ফন্ট সাইজ:
থিম:
দূরত্বের প্রণয় ২

৩৭তম পর্ব

লেখক: স্বর্ণালী ইসলাম

#দূরত্বের_প্রণয়_২

#স্বর্ণালী_ইসলাম

পর্বঃ৩৭

রাতের আমেজ, সবাই খাবার টেবিলে বসে আছে। অনেকদিন পর আশা বাড়িতে আসাতে আকাশ-তাশার আদর-আহ্লাদ অন্যরকম। যেহেতু রোমানা বেগমের অসুস্থতাই তাদের আসার মূল কারণ, তারা দেখা করেছিল ওনার সঙ্গে দেখা করেনি অহীন। কয়েকবার বলার পরেও দেখা করল না সে। খাবার খাওয়া শেষ হতেই অন্তিক তাকে নরম গলায় বলে,

“দাদুর বয়স হয়েছে, একবার দেখা করে নাও।”

​অহীন তাকে সম্পূর্ণ অশোনা করে গিয়ে মায়ের কাছে বসে। সে জানে এই বিষয়ে কুহু তাকে কিছুই বলবে না। বরাবরই তাদের সমস্ত সিদ্ধান্তে সঙ্গ দেয় কুহু। দীর্ঘশ্বাস নিয়ে অন্তিক কুহুর পাশে বসে ওর গায়ে হাত দিয়ে বলে,

“বোঝা ওকে, আম্মু বাঁচবেই বা কতদিন?”

​ছেত করে ওঠে কুহু। অনেকটা দূরে সরে গিয়ে গম্ভীর গলায় হুমকি দেয়,

“একদম কাছে আসবে না বলে দিলাম, তোমার ছেলেকে বোঝাও গিয়ে তুমি।”

​সেই সকাল থেকে একটা কথাও বলেনি তার সঙ্গে কুহু। রাগ কেন হয়েছে তা হাজারবার জিজ্ঞেস করেছে, কিন্তু উত্তর সে পায়নি। অসহায় হয়ে অহীনের থেকেও জিজ্ঞেস করেছে, কিন্তু ছেলেটা তার চেয়ে বড় হারামি, পাত্তাই দেয় না। অনেকটা সময় পর নিজ রুম থেকে কুঁজো পায়ে বের হয়ে আসেন রোমানা বেগম। আগের মতো তরতাজা শরীরটা নেই, শুকিয়ে কাঠ হয়েছে শরীর, কোমরটিও নুয়ে গিয়েছে। ওনাকে দেখামাত্র অহীন বসা থেকে উঠে সিঁড়ির দিকে চলে যেতে নেয়। ওমনি ওর পেছনে যায় আশা। রোমানা বেগম মলিন মুখে আছেন, অহীনকে সবার থেকে একটু বেশি ভালোবাসেন তিনি, বাড়ির বড় ছেলে আর সঙ্গে এতটা সুদর্শন যে। তবে সেই আদরের নাতির মনঃক্ষুণ্ণতা কষ্ট দিচ্ছে মনে। অর্ধেক সিঁড়ি উঠতেই আশা গিয়ে তার পথ আটকে ধরে। চোখাচোখি হয় দুজনের। আশা গভীর গলায় প্রথমেই প্রশ্ন করে,

“তুমি তো বলেছিলে দাদুর চাপে পড়ে বিয়ে করোনি, তাহলে কেন এত রেগে আছ? সত্যি বলো অহীন, তুমি নারাজ এই বিয়ের জন্য?”

​আশার হঠাৎ কথায় উত্তর খুঁজে পেল না অহীন। কিছুটা সময় তাকিয়ে থেকে বলে,

“মাথা ঠিক আছে তোর? নারাজ হলে তোর রাগ ভাঙাতাম?”

​“দাদুর সঙ্গে কথা বলো গিয়ে। আমার ওনার ওপর রাগ নেই, তুমি কেন রাগ?”

​“মুড নেই, সর।”

​আশাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলে তৎক্ষণাৎ আশা বলল,

“ঠিক আছে, আমারও মুড নেই তোমার সাথে ফ্রান্স যাওয়ার।”

​অহীনের পা থামে। মেয়েটা বড্ড জেদি। অন্য সময় হলে হয়তো ঠাটিয়ে চড় দিত গালে, কিন্তু এখন তো আশা তার বিয়ে করা একমাত্র বউ। সে দুটো সিঁড়ি নেমে আসে। আশাকে আপাদমস্তক দেখে সবার দিকে তাকিয়ে আবার বউয়ের চোখে চোখ রেখে সবাইকে শুনিয়েই বলে,

“তোকে আমি বিয়ে করেছিলাম তার জন্য কখনো আমি অকৃতজ্ঞ হব না। আমাদের বিয়েটা স্বাভাবিক হতে পারত, হয়তো আল্লাহ এমনভাবেই লিখেছিলেন। সবকিছু ভুলে গেলেও তোর চরিত্র নিয়ে কথা বলা ওনার ঠিক হয়নি। উনি জানতেন অহীন আর যাই করুক কখনো এমন কিছু করবে না। তবুও এতগুলো লোকের সামনে তোর গায়ে হাত তুলেছেন। তোকে বিয়ে করে আমি সব সামলে নিয়েছি আর কেউ কিছু বলেনি। কিন্তু উনি আমার আম্মু-পাপিকে নিয়ে বলেছেন। আমার পাপি, আমি ওনাকে কেন ভালোবাসি? কারণ উনি আমার মায়ের সেই সময়ের সঙ্গী যখন আব্বুও খোঁজ করেনি। নীরবে যত্ন করেছেন আমার আর আম্মুর।”

​একটু থেমে রোমানা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমার মায়ের মতো উনিও পারতেন ছেলেকে দুটো ধমক দিতে, তাহলে আমার মা দূরে কখনো যেতই না। ওনার জন্যই তো দূরে গিয়েছিল। ওনার ছেলে খোঁজ নেয়নি বলেই পাপিদের সঙ্গে থেকেছে। তাহলে কোন কারণে আমার আম্মু আর পাপিকে অপবাদ দিলেন উনি সেদিন?”

​আশার গালে হাত দিয়ে আদর করে বলে,

“আমি তবুও আমার আব্বু আর আম্মুর জন্য ওনাকে সম্মান করি, কিন্তু আর সম্ভব নয়। এসবের জন্য প্লিজ আমার সাথে ঝামেলা করিস না, তোর সাথে আমি ভালো থাকতে চাই।”

​গালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে অহীন উপরে চলে যায়। স্তব্ধ হয়ে আছে সকলে, কতটা ক্ষোভ জমানো অহীনের মাঝে। আশা রোমানা বেগমের দিকে তাকিয়ে নতমস্তকে চলে যায়।

_____

​রাত প্রায় অনেক হয়েছে। অহীনটার কী হয়েছে কে জানে, বাড়ি যাওয়ার ভীষণ তাড়া আছে। বাইরে বাইকের সামনে দাঁড়িয়ে সবাই বিদায় নিচ্ছে। আশা বরাবরের মতোই অন্তিকের সঙ্গে যাবে। আর কুহু তো রেগেই আছে। আকাশে মেঘগুলো ভারী হয়ে আছে, এখন না গেলে বৃষ্টিতে ভিজতে হবে। অন্তিক বাইকে উঠে কুহুর দিকে তাকিয়ে ইশারা করতেই গিয়ে ওখানে আশা বসল। অন্তিক পেছনে তাকায়। এখন আশাকে নামতে বলা মানে আশাও গাল ফোলাবে। কুহু গিয়ে অহীনের বাইকে ওঠার আগেই জেদ করে নেমে যায় অহীন। মুখে বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকালো। কুহু হতবুদ্ধির মতো তাকিয়ে আছে। অহীন বিরক্ত হয়ে বলে,

“ওখানে গিয়ে বসলি কেন তুই? তোর জন্য আম্মু-আব্বু একটু প্রাইভেসি পায় না ছাগল।”

​আশা অন্তিকের কোমর জড়িয়ে ধরে,

“তোমাকে কে বলছে ওনাদের প্রাইভেসি চাই? আমি বড় আব্বুর সঙ্গেই যাব, সরো।”

​“তবে রে পেঁচি!”

​হনহনিয়ে বড় বড় পা ফেলে ফোঁস ফোঁস শ্বাস নিয়ে আশার কাছে যায়। অন্তিকের দিকে তাকিয়ে মুখে অমাবস্যার মতো অন্ধকার করে টান দেয় আশাকে। কোমরে শক্ত করে ধরে তুলে নেয়। আশা শক্ত করে ধরে আছে অন্তিকের শার্ট, সে যাবে না অহীনের সঙ্গে। অন্তিক বেচারা বউ নাকি মেয়ে নিয়ে পড়েছে ঝামেলায়, দুটোই জেদি। অনেক ধস্তাধস্তি করে অহীন আশাকে ছাড়িয়ে নামায় বাইক থেকে। হাঁপিয়েছে ছেলেটা। কুহুর দিকে তাকিয়ে বলে,

“দেবে না?”

​“যাও।”

​অহীন আশার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে, হাসিতে রহস্য। আশা এতে গাল বাঁকিয়ে নেয়। বাবা-মায়ের সল্প লেহাজ হয়তো অহীনের মাঝে এই মুহূর্তে নেই। পেছন থেকে ধরে আশাকে শূন্যে তুলে নেয়। ওভাবেই নিজের বাইকের পেছনে বসিয়ে নিজেও গিয়ে বসে। হেলমেটগুলো কুহুর হাতে দিয়ে গভীর গলায় বলে,

“জান, টাইট করে ধরবি, তোর রাগ ভাঙাব।”

​হাওয়ায় মিলিয়ে গেল তারা দুজন। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে চোখের আড়াল হয়ে গেল। অন্তিকের পেছনে গিয়ে গম্ভীর মুখে বসে কুহু, তবে গায়ে হাত দিল না, পেছনে ধরে রেখেছে।

​বাতাসের সাঁ সাঁ শব্দের সাথে টেক্কা দিয়ে চলেছে অহীন। শক্ত করে তাকে জড়িয়ে রেখেছে তার প্রেয়সী। এই প্রথম মন ও শরীর দুটিই অহীনের সঙ্গে কোথাও যেতে সায় দিয়েছে, হয়তো তাই অভিমানের আড়ালে ঠোঁটে লুকোচুরির মিষ্টি হাসি। কৃত্রিম রাগ নিয়ে খসখসে মেজাজে বলে আশা,

“কোথায় যাচ্ছ? বাড়ি তো ছেড়ে আসলাম?”

​বাতাসের এত জেদি শব্দ আজ হার মানিয়েছে তার বউটার কণ্ঠকে। অস্পষ্ট কথাটা না শুনেই বলে,

“বসে থাক চুপ করে। পারলে আরও একটু কাছে আয়, তোকে অনুভব করতে পারছি না আমি।”

​তার কথায় কোনো গুরুত্ব দিল না আশা। গ্রামের একটি সরু পথে তারা ঢুকেছে। চারপাশে বিশাল বিশাল চাষের জমিগুলোতে সবুজ ফসলগুলো অন্ধকারে আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে। দুই পাশে লম্বা লম্বা গাছগুলো হেলে যাচ্ছে একদিকে। একদম সব নীরব। বাতাসের শব্দ ও গাছের এমন অস্বাভাবিক নড়াচড়া যেন অশরীরী আত্মাগুলো। ভয়ে শিউরে ওঠে বারবার অহীনকে জড়িয়ে ধরছে আশা। এতে সুখের দীর্ঘশ্বাস নিয়ে গেয়ে ওঠে অহীন,

​“যে দেশে চেনা জানা মানুষ কোনো নাই

ইচ্ছে করে তোরে নিয়ে যাই

যে দেশে শাসন-বারণ, সোনার খাঁচা নাই

ইচ্ছে করে তোরে নিয়ে যাই

​অতঃপর হালকা আলোর দেখা মিলতেই তার গানে ব্যাঘাত ঘটায় আশা, আর উৎসুক হয়ে বলতে থাকে,

“থাম থাম! গ্রামের মাঝে দেখ ফুচকার দোকান, চলো খাই।”

​“বাতাস খেয়ে পেট ভরেনি? বৃষ্টি হবে, অন্যদিন নিয়ে আসব আজ না।”

​আশা ওর কাঁধে থাপ্পড় দেয় জোরে,

“আমার কথা শোনো না কেন? খাব মানে আমি খাব। আর এখনই এখানে নিয়ে আসো বাইকে বসে খাব। বড় আব্বু হলে না করত না কখনো।”

​তার চেয়ে বেশি তার বাবার ভক্তিটা হজম হচ্ছে না আজ পুরোটা দিন। সকালেই তাকে রেখে আইসক্রিম খেতে চলে গেল, আর এখনও বড় আব্বু? ঈর্ষায় ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে। বাইক থামায় অহীন, বউটার জেদের সঙ্গে পারল না। একটি ছোট স্টল ফুচকার, বৃষ্টির জন্য কোনো মানুষ নেই, একটি ছেলেই বসে আছে শুধু ওখানটায়। অহীন আশাকে বসিয়ে দিয়ে সে ওখানে যায়। কিছু সময় পার করে একটি ওয়ানটাইম প্লেটে করে নিয়ে আসে। আবারও বাইকে বসে আশার হাতে প্লেট দিয়ে স্টার্ট দেয় বাইকটি। আশা জিজ্ঞেস করে,

“খাব না?”

​অহীন হালকা গলায় বলে হুমকির মতো,

“তোর কথা শুনলাম আমি, এখন আমি যা বলব সব শুনবি। চুপচাপ বসে থাক।”

​এক হাতের তালুতে প্লেট অন্য হাতে অহীনের কাঁধে হাত রেখে বসে আছে আশা। শীতল বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে তার আদল, ঠান্ডায় কম্পিত বদনটিও বারবার ছুঁয়ে দিচ্ছে অহীনের তপ্ত শরীর। এই শীতল আবহাওয়ায় অহীনের শরীরটাই মনে হচ্ছে সবচাইতে আরামদায়ক। চারপাশ একদম নির্জন, দূর-দূরান্তে কোনো আলো নেই। রাস্তার মোড় ঘোরার আগেই হঠাৎ বাইকটা জোরে ব্রেক করে অহীন, আশা তার গায়ের সাথে একদম মিশে গেল। অহীনের শরীরের তপ্ততা বাড়ছে। বাইক থেকে নেমে আশার সামনে এসে দাঁড়ায়। বাইকের হেডলাইটের হলদে আলোতে অহীনের লাল হয়ে টগবগ করতে থাকা মুখটার দিকে তাকায় একটু চিন্তিত হয়ে। হাত বাড়িয়ে গাল ছুঁয়ে দেয়। গরম হয়ে পুড়ছে সে। আশার শীতল হাতের স্পর্শ পেয়ে চোখ বুজে নেয় অহীন আর গালে চেপে ধরে হিসহিস করে বলে,

“আর পারছি না এবার খোল জান।”

​“এ্যা?”

​অহীনের কথার সঠিক মানে ধরতে পারছে না আশা। এমন মাঝরাস্তায় কি পাগল হয়ে গিয়েছে এই লোক? তার ওপর অদৃশ্য একটা ভয় তো কাজ করেই সেদিনের ছোঁয়ার পর থেকে। হাত কেঁপে ওঠে, ছাড়িয়ে নিতে চায়। অহীন বুঝতে পেরে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে। কী অদ্ভুত রহস্য এই হাসিতে! বিয়ের পর লোকটাকে বোঝা মুশকিল হয়ে পড়েছে, কখন কী চায় জানে না। আগের অহীনের পরিবর্তনগুলো লক্ষ করে সে। অহীন ওর কাছে গিয়ে কোমর ধরে কানের কাছে নেশালো গলায় ফিসফিস করে বলে,

“ফুচকার ঢাকনা।”

​তৎক্ষণাৎ কেশে ওঠে আশা। নিজের থেকে ঝটকায় দূরে সরিয়ে দিল তাকে। এবার লজ্জায় তার গাল লাল হয়ে উঠেছে। অহীন আবার বলে,

“তুই যেটা ভেবেছিস সেটাও করার জন্য মরিয়া হয়ে আছি। Trust me, there is no fucking feeling better than this.”

​আশার বুক ওঠানামা করছে ভয়ে। সেদিনের মতো আজও তাকে এই নির্জন রাস্তায় বাঁচানোর কেউ নেই। ওর ওষ্ঠ প্রায় ছুঁই ছুঁই রেখে বলে অহীন,

“Can I?”

​আশা আবার তাকে ধাক্কা দেয়, চোখ সরিয়ে ফুচকার প্লেটটি খুলতে থাকে। উপরের প্লাস্টিকের ঢাকনাটা খুলে অহীনের দিকে একটিবার না তাকিয়ে গপ করে একটি মুখে পুরে নেয়। দুই পাশে গালগুলো ফুলে আছে তবুও চোখে চোখ রাখার সাহস করছে না আশা। অমনি কানে আসে অহীনের হাসির শব্দ। গাল ফুলিয়ে তার হাসির দিকে মুখ তুলে তাকায় আশা। মুখ খুলে শব্দ করে হাসছে অহীন। আশা ওর মুখে একটি পুরে দিয়ে জিভ দেখিয়ে ভেঙচি কাটে। অহীন শান্ত হয়ে প্লেটের দিকে দেখিয়ে হেসে হেসে বলে,

“মরিচ সরিয়ে দে জান, ঝাল খেতে পারি না তো।”

​আশা তাই করছে। উপরের কাঁচা ঝালগুলো সরিয়ে সরিয়ে ওকে খাইয়ে দিচ্ছে। জিজ্ঞেস করে,

“তোমার জ্বর?”

​মাথা নাড়ে অহীন। তার তো জ্বর নেই। তবুও শরীর গরমে পুড়ে যাচ্ছে। আশা ভ্রু কুঁচকে আবার জিজ্ঞেস করে,

“তাহলে শরীর এত তপ্ত কেন?”

​“তোকে সেদিনের মতো কাছে পাওয়ার জন্য।”

​নির্লিপ্ত অহীনের কথাটা কিন্তু দারুণ ডেসপারেট লাগছে। আশার একটা হামি এই মুহূর্তে তাকে নিঃশেষ করে দেবে। তাই কথা বাড়াল না আর, চুপ করে গেল দুজন।

________

​দুপুরের তপ্ত রোদে ক্লাস থেকে বের হয়েছে অন্তিহা। আজ জেসি নেই, থাকবে কোত্থেকে? গত রাতে নেশায় টাল হয়ে পড়েছিল। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হাঁটছে। কানে জোরে জোরে হর্নের শব্দ বাজতেই পাশে ফিরে তাকায় সে। পরিচিত গাড়িটি থেকে তীক্ষ্ণ চোয়ালে রাগ নিয়ে আয়াশ তাকিয়ে আছে তার দিকে। ফোঁস করে শ্বাস নিয়ে সামনে তাকায় সে। সাফওয়ান হাতে একটি রুবিকস কিউব নিয়ে খেলা করছে। উল্টো পথে যেতেই আবারও হর্ন বাজে। সে রাগ নিয়ে তাকায় আয়াশের দিকে। আয়াশ গম্ভীর ও শক্ত গলায় বলে,

“গাড়িতে ওঠো।”

​হাঁটছে অন্তিহা ধীরে। আয়াশের গাড়িটা তার পিছু নিয়েছে।

“আমার পায়ে ময়লা, জুতো খোলা যাবে না।”

​“গাড়িতে পানি ও টিস্যু আছে।”

​“নো নিড, আমি যাব না আপনার সঙ্গে।”

​আয়াশ গাড়ি থেকে নেমে আসে। অন্তিহার হাতে ধরে টান দেয়, ফলে অন্তিহা থামে। হাত ঝাড়া দিতে চাইলে হেঁচকা টানে তাকে গাড়ির দিকে নিতে থাকে আয়াশ। গাড়ির দরজা খুলে ছুড়ে মারে তাকে, সঙ্গে নিজেও ভেতরে গিয়ে গাড়ি লক করে দেয়। ব্যাকসিটে কিছুক্ষণ দরজার সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে শান্ত হয়ে যায় সে। আয়াশ ওর পায়ের দিকে তাকায়। ময়লা নেই তবুও মনে হচ্ছে কত নোংরা পায়ে। নিজেকে সংকুচিত করে সে শুধায়,

“রাতে এমন করে কল কাটলে কেন? আজ পুরোদিন ইগনোর করেছ?”

​অন্তিহা বেশ বিরক্তি নিয়ে বলে,

“আয়াশ, এত রাতে কোনো ভদ্রলোক একটা মেয়েকে কল করে না। আর রইল আপনাকে ইগনোর করছি? আমাদের মাঝে এমন কিছু নেই। আগে একটা সম্পর্ক ছিল আশার সাথে আপনি রিলেশনশিপে ছিলেন, এখন নেই। আপনাকে কেন আমার প্রায়োরিটি লিস্টে রাখব? প্লিজ লক খুলুন গাড়ির।”

​তাচ্ছিল্য করে হাসে আয়াশ। চোখ ছোট করে দাঁতে দাঁত পিষে বলে,

“সাফওয়ানের কোলে ওঠা যায় রাতের বেলা, আমার কল রিসিভ করা যায় না? ওর সঙ্গে কিসের সম্পর্ক যে ও বিরক্ত করলেও কিছু বলো না? তোমরা রিলেশনশিপে আছ?”

​অন্তিহা ফোঁস করে তপ্ত শ্বাস ফেলে হাতের ওপর নিজের হাত কচলাতে কচলাতে বলে,

“নান অফ ইউর বিজনেস। বের হতে দিন।”

​“মানে রিলেশনশিপে আছ?”

​“হ্যাঁ, আছি তো?”

​রাগে মস্তিষ্কের পোকাগুলো কিড়মিড় করে উঠছে তার বারবার। তপ্ত রাগ গাড়ির ভেতরে ছেড়ে হঠাৎ লক খুলে দিল। অস্বাভাবিক ভাবে বলে,

“Get out of the car.”

​অন্তিহাও তার সঙ্গে কথা বাড়াল না, দরজা ধাক্কা দিয়ে বের হয়ে গেল। আয়াশ ওর দিকে তাকিয়ে আছে উইন্ডো দিয়ে। খুব রগচটা অন্তিহা, সে জানে, কিন্তু তার সঙ্গে প্রথম। নিজের অনুভূতি জানে না সে। কিছুদূর আসতেই সাফওয়ান হাসিমুখে অন্তিহার পিছু নিচ্ছে। আজ কথা নেই সাফওয়ানের পক্ষ থেকে কোনো, তাই অন্তিহার প্রতিবাদের খাতা খুলতে হলো না। পেছনে একজন মানুষ তাকে অনুসরণ করছে চুপচাপ। আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের ওপর হাসে অন্তিহা। যাকে চায় সে তাকে চায় না, আর যে তাকে চায় তাকে সে চায় না। একটা বার শুধু সাফওয়ানকে ভালোবাসতে পারলে হয়তো কিছু হতো। কিন্তু সে বাসবে না, সে জানে। সে চায় তার মা-বাবার সঙ্গে থাকতে। একটা নারীর জীবনে পুরুষ থাকতে হবে কেন? সে নিজের যোগ্যতায় মা-বাবার সঙ্গে থাকতে চায়। পেছনে তাকিয়ে সাফওয়ানকে দেখতেই ছেলেটা অন্য দিকে তাকিয়ে চোখ লুকায়। অন্তিহা এই ছেলেটাকে যদি আয়াশের মতো করে বোঝাতে পারত। এত বলে অন্যজনকে ভালোবাসে তবুও পিছু ছাড়ে না লোকটা তার। হঠাৎ মাথায় আসল সাফওয়ান তার কত বড় হবে? আবার পেছনে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে গলা তুলে,

“এই, আপনার বয়স কত?”

​পেছন থেকে এক গাল হেসে উত্তর করে সাফওয়ান,

“কত চান?”

​“আর যাই চাই আপনার মতো পিচ্চি চাই না।”

​"I know you want it big… the man, I mean. তাই না?”

​"Too bad yours is so small… your intellect, of course.”

​“দেখতে চাও? চিপায় আসো। সাফওয়ান আপনাকে দেখাতে অলওয়েজ রেডি।”

​“জাওরা।”

​হিস্ হিস্ করে ছোট গালিটা দিয়ে আবার সামনে হাঁটতে থাকে সে। এবার আর পেছনে তাকায় না। মেট্রোতে করে যেতে হবে, লেট হওয়া যাবে না। পেছনে সাফওয়ান আসবে, হাজার বললেও আসবে, তাই একে বলে সময় নষ্ট করার মানেই হয় না। ওর দিকে তাকিয়ে আছে সাফওয়ান। জানে না কী আছে এর মাঝে। পেছনের উড়ন্ত চুলগুলোকে ইচ্ছে হচ্ছে হাত বুলিয়ে শুঁকে নিতে। মেয়েটা সারাক্ষণ বলে অন্য কাউকে ভালোবাসে! আন্দাজ করাও সহজ মানুষটা আয়াশ, কেননা অন্তিহা আয়াশের ছোট ছোট জিনিসগুলো গভীর ভাবে খেয়াল রাখে, যেমন কখনো ক্লাসে পেন প্রয়োজন হলে সেই এগিয়ে দেয়। এসব কি তাকে পোড়ায় না? হ্যাঁ পোড়ায়। সে জানে না কবে আয়াশকে খুন না করে দেয় নিজ হাতে।

​“আয়াশ কি আমার থেকে বেশি ভালো ও সুদর্শন? ওর মুখটা সত্যি অসাধারণ।”

​বিড়বিড় করে বলে কথাটা সে নিজেকে নিজে। ওই মুখটা কোনো একদিন নিশ্চিতভাবে সে নষ্ট করে দেবে। কারণ অন্তিহা শুধুই তার প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার সাহস করবে, আর কারো না। হোক সেটা যে-ই।

<<______

​ঠান্ডা শীতল বাতাস, রাত এখনো অনেক বাকি। টিপটিপ করে বৃষ্টির ফোঁটা এসে অহীন ও আশার শরীরে পড়ছে। আশা ওয়ানটাইম প্লেটটি ফেলে দিয়ে বলে,

“চলো চলো, জোরে বৃষ্টি আসলে বাইক চালানো কঠিন হবে।”

​আশা ঠিকঠাক হয়ে বসে। অহীন বাইক চালায়, তবে বেশি দূর যেতে পারল না তারা। হঠাৎ ঝড়ের তোপে বাইক থামাতে হলো তাকে। একটি বড় গাছের নিচে বাইক নিয়ে স্থির হয় তারা, তবে যে বৃষ্টির পানি থেকে বাঁচা যাবে তার সুযোগ নেই। আশা অহীনের ওপর বিরক্ত। আশা তপ্ত রাগ দেখিয়ে বলে,

“এখানে নিয়ে আসলে কেন? বাসায় চলে গেলে তো এমন হতো না।”

​অহীন বলে রাগ দেখিয়ে,

“আর তোর খাওয়া? ফুচকা খাব ফুচকা খাব শুরু না করলে বাসায় চলে যেতাম।”

​“এখন আমার দোষ? তুমি কত খারাপ! ছিঃ! তোমার সঙ্গে আসাই ভুল হয়েছে।”

​অহীন অন্য দিকে তাকায়। শরীরের শার্টটি খুলে আশাকে আবারও বাইকে বসিয়ে তার মাথাটা ঢেকে দেয়। মেয়েটার বেশি সময় ভিজলে সমস্যা হবে, আশপাশে কোনো ঘরবাড়িও নেই, দূর-দূরান্তে শুধুই চাষের জমি। অন্যদিকে তাকিয়ে আশা এবার শীতে কাঁপছে তিরতির করে। দুই হাতে স্বামীর উন্মুক্ত পিঠ জড়িয়ে ধরে বুকের সঙ্গে মিশে যায়।

“শীত।”

​আশার কথাটা বুকে গিয়ে আঘাত করল তার। হয়তো তারই ভুল হয়েছে এত রাতে বের হওয়াটা। মুখ তুলে আশা ওর দিকে তাকাতেই সল্প হেসে অহীন ফিসফিস করে বলে,

“তোকে ভেজা শাড়িতে হট লাগছে। টেস্ট করতে ইচ্ছে হচ্ছে।”

​“ধুর সরো! তোমার কাছে আসাই ঠিক না।”

​এমন পরিস্থিতিতে এমন কথা খুবই বিরক্তিকর, আশা হলোও তাই। দূরে সরে যেতে নিলে অহীন ওকে আবার নিজের বুকে এনে রাখে। ভেতরের দ্রিমদ্রিম শব্দটা অনুভব করছে আশা। এত শীতল পরিবেশে অহীনের শরীর গরমে পুড়ে যাচ্ছে। কিন্তু জ্বর নেই বলল কেন? অহীন ওর মুখটা নিজের দিকে তুলে। পানির বিন্দুগুলো গাল গড়িয়ে চিবুক দিয়ে ঝরছে আশার। পাতলা শাড়িটা গায়ের সাথে এমনভাবেই লেপ্টে আছে যে কিছুই নেই মেপে দেখার বাকি। অহীন মৃদু হেসে অন্য দিকে তাকায়। হাসিটা আসলে নিজের ওপর, কারণ সে নিয়ন্ত্রণে থাকতে চায় কিন্তু প্রকৃতি চায় না সে নিয়ন্ত্রণে থাকুক। এই বৃষ্টি, এই বাতাস চায় সে আশার মাঝে আবার উন্মাদ হয়ে যাক। আশা ওকে হাসতে দেখে জিজ্ঞেস করে,

“হাসছ কেন?”

​ওর দিকে তাকায় সে আবার। ঠোঁটগুলো ভিজে জুবুথুবু হয়ে টইটম্বুর। অহীন ঝুঁকে ওর ঠোঁটের কাছে অধর খানা ওভাবেই রেখে বিড়বিড় করে বলে,

“তোর মাঝে কিছু আছে যা আমাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। আমি চেয়েও দূরত্ব টানতে পারছি না। তুই অভিমানী হয়ে যা, নয়তো আবার কষ্ট দিয়ে ফেলব।”

[এখানের কিছু অংশ প্রাইভেট গ্রুপে দেয়া হয়েছে, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য, জয়েন হয়ে নিজ দায়িত্বে পড়বেন।

গ্রুপ লিংকঃ https://facebook.com/groups/1762297631373262/ ]

​আশার দুটো হাত নিজের গলায় পেঁচিয়ে দেয় সে। চোখ খিঁচিয়ে বন্ধ করে তপ্ত শ্বাস অহীনের কাঁধে ফেলে। মুহূর্তের সময়টা থমকে দিয়ে অহীন আগায় আশার আরও কাছে। আচানক চকচকে লাল লাইটের আলো এসে আশার চোখে পড়তেই অহীনকে নিজ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় সে। এবার অহীন তেতে উঠেছে, বারবার কত বাধা লাগে? তবে মুখ খোলার আগেই লাইটের আলোটা তার মুখে এসে পড়ে। একদম চোখের ওপর এসে পড়ছে ফলে তাকাতে পারছে না তারা। আশা নেমে নিজের কাপড় ঠিক করে অহীনের পেছনে গিয়ে লুকায়।

“অহীন...।”

​“আছি, ভয় পাস না।”

​টর্চের তীব্র আলোটা কাছে আসতেই একটা বৃদ্ধ কণ্ঠস্বর কানে ভেসে এল,

“এই, কারা তোমরা? এত রাতে এখানে কী কাজ?”

​আশা পেছন থেকে ফিসফিসিয়ে বলল,

“এই গ্রামের লোক মনে হয়।”

​“হিস্ বলছি আমি, একদম চুপ থাক! এমনিতেই মেজাজ তুঙ্গে আমার।”

​অহীন হাসিমুখে সামনে এগিয়ে যায়। তার উন্মুক্ত শরীর ভিজে একাকার। পেছনে গুটিশুটি মেরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির শরীরের প্রতিটি ভাঁজ বৃষ্টির জলে স্পষ্ট। মাঝরাতের নির্জনে এমন অবস্থায় দেখে লোকটি যা ভাবার তা-ই ভেবে নিলেন। নিশ্চিত হলেন, কোনো ভদ্রঘরের ছেলেমেয়ে এভাবে রাতবিরাতে রাস্তায় ঘুরে বেড়াবে না। প্রেমিক-প্রেমিকা নষ্টামি করছে। অহীন কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই লোকটি গর্জে উঠলেন,

“কী এখানে হ্যাঁ? বাড়ি কোথায়? বাপ-মা জানে তোরা যে এসব করিস?”

​“চাচা, আমরা এদিকে এমনিতেই ঘুরতে এসেছিলাম। আমরা বিবাহিত, বৃষ্টির কারণে আটকে গেছি।”

​“হ্যাঁ, সিধারে বোঝাস? সামনেই তো মসজিদ আছে, ওখানে গেলি না কেন?”

​“মসজিদ?”

​আশা আর অহীন একে অপরের দিকে তাকাল। তাহলে কি একটু দূরে গেলেই বৃষ্টিতে ভিজতে হতো না? এবার আশা অহীনের কানে ফিসফিস করে বলল,

“চলো পালাই, মজা হবে!”

​অহীন চোখ রাঙিয়ে তাকায় তার দিকে। পরিস্থিতি কতটা ঘোলাটে হতে পারে তা নিয়ে মেয়েটার বিন্দুমাত্র চিন্তা নেই, উল্টো পালানোর ফন্দি আঁটছে! তবে অহীনের রাগকে পাত্তা না দিয়ে আশা তার হাত ধরে আলতো করে টান দেয়, তবুও নড়ল না রগচটা স্বামী। অহীন পরিস্থিতি সামলাতে মরিয়া হয়ে লোকটিকে বোঝাতে চাইল,

“আমরা তো সামনের দিকে যাইনি চাচা, তাই দেখিনি। নয়তো কে এই বৃষ্টিতে মিছেমিছি ভেজে বলুন?”

​“নষ্টামি করিস আবার মুখে মুখে কথা কস? তোদের মতো বয়স আমরাও পার করছি।”

​লোকটির চেঁচামেচিতে চারপাশ থেকে আরও কয়েকজন এগিয়ে আসতে শুরু করে। আশা দাঁত কিড়মিড় করে। বাইকে উঠে চলে যাওয়ার কথা বললেও ছেলেটা শুনল না! এখন লোক জড়ো হচ্ছে। এদিকে অহীনের মেজাজ তখন চরম পর্যায়ে। একে তো বৃষ্টিভেজা বউটাকে নিবিড়ভাবে কাছে পাওয়ার সুযোগ নষ্ট হলো, তার ওপর লোক জমলে আশার ভিজে থাকা অবয়ব অন্যদের নজরে পড়বে—এটা সে সহ্য করতে পারছে না, কেউ তার পেঁচির নিখুঁত বদন দেখবে। উপায় না পেয়ে সে আশার হাত শক্ত করে নিজের মুঠোয় পুরে নিল। নিচু স্বরে বলল,

“পরিস্থিতি ভালো না, বাইক পরে নিয়ে যাব। এখন পালাই চল!”

​আশা একবার সামনের দিকে তাকায়। কয়েকজন লোক টর্চ হাতে এগিয়ে আসছে। পেছনে অনেকটা পথ ছুটে লাভ নেই, আর দুপাশে বিস্তীর্ণ ধানের জমি।

“ডান দিকে... ওয়ান টু থ্রি... চল পেঁচিইইই!”

​“এই এই! পলাইল, পলাইল! ধরো ওদের, নষ্টামি করতেছিল!”

​ঢালু জমি দিয়ে নেমে কাদা মাটিতে পা রাখল দুজন। একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে অন্ধকার চিরে ছুটছে তারা। পেছন থেকে ধাওয়া করা টর্চের আলো তাদের ওপর এসে পড়ছে, অথচ সামনের পথ একদম ঘুটঘুটে অন্ধকার। ভয়ের মধ্যেও এক অদ্ভুত নতুন অনুভূতির শিহরণ জাগছে মনে। আশা বারবার কুঁকড়ে উঠে বলল,

“ভয় লাগছে তো! ওরা ধরলে কী করবে? আমরা তো বিবাহিত!”

​“ধরে বেঁধে রাখবে, তারপর সকালে আবার বিয়ে দেবে। সমস্যা হলো বাড়িতে জানলে মান-সম্মানের ফালুদা হয়ে যাবে।”

​“এই থাম অসভ্য পোলাপান! তোদের মতো ছেলেমেয়ের জন্য মা-বাপ সমাজে মুখ দেখাতে পারে না। ধর, ধর ওদের! তোর শশুর আমাকে ধুয়ে দেবে।"

​অন্ধকারে দিকভ্রান্ত হয়ে একসময় তারা থমকে দাঁড়ায়। সামনে বিশাল ধানখেত, হাঁটু সমান জল। এখানে নামলে সাপ বা বিষাক্ত পোকামাকড়ের ভয়। আশা ঢোক গিলে বলল,

“এবার?”

​অহীন পেছন ফিরে দেখে ওরা প্রায় কাছে চলে এসেছে। ওষ্ঠ কামড়ে উত্তেজনা গিলে সে আশার দিকে তাকায়। মেয়েটির মাথায় এখনো অহীনের শার্টটা ঝুলে আছে, বৃষ্টির ঝাপটায় চোখগুলো তিরতির করে কাঁপছে। অহীন পরম মমতায় শার্টটি ওর শরীরে জড়িয়ে দিল, তারপর হঠাৎ ঝুঁকে ওর অধরে ছোট শক্ত একটা চুমু খায়। ফিসফিস করে বলল,

“আমি একদম সহ্য করব না যে এই নিখুঁত সৌন্দর্য আমি ছাড়া অন্য কেউ একপলকও দেখুক!”

​আশা মাথা নাড়ল। যাতে অহীন বুঝতে পারে আশা সত্যি কাউকে দেখতে দেবে না তার জিনিস। অহীন ওকে আলতো করে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে ধানখেতের ভেতরে পা রাখে। দুজনেই ভিজে সিক্ত। অথচ এখন আর সেই ভয়টা নেই, বরং এই অভিজ্ঞতাটা তারা উপভোগ করতে শুরু করেছে।

​আশা হুট করেই অহীনের গালে একটা গভীর চুমু এঁকে দিয়ে সুর তোলে,

“মাটিতে পা রেখে,

আকাশে ডানা মেলে

চললি তুই সে দেশে...”

​নিজের থেকে এই প্রথমবার কোনো আবদারহীন ভালোবাসা প্রকাশ করল সে। মুহূর্তেই যেন থমকে গেল অহীনের পৃথিবী, থমকে গেল তার চলার গতি। সে বিস্ময়ভরা চোখে আশার দিকে তাকায়। অন্তরের আনন্দ যেন উপচে পড়ছে! মনে মনে ভাবল, ইশ! যদি আবারও গ্রামবাসীগুলোর সামনে গিয়ে তাদেরকেই জড়িয়ে ধরে চুমু দিয়ে আসা যেত! ওরা না এলে কি এই মেয়েটি আজ নিজ থেকে এমন ভালোবাসার পরশ তাকে উপহার দিত? যেটা ছিল কল্পনার বাইরে। অহীন আবেশে আবার পা বাড়িয়ে হাঁটতে শুরু করে আশার সাথে তাল মিলিয়ে গানের সুর তোলে,,

​“যেখানে কখনো

পাবে না কেউ খুঁজে

চল সেই নিরুদ্দেশে”

​জনসম্মুখের আড়ালে গিয়ে একটা ছোট মাচার নিচে সে আশাকে কোল থেকে নামিয়ে দেয়। পায়ে সামান্য চোট পেয়েছে অহীন। তবুও স্থির প্রশান্তি আর চিন্তা মিশে অদ্ভুত শিহরণ। আশার পাশে বসতেই আশা ওর কাঁধে মাথা রাখে। অহীন ওর হাতের উল্টো পিঠে চুমু খায়। হাঁপাচ্ছে, কাদা মাটিতে পা রাখা বড় কষ্টের কাজ তার ওপর আশাকে কোলে নিয়ে রেখেছিল। অহীন হিসহিস করে বলে,

“শেষ পালানোর মজা? এবার বাইক কীভাবে আনব?”

​“লোকজন কমলে।”

​“তোর মনে হয় ওরা বাইক ছাড়বে?”

​আশা চুপ করে গেল এই মুহূর্তে। অহীন দেখছে এবার তাদের আশেপাশে কেউ নেই। আশার ভেজা শরীরটা তার শরীরের উষ্ণতার সাথে মিশে আছে। ঝুঁকে যায় অহীন, প্রেয়সীর অধরগুলো আবার ছুঁতে চায়। চোখ বন্ধ করে অহীনের বারবার বেলেহাজ স্পর্শগুলো সহ্য করছে আশা। শাড়ির আঁচলে হাত মুছে নেয় ভালো করে, হাতে কাদা মাটি লেগে আছে। আশার আরও একটু কাছে যায় সে। আশা হিসহিস করে বলে মজার ছলে,

“শিক্ষা হয়নি তোর কুত্তা!”

​আশার গলায় নাক ঘষে সে। ঠোঁটের কোণায় হাসি রেখে বলে,

“কী করব বল? কপালটাই আমার খারাপ। প্রথমবারে রাগ করে চলে এলি দুটো মাস উপোস কাটল আমার। রাগ ভাঙাতে এখানে আনলাম, এসে তোকে দেখে যে আমি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আমার মতো কে আছে যে বউয়ের কাছে গেলে এত ঝামেলায় পড়ে?”

​“তোমার মতো কয়জন রাস্তায় এমন খেতখামারে বউয়ের ওপর জোঁকের মতো চিপকে যায়?”

চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন