ফন্ট সাইজ:
থিম:
দূরত্বের প্রণয় ২

৩৮তম পর্ব

লেখক: স্বর্ণালী ইসলাম

#দূরত্বের_প্রণয়_২

#স্বর্ণালী_ইসলাম

পর্বঃ৩৮

রাত গভীর হয়ে আছে, দরজায় ক্রমাগত থাপড়াচ্ছে অন্তিক। সেই যে বাড়িতে এসে দরজা বন্ধ করে বসল কুহু আর শুনল না তার কথা, এখনও সে অজানা বউয়ের রাগ কী নিয়ে। অধৈর্যের ন্যায় ডেকেই চলেছে মানুষটা,

“দরজা খুলে যদি আমাকে না বলিস আমি কীভাবে তোর সমস্যা বুঝব?”

​ওপাশ থেকে ক্রুদ্ধ গলা ভেসে আসে,

“বুঝেছই না কবে? বুঝতে হবে না রাস্তায় কচি মেয়েদের আইসক্রিম খাওয়া গিয়ে খিকখিক হেসে হেসে।”

​হতবুদ্ধি বনল বেচারা, আশাকেই তো খাওয়ালো সে। এতে এত রাগের কী আছে এটা তো স্বাভাবিক সব সময় হয়, সে আবার ধাক্কা দিতেই পরপর দুবারের পর দরজা খুলে যায়। কান্না করে চোখগুলো ফুলিয়েছে কুহু, কী অপূর্ব লাগে বউ কান্না করলে—চোখগুলো আটকে গিয়েছে অন্তিকের। তাকে উপেক্ষা করে পিঠ দেখিয়ে চলে যেতেই হুশ ফেরে তার, তৎক্ষণাৎ তার পেছনে যায়। কুহু বিছানায় বসতেই ওর সামনে হাঁটু মুড়ে বসে অন্তিক,

“কী করেছি আমি? বলবে তো, আমাদের বয়স হয়েছে এখন এসব করার সময়? তোমার বয়স বাড়ে না কমে?”

​চোখ ফেরায় কুহু তার থেকে, ফোঁস করে শ্বাস নিয়ে ওর পাশে বসে মুখটা নিজের দিকে ফেরায় তার, চোখে চোখ রেখে এবার কড়া গলায় বলে,

“বলো না পেঁচি কী হয়েছে কী করেছি?”

​জেদ করে ওর হাত সরিয়ে দিয়ে, অন্তিকের মেদহীন পেটে কয়েকটা থাপ্পড় দেয় কুহু। দূরে সরিয়ে দিয়ে রাগ দেখিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,

“তোমার মতো মানুষের পেটে থাকবে ভুঁড়ি, তুমি কেন এত ফিটনেস ধরে রাখো? মাথায় অর্ধেক চুল সাদা থাকবে, তুমি কেন ওগুলো কালো করে রাখো? সাদা পাঞ্জাবি না পরে কেন স্টাইলিশ শার্ট প্যান্ট পরে থাকো? আমি বুঝি না? বাচ্চা হলে বয়স হলে সব মেয়ের সৌন্দর্য খানিকটা কমে যায়, আমাকে তো ভালো লাগে না তাই অন্য মেয়ে পটাও?”

​বাকরুদ্ধ হলো অন্তিক, এক শ্বাসে কী বলল এই মহিলা? এটা সেই কুহু তো কিছু হলেই ছেড়ে চলে যেত তাকে। এখন তার সাথে থাকার কত বাহানা! তবে বুঝল না হঠাৎ এসব কেন বলছে সে। জিজ্ঞেস করে নরম গলায়,

“আজব কথা কেন বলো জান? তোমার জন্য আমি সব সময় পরিপাটি থাকি।”

​অন্তিকের দিকে চোখগুলো পিটপিট করে তাকায় কুহু, আর ক্রুর গলায় বলে,

“বয়স কত তোমার?”

​একটু ভাবান্তর হয়ে মৃদু হেসে উত্তর দেয় অন্তিক,

“৫৫ বা ৬০ হবেই তো, হিসেব করতে পারব না।”

​“দাঁড়াও আমার সামনে।”

​বাধ্য ছেলের মতোই দাঁড়ালো অন্তিক, উপায় নেই রাগ অনেক হয়েছে তর্ক মানে আরও বেশি সময় নির্ঘুম কাটাতে হবে তার। সামনে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই কুহু তাকে আপাদমস্তক দেখে নেয় ভালো করে, অভিযোগের স্বরে বলে,

“এই বয়সে কেন পারফেক্ট থাকতে হবে? আমি তো এমন না। মোটা হয়ে গিয়েছি তুমি হও না কেন? অল্পবয়সি মেয়েরা তোমাকে ৩০-৪০ এর ভেবে নাম্বার দেওয়া নেয়া করে আমি কী দেখি না? আমি এখন সুন্দর নই তাই বুঝি কচি মেয়েদের প্রতি এত আকর্ষণ যায়?”

​অন্তিক কিছু সময় স্থির হয়, পুরোটা দিনের স্মৃতি চয়ন করে সে। তখনই মস্তিষ্কে আসে সকালের ঘটনা, সে হাসি দিয়ে বলে,

“পাগলি মেয়ে একটা, ওটা তো অন্তিহার মতো বাচ্চা একটা মেয়ে তাই। আমার মেয়েটাকে কতগুলো দিন হলো দেখি না, ওকে মেয়ের মতোই দেখলাম।”

​“মেয়েটা তো তোমাকে বাবার চোখে দেখেনি, সে তোমাকে জামাইয়ের চোখে দেখেছে। নজর দেখে বোঝোনি?”

​“আজব এতটুকু মেয়ে কেন বুড়ো মানুষের দিকে বদ নজর দেবে?”

​“দিয়েছে, কারণ তুমি তো বুড়ো হবার নও! হলে তো আর কচি কচি মেয়েরা লাইন মারবে না।”

​ঘরের পরিবেশ আবার গুমোট হলো। কুহু মুখ ফেরায় তার থেকে, অন্তিক ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে নিল। এগিয়ে যায় কুহুর কাছে চোয়াল ধরে নিজের দিকে ফেরায়, কালো রঙের বেল্টে হাত ঠেকে তার, চিবুক তুলে অন্তিক আদুরে স্বরে বলে,

“আমার ছোটকালের সঙ্গী তুই, যখন একটা ছেলের জীবনে প্রেম সম্পর্ক আসে যায়—ওই বয়সে আমি জেনেছি আমার বউ হবে কুহেলিকা শিকদার। আমি কোনো মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট হইনি। এই বয়সে হব ভাবলি কেমন করে?”

​“হও না?”

​“আমার পেঁচি হোক পেঁচি মুখো তবুও আমার চোখে সে সব চেয়ে সুন্দর। এই যে দেখ এই বয়সে এসেও তোকে সামনে এমন ভাবে বসে থাকতে দেখে আমার শরীরের পশম দাঁড়িয়ে গিয়েছে। এত সুন্দর লাগে কেন তোকে বউ?”

​কুহুর রাগ হয়তো একটু কমল এবার, ঘাড় বাকিয়ে অন্যদিকে তাকাতে চাইলে অন্তিক ওকে নিজের দিকে ফেরায়। ঠোঁট কামড়ে হাতে বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে কুহুর লিপস্টিক দেওয়া ঠোঁটটা লেপ্টে দিয়ে নেশালো গলায় বলে,

“আমাকে যখন তুই স্পেশাল আদর দিস, ভুঁড়ি থাকলে কি তোর মুখটা তখন দেখতে পেতাম? এমনিতেও ওসব মেয়েদের মানায় যেমন তোকে, তুই সফট হয়ে যাচ্ছিস এগুলোর জন্য।”

​লজ্জায় মাথা নুইয়ে এবার মুচকি হেসে দিল কুহু, চোখ উল্টে অন্তিক সুস্থির শ্বাস নেয়, অবশেষে মেয়েটার রাগ ভাঙল। তবে সে এখন অন্য দুনিয়ায় আছে। কুহুর মাথা তুলে নিজের দিকে, চোখের ইশারায় অদ্ভুত ভাবে ইঙ্গিত করতেই ধাক্কা দেয় কুহু তাকে,

“বয়স হয়েছে কুরকুরি কমে না?”

​খোঁপা করা চুলগুলো ধরে নিজের দিকে ফেরায় তাকে, এবার রাগ দেখিয়ে বলে,

“পুরুষ মানুষ বুড়ো হয় না মেয়ে, স্বামীর কথা শোন যা বললাম তা কর।”

​“অহীন আসছে না কল দাও সরো।”

​“ওরা বাচ্চা না সময় হলে চলে আসবে। তুই মুড নষ্ট করিস না।”

​“সম্ভব না ঘুমাবো।”

​“কুহু এমন করে না জা…আহহহহহহহ পেঁচি ইইই!”

​বাচ্চাসুলভ ছোট আবদারগুলো রাখল না তার পেঁচি বরং হাতের উল্টোপিঠে নিজের শক্তপোক্ত দাঁত দিয়ে কামড়ে দিল। ব্যথায় কয়েক কদম পিছিয়ে হাত ঝাড়ছে বেচারা। একটু নাহয় আদর চেয়েছে তাই বলে কামড়ে দেবে? কুহু ভরকানো গলায় বলে,

“আর যদি জবরদস্তি করেছ তাহলে পরের বার হাতে না….।”

​ওর কথা শেষ করল না, তবে অর্ধেকের কথার সঠিক মানে বুঝতে সময় নিল না অন্তিক। তড়িৎবেগে এগিয়ে গিয়ে কুহুকে জাপটে ধরে ফেলে দেয় বিছানায়, সব সময়ের মতোই নিজের জোর খাটাচ্ছে কুহু, প্রতিবাদ করছে সঙ্গে হাসছে। সফলতার চূড়ায় অন্তিক, কুহুকে পাওয়ার ব্যাকুলতা ঠোঁটে তৃপ্তিটুকু ফুটেছে। গলায় মুখ রাখতেই যাবে পাশে থাকা ফোনটি গুনগুন করে ভাইব্রেট করে ওঠে তার। এক আকাশ বিরক্তি নিয়ে কাটে সে কলটা। আবারও আগাতে নিলে আবার কল আসে। বিরক্তির সাথে ঝটকা দিয়ে ফোনটা তুলে নেয় কানে, অচেনা নাম্বার দেখে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে,

“কে বলছেন?”

​ওপাশ থেকে নরম ভয়ার্ত কম্পিত কণ্ঠ ভেসে আসে,

“বড় আব্বু আমি আশু।”

​ভ্রু সোজা হয়ে যায় তার, তার উন্মুক্ত পিঠে কুহু মাথা রাখে কথা শোনার জন্য। সে গম্ভীর গলায় বলে,

“অহীন কই? এটা কার নাম্বারে কল দিলি পাখি? কী হয়েছে সমস্যা হয়েছে কোনো?”

​“আমাকে বলতে দাও আব্বু…।”

​আশার কণ্ঠ কাঁপছে মেয়েটা বড্ড ভীতু, ঝোপ ও কাদায় বসা অবস্থায় শরীরের ওপর দিয়ে পিচ্ছিল জাতীয় কোনো বস্তুর নড়াচড়ায় ভয়ে চেঁচিয়েছিল সে। সেই তো গ্রামের লোকগুলো এনে দাঁড় করিয়েছে মজিদের থেকে সামান্য দূরে একটি চিলেকোঠার ঘরে তাদের। অন্তিক ওর কম্পিত গলা শুনে অহীনকে ফোন দিতে বলার আগেই ওর হাত থেকে ছো মেরে নিয়ে নিলেন ফোনটা। লম্বা করে বড় বড় দাড়িগুলো বুক পর্যন্ত নেমে আছে, কানে নিয়ে রুষ্ট গম্ভীর গলায় বলেন,

“আসসালামু আলাইকুম।”

​“ওয়ালাইকুম আসসালাম কে বলছেন? আর আমাদের মেয়ে ওখানে কেন?”

​পরপর চিন্তিত হয়ে বলে অন্তিক। লোকটি মুখটা গম্ভীর করে আশার দিকে তাকায়, মেয়েটাকে অহীনের থেকে দূরে নেওয়ার পর থেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করছে, আর দূর থেকে অহীন তাকে ইশারায় থামাচ্ছে। তিনি বললেন,

“মেয়েকে পোলা মানুষের সঙ্গে ছেড়ে দেওয়ার সময় চিন্তা হয় না? আমরা ধরে আনলেই সমস্যা তাই না?”

​“মানে?”

​“মানে বৃষ্টির মধ্যে এক পোলা নিয়া এসে মেয়েটা ওই রাস্তায় দাঁড়িয়ে—ছিঃ বলতেই বাধে আমাদের।”

​কিছুটা সময় চুপ থাকে অন্তিক, জিজ্ঞেস করে,

“মেয়ে ছেলের গায়ে হাত তুলেছেন?”

​“আমরা ওসব কেন করব? বিয়ে পড়িয়ে দেব আইসা নিয়া যান মাইয়া। জানাইতে কল দিছি। এনে তো মারামারির কথা আসে না।”

​দীর্ঘশ্বাস নেয় অন্তিক, চিন্তিত কুহুর মুখটাও। পরিস্থিতি এতটুকু বুঝেছে যে তারই ছেলেটা কিছু করেছে। বলতে উদ্বিগ্ন হয় অহীন আশার সম্পর্ক তবে মুহূর্তেই একটু আগে বউয়ের পেছনে রাগ ভাঙানোর সময়টার কথা মনে পড়ল—অহীনের কারসাজি বুঝতে বাকি নেই তার আগেই। তাই মনে মনে নিজেও আঁটে দুষ্টু ফন্দি, মেকি রাগ নিয়ে বলল,

“হারামজাদাটা কই?”

​“আপনার মেয়েকে বশ করেছে এই ছেলে, মেয়ে ছেলের হাতই ছাড়ে না। আমাদের তো মুহূর্তের জন্য মনে হতে লেগেছিল সত্যি স্বামী-স্ত্রী, আপনাকে কল না দিলে জানতামই না আজকাল এর বাচ্চাগুলো কত ঘোল খাওয়ায়।”

​“ঠিক বলেছেন ভাই শুনুন, মেয়েটাকে অনেক আদরে বড় করেছি। এই ছেলেটা ভুলিয়েভালিয়ে ফাসিয়েছে। এসব করার জন্য এখন ছিঃ রাস্তায়…।”

​স্বল্প চিন্তিত কৃত্রিম রাগ নিয়ে মেকি কান্নায় ভাসছে সে, যেন আশা'র বাবা সে আর অহীন? অহীন কোনো বখাটে লম্পট মাস্তান। কুহু বড় বড় নয়নে তাকায় অন্তিকের দিকে। এদিকে স্পিকারে ফোন থাকায় হতবুদ্ধির মতো তাকিয়ে আছে অহীন। এটা তারই বাপ? তাকে গণধোলাইয়ের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে যে। অহীন এবার হুট করেই বলে ওঠে,

“সম্বন্ধীর বেটা কোন জনমের শোধ তুলছ এসব বলে? এটা আমার বউ বলে দিচ্ছ না কেন?”

​তার কথায় তৎক্ষণাৎ জবাব আসে ওপাশ থেকে,

“সকালে মনে আছে কী করেছিস?….. তখন মেয়েটা আমার সাথে ছিল হারামির বাচ্চা কখন নিলি?”

​সকালের কথাটা হালকা করে মনে করিয়ে কথা কাটিয়ে নিল অন্তিক। ঠোঁট কামড়ে ঘাড় বাঁকায় অহীন, মানুষগুলো ফুঁসছে কখন যেন গায়ে মার পড়ে আল্লাহ ভালো জানেন। অন্তিক এবার লোকটিকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“আমার মেয়েকে এমন ছেলের সাথে বিয়ে দেবেন না জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে। ওই বাদাইম্মাকে সবাই মিলে উত্তমমধ্যম দিয়ে আমার মেয়েকে রেখে বের করে দিন। সকালে এসে নিয়ে আসব মেয়েকে।”

​মুহূর্তকাল সময় নষ্ট না করে কুহু ছো মেরে ফোনটা নিয়ে নিল তার থেকে। আশা কলে অন্তিকের কথা শুনে অহীনের ওপর হাসবে নাকি পরিস্থিতি থেকে বাঁচার জন্য কাঁদবে জানে না। কুহু চোখ রাঙিয়ে কানে ফোন তুলে নেয়। ওপাশ থেকে অহীনকে বিভিন্ন কথা বলেই চলেছেন লোকটি, কুহু তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে হাসি স্বরে,

“ভাই ভাই শুনুন, বাচ্চা দুটোই আমাদের। বিবাহিত ওরা।”

​“ফাজলামি করেন? একজন বলে ছেলেকে চেনে না আপনি বলছেন ছেলে মেয়ে দুটোই আপনাদের।”

​কুহু অন্তিকের দিকে তাকায় ক্রুর চোখে, চোখ লুকিয়ে নেয় অন্তিক। কুহু ফোঁস করে শ্বাস নিয়ে বলল,

“ওটা আমাদের ছেলে আর মেয়েটা ছেলের বউ, ছেলের বাবার সাথে মনমালিন্য হওয়াতে এমন করছে। ভাইয়া ওরা বাচ্চা মানুষ ছেড়ে দিন। রাত হয়েছে অনেক।”

​“শুনুন আপা, আপনাদের কথা সুবিধার না, ছেলেমেয়েকে বিয়ে পড়াচ্ছি আমরা এসে নিয়ে যান।”

​কথাটা বলতেই চুপসে গেল কুহু। বিয়ে হবে সেটা সমস্যা নয়, এত রাতে ঝামেলায় পড়েছে বাচ্চাগুলো ওখানে কী হবে না হবে জানা নেই। সম্মতি ছাড়া কিছু করলেই রিস্ক, সে রাজি হয় এতে আর বলে,

“জি ওরা বিবাহিতই আবার বিয়ে হলেও সমস্যা নেই, কিন্তু ওদের গায়ে হাত তুলবেন না, আর পারলে বাড়ি পাঠিয়ে দিন।”

​স্থির হয় পরিবেশ, আর কথা বাড়াল না কেউ তবে শর্ত হলো তাদের এসেই নিতে হবে ওদের। তারাও দেখতে চায় কেমন বাবা-মায়ের সন্তান রাস্তায় এসব করে—হোক সে বিবাহিত তাই বলে পথেঘাটে? ঠিকানা নিয়ে কথার সত্যতা রেখে স্থানীয় হুজুর সত্যিই ডাকা হলো। এতটা সময় দাঁড়িয়ে থাকা আশা থরথর করে কাঁপছিল শীত ও ভয়ে। অহীনের একটু কাছে আনতেই শান্ত হলো সে। দুটো চেয়ারে বসিয়ে দেওয়া হলো দুজনকে। অহীনের মুখাবয়ব বোঝা মুশকিল, আশার দিকে তাকিয়ে কম্পিত শরীরটা দেখে আশার সঙ্গে একটি মহিলাকে নিচু স্বরে বলে,

“ওকে একটা শুকনো কাপড় দিন আন্টি। বেশিক্ষণ ঠান্ডায় থাকলে ও হসপিটালাইজড হয়ে যায়।”

​মহিলাটি পাতলা একটা ওড়না দিয়ে দিল আশার গায়ে, এতে কম্পন সামান্য কমে যায়। আড়চোখে অহীনের দিকে তাকায় সে, অল্প আস্থায় মনটাকে নরম করে। অহীনের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন সেই লোকটি যিনি তাদের প্রথম দেখেছিল। হুজুর একটি কাগজে কিছু লিখছেন সময় ও সুযোগে অহীন লোকটিকে জিজ্ঞেস করে,

“চাচা আমরা নাহয় সেখানে ডিস্টিং ডিস্টিং করতে যাচ্ছিলাম। আপনি কেন গিয়েছেন?”

​লোকটি ভরকালেন, এমন উদ্ভব শব্দের মানে তিনি বোঝেন না, হ্যাংলা করে লোকটা দেখে বোঝা সহজ সরল মানুষ—গ্রামেই থেকে হয়তো খেতখামারে কাজ করেন। ভরকানো গলায় উত্তর দিলেন,

“ডিস্টিং কী আবার? নষ্টামি বল পোলা, আমি মুত্তে গেছিলাম।”

​শেষের কথাটা জোরে হওয়াতে আশার কানে গেল সাথে উপস্থিত অনেকেরই, হঠাৎ ফিক করে হেসে দিল আশা। অহীন মুচকি করে হাসে। হুজুর গ্রামপ্রধানের উদ্দেশ্যে বলেন,

“কাবিন কত লিখব?”

​লোকটি অহীনের দিকে তাকায়, খালি গায়ে পানিগুলো শুকিয়ে গিয়েছে। দেখতে অতিমাত্রায় সুদর্শন, এসব ছেলেকে বিশ্বাস নেই এখান থেকে গিয়ে তালাক না দিয়ে দেয় বাচ্চা মেয়েটাকে। তাহলেই জীবন নষ্ট। তিনি বললেন,

“কোটিতে দিন যেন ছাড়তে না পারে।”

​“পরিশোধ না করে সংসার কেমনে করব?”

​অহীন গভীর গলায় হিসহিস করে বলছে,

“এমনিতেও আগেরটায় দশ লক্ষ ছিল শোধ করলাম কই? উত্তেজনার সময় এত কিছু কার মাথায় আসে?”

​“ছেলে তোমার মুখে লাগাম দাও আমরা তোমাদের পরিবার না, আর মোহরানা কত দেব? নিজের সামর্থ্য কত বলো।”

​জিভ কাটে দাঁতে, সে হিসহিস করে বলা কথাটা শুনে নিলেন লোকটি। অহীন গলা খাঁকারি দিয়ে সোজা হয়। অহীন একটিবার আশার দিকে তাকায়, ফোলাফোলা চোখগুলো অনেক আকর্ষণীয় লাগছে আজ। এমন নারীর জন্য তো সব দিতে রাজি সে। নিচু হয়ে ভারী গম্ভীর গলায় এবার স্থিরভাবে বলল,,,

“মোহরানাটা কোটিতেই রাখুন। আমার বাবা আমার মাকে ফ্ল্যাট দিয়েছিলেন, আমি যদি আমার স্ত্রীকে সামান্য একটা ডুপ্লেক্স বাড়ি দিতে না পারি, তবে আমার পুরুষত্ব আর আভিজাত্য, দুটোই নিছক তামাশা মনে হবে।”

​উপস্থিত সবাই স্তব্ধ বনে গেল মুহূর্তে, অহীনের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে, ছোট একটি গ্রামে বউকে এতটা গুরুত্ব দিয়ে কথাটা তাঁদের কাছে বিস্ময়ের আকাশে নিতেই যথেষ্ট। আশাও কম অবাক তা নয়, ফোলাফোলা চোখে তাকিয়ে আছে। কিছু সময় নীরব থেকে গ্রামপ্রধান বললেন,

“ঠিক আছে তাহলে তাই হোক।”

​কাজি বিয়ে শুরু করে, আশা চুপ করে আছে এসব কিছুই ভালো লাগছে না। প্রথমেই তার বিয়ে কতটাই না তামাশা হলো আবারও। কথোপকথন শেষ করেই আশাকে যখন বলা হলো,

“বলো আলহামদুলিল্লাহ কবুল..?”

​আশা নিশ্চুপ মাথা নিচু করেই আছে, তার মস্তিষ্ক জুড়ে বাবা—যিনি দেখেননি তার মেয়েকে কবুল বলতে, আজকেও দেখবেন না। চোখ বেয়ে পানির বিন্দুখানি ফ্লোর ছুঁতেই অহীন নতমস্তকে গভীর গলায় তাকে বলে,

“আশু আজ মন থেকেই বলিস, নয়তো বলিস না। সকালে আম্মু-আব্বু আসলে এমনিতেও সব ঠিক হয়ে যাবে চাপ নিস না।”

​মুহূর্তকাল আশা ভেজা চোখে অহীনের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট প্রসারিত করে মৃদু হাসে, ব্যথার আড়ালে অহীনকে দেওয়া স্বল্প তৃপ্তি—অতঃপর সে বলল,

“আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”

​চোখ নিচে না নামালে হয়তো বাকি মানুষগুলোর সঙ্গে সেও দেখত অহীনের মুখটা কেমন আনন্দে লাল হয়েছে। দীর্ঘশ্বাস নেয় সে। কেননা আশা যে মন থেকেই আজ বলেছে, সেদিনের মতো কোনো জবরদস্তি নেই। হুম একটু মানুষের কটূক্তি আছে কিন্তু না বললেও সমস্যা হতো না মা-বাবা তো আসতই। বিয়ে সম্পন্ন হতেই হুজুর চলে গেলেন। অহীন উঠে দাঁড়িয়ে এবার বলে,

“এবার ওর কাছে যেতে দিন।”

​“না না একটু পর ভোর হবে, তোমার বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছে আসছেন ওনারা। হয়তো প্রায় চলে এসেছে।”

​অহীন এবার ভরকানো গলায় বলে,

“বিয়ে করালেন এবার বাসর করাবেন না? হোয়াট দ্য ফাউল নিয়ম?”

​“এক থাপ্পড় দেব লজ্জা সরম রিটার্ন চলে আসবে বেলেহাজ ছেলে।”

​চারদিকে ফজরের আজানের ধ্বনি বাজছে, আশাকে একটা পাতলা জামা দিয়েছেন একজন মহিলা। কিন্তু প্রয়োজন কাপড় অহীনের, সে নামাজ পড়বে। একটি পাতলা গামছা পেতেই ছেলেটা প্রাণ পেল। নামাজটা তবে ওই বন্ধ কক্ষেই আদায় করতে হলো তার। বের হতে দিল না তাকে কেউ। আশাকে একটি রুমে আলাদা করেছেন মহিলাটি। চুপচাপ একটি কোণায় বসে আছে সে। অহীন কোথায় জানে না। বাইরে হালকা আলো দেখে মৃদু হাসে সে। অবশেষে সকালের আলো ফুটেছে বাড়ি যেতে পারবে। আর কখনো অহীনের সঙ্গে বের হবে না রাতে—মনে মনে ঘোর প্রতিজ্ঞা তার।

​বাহির থেকে মানুষের শোরগোল পেতেই আশার সঙ্গে থাকা মহিলাটি দরজা খুলে দিলেন। আশা ওনার পেছনে পেছনে আসে, ভোরের ঠান্ডা হাওয়া এসে গায়ে আঁচড়ে পড়ছে তার। কয়েকজন লোক জোরে জোরে কথা বলছে তার মধ্যে পরিচিত একটি গলা, একটু উঁকি দিল সে। একটি ভ্যান ভর্তি বাজার নামাচ্ছে দুজন লোক। বাবা-চাচা ও মা-ফুম্মি উপস্থিত। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে পিচ্ছিল কাদা মাটিগুলো ডিঙিয়ে গিয়ে জাপটে ধরে সে তাশাকে। আল্হাদ করে কুহুর কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরে অহীনের নামে অভিযোগের খাতাটা উন্মুক্ত করল সে,

“তোমার ছেলের সাথে আমাকে কক্ষনো দিবে না। ও একটা কুত্তা। আমি যাব না ওর সাথে আসো কোথায়।”

​কুহু আদর করে বলে,

“ঠিক বলেছ, ওর বাবার মতো এক নাম্বার জাওরা কিন্তু তোমারই তো তুমি না রাখলে কই যাবে এই বাদর ছেলেটা? কোন মেয়ে একে বিয়ে করবে বলো?”

​অন্তিক একপাশে কথা বলছে বাড়ির মালিকের সঙ্গে। অহীন একটি কক্ষ থেকে বের হয়ে আসতেই তারা রাগী চোখে তার দিকে তাকায়, অনেক রেগে আছে তারা তার ওপর। নির্লজ্জের মতো এগিয়ে আসে সে লোকটি অন্তিককে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আপনার ছেলের সঙ্গে এক রাত না থাকলে বুঝতাম না কেন আপনি তাকে পরিচয় দিতে চাননি। লজ্জার ল-ও ওর মাঝে নেই।”

​আকাশ এগিয়ে যায় অহীনের নিকট, কানে ধরে টেনে ঝুঁকিয়ে ঝাড়ি দেয় জোরেসোরে কিন্তু হিসহিস করে বলে,

“আমাদের কি বাড়িঘর নেই? আমার বাচ্চা মেয়েটাকে নিয়ে তুমি রাস্তায় এসব কী করছিলে ছিঃ।”

​আহ ব্যথায় কুঁকিয়ে ওঠে অহীন, বেশ জোরেসোরেই ধরেছে তাকে আকাশ। হাসতে হাসতে উত্তর করে অহীন,

“ওহ শ্বশুর আব্বু এ কেমন ব্যবহার? আমি তোমার মেয়ের জামাই দু-দুবার বিয়ে করলাম। লোহা গরম থাকতে হাতুড়ি মারতে হয় জানো না? তখন গরম ছিল স…।”

​“চুপ আমি ওর বাবা।”

​“আমার চাচ্চু কে বলছি।”

​আকাশ ছাড়ল তাকে, অন্তিক ওকে ইশারায় চোখ রাঙায়। লোকটির সাথে বলছে,

“ওরা বিবাহিত এখনের ছেলেমেয়েগুলো বড়ই দুরন্ত ও লজ্জা বোঝে না। আপনাদের ধন্যবাদ ওদের সায়েস্তা করেছেন এর পর থেকে আর এমন করতে ভয় পাবে।”

​“আপনার ছেলের ভাগ্য ভালো আমার হাতে পড়েছে আমার বড় ভাই থাকলে ওর হাত পা কেটে দিত,এসব অশ্লীলতা পছন্দ করেন না তিনি।”

_________________

“মিস গম্ভীর শুনুন, আমার কথাটা একটু শুনুন।”

​সাফওয়ানের কোনো কথা না শোনার প্রতিজ্ঞা করে নিয়েছে এবার অন্তিহা। তাই তো কিছুই না শুনে হনহনিয়ে চলে যাচ্ছে জেসির সঙ্গে। বেশ অনেকটা দূর যাওয়ার পর থামল তার পদচালন। জেসির দিকে তাকায়, পেছন থেকে আর ডাক আসছে না। ফোঁস করে শ্বাস নেয় সে। তবে সাফওয়ান হঠাৎ গায়েব হয় না কখনো। তাকে বলেই যায় অশ্লীল লোক, যখন যা আসে মুখে তাই শেষ কথা হয়—এমন কিছু যেটা অন্তিহা পরদিন সাফওয়ানকে ফের দেখা অবধি ভুলতে দেয় না তাকে। চলে গেলেই না তার কী! চিন্তিত মস্তিষ্কেই আবার সামনের দিকে জেসিকে দিয়ে হাঁটতে থাকে। দু কদম যেতেই গাড়ির চাকার জোর ঘর্ষণের শব্দে পা থেমে যায় অন্তিহা ও জেসির। তৎক্ষণাৎ জেসি ওদিক ফিরে হিসহিস করে আওড়ায়,

“সাফওয়ান…।”

​বুকটা যেন ধুক করে উঠল নামটা কর্ণপাত হতেই। ভালো না বাসলেও মায়া তো হয়, সারাক্ষণ তার পেছনেই তো পড়ে থাকে। আতঙ্কিত নয়নে পেছন ফিরে তাকায় সে, ভয়ার্ত চোখের সামনে একটি গাড়ি থেমে আছে, লোকজন তাকিয়ে আছে ওই দিকেই। গাড়িটির আড়াল থেকে এক গুচ্ছ ফুল হাতে স্বভাবসুলভ হাসি মুখে উঁকি দেয় সাফওয়ান। আতঙ্কিত মুখটায় বিরক্তির রেশ নামে অন্তিহার। তবে এতে ছেলেটার মনে যেন প্রজাপতির খেলা শুরু হয়েছে, গাড়িতে থাকা চালক তাকে বকেই চলেছে ইচ্ছেমতো সেদিকে। অন্তিহার নিকট এসে ফুলগুলো হাতে ধরিয়ে দিয়ে নিজ থেকেই আপন মনে বলতে থাকে,

“ভয় পেয়েছেন আমাকে হারানোর?”

​অন্তিহা হাতের ফুলগুলোর দিকে তাকায়, মুখে গাম্ভীর্য ভাসমান। সাফওয়ান সেখান থেকে একটি ফুল নিয়ে অন্তিহার কানের দিকে হাত বাড়িয়ে বলে,

“কিছু তো একটা ফিল করেন তাই না? প্রকাশ করতে এত কিসের সংকোচ? পেয়ার কিয়া তো ডরনা কেয়া—যেখানে পরিবার থেকে ফ্রিডম আছে আমাদের।”

​তৎক্ষণাৎ তার গালে অন্তিহার নরম হাতের জোরালো একটি থাপ্পড় পড়ে। এতটাই জোরে ছিল যে মানুষটা এক দিকে নুইয়ে গিয়েছে। রাগে ফোঁসফোঁস করে ফণা তুলছে অন্তিহা। সাফওয়ানের হাসিটা আরও চওড়া হলো। অন্তিহা রাগে তার বুকে ধাক্কা দিয়ে চেঁচিয়ে বলে,

“আমার সঙ্গে আপনার ফাজলামোর সম্পর্ক একদম নয়। অতএব আমার সাথে এসব ফাজলামো আর কখনো করবেন না। আপনার মনে হয় এসব করলেই আমি আপনার প্রতি অভ্যস্ত হব? ইন ইয়োর ড্রিম!”

​সাফওয়ান একটুও ভাঙল না, সোজা হয়ে তাকিয়ে আছে গালে হাত দিয়ে। শ্যামলা গালে চারটা আঙুলের ছাপ পড়ে গিয়েছে। সে বিড়বিড় করে বলে,

“কাকে ভালোবাসেন আপনি? নাম কেন বলতে চান না?”

​শেষে রাগে দাঁতে দাঁত ঘষল সে। অন্তিহা নড়ে ওঠে স্থান থেকে। সাফওয়ান কি রেগে গেল? উল্টোপাল্টা কিছু করে না দেয়! রমণী তবুও নিজের অহংকারকে নড়তে দিল না, বলল,

“কারণ আপনি কেউ না, জাস্ট নো ওয়ান। যেখানে আমি আমার কাছের বন্ধু, মা-বাবা কাউকে বলিনি, আপনাকেও বলতে ইচ্ছুক নই।”

​অন্তিহা ঝটকায় নিজের মতো চলে যেতে নিলে ওর হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে নিজের কাছে নিয়ে আসে সাফওয়ান। অন্তিহার পিঠ নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নেয়। হাত আড়মোড়া করাতে কুঁকিয়ে উঠছে অন্তিহা বারবার। জেসি শুকনো ঢোক গিলল, সে হতবুদ্ধি বনেছে। এমন কাহিনি সামনে থেকে দেখা যেমন এক্সাইটমেন্ট, তেমনই কাছের কারো সাথে হলে আতঙ্ক। সাফওয়ান ওর চুলের কাছে গভীর শ্বাস ফেলছে, ফলে বুক ওঠানামা করছে রাগে। হিংস্রভাবে কটমটিয়ে হুমকি দেয়,

“খোদার কসম অন্তিহা, একবার নিজের মুখ থেকে আয়াশ নামটা নিন, ওর অস্তিত্ব আমি মিটিয়ে দেব এই জমিন থেকে।”

​“আপনি সাইকো… ওপর দিয়ে সুন্দর রূপ হলেও আপনি একটা পশুর মতো হিংস্র। নিজের প্রিয় মানুষ, ভালোবাসার নাম নিয়ে আমি কখনো তার ক্ষতি করব না। ছাড়ুন আমাকে নয়তো পুলিশে রিপোর্ট করব।”

​সাফওয়ান তাকে ছেড়ে দেয়, ছিটকে দূরে সরে যায় অন্তিহা। ফিক করে তাচ্ছিল্যের হাসি দিল ছেলেটা। অন্তিহার মুখের দিকে ঝুঁকে মুখাবয়বে আলতো ফুঁ দিয়ে খোলা ছোট ছোট চুলগুলো উড়িয়ে দিয়ে গভীর গলায় বলে,

“You don't know what my fucking power is, sweetie.”

​“হুমকি দিচ্ছেন?”

​“এটা হুমকি না, হুমকি আগেরটা ছিল। জাস্ট একবার নামটা বলুন, হুমকি কীভাবে বাস্তবতার রূপ নেয় প্র্যাকটিক্যাল দেখবেন।”

​অন্তিহার মুখে তাকে নিয়ে কিঞ্চিৎ ঘৃণা ও অবজ্ঞা। তীক্ষ্ণ চোয়ালে রাগ নিয়ে কিছুটা সময় আপাদমস্তক দেখে নেয় সে লোকটিকে। অতঃপর প্রস্থান করে সেখান থেকে। হেলেদুলে হাঁটার তালের দিকে নেশাভরা চোখে তাকিয়ে আছে সাফওয়ান, গালে হাত নিয়ে মাদক মেশানো গলায় বলে,

“এই মেয়ের থাপ্পড়ও কড়া রকমের টেস্টি, কত সফট হাত উফ!”

____________________

​বিকেলের রোদ হেলে পড়েছে, হালকা বাতাস ছড়াচ্ছে চারপাশ। অহীন ও আশার কর্মকাণ্ডে বেশ মাথা নত হয়েছে তাদের অভিভাবকদের। সেই খেসারত দিতে ঝামেলা এড়াতেই হয়তো গ্রামপ্রধানের বাড়িতে উপহারের মেলা জমিয়েছিল তারা। এতে কি খুশি না হয়ে পারেন ভদ্রলোকটি? পুরোদিন তাদের রেখে তাদেরই করে নেওয়া বাজার রান্না করে খাইয়ে পাঠিয়েছে তাদের। পথ থেকেই আকাশ তাশা চলে গিয়েছে, তাইয়ানের যাওয়ার অনেক প্রস্তুতি বাকি—ছেলে মানুষের কতই প্রয়োজন হয়। আর সোফায় গা এলিয়ে বসে আছে অন্তিক, সামনেই মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে অহীন। আশা তো আহ্লাদি মেয়ে, ন্যাকামি যেন অন্তিককে দেখে সরছেই না। মুখে অমাবস্যার রাত নামিয়ে সোফায় বসে আছে অন্তিকের বুকে মাথা রেখে। অন্তিক গাম্ভীর্য ধরে রেখে আদেশ করে,

“আশু রুমে যাও ওর সাথে কথা আছে।”

​বাধ্য মেয়ের মতো উঠে পড়ল সে, অহীনের দিকে তাকিয়ে চোখে দুষ্টু হাসে। ঠোঁটে রসিকতা—যেন পুরনো দিনের মতোই সে জিতল, তাকে পুরো রাত কষ্ট দেওয়ার শোধ তুলে প্রশান্তি পাচ্ছে। সে চলে যেতেই অন্তিক শাসিয়ে ওঠে,

“বিন্দুমাত্র লজ্জা আছে তোমার? বাবা তোমার কি বাড়িঘর নেই? নিজের যা-ই করো না কেন একটা মেয়েকে নিয়ে রাস্তায় তুমি!”

​নতমস্তকে উত্তর দেয় অহীন, তবে কথাটায় সম্মান নেই উল্টো স্বভাবগতই নির্লজ্জের মতো,

“তুমি কি কম নাকি? বুড়ো বয়সেও যেখানে সেখানে যা তা করো। ও থেকেই শিখেছি রোমান্সের টাইমিং হয় না, যখন পাও তখন খাও…..”

​হাতের কাছে সোফার কুশনটি তুলে ওর মুখে ছুঁড়ে মারে সে, কত বড় নির্লজ্জ হলে বাবার সঙ্গে এসব বলে?

“কখনো আব্বুর সাথে এমন নির্লজ্জের মতো কথা আর আব্বুর সংসারে আগুন লাগাইনি আমি, যথেষ্ট রেসপেক্ট করতাম তাদের।”

​“সব তোমাদের থেকেই শিখব নাকি? নিজের কিছু আলাদা গুণ থাকতে হয় নইলে আমার বাচ্চারা কীভাবে আপডেট হবে। ইউ ব্যাকডেটেড লোক…”

​অন্তিক পাল্টা কিছু বলার আগেই কুহু চলে আসল তাদের কথার মাঝে, এসে অন্তিকের হাতে পানি দিয়ে তার পাশে বসে অহীনের দিকে তাকিয়ে বলে,

“রুমে গিয়ে ঘুমাও একটু, পুরোটা রাত তো নির্ঘুম কাটালে..।”

​অহীন আড়চোখে অন্তিকের দিকে তাকিয়ে প্রস্থান করে সেখান থেকে। রুমে এসে ক্লান্তির শ্বাসটা হাওয়ায় ছেড়ে ফোঁস করে তৃপ্তির শ্বাস টেনে নেয়। লাইট অফ করে ঘুমিয়ে আছে হয়তো আশা, ফ্রেশ হয়েছে অনেকক্ষণ আগেই। তাই আর এদিকসেদিক না তাকিয়ে গিয়ে আশার পেছনে শুয়ে পড়ল সে। সব সময়ের মতোই একপাশে ফিরে মাথার নিচে হাত নিয়ে খুবই পরিপাটি হয়ে শুয়েছে আশা। কাপড় কোনোদিকে একটুও নড়ছে না, যতটুকু উড়ছে বা বাতাসে হালকা। অহীন সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আনমনা হয়ে ডাকে,

“ঘুমিয়ে পড়েছিস পেঁচি?”

​“উহু..।”

​হালকা স্বরে উত্তর দিল আশা, মুচকি হাসে অহীন। আশার দিকে ঘুরে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে আস্তে করে, যেন মোমের পুতুল ধরলেই নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু সে চায় এটা উলটপালট করতে, একটু কাছে গিয়ে বলে,

“সরি আমার জন্য তোকে এত কিছু ফেস করতে হলো।”

​আশা মিনমিন করে বলে,

“সরি মানব যদি এখন উল্টাপাল্টা কিছু করতে না চাও তবেই।”

​“এ কেমন অবিচার পাখি? কালকে অপেক্ষা করলাম, আজকেও এমন করবি?”

​অহীনের মুখের চেয়ে বেশি শরীর কথা বলছে, আশা একটু সরে যায়—সে বড্ড ভয় পায় অহীনকে। রাতে ভরসা দিয়েছিল ঠিক কিন্তু সেটা কী এখনো থাকে? বিড়বিড় করে ভয়ার্ত কণ্ঠে,

“ক্লান্ত তো কালকে দেখা যাবে ওসব।”

​“আচ্ছা।”

​অহীনের নিঃশ্বাস ঘন ঘন নিতে হচ্ছে, তারও ইচ্ছে ছিল ঘুমিয়ে থাকার কিন্তু সামনে এমন বউ শুয়ে থাকলে কি ঘুম আসে? তাও এতগুলো দিন পর? সম্মতি দিয়ে আশার আরও কাছে যায় সে। এবার আর সরে যাওয়ার কোনো জায়গা আশার নেই। পেটে হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে গেল। ঘরের মৃদু আলো বাহির থেকে আসা জানালার ফাঁক গলিয়ে শীতল বাতাসের মিষ্টি গন্ধ আশার মনকে ভীত করে তুলছে, কম্পিত হচ্ছে নারীর সম্পূর্ণ কায়া। অহীন আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে শরীরের সঙ্গে, দুমড়েমুচড়ে নিঃশেষ করে দিচ্ছে তার নরম উদর।

অস্বাভাবিক অহীনের নড়াচড়া তাকে ইঙ্গিত দিচ্ছে—এখন নিজেকে সঁপে না দিলে পুরুষটা পাগল হয়ে যাবে। আশার গলায় কথাগুলো দলা পাকিয়ে আটকে যাচ্ছে, মুখ খুলে নিঃশ্বাস নিতে হচ্ছে। ভাঙা ভাঙা গলায় বলে,

“বললে তো করবে না কিছু তবে সরো?”

​অহীনের গরম শ্বাস আছড়ে পড়ল ওর ঘাড় গলায়, হাড়-মাংসগুলো পিষে ফেলতে পারলে হয়তো শান্তি পেত সে। হিসহিস করে হাসিমুখে বলে,

“কী করলাম? ধরে ঘুমাতে পারব না?”

​“দূরে যাও।”

​“না।”

​“প্লিজ।”

​“তোর নকতামি কবে শেষ হবে ন্যাকি একটা, ২৫ বছরের মেয়েদের দুটো তিনটে বাচ্চা থাকে। আর তুই প্রসেসিং করতেই ভয়ে কাঁপাকাপি করিস বাল।”

​সরে আসল অহীন, শরীরটা ব্যথা করে ছেড়েছে মেয়েটার। যে সামান্য ধরার পরেই নড়া যায় না তাকে আর কি করতে সাহস হয় একটু রমনীর? আশা উঠে বসে তার পাশে, কঠিন চোখে তাকায় অহীনের মুখের দিকে। বরাবরের মতোই ছেলেটার ফর্সা মুখ লাল হয়ে আছে তাকে কাছে পাওয়ার তপ্ত তাড়নায়। আশাকে বসতে দেখেই মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে পড়ল। কিছু সময় তাকে দেখে আশাও চুপ করে শুয়ে পড়ে, রাগ ভাঙিয়ে বিপদ ডাকার কোনো মানে সে খুঁজে পায় না। যেখানে অহীন বারবার স্বীকার করে নিয়েছে সে উগ্রতায় তৃপ্তি পায়। চোখ বুজতেই অহীন পেছন ফিরে হয়তো মনটা একটু সময়ের জন্য নিজেকে বুঝিয়েছিল—আশা কাছে আসবে তাকে বুঝবে। কিন্তু পেঁচি তো পেঁচি, ঘুমিয়ে পানির কলসের মতো নিবিড় হয়ে আছে। হতাশার সঙ্গে এবার আশার কাছে যায়। ঘুমন্ত স্ত্রীকে টেনে সোজা করে দেয়, অন্য স্বামীদের মতো মোটেই সে নিজের বুকে আশাকে রাখা পছন্দ করে না। বরং নিচু হয়ে নিজেই আগে নিজের শান্তি প্রশান্তি খুঁজে নেয়। নাকে-মুখে মিষ্টি গন্ধগুলো ছুঁইয়ে চুপসে চোখ বুজে নিল সে। সবচেয়ে ঘনিষ্ঠতা তাকে সাময়িক শান্তি দিলেও এটা দীর্ঘ সময়ের শান্তির মতো। পুরোটা জীবন হয়তো এই বুকে কাটিয়ে দেওয়াটা মনে হবে সামান্য একটি মুহূর্ত। ঘরের শীতল বাতাসের সাথে এবার হালকা একটি কথা,,

“কবে আমার চাওয়াগুলি বুঝবি আশা? এই দূরত্বের প্রণয়ের আগুনে আর কত পোড়াবি?"

চলবে..

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন