#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ৩৯ 🙂
“নাম্বার কোথায় পেলেন আমার?”
“কেন, আমার পুতুল কি এখন আমার থেকে নিজের কণ্ঠের হেফাজত করছে?”
“তেমন নয়, আমি ঝামেলা এড়িয়ে চলছি।”
“চিন্তা করো না ঝামেলা করব না। মন ভালো না কথা বলতে চাই শুধু।”
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে অহীনকে নিজের পাশে পায় নি আশা, সকাল কেটে দুপুর হয়েছে সেই কখন, কুহুকে ঘরের কাজে সাহায্য করে রুমে এসেছিল সে সবে মাত্র। বিছানায় কাত হতেই ফোনের ভাইব্রেট এর শব্দে তুলে নেয়। অতিপরিচিত নাম্বারটা দেখে গা টা কেমন শিউরে উঠল তার। অনেক দিন পর এই নাম্বার থেকে কল এসেছে। প্রথমে রিসিভ করার ইচ্ছে না হলেও নোটিফিকেশনে প্রায় ৯৯+ মিসড কল দেখে রিসিভ করে। বিরক্তির সাথেই কথা বলছে সে। তবে আয়াশের শেষের কথাটায় সত্যি ই আগের মতো অধিকার বোধ নেই শুধুই ক্লান্তি। সে উত্তর দিল,
“আমার সঙ্গে কি বা বলতে চান? আছে বলার কিছু?”
ওপাশ থেকে নরম গলায় ব্যাকুলতা তৈরি হয় একটু,
“বললেই কথা তৈরি হয়, তুমি বিরক্ত হচ্ছ?”
“হচ্ছি তো বটে।”
আয়াশ মাথা নুইয়ে হেসে দেয়, গাড়িতে বসে আছে সে, স্টিয়ারিং এ কয়েকবার চাপ দিয়ে গাড়ির হর্ন বাজায়, পুতুল বিরক্ত হচ্ছে তার কথায়! তবুও আগ বাড়িয়ে বলে,
“আমি অন্তু আর তুমি ছাড়া কারো সঙ্গে মিশতে পারি না। আমার আবেগ, আমার কথা, আমার কষ্ট, খুশি সব একত্রিত হয়ে যায়। অন্তু পাল্টে যাচ্ছে, তুমিও দূরে চলে গেলে। বড্ড একা ফিল হয় আজকাল।”
ছোট মনটায় ধাক্কা খেল আশা, ঠোঁট জোড়া গোল করে শ্বাস ফেলে। সে জানে আয়াশ সত্যি বলছে কারন আয়াশের সঙ্গে মেশার কেউ নেই আয়াশ মিশতে পারে না। আধশোয়া হয়ে বলে,
“সেসব বাদ দিন, অন্তু পাল্টে যাচ্ছে মানে?”
“বয়ফ্রেন্ড হলে যা হয়, তাই।”
“হোয়াট?”
“বলো না তুমি জানতে না?”
“আমাকে বলেনি।”
“উপসসস আই অ্যাম সরি, আমি ভাবলাম তোমরা বেস্টফ্রেন্ড যেহেতু অবশ্যই জানো!”
আশা ফিক করে হাসে, বিস্ময়কর চোখে বিছানার চাদরের দিকে তাকিয়ে হাসছে, অদ্ভুত লাগছে তার অন্তিহা প্রেম করেছে? অসম্ভব শকট করা কথা সে জিজ্ঞেস করে,
“ছেলেটা কেমন আর নাম কি? কোথায় থাকে?”
দীর্ঘদিন পর পুতুলের হাসির ক্ষীণ স্বরে হাসি ফোটে আয়াশের ঠোঁটে, জানে না অনুভূতিগুলো তবে জানে হাসিটা তার খুব প্রিয় সে বলল,
“একটা বাস্টার্ড, নাম সাফওয়ান। আমাকে নিজের কম্পিটিটর মনে করে। বাট আই প্রমিস আমার কোনো ফিলিংস নেই অন্তুর প্রতি। সে অপরুপা আর আমার সঙ্গে কোনো মেয়ের জীবন জড়ানোর কথা স্বপ্নেও ভাবি না। ভালো হয়েছে তুমি নিজেকে গুছিয়েছ।”
হাসির মাঝেই আশার চোখ যায় দরজায় অহীন রুমে প্রবেশ করছে, সাদা শার্ট গাতে একটা ঘড়ি, আশার ঠোঁটে প্রফুল্ল হাসি দেখে তার ঠোঁট ও হাসে একটু, দরজা বন্ধ করে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে ঘড়িটা খুলে রেখে কোনো রকম কথা ছাড়া ঝাঁপ দিয়ে পড়ে আশার কোল মাঝে, ধড়াম আচম্বিত ‘উফফ’ সূচক শব্দ করে আশা। উদরের কাছের পোশাক সরিয়ে মুখটা রেখে নাক ঘষে অস্ফুটস্বরে জিজ্ঞেস করে,
“কার সঙ্গে এত হেসে হেসে কথা হচ্ছে?”
আশা হাসি থামিয়ে অহীনের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে উত্তর করে,
“আয়াশ।”
অধর নিজ কর্মে মজে ছিল তবে কর্ণে নামটা আসতেই থামে সে। অতঃপর আর কিছু না বলে আবার নিজের কাজে মত্ত হয় সে। আয়াশ ওপাশ থেকে জিজ্ঞেস করে,
“অহীন?”
“হ্যাঁ সবে ফিরল বাহির থেকে। আপনি অন্তুর কথা বলুন সমস্যা নেই!”
আয়াশ বলতে যাবে ওমনি ছো মেরে অহীন ফোনটা নিয়ে নেয় আশার থেকে, হাত বাড়িয়ে আশা নিতে চাইলে থামিয়ে দিল পুরুষের খরখরে অধর। আচানক আক্রমণে গুঙিয়ে ওঠে সে। ফোনটা না কেটেই দূরে সরিয়ে দিয়ে দুই হাতে আশাকে চেপে ধরে, ওষ্ঠের ঘর্ষণ সেরে নিচে নামে ঘাড়ের দিকে, নেশালো গলায় বলে,
“ওর সঙ্গে এত কথা বলতে হবে না আমার ভালো লাগে না।”
অহীনকে হালকা বাধা দিচ্ছে আশা গলা দিয়ে খুবই কষ্টে কথা বের হলে বুঝি,
“অহীন আগে কল কাটো, আয়াশতো শুনবে সব।”
ওর কথায় হাত পিছিয়ে হাতড়াতে থাকে অহীন, তবে হাতের কাছে কি সে ছুড়েছিল? পেল না ওভাবে আর না বউটিকে ছেড়ে ওদিকে তাকানোর স্বল্পতমও ধৈর্য বা ইচ্ছে তার আছে। তাই অতটা গ্রাহ্য করল না। আবারও মেতে ওঠে আশার মাঝে সে।
আশার প্রথম অপ্রস্তুতকর শব্দেই কল কেটেছে আয়াশ। অহীন হতে পারে নির্লজ্জ সে নয় যে দুজনের এমন মোনিং সাউন্ড শুনবে। আর এসব নিতান্তই ইয়াক টাইপের সাউন্ড যা তাকে পেট উগলে বমি করতে বাধ্য করে তোলে। চোখ ঘুরিয়ে পাশে তাকাতেই হঠাৎ হুশ ফেরে তার, সঙ্গে বসে আছে জেসি, ড্যাবড্যাব চোখে দেখছে তাকে। মেয়েটা যেন ভুল দেখেছে। তার বিস্ময়ের কারণ না বুঝে হতবুদ্ধির মতো আয়াশ জিজ্ঞেস করে,
“কি ভূত দেখলে নাকি?”
জেসি হতাশার গলায় বলে,
“আপনাকে স্যাড দেখা তো ভূত দেখার মতোই আমার কাছে।”
“আমি হাসতে দেখলে কখন?”
জেসি তার কথার উত্তর দিল না, বাহিরে তাকিয়ে আনমনে বলে,
“আপনি ওদের মিস করেন খুব?”
আয়াশের উত্তর সোজা,
“আমি চাই ওরা দুজন আমাকে কখনো না ছাড়ুক।”
“আমার ফ্রেন্ড হতে পারেন, আমি একা করব না, উল্টো জ্বালাবো।”
আয়াশ হাতে গ্লাভস পড়ে নেয়, একটু এগিয়ে জেসির মাথায় হাত দিয়ে আদুরে পরশ এঁকে বলে,
“তুমি একটা বাচ্চা মেয়ে এনার্কি, আমার ফ্রেন্ড হবে? শোনো মেয়ে আমাকে বিরক্ত করবে না, তুমি খুব কিউট আমার রাগ সহ্য করতে পারবে না।”
জেসি মুচকি হাসে, ব্যঙ্গ করে বলে,
“হুম আপনার যুক্তি ঠিক? অন্তিহা আর আমি একই সঙ্গে পড়াশোনা করি। সে বড় ম্যাচিউর আর আমি বাচ্চা? কিউট?”
“অন্তুকে দেখেছ কখনো এমন ভাবে তর্ক করতে আমার সঙ্গে? পথে ঘাটে কারো গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়তে? পাগলের মতো বকবক করতে?”
জেসি ভাবান্তর হয় একটু পরক্ষণেই বলে ওঠে,
“ওর মাঝেও বাচ্চামো আছে, সাফওয়ান ওকে যখন বিরক্ত করে রেগে যায় অহেতুক রাগ করার মানেই হয় না তবুও রেগে যায়। আর সাফওয়ান পছন্দ করে ওকে রাগিয়ে দিতে। আসলে সবাই সবার পছন্দের মানুষের কাছে বাচ্চা হয়ে যায় তাই না?”
আয়াশ জেসির গালের দিকে তাকায়, ব্লাশ করছে মেয়েটা, এতটুকু একটা মেয়ে প্রেম পছন্দ ভালোবাসা কত সুন্দর ভাবে বোঝে আর বোঝার কথা সে তো আর আয়াশের মতো নয়। আয়াশ দুষ্টু স্বরে বলে,
“ব্লাশ করছ মানে তোমারও কেউ আছে? আমি সিঙ্গেল মরব তোমরা বাচ্চা মেয়েগুলো এসব করলে আমরা যারা ম্যাচিউর মেয়ে খুঁজি তারা তো বিয়ে করতে পারব না।”
কেউ আছে? কথাটা যেন কোথায় একটা সত্যি আছো বলে সাড়া দিল। লজ্জায় লাল হচ্ছে গালগুলো তার, গাল ও হাত উল্টেপাল্টে ধরে তাপমাত্রা দেখে নেয় গরম হয়েছে সম্পূর্ণ মুখ তার। সে গাড়ির সিটের সঙ্গে হেলান দিতে দিতে বলতে চায়,
“হুম আছে তো একজন কিন্তু…।”
“স্টপ!”
থেমে গেল জেসি আরাম করে হেলানটাও দিতে পারল না। একই স্থানে পজ হয়ে গিয়েছে আয়াশ হুমকি দেয়,
“বসতে দিয়েছি তাই অনেক একদম এই খোলা নোংরা চুল আমার গাড়িতে স্পর্শ যেন না হয়।”
আয়াশের কথায় ফোঁশ করে আটকে রাখা শ্বাসটা ছাড়ে জেসি, পায়ে জুতো পর্যন্ত পড়ে উঠতে দেয় নি তাকে গাড়িতে। পারলে মাঝ রাস্তায় গোসল করিয়ে দিত। চুলগুলো ওপরে খোঁপা করতে হয়েছে। অন্য দিকে চেয়ে তাচ্ছিল্য হাসে,
“সিরিয়াসলি?”
আয়াশের দিকে তাকিয়ে কটাক্ষ করে নিজেকে, আর আয়াশকে বলে,
“আমি আশার নাম্বার এনে আপনার এত বড় হেল্প করলাম, আর আপনি? আমাকে থ্যাংক ইউ না বলে এমন ব্যবহার করছেন? আপনার তো আমাকে সেদিনের জন্য সরি বলাও বাকি।”
“ইন ইওর ড্রিম ইডিয়ট, সরি তোমার বলা উচিত আমার গায়ে ভমিট করেছিলে।”
“আপনি আপনি আপনি সারাজীবন সিঙ্গেল থাকবেন অভিশাপ দিলাম।”
গাড়ির দরজা খুলে খোঁপা করা চুলগুলো এলোমেলো করল জেসি, দুই পাশে ঝাড়া দিতেই চুলগুলো গাড়িতে ভালো করেই স্পর্শ হচ্ছে। শুধু এতেই থামেনি মেয়েটা। পুরোটা গাড়ি যতদূর হাত যায় অতদূর ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিয়ে ছুটে নেমে পড়ল, ঝুঁকে জুতো গুলো তুলে গাড়ির উইন্ডো দিয়ে ভেতরে দিয়ে দুটো এক সঙ্গে ঝাড়া দিতেই ঝরঝর করে তলানির মাটিগুলো গাড়িতে পড়ে। আয়াশ তৎক্ষণাৎ চেঁচিয়ে ওঠে,
“স্টুপিড গার্ল, ফাক অফ…।”
জিভ বের করে ভেঙিয়ে জুতো হাতে নিয়েই দৌড়ে সেখান থেকে উধাও হল সে, এখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানে থাপ্পড় খাওয়া। লোকটার হাতে জোর আছে সেদিনের থাপ্পড়ে এখনো গালটা জ্বলে। হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে আছে আয়াশ সিটের দিকে গা গুলিয়ে আসছে তার। গাড়ি থেকে নেমে গেল। কারো নাম্বারে কল করে স্থির হয়। বেশ খানিকটা পর একটি কালো রঙের গাড়ি এসে থামে তার সামনে। ড্রাইভার এর হাতে নিজের গাড়ির চাবিটা দিয়ে কালো গাড়িটায় স্প্রে করে সেটায় উঠে বসে। গাড়ির পরিবর্তন করেও যেন ঠিক থাকে তা নয় তবুও সেই নোংরা গাড়িটির থেকে তো ভালোই। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে কিছু দূর যেতেই জেসি কে দেখতে পায় বসে বসে জুতো পড়ছে।
*****
“আহহ ভালো লাগছে না সরো।”
“ওর সাথে এত কিসের কথা তোর? তাও এমন খিলখিল করে হেসে হেসে আমার সাথে তো হাসতে দেখি না।”
সেই তখন থেকে আশাকে শুইয়ে রেখে উন্মুক্ত উদরে আঙুল দিয়ে আঁকিবুঁকি কাটছে অহীন, বারবার শিউরে উঠছে যুবতীর ভেতরটা। বাধা মানছে না অহীন। পেটের কেন্দ্রবিন্দুর চারপাশে হাত গুলিয়ে দিয়ে কিছু সময়ের ব্যবধানে চুম্বন আঁকছে। আশা চোখ বুজে বাধা দিচ্ছে হালকা তবে ছোট নারী দেহ সঙ্গে নেই তার।
“অনেকগুলো মিসড কল দিয়েছিল তাই কথা বলছিলাম। আপসেট ছিল।”
“কল সার্ভিস দিস নাকি আজকাল? কল দিলেই কথা বলতে হবে?”
অহীন নির্লিপ্ত হয়ে কথা বলছে, তার মাঝে অল্পমাত্রায় ও উত্তেজনা বা মাদকতা নেই আজ। জেদ বুঝতে পারছে আশা, সে কাঁপা গলায় বলে,
“কি সব কথা বলছ? আর করব না এবার সরো।”
“আমাকে আজ বেড সার্ভিস দিবি, কথা দিচ্ছি নেক্সট টাইম কল রিসিভ করার সাহস পাবি না।”
[ 🙂 গল্পের সামান্য অংশ প্রাইভেট গ্রুপে দেয়া হয়েছে। অনুগ্রহ করে পড়ে আসবেন সেখান থেকে। https://www.facebook.com/share/p/1E6MpCJJTF/]
কিভাবে বোঝাবে মেয়েটা ভয় তো তাকেই পায় সে, ধরলে যে নিংড়ে নেবে তাকে এই পাগল পুরুষ ও তার পৈশাচিক ছোঁয়া। টান দিয়ে বিছানায় ফেলে দেয় অহীন তাকে, ঠোঁটে পৈশাচিক হাসি, বিছানার কার্নিশে দাঁড়িয়ে আশাকে আপাদমস্তক দেখে নিল। সঙ্গে নিজেকেও দেখে নিলো ভালো করে স্বল্প সময় ভাবান্তর থেকে বিধ্বস্ত অবস্থায় আশাকে রেখে সরে যায়। আলমারির ওপরে উঠে টেনে টুনে একটা মাঝারি সাইজের মিনি সাউন্ড বক্স নামায়। শরীর চাদরে আবৃত করে আশা জিজ্ঞেস করে,
“সমস্যা কি তোমার?”
অহীন নিজের অবস্থা না দেখেই দরজার ঠিক সামনে সেটা সেট করে দেয়। মিনি রিমোটটা দিয়ে ফুল সাউন্ড দিতে দিতে বলে,
“আমি চাই না ভর দুপুরে আম্মু তোর চিৎকার শুনে এসে আমাকে ভুল বুঝুক।”
রিমোটটা কোন এক কোণায় ফেলে দিলো জানে না সে নিজেও, কানে গিয়ে সাউন্ড লাগছে খুব, কানের পর্দা না ফেটে যায়? অহীন আশাকে উল্টে দিয়ে পিঠে চুমু খায়,
“আমি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও তোর শরীর সহ্য করতে পারবে না।”
হো হো করে কেঁদে ওঠে আশা, তার কান্না গানের প্রচণ্ড শব্দে অহীনের কান অব্দি পৌঁছাতে পারছে না, ঘরের তপ্ত বাতাস ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে আশার কাছে, আর প্রশান্তি দিচ্ছে অহীনের মনে। প্রতিক্ষণ যাকে মনে হতো অন্য কারো হয়ে যাবে। আজ সে তার একান্ত তার।
“Sardi Ki Raaton Mein
Hum Soye Rahe Ek Chaadar Mein
Hum Dono Tanha Ho
Na Koi Bhi Rahe Is Ghar Mein"
_______
দুপুর বেলা সবে চোখ জোড়া বন্ধ হয়েছে কুহুর, এত বছর হয়েছে তবুও অন্তিকের আবদারের কাছে সে নুইয়ে যায়। রাত বিরাতে যখন যা চায় তাই দিতে হয়। (মানে খাবার তৈরি করে😒) তবে কাঁচা ঘুমের ব্যাঘাত হল অহীনের কক্ষ থেকে আসা গানের শব্দে। বুকটাও ধড়ফড় করে উঠছে এই সাউন্ডে। হাঁসফাঁস করে উঠে বসে সে রাগে মাথাটা ভারি হয়ে আসছে। বিছানা থেকে নেমে অহীনের কক্ষের দিকে আগাতেই শব্দ আরও বাড়ে কানের পর্দা হয়ত আজ ফেটেই যাবে। ছেলেটা পাগল হয়েছে নির্ঘাত। দরজায় গিয়ে পরপর জোরে জোরে ধাক্কা দিয়ে চেঁচায় সে,
“অহীন? আশু? এই বেয়াদব গুলা সাউন্ড কমা।”
না ওপাশ থেকে কোনো সাড়া আসল না আসবেই বা কেমন করে? শুনলে তো? কুহু আবারও কয়েকবার ডাকে তাকে,
“এই দরজা খোল থাপ্পড়ে কান ফাটাবো তোদের।”
খুলল না এবারেও, রাগে হাঁসফাঁস করে রুমের দিকে যেতে নিলে কলিং বেল বাজে কুহু গিয়ে দরজা খুলে দিতেই বিরক্তি ভরা গলায় একটি মহিলা বলে ওঠে,
“ভাবি দুপুর বেলা এসব কি? বাসায় বাচ্চা ঘুমাচ্ছে তো!”
মাথা নত হল কুহুর কটমট করে অহীনের কক্ষের দিকে তাকায়। বলে,
“অনেকদিন পর এসেছে তো একটু দুষ্টুমি করছে জানেন তো দুটো এক হলে কি করে।”
“ওদের বোঝান, ওরা এখন বিবাহিত বাচ্চা পয়দা করার বয়সে নিজেরা এসব করে বেড়ায় সাউন্ড কমাতে বলুন।”
মহিলাটি চলে গেলেন। গানের সাউন্ড কমল না একটুও আবারও কিছু সময় কুহু ডাকল তাদের সাড়া না পেয়ে বাধ্য হয়ে রুমে গিয়ে বসে সে। শুধু দরজা খুলুক মনে মনে ভাবা হয়ে গিয়েছে দুটোর আচ্ছা মতো খবর করবে।
_____
Zara Zara Behekta Hai Mehekta Hai
Aaj To Mera Tan Badan
Main Pyaasi Hoon
Mujhe Bhar Le
Apni Baahon Mein…
গান সেই কখন থেকে একটাই বারবার বেজে চলেছে কারো দায়িত্বে নেই সাউন্ড বক্সটাও আজ নিজ স্বাধীনতার একটি দিন কাটাচ্ছে হয়ত। একই সুরে বাজছে শুধু। কেউ গান পরিবর্তন করছে না আর না সাউন্ড কমাচ্ছে বাড়াচ্ছে। এটার শব্দ আশার শব্দগুলোকেও দমিয়ে নিয়েছে। বেচারির বন্ধ কক্ষের আর্তনাদগুলো তার স্বামীর কানেও সঠিক ভাবে পৌঁছাতে পারছে কি না সন্দেহ। আর তার স্বামী? বিরক্তিতে আঁটসাঁট হয়ে যাচ্ছে তবুও ছাড়তে রাজি নয়, আজ আর মুক্তি নেই, আশা জানে না এটা ভুল ছিল কি না অহীন সুযোগটা ভালো করে বুঝে নিয়েছে। অধর জোড়া মুক্ত হতেই হাফ ছাড়ে আশা অহীনের গলা পেঁচিয়ে ধরে নিজের সাথে আটকে নেয়। যাতে দূরে সরে গেলে তার কণ্ঠ ওই বেয়াদব সাউন্ড বক্সের জন্য হাওয়ায় না মিলে যায়, আশা স্বল্প আহ্বানে চোখ তুলে তাকায় অহীন, ঘেমে গিয়েছে মেয়েটা, মুখ কাতরে কাতরে লাল হয়ে গিয়েছে। চোখের পাপড়ি জোড়া বারবার ঝাপটা দিয়ে কত কষ্টে খোলা রেখেছে অহীনের আন্দাজ হচ্ছে একটু, তবুও এটা সময় নয় ছেড়ে দেয়ার। আশা দৃঢ়তার সাথে তাকে কাছে আনে কানের কাছে হিসহিস করে বলে,
“আর কতো?”
মলিন হাসে অহীন, আশার রক্তিম মুখটা দেখে চোখের কার্নিশে লেগে থাকা জলবিন্দু টুকু মুছে দিয়ে বলে,
“ধরার আগেই জিজ্ঞেস করছ আর কত?”
চোখটা আশার দেয়ালের দিকে যায়, কিছু সময় আগে ঘড়ির কাঁটাটা দুপুর ০২:০৩ এ ছিল সবে ০২:৪০। তার যে মনে হচ্ছে রাত নেমেছে? তার চোখ অনুসরণ করে অহীন তাকায় ঘড়ির দিকে, দীর্ঘ সময় বুঝতে পেরে আস্থা দেয়,
“সময় ধরে রাখো ঠিক ৩ টার কাঁটায় আসতেই সব শান্ত হয়ে যাবে।”
“অনেক সময় তো।”
“প্লিজ এর চেয়ে বেশি জেন্টল হওয়া সম্ভব না সোনা।”
আশার হাত আপনাআপনি আবার অহীনের পিঠে চলে যায়, সুখময় যন্ত্রণায় অস্থির ভাবে নখগুলো গেঁথে দিচ্ছে ধবধবে ফর্সা পিঠে, আচানক অহীন ওকে ছেড়ে নেমে যায় পাশে থাকা আশার ফোনটা তুলে এক আছাড়ে সাউন্ড বক্সের ওপর মারে শান্ত হয়ে গেল পুরো কক্ষ গান বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সাউন্ড বক্সের একটি অংশ ফোনের সঙ্গে খুলে এসেছে ফোনটার পার্টসগুলো ধাপে ধাপে খুলে শেষ। হঠাৎ এমন হওয়াতে কম্পিত হয় আশা। অহীনের দিকে তাকায় রাগে চোয়াল শক্ত করে আছে ছেলেটা, এই হঠাৎ রাগের কারণ না বুঝে শুকনো ঢোক গিলে মিনমিন করে জিজ্ঞেস করে,
“ক কি হয়েছে?”
অহীন গোমড়া মুখে এসে আশার বুকে মাথা রাখে ক্লান্তিতে চোখ মেলতে পারছে না। চোখগুলো দেখে মনে হচ্ছে ড্রাগস এর নেশায় বুঁদ, চোখ বুজে ক্লান্ত স্বরে বলে,
“এটার সাউন্ড খুবই বিরক্তিকর যার জন্য তোর মধুর স্বর শুনতে পেলাম না আমি।”
হতবিহ্বল হল আশা ইচ্ছে করছে দূরে সরিয়ে কানের নিচে দুটো লাগিয়ে দিতে, কিন্তু শক্তি নেই তার, হয়ত এখন চোখ বুজলে আবারও জ্ঞান হারাবে বেচারি বুঝতে পেরেছে, জ্বর হচ্ছেও তাই চোখগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, শরীরের জ্বলন ঘায়েল করছে তাকে। কোথায় ক্ষত নেই খুঁজতে গেলেও ঘণ্টা পার হবে তার। প্রতিটা অঙ্গ জ্বালা করছে। স্বল্প চেতনায় অহীনের গলা আবার শুনল সে,
“ফ্রান্স চলে যাব আমরা, আমি তোকে শুনতে চাই। এখানে তোর লজ্জার ভয় আমার মানসিক শান্তি নষ্ট করছে।”
কানে আর কথা আসল না অচেতন মাথাটা ঢলে পড়েছে একদিকে। অচেতন মেয়েটার বুকে মাথা রেখে বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে অহীন, চোখ বুজে রেখেছে তখন থেকে। দরজায় খটাখট শব্দ হচ্ছে একটু পরপর, অলসতা ও ক্লান্তি কাবু করেছে তাকে। এবার বেশ জোরেই ডাক আসে ভেতর থেকে,
“অহীন আশু দরজা খুলছিস না কেন?”
অন্তিকের গলা শুনে বিরক্তির ‘চ’ উচ্চারণ করে, বিরক্তির চরম পর্যায়ে সে আশাকে ছেড়ে নিজেকে ঠিক করে আশার গায়ে বিশাল কাঁথা দিয়ে নেমে যায়। দরজা খুলতেই অন্তিক কক্ষে প্রবেশ করতে নিলে তাকে থামিয়ে ক্লান্ত গলায় বলে,
“ঘুমাচ্ছিলাম।”
অন্তিক ভড়কায় এবং রাগ নিক্ষেপ করে বলে,
“তাহলে গান কি কোনো অশরীরী চালাচ্ছিল সাউন্ড বক্সে?”
অহীনের মাথায় একটু আগের কথা মনে আসে। এই গানের জন্য সে বিরক্ত হয়েছে খুব। আনমনে বলে ওঠে,
“এই শাওয়ার সাউন্ড বক্স এর কথা বলো না। এর জন্য যে কি মিস করলাম আমি। যত দ্রুত সম্ভব আমি ফ্রান্স গেলে বাঁচি।”
“মানে?”
“কিছু না, কেন ডাকলে তা বলো আমি ক্লান্ত।”
“দুপুর থেকে এত লাউডলি গান ছেড়ে কি নৃত্য করছিলেন চান্দু?”
অহীন কোমরের তোয়ালে টা এক পাশে গিট শক্ত করে গুঁজে দিয়ে ভাবলেস হয়ে বলে,
“নৃত্য পুরুষ করে না নারীকে করায়, তাই করছিলাম নৃত্য উপভোগ। আমাকে যাতে পাষণ্ড না বলো তাই গান ছেড়েছি।”
অন্তিক এগিয়ে গিয়ে ওর হাত ধরে টেনে কানের কাছে ঝুঁকে হিসহিস করে বলে,
“পাশের ফ্ল্যাট এর তিনটা মহিলা ৪-৫ বার করে এসেছে। তোমার মা রাগে বোম্বে মরিচ হয়ে আছে তোমাকে নৃত্যের কোর্স করাবে চান্দু।”
বিস্ময়ের চোখে সে বাবার দিকে তাকায়, হতবুদ্ধির মতো বোকা হেসে দেয়। অন্তিকের থেকে একটু দূরে গিয়ে বলে,
“তোমার বউটা অনেক বেড়েছে তোমার উচিত শিক্ষা দেওয়া তাকে। দেখো আমারটাকে এমন শিক্ষা দিয়েছি চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়েছে।”
“মেরেছ তুমি ওকে?”
“না না যাও প্লিজ।”
কথাটা বলে নিচ থেকে সাউন্ড বক্স এর ভাঙা টুকরো গুলোর জন্য নিচে ঝুঁকে যায়। মোবাইল ও সাউন্ড বক্স অন্তিকের হাতে দিয়ে বলে,
“এগুলো ঠিক করতে হবে প্লিজ হ্যান্ডসাম।”
হাতে দিয়ে খট করে দরজা বন্ধ করে দিল সে। যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল এই মুহূর্তে, বিছানার দিকে এগোতে এগোতে নিজের শরীরটা আয়নায় দেখছে ঠিক ডান পাশে দাঁতের চিহ্ন অন্তিক হয়ত খেয়াল করেনি। নাকি করেছে? ফর্সা সে হালকা একটু দাগেই ফুটে ওঠে আর স্পষ্ট হয় সবার চোখে। পরনের স্বল্প কাপড় টুকু পড়ে গেল নিচে কাঁথার ভেতর ঢুকে যায় আবার চোখ বুজে নিল আবার।
___
অহীন দরজা বন্ধ করতেই হাতের জিনিসগুলো টেবিলের ওপর রেখে অন্তিক নিজ কক্ষে যায়। কুহু সবে শুয়েছে চোখ বন্ধ হয়ত ঘুমিয়েছে সে পা টিপে টিপে গিয়ে একটা ড্রয়ার থেকে ছোট একটি শিশি নিয়ে আবারও পা টিপে টিপে বের হতে নিলে পেছন থেকে ডাক আসে,
“কি ছেলেকে বাঁচানো হচ্ছে?”
চোখ বুজে ভয় গিলে নেয় অন্তিক, গাম্ভীর্য দেখায় যাতে কুহু রেগে না যায়,
“ঘুমা পেঁচি, এই বয়সে বাচ্চারা করবে না তো কি? আমরাও করেছি।”
“কি করেছি?”
অন্তিক উত্তর দিল না ওই রুম থেকে প্রাণ নিয়ে বের হল, অহীনের দরজায় এবার হালকা শব্দে খটাখট শব্দ করে সে। সবে চোখ বুজেছিল অহীন আবার কিন্তু দরজার শব্দে বিরক্তি নিয়ে আবার নেমে আসে। নিচ থেকে তোয়ালে কুড়িয়ে কোমর জড়িয়ে নেয়। দরজাটা খুলে বিরক্তি নিয়ে বলল,
“উফফ আবার কি?”
অন্তিক ওকে দেখে এবার নাক ছিটকে নেয়। দূর থেকে মলমটা এগিয়ে দিয়ে বলে,
“আমাদের বেড়ালটা বোধহয় নতুন নতুন খামচি দেওয়া শিখছে। এটা তোমার কাজে দেবে পিঠে দিয়ে ঘুমিও রক্তাক্ত হয়ে আছে।”
মনে পড়ে অহীনের হ্যাঁ প্রচুর জ্বালা করছে পিঠ, আশা বড় বড় নখ এর শৌখিন খুব। সে গলা খাঁকারি দিয়ে হাত বাড়িয়ে ওটা ছো মেরে নিয়ে নেয়। ভেতরে গিয়ে দরজা বন্ধ করতে করতে বলে,
“আর ডাকলে তোমাকে বাপ ডাকিয়ে ছাড়ব।”
ঠাস করে দরজা বন্ধ করল সে। মলমের দিকে তাকিয়ে নিজেই নিজের চুল চুলকে বিড়বিড় করে,
“কেউ না বোঝার জন্য তো সাউন্ড বক্স ছাড়লাম, এখন পুরো বিল্ডিংয়ের মানুষ জেনে গেল? হায় পেঁচিইইইইই আমি ফ্রান্স যাব।”
চলবে..