#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ৪০
অনেকগুলো দিন পর অহীনের ঘুমটা হয়তো প্রশান্তিময় হয়েছে আজ। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে চোখ মেলে তাকায় অহীন, রোজকার মতোই বউটার বুকের ওপর মুখ গুঁজে ঘুমাচ্ছিল। সকাল তেমন না হলেও গতকাল দুপুর থেকে রুমে থাকার দরুন ঘুম ভেঙে গিয়েছে সকাল সকাল। প্রেয়সীর নগ্ন বুকে মাথা রেখে আছে সে। বড় করে হাই তুলে উঠে বসে। বউয়ের দেহটা ঘুমুঘুমু চোখে পরখ করে নিল আবেশিত হয়ে। ঠোঁটের কোণে স্বল্প হাসির রেখা ফোটে তার, কিছুদিন আগে পর্যন্ত ভালোই বেসেছে। কখনো কল্পনায়ও আসেনি আশার এই নিখুঁত বদনে খুঁতগুলো সে তৈরি করবে। হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করছে। হ্যাঁ, করলও তাই সে। হাত বাড়িয়ে শরীর স্পর্শ করতেই আঁতকে ওঠে সে। কপালে হাত উল্টেপাল্টে দেখে বিড়বিড় করে বলে,
“বার্নিং! আশু?”
উত্তর এল না আশার; স্পষ্ট বুঝল এবার অচেতন মেয়েটা। দীর্ঘ হতাশার শ্বাস নেয় সে। কীভাবে মেয়েটাকে এসব সহ্য করাবে সে? বিছানা থেকে নেমে জলপট্টি এনে আবার ওর পাশে বসে, এবার যত্নের সঙ্গে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আস্তে করে ডাকে,
“পেঁচি।”
উত্তর না পেয়ে হালকা পানির ঝাপটা মুখে মারে, পরপর কয়েকবার করার পর নড়েচড়ে ওঠে আশা, খুবই ক্লান্তির সঙ্গে চোখের পাপড়িগুলো টেনে মেলছে। অহীনের মুখটার দিকে একটু তাকিয়ে চোখ ফেরায় সে। অভিমানে রমণী লাল হয়ে আছে। অহীন বুঝল ওর দিকটা, ঠোঁট টিপে হেসে কানের কাছে যেতেই আশা একটি হাতে ধাক্কা দিয়ে বলে,
“আর না।”
“আমাকে কি রাক্ষস মনে হয়?”
“না, ভাদ্রমাসের নেড়ি কুত্তা। নির্দয়।”
অহীন ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে, একটু আগে কাঁথায় আবৃত করে রেখে গিয়েছিল সেটা সরিয়ে পিঠের ওপর ভর ছেড়ে শুয়ে পড়ে আবার নিজেদের পেঁচিয়ে নেয়। ব্যথায় ককিয়ে ওঠে আশা, অহীন ওর কানের পাতায় চুমু দিয়ে বলে,
“দোষ তো তোর, ১২ মাস ফেরোমন ছড়াস আমি তো উত্তেজিত হবই।”
“আর সম্ভব না, পেটে অসম্ভব যন্ত্রণা হচ্ছে সেদিনের চেয়ে বেশি। তুমি তুমি কথা দিয়েছিলে জেন্টল থাকার।”
অহীন সরে তার থেকে হতাশ হয়ে বলল,
“সরি নেক্সটে খেয়াল রাখব।”
আশার ক্লান্ত শরীরটা কোলে নিয়ে বাথরুমে যায় অহীন, শাওয়ারের নিচে রেখে পানি ছাড়তেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে তাকে রমণী। শীতে থরথর করে কাঁপছে। অহীনের দৃষ্টি নিচে ঝরে পড়া পানির দিকে, মুখটা চিন্তাসিক্ত রূপ নেয় তার। এটা প্রথম ছিল না, তাহলে এমন হওয়ার কারণ কী? আশা কান্না করছে পেটের ব্যথায়। অহীন তাকে আবারও পাঁজাকোলে তুলে নেয়, নিচু গলায় জিজ্ঞেস করে,
“তোর কি আজকেও সেদিনের মতো পিরি*ড হয়েছে?”
না সূচক মাথা দোলায় আশা। বিছানায় নিয়ে শুইয়ে দেয় আবার আর বলে,
“হসপিটাল যেতে হবে। অবস্থা তো খুব খারাপ।”
যন্ত্রণায় এতটাই ঘায়েল মেয়েটা, কথা বলার মতো শক্তি তার মধ্যে নেই। বারবার শুধু মাথা নাড়িয়ে নিজের মত জানাচ্ছে সে অহীনকে। অহীন তার ললাটে ভালোবাসার পরশ এঁকে রুম থেকে বের হয়। সকাল সকাল রোজকার মতোই নাস্তা তৈরি করছে কুহু, অহীন হাসিমুখে এগিয়ে গিয়ে নিজের হাতেই একটি প্লেটে খাবার নিচ্ছে। কুহু আড়চোখে দেখেও কিছু বলছে না। অহীন নিজ থেকেই বলে,
“আম্মু আশাকে নিয়ে একটু বের হব।”
“হঠাৎ জানাচ্ছ কেন? তোমরা তো জানিয়ে যাও না কোথাও!”
“এমনি বললাম।”
“হুম।”
কিছু সময় নীরব থাকে দুজন। অহীন গরম গরম রুটি হাতে, সেদিনের মতো ভয় হচ্ছে। তাই তো বলতে চেয়েছে কিন্তু তার মা যে তাকে হুমকির ওপরে রেখেছে। আশাকে অসুস্থ দেখে আবার না বলে বসে বউ দেবে না। সে তো জানতই না এবারও মেয়েটা সহ্য করতে পারবে না। বয়স তো এর কম না। জিভ দিয়ে ওষ্ঠ ভিজিয়ে নিচু গলায় বলে,
“আমি আশাকে অনেক ভালোবাসি।”
হাতের কাজ করতে করতেই কুহু মৃদু হেসে বলে,
“হুম তা জানি, বিয়ের পর বউ ভক্ত তো এমনি এমনি হওনি।”
মায়ের কথায় লজ্জা পেল ছেলেটা, ঘাড় চুলকে বলে,
“অতটাও না, আমি তো আমার মায়ের ভক্ত বেশি।”
ছেলের কথায় ফিক করে হেসে দেয় সে। দীর্ঘ দুই মাস এসেছে, এর পুরোটা সময় বউকে দিয়ে ছেলে বলে তার ভক্ত? খিলখিল হাসিতে আরও লজ্জায় পড়ে ছেলেটা। লজ্জার রেশ কাটিয়ে দেয় কুহু একটি ছোট প্রশ্ন করে,
“ও জানে?”
মলিন হয় অহীন, সে ভয় পায় আশাকে বলতে। যদি আশা তাকে সরাসরি বলে দেয় সে ভালোবাসবে না? হ্যাঁ, আশা বলেনি ভালোবাসে, কিন্তু ভালোবাসে না, সেটাও শুনতে কষ্টকর বেশি। দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলে,
“না, যদি রেগে যায়?”
“রাগবে কেন? বিয়ে হয়েছে, স্বাভাবিক দম্পতির মতো তোমরা একসঙ্গে থাকো সংসার করো। ভালোবাসাটা ভুল নয় বা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং নরমাল একসঙ্গে থাকলে মায়া মোহাব্বত তৈরি হবে।”
“তবুও সব সময় লুকিয়ে রেখে কেমন অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। সাহস আগে করিনি, এখন সাহসগুলো চাপা পড়ে গিয়েছে।”
“বলে দিও।”
সোজা হয়ে দাঁড়াল কুহু, অহীনের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
“বলে দিও। ও তোমাকে বিশ্বাস করে না, হয়তো ভাবে তুমি ওকে চাও না, পারিবারিক চাপের জন্য ওর সঙ্গে বেঁধে আছ। যদি স্পষ্ট করে দাও ও বুঝবে তুমি আমাদের জন্য নও, ওর জন্য সংসার করছ। নিজের জন্য ওকে চাইছ। মেয়েরা একটু বেশি বোঝে, তাদের বুঝিয়ে নিজের করে রাখাই তো পুরুষের মহৎ গুণ।”
অহীন খাবারের প্লেট নিয়ে আশার কাছে যায়, কুহু তাকিয়ে আছে তার দিকে।
______
হাসপাতালের করিডোরে বসে আছে অহীন। সেই কখন থেকে বসে আছে অহীন, আশাকে টেস্ট করানো হচ্ছে। সকালে ব্যথায় কাতরেছে খুব তাই আর রিস্ক নিল না সে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আশাকে অ্যাডমিট করতে হয়েছে। ডাক্তার থেকে নির্দেশনা এবার কঠোর নয়, বিকেলে রিলিজ দেওয়ার সম্ভাবনা আছে। আশা ঘুমিয়ে আছে, নিবিড়ে হাতে ক্যানোলা সেট করা। কিছু সময় আগেই ডাক্তারের সঙ্গে কথা হলো তার, সেই থেকে আশার হাত ধরে বসে আছে। আফসোসের খাতা ক্রমাগত ভারি হচ্ছে। এই তো কিছু সময় আগের কথা ডাক্তারের চেম্বারে ছিল সে। নরমাল প্রবলেম ভেবেই। তবে মুহূর্তটা কেমন অদ্ভুত হয়ে গিয়েছে ধোঁয়াশার মতোই।
ঘুমন্ত নয়নের দিকে তাকিয়ে চোখের কার্নিশ নিয়ে নিজ থেকেই দু-ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার। নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটে আশার হাতে ভেজা অনুভব হতেই একটু নড়ে। নিজ বেয়াদব পেঁচির হাতটা নিজের মুঠোয় শক্ত করে পুরে কপালের সঙ্গে ঠেকিয়ে হোহো করে কেঁদে ওঠে সে। সে তো ভালোবাসার সেই সময় জানত, বুঝত যে পেঁচিকে ভালোবাসলে কাঁদতে হবে খুব। কিন্তু তার মানে কি এই যে প্রতিক্ষণ কেঁদেই কাটাতে হবে। সে তো পেল প্রেয়সীকে নিজের করে তবুও কেন সুন্দর হচ্ছে না সংসার। অন্য একটা স্বাভাবিক মেয়ের মতো তার সঙ্গে মানাতে পারছে না আশা। আর না পারছে সে নিজেকে আশার থেকে দূরে রাখতে। গোঙিয়ে গোঙিয়ে বলতে থাকা অহীন,
“আর এমন করব না পাখি, এবার সত্যি সত্যি প্রমিস করছি। থেরাপি নিয়ে সুস্থ হয়ে তবেই কাছে আসব তোর।”
“মেয়েদের মতো এত ন্যাকা কান্না করো কেন তুমি? ছাগল।”
কান্নার মাঝে আশার দৃঢ় দুষ্টুমি ভরা গলা শুনে চোখ তুলে তাকায়। চোখের লম্বা লম্বা পাপড়িগুলো নোনাজলে জুবজুব করছে, নাকটা লাল হয়ে আছে। সে জানে না আজকাল এই পুরুষের জন্য সে কেমন অনুভব করে। তবে ভালো লাগে যখন তার জন্য কান্না করে তাকে কাছে পাওয়ার জন্য বাচ্চামো করে। আর কাছে পেয়ে গেলে পুরো পৃথিবী ভুলে তাকে গভীর থেকে গভীর ভাবে কাছে নেওয়ার চেষ্টায় মেতে থাকে। তবে কান্নার কারণ বুঝল না। শারীরিক ক্ষতের জন্য প্রথম কয়েকবার তার এমন হবে অহীন তো জানে। এতে কান্না কেন করছে তার পুকি স্বামীটা। তাকে চোখ মেলতে দেখে নিজের চোখগুলো মুছে নিল দুই হাতে অহেতুক মিথ্যা প্রচেষ্টায় কান্না লুকানোর। আশার গালে হাত দিয়ে আদুরে গলায় বলল,
“কই কান্না করলাম তার ছিঁড়া মেয়ে? এতটুকু নিতে পারিস না? স্বামীকে সারাজীবন উপোস রাখবি নাকি?”
ফিক করে ম্লান হাসে আশা। ওকে হাসতে দেখে অহীনের হাসি মিলিয়ে গেল। মনে পড়ল ডাক্তারের কথা, আশাকে কি জানানো প্রয়োজন? যদি তাকে ছেড়ে চলে যায়? অহীন মলিন হেসে বলে,
“আই অ্যাম সরি সোনা।”
“কেন?”
“এই যে বারবার রুড হই তোর পেটে ব্যথা হয় হাসপাতাল আসতে হয় এসবের জন্য।”
অহীনের কথায় সুর পাল্টেছে তাতে হতাশা এখন স্পষ্ট। হয়তো মানুষটা ভেতরে কষ্টে ফেটে যাচ্ছে। অজান্তেই আশার মন বলছে তার জন্য অহীন এত চিন্তা করে? সেদিন তো বেঁধে বাথটাবের মধ্যে ফেলে দিল। সে তাকে শান্ত করার জন্য কথাটাকে উল্টোপথে নিয়ে যায়,
“এজন্য সরি বলছ? সকালে জানি না কী হয় পেটে এত ব্যথা হয়। কিন্তু…..”
“কিন্তু?”
চোখের ইশারায় অহীনকে কাছে ডাকে। ভ্রু কুঁচকে আসে অহীনের। ধীরে ধীরে কাছে যায়, একদম ঠোঁটের কাছে, আশার গরম শ্বাস তার কান ও ঘাড়ে লাগছে। এতে পুরো শরীর শিহরিত হচ্ছে কাম উত্তেজনায়। বেডের সাদা ফকফকে চাদর খামচে ধরে দাঁতগুলো খিঁচিয়ে আছে অহীন। দৃঢ় কিন্তু গভীর নেশালো গলায় আশা হিসহিস করে,
“কিন্তু রাতটা ভালো কেটেছে আমার। Your fucking skills... ugh, just ahh! এমন রাত রোজ আসলে আমি রোজ হাসপাতালে থাকতে রাজি আছি।”
তার কথায় ঢোক গিলে অহীন, বউটাকে অসুস্থ করার পরেও সে মানতে দ্বিধা সংকোচ করছে না যে রাতটা ভালো কাটেনি তার দিক থেকে। ক্রমাগত বারবার অজ্ঞান হয়েছিল আশা, প্রতিবার তাকে চরম মুহূর্তে নিয়ে মেয়েটা বাধ্য করেছে ছাড়তে। এভাবেই কিছুক্ষণ পরপর কাছে যেতে হয়েছে। এতে কি মন ভরে? এখন এমন কথা? গলা শুকিয়ে আসছে। আশা সুস্থ হলে হয়তো হাসপাতালের এই ছোট বেডটাও আর ছাড় পেত না। ঠোঁটে গাঢ় চুম্বন এঁকে ধীরে ধীরে গলায় গিয়ে থামে অহীন। হালকা করে দাঁতের কামড় বসিয়ে মাদকতা মিশ্রিত গলায় বলে,
“এমন করে বল না সোনা, এটা হাসপাতাল তুমি অসুস্থ। আমি তো মরে যাবো।”
“নিজের সঙ্গে আমাকেও মেরে দাও। জাস্ট কিল মি ড্যাডি।”
আচানক আপত্তিকর স্থানে অহীনের হাত যেতেই থেমে যায় আশা, সে তো মজা নিচ্ছিল। অহীন বড় বড় শ্বাস নিয়ে হাঁপাচ্ছে। সহ্য হচ্ছে না আশার দুষ্টুমিগুলো। তবুও নিজেকে শান্ত করে বলে কম্পিত গলায়,
“চুপ, পেকে তালের বিচি হয়েছিস, আর একটা এমন অশ্লীল কথা বললে মুখে টেপ মেরে দেব।”
“তুমি যে সারাক্ষণ অশ্লীল কাজ করতে মরিয়া হয়ে থাকো সেটা দোষ নয়?”
চোখ ছোট ছোট করে অহীন, মেয়েটাকে সে নষ্ট করে দিয়েছে। বলল,
“আর করব না তবুও চুপ।”
“এই না করো প্লিজ।”
“তবে রে শালী, আমাকে খেপানো হচ্ছে তাই না, আমারও দিন আসবে।”
খিলখিল করে হেসে দেয় আশা, অধরগুলো পেতে দেয় অহীনের দিকে। মৃদু হেসে অহীন এগিয়ে দীর্ঘ সময়ের তৃষ্ণা মেটায়। নিস্তব্ধতায় ঘেরা এই শান্তির মাঝেও পুড়ে যাচ্ছে তার ভেতরটা। একা একা কি এত চাপ কষ্ট নেয়া যায়? তার ভেজা চোখের পানিগুলো গাল গড়িয়ে আশার চিবুক ছুঁয়ে যাচ্ছে। নিজের ব্যথাগুলো যেন ভুলিয়ে এখানে সুখের খোঁজে বাঁধনহারা হয়েছে তার অধর যুগল। দীর্ঘ সময় পার করে দূরে আসতেই আশা ওর চোখের পানি মুছে দিয়ে অপ্রত্যাশিত প্রশ্ন করে,
“আমার কি আমার আম্মুর মতো বড় কোনো রোগ হয়েছে নাকি? সেই কখন থেকে কাঁদছ!”
প্রশ্নটায় তড়িৎবেগে আশার ঠোঁটে আঙুল ছোঁয়ায়,
“হুসস বলদ মেয়ে, তোর কিছু হয়নি হয়েছে আমার। ভুল আমার ক্ষতিও আমার। আমরা ফ্রান্স যাবো বাসায় গিয়ে প্যাকিং করে নিস কেমন?”
“হুম।”
___
দীর্ঘদিন পর ফ্রান্সের হাওয়া এসে নাকে লাগল অহীনের। এয়ারপোর্ট থেকে তাকে রিসিভ করতে এসেছে সৃজন। ব্যাক সিটে আশা আর অহীন, সামনে জেসি আর সৃজন। আশা ঘাপটি মেরে সিটে হেলান দিয়ে বাইরে তাকিয়ে। নিজের সঙ্গে নিজের দ্বন্দ্ব চালিয়ে যাচ্ছে। সে কি জেলাস? জেসির দিকে একবার তাকিয়ে আবার অহীনের দিকে তাকাচ্ছে। দু'জনের হাসিগুলো গা জ্বালিয়ে দিচ্ছে তার। এই তো কিছু সময় আগে এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই ছুটে এসে জড়িয়ে ধরেছিল জেসি অহীনকে। অহীন হেসেছিল, দূরে সরিয়ে দেয়নি একটিবারও। উল্টো আদুরে স্বরে জিজ্ঞেস করেছিল,
“কেমন আছ বেইব?”
এগুলো কি দৃষ্টিকটু নয়? মেয়েটাও তখন কেমন করে জবাব দিল, নির্লজ্জ মেয়েছেলে কোথাকার। গাড়িটা সৃজনের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে এসে থামতেই জেইন নিচে নেমে আসে। মহিলাটির বয়স হলে কী হয়েছে? সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নেমেছে কোনোক্রমে। দিকবিদিক না ভেবেই অহীনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে সে। গালগুলো আগলে নিয়ে মমতা ভরা গলায় বলে,
“কেমন আছ প্রিন্স? বউ পেয়ে ভুলে গেছ আমাদের।”
“ও মামান ভুলব কেন? উল্টো আমি চাই আমার বউ তোমার মতো হোক। তুমি পাপিকে যেমন মায়া করো আমাকেও এমনভাবে করুক যেন বুড়ো হলেও পাপির মতো সিক্স প্যাক নিয়ে ঘুরতে পারি।”
“হুম বাসায় আসো।”
বলেই আশার কাছে যায় সে। তবে অহীন আশার অভিমান বুঝতে পেরে থাকতে রাজি হলো না সেখানটায়। আশাকে জেইন আগলে ধরে জিজ্ঞেস করে,
“মা-ফুম্মি কি খাওয়ায়নি? শুকিয়ে গিয়েছ পুরো।”
আশা শীতল হাসে, তার হয়ে অহীন উত্তর করে,
“অসুস্থ ছিল তাই।”
“প্রেগন্যান্ট?”
লজ্জা পেল আশা, ঠোঁট টিপে অহীনের দিকে তাকাতেই অহীন হেসে দিয়ে বলে,
“না অতদূর প্ল্যানিং নেই এখনো। হতে পারে আমার বউটা বুড়ি আমি তো যুবক, আমার বহুত শখ।”
পরিবেশটা একদম থমথমে কেননা অহীনের কথাটা রসিক হলেও কথার সঙ্গে হাসি নেই শুধুই গাম্ভীর্য। অল্পতেই কথা সমাপ্ত করে আশাকে নিয়ে সেখান থেকে বাইকে করে প্রস্থান করে সে। অনেক দিন পর খোলা একটা আকাশের নিচে তারা। ফ্রান্সের চারপাশে কোলাহল নেই, সবাই সবার জীবন নিয়ে ব্যস্ত। পথে কোনো গাড়ির জ্যামজট নেই। আশা জড়িয়ে ধরে আছে অহীনকে পেছন থেকে শক্ত করে। নীরবতা ভেঙে আশা বলল,
“অহীন।”
“হুম?”
নড়েচড়ে বসল আশা, গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“তুমি বেবির জন্য ভাবোনি?”
কিছুটা সময় নীরব থেকে উত্তর আসে,
“না, বিয়েই তো করলাম সবে। বেবি আসলে তোকে আদর দেব কবে? বাচ্চা পালতেই তো দুজন বুড়ো হয়ে যাব।”
দাঁত বের করে হেসে দেয় আশা, অহীনের ঘাড়ে আলতো করে কামড়ে দিল। দাঁত খিঁচিয়ে ব্যথাগুলো সয়ে নিল নিজের গায়ে। অহীনের সুখ হয়তো এখানেই মেয়েটাকে নিয়ে খুনসুটিময় জীবন যাপন করা। বাইকটা আর বেশি দূরে গেল না স্বল্প দূরেই থামে। নতুন জায়গা নতুন বাসা। বাইক থেকে নেমে চারপাশে ভালো করে দেখে নিল। এটা অ্যাপার্টমেন্ট না একটা বাসা ছোট একটু পরিবার থাকার মতোই। অহীনের দিকে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকাতেই অহীন নিজেই বলে,
“অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে দিয়েছি ওখানে ক্লেরা আছে তাই। এটায় রেন্ট একটু বেশি। সমস্যা নেই সামলে নেব।”
ক্লেরার থেকে দূরে বাড়ি নেয়াতে খুশি হলো আশা, একগাল হেসে অহীনকে জড়িয়ে ধরে উঁচু হয়ে ঠোঁটে আলতো করে চুমু খায়,
“সুন্দর বাসাটা, এখানে অন্তি আর তাইয়ান থাকতে পারবে?”
“দুটো বেডরুম আছে, ভেতরে চল দেখবি।”
ছোট রঙিন একটি লোহার গেট ঠেলে ভেতরে যায় দুজন। কিছু ফুলের টব রাখা কিন্তু ফুল নেই কোনোটাতে। অহীন আশাকে ভেতরে নিতে নিতে জানায়,
“এই ছোট বাড়ির প্রতি আকৃষ্ট হলে চলবে? তোকে বিশাল বড় বাড়ি করে দেব। সেটা আমাদের বাড়ি হবে।”
দরজার সামনে গিয়ে চাবি দিয়ে লক খুলছে অহীন, আশা আশেপাশে দেখছে। দেয়ালটা তার বুক পর্যন্ত বাইরে দেখা যায়। এখান থেকে বেশি দূর নয় সৃজনের বাসাটা। এতেও মনটা খারাপ হলো তার। এখন জেসিকে ভালো লাগে না, সেখানটায় বসে ফুলহীনা গাছের পাতাগুলো টানছে আর গভীর চিন্তায় মগ্ন হলো সে। চিন্তার কারণ জেসি কেন আসতেই জড়িয়ে ধরল তার স্বামীকে? রমণীর বুক জ্বলছে ঈর্ষায়। এটা তো হওয়ার কথা নয় তবুও হচ্ছে। অহীন ভীষণ রকম পরিবর্তন হয়েছে, অতিরিক্ত যত্ন মায়ায় মুড়িয়ে রাখে সবাইকে। সবাই তাকে কেন এত করে চায় হয়তো বিয়ে না হলে বুঝতই না কখনো। জেসির তো অনুভূতি আছে অহীনের জন্য। অহীন কি বোঝে না? এরই মাঝে কাঁধে অহীনের হাত পড়ে তার,
“সারাদিন বসে থাকতে পারবি জান? এখন বাসায় চল।”
গাল ফুলিয়ে উঠে দাঁড়ায় আশা। মুখোমুখি হয়ে চোখের পলক বারবার ঝাপটা দিয়ে বলে,
“ত... তুমি জেসির সঙ্গে এত চিপকে থাকো কেন?”
“তুই জেলাস?”
চোখ লুকায় আশা, অন্যদিকে ফিরে আমতা আমতা করছে। তার হাবভাব বোঝা মুশকিল। বাসার ভেতরে যেতে নিলে পেছন থেকে টান দিল অহীন। হেঁচকা টানে এসে তার প্রশস্ত বুকে এসে মুখ থুবড়ে পড়ল সে।
“রাগ করেছ সোনা?”
আদুরে ডাক অহীনের সেই দিন থেকে কতটা মিষ্টি করে ডাকে তাকে। ফোস করে শ্বাস নিয়ে আশা সরতে চায়, তবে শক্ত হাতের বাঁধন তাকে বন্দি করে নিয়েছে নিজের সঙ্গে। আশা মোচড়াচ্ছে ছাড়ার জন্য। বিরক্তি নিয়ে বলে,
“উসস বাসায় চলো গরম এখানে।”
কম্পিত বিরক্তি ভরা মুখটার দিকে তাকালো সে, তিরতির করে কাঁপছে আশার ওষ্ঠদ্বয়। অহীন অভিমান নিয়ে বলে,
“তোকে ছুঁতে হলে অনেক বাধা বিপত্তি আসে। স্বাভাবিক ভাবে সংসার করতে চাই আমি। কিন্তু তুই অসুস্থ হয়ে যাস!”
“এগুলো স্বাভাবিক?”
অহীন আশার নাক টেনে দিয়ে হিসহিস করে বলে,
“খুব স্বাভাবিক, তোর হাড় মাংসে জোর নেই। আর তুই তো সেদিন বললি এমন রাত রোজ চাস…”
লজ্জায় নারী আড়ষ্ট হয়ে একটি হাত বাড়িয়ে মুখ চেপে ধরে তার। সেদিন বলেছিল তারপর অহীন ভালো ছেলের মতো থেকেছে। কিন্তু আজ হঠাৎ ওসব মনে করছে লজ্জায় রংধনুর মতো রঙিন হচ্ছে সে।
“হাহ আইছে দানব একটা। আমি তো এমনি বলেছিলাম।”
অহীন আর কথা বাড়াল না। ঝুঁকে পড়ে আশার অধরে মৃদু হামলা চালায়। জামার নিচ দিয়ে হাত গলিয়ে আশার পৃষ্ঠদেশে নিজের আঙুলের খেলা চালাচ্ছে সে। হঠাৎ এমন ঘনিষ্ঠতায় মেয়েটি কিছুটা হকচকিয়ে পেছনে হেলে যায়, অহীনের বুকে ধাক্কা দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু অহীন তাকে ছাড়ল না। শেষে নিরুপায় হয়ে আশা সায় দিল তার সঙ্গে, দুহাতে গলা জড়িয়ে ধরল। এবার অহীন ধীরে ধীরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চায় তবে আশা তাকে আরও শক্ত করে জাপটে ধরে, এবার নিজ থেকে। কাছে চায় সে।
বউয়ের এভাবে বারবার আগ বাড়িয়ে কাছে আসাটা অহীনের জন্য সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। সে চায় তার স্ত্রী সুস্থ থাকুক, কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা দুষ্কর। মাথায় কিছু একটা আসতেই সে সময় নিল না একটুও। আশার ঠোঁটে চুম্বনরত অবস্থায় তাকে আস্তে আস্তে ঠেলে দরজার কাছে নেয়। দেয়ালের সঙ্গে চেপে রেখে নিজ মনমর্জি মতো হাত বিচরণ করে। বাইরে পড়ে আছে তাদের ছোট একটি লাগেজ।
দরজা ধাক্কা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেই নিয়ন্ত্রণহীন অহীন প্রথমেই আশার ওড়নাটা টেনে দূরে ফেলে দিল দূরে কোথাও। দরজার সামনেই জুতো রাখার কাঠের ছোট একটা র্যাক। সেখানে আশাকে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে তার গলদেশে মুখ ডুবিয়ে দিল সে। চিবুকে আলতো চুমু খেয়ে আশার নিতম্ব চেপে ধরে তাকে সেই কাঠের র্যাকটির ওপর বসিয়ে দিল। ঠোঁট কামড়ে আশার কোমরের নিচের অংশে তাকায় নেশালো চোখে। বুঝতে পারছে আশা অহীন কী চায়। পিছিয়ে গিয়ে দেয়ালের সঙ্গে আরও চেপে গেল সে। অহীনের কাছে সময়ের মূল্য খুব এখন।
আশা অস্থির ভঙ্গিতে বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে। সে মনেপ্রাণে চায় অহীন এগিয়ে আসুক। নারী হিসেবে স্বামীর সান্নিধ্য পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তারও হয়। সেই যে কবে অসুস্থ হলো, তারপর অহীন আর তাকে গভীর স্পর্শ দেয়নি। অহীনকে নিয়ে মনের কোণে সামান্য ভয় থাকলেও সে জানে, এতটুকু তাকে মানিয়ে নিতেই হবে। অহীনকে সে এই কদিনে চিনেছে, সে নিজে কষ্ট পেয়েও কখনো আশাকে নিজে থেকে কষ্ট দেবে না।
রমণীর গায়ের কাপড় নিচের দিকে টান দিতেই হঠাৎ কাঁচ ভাঙার ঝনঝন শব্দ কানে আসে। আঁতকে ওঠে আশা, দুজনেই সেদিকে তাকায়। মুখে পানি নিয়ে গাল ফুলিয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে অন্তিহা। বিস্ময়ে বেচারির গলা দিয়ে পানিটুকুও নামছে না। আশা অহীনকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে নিতে চায়, কিন্তু সে সরলো না। মেয়েটা হতবুদ্ধি হয়ে বোকা হাসি হেসে আমতা আমতা করে বলল,
“ব... বাসাটা নতুন তো, তাই সেট-আপ করতে এসেছিলাম। স... সঙ্গে দেখাও হয়ে যাবে ভেবে। তবে সত্যি আমি কিছু দেখিনি! চলে যাচ্ছি।”
আশা র্যাক থেকে নামার চেষ্টা করে, কিন্তু পাষণ্ড নির্লজ্জ পুরুষটি তাকে নামতে দিল কই। উল্টো বেহায়ার মতো বলে উঠল,
“ইট’স ওকে, তুই থাক। আশু, চল আমরা বেডরুমে যাই।”
লজ্জায় যেন কুঁকড়ে গেল নারী, বুকের ভেতর তোলপাড় শুরু হচ্ছে রমণীর। সে স্বামীর বুকে ধাক্কা দিয়ে তাকে সরে যেতে বলল। অহীন কিছু বলার আগেই অন্তিহা সোফার ওপর থেকে তড়িঘড়ি করে নিজের ফোন আর লং কোটটা তুলে তাদের পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে বলে উঠল,
“ফ্রিজে খাবার আছে গাইজ, আপনাদের শেষ হলে খেয়ে নিয়েন, শক্তি হবে। আগে খেলে আরও ভালো এনার্জি বেশি পাবেন!”
অন্তিহা যেতেই ভরকে ওঠে আশা, ধমকে দেয় অহীনকে আচ্ছামতো,
“নির্লজ্জ ওটা তোমার ছোট বোন ওর সামনে এটা করতে বাঁধেনি?”
“হুসসস কথা কম।”
(এখানের কিছু অংশ প্রাইভেট গ্রুপে দেয়া হয়েছে।
https://www.facebook.com/share/v/188waRGdxR/ )
___
দরজার বাইরে এসেই অন্তিহা হাঁসফাঁস করছে। বুকে হাত দিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে সে। মাথায় বারবার কুচিন্তা আসছে, সে না থাকলে কী হতো? কিংবা সে যদি কিচেন থেকে দুই মিনিট পরে বের হতো? ছিহ ওটা বড় ভাই হয় অন্তি! মাথা তুলে সামনে দেখেই বিরক্তি আর বিস্ময়ে কপালে হাত দিয়ে চোখ বুজে ফেলল সে।
গাড়ির সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাফওয়ান, তাকে দেখে হাত নেড়ে ‘হাই’ দিচ্ছে। উফ, স্টকার একটা! পরক্ষণেই সেখানে হাজির হলো আরেক আপদ, আয়াশ। ফরমাল গেটাপে গাড়ি থেকে নামছে সে। এবার এই দুই আপদকে একসাথে সামলাতে হবে ভেবেই অন্তিহার গা জ্বলে উঠছে। সামনের দিকে এগোতেই আয়াশ গেট ঠেলে প্রবেশ করে। অন্তিহা ভড়কে তার সামনে গিয়ে,
“হঠাৎ এখানে কী?”
গম্ভীর গলায় উত্তর করে আয়াশ,
“পুতুলের সঙ্গে দেখা করতে আসলাম।”
তাচ্ছিল্য করে হাসে অন্তিহা,
“জানলেন কেমন করে আশা আর ভাইয়া এসেছে?”
“ভেতরে যেতে দাও!”
অন্তিহা বেশ বিরক্তি নিয়ে বলে,
“ওরা সবে এসেছে, ওদের কত ঝামেলা জানেন? আপনার মনে হয় না ওদের সংসারে প্রভাব ফেলছেন?”
“হোয়াট দ্য হেল অন্তু? জাস্ট দেখা করব অহীনও আছে, আমি প্রেম করতে যাচ্ছি না।”
অন্তিহা ফোস করে শ্বাস নেয়, ভেতরে কী হতে পারে ধারণা তার আছে। সে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
“আমি ভেতর থেকেই তো আসলাম। ওরা এখন বিজি আপনি অন্য দিন আসুন সানডেতে ভাইয়া ফ্রি থাকে, আপনার দাওয়াত কেমন?”
“শিওর?”
“এখন যান।”
“কোথায় যাচ্ছ? ড্রপ করে দেব?”
“নো থ্যাংকস।”
অন্তিহা বের হয় গেট পার হয়ে। এতটা সময় শান্ত ছেলেটা দেখছিল তাদের। অন্তিহাকে বের হতে দেখেই পিছু নিল তার। অন্তিহা অভ্যস্ত হয়েছে এর অত্যাচারে, তাই এখন কিছু বলে না। ভার্সিটি জুড়ে বলে বেড়ায় লোকটা সকলকে 'মাই লেডি'। পকেটে হাত রেখে হাঁটছে সে, পেছনে লোকটা তাকে কপি করছে। পেছনে তাকাতেই চোখ লুকায় সাফওয়ান। অতঃপর থামল, হাতের আঙুল দিয়ে ইশারা করে সাফওয়ানকে নিজের কাছে ডাকে। সাফওয়ান মৃদু হেসে ছুটে আসে তার নিকট। কপট হাসে অন্তিহা, বলল,
“এভাবে পিছু নিয়ে কী মজা পান?”
“আপনার পেছনের ভিউটা সুন্দর তাই।”
“বিচ।”
হাঁটা ধরল আবার, এবার দুজন সমান তালে হাঁটছে। সাফওয়ান আড়চোখে বারবার দেখছে তাকে। অন্তিহা হঠাৎ কিছু একটা ভেবে তাকে বলল,
“এয়ারপোর্ট যাব আমার কাজিন আসবে।”
“ওকে।”
“আপনাকে বললাম আগেই কারণ শেষমেশ তো আমার পিছু নেবেনই।”
ফিচলে হাসে ছেলেটা, তার মিস গম্ভীর তাকে বুঝেছে এতদিনে ভালোই। তার হাসির শব্দে পা থামে অন্তিহার। সামনেই ছোট একটা ক্যাফে, শীতল হাওয়া বইছে চারপাশে। ফোস করে শ্বাস নিয়ে অন্তিহা বলে,
“সবারই কিছু না কিছু উইকনেস থাকে। আমার দুর্বলতা হচ্ছে আমাকে কেউ যদি বলে ভালোবাসে আমার মায়া হয় এই ভেবে যে সেও আমার মতোই নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে পাবে না।”
সাফওয়ান অন্তিহার হাত ধরে নিজের দিকে ফেরায়, মেয়েটার মুখ মলিন। সাফওয়ান কঠিন গলায় বলে,
“কে বলেছে আমি আপনাকে পাব না? আমি পাব আপনাকে। কত দিন আমাকে ফিরিয়ে রাখবেন?”
নিচের দিকে তাকায় অন্তিহা, হাত ছাড়িয়ে নেয়। স্থির চিত্তে মেকি হেসে বলে,
“পাবেন না, আমার মায়া হয় কিন্তু মন একজনের প্রতি দুর্বল। সে অন্য জনকে ভালোবাসে। সহজ নয় সাফওয়ান, আমি বুঝি বলেই আপনাদের বারবার বলি দূরে থাকতে। আমার সঙ্গী প্রয়োজন নেই আমি একা জীবন কাটাতে পারব।”
সাফওয়ান হাত বাড়িয়ে তার গালে হাত রাখে, বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে গাল বুলিয়ে দিয়ে বলে,
“ আমি পারব না একা জীবন কাটাতে! আই নিড ইউ আমি সবার মতো আপনার সঙ্গে থাকতে চাই। কারণ আপনাকে আপনার ভালোবাসার মানুষটা ভালোবাসেনি। তাই আপনি তাকে ভালোবাসবেন না যে আপনাকে ভালোবাসে?”
“তেমন নয়, আমি ভালোবাসতে পারব না, চাইলেও পারব না।”
“পারতে হবে না, আমি জানি আমি আপনাকে এতটাই চাই আপনার প্রতি এতটাই আসক্ত যে দুজন মানুষ সুখে থাকার জন্য তা যথেষ্ট। আমি ভালোবাসব আপনাকে।”
সাফওয়ানের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মলিন মুখটায় আবারও গাম্ভীর্য ফুটিয়ে বলে,
“বেশ অনেক হয়েছে ইমোশনাল ঢং। আমার ভাইয়া এসেছে ভুলেও ওনার সামনে আমাকে টিজ করবেন না। আর আগামী দিন এয়ারপোর্ট যাব আমার পিছু নিবেন না।”
“যাওয়ার সময় দেখা যাবে।”
ঠোঁট ভেঙায় সাফওয়ান, ওর বাচ্চামো দেখে ফিক করে হেসে দেয় অন্তিহা। তাকে হাসতে দেখে মাথা নিচু করে লজ্জা পেল ছেলেটা। পকেট থেকে একটি ছোট চকলেট বের করে অন্তিহার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,
“আপনার ভাই-ভাবিকে দেখলাম, দে আর টোটালি কন্ট্রোললেস কাপল।”
“চুপ থাকুন অসভ্য, আমাকে স্টোক করেন ওদের দিকে তাকান কেন?”
“আই অ্যাম জেলাস বেইবি আমি বিয়ে করতে পারছি না আপনাকে। আমিও ডেস্পারেটলি আপনাকে কিস করতে চাই।”
“সুহহহহহহহ।”
অন্তিহার ঘাট হয়েছে সাফওয়ানের সঙ্গে আজ কথা বলা। এই লোকটা যে নির্লজ্জ, কেবল বেহায়ার মতো কথা বলতে পারে। তাকে বড় বড় পা ফেলে চলে যেতে দেখে হতবিহ্বল সাফওয়ান চেঁচিয়ে ওঠে পেছন থেকে,
“মিস গম্ভীর আমি সত্যি করতে চাই। আপনি কি চান আপনার কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে বিয়ে করি?”
অন্তিহা তার দিকে ফিরে, একটু আগে সাফওয়ানের মতো করে ঠোঁট ভেঙিয়ে বলে,
“আপনার বন্দুক আপনাকে গুঁজে দেব জায়গা মতো।”
“তার জন্য হলেও আমাদের একটা রুমে যেতে হবে, চলুন যাই।”
চলবে?.....