ফন্ট সাইজ:
থিম:
দূরত্বের প্রণয় ২

৪১তম পর্ব

লেখক: স্বর্ণালী ইসলাম

#দূরত্বের_প্রণয়_২

#স্বর্ণালী_ইসলাম

পর্বঃ৪১

এয়ারপোর্টের সামনে সাফওয়ানের গাড়িতে হেলান দিয়ে হাতের ছোট ঘড়িটা দেখছে অন্তিহা। কিছু সমস্যার কারণে অহীনের আসার কথা সকালে আর তাইয়ানের বিকেলে আসতে হলো। আর সকালে অন্তিহা আসতে পারেনি বাড়ির কাজের জন্য, যতই হোক নতুন বাসা তো। তবে তাইয়ানের জন্য না এসে পারল কই বেচারি? আশা ও অহীন তো ক্লান্ত, আর যা সে দেখল তারপর তাদের ডেকে বিরক্ত করার মতো মেয়ে সে নয়। সাফওয়ানের এমন পেছনে পড়ে থাকাটাকে কাজে লাগালো আজ। সে জানে সে না বললেও উড়ে এসে জুড়ে বসবে তার ঘাড়ে এই লোক। ঘড়ি থেকে চোখ তুলে সামনে তাকাতেই পরিচিত মুখটা দেখে একগাল হাসল সে। চোখে সানগ্লাস, ইন করা শার্ট। তাইয়ানের থেকে পলক পড়ছে না, সে তো তাইয়ানকে বাচ্চা দেখে এসেছিল, সেই ছেলে কেমন পুরুষ হয়েছে ভাবা যাচ্ছে না। দুই পা এগিয়ে যায় হাসিমুখে, তবে আবার পা থমকায় তার; হাসিমুখটা মিইয়ে মুখে অবিশ্বাস ফোটে, জ্বলে ওঠে চোখের পাপড়িগুলো।

তাইয়ানের সঙ্গে প্রদীপকে কল্পনা করেনি সে। ধীরে ধীরে এবার আগাচ্ছে। হাসিটা প্রসারিত হচ্ছে নিজ থেকেই। হাতের লাগেজ ছেড়ে দিয়ে প্রদীপ বাধাহীন প্রেমিকের মতো প্রথম বারের মতো ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল অন্তিখাকে। ধাক্কার টাল সামলে উঠতে না পেরে পিছিয়ে গেল অন্তিহা, পেছনে সাফওয়ানের মুখাবয়ব রাগের রূপ নিল। জড়িয়ে ধরে আলতো করে প্রদীপ হিসহিস করে বলল,

“সারপ্রাইজ।”

​অন্তিহা তাকে সরিয়ে বুকে দুটো থাপ্পড় দিয়ে বলে,

“শক বলুন বেকুব লোক, এখন যদি স্ট্রোক করে মরে টরে যেতাম?”

​“মরতে না, আমি প্রার্থনা করি তো তোমার দীর্ঘায়ুর।”

​হাসল অন্তিহা। তাইয়ান কাছে আসে। পেছন থেকে সাফওয়ান এসে হুট করে জিজ্ঞেস করে প্রদীপকে উদ্দেশ্য করে,

“এটা আপনার কাজিন?”

​সঙ্গে সঙ্গে তাইয়ান উত্তর করল,

“নো, ওটা ওর ছেলে বেস্টফ্রেন্ড বলা যায়, আমি ওর কাজিন।”

​বলতে বলতে হালকা হাতে জড়িয়ে ধরল সেও অন্তিখাকে। প্রদীপ জড়িয়ে ধরেছে তবে কাজিন নয়, সম্পর্কে কিছু নয়। জানার পর সাফওয়ানের রাগ কি আরও গাঢ় হওয়াটা স্বাভাবিক নয়? তার চেয়ে বড় বিষয় অন্তিহা তাইয়ানের সঙ্গে কথা বলছে না, বললেও ভুল হবে না সে কথা করছে প্রদীপের সঙ্গে। দুটো মানুষের দৃষ্টি ছলছল যেন বহুদিনের জমানো অশ্রু এখনই ঝরিয়ে হাহাকার ছড়িয়ে দেবে দিনের মাঝে। সাফওয়ান এগিয়ে যায়, অন্তিহার বাম হাত ধরে হেঁচকা টানে দূরে সরিয়ে দিয়ে গম্ভীর ক্রূর গলায় বলল,

“চ চলুন মিস।”

​ভ্রু কুঁচকে নিল অন্তিহা, হাত ছাড়িয়ে নেয় মোচড় দিয়ে। আবার এগিয়ে যায় প্রদীপের নিকট। প্রদীপ জিজ্ঞেস করে,

“বয়ফ্রেন্ড?”

​তাচ্ছিল্য করে মাছি ওড়ায় অন্তিহা, ফিক করে হেসে দিয়ে বলে,

“সিরিয়াসলি আপনি এটা জিজ্ঞেস করছেন? আপনি ভালো করে আমাকে চেনেন তবুও?”

​প্রদীপ সাফওয়ানকে আপাদমস্তক দেখে নিল। আগাতে আগাতে ট্যাক্সি নিয়ে নেয় নিজেদের জন্য। ঠোঁট কামড়ে ধরে তাকিয়ে আছে সাফওয়ান প্রদীপের হাতের দিকে। লম্বা লম্বা আঙুলগুলো অন্তিহার লম্বা ড্রেসের একটি কোনা ধরে রেখেছে, এতে শরীরে স্পর্শ না হলেও একে অপরের উপস্থিতি বোঝা সহজ। নাকের নিচ ঘষে ডাকে সে পেছন থেকে,

“মিস গম্ভীর প্লিজ ডিস্টেন্স মেইনটেইন করুন।”

​অন্তিহা নিচের দিকে তাকায়, প্রদীপের পুরোনো স্বভাব এটা, লোকটা বাচ্চামো করে। সে ছাড়িয়ে নিল সাফওয়ানের জন্য নয় কেবল জনসম্মুখে আছে তাই। নিচু গলায় বলে,

“এটা রাস্তা প্রদীপ।”

​“এখানে আমি কিছুই চিনি না, খিদে পেয়েছে, তোমার হাতের খাবার হবে?”

​ঠোঁট প্রসারিত করে হাসল অন্তিহা। যেহেতু নিজ সুবিধার্থে সাফওয়ানকে নিয়ে এসেছে তাই তার গাড়িতেই উঠল দু'জন। তাইয়ান ওর কাছে গাড়িতে লাগেজটি দিয়ে নিচু হয়ে বলল,

“অন্তু তুই যা, আমার একটু কাজ আছে একটু পর ট্যাক্সি করে নেব।”

​“কোথায় চিনিস কিছু?”

​তাইয়ান ভাবান্তর হয়, পরক্ষণেই একটু হেসে বলে,

“চিনিয়ে দেয়ার লোক আছে বেইবি, তোরা যা এক ঘণ্টা পর আসব।”

​আর কথা বলার প্রয়োজন হলো না। সাফওয়ান ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল। সিটে বসে হতবুদ্ধির মতো পেছন ফিরে তাকায়, অন্তিহা প্রদীপ একসঙ্গে বসেছে। আর অন্তিহা হেসে হেসে একটা বক্স খুলছে। নড়েচড়ে বসে বলে ওঠে,

“অন্তিহা ওখানে বসেছেন কেন? আমাকে ড্রাইভার মনে হয়?”

​“ সে জন্যই তো ট্যাক্সি নিয়েছিলাম। সমস্যা হলে নেমে যাই?!”

​থমথমে মুখে তাকায় সাফওয়ান। গাড়িতে আছে ঠিক আছে, দেখবে এরা কি করে। সম্পর্ক কেমন? কিন্তু আলাদা চলে গেলে তার মিস গম্ভীরকে এই ছেলে টাচ করলেও জানবে না। তাই কথা বাড়াল না, চুপ করে গাড়ি স্টার্ট দেয়। বক্স থেকে খাবার প্রদীপের দিকে এগিয়ে দেয়, তৃপ্ত হাসে ছেলেটা, কপালে লাল ছোট তিলকটা এখনো একটু একটু আছে, হয়ত তার মা করে দিয়েছিল। হাত দিয়ে মুখে খাবার তুলে নেয় সে। কণ্ঠ দলা পাকিয়ে আসছে, ঘাড় তুলে ভাঙা গলায় বলে,

“খুব মিস করেছি তোমাকে আমি।”

​ফোস করে শ্বাস নিল অন্তিহা, মুখাবয়বে বিরক্তি প্রকাশ করে বলে,

“চুপচাপ খান, এতদিন পর দেখেও আপনার ঢং কমেনি।”

​“তুমি খাও?”

​“আমার পেট ভরা আর হাতও আছে।”

​প্রদীপ নিজ হাত বাড়িয়েছিল তার দিকে, তবে মেয়েটার এমন রাগ নিয়ে উত্তর দেওয়ার স্বভাবটা যায়নি একটুও, তাই আর জ্বালাল না আজ, খেয়ে নিল চুপচাপ। লুকিংগ্লাসে তাঁদের দেখছে সাফওয়ান। অন্তিহার মুখটা অন্য রকম লাগছে যেন গাম্ভীর্যে লুকানো হাসি, যা কখনই প্রকাশ করে না অন্তিহা। প্রদীপ মুখে সামান্য পানি নিতেই গাড়িটা আচানক ঝাঁকি খায়। বোতলটা নিচে পড়ে দরজার সঙ্গে বাড়ি খেল তার মুখ, চিরিৎ করে রক্ত ছিটকে পড়ে গাড়িতে। সাফওয়ান চিন্তিত হয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,

“শিট, গাড়িতে স্ক্রেচ পড়ল নাতো?”

​অন্তিহা এগিয়ে যায় প্রদীপের কাছে, নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে। সাফওয়ানের দিকে তাকায় এক পলক, নির্বাক লোকটার ঠোঁটে ভয়ানক একচিলতে হাসি দেখেও যেন অদেখাই রয়ে গেল। সে প্রদীপের নাকে টিস্যু চেপে ধরে ধমকায়,

“উফফ প্রদীপ আপনি এত কোনায় কেন বসেছেন? ব্যথা হচ্ছে নিশ্চয়ই?”

​সাফওয়ান লুকিংগ্লাসে তখনো তাদের দেখছে, ঠোঁট কামড়ে রাগ নিবারণ করছে। অন্তিহা তাকে শাসিয়ে বলল,

“আপনি চান আমরা নেমে যাই? আমি আপনার এসব ট্রিকস ভালো বুঝি।”

​“আমি চাই আপনি আমার পাশে এসে বসুন।”

​“ নেমে যাব তবুও বসব না অসভ্য।”

​“ উপস সুইটি।”

​কথাটা অন্তিহার মুখ থেকে বের হওয়ার অপেক্ষাই যেন ছিল সাফওয়ান। গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে স্পিড বাড়ায়, বাতাসে উড়ে যাচ্ছে চুল, চোখ খোলা যাচ্ছে না। চোখ বুজে ভয় কাটাতে ব্যর্থ হচ্ছে অন্তিহা, সামনে অন্য একটি গাড়ি দেখেও স্পিড সামান্য কমাচ্ছে না সে। গাড়ির সঙ্গে অপর গাড়ির সংঘর্ষ হওয়ার আগমুহূর্তে প্রদীপ চেপে ধরল অন্তিহার হাত। এতে যেন সাফওয়ানের রাগ আরও বাড়ছে, সে স্পিড বাড়িয়ে দেয়, চেঁচিয়ে ওঠে অন্তিহা,

“সাফওয়ান স্টপ।”

____

​নীরব কক্ষ, কম্ফোর্টারের ভেতরে অহীনের বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে আশা, কক্ষ জুড়ে তার গভীর শ্বাসপ্রশ্বাসের ধ্বনি। সন্দিহান মনে সে গভীর ভাবনায় মগ্ন, অহীনের আচরণ অদ্ভুত। যেই ছেলে একটু পরপর কাছে আসার জন্য মরিয়া হয়ে থাকত, আজ আশা সুযোগ দেওয়ার পরেও কেমন চুপসে আছে, প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। ডান হাতের তালুতে ভর দিয়ে উঁচু হয়ে অহীনের দিকে তাকাল সে। সিলিংয়ের দিকে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে, বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে, চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে সব। আশা আবারও নিজ থেকে এগিয়ে হাতের তর্জনী দিয়ে অহীনের ঠোঁটে হাত বুলিয়ে দেয়। চোখ বুজে নিল অহীন, ঠোঁট বুলিয়ে হাতের ছোঁয়া নিচের দিকে অগ্রগতি হচ্ছে। গলায় এসে থামতেই আলতো করে চুমু খায় আশা, ধীরে ধীরে আরও নিচের দিকে নামছে সে। চোখ বুজে অনুভব করছে অহীন আশার ছোঁয়া। সে এত সময় অনেক কিছুই করেছে, তবে নিজের স্বার্থ বা তৃপ্তির আশায় নয়, সব ছিল আশার; নিজেকে থামিয়ে রাখছিল যাতে কষ্ট না হয় বউটার। হাতের ছোঁয়া অপ্রকাশিত স্থানে যাওয়ার আগেই খপ করে হাত থামিয়ে আশাকে উল্টে দিয়ে ওর গায়ের ওপর চড়ে বসে অহীন। ফিচলে হাসে মেয়েটি। অহীন ঝুঁকে ওর কানের কাছে গিয়ে নেশালো গলায় হিসহিস করে জিজ্ঞেস করে,

“You're not done?”

​শ্বাসের শব্দ কানের কাছে আসছে তার, ওর গলা পেঁচিয়ে ধরল আশা, উত্তর না দিয়ে পাল্টা জিজ্ঞেস করে,

“তোমার কি মন খারাপ বা কিছু নিয়ে চিন্তিত?”

​“তুই আছিস সঙ্গে, চিন্তা কাকে নিয়ে করব? হুম?”

​“তাহলে এমন করে দূরে সরে থাকো কেন?”

​ফিক করে হাসে অহীন, সরে গিয়ে ওর পাশে শুয়ে পড়ে, ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলে,

“একটু আগের কথা ভুলে গিয়েছিস সোনা? আমার হাত…”

​“বাট আই ওয়ান্ট ইউর…।”

​“হোয়াট?”

​আশা বলতে বলতে থামতেই অহীন মুহূর্তকাল সময় না নিয়েই জিজ্ঞেস করে, এতে লজ্জায় মুখ লুকায় আশা। লজ্জানত মুখের দিকে তাকিয়ে অহীন বলল,

“বারবার তোর পেটে ব্যথা হয়, হসপিটাল যেতে হয়। এতে তোর কষ্ট বাড়ে। আপাতত নিজেকে বোঝাচ্ছি শেখাচ্ছি কিভাবে নরমাল হওয়া যায়। বারবার ক্ষতিপূরণ দেওয়া সহজ নয়। একটু ঘুমা এখন, ক্লান্ত না তুই?”

​বিছানা থেকে নেমে গেল সে। পরনের প্যান্টটি কোমরের নিচে নেমে আছে, আর একটু নামলেই হয়ত স্বাধীনতা হয়ে যাবে, তাকিয়ে আছে আশা সেদিকে। নিজের গায়ের কম্ফোর্টারটা সরিয়ে দিল এক টানে, বিছানায় পড়ে থাকা অহীনের শার্ট গায়ে জড়িয়ে সেও বাথরুমের দিকে আগায়। হালকা ভেজানো দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল সে। অহীন শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে আছে চোখ বন্ধ করে, পিঠ গড়িয়ে পানির ধারা বইছে। আশা এগিয়ে যায়, আলতো করে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরতেই ভেজা পাপড়িগুলো মেলে অহীন। হাতের সাহায্যে মুখের পানি মুছে আশার দিকে ফেরে। তার বিশাল দেহের আড়ালে মেয়েটা ভিজে যায়নি সম্পূর্ণ তবুও কাকভেজা হয়েছে। অহীন মৃদু হেসে বলে,

“আবার কি?”

​“তুমি।”

​ফিক করে হেসে আশাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে, ঝুঁকে ঠোঁটে ঠোঁট বসায়, এলোমেলো ভঙ্গিতে হাত চালিয়ে যাচ্ছে। বারবার নিজের শান্তির আশায় হাতটা তীব্রভাবে হিংস্র করে তুলছে, আবার আশার কথা ভেবে নিজেকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা, দ্বন্দ্বে পুড়ে ছারখার তার শরীর। বক্ষঃস্থলে আশার মাথা চেপে ধরে বাঁ হাত তখনের মতো আগাতে নিলে আশা ধরে আটকে দেয়। চোখ রাখে অহীন আশার চোখে। প্রতিটা শ্বাস-প্রশ্বাস ঘন তাদের, ঠান্ডা পানি গায়ে লাগতেই বাষ্প হয়ে উড়ছে। দেয়ালগুলো ঘোলা হয়ে আছে, দুই পাশে হাত রেখে গভীর ঘোরলাগা গলায় বলল,

“অদ্ভুত আচরণ করছিস! সবে বললি আমাকে চাস, এখন কি সমস্যা?”

[প্রাইভেট গ্রুপে বাকি অংশ https://www.facebook.com/share/p/18Vkq9nU2z/ ]

​ফ্রান্সের আকাশে রাত নেমেছে, স্থির গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে সাফওয়ান। পাশেই অন্তিহা বসে আছে গম্ভীর গোমড়া মুখে। হোস্টেলের সামনে এসে গাড়ি থামতেই নিজে নিজে তৎক্ষণাৎ নেমে যায় গাড়ি থেকে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাফওয়ানও নেমে আসে। অন্তিহা চলে যেতে নিলে হেঁচকা টানে গাড়ির সঙ্গে চেপে ধরে, ঠোঁটের কোণে রহস্যময় কপট হাসি। অন্তিহা তাকে সজোরে ধাক্কা দিতেই কয়েক পা পিছিয়ে যায়, একটু দূরে গিয়ে আবারও কাছে চলে আসে, এবার বাহু চেপে ধরে,

“আপনাকে আমি স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছি তার মানে দাঁড়ায় আপনি নিজেকে আমার জন্য প্রস্তুত করুন। নাকি যার তার বুকে ঢলে পড়বেন?”

​“হাউ ডেয়ার টু টাচ মি সাফওয়ান? স্বাধীনতা দিয়েছেন মানে? আমি আপনার বন্দিনী?”

​“আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না অন্য কাউকে আপনার শরীরে স্পর্শ করতে দেখলে।”

​রাগে গিজগিজ করে ওঠে অন্তিহার শরীর, মুহূর্তের মধ্যে ঠাস করে ওর গালে থাপ্পড় দিল অন্তিহা, সঙ্গেই হুঙ্কার ছাড়ে,

“তার মানে প্রদীপকে ইচ্ছাকৃত ভাবে আঘাত করেছেন?”

​“ইয়েস, আমি জেলাস ছিলাম, কারণ আপনি আমার থেকে বেশি ওর সঙ্গে খুশি ছিলেন।”

​“বাস্টার্ড, সামনে আসবেন না আমার।”

​“কোথায় যাব আপনাকে ছেড়ে অন্তিহা? মেরে ফেলতে চান?”

​“মরেই যান প্লিজ, প্রদীপ আমার প্রতি দুর্বল এটা সত্যি। কিন্তু সে সমান ভাবেই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। সে আমাকে বোঝে, আমার বলতে হয় না। সে আমাকে শুনতে পছন্দ করে। আপনি চান আমি হাসা বন্ধ করে দেই?”

​সাফওয়ান মলিন হয়, বাচ্চাদের মতো কম্পিত হয় তার কণ্ঠ,

“আমি আছি তো, আমাকে বলবেন, সারাদিন শুনব। আমার কাজ করতে হয় না, ফান্ডের টাকা আছে প্রতি মাসে। আপনার সঙ্গ ছাড়ব না। আমি হব আপনার পারফেক্ট লিসেনার।”

​বিরক্তি নিয়ে সরিয়ে দিল তাকে অন্তিহা,

“আপনি হবেন? আপনি আজকে যা করলেন তারপর আপনাকে নিজের পার্সোনাল কথা বলতে আমার রুহ কাঁপবে না? আপনি আমাকে হুমকি দেননি মার্ডারের?”

​ঢোক গেলে সাফওয়ান, সে শুনতে চায় অন্তিহাকে, কিন্তু সে মানতে চায় না এই মেয়ের মনে অন্য কারো স্থান। বিরক্তি ও রাগ নিয়ে অন্তিহা করুণ হয়ে বলে,

“ প্রদীপের ক্ষতি করবেন না, ওনাকে আমি ভালোবাসি না। অহেতুক আমার একজন শুভাকাঙ্ক্ষীর ক্ষতি করে আমাকে গিল্ট ফিল করিয়ে দিয়েন না প্লিজ।”

----

​বরাবরই রাত-বিরেতে পার্টি করার স্বভাব জেসির, মা-বাবার দেওয়া স্বাধীনতাগুলো উপভোগ করেছে সে। তবে খারাপ কোনো রিপোর্ট নেই। ফ্রেন্ডদের সঙ্গে ড্রিংক করা, ড্যান্স করাতে সীমাবদ্ধ সে। অতিরিক্ত ড্রিংক করে মাঝরাস্তা দিয়ে হেলেদুলে যাচ্ছে সে, কান্না করছে কোনো এক অজানা কারণে। রাস্তার পাশে গ্রিন সিগন্যাল রেড হতেও দেখল সে। মাঝরাস্তায় আসতেই একটি ধূসর গাড়ি তার দিকে এগিয়ে আসে। ভয় পেল না মেয়েটা, চোখ ঢেকে নিল। গাড়িটি তাকে ছুঁয়ে যাওয়ার আগেই থামে। তড়িঘড়ি করে গাড়ি থেকে নেমে আসে পরিপাটি একটি মানুষের অবয়ব। ঘোলাটে চোখে মনে হচ্ছে যম তাকে নিতে এসেছে, মাথাটা চক্কর দিয়ে মানুষটার গায়ের ওপর হেলে পড়ল, চোখ বুজে রেখেই বিড়বিড় করে খিকখিক করে হেসে দিয়ে বলে,

“যম বুঝি এত হ্যান্ডসাম হয়? তাহলে আমি তার গলায় ঝুলে থাকব, যখন মন চায় মারবে তখন আমি আপনাকে দেখব।” (ফরাসিতে)

​লোকটা তাকে তুলে কয়েকবার ঝাঁকি দিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,

“স্টুপিড গার্ল, মরলে অন্য কারো গাড়ির নিচে গিয়ে মরো। তুমি জানো আমার গাড়ির নিচে মরলে তাতে ঠিক কতটা ব্যাকটেরিয়া লাগবে? আমার পুরো গাড়ি চেঞ্জ করতে হবে।”

​“আয়ুশশশশশ।”

​নেশায় বুদ হয়ে পড়ে থাকা মেয়েটির কণ্ঠ চিনতে ভুল হলো না একটুও। আয়াশ তাকে দূরে ঠেলে দিয়ে নিজে গাড়ির দিকে গিয়ে দরজা খুলতেই জেসি সেখানে চলে আসে। গাড়ির দরজা ধাক্কা দিয়ে বন্ধ করে দিয়ে আয়াশের কলার চেপে ধরে গর্জে ওঠে চিৎকার দিয়ে, ফাঁকা রাস্তায় বারবার বেজে ওঠে সেই স্বর,

“যদি আমাকে তুমি ছেড়েই যাবে তাহলে কেন এসেছ আমার জীবনে বাস্টার্ড? আমার ফিলিংস নিয়ে খেলার সাহস কে দিয়েছে তোমাকে? মম ড্যাডের একমাত্র আদুরে আমি, আর তুমি আমাকে কিভাবে এভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে পারো? এ কেমন ভালোবাসা?”

​“হোয়াট দ্যা ফাক জেসি! আর ইউ লস্ট ইয়োর মাইন্ড? কি বলছ? স্টে অ্যাওয়ে ফ্রম মি।”

​হিসহিস করে হেসে দেয় জেসি, তাকে ছেড়ে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলে,

“আচ্ছা। তুমি ভালোবাসো না আমায়? ঠিক আছে আমি যা ইচ্ছে হবে আজ তাই করব। সকালেই তোমাকে ডিভোর্স দেব।”

​হাতের মধ্যমা দেখিয়ে জেসি ফের ক্লাবের দিকে আগাচ্ছে। কয়েকটা ছেলের সঙ্গে ধাক্কা খেতেই আয়াশের মায়া হলো। পাগল মেয়েটা, একে গাড়িতে তোলা যাবে না কিন্তু এতগুলো ছেলের মাঝে ছেড়ে যাওয়া ঠিক হবে না। একটি ছেলের গায়ে হাত দিয়ে সে আয়াশকে দেখিয়ে বলে,

“হি ইজ মাই হাজব্যান্ড, কিচ্ছু পারে না, Can you guys please help teach him today?”

​ছেলেগুলো লোভাতুর হয়ে হাসে, জেসিকে ধরতে যাবে,

“ইয়েস বেইব, হোয়াই নট?”

​আয়াশ ছোঁ মেরে টান দেয় তার হাতে, গাড়ির দিকে আগাচ্ছে, লোকগুলো তাকিয়ে আছে পেছন থেকে। জেসিকে গাড়ির ব্যাক সিটে ধাক্কা দিয়ে ফেলে ধমকে ওঠে,

“এই মেয়ে, কে তোমার হাজব্যান্ড?”

​“তুমি, আমাদের তো বিয়ে হলো। কি ভেবেছ ড্রাঙ্ক জেসি সব ভুলে গিয়েছে? আমার সব মনে আছে, ফোর্স করেছ তুমি, কেস করে দেব তোমার নামে।”

​ঠাস করে গাড়ির দরজা বন্ধ করে দিল আয়াশ, নিজে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসে। মেয়েটা ততক্ষণে শুয়ে চোখ বুজে নিয়েছে, বিড়বিড় করে বলছে কিছু একটা। মৃদু হেসে গাড়ি স্টার্ট দিল সে। স্টিয়ারিং ঘোরাতেই সামনে হালকা আলোর সঙ্গে কালো অবয়ব দেখে গাড়িটা থামিয়ে দেয় আবার।

---

​সময়ের স্রোত শেষ হয়ে ঘণ্টা পার হতেই অহীন আশার বুকে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। চোখে ঘুম নেমেছে খুব। হাসিমুখে আশার দিকে তাকায় সে, নাকের পানি চোখের পানি এক করেছে মেয়েটা। মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল,

“আর উস্কানি দিবি আমাকে?”

​মাথা দুলিয়ে হ্যাঁ সূচকে উত্তর করল আশা। খিক করে হাসল অহীন,

“পাগলি।”

​দরজায় কলিং বেল বাজে। অহীন শোয়া থেকে উঠে গায়ে একটি টিশার্ট জড়িয়ে নিল। রুমের দরজা লক করে গিয়ে মেইন দরজা খুলে দিল। তাইয়ান এসেছে, বাসায় প্রবেশ করতে করতে বলছে,

“আশা কোথায়?”

​“ঘুমাচ্ছে।”

​“এখন?”

​“যখন ইচ্ছে ঘুমাবে, তোর কি?”

​“কিছু না।”

​তাইয়ান স্থির হতেই অহীন হাতের একটি রুমের দিকে ইশারা করে, তাইয়ান সেই রুমে প্রবেশ করল। অহীন নিজ কক্ষে গিয়ে আবারও টিশার্ট খুলে আশার পাশে বসে, সন্দিহান হয়ে চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করে,

“পেট ব্যথা করে পাখি?”

​“উহু।”

​কম্ফোর্টারের টা একটু উঁচু করে দেখল অহীন, নাহ আজকে কোনো সমস্যা এখনো তাহলে হয়নি, মানিয়ে যাচ্ছে এসব আশার শরীরের সঙ্গে। সুস্থির শ্বাস নিয়ে বাথরুমে প্রবেশ করে সে। সে চলে যেতেই পেটে হাত দিয়ে বেচারি ‘আহ’ বলে গুঙিয়ে কাতরে ওঠে, মোচড়ে গুলিয়ে আসছে তার পেট। কাত হয়ে গুটিশুটি মেরে চোখ বন্ধ করে নিল আজকে সে। অহীন অনেকট সময় নিয়ে বের হয়ে আসে, আশাকে গুটিশুটি হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে ভয়ে ভ্রু কুঁচকে নিল। এগিয়ে যায়, তার গায়ে হাত দিয়ে দেখে গা শরীর শীতল। সন্দিহান নেত্রে ঢোক গিলে কম্ফোর্টারটা এক টানে সরিয়ে দিল আশার শরীর থেকে। বিছানার দিকে তাকিয়ে নিজেকে আস্থা দিয়ে শ্বাস নেয়। সঙ্গে সঙ্গে নড়েচড়ে বিরক্তি নিয়ে আশা কম্ফোর্টারটা আবার টেনে নিল নিজের গায়ে, গুঙিয়ে ওঠে,

“উসস, বিরক্ত করছ কেন?”

​ফিক করে হেসে দিল অহীন, আশা আর অচেতন হয়নি, ভালো লাগছে। কোমরে পেঁচানো তোয়ালের গিট ফেলে নিজেও আশার গায়ের সঙ্গে লেপ্টে শুয়ে পড়ে। তার এমন হঠাৎ ভেজা অপ্রত্যাশিত স্পর্শে কম্পিত হয় ছোট নারীদেহ। হাতটি উদরে ছুঁইয়ে বুলিয়ে দিচ্ছে বারবার, তলপেটে আবারও আশার প্রজাপতিরা ডানা ঝাপটাচ্ছে, তবে এবার সে শান্ত; বারবার আগ বাড়িয়ে কষ্ট নেওয়ার মেয়ে তো নয়। অহীন তাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করে,

“পেটে ব্যথা আছে সোনা?”

​সম্পূর্ণ তার দিকে ফিরে গলায় মুখ দিয়ে দুই হাতে পেঁচিয়ে নিল আশা, মাথা দুই পাশে দুলিয়ে না-সূচক সম্মতি দিতেই মুচকি হাসে অহীন। পেটের গুড়গুড় শব্দ হতেই আশার মুখ নিজের দিকে করে,

“জান, বাচ্চাটার খিদে পেয়েছে?”

​এতটা আদুরে ডাক? মাথা দুলিয়ে উত্তর করে,

“সকাল থেকে আমরা বেডরুমে, এখন রাত বেইবি। সরো।”

​শোয়া থেকে উঠে বসতেই যাবে, কোমরের অজস্র ব্যথায় ধপ করে আবার শুয়ে পড়ে। ঠোঁট টিপে হাসে অহীন, চোখ টিপে বলে,

“সোনা উঠতে পারছ না? হোয়াট হ্যাপেন্ড? আর ইউ ওকে?”

​কাত হয়ে নিজের কোমরের দিকে ইশারা করল সে, আঙুলের সাহায্যে স্লাইড করতেই আশা বিড়বিড় করে বলে,

“আম নট ওকে, ব্যথা।”

​বিছানা থেকে নেমে তোয়ালে জড়িয়ে বের হলো অহীন। ড্রয়িংরুম সহ পুরো বাসা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে আছে। খাবার নিয়ে রুমে ঢুকে আবার দরজা ভিড়িয়ে দিল সে। বিছানায় রেখে আশাকে সযত্নে খাওয়াতেও ভুলল না, মেয়েটা ভীষণ কষ্টে বসে আছে। খাবার শেষ করে উঠতে নিলে আশা জিজ্ঞেস করে,

“তুমি খাবে না?”

​প্রত্যুত্তরে বাঁকা হাসে অহীন, প্লেট রেখে এসে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেয়। আশার দিকে আগাতে দেখে শুকনো ঢোক গিলে আশা। অহীনের চোখের রঙ পাল্টে গিয়েছে মানে কিছু তো চায় তার থেকে। কম্পিত গলায় বলে আশা,

“এই অবেলায় আরও ঘুমাবে? খাবার খেলে না তো।”

​"I want to taste something else. আজ রাতে আমি একদম ঘুমাচ্ছি না।”

​অহীন কাছে এসে সরিয়ে দিল আশার শরীর ঢেকে রাখা সামান্য কাপড়টুকু, পিঠে আলতো করে চুমু দিয়ে কোমরে হাত বুলিয়ে দিতেই আশা বড় বড় চোখে তাকায়, ঝটকায় সরে যেতে চায় তার থেকে, রাগ ও ভয়ে গিজগিজ করে ওঠে,

“মেরে ফেলতে চাও?”

​“তোকে মেরে ফেললে আদর কাকে করব জান? কথা শোন আমার।”

​“তুমি কত বড় হারামি ছিঃ।”

​“আরও দেখবি শুধু সময় যাক, আমি অনেক কিছু চাই তোর থেকে।”

​আবারও টেনে আনে নিজের কাছে, এবার আশার ছটফটানি কাজে দিল না, ফলে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে অহীনের হাতে দাঁত বসিয়ে দিল আশা। চোখ ঘোলা হয়ে আসছে, অন্ধকার পুরোটা পৃথিবী। টপটপ করে কার্নিশ বেয়ে পানির ধারা বইছে। অহীন আশাকে আবার নতুন অনুভূতির সঙ্গে নিজের করছে, কি আছে এই নারীদেহে হাজার রকম ভাবে নতুন করে পাওয়ার কামনা! আর সে চায় তার পেঁচিকে সব ভাবে ভালোবাসতে যাতে কোনো এক সময় আফসোস না হয় পাওয়াগুলো থেকে বঞ্চিত হওয়ার। দাঁতের চাপে হাত অবশ হয়ে আসছে তবুও আশা ছাড়ছে না, আর হাতের সামান্য ব্যথাকে কোনো গুরুত্বই অহীন দিচ্ছে না। হাতের ওপর গুরুত্ব দিতে গেলে নিজের অনেক কিছুই মিস করতে হবে যে।

চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন