ফন্ট সাইজ:
থিম:
দূরত্বের প্রণয় ২

৪২তম পর্ব

লেখক: স্বর্ণালী ইসলাম

#দূরত্বের_প্রণয়_২

#স্বর্ণালী_ইসলাম

পর্বঃ৪২

দিন কাটছে খুবই দ্রুত তবে সুন্দর একদমই পরিপাটিভাবে। রোজ সকালে কাজে গিয়ে রাতে একরাশ ক্লান্তির সঙ্গে আশাকে জড়িয়ে ধরাই কি অহীনের শখ ছিল না? তবে পরিবর্তন ঘটেছে সকালবেলা আশার নিয়মের। শরীরের অসহ্য ব্যথায় কোনদিনই অহীনকে দরজা পর্যন্ত দিয়ে আসা সম্ভব হয় না। এ নিয়ে মেয়েটা ভীষণ কাবঝাপ করে। তবুও নিজের মাঝের দ্বন্দ্ব থেকে ফিরতে পারে না অহীন। অস্বাভাবিকভাবে আশাকে বারবার চায়। সকাল ১০টা। আজ লেট হয়েছে ঘুম থেকে উঠতে অহীনের, তড়িঘড়ি করে রেডি হচ্ছে সে, আর আশা ঘুমিয়ে আছে। তৈরি হয়ে প্রেয়সীর ললাটে আলতো চুমু খেয়ে আস্তে করে ডেকে দিল সে,

“বের হলাম সোনা, উঠে নাস্তা খেয়ে নিস।”

​ঘুমো ঘুমো গলায় বিড়বিড় করে আশা,

“তুমি খাবে না?”

​“মাম্মাম দোকানে পাঠাবে পাপিকে দিয়ে খাবার, খেয়ে নেব। তুই বেলা করিস না অসুস্থ হয়ে যাবি।”

​তাড়াহুড়ো করেই বের হলো বাসা থেকে। নিস্তব্ধতা ছড়াতেই মেয়েটি আড়মোড়া ভেঙে ঘুম থেকে ওঠে। বিছানা থেকে নেমে খুঁড়িয়ে হাঁটছে, পেট চেপে ধরে রেখে প্রচণ্ড ব্যথা হয় রোজ সকালে। ফ্রেশ হয়ে এসে রুমের দরজা খুলতেই থ বনে তাকিয়ে রইল কিছুটা সময়। শর্ট ড্রেসের জেসি কোমরে রঙিন অ্যাপ্রন পরে টেবিলে নাস্তা সাজাচ্ছে। বিস্ময় নিয়ে এগিয়ে যায় সে। টিভির সামনে হাতে ব্রেড নিয়ে বসে আছে তাইয়ান, আড়চোখে আশাকে দেখে নির্লিপ্ত হয়ে টিভিতে আবার মন দিল। আশা অপ্রস্তুত হয়ে মেকি হেসে কাছে গিয়ে জেসিকে জিজ্ঞেস করে,

“আমার বাড়িতে রান্না করছো তুমি?”

​“হুম কেমন আছো ভাবি? এমনি তোমরা অনেক দিন পর এসেছো ভাবলাম দেখা করে যাই। তাইয়ান বলল তুমি সকালে উঠতে পারো না তাই হালকা নাস্তা বানালাম বসো।”

​জেসির হাসি মুখে মিষ্টি কথা শুনে আশা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে হাসে, তাইয়ানের দিকে তাকায়, এদিকে ছেলেটার কান নেই। সত্যি কথা ও মেশার দিক দিয়ে তাইয়ানের অবদান খুবই কম। হালকা নাস্তার কথা বলেছিল তবে টেবিল দেখে মনে হচ্ছে পুরোটা দিন আর রান্নার ধারেও যেতে হবে না তার। আশা বসে তার সামনে, লজ্জা হচ্ছে খুব কেননা চেয়ারে বসা তার জন্য প্রচুর বিপত্তিকর। অধিকাংশ সময় বিছানায় বসতে হয়।

মেকি হেসে অপ্রস্তুত গলায় সে বলল,

“আমি ভালো আছি তুমি?”

​“আর ভালো থাকা? তোমার জন্য আমার জীবনে যা বিপদ আসলো তা বলার মতন নয়।”

​আশা মলিন হয় একটু, তার কথারা কি খোঁচা দিয়ে বলল? না হয়তো এমনি বলেছে, পেছন থেকে তাইয়ান ডেকে ওঠে,

“হেই লিলিপুট আমার জন্য প্লিজ এক কাপ চা করে দিও। দোয়া করব লম্বা হবে খুবই জলদি।”

​ভড়কায় জেসি, রাগে হাঁসফাঁস করে ওঠে,

“এই ছেলে তোমাকে বলেছি না? আমাকে আপনি বলবে? বেয়াদব একটা বড়দের সম্মান করতে শেখোনি? আমাকে দেখো কত সুন্দর করে আশাকে সম্মান করি আমি।”

​তাইয়ান রিমোট রেখে উঠে আশার পাশে এসে বসে,

“তোমার ছেলে যেদিন আমার কাঁধ পর্যন্ত উঁচু হবে সেদিন তোমাকে আপনি বলে ডাকব। সম্মানিতা।”

​“ছেলে কোথায় পেলে তুমি?”

​“কেনো তুমি সারাজীবন এভাবেই থাকবে? বিয়ে আর বেবি নেবে না? শোনো অল্প বয়সে বিয়ে করা ও বাচ্চা নেয়া ভালো জানো না?”

​“উফফ থাম তোরা, আগে বিয়ে কর তারপর এ ওর কাঁধ বরাবর বাবু নিস।”

​জেসি গাল বাঁকায়, তাইয়ানের সামনে চায়ের কাপ রাখে ধপ করে। তাইয়ান ওটা মুখে দিয়ে আশার দিকে তাকায়। মেয়েটা গুমরো মুখ করে আছে, জেসিকে পছন্দ করছে না মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। গলা খাঁকারি দিয়ে সে জিজ্ঞেস করে,

“আশু আজকেও অসুস্থ তুই? ডাক্তার দেখাস না কেনো?”

​ভ্রু কুঁচকে নিল আশা, দাঁতে দাঁত পিসে বসা থেকে উঠেই গালি দিয়ে ওঠে,

“ছাগল।”

​হতবাক নেত্রে আশার দিকে তাকায় সে, আশার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটাকে এখানে এসে একটি দিনও সুস্থ সে দেখেনি। বোনের জন্য মায়া হয় আফসোসও হয় অহীনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে। বোনটাকে ডাক্তার দেখাতে এত কিসের ভাবনা অহীনের জানে না। জেসি বসা থেকে উঠে প্রস্থান করে সেখান থেকে, অদ্ভুতভাবে তার চলন অনেকটা আশার মতোই, তবে আশার চেয়ে সুস্থ জেসি। পেছন থেকে সে ডেকে ওঠে,

“জেসি তুমিও হাঁটতে পারছ না আশার মতো লাগছে! তুমিও অসুস্থ?”

​ভ্রু কুঁচকে তাকায় সে, পেছনে হাতের কাছে থাকা একটি বোতল তাইয়ানের দিকে ছুঁড়ে মারল সে,

“বেয়াদব।”

​বেচারা সরে গিয়েছে নয়তো ঠিক মাথাটা আজ ফুলে বালিশ হতো। তবে অজানা এক বেকুবির মতোই আছে। দুই পাশ থেকে বকা খেয়ে নিজেকে অসহায় লাগছে, ঠোঁট উল্টায় সে।

_____

​আনমনা হয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটছে জেসি, স্বল্প তাড়াহুড়ো তার, কাঁধে ব্যাগটি সব সময়ের মতোই ঝুলছে, রাস্তার মাঝে এসে গ্রিন সিগনালের দিকে তাকিয়ে রোড পার হতেই সামনে এসে আয়াশের গাড়ি থামে, ছেলেটা ভীষণ গম্ভীর মুখে তার পানে তাকিয়েছে। স্বল্প ভয়ার্ত চোখে তাকায় জেসি তার দিকে। এর আগে কখনই আয়াশকে সে ভয় পায়নি, ঢোক গিলে নেওয়ার সুযোগটুকু পেল না মেয়েটি, ধমকে ওঠে আয়াশ,

“স্টুপিড গাড়িতে ওঠো।”

​তৎক্ষণাৎ গাড়িতে উঠে বসল সে, চোখের পাতা ঝাপটাচ্ছে যেন, যেন চোখ মেলাতেও দ্বিধায় ভুগছে মেয়েটি। আজ আর বাচ্চামো নেই। কম্পিত গলায় বলতেই যাবে কিছু কথা তার আগেই আয়াশ গাড়ি টান দিল সেখান থেকে।

​গাছের ডাল থেকে ঝরে একটি শুকনো পাতা এসে অন্তিহার কাঁধে পড়ে, নির্বাক চোখে দূর থেকে আয়াশের গাড়িটির দিকে তাকিয়ে আছে সে। তবে তার একাকী শোক করার দিন কি আছে? কোথা থেকে হুট করে ঝাঁপিয়ে পড়ল সাফওয়ান, কাঁধে হাত পড়তেই ভাবনারত মেয়েটি থতমত খেয়ে বুকে ফুঁ দেয়। সাফওয়ান হাসছে ওর দিকে তাকিয়ে,

“মিস ভয় পেলেন?”

​“আপনার মতো একটা জিরাফ এমন মাঝ রাস্তায় সামনে চলে আসলে নরমাল মানুষ ভয় পাবে না?”

​অন্তিহার ক্রূর শব্দ শুনে, মাথা চুলকে নিল সাফওয়ান মুখাবয়ব ভাবান্তর করে বলে ওঠে,

“তা ঠিক কিন্তু এখানে নরমালটা কে?”

​ওর কথায় ক্রুদ্ধ শ্বাস ফেলে বড় বড় পা রেখে হাঁটছে অন্তিহা, সামনেই লাইব্রেরিতে যাবে, লাইব্রেরির সামনে একটি বই হাতে দাঁড়িয়ে আছে প্রদীপ যাকে দেখে ক্রূরভাবে তাচ্ছিল্য হাসে সাফওয়ান। অন্তিহার প্রাইভেসিতে সম্পূর্ণ হস্তক্ষেপ সাফওয়ানের, কখন কোথায় কার সঙ্গে যাচ্ছে প্রতিটা জিনিসের খোঁজ রাখে, খোঁজ রাখে বললে ভুল হবে নিজেই দেখে। সাফওয়ান কি কোনো পাগল প্রেমিক নাকি তার দেহরক্ষী মাঝেমধ্যে সন্দেহ লাগে খুব। লাইব্রেরির ভেতরে গিয়ে অন্তিহা মাঝে আর মুখোমুখিভাবে প্রদীপ ও সাফওয়ান বসেছে। প্রদীপের চোখ তার দিকে নেই ছেলেটার মনোযোগ অন্তিহাতেই। কাঁধের ব্যাগ থেকে কিছু বই বের করছে সে, অন্তিহা অবাক বিস্ময়ের চোখে তাকিয়ে আছে, মেয়েটাকে খুশি দেখে প্রদীপ উৎসুক হয়ে বলে,

“তোমার উইশলিস্টের সবগুলো। শেষে মানি প্রবলেমের জন্য আরো অনেকগুলো আনি নি।”

​সবগুলো বই একত্রে করে নাক দিয়ে শুঁকছে অন্তিহা, বুকের মধ্যে নিয়ে মাথা রেখে হেসে হেসে বলছে,

“এসব কেনো আনতে গেলেন প্রদীপ এখানেও পাওয়া যেত। কত কষ্ট করতে হয়েছে আপনার।”

​“নিজে এনে না দিলে তোমাকে এভাবে হাসতে দেখতাম? তোমার হাসি যে ডাইনোসরের চেয়ে বেশি রেয়ার।”

​বলতে বলতেই একটি বই খুলে অন্তিহার মাথায় রেখে দিল সে, নতুন বইয়ের গন্ধের নেশায় চোখ বুজে বিড়বিড় করে ওঠে,

“মেরে ফেলবেন নাকি একদিনেই, এত খুশিতে আমি স্ট্রোক না করে বসি।”

​ভ্রু ক্রূর করল সাফওয়ান, মাথার ওপরের বইটা নিয়ে বন্ধ করে পাশে রাখে, গাল ফুলিয়ে উঠে একটা কাগজ ও কলম এসে ছুঁড়ে মারে অন্তিহার সামনে,

“আপনার কি বই চাই নাম লিখুন ট্রাকে করে নিয়ে আসব, এই ১০-১২টা বই নিয়ে এত ঢং? তাও তৃতীয় পক্ষের দেওয়া?”

​অবাক হলো দু'জন, তবে স্থির গলায় প্রদীপ উত্তর করে,

“যদি এটাও মুখে বলে দিতে হয় কেমন প্রেমিক তুমি?”

​“জাস্ট ফাকিং শাট আপ ব্লাডি।”

​প্রদীপকে ধমকে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভড়কায় অন্তিহা,

“গালি কেনো দিচ্ছেন অসভ্য। আপনাকে কে বলেছে আমার পিছু নিতে?”

​নিচের ঠোঁট কামড়ে রাগ ও ঈর্ষা গিলে নিতে চাইল সে, পারছে না। অন্তিহা বারবার প্রদীপের জন্য এত দরদগুলো অসহ্য লাগছে। তবুও সে বসল এবার অন্তিহার পাশে। মুচকি হাসে প্রদীপ। সে জানে সে ভালোবাসলেও পাবে না এই মেয়েকে, তাঁদের মাঝে অনেক বড় দেয়াল। আর অন্তিহা অহেতুক নিজেকে আটকে রেখেছে অচেনা মরীচিকায়। সাফওয়ান যদি বারবার পাগলামি করে অন্তিহার মন ফেরাতে সক্ষম হয় এতে সে নিরাশ হবে না। কেননা সে চায় অন্তির সারাজীবন একা কাটাবো কথা থেকে ফিরে আসুক। একা বাঁচা ভীষণ কঠিন।

______

​গ্রোসারি সুপারশপে হেঁটে হেঁটে জিনিসপত্রগুলো ঠিক করছে অহীন, হাতে একটা ঝুড়ি যা থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো জায়গায় রাখছে আর মাথা দুলাচ্ছে, মাথা দুলাচ্ছে মূলত বিরক্তির সঙ্গে। জেসি সকালে বাড়িতে আর এখন এখানে এসে তাকে জানাচ্ছে কিছু বলার জন্য, বাহু ধরে টেনে টেনে ডাকছে,

“অহীন প্লিজ আমার কথা শোনো।”

​“হুম শুনছি বলো।”

​“এখানে না এখানে ড্যাড চলে আসবে।”

​“আসবে না এটা আমার ওয়ার্ক টাইম পাপি এমন সময় আসে না।”

​“তবুও একটু সাইডে গেলে এমন কিছু হবে না প্লিজ।”

​বিরক্তির সঙ্গে স্থির হয় অহীন,

“জেসি, কাস্টমার নেই। কেনো জ্বালাচ্ছ কাজের মাঝে?”

​জেসি মুখ ভার করে তাকায় তার দিকে, টলটলে চোখের দিকে তাকিয়ে ফোস করে শ্বাস নেয়। হাতের ঝুড়িটা নিচে রেখে সোজা হয়ে জিজ্ঞেস করে,

“হুম বলো কি?”

​“ওই দিকে চলো।”

​স্টোররুমের দিকে গিয়ে হালকা অন্ধকার স্থানে দাঁড়ায় তারা, নীরব স্থানে, নতমস্তকে দাঁড়িয়ে আছে জেসি, মনোযোগ দিয়ে রেখেছে অহীন। বড় কোনো ভুল করেই তার কাছে এমনভাবে ন্যাকামো করে জেসি, কেননা অহীনের সুপারিশ থাকলে সৃজন কখনই কিছু বলবে না। জেসি দৃঢ় গলায় বলে,

“আসলে আমি না একটা ভুল করে ফেলেছি, আ আর ড্যাড আর মমকে জানাতে হবে। ত তুমি..।”

​“তুমি মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছি কোনো একটা ঘাপলা করেই এসেছো নয়তো এই গরমে আমার কাছে আসাটা সন্দেহজনক, তাও আবার এত কিছুর পর আমার সঙ্গে এত মিষ্টি আচরণ।”

​জেসি আহ্লাদ করে অহীনের বাহু পেঁচিয়ে ধরে পা নাচিয়ে ন্যাকা গলায় ঢং করে বলে,

“এমনভাবে বলো কেনো? ওসব ডেসটিনি আমি ভুলে গিয়েছি। আর আমি কি সব সময় তোমার কাছে স্বার্থে আসি নাকি?”

​"একদম না কেনো এসেছেন ম্যাডাম সেটা বলুন।”

​অহীনকে ভোলানোর জন্য আবার বলল,

“তোমাকে দেখতে।”

​“কথায় আসো কেউ চলে আসবে।”

​জেসি ছেড়ে দাঁড়ায়, দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করে,

“আসলে আমি বি…।”

​“দোকান রেখে দুজন এই অন্ধকারে কি করছো?”

​পরিচিত মেয়েলি গলা শুনে তাকায় অহীন, আশা এসেছে সঙ্গে তাইয়ান। জেসি অহীনকে ছেড়ে দাঁড়াল, না বলা কথা মুখেই রয়ে গেল। আশাকে দেখে উৎসুক হলো অহীনের মন, কিঞ্চিৎ খুশি হয়ে ওর দিকে এগিয়ে যায় একটু চিন্তিতভাব নিয়ে জিজ্ঞেস করে,

“আশু শরীর সুস্থ হয়েছে তোর? এত দূর আসতে গেলি কেনো।”

​জেসির দিকে কিছুটা সময় তাকিয়ে থেকে, অহীনের দিকে চোখ রাখে সে, মৃদু হেসে উত্তর করে,

“সারাক্ষণ তো বাড়িতেই কাটাই তুমি সময় দাও না আমাকে, তাই এর অফ ডে আজ তাই চলে এলাম ওর সঙ্গে। ভালো করিনি?”

​“খুব ভালো করেছিস।”

​তাইয়ান জেসির দিকে তাকিয়ে আছে চিন্তিত মেয়েটা খুব দেখা যাচ্ছে। দুজন চোখাচোখি করে চোখ নামিয়ে নিল ফের, আশা সেখান থেকে আগাতে নিলে সামনেই পড়ে থাকা বালতি ভর্তি পানিতে হোঁচট খেল পায়ে। আহ করে কুঁকিয়ে উঠতেই বাকিরা ওকে ধরতে আগায়, তবে অতটা লাগেনি। কিন্তু আশা সবার মাঝেই হুট করে জিজ্ঞেস করে,

“জেসির সঙ্গে এখানে কেনো এসেছো?”

​অপ্রস্তুত হলো অহীন একটু, কেননা সামনেই জেসি, মেয়েটা কষ্ট পাবে বুঝলে আশা ওদের খারাপভাবে নেয়। হয়তো তাইয়ান বুঝল জেসিকে ডেকে নিয়ে গেল নিজের সঙ্গে। অহীন অল্প আওয়াজে আওড়ায়,

“ও আমাকে কিছু প্রয়োজনীয় কথা বলতে চাচ্ছিল। কাউকে জানাতে চায় না এমনি কিছু। রাগ করলি?”

​অহীনের কথায় তিক্ততা খানিকটা ঘাটে, মৃদু হেসে বলে,

“হুম করলাম তো?”

​“ব্যথা ঠিক হয়েছে পেটের?”

​“হুম তাই তো এলাম।”

​নিচের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হাসে অহীন, হঠাৎ আশাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল, দিনের বেলা হলেও শপের এই কর্নারে তেমন লোক আসে না। কাঠের নীল একটি দরজা ধাক্কা দিয়ে আশাকে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে, স্টোররুম তবুও পরিষ্কার, সৃজন একদমই ডাস্ট পছন্দ করে না তার শপে। একটি উঁচু টুলে বসিয়ে দিয়ে হাঁটু গেড়ে নিচে বসল সে। পায়ে হাত দিয়ে হালকা ব্যথারত স্থানে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আদুরে গলায় বলে,

“জান এখানে ইদানীং প্রচুর কাজের চাপ, পাপি অসুস্থ থাকে। নয়তো আমি রোজ দুপুরে একবার তোকে আদর করে আসতাম।”

​পায়ে আলতো করে চাপতেই আশা কুঁকিয়ে ওঠে,

“হুম আস্তে ওখানে খুব ব্যথা।”

​আশার কথাটা হয়তো স্বাভাবিক কিন্তু অহীনের কাছে প্রচণ্ড নেশার মতো লাগল। পায়ে আলতো করে চুমু খেয়ে হিসহিস করে বলে,

“আর একটু দিতে ইচ্ছে করছে ব্যথা।”

​“হুসস সরো এটা দোকান তোমার মজা করার জায়গা না।”

​অহীন রইল নিজের একঘেয়েমি নিয়ে, যেই একটু আগে জেসির কথা শুনতে এত দুনুমনু করল। সে নিজেই একটু সময় নষ্ট করতে চায় আশার সঙ্গে। পায়ের থেকে ঠোঁট অগ্রসর হচ্ছে, দেয়ালে পিঠ ঠেকছে আশার, অহীনের চুল খামচে ধরে অস্ফুটস্বরে বলে,

“অহীন এভাবে শপ ফেলে রেখে এসব করছ জানলে পাপি তোমাকে চাকরি ছাড়া করবে।”

​“আচ্ছা আর পাপিকে কে বলবে? তুই?”

_____

​দোকানের সামনে এসে জেসি ছাড়ল তাইয়ান ক্ষোভে ফাটছে মাথা তার, দুপুর হওয়াতে কাস্টমার নেই বললেই চলে কাউন্টারের সঙ্গে ছেড়ে দিয়ে রুদ্ধ গলায় খেচখেচ করে ওঠে,

“তোমার সমস্যা কি জেসি? যখন দেখি কারো না কারো সাথে চিপকে থাকো অহীন এখন বিবাহিত তোমার বুঝতে হবে আশা কষ্ট পায় এসবো।”

​“কষ্ট পাওয়ার কি আছে? আমি আগেও সব কথা অহীনকে আগে বলতাম, যাতে সে ড্যাডকে বুঝিয়ে বলতে পারে।”

​“আগে তোমাদের একটা সম্পর্ক ছিল এখন নেই।”

​ভ্রু ক্রূর করে নিল, কপালে ভাঁজ পড়ল রাগে, তাইয়ানের বুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে চিল্লাই সে,

“কাকে বলব সমস্যার কথা, তুমি জানো ড্যাড আমাকে মেরে ফেলবে যদি জানে ওনার বিশ্বাস..।”

​হয়তো বলতে চায়, কিন্তু শপের বিশাল কাঁচের দরজা ঠেলে প্রবেশ করে কেউ, ভেজা চোখ মুছে তাকায় সেদিকে সৃজনকে দেখে দুজন অপ্রস্তুত হলো, জেসির মুখটা ভয়ার্ত সৃজন সেদিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করে,

“কি হয়েছে তোমার?”

​“কি কই কি হয়েছে?”

​“দুপুরবেলা তোমরা দুজন এখানে কি করছো? অহীন কোথায়?”

​তাইয়ান জেসি গলা খাঁকারি দেয়, সৃজন ক্যাশ কাউন্টার ফাঁকা দেখে কপালে ভাঁজ ফেলে, অহীন তো নিজেই বলেছে কাজ নিয়ে আর অবহেলা করবে না প্রফেশনাল হবে। তাহলে এভাবে যাকে তাকে দেখে কোথায় গেল? দরজা ঠেলে একজন কাস্টমার প্রবেশ করতেই সৃজন যথারীতি ওয়েলকাম করে। জেসি নতমস্তকে তাকে বলল,

“আশা এসেছে পায়ে হালকা চোট লেগেছে তো তাই ওরা স্টোররুমের কাছেই আছে।”

​“কি বলো? কিভাবে লাগল? চলো দেখি বেচারি অসুস্থ থাকে সব সময় তার ওপর ব্যথা উফফ ছেলেটা বিয়ে করেছে বউয়ের যত্ন করতে জানে না।”

--

​আশার গলায় মুখ রেখে চুমু খাচ্ছে অহীন, এতে বিরক্ত মেয়েটি তবুও চেঁচাতে পারছে না পাছে কেউ শুনলে মানসম্মান খোয়াবে সে। দূরে সরে অহীন এতটুকু সময়ে এলোমেলো করেছে আশাকে সে। দুই উরুতে হাত দিয়ে দুই পাশে ছড়িয়ে দিয়ে নেশালো গলায় বলে,

“১০ মিনিটের জন্য একটু জায়গা দে সোনা।”

​অহীন স্থির হয় নিজ পছন্দ মতো স্থানে, আশা তাকে জড়িয়ে ধরে হিসহিস করে বলে,

“তোমার যেখানে সেখানে মুড সুইং আমাদের প্যাঁচে ফেলে দেয় গ্রামের কথা ভুলে গেছো?”

​“এই দেশে বিয়ে ছাড়াও এসব করা বড় বিষয় না, আর আমরা বিবাহিত। আর কে আসবে এই চিপায়?”

​“আমাদের একটা বাসা আছে, একটা রুম আছে, বিশাল একটা খাট আছে অহীন তাহলে এই চিপাচাপায় কি করতে আসো? তুমি আসলে একটা টিকটিকি।”

​আশাকে নিজের কাছে আনে, নিজ প্যান্টে হাত রেখে হিসহিস করে বলে,

“বুঝবি না সব সময় একভাবে ভালো লাগে না পাখি, তাই মুখ বন্ধ রাখ।”

​ছেলেটার হয়তো ভাগ্য সঙ্গে দিল না দরজার লক খোলার শব্দ হয়, দূরে সরে যায় আশাকে তৎক্ষণাৎ ঠিকঠাক করে আগের মতো পায়ের কাছে বসে, ঠোঁট কামড়ে পা কচলে নিজের ইচ্ছেগুলোকে দমিয়ে দিল সে। সৃজন প্রবেশ করে একটু স্থির হয়, সে অবুঝ না বাতাসেও ভ্যাপসা গরম আর গন্ধ ছড়াচ্ছে। রুচি হলো না আশার দিকে তাকানোর সোজা অহীনের কানে ধরে টেনে উঠাল সে ঠোঁট কামড়ে রাগে গজগজ করে, তবে আশাকে নরম গলায় উদ্দেশ্য করে,

“আশু পায়ে বেশি চোট লেগেছে?”

​“না হালকা।”

​অহীনকে গরম থেকে টেনে বের করে আনল সে। ঘামে চিটচিটে শরীর অহীনের। সৃজন ক্যাশের সামনে এনে তাকে শাসিয়ে বলল,

“এসব কি? কাস্টমার এসে চলে যাচ্ছে। আর তুমি এত বেয়াদব তো ছিলে না, এটা কি বেডরুম?”

​“উফফ ওর পায়ে ব্যথা লেগেছে সেটাই দেখছিলাম আমি। ৫ মিনিটও হয়নি।”

​“পায়ের ব্যথা দেখতে এত সময় লাগে? আমি ২ ঘণ্টা ধরে এসে আছি জানো?”

​সৃজনের মিথ্যার চালে ধরা দিল অহীন কান কাছিয়ে পিছিয়ে যায় কয়েক পা,

“মিথ্যুক, আমি ৩০ মিনিট হবে এসেছি আর তুমি ২ ঘণ্টা বলছো?”

​কৃত্রিম রাগে গরজায় সৃজন,

“আধা ঘণ্টা তুমি শপ আল্লাহর ওয়াস্তে ছেড়ে দিয়েছো?”

​জিভ কাটে দাঁতে সে, অন্যদিকে ফিরতেই পেছনে আশা লজ্জায় মেয়েটির গাল লাল হয়ে আছে, তবে মনে মনে সৃজনকে ধন্যবাদও দিতে ভুলছে না, সে না আসলে আজ অ্যাম্বুলেন্স করে বাড়ি যেতে হতো। তাকে দেখে সৃজন ছোট পাখাটা ঘুরিয়ে দিল তার দিকে, হালকা বাতাসের ঝোঁকায় আশার খোলা চুলগুলো উড়ছে, লজ্জায় টসটসে গালগুলো দেখে কি কাছে পাওয়ার ইচ্ছে হওয়াটা অনেক বেমানান? যেখানে বউটা কথা বললেও ভালোবাসা পায়। আশেপাশে জেসি বা তাইয়ান নেই কোথাও। সৃজন আশাহত হলো খুব সে বলল,

“আজকে আর থাকতে হবে না বাড়ি যাও এন্ড নেক্সট টাইম যদি দেখেছি এসব করতে তোমার চাকরি শেষ মনে থাকবে?”

​“হুম।”

​অহীন তড়িঘড়ি করে নিজের জিনিস গোছাতে শুরু করে, দোকান থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো নিয়ে নিচ্ছে। আশা তখনো চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে অপ্রস্তুত হাবভাব স্বাভাবিক করার জন্য সৃজন নিজ থেকেই বলল,

“তুমি জানো আমার আরো দুটো দোকান আছে কিন্তু আমি অহীনকে এই খালি শপটায় কেনো দিয়ে রাখি?”

​সৃজনের আদুরে কথায় দুই পাশে মাথা দোলায় আশা, সৃজন মলিন হেসে আশাকে একটি টুলে বসিয়ে নিজে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়, দুপুরের কড়া রোদ এসে তার গালের একটি কোণায় পড়ছে, আশা একটু ভাবনায় পড়ল এতে, তার ফুফুর জন্য বাছাই করা কতটা কঠিন ছিল বড় বাবা আর পাপির মাঝে একজনকে। কত সুন্দর দু'জন, তাই তো তাদের সন্তান জেসি, অন্তিহা, অহীন এত সুন্দর। সৃজন মলিন মুখে হাসে বলে,

“তোমার ফুফু এখানে এসেছিল তখন এটাই আমার শুরু ছিল। অহীনের জন্মের পর কুহেলিকা লেখাপড়া চাকরি দুটোই করত। আর অহীনকে আমি আর আমার মা রাখতাম। ওকে একটা বেবি ক্যারি ব্যাগে নিয়ে এই কাউন্টারে দাঁড়িয়ে থাকতাম। আমার অধিকাংশ কাস্টমার অহীনকেই দেখার জন্য আর আদর করার জন্য আসত। এখন যখন ওকে দেখি এখানে কাজ করে, আমার ভালো লাগে স্মৃতিগুলো তাজা হয়ে ওঠে।”

​“আপনি অহীনকে অনেক ভালোবাসেন পাপি?”

​“হয়তো জেসির চেয়ে বেশি। ওকে কোলে নেওয়ার সময় আমার হাত কেঁপেছে, আর জেসির সময় আমি পরিপক্ব একজন বাবা। তাই তো চাইতাম আমার দুই পৃথিবী এক হয়ে যাক।”

​সৃজনের চোখ ভেজা, পুরোনো দিনগুলো মনে করতে ভালো লাগে। সেই দিনগুলো অনুভব না করলে হয়তো সে জেসির বেস্ট ড্যাড হতে পারত না। আদর করা বুঝত না। আশা আনমনা হয়ে বলে,

“অহীনও আপনাকে অনেক ভালোবাসে হয়তো বড় বাবার চেয়ে বেশি। তাই তো ওখানে বাবার কাছে থেকেও ছটফট করত আর বলত পাপির কাছে যেতে হবে। রক্তের চেয়ে মায়ার জোর বেশি হয় তাই না? সরি আমার জন্য অহীনের সঙ্গে আপনার দূরত্ব হয়েছে।”

​“বোকা মেয়ে এটা কি বলছো? বরং তোমার জন্য এখন আমার চারটি পৃথিবী হবে, তুমি, অহীন, জেসি আর জেসির বিয়ের পর তার হাসবেন্ড।”

​“এই পেঁচি চল।”

​অহীন চলে আসে সেখানে, দুজনের কথার ব্যাঘাত ঘটল এতে, হেসে দিল দুজন। তাদের অদ্ভুত হাসির মানে না বুঝে অহীন নিজেও ভেবলার মতো হাসে। হাসতে হাসতেই বের হয় দোকান থেকে, আশা পাশে ব্যথা পেয়েছে অহীন বারবার ঝুঁকে ঝুঁকে দেখছে আর হাঁটছে, হয়তো বলছে হাতের জিনিসগুলো আশাকে তুলতে সে কোলে করে নিয়ে যাবে, একটু দূরে বাইক তার। পেছন থেকে তাকিয়ে আছে সৃজন কাঁচের গ্লাসের ভেতর থেকে। দরজা দিয়ে একটি কাস্টমার প্রবেশ করতেই হুঁশ ফেরে, মিষ্টি হেসে ওয়েলকাম করল সে। এবার কাজে মন দিল।

চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন