ফন্ট সাইজ:
থিম:
দূরত্বের প্রণয় ২

৪৩তম পর্ব

লেখক: স্বর্ণালী ইসলাম

#দূরত্বের_প্রণয়_২

#স্বর্ণালী_ইসলাম

পর্বঃ৪৩

নিরব পরিবেশ পরিপাটি ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আছে আয়াশ। তার পাশেই খানিকটা দূরে অন্তিহা, বরাবরই সে বইয়ের মাঝে ডুবে আছে। তাইয়ানের টিভিতে চোখ। অন্তিহা কথা দিয়েছিল আশার সঙ্গে দেখা করানোর। সেটার ফায়দাই লুটেছে আজ আয়াশ। অহীন গাল ফুলিয়েছে তাকে দেখে। তারওপর আশার হাসি দিয়ে মিষ্টি করে কথা বলা গায়ে জ্বলন তৈরি করে দিল। ডাইনিং টেবিলে একে একে প্লেট সাজিয়ে রাখছে আশা। প্রতিটা প্লেট মেপে একদম পারফেক্ট দূরত্বে। টিস্যু দিয়ে মুছে শুকিয়ে। নয়ত আয়াশ কিছুই খাবে না। চোখের সামনে মশলা মাখানো হাতে কাঁচের গ্লাস হঠাৎ আসতেই নাক কুঁচকে নিল সে। তাইয়ান অন্তিহা অবাক চোখে জেসির দিকে ডেব ডেব করে তাকাল। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আয়াশ মেজাজ চড়াও করে দাঁতে দাঁত পিসে বলে,

“স্টুপিড। এই নোংরা হাতে আমি খাব? তাইয়ানকে দাও ওর এসব হজম হয়, আমার না। ইডিয়ট।”

​জেসির বোকামির জন্য বেচারা তাইয়ানকে টানার মানে বুঝল না। তার দিকেই এগিয়ে দিল জেসি আয়াশকে ভেঙচি কেটে বলল,

“বড় বলে যা ইচ্ছে করবেন নাকি? মনে রাখবেন এটা আমার বাসা। ভার্সিটি নয় যে আপনাকে স্যার স্যার করব। সোও একদম এমন করবেন না।”

​“ওউ রাইট মিসেস জেসিকা।”

​“মিসেস!”

​আয়াশের বলার সঙ্গে সঙ্গে অন্তিহা ভরকে ওঠে, তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন করে তাকে। চেঁচিয়ে উঠতেই আয়াশ আরো বিরক্ত হলো। জেসি অন্তিহার কাঁধে হাত রেখে ধাতস্থ করে বলে,

“ভুলে বলে ফেলেছে পাগল।”

​“ইয়াক।”

​জেসির নোংরা হাত গায়ে লাগতেই ঘৃণায় গা গুলিয়ে আসছে অন্তিহার। বিরক্তি নিয়ে রুমে চলে গেল বেচারি। জেসি ঠোঁট উল্টে কিচেনে যেতেই আশা হাসিস্বরে বলে,

“বলেছিলাম খাবে না। অহেতুক দুজনকে কেন জ্বালাও?”

​“ভালো লাগে। জাস্ট লুক উনি তুমি আর অন্তিহা ছাড়া সবাইকে ভাইরাস মনে করেন। ওনার শরীর ছুঁয়ে গেলেই যেন মরে যাবে।”

​আশা সেদিকে তাকায় দীর্ঘশ্বাস নেয়। লোকটার সঙ্গে সে খুবই খারাপ করেছে। গাম্ভীর্য আর অতিরিক্ত ভালোবাসার সুযোগ নেয়া। হাতে কাঁচের গ্লাসে শরবত নিয়ে সে নিজেই এগিয়ে গেল আয়াশের নিকট। মুখের সামনে ধরতেই চোখাচোখি হয় দুজনের। চোখ সরায় আয়াশ ঢোক গিলে গ্লাস নিয়ে প্রচণ্ড বিরক্তির সঙ্গে বলল,

“তোমার বাড়িতে এসেছি প্লিজ তুমি সার্ভ করো নয়ত অন্তিকে বলো করতে। আমার গা গুলাচ্ছে অসুস্থ হতে চাই না।”

​আশা ঝুঁকে ওর হাতে দিয়ে ঠোঁট টিপে হাসে,

“আচ্ছা ঠিক আছে। এখন এটা খান। আমি একটা গেস্ট নিয়ে আসি।”

​“কাকে?”

​উত্তর করল না আশা, সোজা বের হয়ে গেল বাসা থেকে। দুপুরের কড়া রোদে পিটপিট করে তাকায়, যা ভেবেছে তাই গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ফোন চাপছে আর একটা ললিপপ চুষছে সাফওয়ান। তার সম্পর্কে অজানা নয় কেউ বাড়িতেও সবাই জানে। কেনই বা জানবে না? সারাক্ষণ একটা সিসি ক্যামেরার মতো অন্তিহার পেছনে ঘুরঘুর করে। এসব কথা কি বাড়িতে যায় না? হাঁক ছাড়ল আশা,

“এই যে মিস্টার অসভ্য স্টকার।”

​ফোন পকেটে রেখে ললিপপটা মুখ থেকে বের করে, আশার দিকে তাকিয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসল সাফওয়ান।

“ভাবি আমাকে ডাকছেন?”

​“হুম হুম আর কে আছে অন্তুকে স্টক করে?”

​“ওগুলো ভালোবাসা বুঝবেন না, আপনারা তো শুধু বেডরুমের ভালোবাসা চেনেন। আমি পথেঘাটেও ভালোবাসি আমার মিসকে। সুযোগ পেলে বেডরুমে আরো বেশি ভালোবাসব।”

​হতবাক হলো আশা, অন্তিহা এমনি এমনি একে অসভ্য বলে না। অহীনের মুখেও এর চেয়ে বেশি লাগাম। সে ডাকতে এসেছে এর কথা শুনে মনে হয় মানসম্মান আর থাকবে না। বাসায় আবার চলে যেতে নিয়েও আবার কিছু ভেবে আবার সাফওয়ানের দিকে তাকায়,

“আচ্ছা আপনি কি খান না? অন্তিহা ঘণ্টার পর ঘণ্টা এখানে কাটায়, আপনি নড়েন না খিদে পায় না?”

​সাফওয়ান ভাবান্তর হলো একটু, অতঃপর গাড়ির ব্যাক ডোর খুলে দেয়। চোখ বিস্মিত হলো আশার। ইনস্ট্যান্ট সব ধরনের খাবার এর কাছে আছে। মেকি হাসে, এ সত্যি অন্তিহার জন্য পাগল। নয়ত এসব কে করে?

“রাতে বাড়িতে যান নাকি হোস্টেলের সামনেই থাকেন।”

​সাফওয়ান কিছুটা সময় চুপ থেকে বলল,

​"বাড়ি যাই তবে খুবই কম, একটা বোন আছে আমার, শুধু ওর জন্যই যাওয়া। নয়তো ওনার এই ক্রুস থেকে দূরে যেতে ইচ্ছে হয় না। উনি বিল্ডিংয়ের ভেতরে থাকলে, আমি বাইরে দাঁড়িয়ে ওনার অস্তিত্বের গন্ধে যে স্বস্তিটুকু পাই, তা কোথাও পাইনি কখনো।”

​স্থির হয়ে আশা মলিন হাসে,

“ভেতরে আসুন তবে, এই সুযোগে ওনার পাশে বসে খাওয়া হয়ে যাবে।”

​“চলুন।”

​আশার এক কথায় কোন রকম দ্বিমত করল না ছেলেটা হনহনিয়ে তাকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। দরজা বন্ধ করতে নিলে দরজায় উপস্থিত হলো প্রদীপ। আশা ঠোঁট কামড়ে হাসে। তিনজনই একই সঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করল। সাফওয়ান আয়াশকে দেখিয়ে হেলেদুলে গিয়ে ঠিক তার পাশে বসে। আশা ওদের রেখেই অহীনের কাছে যায়। অহেতুক গাল ফুলিয়েছে। সে কি আয়াশকে এনেছে? এনেছে তার বোন তবে এত রাগ তার সঙ্গে কেন? রুমে প্রবেশ করে পর্দা দিয়ে সব অন্ধকার করে রেখেছে অহীন। বিছানার মাঝে কম্ফোর্টার দিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ ঢেকে বসে আছে প্রেতাত্মার মতোন। ধীরে ধীরে ওর কাছে গিয়ে আলতো হাতে কম্ফোর্টার উঁচু করে নিজেই ওটার ভেতরে ঢুকে পড়ল সে,

“ম্যাউ।”

​ওকে দেখে ফর্সা গালগুলো আরো ফুলাল সে। অন্য দিকে ফিরে যায় ঝটকা দিয়ে,

“যা পেঁচি স্যানিটাইজারের সাথে খিকখিক করে হাস গিয়ে।”

​ফিক করে হেসে আশা টান দিয়ে কম্ফোর্টার সরিয়ে দিল তার শরীর থেকে। অবাক হলো সত্যি রেগেছে নাকের ডগা লাল হয়ে আছে গালগুলো টমেটো হয়ে আছে। ফর্সা ত্বকের এই জ্বালা আনন্দ, কষ্ট, রাগ হলেই গাল লাল হয়ে যায়। আশা গলা খাঁকারি দিয়ে দুই পা দুই পাশে দিয়ে ওর কোলে উঠে বসে। গলা জড়িয়ে ধরে গাল বাঁকিয়ে পাল্টা অভিমান করে বলে,

“আমি কি করেছি? তোমার বোন ডেকেছে ওকে। আর ও থাকলে কি হয়? ও কত কিউট আমার দিকে একবারও তাকায়নি সত্যি।”

​“ঠিক অনেক কিউট, যা ওর কাছে যা।”

​আশাকে নামিয়ে দিতে নিলে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল আশা তার গলা ফলে অহীনের মুখ ঠেকল অপ্রত্যাশিত স্থানে। ঠোঁট চেপে মুখ ফিরিয়ে দাঁতে দাঁত পিশে বলে অহীন,

“পেঁচি সর।”

​আশা সরল না, বরং আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে বসল কোল জুড়ে, দুই গাল হাতের ভাঁজে নিয়ে আদুরে গলায় বলল,

“অহীন, তুমি বেশি কিউট, আমার আফসোস হয় কেন আগে তোমাকে বিয়ে করলাম না। হ্যান্ডসাম সুইট হট সেক্সী একটা জামাই আমার তার সঙ্গে কি যার তার তুলনা হয়?”

​আশার প্রশংসায় গলল সে, মুচকি হেসে কোমর জড়িয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল একদম, এবার ইচ্ছে করেই নাম মুখ গুঁজে দিচ্ছে মনমতো স্থানে,

“তাহলে চল একটু হটনেস দেখাই।”

​কেঁপে উঠল আশা, বলে কি এই লোক বাহিরে লোক ভর্তি আর এ মজা করছে? নড়েচড়ে নামতে চায়,

“রাতে দেখব এখন বাহিরে আসো মেহমান এসেছে।”

​“মেহমান ভালো লাগে না, উইকেন্ডের দিন তোর কান্না শুনব আমি পুরোদিন। তাও পারছি না। ১০ মিনিট লাগবে তারপর সারাদিন যা ইচ্ছে করিস।”

​“তোমার ১০ মিনিটের হিসেব আমি জানি, প্রদীপ এসেছে না গেলে কেমন দেখায়? প্লিজ চলো।”

​“তো ও কি আমাদের জন্য এসেছে? অন্তুর জন্য এসেছে।”

​বলেই ঝটকায় বিছানায় ফেলে দিল আশাকে উল্টে দিল, রমণী ব্যথায় কুঁকিয়ে ওঠে খানিকটা। সে জানে অহীনের সময়-জ্ঞান নেই একটুও। ঠোঁট হাসে। জিব দিয়ে লোভাতুর ভাবে ঠোঁট ভিজিয়ে হিসহিস করে বলে,

“জানিস তোর সঙ্গে এমন কেন করি আমি?”

​নিজেই উত্তর করে,

"Cause I love being in this position, it lets me feel you deeply.”

​ঠাস ঠাস করে দরজার শব্দ সরে আসে অহীন বিরক্তি নিয়ে। কেউ যেন দরজা ভেঙে ফেলতে পারলেই বাঁচে। আশা হন্তদন্ত হয়ে নামে কাপড় ঠিক করে দরজা খুলে দিল। রাগ নিক্ষেপ করে আছে অন্তিহা। ভাইয়ের মতোই গালগুলো লাল হয়ে আছে। সাপের মতো ফোসফোস করে ফণা তুলছে। নিচের ঠোঁট এমন ভাবে কামড়ে ধরেছে যেন নিজেই নিজে ছিঁড়ে নিয়ে আসবে। ওমনি একটা চিৎকার আসে,

“শিট ডেম এমন সময় কে ডোর নক করে ইয়ার।”

​তারা সেদিকে তাকায়, সাফওয়ান ও তাইয়ান টিভি দেখছে। সাফওয়ানের তালে পড়ে তাইয়ান নিজেও উৎসুক। হাতে আপেলের স্লাইস। পেছন থেকে অহীন বের হয়ে তাদের এমন রূপ দেখে খুকখুক করে কেশে আশাকে জিজ্ঞেস করে,

“ওকে তুই এনেছিস?”

​অন্তিহা রাগ নিয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। আশা মেকি হেসে বলে,

“সারাদিন বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকে মায়া হলো তাই আনলাম ভুল করেছি বেইবি?”

​বারবার পলক ঝাপটে বলা কথা শুনে আহ্লাদ করে অহীন আশার গাল টেনে দিল।

“একদম না, রুমে চলো।”

​মেয়েটা মুচকি হেসে গা ঘেঁষে দাঁড়ায় তার, বুকে থাপ্পড় দিয়ে লজ্জা প্রকাশ করে। সাফওয়ান তাঁদের দিকে তাকিয়ে হাতের ইশারায় হায় বলে নিজ থেকেই বসা থেকে উঠে যায়। অহীনের সামনে এসে দুই হাত ধরে হাসি মুখে বলে,

“ভালো আছেন ভাইয়া?”

​অহীন তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে, পেছন থেকে আয়াশের গম্ভীর গলা ভেসে আসে,

“আমার কাজ আছে, আমরা লাঞ্চের পর্ব শেষ করি যেতে হবে আমার।”

​আয়াশ বেশ বিরক্ত সাফওয়ানের জন্য। সবাই তার গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ হলো। অহীন তার ওপর জেলাস খুব। তবুও আশার জন্য দাঁত পিশে চুপ করে আছে।

​ডাইনিং টেবিলের ওপর সবাই বসেছে। অহীনের পাশের চেয়ার ফাঁকা। অন্তিহার এক পাশে প্রদীপ অন্য পাশে তাইয়ান। সামনেই এক সঙ্গে আয়াশ ও সাফওয়ান। আয়াশ দাঁত কটমট করছে। সে শুধুই আশার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল জানত সবাই হাজির হবে কখনই আসত না। প্লেটে আশার সঙ্গে খাবার বাড়ছে জেসি। অন্তিহা সাংসারিক কাজে পারদর্শী নয় তাই এসব বিষয় কখনই আগায় না। জেসির আগ বাড়িয়ে সাহায্য করাটাও আশার অতটা ভালো ঠেকে না। আয়াশের কাছে যেতেই অহীন তার দিকে তাকায় লক্ষ করল আয়াশ সেটা। অনুভূতির ওপর নিয়ন্ত্রণ করে হালকা হাসে। তার মন সম্পূর্ণ খাবারে। প্রদীপ সব সময়ের মতোই চুপচাপ বসে আছে অন্তিহার দিকে তাকিয়ে। সে জেসিকে ডেকে বলল,

“জেসি কিচেনে সেলফের ভেতর একটা হটপট আছে নিয়ে আসো প্লিজ।”

​প্রদীপ মুচকি হাসে,

“থ্যাঙ্কিউ।”

​অহীন গলা খাঁকারি দিল আনমনা হয়ে সাফওয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে,

“সাফু তোর সামনের বাটিটা দে।”

​হতবিহ্বল সকলে অবাক চোখে অহীনের দিকে তাকায়। যেন ভূত দেখল সবাই। প্রথম সাক্ষাৎকারে তুই সম্বোধন! আশা অহীনের কাঁধে হাত রাখে। সাফওয়ান চামচ রেখে দুই হাত ভাঁজ করে চোখ রাখে অহীনের চোখে। চোখ বুজে ঠোঁট কামড়ে ধরে সে। সবার কৌতুহলী চাহনি দেখে ভরকে গেল,

“কি? এখানে সবাইকে আমি তুই বলি, সেই হিসেবে মুখ ফস্কে চলে এসেছে”

​সন্দিহান নেত্রে তাকায় তার দিকে অন্তিহা, তার কম্পিত গলা বলে দিচ্ছে পূর্ব পরিচিত। সাফওয়ান তার দিকে পানি এগিয়ে দিয়ে চোখের পলক ঝাপটে বলে,

“নে পানি খা।”

​সবার চোখ অহীন থেকে সাফওয়ানের দিকে স্থির হয়। এতে বিব্রত হলো সে বলল,

“আমাকে ও তুই বলেছে আমি কি আপনি বলব নাকি? সম্মান দিলেই সম্মান দেব।”

​অন্তিহা চোখ পিটপিট করে তাকায় সাফওয়ানের দিকে। চামচ রেখে সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করে বলল

“আপনার বয়সও ওনার মতোই মনে হয়। সত্যি বলুন পরিচিত আপনারা?”

​প্রেয়সীর মুখের ওপর মিথ্যা বলা টাফ, অহীনের দিকে তাকিয়ে নাক কুঁচকে বিড়বিড় করে বলে,

“ওর সঙ্গে এক্সাম দিয়েছিলাম।”

​“মানে? আপনি এখন আমার ভার্সিটির সিনিয়র।”

​অন্তিহা হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠতেই মাথা দোলায় দুই দিকে আয়াশ, তাচ্ছিল্য করে হাসে,

“প্রতি বছর বিশাল বড় বড় ডাব্বা মারে, চিটিং করেও যথেষ্ট পরিমাণ মার্ক আনতে পারে না।”

​চামচ তুলে কাঁচের প্লেটে টাস করে বাড়ি দিল সাফওয়ান, তার মিস গম্ভীরের সামনে অপমান একদম সহ্য হলো না। নাক ফুলিয়ে ক্রুর গলায় ধমকে ওঠে,

"আমার যে নলেজ, তার ন্যানো পার্সেন্টও তোর ভেতরে নেই। শুধু লাফিয়ে লাফিয়ে কয়েকটা ডিগ্রি পকেটে পুরে লেকচার দিতে বসে পড়লেই হয় না।"

​"ওহ রিয়ালি? তা নলেজ প্রুফ করার জন্য আজকাল ফেইল করতে হয় বুঝি? এই বুদ্ধি নিয়ে আবার অন্তিকে পটাতে যাওয়া! নিজের চেহারা আয়নায় দেখেছিস কখনো? ব্রেইনলেস জোকার কোথাকার!”

​“প্রদীপ আপনি এই ডিশটা খেয়ে দেখুন, আশু রেঁধেছে বাট অনেক মজা হয়েছে।”

​তাঁদের তর্কের মাঝে অন্তিহার আদর করে প্রদীপকে খাওয়ানো, আর মিষ্টি কথায় থমথম হয় দুজনের মুখ। অহীন আশাও নিজেদের মাঝে ব্যস্ত। জেসি বেচারি তাইয়ানের সঙ্গে ফোসফাস করছে রাগে। তুমি আপনি নিয়ে। হতাশ দুজন নিজেদের ওপর হাসে। সাফওয়ান প্রচণ্ড জেলাসির সঙ্গে অন্তিহার হাত টেনে ধরে প্রদীপকে সার্ভ করা থেকে আটকায়,

“আমাকে দিচ্ছেন না কেন? বলুন আপনি আমার ডিগ্রি চান?”

​হতবিহ্বল অন্তিহা অহীনের দিকে তাকায়, এ কেমন ভাই? তার সামনে হাত ধরল অন্তত সে বউ নিয়ে ব্যস্ত? অন্তিহা কটমট করে উত্তর করার আগেই প্রদীপ খাবার মুখে থেমে থেমে বলে,

“আমার মনে হয় সাফওয়ান ঠিক আছে অন্তুর জন্য। ওর রুচি খুঁজতে গেলে বিয়ে হবে না। আর ওর চয়েজ খুবই বাজে। চোহ।”

​প্রদীপ আবার খাবার ঢুসে নিল মুখে, অন্তিহা মোচড় দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিল তার থেকে। সাফওয়ান খুশি হলো বত্রিশ পাটি বের করে দিশেহারা হয়ে একটি বাটি থেকে মাংস তুলে তার প্লেটে দিয়ে, হাত টেনে মিলিয়ে নিল,

“ব্রাদার রাইট ওনার টেস্ট এত বাজে।” বলতে বলতে আয়াশের দিকে তাকায়, “ওয়াক থু। মেয়েটা বোঝে না তুমি বুঝলে ব্যথা আমার।”

​বোকা বনল প্রদীপ ভেবলার মতো হেসে, প্লেটের দিকে তাকিয়ে মেকি হেসে বলে,

“আমি বিফ খাই না।”

​অহীন আশার থেকে চোখ ফেরায়, সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে, ভাবান্তর গলায় বলে,

“আমার ওকে নিয়ে প্রবলেম নেই। আমি বাড়িতে সুপারিশ করতেও পারব। আমি চাইব আমার বোনকে কেউ পাগলের মতো চাক, সাফওয়ান চায় অন্তুকে যেমন আমি আমার বউকে চাই। তাই না চাচাতো বউ?”

​আশা তাচ্ছিল্য হাসে, অহীনের কাঁধে ঠাস করে থাপ্পড় দিয়ে মশকরা স্বরে বলে,

“তুমি বউ পাগল কবে হলে? বেস্ট জোকস এভার।”

​আয়াশের মুখের দিকে তাকায় প্রদীপ ফুঁসছে, তবুও বান্দা কথা বলছে না কোনো। প্লেটের দিকে তাকায় চামচের কোনো শব্দ নেই। মনে হয় যেন কোনো মানুষ এখানে অবস্থান করছে না। একটা মানুষ এতটা শান্ত থাকে কি ভাবে সে জানে না। কপালে অবিরাম রাগ তবে চুপচাপ হঠাৎ গর্জায়। অহীন পড়েছে এবার একটু জিজ্ঞাসাবাদে,

“সাফু আমার বোনটাকেই কেন তোর মুরগি বানাতে হবে?”

​“দেখ সব মুরগি মজা হয় না। বাট ওনাকে দেখলে মনে হয় খুবই ডিলিসিয়াস হবে। আমি ইনস্ট্যান্ট খাবার পছন্দ করি খুব। উনি ঠিক ওমনই। সব জানে কিছু শেখাতে হবে শুধু রুমে নেব আর….”

​“শাট আপ ব্লাডি অসভ্য ওটা আমার ভাই।”

​কড়মড় করে ওঠে কথার মাঝে অন্তিহা, সাফওয়ান ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,

“তো? অহীন নিজেই জিজ্ঞেস করেছে। এমনিতেও ওরা সব বোঝে, করেছে ও। আমি বললে করলেই দোষ?”

​“একদম না ভাইয়া আপনি বলুন অহীন তুমি শেখো।”

​আশা বলল। সাফওয়ান লজ্জা পেল খানিকটা। লজ্জা পেল বললে ভুল হবে। অহেতুক লজ্জা পাওয়ার ভান ধরল। অন্তিহা রাগে রিরি করছে ওদের কাণ্ড দেখে। বসা থেকে উঠে পড়ল প্লেটে চামচ আঁচড়ে। সাফওয়ান আচানক খাবার পাতেই উচু হয়ে অন্তিহার হাত ধরে এক টানে নিজের কাছে নিয়ে আসে। পৃষ্ঠদেশে রেখে গেয়ে ওঠে,

“হটি নটি তোর ঐ ফিগারে

কারেন্ট যেন আছে ,

ছুঁয়ে দিলে ঝাটকা লাগেরে

আয় না আরও কাছে..।

​অন্তিহা বলার আগেই অহীন আশার দিকে পাউট করে গায়,

“তোর ঠোঁটে দু ঠোঁট রাখলে এই

প্রাণটা যেন বাঁচে..”

​বুঝল অন্তিহা এটা তার আপন ভাই হতে পারে না কোন দিনই। নিজেই ঝাড়া দিয়ে সরে যায়। পড়ে থাকা কাঁটাচামচ নিয়ে ওর মুখের দিকে তাক করতেই সেটা খপ করে ধরে প্রদীপ রাগের মাথায় গেঁথে দিতে পারে ভয় তার। সাফওয়ানের কি সেই খেয়াল হয়?,

“আপনার হাতে মরণ মঞ্জুর অন্তিহা, আমাকে আপনি নিজ হাতে মারলে কখনো আপনার স্মৃতি থেকে মুছব না।”

​টাস করে চামচ আছাড় মারল আয়াশ। সবার দৃষ্টি তার দিকে। চোখ তুলে আশার দিকে একবার তাকিয়ে অন্তিহার দিকে তাকায়,

“আমি এখানে কোনো চিপ রোমিওগিরি দেখতে আসিনি অন্তি, দেখা করতে এসেছি। আমার দেখা করা মানে ৫ মিনিট শুধুই কথা বলা। কিন্তু এখানে মাছের বাজার করে কি প্রুফ করতে চাইছ?”

​সাফওয়ান আগেই বলে ওঠে,

“তুই আমাদের থেকে আলাদা, তোর সঙ্গে না আশা আর না অন্তিহা কারো যায় না। তুই বাড়তি।”

​ভরকাল অন্তিহা বসা থেকে হঠাৎ দাঁড়িয়ে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে ক্রুর গলায় বলে,

​“সাফওয়ান, নিজের সীমার মধ্যে থেকে কথা বলুন ঠিক যতটুকু আমরা সহ্য করব। উনি আলাদা হতে পারেন, কিন্তু বাড়তি কেউ নন। একদমই নন, হুম? ওনার গুরুত্ব এখানে ঠিক ততটুকুই, যতটুকু বাকিদের।”

​তাইয়ান দাঁড়িয়ে অন্তুর কাঁধে হাত দিয়ে শান্ত করে বলে,

“গাইজ স্টপইট। ঝামেলা করছিস কেন অন্তু।”

​“আইম সরি।”

​সাফওয়ান বলল,

“মি টু..।”

​খাওয়া শেষ করে সবাই, অহীন নিজ রুমে চলে গেল। আয়াশের মুড নষ্ট হয়েছে। প্রদীপ চলে গিয়েছে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আয়াশ। পকেট থেকে ছোট একটা বাক্স বের করে। ছলছল চোখে হাসছে। আশা নতমস্তক হয়ে বলে,

“সরি ওনার বিহেভিয়ার সম্পর্কে আমি জানতাম না।”

​“ইটস ওকে, তিন বছর সহ্য করছি ওকে আমি। এসব কিছু না।”

​বাক্সটা খুলে আশার দিকে ধরে সে। দুটো ইয়ারিং লাল রুবি পাথরের। জ্বলজ্বল করছে চোখে। ওর ঠোঁটও উচ্ছ্বসিত হলো এতে। হাসিতে চোখ রেখে নিরেট গলায় বলে,

“তোমার বিয়ের আগে কিনেছিলাম এত সমস্যার মাঝে দেয়া হয়নি। হয়ত সেই অনুভূতি নিয়ে আর কখনো কেনা হবে না। ভাবলাম আমার ছোট অনুভূতিটা তোমাকে দিয়ে দি। রাখবে পুতুল?”

​“আপনার মনে হয় না এটার মালিক আপনার ফিউচার ওয়াইফ..।”

​ঢোক গিলে ছেলেটা। দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলে,

“আমি সবার চেয়ে আলাদা, আমার সঙ্গে তুমি বা অন্তিই কেন? কোনো মেয়ে হ্যাপি থাকবে না। আপাতত নিজেকে সামলাই বউয়ের কথা পরে ভাবব।”

​“আম সরি এগেইন। আমার জন্য আপনার সব এলোমেলো হয়েছে।”

​“কিছু এলোমেলো হয়নি, বরং তোমার জীবন গোছালো হয়েছে আমার ভালো লাগছে দেখতে। অহীন সব সময় আমার ওপর জেলাস থাকত হয়ত তুমি খেয়াল করোনি আমি করেছি। আমি দেশে গেলে ও চলে যেত। আমার সঙ্গে তোমাকে কোথাও নিয়ে গেলে কোনো এক বাহানা দিয়ে সঙ্গে যেত। ও তোমায় ভালোবাসে। ওর সঙ্গে ঝামেলা করো না কেমন?”

​“হুম।”

​“বায়।”

​আয়াশ যেতেই ফুপায় আশা, নাক টেনে টেনে কাঁদছে। অন্তিহার পাশে সাফওয়ান দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখও ভেজা। অন্তিহাকে কাঁদতে দেখছে প্রথম সে জিজ্ঞেস করে,

“আশা এখনো আয়াশকে ভালোবাসে?”

​অন্তিহা তার দিকে তাকায়,

“মায়া, আয়াশের সত্যি কেউ নেই। থেকেও নেই। আশা এখন ভাইয়াকে ভালোবাসে। ওদের বিহেভিয়ার দেখে বোঝেন না?”

​সাফওয়ান মন খারাপ করল এই পর্যায়ে। অন্তিহা বুঝল। একটু আগে অতিরিক্ত রুড হয়েছে সবার সামনে ওর সঙ্গে, এখন রুডনেস হয়ত সহ্য করতে পারছে না।

“বাড়ি যান আজকে আমি হোস্টেল যাব না। পিছু নিতে হবে না।”

​সাফওয়ান মাথা উপর নিচ দুলিয়ে, দরজার দিকে গিয়ে আবার ফিরে আসে,

“গিফট লাগবে ওমন?”

​“না বাড়ি যান ইশারা অপেক্ষা করবে।”

​দরজায় আশার সঙ্গে মুখোমুখি হয় সে। পাশ কাটাতে নিলে আশা স্থির গলায় বলে,

“সরি সাফু, আসলে উনি আমাদের ছোট বেলার ফ্রেন্ড ওসিডির জন্য সব সময় সবার থেকে আলাদা ট্রিটমেন্ট পেয়েছে। মায়া হয় এমন একজনের জন্য যার থেকেও কেউ নেই।”

​“ইটস ওকে যদি আপনার ননদকে আমার নামে লিখে দিন তাহলে সব ভুলে যাব।”

​মুচকি হাসে আশা সাফওয়ান বেরিয়ে গেল বাসা থেকে। ড্রয়িংরুমের অবস্থা বেহাল হয়ে আছে। দেয়াল ঘড়িতে প্রায় অনেক সময়। ক্লান্তি নিয়ে বলল অন্তিহা,

“আগে একটু রেস্ট নে তারপর আমিও হেল্প করে দেব।”

​“হ্যাঁ।”

​ফোস করে শ্বাস নিয়ে রুমে প্রবেশ করে আশা, সন্ধ্যা হওয়াতে আবছা আলোকিত হয়ে আছে পুরোটা কক্ষ। জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে জেসি আর অহীন। কখন এসেছে জানা নেই। চোয়াল শক্ত হলো তার এটা দেখে। সেদিন শপে একা বেডরুমে একা। তাকে দেখে চুপসে গিয়েছে জেসি। শক্ত তীক্ষ্ণ গলায় জিজ্ঞেস করে,

“কি করছো?”

​অহীন বলার আগেই জেসি ইতস্তত হয়ে আমতা আমতা করে বলে,

“নাথিং জাস্ট এমনি।”

​“রোজ রোজ একা একা আমার থেকে আড়ালে নিয়ে এমনি এমনি এত কিসের কথা?”

​গলা খাঁকারি দিল অহীন, আশার নিকট গিয়ে বাহুতে ধরতে চাইলে ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে দেয়,

“আয়াশের সঙ্গে কথা বলা যাবে না হাসা যাবে না। এসব সারাক্ষণ বলতে থাকো। আজ একটু হাসি দিয়ে কথা কি বলে ফেলেছি রাগ করে বসে ছিলে। তাহলে তুমি কেন বারবার এই মেয়ের সঙ্গে পার্সোনাল কথা বলতে কখনো রুম তো কখনো কোনো নীরব স্থান খোঁজো?”

​আশা আবার ভুল বুঝছে তাকে? এই মেয়েটা কি তাকে এত দিনেও বিশ্বাস করতে পারেনি? জেসি বলতে চায়,

“আশা আমি আসলে একটা ভুল…।”

​রাগ ও ঈর্ষায় চেঁচিয়ে ওঠে আশা,

“ভুলটা নিশ্চয়ই আমার হাজবেন্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু নয়? তুমি এত গায়ে পড়া স্বাভাবিকভাবের কেন জেসি? একবার আয়াশের সঙ্গে দেখি একটা তাইয়ানের সঙ্গে দেখি। আর অহীন তো তোমার পার্সোনাল প্রপার্টি যখন ইচ্ছে এসে ঝাপটে ধরো। আমার তো মনে হয় ওরা সুযোগ দিলে শুয়ে পড়বে তুমি, ইউ জাস্ট লাইক আ স্লাট।”

​ঠাস করে আশার গালে অহীনের শক্ত হাতের থাপ্পড় পড়ল। তাকে বলা চলে, তবে যাকে তাকে অপমান করার অধিকার তার নেই। রক্তিম চোখে তাকিয়ে অহীন গর্জায় তার ওপর,

“আদর করি মানে এই নয় যা ইচ্ছে করবি। আমাকে ট্রাস্ট করিস না তুই এতগুলো দিনের পরেও?”

​“না করি না, কি ভাবে করব বোঝাবে আমাকে? শপে গিয়েছি ওখানে গায়ে পড়ে ছিল। এখন বাসা খালি হতেই একা ডেকে এনেছে প্রতিবার আমাকে দেখলে কেন থেমে যায়?”

​কপালে ভাঁজ পড়ে তার, জেসি অহীনের দিকে তাকিয়ে আছে। আয়াশ আর তাইয়ানের বিষয় অন্য রকম হয়ত সেগুলো অতিরিক্ত কিন্তু অহীন তার কাছে কখনই অতিরিক্ত নয়। ছোট থেকে দেখে এসেছে অহীনকে আপন ভেবেই সে কি চায় অহীনের সংসার নষ্ট করতে। চোখ দিয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ার আগেই নাক টেনে দুই হাতে কান চেপে কান্না আটকে নিল। রাগ ও তাচ্ছিল্য নিয়ে অহীন বলে,

“তাহলে তুই এখনো আমায় বিশ্বাস করিস না?”

​আশা মুখ ফিরিয়ে নিল তার থেকে। দরজার সামনে অন্তিহা তাইয়ানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফোস করে শ্বাস নিল অহীন। জেসির দিকে তাকিয়ে মাথায় হাত দিয়ে আদুরে গলায় বলে,

“ও রাগী বলার সময় ভাবে না। কষ্ট পেয়ো না, এখন যাও। আর তুমি কি বলতে চাও পাপিকে বলে দিও। আমি আছি, পাপি তো আমাকে জানাবে তখন সামলে নেব সবটা।”

​অন্তিহা কয়েক কদম এগিয়ে জেসির হাত ধরে বেরিয়ে যায় রুম থেকে। অহীন গিয়ে ঠাস করে দরজা বন্ধ করল। কেঁপে উঠল আশা। অহীন রেগে গিয়েছে কিছু করবে নাতো ভেবে ভয় হচ্ছে তবে তার ভয়কে ভুল প্রমাণ করে বাথরুমে চলে যায় সে।

____

​টিকটিক করে করে ঘড়ির কাঁটা নড়ছে রাত দশটার বেশি। উইকেন্ড হওয়াতে বাসায় ছিল অহীন। সেই তর্ক হওয়ার পর থেকে আশা বা সে একে অপরের সঙ্গে কোনো রকম কথাই বলেনি। অন্তিহা ডেকেছে খাবারের জন্য কেউ বের হয়নি। এতে অতটা তাদের সন্দিহান বা নতুনত্ব নেই। অহীন বাড়িতে থাকলে আশাকে ঘরেই রাখে। আজকেও মেহমান না আসলে হয়ত পুরো দিনে খাওয়ার জন্য বের হতো বিছানায় পা মেলে ফোন চাপছে অহীন। চোখে ঘুম নেই, আশাকে সবার সামনে থাপ্পড় দেয়া নিয়ে ভাবছে। কিছুটা সময় পর রোজকার মতোই পাতলা একটা জামা পরে এসে শুয়ে পড়ল আশা। আজকে তবে অনেক চুপচাপ। আড় চোখে একবার তাকিয়ে ফোন রেখে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে আশাকে। আশার থেকে বাধা পেল না কোনো। অস্বস্তির সঙ্গে আরো কাছে যায়। হালকা করে টেনে নিজের দিকে ফেরায়, চোখগুলো ফোলা ফোলা মেয়েটার অনেক কেঁদেছে।

“কেঁদেছিস জান?”

​নাক টেনে নিল আশা কোনো উত্তর করল না। অহীন তার গলায় মুখ ডুবিয়ে দেয়। একটু ভালোবাসায় নিজেদের বিগড়ে যাওয়া মুড ঠিক করার জন্য সুযোগ করছে। আস্তে আস্তে আশাকে তুলে পরনের ড্রেস থেকে উন্মুক্ত করল সে। আশা তবুও নিশ্চুপ। ঝুঁকে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরল নিজ থেকেই আশার হাত নিজ গলায় পেঁচিয়ে দেয়। সে আশার প্রতিক্রিয়া চাচ্ছে। ওষ্ঠ ছেড়ে চিবুকে চুমু খায়। ধীরে ধীরে নেমে আসছে নিচে। নিজেকে আবৃত করে কম্ফোর্টারে। আশার হাত শক্ত করে ধরে ঘাড়ে নাক ডুবিয়ে, আশাকে সম্পূর্ণ নিজের করে নিল। এই পর্যায়ে কুঁকিয়ে উঠে আশার শরীর। অহীন প্রতিবারের মতোই উন্মাদ হয়ে আছে। বড় বড় শ্বাস নিয়ে ঘাড়ে চুমু দিচ্ছে ক্লান্ত গলায় হাঁপানো স্বরে আবার জিজ্ঞেস করে,

“কেনো আমাকে বিশ্বাস করিস না? তোর মনে হয় আমি অন্য কোনো নারীর মাঝে এভাবে হারাব?”

​আশার উত্তর নেই। অহীন আবার জিজ্ঞেস করে,

“করবি না কখনো বিশ্বাস?”

​এবার খুবই কষ্ট নিশ্বাসের মাঝে দিয়ে অস্ফুটে বলে ওঠে জোরে,

“না।”

​খানিকটা সময়ের বিরতি নিল অহীন। গতি ধীর হলো। হাঁপাচ্ছে। তবে ভালো লাগছে না কিছু। আশাকে অবাক করে দিয়ে সরে আসে তার কাছ থেকে। তবুও আশা কিছু বলল না। কম্ফোর্টার দিয়ে শুধু নিজেকে ঢেকে নিল। সিলিংয়ের দিকে কিছুটা সময় স্থির নয়নে তাকিয়ে থেকে নেমে যায় অহীন। ঘুম তার আসবে না। বাথরুমে গিয়ে লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে সোজা রুম থেকেই বের। শরীর মুচড়ে চোখ বুজে নিল আশা।

____

​বাসা থেকে বের হয়ে গেটের সামনে নীরব ল্যাম্পপোস্টের নিচে গিয়ে পকেট থেকে সিগারেট বের করে। লাইটার আগুন সিগারেটে জ্বালিয়ে ওপরের দিকে ধোঁয়া ছাড়ল। ধোঁয়াগুলো কুণ্ডলী পাকিয়ে মিলে যাচ্ছে আকাশের সঙ্গে। ভালোবাসলে কতটাই না সইতে হয় ভালোবাসার মানুষটির। পা ফেলে সামনের দিকে তার থেকে খানিকটা দূরে চেনা গাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে। সাফওয়ান হয়ত ভেতরেই ঘুমাচ্ছে। গাড়ির সামনে গিয়ে গ্লাস দিয়ে উঁকি দিতেই বিস্মিত হলো। গেম খেলছে ফোনে জানালায় ঠকঠক শব্দ করলে কাচ নামায় সে। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,

“শেষ এত ফাস্ট? আমার কাছে কেন? ইয়ার ডাক্তার দেখা।”

​অহীন হাত বাড়িয়ে ওর মাথায় চাপড় দিয়ে বলে,

“তুই সত্যি অসভ্য একটা।”

​সাফওয়ান নেমে আসে গাড়ি থেকে। ভেজা চুল ও সোপের সুবাস আন্দাজ করল ছেলেটা হতাশ খুব। কাঁধে হাত দিয়ে ঝাড়ি দিয়ে বলে ওঠে,

“কি দরকার ছিল তোর বোনের সামনে আমাকে এভাবে বলার। এখন ভাববে আমি কত বড়। বুড়ো না ভেবে বসে।”

​অহীন ‘চ’ করে বিরক্তি প্রকাশ করে,

“ও আয়াশকে লাইক করে। ওর থেকে তিন বছরের ছোট তুই। এখন মেয়েরা বয়সে বড় ছেলেদের পছন্দ করে।”

​“অন্তিহা আর আশা দু'জন আয়াশের এত পক্ষবাদী বাবাহ। আমি অনেক জেলাস হই এতে। তুই হোস না?”

​অহীন নির্জন পথে তাকিয়ে থেকে বলে,

“হই কারণ আমার বউ আমার বোন ওকে নিয়ে একটু বেশি নাচে। আমার পক্ষে কেউ নেই।”

​সাফওয়ান জিজ্ঞেস করে,

“অন্তিহা কবে থেকে ওকে পছন্দ করে? আমি এত জিজ্ঞেস করি তবুও স্বীকার করে না ভালোবাসা। আমি মেরে ফেলব আয়াশকে।”

​“তাই জন্য করবে না, আমি বুঝতে পেরেছি যখন আয়াশ আশাকে প্রপোজ করেছিল তখন।”

​সাফওয়ান ওর দিকে ফিরে তাকায়,

“হেই তোর বোনটাকে দিয়ে দে।”

​অহীন মেকি হাসে,

“মোয়া? দিয়ে দে! ও যাকে ইচ্ছে তাকেই বিয়ে করুক আমাদের তরফ থেকে চাপ নেই।”

​তাচ্ছিল্য করে মজা নিল সাফওয়ান,

“তোদের তো চাপ দিয়েই বিয়ে করিয়েছে! নাটকবাজ।”

​“এই জন্যই বউ বিশ্বাস করে না, দিনরাত মারা খাই। শান্তিতে আজকে ** করতে পারলাম না ইয়ার। সে মিথ্যা বলে না, পরম সত্যবাদী! একবার মুড রাখার জন্য যদি বলতো বিশ্বাস করে কি হতো? মুডটা পুরো নষ্ট করে দিয়ে এখন হয়তো ঘুমাচ্ছে। আরে ভাই, এত ট্রাস্ট ইস্যু কেন হবে? আমাকে কি এমন লম্পট মনে হয় যে যার তার মাঝে মেশিন ** দেব?”

​অহীন এক শ্বাসে এতগুলো কথা বলে থামে। সাফওয়ান গলা খাঁকারি দিয়ে অহীনকে ইশারায় পেছনে দেখায়। ঘুরল না অহীন বরং আরো ভরকায়,

“থামাস না ভাই, ওর আইডিয়া নেই কত কন্ট্রোলে থাকি আমি। ধরলেই হাসপাতাল, তাই ধরিও না আমি। এখন ঠিক পরকীয়া করব তখন বুঝবে শালী।”

​সাফওয়ান অহীনের দুই পাশের বাহু ধরে ঘুরিয়ে দিল আচানক। থমকে গেল অহীন। কপালে হাত দিয়ে ঠোঁট গিলে নিল। আশা ওর দিকে,

“করবা তুমি মেয়েদের সঙ্গে ঢলাঢলি, আর আমি কথা বললেই গায়ে হাত তুলবে? একটা 'সরি' পর্যন্ত বলার ভদ্রতা নেই, উল্টো গায়ের ওপর উঠে পড়েছো। আবার তোমার মুডও চাই? ওয়াও মিস্টার শিকদার! মার্কেটে প্লাস্টিকের চামড়া কিনতে পাওয়া যায়, নিজের জন্য একটা কিনে নিও।”

​আশা এসেছিল ডাকতে তাকে। তবে এমন ভাষায় রক্ত উঠেছে মাথায় আর কথা নয় এর সঙ্গে। হনহনিয়ে আবারও বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল সে।

হাঁসফাঁস করছে অহীন সাফওয়ান হতবুদ্ধির মতো তাকিয়ে দেখছে শুধু। অন্তিহা কি এমন করবে তার সঙ্গে? সেদিনের রোমান্স দেখে শখ হলেও এখন অহীনের ফ্রাস্ট্রেশন দেখে শখ গুজে গিয়েছে। অহীন তার গাড়িতে লাথি দিয়ে বলে,

“দেখলি কত বড় বেয়াদব? আজকে দেখাবো প্লাস্টিক আর ওর মধ্যে পার্থক্য কি।”

​চলে গেল অহীন। আশার কপালে না জানি কি আছে। সাফওয়ান আবার গাড়িতে বসে। মিস গম্ভীরের জন্য চিন্তা হচ্ছে। যা রাগ নিয়ে গেল অহীন না জানি ঘুমাতে পারবে কি না।

“আহহহ মিস আপনাকে নিয়ে ঘুমানোর সময়ের কন্ট্রোললেস কাপলের ঝগড়া দেখি। আমিও করতে চাই… ঝ..গ…ড়া।”

চলবে.......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন