#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ এক্সট্রা #বোনাস.....
“এভাবে পাগলের মতো কেন থাকিস সোনা? আমার বউকে থাকতে হবে সব সময় ফিটফাট। যেন দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে করে।”
“পাগলের মতো থেকেও তো কখনো একটু ছাড় পাই না, সাজলে তুমি আমাকে শ্বাস নেয়ার সুযোগ দিতে?”
আশার জটপাকানো চুলগুলোতে চিরুনি করে দিচ্ছে অহীন। অজানা কত দিন আশা চুলগুলো আঁচড়ায়নি। এই তো কিছুক্ষণ আগেও নড়তে পারছিল না আশা। আশার মত পেলে অহীন হাতে চাঁদ পাওয়ার মতোই খুশি হয়। আজকেও ব্যতিক্রম ঘটেনি কিছুই। অসুস্থ স্ত্রীকে কোলে নিয়েই গোসল করিয়েছে বাথটাবে বসিয়ে, চুলে হাত রাখতেই ভেজা একটা গন্ধ ঠেকে নাকে। উন্মুক্ত বদনে ক্ষতহীনা কিছুই নেই। চুলে নিজ হাতেই শ্যাম্পু করে দিয়েছে। অর্ধচেতনা নিয়ে ছিল আশা। বিছানায় অনেকটা সময় ঘুমিয়েছে। অহীনের সংকোচ থাকে নিজের স্বভাব নিয়ে, কেননা একটা মেয়ে শরীরে এত অত্যাচার নিতে পারবে না, আদৌও কি অত্যাচার? উহু, অহীনের ভাষায় ভালোবাসা। আশার মেকি হাসির কথায় অহীন বলে,
“এমন করে বলছিস যেন তোর ভালো লাগে না? শুরুতে তো খুব আমার নাম জপিস। ঢঙি, এখন থেকে সাজতে হবে।”
আশা তার হাতের চিরুনি নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে ফোঁস করে জিজ্ঞেস করে,
“আমি বিবাহিত, এত সাজব কেন? আবার ঘটক ডেকে বিয়ে করাতে চাও ভাইয়া?”
আশার গাল ধরে ভ্রু কুঁচকে আচ্ছা মতো টেনে দিয়ে বলল,
“তোর মতো পাকা তালের বিচিকে আমি ছাড়া কেউ সামাল দিতে পারবে? তুই আমার জন্য নিজেকে পরিপাটি রাখবি। মাথায় ঢুকেছে কথা?”
“আহহহ সরো, লেট হচ্ছে না?”
“হুম, চল।”
দুপুর থেকে আশাকে নিয়ে ঘুমিয়েছিল অহীন, শপে আগামীকাল গেলে আবার উইকেন্ডের আগে কোনো ছুটি নেই। তাই অল্প সময়ই একটু ঘুরবে আজ বউটাকে নিয়ে। গত রাতে থাপ্পড় দিয়েছিল সঙ্গে শরীরের ওপর এত চাও! বাড়িতে থাকলে সে আবার শুরু করবে। আশাকে নিজের পছন্দ মতো একটা জামা পরিয়েছে সে। হাঁটতে একটু সমস্যা হয়, তবুও ঘোরার জন্য মনটা ছটফট করছে তার। আজ আর বাইক নিল না, ঘোরার জন্য আর আশার জন্য পায়ে হাঁটাই ঠিক হবে কেননা পায়ে ব্যথা থাকে সবসময়।
______
সন্ধ্যাবেলা রাস্তায় দাঁড়িয়ে সারিসারি লোক স্ট্রিট ফুড খাচ্ছে। জমজমাট পরিবেশ দেখতে আনন্দই লাগছে অন্তিহার। হাতে স্টিক ধরিয়ে দিয়েছে সাফওয়ান। তার ভালোই লাগে উল্টাপাল্টা ইঙ্গিত করে মজা নিতে। কপাল কুঁচকে ফোঁসফাঁস করছে অন্তিহা, রাগ নিয়ে স্টিকে দাঁত বের করে টান দিতেই ভয়ে কুঁচকায় সাফওয়ানের শরীর। ইঙ্গিতমূলক স্থানে হাত চেপে পিছিয়ে গেল একটু।
“সাবধানে, আপনার দাঁতগুলো রিস্কি।”
তবে দু-একটা কামড় দিয়ে হয়ত খাবারটা ভালো লাগল অন্তিহার। ঠোঁটের কোণে হাসি ফোটে, এবার অন্য দিকে ঘুরল, কেননা সাফওয়ানের প্রতিক্রিয়া দেখে গা ঘিনঘিন করে। তার কি আয়াশের মতো শুচিবায়ুর সমস্যা হলো নাকি? তাকে উল্টোদিকে ঘুরতে দেখে সে সামনে গিয়ে দাঁড়ায় আবার,
“কী সমস্যা?”
“কী সমস্যা হবে, খাচ্ছি তো।”
সাফওয়ান তার উত্তরে ভরকে জানায়,
“অন্য দিকে ফিরে আমাকে অচেনা বানান কেন?”
অন্তিহা ঠোঁট বাঁকায়৷ খেয়াল হয় সাফওয়ান তাকে খাওয়াচ্ছে সেই থেকে, নিজে কিছুই খাচ্ছে না। হাঁটতে হাঁটতে প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে বলে,
“খাবেন?”
“আপনার লিপস।”
নির্জন সন্ধ্যা, ফ্রান্সের পথঘাটে মানুষের কোলাহল প্রায় কমে গিয়েছে। পেছনে সকল কোলাহল ছেড়ে এসেছে, অন্তিহা ভাবান্তর হয়ে আছে, সে সাফওয়ানকে কিছু বলতে চায় তবে হয়ত নিজস্ব দ্বিধাদ্বন্দ্বের জন্য বলছে না। সাফওয়ানটাও মুহূর্তে চুপসে গিয়েছে। অন্তিহা এবার দীর্ঘশ্বাস নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আপনার প্যারেন্টস কোথায় থাকে? বাড়িতে দেখিনি!”
সাফওয়ান তার দিকে তাকিয়ে আবার পথের দিকে তাকায়, ফোঁস করে বলে,
“ড্যাড আছে বিডিতে, মম নেই।”
“আপনি আর ইশারা একা থাকেন? আপনার ড্যাড কেন থাকে না?”
বাঁকা চোখে তাকাল তার দিকে ছেলেটা, বিব্রত ভেবে অন্তিহা বলে ওঠে,
“পার্সোনাল হলে বলতে হবে না।”
সাফওয়ান ফিক করে হাসল, বলল,
“আমি মানুষটাই আপনার, আমার আবার পার্সোনাল কী আপনার নিকট?”
কথাটা বলেই চুপ হলো, অন্তিহা ফের প্রশ্ন করল না। সে একটু গলা ঝেড়ে নিল। সাফওয়ান বলল,
“ওনারা সেপারেশন নিয়েছিল, মম এর হোম কান্ট্রি এটা আর ড্যাড বাংলাদেশি। আর সচরাচর তো ডিভোর্সের পর সন্তান মায়ের কাছেই থাকে। আমার মম ডিভোর্সের পর দ্বিতীয় বিয়ে করেন, ইশারা আসে। দ্যান কার এক্সিডেন্টে মম আর ওনার হাসবেন্ড মারা যান।”
“আপনার ড্যাড খোঁজ নেয় না?”
সাফওয়ান বেশ উৎসুক হয়েই উত্তর করল,
“যোগাযোগ আমাদের নেই বললেই চলে, তবে ফাইনান্সিয়াল কোনো প্রবলেম আমাদের কখনোই হয় না। মম সফল বিজনেস ওমেন ছিলেন। নিজের পরিবারের একমাত্র সন্তান। অন্যদিকে ড্যাড ছিলেন তার পরিবারের একমাত্র ছেলে। আর আমার মায়ের হাসবেন্ড? উনি আন্ডারওয়ার্ল্ডের গ্যাংস্টার। এসব আমার আর ইশুর। এখন মম এর পুরো কোম্পানি একজন ম্যানেজার হ্যান্ডেল করে, কিন্তু আমার সাইন বা অ্যাপ্রুভাল ছাড়া না। তবে স্যুট, প্যান্ট আর টাইয়ের ফর্মাল গেটআপটা ক্যারি করতে আমার বড্ড ইয়াক লাগে। তাই ঘুরি শুধু। সব পেয়েছি তাই শ্রম জিনিস টা করতে ইচ্ছে করে না।"
নাক-মুখ কুঁচকে নিয়েছে এই পর্যায়ে যেন খাটুনি করা সত্যি বাজে। অন্তিহা চোখে হাসছে তার অঙ্গভঙ্গি দেখে, কিছুটা দূরেই পার্কিং, এবার চারপাশ সম্পূর্ণ নীরব। পুরোটা দিন হিল পরে থাকায় পায়ের গোড়ালি টনটন করে ব্যথা করছে। হাসির সঙ্গে ওর মুখে ব্যথায় কষ্টের ছাপ লক্ষ করে সাফওয়ান পায়ের দিকে ঝুঁকে তাকায়,
“বেশি ব্যথা করছে পায়ে? কেন হিল পরতে গেলেন? খুলে ফেলুন।”
বলে নিজেই ঝুঁকে জুতোর ফিতাগুলো খুলে দিচ্ছে। তাকে গভীর চোখে দেখছে অন্তিহা, জুতো খুলে সোজা হয়ে দাঁড়ায়, পায়ের পাতায় শান্তি অনুভব করে শরীর ছেড়ে দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ায় অন্তিহা। আকাশ মেঘলা হয়ে আছে, হয়ত বৃষ্টি হবে। চারপাশে বাতাস। তবুও গরমে হাঁপাচ্ছে অন্তিহা। প্রেয়সীর ওঠানামা করতে থাকা শ্বাসের দিকে এক অপলক দৃষ্টিতে, একটু একটু করে এগিয়ে দেওয়ালে এক হাত রেখে ঝুঁকে আসে অন্তিহার দিকে,
“মিস, আপনার লিপস দেওয়ার কথা ছিল।”
নিশ্চুপ অন্তিহা, তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে, সাফওয়ান ঝুঁকে যায় আরও নিকট, তার উদ্বেগ বুঝতে পেরে অন্তিহা আচানক জিজ্ঞেস করে,
“আপনি আগেও কোনো মেয়ের সঙ্গে শুয়েছেন?”
বিস্ফোরণের মতো প্রশ্ন শুনতেই ‘চ’ চটে যায় সে, মুডের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। ফোঁস করে শ্বাস নেয় অন্তিহা, সাফওয়ানের মুখভাব বলে দিচ্ছে প্রশ্ন একদম ঠিক জায়গায় ছুঁড়েছে। এখন নিশ্চয়ই নিজ পাক্ষিক হাজারটা সাফাই গাইবে। তবে তাকে অবাক করে দিয়ে সাফওয়ান বলে ওঠে,
“হ্যাঁ, ৫ জনের সঙ্গে।”
বিস্ময়ের ওপর বিস্ময়, সে সন্দেহ করেছিল হয়ত এক বা দুই বার এমন কিছু। এই ছেলে তো বোমা ছুড়ল পুরো।
“৫টা মেয়ের সঙ্গে আপনি ** করেছেন?”
তাকে আরও অবাক করার জন্য পটপট করে সে আবার বলতে থাকে,
“প্রথমটার সঙ্গে সিরিয়াস ছিলাম, তাই লিভ-ইন এ ছিলাম দীর্ঘ সময়, প্রায় ৬ মাস। পরে শালি স্লাট চিট করেছে আমাকে। তারপরের টা একদম পিওর লাভ ছিল। কিন্তু বাঙালিদের একটা কথোপকথন আছে না? যদি থাকে নসিবে আপনি আপনি আসিবে! ওরে জোর করে ওর পরিবার বিয়ে দিয়ে দিল।”
খুকখুক করে কেশে অন্তিহা জিজ্ঞেস করে,
“ওর সঙ্গে লিভ-ইন এ ছিলেন?”
“আরে না, পাগল নাকি? ও চিক্কু টাইপের মেয়ে ছিল। মাঝেমধ্যে বাড়িতে চলে আসত। আর বাড়া ভাত ফেলে কে দেয়? তাই একটু-আধটু।”
“আপনি সিরিয়াস ছিলেন না কার সঙ্গে? আর বাকিরা?”
সাফওয়ান গলা খাঁকারি দেয়, মিনমিন করে বলে,
“ওরা সিরিয়াস হওয়ার আগেই ব্রেকআপ করে নিয়েছি। আপনাকে দেখার পর ওদের প্রতি রুচিইইই..।”
বলতে বলতে নিজেই থেমে গিয়েছে সে, কেননা অন্তিহার গম্ভীর নজর তাকে গ্রাস করে দিচ্ছে। অন্তিহা তারই ভঙ্গিতে স্পষ্টভাবে বলে দিল,
“আই অ্যাম স্টিল ভার্জিন, আমি কেন জেনে-শুনে একটা প্লে-বয়কে সুযোগ দেব? যেখানে আপনি আমার সামনে এক্সকে গালি দিলেন। আমাকে কিস করার জন্য মরিয়া হয়ে আছেন। আমি রিজেক্ট করলে আমাকেও গালি দেবেন।”
“আপনার রিজেক্ট করার অপশন নেই। আই অ্যাম সরি, বাট আমি..।”
“বলুন, আমি শুনছি। আপনি?”
সাফওয়ান শুকনো ঢোক গেলে, হয়ত তার বলা উচিত হয়নি, মেয়েরা তো নরম মনের হয়। সেও কি তবে বাকিদের মতো অন্তিহাকে অনুভূতিহীন ভাবতে শুরু করেছে? নাকি অন্তিহা তার এক্সদের নিয়ে জেলাস? সত্যি বলে বিব্রত হয়ে আছে খুব। এগিয়ে গিয়ে বলে,
“আই অ্যাম সরি। আমি একা বড় হয়েছি, কখনো কারো প্রতি স্ট্রং ফিলিংস কাজ করেনি। বাড়িতে মেয়ে নিলেও কেউ বাধা দেয়নি। বাট আই সোয়্যার মিস, আমি আপনাকে দেখার পর কোনো মেয়ের দিকে তাকাইনি, ট্রাস্ট মি।”
মাথা নিচু করে শুধু ভারী গলায় জিজ্ঞেস করে,
“অহীন ভাইয়া জানে?”
“নাহ, ওর সঙ্গে আমি জাস্ট এক বছর ছিলাম, তখন ফার্স্ট ব্রেকআপ হয়েছিল। আর আমি কাউকে গার্লফ্রেন্ড নিয়ে বলতাম না। আপনাকেই শুধু প্রকাশ করেছি দুনিয়ার কাছে। কারন রিয়েলি আই লাভ ইউ।”
টলটল করতে থাকা চোখ দিয়ে নিজ থেকেই জলবিন্দু গড়িয়ে পড়ল নিচে, তার কান্না করতে দেখে বিচলিত হলো সাফওয়ান। সে রিয়ালাইজ করছে কত বড় ভুল করেছে এটা বলে। এগিয়ে বাহু ধরতে চেয়ে বলে,
“অন্তিহা, কেন কান্না করছ, আই প্রমিজ আমি আপনার জন্য ফিল করি, ওরা জাস্ট এমনি বেড পার্টনার ছিল। আপনি জেলাস হয়ে কান্না করছেন?”
মাথা দোলায় অন্তিহা, ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে,
“জেলাস? আমি জেলাস হইনি। আমি কাঁদছি এটা ভেবে যে, এই আমি কখনো কারও ফার্স্ট চয়েজ হতে পারলাম না। প্রদীপেরও না, সে আমার জন্য ব্রেকআপ করেছিল! এমনকি নিজের ফ্যামিলির কাছেও না। মামা-মামির কাছেই বড় হয়েছি, কারণ আব্বু-আম্মু ব্যস্ত ছিল নিজেদের নিয়ে, ভাইয়া আসার পর সবাই তাকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে থাকত। আমার ভাগ্যে একটুখানি ভালোবাসা জুটত। কিন্তু আমি? এতগুলো ভালোবাসা চাই কেউ বোঝে না! সারাজীবন শুধু 'ভদ্র মেয়ে' হয়েই কাটালাম। আজ আপনার দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল, একটুখানি আপনার মতো হই। কিন্তু আপনি তো আমার কল্পনার চেয়েও নিচ, ভীষণ অভদ্র! আরে ভাই, নিজের অনুভূতিগুলোকে আটকে রাখা আমি খুব ভালো করেই জানি। নতুন করে আর বিরক্ত করতে আসবেন না, প্লিজ। লিভ মি সাফওয়ান!”
“অন্তিহা, আমি আপনাকে ভালোবাসি, আপনি ফার্স্ট আমার লাইফে, ওসব আমার ছেলেমানুষি ছিল। প্লিজ ডোন্ট ক্রাই বেইবি।”
“আপনি জানতে চান আমি কাকে ভালোবাসি?”
চোখের দিকে তাকায় তারা একে-অপরের, সাফওয়ান আজ শুনতে চায় না। তাই মাথা নেড়ে না বলে, তবে শুনল না ক্রন্দিত নারীটি, বলল,,
“আয়াশকে ভালোবাসি আমি, প্রচণ্ড ভালোবাসি! কিন্তু... ওহ, ফাকিং বুলশিট! তার ফার্স্ট বা লাস্ট কোনো অপশনেই আমি নেই। কারণ, সে-ও মনে করে আমার কোনো অনুভূতি নেই। ঠিক আপনার মতো! আপনিও তো অবলীলায়, কত সহজে বলে দিলেন যে পাঁচটা মেয়ের সাথে ** করেছেন! একবারও ভেবেছেন কথাটা শুনে আমার কেমন লাগবে? যদি একটুও আপনার জন্য কিছু ফিল করতাম আমার কেমন লাগত? আপনারা সবাই ভাবেন আমার কোনো ফিলিংস নেই, থাকলে আমি কষ্ট পেতাম। আমি ভাবতাম আপনি সবার চেয়ে আলাদা। উহু, ভুল ভাবতাম! আসলে আপনার কাছেও আমি রক্ত-মাংসের কোনো মানুষ নই, একটা ইমোশনলেস স্ট্যাচু মাত্র!”
একটু থামে, সাফওয়ান বোকা বনেছে সেই কখন। নিজের গালেই থাপ্পড় মারতে ইচ্ছে করছে। যেখানে সে এটাই সহ্য করতে পারে না অন্তিহা কাউকে ভালোবাসে, তাও একতরফা, সেখানে সে নিজের এত বড় একটা সিক্রেট বলে দিয়েছে। নিজের চুল টেনে ধরে,
“অন্তিহা বেইবি, আই অ্যাম সরি! আমি কোনো কিছু হাইড করতে চাইনি, যা ছিল সব ওপেনলি বলে দিয়েছি। ওদের সাথে কোনো ইমোশনাল কানেকশন ছিল না আমার, জাস্ট ফিজিক্যাল নিডসগুলো ফুলফিল করতাম। আর, ওদের যে বাইকে চড়াতাম, আপনার জন্য সেই বাইকটাই বদলে ফেলেছি আমি, সুইটি। এরপরও কি বিশ্বাস করবেন না?”
“আমি অবিশ্বাস করছি না আপনাকে, বরং প্রচুর বিশ্বাস করি। যাই হোক, কথা ছিল হয়ত বেছে নেব নয়ত আমার পিছু ছেড়ে দেবেন। আমি অপশন ২ সিলেক্ট করেছি। কালকে থেকে আমার পিছু নেবেন না।”
চোখের পানি মুছে দৃঢ় গলায় বলে,
“আপনি সুযোগ চেয়েছেন আমি দিয়েছি, এর বেশি আর নয়। আমার পিছু নেবেন না প্লিজ। আপনাকে আমি ভালোবাসব না। আমি সিঙ্গেল থাকা বেছে নেব আপনার মতো লাইফ পার্টনারের চেয়ে।”
আজ আর সাফওয়ান আটকালো না আর না কোনো বেয়াদবি করল তার সঙ্গে। একদমই নিশ্চুপ বনল এক পর্যায়ে, তার হাত থেকে ছো মেরে জুতো নিয়ে নিয়েছে অন্তিহা, হয়ত এটাও ছেলেটা অনুভব করতে পারেনি। নিষ্প্রভ হয়ে কান্নার দিকে তাকিয়ে আছে। সে সত্যি এই ছোট মেয়েটির হাসির প্রতি অন্য কিছু ফিল করে, আর কান্নাতেও উপভোগ করছে। কাঁদলে কোনো মেয়ে এত সুন্দর হয় সে ভাবেনি। মনে কিঞ্চিৎ আক্ষেপ নিয়ে অন্তিহার পেছনে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করে বলতে থাকে,
“আমি চাই, এই কান্না রোজ দেখতে চাই। কিন্তু ব্যথা নিয়ে নয়, সুখ নিয়ে। মিস গম্ভীর, কেন বুঝতে পারছেন না? ওইসব স্লাট আর আপনি কতটা ভিন্ন? আই লাভ ইউ আর আপনিই প্রথম।”
____
“অন্তুটার খোঁজ করলে না একটিবার অহীন? মেয়েটা কোথায় আছে কে জানে?”
“চিন্তা করিস না সোনা, ওর সঙ্গে একটা পার্সোনাল গার্ড আছে।”
আইসক্রিম খাচ্ছে আশা আর অহীন, হাতের ভাঁজে হাত পুরে নিয়েছে শক্ত করে, আশার মনটা আজ ভালো, হাসি দেখেই অহীন উপলব্ধি করছে। কাছে টেনে আর একটু নিজের সঙ্গে চেপে ধরে হাস্যস্বরে বলে,
“বৃষ্টি হবে সোনা, চল বাড়ি চলে যাই, মেট্রো নিলেও ভিজতে হবে।”
আশা ছোট করে আবদার করে,
“ভিজব জান।”
আশার মুখ থেকে জান সম্বোধনে সম্মোহিত হলো। চোখের পলক কয়েক বার ঝাপটে দিয়ে, কোনো রকম বাক্য ব্যয় না করেই মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিল। একটা ডাক বশ করে নিয়েছে তার মন-মস্তিষ্ক। খুশিতে আত্মহারা আশা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তাকে। পাল্টা জড়িয়ে ধরে প্রেয়সীর সঙ্গে নিজেও হাসে অহীন। দীর্ঘশ্বাস নেয়। আশার মুখ তুলে নিজের দিকে করে, একটা জলবিন্দু টপ করে আশার গালে পড়ল, চোখ বুজে নিল সে। এতে হয়ত আনন্দের কিছু নেই, তবুও হাসছে অহীন, অদ্ভুত রকম মায়া হচ্ছে। জলবিন্দুটুকু ঠোঁট দিয়ে শুষে নিল সে। বলল,
“একটা সত্যি সত্যি কথা বলব?”
“এত দিন মিথ্যা বলেছ?”
ফিক করে দাঁত দেখিয়ে হাসে অহীন, উত্তেজনায় লাল হয়ে আছে তার গাল, বলে,
“বলার সুযোগ দিলে আগে আর এখন সত্যই বলতাম।”
আশা তার গালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“বলো।”
মলিন হলো অহীনের মুখ, বাচ্চাদের মতো নড়েচড়ে আশার কোমর জড়িয়ে ধরে ঠোঁট উল্টায়, মিনমিন করে বলে,,
“আমি না? কখনো প্রেম করিনি! আজ খুব প্রেম করতে ইচ্ছে হচ্ছে।”
তার কথায় ঠোঁট টিপে হাসি নিয়ন্ত্রণ করল আশা, গলায় পেঁচিয়ে ধরল, চোখে চোখ একে-অপরের। নীরব পথে আলতো করে সে অহীনের পায়ের পাতায় ভর দিয়ে উঁচু হয়ে জিজ্ঞেস করে,
“তো এখন তোমার জন্য মেয়ে খুঁজব?”
হিস হিস্ করে অহীন,
“উহু, তোর সঙ্গেই করতে চাই।”
“তুমি জানো প্রেম কীভাবে করে?”
“শিখিয়ে দে?”
কোমর থেকে অহীনের হাত টেনে নিজের হাতে রাখল আশা, পায়ের ওপর শরীর ছাড়ল। বাতাস ধীরে ধীরে বইছে। দুজনের চুলগুলো উড়ছে। আশা তার হাতের আঙুলের ভাঁজে নিজের হাত রেখে নড়ে হিস্হিস্ করে গায়..
Kyun ek pal ki bhi judaai sahi jaaye na
Kyun har subah tu meri
saanse mein samaaye na
বাতাসের উড়ন্ত চুলের সঙ্গে দুলছে দুজন নর-নারীর শরীর, অহীনের হয়ত আজকের মতো দিন কখনো আসেনি। আশার অভিমানটা ভাঙানো উশুল হয়েছে। নয়ত কোথায় পেত এই অনুভূতি, যা নির্জন পথ তৈরি করছে আশাকে নিয়ে। তার শুরুটাই তার পেঁচি নিজে করেছে। ধীর পদক্ষেপে নাচের তালে অহীন আশাকে ছেড়ে ঘুরিয়ে নিজের কাছে আনতে আনতে গেয়ে উঠল নিজেও,,
Aa jaana tu mere paas
dunga itna pyar main
Kitni Raat guzaari hai tere intzaar mein
-;---------
Sab kuchh chhod ke aana
tu, saawan aaya hai
Tere aur mere milne ka
mausam aaya hai
বিছানায় ধপ করে পড়ে অন্তিহার ক্রন্দনরত মুখটার কথা ভেবে সাফওয়ান গেয়ে যাচ্ছে। চোখ বুজে কল্পনায় বারবার কান্নাগুলো ভাসছে, বরঞ্চ সে হাসছে। শরীর শিরশির করছে ভাবতেই, অন্তিহা জেলাস হয়েছে আজ তাকে নিয়ে। কিঞ্চিৎ তাতেও চলবে। দরজায় ইশারা এসে চলে গিয়েছে ভাইকে দেখে। তবে হুঁশ নেই, সে তো ভাবনায় মত্ত প্রেয়সীর।
Sab se chhupa ke tujhe
seene se lagaana hai
Pyaar mein tere had se guzar jana hai
Itna pyaar kisi pe
pehli baar aaya hai
____
বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা গায়ে এসে পড়ছে, অহীনের হুঁশ ফিরতেই দুজন কাকভেজা হয়ে গিয়েছে, তবে আশা ছাড়তে রাজি নয়। ঠোঁট ভিজে জবজব করছে। আশাকে নিজের কাছে এনে হিসহিস করে বলছে চলে যেতে, আর ভেজা ঠিক হবে না, আশার নিউমোনিয়ার সমস্যা আছে। তবে আশার নাকচ, সে অহীনের সঙ্গে ভিজতে চায়। এসব কি অবাক করছে না অহীনকে? এই তো কত ঝামেলা হলো তবুও সব ঠিকঠাক হয়ে গিয়েছে, আবারও নিজেরা ভালোবাসায় মেতে আছে। আশা উৎসুক হয়ে দুই হাত মেলে অহীনের চারদিকে ঘুরছে।
নিজেকে সামলে উঠতে পারল না অহীন, পেছন থেকে প্রেয়সীর হাতে হেঁচকা টানে নিজের কাছে নিয়ে আসে। আগাম সতর্কতা ছাড়াই গভীরভাবে নিজ অধরে ছুঁয়ে দিল আশার ঠোঁট। আলতো করে গালগুলো নিজের দিকে তুলে ধরে শুষে নিচ্ছে বৃষ্টির পানির সঙ্গে আশার অধরসুধা। আনন্দিত মস্তিষ্ক কী হয়েছে বুঝতে কিঞ্চিৎ সময় নিল আশার, চোখে-মুখে অহীনের চুলের পানির জন্য তাকাতে পারছে না। বুঝে বুকে ধাক্কা দিলেও ছাড়ল না তার স্বামী তাকে। বরং আরও ঘনিষ্ঠ হতে চাইছে। অহীন চোখ পিটপিট করে তুলতেই কিছুটা দূরে টেলিফোন বুথ চোখে পড়ে, আলতো করে নিতম্বে চাপ দিয়ে কোলে তুলে নিল তবুও অধর ছাড়ল না। মাঝপথে কি তার একটুও খেয়াল আছে? চারপাশ এমনিতেই সুনসান, বৃষ্টিতে এবার কোনো প্রাণের আনাগোনাও নেই। দরজা খুলে ভেতরে নিয়ে এক প্রকার চেপে ধরে অধর ছেড়ে নিচে নেমে আসে অহীন, গলায় মেতেছে এবার, নিঃশ্বাস ভারী চলছে খুব, আশা হাঁপাচ্ছে, বলছে...
“অহীন, এটার চারপাশ থেকে দেখা যায়, এখানে কিছু করো না।”
নেশালো দৃষ্টিতে ভেজা শরীরটা দেখে নিল অহীন তার, উত্তেজিত ব্যাকুল গলায় বলে,
“এটা বিডি নয়, কেউ কারো দিকে তাকানোর সময় নেই এখানে। তবুও রিল্যাক্স, আমি কিছু করব না। শুধু ঠোঁট ছোঁয়াবো।”
আরও নিচে নামছে অহীন, আশা তাকে বাধা দিতে চায় তবে প্রতিবারের ন্যায় এবারও শরীর সঙ্গে নেই, চোখ এদিক-সেদিক ঘুরিয়ে স্থান পর্যবেক্ষণ করে নিল। সত্যি কেউ নেই। শরীর ও অহীনের জেদের কাছে হার মানল এবারেও। এক হাঁটু মুড়ে বসে আছে অহীন, আশার পা হাতে তুলে তালুতে আলতো চুমু খায়, আবেশে চোখ বোজে আশা। ঠোঁট অগ্রসর হচ্ছে, আশার বড় বড় শ্বাস পড়ছে আর অহীনের দিকে নেশালো দৃষ্টিতে। কাঁচের দেওয়াল খাবলে ধরার প্রয়াস করছে। হয়ত দেওয়াল তার সঙ্গে বেইমানি করছে খুব। পায়ের আঙুলগুলো অহীনের পিঠের কাপড় চিঁড়ে মাংসে ধরতে চাইছে। বৃষ্টিবিলাস বুঝি এমনও হয়? অহীন কি নিঃসন্দেহে তাকে ভালো রাখার সব রকম চেষ্টা করে না? অহীনের চুলের ভাঁজে নিজের হাত রেখে খাবলে ধরে যেন ছিঁড়ে নিয়ে আসবে আসবে। বন্ধ চোখে হালকা আলো আসতেই চোখ মেলে তাকায় আশা, সামান্য দূরত্ব থেকে গাড়ি আসছে একটি। হকচকিয়ে অহীনকে সরিয়ে দিতে চায়,
“অহীন আর না, বাসায় গিয়ে বাকিটা।”
ছাড়তে নারাজ অহীন, বাধা পেয়ে বরং আরও বিরক্তির সঙ্গে দাঁত বসিয়ে দিল। কুঁকিয়ে ওঠে আশা,
“আহহ।”
“আর একটু সোনা। ভালো লাগছে না?”
আশা ধাক্কা দিলেও সরল না, রাগ ও লজ্জায় বুকে সজোরে পা দিয়ে লাথি দিয়ে ফেলে দিল। ছলছল চোখে রাগ নিয়ে তাকিয়ে আছে, আশা ঝুঁকে নিজের কাপড় ঠিক করে গালি দেয়,
“ডি* হেড** ব্লাডি, গাড়ি দেখিস না চোখে? শুরু হলে থামে না।”
আশার কথায় গাল ফোলায় অহীন, নিজ আঙুল ঠোঁটে ছুঁয়ে বাইরে তাকায়, হ্যাঁ একটি গাড়ি আসছে। বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল সে, টেলিফোন বুথের দরজা খুলে বের হলো। বৃষ্টি কমে এসেছে একদম। গাড়িটি যাওয়ার অপেক্ষায় আছে তবে গেল কই? উল্টো এসে থামল তারই সামনে, ইচ্ছে করছে লাথি দিয়ে গাড়িটা উড়িয়ে দিতে। দাঁতে দাঁত পিষে হাজারটা নোংরা গালি দিতে ভুলল না সে। জানালার কাচ নামিয়ে আয়াশ চেঁচিয়ে ওঠে,
“এত রাতে? বউ কই? মাদারবোর্ড?”
ওমনি গুটিগুটি পায়ে আশা বেরিয়ে আসে অহীনের পেছন থেকে। ভেজা শরীরে কোনোমতে ওড়না দিয়ে শরীর ঢেকে নিয়েছে সে। আয়াশ অন্য দিকে তাকিয়ে আবারও অহীনের দিকে তাকায়, ক্রুর গলায় বলে,,
“বৃষ্টির মধ্যে ওকে নিয়ে ঘুরছিস তুই? ওর ঠান্ডায় নিউমোনিয়া হয়ে যায়, ইডিয়ট।”
অহীন ওর দিকে ঝুঁকে যায়, বলে,,
“শালা স্যানিটাইজার, মুডে ছিলাম। ভাই, তোর সময়জ্ঞান নেই? তুই কী বুঝবি? অবিবাহিত পিপল যত সব।”
ওর কথাটা গায়ে তো লাগল, তবে আশার কথা ভেবে তর্ক করল না, বলল,
“গাড়িতে ওঠ, ড্রপ করে দিচ্ছি। এত রাতে বাস বা মেট্রো পাবি না। ট্যাক্সি আসতে সময় লাগবে অনেক।”
অহীন প্রথমে নাকচ করলেও পরক্ষণেই আশার ভেজা বদনের দিকে তাকিয়ে রাজি হলো। অহীন উঠতে নিলে আশা তাকে থামিয়ে দেয়, আয়াশের থেকে পানির বোতল নিয়ে অহীনের পা ধুইয়ে দিল জোর করে, সে জানে আয়াশ ভেজা দেখে সাহায্য করলেও অস্বস্তিতে ভুগছে, ময়লা পা নিয়ে উঠলে হয়ত ড্রাইভ করাও তার জন্য মুশকিল হয়ে যাবে। গাড়িতে উঠে বিনয়ী ভঙ্গিতে আশা বলে,
“সরি।”
“অন্তু কে দেখেছিলাম দুপুরে সাফওয়ানের গাড়িতে।”
অহীন চুপ করে আশার কাঁধে মাথা রেখে ঘাড়ে নাক ঘষছে, ডেস্পারেট সে, আশা একটি হাত দিয়ে তার হাতে চাপড় দিয়ে শান্ত করছে। আয়াশের প্রশ্নের উত্তরে বলে,
“হ্যাঁ, বলেছে ওর সঙ্গে থাকবে আজ।”
ভরকানো গলায় আচানক চেঁচিয়ে ওঠে,
“রাতে?”
মেকি হাসে আশা,
“না, এতক্ষণে হয়ত বাড়ি চলে গিয়েছে।”
বলতে বলতেই আয়াশ গাড়ি হঠাৎ সজোরে ব্রেক কষে, বাইরে বৃষ্টি নেই, সে গাড়ির ডোর ওপেন করে নামতে নামতে বলে,
“গাইজ ৫ মিনিট, আমার বাসার জন্য কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস নিতে হবে।”
আয়াশ গাড়ি থেকে নামতেই দরজা লক করল অহীন, শরীর মোচড় দিয়ে আশাকে কোলে তুলে নিল। ঠোঁটে মৃদু হাসি। আশার গলায় মুখ ডুবিয়ে নিয়েছে আবারও। এবার গভীরভাবে, জামার নিচ দিয়ে হাত গলিয়ে পৃষ্ঠদেশ গুলিয়ে দিচ্ছে, আশা অস্ফুটস্বরে হাসির সঙ্গে বলে,,
“কুত্তা, রাস্তাঘাটে পাগল হয়ে যায়, সর বাল।”
তার কথা যেন কানেই তুলল না অহীন, আশাকে সিটে ফেলে তখনের ন্যায় মত্ত হলো অন্য রকম নেশায়।
“অহীন, আয়াশের গাড়ি এটা, ও আসবে তো।”
“ও আসলেই ছেড়ে দেব পেঁচি।”
বাইরে বৃষ্টির চাপ বাড়ছে আর ভেতরে অহীনের উন্মাদনা। আশাকে নিজ মর্জি মতো রেখে বলল,
“জান, তুই আয়াশকে এখনো ভালোবাসিস?”
চরম মুহূর্তে আটকে গিয়েছে অহীন, আশা তার প্রশ্ন এড়িয়ে বলে,
“অহীন, এখন এসব করো না।”
“আগে উত্তর দে, আয়াশকে ভালোবাসিস এখনো?”
“না, একদম না, ওর প্রতি এখন মায়া আর বন্ধুত্ব শুধু।”
অহীন আশাকে সব সময়ের মতো উলটে দিল, গাড়ির দরজায় হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে আছে আশা, নেশালো গলায় অহীন আবদার করল,
“আজকে আমার একটা আবদার রাখবি সোনা বউ?”
আশা ঘাড় কাত করে তাকায় তার দিকে একটু,
“কেমন আবদার?”
অহীন তার দিকে নুয়ে যায়, ঘাড়ে চুমু দিয়ে পকেট থেকে একটা কৌটা দেখিয়ে কানের কাছে হিসহিস করে কিছু বলতেই হকচকিয়ে ভয়ার্ত আশা পা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে সরে যেতে চায়।
“এটা গা..গাড়ি, মেরে ফেলতে চাও তুমি আমাকে? জানোয়ার একটা।”
তবে পারল না, কোমর ধরে আগের মতোই আটকে নিল আশাকে। ভয় ভাঙানো গলায় বলে,
“কিচ্ছু হবে না, আমি আছি তো সোনা।”
ফুঁপিয়ে উঠল আশা, অহীন শোনে না একদম তার কথা, বাইরে ঝড়ের তোপে শহর এলোমেলো হলেও অহীন আশাকে প্রতিবারের মতো নতুন ভাবে নিজের করছে, আশাকে গভীরভাবে অনুভব করার জন্য হয়ত। আবেশে চোখ বুজে নিচ্ছে বারবার। আশার কান্নাগুলো শুনছে না। মাঝে মাঝে চোখ বাইরে দিচ্ছে আয়াশ কখন চলে আসবে ভেবে। অহীনের কোনো ভাবান্তর নেই, সে যেকোনো ভাবে আশাকে পেলেই বাঁচে।
----
ছোট একটা ফার্মেসিতে ঢুকেছে আয়াশ, নিজের জন্য কিছু হাইজেনিক প্রয়োজনীয় জিনিস নিতে। বাইরে বৃষ্টির জন্য ধীরে সুস্থেই নিজের প্রয়োজন মেটাচ্ছে সে। ধীরে পায়ে বের হয়ে আসতেই চোখ যায় শপটির এক কোণায়, ফুঁপিয়ে কাঁদছে অন্তিহা। প্রথমে চোখের ভুল ভাবলেও, চুল ঝাড়া দিতেই স্পষ্ট হলো রমণীর লাল ফুলে ফেঁপে থাকা টমেটোর মতো গালগুলো। বিস্মিত হয়ে এগিয়ে যায়, সামনে লম্বা লম্বা দুটো পা দেখে দুই হাতে চোখ মুছে মাথা তুলে তাকাল অন্তিহা, আয়াশকে নিজের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকতে দেখে দুই হাতে চোখ-মুখ মুছে উঠে দাঁড়ায়। কথা আসছে না ফোঁপানির জন্য, তবুও নিয়ন্ত্রণ করে বলে,
“এত রাতে বৃষ্টিতে এখানে কী করছেন? শুচিবায়ু ভালো হয়ে গিয়েছে?”
তার প্রশ্নে কেবল ভ্রু কুঁচকে নিল আয়াশ, অন্তিহার ফোলা ফোলা চোখগুলো পকেট থেকে টিস্যু বের করে মুছে দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে,
“ওসিডিকে সাইডে রাখো, কাঁদছ কেন সেটা বলো?”
“কাঁদারও প্রাইভেসি নেই?”
“না, তোমার কিসের আবার প্রাইভেসি? যে মেয়ে অর্ধনগ্ন হয়ে একটা বেয়াদব ছেলের সঙ্গে ঘুরতে পারে, তার না জীবনের প্রাইভেসি আছে আর না দেহের।”
আয়াশের কটূক্তিপূর্ণ কথায় কান্নার স্থানে রাগ ও অপমানে গা ঘিনঘিন করছে তার। কয়েক কদম পিছিয়ে তেজি গলায় দৃঢ় আওয়াজে বলে,
“আমার লাইফ আমি কোনটা প্রাইভেট রাখব আমার বিষয় আয়াশ। আপনি কবে থেকে এসব ভাষা ব্যবহার করা শুরু করেছেন?”
আয়াশ ওকে আপাদমস্তক দেখে নিল, কাকভেজা হয়ে আছে পুরো, সাফওয়ানের ওপর রাগ হচ্ছে খুব। মেয়েটার কান্নারত মুখ দেখে অদ্ভুত রকম চিন্তা হচ্ছে তার, জিজ্ঞেস করে,
“সাফওয়ান কিছু করেছে? কান্না কেন করছ? ওর থেকে দূরে থাকতে কতবার বলেছি তোমাকে, দূরে থাকো না কেন? নিজেকে ওভারস্মার্ট ভাবো? ছুঁয়েছে? অভদ্রতা করেছে? কী করেছে?”
চিন্তিত আয়াশের মুখাবয়বের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলে ওঠে,
“ও খারাপ না আয়াশ, ও ভালো, আমি যতটুকু কল্পনাও করিনি কখনো তার চেয়ে অনেক ভালো। আপনি ভালো না। আমার প্রাইভেসিতে হস্তক্ষেপ করছেন।”
শীতল হাওয়া বয়ে গেল আয়াশের গা দিয়ে, এমন বাঁকা কথা তার অন্তি তাকে কখনোই বলে না, আর না সে কল্পনাও করেছে কখনো বলবে। সে অস্পষ্ট স্বরে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে অন্তি? আমার ওপর রাগ কোন কারণে?”
তাচ্ছিল্য হাসে অন্তিহা, দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
“কারো ওপর আমার রাগ নেই, সরুন এখান থেকে।”
বুঝল আয়াশ, তার ওপর ক্ষেপে আছে অন্তিহা কোনো অজানা কারণে। তাই চুপসে গিয়েছে। অনেকটা সময় এমন ভাবেই দুজন চুপচাপ কাটল। অন্তিহার ফোঁপানি কমতেই আয়াশ পা টিপে টিপে তার একটু কাছে গিয়ে দাঁড়ায়, একটি চকলেট এগিয়ে দিয়ে বলে,
“রাগ করার জন্য পুরোটা জীবন পড়ে আছে অন্তি, এখন অনেক রাত, বাড়ি যাওয়া যাক? তোমার মতো স্ট্রং একটা মেয়েকে রাস্তায় কান্না মানায় না!”
অন্তিহা আয়াশের চোখের দিকে তাকায়, কাতর গলায় জিজ্ঞেস করে,
“আমি অনেক স্ট্রং?”
“হুম অনেক, নয়ত আমার মতো কাউকে সহ্য করা সহজ নয়। তোমার কাজিনও পারত না এত বছর তুমি না থাকলে।”
অন্তিহা বাঁকা চোখে দেখছে আয়াশকে, আয়াশ গাল ফুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে পকেটে হাত দিয়ে আনমনে বলে,
“আমি তো পুতুলের জন্য এত ভাবিনি, তোমাকে হারানোর ভয়ে এত ভাবি। তোমার যখন বিয়ে হয়ে যাবে, কে জেসি আর অহীনের মতো পাগলদের আমার থেকে দূরে রাখবে?”
অন্তিহা একটু বিরক্ত-তিক্ত হলো বটে, তার কষ্ট না কমিয়ে নিজের যত দুঃখ-কষ্ট আছে বলে যাচ্ছে। আয়াশের হাতের চকলেটটা নিয়ে মুখে দিল। এত রাতে অহেতুক এই স্যানিটাইজারকে বকতে গেলে নিজের বিপদ। ট্যাক্সিও পাবে বলে মনে হয় না। আয়াশ মৃদুস্বরে বলে,
“চলো, আর নেক্সট টাইম এসব ড্রেস পরবে না। নিজের লাইফ নিজে লিড করছ তার মানে এই নয় এসব পরবে। বিশ্রী দেখায় খুব। আমার কাঁদামাটি দেখেও গা এত গুলায়নি কখনো, তোমাকে আজ শাড়িতে দেখে যতটা গুলিয়েছে।”
অন্তিহা আয়াশের পেছনে পা চালায়, বলে,
“সাফওয়ানের জন্য সেজেছিলাম, ওর পছন্দ হয়েছে।”
আয়াশের পা থামে, পেছন ফিরে ফোঁস করে শ্বাস নিয়ে বলে,
“ওর রুচি ওর মতোই দুর্গন্ধযুক্ত, তাই বলে গায়ে গু মেখে ঘুরবে তুমি?”
আয়াশের মুখে খাস বাংলায় কথাটায় মজা পেল অন্তিহা, ঠোঁট টিপে হাসে। বৃষ্টির জন্য কিছু দূরে গাড়িটার অস্পষ্ট অবয়ব দেখা যাচ্ছে, হালকা নড়ছে, ভ্রুক্ষেপহীন অন্তিহার দিকে তাকিয়ে বলে,
“বৃষ্টি একটু কমতে দাও তার.. গাড়ি নড়ছে কেন?”
হঠাৎ আবারও গাড়ির দিকে ফিরে তাকায় আয়াশ, খেয়াল করে দেখে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো গাড়িটি অস্পষ্ট করে রেখেছে। তবে অস্বাভাবিক নড়াচড়া আয়াশের অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দিচ্ছে। না, এটা আশার জন্য একদম নয়। এটা তার খুবই পছন্দের গাড়ি। কালারটা খুবই পছন্দ করে নিয়েছিল নিজে বাছাই করে, অন্তিহার বাহু ধরে কয়েকবার ঝাঁকি দিয়ে নাড়িয়ে দিল মেয়েটির শরীর, ভাবনায় আসছে গাড়িতে কী করছে, পেট গুলিয়ে আসল তার,,
“ওয়াক, অন্তি, ওরা এটা কী করছে? আমার গাড়ি কেন? তোমার ভাইকে খুন করব আমি। ওয়াককক।”
বেচারা নিজের গাড়ির ভেতরের হালতের কথা ভেবে আটকে রাখতে পারল না। মুখ ভরে বমি করে দিল। হকচকিয়ে অন্তিহা তাকে পেছন থেকে ধরে। পিঠে চাপড় দিয়ে মজা নিয়ে খিলখিল করে হেসে দেয়,
“আয়াশ, ওদের একা ছেড়ে দিয়েছেন কেন? আপনি সাফওয়ানের চেয়ে বড় বলদ। ওনাদের পরিবেশ লাগে না জানেন না?”
গরগর করে বমি করেই চলেছে আয়াশ, ভাবতেই গা গুলাচ্ছে ভেতরে নোংরা জিনিসগুলো লাগবে। হাসতে হাসতে অন্তিহা বলে ওঠে,
“আপনাকে নিয়ে চিন্তায় আছি, বিয়ে করে বউ কাকে বানাবেন? আশা হলে মানিয়ে নিত, বাট অন্য মেয়েরা? আপনার কে হবে? ইয়া খালিদ।
বমি করতে করতে পেট খালি হতেই অন্তিহা টিস্যু দিয়ে একটি বোতল মুছে তার হাতে দিল যাতে ভেজায় অস্বস্তি না হয় আয়াশের। সেটা দিয়ে কুলকুচি করে হাত ভালোমতো স্যানিটাইজ করছে। কথার পৃষ্ঠে বলে,
“তুমি আছো তো।”
“হুম, আমি?”
অবাক হয়ে প্রশ্ন করে অন্তিহা, আয়াশ ওর হাত থেকে স্যানিটাইজার নিয়ে হাত পরিষ্কার করে নিচ্ছে, গ্লাভসগুলো ফেলে দিয়েছে।
“হুম, তুমি তো থেরাপিস্ট হবে, আমি তোমার প্রথম পেশেন্ট। করবে না?”
আয়াশকে ছোটবেলায় অনেক থেরাপিস্ট দেখালেও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর নিজ থেকেই কখনো এসবে আগায়নি। শুধু নিজের রোগ সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকেই এই বিষয় নিয়ে পড়েছে। তার বাইরের মানুষ মোটেই পছন্দ নয়। অপরিচিত কারো কথা শোনার চেয়ে সে নিজের অসুস্থতাতে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তবে অন্তিহা বাইরের নয় সে চিকিৎসা করলে সে সাদরো শুনতে রাজি। দৃঢ়তার সঙ্গে সম্মতি দিল অন্তিহা,
“হ্যাঁ, করব।”
আয়াশ নিজের পকেট হাতড়ে সময় নিয়ে কিছু একটা খুঁজতে ব্যস্ত হলো। ব্যাকপকেট থেকে একটা স্যানিটাইজারের মিনি প্যাকেট বের করে অন্তিহার হাতে গুঁজে দিয়ে বলল,
“এটা অ্যাডভান্স।”
“এই কাগজের প্যাকেটটা? একটা কাঁচের বড় শিশিও না?”
“ওহ হো হ্যালো! এটা লক্ষ টাকার চেয়েও দামি আমার কাছে। আমার জানটা তোমায় দিয়ে দিলাম। ডিগ্রি নিয়ে আমার চিকিৎসা শুরু করো আগে, নয়তো...”
ফিক করে হাসে অন্তিহা। প্যাকেটটা আয়াশের হাতেই ফিরিয়ে দিয়ে বলল,
“আমার আপনার মতো শুচিবায়ু নেই, মিস্টার! আপনিই এগুলো দিয়ে গোসল করুন।”
—------
বাহিরে বৃষ্টি কমেনি এখনো, আর না গাড়ির ভেতরের ঝড়, দুটো দিন আশাকে কাঁদাচ্ছে সে। আজ আর বেচারি কান্নাও করতে পারছে না, গলা ভেঙে চৌচির। কিন্তু অহীন সে নিজেও জানে না কেন আজ এমন হচ্ছে। আয়াশ আসলে হয়ত থেমে যাবে, কিন্তু বাড়ি গিয়ে কিছু করবে না তার কোনো নিজস্ব গ্যারান্টি নেই। আশা ক্লান্ত গলায় থেমে থেমে বলে,
“সাইকো একটা, ছাড়ো এবার, আয়াশ আসছে না কেন?”
অহীনের কানে কোনো কথাই যাচ্ছে না, বাইরে যা বৃষ্টি স্যানিটাইজার সাহস করবে না পা ভেজানোর। পায়ে পানি লাগলে প্রাণটাই বেরিয়ে যাবে সে জানে। তবে কিসের এত চিন্তা?
“কেন সোনা? সাইকো স্বামী কে না চায় আজকাল? তোর ভালো লাগছে না?”
বাইরে বৃষ্টি কমে আসছে, কাচের টেবিলে চেপে রেখেছে আশা নিজের হাত, রাগ হচ্ছে ভালোলাগার সঙ্গে। সব কিছুর একটা নির্দিষ্ট সময় থাকে সে এটা মানে। কিন্তু অহীন সময়, কাল, পরিস্থিতি, স্থান বোঝে না। এটা তাকে পীড়া দেয়। আশা শরীরের ওপর ক্লান্ত শরীর ছেড়ে দিয়েছে। বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে। ঠকঠক শব্দে গাড়ির জানালার দিকে তাকায়। আয়াশ টোকা দিচ্ছে। উঁচু হয়ে সামান্য একটু কাচ নামিয়ে দেয়। তার ঘামে জর্জরিত মুখ দেখে ওয়াক করে খালি পেটে আবারও বমির ভাব হলো আয়াশের। অন্তু পেছন থেকে ধরে সামনে নিল তাকে। থেমে থেমে বলে,
“ডি* হেড, ওকে আমি শুট করে দেব।”
সময় নিয়ে অহীন বের হয়ে আসে গাড়ি থেকে। বন্ধ স্থান থেকে বেরিয়ে শীতল হাওয়া লাগতেই নিঃশ্বাস টেনে নিল বুক ভরে। আয়াশ না পারছে ওকে ছুঁতে আর না পারছে তাকাতে, গা গুলিয়ে আসছে। টিস্যু দিয়ে দুই আঙুলের সাহায্যে ফ্রন্ট গেট খুলতে চাচ্ছে, তবে এই দরজা কি দুই আঙুলে খুলবে? অন্তিহা পেছন থেকে গিয়ে সাহায্য করল দরজা খুলে দিয়ে। শরীর গাড়িতে স্পর্শ হতে দিচ্ছে না আয়াশ, কোনো ক্রমে টিস্যুর সাহায্যে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো তুলে নিল। সেগুলো স্প্রে করে নিল ভালো করে, নাক ছিটকে অহীনের দিকে গাড়ির চাবি ছুঁড়ে দিয়ে বলে,,
“মাদারফা** গাড়ি ওয়াশ করিয়ে দিবি, আমি ড্রাইভার পাঠিয়ে দেব গাড়ি নিতে।”
অন্তিহা জিজ্ঞেস করল তাকে,
“আপনি কীভাবে যাবেন?”
“তোমরা যাও, আমি গাড়ি আনিয়ে চলে যাব।”
চলবে....