#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ৪৫
ভোরের আলো আকাশে ফুটতে শুরু করেছে, আশার উন্মুক্ত দেহের ওপর উপুড় হয়ে ঘুমিয়ে আছে অহীন। পিঠে নখের আঁচড়ের অসংখ্য দাগ। আশাও কম কিসে? সেও দুই হাতে অহীনের মাথা আগলে রেখেছে নিজের বুকের সঙ্গে। কানে ফোনের রিং হওয়ার বিরক্তিকর শব্দে মোচড়াচ্ছে আশা। তার নড়াচড়ায় অহীন শরীর ঝাড়া দিয়ে সরল তবে রিংটোনের শব্দে উঠে বসে। বালিশের কাছ থেকে ফোন তুলে রিসিভ করে, গুঙিয়ে ওঠে,
“হুম?”
ওপাশ থেকে আসা কয়েকটা কথা শুনেই ঘুম ছুটে যায় তার। চোখেমুখে ফোটে দুশ্চিন্তার ছাপ। ফোন রেখে বিছানা থেকে নেমে আশার ওড়না পেঁচায় কোমরে। আর আশার গায়ে জড়িয়ে দেয় কমফোর্টার। একটু তাড়াহুড়ো করেই শাওয়ার নিল। বাইরে আলোও ফোটেনি বললেই চলে। ফোন হাতে নিয়ে বের হওয়ার সময়টাতে আশার ঘুমন্ত আদলের দিকে তাকায়। ডাকতে চায়, একবার বলে যাওয়া উচিত। তবে মনের মাঝে দ্বিধা ও ইতস্তত ভাবের জন্য “চ” বলে চলে গেল। ডাকলেই হাজার খানেক প্রশ্ন করবে।
--
আকাশে রোদের দেখা মিলছে। কাঁধে একটা ব্যাগ নিয়ে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বের হয়েছে অন্তিহা। আজ তার একটি পরিবর্তন হয়েছে, চোখে চশমা পরে আছে। এক কানে ইয়ারফোন গোঁজা। মনটা ফুরফুরে, গতদিন সাফওয়ানকে রিজেক্ট করার পর আজ আর সে সামনে আসবে না। আকাশের দিকে তাকিয়ে বিরক্তি থেকে বাঁচার তৃপ্তি প্রকাশ করে,
“হাহহহ ওই অভদ্রটা না থাকলে পৃথিবীটা কত সুন্দর লাগে।”
“ভাও! মনে করেছেন আমাকে?”
আচানক চোখের সামনে বাঁদরের মতো 'ভাও' বলে লাফিয়ে পড়তেই হকচকিয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। বুকে ফুঁ দিয়ে, চোখমুখের বারোটা বাজায়। মেকি তাচ্ছিল্য করে বলে,
“এভাবে সামনে কে আসে? অসভ্য কোথাকার।”
চিরপরিচিত হাসি সাফওয়ানের ঠোঁটে। আজ একটু ভিন্ন, চোখগুলোতে পরিবর্তন লাগছে। সাফওয়ান হেসেই বলে,
“আপনার অভদ্র, অসভ্য আর ব্লাডি।”
অন্তিহার মুখে অমাবস্যা নামল। এই লোকের তাড়না আর সহ্য করা যাচ্ছে না। কাল এমন স্পষ্ট করার পরেও চলে এসেছে কেমন বেহায়ার মতো। অন্তিহা সামনে হাঁটতে হাঁটতে বিরক্তি নিয়ে বলে,
“বলেছিলেন আর পেছনে আসবেন না!”
“হুম আমি কথা রেখেছি। আমি আপনার পেছনে নই, আপনার পাশে। মাই সেক্সি লেডি।”
অন্তিহার পা থামল, ঘাড় কাত করে সাফওয়ানের দিকে ফিরে মাথা নিচু করে পায়ের দিকে তাকায়; সত্যি আজকে সে পাশেই হাঁটছে।
“আপনি একটা মারা খাবেন মা****।”
অশালীন গালিতে খুকখুক করে কাশে সাফওয়ান, ততক্ষণে অন্তিহা তাকে ছেড়ে অনেকটা দূরে চলে গিয়েছে। ছুটে আবারও তার পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলে,
“তার জন্য বেড দরকার, বাড়ি চলুন।”
---
দুপুরে ঘুম থেকে উঠেছিল আশা, অহীনকে পাশে পায়নি। এটা যেহেতু এখন রোজকার নিয়মেই পরিণত হয়েছে, তাই আজকেও ভাবল না তেমন। তবে হ্যাঁ, মনের মাঝে খচখচানিটা রয়েই গেছে। কেননা অহীন কয়েকবার কল করেছে, সে কল রিসিভ হয়নি। ডাইনিং টেবিলে বসে জুসের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে আশা, পেট ব্যথা করছে সকাল থেকে। বাংলাদেশে থাকাকালীন এমন হয়েছিল একবার তার সঙ্গে। প্রথমে ব্যথা অনুভব না হলেও কিছুটা সময় পর হাসপাতালে ভর্তি করেছিল অহীন। সঙ্গে কেঁদেছিল অনেক। তার কান্নার কারণ আশা আজও জানতে পারেনি। অহীনকে বারবার কল করেও পাচ্ছে না, সেদিনের রিপোর্টগুলো দেখলে যদি বুঝত সমস্যা কোথায়! বসা থেকে উঠতেই পায়ের শক্তি হারিয়ে ধপাস করে মেঝেতে পড়ে আশা লুটিয়ে।
কাচের গ্লাসটা ঝনঝন করে চূর্ণ হয়ে গেল, গুঙিয়ে ওঠে সে,
“আল্লাহ।”
বাড়িতে কেউ না থাকায় নিজে থেকেই চেয়ারে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। স্বল্প সময় অপেক্ষা করে উঠে রুমে যায়। অহীনের নাম্বারে কল দিল, এবারেও পেল না। আজ তাইয়ানটাকেও ফোনে পাচ্ছে না। অন্তিহা চলে আসবে হয়তো। কাভার্ডের ওপর অহীনের লাগেজে হয়তো রিপোর্টগুলো আছে, ভেবেই ধীরে ধীরে নামাল সেটা। লাগেজ ঘেঁটে পেল না। বিরক্তি ও ব্যথায় মুখটা লাল হয়ে উঠছে তার বারংবার। ওপরের দিকটায় লম্বা চেইনটাও টানতেই পরিচিত বাংলাদেশি ভাষায় প্রেসক্রিপশনের ফাইলটা দেখে ভালো লাগল। ফোঁস করে শ্বাস নিয়ে সেটা বের করে। কলিং বেল বাজছে, ফাইলটা রেখে সে দরজা খুলে দিতে যায়, পার্সেল এসেছে তার কোনো একটা। পেইড। রুমে এসে টেবিলের ওপর রেখে রুমে গেল সে। নিজের হাতের ফাইলটা নিয়ে বসে, প্রথম পাতা উল্টে মনোযোগ দিয়ে দেখছে। অহীনের সঙ্গে সম্পর্ক এতদিনে এতটাই সূক্ষ্ম ও সুন্দর হয়েছে যে এসব দেখার সময় হয়নি। তবে কৌতূহলী মুখে আঁধার নামছে নিজের রিপোর্ট দেখে। সংসার ও নিজের প্রতি উদাসীনতার ফল বোধহয় এমনই হয়, নিজের সম্পর্কেই নিজের অজানা হয়ে যায়। নিজ থেকেই বিড়বিড় করে, ঠোঁটগুলো কাঁপছে তার,
“মিসক্যারেজ!”
স্বল্প সময় ভাবান্তর থেকে ফাইলটা বন্ধ করে, অহীনের ওপর রাগ হচ্ছে সঙ্গে কষ্ট তো অপরিসীম। সে এতগুলো দিন জানতেই পারেনি কখনো তারও পেটে প্রাণ ছিল। কবে আসল, কবে আবার চলে গেল টের পেল না সে। তলপেটে হাত রেখে চোখের কার্নিশ বেয়ে জলবিন্দু টপ করে পড়ল নিচে। তখনই খেয়াল হয় তার, সেদিনের মতোই তো ব্যথা হচ্ছে। তাই আর দেরি করল না, আর না অহীন, তাইয়ান বা অন্তিহার অপেক্ষা।
___
হাসপাতালের করিডোরে রিপোর্টের ফাইলটা হাতে নিয়ে বসে আছে আশা। অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছে। বাড়ির কাছের মেডিকেল সেন্টারে এসেছে সে। তেমন কোথাও চেনা নেই। অহীন ছাড়া যে ফ্রান্স অজানা তার কাছে। কষ্ট ও সুপ্ত অভিমানে বুক ভরে আসছে। অহীন বলেছিল ক্ষতি আশার নয়, অহীনের হয়েছে। সে কি বোঝাতে চেয়েছে বাচ্চা শুধুই তার? নিচের দিকে তাকিয়ে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছতেই ডাক আসে নার্সের। দুই হাতে চোখ মুছে নেয়। ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে উঠে দাঁড়ায়, কেবিনের ভেতরে প্রবেশ করতেই অপ্রত্যাশিত চোখে চোখ পড়ে তার। অহীন ড্যাবড্যাব করে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। হাতে রিপোর্ট, মাথা উঁচু করে নেমপ্লেটের দিকে তাকায় আশা, সে ভুল নয় তো? না, ওখানে স্পষ্ট ভাবে লেখা ‘গাইনিকোলজিস্ট', তবে তার অভিমান আর কৌতূহল হারিয়ে গেল অহীনের কাতর চিন্তিত গলায়,
“সোনা, হসপিটালে কেন এসেছিস? আবার পেট ব্যথা হচ্ছে আজকে?”
কম্পিত গলায় আশা বলে,
“কল দিয়েছিলাম।”
পকেট থেকে ফোনটা তাড়াহুড়ো করে হাতড়ে বের করে সে। রাতে চার্জ দিতে মনে নেই, সুইচড অফ হয়ে আছে। সে বলতে চায়,
“সরি সোনা, বন্ধ ছিল খেয়াল করিনি, তোর কি হয়েছে?”
“এখানে কি করছো?”
আশা বরাবরই তাকে বিশ্বাস করে না, তাই তো সকালে না বলেই বের হতে হলো বেচারাকে। তবে এখন মিথ্যা কোথায় বলবে? অহীন নিজের সাফাইতে বলতে চায়,
“জেসি…।”
শেষ হওয়ার আগেই একজন নার্স বলেন,
“স্যার, আপনার রিলেটিভ পেশেন্টের সঙ্গে রাগারাগি করছেন। পেশেন্টকে চাপ দেবেন না প্লিজ।”
মাথা নাড়ে অহীন, আশার চোখে স্পষ্ট রাগ আর অবিশ্বাসের ক্ষোভ। তবুও গলা নামিয়ে বলল,
“আগেও অবিশ্বাস করে অনেক দূরত্ব তৈরি করেছিস, এবার করিস না। জেসি প্রেগন্যান্ট, পাপিকে বলতে পারছে না। তোকে আমি একটু পর বোঝাচ্ছি কেমন?”
অহীন সেখান থেকে চলে গেল, সৃজন হয়তো জেনেছে, এসে জেসিকে বকছে, রাগের মাথায় গায়ে হাত না তুলে বসে। সে যেতেই হাতের ফাইলগুলো ফ্লোরে পড়ে, তাকে কেবিনে ডাকা হচ্ছে তবে কর্ণে কিছুই ধারণ করার ক্ষমতা নেই। ফাইলটা তুলে সে অহীনের পিছু নিতে শুরু করে। সাদা পর্দার আড়ালে বসে আছে জেসি, সৃজন রাগী চোখে তারই দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের শিরাগুলো লাল রক্তের মতো হয়ে আছে। জেসি কাঁদছে,
“ড্যাড, আই অ্যাম সরি।”
গর্জে ওঠে সৃজন,
“সরি? তোমার ধারণা আছে কি হচ্ছে এখন? তোমাকে ফ্রিডম দিয়েছিলাম আমি, আর তুমি এটা কি করলে? তোমার বুক কাঁপেনি একটিবারও আমাদের আঘাত দিতে?”
ঝরনার মতো চোখের পানি বয়েই যাচ্ছে জেসির। সৃজনকে কাটিয়ে জেসির কাছে অহীন যেতেই, মেয়েটা বসা থেকে ধপাস করে উঠে অহীনের বাহু পেঁচিয়ে ধরে পাঁজরে মুখ লুকাল। ভয়ে রীতিমতো কাঁপছে সৃজনের রাগের সাথে অচেনা সে। আজ প্রথম সৃজন চেঁচিয়ে কথা বলছে বললেই চলে। তার পিঠে চাপড় দিয়ে শান্ত করে,
“পাপি, হাসপাতাল এটা, বাড়ি চলো, বলছি তোমাকে আমি সব।”
“তোমার কি মনে হয় অহীন? মজা হচ্ছে এখানে? বাচ্চা কার ওকে বলতে বলো।”
ধীরে ধীরে আশা এগিয়ে আসছে তার দিকে, তাকে দেখে যেন জেসি আরও বিব্রত ও ভয়ার্ত হলো। পা নাড়িয়ে অহীনের পেছনে গিয়ে থামে। এটা কি খারাপ ইঙ্গিত নয় আশার জন্য? কেন বারবার তার সঙ্গেই চোখ লুকায় জেসি? আশাও জিজ্ঞেস করে,
“কার বেবি?”
ধীরে ধীরে আরও কাছে যায় অহীনের, পেঁচিয়ে রাখা জেসির হাতের ভাঁজে অহীনের হাত, অহীন বলল,
“আশু, বাড়ি গিয়ে বলব তো বললাম।”
রাগে গিজগিজ করতে করতে জেসি ও অহীনের হাত ধরে টান দিয়ে দুজনকে আলাদা করে দিল, সঙ্গে গর্জে ওঠে পুরো করিডোর..
“ এক্ষুনি বলবি।”
জেসি ধাক্কায় খেই হারিয়ে পড়ে যেতে নিলে অহীন কোনোক্রমে তড়িঘড়ি করে তাকে ধরে দেয়, ধমকে ওঠে আশার ওপর,
“একবার বললে কানে যায় না তোর কথা? বললাম তো বাড়ি গিয়ে বলব। তোর মাথায় কি চলে বেয়াদব?”
তার ধমকে ঠোঁট উল্টে আসছে আশার, সব সময় এমন করে অহীন তার সঙ্গে। চোখের পানি মুছে অস্ফুট স্বরে বলে,
“আমি আগেও বলেছি একবিন্দু বিশ্বাস আমি তোমাকে করি না আর না করব। সেই হিসেবে আমার মাথায় যা আসার কথা তাই আসছে!”
অহীন বুঝতে পেরেছে আশা কি বলতে চায়, তবুও নিজের ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করতে জিজ্ঞেস করল,
“কি আসল মাথায় শুনি?”
“বেবিটা তোমার, নয়তো কেন আমার সঙ্গেই জেসির এত লুকোচুরি?”
সৃজন জেসির থেকে নজর সরিয়ে আশার দিকে তাকায়, সে জেসির কাজে আশাহত হলেও অহীনকে ব্লেম করছে না একটিবারও। কিন্তু এই মেয়ে কেমন নিঃসংকোচে বলে দিল?! অহীন আশার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, সেদিন ক্লেরার সঙ্গেও এমনই আচরণ করেছিল তাই অহীন এবার এড়িয়ে যায়, সে আশাকে কষ্ট দিতে চায় না। সৃজন আশার কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রাখে,
“আশু কি বলছ, হুঁশ আছে? অহীন তোমাকে ভালোবাসে..”
“ভালোবাসা মাই ফিট! সরুন আমার কাছ থেকে মিস্টার।”
সৃজনের ওপর এভাবে তেতে ওঠাটা অহীনের পছন্দ হলো না, তবুও জেসিকে বসিয়ে দিয়ে আশার বাহু ধরে আলতো টান দেয়,
“আশু..।”
তার ডাকেও নিভল না রমণীর রাগের আগুনের পাহাড়, বরং সপাটে সবার সামনে থাপ্পড় দিয়ে নিজ রাগ ও কষ্ট থেকে কান্না করে দেয়। হাতের ফাইলটা ওর মুখের ওপর ছুড়ে দিয়ে বলে,
“এসব কি? অহীন, আমি তোমাকে একটু বিশ্বাস করতে চাই আর তুমি প্রতিবার আমাকে হতাশ করো? আমি সুস্থ একটা মেয়ে, কেন মিসক্যারেজ হলো আর তুমি আমাকে কেন জানালে না? নিজের প্রতি আমি উদাসীন ছিলাম কারণ আমি জানতাম তুমি অন্তত এমন কিছু করবে না আমার হেলথ নিয়ে, বাট তুমি কি করে করতে পারলে?”
“ এটা তুই যতটা বড় করে নিচ্ছিস অতটাও বড় বিষয় নয়, আমাদের পার্সোনাল বিষয়গুলো বাড়ি গিয়ে সলভ করব। রাগ করিস না।”
আশা নাক ফুলিয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে, ফুঁসছে সে, বরাবরই কষ্টকে রাগ দিয়েই নিয়ন্ত্রণ করে সে। একবার শুধু বিয়ের দিন তার কথার খেলাপ হয়েছিল। নয়তো ছোট থেকে আকাশ বা অন্তিক তার কোনো কথায় ফেলেনি এই রাগের জন্য। তৎক্ষণাৎ আরও গর্জায় সে,
“পার্সোনাল নেই কিছুই অহীন! আমার থেকে জেসির চোখ লুকানো কি প্রমাণ করে না তুমি চিট করছ আমাকে? আর রিপোর্টে তো স্পষ্ট ভাবে লেখা আছে আমার দ্বিতীয়বার প্রেগন্যান্ট হওয়ার চান্স মাত্র ১০% হয়তো, তাই ওর সঙ্গে বেবি মেক করেছ?”
ছোট স্ট্রেচারের ওপর জেসির রিপোর্টগুলো পড়ে আছে, ছোঁ মেরে তুলে নিল সে। স্পষ্ট, তারা ফ্রান্স আসার ঠিক ২-৩ দিনের মাঝেই প্রেগন্যান্সির ডেট লেখা। তার এই কিছু কথায় অহীন স্তব্ধ বনে গিয়েছে, উত্তর কি দেবে? উত্তর দিলেই রেগে যাবে আর ঠিক ঝামেলা হবে নিজেদের মাঝে। সে জানে আশার রাগ ভাঙলে নিজেই হয়তো বুঝবে। এখানে তাকে অবাক করে দিয়ে আশা ক্ষোভ প্রকাশ করল অন্য দিকে, যেখানে অহীনের দুর্বলতা, আশা আঙুল তুলে সৃজনের দিকে,
“এত বছর পেলে-পুষে বড় করেছেন দুটো বাচ্চাকে, মানুষ তো বানাতেই পারতেন। কি করে পারলেন আপনার ক্যারেক্টারলেস মেয়েকে অহীনের পেছনে ছেড়ে দিতে? ছেলে কি ছিল না দুনিয়ায় আর? এখন হাসপাতালে আমাকে দেখতেই নাটক জুড়েছেন। বয়স হয়েছে, মৃত্যুর চিন্তা করেও সন্তানকে হাতে রাখতে শিখুন।”
ব্যাস, এটাই তো? পেছন থেকে হেঁচকা টানে আশাকে সৃজনের সামনে থেকে এনে চোয়াল দুই আঙুলে চেপে ধরে। পিঠ ঠেকে আশার দেয়ালে। অহীন রাগ নিয়ন্ত্রণ করার বৃথা প্রচেষ্টা করে দাঁতে দাঁত পিসে বলে,
“মুখ টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলব ***** ** কাকে বলছিস চোখ খুলে দেখে বলবি, ওনার সঙ্গে লাগাম দিয়ে কথা বল।”
চোয়ালে চাপ এতটাই কঠিন যে ঠোঁটগুলো গোল হয়েছে, নড়াতে কষ্ট হচ্ছে, জেদি আশা তবুও বলবে,
“সাহস হয় কেমন করে গালি দেওয়ার? আর আমি ভুল বললাম কোথায়? তিনি তো ছোট থেকেই চান জেসিকে তোমার গলায় বেঁধে দিতে! যখন পারলেন না, কৌশলে বেঁধে দিলেন তো?”
ওর এমন ধারালো কথায় ফেটে যাচ্ছে তার মাথা, মাথায় পোকাগুলো কিলবিল করছে, ইচ্ছে করছে মেরে ফেলতে এই নারীকে। ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে এই হাওয়ায় তৈরি করা অহংকারের মিথ্যা দেয়াল। ঝাড়া দিয়ে ছেড়ে স্টিলের স্ট্রেচারে কয়েকটা ঘুষি দিয়ে নিজেকে শান্ত করে নিল। জেসির দিকে তাকায় সে। মেয়েটা ভয়ে তখনো চুপ করে আছে, সেও বলে দিত যদি জেসি তাকে বলত আসলে বাচ্চা কার? আয়াশ! কিন্তু কিভাবে? সে আয়াশকে চেনে, এত অল্প সময়ে রোগ থেকে বেরিয়ে কারো শরীরে এমন ভাবে ছোঁয়ার সাহস ওর নেই। আশা ফের সৃজনকে বলতে যায় তার আগেই সৃজন বলে,
"যোগ্যতা বুঝে জবান লম্বা করো, নয়তো সেই জবানই কাঁচি হয়ে যাবে। আর মাথায় রাখো একটা কথা, তোমার কোনো অধিকার নেই আমাকে কিছু বলার, ওকে? এবার তোমার হাসবেন্ডকে নিয়ে আমার সামনে থেকে যাও।”
অহীন সৃজনের সামনে আসে, ভেজা গলায় বলে,
“পাপি, ও বোঝে না, বাচ্চা তুমি তো জানো। ওর কথায় কষ্ট পেয়ো না।”
“আশা কি জেসির থেকে বয়সে ছোট? তুমি যেটাকে বাচ্চামো বলছ, আমি সেটা বেয়াদবি দেখছি। ও বেয়াদব।”
আশা আরও চটল তার ওপর,
“বেয়াদব আমি বটে তবে আপনার মেয়ের মতন একদম নই, ছেলেদের গায়ে পড়া আর যার-তার সঙ্গে শুয়ে পড়ার স্বভাব নেই।”
অহীনের রক্তিম নজরের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলে শেষ করল সৃজনের চোখে তাকিয়ে। অহীন ওর গালে ঠাটিয়ে একটা চড় মারতেই হেলে যায় একদিকে,
“যার-তার সঙ্গে? তুই জানিস কার সঙ্গে?”
অহীনের হাত ধরে থামাল জেইন, মেয়ের কর্মে মুখ খোলার মতো ভাষা নেই তার, তাই বলে তো ছেলের সংসার নষ্ট করা যায় না। হাঁসফাঁস করে ফুঁসছে আশা। চোখের পানি মুছে অহীনের রক্তিম চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুটা সময়। রাগে মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রম দুজনের। পা ফ্লোরে ঝাড়া দিয়ে তাচ্ছিল্য হেসে হিসহিসিয়ে বলে,
“তোমার সঙ্গেই হবে, কারণ তোমারই তো বিকৃত মস্তিষ্কের যৌন চাহিদা। হয়তো আমাকে দিয়ে মন ভরে না।”
আশা রাগে গিজগিজ করতে করতে সেখান থেকে চলে তো গেল। কিন্তু অহীনের দিকে একবার যদি তাকাত হয়তো সেই রাগের আগুনে ঝলসে যেত। ফোঁস করে শ্বাস নেয়, সৃজনের দিকে ফিরে ফের বলে,
“পাপি।”
“তুমি হয়তো খেয়াল করোনি, আমি ওই বেয়াদব মেয়ের সঙ্গে তোমাকেও যেতে বলেছি। আমার ফ্যামিলি ম্যাটারে আর কখনোই ইন্টারফেয়ার করবে না।”
সৃজনের শান্ত গলায় বলা তীক্ষ্ণ কথাটায় অহীনের ভেতরে আঘাত করল। কম নয়, ২৯ বছর সে দুটো পরিবারে সমান প্রায়োরিটি পেয়েছে। হঠাৎ করে ফ্যামিলি আলাদা বলে দেওয়াটা ভেতরে ক্ষত তৈরি করছে গভীর। অহীনের চোখ জোড়া টলমল করছে। জেসির দিকে তাকিয়ে আছে, মেয়েটা তবুও মুখ খুলতে নারাজ। অহীন বলতেই যাবে, সৃজন ওর গালে থাপ্পড় বসায়, কষিয়ে বলে,
"একবার যখন বলেছি এখন থেকে তোমার সঙ্গে আমাদের আর কোনো সম্পর্ক নেই, তখন সেটাই চূড়ান্ত। আমি চাই না তোমার সংসার নষ্ট হওয়ার কারণ আমার মেয়ে বা আমরা হই। আফটার অল, তুমি এমনিতেও আমাদের কেউ না।”
“ পাপি, তুমি আমাকে বাইরের মানুষ বানাচ্ছ!”
“তুমি বাইরের মানুষই, আমি শুধু মাত্র কিছুদিন খেয়াল রেখেছি। এবার যাও নয়তো ভালো হবে না, আর তোমার থেকে ভালো কেউ জানে না আমি কি করতে পারব।”
অহীন উপর-নিচ মাথা দোলায়, জেইনের দিকে চোখ মেলে তার মানুষটা কাঁদছে, মেয়ের এমন কাণ্ড আর ছেলের সঙ্গে এমন ভাবে বিচ্ছেদ। জেইন সৃজনের গায়ে হাত রেখে কান্নায় ভাঙা গলায় চেঁচায়,
“আপনি কিভাবে অহীনের গায়ে হাত তুলতে পারেন? ও কি করেছে?”
সৃজন বলল তীক্ষ্ণ গলায়,
“ তুমি কি চাও অহীন? জোনাকির সঙ্গে আমি ঝামেলা করি? যাও এখান থেকে।”
অহীন চলে গেল জেইনের কথা ভেবে, সে সৃজনকে এতটা রুষ্ট আগে কখনোই দেখেনি। এই রাগ, এই ক্ষোভ নতুন। তার গায়ে হাত তোলা মানুষটা তার পাপি! জেইন আচানক ফুঁপিয়ে উঠল জেসির কর্মের চেয়ে অহীনের চলে যাওয়াটা কি তাকে বেশি কষ্ট দিচ্ছে না? তাও অন্য একটা মেয়ের জন্য? সে তো অহীনের মা নয়। কিন্তু ফ্রান্স আসার পর মায়ের চেয়ে কম আদরে রাখেনি। মায়া যে ভীষণ বাজে জিনিস, ছাড়া যায় না। সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে,
“একটা মেয়ের জন্য আপনি অহীনের গায়ে হাত তুলেছেন? আপনার মেয়ে অন্যায় করেছে বলেই আঙুল তোলার সাহস হয়েছে। আপনি কোন অপরাধে অহীনের সঙ্গে এমন ব্যবহার করলেন?”
"তোমার কী মনে হয়? আশা আদৌ কেমন মেয়ে? অহীন আমাদের সাথে যতদিন থাকবে, জেসিকে নিয়ে আশার এই সমস্যা বা মনমালিন্য চলতেই থাকবে। বুক দিয়ে আগলে যে ছেলেটাকে মানুষ করতে আমি নিজের জীবন পার করে দিলাম, শেষমেশ আমিই তার ভাঙনের কারণ হব? আমি অহীনের হতাশার শ্বাস হতে চাই না। তার চেয়ে ও দূরেই থাকুক। দূর থেকেই আমায় মনে করুক, কাছে আসতে হবে না।”
জেইন জেসির কাছে যায়, বেডের পাশে বসল, ছলছল চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
“ তোকে স্বাধীনতা দিয়েছি আমরা, তার সুযোগ এমন ভাবে নিয়েছিস? আশা অহীনের জীবনে আসার পর থেকে ছেলেটা নিজের মধ্যে থাকে। তোর বুক কাঁপছে না ওকে ভাঙতে দেখে? তোর জন্য আশা অহীনকে এসব শুনাল, এখন তোর ড্যাড ওকে দূরে করে দিচ্ছে। তুই বললেই হয় কে এই বাচ্চার বাবা, সব সমাধান হয়ে যাবে। বলবি না?”
জেসি কাঁদছে, যেন সাহস নেই; অহীন থাকা কালীন যতটুকু সাহস ছিল, সেটাও এখন আর নেই। সৃজন ওর পাশে বসে নরম গলায় বলে,
“ বিয়ে করেছিস?”
জেসি মুখ ফুটল না, শুধু মাথা দোলাল হ্যাঁ-সূচক। সৃজন ফের বলে,
“ আমাকে তুমি ভয় পাচ্ছ কেন? আমার যতদূর জানা, তোমাদের দুজনের কোনো সিদ্ধান্তে আমি দ্বিমত করিনি। এখনো করব না। কাকে বিয়ে করেছিস বল!”
“ত..তাইয়ান।”
জেসির ভাঙা গলায় তাইয়ানের নামটা শুনতেই বিস্মিত হলো দুজন। এদের না কখনো একসঙ্গে দেখেছে, আর না কথা বলতে দেখেছে। জেইন জিজ্ঞেস করে,
“ও তোমার ছোট জেসি।”
“এই জন্যই ভয় পাচ্ছিলাম বলতে। আর তাইয়ানও একটু আফসোস করছে, কেননা আমি অহীনের প্রাক্তন। বিয়ে করে যে আফসোস করে তার নাম কিই বা বলব আমি?”
“ও কি অস্বীকার করে?”
“না না ও ভয় পায় আশাকে, কারণ আশা আমাকে পছন্দ করে না। বলদ একটা।”
“হুম! বিয়ে করে বাচ্চা পয়দা করে ফেলবে বড়দের না জানিয়ে, ওটা বলদ? নিমবজ্জাত।”
জেইন দীর্ঘশ্বাস নিয়ে মেয়েকে বুকে টেনে নিল। এত কিছু হয়ে গিয়েছে মেয়ের জীবনে, তারা জানেই না। জেসির অবস্থা দেখে নিজেদের অবহেলার ওপর আফসোস হচ্ছে। অতিরিক্ত স্বাধীনতা দিতে গিয়ে তারা মেয়েটার খোঁজও রাখেনি বলেই এই পরিস্থিতি। তাইয়ান তো বাচ্চা একটা ছেলে, ভালো লেগেছে হয়তো করেছে। তাকেই বা কি বলবে? সৃজনের চোখে চোখ রাখে সে। চোখের ইশারায় আস্থা দেয় সব ঠিক হয়ে যাওয়ার।
____
সন্ধ্যা পেরিয়েছে, রাত নামছে ধরণীর বুকে, অহীন আশার জন্যই বেরিয়েছে, নয়তো সৃজনের রাগ ভাঙানো তো বিষয় না। আশা হয়তো অসুস্থ, যতই রাগ হোক অসুস্থ মেয়েটার তো চিকিৎসা করতে হবে। হাসপাতালের বাইরে নেমে চোখ ঘুরিয়ে আশাকে খুঁজতেই পেয়ে গেল। তবে চোয়াল শক্ত হলো আয়াশের গাড়িতে আশাকে উঠতে দেখে।
গাড়ির দরজা খুলে আয়াশের পাশেই নাক টেনে বসল আশা, আয়াশ মুচকি হাসির সঙ্গে তার কান্না দেখছে। কিছুক্ষণ আগেই আশা কল দিয়েছে তাকে। তখনই বুঝতে পেরেছে আশা কাঁদছে, আর দেরি করল না, সব কাজ রেখে ছুটে এসেছে পুতুলের নিকট।
“কি হয়েছে পুতুল, অহীন কোথায়?”
“হাসপাতালেই আছে। নতুন গাড়ি নিয়েছেন?”
তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“আবার ঝামেলা করেছিস?”
“আমি অন্তুর কাছে যাব, অহীনের বাড়ি যাব না।”
আয়াশ নিশ্চুপ, ওদের নিত্যদিনের ঝামেলাগুলো কেমন পরিচিত হয়ে গিয়েছে তাদের কাছে, বিয়ে করার ইচ্ছে নেই, এদের দেখলে আরও শখ মরে, ভুল হয় তার। ফোঁস করে শ্বাস নিয়ে চুপচাপ অন্তির হোস্টেলের সামনে এসে নামিয়ে দিল সে আশাকে। আশা নাক টেনে টেনে কাঁদছে তখনো। মায়া হচ্ছে কিন্তু কিছু করার নেই তার, করণীয় যতটুকু ততটুকুই করল। গাড়ি থেকে নেমে ঝুঁকে বলে,
“গার্লস হোস্টেল আমাকে ঢুকতে দেবে না। দ্বিতীয় ফ্লোরে ওর রুম, নাম বললেই পেয়ে যাবি।”
আশা মাথা দোলায় দুই দিকে, মাথা নিচু করে আশা অন্য দিকে ঘুরতেই আয়াশ জিজ্ঞেস করে,
“আমি ওয়েট করব?”
“না, আমি অতটাও অবুঝ নই, শুধু চিনি না বলে ডেকেছিলাম।”
আশার মাথায় হাত বুলিয়ে নরম গলায় আয়াশ বলে,
“গুড, অতটা অবুঝ হওয়াও উচিত নয়। নিজের ভালো তো পাগলও বোঝে। তুমি তো সুস্থ, তাই না?”
মৃদু মেকি হাসে আশা। অতঃপর সেখান থেকে ভেতরে যায়। সময় নিয়ে ওয়ার্ডেনের সঙ্গে কথা বলছে। ওয়ার্ডেন জানান অন্তিহা এখনো ফেরেনি, রাত তো কম নয়। মেয়েটা কোথায় কোথায় ঘোরে? হোস্টেলের বাইরে এসে দেখল আয়াশও নেই। হাতে কিছু ক্যাশ আর ফোনটাই আছে। সে যে এই শহর চেনেই না। হাসপাতাল কাছে ছিল বিধায় যেতে পেরেছে। কিন্তু বাড়ি তো কাছে নয়। রমণী কাঁদতে কাঁদতে চোখ মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে। দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসল সে। কিছুটা সময়, মিনিটের কাঁটা গড়িয়ে ঘণ্টা পার হলো, অন্তিহার খোঁজ নেই। কানে রিংটোনের শব্দ আসতেই মুখ তুলে তাকায় আশা। তার ফোন নয়, সামনেই বসে থাকা আয়াশের ফোন আয়াশ ভ্রু কুঁচকে কলটা কেটে দিল। আশা জিজ্ঞেস করে,
“কখন এসেছেন? যাননি আপনি?”
“হুম, যখন তুমি মুখ গুঁজে কাঁদা শুরু করলে তখন এসেছি। চলো বাড়ি দিয়ে আসি।”
“যাব না ওই কুত্তার কাছে আমি।”
“রাস্তায় তো থাকা যাবে না। এটা গার্লস হোস্টেল, বাইরে বখাটে ছেলেরা ঘোরে, মেয়েদের উত্যক্ত করে। গাড়িতে ওঠো, তারপর কথা বলছি কোথায় যাবে, সেটাও দেখছি।”
আশা চারপাশে তাকিয়ে দেখে নিল, রাত অনেক হয়েছে, মানুষ নেই বললেই চলে। ভূতেরও ভয় আছে। সে নতমস্তক হয়ে উঠে গিয়ে গাড়িতে আবার বসল। আয়াশ ড্রাইভিং সিটে বসে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গম্ভীর কিন্তু স্বল্প আদর মেখে জিজ্ঞেস করে,
“এবার কি নিয়ে ঝামেলা করলে তোমরা?”
“আগের বার যা নিয়ে করেছিলাম। ওকে আমি বিশ্বাস করি না।”
তার উত্তরে একটু চাপা রাগ হলো আয়াশের, কেননা অহীন তো অবিশ্বাস করার মতো করে রাখে না এত দিনে সে বুঝেছে ভালোই। নীরবে বাইরে বাতাস বইছে, গাড়ির গ্লাসগুলো বন্ধ। বাইরের বাতাসের সঙ্গে ছোট ছোট ব্যাকটেরিয়াদের ভয় পায় আয়াশ। সে নীরবতা ভেঙে বলে,
“অহীনকে অবিশ্বাস করার কারণ কি পুতুল?”
আশা নিশ্চুপ, সে নিজেও জানে না কেন অবিশ্বাস করে। তার নীরবতা অনুভব করে আয়াশ নিজেই বলল,
“তুমি বোধহয় অহীনকে অনেক ভালোবাসো। আর অহীন সবার প্রতি এতটাই যত্নবান, মনে করো কেউ নিয়ে যাবে, তাই না?”
আশা চুপ করে আছে, কোথাও তো আয়াশ ঠিক কথা বলছে কিন্তু সে স্বীকার করতে নারাজ। বলল,
“এত ভালো ভালো না আয়াশ, ওকে কেউ দায়িত্ব দিয়ে রাখেনি সবার যত্ন নেওয়ার। মিথ্যাবাদী একবার মিথ্যা বলতে পারলে বারবার বলে, আমি এটাই মানি।”
“অহীন তোমাকে ভালোবাসে, আশা। আমরা এই দেশে বড় হয়েছি, এখানে নারী সঙ্গ পাওয়া খুব সহজ। চাইলেই অহীন কত মেয়ের সঙ্গে থাকতে পারত, কিন্তু সে কখনো এসব করেনি। তোমাকে বিয়ে করার পর ওর মধ্যে পরিবর্তন এসেছে। আগের মতো আর থাকে না, এখন গম্ভীর আর গুমসুম হয়ে গেছে। ওর এই আচরণ দেখে আমি অবাক হই। এখন আমার সঙ্গেও তেমন তর্কে যায় না, বেশিরভাগ সময় তোমাকে নিয়েই থাকে। শপ থেকে বাড়ি, আবার বাড়ি থেকে শপ। আগে এমন ছিল না ও। আগে তো ওকে খুঁজেই পাওয়া যেত না, কোনো কাজ করত না বললে ভুল হবে না। আর তোমার ওপরও রাগ হয় আমার। তুমি ওর সঙ্গে কত সমস্যা করো। মানি, একটু নির্লজ্জ, কিন্তু সব তো তোমার সঙ্গেই, তাই না? তোমার উচিত ওর সঙ্গে গিয়ে সব মিটিয়ে নেওয়া।”
“আপনার ভুল, ও আমাকে ভালো কখনোই বাসে না।”
“তুমি তো বাসো, একই ব্যাপার। বাড়ি গিয়ে মিটমাট করে আমাকে একটা ডিনার পার্টি দিও। তুমি আর তোমার ননদ খুব ভালোভাবে আপ্যায়ন করতে পারো। আই অ্যাম ইমপ্রেসড।”
আয়াশ গাড়ির গেটের লক খোলে, আশা বাইরে তাকায়, কথা শুনতে শুনতে কখন কোথায় চলে এলো জানা নেই। বাইরে তাকিয়ে দেখল নিজেদেরই বাসা।
“ও রেগে থাকবে। ভয় পাই।”
তার কথায় ফোঁস করে হাসে আয়াশ,
“তুমি না ওর বউ? মিষ্টি করে বললেই রাগ ভেঙে যাবে। যাও আর ওর সঙ্গে ঝামেলা করো না। ওকে কষ্ট দিও না। তোমার জন্য তো সব করে বেচারা। হয়তো মিথ্যা বলেছে তোমার জন্যই।”
আশা বাড়ির ভেতরে গেল। তাকে দরজা পার হতে দেখেই আয়াশ গাড়ি স্টার্ট দেয়। অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছে আজকে। বিয়ে করা কতটা প্যারা! তার কি ভাগ্য ভালো ছিল সেদিন যে বিয়ে করা হলো না? নয়তো এসব অহীনের নয়, তার সঙ্গেই হয়তো হতো। গা গুলিয়ে আসছে ভাবতেই এসব।
__
দরজা পেরিয়ে ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই থমকে গেল সে। পুরো বাসা এলোমেলো হয়ে আছে। বাইরে থেকে আসা ক্ষীণ আলোয় সবকিছু আবছাভাবে চোখে পড়ছে। দরজার পাশের সুইচবোর্ডে হাত দিতেই ঘর আলো হয় আর সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময় আরও গভীর হলো তার মুখে।
ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। মেঝেতে পড়ে আছে ছোট্ট একটা মেশিন, সম্ভবত ক্যান্ডি মেকার। বিশেষভাবে অর্ডার দিয়ে ডিজাইন করানো, হয়তো অহীন করিয়েছে। বুঝতে সময় লাগল না, কেননা মেশিনের গায়ে ছোট ছোট অক্ষরে লেখা,
“উমম পেঁচি, কটন ক্যান্ডি তোর লিপসের সঙ্গে একটু বেশি টেস্টি।”
কতটা নির্লজ্জ হতে হবে ঘরে এমন একটা মেশিন সাজিয়ে রাখতে হলে, তার ধারণা আশার নেই একটুও। অহীন পারবে নির্লজ্জের মেডেল গলায় ঝুলিয়ে ঘুরতে। কিন্তু ঘরের অবস্থা এমন বেহাল কেন? মেশিনটা তুলে ডাইনিং টেবিলের ওপর রেখে রুমে প্রবেশ করল সে। ঘরেরও একই অবস্থা, সব এলোমেলো। আশার নিজের হাতে কেনা ফুলদানিগুলো ভেঙে পড়ে আছে। লাইট জ্বালাতেই বিছানার ওপর চিত হয়ে পড়ে থাকা অহীন চোখ টিপে ধরে, দীর্ঘ সময় অন্ধকারে থাকার পর আলোয় অসুবিধা হচ্ছে চোখ মেলে তাকাতে। তবুও পিটপিট করে তাকাল আশার দিকে, চোখগুলো রক্তিম হয়ে আছে তার, রাগে জ্বলছে, বুঝতে অসুবিধা হলো না আশার। এক পা এগোতেই অহীন নিজেই উঠে বসে, আশাকে অবাক করে কোনো রকম রাগ প্রকাশ না করে স্থির শান্ত গলায় বলে,
“কেঁদেছিস?”
আশা একটু অবাক হলো, সঙ্গে শরীর বেয়ে শীতল বাতাস ছুঁয়ে গেল। অহীন সচরাচর রাগ করলে এতক্ষণে আশার শরীরের ওপর প্রতিক্রিয়া দেখানো শুরু হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। তবে এই শব্দটা অস্থির করছে তার সমস্ত কায়া। অহীন ঠোঁট বাঁকিয়ে ক্ষীন হাসে,
“আর কাঁদতে হবে না আশু, আমি তোকে আর কাঁদাবো না।”
বিছানার একটি পাশে পড়ে থাকা কয়েকটা কাগজ তুলে হাতে নিয়ে আশাকে ডাকে নিজের কাছে, পাশে বসিয়ে তার দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে কাগজ এগিয়ে দিয়ে শীতল গলায় বলে,
“আই অ্যাম সরি, আমার জন্য এতগুলো দিন তোর কষ্ট পেতে হয়েছে। আমি হয়তো পারব তোর একটা বছর ফিরিয়ে দিতে, কিন্তু আমি চাই তোর বাকি জীবনটা অন্তত সুন্দর হোক। আর সত্যি বলতে আমি ক্লান্ত, তোর সঙ্গে আমি জোর করে আর ভালো থাকতে পারছি না।”
তার কথার কোনো কিছুই বুঝে আসছে না। আশা হাতের কাগজের দিকে তাকায়; পৃথিবীটা যেন সেখানেই থামল আশার, পাতা উল্টে নিচের দিকে চোখ রাখে সে। অহীন সাইন করে দিয়েছে। অস্পষ্ট কম্পিত স্বরে বলে ওঠে,
“ডি..ডিভোর্স!”
অহীন তখনো প্রতিক্রিয়াহীন মাথা দোলায়,
“ছোট বাবা বড্ড ভরসা করে তোর দায়িত্ব দিয়েছিলেন আমার ওপর। আজ মনে হচ্ছে আমি ব্যর্থ, তোকে আগলে রাখতে পারলাম না। আবারও সরি। কিন্তু আমিও তো মানুষ! পুরুষ মানুষ, যার চরিত্রই অহংকার। আমার জগৎ তো তোকে নিয়েই। তোর এই অপবাদগুলো এখন আমার পায়ে শিকল হয়ে জড়াচ্ছে, আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না আগানো। তোর প্রতিটা কথা আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করি। একটুখানি ঘনিষ্ঠতাও যদি চেয়ে থাকি, তোর শরীরের সামর্থ্য বুঝেই চেয়েছি। তুই কাজ করতে বলেছিলি, করছি। ঘুরতে যেতে চাস, নিয়ে যাই। অসুস্থ থাকিস, রান্নার চাপ দেই না। তবুও কেবল একটা সাধারণ বাঙালি মেয়ের মতো সংসার তুই আমাকে দিতে পারলি না! সবার সামনে আমাকে ছোট করিস, আমি মুখ বুজে সয়ে নেই। কারণ তোকে আমি বড্ড ভালোবাসি।”
অহীনের কণ্ঠ কাঁপছে, হাতও কাঁপছে, কিন্তু তার শেষে বলে যাওয়া 'ভালোবাসি'টা আশার ভেতরে তোলপাড় করছে। অহীন বলে,
“কিন্তু এই ভালোবাসা একতরফা, আর একতরফা এই সম্পর্ক টানতে পারছি না। ভয় হয়, কোনোদিন তোকে আমি খুনই না করে ফেলি! এই ভয় নিয়ে আর যাই হোক, একসাথে এগোনো সম্ভব না। আর ক্ষমা আসে না ভেতর থেকে তোর জন্য, আই অ্যাম ডান আশু।”
আশা ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে অহীনের দিকে। গলার ভেতর কথাগুলো যেন ধারালো মাছের কাঁটার মতো আটকে আছে, কিছুতেই বের হচ্ছে না। অহীনের মলিন মুখে ফুটে উঠল এক চিলতে মৃদু হাসি। পরক্ষণেই হিসহিসিয়ে উঠে বলল,
"আই অ্যাম সরি! কিন্তু তোকে নিজের অনেস্টির প্রমাণ দিতে দিতে আমি সত্যি ক্লান্ত। আমরা যাকে ভালোবাসি, তার সঙ্গে ভালো থাকা বড্ড কঠিন। বরং যার আমাদের প্রয়োজন, তার সঙ্গে থাকাই বোধহয় শ্রেয়। তুই শেষ পর্যন্ত আমার একমাত্র চাচাতো বউ হয়েই রয়ে গেলি... অথচ আমি তোকে আপন করতে চেয়েছিলাম।”
তার কণ্ঠে কম্পিত কষ্ট, যা ঠোঁটের শীতল হাসির রূপ নিয়ে আছে। খানিক সময় বাদ অহীনের চোখের কোণায় জলবিন্দুর দেখা মিলল। আশা কাগজগুলো সাইডে রেখে অহীনের নিকট ঘেঁষে বসতে চায়, সুযোগ হলো না, অহীন সরে এসেছে তার থেকে। আশা বলল একটু নিচু গলায়,
“ অহীন পাগল..।”
শেষ করার আগেই তাকে থামিয়ে চিৎকার করে ওঠে অহীন,
“আমাকে একটু শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দে দয়া করে। তোর সঙ্গে দম বন্ধ হয়ে মরে যাব। যেই মেয়ে আমার চরিত্র ৫ টা মানুষের সামনে এমন নোংরা ভাবে বারবার উপস্থাপন করে, তার সঙ্গে আমি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মরতে চাই না।”
কিছুটা সময় চুপ থেকে আশা আবারও হাত বাড়িয়ে অহীনের কাঁধে হাত রাখতে গেলে, অহীন তাকে ঝাড়া দিয়ে ‘চ' করে ওঠে। যেন সে প্রকাশ করছে কতটা বিরক্ত আর অতিষ্ঠ আশার ওপর। আশা ঠোঁট গিলে ভেজা গলায় বলে,
“তুমি এমন করছ কেন? আমি ভুল করেছি মেনেছি বলেই তো এসেছি। এসব করে কি তুমি আমার সন্দেহ ঠিক প্রমাণ করছ? বাচ্চাটা তোমার?”
চোখ বুজে রাগ বর্জন করল সে, এখনো মেয়েরা একই কথা বলছে। সে কি বুঝতে পারছে না এটা অহীনের আত্মসম্মান কে নত করছে, শীতল গলায় বলে,
“তুই এ পর্যন্ত যা সন্দেহ করেছিস সব সঠিক, আমার চরিত্রে বিরাট সমস্যা। প্লিজ, সাইন করে নিজেকে মুক্ত করে ভালো থাক। আমাকেও নোংরা চরিত্র নিয়ে ভালো থাকতে দে।"
“অহীন..।”
“আমি সজ্ঞানে তোকে ছাড়লাম। তালাক, তালাক, তালাক। শান্তি চাই আমি। তোর সাইন না করাতেও কিছু যায় আসবে না এখন।”
দাঁত পিশে অল্পতে সমাপ্ত করে অহীন বসা থেকে উঠে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। আশার কান বাজছে অহীনের বলা তালাক-এ। হাতের কাগজগুলোর দিকে নিষ্প্ৰভ হয়ে তাকিয়ে আছে সে। শান্তি চায় অহীন? আফসোস হচ্ছে? হুম। কষ্ট না পেলে অহীন এত বড় সিদ্ধান্ত নেয়নি। ফুঁপিয়ে কাঁদছে সে। রুমে আবারও অহীন প্রবেশ করে। আশার সামনে ড্রেসিংটেবিলের ওপর ঘড়িটা খুলে ছুঁড়ে মেরে বলে,
“ওই রুমে অন্তু আছে, ওর সঙ্গে ঘুমা গিয়ে। আমার ক্লান্ত লাগছে, ঘুমাব।”
“আজকে শান্তিতে ঘুম হবে?”
“খুব শান্তিতে হবে।”
আশা ওর কথার হয়তো হাজার রকম মানে খুঁজেছে, শেষে নিজেই অনুভব করল অহীনকে একটু বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছে আর অহীন ক্লান্ত, সত্যি শান্তি চায় সে। চুপচাপ হাতের কাগজে সাইন করে পাশে রেখে চলে গেল। রুমটা খালি হতেই আটকে রাখা দমটা ফোঁস করে ছাড়ল অহীন। ঠোঁট টিপে ধরে কাঁদছে। তার কান্নার শব্দ নেই। আশা তাকে কাঁদিয়েছে প্রতিবার, এর দায়ও সারা হয়ে গেল। মেয়েটা ড্রেসিংটেবিলের গায়ে পরপর কয়েকটা ঘুষি বসিয়ে বিছানায় কাগজগুলো তুলে নেয় হাতে। পাশাপাশি দুটো সাইন। আগেও তারা করেছে, তবে এবার পূর্ণতার নয়, বিচ্ছেদের। নিচে পড়ে আছে কয়েকটা পিলের পাতা। সে কিছুক্ষণ আগেই তো অধৈর্য হয়ে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে ড্রাগস নিয়েছে। হয়তো তখন আশা কাছে থাকলে রাগ মেটাত অন্য উপায়ে, কিন্তু আশা আয়াশের সঙ্গে কোন সাহসে গেল? রুচি কি উবে যায় না?
চলবে....