#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ৪৬
জানালার ধারে বাহিরে উঠন্ত সূর্যের হালকা কিরণের দিকে তাকিয়ে আছে আশা, পুরোটা রাত ঘুমায়নি সে। অন্তিহা এতটা সময় ঘুমিয়ে থেকে আশাকে দেখে একপ্রকার ধড়ফড়িয়েই উঠেছে। অহীন রাতে প্রচুর রেগে ছিল সে দেখেছে। তবে এই একটা বছরে সে যতটুকু ওর স্বভাব আঁচ করেছে তাতে আশাকে পেলে রাগ কমে যাওয়ার কথা, তাই ক্লান্ত শরীরকে ক্লান্ত করে আর ঘরের কাজ করতে পারেনি। এলোমেলো ভাঙাচোরা অবস্থায় রেখেই ঘুমিয়েছিল। সাফওয়ানের জন্য তার বাড়ি আসতেও লেইট হয়, লোকটা যেখানে-সেখানে গিয়ে কথায় ভুলায়। আশার পাশে গালে হাত দিয়ে বসে আছে। জানার জন্য যে এত ভোরে তার রুমে কী জন্য এমন বসে আছে? তাইয়ানও রাতে বাড়ি ফিরবে না বলাতেই সে বাড়ি এসেছিল। অপর দিকে জেসি না থাকায় ডোমে একা লাগছিল। কিন্তু আশা? সে কোনোরকম কথাই বলছে না। অন্তিহা হয়তো পরপর ৫০ বার জিজ্ঞেস করেছে একই কথা, এবার বললে সংখ্যা বেড়ে ৫১ তে হবে,
“আশু কী হয়েছে বল? লাশের মতো বসে আছিস কী জন্য? ভাইয়ার সঙ্গে সমস্যা হয়েছে তোর?”
হাতে ধোঁয়া ওঠা কাপ নিয়ে ফুঁ দিতে দিতে আসছে, ছেলেটার আদলে ঘুম। গাড়িতে কী ঘুম হয়? তবুও যায় না। জানালার কাছে এসে অন্তুর দিকে কাপ এগিয়ে দিয়ে বলে,
“এত ভোরে উঠতে হয় না সুইটহার্ট, চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল পড়বে।”
কাপ প্রত্যাখ্যান করে অন্তিহা,
“রাতটা অন্তত বাড়ি গিয়ে কাটাতে পারেন। এটা কেমন ভালোবাসা আপনার? ২৪ ঘণ্টা ফেভিকলের মতো লেগে থাকার বায়না!”
সাফওয়ান তাকে আর জোর করল না খাওয়ার জন্য, নিজেই চুমুক দিয়ে বলে,
“ইশারা ডোমে থাকে। বাড়িতে মেইড ছাড়া কেউ নেই, গিয়ে লাভ কী? আপনাকে যখন নেব, আমি তো বেডরুম থেকেই বের হব না।”
অন্তিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছ সাফওয়ান, ছেলেটা কি এটাই চাচ্ছিল না? আজকাল তার মিস গম্ভীর রাগারাগি কমই করে। কেননা অন্তু নিজেও বুঝতে পেরেছে সাফওয়ান এত সহজে পিছু ছাড়বে না। তাই আর তার সঙ্গে তর্কে একদমই গেল না, আশার হাত নিজের হাতে রেখে চেপে ধরে জিজ্ঞেস করে,
“আশু বল আমাকে, উনি কি আবার তোর সঙ্গে ওমন কিছু করেছে রাগে?”
আটকে রাখা কান্নাগুলো আছড়ে পড়ল অন্তিহার মুষ্টিবদ্ধ হাতের ওপর। গুঙিয়ে উঠতেই অন্তিহা বিস্ময় নিয়ে তার দিকে তাকায়, এমন কান্না তো সেদিনও আশা করেনি। জানালার বাহির থেকে সাফওয়ান তাকিয়ে আছে। রাতে সে আশাকে দেখেছিল আয়াশের সঙ্গে, তাই মনে হচ্ছে অহীন এটা নিয়ে আশার সঙ্গে রাগ করেছে। অন্তিহা একটি হাত দিয়ে আশার পিঠে বুলিয়েই চলেছে। ক্রন্দন গলায় আশা নিজে নিজেই বলছে,
"আমি অহীনের সঙ্গেই থাকতে চাই, অন্তু। ও আমায় রোজ কষ্ট দেয়, রেগে থাকলে কষ্টের পরিমাণটা আরও বেড়ে যায়, তবুও আমি ওকে ছাড়তে পারব না। আচ্ছা, কাল রাতে যা হয়েছে সব মিথ্যা ছিল না? আসলে মিসক্যারিজের ট্রমায় আমার মাথাটা ঠিক নেই, আমি হয়তো খুব বাজে কিছু হ্যালুসিনেট করছিলাম।”
আশা বলতে বলতে সোজা হয়ে বসে, দুই হাতে পাগলের মতো নিজের চোখগুলো মুছে নিল। অন্তু, সাফওয়ান বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে আছে। আশা অ্যাবনরমাল বিহেভ করছে। তবে অন্তিহা আরও বিস্মিত হলো মিসক্যারিজের কথায়, কবে হলো? কীভাবে হলো?
“মিসক্যারিজ তোর?”
আশা তার কথা কি আর শোনে? অনাগত সন্তান যে নেই, কবে আসল আবার চলেও গেল সে জানে না। আবার অহীন রাতে যা করল এসব মাথায় চাপ তৈরি করছে। বসা থেকে উঠে অহীনের কক্ষের দিকে আগাতে নিতেই খেই হারিয়ে হেলে যায়, অন্তিহা নিকটে থাকায় ধরে নিল আশাকে। পুরো রাত নির্ঘুম চিন্তায় কাটিয়ে শরীর ছেড়ে দিয়েছে তার।
---
উপুড় হয়ে বিছানায় পড়ে আছে অহীন, আশার নির্ঘুম রাত কাটলেও ড্রাগস নেওয়ার ফলে অহীন ঘুমিয়েছে বেঘোরে। ঘুমন্ত অবস্থায় হাতগুলো বিছানায় হাতড়াচ্ছে যেন খুবই প্রয়োজনীয় কিছু খুঁজছে সে। না পেয়ে বিরক্তির ‘চ’ বলে মোচড় দেয়। অস্ফুটস্বরে ঘুমের ঘোরে প্রেয়সীকে সজোরে ডাকে,
“সোনা বাথরুমে তুই?”
না, সাড়া পেল না। কয়েকবার মোচড় দিতেই রাতের সমস্ত কিছুই আবার মস্তিষ্ককে সচল করল তার। শোয়া থেকে তড়িঘড়ি করে উঠে বসে, চোখমুখ কচলে স্মৃতিচারণ করে রাতের। মনে পড়তেই সে অস্থির হয়ে পড়ে, মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে,
“শিট!”
দীর্ঘ একটা বছর সে যতটুকুই আশাকে কাছে পেয়েছে নিজের মতো করে আদায় করেছে। এখন মেয়েটা শুধুই তার ভালোবাসার প্রেয়সী নয়, এখন অভ্যাস। সকালে কোনোদিনই সহজে ১০ টার আগে নিজেও উঠেনি আর না আশাকে নড়তে দিয়েছে। এটাই কারণ এমন স্ট্রং ড্রাগস নেওয়ার পরেও ঘুম ভেঙেছে তার।
নিজের করা কাজটাকে স্বপ্ন প্রমাণ করার জন্যই হয়তো, সে আবারও খুঁজতে লাগে কিছু, সামান্য খোঁজাখুঁজি করতেই বিছানার নিচে বাতাসে উল্টাতে থাকা কাগজে নজর পড়ে। পাতাটা উল্টে আবার আগের স্থানে এসে থাকছে। বাতাসে উড়তেই আশার সিগনেচার ভাসছে। আবার বাতাস জমতেই আড়াল হয়ে যাচ্ছে। অহীন বিছানা থেকে নেমে কাগজটা হাতে তুলে নেয়। ডিভোর্স এগ্রিমেন্টে লেখা প্রতিটা পাতা সে মনোযোগ দিয়ে পড়ছে। আর ক্ষয় হচ্ছে ভেতরে। এটা কোনো বিচ্ছেদের দলিল নয় শুধু, এটা সাক্ষী অহীন নিজ থেকে ওই নারীর ওপরের সমস্ত অধিকার ত্যাগ করেছে। মোচড় দিয়ে উঠছে তার ভেতরটা ভাবতেই এসব। দরজা ধাক্কা দিয়ে কোনোরূপ ভদ্রতা না দেখিয়ে সাফওয়ান প্রবেশ করে। অহীন তাকে দেখে অবাক হলো কেননা সে বাড়িতে ঢুকে না কখনোই। সাফওয়ান শান্ত গলায় জানাল মাত্র,
“তোর বউ অস্থির হয়ে আছে, অন্তিহা সামলাতে পারছে না।”
অহীন হাতের কাগজ রেখে নিচ থেকে শার্ট তুলে গায়ে জড়িয়ে বের হয়ে যায় সে রুম থেকে। অন্তিহার রুমে গিয়ে দেখে আশা চুপ করে আছে দরজার দিকেই তাকিয়ে। আর অন্তিহা পাশেই বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। শোয়া অবস্থায় আশা অহীনকে দেখেই উঠে আসতে চায়। অহীন একটু দ্রুত পায়ে ওর কাছে গেল। অন্তু সরল না, আশা কান্নার মাঝে একবার তাকে বলেছে তালাকের কথা তবে বিশ্বাস হয়নি অন্তুর, কিন্তু অহীনের মুখ দেখে সন্দিহান লাগছে। সে সরছে না দেখে আশা আবার উঠতে চায়, এবার বিরক্ত অন্তিহা সরতে বাধ্য হলো, অহীন গিয়ে হাঁটুতে ভর দিয়ে আশার পাশে বসতেই, দুই হাতে জাপটে ধরল রমণী তাকে,
“অহীন, আমি জানি তুমি আমাকে এত অল্পতে ছাড়বে না, ওসব আমাকে কষ্ট দিয়ে বোঝানোর জন্য বলেছ তাই না? আমার কী দোষ? তুমি আমাকে বলোনি আমার পেটে তোমার বাচ্চা ছিল। আর আর ওই মেয়ে কেন আমাকে দেখলে এমন করে? আমি কীভাবে নেব এতকিছু? তাই এসব নাটক ছিল তাই না?”
আশা ফুঁপিয়ে কাঁদছে, একই সঙ্গে দুটো ধাক্কা সামলাতে পারছে না। তার কান্নায় কি অহীনের আত্মা কাঁপছে না? সে ছেড়েছে বলে আশা এমন পাগলামি করবে হয়তো কল্পনায় ছিল না অহীনের। আচানক দূরে সরে অহীনের মুখ নিজের দুই হাতে আলতো করে ধরে, কান্না থামিয়ে ভেজা গলায় জিজ্ঞেস করে,
“কথা বলো। রাগ করে আছো? তাই উল্টোপাল্টা বলেছ না? ওসব কথা ভিত্তিহীন তাই না?”
অহীন নিষ্প্রভ চোখে আশার ক্রন্দিত মুখে তাকিয়ে আছে, কী সুন্দর ভাবে গুছিয়ে কান্না করে তাকে ভেতর থেকে ভাঙছে এই মেয়ে। এই পাগলামিগুলো দিয়ে অহীনকে কত নিখুঁত প্রক্রিয়ায় আফসোস করাচ্ছে। মাথা দুলিয়ে আবার জিজ্ঞেস করতেই অহীন মাথা উপর নিচ দুলিয়ে সম্মতি দিল তাকে,
“হুম রেগেছিলাম খুব, তাই সব ভিত্তিহীন।”
আশা দাঁত বের করে হাসল, গাল ছেড়ে অহীনের শার্টের বোতামে হাত রাখে। অদ্ভুত উত্তেজিত সে। অন্য সময়ের মতো অহীনের রাগ ভাঙিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে।
“আচ্ছা সমস্যা নেই, এক্ষুনি রাগ কমে যাবে।”
সাফওয়ান ওর এহেম কাজে বিব্রত হলো বোধহয়। অন্তিহার হাত ধরে রুম থেকে বের হতে নিলে নড়ল না অন্তিহা। কেননা অহীন আশাকে কিঞ্চিৎ সাড়াও দিচ্ছে না, বরং আশার হাতগুলো থামিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। ধস্তাধস্তি করে একটা বোতাম খুলতেই অহীন ওর সঙ্গে নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে থামিয়ে উন্মুক্ত বুকে মাথা চেপে ধরে,
“হুশ সোনা, থাম। এখানে সবাই আছে তো।”
“ওদের চলে যেতে বলো?”
“হুশ হুশ চলে যাবে, তুই চুপ করে থাক।”
তার উন্মুক্ত বুকে কাঁদতে কাঁদতে হয়তো জ্ঞান হারাল আশা, আচমকাই চুপ হয়ে গেল। তার আদল এক হাতে অহীন বুলিয়ে, এলোমেলো চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে তাকিয়ে আছে। মুখটা কান্নার নোনাপানিতে ভেজা। এই এই কান্না তাকে হারানোর ভয়ের। তবুও অহীনের কেমন আজ একটু শক্ত থাকতে ইচ্ছে করছে। রাগ ভাঙানোর প্রক্রিয়া কত সুন্দর জানে এই অবস্থাতেও। অথচ গতকাল সবার সামনে এই স্বভাবটাকেই বিকৃত দাবি করেছিল। আর আজ এটা দিয়েই তার রাগ ভাঙাতে চায় এই নির্বোধ নারী। অন্তু এসে তাদের সামনে বসে, আশার দিকে তাকিয়ে অস্ফুটস্বরে অহীনকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“ডিভোর্স কি সত্যি দিয়েছেন?”
“হুম।”
বাজ পড়ল তার মাথায়, নড়েচড়ে বসল একটু, সাফওয়ান অবাক হয়েছে, এগিয়ে অহীনের নিকট আসে, অহীনের সঙ্গে অনেক ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব না হলেও ব্যবহার আর আচরণ বলে দিল আশাকে ঠিক কতটা চায় এই ছেলে। নিজের স্বভাব একটু উশৃঙ্খল থাকায় অনেক সময় অহীনের ফোন সে কলেজ লাইফে না বলেও নিয়েছে তখন দুষ্টু ছিল একটু বেশি সে। আশার হাজারো ছবি দিয়ে গ্যালারি ভরপুর। যা সরাসরি অহীন কখনো কারো সামনে ওপেন করত না। কিন্তু কোনো স্বাভাবিক মানুষ কোনো অপ্রয়োজনীয় কারো এত ছবি নিজের কাছে রাখে না। তাই আন্দাজ তার একটাই ছিল অহীন তার পেচিকে ভালোবাসে। আর এত সহজে ছেড়ে দিল? সে একটু বিস্মিত কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“সত্যি ডিভোর্স দিয়েছিস? তালাক কিন্তু সজ্ঞানে দিতে হয়! তুই ড্রাগস নিয়েছিলি?”
“হুম নিয়েছিলাম। কিন্তু আমি পাগল না, হুশ ছিল।”
“অহীন ভেবে দেখ আর কিন্তু পাবি না তোর পেচিকে। আর এমন ভাবে কাছে…”
তার শেষ করবার আগেই ভরকায় অহীন, একে তো মাথা খারাপ তার ওপর কাটা ঘায়ে লবণ ছেটাচ্ছে জ্বলে উঠল তার শরীর, চেঁচিয়ে ওঠে,
“মাদার** কাটা ঘায়ে নুন ছেটাস কেন? তালাক মানে বুঝিস না? বিশ্বাস না হলে স্বর্ণকে বল স্ক্রিনশট দেবে।”
অন্তিহা সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে চুপ থাকতে বলে ইশারায়। সে একটু নড়েচড়ে আশার দিকে তাকায়, তাকে দুই হাতে আগলে ধরে আছে অহীন। আর আশা? অচেতন হয়েও অহীনের বুকের ভেতর ঢুকতে পারলে বাঁচে, সে গম্ভীর কিন্তু নিচু গলায় বলে,
“ও আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছে, আপনি কেন এটা করলেন? ভালোই তো চলছিল সব?”
“কিছু ভালো ছিল না অন্তু, আমাদের মাঝে আগের মতো কিছুই নেই। বিয়ের আগে ওর সাথে খুনসুটি ছিল যা এখন চাপ মনে হয়। যখন ও আন্দাজ করতে পারেনি আমি ওকে ছাড়া থাকতে পারব না ততদিন সব ঠিক ছিল। বিয়ের পর ও পাল্টেছে ওর সমস্ত কিছুতে সঙ্গ দিয়ে আমিও পাল্টেছি। এখন কেমন যেন জীবন একঘেয়ে হয়ে গিয়েছে আমাদের।”
“একঘেয়ে পনা কাটাতে তালাক দেবেন? দূরে রাখতে পারতেন।”
অহীন একটু চুপ থাকে, অন্তিহার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল কিছুটা সময়। মনের মাঝে বিরাট বোঝা, অন্তিহার সঙ্গে তেমন সম্পর্ক নেই বললেই চলে তবুও দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল নিজের দিকটা যা হয়তো বলা ঠিক নয় কারণ অন্তু তার বোন, তবুও অন্তুর প্রশ্নের উত্তর,
“অন্তু, আমাদের সম্পর্কটাকে ও ** পর্যন্ত থেমে আছে ভেবে নিয়েছে । যা সময়ের সাথে ওর কাছে বিকৃত মনে হচ্ছে। ও মনে করে ওর সঙ্গে আমি শুধু ** করতে চাই! আর ও অন্য রকম জীবন চায়। তাই ওকে আটকে রাখার মানে হয় না, ও যেমন জীবন চায় গড়ে নিক।”
ঠোঁট কামড়ে নতমুখী হয়ে বলে অন্তু,
"ও আপনাকে ভালোবাসে, এটা আপনি কেন বুঝতে পারছেন না? ওকে দেখে কি মনে হয় ও আপনাকে ছাড়া থাকতে পারবে? নিজেদের মাঝের যে সম্পর্কের কথা বললেন, তার জন্য হলেও ওর আপনাকে প্রয়োজন হবে ভাইয়া। রাগ করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত কি কখনো সঠিক হয়?”
"আয়াশকেও তো একসময় অনেক ভালোবেসেছিল, আজ কি আর মনে রেখেছে? ভুলে গিয়েছে তো! ঠিক তেমনি আমাকেও একদিন ভুলে যাবে। এখানে কোনো আবেগ নেই, সবটাই সময়।”
“ভালোবাসলে অনেক কষ্ট তাই না?”
অন্তিহার দিকে তাকায় অহীন, একটু এগিয়ে আশার মুখ থেকে হাত সরিয়ে অন্তিহার মাথায় রাখে। চোখ দিয়ে টপটপ করে গড়িয়ে পানি পড়ছে তার। ঢোক গিলে ভেজা গভীর গলায় বলে,
"তুই তো বুঝিস, আমি জানি না সাফওয়ান তোকে ঠিক কতটা ভালোবাসে। তোর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা হয়তো এতটা জোরালো নয় যে তোর হয়ে কোনো ঠিক-ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমি রাখব। কিন্তু তোর যদি একটুও মনে হয় তোর জন্য সাফওয়ানই পারফেক্ট, আর তুই বর্তমানে যাকে ভালোবাসিস তার চেয়ে সাফওয়ানের সঙ্গেই বেশি ভালো থাকবি, তাহলে সাফওয়ানকেই বেছে নিস। কারণ, ভালোবাসা ততদিনই ভেতর থেকে তীব্রভাবে অনুভব করা যায়, যতদিন আমরা দূরে থাকি, পাওয়ার জন্য লড়াই করি। কিন্তু পেয়ে যাওয়ার পর যখন অপর মানুষটা বুঝে যায় আমরা তাকে ঠিক কতটা ভালোবাসি, তখন সে বড্ড চতুর হয়ে ওঠে। নিজের অনুভূতি লুকিয়ে তখন সে আমাদের ধৈর্য নিয়ে খেলতে শুরু করে। আর সেই খেলা সইতে সইতে মনের ভেতরের মানুষটা একসময় ঠিক ভেঙে যায়। ভালোবাসা সেই ভেঙে যাওয়া মানুষটার কাছে ফিকে পড়ে যায়।”
ভার্সিটি যাওয়ার উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে আছে অন্তিহা। কিছুটা দূর মেট্রো স্টেশন তবে অন্তিহা যাচ্ছে না। সাফওয়ান গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে রোজ গাড়িতে ছাড়তে চায় কিন্তু একঘেয়ে অন্তিহা রাজি হয় না। ফোঁস করে শ্বাস নিয়ে অন্তিহা সাফওয়ানের গাড়ির জানালায় হাত রেখে ঝুঁকে আসে। তার কাজে খুশি হলো ছেলেটির মন। তবে নিরাশ হলো অন্তিহার আবেদনে,
“সাফওয়ান, জানি না ভাইয়া কোথায় আপনি তো ওনার বন্ধু আজকে একটু ওনার কাছে কাছে থাকবেন? আমার অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতেই হবে আজ। আপনি জানেন আমার ডে রুটিন।”
মুখ গোমরা করল তার কথায় ছেলেটা, ঠোঁট কামড়ে ধরল নিজেই নিজের। বলল,
“শুধু ভার্সিটিতেই থাকবেন তো?”
“আপনি জানেন আজকে আমার সম্পূর্ণ রুটিন।”
সাফওয়ান তার দিকে কিছুটা সময় তাকিয়ে থেকে বলল,
“ওকে, বাট কোথাও যাওয়া যাবে না হুম? আর আমাকে একটা প্রমিজ করতে হবে।”
মৃদুস্বরে হাসে অন্তিহা,
“নাটক করছেন?”
“হ্যাঁ বা না। না হলে আমি আপনার সঙ্গেই যাব।”
অহীনের জন্য চিন্তা হচ্ছে অন্তিহার, অন্তিহা একটু ইতস্তত হলেও রাজি হলো,
“কী শর্ত?”
“ভয় পাবেন না, ছোট শর্ত ইজি।”
“হুম হুম বলুন অসভ্য লোক।”
সাফওয়ান মুচকি হেসে ওষ্ঠ জিব দিয়ে ভিজিয়ে বলে,
“ফেরার সময় আমার গাড়িতে করে ফিরতে হবে। এবং আমার সঙ্গে সুন্দর আচরণ করতে হবে।”
“ডিল।”
অন্তিহা সহজেই রাজি হলো। আর প্রস্থান করল যথাস্থান থেকে।
____
সৃজনের অ্যাপার্টমেন্টের সিঁড়ি দিয়ে বড় বড় পা ফেলে ওপরে উঠছে অহীন। তার রাগ শরীরে প্রচণ্ড। দরজায় গিয়ে পরপর একনাগাড়ে বিরতিহীনভাবে কলিং বেল চাপছে সে। ভেতর থেকে ডাক শুনছে জেইনের,
“আসছি, কে?”
দরজা খুলতেই রক্তিম চোখে অহীন দেখে জেইনের কলিজা যেন জুড়ালো। সৃজনের এহেম ব্যবহারের পর হাজার খানেক কল সে তাকে দিয়েছিল তবে কল রিসিভ করেনি অহীন। শেষে জেসি তাইয়ানের বিষয়ে ছোট মেসেজ ছেড়েছে। তাকে দেখে মমতায় মুখখানি আলতো করে তুলে ধরে,
“আমার প্রিন্সটা পাপি রাগ করে এতগুলো কথা বলেছিল। তুমি ঠিক আছো?”
অহীন ফুঁসছে, তবে জেইনের আদলে একটু শান্ত হয়েছে। গালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে জেইন তার। সে মাম্মামের কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে ডুকরে ওঠে,
“আমি শেষ হয়ে গেছি মাম্মাম। তোমার প্রিন্স নিঃস্ব হয়ে গিয়েছে।”
“উহু কিছু হয়নি, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
অহীন মাথা তুলে, চোখের পানি মুছে বলে,
“কিছু আর ঠিক হবে না।”
চোখ যায় ড্রয়িং রুমে বসা তাইয়ান ও জেসির দিকে তার, জেসির ওপর রাগ হচ্ছে যদি এমনটাই করবে কেন তখন বলল না? সে তো এই মেয়েটাকেই ডিফেন্স করেছিল। আর তাইয়ান? অহীন জেইনকে পাশ কাটিয়ে কোনোরূপ সতর্কতাহীন ঝাঁপিয়ে পড়ে তাইয়ানের ওপর, শক্ত হাতে সোফায় চিত করে এলোপাতাড়ি ঘুসি দিয়ে চলেছে মুখের মধ্যে,
“ফাকিং বিচ, আই উইল কিল ইউ, ফাক।”
নাক দিয়ে রক্ত চলে আসছে, ঘটনা আচম্বিত সৃজন অহীনকে পেছন থেকে থামাতে এগিয়ে যায়, সৃজন রেগে নেই তা নয় কিন্তু এটা অমানবিক আচরণ তাইয়ানের সঙ্গে। জেসি বসা থেকে উঠে অহীনের হাত ধরতে চাইলে, ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিল তাকেও, জেইন না ধরলে হয়তো মেয়েটা গুরুতর আঘাত পেত। তাইয়ান শুরুতে অহীনের প্রতিবাদ না করলেও সামাল দিতে না পেরে, নিজ শক্তি দিয়ে অহীনকে উল্টে দিল সে। এবং ইচ্ছে করেই মাত্র দুটো ঘুসি দিয়ে সরে গেল। তবে অহীনকে থামায় কে? তার মাথায় তো চিন্তা একটাই, না তাইয়ান এসব করত আর না এতদূর জল গড়াত। সে আবারও ওর ওপরে উঠে আবারও আচম্বিত কাজে সৃজন তাকে ধরতে যায়। অহীন যথারীতি উঠতি যুবক তার সঙ্গে কি সৃজন পেরে ওঠে? সাহায্য হলো যখন পেছন থেকে আরও দুটো হাত অহীনকে থামাতে এল। টেনেহিঁচড়ে সরাতে সক্ষম হলো তারা তাকে। সৃজন সাফওয়ানকে দেখে অবাক হলো না সে চেনে তাকে। অহীন গর্জায় সবার ওপর,
“ছাড়ো আমারে, বাস্টার্ড সবার সামনে বলার হেডাম না থাকলে গা* মা** বিয়ে চু** কেন?”
তাইয়ান কম যায় কিসে, তেড়ে গিয়ে অহীনের কলার চেপে ধরে নিজেও চেঁচিয়ে ওঠে,
“লিমিট ওকে?”
তাচ্ছিল্যের হাসি দেয় অহীন,
“লিমিট? তোর আছে? তোর মিনিমাম আইডিয়া আছে কী করেছিস?”
তাইয়ান নাকের নিচে লেগে থাকা রক্ত বাম হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে মুছে,
“ভালোবাসি বিয়ে করেছি। সো?”
“এই কথাটা আগে বললে কী হতো? কেন বিয়ে থেকে সোজা ওসবে চলে গেলি? কাউকে চারআনার দামটাও দিসনি মাদার**। পরিবারকে বলে বিয়ে করতে পারতি।”
জেসি তাইয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে, সাফওয়ান অহীনকে ধরে আছে শক্ত করে, ছাড়লেই হিংস্রতার সঙ্গে তাইয়ানকে আবার ধরবে। তাইয়ান তাকে তাচ্ছিল্য করে হাসে, এবং ক্ষীণ হেসে এগিয়ে যায় অহীনের কাছে, আস্তে করে গম্ভীর ভারি গলায় বলে,
“কী বলতাম? নিজের থেকে ৪ বছরের বড় একটা মেয়ে যে কিনা আমাকে কোনো ভাবেই চায় না তাকে ভালোবাসি? তার ওপর তোর এক্স যাকে আমার আপন বোন বিষের চেয়ে বেশি বিষাক্ত নজরে দেখে? সহজে মানত কেউ? জেসি নিজেই তো মানতে চায়নি।”
“ধীরে ধীরে মানাতি, জেসির বিয়ে কি আমরা এখনই দিয়ে দিতাম? ও তো অনেক ছোট, পড়াশোনা করত, তারপর না হয় বিয়ে নিয়ে ভাবতাম। তুইও নিজের ক্যারিয়ারটা গড়তি। কিন্তু একটা ভুল সিদ্ধান্ত যে সবকিছু এভাবে ওলটপালট করে দেয়, তাই! ডু ইউ ফিল দ্যাট? তোর এই একটা ভুল পদক্ষেপ আমাকে জ্যান্ত লাশ বানিয়ে দিয়েছে। আমার আর কিচ্ছু বাকি রইল না, সব শেষ!”
“আমি জানি না, বাট আমার মনে হয়েছে জেসি আয়াশের প্রতি দুর্বল হচ্ছে তাই করেছি।”
অহীন ঝাড়া দেয় সাফওয়ানের হাত, সাফওয়ান ছাড়তে না চাইলে আবার ঝাড়া দেয়,
“ছাড় ইয়ার, কিছু করব না।”
সাফওয়ান ছাড়ল তবে অহীন ধপ করে সোফায় বসে, পাশেই সাফওয়ান নিজেও বসে। অজানার মতো সৃজন হয়তো ভাবছে জেসির জন্য চিন্তিত অহীন তবে তাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করে শক দিল সাফওয়ান,
“গত রাতে বাড়িতে এসব নিয়ে ঝামেলা করেছে ওরা হাসবেন্ড ওয়াইফ। আর অহীন..।”
তাঁইয়ান ভরকাল বলল,
“ওকে আবার কষ্ট দিয়েছে?”
তাচ্ছিল্য হাসে অহীন, সাফওয়ান বলে,
“হুম বড় কষ্ট, যা সারাজীবন বইতে হবে আর ভাই হয়ে বোনের এই পরিণতির কারণ হওয়ার বিরাট আফসোস তোমারও কাঁধে ঝুলবে। অহীন আশাকে ছেড়ে দিয়েছে।”
সৃজন কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। জেইন আঁতকে উঠেছে। আর তাইয়ান সে স্তব্ধ অহীনের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে আশ্চর্য হয়ে। জেইন এগিয়ে যায় অহীনের কাছে। পাশে বসে গালে আদুরে হাত বুলিয়ে দেয়,
“কী হয়েছে তোমার অহীন?”
কেঁদে ওঠে সে, জেইনের কাঁধে মুখ চেপে ধরে কাঁদছে। তার আহাজারিতে ক্ষয় হচ্ছে সৃজন। শুধু নিঃশ্বাস দমিয়ে রেখে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে। কাতর সেই কান্না সেই অশ্রুসিক্ত কণ্ঠ। অহীন গুঙিয়ে উঠছে বারবার,
“আমার কষ্ট হচ্ছে মাম্মাম, ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে আমি কী করলাম? আমার আফসোস হতো না একটুও যদি আমি আশার স্বাভাবিক রূপ দেখতাম। কিন্তু ও আমাকে চায়। আমি এমন সময় বুঝলাম যখন ও আমার নেই।”
রাত হয়ে আসছে প্রায়। আকাশের বুক থেকে সন্ধ্যার শেষ রেশটুকু মুছে গিয়ে চারপাশটা গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে। ভার্সিটি থেকে সবে বের হয়েছে অন্তিহা। আশেপাশে আজকে সাফওয়ান নেই। ব্যাপারটা কেমন যেন অন্যরকম লাগছে, কারণ প্রতিদিন সাফওয়ানের থাকাটা এখন তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত সে সবসময় হেঁটেই যায়, আজকেও তার ব্যতিক্রম হলো না।
___
কানে এয়ারফোন গুঁজে ফুটপাত দিয়ে আপনমনে হাঁটছে অন্তিহা। রাস্তার ধারের ল্যাম্পপোস্টগুলো এক এক করে জ্বলে উঠছে। চারপাশের দিকে খেয়াল নেই তার, সে নিজের মনেই আগাচ্ছে। সাফওয়ানকে কথা দিয়েছিল অপেক্ষা করবে বলে, কিন্তু এতটা সময় হয়ে গেল লোকটা আসল না। আর কতক্ষণ অপেক্ষা করা যায়? হঠাৎ নিজের পায়ের কাছে একটা কালো ছায়া পড়তেই থমকে গেল তার পা। কান থেকে এয়ারফোনটা টেনে খুলে ভয়ার্ত চোখে পেছনে তাকায় সে। না, পেছনে কেউ নেই।
এয়ারফোনটা হাতে রেখেই এবার কান সজাগ রেখে হাঁটতে লাগল অন্তিহা। কিছু দূর যেতেই পেছন থেকে ভারী বুটের খচখচ শব্দ পেয়ে শুকনো ঢোক গিলল সে। ধীরে ধীরে পেছনে তাকায়। একদম কালো মাস্ক পরা একটা লোক হাতে ধারালো ছুরি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কী ভয়ানক দৃশ্য! অন্তিহা এক পা এক পা করে পেছাচ্ছে আর লোকটা তার দিকে এগিয়ে আসছে। পেছন ফিরে দৌড় দিতে যাবে, ঠিক তখনই খেই হারায় টাল সামলাতে না পেরে, হোঁচট খেয়ে ধপ করে পড়ে গেল শক্ত জমিনে।
সঙ্গে সঙ্গে লোকটার হাতের ধারালো ছুরিটা আঘাত হানল। চোখের সামনে চকচকে ফলার নিচে গালে রক্তের বড় বড় ছিটে এসে লাগতেই আতঙ্কে চোখ বুজল অন্তিহা। তবে অদ্ভুত ব্যাপার, কোনো ব্যথা অনুভব হচ্ছে না তার!
বন্ধ চোখ পিটপিট করে তাকাতেই দেখে, মাস্ক পরা লোকটা দৌড়ে পালাচ্ছে আর তার পেছনে ছুটছে আয়াশের ড্রাইভার। অন্তিহা নিজের গালে হাত দিয়ে বুঝতে পারে, এগুলো তার নিজের রক্ত নয়, কারো গভীর ক্ষত থেকে ছিটকে আসা তাজা রক্ত। তৎক্ষণাৎ সে পাশে তাকায়। নিজের মাংস চিরে যাওয়ার তীব্র যন্ত্রণায় হাত চেপে ধরে চোখ বুজে আছে আয়াশ। তাকে ওই অবস্থায় দেখেই আঁতকে উঠে চেঁচিয়ে উঠল অন্তিহা,
“আয়াশ, আপনি?!”
আয়াশের গলার আওয়াজ ব্যথায় কাঁপছে,
“তোমার ক্লাস শেষ হয়েছে কখন? ইডিয়ট, এত রাতে বাড়ি ফিরছ কেন?”
“আপনার রক্ত আসছে! গাড়ি কোথায়? ফাস্টএইড বক্স আছে না? চলুন!”
তার কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আয়াশকে উঠতে সাহায্য করল এবং নিজের থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে গাড়ির পেছনের সিটে নিয়ে বসিয়ে দিল। ফাস্টএইড টুল গাড়িতে সবসময়ই রাখে আয়াশ, কারণ তার শরীরে সামান্য একটু স্ক্রেচ আসলেও ব্যান্ডেজ করে ফেলার একটা স্বভাব আছে। গাড়িতে অন্তিহা একরকম ধাক্কা দিয়েই বসিয়ে দিল তাকে। নিজের এই মরণ যন্ত্রণা অগ্রাহ্য করে আয়াশ অন্তিহাকে গাড়িতে ওঠার আগে নিষেধ করে,
“জুতো ঝেড়ে গাড়িতে ওঠো।”
এই তীব্র যন্ত্রণার মাঝেও লোকটা শুচিবায়ুর কথা ভাবছে? অন্তিহা মনে মনে খুব বিরক্ত হলো, তবে তার কথা রাখে। জুতো দুটো নিচে নামিয়ে রেখেই সিটে উঠে বসে তার সামনে। আয়াশের ডান বাহুতে চাকুটা গভীর আঁচড় কেটেছে, ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়ছে। ক্ষতটা দেখে মেয়েটার কপাল বেয়ে ঘাম ছুটছে ভয়ে। আয়াশ ব্যথায় বারবার কুঁকড়ে উঠছে, তবে অন্তিহাকে বকতে একদম ভুলছে না,
“আর কোনোদিন এমন উড়নচণ্ডীপনা করতে দেখলে ডানা কেটে বিডি পাঠাব তোমাকে! এত রাতে পথেঘাটে কী?”
শেষের কথাটা আয়াশ বেশ ধমকের সুরে বলতেই ধড়ফড়িয়ে ওঠে অন্তিহা। মেয়েটার এবার সত্যি রাগ হলো। সে তো বলেনি এসে এই 'স্যানিটাইজারের প্যাকেট'কে হিরোগিরি দেখাতে! রাগের মাথায় সে আয়াশের ক্ষতস্থানে জোরে চেপে ধরে, এতে আয়াশ তীব্র আর্তনাদ করে ওঠে,
"ও গড, অন্তি! ডোন্ট প্রেস, ইটস হার্টস! প্লিজ ছাড়ো।”
অন্তিহা হাত ছেড়ে দিল ঠিকই, তবে নিজের রক্তাক্ত হাতের তালুটা আয়াশের মুখের সামনে ধরে ছুঁয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে বলল,
“পাঁঠার মতো চেঁচালে এই ব্লাডগুলো দিয়ে পুরো গাড়ি মাখিয়ে দেব, একদম চুপচাপ বসে থাকুন। আপনাকে আমি সাহায্য করতে বলিনি! আজ ওই অসভ্যটা নেই, মাথায় ছিল না। নিজেকে সেফ ভেবে হাঁটছিলাম।”
আয়াশ একদম চুপসে গিয়ে সিটে পিছিয়ে বসে, অন্তিহা নিজের কাজে মন দেয়। সে হাত ধুয়ে এসে আয়াশের পরনের সাদা শার্টের বোতামে হাত দিতেই আটকে দিল আয়াশ,
“শার্ট খুলতে হবে না।”
বিরক্তির 'চ' উচ্চারণ করে তার হাত ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দেয় অন্তিহা। একটা একটা করে বোতাম খুলতে খুলতে বলল,
“তো আমি কি চিকিৎসা আপনার শার্টের ওপর করব?”
তৃতীয় বোতামটা খুলতেই অন্তিহার হাত দুটো কাঁপে, আয়াশের চওড়া, সুগঠিত বুকটা এই মুহূর্তে একদম উন্মুক্ত তার চোখের সামনে। অতটুকুতেই ক্ষতস্থানটা বের করা যাবে ভেবে সে আর নিচের বোতামের দিকে নামল না। কিন্তু কাঁধের কাপড়ে আলতো টান দিতেই আয়াশ বড় বড় শ্বাস ফেলে নেশালো ফিসফিসে গলায় বলল,
“খুলছ যেহেতু পুরোটাই খুলে দাও। এটা আমাকে অস্থির করছে।”
ব্যথাতুর গলায় মায়া হলো, আয়াশ রক্তকেও নোংরা মনে করে ভেবে। অন্তিহা বাধ্য হয়ে মাথা দোলায়। আবারও কম্পিত হাত রাখল নিচের বোতামগুলোতে। শার্টটা পুরোপুরি উন্মুক্ত হতেই আয়াশ শরীরটা সিটে ছেড়ে দিল। তার নিঃশ্বাস এতটাই ভারী যে পেটের অ্যাবসগুলো প্রতিটা শ্বাসের সাথে কাঁপছে। আয়াশ এক হাত দিয়ে শক্ত করে গাড়ির সিট চেপে ধরে মাথাটা উল্টো দিকে হেলিয়ে হিসহিস করে বলল,
“I've never felt this kind of heat before. Please, Don't stop.”
তার এই নেশালো গলার কথা আর গভীর আকুতিতে অন্তিহার হাতসহ নিজের শরীরটাও কম্পিত করছে। সে থতমত খেয়ে একটু পিছিয়ে গেল, ঠোঁট দুটো তার তিরতির করে কাঁপছে। সে থেমে যেতেই আয়াশ মাথা তুলে তার দিকে তাকাল,
“থামতে না করলাম তো?”
“আপনার ক্ষত অনেক গভীর। হসপিটাল গিয়ে ড্রেসিং করিয়ে নিন, আমি পারব না।”
অন্তিহা বলেই গাড়ি থেকে নামতে চায়। কিন্তু পারল না। পেছন থেকে তার হাতটা শক্ত করে টেনে ধরল আয়াশ,
“অন্তি, পেইন হচ্ছে... প্লিজ।”
“কিন্তু...”
“উমমম... প্লিজ।”
কী অদ্ভুত এই অনুভূতি! অন্তিহা বুঝতে পারে এই লোকটার প্রতি দুর্বল। তার ওপর আয়াশের এমন গুঙিয়ে বলা কথাগুলো তার ভেতরের নারীত্বকে এক তীব্র ব্যাকুলতায় নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। রক্তের স্রোত দেখে সে আর নিজেকে দমিয়ে রাখল না। এবার চোখ টিপে, তাড়াহুড়ো করে আয়াশের গা থেকে শার্টটা পুরো খুলে দেয়। ফাস্টএইড বক্স থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো তুলে নিয়ে খুব সাবধানে ক্ষতে লাগিয়ে দিতে দিচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে তার পুরো মনোযোগ এখন হাতের কাজের ওপর।
আয়াশ নির্লিপ্ত, তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে আছে অন্তিহার দিকে। পুরোটা দিন বাইরে কাটিয়ে আসার পরেও অন্তিহার শরীর থেকে এক ধরনের মিষ্টি, মাদকতাময় সুবাস আসছে। মেয়েটার চোখের ওপর ছোট ছোট কিছু চুল এসে পড়তেই আয়াশ নিজের হাত বাড়িয়ে সেগুলো আলতো করে তার কানের পেছনে গুঁজে দিল। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে,
“পারফিউম ইউজ করো?”
কাজের মাঝেই আনমনে উত্তর করে অন্তিহা,
“ছোট থেকেই।”
“কখনো যে এই ঘ্রাণ পাইনি...”
“কখনো খেয়াল করেননি, তাই।”
দাঁত দিয়ে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে আয়াশ। এত কাছ থেকে সে কোনো মেয়েকে এই প্রথম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। নিজের ব্যাকুলতা আড়াল করতে সে একটু ঘাড় ঘুরিয়ে সিটে পড়ে থাকা রক্তে ভেজা শার্টটা তুলে কোলের ওপর রাখে। আড়চোখে আয়াশের এই অদ্ভুত কাণ্ড লক্ষ করে অন্তিহা। সে ব্যান্ডেজ শেষ করে মৃদু গলায় বলল,
“আপনার পুতুলকে ভাইয়া ছেড়ে দিয়েছে।”
আয়াশ তার কথাটা হয়তো শুনতেই পায়নি। সে একমনে তাকিয়ে আছে অন্তিহার শরীরের এমন এক অংশে, যেখানে তার তাকিয়ে থাকাটা একদম উচিত নয়। অন্তিহা কাজ শেষ করে একটু সরে এসে তার দিকে চোখ রাখে। আবার জিজ্ঞেস করে,
“তো, কী ভাবলেন?”
“সুন্দর...”
“হুঁ? কী বলছেন?”
হকচকিয়ে উঠে আয়াশ নড়েচড়ে বসে। কোলের ওপরের শার্টটা ঠিকঠাক টেনে নিয়ে কোমরের নিচের অংশটা আড়াল করার চেষ্টা করে, একটা শুকনো গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“না... মানে, সুন্দর করে ড্রেসিং করেছ। থ্যাংকস।”
কথাটা আর দ্বিতীয়বার বলার ইচ্ছে হলো না অন্তিহার। সে গাড়ি থেকে নেমে আসে। আয়াশ তাকে নামতে দেখে পেছন থেকে আবার বাধা দেয় হাত ধরে,
“আবার নামলে কেন? আসো, আমি ড্রপ করে দিচ্ছি।”
অন্তিহা রাস্তার অপর পাশে তাকায়। সেখানে সাফওয়ান বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, মাত্রই এসে পৌঁছেছে সে। অন্তিহা গাড়ির জানালার দিকে একটু ঝুঁকে বলল,
“আমি সাফওয়ানের সঙ্গে যাব। ওকে কথা দিয়েছিলাম।”
“কথা দিলেই রাখতে হয়? গাড়িতে ওঠো।”
অন্তিহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“কথা দিয়েছি, রাখতে তো হবেই। বাই। মেডিসিন নিয়ে নেবেন, পেইন কমে যাবে। ড্রাইভার আঙ্কেলকে বলুন ড্রাইভ করতে, আপনার হাতে চাপ দেবেন না। পারলে হসপিটাল থেকে একটা প্রপার ট্রিটমেন্ট নিয়ে নিয়েন।”
সে আর কোনো কথা বাড়ায় না, আয়াশের কোনো বারণও শুনল না। কেবল হাত নেড়ে রাস্তা পার হয়ে চলে গেল। সাফওয়ান তাকে দেখেই বাইক স্টার্ট দেয়। অন্তিহা বিন্দুমাত্র বাক্যব্যয় না করে তার পেছনে গিয়ে বসে, তবে মেয়েটা তাকে ছুঁল না।
গাড়ির জানালা দিয়ে তাকিয়ে আয়াশ। ড্রাইভার এসে সিটে বসার পরেও আয়াশ একমনে ওদের চলে যাওয়া বাইকটার দিকেই তাকিয়ে আছে। হঠাৎ করেই, নিজের অজান্তেই আয়াশের পুরো শরীর এক তীব্র ভাবে কাঁপতে শুরু করেছে। বুকের ভেতর থেকে একটা অবাধ্য কিছু বেরিয়ে আসতে চাইছে। শরীর শান্ত হতেই সে তড়িঘড়ি করে কোমর থেকে রক্তে ভেজা শার্টটা সরিয়ে নিজের মুখটায় হাত চেপে ধরে, আক্রোশে উচ্চারণ করে ওঠে,
“ফাক!”
তার ফর্সা গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে। সে একটু আড়চোখে সামনে বসা ড্রাইভারের দিকে তাকায়। আয়নায় লোকটা তার দিকেই তাকিয়ে আছে, তিনিও মুচকি হাসছে তাকে লজ্জা দেওয়ার জন্য। এতে আয়াশের শ্যামলাটে গাল দুটো আরও একটু লালচে হয়ে উঠেছে। সে ঠোঁট কামড়ে চোখ বুজে সিটের একপাশে কাত হয়ে বসে। আড়াল করে নিজের অবাধ্য চাওয়া।
গাড়ি স্টার্ট নিতেই সামনে থেকে ড্রাইভার খুব ক্ষীণ গলায় তাকে পরামর্শ দিলেন,
“তোমার এবার বিয়ে করে নেওয়া উচিত, আয়াশ। ওসিডির বাহানা আর কতদিন চালাবে?”
আয়াশ চোখ বুজেই বিরক্ত হয়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বলে, “শাট আপ, আঙ্কেল! তাড়াতাড়ি বাড়ি চলুন, ওয়াক।”
"ওয়াক করছো কেনো? তুমি ৩২ এর ফার্সট টাইম না।"
"ফার্স্ট।"
"ও শিট তারাতাড়ি বাড়ি যেতে হবে!"
বলেই গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিলেন লোকটা। আয়াশ গুলিয়ে ওঠা গায়ে হাত চেপে ধরে বসে আসে৷ কাদলে হয়তো আরো বেশি আড়াম ফিল হতো কিন্তু কাঁদতেও পারছে না।
___
বাইকে চুপ করে বসে আছে অন্তিহা, বাইক চালাচ্ছে সাফওয়ান। কারো মুখে কোনো কথা নেই। চারপাশটা একদম থমথমে। সাফওয়ান বাইকটা চালাতে চালাতে নির্জন একটা রাস্তার পাশে সাইড করে দাঁড় করায়। অন্তিহা চারপাশে তাকিয়ে অচেনা পরিবেশ দেখে একটু ঘাবড়ে গিয়ে সাফওয়ানের দিকে তাকায়। কিন্তু সাফওয়ান কোনো কথা না বলে বাইক লক করে নেমে আসে।
চারপাশে শীতল বাতাস বইছে। অন্তিহার চুলগুলো এলোমেলোভাবে উড়ছে। সাফওয়ান আচমকাই অন্তিহার একদম সামনে এসে দাঁড়ায় এবং ওর দু'পাশে বাইকের হ্যান্ডেল আর সিটের ওপর হাত রেখে ওর ওপর ঝুঁকে আসে। এই অপ্রত্যাশিত কাণ্ডে নিজেকে বাঁচাতে পেছনের দিকে যতটা সম্ভব ঝুঁকে গেল অন্তিহা। অন্তিহার নরম, গোলাপি অধরের দিকে চোখ রেখে সাফওয়ান দাঁত কিড়মিড় করে জিজ্ঞেস করে,
“ওর গাড়িতে কেন উঠেছেন?”
চোখ ফিরায় অন্তিহা। সাফওয়ানের এত কাছে চলে আসাটা এই মুহূর্তে তাকে ভীষণ বিব্রত করছে। সে একটা শুকনো ঢোক গিলে ভেজা গলায় বলল,
“আমার ওপর অ্যাটাক হয়েছিল, তখন আমাকে বাঁচাতে গিয়ে ওনার হাত ইনজুরি হয়েছে। সেটাই জাস্ট ড্রেসিং করে দিচ্ছিলাম।”
“অ্যাটাক?!”
বলেই সে একটু সরে আসে অন্তিহার ওপর থেকে। সাফওয়ান সরতেই হাফ ছেড়ে সোজা হয়ে বসে অন্তিহা,
“হুম, চাকু দিয়ে।”
মুহূর্তেই ছেলেটার মুখাবয়ব চিন্তিত হয়, সেই সাথে তীব্র এক আফসোস দলা পাকিয়ে আসছে তার বুকে, প্রেয়সীকে এভাবে একা ছাড়ার। গলার স্বরে কিছুটা অভিমান মিশিয়ে সে বলল,
“আপনাকে এই জন্য একা রেখে আমি রাতেও বাড়ি যাই না! লেগেছে কোথাও আপনার?”
বলেই সে ছুঁতে চায় তাকে। কিন্তু সাফওয়ানের হাত ছোঁয়ার আগেই একটু পাশে সরে অন্তিহা,
“লাগেনি, আয়াশ ছিল তো।”
তার মুখে আয়াশের নামটা শুনে স্তব্ধ হয় সাফওয়ান। মুহূর্তের মধ্যে চোখগুলো জ্বলে ওঠে তার। সে আবারও নিজের দু'হাতের মাঝে আবদ্ধ করে তীব্রভাবে ঝুঁকে আসে অন্তিহার মুখের ওপর। গভীর ব্যাকুলতা ভরা ফিসফিসে গলায় বলল,
“একটা পুরো বছর ধরে আপনার জন্য পাগল হয়ে আছি আমি! আমার কোনো রিলেশনশিপ ইনটিমেট না হয়ে এক সপ্তাহও টেকেনি কোনোদিন। আর সেখানে আপনি আমাকে একটুও পছন্দ করেন না জেনেও... আমি জাস্ট পাগলের মতো আপনার পেছনে পড়ে আছি!”
শুকনো ঢোক গিলে অন্তিহা,
“আমি বলিনি আমার জন্য পাগল হয়ে থাকতে। আপনার হাজারো অপশন আছে, ফিরে যান।”
সাফওয়ানের আর সহ্য হচ্ছে না বারবার একই ভাবে রিজেকশন। সে শক্ত একটা হাতে অন্তিহার নরম চোয়ালটা চেপে ধরে। চাপের কারণে মেয়েটির ঠোঁট দুটো পাউট হয়ে গেল। একটু সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়াতে তার চিবুকের কোমল মাংসটুকু সাফওয়ানের আঙুলের ফাঁক দিয়ে উপচে পড়ছে। গোলাপি নরম ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে সাফওয়ান তৃষ্ণার্তের মতো ঢোক গিলে, ব্যাকুল হয়ে বলল,
"আপনার মনে হয় আমি ট্রাই করিনি? আপনাকে দেখার পর প্রথম রাতে আই টুক থ্রি হাই-ডোজ ড্রাগ পিলস, জাস্ট আপনাকে মাথা থেকে বের করার জন্য! আমার পেছনে যে মেয়েটা তিনটে বছর ধরে পড়েছিল, যাকে কোনোদিন গুনতিতেই ধরিনি, তাকে অব্দি বেডরুমে নিয়েছিলাম। বাট ট্রাস্ট মিইই... আই কুডন্ট ডু অ্যানিথিং! ইচ্ছে করছিল শুধু আপনাকে... জাস্ট আপনাকে ছুঁতে। ভেবেছিলাম টাইম হিলস এভরিথিং, দুটো দিন গেলে ঠিক হয়ে যাবে। দু'দিন পর আবার ট্রাই করলাম, বাট আই ফেইল্ড মিজ্যারেবলি! ফাইনালি আই রিয়ালাইজড, আপনি আমার জাস্ট লাভ নন, আপনি আমার অ্যাডিকশন! প্লিজ, এমন কিছু করবেন না যাতে আমি কারো প্রাণ নিয়ে নিই। ডু ইউ গেট দ্যাট? হুম?”
সাফওয়ানের শক্ত হাতের বাঁধন থেকে কোনোমতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে একঝটকায় বাইক থেকে নামে অন্তিহা। বুকটা তার কাঁপছে। এক শ্বাসে সে নিজের ভেতরের জমানো ক্ষোভ উগরে দেয়,
"আপনি নিজের দিকটাই ভাবছেন সাফওয়ান, আমার ফিলিংসের কোনো দাম নেই? আমি আপনাকে ফিল করতে পারি না, এটা কি আমার ইচ্ছে করে করা? ভাইয়া যেভাবে লাইফে কষ্ট পাচ্ছে, যে তাকে ভালোবাসে না তার সঙ্গে জড়িয়ে যেভাবে নিজেকে শেষ করছে... আমি ওমন কষ্ট পেতে চাই না। আপনাকে রোজ নতুন করে এক একটা সুযোগ দিচ্ছি আমি, সেগুলো দেখতে পারছেন না আপনি? বাট ট্রাস্ট মি, আমি ভেতর থেকে আপনার জন্য কিছুই ফিল করতে পারছি না। আমার মস্তিষ্ক সারাক্ষণ জাস্ট একটা কথাই বলে যায়, বিয়ে করার কী দরকার? একা তো বেশ শান্তিতে আছি। এখন এই সিচুয়েশনে আপনি জাস্ট আমার লাইফের একটা উটকো ঝামেলা ছাড়া আর কিছুই নন!”
একদমে এতগুলো কথা বলে হাঁপাতে হাঁপাতে থামল সে। সাফওয়ান তার দিকে অবাক, নেশাল নেত্রে তাকিয়ে আছে। অন্তিহা যে তাকে সত্যি বারবার সুযোগ দিচ্ছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সে তাকে সুযোগ না দিলেও সাফওয়ানের কী বা এসে যেত? সাফওয়ান কখনোই তার পিছু ছাড়বে না। যতক্ষণ শরীরে প্রাণ আছে, এই 'মিস গম্ভীর' শুধু তার, এবং তারই থাকবে।
হঠাৎ একটা হেঁচকা টানে অন্তিহাকে আবারও বাইকের বডির সাথে চেপে ধরে সে। আচমকা ধাক্কায় রমণীর কোমরে বোধহয় সামান্য চোট লাগতেই, মৃদু গুঞ্জন বেরিয়ে আসে মুখ থেকে। সাফওয়ান তার কানের খুব কাছে নিজের ঠোঁট নিয়ে গিয়ে হিসহিস করে জিজ্ঞেস করে,
“বিয়ে করতে চান না? ইউ ডোন্ট নিড **?”
সাফওয়ানের চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে অন্তিহা স্পষ্ট স্বরে জবাব দিল,
“নো, আই ডোন্ট।”
চোয়াল ছেড়ে তার অধরে হাত রাখে সাফওয়ান, নরম ঠোঁট হাতের ছোঁয়ার সঙ্গে দুলছে। একপাশে সেটা টেনে নিচে নামায় সাদা চকচকে দাঁতগুলো দেখা যাচ্ছে। সাফওয়ান হাস্যিস্বরে বলে,
"ওকে ডান! আজকে ছুঁয়েছি, আর কোনোদিন ছোঁব না। নো মোর টকস অ্যাবাউট ম্যারেজ। আমাদের জীবনটা এভাবেই চলুক। এই সফট লিপসের মায়া আমি আজকেই ছাড়লাম। বাট রিমেম্বার ওয়ান থিং... অন্য কারও সাথে আপনাকে আমি জাস্ট সহ্য করতে পারব না। বিয়ে করলে আমাকেই করতে হবে, নয়তো চলুক এভাবেই, আমি পিছু নেব আপনি বারবার অসভ্য বলে গালি দেবেন আমাকে। টাচ না করেও আমি এভাবে সারাজীবন পার করে দিতে পারব, আন্ডারস্টুড?”
সাফওয়ান করল তাই, একটিবার অন্তিহার সম্মতি চাইল না। মেয়েটা তার শর্তে রাজি নাকি না তা জানার বিন্দু মাত্র ইচ্ছে নেই। সরে যেতে নিলে অন্তিহা তার হাত ধরে নিজের দিকে ফেরায় আবার, ছলছল চোখে তাকিয়ে বলে,
“এভাবে কারো জন্য বাঁচা সম্ভব নয় আমার। আমি নিজের জন্য বাঁচতে চাই। এটা খেলা নয়। আপনি পাগল, কথার মাঝে হুমকি দেন আমাকে।”
তাকে ছেড়ে বাইকে উঠে বসে, এবার বাতাসের গতির সঙ্গে টেক্কা দিয়ে আগাচ্ছে না। বাইকের গতি এতটাই বেশি না চাইতেও সাফওয়ানের পরনের শার্টটা পেছন থেকে খামচে ধরতে হতো তার। এবার বাড়ির সামনে এসে থামে তারা, অন্তিহা নেমে যেতে নিলেই তার হাত ধরে আস্তে করে টানে সাফওয়ান, এগিয়ে আসে আবার ওর নিকট, একটি হাত দিয়ে অন্তিহার হাতের ভাঁজে নিজের হাতের সব গুলো আঙুল গুঁজে দিয়ে বুকের ওপর টেনে রাখে, ঠোঁট বাঁকায় কানের কাছে এসে নেশালো গলায় হিসহিস করে গায়,
“Dil ibaadat kar raha hai,
dhadkanein meri sun
Tujh ko main kar loon haasil,
lagi hai yahi dhun
তার গরম শ্বাস আছড়ে পড়ছে অন্তিহার ঘাড়ে। চোখ বুজে হাত ঝাড়া দিয়ে কোনোমতে দৌড় দেয় সে বাসার ভেতর। তাকে প্রথমবার এমন বাচ্চামো করতে দেখে মুচকি হাসে সাফওয়ান। পরক্ষণেই অন্তিহার ওপর অ্যাটাক হয়েছে মনে পড়তেই চোয়াল শক্ত হয় তার। পকেট থেকে ফোন বের করে কল দেয় কোনো পরিচিত নাম্বারে। কল যাবে হয়তো জানা ছিল তাই সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ হয়। সে দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
“আমার সুখ আপনার সহ্য হয় না? আমি ভালো আছি। আপনি নিজেই তো চাইতেন আমি ভালো থাকি, তাহলে কেন ওর ওপর অ্যাটাক করালেন।”
ওপাশ থেকে ভারি গলা আসে,
“আমি চাই তুমি বাংলাদেশ আসো, আমাকে খুন করার জন্য হলেও আসো মাই বয়।”
“ইন ইউর ড্রিম, আমি বিডি যাব না কোনোদিন না।”
“তোমার গার্লফ্রেন্ড চলে আসলেও না?”
“ওর থেকে দূরে থাকবেন। ওর জন্য যদি বিডি আসতে হয় খুন আমি আপনাকে নিশ্চিত করব। আমি বদলে গিয়েছি, আমাকে একদম উসকানি দেবেন না।”
___
দরজার ভেতরে প্রবেশ করেই পাগলের মতো নিজের ফোন, জুতো এলোমেলো ভাবে ছুড়তে ছুড়তে চুলগুলো দুই হাতে আউলে-ঝাউলে দিয়ে চিৎকার করে অন্তিহা,
“আআআআআ।”
শেষে পায়ের ওপর কয়েকবার ঝাড়া দিয়ে শরীর ছেড়ে দাঁড়ায় সে। সামনেই মলিন মুখে বসে আছে তাইয়ান, অহীন আর আশা স্বাভাবিক আচরণ করছে যেন কিছুই হয়নি। তাঁদের খাবার দিচ্ছে। তার দিকে অবাক চোখে সবাই তাকিয়ে আছে। অন্তিহা বোকার মতো হেসে ঝুঁকে জুতো গুলো যথাস্থানে রেখে আশাকে জিজ্ঞেস করে,
“এখন সুস্থ আছিস জান?”
আশা হালকা মাথা দোলায় এবং বলে,
“হুম। খেতে আয়।”
অন্তিহা সোজা বেসিনের দিকে গিয়ে হাত ধুয়ে চুলগুলো ঠিক করেই এসে বসে তাদের সামনে। অহীন বা আশার মাঝে কোনোরকম পরিবর্তন নেই। বরং অহীন স্বাভাবিক ভাবেই আশাকে বলে,
“আশু তরকারি দে।”
আর আশা সেও কোনোরকম তর্ক করছে না বা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। বেড়ে দিচ্ছে তাদের খাবার। অন্তিহার সামনে প্লেট দিয়ে খাবার দিচ্ছে আশা। নিজে তখন থেকে তাদের পরিবেশন করেই যাচ্ছে, নিজে খাচ্ছে না। অহীন একটু গলা ঝেড়ে বলে,
“তুইও খেয়ে নে। নয়তো অসুস্থ হয়ে যাবি।”
“আমার খিদে নেই তোমরা খাও।”
তার মলিন গলায় বলা কথাটা শুনে চোখ রাঙায় অহীন। শুকনো ঢোক গিলে আশাও পাশেই বসে নিজের প্লেটে খাবার নিচ্ছে কিন্তু এই খাবার কি গলা দিয়ে নামবে তার? মনকে মানাতেই পারছে না, অহীনের গলা দিয়ে কীভাবে নামছে? তাহলে কি সত্যি অহীন তাকে ছেড়ে খুশি আছে? প্লেটে নিজ হাতেই খাবার তুলে দিচ্ছে তাকে অহীন। আশার নরম মুখের দিকে তাকিয়েও কিছু বলছে না। কাঁপা কাঁপা হাত ভাতের দানায় ডুবিয়ে লোকমা তুলতেই গলায় বাঁধছে, প্রতিটা লোকমা পানির সঙ্গে গলা দিয়ে নামাতে হচ্ছে তার। খাওয়ার মাঝেই অন্তিহা নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
“এবার বাড়িতে কী বলবেন আপনারা?”
অহীন নির্লিপ্ত হয়ে উত্তর করে,
“আমরা দেশে যাব, গিয়ে সময় বুঝে বলতে হবে। তোর মুখ ততদিন বন্ধ রাখবি, আম্মুকে কিছু বললে মেরে ফেলব।”
অন্তিহা গাল বাঁকায়, তার সঙ্গে সব সময় অহীন রুড আচরণ করে। সকালে মনে হয় ভূত চড়েছিল তাই দরদ দেখিয়েছে। বলল,
“কবে যাবেন আপনারা দুজন?”
“দুজন না তিনজন, তুইও যাচ্ছিস।”
নড়ে ওঠে অন্তিহা, ঢকঢক করে পানি গিলে নিয়ে বলে,
“আমার ক্লাস আছে আমি কেন যাব?”
অহীন শুধুই চোখের ইশারায় আশাকে দেখাল। তাকে সামলাতে যেতে হবে। তাই ফোঁস করে শ্বাস নিয়ে বলে,
“তাইয়ান এখানে কী করবে ওকেও নিয়ে চলুন।”
অহীন ওর দিকে রাগী চোখ নিক্ষেপ করে, দাঁতে দাঁত পিষে হিসহিস করে বলে,
“ওর অনেক কাজ এখানে। বরং এখানে ওর প্রয়োজনীয়তা একটু বেশি। তাই ও যাবে না। তুই নিজের চিন্তা কর। মুখে তালা কীভাবে মারবি, সব তো আম্মুকে বলে দেওয়ার স্বভাব মুখ পাতলা একটা।”
ঝাড়া দিয়ে উঠে যায় অন্তিহা, আশার দিকে তাকিয়ে রুমে চলে গেল সে। আশাও উঠে চলে গেল সেখান থেকে। দরজা ঠাস করে লক করে, পরনের জামাটা টান দিয়ে খুলে ফেলল অন্তিহা। গরমে গা জ্বলে যাচ্ছে, জানালা লক করে বিছানায় ধপ করে শুয়ে পড়ল সে। বিছানায় নিজের ওভারসাইজড শার্ট গায়ে জড়িয়ে আবারও শুয়ে চোখ বুজে নেয় নিজের। সাফওয়ান নামের বেয়াদব লোকটা তার জীবনে এসে অনুভূতি নিয়ে তাকে কনফিউজড করে তুলেছে। সে কি সত্যি তার জন্য কাউকে খুন করে ফেলবে? সে বলেছিল আয়াশকে মেরে ফেলবে, এটা কি বাস্তবায়ন করে ফেলবে কখনো? ভয় হতে শুরু করেছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার সান্নিধ্যতা। তার কি উচিত অতীত ছেড়ে সাফওয়ানকে সম্পূর্ণ একটা সুযোগ দেওয়া? কিন্তু সাফওয়ান নিজেই বলেছে তার ** লাইফ বাজে। এসব থেকে বের হতে পারবে কি আদৌ? ভাবতে ভাবতেই নিজের লেগিংসটাও খুলে নিল। কম্ফোর্টারের ভেতর ঢুকে চোখ বুজে নিল সে। নাহ, একা জীবন এত সহজ নয়। কম্ফোর্টারের ভেতর থেকে একা একাই চেঁচিয়ে ওঠে,
“Khoobsurat hona bhi ek gunaah hai,
hayyyy
main itni sundar hun main kiya karu?”
চলবে...