ফন্ট সাইজ:
থিম:
দূরত্বের প্রণয় ২

৪৮তম পর্ব

লেখক: স্বর্ণালী ইসলাম

#দূরত্বের_প্রণয়_২

#স্বর্ণালী_ইসলাম

পর্বঃ৪৭

"​সরি, অনেক বেশি করে ফেলেছি। আমার জন্য এখন বাড়িতে তোকে কৈফিয়ত দিতে হবে।”

"সরি টু। তোমাকে সারাক্ষণ উল্টোপাল্টা বলে রাগিয়ে রাখতাম। একটা বছর তোমাকে এতটা চাপে রেখেছি। বাই দ্য ওয়ে, শান্তিতে ঘুম হয়?"

​কথাটা বলতে বলতেই একটা শুকনো ঢোক গিলল আশা। সে অহীনের চোখের দিকে সরাসরি তাকায়। দুজনে মিলে লাগেজ গোছাচ্ছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে বের হতে হবে। মাঝে কেটে যাওয়া এই দিনগুলোর একটা দিনেও কি অহীন ঠিকঠাক ঘুমিয়েছে? উহু, ও তো ঘুমাতে চায়নি। খুব ইচ্ছে করছিল জেগে থাকতে, আদর করতে না পারলেও ওর 'পেঁচি'র সঙ্গে গল্প করতে।সে নিজের ভেজা গলাটা আড়াল করতে একটা মেকি হাসি হেসে জবাব দিল,

"হুম, খুব শান্তিতে। তোর?"

​অহীনের পাল্টা প্রশ্নে মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে আশা। লাগেজের চেইনটা টেনে আটকে দিয়ে সেটা অহীনের দিকে এগিয়ে দিয়ে মুখে হাসি ধরে রেখে বলল,

"নিন, আপনার লাগেজ গোছানো শেষ। আশা করি এদেশ ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই একটা বছরের সব স্মৃতি আর আপনার প্রতি আমার দায়িত্ব সব এখানেই রেখে যাবো। আর কখনো স্বপ্নেও আমি এই জীবনে ফিরতে চাই না। এই দূরত্বটা আমাকে এতটা শান্তি দেয়।"

​"আমার আর কোনো কাজ করবি না? তোদের বাড়ি গেলে মাঝেমধ্যে করে দিস? আআআ... আমার জাঙ্গিয়াটা তোকে দিয়েই ধোয়াবো।"

​আশা মলিন হাসে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে। অহীন খুব চেষ্টা করছে নিজের ভেতরের কষ্টটা লুকিয়ে আশাকে বোঝাতে যে সে একটুও ভাঙেনি। আশা নিজেও মনে মনে এটাই চায়, অহীন যেন নিজের এই সিদ্ধান্তে কখনো আফসোস না করুক। কেননা, আফসোসের বোঝা বড্ড ভারী হয়। তপু মৃদু হেসে অহীনকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে যেতে মলিন গলায় বলল,

"আমাকে দিলে আমি ওটায় বিছুটি পাতা লাগিয়ে দেবো। তখন বানরের মতো উউ উউ করবে, কেমন?"

​"যেমন তুই এখন করছিস... উউ উউ উউ?”

​বিছানার ওপর অহীনের একটা শার্ট পড়ে ছিল, সেটা ঝটকায় তুলে অহীনের মুখের ওপর ছুঁড়ে মারে আশা। জড়ানো গলায়, হাসির ছলে বলে,

"কুত্তা!”

​শার্টটা মুখ থেকে সরিয়ে অহীন আশার একদম কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। অপার্থিব এই রূপ কতগুলো বছর ধরে তাকে মোহিত করে রেখেছে, আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। আশা তার হাতের দিকে তাকিয়ে সামান্য একটা ক্ষত দেখে ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে এক চিলতে মৃদু হাসি, যা অহীনের চোখে অদেখাই রয়ে গিয়েছে । কিন্তু ভেতরটা তার দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে, অহীনের জন্য বড্ড কষ্ট হচ্ছে। এই একটা বছরে এতটুকু তো সে বুঝেছে যে অহীন ওকে ছাড়া ভালো নেই, আর কোনোদিন থাকবেও না। হাতটা আলতো করে তুলে ধরে জিজ্ঞেস করে,

"হাতে কী হয়েছে?"

​অহীনের মুখ থেকে টু শব্দটুকু বের হলো না। তার বদলে সে আচমকা প্রেয়সীকে টেনে নেয় নিজের শক্ত বুকের ভেতর। এতগুলো দিন ধরে জমিয়ে রাখা যে কান্নাটা সে আশার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিল, আজ আর তার শক্ত মনের বাঁধ ভাঙা অবাধ্যতাকে সে আটকে রাখতে পারল না। আশার ঘাড়ে মুখ গুঁজে, শক্ত করে জড়িয়ে ধরে গুঙিয়ে উঠল অহীন, "আশু... তুই তো আমার শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে অনেক কষ্টে থাকতি, তাই না ? এখন যখন আমাদের হালাল সম্পর্ক নেই, আমরা তো ওসব করতেই পারব না। তো ঠিক আছে, আমরা এভাবেই থেকে যাই না, জান? আমি তোর একটুও কাছে আসব না, ছুঁয়েও দেখব না তোকে। শুধু তুই আমার কাজগুলো করে দিবি, রান্না করে দিবি... আমি তোকে ঘুরতে নিয়ে যাবো, কত মজা করব! এভাবেও তো একসাথে থাকা যায়, তাই না?"

​তার কাকুতি-মিনতিগুলো আশাকে ভেতর থেকে একদম ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছিল। নিজের ওপর বড্ড করুণাও হচ্ছে, নিজের মুখের ওপর ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করছে, কেন ওসব বলতে গেল সে অহীনকে! কাঁপা কাঁপা হাতটা অহীনের চুলের ভেতর গলিয়ে দিয়ে নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করে নিলো আশা। তার গলার স্বর বুজে আসছে,

"অহীন, এভাবে কান্না করে তুমি কী বোঝাতে চাচ্ছ? সব দোষ আমার? অশ্রু বিসর্জন দিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করছ বুঝি? দাঁড়াও, বাড়িতে জানাই, তারপর দেখব কার কত দোষ!"

​আশা মূলত খুনশুটি দিয়ে অহীনের মনটা অন্যদিকে ঘোরাতে চাইছে। কিন্তু অহীন ওকে আরও শক্ত করে ঝাপটে ধরে, মাথা দুদিকে নাড়িয়ে ব্যাকুল গলায় আবারও গুঙিয়ে উঠল,

"বাড়িতে না বললেই তো হয়! আমরা বরং বাড়ি গিয়ে সপ্তাহখানেক থেকে চলে আসব। পাপিকে বলে দেবো আম্মু-আব্বুকে কিছু না জানাতে। আর অন্তু অনেক ম্যাচিউর মেন্টালিটির একটা মেয়ে, না করে দিলে ও কাউকে কিচ্ছু বলবে না।"

​"অহীন...!"

​"আরে ভাই, বলছি তো আমি তোর ধারের কাছেও আসব না!" অহীন পাগলের মতো করছে "শুধু আমি যেই সংসারটা করতে চেয়েছিলাম তোর সঙ্গে, তুই আমাকে জাস্ট সেই সংসারটুকু দে। একটা বছরে একটুও সংসারের মতো ফিল হয়নি আমার। প্লিজ...!”

​একটু দূরত্ব তৈরি করে অহীন নিজের এক আঙুলে আশার চোখের কোণের জলটুকু মুছে দিল আলতো করে। তার গাল দুটো নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে কপালে কপাল ঠেকায়। তার উত্তপ্ত নিঃশ্বাস আশার ত্বকে কাঁপন ধরাচ্ছে। অহীন নিচু, ভাঙা গলায় বলল,

"বাড়িতে বললে হতেও পারে তোর সঙ্গে আর কোনোদিন দেখাও করতে দেবে না আমাকে কেউ। তোকে সবাই অনেক ভালোবাসে! তোকে কষ্ট দেওয়ার অপরাধের শাস্তি বিশাল বড় হবে, সেটা আমি জানি। আর সবচেয়ে বড় শাস্তিটা হবে, তোর থেকে আজীবন দূরে থাকা।”

​তারর তীব্র সান্নিধ্যে আশার বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে। সে জিভ দিয়ে নিজের শুকনো ঠোঁট দুটো ভিজিয়ে নিয়ে ভেজা চোখে অহীনের দিকে চাইলো। তারপর কাঁপা হাতে ধাক্কা দিয়ে কিছুটা পিছিয়ে দিয়ে বলল,

“ আ আমি তোমাকে এখনো একরত্তি বিশ্বাস করি না। তাই স্বপ্ন দেখতে হবে না।”

রুমটা থেকে বের হয়ে গেলো প্রত্যাখ্যান করে তাকে। ছলছল চোখে শুধু তাকিয়েই আছে অহীন। মেয়েটা কেনো তাকে একটু বুঝতে চায় না? একটু সামান্য একটু তাকে বোঝার চেষ্টা করলেও কি এতদূর সম্পর্ক গুলিয়ে যেতো?

________

​কড়া রোদের মধ্যে একটি ক্যাফেতে বসে আছে অন্তিহা, পাশেই রাখা লাগেজ। সময়ের বেশ কিছুটা আগেই বের হয়েছে সে। গরমে শরীর ঘামিয়ে যাচ্ছে। স্ট্র দিয়ে কোল্ড কফির পরপর কয়েকটা জিপ নিচ্ছে আর ফোনে টাইম দেখছে বারবার। দূর থেকে প্রদীপকে ছুটে আসতে দেখে হাত উঁচু করে 'হাই' দিল সে। ছেলেটা হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে আসছে। কাছে এসে হাঁটুতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,,

"অন্তিহা, লাঞ্চ ব্রেক সবে হলো রে। আই অ্যাম সো সরি তোমাকে এভাবে ওয়েট করানোর জন্য।"

"ইটস ওকে। জব করলে প্যারা সবারই কমবেশি খেতে হয়, তাই না?"

"খুব! তা ফ্লাইট কটায় তোমার?"

"৩টেয়।"

​ওর পাশের চেয়ারটায় বসে প্রদীপ। অন্তিহা আগে থেকেই তার জন্য একটা সফট ড্রিংকস অর্ডার করে রেখেছিল। ওটাতে চুমুক দিয়ে প্রদীপ বলল,

"ওওহ, তাহলে তো এখনই যাওয়া উচিত । তা তোমার সেই অসভ্য 'চিক্কু' কোথায় আজ? সে কাঁদছে না তোমাকে যেতে না দেওয়ার জন্য?"

অন্তিহা মাথা নিচু করে কানের পেছনে চুল গুঁজে ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল,

"জানি না, এমনিতে তো ফ্যামিকলের মতো চিপকে থাকে সারাক্ষণ। আজকে কে জানে কোথায় গেল!"

​"ফুউউউ..."

আচমকা কানের কাছে কারো মুখের হালকা ফু-এর শিরশিরানিতে পুরো শরীর ঝাঁকিয়ে উঠে তার। অবস্থা দেখে হেসে দিল প্রদীপ। অন্তিহা চোখ বড় বড় করে পেছন ফিরে, কিন্তু কেউ নেই! ঠিক অপর দিক দিয়ে কাঁধে হাত রেখে চেনা গলায় ডেকে উঠে সাফওয়ান,

"মিস সেক্সি... উপস সরি, মিস গম্ভীর! আমাকে আজকাল একটু একটু মিস করে বুঝি?"

​অন্তিহা তারর দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকায় সাফওয়ান এক ঝটকায় চেয়ার টেনে ঠিক তার পাশেই বসে। পেছন থেকে ইশারা এগিয়ে এসে আলতো করে জড়িয়ে ধরে অন্তিহাকে। এবার এক গাল হেসে দিল অন্তিহা। সাফওয়ান ইশারার দিকে তাকিয়ে বিরক্তিতে মুখ বাঁকায়,

"এর জন্যই এত দেরি হলো আসতে। আপনি দেশে যাবেন শুনে মেয়েটা এমনভাবে সেজেগুজে এসেছে, যেন ভাইয়ের বউ বিদায় দিতে নয়, বাড়িতে তুলে আনতে যাচ্ছে! লানত তোর ওপর, মেয়ে! আমার শোকে তুই সুখ করছিস?"

​অন্তিহা একটি ভ্রু কুঁচকে শাসানো স্বরে জিজ্ঞেস করে,

"বউ?!"

সাফওয়ান দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে, মাথা নুইয়ে নিজের চুলে হাত বুলাতে বুলাতে লাজুক ভঙ্গিতে বলল,

"উফফ, শুরুতে 'হবু' শব্দটা ড্রপ করে গিয়েছি, সরি সরি!"

​অন্তিহা তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে তাকে একটা ধমক দিতেই যাবে, মাঝখান থেকে বাধা দিয়ে দাঁড়ায় প্রদীপ,

"গাইস, আমার এবার বের হতে হবে। অন্তু, আর লেট করো না, ফ্লাইট মিস হয়ে যাবে কিন্তু। বাই।"

"বাই।"

"হ্যাভ আ সেফ জার্নি, মাই লাভ!"

​শেষের ওই ‘মাই লাভ’ শব্দটা শুনেই মুহূর্তের মধ্যে চটে গেল সাফওয়ান। রক্ত গরম হলো তার বসা থেকে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে সে প্রদীপের কলার চেপে ধরে শক্ত হাতে,

"মাই লাভ কাকে বললি তুই? কার লাভ ও?!"

প্রদীপ তার হাতটা সামান্য সরিয়ে দিয়ে ফোসফোস করে হেসে, হাঁপানো গলায় বলল,

"কুল ডুড, কুল! জাস্ট মজা করছিলাম তোমায় রাগানোর জন্য।"

​অন্তিহা সাফওয়ানের চোখে লেগে থাকা তীব্র ক্ষোভের দিকে তাকিয়ে আছে নির্বাক হয়ে। সে অন্তত এতটুকু বুঝতে পেরেছে যে এই লোকটার রাগ কতটা ভয়ানক হতে পারে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে উঠে দাঁড়িয়ে সাফওয়ানের হাত ধরে প্রদীপের কলার থেকে তার হাতটা ছাড়িয়ে দিল আলতো করে। মৃদু হেসে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,

"এত রাগ ভালো না সাফওয়ান। উনি জাস্ট মজা করছিলেন আপনাকে ক্ষ্যাপানোর জন্য।"

​প্রেয়সীর হাতের নরম স্পর্শ পেতেই যেন মুহূর্তের মধ্যে চুপসে গেল তার মুখ। দাপুটে মুখটা এক নিমেষে মলিন হয়ে উঠেছে। অন্তিহা চলে যাচ্ছে, এই কথা ভেবে লোকটা যে ভেতরে ভেতরে ভীষণ রকমের কষ্ট পাচ্ছে, তা মুখ দেখলেই বোঝা যায়। অন্তিহা তো তাকে নিজের যাওয়ার কথা জানায়নি, তবুও কোথা থেকে যে খবর পেয়েছে কে জানে! শোনার পর নাক আর মুখটা বাচ্চাদের মতো ফুলিয়ে অভিমান করে আবদার করে ছিলো না যাওয়ার জন্য । যদিও রমনীর মন গলেনি সেই ন্যাকামিতে। সাফওয়ান পরক্ষণেই আড়চোখে প্রদীপের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,

"মজা করেও আপনাকে কেউ নিজের বলে দাবি করুক, এটা আমার সহ্য হবে না।"

​ইশারা পেছন থেকে অল্প স্বরে তাগাদা দেয় এবার তাদের,,

"চলো, লেট হচ্ছে তো।"

বলেই সে অন্তিহার বাহু আঁকড়ে ধরে। ক্যাফে থেকে বের হয়ে কিছুটা দূরে পার্ক করা গাড়িতে গিয়ে উঠে বসেছে তারা। অন্তিহা অনেকবার ইশারাকে বারণ করলেও তার অতিরিক্ত আবদার শেষ পর্যন্ত তাকে গলিয়ে দিয়েছে। মেয়েটার কথায় তাঁদের সঙ্গে যাওয়া হচ্ছে বললে ভুল হবে? নাকি কারনটা সাফওয়ান? সাফওয়ান তখনো গাড়ির কাছে আসেনি, ​গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরের দিকে একমনে তাকিয়ে আছে অন্তিহা। মনটা বড্ড অস্থির। আশা আর অহীনের জন্য ভীষণ চিন্তা হচ্ছে,না জানি বাড়িতে পৌঁছানোর পর তাদের কত কিছু ফেস করতে হবে, কত কৈফিয়ত দিতে হবে! আর নিজের কথা? নিজের কথা কী-ই বা বলবে সে! সাফওয়ান নামের এই পাগলাটে ছেলেটার থেকে হয়তো আজকেই শেষবারের মতো এই মিষ্টি জ্বালাতনটুকু সহ্য করছে ও। হয়তো আর এই শহরে ফেরার কোনো ইচ্ছেই নেই। এই পাগলামি, এই একঘেয়েমি ভালোবাসা, এসব থেকে চিরকালের জন্য পিছু ছাড়াতে চায় অন্তিহা। আর যদি কখনো ফেরেও, তবে হয়তো এই শহরে আর পা রাখবে না সে। চলে যাবে দূরে কোথাও ফ্রান্স এর অন্য শহরে।. যেখানে এই অসভ্য লোকটা আর কোনোদিনও জানতে পারবে না ওনার 'মিস গম্ভীর' আসলে কোথায়। জ্বালাতে পারবে না একটুও।

​তার এমন আনমনা ও গম্ভীর্য মেশানো মুখের দিকে তাকিয়ে আছে ইশারা। সে ভাবছে, অন্তিহা ভীষণ সুন্দর! অহীনকে কয়েকবার দেখেছে সে, বেশ সুদর্শন। ভাইয়ের মতোই অসম্ভব রূপ পেয়েছে মেয়েটা। সাফওয়ানের একঘেয়েমি আর চয়েসকে মনে মনে বারবার বাহবা দিয়েও যেন তৃপ্তি হচ্ছে না। সে নিজ থেকেই এই গম্ভীর মেয়েটার সঙ্গে বলে কারণ অন্তিহা নিজে থেকে যেচে কথা বলবে বলে তো মনে হয় না।

​“অন্তিহা?”

​“হুম?”

​অন্তিহা তার দিকে তাকাতেই ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে এক চিলতে মুচকি হাসি। এই হাসিতে তার ফুলে থাকা গাল দুটোকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। মেয়ে হয়েও ইশারার নিজেরই যেখানে এত ভালো লেগে যাচ্ছে, টেনে দিতে ইচ্ছে করছে। সেখানে তার ভাই পুরুষ মানুষ হয়ে যে এখনো নিজেকে সামলে রেখেছে, এটাই তো অনেক!

​ইশারা মৃদু গলা ঝেড়ে বলল,

“তুমি কবে ফিরবে আবার?”

​“হয়তো ১৫ দিন, হয়তো এক মাস... আবার ছয় মাসও হয়ে যেতে পারে। বাড়িতে ঝামেলা হবে মনে হচ্ছে, জানি না কতদিনে সব ঠিকঠাক হবে।”

​“কিন্তু তোমার পড়াশোনার তো অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে!”

​“কে ভাবে আমার কথা?”

অন্তিহা মলিন হাসে,

“তবে সমস্যা হবে না। অনলাইন ক্লাস করে নেব। প্রিন্সিপাল বলেছেন, সেমিস্টারের সময় এসে শুধু পরীক্ষাগুলো দিলেও চলবে।”

“পড়া শোনায় ভালো হওয়ার এটাই তো ভালো দিক। টিচাররা সব ধরনের সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করে।”

“হয়ত ভালো স্টুডেন্ট হলে বুঝতাম। আমু তা নই।”

“চাপা কম মারো মহিলা, ভাইয়া বলেছে তোমার গ্রেড সব সময় টপার লিস্টে থাকে। তাও প্রথম বছরেই।”

“তুমি ভালো বাংলা পারো তো!”

“ভাইয়া শিখিয়েছে।”

অন্তিহা আবার চুপসে গিয়েছে। সাফওয়ান এসে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসেছে। ওদের দুজনকে পেছনে বসে থাকতে দেখে সে একটু অস্থির হলো তার মন। কিছুটা ক্ষোভ মেশানো গলায় বলল,

“ একজন অন্তত সামনে এসে বসুন। আমি তো নিশ্চয়ই আপনাদের ভাড়াটে ড্রাইভার নই, তাই না?”

​ইশারা ইশারাতেই অন্তিহাকে সামনে যেতে বলে কিন্তু অন্তিহা সরাসরি নাকচ করে তাকে। ইশারা তো সাফওয়ানের নিজের বোন, সে-ই সামনে যাক, অন্তিহার তো সেখানে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তার এমন উদাসীন ব্যবহারে ছেলেটার মনটা আরও খারাপ হয়ে উঠছে, মুখে চাপা বিষন্নতা ছড়াচ্ছে। তবুও আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সে গাড়ি স্টার্ট দেয়।

​কিছুটা পথ যাওয়ার পর সাফওয়ান আয়নায় অন্তিহার দিকে তাকিয়ে বলল,

“এখন না গেলে হয় না, মিস গম্ভীর? আর দুটো দিন থেকে যান না। এরপর আমি নিজেই টিকিট কেটে দেব, তখন বরং আরামে যেতে পারবেন। আপনি চলে গেলে তো আমার বাড়িতে ঘুম আসবে না... বিচ্ছেদের দহনে!”

​অন্তিহা চটে গিয়ে বলল,

“মুখে একদম স্টেপলার মেরে দেব! আমার সঙ্গে আপনার আবার কবে ‘আচ্ছেদ’ ছিল যে আপনি বিচ্ছেদের কথা বলছেন? আর এতই যদি পিরিত উথলে ওঠে, তবে সঙ্গে আসছেন না কেন? আসুন সেখানেও আমার বাঁচা মুশকিল করে দেবেন খানিকটা।”

অন্তিহার এমন রুষ্ট গলার কথা শুনে সাফওয়ান একদম থমকায়, চুপশে গিয়েছে একদম, চলে যাওয়ার আগেও এমন না করলেই নয়!। ইশারা ঠোঁট উল্টায় এতে, সাফওয়ানকে এতটা শান্ত থাকতে দেখে সে ভীষণ আশ্চর্য হয়েছে। যে ছেলে নিজের ওপর একটু গলাতুলে কথা বলা একদম পছন্দ করে না, সেই মানুষকে এই মেয়েটা কখন থেকে এত কথা শুনিয়ে যাচ্ছে! অথচ তার ভাইয়া সব চুপচাপ হজম করে নিচ্ছে। রূপবতী বলেই কি এত ছাড়? সাফওয়ানের আগের গার্লফ্রেন্ডগুলো কি সুন্দর ছিল না? প্রতিটা মেয়েই তো অন্তিহাকে টেক্কা দেওয়ার মতো রূপসী ছিল। তাহলে ওর বেলা এত ছাড়? সত্যি পাগল হয়েছে মানুষটা। চলন্ত গাড়ি আচমকা থামাতে বলে ইশারা,

“ভাইয়া, গাড়িটা একটু থামাও। অন্তিহার জন্য কিছু স্ন্যাক্স নিয়ে নাও, লং জার্নি তো!”

অন্তিহা তড়িঘড়ি করে নাকচ করে ওঠে,

​“না না, আমার কিছু লাগবে না। আমার ভাইয়া তো সাথে যাচ্ছে, ও নিশ্চয়ই সব নিয়ে নিয়েছে,”

​কিন্তু তার নাকোচ কে শোনে? সাফওয়ান সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটা রাস্তার পাশে সাইড করে থামায়। সত্যি, ছেলেটা বড্ড ব্যাকুল হয়ে নেমে ছুটে যাচ্ছে দোকানের দিকে। যেন সে মনে মনে চায়, অন্তিহা আরও কিছু সময় এই গাড়িতে বসে থাকুক, তার শরীরের মায়াবী সুবাসটা তবে দীর্ঘ সময় গাড়ির ভেতরে লেগে থাকবে।

​সাফওয়ান চোখের আড়াল হতেই গাড়ির ভেতরের পরিবেশটা আবার শান্ত হয়ে উঠেছে। ইশারা একটু গা ঘেঁষে বসেছে অন্তিহার দিকে। তারপর হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে আস্তে আস্তে বলল,

“ওনার একটা গার্লফ্রেন্ড একদিন ওনার সাথে একটু জোরে কথা বলেছিল। সেই মেয়ের কানের নিচে এমন এক থাপ্পড় মেরেছিলেন যে মেয়েটা একদম দেশ ছেড়ে ইংল্যান্ডে চলে গিয়েছে!”

​তার কথা শুনে ফিক করে হেসে দিল অন্তিহা, “তোমার ভাই আসলে কয়টা রিলেশন করেছে, ইশু?”

​অন্তিহার হাসিমুখ দেখে নিজেই নিজের জিভ কাটে ইশারা। তার ভাই যে মেয়েটাকে এত পছন্দ করে, তার সামনেই ভাইয়ের এক্স-দের নিয়ে কথা বলাটা মোটেই ঠিক হয়নি। অন্তিহা অবশ্য হাসতে হাসতেই আবার চুপ হয়ে গিয়েছে। এতটা চুপচাপ থাকে ভাবতে পারেনি সে। তার অন্তিহাকে লাইফলেস ছাড়া কিছুই লাগছে না। গাড়িটা বড্ড নীরব লাগায় ইশারা এবার কিছুটা বোরিং ফিল করছে, অন্তিহা নিজে থেকে একটুও কথা বাড়াচ্ছে না। ইশারা এবার নিজেও একটু গম্ভীর হয়ে গলা ঝেড়ে বলল,

“তুমি জানতে চাইবে না? যে মানুষটা তোমাকে একটা বছর এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করতে চায়নি, সে কেন বিডি তোমার পিছু পিছু যাচ্ছে না?”

​একটি শীতল হাসি ফুটে অন্তিহার ঠোঁটে,

“ব্যক্তিগত কারণ থাকতেই পারে। আমি যেহেতু ওনাকে নিয়ে অতটা ভাবি না, তাই জানার ইচ্ছেটাও খুব কম।”

​ইশারা শুকনো ঢোক গিলল। আরও একটু পাশে ঘেঁষে বসে নরম গলায় বলল,

“ওনার ড্যাড ফ্রান্সে পড়াশোনা করতে এসেছিলেন। আমার মমের সঙ্গে প্রেম করে, পরিবারকে না জানিয়ে বিয়েও করেছিলেন। এরপর মম যখন প্রেগন্যান্ট হলেন, উনি কোনো এক প্রয়োজনে বাংলাদেশে চলে যান। তারপর মাস, বছর কেটে গেল... ভাইয়া জন্মাল, বড় হলো, কিন্তু উনি আর ফিরলেন না। তবে ফোনে খোঁজখবর নিতেন। কিন্তু এভাবে তো আর একটা জীবন চলে না, তাই না?”

​নিশ্চুপ অন্তিহা জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। মুখ ওদিকে ফেরানো থাকলেও তার পুরো মনোযোগ এখন ইশারার কথার দিকে।

​ইশারা বলছে,

“মম অবশেষে অধৈর্য হয়ে আমার নানু আর ভাইয়াকে নিয়ে বাংলাদেশে গেলেন। কিন্তু ওখানে গিয়ে যা দেখলেন, তা হয়তো উনি কল্পনায়ও ভাবেননি। ওনার হাসবেন্ড বিডিতে আবার বিয়ে করেছেন! ওনার ঘরে তখন একটা ফুটফুটে মেয়ে হামাগুড়ি দিচ্ছে। মমকে ওনারা অনেক অপমান করেছিলেন। নানু সেই ধাক্কা সামলাতে না পেরে ওখানেই হার্ট অ্যাটাক করে মারা যান। সাফওয়ান ভাইয়াকে ওনার ড্যাড নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মম দেননি। বরং কসম করে নিয়েছিলেন যে, ওই নোংরা দেশের নোংরা মাটিতে ওনার গর্ভের কোনো সন্তান কোনোদিন পা রাখবে না। ব্যস, আমরা এভাবেই বড় হলাম। মম মারা যাওয়ার আগে ভাইয়ার কাছ থেকে প্রমিস করিয়ে নিয়েছিলেন যেন সে কখনো বাংলাদেশে না যায়। ভাইয়া মমকে বড্ড ভালোবাসত, ওনার সব কথা মানত... ঠিক এখন যেমন তোমাকে মানে।”

​অন্তিহা এবার জানালা থেকে চোখ ফিরিয়ে ইশারার দিকে তাকায়। তার চোখে স্পষ্ট কৌতূহল, জিজ্ঞেস করে,

“আর তুমি? তোমার ড্যাড কীভাবে তোমাদের মমকে পেলেন?”

​“ওটা একটা নোবেলের মতো, একদম স্বপ্নের নায়কের মতো লাভ স্টোরি! অন্য কোনো সময় বলব।”

​“এখনই বলো?”

​গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে সাফওয়ান । দুই হাত ভরতি স্ন্যাক্সের প্যাকেট ড্রাইভিং সিটের পাশে রেখে ও পেছনে তাকায়। অন্তিহার কৌতূহলী মুখটা দেখে জিজ্ঞেস করে,

“কী বলবে?”

অন্তিহা নড়েচড়ে বসে গভীর গলায় উত্তর করে,

“কিছু না।”

প্যারিস (CDG) এয়ারপোর্টের সামনে এসে থামলো সাফওয়ানের গাড়িটি। অন্তিহা নিজে থেকে গাড়ির দরজা খোলার আগেই তড়িঘড়ি করে সাফওয়ান নেমে এসে তার দিকের গেটটা খুলে ধরেছে। ক্ষণিকের জন্য নতজানু অন্তিহা সাফওয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে গাড়ি থেকে নেমে আসে। সাফওয়ান লাগেজটা বের করে তার হাতে দিতেই পাশে বসা ইশারা ভাবলো, এই মুহূর্তে তাঁদের দুজনকে একটু প্রাইভেসি দেওয়া উচিত। তাই সে অপর পাশ দিয়ে নেমে যায়।

​গাড়ির বাইরে এসে ফোনের স্ক্রিনে নিজের মেকআপ ঠিক করার সময় চোখ ফেরাতেই একটা পরিচিত মুখ দেখতে পায় ইশারা। ঠোঁটের কোণে তার একটু হাসি ফুটে উঠেছে। তাদের থেকে খানিকটা দূরে আয়াশ দাঁড়িয়ে আছে, বারবার হাতের ঘড়িতে সময় দেখছে, বোধহয় কারও জন্য গভীর অপেক্ষা তার। ইশারা হেসে আয়াশের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে।

​বোনকে চলে যেতে দেখে সাফওয়ান মনে মনে একটু স্বস্তি পেলো। বোনের সামনে নিজের মনের কথা বা দুর্বলতা প্রকাশ করাটা বেশ ইতস্ততকর। এদিকে রোদের হালকা গরমে প্রেয়সীর ফর্সা মুখটা একটু লাল হয়ে উঠেছে। সাফওয়ান মৃদু গলা খাকানি দিয়ে নীরবতা ভাঙে,

“অন্তিহা, খুব মিস করবো আপনাকে। তাড়াতাড়ি ফিরবেন তো?”

​কিছুক্ষণ আগে গাড়িতে ইশারার মুখে সাফওয়ানের কিছু কথা শুনে অন্তিহার মনে লোকটার জন্য একটা হালকা মায়া জেগেছে ঠিকই, তবুও সে নিজের ওপরের শক্ত ভাবটা বজায় রেখে নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিলো,

“দেখা যাক।”

​সাফওয়ান নিজের হাত থেকে লাগেজের হ্যান্ডেলটা ছেড়ে দেয়। ধীর পায়ে সে অন্তিহার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। এই দীর্ঘদেহী মানুষটার সামনে নিজেকে ভীষণ ছোট মনে হচ্ছে মেয়েটার। সে অস্বস্তি কাটিয়ে একটু পিছিয়ে গাড়ির বডির সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়েছে। সাফওয়ান আলতো করে হাত বাড়িয়ে তার কোমর জড়াতে চায় কিন্তু ওমনি অন্তিহা ঝটকা মেরে তার হাতটা সরিয়ে দিলো নিজ থেকে। নিজে এক পা পিছিয়ে পাশ কাটিয়ে দূরে সরে দাঁড়ায় একটু।

​অন্তিহার এই আচরণে সাফওয়ানের মুখটা বিরক্তিতে কালো হয়েছে। সে ভীষণ মলিন আর ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“আমাকে এত ঘৃণা হয় আপনার?”

​অন্তিহা এবার বিরক্তি লুকিয়ে না রেখে সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে বলল,

“ধরাধরি একদম ভালো লাগে না। আপনি দূরে থেকে কথা বলুন। আর তাছাড়া আপনার সঙ্গে তো আমার কোনো সম্পর্ক নেই, তাহলে কেন বারবার এমন করেন?”

​“সম্পর্ক নেই?”

​“না, নেই।”

​কথাটা শুনে সাফওয়ান একটা শীতল, অর্থপূর্ণ হাসি হাসে। তবুও যেনো বেহায়া প্রেমিক মন চায় বোঝাতে তার সঙ্গে এই নারীর গভীর সম্পর্ক। সে গাড়ির দরজা খুলে ভেতর থেকে একটা ছোট বাক্স বের করে আনে, বাক্সটা খুলেই অন্তিহা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সাফওয়ান শক্ত করে তার হাতটা টেনে ধরেছে এবং তার কবজিতে পরিয়ে দিতে থাকে একটি ঘরি।

​অন্তিহা হাতটা ঝাড়া দিয়ে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই সাফওয়ান এবার চোখ রাঙিয়ে তার দিকে তাকায়। সেই চাউনিতে এক অদ্ভুত অধিকারবোধ আর জেদ মেশানো। সে হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে গভীর, গম্ভীর গলায় বলতে শুরু করে,

"আমাকে মনে জায়গা দিলেন না তো কী? আপনার মস্তিষ্কে এমন ভাবে গেঁথে রইবো যে, আমায় ভুলতে গিয়ে আপনি নিজেই চূর্ণ হয়ে যাবেন। দিনশেষে গভীর আফসোস আর হতাশা নিয়ে আপনাকে স্বীকার করতেই হবে আপনার ভেতরের ওই অভদ্রলোকটাকে আপনি কোনোদিনই ছাড়তে পারবেন না। এমন কি আপনার ভালোবাসাটাও তখন কম পরে যাবে। আমাকে ভোলার জন্য।"

ঘড়ির ডায়ালের দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে অন্তিহা। কাস্টমাইজ করা একটা ঘড়ি, যাতে শুধু সময় নয়, নিখুঁতভাবে দেখা যাচ্ছে সাল, মাস আর সেকেন্ডের কাঁটাও। একটা মৃদু ঢোক গিলে সাফওয়ানের এই তীব্র পাগলামিটা ভেতরে ভেতরে উপলব্ধি করার চেষ্টা করছে সে। তবুও মনটা সাফওয়ানের হয়ে একটিবার ও স্পর্ধিত হচ্ছে না। তারপর কিছুটা উপহাসের সুরে জিজ্ঞেস করল,

“তাহলে আর ভয় কেন পাচ্ছেন আমাকে হারানোর?”

​সাফওয়ান সোজা তাকাল তার চোখের দিকে। কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলল,

“আপনার সঙ্গে বাঁচতে চাই। যদি মরেটরে যান তাই ভয় করে।”

“ দোয়া করছেন আমার মৃত্যুর?”

​সাফওয়ান কোনো উত্তর দিল না। সে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে অন্তিহার হাতের ওপর নিজের আঙুলগুলো বুলিয়ে দিচ্ছে। তার এই ছোঁয়া যতটা নরম, ঠিক ততটাই অনমনীয়। হঠাৎ করেই তার সেই গভীর গলাটা বেশ কঠিন হয়ে উঠছে, আর চোখের চাউনিতে উপচে পড়ে তীব্র, অবাধ্য অধিকারবোধ। অন্তিহার হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে সে বলল,

“আমার না হলে বেঁচে থেকে কী করবেন?”

একে অপরের চোখের দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে দু'জন। কী ভয়ংকর, অথচ অবলীলায় বলে ফেলা এক কথা! অন্তিহা ভাবতেও পারছে না যে, সে যদি সাফওয়ানের না হয়, তবে এই লোকটার কাছে তার পুরো জীবনটাই মূল্যহীন? সাফওয়ানের চোখের সেই তীব্র জেদ শুধু একটা কথাই জানান দিচ্ছে, যেকোনো মূল্যে অন্তিহাকে তার নিজের করে চাই-ই চাই।

​খানিকটা নিচু, ভারী গলায় সাফওয়ান আবার বলতে শুরু করে,

“এখন যাচ্ছেন যান। কিন্তু আমার থেকে দূরে থাকার প্রতিটা সেকেন্ড এই ঘড়িতে কাউন্ট হবে। আমার কাছেও ঠিক এই একই রকম একটা ঘড়ি আছে, কাপল সেট বানিয়েছি এটা। আপনি যখন ফিরে আসবেন, তখন আপনার দূরে থাকার এক একটা সেকেন্ড আমি সুদে-আসলে উসুল করে নেবো।”

​অন্তিহা নির্বাক। সে বুঝতে পারছে না এই মুহূর্তে তার কী বলা উচিত। এই লোকটা যেন কোন এক জাদুবলে তার মস্তিষ্ক পুরোপুরি অবশ করে দিয়েছে, যেখানে কোনো যুক্তি খাটছে না। সে কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু নিচু নজরে নিজের কবজিতে থাকা ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে আছে। যেনো এটা একটা শিকল যা সাফওয়ান তাকে পড়িয়ে দিচ্ছে।

​সাফওয়ান তার এক হাত দিয়ে অন্তিহার হাতটা ধরে রেখেই, অন্য হাতটা আলতো করে রাখে তার নরম গালে। পরম মমতায় বুড়ো আঙুলটা গালে ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল,

“আমি বাংলাদেশে যেতে চাই না অন্তিহা। ওখানে এমন কিছু করবেন না যাতে বাধ্য হয়ে আমার যেতে হয়। কারণ, আমি যদি একবার ওখানে যাই, তবে একটা খুন নিশ্চিত করে ছাড়বো।”

“কার?”

​সাফওয়ানের চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে। সেই লালচে আভায় তীব্র ক্ষোভ মিশে আছে, নাকি বুকের ভেতরের কোনো গোপন কষ্ট, তা চট করে ধরা দায়। অন্তিহার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সাফওয়ানের চোখের কার্নিশ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ার উপক্রম হতেই সেটার সুযোগ না দিয়েই খুব দ্রুত হাত দিয়ে তা মুছে নিল সাফওয়ান। নিজের ভেতরের দুর্বলতাটুকু আড়াল করে ভেজা, কঠিন গলায় বলল,

​"আমি আপনাকে বড্ড বেশি চাই, প্লিজ আমার হয়ে থাকুন। আমাদের মতো অসভ্য অভদ্র ছেলেদের যদি আপনাদের মতো পবিত্র মেয়েরা শুধরে না নেয়, তবে আমরা চিরকাল অন্ধকারের বাসিন্দা হয়েই রয়ে যাব। আমাকে একটু ভালো হওয়ার সুযোগ দিন, প্রমাণ করতে দিন যে সঠিক ভালোবাসা আর একটুখানি শাসন পেলে আমরাও সুন্দর করে বাঁচতে জানি।”

সাফওয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে এবার মুচকি হাসে অন্তিহা। তার কণ্ঠস্বরে খেলা করছে এক অদ্ভুত মায়া। সে বেশ শান্ত কিন্তু গভীর গলায় বলল,

“তাড়াতাড়ি চলে আসার চেষ্টা করবো। অপেক্ষা করবেন না। ওয়েট করাটা ভীষণ ডিফিকাল্ট, আপনার এত কষ্ট করার কোনো দরকার নেই।”

​অন্তিহার এই নমনীয় কথাগুলো সাফওয়ানের বুকের ভেতরটা জুড়িয়ে দিচ্ছে, প্রেয়সীর নরম বাক্যে দ্রিম দ্রিম করছে ভেতরটা। সে আলতো করে নিজের মাথাটা নুইয়ে অন্তিহার হাতের উল্টো পিঠটা নিজের মুখের কাছে তুলে ধরেছে। প্রেয়সীর শরীরে এই প্রথমবার নিজের ঠোঁট ছোঁয়ানোর জন্য তার মনের ভেতর এক তীব্র আকুলতা আর উদ্বেগ কাজ করছে। সাফওয়ান যেই না তার ঠোঁট দুটো নামিয়ে অন্তিহার হাতের পিঠে ছোঁয়াতে যাবে, ঠিক ওমনি এক হিংস্র থাবায় কেউ একজন ঝটকা মেরে অন্তিহার হাতটা টেনে সরিয়ে নিয়ে যায় তার থেকে!

​হুট করে হওয়া এই আকস্মিকতায় অন্তিহার পুরো শরীরটা কেঁপে উঠেছে। সে নিজেকে সামলাতে না পেরে সেই হিংস্র টানের সাথে সাথে পা বাড়াতে বাধ্য হলো। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখে, আয়াশ! আয়াশ কোনো কথা বলছে না, মুখে কোনো শব্দও উচ্চারণ করছে না, কেবল অত্যন্ত অধিকারবোধ নিয়ে অন্তিহাকে টেনে সামনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যেনো এটা তার একান্ত অধিকার।

​এদিকে প্রায় ছুঁয়ে ফেলা হাতটা এভাবে ঠোঁটের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতেই চোখ তুলে তাকায় সাফওয়ান। কোনো কিছু বলা বা বোঝার সুযোগ দেওয়ার আগেই তার হাত থেকে অন্তিহা হারিয়ে গিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে সাফওয়ানের চোখ দুটো যেন ক্রোধে জ্বলন্ত আগুন হয়ে উঠেছে, একদম আগুন ধরে গিয়েছে মস্তিষ্কের ভেতর। সে হনহন করে আয়াশের দিকে কয়েক কদম এগিয়ে যেতেই ইশারা মাঝপথে এসে তাকে আটকে দিল,

“ভাইয়া, অন্তিহা আজকে চলে যাচ্ছে। অন্তত আজকের দিনটায় ওকে এসব নিয়ে কোনো ঝামেলায় ফেলো না, প্লিজ!”

​কিছুটা দূরে গিয়ে আয়াশের দ্রুত চলতে থাকা পা দুটো স্থির হয়ে আসছে। এবার সে হাঁটার গতি কিছুটা কমিয়ে স্বাভাবিক করে দিয়েছে। নিজের স্বভাবজাত গম্ভীর ও ভারী গলায় বলল,

“অহীন অলরেডি এক ঘণ্টা আগে এয়ারপোর্টের ভেতরে এন্টার করেছে। আমি জাস্ট তোমার জন্য ওয়েট করছিলাম।”

​অন্তিহা তখনও পেছনের সেই রেশ আর ঘোরের মধ্যে আটকে আছে। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

“হুম... আই অ্যাম সরি লেট হওয়ার জন্য।”

​আয়াশ হুট করেই থমকে দাঁড়ায়, গভীর রুক্ষ মেজাজে বলে,,

“শো মি ইয়োর হ্যান্ড।”

​বলেই অন্তিহা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার হাতটা টেনে নিজের চোখের সামনে তুলে ধরে। আয়াশের পরবর্তী অ্যাক্ট অন্তিহাকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ আর অবাক করে দিয়েছে। সে এক ঝটকায় অন্তিহার কবজি থেকে কাস্টমাইজড ঘড়িটা টেনে খুলে ফেলেছে। বিস্মিত ও আতঙ্কিত অন্তিহা ভরকালো চোখে তাকিয়ে হাত বাড়ায় ঘড়িটা লুফে নেওয়ার জন্য, কিন্তু আয়াশ তাকে সেই সুযোগটাই দিল না। অন্তিহার দিকে একটিবারও না তাকিয়ে ঘড়িটা সরাসরি ছুড়ে মারে পাশের একটা ডাস্টবিনের ভেতর!

​অন্তিহা আর নিজের রাগ ধরে রাখতে পারলো না। সে সঙ্গে সঙ্গেই তীব্র প্রতিবাদের স্বরে চেঁচিয়ে উঠল,

“হোয়াট দ্য হেল ডিড ইউ জাস্ট ডু? ওটার প্রাইস কত আপনি জানেন? একটা মানুষ কতটা মায়া নিয়ে ওটা আমাকে গিফট করেছে!”

​আয়াশ অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দিল,

“এর চেয়ে থ্রি টাইমস বেশি এক্সপেনসিভ টা আমি তোমাকে এনে দেবো। এখন চলো, আদারওয়াইজ ফ্লাইট মিস হয়ে যাবে।”

​ততক্ষণে তারা এয়ারপোর্টের সিকিউরিটি চেকপয়েন্টের একদম সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। চারপাশের কড়া সিকিউরিটি আর মানুষের ভিড়ের কারণে অন্তিহা চাইলেও এই নোংরা আচরণ নিয়ে সেখানে আর কোনো সিন ক্রিয়েট করতে পারছে না। সে আয়াশের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আবার ডাস্টবিনটার দিকে পা বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই লাউডস্পিকারে অ্যানাউন্সমেন্ট ভেসে এলো, প্যাসেঞ্জারদের দ্রুত সিকিউরিটি চেকিং শেষ করে ভেতরে প্রবেশ করতে হবে।

​তীব্র রাগ আর প্রচণ্ড ক্ষোভ বুকে চেপে অন্তিহা ওখানেই থেমে গিয়েঢ়ে। আয়াশকে সে এবার সম্পূর্ণ ইগনোর করে একটা কথাও না বলে, পাশ কাটিয়ে আয়াশের আগেই গটগট করে ভেতরে দিকে চলে যায়। ​আয়াশ পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রাগে আর ফ্লাস্ট্রেশনে হাঁসফাঁস করতে থাকা অন্তিহার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটাকে আজ একদম খাঁটি বাঙালি লুকের একটা ধবধবে সাদা থ্রিপিসে দারুণ দেখাচ্ছে। আয়াশ একটু নড়েচড়ে পেছনে ফিরতেই দেখে সাফওয়ানকে। হাতে কিছু স্ন্যাক্সের প্যাকেট নিয়ে সাফওয়ান ঠিক ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে, আর তার চোখ দিয়ে যেন আক্ষরিক অর্থেই আগুন ঝরছে। আয়াশ তার দিক থেকে খুব নির্বাক ভঙ্গিতে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ভেতরের দিকে ঘুরে হাঁটা দেওয়ার সময় তার ঠোঁটের কোণে ফুটে একচিলতে অদেখা, বিজয়ী হাসি।

“অন্তি ওয়েট আমি আসছি।”

______

মনঃক্ষুণ্নতা নিয়েই প্লেনের সিটে বসে আছে অন্তিহা। তার সামনের সিটে অহীন আর আশা বসেছে। তার পাশের সিটটা ফাঁকা, আর আয়াশ সম্ভবত ফার্স্ট ক্লাসে। অহীন আশার পাশে একদম নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে, আর আশাও আজ কোনো কথা বলছে না। তবে মেয়ের চোখ দুটো অনবরত ভিজে উঠছে, এতক্ষণ ধরে সে নীরবেই কাঁদছে। ভয়ে যেন একদম আড়ষ্ট হয়ে আছে মেয়েটা। ​আশার হালকা ফোঁকানোর শব্দ পেয়ে অন্তিহা চটে গেলো একটু চুপ করে থাকতে পারছে না। সে সিট থেকে উঠে দাঁড়ায়, একটু উবু হয়ে আশার দিকে তাকিয়ে ক্রূর গলায় বলল,

“কাঁদছিস কোন দুঃখে? তুই কাঁদলে কি বাড়ির সবাই ছেড়ে দেবে? নাটক করিস দু'জন তখন খেয়াল থাকে না? ভাইয়া, আপনি পেছনে আসুন তো। ও আপনাকে দেখলে এমন করে যেন ফিডার খাওয়া বাচ্চা!”

​অহীন উপরের দিকে তাকায়। একটু মলিন, মৃদু হেসে ও বলল,

“হতে পারে আজকের পর আমাদের বাড়ির মানুষ আমাদের আর কথাও বলতে দেবে না। একটু ন্যাকামি সহ্য করি ওর, আজকের দিনটাই তো!”

​অন্তিহা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে তাদের..

“আপনাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে, তবুও আপনারা কীভাবে এত স্বাভাবিক হয়ে আছেন?”

​অহীন আর আশা একে অপরের দিকে তাকায়। অহীন যে একদমই স্বাভাবিক নেই, তা তার চোখ বলে দিচ্ছে। আর আশা বাড়ির লোকের ভয়ে হিমশিম খাচ্ছে বলেই অহীন এমন আচরণ করছে, যাতে বোঝানো যায় সে সব সামলে নেবে। অন্তিহা বিরক্ত হয়ে আবার নিজের সিটে গিয়ে বসে।

​আশা অহীনের দিকে তাকিয়ে নাক টেনে চুপ হলে এবার। অন্তিহা তো ভুল কিছু বলেনি! ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পরও নিজের এক্স-হাসবেন্ডের সামনে এভাবে কান্নাকাটি করতেএকটুও লজ্জা লাগছে না?

​অহীন নিচু গলায় আশাকে বোঝায়,

“কাঁদিস না, আমি সবাইকে বোঝাব। হুম?”

​আশা শুধু মাথা দোলায় দুই পাশে। অহীন আলতো করে ওর চোখের জল মুছে দিলো একটি হাতে। সে নিজের মাকে খুব ভালো করেই চেনে। কুহেলিকা যদি এসব জানতে পারেন, তবে আশার সঙ্গে তার সম্পূর্ণ দেখাসাক্ষাৎ বন্ধ করে দেবেন। তাই এই সামান্য সময়টুকু সে ভালোভাবেই কাটাতে চায়। আশাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে সবাইকে বোঝাবে, তারপর ফ্রান্সে ফিরে গিয়ে আর কোনোদিন বাংলাদেশে পা রাখবে না।

​সিটে বসে হ্যান্ডব্যাগ থেকে ট্যাব আর ইয়ারফোন বের করছে অন্তিহা। হঠাৎ পাশে কারও উপস্থিতি টের পেয়ে চোখ তুলে তাকাতেই সে স্তব্ধ হলো। একদম অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষটা! ​আয়াশ এসে তার ঠিক পাশের সিটটায়। মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস আর টিস্যু নিয়ে সে সিটটাতে স্প্রে করে পরিষ্কার করছে। সিটটা মুছে সে আস্তে করে বসে। অন্তিহা কৌতূহল আর রাগ মেশানো চোখ নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। এয়ারপোর্টের সেই রাগটা এখনো কমেনি, তাই রুক্ষ গলায় জিজ্ঞেস করল,

“এখানে কী?”

​আয়াশ অত্যন্ত নির্লিপ্ত গলায় উত্তর করে,,

“আমার পাশের সিটে হাতির মতো একটা লোক বসেছে। শুধু খাচ্ছে আর নোংরা করছে, আমার শরীর গুলিয়ে উঠছে। আর ওখানে টয়লেটের পাশে একটা সিট খালি ছিল, আর এখানে এই একটা সিট খালি আছে।”

​আয়াশ আঙুল উঁচিয়ে অন্তিহার থেকে দুই-তিন সিট পেছনের একটা জায়গা দেখায়। সেখানে এক মহিলা কোলে একটা মিষ্টি বাচ্চা নিয়ে ফিডিং করাচ্ছেন। দৃশ্যটা দেখে অজান্তেই অন্তিহার মনটা ভালো হয়ে উঠেছে। সে অস্ফুটে বলে,

“কী কিউট না বেবিটা?”

​আয়াশ আড়চোখে তাকিয়ে বলল,

“হুম, গালগুলো তোমার মতো ভোঁতা ভোঁতা!”

​“কী?”

​“বাংলা বোঝো না?”

​অন্তিহা নিজের মুখে হাত দিয়ে খিলখিল করে হেসে দেয়। কথায় কথায় ইংরেজি বলে নিজেকে খাঁটি ইংরেজ মনে করা এই ‘স্যানিটাইজারের প্যাকেট’ যে এমন খাঁটি বাংলা বলতে পারে, তা সে ভাবেনি।

​অন্তিহার এমন হাসি দেখে আয়াশের মুখের আলতো ভাবটা গায়েব হয়ে হয়ে গিয়েছে। সে একটু অস্বস্তিতে পড়ে কাঠকাঠ গলায় ঢোক গিলে বলল,

“স্টপ দিস, ইডিয়ট! পাগলের মতো হাসছ তুমি?”

​অন্তিহা হাসতে হাসতেই জবাব দেয়,

“কেন, আমি হাসলে বুঝি আমার গাল ভোঁতা ভোঁতা হয় না?”

কী অদ্ভুত আর বাজে মেয়ে রে বাবা! তাকেই ভেঙাচ্ছে? সে গম্ভীর মুখে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে নিজের ভাব বজায় রাখার চেষ্টা করছে অন্য দিকে ফিরে। তবে চোখ বারবার বেহায়ার মতো অন্তিহা গালের দিকে গিয়ে থামতে। আসলেই চাবি একটা মেয়ে। হঠাৎ আয়াশের গম্ভীর ভাব দেখে অন্তিহা ঠোঁট চেপে হাসি থামানোর চেষ্টা করলেও হঠাৎ হঠাৎ তার ফিক করে হাসি পেয়ে যাচ্ছে।

​হাসি থামিয়ে কানে ইয়ারফোন গুঁজতে গুঁজতে দুজনেই চুপ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। কিন্তু ভেতরের ক্ষোভটা থেকে হঠাৎ অন্তিহা ফিসফিস করে হিসহিসিয়ে বলল,

“ঘড়িটা ওভাবে ফেলে দিয়ে একদম ঠিক করেননি আপনি।”

​আয়াশ একটু গলা খাকানি দেয় তার কথা শুনে। অন্তিহা কানে ইয়ারফোন গুঁজে রেখেই কথাগুলো বলছে, যেন সে আয়াশের কোনো উত্তর শুনতেই ইচ্ছুক নয়। আয়াশ নিজেই হাত বাড়িয়ে দুই আঙুল দিয়ে অন্তিহার কান থেকে ইয়ারফোনটা টেনে খুলে দিয়েছে ক্রূর ভঙ্গিতে বলে,,

“বলেছি তো, ওর চেয়েও দামিটা দেব তোমাকে।”

​অন্তিহা নিজের অপর কানের ইয়ারফোনটাও টেনে খুলে ফেলে। রাগে দাঁতে দাঁত চেপে, ফুঁসে উঠে বলে,

“আমি টাকাটা বড় করে দেখছি না আয়াশ! সাফওয়ানের মুখটা কতটা মলিন হয়েছিল, আপনি দেখেননি? সে কতটা মায়ার সাথে ওটা দিয়েছে! ফিরিয়ে দিলে লোকটা কষ্ট পেতো। মনে হচ্ছিল কেঁদে দেবে।”

​আয়াশও রেগে রুদ্ধ গলায় বলে,

“কান্নাকাটি করে যে যা দেবে, সব বস্তায় পুরে নেবে তুমি? এত দরদ? ওটা নিজের কাছে রাখার মানে হচ্ছে তুমি ওকে পছন্দ করো আর ওকে সুযোগ দিতে চাও! আর তোমার হাতে কিস করতে দিচ্ছিলে কেন তুমি?”

​অন্তিহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

“হ্যাঁ, আমার অনেক দরদ ওসব মানুষের জন্য যারা আমাকে ভালোবাসে। ভালোবাসার মানুষগুলো যখন বুঝতে চায় না, তখন কেমন লাগে, সেই অনুভূতিটা আমি খুব ভালো করেই বুঝি, কারণ আমিও তা ফিল করেছি। আমি সারাজীবন অন্যের জন্য বেঁচেছি, অন্যের জন্য সব করেছি। তাই আমার জন্য কেউ কিছু করলে আমার ভালো লাগে। কিন্তু আপনাকে আমার অনুমতি ছাড়া আমার কোন জিনিস ফেলে দেওয়ার রাইট কে দিয়েছে? নিজের সীমায় থাকতে শিখুন আমি আপনার পুতুল নই। চোখ খুলে আমাকে দেখুন আমি অন্তিহা যার সঙ্গে অধিকার দেখানোর সম্পর্ক আপনার নেই।”

তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে আয়াশের মুখে,

“তুমি সাফওয়ানের জন্য আমার ওপর চেঁচাচ্ছো? তাও আবার একটা পাবলিক প্লেসে!”

​অন্তিহা আর কথা বাড়াল না। অবহেলাভরে কানে ইয়ারফোন গুঁজে সিটে মাথা ঠেকায় সে। রুক্ষ মেজাজে হুমকি ছুড়ে,,

“আর বিরক্ত করলে আমি এখান থেকে উঠে চলে যাব।”

​আয়াশের আর কিছু বলার মতো নেই। সে যেন একদম স্তব্ধ হয়ে আছে। অন্তিহা তার সঙ্গে এভাবে কথা বলছে? তাও কি না মাত্র দুদিনের চেনা একটা ছেলের জন্য! এটা মেনে নেওয়া কি এতই সহজ? রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসছে। নিজের ব্যাগ থেকে সে-ও ইয়ারফোন বের করে কানে গুঁজে এবং চোখ বন্ধ করে নিলো।

​কিন্তু এভাবে কি আর মন শান্ত হয়? মাথার ভেতরের চিন্তাগুলো বারবার কিলবিল করে কামড়াচ্ছে তাকে। একটা চোখ মেলে আড়চোখে অন্তিহার দিকে তাকায় সে। অন্তিহার রাগে কুঁচকে থাকা ভ্রু দুটো এতক্ষণে স্বাভাবিক হয়ে এসেছে মেয়েটা সম্ভবত ঘুমে বিভোর।

নিজের কানের ইয়ারফোনটা খুলে পকেটে আবারো রেখে দিলো। অন্তিহা ঘুমিয়ে থাকলেও অদ্ভুতভাবে তার চোখের পাপড়িগুলো কাঁপছে, মাঝে মাঝে ঢোক গিলছে, প্রচন্ড অস্থির মেয়েটা। ঘাড়টা একপাশে অস্বস্তিকরভাবে বেঁকে আছে দেখে আয়াশ পকেট থেকে নিজের রুমালটা বের করে কাধে রাখে এবং খুব আলতো করে অন্তিহার মাথাটা সেই রুমালের ওপর এনে রাখে। এতে নিজের কাঁধেও লাগলো না অন্তিহাও বেশ আড়ামে ঘুমাতে পারবে। মেয়েটা ​কাছে আসতেই অনুভব করে, অন্তিহার শ্বাস-প্রশ্বাস বেশ ভারী। মেয়েটা যেন ঘুমের ঘোরেও তীব্র অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দূর থেকে বা না ছুঁয়ে এই অস্থিরতা বোঝা কঠিন, কিন্তু আয়াশ অতিরিক্ত কাছে থাকায় এবং তাকে ছুঁয়ে দেওয়ায় তা স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে। মনে তীব্র কৌতূহল হচ্ছে জানার, কী এমন শুনছে মেয়েটা, যা ঘুমের ঘোরেও তাকে এভাবে নাড়া দিচ্ছে?

​আয়াশ অত্যন্ত সাবধানে অন্তিহার একটা কানের ইয়ারফোন খুলে নিজের কানে গুজে নেয়। প্রথম কিছুটা সময় সবকিছু বেশ স্বাভাবিক আর ভালোই শোনাচ্ছে। কিন্তু পরক্ষণেই বরফে ঢাকা এক পাহাড়ি শীতল অঞ্চলের তীব্র, বিকৃত এক রোমান্সের বর্ণনা কানে আসতেই হতবিহ্বল হয় আয়াশ। সে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে। দেখতে এতটুকু একটা মেয়ে, সে এসব পড়ে? আর এখনও কানে হেডফোন গুঁজে এসবই শুনছে! তখনই ঘুমের ঘোরে নড়েচড়ে উঠে অন্তিহা। নিজের একটা হাত সে আয়াশের উরুর ওপর রাখে এবং হালকা কাত হয়ে তার দিকে ঝুঁকে এলো। এই অপ্রত্যাশিত ছোঁয়ায় যেন পাথর বনলো আয়াশের সমস্ত শরীর। একদিকে কানে বাজতে থাকা ডার্ক রোমান্সের চরম উন্মাদনার বর্ণনা, আর অন্যদিকে অন্তিহার এই এলোমেলো ছোঁয়া, দুটো মিলে আয়াশের ভেতরটা ওলটপালট করে দিল। তার চেয়েও বড় কথা, নিজের কাঁধে অন্তিহার মাথাটা লেপ্টে থাকায় তার তপ্ত নিঃশ্বাসের প্রতিটা শব্দ আয়াশ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে সে। ​নিজের ভেতরে এক তীব্র অস্থিরতা টের পেয়ে আয়াশ ঝটকা মেরে কান থেকে ইয়ারফোনটা খুলে ফেলেছে। আর এক মুহূর্তও এটা শোনা সম্ভব নয়, তার রীতিমতো বমি ভাব চলে আসছে। পকেট থেকে তাড়াহুড়ো করে একটা মাউথ ফ্রেশনার ট্যাবলেট বের করে মুখে দিয়ে সে চুষতে শুরু করে।

​তারপর আবার অন্তিহার দিকে তাকায়। আলতো করে মেয়েটার হাতটা নিজের উরু থেকে সরিয়ে রাখে সে। আরো একটু কৌতুহল নিয়ে অন্তিহার কোলের ওপর থাকা ট্যাবটা হালকা উল্টে দেখতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠে অডিও বুকের নাম, পেনেলোপ ডগলাসের ডার্ক রোমান্স নভেল 'ক্রিডেন্স' (Credence)।

​অজান্তেই নিজে নিজেই বিড়বিড় করে উঠে,

“এর থেকে দূরে থাকতে হবে... কী ঘৃণ্য! ওয়াক!”

চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন