#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ৪৮
ট্যাক্সির পেছনের সিটে আশা আর অন্তিহা। সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে অহীন। রিয়ার-ভিউ মিররে আশার মুখটার দিকে অপলক তাকিয়ে আছে অহীন। মেয়েটা ঘুমে বিভোর, পুরোটা ফ্লাইট ঘুমিয়েও যেন ক্লান্তি কাটেনি তার। কে জানে, হঠাৎ এমন কী হলো ওর?
গাড়িটি শিকদার বাড়ির সামনে এসে থামতেই অহীন অন্তিহাকে ডেকে বলল,
“অন্তু, ওকে ডেকে ভেতরে নিয়ে যা। আমি বাড়ি যাব।”
অন্তিহা কিছুটা গম্ভীর মুখে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে,
“কী বলব সবাইকে? আপনি আসুন?”
অহীনের দৃষ্টি শীতল হয়ে আসে। সে আশার দিকে একবার তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
“ছোট বাবার চোখে চোখ রাখার মতো সাহসটুকুও তো আগে সঞ্চয় করতে হবে। তার জন্য সময় প্রয়োজন। বাড়িতে গিয়ে বলিস, আমি প্রয়োজনে আগে ওই বাসায় গিয়েছি।”
অহীনের কথা শুনে আশা পিটপিট করে চোখ খুলল। অহীন ও অন্তিহাকে কথা বলতে দেখে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাইরের দিকে তাকায়। বাড়ির বিশাল গেটটার দিকে একবার চেয়ে আবার অহীনের দিকে তাকায় সে। অহীন চোখের ইশারায় নামতে বলতেই দুজনে নেমে যায়। আশা বাতাসে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আর পেছন ফিরে তাকাল না। সে জানে, অহীন ঠিকই তার দিকে অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে, যা তাকে ভেতর থেকে আরও দুর্বল করে দেবে। বুক ফুলিয়ে সে গেট পার হয়ে ভেতরে চলে গিয়েছে।
অন্তিহা দাঁড়িয়ে আছে। কেন জানি না, আজ সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবীটাকে সঙ্গ দেওয়ার কোনো ইচ্ছেই নেই তার। হবেই বা কীভাবে? একটা বছর তো সে ওদের সঙ্গেই থেকেছে। আশার কি এখন নিজের সমস্যাগুলো নিজে সমাধান করা উচিত নয়? তবুও সে এগোচ্ছে, সবটাই অহীনের জন্য। আশার মাঝে তেমন কোনো পরিবর্তন না দেখলেও, ডিভোর্সের পর নিজের ভাইয়ের মধ্যে একটা বিশাল পরিবর্তন লক্ষ্য করছে অন্তিহা।
পেছন ফিরে অহীনের দিকে তাকায়। অহীন এখনো তার প্রেয়সীর চলে যাওয়ার পথের দিকে নিরেট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। অন্তিহা এগিয়ে গিয়ে আস্তে করে আশ্বাস দিল,
“ভাববেন না। আশা অবুঝ নয়, একদম নয় চিন্তা করবেন না, তবুও আমি আছি তো।”
“সামলে নিস। এখন বাড়িতে কিছু বলিস না, হঠাৎ করে বললে ঝামেলা বাড়বে।”
“ভরসা রাখুন।”
অন্তিহা চলে গেল। অহীন তাকিয়ে রইল ঠিক যতক্ষণ না অন্তিহা চোখের আড়ালে চলে গিয়েছে। ড্রাইভারকে গাড়ি এগিয়ে নিতে বলতেই গাড়ি চলতে শুরু করে। অহীন জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে পেছনে পড়ে থাকা সবটুকুই কি তার ঝামেলা? না, আশা তার ঝামেলা নয়। আশা তার সব, যাকে সে হারাতো না, তবুও হারিয়েছে। এখনো নিজেকেই দোষী মনে হয়। একটু না হয় মেয়েটা জ্বালাত তাকে, তাই বলে কি এই বড় সিদ্ধান্তটা তাকে পুরোপুরি শেষ করে দেবে?
___
রাত প্রায় নয়টা। শিকদার বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়েছে অন্তিহা আর আশা। দরজা খুললেন বরাবরের মতোই তাশা। মেয়ে দুজনকে দেখে সরল মনের এই মানুষটা যেন কিছুক্ষণের জন্য প্রতিক্রিয়া দেখাতেই ভুলে গিয়েছে। সামলে নিয়ে এগিয়ে গিয়ে অন্তিহাকেই আগে জড়িয়ে ধরল সে। অন্তিহা একদম পাল্টে গিয়েছে সময়ের পরিবর্তন আর বাইরের দেশের আবহাওয়া মিলিয়ে ওর রূপ-সৌন্দর্য আগের চেয়েও বেশি উপচে পড়ছে।
তবে আশাকে দেখে তাশার মুখটা কিছুটা মলিন হলো। এগিয়ে গিয়ে হালকা হাতে ওকে জড়িয়ে ধরে, কিছু না বলে, তাদের পেছনে চোখ বুলিয়ে কাউকে না দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
“অহীন কোথায়?”
আশা মলিন হাসে। মায়ের বুকে আলতো করে মাথা রেখে আহ্লাদী গলায় বলল,
“লোকে ঠিকই বলে, বিয়ের পর মেয়েরা পর হয়ে যায়। কেমন আছি তা তো জিজ্ঞেস করলে না, আগেই অহীনের খোঁজ নিলে!”
তাশা মুখের হাসি প্রসারিত করে ওর ললাটে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,,
“এমন বলতে নেই। অহীন কোথায়? আবার কিছু করেছিস ছেলেটার সঙ্গে?”
মায়ের মুখের দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে আছে আশা। মানুষটা সত্যিই বড্ড সরল, অহীনকে একটু বেশিই ভালোবাসেন তিনি। মলিন গলায় ও বলল,
“ওই বাড়ি গিয়েছে। আমার মন যেমন তোমাদের দেখার জন্য ছটফট করছিল, ওর বেলাতেও তো ব্যতিক্রম নয়, তাই না?”
অন্তিহা লাগেজটা একপাশে রেখে নরম গলায় বলল,
“ছোট বাবা কোথায়?”
“ঘরেই আছে। দেখা করে হাত-মুখ ধুয়ে আয়, খাবার খাবি। তারপর তোদের খবর নিচ্ছি! না বলে-কয়ে এভাবে সবসময় চলে আসার অভ্যাস হয়ে গেছে, তাই না? দেখাচ্ছি মজা!”
অন্তিহা হাসিমুখে ভেতরের দিকে এগোলেও দ্বিমত করে আশা। কথার মাঝেই ক্লান্ত সুরে বলল,
“আমি অনেক টায়ার্ড, আম্মু। আর এয়ারপোর্ট থেকেই অহীন খাইয়েছে। আব্বুর সঙ্গে দেখা করে আমি ঘুমাতে যাব।”
অন্তিহা বলে,
“সেই প্লেনেও ঘুমিয়েছিস, টেক্সিতেও ঘুমালি আরো ঘুমাবি?”
তার কথায় মলিন হেসে মাথা দোলায়, বুঝলো অন্তিহা মেয়েটার ভেতরে দলা পাকানো কষ্ট গুলো। লাগেজটা এক কোনায় রেখে বাবার রুমের দিকে পা বাড়াল আশা। দরজায় টোকা দিতেই ভেতর থেকে আকাশ শিকদারের গম্ভীর কণ্ঠস্বরে অনুমতি মিলল। নিজের ভেতরের সব মন খারাপ দরজার বাইরে রেখে, ঠোঁটে একচিলতে মেকি হাসি ফুটিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে সে। দুবোন একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠে,
“সারপ্রাইজ…!”
ফোনে কথা বলছে আকাশ হয়তো খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো আলাপ । চোখে চশমা আঁটা, দৃষ্টিতে অদ্ভুত ধরনের গাম্ভীর্য। সে যে খুব অবাক হয়েছেন তা নয়, বরং এক অদ্ভুত নিরেট চোখে মেয়েদের পর্যবেক্ষণ করছে। তবে কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে সেও উৎসাহিত হয়ে হেসে উঠে। আশা আর অন্তিহার দিকে হাত বাড়িয়ে দিতেই, দুই বোন একসঙ্গে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার বুকে, খুশি মনে আকাশ বলল ,
“এই বুড়ো বয়সে এভাবে সারপ্রাইজ দিলে তো হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে আমার!”
অন্তিহা মুখ তুলে বলল,
“এসব কী কথা বলো, ছোট বাবা? তুমি যদি বুড়ো হও, তাহলে আসল বুড়োদের কী বলব? আমি তো স্বপ্ন দেখি তোমার মতো একজন হট অ্যান্ড হ্যান্ডসাম পুরুষের!”
আশা অন্তিহার দিকে তাকিয়ে মুখ ভেঙচে বলল,
“তোর তো বিয়ে করারই ইচ্ছে নেই, আবার সুগার ড্যাডি খুঁজিস?”
“খ্যাত, চুপ কর! আমার বাবা আর চাচার মতো ভালোবাসার মতো কেউ থাকলে এই মুহূর্তেই বিয়ে করে নিতে দ্বিধা নেই আমার।”
“আব্বু একে বিয়ে দাও তাড়াতাড়ি, দেখো কেমন ইঙ্গিতে বোঝাচ্ছে বিয়ে করতে চায়।”
আকাশ পারল না মেয়েদের খুনশুটিতে না হেসে৷ হো হো করে হেসে উঠে তৎক্ষণাৎ। দু'জনের মাথায় হাত বুলিয়ে সোজা হয়ে বসে । আশার শুকনো আদলে হাত বুলিয়ে দিয়ে অন্তিহাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“পড়াশোনা কেমন চলছে? তোমার তো সামনেই ফাইনাল এক্সাম। এমন সময় হুট করে চলে আসা ঠিক হয়নি কিন্তু।”
মাথা নত করে মেকি হাসে অন্তিহা, ঠোঁট কামড়ে বলল,
“অনলাইনে ক্লাস করে নেব। তোমাদের অনেক মিস করছিলাম।”
আকাশ একটু মাথা নিচু করে অন্তিহার চিবুক দুই আঙুলে তুলে ধরে। সে আগের চেয়ে খুব সুন্দর হয়েছে। গালগুলো ভরাভরা, চোখগুলো ফোলাভোলা,আগে এতটা সুন্দর ছিল না। তবে কমও ছিলো না। একটু দুষ্টুমি করে বলল,
“বাই দ্য ওয়ে, শুনলাম তোমার নাকি বয়ফ্রেন্ড হয়েছে?”
চোখ বড় বড় হয় অন্তিহার। নড়েচড়ে বেশ লজ্জা নিয়ে বসে সে, আশার দিকে রাগী চোখে তাকায়। ইতিমধ্যে আশা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে মাথা দুলিয়ে বোঝাচ্ছে সে কিছুই বলেনি। মেয়েদের এই চোখাচোখি দেখে আরও একটু শব্দ করে হেসে ওঠে আকাশ,
“ও বলেনি বোকা, তোমার মা-বাবাও এসব জানেন। সাফওয়ান তাই না? ওর বাবা এসেছিলেন। যেহেতু তোমার পার্মানেন্ট অ্যাড্রেস এখনো শিকদার বাড়ির, তাই এই বাড়িতেই এসেছিলেন আজকেই বিকেলে।”
অবাক হলো অন্তিহা, বেশ অনেকখানি অবাক হলো। চেহারায় কেমন অদ্ভুত নিরাশা নেমেছে তার। নিচু গলায় বলল,
“সাফওয়ান আমার বয়ফ্রেন্ড না ছোট বাবা। আর না ওর বাবার সঙ্গে ওর এত ক্লজ রিলেশন আছে যে তোমাদের সঙ্গে কথা বলতে আসবে। কখনো খুব প্রয়োজন হলে সে নিজেই ডিরেক্ট কথা বলবে, কিন্তু ওর বাবাকে দিয়ে বলাবে না।”
“বয়ফ্রেন্ড না বলেও তার ব্যাপারে এত বোঝো? যদি সত্যি কোনো রিলেশন থাকে, তাহলে ঠিক কতটা বুঝতে?”
আশা অন্তিহার অস্থিরতা বুঝতে পেরে চুপসে গিয়েছে। আকাশ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“আচ্ছা আচ্ছা, আই গট ইট। অন্তিহাকে আমরা এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দেব না। সব মেয়েছেলে বিদেশ থাকলে আমাদের সাথে কে থাকবে? অন্তু, ঠিক বললাম তো?”
উপর-নিচ মাথা দোলায় অন্তিহা। তারপর গুটিগুটি পায়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসে। সাফওয়ান যে এখানেও এভাবে নিজের উপস্থিতির প্রভাব ফেলবে, তা ধারণায় ছিল না তার। ভেবেছিল হয়তো এখানে পিছু নেয়ার কেউ নেই , ওর চ্যাপ্টারটা থেকে মুভ অন করে সব ক্লিয়ার হয়ে যাবে। কিন্তু না, এখানেও সে নিজের অস্তিত্বের ছাপ রেখে দিয়েছে। কেবল তো দেশে পা রাখল সে, সামনে যে তাকে নিয়ে আরও কত কথা শুনতে হবে, আর দিতে হবে হাজারো প্রশ্নের উত্তর!
আশাও উঠে চলে যেতে নিলে আকাশ তার হাত ধরে আবার বসিয়ে দেয় পাশে। সোজা হয়ে বসে টেনে নিল আশাকে নিজের বুকে। মুখটা শুকিয়ে গিয়েছে মেয়েটার, একদম যেন অনাহারে থেকে এমন হয়েছে। বাবার বুকে গুটিশুটি মেরে চুপ করে গিয়ছে আশা। এখানেও অহীনের কথা মনে পড়ছে তার। মন খারাপ হলে এভাবেই বুকে টেনে নিয়ে ও রিল্যাক্স করত, ভরসা দিতো কেউ না থাকলেও তার হৃদয়ের উপস্থিতির। আকাশ ম্লান হেসে জিজ্ঞেস করে,
“মুখটা এমন দেখাচ্ছে কেন, কিছু হয়েছে? আর ইউ ওকে? অহীন তোমাকে কিছু বলে না তো? আব্বুকে জাস্ট একবার বলো, ওকে আচ্ছা মতো বকে দেব। আমার কাছে আমার মেয়ে সবার আগে, তার ওপর কোনো কম্প্রোমাইজ নেই।”
আশার চোখের কোণ বেয়ে অবাধ্য জলকণা টপ টপ করে গড়িয়ে পড়ছে এবার আকাশের বুকে। পরনের কালো শার্টটা চোখের পানিতে ভিজে জবজব হয়ে যাচ্ছে। আশা ডুকরে কেঁদে উঠে,,
“তোমাদের খুব মিস করেছি আব্বু, তাই ভালো নেই আমি। অহীন কিছু বলেনি, প্লিজ ওকে কিছু বোলো না। ওর কাছেও এখন আমার চেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট কেউ না, কিচ্ছু না।”
“সময় থাকতে ও তোমাকে আর তুমি ওকে বুঝেছ, এটাই বড় কথা। যাও, এখন রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে কিছু খেয়ে নাও, তারপর টেক সাম রেস্ট।”
আশা মাথা দোলায়, তারপর সোজা ঘর থেকে বের হয়ে নিজের রুমে চলে যাস। সে চলে যেতেই বেশ চড়া গলায় আকাশ চেঁচিয়ে উঠে,
“বউ ও বউ, একটু এদিকে আসো। রাত তো কম হলো না, আমাকে একটু ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে যাও লক্ষ্মীটি!”
পরক্ষণেই একই সুরে, তবে বেশ ধমকের স্বরে চেঁচিয়ে উঠে তাশা,
“বাড়িতে এখন দুটো মেয়ে আছে আকাশ! আপনার এই খাপছাড়া মুখে একটু তো লাগাম দিন!”
ওপর থেকে পরপর ভেসে আসে অন্তিহার গলা,
“ছোট বাবা যে ‘বউ বউ’ করে ডাকছে, এটা কিন্তু আমি একদম শুনিনি! কারণ আমার কানে এয়ারফোন গোঁজা আর ভলিউম ফুল!”
________
অন্ধকার করিডোরে হালকা আলো আসছে একটি ফ্ল্যাটের দরজার একটু ফাঁক দিয়ে। সেটাই অনুসরণ করে পা টিপে টিপে হাঁটছে অহীন। লাগেজটা হাতে তুলে রেখেছে যাতে একদম শব্দ না হয়। ফ্ল্যাটের ভেতরে প্রবেশ করে কিচেন থেকে আসা পানির জবজব শব্দ পেয়ে আন্দাজ করে মা কাজ করছে। এত রাতেও কাজ করছে ভেবে একটু হতাশ হলো সে। আশুটার সঙ্গে সম্পর্কটা ঠিকঠাক থাকলে আজ এই দৃশ্য দেখার পর কখনই ফ্রান্স যেত না সে। মা আর বউ মিলে সংসার করত কত মিষ্টি হতো তার ছোট সংসারটা! ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল প্রায় ১০টা বেজেছে, কাজের তাড়াহুড়োয় হয়তো দরজাও লক করতে মনে নেই মায়ের। বাবার ওপর খুব রাগ হচ্ছে তার। কেমন স্বামী, এত রাত অবধি বউকে দিয়ে কাজ করায়?
আরও একটু গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যায় সে। তখনই কানে ভেসে আসে মৃদু পুরুষালি গলায় হালকা গুনগুনে গান,,
Shaam savere ab
Main joru joru kahoonga
Main joru ka ghulam…
ভীষণ রাগ হলো তার। মাকে দিয়ে কাজ করিয়ে তার বাবা আবার কেমন আয়েশ করে গান গাইছে! কিন্তু কিচেনের সামনে পৌঁছাতেই তার পা জোড়া থমকে গিয়েছে, মুহূর্তের মধ্যে মুখটা হাঁ হয়ে গেল তার। অস্ফুট স্বরে বলে উঠে,,
“অন্তিক শিকদার থালা-বাটি মাজছে?”
মায়ের কষ্ট হচ্ছে ভেবে এতক্ষণ অহীনের বুকের কষ্ট টুকু অন্তিকের হাতে ভিমের ফেনার সঙ্গেই যেন ধুয়েমুছে গিয়েছে নিমিষেই! আফসোসরত মুখটা এখন ঘোর বিস্ময়ে থমকে গেছে। তার এমন আকস্মিক ডাকে ভড়কে গিয়ে তড়িঘড়ি করে চোখ ফেরাতেই টাইলসের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে একটি প্লেট ঠাস করে পড়ে ঝনঝন শব্দে কয়েকটা টুকরো হয়ে গিয়েছে। মানুষটার শরীরে কোনো শার্ট নেই, কোমরের নিচে ট্রাউজারটা খুলে যাবে যাবে অবস্থা, কোনো মতে যেন নিজের ইজ্জত টেনেটুনে ধরে রেখেছে! ট্রাউজারটা বিশ্বাসঘাতকা করবে না। অহীন এই বিস্ময়টাই কাটিয়ে উঠতে পারছে না, তার আগেই কাচ ভাঙার শব্দ শুনে রুম থেকে কর্কশ মেজাজে বকতে বকতে বের হয়ে আসে কুহু,,
“দুটো প্লেটও ঠিকমতো ধুতে পারেন না আপনি? কালকে থেকে আপনাকে ফ্লোরে খাবার দেব, তখন বুঝবেন জিনিসের মূল্য!”
মায়ের এমন মেজাজি গলার বকা শুনে সেদিকে তাকাতেই অহীনের চোখ তো সাত আসমানে! এটাকে তার মা-বাবার বাড়ি মনে হচ্ছে না এই মুহূর্তে, মনে হচ্ছে কোনো নিউলি মেরিড কাপল-এর হানিমুন সুইট! কুহুর পরনে অন্তিকের শার্ট, আর নিচের ট্রাউজারটাও ঢোলাঢালা, ওটা অন্তিকেরই হবে হয়তো। সবচেয়ে বড় কথা, কুহুর দুই হাত ভর্তি নতুন বউয়ের মতো মেহেন্দি পরা!
অহীনকে দেখে যেন নেনো সেকেন্ডের জন্য থমকে গিয়েছে কুহু। পরক্ষণেই মস্তিষ্ক সতেজ হতেই ছুটে রুমে গিয়ে, মেহেন্দি দেওয়া হাতেই দরজার কবাট ধরে ঠাস করে লাগিয়ে দিয়েছে লজ্জায়, ওমনি ওপাশ থেকে চেঁচিয়ে উঠে অন্তিক,
“পেঁচি! দুই ঘণ্টা সময় নিয়ে মেহেন্দি দিয়ে দিয়েছিলাম তোকে, এ করলি এটা? ছেমড়ি বেয়াদব।”
অন্তিক নিচে তাকিয়ে ভাঙা প্লেটের টুকরোগুলো দেখছে, আবার কখনো অহীনের দিকে তো কখনো বন্ধ দরজার দিকে তাকাচ্ছে। বেচারা কী করবে একদমই বুঝে উঠতে পারছে না। তার এই অপ্রস্তুত পরিস্থিতি বুঝতে পেরে অহীন নিজেই এগিয়ে গিয়ে বলে,
“আমি ফ্রেশ হয়ে আসি, তারপর কথা বলছি। ততক্ষণে তুমি বাকি কাজগুলো সেরে নাও?”
“হঠাৎ না বলে চলে এলে যে? আর আশু কোথায়?”
“আশু শিকদার বাড়িতে। আর যা বুঝলাম, এখন থেকে বোধহয় আর না বলে আসা যাবে না!”
ঠোঁট কামড়ে ট্রাউজারটা ওপরের দিকে টেনে নিল অন্তিক। ভাঙা কাচ ডিঙিয়ে নিজের রুমের দিকে যেতে যেতে বলল,
“ফ্রেশ হয়ে এসো, একসঙ্গে ডিনার করব।”
নিজের রুমে চলে যায় সে। বিছানায় চোখ লাল করে বসে আছে কুহেলিকা। ছেলের সামনে এমন অবিন্যস্ত পোশাকে পড়াটা যে কতটা লজ্জার, তা ওর ভাবনার বাইরে! মেহেন্দির হাতটা ধুয়ে এসেছে হয়তো। অন্তিককে ঢুকতে দেখে ও আরও একটু গুটিয়ে বসে। অন্তিক হেসে স্ত্রীর সামনে গিয়ে বসে, তারপর ওর হাত দুটো উল্টে ধরে। মেহেন্দির ডিজাইনটা একদম লেপ্টে ঘেঁটে গেছে দেখে ওর মেজাজটাই বিগড়ে গেল। একটু ধমকের সুরে বলল,
“পুরো দুই ঘণ্টা সময় নিয়ে ডিজাইনটা করেছিলাম, পেঁচি!”
বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে উঠে কুহেলিকা,
“তুমি আছ তোমার মেহেন্দি নিয়ে! এদিকে আমার যে কী লজ্জাটা লাগল! ছিঃ!”
“আমরা তো জানতাম না পেঁচি যে অহীন হুট করে চলে আসবে। আর এই যুগে এসেও এসব নিয়ে এত নাটক কেন করছিস? দেখলি না ওর মুখটা কেমন মলিন? হয়তো কিছু একটা হয়েছে, আশাকেও সাথে আনেনি। চল, জলদি একটা শাড়ি পরে বের হয়ে আয়।”
অন্তিকের শান্ত আদেশে রমণী চুপচাপ মাথা দোলায়,সম্মতির। অন্তিক ঘর থেকে বের হতেই ও শাড়ি পরতে শুরু করে। শাড়ি পরা শেষ হলে নিজের হাতের দিকে তাকায়, মেহেন্দিটা সত্যিই একদম ঘেঁটে গেছে। লোকটা কত সময় নিয়ে পরম যত্নে করে দিয়েছিল! রুম থেকে বের হওয়ার সময় ফোনে পরপর কয়েকটা মেসেজের টুংটাং শব্দ হতেই ও ফোনটা হাতে তুলে। খানিকটা সময় নিয়ে দরজা খুলে বের হওয়ার সময় খেয়াল করে, দরজার কবাটে লেগে থাকা মেহেন্দির দাগটাও পরিষ্কার করে দিয়েছে অন্তিক। রান্না ছাড়া ঘরের অন্য কোনো কাজ করতেই এখন আর সমস্যা হয় না অন্তিকের। তবে বউয়ের হাতের রান্না ছাড়া এই লোকটার দিন চলে না! ড্রয়িংরুমে বের হয়ে পুরো ঘরটা পরিপাটি দেখে কুহুর ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠেছে।
অহীনের ঘরের দরজায় নক করছে অন্তিক। দরজা খুলে বের হয়ে অহীন ডাইনিং টেবিলের সামনে বসতেই কুহু প্লেটে খাবার বাড়তে যায়, কিন্তু অন্তিক ওর হাত ধরে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“হাতে মেহেন্দির গন্ধ হবে। তুই বস, আমি খাইয়ে দিচ্ছি।”
কুহু দ্বিমত করতে গেলেই চোখ রাঙায় অন্তিক। অগত্যা কুহু মেনে নিয়ে অহীনের পাশে চুপ করে বসে পরে বাধ্য নারীর মতো। অহীন মা-বাবার এই ছোট ছোট কিউট মুহূর্তগুলো বেশ উপভোগ করছে, তাই কোনো বিরক্তি না দেখিয়ে চুপচাপ দেখছিে সে নিজেই এবার বলে উঠে,
“একা একা বেশ তো তোমরা হাজবেন্ড-ওয়াইফ লাইফ কাটাচ্ছ! আমি তো ভাবছিলাম, একা একা না জানি কত প্রবলেম হচ্ছে তোমাদের।”
কুহেলিকা মৃদু হেসে বলে,
“সমস্যা কেন হবে? আমরা তো একাই থাকি সব সময়। বরং এতে তোমার বাবা বেশ ফিট থাকে। বাড়িতে মানুষজন থাকলে মহারাজ তো নড়েও চড়ে না! এখন একটু কাজটাজ না করলে পেটটা তো বড় হয়ে যাবে, নাকি?”
“ওহো সো রোমান্টিক, ফিট হাসবেন্ড চাও?”
অন্তিক চোখ জোড়া পিটপিট করে ওর দিকে তাকাল। অহীন এবার শব্দ করে হেসে দিল। কুহেলিকা কিছুটা সময় নিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বসে, তারপর অহীনের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করে,
“কেমন আছো? আশুকে কেন আনলে না?”
মায়ের প্রশ্নে অহীন একটু বিব্রত হয়ে উঠে। নিজেকে সামলে নিয়ে উত্তর করে,,
“ভালো আছি। আশা ওই বাড়িতে এসেছে, অন্তুকেও নিয়ে এসেছে। কালকে চলে আসবে ও।”
“আর আশা আসবে না?”
অন্তিকের প্রশ্নে এবার একটু নড়েচড়ে বসে সে। মেকি হেসে প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়ার ভান করে বলল,
“ভীষণ খিদে পেয়েছে, আগে খাবার দাও তো!”
তার কথায় কাজ হলো। তারা আপাতত আশার প্রসঙ্গটা ওখানেই বাদ দিয়েছে। বউ আর সন্তানের মাঝে একটি চেয়ার টেনে বসে অন্তিক। প্লেটে ভাত মেখে প্রথম লোকমাটা অহীনের মুখে তুলে দিতেই ও খাচ্ছে। অহীনের গলাটা কেমন দলা পাকিয়ে আসছে, মুখ ভরা থাকলে অন্তত কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে না! অন্তিক দু’জনকেই পরম স্নেহে লোকমা তুলে খাওয়াচ্ছে। খাওয়ার মাঝেই কুহুর হাত দুটো উল্টেপাল্টে দেখছে অহীন। গালভর্তি খাবার নিয়ে কুহুর হাতের দিকে আঙুল ইশারা করে ভাঙা ভাঙা গলায় বলল,
“এখানে ‘A’ দিয়ে অহীন বোঝানো হয়েছে, তাই না আম্মু?”
তার কথা শুনে ঠাস করে ভাতের প্লেটটা একপাশে রেখে দেয় অন্তিক! কুহুর হাতটা অহীনের কাছ থেকে ঝটকা মেরে নিজের দিকে টানে । তারপর একদম মহিলাদের মতো করে গাল বাঁকিয়ে, ভেঙচি কেটে বলল,
“আমার বউয়ের হাতে আমি কেন ‘অহীন’ লিখতে যাব? ওটা ‘A’ ফর অন্তিক!”
“তোমার বউ তো কী হয়েছে? আমার তো মা! ওটা অহীনই, তাই না আম্মু?”
বলেই ও-ও টান দিয়ে মায়ের হাতটা নিজের দিকে নিয়ে নিল আবার। অন্তিক এবার ছেলের ওপর চরম চটছে। বউকে নিয়ে কোনো রকম ভাগাভাগি সে একদমই টলারেট করতে পারে না। ছেলে হয়েছে তো কী হয়েছে? বউ তো শুধুই তার! আবারো কুহুর হাতটা টেনে এনে নিজের সাদা ট্রাউজারের পকেটের ভেতর পুরে নিল সে। তারপর এক বিজয়ী হাসি দিয়ে, গলাটা রাশভারী করে বলল,
“যার যার বউয়ের হাতে সে নিজের নাম লিখে নিক! প্রয়োজনে বউয়ের কলিজায় গিয়ে লিখুক! আমার বউকে নিয়ে আমি কোনো কম্প্রোমাইজ করব না, ব্যস!”
বাপ-ছেলের এমন বাচ্চামো দেখে হো হো করে হেসে উঠে কুহেলিকা। পকেট থেকে হাতটা বের করে বলে,
“হয়েছে, এবার আপনাদের এই পাগলামি থামান! অহীনের এখন রেস্ট দরকার, ও অনেক ক্লান্ত। সকালে আমরা আশা আর অন্তুর কাছে যাব। অন্তুটা যে এ বাড়িতে কেন আসল না! আমার তো এখনই চলে যেতে ইচ্ছে করছে। রাতে ঘুম ই হবে ওকে দেখার জন্য। রাহাত ভাইয়াকে কল দিয়ে জানিয়ে দেই।”
খাবার শেষ হতেই যে যার মতো রুমে চলে গিয়েছে। অহীন লং জার্নি করে এসেছে বলে তাকেও আর কথা বলে আটকালো না কেউ। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে কুহু। বেশ খানিকটা পর পেছন থেকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে তাকে অন্তিক। ঘাড়ের ভাজে নাক ঘষে ফিসফিস করে বলল,
“সে যাই হোক, আমার পেঁচিকে এই শাড়িতে জাস্ট হট অ্যান্ড চিক লাগছে! মাখন।”
কনুই দিয়ে ধাক্কা দিতেই অন্তিক পেটে হাত দিয়ে ‘উফ’ বলে ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে। কুহু হাসছে। বিছানায় অন্তিক বসতেই কুহু তার পাশে গিয়ে বসে পরে, বেশ দ্বিধাগ্রস্ত মনে হলো ওকে। অন্তিক ওকে কাছে টেনে জিজ্ঞেস করে,
“কিছু বলবি?”
ফোস করে শ্বাস ফেলে কুহু আস্তে করে বলল,
“হুম, বলব। অন্তুকে নিয়ে ভীষণ চিন্তা হচ্ছে আমার। বিকেলে তো দেখলেই লোকগুলোকে, যেন সাক্ষাৎ সন্ত্রাস! একা একা ওই দেশে কেমন ছেলের পাল্লায় পড়ল আমার মেয়েটা? অহীনটার সঙ্গে যে এই বিষয়গুলো বলব, জিজ্ঞেস করবো, ওর নিজের জীবনেই তো তোলপাড় চলছে।”
“অহীনের আবার কী হয়েছে?”
“জানি না, তবে আশা ওর সঙ্গে নেই বলে মনে হয় না সব কিছু ঠিকঠাক আছে। ও কিছুদিন আগেও আমাকে বলেছিল দুজনে একসাথে আসবে। অথচ হঠাৎ কথা বলা বন্ধ করে দিল, আর এখন একদম আচমকা বাড়ি চলে এসেছে। এমনকি সৃজনকেও আজকাল কিছু জিজ্ঞেস করলে ঠিকঠাক জবাব দেয় না, যেন হুট করেই অচেনা হয়ে গেছে!”
“ভাবিস না জান, সব ঠিক হয়ে যাবে। আর অন্তুর বিষয়ে কাল সকালেই না হয় অন্তুকেই জিজ্ঞেস করে নিস।”
দরজায় হালকা টোকার শব্দে দুজনে দূরত্ব বজায় রেখে বসে। অহীনকে ঘরে আসার অনুমতি দিতেই সে বুকে বালিশ জড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। মুখটায় এক অদ্ভুত অনমনীয় ভাব। দুজনকে ওর দিকে কৌতুহলী নেত্রে তাকাতে দেখে অহীন আস্তে করে বলল,
“আব্বুর সাথে ঘুমাতে চাই।”
দুজনেই বেশ অবাক হলো। ঢোক গিলে একে-অপরের দিকে তাকাতেই অন্তিককে কুহু ইশারায় সম্মতি জানায়। অহীন বড় হয়েছে পর থেকে অন্তিক বা কুহুর সঙ্গে ঘুমানোর এমন আবদার অন্তিকের কাছে বেশ অন্যরকম ঠেকছে। অন্তিক কিছু বলার আগেই কুহু বলে উঠে,
“ঠিক আছে, আজ তুমি ঘুমিয়ে পড়ো এখানে। আমি বরং আজ তোমার রুমে গিয়ে ঘুমাই।”
কুহু নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে যায়। ছোট্ট ছোট্ট পায়ে অহীন বিছানায় গিয়ে গা এলিয়ে দিয়েছে। লাইট অফ করে অন্তিকও তার পাশেই শুয়ে পড়ে। কয়েক মিনিট পেরোতেই অহীন বাবাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। অন্তিক পিঠে ভেজা অনুভূতি পেয়ে একটু নড়েচড়ে পেছন ফিরতে চাইতেই অহীন মাথা দুলিয়ে নিষেধ করে তাকে। অন্তিক আর ফিরল না, শুধু প্রচুর আদুরে আর ভরাট গলায় জিজ্ঞেস করে,
“কাঁদছিস কেন? কিছু হয়েছে?”
অহীন মাথা দোলাল, কিছুই হয়নি। অন্তিক আবার জিজ্ঞেস করে,
“তবে কাঁদছিস কেন, বল আব্বুর কাছে?”
অহীন এবারও মাথা দুলিয়ে চুপ করে আছে। অন্তিক আর না পেরে অহীনের দিকে ঘুরে শোয়া থেকে উঠে বসে এবং মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালায়। আবছা অন্ধকারে অহীনের ফোলা ফোলা চোখজোড়া অশ্রুসিক্ত লাল হয়ে আছে। সে একটু ধমকের সুরে জিজ্ঞেস করে,
“কিছু না হলে কাঁদছিস কেন?”
অহীন মিনমিনে স্বরে বিড়বিড় করে বলে,
“আমি জেলাস।”
অহীনের জেলাস হওয়ার কারণ অন্তিক ঠিক ধরতে পারছে না, তাই জিজ্ঞেস করে,
“হুম?”
অন্তিকের দিকে বালিশটা ছুঁড়ে দিয়ে সজোরে চিৎকার করে উঠে অহীন,
“তুমি তোমার পেচির সঙ্গে এত ভালো আছো, এত সুখী! এসব দেখে আমি জেলাস হচ্ছি! আমিও আমার ‘পেচি’র সঙ্গে ঠিক এভাবেই থাকতে চাই!”
ছেলের এমন অবুঝের মতো কথায় থতমত চেহারা নিয়ে হঠাৎ ফিক করে হেসে দিলো অন্তিক, অহীনের গায়ে সপাটে থাপ্পড় দিয়ে বলে,
“তো তোমাকে কে বলেছে এভাবে না থাকতে? তুমি আরো অনেক ভালো করে থাকতে পারবে বোকা। আমার বয়স হয়েছে চাইলেও তোমার মায়ের সঙ্গে আগের মতো ছোট ছোট অনুভুতির মূহুর্ত গুলো তৈরি করতে পারি না। তুমি ফ্রান্স থাকো স্বাধীন কেউ বাঁধা দেয়ার নেই। তোমার যেমন ইচ্ছে বউকে রাখো যা ইচ্ছে পড়াও। কেউ টুকবে না তোমায়। তুমি তো চাইলে আমার থেকেও বেশি ভালো থাকতে পারবে।”
অহীন মাথা দুলায় উপর নিচ, বাবাকে সবটা বলার সাহস হলো না। কত সুন্দর করে বোঝালে ভালো থাকার জন্য। কিন্তু ভালো থাকার মানুষটাকেই তো ছেড়ে দিয়েছে। ফোনের ফ্লাশটা বন্ধ করে দিলো সে নিজেই।
“ঘুমাও।”
অন্তিক শুয়ে পরতেই আবারো গিয়ে শক্ত করে জরিয়ে ধরলো অহীন। অন্তিক তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ছেলের উদাসীনতা কোন বাবার ভালো লাগে? তারও ভালো লাগছে না। অহীনের নিশ্বাস ভারি হতেই সে আলতো করে কপালে চুমু খেয়ে নিজেও চোখ বুঝে নিয়েছে।
________
সকালের মিষ্টি রোদে বাড়ির প্রতিটি মানুষের ঘুম ভাঙলেও, অন্তিহা আর আশার যেন রাত কাটছেই না। ভোরবেলাতেই কুহু এসেছে এ বাড়িতে। মেয়ের কক্ষে এসে সে কয়েকবার ডেকে গেলেও অন্তিহা বা আশা কারও সাড়াই পাওয়া যায়নি। অহীনকে হাজার বলার পরেও সে এ বাড়িতে আসতে রাজি হলো না। এদিকে ভোরের হাঁটেই আকাশ আর অন্তিক বাজার করে এনেছে। রান্নাঘরে কুহু আর তাশা মিলে রাঁধছে। চারপাশ জুড়ে যেন একটা উৎসবের আমেজ।
সিঁড়ি দিয়ে ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে নামছে অন্তিহা। সেদিকে তাকিয়ে আছে অন্তিক। ভিডিও কলে মেয়েকে দেখলেও, সামনাসামনি এ যেন অন্য কেউ! এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে উল্টে বাবার দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে পায়ের গতি বাড়াতেই কানে খটাস করে কিছু একটা পড়ার শব্দ হলো। দরজার দিকে তাকায় সবাই।
কালো পোশাক আর মুখে মাস্ক পরা সেই মানুষটা সবার খুব পরিচিত। তার হাতের ফ্রুটস বক্সটা মেঝেতে পড়ে গিয়ে ফলগুলো করিডোরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গিয়েছে। অন্তিহার দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে আয়াশ। তাকে আচমকা সামনে দেখে হোঁচট খেল অন্তিহা, আর সিঁড়ির শেষ ধাপ থেকে ধপাস করে পড়ল ফ্লোরে। মাজায় চোট পেয়ে ব্যথায় ককিয়ে উঠে ডাকল,
“আব্বুউউউউউউ!”
বসা থেকে তড়িঘড়ি করে উঠে গিয়ে মেয়েকে দুই হাতে ধরে নিল অন্তিক। কুহেলিকা আর তাশাও রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এসেছে। সবাই ওর কাছে আসতেই, মেয়েটি মুখ কুঁচকে অন্তিকের কাঁধে হাত রেখে শক্ত ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। সোফায় এনে বসানোর পর অন্তিক ওর পায়ের কাছে বসে জিজ্ঞেস করে চিন্তিত গলায়,,
“কোথায় লেগেছে? এভাবে কেউ নামে?”
সে আলতো করে অন্তিহার পা-টা নিজের হাতে তুলে নিল। তাশা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা আয়াশকে ভেতরে আসতে বলতেই সে ভেতরে আসে। তবে সে বসছে না দেখে কুহু নিজেই একটা চেয়ার টেনে দিয়ে নরম সুরে বলল,
“বসো, একটু আগেই সব ঝাড়ামোছা করা হয়েছে।”
মাথা ওপর-নিচ দুলিয়ে আয়াশ পকেট থেকে স্যানিটাইজার স্প্রে বের করে হালকা স্প্রে করে বসে। কুহুর ওপর তার অগাধ ভরসা, কারণ ছোটবেলা থেকেই সে কুহুর কাছে অনেক এসেছে। কিন্তু তাশার সঙ্গে আশার কারণে তেমন একটা মেলামেশা হয়ে ওঠেনি। মনের ভেতর সব সময় একটা সংকোচ কাজ করত যদি উনি কিছু মনে করেন!
অন্তিহার দিকে পা ব্যথার মলম এগিয়ে দিতে দিতে তাশার চোখ যায় মেয়েটির হাতের দিকে। সে অবাক হয়ে বলল,
“অন্তু, তোর ব্রেসলেটটা তো দারুণ! রাতে তো এটা ছিল না?”
তার কথায় নিজের হাতের দিকে সবে খেয়াল গেল অন্তিহার। ব্লু টোপাজ (Blue Topaz) দিয়ে তৈরি ব্রেসলেট! অসম্ভব সুন্দর। কিন্তু তার তো মনে পড়ছে না এটা সে নিজে কিনেছে বা রাতে কোনোভাবে হাতে পড়েছে বলে! বিস্মিত চোখে ব্রেসলেটের দিকে তাকিয়ে থেকে সে জিজ্ঞেস করে,
“এটা আব্বু, তুমি দিয়েছ?”
তার প্রশ্নে অন্তিকের চোখ জোড়া বড় করে তাকায় । কারণ সে তো এটা দেয়নি! প্রিমিয়াম কোয়ালিটির ব্রেসলেট, সঙ্গে হোয়াইট গোল্ডের কাজ। সে নিজেও অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
“এটা তোমার হাতে আর তুমিই জানো না কে দিয়েছে? এটা কম করে হলেও এক লাখ টাকার ব্রেসলেট!”
বাবার উত্তরে ঘোরেচলে গিয়েছে অন্তিহা। কুহু মেয়ের কাছে এগিয়ে গিয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে টপাটপ কয়েকটা চুমু খায় গালে। তারপর গাল দুটো টেনে দিয়ে বলল,
“দিয়েছে হয়তো কেউ গিফট। ক্লান্তির কারণে হয়তো মনে পড়ছে না তোর। মনে পড়লে তাকে আবার একটা ‘থ্যাংক ইউ’ দিয়ে দিস। আগে বল, তুই আমার কাছে না গিয়ে এখানে কেন আসলি? আমাকে মায়া হয় না বুঝি?”
একগাল হেসে মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সে ফিসফিসিয়ে বলল,
“হয়তো খুব মায়া হয় তোমার জন্য। কিন্তু তোমাদের ‘আশু’ মহারানিকে যে তোমাদের ছেলে বাইরে দুই মিনিটের জন্যও একা ছাড়তে রাজি নয়! গেট থেকে মহারানিকে নিয়ে ভেতরে আসতে হয়েছে, তবেই তোমার ছেলে গেছে।”
তার কথা শুনে উপস্থিত সবাই উচ্চশব্দে হেসে উঠে, আয়াশ দূরে বসেও মুচকি হাসছে। তার দৃষ্টি অন্তিহার হাতের দিকে এটা কথার মাঝে অন্তিহা যে লক্ষ করেনি, তা নয়। বরাবরই সে আয়াশের ছোট ছোট বিষয়গুলো লক্ষ করতে অভ্যস্ত।
সন্দিহান হয়ে ব্রেসলেটটি একবার নাকের সামনে নিয়ে এলো অন্তিহা। হ্যাঁ, এটা সেই চেনা স্যানিটাইজারের ঝাঁঝালো কিন্তু মিষ্টি গন্ধ, যা আয়াশ নিজের যাবতীয় জিনিসে ব্যবহার করে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়াশের দিকে তাকাতেই সে চোখ সরিয়ে নেয়, নেলো কিছু লুকচ্ছে। অন্তিহা নিশ্চিত হলো এটা আয়াশই দিয়েছে।
তার এই ভাবনাকে আরও জোরালো করতে আকাশের একটি কথাই যথেষ্ট কারন হলো,
“আয়াশ, তুমি এগুলো আনার জন্য আবার বাইরে বের হয়েছিলে?”
“চাচ্চু, এতদিন পর খালি হাতে আসতে ভালো লাগছিল না, তাই গিয়েছিলাম।”
কিছুক্ষণ আগে অন্তিক আর আকাশ বাজার থেকে ফেরার সময় আয়াশের সঙ্গে দেখা হয়। তারা জোর করে টেনে নিয়ে এসেছে তাকে। এ বাড়িতে এসে বড়দের সঙ্গে কেমন যেন অদ্ভুত লাগছিল আয়াশের। তাই ছাদের দিকে যাওয়ার জন্য উপরে উঠে সে। যাওয়ার পথে অন্তিহার কক্ষের দরজাটা হাঁট করে খোলা । হালকা চোখ যেতেই সে চোখ গুলো অবাক হলো ঘরের পরিবেশ একদম নরম, যেন কোনো পুতুলের ঘর। বিছানায় কেউ নেই ভেবে ধীরপায়ে এগিয়ে যায় সে।
কিছুটা এগোতেই দেখল, একটা ছোট শরীর অর্ধেক কাঁথা দিয়ে আবৃত, আর ওপরের অংশ উন্মুক্ত। ওভারসাইজড শার্ট পরা থাকায় কাঁধের একপাশ থেকে ইনার দেখা যাচ্ছে। বেঘোরে ঘুমাচ্ছে মেয়েটি, যেন দুনিয়ার কোনো চিন্তাই নেই তার মস্তিষ্কে।
আয়াশের ভীষণ হিংসে হলো। সে নিজে শেষ কবে এতটা সময় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে, তা একদম মনে নেই। সেও এভাবে এত বেলা অবদি ঘুমাতে চায়। কক্ষ থেকে বের হতে গিয়েও হঠাৎ কিছু একটা মনে করে থমকে দাঁড়ায় সে। অন্তিহার কাছে গিয়ে কিছুটা ঝুঁকে, প্যান্টের পকেট থেকে ব্রেসলেটটা বের করে খুব সাবধানে পরিয়ে দিল ওর কবজিতে। বেচারা লক্ষ্মী ছেলের মতোই উল্টোপাল্টা কিছুর দিকে চোখ না দিয়ে, ব্রেসলেটটা পরাতে পরাতে বিরবির করে বলল, ‘ভেবো না ওই বাস্টার্ডের ঘড়ির বদলে এটা দিয়েছি। এটা তো অনেক আগে থেকেই সাথে নিয়ে ঘুরি। তোমার যা তেজ, সামনাসামনি দেয়া তো দূর, কাছে আসতেই পা কাঁপে।’
কিছুটা সময় চুপচাপ ওর হাতের দিকে তাকিয়ে থেকে অস্ফুটে বলে,
“তোমাকে অসাধারণ লাগছে। ঘড়িটার থেকে অনেক বেটার।”
“আব্বু-আম্মু, তোমাদের মাঝে ‘ম্যানার্স’ বলে কিছু নেই? এত সকাল সকাল কেউ কারও বাসায় এসে বসে থাকে? জাস্ট অসহ্য!”
আয়াশের ভাবনার জাল ছিন্ন করে অন্তিহা ঝাঁঝালো গলায় কথাগুলো বলে উঠে। হকচকিয়ে উঠল আয়াশ। কথা শেষ করেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে শুরু করে অন্তিহা। অন্তিক আর কুহু মেয়ের এমন বাঁকা কথায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। অন্তিক কিছুটা ভারী গলায় ওকে শাসন করে বলল,
“কী বলতে চাও? এটা তোমার চাচ্চুর বাড়ি, ঠিক যতটুকু আমারও সেম ততটুকুই। ফ্রান্স থেকে বেয়াদব হয়ে ফিরেছ!”
যেতে যেতে ওপর থেকে অন্তিহা জবাব দিল,
“কিছু কিছু কথায় কারও নাম ব্যবহার করলেও, প্রয়োজন পড়ে না যে তাকেই বলা হয়েছে। হতেও তো পারে সকাল সকাল অন্য কেউ এসেছে!”
হঠাৎ খুকখুক করে কেশে উঠে আয়াশ। ফলে সবার আকর্ষণ তার দিকেই গেল। কুহু তাকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলল,
“তোমাকে বলেনি, পানি খাও। মেয়েটার কথার ধরন ফ্রান্স থেকে ফিরে বড্ড খিটখিটে হয়ে গিয়েছে।”
“ইটস ওকে চাচি, আমি ফ্রান্সে ওর এই স্বভাবের সাথে অভ্যস্ত।”
_______
দুপুর হয়ে আসছে প্রায়, আশা এখনো নিচে নামেনি ঘুমে বিভোর সে। কয়েকবার ঘরে গিয়ে ডাকার পরেও মেয়েটা প্রতিবারই জড়িয়ে জড়িয়ে বলেছে,
“আর ৫ মিনিট ঘুমাই।”
অন্তিহার কথার সূত্রে বাড়ির সবাই জেনেছে, ফ্রান্সে ও নাকি এমন দুপুর ১টা-২টা পর্যন্তই ঘুমিয়ে কাটাত।
নিজের কক্ষে জানালার ধারে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে অন্তিহা। বাইরে রোদের লাল কিরণে রাস্তা ঝলমল করছে, কিছুক্ষণ পরপর দু-একজন লোক হেঁটে যাচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে ফ্রান্সের কথা খুব মনে পড়ছে ওর। ওখানে থাকলে জানালা খুলতেই যেন এক কাপ কফি হাজির হয়ে যেত তার জন্য। কোনো দিন খেলে খেল, না খেলে সাফওয়ান নিজেই সেটা ঢকঢক করে গিলে নিত। অনেক সময় সাফওয়ান কফি নিয়ে না আসলে, অন্তিহা পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে জানালা দিয়ে উঁকি দিত। দেখত, গাড়ির ড্রাইভিং সিটে মাথা হেলিয়ে ঘুমিয়ে আছে লোকটা। যদিও চুল ছাড়া কোনো দিন তার সেই ঘুমন্ত মুখটা ভালো করে দেখার ভাগ্য অন্তিহার হয়নি।
হঠাৎ ঘরে কারও উপস্থিতি টের পেয়ে ঘুরে দাঁড়ায় সে। আয়াশ ঠিক তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
আয়াশ শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে,
“কী করছ?”
অন্তিহার নির্লিপ্ত জবাব,
“ভাবছি।”
আয়াশ কিছুটা উৎসুক হয়ে প্রশ্ন করে,
“কী ভাবছ?”
অন্তিহা আঙুল দিয়ে রাস্তার ওপারটায় ইশারা করে, যেখানটায় একটা গাছের হালকা ছায়া পড়েছে। বলল,
“সে যদি এখন বাংলাদেশে আসত, ঠিক ওইখানটায় গাড়ির ভেতর ঘুমিয়ে থাকত।”
“মিস করছ? সবে তো একটা রাত হলো।”
আয়াশের গলায় সূক্ষ্ম এক চিলতে খোঁচা।
“হুম। যে আপনাকে মিস করবে, তাকে তো একটু মিস করতেই হয়। সবাই তো আর আপনার মতো অসামাজিক হতে পারে না।”
“ভীষণ পাল্টেছ তুমি। আগে কখনো আমার সাথে এমন বিহেভ করোনি।”
তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে অন্তিহা। এমন ব্যবহার করার সময়টাই বা কখনো এসেছে? লোকটার প্রতি আজকাল রাগ হওয়াটা খুব স্বাভাবিক, কারণ সে অহেতুক অধিকার ফলায়। অবশ্য এই অধিকার সাফওয়ানও দেখায়, যা অন্তিহার অসহ্য লাগে। তবে সাফওয়ানের দিক থেকে একটা জোরালো কারণ আছে, সে স্পষ্ট দাবি করে সে অন্তিহাকে ভালোবাসে এবং যেকোনো উপায়ে তাকে নিজের করতে চায়। আর আয়াশ? সে তো কেবল তার বাবার বন্ধুর ছেলে, যার সঙ্গে ঠুনকো একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক মাত্র!
তবে অন্তিহা নিজেই এই আয়াশ নামের মানুষটাকে খুব চায়। কিন্তু আয়াশ তো সেটা জানে না! তাহলে সে কিসের অধিকার দেখায় এত? কোন সাহসে সে সাফওয়ানের দেওয়া গিফটের ঘড়িটা ওভাবে ছুড়ে ফেলে দিল?
ভাবনার মাঝেই আয়াশ বলে উঠে,
“তোমার হাতে ওটা বেশ শুট করেছে।”
“ঘড়িটা বেশি ভালো ছিল। ওটা হাতে পরা মাত্র মনে একটা অদ্ভুত শিহরন কাজ করেছে। মনে হয়েছে, কেউ একজন আমার অপেক্ষায় থাকবে... আমার ফিরতে হবে।”
আয়াশ অন্তিহার কাছ থেকে এমন উত্তর একদম আশা করেনি। থমকে গেল তার জবান। নিরেট নেত্রে সে তাকিয়ে রইল অন্তিহার মুখের দিকে। অন্তিহা এবার সোজা হয়ে, টানটান হয়ে দাঁড়াল আয়াশের মুখোমুখি। উচ্চতায় খাটো হওয়ায় বেচারিকে বেশ ঘাড় উঁচুই করতে হলো। রাশভারী বিরক্তি নিয়ে সে বলল,
“আপনার কী মনে হয়েছিল আয়াশ? আমি আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ দেব ঘড়িটার বদলে এটা দেওয়ার জন্য? আপনার মনে হয় না এসব বড্ড ছেলেমানুষি? আপনার কিন্তু ছেলেমানুষি করার বয়স আর নেই, এই সামান্য বিষয়টা কি ভুলে গেছেন?”
“তুমি ওই ঘড়িটার জন্য এখনো রেগে আছো?”
“অফকোর্স আমি রেগে আছি আয়াশ! আপনার এই ব্রেসলেট থেকে শতগুণ বেশি পছন্দ হয়েছিল আমার ওটা।”
তার কথায় এবার তাচ্ছিল্য করে হাসে আয়াশ। দুই পা এগিয়ে এসে সে অন্তিহার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নেয়। ভারী গলায় বলল,
“সিরিয়াসলি অন্তি? ওই ঘড়িটার মডেল আর প্রাইজ থেকে এটা ডাবল এক্সপেন্সিভ আর রেয়ার। ফ্রান্সের বেস্ট ডিজাইনারকে দিয়ে আমি নিজে বানিয়েছি এটা।”
হাতটা এক ঝটকায় আয়াশের মুঠো থেকে ছাড়িয়ে আনে অন্তিহা। কবজি থেকে ব্রেসলেটটা খুলতে খুলতে সামান্য দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“আপনাকে হাজারবার বলেও আমি বোঝাতে পারছি না দুটো জিনিসের মাঝের তফাতটা। আপনার দেওয়া উপহারে আছে সাফওয়ানের প্রতি হিংসা আর নিজের অহংকার, আর সাফওয়ানের দেওয়া উপহারে ছিল এক আকাশ পরিমাণ মায়া আর ভালোবাসা।”
খুলে ফেলা ব্রেসলেটটা আয়াশের হাতের ওপর ফিরিয়ে দিতে গিয়েও মাঝপথে থেমে যায় অন্তিহা। সেটা আবার নিজের দিকে ফিরিয়ে আনে। আয়াশের স্থির দৃষ্টি তখনো আটকে আছে ওর কথা বলার ধরনের ওপর। রাগে রমণীর ফর্সা গাল দুটো টলটলে লাল হয়ে উঠেছে।
অন্তিহা এবার দাঁতে দাঁত চেপে, তাচ্ছিল্যের সুরে বলে,
“না, এটা এভাবে হাতে ফেরত দেওয়া ঠিক হবে না। আপনারও তো বোঝা উচিত, কাউকে কোনো কিছু দেওয়ার পর সেটা যখন অবহেলায় কোথাও ফেলে দেওয়া হয় তখন মনের মাঝে ঠিক কেমন ফিল হয়!”
কথাটা শেষ করেই, জানালার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে হাত গলিয়ে দেয় সে। আয়াশকে কোনো রকম আটকানোর সুযোগ না দিয়ে সত্যি সত্যিই ব্রেসলেটটা বাইরে ছুড়ে ফেলে দিল সে!
ঘটনার আকস্মিকতায় স্তব্ধ, হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছে আয়াশ। যা ছিল তার কল্পনারও অতীত। বাড়ির এই পাশটায় ময়লার ছোট ছোট স্তূপ জমে থাকে। সে চোখ বড় বড় করে চেঁচিয়ে উঠে,
“হোয়াট দ্য ফাক! কী করলে এটা?”
মুখে একটা মেকি হাসি ঝুলিয়ে অন্তিহা বলল,
“লেগেছে? ব্যথা লেগেছে? আপনার কোনো ফিলিংস নেই, তাতেই এতটা লাগল? এবার ভাবুন, যার ফিলিংস জড়িয়ে ছিল, ওটা ফেলে দেওয়ায় তার কতটা লেগেছে?!”
মুহূর্তেই চোয়াল শক্ত হয় আয়াশের। সে হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে কোনো রকমে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করল। চেপে রাখা ক্রোধ নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“আই উইল মেক ইউ রিগ্রেট ফর দিস!”
তার এই চরম হুমকিতে ততক্ষণাৎ মুখে কোনো জবাব দিল না অন্তিহা। বরং কিছুটা সময় নিয়ে, সোজা আয়াশের চোখে চোখ রেখে নিজের হাতের মধ্যমা আঙুল উঁচিয়ে ‘ফাক’ দেখায়। তারপর একটা কটাক্ষপূর্ণ হাসি দিয়ে আবারও জানালার বাইরের দিকে চোখ ফেরায়।
চলবে...