ফন্ট সাইজ:
থিম:
দূরত্বের প্রণয় ২

৫০তম পর্ব

লেখক: স্বর্ণালী ইসলাম

#দূরত্বের_প্রণয়_২

#স্বর্ণালী_ইসলাম

পর্বঃ৪৯

"অন্তু, এই অন্তু ওঠ! আর কত ঘুমাবি? জলদি ওঠ!”

​“উফ আশু, আর একটুখানি ঘুমাই না...”

​আশার কণ্ঠে এমন বিচলিত সুর ঝরে পড়ার পরও মেয়েটার ঘুম ভাঙছে না কিঞ্চিৎ। অগত্যা আশা তার শরীর ছুঁয়ে সজোরে একটা ধাক্কা দিল, তবুও সে নড়ল না। উল্টো কাঁথার ওমে নিজেকে আরও ভালো করে গুটিয়ে নিয়ে নাক-মুখ ঢেকে নিয়েছে। এবার বাধ্য হয়েই আশাকে গলার স্বর সপ্তমে চড়াতে হয়েছে। কানের কাছে মুখ নিয়ে চেঁচিয়ে উঠে,

“অন্তু! তোর সাফওয়ানের ব্যাপারে নিউজ এসেছে, দেখ!”

​অন্য কোনো কথা কানে না তুললেও ‘সাফওয়ান’ নামটা কর্ণকুহরে প্রবেশ করতেই ধড়ফড় করে গা থেকে কাঁথাটা ছুঁড়ে ফেলল সে। ভেবাচেকা খেয়ে কম্পিত গলায় শুধাল,

“কী হয়েছে? সাফওয়ানের কী হয়েছে?”

​ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসে মেয়েটি। বুকের ওপর হাত রেখে হাঁপাচ্ছে সে। গত রাতে বই পড়তে পড়তে কখন যে চোখ দুটো বুজে এসেছে, তার নিজেরই জানা নেই। আশার দিকে কিছুটা বিভ্রান্ত চোখে তাকায় সে। কিন্তু আশা তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই হাতের ফোনটা বাড়িয়ে দিল,

“দেখ নিজেই।”

​আশার হাত থেকে ফোনটা লুফে নেয় অন্তিহা। বিরক্তি নিয়ে চোখ কচলাতে কচলাতে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে যায় মেয়েটি। এক লহমায় চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র আতঙ্ক। প্যারিসের এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের খবর! ফরাসি ভাষায় স্পষ্ট অক্ষরে লেখা

“বিখ্যাত ব্যবসায়ী প্রয়াত ইশতিফা খানমের বিলাসবহুল ভিলাটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত।”

​আতঙ্কিত মুখটায় যেন এক নিমেষে অমাবস্যার অন্ধকার নেমে আসে। কাঁপতি আঙুলে স্ক্রিন স্ক্রোল করতে শুরু করে সে। কোনো ভিডিও বা সংক্ষিপ্ত ক্লিপেও সাফওয়ান নামের সেই অসভ্য লোকটার দেখা মিলছে না। আশা ওর পাশে বসে বিচলিত গলায় বলল,

“কতক্ষণ ধরে ডাকছি তোকে, শুনছিস না কেন? প্রদীপ কতগুলো কল দিয়েছে তোকে, কোনো খোঁজ রাখিস?”

​আশার কথা ওর কানে পৌঁছাল কি না কে জানে! বেচারি অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে,

“এখানে কোথায়... সাফওয়ানকে দেখা যাচ্ছে না কেন?”

​আশা ওর হাত থেকে ফোনটা একরকম ছিনিয়েই নেয়। স্ক্রিনের এক জায়গায় আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল,

“হেডলাইনটা পড়! আগুন লাগার পর থেকে ওকে আর দেখাই যায়নি। ফোন অন, কিন্তু কারও কল রিসিভ হচ্ছে না।”

​“মানে?”

​বলেই আবারও আশার ফোনটা কেড়ে নেয় সে। বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ে ত্রস্ত পায়ে। কী করবে, তা যেন নিজেও বুঝতে পারছে না। মন থেকে ভালো না বাসলেও, সাফওয়ানের মতো একটা মানুষের এমন কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে তা তো মেনে নেওয়া যায় না! তীব্র দুশ্চিন্তায় নিজের ফোনটা হাতে তুলে অন্তিহা। এবার সরাসরি সাফওয়ানের নম্বরেই ডায়াল করে। নিজের অজান্তেই চোখ বেয়ে দু-ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে তার।

​তবে অবাক করে দিয়ে, মাত্র একবার রিং হতেই ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে কলটা রিসিভ হয়!! অন্তিহা বিচলিত গলায় ডেকে উঠে,

“সাফওয়ান?”

​ওপাশটা একদম নিস্তব্ধ। কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে অন্তিহা নিজেও যেন কেমন চুপসে যায়। ছেলেটার অদ্ভুত আর ভারী শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ ফোনের কাচ ভেদ করে তীব্রভাবে এসে লাগছে অন্তিহার কানে। সে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে অস্ফুটে মিনতি করে,

“ঠিক আছেন আপনি? ইশু ঠিক আছে?”

​তবুও উত্তর দিল না সাফওয়ান, ওপাশ থেকে কেবল নীরব শ্রোতা হয়ে বসে আছে। অন্তিহা এবার ধৈর্য হারিয়ে আরও ব্যাকুল হয়ে বলল,

“কীভাবে হলো এসব? চুপ করে আছেন কেন? কিছু বলুন!”

​কথার শেষ দিকে তার গলা চড়ে উঠতেই ওপাশ থেকেও আচমকা পাল্টা ধমকে উঠে সাফওয়ান,

“কী বলব আপনাকে, বেয়াদব?”

​সাফওয়ানের এমন আকস্মিক চিৎকারে থমকে যায় অন্তিহা, ওর মুখের ভাষা যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। যে লোকটা সবসময় ওর সামনে মিউমিউ করত, সে আজ এমন কর্কশভাবে ধমক দিল তাকে! নিজের কানকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না ও। অন্তিহা একদম স্থবির হয়ে আছে। ওর এই নীরবতা টের পেয়ে ওপাশ থেকে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ছুঁড়ে সাফওয়ান,

“এক সপ্তাহ ধরে আমার একটা কলও রিসিভ করছেন না! ভিলাতে আগুন দিয়েছি চার ঘণ্টা কেটেছে, আর এখন কল দিচ্ছেন আমাকে? আপনি এত নিষ্ঠুর কেন আমার প্রতি, অন্তিহা?”

​সাফওয়ানের কথাগুলো যেন বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়ে ওর ওপর। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাওয়ার উপক্রম অন্তিহার,

“আ... আপনি দিয়েছেন আগুন?”

​“নইলে কি কল দিতেন? আমার কষ্টটা বোঝেন না কেন আপনি? একটু কণ্ঠ শোনার জন্য পাগলপ্রায় হয়ে থাকি আমি! মানুষ তো ওই পথচলতি কোনো প্রাণীকেও একটা সময় মায়ার টানে ঘরে তুলে নেয়। আপনার কাছে কি আমি তার থেকেও বেশি নিকৃষ্ট?”

​সাফওয়ানের প্রতিটি শব্দ যেন সিসা ঢালা বুলেটের মতো এসে বিঁধছে অন্তিহার বুকে। ওপাশের ভারী আর উথালপাথাল শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দই বলে দিচ্ছে, লোকটা কতটা মরিয়া, কতটা ক্ষিপ্ত! এক অদ্ভুত ঘোর লাগা আচ্ছন্নতা আর তীব্র আতঙ্কে অন্তিহার শরীর কাঁপছে, এমন সাফওয়ানকে সে কল্পনা করেনি কখনো। দূরত্ব যেনো নিতেই পারছে না। ​ওর দিক থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে ওপাশে সাফওয়ান আবার তপ্ত শ্বাস ফেলে হাসে। সেই হাসিতে কেবল এক বুক হাহাকার আর তীব্র অভিমান। সে ফিসফিসিয়ে বলল,

“চুপ করে আছেন কেন, মিস? বলুন? একটা বিলাসবহুল ভিলা পুড়লে যদি আপনার একটুখানি মনোযোগ পাওয়া যায়, তবে পুরো প্যারিস শহরটাকে ছাই করে দিতেও আমার এক সেকেন্ড সময় লাগবে না! এবার তো বুঝুন, আমি আপনার জন্য কতটা পুড়ছি…”

​“আপনি একটা সাইকো! বুঝেছি আমি।”।

​ওপাশে সাফওয়ান মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয় । তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলতো করে নাক টানে। এবার তার কণ্ঠে ফুটে এক শীতল আবদার,

“বাড়ি পুড়িয়ে মূল্য দিলাম, এবার ভালোবাসা দিন?”

​তার এই শেষ কথাটার উত্তর অজানা অন্তিহার। ফোনের ওপাশের আর এপাশের—দুটো নীরবতা যেন এক হয়ে মিশে গিয়েছে খানিকটা সময়। অন্তিহা মাথা নিচু করে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে,

“আই অ্যাম সরি...”

​“হুম?”

​সাফওয়ানের যেন বিশ্বাসই হলো না। অন্তিহার মতো একটা শক্ত মনের মেয়ে তার কাছে সরি চাইছে, এটা যেন কোনোভাবেই হজম করতে পারছে না সে। তার শ্রবণেন্দ্রিয় আর মস্তিষ্ক ক্ষণিকের জন্য অসাড় হয়ে আসছে। এরপরই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে এক চিলতে অদ্ভুত হাসি। সে দূরে, শহরের এক একদম উঁচু স্থানে আছে যেখান থেকে তার চোখের সামনে নিজের শখের ভিলাটা দাউদাউ করে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার দৃশ্যটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সে অবহেলায় হাসতে হাসতেই শুধাল,

“সরি কিসের জন্য? এবারও আমাকে ফিরিয়ে দেবেন বলে?”

​শক্ত করে ঢোক গিলে অন্তিহা। এমন একটা ছিটগ্রস্ত, পাগল মানুষকে বারবার ফিরিয়ে দেওয়াটা নিতান্তই নির্দয়তা হবে বলে মনে হচ্ছে তার। গলা খাঁকারি দিয়ে একবার পেছনে তাকায় ও, ততক্ষণে আশা ঘর থেকে চলে গিয়েছে। অন্তিহা নিজের ভারী হয়ে আসা গলাটা একটু স্বাভাবিক করে বলল,

“আপনার কল রিসিভ না করার জন্য। রোজ কল রিসিভ করে আপনাকে কম করে হলেও একশোটা করে গালি দেওয়া প্রয়োজন ছিল আমার।”

​ওপাশের বিষাদ উবে গিয়ে এবার সশব্দে হেসে উঠে সাফওয়ান তার কথায়, তার আকুল হাসির রেশ টেনেই বলল,

“আপনার গালি শোনার জন্যই তো আমার অন্তরাত্মা তৃষ্ণায় ধুঁকে ধুঁকে মরছে, মিস! বলুন না... একবার ‘অসভ্য’ বলে ডাকুন আমাকে?”

অন্তিহা মুখে কিছু বলার পূর্বেই ফোনটা মৃদু ভাইব্রেট করে উঠে। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখে, সাফওয়ান ভিডিও কল অন করেছে। সে ব্যাক ক্যামেরা দিয়ে দূরের দৃশ্যটা দেখাচ্ছে তাকে বিশাল একটা এলাকা জুড়ে দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন, আর সেই লেলিহান শিখার কালো ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে মিশে যাচ্ছে ধূসর আকাশে। সাফওয়ান ওপাশ থেকে ফিসফিসিয়ে বলল,

“আপনার ক্যামেরাটাও একটু অন করুন না, মিস?”

​করল না অন্তিহা। সে বড্ড পাথরচাপা ধরনের মেয়ে। সাফওয়ানের এই তীব্র উন্মাদনা আর অবাধ্য কষ্টটুকু বোঝার বিন্দুমাত্র আগ্রহ সে দেখাস না, বরং কঠিন চোখে স্ক্রিনের দিকে চেয়ে আছে।

​ওপাশের নীরবতা টের পেয়ে সাফওয়ান আরও আনমনা হয়। দূরে আগুনের লেলিহান শিখার দিকে চোখ রেখে, আচ্ছন্ন ও কোমল সুরে গুনগুন করে গেয়ে উঠে,

Main tenu samjhava ki

Na tere bina lagda jee

Tu ki jaane pyaar mera

Main karoon intezar tera

Tu dil tui yon jaan meri

Main tenu samjhawa ki

​গানটা শেষ হতে না হতেই ওপাশ থেকে ‘কটকট’ শব্দে কলটা কেটে যায়। ​সাফওয়ান হাতের ফোনটার দিকে কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। মনটা বড্ড ছটফট করছিল প্রিয় মুখটা একনজর দেখার জন্য, অথচ পাষাণ নারী তাকে দেখা দিল না, বরং মুখের ওপর কলটা কেটে দিয়ে বুঝিয়ে দিল তার নির্মমতা। সাফওয়ান একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও সামনের সেই দাউদাউ করে জ্বলন্ত অগ্নিশিখার দিকে চেয়ে রইল। লেলিহান আগুনের আলো এসে পড়ছে তার বিষাদগ্রস্ত মুখে।

​এদিকে কলটা কেটে দিয়ে অন্তিহার বুকের ভেতরটা তোলপাড় হচ্ছে অজানা শিহরনে। সাফওয়ানের এই অদ্ভুত কথাবার্তা আর আবদারগুলো তাকে ভীষণ রকম অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে, এক তীব্র অপরাধবোধ যেন গ্রাস করছে তাকে। সে তো আয়াশকে ভালোবাসে, তার সমস্ত মন জুড়ে কেবলই আয়াশের অস্তিত্ব থাকার কথা! তবে এই অহেতুক, ছিটগ্রস্ত লোকটার জন্য কেন তার ভেতরটা এমন করে কেঁপে উঠছে? কেন তার এত চিন্তা হচ্ছে, সে নিজেও তা জানে না।

​সাফওয়ান তাকে বলেছিল সে অন্তিহার মস্তিষ্কে স্থায়ীভাবে গেঁথে যাবে। সেই কথাটার গূঢ় মানে কি তবে এটাই ছিল? অবহেলা করলেও, লোকটাকে যে সে আর চাইলেও নিজের মস্তিষ্ক থেকে মুছে ফেলতে পারছে না! অবশেষে নিজের মন আর মস্তিষ্কের সঙ্গে লড়াই করে আবারো মনটাকেই জয়ী করে দেয় সে,

“আমি আয়াশকে ভালোবাসি।”

___

বিছানায় বসে ফোনের ওপাশের মানুষের সঙ্গে গভীর মনোযোগ দিয়ে কথা বলছে অহীন। তার ঠোঁটের কোণে এক ব্যথাতুর হাসি বারবার মিলিয়ে যাচ্ছে, পরক্ষণেই আবার ফুটে উঠছে। এমন সময় দরজায় ‘খটখট’ শব্দ হতেই সে ওপাশের মানুষটিকে তড়িঘড়ি করে বলে,

“পাপি, রাখি এখন। পরে কথা হবে।”

​কলটা কেটে সে সামনে তাকায়, হাতে ফলের প্লেট নিয়ে চওড়া মুখে কক্ষে প্রবেশ করছে কুহু। মায়ের মায়াবী আদলের দিকে তাকিয়ে অহীনের ঠোঁটের সেই ম্লান হাসিটা এবার একটু চওড়া হয়। কুহু এসে ঠিক তার গা ঘেঁষে বসে। কুশলতার সুরে শুধায়,

“কী করছিস?”

​কুহুর দিকে নিস্পৃহ চোখে চেয়ে থেকে অহীন হঠাৎ রসিকতার গলায় বলে,

“দেখছি আমার আম্মুকে আবার নতুন করে বিয়ে দেওয়া যায় কি না! এখনো তুমি যা সুন্দর আছ না...”

​“পাম দেওয়া বন্ধ কর!”

কুহু প্লেটটা পাশে রেখে বলল,

“আর বল, আশাকে এ বাড়িতে কবে নিয়ে আসবি? ওর জন্য আমার অন্তুটাও আসতে পারছে না। ওকে বললেই বলে আর কিছুদিন পর আসব।”

​কুহুর মুখে আশার নামটা শুনতেই অহীনের ঠোঁটের হাসি মুহূর্তেই বাতাসের মতো উড়ে যায়। গত এক সপ্তাহ ধরে সে কেবল এদিক-সেদিকের কথা বলে এই প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেছে। কিন্তু আজকে কুহুর প্রশ্নের ধরনটা আলাদা, বড্ড বেশি সরাসরি। অহীন শক্ত করে ঢোক গিলে শীতল গলায় বলল,

“অন্তুকে বলো চলে আসতে, ওর আর ওখানে থাকার দরকার নেই। নীল ফুপ্পিও তো ওকে যেতে বলছে। ও শুধু শুধু কেন ওই বাসায় পড়ে আছে?”

​“অহীন, তুই-ই তো ওকে বলেছিস ওই বাড়িতে কিছুদিন থাকতে!”

​মায়ের এমন সটান জবাবে অহীন কণ্ঠে কিছুটা আমতা আমতা ভাব এনে বলে,

“আমি? ওহ হ্যাঁ... আশুটার জন্য বলেছিলাম। মেয়েটা দেখো না কেমন অসুস্থ হয়ে থাকে সবসময়!”

​তার কথা শেষ হতে না দিয়েই কুহু ধমকে উঠে,

“এতই যদি চিন্তা, তবে নিজের বউকে নিজের কাছে এনে রাখ, যত্ন কর! ওই বাড়িতে এভাবে ফেলে রেখেছিস কেন? তুই কি আমাকে দজ্জাল শাশুড়ি মনে করিস? যে ছেলের বউ অসুস্থ দেখলে তাকে আরও কষ্ট দেব?”

​“আম্মু, তুমি কথা অন্য দিকে নিয়ে যাচ্ছ।”

​“আমি একদম সঠিক কথাই বলছি অহীন। তোদের মাঝে যদি ছোটখাটো কোনো সমস্যা হয়ে থাকে, তবে এবার সেটা মিটমাট করে নে। আর যদি সমস্যা বড় হয়, তবে আমাদের জানা। আমরা আছি। এভাবে তো একটা সংসার চলতে পারে না!”

​“আম্মু!”

​“এত কিছু আমি বুঝি না। তুই যদি ওকে আজ আনতে না চাস, তবে আমি নিজেই গিয়ে নিয়ে আসব আজকেই।”

​মায়ের এমন অনড় রূপ দেখে অহীনের ঘরে বসে থাকা হলো না। মাথায় হাজারটা চিন্তা নিয়ে সে ঝটপট তৈরি হয়। রুম থেকে বের হয়েই দেখে, তার মা যিনি পাকা কথার রানী—ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। তাকে দেখে অগোচরে একটু মুচকি হাসে কুহু। অন্তিক অফিসে। কুহুকে সঙ্গে নিয়ে অহীন বাসা থেকে বের হলো।

​লিফটে উঠতেই হঠাৎ কুহুর খেয়াল হলো সে নিজের ফোনটা ঘরে ফেলে এসেছে। অহীনকে সেটা জানাতেই অহীনেরও হুট করে একটা কথা মনে পড়ে। সে বলল,

“আমি যাচ্ছি আম্মু। ছোট আম্মুর জন্য অনেক আগে একটা শাড়ি কিনেছিলাম, ওটা লাগেজ থেকে একবারে নিয়ে আসি।”

​“ তুই নিচে গিয়ে বাইকটা বের কর, আমি ফোন আর শাড়ি দুটোই নিয়ে আসছি।”

বলেই কুহু লিফট থেকে নামে । ​অহীন মায়ের কথায় সায় দিয়ে লিফটের ভেতরেই। লিফট যত নিচের দিকে নামছে, অহীনের মস্তিষ্কের দ্বন্দ্ব যেন ততই বাড়ছে। আশার মুখোমুখি হলেই মনটা আবার কেমন ছটফট করে উঠবে! আর ছোট বাবার সামনেই বা সে কেমন করে চোখ মেলাবে? লাস্ট ফ্লোরে লিফট থামে সে বাইরে বেরিয়ে আসে । বাইকের দিকে হাঁটতে হাঁটতে সে নিজের মনটাকে প্রস্তুত করছে ওই সবার মুখোমুখি হওয়ার জন্য।

​কিন্তু বাইকের একদম কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ তার মাথায় যেন বজ্রপাত হয়! মনে পড়ে তার ডিভোর্স পেপারগুলো তো ওই লাগেজেই রাখা আছে! শাড়ি বের করার জন্য কুহু লাগেজ খুললেই তো পেপারগুলো সরাসরি তার হাতে পড়বে!

​“ওহ শিট!”

​অস্ফুটে বলেই অহীন আবার লিফটের দিকে ছুটে । পরপর কয়েকবার বাটন প্রেস করলেও লিফট নিচে আসছে না। সময় নষ্ট না করে সে সিঁড়ি দিয়েই হাপাতি হাপাতে ওপরে উঠতে শুরু করে। এক তলা ওঠার পর আবারও লিফটের বাটন চাপতেই এবার দরজাটা খুলে। দ্রুত লিফটে উঠে পড়ে অহীন। নির্দিষ্ট তলায় এসে লিফট থামতেই সে একরকম দৌড়ে নিজের ফ্ল্যাটের ভেতর ঢুকে।

​দরজা পার হতেই সে সরাসরি কুহুর মুখোমুখি হয়। কুহু দরজার কাছেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর ড্যাবড্যাব করে অহীনের দিকে তাকিয়ে আছে। মায়ের এই চাউনি দেখে অহীনের বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে।

​কুহু স্বাভাবিক গলায় শুধায়,

“আবার ফিরে এলি কেন?”

​কুহুর এক হাতে তাশার জন্য কেনা শাড়িটা, আর অন্য হাতে তার ফোন। সে সবেমাত্র বের হতে যাচ্ছে। অহীন বুক ভরে হাঁপাচ্ছিল মায়ের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। কিন্তু কুহুর চেহারা একদম স্বাভাবিক, কোনো ঝড়ের আভাস সেখানে নেই। অহীন একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সে নিজের মাকে খুব ভালো করেই চেনে কুহু যদি কোনোভাবে ওই ডিভোর্স পেপার দেখত, তবে কোনো প্রশ্ন না করে এতক্ষণে সটান একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিত অহীনের গালে। যেহেতু কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, তার মানে পেপারগুলো কুহুর নজরে পড়েনি।

​অহীন নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,

“ভাবলাম তুমি হয়তো শাড়িটা খুঁজে পাবে না, তাই এলাম। ওহ, পেয়ে গেছ তো? চলো, অহেতুক কষ্ট করে আসলাম।”

​কুহু ঠোটে একটু মৃদু হাসির রেখা টেনে বলে,

“একদম তোর বাবার মতো বলদ হয়েছিস! পাব না কেন, সামনেই তো রাখা ছিল। চল এবার।”

​দুই জনেই আবার একসঙ্গে লিফটের দিকে পা বাড়াল।

___

শিকদার বাড়িতে এসে কুহু সটান ভেতরে চলে গিয়েছে। অহীন গাড়িটা পার্ক করে সবেমাত্র ড্রয়িংরুমে পা রেখেছে। সোফার ওপর নজর পড়তেই ওর ভ্রু দুটো কুঁচকে যায় পায়ের ওপর পা তুলে আয়েশ করে খাচ্ছে আশা! অহীনের মনে একটা সূক্ষ্ম মোচড় লাগে। আশার কি একটুও কষ্ট হয় না ওকে ছাড়া? সবকিছু এত সহজে ভুলে গিয়ে কেমন আরামসে খাচ্ছে!

​ঠিক পরক্ষণেই কুহুর গলা ভেসে আসে। ও আসলে আশার পাশেই বসে আশাকে জোর করে খাওয়াচ্ছে,,

“খা বেয়াদব মেয়ে। শুকিয়ে একদম কাঠ হয়ে যাচ্ছিস! তাড়াতাড়ি শেষ কর, বাড়ি যেতে হবে।”

​আশার মুখে রাজ্যের অভিমান। ও প্রথমে অহীনের দিকে তাকায়, তারপর ভেজা চোখে কুহুর দিকে চেয়ে বলে,

“খাচ্ছি তো। কিন্তু আমি যাব না। আমার এখানেই ভালো লাগছে।”

​“একটা থাপ্পড় খাবি তুই! অন্তু...!”

আশাকে ধমক দিয়ে কুহু সজোরে অন্তিহাকে ডাকে। ​ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নিজের লাগেজ টেনে নামতে দেখা যায় অন্তিহাকে। দেখে মনে হচ্ছে ও যেন আগে থেকেই জানত কুহু আজ আসবে। ​অহীন ভেতরে ঢুকতেই তাশা এগিয়ে আসে। আজকাল সে অহীনকে বড্ড বেশি কেয়ার করে যতই হোক, একমাত্র মেয়ের জামাই বলে কথা! একটু বাড়তি মায়া তো থাকবেই। তড়িঘড়ি করে অহীনকে ভেতরে নিয়ে যেতে যেতে তাশা কিছুটা অভিমানের সুরে বলল,

“তোর এতদিনে আমাকে মনে পড়ল? আগে তো দেশে ফিরলেই প্রথমে আমার কাছে আসতি।”

​অহীন হাসে,

“তোমাকে কি ভোলা যায়? ছোট বাবা কই?”

​“ফ্যাক্টরি গিয়েছে, কী একটা প্রবলেম হয়েছে ওখানে। তোরা দুই ভাই তো থাকিস দূরে, তোর ছোট বাবার এই বুড়ো বয়সে বিজনেস সামলায় কে? এত বলি এসব এবার ছাড়তে, তাও শুনবে না। বলবে সব তোমার জন্যই তো করি!”

​“পুরুষ মানুষ এমনই হয়, ছোট আম্মু। তারা নিজের স্ত্রীকে কখনও কোনো কিছুর অভাবে বা কারো ভরসায় ছাড়তে চায় না।”

​“হুম, তা তো বটেই। তবুও তোরা বলবি না যে একেবারে দেশে চলে আসবি! চল, খেতে বস।”

​তাশার কথার মাঝেই অহীন এগিয়ে আশার দিকে যায়, সোফায় ধপ করে বসে ঠোঁটে একটা মুচকি হাসি ফুটিয়ে তুলে, যেন ওদের মাঝে সবকিছু একদম নরমাল। ও আশার মুখের সামনে নিজের মুখটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“আর কত খাবি? স্বামীর বাড়িতে এত খাই-খাই করা যায় না. জানিস না?”

​কথাটা শুনেই আশা দাঁত কিড়মিড় করে উঠে। অহীনের মুখটা হাঁ হতেই ও একমুঠো খাবার জোর করে ওর মুখে গুঁজে দিল। তারপর ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলল,

“আমার কোনো স্বামীও নেই, আর স্বামীর বাড়িও নেই! সো, তোমাকে আমাকে নিয়ে এত ভাবতে হবে না। বাড়ি গিয়ে চুপচাপ ঘুমিয়ে থাকো, এতদিন তো ঘুমিয়েই কাটিয়েছ!”

​একসাথে অতটা খাবার মুখে ঢোকায় অহীনের গাল দুটো ফুলে দুদিকে ঝুলে পড়েছে। কুহু এতক্ষণ নিষ্পলক চোখে ওদের দেখছে। ও হঠাৎ বেশ গম্ভীর গলায় বলে উঠল,

“কেন, অহীন তো আছে তোমার স্বামী। আর এখন তো অহীনের বাড়িও আছে। তোকে ছাড়া একটা রাতও ঘুমাতে পারেনি আমার ছেলে। অথচ তুই এখানে এসে আছিস, তোকে তো কোনোদিন ওর জন্য আফসোস করতে বা ওকে মিস করতে দেখলাম না! রোজ এসে তোকে নিয়ে যাওয়ার জন্য ঘুম থেকে ডাকতে হতো। তুই কি কোন কারনে ওর ওপর রাগ?”

​কুহুর এমন শান্ত কিন্তু ধারালো গলার স্বর শুনে অন্তিহা বেশ অবাক হলো। ও এগিয়ে গিয়ে মায়ের কাঁধে আলতো করে হাত রাখে, আশা ঠোঁট টিপে ধরে কষ্ট করে খাবারটা গিলল।

​কুহু থামল না, ফের বলতে শুরু করে,

“তোকে আমি অন্তু আর অহীনের চেয়ে বেশি ভালোবাসি, কারন অহীন আর অন্তু সবচেয়ে বেশি তোকে ভালোবাসে। তোমরা কিভাবে পরিবারকে সাইডে রেখে এমন সিদ্ধান্ত করতে পারলে? বারবার ডিভোর্স নেয়ার কথা বলার পরেও তোমাদের একসঙ্গে থাকতে বলাটা কি বিরাট অন্যায় ছিলো?”

অহীন বসা থেকে উঠে। কিছুটা ইতস্তত করে আমতা আমতা গলায় বলল,

“আম্মু, কী বলছ এসব?”

​“অহীন, বারবার তোদের লাইফে নাক গলিয়ে বোধহয় আমি সত্যি একটা বাজে মা আর বাজে শাশুড়ির প্রমাণ দিচ্ছি, তাই না?”

​আশা ঝটপট উঠে গিয়ে কুহুর হাত দুটো চেপে ধরল, “কী বলছ এসব ফুম্মি? তুমি বেস্ট!”

​“ঠিক আছে, তাহলে চল আমাদের বাড়িতে।”

​অহীন আর আশা দুজনেই কুহুর এই জেদের কাছে একদম গুটিয়ে যাচ্ছে। তাশা কুহুর এমন মারমুখী ব্যবহারে বেশ অবাক হয়ে একটু চড়া সুরে বলল, “কুহু, বাচ্চাদের সঙ্গে এটা কেমন বিহেভ করছ তুমি?”

​কুহু তাশার দিকে তাকায়। ওর গলা এবার একদম ক্ষীণ,

“মায়েরা ভীষণ সেলফিশ হয় তাশা, তখন যখন একটা মা নিজের সন্তানের ভালো চায়। তোমরা কেন বুঝতে পারছ না, এতগুলো দিন ধরে আশা এখানে পড়ে আছে অথচ ওদের মধ্যে কোনো কমিউনিকেশন পর্যন্ত নেই! চোখ খোলো তোমরা! ওদের জীবনে কিচ্ছু ঠিক নেই, সব... সব বিগড়ে গিয়েছে।”

​অহীন মায়ের দিকে আরও এক পা এগোয়। একদম কাছে গিয়ে যেই না মায়ের বাহু ছুঁয়েছে, অমনি কুহু সপাটে ওর গালে একটা চড় বসিয়ে দিল! থাপ্পড়ের শব্দে পুরো ঘর স্তব্ধ। অহীন স্তব্ধ হয়ে গালে হাত দিয়ে দাঁড়ায়, আশাও ভয়ে একদম জড়সড় কারো মুখে কোনো কথা নেই।

​ বাড়িতে ঢুকল আকাশ আর অন্তিক। কুহুর এমন চণ্ডী রূপের কারণ শুরুতে ওরা কেউই বুঝতে পাটছে না। তাই অন্তিক প্রতিবারের মতোই ছেলেকে প্রটেক্ট করতে ওর সামনে এসে দাঁড়ায়। অহীনকে আড়াল করে অন্তিক কুহুর ওপর ধমকে ওঠে,,

“হাজব্যান্ড-ওয়াইফের মাঝে যাই হোক না কেন, তুই কে এভাবে ওদের পার্সোনাল ম্যাটারে কথা বলার? বারবার তোর এই পাকামি! নিজেকে কী ভাবিস তুই?”

​কুহু একটা তাচ্ছিল্য হাসে। তারপর অহীনের দিকে তাকিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করে,

“অহীন, ও তোর ওয়াইফ?”

​অহীন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুকটা ভারী হয়ে আসছে,, তাও নিজেকে শক্ত করে প্রস্তুত করে ও। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে সোজাসুজি বলে,

“না... ও আমার ওয়াইফ না।”

​কথাটা শোনামাত্র অন্তিকের হাতটা আলগা হয়ে আসে অহীনের পিঠ থেকে। আকাশ তখনো অহীনের ছলছল চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। ও অবিশ্বাস্য গলায় অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করে,

“এটা কোনো প্র্যাঙ্ক?”

​আশা মাথা নিচু করে আকাশের সামনে এসে একদম নরম গলায় বলে,

“স... সরি আব্বু, এটা কোনো প্র্যাঙ্ক না। অহীন আর...”

​কথাটা শেষও করতে পারল না ও। আশার নরম গালে ঠাস করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে গর্জে উঠে আকাশ,

“চুপ! একটা কথাও বলবি না তুই! অহীন, তুই বল এটা একটা প্র্যাঙ্ক, তাই না?”

​অহীন দুদিকে মাথা নাড়ে,,

“না ছোট বাবা, এটা প্র্যাঙ্ক না। আমি ওকে ছেড়ে দিয়েছি।”

​মুহূর্তের মধ্যে আকাশ এগিয়ে গিয়ে অহীনের শার্টের কলার চেপে ধরে। রাগে লোকটা একদম হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। ও তো অহীনকে বড্ড ভরসা করে নিজের কলিজার টুকরো মেয়েটাকে ওর হাতে তুলে দিয়েছিল! আর এই ছেলে আজ এত সহজে বলছে ছেড়ে দিয়েছে?

​আকাশের এই মারমুখী থাবা থেকে অন্তিক জোর করে ধাক্কা দিয়ে আকাশকে সরিয়ে দিয়েদ, মুক্ত করে অহীনকে। চিৎকার করে বলে,

“একপাক্ষিক জাজমেন্ট কোন সাহসে করছিস তুই? ওর গায়ে হাত তোলার সাহস তোকে কে দিয়েছে? আগে জেনে নে কী হয়েছে, কেন হয়েছে! কারণ একটা কথা মাথায় রাখিস আকাশ, অহীন আশাকে ভালোবাসত, ওয়ান-সাইডেড লাভ ছিল ওটা! আশা ওকে কোনোদিন চায়নি, ও নিজেই সবসময় ডিভোর্স চাইত!”

​দূর থেকে অন্তিহা পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে সব দেখছে। এতগুলো বছরে ও লাইফে অনেক প্রবলেম ফেস করেছে, অনেক চড়াই-উতরাই, তর্ক-বিতর্ক দেখেছে। কিন্তু নিজের বাবা আর চাচার মাঝে এমন ভয়ঙ্কর ঝামেলা ও কোনোদিন দেখেনি। যত ঝামেলাই হোক না কেন, আকাশ আর অন্তিকের বন্ডিংটা ছিল সবসময় ভীষণ স্ট্রং আর মজবুত। অথচ আজকে যেন সব ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে!

​অন্তিহা এবার পুরোপুরি বুঝতে পারে, অহীন কেন এই কথাটা বাড়িতে জানাতে এত ভয় পাচ্ছিল এতগুলো দিন। না জানানোর জন্য অন্তিহা এতক্ষণ অহীনের ওপর যতটা বিরক্ত ছিল, এখন ঠিক ততটাই মায়া হতে লাগল ওর জন্য। কারণ এই মুহূর্তে ঘরের সবাই মিলে কেবল এই একটা মানুষের ওপরই চড়াও হয়ে আছে। কই, আশাকে তো কেউ একটাও কড়া কথা বলছে না! বেশ ক্ষীণ তবে স্পষ্ট গলায় বলে উঠল,

“তোমরা তো সেই কখন থেকে শুধু ভাইয়াকেই ব্লেম করছ! উনি একা কেন সব কৈফিয়ত দেবেন? ফ্রান্স-এ কয়টা দিন শান্তিতে ছিল লোকটা। ফিরতে না ফিরতেই যার যেভাবে ইচ্ছা ওনার ওপর চড়ে বসছ কেন? শি ইজ অলসো রেসপন্সিবল ফর দিস!”

তাশা বরাবরই ভীষণ চুপচাপ স্বভাবের মানুষ। আকাশ যেখানে উপস্থিত থাকে, সেখানে সে নিজেকে সবসময় শান্ত রাখতেই পছন্দ করে। তবে আজকের পরিস্থিতি দেখে সে আর চুপ থাকতে পারছে না, কিছুটা নরম গলায় জিজ্ঞেস করে,

“সবকিছুর তো একটা রিজন থাকে। আশা, তুই কি বলবি আসলে কী হয়েছে? অহীন বিনা কারনে এমন কিছু করবে এটা সত্যি ভাবায় আমাদের।

​আশা চোখ মুছে মাথা দোলায়। ও দুটো কথা বলার জন্য যেই না মুখ খুলেছে, অমনি আবার ওর গালে ঠাস করে একটা থাপ্পড় পড়ে! একটি থাপ্পড় সামলে ওঠার আগেই আকাশ দ্বিতীয় থাপ্পড়টা মারার জন্য অপর গালে হাত তুলতে যায়, । অহীন ঝড়ের বেগে এসে নিজের প্রেয়সীকে বুকের মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, ফলে আকাশের দ্বিতীয় থাপ্পড়টা সজোরে এসে পড়ে অহীনের পিঠের ওপর। অহীন বেশ ভরকানো আর উত্তেজিত গলায় বলে উঠল,

“বারবার ওর গায়ে হাত তুলছ কেন তুমি? হোয়াই আর ইউ হিটিং হার এগেইন অ্যান্ড এগেইন?”

​আকাশ এবার একটা শীতল, তাচ্ছিল্যের হসি দেয় । অহীন সোজা হয়ে দাঁড়াতেই আকাশ ওকে ধাক্কা দিয়ে বেশ খানিকটা দূরে সরায়। তারপর অত্যন্ত তীক্ষ্ণ আর ধারালো গলায় বলল,

“ আমার মেয়ে এখন তোমার কেউ না। আমি ওকে নিয়ে যা ইচ্ছা করব, তাতে তোমার কী? তুমি কে আমার মেয়েকে এভাবে জড়িয়ে ধরার? কোন অধিকারে ধরলে এভাবে? জাস্ট কিপ ইওর ডিস্টেন্স! ওকে?”

এক্স্যাক্টলি এই কথাটা সবচাইতে বেশি শুধু অহীনের নয়, বরং আশার বুকেও তীরের মতো গিয়ে বিঁধছে। 'অধিকার নেই!' এই দুটো শব্দ যেন ওদের পুরো পৃথিবীটাকে এক নিমেষে ওলটপালট করে দিচ্ছে।

এই মুহূর্তে ঘরের প্রতিটা চোখ অহীনের দিকেই নিবদ্ধ। এমনকি আশাও নিষ্পলক চোখে অহীনকে দেখছে। ওর মাথাটা ভনভন করছে, চারপাশের কথাগুলো সব আবছা হয়ে আসছে। ও আর সহ্য করতে না পেরে একটু এগিয়ে গিয়ে কিছু একটা বলতে চায়, “আমি...।”

​কিন্তু কথা আর মুখ দিয়ে বেরোল না। মাথাটা ঘুরে ও ধপ করে নিচে পড়ে যায়। ও পুরোপুরি সেন্সলেস হয়নি, কিন্তু ওর মস্তিষ্কে আর কোনো কাজ করছে না। আকাশ ঝটপট ঝুঁকে গিয়ে আশাকে দুই হাতে আগলে ধরে তুলে নেয়। মেয়েটা তখনো আধবোজা, নিভু নিভু চোখে অহীনের দিকেই তাকিয়ে আছে।

অহীন আগাতে নিতে আকাশ নিজের রক্তিম, ভেজা চোখে তার দিকে তাকায়। কঠিন গলায় বলে,

“আগাবে না।”

_____________

বাড়িতে অন্তিকের কক্ষে তখন এক থমথমে পরিবেশ। সবাই চুপচাপ বসে আছে, আর তাদের সামনেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে অহীন। ওর কিছু বলার নেই, আসলে এই পরিস্থিতিতে বলার মতো কোনো ভাষাই অবশিষ্ট নেই। পরিস্থিতি কিছুটা থিতিয়ে আসতেই অন্তিক বেশ গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করে,

“ডিভোর্সটা কবে হয়েছে? আর তোমরা এতদিন বাড়িতে কাউকে জানাওনি কেন?”

​অহীন একটা শুকনো ঢোক গিলে বলে,

“মাস খানেক হয়েছে।”

​“কিন্তু কেন করলে এমনটা? রিজন কী?”

​অহীন একদম নিচু গলায় বলে,

“তেমন সিরিয়াস কিছুই না। পুরোদিন কাজ করতাম তো, ওখান থেকেই একধরনের ফ্রাস্ট্রেশন তৈরি হয়েছে। আর এমনিতেও... আই ডোন্ট লাইক হার অ্যানিমোর। ভালোবাসা ততদিনই সুন্দর লাগত, যতদিন ও দূরে ছিল। ওর প্রতি এখন আর কিছু ফিল হয় না আমার।”

​কথাটা শেষ হতে না হতেই মাঝখান থেকে অন্তিহা বেশ কড়া সুরে বলে উঠে,

“কেন মিথ্যে কথা বলছেন আপনি? কিছু কিছু ক্ষেত্রে দুজনকে সমানভাবে সিচুয়েশন হ্যান্ডেল করতে হয়। আপনি একা কেন ব্লেম নিচ্ছেন? হোয়াই আর ইউ সেভিং হার?”

​“তুই কি তখন ওখানে ছিলি?”

অহীন সঙ্গে সঙ্গে অন্তিহাকে ধমকে উঠে। ওর এমন রুক্ষ প্রশ্নে অন্তিহা এক নিমেষে চুপসে যায়। অহীন ফের বলল,

“যদি উপস্থিত না থাকিস, তাহলে জানলি কেমন করে? নিজের চোখে যখন কিছু দেখিসনি, সো জাস্ট শাট আপ।”

​কুহু এবার অহীনের দিকে এগিয়ে এসে তীক্ষ্ণ চোখে তাকায়,

“ফ্রাস্ট্রেশন? ইউ ডোন্ট ফিল ফর হার? তাই?”

​মায়ের সঙ্গে চোখাচোখি হওয়ার উপক্রম হতেই ও চোখ সরিয়ে নিয়েছে, নিচে তাকিয়ে চোখ ফেরায়। কুহুর চোখের দিকে তাকানোর সাহস এই মুহূর্তে ওর নেই। ও খুব ভালো করেই জানে, মায়ের ওই তীক্ষ্ণ আর চতুর চোখ কত সহজে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য ধরে ফেলতে পারে। কুহু এবার অন্তিকের দিকে তাকিয়ে বেশ ক্ষীন কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,

“অন্তিক, ভুল অহীন নিজেই স্বীকার করছে। আর আশার বিহেভিয়ার দেখেও আজ স্পষ্ট যে ও অহীনকে চায় না। নয়ত এতকিছুর পর আশা চুপ থাকত না। সো, অহীনকে আবার ফ্রান্সে পাঠিয়ে দাও। আর আশা...।”

​একটু থেমে কুহু আবার অহীনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আশার বিষয়ে এই বাড়িতে আর কোনো কথা হবে না। ওর মা-বাবা আছে, তারা যা ডিসিশন নেবেন, সেটাই ফাইনাল।”

​অহীন এবার আস্তে করে সুধায়,

“আমি কি আর কিছুদিন এখানে থাকতে....।”

​“তুমি কি দেখোনি আজকে তোমার বাবা আর চাচার মধ্যে কেমন তর্ক হলো?” কুহু ওর কথা কেড়ে নিয়ে বলে ওঠে, “আমি আমার লাইফে এই প্রথম ওনাদের মাঝে এতটা অমলিনতা আর দূরত্ব দেখেছি, অহীন। সো, প্লিজ আর কোনো ঝামেলা বাড়িও না।”

​ দরজার কাছ থেকেযেতে যেতে অন্তিহা বেশ শ্লেষাত্মক গলায় বলতে থাকে, “গলায় একটা ‘আশা’ নামের ন্যাকা তজবি ঝুলিয়ে দাও । দেখবে ঠিক চলে যাবে!”

​অহীন সেদিকে তাকায়। ওর বিরক্তি তখন সপ্ত আকাশে গিয়ে ঠেকেছে। অবশ্য অন্তিহা সেখানে আর দাঁড়ায় নি, সোজা চলে গেল নিজের কক্ষে।

​বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ওর ফোনে টুংটাং করে মেসেজের নোটিফিকেশন বাজে, ফোন তুলতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠে সাফওয়ানের মেসেজ

‘মিস, আমার নতুন বাড়িটা দেখতে চান না? ভিডিও কল দেই?’

​অন্তিহা মৃদু হেসে টাইপ করে,

‘এত বড় একটা অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়ে দেওয়ার পর আপনাকে পুলিশ এখনো অ্যারেস্ট করেনি?’

​ওপাশ থেকে ঝটপট রিপ্লাই আসে, যেনো প্রস্তুত ছিলো সাফওয়ান,,

‘হেই, টাকা থাকলে এমন পুলিশ পেছনের পকেটে নিয়ে ঘোরা যায়! শুধু পাওয়া যায় না অন্তিহা নামের এক নিষ্ঠুর নারীর মন।’

​অন্তিহা একটু ভেবে লিখে,

“আপনি চাইলে আমার ফ্রেন্ড হতে পারেন। খুব ভালো একটা বন্ধু।”

​“এত কিছুর পর জাস্ট ফ্রেন্ড? ওটা একটু বেশি সামান্য হয়ে যায় না? লেভেলটা একটু বাড়িয়ে দিন প্লিজ!”

​“লেভেল বাড়ানো যাবে না। বন্ধু হলে হন, না হলে কিচ্ছু হওয়ার দরকার নেই। বাই!”

​অন্তিহা চ্যাট অফ করে ফোনটা রাখার তাগিদ দিতেই ওপাশ থেকে হতবুদ্ধির মতো সাফওয়ান তড়িঘড়ি করে লিখে পাঠায়,,

“হব হব! বন্ধুই হব! আপনার জীবনের সবচেয়ে কাছের, আপন, পাশের বন্ধু। ‘তুমি বন্ধু দু’চোখে আমাকে জড়াও’?”🤗😇

মেসেজের শেষের ওই দুটো ইমোজি দেখে অন্তিহার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠেছে। অনেকক্ষণ ও চুপচাপ থেকে, স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কী যেন লিখছে, কিন্তু সেন্ড বাটনে আঙুলটা আর নিতে পারছে না। এতক্ষণ ধরে অন্তিহার টাইপিং স্ট্যাটাস দেখে সাফওয়ান ধৈর্য না ধরে মেসেজ করে,,,

“এত বড় প্যারাগ্রাফ না লিখে একটা ভিডিও কল দিলে হয় না?”

​অন্তিহা সঙ্গে সঙ্গে টাইপ করে, “মজার বিষয় কি জানেন?”

​সাফওয়ান পাল্টা প্রশ্ন করল, “ এত সময় নিয়ে এটা লিখলেন? কী?”

​অন্তিহা একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে লিখল, “আপনার মতো করে এভাবে আমাকে প্রায়োরিটি আজ পর্যন্ত কেউ দেয়নি।”

​সাফওয়ানের উত্তর আসে,

“🤣🤣🤣🤣🤣🤣🤣।”

​এতগুলো হাসি দেখে অন্তিহার মেজাজ মুহূর্তেই চড়ে যায় মাথায়। ও দ্রুত টাইপ করে,

“হা হা দিচ্ছেন কেন? হাসার মতো কী বলেছি আমি? 🙄”

​“না মানে, আপনি তো বললেন ‘মজার বিষয়’, তাই...” 🙂

​ “আপনার লাইফে সিরিয়াস হওয়া দরকার, অসভ্য লোক!”

​“আমি সিরিয়াস হচ্ছি না, তাতেই তো আপনি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। আমি যদি সত্যিই সিরিয়াস হয়ে যাই, তখন সামলাতে পারবেন তো?”

​অন্তিহা যেন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে নিয়েছে, সাফওয়ানের এসব কথার আর কোনো উত্তর সে দেবে না। ফোনটা সাইলেন্ট করে ও বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে পরে সে। লোকটা সত্যি পাগল। কে জানে কখন কি করে বসে?

“ইয়া রব।”

চলবে.......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন