#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ৫০
শিকদার বাড়ির সবার সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভ্যাস এবারও অক্ষুণ্ণ। অন্তিকের বাড়িতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আশা ও অহীন। আগামী দু'দিন পর অহীন ফ্রান্সের পথে রওনা হবে, কিন্তু এই সময়টুকুতেও আশার সঙ্গে তার কোনো কথা হয়নি, বরং কেউই উদ্যোগী হয়নি কথোপকথনের।
আকাশের মুখে বিষণ্নতার ছায়া। সে গভীর শ্বাস নিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ক্ষীণস্বরে বলে
"আই অ্যাম সরি, অন্তিক। সেদিন পরিস্থিতি এতটাই বিশৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল যে আমি নিজেও বুঝতে পারিনি কী করব!"
অন্তিক ভাইয়ের হাতে হাত রেখে সান্ত্বনা দেয়,
"আশার জায়গায় অন্তু থাকলেও তো এরকমই প্রতিক্রিয়া দেখাতাম। আর অহীন নিজেই বারবার স্বীকার করছে তার দোষ,তাহলে তাকে দোষারোপ করতেই তো হয়।"
"কিন্তু দোষ তো দু'জনেরই,"
উপস্থিত সবাই একসঙ্গে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তাঁরা অবশ্য অজানা নয়, কুহুকে জেইন আগেই সব খুলে বলেছে। কুহু আশার প্রতি কিছুটা অভিমানী হলেও মুখ খোলে না, কারণ তার ছেলে তো আশা নিয়ে কারও সঙ্গে কোনো আলোচনাই করতে দেয় না, বরং কেউ কিছু বললে তাকেই ঝাঁঝিয়ে ওঠে। মেয়েটাকে বাঁচিয়ে বাচিয়ে রাখে সবার রুষ্টুতা থেকে। এতে শুধু কুহু নয়, আকাশও মেয়েকে নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।
কুহু কিছুক্ষণ থেমে গলা খাঁকিয়ে বলেন,
"লিজা আপু জানার পর থেকেই বলছে, ইদ্দত শেষ হলেই আয়াশের সঙ্গে আশার বিয়ে দেওয়া হোক। আর এত সব ঘটনার পর তো সেটা বোঝাই যায় আয়াশ এখনো আশাকে ভালোবাসে।"
তাশা অবাক হয়ে বলেন,
"এটা কী কথা কুহু! সবে মেয়েটা এক কঠিন সময় পার করে এসেছে, আবার জোর করে বিয়ে দিয়ে দেব? তাকে তো সময় দিতে হবে নিজেকে সামলানোর!"
কুহু কঠোর গলায় বলে,
"আমি জোর করতে বলছি না। যে মেয়েটাকে নিজের সন্তানের চেয়েও বেশি আদর করে বড় করেছি, তার মন্দ কখনো চাইব না। কিন্তু তোমাদের উচিত আমার ছেলের দিকটাও দেখা। অহীন পাগলের মতো একটাই কথা বলে, ওর কাছে যাব, কিন্তু কথা বলব না, শুধু পাশে থাকতে চাই। তোমার মতো আমিও মা তোমার মতো আমিও সন্তানের ভালোই চাই।”
আকাশ নীরবে মাথা নিচু করে বসে। তাশা কুহুর দিকে তাকিয়ে, অহীনকে তো সে-ও ভালোবাসে, তাহলে কুহু কীভাবে নিজের ছেলেকে পর করে দিচ্ছে? মায়েরা কি সত্যিই বদলে যায়?
আকাশ কঠিন সুরে বলে,
"একটা ডিভোর্সি মেয়েকে আয়াশের ঘরে তুলে দেওয়ার মতোই মনে হচ্ছে সবকিছু।"
কুহু সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দেয়,
"একদম না। ডিভোর্সের আগে যখন তারা এসেছিল, তখন আয়াশ আসেনি, কারণ সে জানত আশা বিবাহিত। এখন তো ডিভোর্স হয়ে গেছে,তাহলে কেন আসলো পেছে? ভেবে দেখেছেন? প্রতিদিন কোনো-না-কোনো অজুহাতে আপনাদের বাড়িতে ওর আসা-যাওয়া লেগেই আছে। এতেই তো তিতু ভাইয়া আর লিজা আপু নতুন করে আশাবাদী হয়েছেন। আর ওনারা চান আয়াশ যদি এভাবেই আশাকে চায় তাহলে দিয়ে দিক। দুজন ভালো থাকবে।"
আকাশ অন্তিকের দিকে ফিরে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করে,
"আর আশা? সে কি এত সহজে রাজি হবে?"
কুহু বলে,
"আশা এখনো জানে না জেসির আর তাইয়ের সম্পর্কে। ওকে জানিয়ে দিও জেসির সঙ্গেই অহীনের বিয়ে হবে। আশা এমনিতেও আমার ছেলেকে বিশ্বাস করে না, দেখবে জেসির প্রসংগ আসতেই রাজি হয়ে যাবে।”
—
রাতের প্রহর গভীর। আকাশ যখন বাড়ি ফিরল, ড্রইংরুমে ঘাপটি মেরে বসে ছিল আশা চোখের নিচে কালি জমা, মুখশ্রীতে ক্লান্তির ছাপ। তাশা হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে যায় মেয়ের কাছে। আশা মায়ের গায়ের ওপর হেলে পড়েছে , ফাঁকা বাড়িতে একা প্রচুর কেঁদেছে, তাতে স্পষ্ট ধরাই যাচ্ছে। আকাশ কাছে গিয়ে কপালে হাত রাখে, জ্বর নেই, অসুস্থও মনে হচ্ছে না। মেয়েটা মায়ের বুকে মুখ গুঁজে অস্ফুটস্বরে বলে উঠে,
“অহীনকে ফ্রান্স পাঠিয়ে দিচ্ছ কেন? সারাজীবন তো দূরেই কাটালো, তাহলে আমার ভুলের শাস্তি সে কেন পাচ্ছে?”
আকাশ মেয়ের কথায় স্তব্ধ হয়। কিছুক্ষণ নিরবে থেকে বলল,
“শাস্তি? কিসের শাস্তির কথা বলছ তুমি? সে তো শাস্তি পেয়েছে তখনই, যখন তোমার পক্ষ নিয়েছে আর নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষটাকে তুমি কষ্ট দিয়েছো জেনেও তোমাকেই প্রথম বানিয়ে নিয়েছিল। তোমার থেকে দূরে থাকা তো ওর জন্য সবচেয়ে বেশি শান্তির হওয়ার কথা।”
“আমি পাপিকে সরি বলব। পাপি কি ওর ওপর রেগে আছে?”
“না, সৃজন কারও ওপর রেগে থাকে না। অহীনের ওপরও না। তাই তো এত রিল্যাক্স থাকতে ও ভয় পায় না। যাই হোক, তাদের মাঝে আর তোমার কোনো কথা নেই, মিটে যাবে, জেসির সঙ্গে বিয়ের পর।”
আকাশের স্পষ্ট কথাগুলো যেন আধো-আধো শুনল আশা। অস্ফুটে জিজ্ঞেস করল,
“হুম?”
আশার মায়ের বুক থেকে মাথা তুলে সে বাবার দিকে তাকায় চোখে কৌতূহল আর বিস্ময়। যেন এই মুহূর্তেই আকাশ বলে উঠবে, ‘ইস, ভুল বললাম’। কিন্তু তা হলো না। বরং আকাশ আরও স্পষ্ট করে বলল,
“হুম, জেসির বিয়ে ওর সন্তানের দিক বিবেচনা করে করতেই হবে। আর তিতাশের সঙ্গে কথা হয়েছে। আগামিকাল আয়াশ আসবে। তুমি রাজি হলে বলে নিও, ওর সঙ্গেই তোমার বিয়ে হবে।”
আশা যেন পাথরের মূর্তি। নড়তে পারে না। জেসির বিয়ে? আয়াশের সঙ্গে নিজের বিয়ে? সে কি ঠিক শুনছে, নাকি অহীনকে হারানোর শোকে উল্টোপাল্টা শুনছে? অস্বাভাবিক কণ্ঠে বলে,
“অহীন করুক না হয় যাকে তাকে বিয়ে। এর সঙ্গে আমার বিয়ের কী সম্পর্ক? আর আয়াশই বা কেন?”
“কারণ আয়াশের তোমার প্রতি অনুভূতি আছে। ওর পরিবার তোমাকে চায়। আর অহীন, সেও বাঁচার অধিকারী, সুখে থাকার অধিকার রাখে। তোমাকে দু’জন মানুষ পাগলের মতো ভালোবেসেছে। তুমি একজনকে ধ্বংসস্তুপের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছ। এখন তাকে গুছিয়ে নিতে হলেও অপরজনকে কাছে টানা উচিত যেন অহীন আর কখনো তোমার জন্য আফসোস না করে।”
আশা শুকনো ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে নিল। আকাশের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিছু ভাবছে। তার ভাবনার মাঝেই তাশা ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“করবে তুমি আয়াশকে বিয়ে?”
আশা মায়ের দিকে তাকায়। তারপর বলে,
“আয়াশ কী চায়?”
তাশা আর আকাশ একে অপরের দিকে চাইল। আকাশ বলল,
“ওকে জিজ্ঞেস করা হয়নি।”
“জিজ্ঞেস করতে হবে না। আমি কথা বলে নেব। আমি রাজি।”
‘রাজি’ কথাটা আকাশকে যেন বুকের মধ্যে কোথাও একটা আঘাত করছে। মেয়ের ওপর থেকে তাঁর সম্পূর্ণ আস্থা ভেঙে গিয়েছে। সে নিজের মেয়েকে চেনে বলে মনে করত এতকাল, তাশার সঙ্গে তর্কে করেছে কিছুক্ষণ আগেও যে আশা রাজি হবে না। আশা উদাসীন হলেও অহীনকে ভালোবাসে, যদিও তা অপ্রকাশিত। কিন্তু আশা একবাক্যে রাজি হয়ে গেল? তাহলে কি সে নিজের মেয়েকেই বুঝতে ভুল করেছে? যে বাবা সারাজীবন মেয়েকে আগলে রেখেছে, সে কি তবে তারই মন বুঝতে ব্যর্থ হলো?
আফসোসের কড়ি গুনতে গুনতে আজ রাত শেষ হবে কিনা জানা নেই। কারণ সে নিজের ওপর আর অহীনের ওপরও আস্থা রেখেছিল, আশা অহীনকে ভালোবাসবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সবটাই শুরু থেকে চাপিয়ে দেওয়া।
____
আগামীকালই অহীন চলে যাবে। অথচ আশা বরাবরের মতোই উদাসীন ভঙ্গিতে চলাফেরা করছে, যেন নিজের জীবনের প্রতিই তার কোনো দায় নেই, নেই অহীন কিংবা নিজের বাবার ভালোবাসার কোনো মূল্য।
বারান্দায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে সে। গতকাল অহীন এসেছিল। নিজের ঘর থেকেই স্পষ্ট শুনেছে আকাশের কাছে অহীনের ব্যাকুল কণ্ঠে করা মিনতিগুলো শুধু একবার আশার সঙ্গে দেখা করার জন্য। কিন্তু পাষাণ ছিল তার বাবা। মেয়ের সঙ্গে দেখা তো দূরের কথা, একবার চোখের দেখাও হতে দেয়নি। সেই মুহূর্তগুলোর কথা মনে পড়তেই বারবার মোচড় দিয়ে উঠছে তার কলিজা।
নিচে এসে থামল একটি খুব পরিচিত গাড়ি। সেখান থেকে নেমে প্রবল বিরক্তি নিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করছে আয়াশ। তাকে দেখে শীতল এক হাসি ফুটে আশার ঠোঁটে।
নিচ থেকে ভেসে আসছে হালকা কথাবার্তার শব্দ। কিছুক্ষণ পরই সিঁড়ি বেয়ে ধপধপ শব্দ তুলে ওপরে উঠে আসছে কেউ। দরজায় নক করলেও ফিরে তাকাল না আশা। কোনো উত্তর না পেয়ে অনুমতি ছাড়াই ভেতরে ঢুকে সরাসরি বারান্দায় চলে আসে আয়াশ।
গভীর, শীতল দৃষ্টিতে একবার আপাদমস্তক দেখে নিল পুতুলকে। আশার সামনে নিজের বিরক্তি কখনোই প্রকাশ করতে চায় না সে। তাই খুব নরম গলায় বলল,
“কী হচ্ছে, পুতুল?”
আশা ধীরস্বরে বলল,
“কী হচ্ছে মানে? একটা সময় তো আমাকে নিয়ে প্রচুর পাগলামি করেছিলেন। হঠাৎ সেসব কোথায় হারিয়ে গেল, আয়াশ?”
খোঁচা দেওয়া কথাটায় মুহূর্তের জন্য বিরক্ত হলেও নিজেকে সামলে নিল আয়াশ।
“আমি পাগলামি করেছি, সেটা অস্বীকার করছি না। তবে তোমার কি মনে হয় না আমি মুভ অন করেছি? আর আমি...”
বলতে বলতেই থেমে গেল সে নিজ থেকেই, মুহূর্তেই প্রসঙ্গ বদলে নরম স্বরে বলল,
“সরি... কিন্তু তোমার কী হয়েছে? আমাকে বলবে?”
আশা মৃদু হাসে। সেই হাসির আড়ালেও কষ্ট স্পষ্ট।
“আমি অহীনকে ভালোবাসি। হ্যাঁ, আপনার প্রতি হয়তো যে অনুভূতিগুলো ছিল, অহীন আমার জীবনে আসার পর সেগুলো মুছে গেছে। কিন্তু অহীনের প্রতি আমার অনুভূতিগুলো আমি কখনো মুছে যেতে দিতে চাই না। আমি চাই না, একদিন আপনার মতো সেও বলুক তার আর কোনো অনুভূতি নেই। আমি আমৃত্যু শুনতে চাই, অহীন তার বেয়াদব পেচির জন্য আজও উন্মাদ।”
অবিশ্বাসে আশার দিকে তাকায় আয়াশ। এ কি সেই মেয়ে, যাকে একসময় অহীনের সঙ্গে থাকার জন্য নানাভাবে বোঝাতে হয়েছিল?
রমণীর গাল আর চোখ ফুলে আছে। নিজেকে যতই শক্ত দেখানোর চেষ্টা করুক, অনিদ্রা আর কান্নার ছাপ আয়াশের চোখ এড়াল না।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে জিজ্ঞেস করল,
“এসবের মাঝে বিয়ের বিষয়টা কেন আসছে? আর বারবার আমাকে কেন টেনে আনছ?”
আশা ধীরে মুখ ফিরিয়ে করুণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল।
“কারণ সবাই ভাবে... আপনি এখনো আমাকে ভালোবাসেন।”
আয়াশ শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
"But I'm not. And you absolutely know that.”
মুচকি হাসে আশা। আয়াশের শার্টের ওপর দিয়ে এক আঙুল দিয়ে তার বুকে আলতো চাপ দিল, যেন হালকা ধাক্কা। তারপর বেশ রসিকতার সুরে বলে,
“জানি, জানি, সব জানি। আপনি এখন আমার বেস্টির দিকেই নজর দিয়েছেন। বাট আয়াশ, আপনি ওর ডার্ক সাইডগুলো জানেন না। সইতে পারবেন না কিন্তু!”
আশার কথায় হতবিহ্বল হয়ে গেল ছেলেটা। কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন প্রতিক্রিয়া দিতেই ভুলে গিয়েছে। ফর্সা গালজুড়ে এবার বিরক্তির ছাপ ফুটছে। এসব বিষয়ে আলোচনা করতে সে মোটেও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে না। সবকিছুর পরও আশা তার এক্স।
“পয়েন্টে আসো।”
ফিক করে হেসে ফেলে আশা। মাথা নেড়ে নিজের হাসি থামিয়ে মুহূর্তেই মুখটা গম্ভীর করে বলল,
“রাজি হয়ে যান, আয়াশ। আই প্রমিজ, আমি আপনাকে বিয়ে করব না।”
“হোয়াট?”
“হুম। আপনি রাজি না হলে অন্য কোনো অচেনা মানুষের সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক হবে। তারপর শেষ মুহূর্তে আগের বারের মতোই বাড়ির সম্মান নষ্ট হবে। কিন্তু আমিতো বিয়ে করতে চাই না।”
বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে উঠে আয়াশ।
“বিয়ে করতে না চাইলে চাচ্চুকে বলো। তাহলেই তো হয়। এসব নাটক করার কোনো মানে হয় না।”
আশা নতমুখে বলল,
“আমি রাজি না হলে অহীন ফ্রান্স ফিরবে না। আর এবার আমি আব্বুর কথাটা রাখতে চাই। হ্যাঁ, হয়তো আমার পরিকল্পনা ভিন্ন। তবুও আমি আমার মা আর বাবার চোখে অন্তত একটু স্বস্তি দেখতে চাই।”
আয়াশ ঠোঁট ফাঁক করে কিছু বলার আগেই আশা আবার বলে উঠে,
“আমি কথা দিচ্ছি, আয়াশ। আমাকে আপনাকে বিয়ে করতে হবে না। জাস্ট বসবেন। আপনাকে আমার জন্য ‘কবুল’ শব্দটাও উচ্চারণ করতে হবে না। তার আগেই আমি সব ঠিক করে দেব। অহীনও চলে যাবে।”
আয়াশ অসহায় গলায় বলল,
“পুতুল, বোঝার চেষ্টা করো। আমাকে ও এমনিতেই পছন্দ করে না। তার ওপর এসব করলে ওর চোখে আমার প্রতি যে সামান্য সম্মান আছে, সেটুকুও নষ্ট হয়ে যাবে।”
“ও আপনাকে ভালোবাসে। আর ও নিজের অনুভূতির প্রতি ভীষণ আস্থাবান। এত সহজে ওর অনুভূতি নষ্ট হবে না। প্লিজ, আয়াশ!”
“আমাকে... ভালোবাসে?”
আশা ওপর-নিচ মাথা দোলায়।
কথাটা শুনে আয়াশের ফর্সা গাল দুটো লাল হয়ে উঠছে এবার। গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“ওকে... আমি রাজি। বাট রিমেম্বার, ইট’স জাস্ট অ্যাক্টিং। শেষ মুহূর্তে, দয়া করে হলেও, আমি ‘কবুল’ বলব না।”
এক গাল হেসে উঠে আশা। আয়াশের লাল হয়ে থাকা দুই গাল জোরে টেনে দিয়ে বলল,
“থ্যাংক ইউ! আর খাবার খেয়ে যাবেন কিন্তু... এক্স অ্যান্ড প্রেজেন্ট ফিয়ঁসে।”
_______
সকালের ফ্লাইট অহীনের। এখন প্রায় গভীর রাত। শিকদার বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে। শত-সহস্র মাইলের দূরত্বের কথা ভাবতেই বারবার শরীর কেঁপে উঠছে তার।
একনজর তাকিয়ে আছে আশার রুমের দিকে। না, কেউ নেই। হঠাৎ ছাদে কিছুর নড়াচড়ার আভাস পেয়ে ওপরে তাকাল সে। সাদা ওড়নাটা বাতাসে উড়ছে। আজ আকাশে চাঁদ নেই, শুধু কালো মেঘের আনাগোনা। হালকা বিদ্যুৎ চমকাতেই প্রেয়সীর মুখটা ভেসে উঠে তার সামনে। তার দিকেই তাকিয়ে আশা। কিন্তু এভাবে দেখলেই কি আর মন ভরে?
অহীন ছুটে গিয়ে কলিং বেল চাপে। দরজা খুলে দিল তাশা। অহীন ঝাঁপিয়ে পড়ে তাশার হাত ধরে।
“প্লিজ, সুইটহার্ট। ছোট বাবাকে বলে দিয়ো না। আমি জাস্ট টেন মিনিট কথা বলে চলে যাব। প্রমিজ।”
বলেই তাশার কোনো উত্তর শোনার অপেক্ষা না করে সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে ওপরে উঠে গেল। হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়েই রইল তাশা।
ভেতর থেকে আকাশের ডাক ভেসে আসে,,
“তাশু...?”
“আসছিইইই।”
ছাদের সিঁড়ি বেয়ে সোজা ওপরে উঠে চিলেকোঠার ঘরটা পার হতেই তার পায়ের গতি ধীর হয়ে আসছে। সাদা ওড়নাটা বাতাসে উড়ছে আশার। শুধু পেছন থেকে দেখেই অহীনের বুঝতে অসুবিধা হলো না, অতিরিক্ত অনাহারে থেকে তার পেচি অনেকটা ওজন কমিয়ে ফেলেছে।
ধীরে ধীরে এগোতে এগোতে হাসিমুখে বলল,
“ডায়েট করিস নাকি, পেচি?”
তার কণ্ঠ শুনে হালকা হাসে আশা,
“হুম, তা তো করি। একটু শরীরচর্চা না করলে স্বামীর মন পাব?”
“ইসস... এভাবে যদি আমার জন্য করতি!”
কথাটা শেষ হতেই আশা ঘুরে তাকায় তার দিকে।
যথাস্থানে থমকে গেল অহীন। গলার কাছে এসে কথাগুলো দলা পাকিয়ে আটকে যাচ্ছে। তার পেচিকে আজ অসম্ভব সুন্দর লাগছে। ঠোঁটে হালকা লিপস্টিকের প্রলেপ, চোখে কাজল, কপালে ছোট্ট একটা টিপ—যদিও সেটা একটু বাঁকা।
ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সে জিজ্ঞেস করে,
“কার জন্য এত সাজা হলো এত রাতে?”
অহীন ভেবেই নিয়েছে আশা তার নাম নেবে না। অন্য কিছু বলে এড়িয়ে যাবে। কিন্তু তাকে ভুল প্রমাণ করে আশা মুচকি হেসে বলল,
“আপনার জন্য, পিঙ্কিস কুত্তা...”
তার কথায় হেসে ফেলল অহীন। অথচ চোখ দুটো জ্বলছে। ভাবতেই বুকটা ভেঙে যাচ্ছে, হয়তো এটাই তাদের শেষ দেখা।
ছাদের এক কোণে পাশাপাশি পা ঝুলিয়ে বসে রইল দুজন। অহীন দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। দুজনেই চুপ। কারও মুখে কোনো কথা নেই। শুধু গভীরভাবে অনুভব করছে একে-অপরের উপস্থিতি।
নীরবতা ভাঙল অহীন।
“জানতি আমি আসব?”
আশা আঙুল তুলে ছাদের এক কোণ দেখাল। বিদ্যুৎ চমকাতেই লম্বা একটা দড়ি চোখে পড়ল।
“রোজ আসো। আজ দরজা দিয়ে আসতে না দিলে ওইটা দিয়ে টেনে তুলতাম।”
কাতর হেসে অহীন মাথাটা কাত করে আশার কাঁধে এলিয়ে দেয়, অপ্রস্তুত হয়ে শিউরে উঠলেও মানুষটাকে সরিয়ে দিল না আশা। বরং অহীনের বাহুটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
অহীন মৃদুস্বরে ডাকে,
“সোনাহ...”
ডাকটা আশার খুব পরিচিত। অহীন যখনই তার ওপর একটু তুষ্ট হতো, আদর করে তাকে ‘সোনাহ’ বলেই ডাকত। যদিও ‘পেচি’ ডাকটাই তার বেশি প্রিয়।
আশা অস্ফুট স্বরে বলল,
“এভাবে ডেকো না।”
অহীন মাথা তুলে তার দিকে তাকায়, কপালে বাকা টিপটা সোজা করে পরিয়ে দিলো দুহাতে আলতো করে আশার গাল চেপে ধরে, ললাটে ছোট করে ঠোট ছুয়ে দেয়, কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে বলল,
“আমাকে অনেক জ্বালিয়েছিস তুই, সোনাহ। আর কাউকে এভাবে জ্বালাবি না। তুই বড় হয়েছিস। আগের সেই ছোট্ট পেচিটা আর নেই। এখন থেকে একটু বুঝে-শুনে চলতে হবে। আমি রিয়েলি সরি, সোনাহ। তোর বাচ্চামোগুলো আর আমার জন্য নয়। তাই এবার একটু ম্যাচিউর হতে হবে... হুম?”
আশা শুধু মাথা নেড়ে মৃদু স্বরে বলল,
“হুম।”
““চকলেট খাবি?”
বলেই পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে নিজের মুখে পুরে অহীন। মূলত তার সুগার ফল করছে।
এমন সময় বৃষ্টির দু-এক ফোঁটা এসে পড়ে তাদের গায়ে। তবুও বসা থেকে উঠল না কেউ। চকলেটটা মুখে দিয়ে ধীরে ধীরে চুষছে অহীন। আশা আলতো করে মাথাটা তার কাঁধে রেখে বলল,
“পাপিকে আমার হয়ে সরি বলে দিও।”
“আমার পাপি বেস্ট। অতটুকুতে রাগ করে না। তাই চিল...”
দুটো দেহ, যারা একে-অপরের এতটা কাছে থেকেও আজ যেন বহু দূরে। চাইলেই নিজেদের আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া যাচ্ছে না। অহীন পারছে না ওই অধরে হারিয়ে যেতে। আজকের পর থেকে আশার এই সাজটাই হয়তো সে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করবে। পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণিত দৃশ্যের তালিকায় আশার এই অপরূপ সৌন্দর্যকে রাখতে তার একটুও আফসোস হচ্ছে না। কেননা এই সৌন্দর্য তাকে আশার সঙ্গে নিষিদ্ধ কিছুর দিকে আকৃষ্ট করে তুলছে।
আশা এবার আলতো করে মাথাটা অহীনের বুকের ওপর রেখে চোখ বন্ধ করে। বৃষ্টি যেন তাদের এই মুহূর্তটুকু উপভোগ করার সুযোগ করে দিচ্ছে। তাই এসেও ঝরতে পারল না, শুধু বাতাসের সঙ্গে মিশে আছে।
আশার ভারী নিশ্বাসের শব্দ পেয়ে মৃদু হাসে অহীন। এভাবেই সময় কেটে যাচ্ছে। তার পেচি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে, আর সে ভোরের আবছা আলোয় মুখটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে, যেন ভুল করেও কোনোদিন এই মুখটা ভুলে না যায়।
দূরের আকাশে ভোরের আবছা আলো ফুটে উঠছে। নিজের লম্বা আঙুল দিয়ে আশার কপালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো একপাশে সরিয়ে দিল অহীন। মেয়েটার এত ঘুম কিসের, কে জানে! বিয়ের পর তো তাকে ঠিকমতো ঘুমাতেই দেয়নি। হয়তো সেই না-ঘুমোনো রাতগুলোর ঘুমই এখন উসুল করছে।
আনমনে কানের পেছনে চুল সরাতে সরাতে গেয়ে উঠল অহীন,,
“এটা গল্প কার, দেখো পড়ছে কে
ঘুমে রূপকথার দেশে ঘুরছে কে...”
মিষ্টি সুরে চোখ মেলে তাকায় আশা। ঘাড় কাত করে বুঝল, সে অহীনের কোলেই শুয়ে আছে। আশাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হালকা হেসে সে,
“কিছু আবদারের জানি নেই মানে
তোর সঙ্গে আজ আমাকে নে...”
অহীনের কোল থেকে মাথা তুলে বসে আশা। চারপাশ প্রায় ফর্সা হয়ে এসেছে। ঘুমে এখনো ভারী তার চোখ। আর অহীনের চলে যাওয়ার সময়ও হয়ে এসেছে।
অহীন তার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। গুনগুন করে গাইতে থাকে..
“এগিয়ে দে, এগিয়ে দে
দু' এক পা এগিয়ে দে
হাঁটতে চাই কয়েক পা
তোর সাথে...”
আশা উঠে অহীনের হাতটা শক্ত করে ধরে। সে জানে, নিচে তার বাবা-মা জেগে গেছেন। আজকের বিশেষ দিনটির কথা অহীন এখনো জানে না।
হাত ছেড়ে দিয়ে পাশে রাখা মোটা রশিটা অহীনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“এভাবে যাও। আব্বু তোমাকে দেখলে বকা দেবে।”
মোটা রশিটা দেখে আঁতকে উঠে অহীন।
“আমি পড়ে যাব! তার চেয়ে বরং বকাই খাই একটু...”
“পড়বি না, কুত্তা। বকা খাওয়ার এতই শখ হলে গিয়ে বল, তুই ফ্রান্সে যাবি না। তখন ধুয়ে দেবে। আমাকে বকা শুনানোর এত শখ কেন তোর?”
“পেঁচি...”
ঠোঁট উল্টে অসহায় মুখ করল অহীন। আশা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“নামো, তাড়াতাড়ি।”
শেষ পর্যন্ত হাল ছাড়ে বেচারা অহীন নিজ পেচির কাছে, রশি বেয়ে নামতেই রাজি হলো। টানটান রশিতে নিজের ভারী শরীরের ভর দিতেই সেটা কেঁপে উঠে। চোখ-মুখ কুঁচকে গেল তার। শারীরিকভাবে ফিট হলেও এমন বানরের মতো কসরত তার কাছে মোটেও সহজ লাগছে না।
ওকে সাহস দেওয়ার জন্য আশা গেয়ে উঠল—
*“পথ চলতে হাজারো রকম
ওঠাপড়া এসেছে যখন
একা আমি তোকে তখন
আগলে যাই
ঝড়া ঝাপটা মরসুম এলে
ফাঁকা একটু সময় পেলে
তোকে আমি আমার কথাও
বলতে চাই...”*
চলবে.....