#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ৫১
গতকালই অহীন ফ্রান্সে চলে গেছে। আশাকে বারবার অহীনের দোহাই দিয়ে বিয়েতে রাজি করানো হলেও, সত্যিটা হলো আশার বিয়ে সম্পর্কে অহীন সম্পূর্ণ অজ্ঞ। তাই কোনো দ্বিধা বা অস্থিরতা ছাড়াই সে শান্ত মনে দেশ ছেড়ে চলে গেছে। আগামীকাল আশার বিয়ে। সেই উপলক্ষে আজ শিকদার বাড়ির ভেতরটা সুন্দর করে সাজানো হচ্ছে। আগের মতো বিশাল আয়োজন না থাকলেও ঘরোয়া সাজসজ্জায় কোনো ত্রুটি রাখেনি তাশা।
রান্নাঘরে ব্যস্ত তাশা। পেছন থেকে এসে আলতো করে তাকে জড়িয়ে ধরে আশা। মায়ের পিঠে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠতেই কাজের হাত থেমে গেল তাশার। সে ধীরে পেছন ফিরে দুই হাতে মেয়ের মুখটা তুলে নিল।
“কী হয়েছে, আশু? কাঁদছিস কেন? বাবা কিছু বলেছে?”
আশা মাথা নেড়ে না-সূচক ইঙ্গিত করে। হিসহিসে কণ্ঠে শুধু বলল,
“অহীন... সত্যিই জেসিকে বিয়ে করবে?”
প্রশ্নটা শুনে তাশা খানিকটা অপ্রস্তুত হয়। সে আলতো করে আশার এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিল।
কাতর, ভাঙা গলায় আশা আবার বলল,
“ও আমাকে বলেছিল, ভালোবাসে। সেদিন পুরো রাত আমার সঙ্গেই ছিল। খুব বেশি কথা হয়নি, তবে আমি অনুভব করেছিলাম, ও এখনো আমাকে ভালোবাসে। আমি খুব রেগে গিয়েছিলাম, তাই পাপির সঙ্গে উল্টোপাল্টা কথা বলেছিলাম। আমার মিসক্যারেজ হয়েছিল... আমি সেটা সহ্য করতে পারিনি। তারপর যখন প্রচণ্ড অনুশোচনা নিয়ে ওর কাছে ক্ষমা চাইতে গিয়েছিলাম, তখন সবকিছু বদলে গেছে। ও আমাকে হাজারটা বকা দিলেও আমার কষ্ট হতো না। কারণ আমি জানি, মানুষটা আমাকে ভীষণ ভালোবাসে। জেসিকে নিয়েও আমার কোনো সমস্যা হতো না। আমি রাগের মাথায় অহীনকে অনেক কিছু বলেছিলাম ঠিকই, কিন্তু শান্ত মাথায় আমি জানি, ওটা অহীনের সন্তান নয়। কিন্তু অহীন সেদিন বলেছিল, আমার সঙ্গে থাকলে ওর শ্বাসরুদ্ধ লাগে। দম বন্ধ হয়ে আসে। সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকে। তাই আর ওকে আমার সঙ্গে থাকার জন্য জোর করিনি। আমি... আমি...।”
শেষের শব্দগুলো গলায় আটকে গেল। চোখে একফোঁটা জল নেই, অথচ বুকভাঙা কান্না কণ্ঠে স্পষ্ট। তাশার দুই হাত নিজের মুঠোয় শক্ত করে ধরে ব্যাকুল স্বরে বলল,
“আমি জানি, ওর সঙ্গে আমার আর কোনোদিন দেখা হবে না। আমি কখনো ওকে বলিনি, আমি ওকে ভীষণ ভালোবাসি। তুমি... তুমি আমার হয়ে বলবে? বলো না, বলবে তো?”
তাশার শরীর যেন মুহূর্তেই বরফের মতো জমে গেল। আয়াশকে হারিয়েও আশা এভাবে ভেঙে পড়েনি। আজ তার চোখে জল নেই, আছে শুধু একরাশ উন্মনা আকুতি, মায়ের মুখ থেকে একটি ‘বলব’ শোনার অপেক্ষা।
সে বারবার তাশার হাত ঝাঁকিয়ে বলছে,
“বলবে না? আর বলবে... ওর বিষাদভরা স্মৃতির মধ্যেই যদি কখনো আমার কথা আসে, তবুও যেন আমাকে মনে রাখে। ঘৃণা করেও হলেও... যেন আমাকে ভুলে না যায়।”
তাশা কাঁপতে থাকা মেয়ের হাত দুটো শক্ত করে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু আশা থামছে না। তার পুরো শরীর কাঁপছে, ততক্ষন যতক্ষণ না তাশা কাঁপা কণ্ঠে স্বীকার করছে সে অহীনকে সব বলবে। সব।
তাশার ফোন বেজে উঠে। আশা মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে। শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরে পরপর গাল আর কপালে চুমু খায় কয়েকটা। ফোনটা রিসিভ করে তাশার হাতে ধরিয়ে দিয়ে নীরবে সেখান থেকে চলে গেল। তাশা নিস্তব্ধ হয়ে মেয়ের হঠাৎ উন্মাদনা শান্ত হয়ে যাওয়া দেখছে।
—-
কানে ফোনটা তুলতেই ওপাশ থেকে তাইয়ানের কণ্ঠ ভেসে আসে মুহূর্তেই তাশার চোয়াল শক্ত হয়। বরাবরই খুব বেশি কথা বলত না সে, তবে ইদানীং তাইয়ানের সঙ্গে তার সম্পর্কটা যেন আরও দূরত্বে ঠেলে গেছে। ছেলেটা প্রায় প্রতিদিনই ফোন করে। স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে চায়। কিন্তু তাশার আর সেই স্বাভাবিকতা খুঁজে পাওয়া হয় না। তার মানে এই নয় যে তারা জেসির সঙ্গে কথা বলে না। ভাগ্যের লিখন মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো পথও তো খোলা নেই।
ওপাশ থেকে অসহায় কণ্ঠে তাইয়ান বলল,
“আম্মু, কী করতাম আমি? আমি জেসিকে ভালোবাসি!”
তাশা শীতল তীক্ষ্ণ এক হাসি দেয়, বিদ্রুপের ভঙ্গিতে বলে৷
“কী করতে? অন্তত আমাকে বলতে পারতে। আমরা কি তোমার অভিভাবক নই? না হয় আশাকে বলতে, অন্তুকে বলতে ওরা তোমার বোন। কিন্তু কাউকেই কিছু জানালে না। তাইয়ান, তুমি বুঝতে পারছ না, তোমার একটা সিদ্ধান্তের জন্য আজ তোমার বোনের পুরো জীবনটা ওলটপালট হয়ে গেছে!”
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা থেকে অপরাধবোধে ভাঙা গলায় তাইয়ান বলল,
“আমি বুঝতে পারিনি ওদের সম্পর্ক এত দূর ভেঙে যাবে। আমি... আমি শুধু একবার... আমি বুঝতেই পারিনি জেসি এতেই প্রেগন্যান্ট হয়ে যাবে।”
কথাটা শেষ হতেই তাশার বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ যেন বিস্ফোরিত হয়, ধমকে ওঠে ছেলেকে।
“বিয়ে পর্যন্ত করে ফেললে, অথচ আমাদের জানালে না! এতদূর সব বুঝতে পেরেছিলে, কিন্তু নিজের বোন আর তার স্বামীর সম্পর্কের টানাপোড়েনটা বুঝতে পারলে না? ওদের সংসার এলোমেলো ছিলো যার কারণ জেসি, হ্যাঁ তোমার স্ত্রী! সত্যিই কিছুই বুঝতে পারোনি? জেসিকে দিনের পর দিন এই বাড়িতে নিয়ে এসেছ। সকাল, রাত, কতবার এসেছে। অথচ এমনভাবে থেকেছ, যেন কিছুই হয়নি। এসব দেখে আশার মনে যে সন্দেহ জন্মাবে, সেটা একবারও ভাবোনি? আশা ভাবতো অহীনের জন্য আসে জেসি! আমার মেয়েটাকে দেখেছ? ওর এই নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া, এই শূন্য দৃষ্টি, এই অস্বাভাবিক আচরণ... আমি আর নিতে পারছি না। এই মুহূর্তে ওর মানসিক অবস্থা ভীষণ খারাপ। ও অহীনকে হারিয়ে কষ্ট পাচ্ছে, কিন্তু কাঁদতে পারছে না। বুকের ভেতর সবটুকু যন্ত্রণা চেপে রেখে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। তুমি বুঝতে পারছ, তাইয়ান? একবারও কি ওর দিকটা ভেবে দেখেছ?”
শেষ কথাগুলো বলতে বলতে তাশার গলা কাপছে। রাগের আগুনের আড়ালেও একজন মায়ের অসহায়তা স্পষ্ট । রান্নাঘরের গরম চুলার সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও তার হাত-পা যেন বরফ হয়ে আসছে। মনে হচ্ছিল, মেয়েটা চোখের সামনেই একটু একটু করে নিজেকে হারিয়ে ফেলছে, অথচ সে কিছুই করতে পারছে না। একটা সন্তানের জন্য অন্য সন্তানের সুখ হাড়িয়ে যাবে! মানা যায়?
তাইয়ান মায়ের কথা গুলো শুনে, আফসোস হচ্ছে তার, হ্যাঁ যেখানে একটা ভাইয়ের দায়িত্ব হয় বোনকে গুছিয়ে দেয়া এখানে বোনকে সম্পূর্ণ এলোমেলো করে দিয়েছে সে। শুধু ভালোবাসে তাই! সে ভাঙা গলায় বলে,
“যেহেতু এতকিছু হচ্ছে তাহলে ওকে কেনো সময় দিচ্ছো না? কিছুদিন পর বিয়ে নিয়ে ভাবলে হয় না?”
“কার বিয়ে? আশুর? কবে? আমাকে কেউ জানালো না দেশে থাকা কালীন!”
অহীনের কণ্ঠ ভেসে আসতেই ড্রয়িংরুমের পরিবেশ যেন মুহূর্তেই থমকায়। বেখেয়ালিভাবে সোফায় বসে ছিল তাইয়ান। ফাঁকা বাসার সুযোগে জেসি তার উরুর ওপর মাথা রেখে শুয়ে । ছয় মাসের গর্ভবতী স্ত্রীর স্ফীত পেটে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল সে। আচমকা অহীনের গলা শুনে দুজনই চমকে উঠে। জেসি তড়িঘড়ি করে উঠে বসতে চাইলে তাইয়ান দ্রুত তাকে দু'হাতে আগলে নেয়। কপালে ভাঁজ ফেলে মৃদু ধমকের সুরে বলল,
“আস্তে, জান। ব্যথা লাগবে।”
জেসি বিরক্তিতে ঠোঁট ফুলিয়ে মুখ ঘুরায় । এখনো এই মানুষটাকে পুরোপুরি সহ্য করতে পারে না সে। কেবল একটু যত্ন আর আদরের লোভেই বেড়ালের মতো তার আশেপাশে ঘুরঘুর করে। নইলে এই বাচ্চা ছেলের সঙ্গে কী আর সংসার করা যায়! এক-দুই নয়, পুরো চার বছরের ছোট সে।
ওদের এই আল্হাদে ভরা দৃশ্য দেখে অহীনের গা গুলিয়ে আসছে, গলা আরও কঠিন করে আবার প্রশ্ন করল,
“কার বিয়ে?”
এবার সত্যিই চমকে উঠে তাইয়ান। কিন্তু পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকাল অহীনের দিকে।
“যারই হোক, তোর কী? কেন, তোর মনে হচ্ছে আশার বিয়ে? আশার বিয়ে হলেই বা তোর কী?”
কথাটা শেষ হতেই অহীনের মুখের রঙ বদলায়। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে। দরজার পাশে রাখা ঝাড়ুটা এক ঝটকায় হাতে তুলে নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল,
“বাস্টার্ড! ‘তোর কী’ মানে? ও আমার থেকে দূরে থাকলেও ও আমারই। ওর জীবনের প্রতিটা খবর জানার অধিকার এখনো আমার আছে। আন্ডারস্ট্যান্ড?”
অহীন তেড়ে আসতেই স্ফীত পেট নিয়ে না চাইলেও জেসি তড়িঘড়ি করে সামনে এসে তার পথ আটকে দাঁড়ায়। কণ্ঠে বিরক্তি নিয়ে বলে
“শুরুটা কী করেছো, অহীন? সবে তো আম্মু ছেলেটাকে বকেছে। সেদিনও রাগের মাথায় মারধর করেছো। আজ আবার এমন করছো কেন? ও এখনো বাচ্চা, অবুঝ।”
“অবুঝ?”
জেসির কথায় যেন আকাশ থেকে পড়ল অহীন। তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে নেমে এলো জেসির স্ফীত পেটের দিকে। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে তাচ্ছিল্যের এক অদ্ভুত হাসি। হাসিটা ঠিক কাকে উদ্দেশ্য করে তাইয়ানকে, নাকি নিজের ভাগ্যকে বোঝার উপায় নেই।
জেসির ফোলা পেটের দিকে আঙুল তুলে বিদ্রূপের সুরে বলল,
“এটা? এই বাচ্চাটার বাবা কে, মিসেস তাইয়ান শিকদার? যে ছেলেটাকে তুমি অবুঝ বলছ, সেই 'অবুঝ' ছেলেটাই এত বড় ডিব্বা বানিয়েছে। কাকে বাচ্চা বলা হচ্ছে?”
এক মুহূর্ত থেমে চোখ সরাসরি তাইয়ানের দিকে স্থির করে সে। চোয়াল শক্ত হয়ে নিজের কাপল চাপরে,,
“বাচ্চা তো, ভাই, আমি! যে যেভাবে ইচ্ছে ভরে দিয়ে চলে যাচ্ছে। এখন আবার আমার আমার পেঁচিটাকে নিয়ে টান দেয়া হচ্ছে?”
তাইয়ান এবারও দমল না। বরং আরও দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“তোর পেঁচি? আমি মানছি, আমার ভুল ছিল। কিন্তু রাগ করে তালাক কে দেয়? আমি হলে দিতাম না। এমনকি কেউ যদি আমার প্রাণও বাজি রাখত, তবুও আমি আমার বউকে ছাড়তাম না। খামতি ছিল তোর ভালোবাসায়। আর হ্যাঁ, আশার বিয়ে কালই আয়াশের সঙ্গে। সো, হোয়াট?”
তাইয়ানের শেষ কথাটুকু যেন অহীনের বুক চিরে ঢুকছে । সে থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। বয়সে ছোট এই ছেলেটার মুখে আজ একের পর এক এমন সব কথা শুনতে হচ্ছে, যার জবাব যেন মুহূর্তে খুঁজে পাচ্ছে না সে।
কিন্তু তাইয়ান থামছ না,,
“আমি মানছি, দোষ আমার ছিল। আমার বোনেরও ছিল। আমাদের জন্যই সব কিছু হয়েছে। কিন্তু তাই বলে রাগের মাথায় তালাক দিয়ে দেওয়া কোনো পুরুষের কাজ নয়। ওটা কাপুরুষের লক্ষণ। নিজের সিদ্ধান্তকে ভালোবাসার নাম দিয়ে অন্তত ভালোবাসার মতো পবিত্র একটা সম্পর্ককে অপমান করিস না।”
জেসি তাইয়ানের বাহু খামচে ধরে দুই হাতে। অহীনকে বলা প্রতিটি শব্দ যেন তার নিজের বুকেও তীরের মতো বিঁধছে। সে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই তাইয়ান তাকে থামিয়ে দিল। শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় আবার বলল,
“রাগ আমারও আছে। গত তিন মাস ধরে শুধু জেসিকে বিয়ে করেছি বলে আমি নিজের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়েছে। জেসি আমার সিনিয়র, আর তোর এক্স। আশার চোখে সবচেয়ে অপছন্দের মানুষও সে। আমি যদি আগে বলতাম জেসিকেই বিয়ে করব, কেউ কি মেনে নিত? কখনোই না। তুই নিজের ইচ্ছাতেই আশাকে ছেড়ে দিয়েছিস। ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে, সেটা জেনেও চলে এসেছিস। এখন আমাকে দোষ দিয়ে কী নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারবি? সত্যিটা মেনে নে। আশুকে এবার বাঁচতে দে। অল্পতেই মুভ অন করুন দু'জনেট জীবন সুন্দর হয়ে যাবে।”
তার কথা শেষ হতেই বাসায় সৃজন প্রবেশ করে, তাদের তর্কের মাঝেই। পরিস্থিতি দুই ভাইয়ের বিবাদ তৈরি করার আগেই সামলে নিলো সে,
“তাই কখন এসেছো?”
জেসি বলল,
“এই তো একাছিলাম বাড়িতে তাই ডেকেছি আমি।”
“হুম ভালো করেছো। রুমে যাও। তাই খাবার না খেয়ে যেও না। অহীন তুমি গিয়ে আড়াম করো সবে তো আসলে।”
সবাইকে আদেশ করতেই তাইয়ান জেসিকে ধরে রুমে নিয়ে যাচ্ছে। মূলত তাকে এখনো সৃজন জেসির সঙ্গে থাকার বা জেসিকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয় নি। পারিবারিক ভাবে সব মিটমাট হয়ে বাচ্চা সুস্থ ভাবে দুনিয়াতে আসলে এসব নিয়ে ভাবা যাবে। ততদিন এভাবেই স্বামী স্ত্রী আসা যাওয়ায় থাকবে। তারা দুজন চলে যেতেই সৃজন পূর্ণ দৃষ্টি ফেলে অহীনের দিকে। ছেলেটা স্তব্ধ হয়ে ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে। অহীন টিপটিপ করে সৃজনের কক্ষে যায়। উহুম তার ঘুম হবে বলে মনে হয় না। সটান হয়ে শুয়ে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে আছে।বুকের ভেতর দ্রিমদ্রিম শব্দটা বেশ বেজে বেজে তাকে ক্ষত করে দিচ্ছে। তবুও যেনো ছেলেটা নিশ্চুপ। এর মাঝে কয়েকবার সৃজন আর জেইন এসে গেলেও কে জানে ছেলেটার কোন হেলদোল নেই। মস্তিষ্ক বারবার যা ভাবছে তা একদম ভাবার মত নয়। যা ভাবা সম্পূর্ণ পাপ। সৃজন আবার কক্ষে এসে বসলো ব্যবসায়িক কাজের ঝামেলা নিয়ে অহীনকে বলে
“তুমি ছিলে না দুটো মাস, কালকে থেকে দোকানে বসবে। কারো ভরসায় দোকান ফেলে রাখা যায় না বুঝলে? আর যতই হোক তাইয়ান এখন জেসির হাসবেন্ড ওর সঙ্গে মিলেমিশে থেকো। বাচ্চাছেলে ভুল করে ফেলেছে অনাগত সন্তানটার দিকেও তাকাতে হবে।”
তার এমন বড় করে শান্ত মস্তিকের বলা কথটার প্রতিপেক্ষে অহীন বেশ উল্টো আর পাল্টা ভাসায় জিজ্ঞেস করে,
“আশুর যদি আয়াশের সঙ্গে বিয়ে হয়। স্যানিটাইজার শুরুতে ওর কাছে না গেলেও একসময় তো ঠিক যাবে তাই না পাপি?”
হতবুদ্ধির মতো তাকিয়ে আছে সৃজন তার এহেম কথায়, কোন রকম উত্তর কি আছে এই প্রশ্নের? বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর আয়াশ হয়ত প্রথমে ইতস্ততিতে ভুগবে তবে ভূমিরীতির দৃষ্টিভঙ্গিতে এক সম তাদের কাছে আসতেই হবে। হতে পারে সমাজের জন্য! তাকে চুপ থাকতে দেখে অহীন ফের বলে,
"আমি মরে যাবো অন্য কারও সাথে ওকে দেখলে। দূরত্ব সহ্য করব, কিন্তু আমার পেচির কোনো ভাগ-বণ্টান আমি মেনে নিতে পারব না আর এখন তো পুরো পেচটাকেই ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্ন উঠছে।”
সৃজন শীতল চোখে ছেলের দিকে তাকায়, কি অদ্ভুত ভাবে বাবার মতো হয়েছে এই ছেলে। নিজের করবে না তবে অন্যের হতেও দিবে না। কিন্তু এটা তো সেই রকম নয়। অন্তিক কুহুকে পাওয়ার রাস্তা রেখেছিলো যা অহীন বোকা ছেলে রাখেনি। জীবন তো দু'জনেই আছে?
“কোন একদিন তো আশার বিয়ে করতেই হতো। আয়াশ আশাকে ভালোবাসে একে-অপরকে বুঝে ওদের মিল হোক এতে তোমার কেনো এত অনিহা? বাঁচতে হবে দু'জনের।”
“বাঁচা লাগবে না ওই বেয়াদব ডেমনির, আমি দেশে যাবো আজকেই ইমার্জেন্সি ফ্লাইটে।”
শোয়া থেকে ঝটকা দিয়ে উঠে বসলে অহীন, সৃজন বিস্ময়খেলো তাঁর কাণ্ড দেখে। ছেলেটা সত্যি ফোন তুলে ফ্লাইট ডিটেইলস চেক করছে।
_____________
এয়ারপোর্টের পিচঢালা রাস্তা, সন্ধ্যার আগের সূর্যটা আকাশে লাল বর্ণ ধারণ করেছে। কিছু মানুষের কাছে সময়টা অসম্ভব সুন্দর হলেও যার জীবন সম্পূর্ণ এলোমেলো তার চোখে ঠেকবে না। এয়ারপোর্টের বাইরে বিধ্বস্ত হয়ে ছুটছে অহীন,যথাযথ বিয়ের সময় টা না জানা থাকলেও বাঙালির বিয়ে মানেই দুপুরের পরের সময় টা। পরনের সাদা শার্টটি ফর্সা ত্বকের সাথে ঘামে লেপ্টে আছে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে দুলছে। ঠোঁটজোড়া তিরতির করে কাঁপছে, অস্পষ্ট স্বরে বিরবির করে বলছে,
"পেঁচি, এটা করিস না। সরি সরি, এত বড় শাস্তি নিতে পারবো না। ভুল তো দু'জনের ছিলে তাহলে শাস্তি কেনো দিচ্ছিস আমাকে একা?"
"অহীন থামো, গিয়ে কোনো লাভ নেই আশার নিজেরও জীবন আছে।"
"জানি না, আমার আশা আমার পেঁচি।”
পেছন থেকে অনবরত পুরুষালি কণ্ঠে ডাক পড়ছে সৃজনের, শেষ মূহুর্তে অহীনের বিধস্ত রুম তাকে একা এত দূর ছাড়তে মন সায় দেয় নি তার। হয়ত ভাগ্য সহায় ছিলো বলেই টিকিট পেয়েছে। ঢাকার শহরের রাস্তায় নেমে কপালে হাত দিয়ে ক্লান্ত গলা ঢোক গিলে ভিজিয়ে নেয় অহীন। চারপাশে তাকিয়ে বুঝে উঠতে পারছে না কি করবে সে? পকেট হাতড়ে নিজের ফোনটা খুঁজে পেলো না। হয়তো ফোনটা বাড়িতে বা ট্যাক্সির কোনো এক কোনায় পড়ে আছে খুবই অযত্নের সাথে। পেছন ফিরে দৌড়ে যায় পাপির নিকট। নিজেই তার স্যুটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেয়। শ্যামলা মুখটা ক্লান্তিতে লাল হয়ে গিয়েছে, অহীনের এমন কাজে প্রশ্ন করে,
"কি খুঁজছো?"
"পাপি তোমার ফোন দাও, বাইক বাইক লাগবে।"
সৃজন কিছু বলার আগেই ফোনটা বের করে নিলো অহীন, ছুটে কাউকে কল করতে করতে এয়ারপোর্টের বাইরে রাস্তায় পৌঁছায় সে। সৃজন ওর পিছু, একটা বোতল পানিতে চুমুক দেয় সৃজন, গলা দিয়ে নামতে সময় দিলো না। বাতাসের গতিতে একটা বাইক এসে থামে তাদের সামনে, অহীন সময় নষ্ট করলো না। বাইকে বসে পড়ে। মুখের পানি মুখে রেখেই ছুট লাগায়, গিয়ে অহীনের শার্ট ধরে বলে,
"আরে পাঠার বাচ্চা নিয়ে যা আমাকে।"
কোনো প্রকার গলা দিয়ে পানিটা নামিয়ে সৃজন বাইকের পেছনে বসে। বাইক আবারও বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে। সৃজন অস্পষ্ট স্বরে অহীনকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে,
"এই বয়সেও আমাকে তোমার পেছনে ছুটতে হয়। আমার সাথে থেকে তুমি অন্তিকের সম্পূর্ণ গুণ কি করে পেতে পারো?"
"সাট আপ পাপি, তুমি বুঝতে পারছো না, আমার দুনিয়া অন্য কেউ নিয়ে যাচ্ছে।"
"সে টা এখন তোমার নেই, অহেতুক মরিচিকার পিছু নিচ্ছো তুমি।"
সৃজনের গভীর কথায় পাত্তা সে দিলো না। বাইক চালককে তাড়া দিয়ে বলল,
"ব্রো প্লিজ ফাস্ট।"
বাইকের স্পিড আরো বাড়লো, অহীনের চোখগুলো লাল হয়ে আছে, গালগুলোও লাল ধবধবে হয়ে আছে। সৃজন বুঝতে পারে হয়তো সুগার ফল হচ্ছে। পকেট থেকে একটা ট্যাবলেট এগিয়ে ওর মুখের সামনে ধরে। তবে ছেলেটি গ্রহণ করলো না। হতাশার শ্বাস ফেলল সৃজন। সে জানে এই শ্রম, এই জার্নি সব অহেতুক যা হবার হয়ে গিয়েছে।
___________
গায়ে খুবই হালকা কাজের একটা লাল শাড়ি, আর লাল লিপস্টিক। জানালার বাইরে অধীর মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছে আশা। শ্যামলা সেই মুখটা মলিন হয়ে আছে। পেছন থেকে ডাক পড়তেই হুশে ফেরে মেয়েটি,
"আশা?"
"হুম।"
হকচকিয়ে তাকায় আশা তার সামনে, তার সবচেয়ে প্রিয় নারীটি দাঁড়িয়ে আছে। ইস কি মিষ্টি এই মুখ, আশার চোখে জল থৈথৈ করে ওঠে। এগিয়ে এসে ঝাপটে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দেয়,
"ফুম্মি, তোমার মতো হওয়া কঠিন খুব। এলোমেলো করে দিলো তোমার ছেলে আমার জীবনটা।"
আশার পিঠে ধপধপ করে কয়েকবার আদুরে থাপ্পড় দিয়ে কুহু নরম স্বরে, সে অহীনকে ভিসন ভালোবাসলেও আশাকেও কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে। হয়ত বিয়ের তাগাদা তার দিক থেকেই আগে এসেছে, তবে আয়াশটা আশাকে চায় এটা জেনেই। সে বলল,
"না আশু, জীবন এলোমেলো নয় তোর, আয়াশ আছে তো তোকে গুছিয়ে দিতে। এত কিছুর পর ও তোকে বিয়ে করতে চায়।"
মুখ তুলে কুহুর পানে একটু তাকায় আশা, কি অদ্ভুত মানুষটা নিজের ছেলের বিপক্ষে তার জন্য। ফুম্মি তো জানে অহীন ভেঙে যাবে তবুও? অবশ্য মেয়েটাও তাদেরই। কুহেলিকা ওর হাত ধরে নিয়ে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে দেয়। চোখ ঘুরিয়ে চারপাশ এই তো সবাই আছে সামনেই বসে, কারো মনে বিষণ্ণতা নেই, কত আনন্দ মেয়ের বিয়ে বলে কথা। আয়াশ অপরূপ সুদর্শন এক যুবক, কতগুলো দিন গুনেছে তাকে পাওয়ার আশায়। কোঁকড়ানো চুল, নিচের অধরে দৃশ্যমান একটি লাল তিল, অহীনের মতো ফর্সা না হলেও নিঃসন্দেহে সে অপূর্ব অহীনের চেয়ে বেশি। তবে মনটা যে বারবার অহীনের জন্য স্পন্দিত হচ্ছে আশাকে তার পাশেই বসিয়ে দেয়া হলো। সবার দৃষ্টি আশা এবং আয়াশের দিকে। স্বল্প বছর আগেও এই দু’টো মানুষের বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো, সব ওলটপালট করে দিয়ে গেলো একটি ঝড় এসে। তাশার মন ভালো নেই, দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। আশার তখনের বলা কথাগুলো কেমন মনের মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে। আশা কুহেলিকার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
"অন্তু কই?"
আয়াশের মুখ মলিন হলো, আড়চোখে আশার দিকে তাকায় সে। কুহেলিকা অল্প হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
"ওর কথা বাদ দে, রুমে আছে হয়ত ঘুমিয়ে।"
"ঘুমাবো কেনো? নিজের চাচাতো বোনের বনাম এক্স ভাবির বিয়ের জন্য সাজলাম।”
পেছনে একটি কক্ষের দরজার সামনে ভারী মেকআপের প্রলেপ লাগিয়ে এসেছে অন্তিহা, দু’টো ভাইবোন অন্তিকের সাথে গায়ের রং হুবহু মিল। কথার সমাপ্তি হলো, কুহেলিকা গুরুত্ব দিলো না অন্তিহার কথার। বারবার অহীনের জন্য ছটফট করছে মেয়েটা। ভাইয়ের সঙ্গে তেমন মিলভাব না থাকলেও কিছুদিন যাবত কপমন ভাইয়ের জন্য বলে যায়? আয়াশের পরিবার থেকে তেমন কেউ নেই, লিজা তিতাশ বরাবরই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে, দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়ায়। এবারেও কেবল দাদু এসেছে। মাথাটা নিচু করে বসে আছে আশা। একটি হাত বাড়িয়ে আশার হাতের উপর রেখে শান্ত চোখে আস্থা দিয়ে বিরবির করে বলে আয়াশ,
"চিন্তা করো না পুতুল, তোমার সব সিদ্ধান্তে পাশে আছি তো আমি।"
মনের ভেতর একটু তো তৃপ্ততা আয়াশের থাকার কথা, ছোট থেকে একে অপরকে ভালোবেসে এসেছে যে তারা। আজ পূর্ণতা পাবে তাদের সম্পর্ক। তবুও কেমন আজ তৃপ্ত হচ্ছে না। চোখ বেয়াহার মতো অন্তিহার দিকে আটকে যাচ্ছে বারবার।
__________
বুকের মাঝে ঝড়ের মতো ধকপুকগুলো ক্রমাগত বেড়েই চলেছে, বাইকটি অতি পরিচিত একটি বাড়ির সামনে এসে গতি কমে আসে। কিন্তু থেমে যাওয়ার সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করার সময়টুকু অহীনের নেই। ঝাঁপ দিয়ে নেমে ছুটে যায় বাড়ির ভেতর। সৃজন নেমে কিছু টাকা পরিশোধ করে ভেতরে প্রবেশ করে। দৌড়ে দরজা ঠেলে প্রবেশ করতেই অহীনের যেই প্রথম শব্দটি কর্ণপাত হয় সেটা আশার মুখ থেকে পড়া খুবই ছোট বাক্য,,
" আলহামদুলিল্লাহ কবুল.।"
দরজায় ঠাঁই স্তব্ধ হয়ে বসে পড়ে অহীন, ধপাস করে একটি শব্দ হলেই সবার খেয়াল ওই দিকে ফিরে, বিয়ের আনন্দিত আমেজ ক্ষণঘুম করে ওঠে, দরজার থেকে সামান্য দূরত্ব রেখে অন্তিক বসেছিলো। ছেলেকে দেখে উঠে যায় বাহুতে ধরে মায়া করে সুধায়,
"অহীন তুমি হঠাৎ? তোমার তো দুই দিন পর বিয়ে ছিলো জেসির সাথে।"
কান স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে কবুল শুনেই অন্তিকের কথ কি শুনতে পেলো সে?অহীনের চোখজোড়া আশার দিকে স্থির হয়ে আছে। আশার চোখে আজ অনুভূতি বলতে নেই। চোখের দিকেও তাকাচ্ছে না অহীনের। অহীন অন্তিকের দিকে তাকিয়ে স্বল্প স্বরে বলে,
"ওকে কেনো বিয়ে দিচ্ছো? জানো না ও আমার, শুধুই আমার।"
মস্তিষ্ক অহীনের প্রতি রাগ তৈরি করছে তবুও অন্তিক শান্ত স্বরে বলে,
"রুমে যাও অহীন, যা হচ্ছে ভালোই হচ্ছে।"
পেছন থেকে সৃজনের হাত পড়ে অহীনের কাঁধে, তবে সেটাও যেন তাকে শান্ত করতে পারলো না। ঝাঁপিয়ে উঠে আসে আশার কাছে। কুহেলিকা আর আয়াশ আশাকে আড়াল করলো নিজেদের পেছনে। তবে কে বুঝে? আয়াশকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে আশার হাতের কব্জি শক্ত করে ধরে বলতেই যাবে কিছু, অমনি মায়ের নরম হাতের কঠিন থাপ্পড় তার গালে,
"অহীন নিজের সীমা অতিক্রম করবে না, মনে রেখো শিকদার বংশের মেয়ে আর তার স্বামীর মান এতটাও তুচ্ছ হয় নি যে তুমি আয়াশকে ধাক্কা দেবে।"
মায়ের হাতের থাপ্পড় খেয়ে বড় বড় করে তাকায় সে, চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। সৃজন এগিয়ে এসে ধমকের গলায় বলে,
"কুহেলিকা তুমিও কেনো ভুলে যাও? অহীন এ বাড়ির ছেলে।"
"সেটা ভোলা যায় না সৃজন, যতই হোক বংশের টান ধরেই এসেছে। ওকে কেনো এনেছেন এখানে?”
তবুও একটু নড়লো না অহীন, এগিয়ে মাকে উপেক্ষা করে আশার বাহুতে ধরে ঝাঁকিয়ে বলে,
"এই মুখের জবান কেনো উপরওয়ালা কেড়ে নিলো না যখন অন্য কারো নামে দ্বিতীয়বার কবুল বললি?"
ককিয়ে উঠলো রমনী, সে জানে সে কি করছে। অহীনের সঙ্গে সঙ্গ দিলে তো হবে না। সম্পর্কের সমাপ্তি টানতেই হবে।
"ছাড়ো অহীন লাগছে, আমার জীবন ডায়রির পাতার মতো নয়, যে ব্যবহার করার পর মূল্যহীন হবে। আমারো অন্য পাঁচটা মেয়ের মতো সংসার করতে ইচ্ছে হয়। আর যদি হয় আয়াশের মতো কেউ যে আমাকে আগলে নেবে?"
আশার নরম গালে অহীনের পুরুষালী শক্ত হাতটা পড়ে, পর মুহূর্তে আয়াশ এগিয়ে আসতে চায়। তবে পারলো না, সৃজনের জন্য। সৃজন তার আগেই অহীনের গালে থাপ্পড় দেয়,
"এই শিক্ষা পেয়েছো? সাহস কে দিয়েছে ওকে মারার? তুমি দোষ করেছো তার শাস্তি পেতে হবে। আশারও বাঁচার অধিকার আছে। কতবার বলব?"
হুংকার ছেড়ে বলে ওঠে অহীন,,
"কিসের বাঁচার অধিকার? আমি নেই মানে ওর বিয়ে করে নিতে হবে? আমার আম্মু থাকেনি বাবাকে ছাড়া তিন বছর? তাহলে ও কেনো পারে না?"
"পারে না কারণ তোমাদের সম্পর্ক আর তোমাদের বাবা-মায়ের সম্পর্ক এক নয়। ভিন্ন সকল পরিস্থিতি।"
"জানি না আমি কিছু, আশা আমার আমার আমার। কেনো করবি তুই এমন কাজ? আশা তুই আমার, আমার পেঁচি, বাবা যেমন নিজ পেঁচিকে এতগুলো বছর আগলে রেখেছে আমিও চাই।"
চিৎকার কেমন ধীরে ধীরে কান্নায় পরিণত হলো, গড়িয়ে পড়ছে নোনা জল, একটু কান্না করে অহীন আসে পাশে তাকিয়ে ছুটে যায় আকাশের পায়ে ঝাপটে জড়িয়ে ধরে,
"ছোট বাবা কেনো করলে এটা? তুমি তো বলেছিলে আশার দায়িত্ব আমার! তাহলে? এসব কি করছো?"
অতঃপর তাশার পায়ের কাছে,
"ও ছোট আম্মু তুমি তো সবসময় আমার পক্ষ নাও আজ কেনো চুপ করে আছো? আমার কান্নাগুলো কি তুমি এবার সহ্য করে নিলে? তার মানে তোমার মন এবার পাথরের মরিচিকায় আবদ্ধ হয়েছে?"
কি বলবে তারা? নিজের মেয়ের জীবন নষ্ট করবে? আশার যে অহীনের সাথে কোনো ভবিষ্যৎ নেই। পাথরের মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। আজ আকাশ মুখ খুললে যে সবার মন ভাঙবে। অহীন ওদের মনের ভেতরে পাথরের প্রাচীর নড়াতে না পেরে আশার কাছে যায় আয়াশ বাধা দিলে করুণ স্বরে বলে,
"প্লিজ একটু কথা বলবো।"
আয়াশ জানে না কেনো অহীনের জন্য বড্ড মায়া হচ্ছে আজ। এতটা পাগল কেনো আশার জন্য সে? আশার গালগুলো নিজের দিকে তুলে ধরে, মেয়েটির চোখগুলো টলটল করছে। কাজল লেপ্টে গিয়েছে। করুণ স্বরে অহীন বলে,
"কেনো বললি কবুল? একটা জীবন কি আমার জন্য থাকা যেতো না? দূরত্ব রেখে কি ভালোবাসা যায় না? তুই আমি না হয় দূর থেকে আ জীবন ভালোবেসে যাবো। আমাদের না হয় দূরত্বের প্রণয় হলো!"
লাল হয়ে ফুলে গিয়েছে গাল মেয়েটা। অভিমানী গলায় বলে,,
"তুমিও তো জেসিকে বিয়ে করতে সামনের সপ্তাহে।"
"কে বলেছে এসব? ভুল ছিলো আমার। তুই তো সংশোধন করার ক্ষমতা রাখিস।"
"ভুল দু'জনের ছিলো। এর মাশুল যে একটাই, শুধুই দূরত্ব।"
"পারবি আমার হাতে অঙ্কিত এই দেহে অন্যের রং ছোঁয়াতে? আমি তোকে অনেক আদর করেছি আশু, ওমন করে অন্য কারো আদর গ্রহণ করে নিবি?"
"আমি পেছনে তাকাই না ফিরে, এটা তো ভালো করেই জানো। অহীন তুমি যদি পারো আমিও পারবো। আর রইলো দেহ? সেটা পুরোনো পৃষ্ঠা ছিড়ে ফেলে। নতুন করে অন্য কেউ অঙ্কন করে নেবে।"
চেঁচিয়ে ওঠে পাগলের মতো করে অহীন,
"চুপ চুপ চুউউউপ। তোর কলিজা হাতে নিয়ে নেবো শুয়োরের বাচ্চা, তুই আমার। তোকে অন্য কারো সাথে ভাবতে আমার কেমন লাগে জানিস? মরে যাবো আমি।"
রাগে শরীরের পশমগুলো জানান দিচ্ছে বরাবরই অন্তিকের রাগ বেশি। এগিয়ে এসে অহীনের কলার ধরে টেনে একটি কক্ষের দিকে আগাতে আগাতে বলে,
"বিয়ে সম্পূর্ণ করুন, ও পাগল হয়েছে। ওর কথার কোনো মূল্য নেই এই বিষয়ে।"
"আব্বু প্লিজ, পাপি কিছু বলো না। ছোট আব্বু তুমি তো বলো। আশু মরে যাবো খোদার কসম যদি তোকে অন্য কেউ ছুঁয়ে দেয়।"
রুমে নিয়ে বন্ধ করে দিতেই, আশার কান্নার বাঁধ ভাঙে, হো হো করে কেঁদে দিলো, তাশা কুহেলিকা জড়িয়ে ধরে সামলে নিলো আশাকে। আয়াশ এগিয়ে ওর মাথায় হাত রাখতেই চোখে চোখ রাখে আশা। এই তাকানোটা অনেক ভয়ংকর লাগে আয়াশের কাছে।
সে হাঁটু গেড়ে আশার পাশে বসে পড়ে। আশার চোখ দুটো অস্বাভাবিক লাল। শুধু কান্নার জন্য এমন হওয়ার কথা নয়। সন্দেহ হতেই সে হাত বাড়িয়ে পালস ধরতে যায়। কিন্তু তার আগেই আশা গরগর করে রক্তবমি করে । রক্ত এসে ছিটকে পড়ছে আয়াশের হাতের ওপর। মুহূর্তেই তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। রক্তমাখা হাতের দিকে তাকিয়েই ফিসফিস করে বলল,
“পয়জন... ও হয়ত পয়জন নিয়েছে। এখনই হসপিটালে নিতে হবে।”
ইতোমধ্যে আশার বমি থামছে না। নাক-মুখ দিয়ে রক্তের সঙ্গে লালা গড়িয়ে পড়ছে। ছুটে এসে আকাশ এক মুহূর্ত দেরি না করে মেয়েকে কোলে তুলে নিল। আয়াশ তখনও স্থির হয়ে বসে আছে। হাতভর্তি রক্ত, চোখেমুখে অপরাধবোধ। যদি সে জানত আশার পরিকল্পনার শেষটা এমন হবে, তাহলে কোনোদিনই এই সিদ্ধান্তে তাকে সঙ্গ দিত না।
আকাশের বুক থেকে নিজেকে সরিয়ে নামতে চাইছে আশা। অন্তিক আগেই গাড়ি বের করতে ছুটে গেছে। কষ্টে শ্বাস নিতে নিতে আশা বাবার কানের কাছে মুখ এনে আস্তে বলল,
“একটা মেয়ে কখনো সবার মন রাখতে পারে না... আমি তোমার মন রাখতে পারিনি, আব্বু...”
প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করতেই যেন বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে তার। শ্বাস ভারী হয়ে এসেছে। আকাশ সব শুনছে, অথচ কোনো উত্তর দিতে পারছে না। বুকের ভেতরটা শুধু মোচড় দিয়ে উঠছে। এই তো তার আদরের মেয়ে। ছোটবেলা থেকে আশার কোনো ইচ্ছে অপূর্ণ রাখেনি সে। যা চেয়েছে, সাধ্যের বাইরে গিয়েও এনে দিয়েছে। অথচ শেষ কয়েকটা মাস নিজের অজান্তেই মেয়েটার ওপর এমন একটা চাপ তৈরি করেছে, যার ভার সে হয়ত আর নিতে পারেনি।
আশা আবারও খুব ধীরে বলল,
“অহীনকে কথা দিয়েছিলাম... আমার নামের দলিল কাউকে দেব না। কিন্তু বেঁচে থাকলে... আমাকে দিতে বাধ্য করা হবে। তাই... মনে হলো... মরে গেলেই সব শেষ হয়ে যাবে...”
আকাশের কলিজা যেনো ছিড়ে দ্বিখণ্ডিত হশে যাচ্ছে। কাঁদতে কাঁদতেই মেয়ের কপালে চুমু এঁকে দিল।
“এভাবে বলে না, মা। আর একটু সহ্য কর। তোর বিয়ে আমি আর কোথাও দেব না। কে বলেছে, মেয়েদের বিয়ে করতেই হবে? একবার আমাকে বলতি। আমি সব ঠিক করে দিতাম। আমাকে ক্ষমা করে দে... সরি আব্বু... আব্বুর তোর কাছে এতগুলো সরি…”
_________
দরজায় অনবরত আঘাত করার পরও যখন দরজা খুলে দিলো না কেউ, অহীন গড়িয়ে নিচে বসে পড়ে। চোখের পানি গুলো নিচে পরছে। গায়ে লেপ্টে আছে ঘামে জর্জরিত শার্ট টি। আর্তনাদ করেই চলেছে,,,
"আশা সত্যি মরে যাবো এমনটা করিস না জান আমার। জানি অহেতুক ও বেহায়ার মতো আবদার কিন্তু তবুও সহ্য হচ্ছে না। আমি সারাজীবন তোর খেয়াল রাখবো।"
কোন শব্দ যেমন নেই, একদম নিস্তব্ধ। যেনো কিছুই হচ্ছে না। ওপাশ থেকে অন্তিহার শব্দ আসে,
"ভাইয়া কান্না করবেন না, সব ঠিক হয়ে যাবে।"
অন্তীহার গলা শুনে বার কয়েক বলল দরজা খুলতে, তবে দরজায় যে তালা। সিড়ির একটি কোনার রুমে অন্তিহা থাকায় অনেক হৈচৈ হলেও কিছু দেখার রুচি হয়নি। কাজেই আশার অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞ সে। অহীন অসহায় হয়ে বলতে থাকে,
"জানিস অন্তু? আমি সব সহ্য করতে পারি, ওর পাশে অন্য কাউকে না। আমাদের জীবন টাও সুন্দর হতে পারতো। ভুলের মাশুল কি করে এত ভয়ংকর হতে পারে?"
অন্তীহা চুপ থাকে কিছুটা সময়,কখনোই অহীনের সাথে তেমন জমেনি তার। এই প্রথম হয়ত নিজের মনের কথাটা বললো অহীন তাকে। অমনি ভেতর থেকে সুন্দর ও কাতর স্বর ভেসে আসে,,
আমি তোমার সাথেই আমাকে খুঁজে পাই,
এখনও যত্ন করে যাই,
যদিও তুমি বহুদূরে...
আমি আজও পাগল তোমারই ওই প্রেমে,
গেছি হারিয়ে রাতের আকাশে...
তবে কি কাহিনি শেষ আমাদের?
এই পর্যায়ে কণ্ঠ কেমন ধীরে হয়ে আসছে যেনো অহীন দূরে যাচ্ছে দরজা থেকে...
আমি ভাবি, যদি আবার
ছুঁতে পারতাম তোমাকে—
সত্যি বা স্বপ্নই হোক,
এ দূরত্ব শেষ হয়ে যেত যে...
ভালো লাগা, ভালোবাসার
তফাৎ কী যে হয়, জানতাম না।
তবে কি আজ সব দোষটাই আমার?
দেরি করেছি বুঝতে... তবু ভয়...
'ধপাস.......'
চলবে.....