#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ৫৩
“অন্তি, আমি দেখতে পারছি না! ওই ফাকিং বাস্টার্ডটা চোখে কেন মারল? ওনাকে বলো, প্লিজ হাত ভালো করে স্যানিটাইজ করতে। ফাক, ইয়ার! আমি শাওয়ার নেব। আমার গা গুলাচ্ছে। মনে হয় আর বাঁচব না। আমার মনে হয় এবার বড় কোনো সংক্রমণ হবে। আহহহহ... আমার হাত কে ধরেছে? হাতে ব্যাকটেরিয়া আছে! এই হাত সরাও! শিট আহহহহহহ।”
সেই কখন থেকে আয়াশ চেঁচিয়ে চলেছে। অন্তিহা তার একটি হাত ধরে আছে শক্ত করে। পাশে বসে থাকা নার্স কেবল হতবুদ্ধির মতো তাকিয়ে আছে। মেয়েটা এখনো হাতে গ্লাভসও পরেনি, অথচ লোকটা আবোলতাবোল বকেই যাচ্ছে। অন্তিহাও আজ বড্ড বিপাকে পড়েছে। সে আয়াশকে ধমক দিয়ে বলল,
“উফ, শান্ত হন। ও ধরছে না আপনাকে। আমি আছি তো, কিছু হবে না।”
আয়াশ অন্তিহার হাতটা আরও শক্ত করে খামচে ধরে, যেন চামড়া ভেদ করে নখ গেঁথে দেবে। নার্সটি গ্লাভস পরে হাতে অত্যন্ত হতাশ ও আফসোসের সুরে বলল,
“এত হ্যান্ডসাম একটা ছেলের ব্রেইনে সমস্যা! চিন্তা করবেন না, আপু। আপনার ভালো কর্মের ফল অবশ্যই পাবেন।”
এত মিষ্টি করে বলল মেয়েটা যে অন্তিহা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। একটুও ইচ্ছে হলো না বলার যে আয়াশ পাগল নয়... মহাপাগল। তার পক্ষ থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে আয়াশই ভড়কে গিয়ে বলে উঠে,
“হোয়াট ডু ইউ মিন বাই আমার ব্রেইনে সমস্যা? হুম? আপনার হাত দিয়ে কত মানুষের ময়লা ক্ষত পরিষ্কার করেন, খবর আছে? যতসব নোংরা পিপল!”
নার্সটির পাশে থাকা আরেকজন নার্স এবার রেগে গেলেন।
“ইসস! লোকটার ভিসন জবান চলে। এতই যদি আমাদের নোংরা মনে হয়, তাহলে বিদায় হন। করব না আপনার চিকিৎসা!”
“ওকে, চলো অন্তি। আগে শাওয়ার নিয়ে বড় হাসপাতালে যাব। আমার চিকিৎসা করার জন্য ভালো ভালো ডাক্তার বসে থাকে।”
ঠাস!
আয়াশ কথা শেষ করার আগেই অন্তিহা পাশে থাকা স্ট্রেচারের ওপর সজোরে হাত মারল। বিকট শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠে। রমণীর ভাইকে নিয়ে এমনিতেই ভীষণ দুশ্চিন্তা হচ্ছে। তার ওপর আয়াশের এসব বায়নাক্কা যেন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। রাগে গর্জে উঠে বলে
“আর একটা... আর একটা শব্দ যদি মুখ দিয়ে বের হয়, আয়াশ, সামনেই একটা ময়লা পানির বালতি আছে। পুরোটা আপনার মাথায় ঢেলে দেব আমি!”
মুহূর্তেই চুপসে গেল আয়াশ। কয়েকদিন ধরেই সে অন্তিহার মুড সুইংগুলো লক্ষ করছে। মেয়েটা যে সত্যিই ময়লা পানি ঢেলে দিতে পারে, সেটা বিশ্বাস করতেও তার কষ্ট হচ্ছে না।
অন্তিহা নার্সদের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“আপু, ওর কথায় কান দেবেন না। ওনার ব্রেইনে কোন সমস্যা নেই, , বরং ব্রেইনই নেই।”
নার্সরা মুখ চেপে মৃদু হাসলেন। তারপর আয়াশের হাতের ক্ষতের চিকিৎসা শুরু করে। অতটা গভীর ক্ষত নয়। গুলিটা কেবল পাশ ঘেঁষে চলে গেছে। ব্যথা আর ঘৃণায় মুখ কুঁচকে আয়াশ অন্তিহার বাহুতে কপাল ঘষে ক্রন্দনরত গলায় নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
“অন্তি, এটা খুব জঘন্য! তুমি ভীষণ পাষাণ একটা মেয়ে। কীভাবে আমার মতো একটা অবলা পুরুষকে এমন দুটো অচেনা রাক্ষসীর হাতে তুলে দিতে পারলে? আমার জন্য তোমার হৃদয়ে কি একটুও মায়া হয় না?”
নার্সরা তার এমন পাগলামিসুলভ আচরণে ঠোঁট চেপে হাসতে হাসতেই কাজ করছে। অন্তিহা এক হাতে আয়াশের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। না ব্যথায় আয়াশ কাঁদছে না, বরং তার এই উন্মাদ আচরণের পেছনে অন্য কারণ। সারাদিনের ঘটনাপ্রবাহে লোকটা একবারও শাওয়ার নিতে পারেনি। তার ওপর সারা শরীরে লেগে আছে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত। এখন আবার অচেনা দুই নারীর ছোঁয়া সব মিলিয়ে আয়াশ সত্যিই ভীষণ অস্বস্তিতে আছে।
নার্সের কাজ শেষ হতেই প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ দিয়ে তারা চলে গেলেন। অন্তিহা এবার আয়াশকে নিজের কাছ থেকে আলতো করে সরিয়ে দিয়ে কাপড় ঝাড়তে ঝাড়তে গম্ভীর গলায় বলল,
“এবার উঠুন। হাসপাতালে যাব, ভাইয়ার কাছে।”
“উঠব মানে? আমি কীভাবে উঠব? আমি তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।”
এতক্ষণ বিষয়টাকে তেমন গুরুত্ব না দিলেও এবার অন্তিহাকে দিতে হলো। সে একটু এগিয়ে এসে নিজের ডান হাতটা আয়াশের চোখের সামনে এপাশ-ওপাশ নাড়িয়ে ধীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
“এটা দেখতে পাচ্ছেন?”
“নো, ইয়ার!”
ঢোক গিলে অন্তিহা আরও কাছে এগিয়ে যায়, প্রায় গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আয়াশের চোখের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তবুও আয়াশ একটুও নড়ল না। চোখে দেখতে পেলে হয়তো এতক্ষণে পিছিয়ে যেত। অন্তিহা শান্ত দৃষ্টিতে তার চোখ দুটো পরীক্ষা করে। এলোপাতাড়ি ঘুষির আঘাতে কর্নিয়ার আশপাশটা লালচে হয়ে উঠেছে।
আয়াশ নিচু স্বরে হিসহিস করে বলল,
“তুমি... আমার খুব কাছে এসেছ, তাই না?”
চোখে দেখতে না পেলেও অন্তিহার গায়ে মাখা সেই পরিচিত কড়া পারফিউমের গন্ধ ঠিকই তার নাকে এসে লাগছে। কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে আয়াশের উষ্ণ নিশ্বাস এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে অন্তিহার উন্মুক্ত গলদেশ। কথাটা শুনে অন্তিহা হকচকিয়ে দ্রুত এক পা পিছিয়ে গেল। তারপর চিন্তিত গলায় বলল,
“আপনি পাগল নাকি? কে বলেছিল নায়কগিরি করতে? চলুন, হাসপাতালে যাই। ওখানেই আপনার চোখের ট্রিটমেন্ট করাব।”
“আগে শাওয়ার নেব আমি।”
অন্তিহা বিরক্ত হয়ে কপালে হাত ঠেকাল।
“কানা হয়ে গেছেন, তবু গোসলের জপ বন্ধ হবে না! বলুন তো, আপনার মতো মানুষ আর একটা আছে?”
___________
অচেতন অহীন হাসপাতালের একটি বেডে শুয়ে আছে। মাথার পাশে বসে আছে শুধু তার মা আর তার সবচেয়ে প্রিয় নারী আশা। মেয়েটা নিঃশব্দে কেঁদেই চলেছে। কান্নার কোনো শব্দ নেই, শুধু চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। এতক্ষণে সে জেনে গেছে অহীন কী করেছে। তাই নিজের কেবিনে না থেকে, একটু চলাফেরা করার মতো অবস্থায় আসতেই পাগলের মতো ছুটে এসেছে তার কাছে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে অহীনের অচেতন হাতটা নিজের হাতে ধরে বসে আছে সে। অহীন ধীরে ধীরে চোখের পাতা মেলে। ঘোলাটে দৃষ্টিতে চারপাশে যেন কাউকে খুঁজছে সে একসময় দৃষ্টি গিয়ে থামে আশার মুখে। ঢোক গিলে হাতে অনুভব করে পরিচিত স্পর্শ। চোখ ঘুরিয়ে দেখে, মাথার পাশে বসে আছে তার মা।
তাদের অবাক ও বিস্মিত করে দিয়ে আশার হাতটা আলতো করে সরিয়ে দিয়ে সে মাকে জড়িয়ে ধরে। কোনো কান্না নেই, কোনো কথা নেই। অথচ তার এই আচরণে আশার প্রতি একরাশ অবজ্ঞাই যেন ফুটে উঠেছে। মনে হলো, এত দিনের ভালোবাসা যেন মুহূর্তেই ভুলে গেছে সে। কুহু ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। এই ক'টা ঘণ্টা ছেলের জ্ঞান ফেরার অপেক্ষায় মায়ের মন কতটা ছটফট করেছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার নয়। শেষ পর্যন্ত ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে।
“আশাই বুঝি তোর সব? আমরা কেউ কিচ্ছু না? একটু মায়া হয় না মায়ের জন্য, বাবার জন্য? আর পাপি? তোর পাপির জন্যও মায়া হয় না? কেন এমন করলি? আশাই তোর সব? ওকেই নিজের জীবন বানিয়ে নিয়েছিস?”
অহীন মাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। মুখ গুঁজে দেয় মায়ের শরীরের ভাঁজে। ভেজা গলায় ধীরে বলে,
“সরি আম্মু... আমি অনেক সরি। হঠাৎ মনে হচ্ছিল, কেউ যেন আমাকেই আমার থেকে কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল, আমার শরীর থেকে কেউ জীবন্ত চামড়া ছিঁড়ে তুলে নিচ্ছে। খুব কষ্ট হচ্ছিল... আর কোনোদিন এমন করব না।”
কুহু ছেলের চুলে স্নেহভরে ঠোঁট ছোঁয়ায়। আদর করতে থাকে তাকে। এদিকে একে একে সবাই কেবিনে ঢুকে পড়ে। আশা তখনও নির্বাক চোখে তাকিয়ে আছে অহীনের দিকে। ডিভোর্সের পরেও অহীন কখনো তাকে অবজ্ঞা করেনি। বরং আগলে রেখেছে, যত্নে রেখেছে। অথচ আজ হঠাৎ সবকিছু বদলে গেছে। মনের ভেতর হয়তো এক বুক আশা নিয়েই বসেছিল সে অহীন চোখ খুলেই তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নেবে। কিন্তু তা হলো না। বরং সবার সঙ্গে কথা বলল, সবার বুকে মাথা রাখল, অনুতপ্ত কণ্ঠে ক্ষমা চাইল, অথচ আশা নামের মানুষটার যেন এই কেবিনে কোনো অস্তিত্বই নেই। সবার মুখে আশার কথাও শুনল অহীন। একবার শুধু আড়চোখে তাকিয়েছে তার দিকে। তবুও ডাকল না। বলল না,
“পেঁচি, কাছে আয়... আমার বাচ্চাদের কেন কষ্ট দিলি?”
______
হাসপাতালের করিডোর দিয়ে ধীরে ধীরে আয়াশকে ধরে হাঁটছে অন্তিহা। যেহেতু আয়াশ তেমন একটা বিরক্ত করছে না, তাই শুরুতেই সে অহীনকে দেখে আসতে চায়। গাড়িতে আসার পুরোটা পথ আশা আর নিজের সম্পর্কের সবকিছুই বলেছে আয়াশ। যদিও অন্তিহা একবারও কৈফিয়ত চায়নি, তবুও লোকটা গাড়ির সিটে চোখ বন্ধ করে হেলান দিয়ে নিখুঁতভাবে সব বলে গেছে। আয়াশকে করিডোরের বেঞ্চে বসিয়ে অন্তিহা হন্তদন্ত হয়ে অহীনের কেবিনে ঢুকে পড়ে।
অহীন বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে। সৃজন ধমকাতে ধমকাতে জুস খাওয়াচ্ছে তাকে। গলায় মোটা ব্যান্ডেজ প্যাঁচানো। মুখটা অস্বাভাবিক লাল হয়ে আছে, যেন চামড়া ফেটে এখনই রক্ত গড়িয়ে পড়বে।
ভাইকে সুস্থ দেখে দরজাতেই থমকে যায় অন্তিহা। আর এগোয় না। দূর থেকেই তাকিয়ে থাকে। সে জানে, অহীন তাকে কোনো দিনই খুব একটা পছন্দ করেনি। লোকটার বিশ্বাস, তাদের মা দীর্ঘদিন অন্তিহার কারণেই অসুস্থ ছিলেন। অন্তিহার ফোলা, লালচে চোখ-মুখ দেখে অহীন মুচকি হেসে ফেলে। বোনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজেই হাত বাড়িয়ে ডাকে,
“লাল হয়ে আছিস কেন? আমাকে দেখে সুখে কাঁদছিস, নাকি কষ্টে? সম্পত্তির ভাগ বাঁচতে বাঁচতে আবার দুই ভাগ হয়ে গেল। এই ছিল তোর মনে?”
ভাইয়ের মুখে এমন কথা শুনে মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় সে। অহীন কোনো দিনই অন্তিহার সঙ্গে এভাবে রসিকতা করেনি। আজ প্রথমবার ঠিক একজন ভাইয়ের মতো কথা বলল। এতেই আবেগ আর আটকে রাখতে পারল না অন্তিহা।
“ভাইয়াআআ...!”
বলে দৌড়ে গিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে গলা। অভিমান আর অভিযোগে ভরা কণ্ঠে বলতে থাকে,
“এভাবে কেন করলেন? গান গাইতে গাইতে কেউ মরতে যায়? কত শান্তিতে সব ভুলে শুনছিলাম আমি!”
ব্যথায় কুঁকিয়ে ওঠে অহীন। সৃজন দ্রুত অন্তিহার হাত আলগা করে দেয়। অহীন ভাঙা গলায় থেমে থেমে বলে,
“লোভী মেয়ে, ছাড় বলছি। সম্পদের লোভে হাসপাতালে এসে আমাকে মারতে চাস?”
সরে আসে অন্তিহা। বারবার নাক টানতে টানতে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। গলায় চাপ লাগায় অহীন একটু নড়ে বসে। অন্তিহা ধীরে জিজ্ঞেস করে,
“আম্মু, আব্বু কোথায়, মামা?”
সৃজন হেসে বলে,
“এই তো, সবে বাসায় গেছে।”
“আপনিও যান। আমি আছি ভাইয়ার সঙ্গে। কাল থেকে তো সামলাচ্ছেন।”
সৃজন অহীনের দিকে তাকায়। অহীন নির্লিপ্ত গলায় বলে,
“যাও। আমি আর উল্টোপাল্টা কিছু করব না।”
সৃজন এগিয়ে এসে অহীনের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। অহীন চোখ বুঝে আদর গ্রহন করে। কতটা মায়া দিয়ে বড় করেছে মানুষটা তাকে! জন্মদাতা না হলেও অন্তিকের চেয়ে একটুও কম ভালোবাসেনি অহীনকে, বরং একটু বেশিই। টাকা-পয়সা, খাওয়া-দাওয়া, ফ্রান্সে চলে যাওয়ার পর কোনো কিছুর অভাব হতে দেয়নি। বাইরে থেকে কেউ শুনলে হয়তো বিশ্বাসই করবে না পরের সন্তানকে কেউ এত আদরে বড় করতে পারে! কিন্তু কুহু, অন্তিক আর অহীন জানে, নিজের সন্তান না হয়েও সৃজন আর জেইন তার মা-বাবার চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে।
অহীনের এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে সৃজন নিচু গলায় বলল,
“তোমার মা-বাবা এলে আমি চলে যাব। তোমরা কথা বলো। আমি বাইরে আছি, দরকার হলে ডাকবে।”
সৃজন বেরিয়ে যেতেই অন্তিহা চুপচাপ এসে অহীনের পাশে বসে। কেবিনজুড়ে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। কেউ কোনো কথা বলে না। শেষ পর্যন্ত অহীনই নীরবতা ভাঙে।
“সেই কখন আমার জ্ঞান ফিরেছে, তুই এখন এলি!”
অন্তিহা চোখ মুছে নিচু গলায় শুরু থেকে সব বলতে থাকে। কীভাবে অহীনকে রুম থেকে বের করা হয়েছিল, তারপর একে একে সব ঘটনা। এমনকি আশা আর আয়াশের বিয়ে নিয়ে আয়াশ যা বলেছে, তাও। সব শুনে অহীন চুপচাপ হাত বাড়িয়ে বোনকে কাছে টেনে নেয়। মাথাটা নিজের পাঁজরের কাছে আলতো করে রেখে জিজ্ঞেস করে,
“ভাইয়া তোকে একটুও পাত্তা দেয় না, মায়াও করে না। তবু তার জন্য এভাবে কেঁদে চোখ লাল করার কী মানে বল তো?”
অন্তিহা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। নিস্তব্ধ কেবিনে মিনমিনে গলায় বলে,
“নারীর জীবনে সবচেয়ে আপন আর সবচেয়ে পর দুই রূপেই জড়িয়ে থাকে বাবা, স্বামী আর ভাই। তারা অবজ্ঞা করলেও জীবন থেকে ফেলে দেওয়া যায় না। বেঁচে থাকতে তারা যতই দূরে ঠেলে দিক, তাদের অবর্তমানে আমরা বড় নিঃস্ব... বলতে গেলে এতিম। হয়তো সেই শূন্যতার ভয়েই আপনার জন্য কেঁদেছি।”
মৃদু হেসে ওঠে অহীন।
“সব সময় বিবেকটাই চালাস। একটু আবেগটাকেও নাড়াচাড়া দে।”
অন্তিহাও ক্ষীণ হেসে বলে,
“আমি যখন নিজের বিবেক দিয়ে নিজের জন্য সিদ্ধান্ত নিই, তখনই ভালো হয়। আর আবেগ দিয়ে ভাবতে গেলেই কষ্ট পাই। তাই এখন মনকে জীবনের ওপর প্রভাব ফেলতে দিই না।”
অন্তিহার কথাগুলো অহীনের কেমন যেন অন্য রকম লাগছে। মনে হয়, বয়সে ছোট হলেও মেয়েটা যেন তার চেয়েও বেশি পরিণত। অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে বাঁচতে শিখিয়ে দিচ্ছে তাকে। ঠিক তখনই দরজায় টোকা দিয়ে সৃজন ঢোকে। এদিক-ওদিক না তাকিয়ে সরাসরি অন্তিহার দিকে তাকিয়ে চিন্তিত গলায় বলে,
“অন্তু, বাইরে আসো মা। আয়াশ তোমার জন্য পাগল হয়ে গেছে।”
অহীনের বুক থেকে মাথা তুলে বসে অন্তিহা। সৃজন আবার বেরিয়ে যায়। উঠতে নিতেই অহীন নিচু গলায় বলে,
“আয়াশ মনে হয় তোকে পছন্দ করে।”
থমকে যায় অন্তিহা। কিছুক্ষণ ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
“দ্বিতীয়বার কারও প্রতি অনুভূতি তৈরি হওয়া সম্ভব?”
“কেন সম্ভব নয়? অবশ্যই সম্ভব।”
“তাহলে আমি আর আপনি কেন পারি না?”
অহীন কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে বোনের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,
“কারণ সবার ভালোবাসার ধরন এক রকম নয়। আমরা দ্বিতীয় কাউকে ভালোবাসতে চাই না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে থেমে যাই। একজন মানুষকেই নিজের ভেতর আটকে রাখি। দ্বিতীয় ভালোবাসাকে প্রায় অপরাধ, এমনকি প্রাণঘাতী মনে হয়। কিন্তু ওরা? ওরা সময়ের স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে শেখে। বুঝে যায়, অনুভূতিগুলো সারাজীবন আটকে রাখলে বেঁচে থাকাটাই কঠিন হয়ে যায়। তাই একসময় দ্বিতীয়বারও প্রেমে পড়ে।”
অন্তিহা ধীরে বলে,
“তাহলে তো আমাকে না পেলে তৃতীয়জনও একই জায়গায় চলে যাবে। আমি আমার ভাইয়ের মতো কাউকেই চাই। যার সঙ্গে হাজারো ভুল-অন্যায় করলেও সে শুধু আমারই থাকবে। যার জীবনে দ্বিতীয় কারও কোনো জায়গা থাকবে না।”
অহীন মৃদু হেসে বলে,
“তার মানে এই নয় যে তারা ভালোবাসে ইচ্ছে করে দ্বিতীয়জনকে ছাড়বে। হয়তো ভালোবাসার মানুষটাকে দ্বিতীয়বার পাওয়ার পর তাদের যত্ন, আদর আর আগলে রাখার প্রবণতা আরও বেড়ে যায়। তারা ভয় পায় দ্বিতীয়জনকেও হারাতে। কারণ তারা জানে, ভালোবাসার মানুষকে হারানোর কষ্ট ঠিক কতটা গভীর। সবাই যদি প্রথম ভালোবাসার কথা ভেবে দ্বিতীয়বার ভালোবাসতেই না চায়, তাহলে তাদের বেঁচে থাকার আকর্ষণটাই বা কোথায় থাকবে?”
অন্তিহা নিচু গলায় হেসে বলে,
“আপনি আয়াশের তরফদারি করছেন?”
অহীন গলা খাঁকারি দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
“কখনোই না। আগেও ওই স্যানিটাইজারকে পছন্দ করতাম না, এখনো করি না, ভবিষ্যতেও করব না। আমি তোর কথা ভাবছি।”
ঠিক তখনই বাইরে থেকে আয়াশের গলা ভেসে আসে,
“অন্তিইইইইই...!”
কান ফাটানো চিৎকার শুনে অন্তিহা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াতে পারছে না। দ্রুত কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। বোনের চলে যাওয়ার দিকে চুপচাপ তাকিয়ে রইল অহীন।
কেবিনের বাইরে এসে অন্তিহা দেখে, আয়াশের পাশে দাঁড়িয়ে আছে সৃজন। লোকটা মিটিমিটি হাসছে। সাথে কয়েকজন ওয়ার্ড বয় ও নার্স মুখ চেপে হাসছে। আর আয়াশ একই দিকে তাকিয়ে রাগে গাল-নাক লাল করে বিড়বিড় করছে,
“ও জানে, আমার গায়ে কেউ টাচ করলে আমি সহ্য করতে পারি না। এখনো শাওয়ারও নিইনি। ও কীভাবে নার্স পাঠাতে পারে আমার কাছে?”
অন্তিহারও রাগ হলো। বড় বড় পা ফেলে সামনে গিয়ে কড়া গলায় বলল,
“সমস্যা কী, আয়াশ? চেঁচামেচি করছেন কেন? বসে থাকতে বলেছিলাম তো!”
আয়াশ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ওয়াশরুমে যাব।”
“তাহলে মামা আছেন এখানে। উনাকে নিয়ে যান।”
“উনি সবে অহীন নামের রোগীর সেবা করে এসেছেন। তুমি নিয়ে চলো আমাকে...”
তৎক্ষনাৎ আয়াশের থেকে বড় গলায় চেচিয়ে ওঠে,
“কীহহহহহহ?”
চলবে.