ফন্ট সাইজ:
থিম:
দূরত্বের প্রণয় ২

৫৫তম পর্ব

লেখক: স্বর্ণালী ইসলাম

#দূরত্বের_প্রণয়_২

#স্বর্ণালী_ইসলাম

পর্বঃ৫৪

হাসপাতালের পাবলিক টয়লেটগুলো বরাবরই একটু দুর্গন্ধময় আর অস্বাস্থ্যকর হয়ে থাকে। যেখানে আয়াশ সামান্য একটু নোংরা বা দুর্গন্ধও সহ্য করতে পারে না, সেখানে এতক্ষণ থাকাটা তার জন্য এক প্রকার শাস্তি। আয়াশ অনেক আপত্তি করা সত্ত্বেও অন্তিহা তাকে সৃজনের সঙ্গে হসপিটালের ডাক্তারদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ টয়লেটটিতে পাঠিয়েছে। এতে যে মেয়েটার নিজের ব্যস্ততা খুব একটা কমেছে তা নয়, অহীনের পাশে পাশেই তাকে থাকতে হচ্ছে।

​এমন সময় কেবিনের দরজায় খটখট শব্দ হতেই দুজন দরজার দিকে তাকায়। মুখে অমাবস্যার অন্ধকার নামিয়ে সৃজনের পাশে এসে দাঁড়িয়ে আছে আয়াশ। চোখ গুলো বারবার ঝাপটাচ্ছে অসস্থিতে কেননা দেখতে পারছে না কিছুই। অন্তিহা বসা থেকে উঠে তাদের সামনে যায়। আয়াশের বিরক্ত মুখভঙ্গি দেখে বেশ খোঁচা দিয়ে বলল,,

“আপনার দুনিয়া শান্ত হয়েছে?”

​আয়াশ কোনো ভাবান্তর না দেখিয়ে একদম নিস্পৃহ গলায় উত্তর দিল,

“না। হাত ধুয়ে দাও আবার।”

​অন্তিহা চোখ কপালে তুলে বলল,

“এখনো হাত ধোননি? ইয়াক!”

​পাশ থেকে সৃজন জবাব দিল,

“ধুয়েছে তো! দেখো হাতের চামড়া ক্ষয় হয়ে গেছে কি না। তবুও তো আমাকে বিশ্বাস করে না ও!”

​অন্তিহা আর কথা না বাড়িয়ে আয়াশকে নিয়ে চলে গেল। তবে মনের ভেতর এক সামান্য অপরাধবোধ বা গিল্টি ফিলিং কাজ করছে মেয়েটার। তার জন্যই তো লোকটা ওখানে গিয়েছিল এবং নিজের চোখের ওপর এমন মারাত্মক চোট পেল। এখন তো তার নয়নজোড়া প্রায় হারানোর উপক্রম!

___

​সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পেরে ওঠা ভীষণ কঠিন। তাই তো সাফওয়ান ঠিক যেই সময়টায় নিজের 'মিস গম্ভীর'-এর কাছাকাছি থাকার কথা ছিল, সেই মূল্যবান সময়টা তাকে প্লেনেই কাটাতে হয়েছে। নিজের বাড়ির ভেতর একরাশ ক্ষোভ আর বিরক্তি নিয়েই সে প্রবেশ করে।

​ফটক পার হতেই সামনে এসে দাঁড়াশ তার বাবার দ্বিতীয় পক্ষের ছেলে শাহেন। সাফওয়ান গাড়ি থেকে নেমে কেবল শান্ত গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল

“অন্তিহা কোথায়, শাহেন?”

​শাহেনের চোখ-মুখ মুহূর্তের মধ্যে রাগে জ্বলে উঠে। বাবার সেই করুণ পরিণতি আর নিজের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া গুলির দৃশ্যটা মনে করে সে এখনো রীতিমতো ভড়কে আছে। রাগি গলায় বললে,

“একটা ছেলে এসেছিল... ড্যাডকে গুলি করেছে।”

​থমকে দাঁড়ায় সাফওয়ান। আয়াশ এসেছে, এটা বুঝতে তার এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। তবে আয়াশের মতো ছেলে এভাবে সরাসরি এসে শুট করেছে? এটা যেন সাফওয়ানকে চরম বিস্ময় লাগছে। সে এক পা পিছিয়ে এসে ভারী গলায় বলে

“কেন শুট করল?”

​“ওই মেয়েটার জন্য।”

​সাফওয়ানের মুখাবয়ব এক লহমায় পাথরের মতো শক্ত হয়। সে শাহেনের দিকে তীক্ষ্ণ, ভেদনকারী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলে,

“সিসিটিভি ক্যামেরা আছে না? ফুটেজ দেখা আমায়।”

​শাহেন সাফওয়ানকে তেমন একটা পছন্দ না করলেও, বাবার মুখ থেকে সে বহুবার শুনেছে এই লোকটার রাগ কতটা চড়া আর ভয়ঙ্কর হতে পারে। তাছাড়া নিজের মনেও আয়াশের প্রতি তীব্র ক্ষোভ জমে আছে। তাই কোনো রূপ দ্বিধা ছাড়াই সে পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করে ফুটেজটা অন করে।

​লিভিং রুমের ভেতরে কোনো ক্যামেরা না থাকলেও দরজার কাছের ক্যামেরার ফুটেজে আধো-আবছা আলোয় সবকিছু বেশ ভালোই দেখা যাচ্ছে। সাফওয়ান একদৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে দেখছে। প্রতিটা দৃশ্য যেন তার মস্তিষ্কের কোষে কোষে আটকে যাচ্ছে। তার চোখ বারবার গিয়ে থমকে যাচ্ছে তার সেই মিস গম্ভীরের চেহারার দিকে। এখানে এসে যত্নের অভাবে প্রেয়সীর গাল দুটো যে একটু ভেঙে গেছে, শুকিয়ে গেছে, সেটুকুও তার তীক্ষ্ণ চোখ এড়াল না। কতগুলো দিন ধরে মেয়েটার কাছে মিনতি করেছে একটা ভিডিও কল দেওয়ার জন্য, কিন্তু পাষণ্ড নারী তাকে পাত্তাই দেয়নি!

​তাই তো আজকের এই দূর থেকে দেখার আনন্দটাও তার কাছে অন্য রকম। ফুটেজে যখন আয়াশ আসার সাথে সাথে অন্তিহা বাঁকা প্রশ্নটা ছুড়ে দিল, সাফওয়ানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে। ভিডিওতে কোনো সাউন্ড নেই, তবুও প্রেয়সীর অধরের কম্পন আর শরীরের ভঙ্গি দেখেই সে তার ভেতরের সব নালিশ আর ইঙ্গিত বুঝে ফেলল।

​পরের মুহূর্তেই...

ঠাস!

​আয়াশের সেই গুলির শব্দ। মুহূর্তেই সাফওয়ানের চোয়াল শক্ত হয় দাঁতে দাঁত চেপে সে ঠোঁট জোড়া কামড়ে ধরে। শাহেনের হাতে ফোনটা ফিরিয়ে দিয়ে সে সোজা সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায়। অত্যন্ত ঠান্ডা অথচ হাড়হিম করা গলায় জিজ্ঞেস করল,

“তোর বাপ কই?”

​শাহেন আতঙ্কে জোরে ঢোক গিলে বলল,

“উপরে... ডান দিকের দ্বিতীয় কক্ষে।”

​সিঁড়ি দিয়ে ধুপধাপ করে উঠে সাফওয়ান ঠিক সেই কক্ষের সামনে গিয়ে ধাক্কা দিয়ে প্রবেশ করে। বিছানায় শরীর এলিয়ে শুয়ে আছেন লোকটা, পায়ে সাদা ব্যান্ডেজ করা। সাফওয়ানকে ঘরে ঢুকতে দেখে লোকটার ঠোঁটে এক হাসি ফুটে উঠে। বয়স হলেও চেহারার সেই পুরনো আভিজাত্য আর সৌন্দর্য এখনো কমেনি লোকটার।

​সাফওয়ান ধীরপায়ে লোকটার দিকে এগিয়ে গেল, তার চোখ দুটো রাগে রি রি করছে। লোকটা ক্ষীণ, দুর্বল গলায় বলল,,

“তোমাকে এত কাছ থেকে দেখার পর মনে হচ্ছে মৃত্যুটাও এখন শান্তির হবে।”

​“উউউ... তাই? তাহলে শান্তির হোক আপনার মৃত্যুযাত্রা!”

​সাফওয়ান আর কথা বাড়ায় না, আর না নিজের জন্মদাতার কোনো রূপ আকুতি শুনছে। পাশে থাকা ছোট টি-টেবিলটার ওপর থেকে একটা ধারালো নাইফ এক ঝটকায় তুলে সে। আর কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাবার ঠিক বুকের মাঝখানে আচানক ওটা গেঁথে দিল!

​এ পর্যায়ে এসে সাফওয়ানের চোখ জোড়া কামে লাল হয়ে উঠে। সে এক প্রকার ভাঙা, উগ্র গলায় চিৎকার করে বলল,

“আমার মম আর তার হাসবেন্ডকে আমি অনেক ভালোবাসতাম! কী দরকার ছিল আপনার তাদের খুন করার?”

​লোকটি বাঁচার আকুতিতে সাফওয়ানের হাত দুটো চেপে ধরেছে। কিন্তু বুকের ভেতর নাইফটির অস্বাভাবিক ও নির্মম নড়াচড়ায় লোকটার শরীরের সমস্ত শক্তি দ্রুত ক্ষয় হয়ে আসতে থাকে। সাফওয়ান নিজের এক হাত দিয়ে ওনার দুটো হাত অবলীলায় সরিয়ে দিল এবং নাইফটি ডান দিক দিয়ে টেনে বের করে আনল। রক্ত ফিনকি দিয়ে ছুটে আসতেই, আবারও একটা সজোরে ঘাই মারল বুকের অপর পাশে!

​“আমি অন্তিহাকে খুব ভালোবাসি! ওর গায়ে হাত তোলার সাহস আপনি পেলেন কোথায়? আপনি জানেন না, ওর মুখের ওপর একটা পাল্টা তর্ক করার সাহসও আমি কোনোদিন করি না?” গর্জে উঠল সাফওয়ান, “সব জানেন, অথচ এতটুকু জানেন না কেন?”

​আবারও টেনে বের করল নাইফটা। দরজার কাছে এসে থমকে দাঁড়িয়ে যায় শাহেনের পা। সাফওয়ান বদমেজাজি, খারাপ এসব সে অনেক শুনেছে। কিন্তু একটা মেয়ের জন্য সে যে নিজের জন্মদাতা বাবাকে এভাবে খুন করতে পারে, তা তার বাবাও কখনো কল্পনা করতে পারেনি।

​সাফওয়ান এবার লোকটার পেটের ওপর চড়ে বসে। তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে, সে রীতিমতো ডুকরে কেঁদে দিল। তীব্র রাগ, ক্ষোভ আর পাগলামি নিয়ে সে বারবার নাইফটি লোকটার বুক আর গলার কাছে এলোপাতাড়ি গেঁথে দিচ্ছে। সে কাঁদছে আর পাগলের মতো চেঁচিয়ে বলছে,,

​“আমাকে আর আমার মমকে আপনি একা ফেলে চলে গিয়েছিলেন! ওই গলির গ্যাংস্টার লোকটা আমাকে কখনো একটা ড্যাডের অভাব বুঝতে দেয়নি। সেই মানুষটাকে আর আমার মমকে আপনি মেরে ফেললেন? আর আমার মিস গম্ভীর... উনি আমার জীবনে আসার পর আমি কত ভালো হয়ে গিয়েছিলাম, জানেন আপনি? নিজের পদ হারিয়েছিলাম, তবুও মেয়েটাকে দেখার পর আমি ড্রিংক করা পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছি! যদি কোনো কারণে সে আমাকে খারাপ ভেবে ছেড়ে চলে যায় সেই ভয়ে! আর আপনি... আপনি ওই মেয়ের গায়ে হাত তুললেন?”

​সাফওয়ান হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এক উন্মাদের মতো বলতে থাকে,,

“এভাবে কেন ব্যবহার করলেন ওনার সঙ্গে? এখন মেয়েটা আমার সম্পর্কে কী ভাববে, আপনার কোনো ধারণা আছে? কতটা রাগী আর জেদি মেয়ে আমার অন্তিহা! কিছু বলুন? এত বড় ঝামেলা তৈরি করে দিলেন আমার জীবনে, এবার প্লিজ কিছু বলুন আমাকে! কিছু সাজেস্ট করুন—কীভাবে রাগ ভাঙাব ওনার? ফুল দেব? চকলেট? নাকি বই... হ্যাঁ, বই! বই দিলে ও খুশি হবে, হুম।”

​কথাটা বলেই বাবার নিথর পেটের ওপর থেকে নেমে এলো সাফওয়ান। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সে দরজার দিকে তাকায়। শাহেন দরজায় দাঁড়িয়ে চরম বিস্ময় আর তীব্র আতঙ্কে তার দিকে তাকিয়ে আছে, ছেলেটার হাঁটু দুটো থরথর করে কাঁপছে।

​তার এমন অস্বাভাবিক কম্পন দেখে সাফওয়ান নিজের শরীরের দিকে তাকায়। পুরো শরীর আর মুখমণ্ডল রক্তে মাখামাখি হয়ে আছে তার। এতক্ষণ সে খেয়ালই করেনি এসব। আর বিছানায় পড়ে থাকা বাবার নিথর শরীরের বুকটা চিরে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।

​সাফওয়ান একটা লম্বা শ্বাস ফেলে একদম নিচু গলায়, স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,,

“একটা শাওয়ার নেব। এক্সট্রা কোনো কাপড় আছে তোর?”

​“ড... ড্যাড...”

​“উনি এমনিতেও আমাদের জন্য কিছুই করেননি। তোর মম, আমার মম, সবার জীবনই এই লোকটা নষ্ট করেছে। নিজের মুখটা একদম বন্ধ রাখবি। বাংলাদেশে এসব মার্ডার-টার্ডার কোনো বড় বিষয় না।”

______

​শিকদার বাড়িতে নেওয়া হয়েছে আশাকে। আর অহীনকে আনা হয়েছে ফ্ল্যাটে। বিছানায় আধশোয়া হয়ে চুপচাপ বসে নিজের ফোন স্ক্রল করছে অহীন। গলায় মোটা ব্যান্ডেজটার জন্য ঘাড় একদমই নাড়াতে পারছে না ছেলেটা, শরীরজুড়ে তীব্র ক্লান্তি আর মনের ভেতর একরাশ হতাশা।

​এমন সময় ঘরে প্রবেশ করে কুহু, তার ঠিক পেছনেই অন্তিক। দুজন এসে সরাসরি ছেলের বিছানার পাশে বসে, কুহু একটু শাসনসুলভ ধমকের সুরে অহীনের দিকে তাকিয়ে বলে,

“যাই হয়ে যাক না কেন, হাত থেকে ফোনটা ফেলা যাবে না, তাই না?”

​অহীন ফোনটা পাশে রেখে দিল। চোখ-মুখ ভার করে অত্যন্ত অভিমানী আর ধীর গলায় বলল:

“বিশ্বাস করো আমি পারলো আলাদা একটা সংসার পেতে নিতাম আমার ফোনের সঙ্গে।”

​অন্তিক তার কথা শুনে শব্দ তুলে হেসে দেয়। তারা এসেছে অহীনের সঙ্গে আশা-কে নিয়ে অল্প কিছু আলোচনা করতে। পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। মেয়েটা বিষ খেল, আর অহীন বিষাদের ঘোরে নিজেকে ফাঁসি দিতে গেল! আর এখন আশা গর্ভবতী! ডিভোর্স থেকে শুরু করে এই অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তান সবকিছু যেন এখন কেবল আশা আর অহীনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং পুরো পরিবারটাকেই এলোমেলো করে দেওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে।

​অন্তিক ছেলের আর একটু কাছ ঘেঁষে বসে। তার চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে নরম গলায় শুধায়

“কেন এমন করলে অহীন? বাস্তবতা তো আমাদের মানতেই হবে। ভুল তোমরা দুজনেই করেছ, তাই বলে কি বাঁচাটাই থামিয়ে দেবে?”

​কুহু অহীনের দিকে তাকিয়ে নিচু কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলল

“আমাকে হয়তো এই মুহূর্তে তোমার খুব নিষ্ঠুর মনে হতে পারে, অহীন। কিন্তু তোমাদের এই সম্পর্কের আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই, এটা তোমাদের দুজনেই যত দ্রুত মেনে নাও, ততই মঙ্গল। এভাবে জেদ ধরে সারাজীবন কাটে না। নিজেকে এবার মানিয়ে নাও, আশা-হীন বাঁচতে শেখো।”

​অহীন ঠোঁট কামড়ে ধরে দুজনের কথার পিঠে নিজের মনের সব জমানো ক্ষোভ উগরে দোয়,,

“আমি ওর ওপর ক্ষণিকের জন্য অভিমান করে দূরে থাকতে পারব ঠিকই, কিন্তু ওকে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি জানি এসব পাগলামি, এই আবদার, সবকিছু আমাদের সমাজের নীতিমালার বাইরে। তবুও আমি অন্য কারও সাথে ওকে সহ্য করতে পারব না। ইন ফিউচার তোমরা যদি আবার ওর বিয়ে দিতে চাও, আমি তা নিজের চোখে দেখতে পারব না। তাই আমার কোনো গ্যারান্টি নেই যে, ভবিষ্যতে আমি আবার এমন কোনো পাগলামি করব না!”

​অন্তিক একটু তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,

“এতই যখন ভালোবাসা, তাহলে ওকে ছেড়ে দিলে কেন? মেয়েটা এখন প্রেগন্যান্ট, অথচ হাসপাতালে ওকে ওভাবে ইগনোর করলে কেন?”

​তার প্রশ্নে মুহূর্তের মধ্যে ভড়কে গেল অহীন। তার গাল দুটো রাগে-অভিমানে ফুলে উঠে, চোখ জোড়া লাল হয়ে নোনা জলে ভিজে একাকার হলো। সে রুদ্ধকণ্ঠে বলল:

“ও আমাকে কথা দিয়েছিল... দূরত্ব যতই আসুক না কেন, ও কখনো আমি ছাড়া আর অন্য কারও হবে না! তাহলে ও কোন সাহসে কবুল বলল? কেন ও অন্য কাউকে মেনে নিল?”

​কুহু ছেলের দিকে আরও একটু এগিয়ে আসে। অহীন যেভাবে কাঁদছে আর বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে, তাতে তার গলার ওই ক্ষতটাতে আরও বেশি ব্যথা লাগবে। কুহু আলতো হাতে অহীনের মাথাটা চেপে ধরে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে । শান্ত করার চেষ্টা করে বলে,,

“ও তো নিজেই সুইসাইড করতে গিয়েছিল ! সেসব কথা কেন এখন তুলছো?”

​“হুম, শুনলাম!” অহীন মায়ের বুকে মুখ লুকিয়েই বলতে লাগো, “ও ভীষণ রকমের বেয়াকুব মেয়ে। ও কি এই সিদ্ধান্তটা নেওয়ার আগে একটাবারও আমার বাচ্চাদের কথা ভাবেনি? কীভাবে ও নিজের শরীরে বিষ ঢালল, বলো আমাকে?”

“ও তো নিজেই জানত না ও মা হতে চলেছে!”

​“একটা মেয়ে মা হতে চলেছে আর সে নিজে তা জানে না? বেকুব বলদি একটা! ও চাইলেই পারত এই বিয়ে জিনিসটাকে এড়িয়ে যেতে, কেউ তো ওকে জোর করে বসিয়ে দেয়নি! তবুও এসব নাটক কীসের জন্য? মানছি ও জানত না ওর গর্ভে আমাদের সন্তান আছে। কিন্তু ও কি এটাও জানত না যে ও নিজের ক্ষতি করলে আমি পাগল হয়ে যাব, মরে যাব? আমি কেবল একটা ভুল করেছিলাম, কিন্তু ওর করা হাজারটা ভুল-অন্যায় আমি সবসময় হাসিমুখে মেনে নিয়েছি। তবুও আমার বেলা ও এত স্বার্থপর কীভাবে হলো? নিজে বিষ খেয়ে মুক্ত হয়ে যাচ্ছিল, আর আমি? আমার কথা ও একটা বারও ভাবল না? আমি দূরে থেকে হলেও ওর থেকে একবিন্দু ভালোবাসা চেয়েছি। এত কঠিন তো কিছু না! আমি বারবার বলেছি, আশু... বাড়িতে এসব কিছু না জানিয়ে আমরা ফ্রান্স থাকব। আমি তাকে ছোঁব না, তাও ও রাজী হলো না! ও আসলো দেশে, আর তোমরাও জেনে গেলে। আমার জিনিস তোমরা অন্য কারও হাতে তুলে দিতে চাইলে? এসব ঠিক না, আম্মু! আমার খুব কষ্ট হয়। আর সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় তখন যখন নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটাকে অন্য কারও হতে দেখি!”

অহীনের গলার স্বর ভেঙে আসছে, বুক চিরে বের হচ্ছে অবাধ্য সব আর্তনাদ। উত্তেজনার চোটে তার পুরো শরীর কাঁপছে, গলার ব্যান্ডেজটার ওপর দিয়ে চামড়া লাল হয়ে উঠছে। সে মায়ের বুকে মুখ ঘষে বাচ্চাদের মতো ডুকরে কেঁদে উঠে,

​“ওকে চাওয়ার পর থেকে আমি কেবল কাঁদছি, আম্মু শুধু কাঁদছি আর কাঁদছি! আমি একটুখানি ভালো থাকতে চাই, খুব সামান্য একটুখানি সুখ চাই ওটাও আমার কপালে মিলছে না? তবে কোন কারণে বাঁচব আমি? এই নরকযন্ত্রণা নিয়ে আমি কীভাবে বাঁচব?”

​আঁতকে উঠে কুহু। অহীনের হঠাৎ এভাবে অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে পড়া এবং পাগলের মতো কান্না দেখে মায়ের কলিজা যেন শুকিয়ে আসছে। গলায় অত বড় ফাঁসির ক্ষত, এভাবে চিল্লালে যে যেকোনো মুহূর্তে বড় কোনো বিপদ হয়ে যেতে পারে! সে চটজলদি দুই হাতে অহীনের চোখের জল মাখা মুখটা আগলে ধরে। নিজের বুকের সাথে তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অত্যন্ত ব্যাকুল গলায় শান্ত করতে চায়,,

​“এমন করে না বাবা... লক্ষ্মীটি, শান্ত হও! এভাবে চিল্লালে গলায় বড্ড কষ্ট হবে তো। তুমি কী চাও বলো? কীভাবে তুমি ভালো থাকবে, আমায় বলো! আমি আর আব্বু শুনছি তো, বাব...”

​সে মাথা দুলিয়ে কুহুর হাতের ওপর নিজের কাঁপাকাঁপা হাত দুটো রাখে। তারপর একদম শেষ সম্বলটুকু আঁকড়ে ধরার মতো ব্যাকুল ও আর্তিভরা গলায় বললে

​“আমি আশাকে চাই, আম্মু! আশাকে চাই... আর ওর শরীরে থাকা আমার নিষ্পাপ সন্তানও চাই। ওদের আমার কাছে ফিরিয়ে দাও। আমি তাহলেই ভালো থাকব, খুব ভালো থাকব।”

​অহীনের এমন অবুঝ আবদার শুনে অন্তিক এগিয়ে আসে। ছেলের মাথায় স্নেহের হাত রেখে বলল,

“ওকে ডান, আশাকে এনে দেবো তোমার কাছে। তবে নিজের সীমানায় একটা লাল দাগ টেনে নিও, যা কোনোভাবেই অতিক্রম করা যাবে না। মনে থাকবে?”

​অহীন দ্রুত মাথা দোলায়। সে সব নিয়ম মেনে নিতে প্রস্তুত, শুধু ওই মেয়েকে অন্য কারও পাশে সে সহ্য করতে পারবে না। পাশে দাঁড়িয়ে কুহু স্বামীর মুখের দিকে করুণ চোখে তাকায়। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে এসবই অহীনকে শান্ত করার জন্য কেবলই এক মন ভোলানো সান্ত্বনা!

___

​শিকদার বাড়িতে আজকের পরিবেশটা একদম অন্য রকম। আয়াশের দাদি গত দিন থেকেই এখানে আছেন। নাতির চিন্তায় মহিলাটির বোধহয় এখান থেকে প্রস্থান করার কোনো ইচ্ছাই ছিল না। আয়াশকে একজন ভালো ডাক্তার দেখিয়ে অন্তিহা নিজেই শিকদার বাড়িতে নিয়ে এসেছে। করবেই বা কী মেয়েটা? লোকটাকে এই অবস্থায় একা ছেড়ে দেওয়ার সাধ্য তো তার নেই! সেই কখন থেকে যে অন্তিহার ফোনটা বেজে চলেছে, সেদিকে মেয়েটার কোনো হুঁশ নেই।

​সোফায় আয়াশ বসে আছে, আর ঠিক তার সামনেই মন খারাপ করে বসে আছে আশা। সে কিছুক্ষণ পর পর আয়াশের দিকে তাকাচ্ছে। লোকটা কি সত্যিই কিছু দেখতে পাচ্ছে না?

​হাতে খাবারের কয়েকটা প্লেট নিয়ে সেখানে হাজির হলো অন্তিহা। প্লেটটা আয়াশের দাদির হাতে দিয়ে নিচু গলায় বলল,

“খেয়ে নিন দাদু, সারা দিন হয়তো কিছুই খাননি।”

​মহিলাটি প্লেটটা হাত বাড়িয়ে নিলেন। দুটো দিন হলো এই বাড়িতে এসেছেন, মেজাজটা পুরো খিটখিটে হয়ে আছে। যেখানে নিজের বাড়িতে এসি ছাড়া ঘুমই আসে না, সেখানে এখানে বারবার লোডশেডিংয়ের উৎপাত! আর আয়াশের দিকে খাবারের একটা চামচ এগিয়ে দিলো অন্তিহা।

​অন্তিহা এবার আশার দিকে ফিরে। একটু আগে পর্যন্ত রমনী অভিমান করে ছিল আশার ওপর, তবে এত ভালো কথা শোনার পর আর কতক্ষণই বা অভিমান ধরে রাখা যায়? আশার দিকেও হাসিমুখে একটা খাবারের প্লেট এগিয়ে দিল সে। আশা তার শীতল চোখ জোড়া তুলে তাকায়, বিয়ের পর অন্তিহার সঙ্গে তার দূরত্বটা যেন অনেকটাই বেড়ে গেছে। অন্তিহা ওর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে, তারপর আশার মলিন গালে বৃদ্ধাঙ্গুলি বুলিয়ে দিয়ে আদুরে ফিসফিসানি গলায় বলল,

“ভুল তো মানুষেরই হয়, তাই না রে? এখন একটু আমার সুনু-মুনুর কথা ভাব! বড়দের মতো চিন্তাভাবনা কর। মায়েদের তো অনেক দায়িত্ব থাকে। চিন্তা করিস না, এখন থেকে আমি তোর পক্ষেই আছি।”

​আশা এবার মুচকি হাসে। অন্তিহার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল,

“তুই খাবি না?”

“খাবো।”

​ ড্রয়িংরুমে উপস্থিত হলো আকাশ আর তাশা। আকাশের চোখে-মুখে বেশ দুশ্চিন্তার ছাপ, চোখ জোড়া আয়াশের দিকেই নিবদ্ধ। সে আয়াশের সামনে গিয়ে বসে জিজ্ঞেস করে,

“কী করে হলো এটা? ডাক্তার কী বলেছে?”

​তার আকস্মিক প্রশ্নে আয়াশ আর অন্তিহা দুজনেই অপ্রস্তুত হয়ে একটু গলা খাঁকারি দেয়, তারপর দুজনে একই সঙ্গে দুই রকম উত্তর দিয়ে বসে,

​অন্তিহা বলল, “গাড়িতে আসলে...”

আয়াশ বলল, “হাসপাতালের সামনে...”

​দুজনেই মাঝপথে থেমে গেল। কথা মিলছে না দেখে থতমত খেয়ে ফের একই সঙ্গে বলে উঠে,

​“হ্যাঁ, হাসপাতালে...”

“হুম, গাড়িতে...”

​দাঁত কিড়মিড় করে উঠে অন্তিহার। আয়াশের দিকে তাকিয়ে বলে,

“আয়াশ, আপনি অসুস্থ! আমাকে বলতে দিন।”

“তুমি আমাকে বলতে দাও।”

​অন্তিহা এবার চুপ হয়। আয়াশ বাতাসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু নিচু ও হতাশ গলায় বলতে শুরু করে,

“হাসপাতালের সামনে গাড়ি থেকে নামছিলাম। নামতেই হঠাৎ কয়েকটা বখাটে ছেলে অন্তিহার ফোনটা নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু করল। অন্তিহাকে তো চেনোই, জেদি মেয়ে! ও অমনি ওদের পেছনে দৌড় দিল...”

​এই মুহূর্তে পুরো হতবিহ্বল হয়ে গেল অন্তিহা। কী সব আজগুবি কাহিনি বানাচ্ছে এই লোক! সবার কঠিন দৃষ্টি এবার অন্তিহার দিকে। আকাশ তো রীতিমতো ধমকেই উঠেছে তাকে,

“ফোন গেলে নতুন একটা এনে দিতাম! তুমি কেন ওসব বখাটে ছেলেদের পিছু নিতে গেলে?”

​হতভম্ব অন্তিহা আমতা আমতা করে,

“আ... আমি...”

​তাশা আলতো করে অন্তিহার মাথায় একটা চাঁটি মেরে বলে,

“চুপ করো ! আয়াশ, তুমি বলো, তারপর কী হলো?”

​আয়াশ চোখে-মুখে আরও বেশি ব্যথা আর হতাশার অভিনয় ফুটিয়ে তুলে বলে,

“এতগুলো বখাটের পেছনে ওকে একা কীভাবে ছেড়ে দিই বলো? যেখানে ও আমার এত প্রিয়...”

​আশা পাশ থেকে ফোড়ন কাটে,

“প্রিয় নয় আয়াশ, প্রেয়সী।”

​তার কথায় আয়াশ থামল না, আর না অন্য কেউ ওটাতে কান দিল। কারণ সবার কাছেই এটা এক অর্থহীন কথা, যা বাড়ির কারও কল্পনাতেও নেই! আয়াশ মনে মনে একটু হেসে আবার বলতে লাগে,

“আমি পিছু নিলাম। ওখানেই দেখলাম একটা ছেলে ওর হাত ধরেছে। ব্যাস, আমার শুচিবায়ু এক পাশে সরিয়ে রেখে ওর জন্য ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। তখনই একটা ছেলে হঠাৎ চোখে...”

​কথাটা শেষ না করেই হতাশায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। সঙ্গে সঙ্গে হা-হুতাশ শুরু করে দিলেন আয়াশের দাদি,

“ইয়া আল্লাহ! আমার এমন সুস্থ নাতিটা এই অলক্ষ্মী বাড়িটায় কেন যে আসে! আজ অন্ধ হয়েছে, কাল হয়তো পঙ্গু হয়ে যাবে! আয়াশ রে, কেন এলি বল তো এখানে? এই দুনিয়ায় কি মেয়ের অভাব পড়েছিল? বিয়ে করতে এসে জীবন দোষ নিয়ে ফিরছিস? বিয়ে করবি কেমন করে?”

মহিলাটি বসা থেকে উঠে আয়াশের দিকে এগিয়ে আসতেই আয়াশ চরম বিরক্তিতে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলেছে। নির্ঘাত জড়িয়ে ধরবে এখন! উফ, এই নোংরা স্পর্শে আজ সে মরেই না যায়! কিন্তু চাইলেও সে একচুল সরতে পারছে না অন্তিহা যদি একবার টের পায় সে অভিনয় করছে, তবে একদম লাথি দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেবে। মেয়েটাকে সে কম জ্বালায়নি! আয়াশকে ছোঁয়ার ঠিক আগমুহূর্তে দরজায় এসে দাঁড়াল অন্তিক আর কুহু।

​তাদের কণ্ঠস্বরে ঘরের থমথমে ভাবটা ভাঙে

“কী হয়েছে? এমন কান্নাকাটি হচ্ছে কেন?”

​আয়াশের দাদি আয়াশকে আর ছোঁয়ার সুযোগ পেলেন না। আয়াশ যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে। ধক করে একটা ঢোক গিলে মনে মনে বলল, ‘মরতে মরতে বেঁচে গেলাম!’

​মহিলাটি আয়াশের ঠিক পাশে সোফায় ধপ করে বসে নিজের কপালে হাত দিলেন। অন্তিহাকে ওনার সহ্যই হচ্ছে না, সব তো এই মুখপুড়ির জন্যই হয়েছে! এখন অন্তিক আর কুহুকে দেখে ওনার অভিনয়ের মাত্রা যেন আরও এক ধাপ বেড়ে গেল। ঘরের বাকি সবার চোখ তখন দরজায় দাঁড়ানো নবাগতদের দিকে। এই মোক্ষম সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইল না আয়াশ। সে ফিসফিস করে দাদির কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,

“আপনাকে আমি একটুও পছন্দ করি না। তবে আজকে করতে পারি। এই বিলাপটা ততক্ষণ চালিয়ে যান, যতক্ষণ না আমাকে একদম অসহায় প্রমাণ করে অন্তিহার ঘাড়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে।”

​দাদি চরম চমকে উঠলেন। চোখ বড় বড় করে নাতির দিকে তাকালেন। আয়াশ জবাবে আলতো করে পলক ফেলে যার অর্থ, ‘আমি যা বলছি, তা-ই করুন।’ দাদি এবার কুহুর দিকে তাকিয়ে একটু এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন। আয়াশের দিকে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন,

“চোখ এখন কেমন তোমার?”

​এখন আর অন্য কারও উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন হলো না। আয়াশের দাদি তো নিজেই একশো! তিনি যেন জ্বলে উঠলেন,

“চোখ? আমার সোনার নাতিটার চোখের এই অবস্থা তো তোমার মেয়ের জন্যই হলো! আর এখন এসে জিজ্ঞেস করছ কেমন আছে? এতক্ষণে আসার সময় হলো তোমাদের? এখন আমার আয়াশের কী হবে শুনি?”

​সবে এসে এমন অতর্কিত আক্রমণের মুখে পড়ে হতভম্ব হয়ে গেল অন্তিক আর কুহু। কথার পিঠে তারা কেবল জিজ্ঞেস করে

“মানে? কী হয়েছে আকাশ ভাইয়া?”

​আকাশ পুরো পরিস্থিতিটা আয়াশের সাজানো সেই মনগড়া গল্পটা খুব সাবলীলভাবে তাদের বুঝিয়ে বলল। সব শুনে অন্তিক নিস্পৃহ গলায় বলল,

“যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। এখন মেয়েটাকে বকে কী লাভ?”

​“লাভ কী মানে? তোমরা কি জানো না আয়াশ কাউকে সহজে নিজের কাছে ঘেঁষতে দেয় না? তারপরেও কীভাবে এই কথা বলছ?”

​কুহু এবার একটু চড়া গলায় বলল,

“যেহেতু আয়াশ শুধু আশা আর অন্তিহার সাথেই একটু স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, তাহলে ও কিছুদিন এখানেই থাকুক। আমার মেয়ে নিজের দায়িত্ব কখনো অবহেলা করে না।”

​“কী! আয়াশ এখানে থাকবে? দুটো মেয়ের সেবা নেবে তা-ও কোনো সম্পর্ক ছাড়া?”

​কুহুর চোখে এবার কাঠিন্য ফুটে উঠে,

“তাছাড়া আর কী করার আছে বলুন? বাচ্চাদের একটা ভুলের জন্য যখন এত বড় ঝামেলা হয়ে গেল, আয়াশের জন্য আমাদেরও খুব খারাপ লাগছে। কিন্তু এই মুহূর্তে এছাড়া তো উপায় দেখছি না।”

​দাদি শাড়ির আঁচলটা হাত দিয়ে গুছিয়ে নিলেন। মুখটা বাঁকিয়ে কুটিল চোখে তাকালেন অন্তিহার দিকে। মেয়েটাকে ওনার একটুও পছন্দ নয়, কিন্তু নাতির ফিসফিস করে বলা কথাটার মান তো রাখতেই হবে! তিনি কুহুর দিকে চেয়ে বললেন,

“আপনার ছোট মেয়েকে আমাদের সাথে পাঠিয়ে দিন। ওর জন্যই তো সব হলো।”

​যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো অন্তিহার মাথায়! সে থমত খেয়ে গেল। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে না পেরে চিৎকার করে উঠল,

“মানে? আপনার নাতি সম্পর্ক ছাড়া থাকতে পারবে না বলে আমাকে ওনার সাথে পাঠিয়ে দেবেন? আমাকে কি আপনাদের বাড়ির পার্সোনাল নার্স মনে হয়?”

​কুহু চোখ রাঙিয়ে তাকাতেই অন্তিহা দমে, তবে ফুঁসছে রাগে। ​দাদি ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন,

“চোখ যদি ভালো না হয়, আয়াশ কি কোনো বাইরের নার্সের ছোঁয়া সহ্য করতে পারবে? আমি তোমাকে নার্স হয়ে যেতে বলছি না, বউ হয়ে যেতে বলছি আমার আয়াশের।”

​“হোয়াট দ্য ফাক!”

​আয়াশ মনে মনে চোখ খিচে বন্ধ করে ফেলেছে ভয়ে। অন্তিহার এমন চণ্ডী রূপ দেখে সে ভেতরে ভেতরে বেশ মজা পেলেও বাইরে নির্বিকার। অন্তিহা অপমানে আর রাগে ফুঁসছে। অন্তিক আর কুহু কেবল নিস্পৃহ চোখে মহিলাটিকে আপাদমস্তক মেপে চলেছে। ​কুহু শান্ত দৃঢ় গলায় উত্তর করে,

“আমরা ভেবে জানাব আপনাকে।”

​“ভেবে জানাবে? আম্মু, তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? ভেবে জানাবে মানে কী? আমার কিসের এত খামতি যে ওনার নাতির এই খুতের জন্য আমাকে নাতি-বউ হতে হবে? আমাকে কি অপশনাল মনে হয়? তুমি সরাসরি না করে দিচ্ছ না কেন?”

​কুহু মেয়ের দিকে তাকায়। সে বোঝে অন্তিহার রাগটা যৌক্তিক, কিন্তু এমন একটা ভরা মজলিসে সামনাসামনি তো আর মুখের ওপর প্রত্যাখ্যান করা যায় না। তাই সে লিজা বা তিতাশকে পরে ফোন করে বুঝিয়ে বলবে। ভেবে পরিস্থিতি সামাল দিতে চেয়েছিল।

​কিন্তু আয়াশের দাদি অন্তিহার এই উদ্ধত কথাগুলো একদম সহ্য করতে পারলেন না। তিনি রেগে গিয়ে বেশ ধমকের সুরে চেঁচিয়ে উঠলেন,

“বুঝি না বাপু, এই বাড়ির মেয়েদের মাথায় এত তেজ কোত্থেকে আসে! শোনো মেয়ে, আয়াশ সোনার টুকরো ছেলে। কপাল ভালো হলে ওকে স্বামী হিসেবে পাবে, এত ঢং কোরো না! আর বড়দের মুখের ওপর মেয়েমানুষের এত কথা বলতে নেই!”

​রাগে জ্বলতে জ্বলতে অন্তিহা আয়াশের দিকে তাকায়। তার জ্বলন্ত দৃষ্টি আয়াশের ওপর পড়তেই আয়াশ চট করে চোখ সরিয়ে নিল। সে তো অন্ধ অন্তিহা তাচ্ছিল্য আর ক্ষোভ মেশানো গলায় বলল,

“আয়াশ, আপনি কিছু বলবেন না?”

​আয়াশ কী-ই বা বলবে? মনে মনে তো সে এটাই চাইছিল! তার পুরুষালী মাথাটা দুলিয়ে কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই দাদি আবার গর্জে উঠলেন,

“শোনো মহিলা মানুষ এত তর্ক মানায় না।”

তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে অন্তিহার ঠোঁটে। সে আয়াশের দিকে আরও দুই পা এগিয়ে যায়। এবার তার ওপর সন্দেহটা ওর মনে দানা বাঁধছে। আয়াশের দিকে তাকিয়ে তার দাদিকে উত্তর দেয় সে৷

“আপনি কি বেডা মানুষ? এত যে তর্ক করছেন কখন থেকে?”

​আয়াশের দাদি চমকে নিজের ঠোঁটে হাত রাখলেন। এ কেমন বেয়াদব মেয়েকে বিয়ে করতে চায় ওনার নাতি! তিনি যেন আকাশ থেকে পড়লেন,

“ওরে রে রে আল্লা...”

​ওনার কথা শেষ আর হলো কই! অন্তিহা আয়াশের একদম কাছে চলে গেল। তবুও আয়াশ নিজের জায়গায় অনড় রইল, একচুল নড়ল না। অথচ বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা যেন ক্রমশ বেড়েই চলেছে। সে অন্ধ হ্যাঁ। আয়াশের মুখের একদম কাছাকাছি ঝুঁকে এসে অন্তিহা তীক্ষ্ণ গলায় বলল,

“উপস দাদু! ‘ওরে রে রে’ এত রিপিট করছেন কেন? ভুলে কি কোথাও চাপ লেগে গেছে?”

অন্তিহার রাগে ফোঁস ফোঁস করা তপ্ত শ্বাস আয়াশের মুখের ওপর আছড়ে পড়ছে। ঠিক তখনই দাদির কটাক্ষপূর্ণ খোঁটা আবার ঘরের সবার মনোযোগ কেড়ে নিল,

“এই চোপাবাজির জন্যই তো এখনো তোমার বিয়ে হয় না। নিজের বয়সের দিকে তাকাও মেয়ে! তোমার ভালোর জন্যই বলছি, বিয়ে করে নাও। নইলে জীবনেও কিচ্ছু করতে পারবে না।”

​কথাটা তীরের মতো গিয়ে বিঁধল অন্তিহার গায়ে। ওনার মুখে কথাটা শুনে ওর গা জ্বলে উঠছে তার। এতদিনের লেখাপড়া, নিজের মেধা দিয়ে অর্জন করা এতসব ডিগ্রি মহিলাটা কেমন ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিল! যেন বিয়ে না করলে ওর জীবনটাই ব্যর্থ! ও সোজা হয়ে দাঁড়াল। দাদির দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ ও ধারালো গলায় জবাব দিল,

“বয়স তো আপনারও কম হলো না, অথচ চাপার জোর আমার থেকেও বেশি! বিয়ে করে আপনি নিজে কোন বিশ্ব তীরটা মারলেন শুনি? বিয়ে করে যা করার তা তো করছেনই যার তার বাসায় গিয়ে শুধু কুচুটিপনা!”

​কথাটা শেষ হতেই ঘরের কোণায় বসে থাকা আশা আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না, ফিক করে হেসে দিল। থমথমে পরিবেশটা মুহূর্তের মধ্যে আরও ভারী হয়ে উঠে, আশা দাত দিয়ে দুটো ঠোঁট চেপে ধরে। দাদি এবার নড়েচড়ে দাঁড়ালেন।

​আয়াশ বেচারা এবার সত্যিই ফেঁসে গেছে। এ কাকে বিয়ের কথা বলল সে? দাদিকে? ইনি তো সংসার হওয়ার আগেই আগুন লাগিয়ে দেবে! মেয়েটার আত্মসম্মানের ওপর বারবার আঘাত করেই চলেছেন।

​অন্তিক এবার আর চুপ থাকতে পারল না। এভাবে কথা বাড়িয়ে বাড়িতে আরও বড় ঝামেলা করার কোনো মানে হয় না। ও অন্তিহার দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

“রুমে যাও। বিয়ের বিষয় যা করার আমরা বুঝব। এত পাকামি করছ কেন? বড়দের কি চোখে লাগছে না?”

​বাবার কড়া কথায় অন্তিহা নাক ফোলায়, অভিমানে চোখ দুটো ঘোলা হয়ে আসছে। ছলছল করে উঠে তাতে জল। ও আয়াশকে ভালোবাসে, এটা তো মিথ্যা নয়! কিন্তু তার মানে কি এই? যে ছেলেটা এর আগে পরপর দুবার ওর নিজের কাজিনের সঙ্গে বিয়েতে বসতে রাজি হয়েছিল, তাকেই ও এখন বিয়ে করে নেবে? তাও এমন একটা ফালতু অপবাদ আর সস্তা লজিকের খাতিরে?

​ভেতরটা বাবার ওপর অভিমানে ফেটে যাচ্ছে। আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে ও গটগট পায়ে সিঁড়ির দিকে এগোয় সে। কিন্তু দুটো সিঁড়ি উঠতেই ওর কানে ভেসে আসে সেই ভীষণ পরিচিত, গম্ভীর পুরুষালী কণ্ঠস্বর। ​মুহূর্তেই থমকে গেল অন্তিহার পা জোড়া,

​“মিস গম্ভীর।”

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন