ফন্ট সাইজ:
থিম:
দূরত্বের প্রণয় ২

৫৬তম পর্ব

লেখক: স্বর্ণালী ইসলাম

#দূরত্বের_প্রণয়_২

#স্বর্ণালী_ইসলাম

পর্বঃ ৫৫

“মিস গম্ভীর।”

​থমকে গেল অন্তিহার পা জোড়া। ডাকটা শুনেই যেন তার মস্তিষ্কে সমবিত ফিরেছে তার। সে-ই তো সাফওয়ানকে আসতে বলেছিল। হ্যাঁ, তার এক ডাকেই সাফওয়ান চলে আসবে এটা অন্তিহা জানত। এমনকি সে যে তার বাবাকে শেষ করে দেবে, সেটাও তাকে বারবার বলেছিল সাফওয়ান।

​ঝটকা দিয়ে পেছনে ফিরে অন্তিহা। প্রেয়সীর এমন আকস্মিক দৃষ্টিপাতে সাফওয়ানের বুকের বাঁ পাশটা শক্ত করে চেপে ধরে। অজানা এক আনন্দে তার চোখ জোড়া উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। অন্তিহা অপলক দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। তবে সামনে থেকে মেয়েটার গাল দুটো যেন আরও শুকিয়ে গেছে বলে মনে হলো। দেখে বড্ড মন খারাপ হয় সাফওয়ানের।

​অন্তিহা সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসছে। অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে মেকি এক হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে বলল,

“আপনি এখানে কেন এসেছেন?”

​সাফওয়ানের তৃপ্তিময় দৃষ্টি অন্তিহার দিকেই নিবদ্ধ। সে নরম স্বরে বলল,

“আপনিই তো বলেছেন আসতে। এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন?”

​উপস্থিত পরিবারের সবাই অবাক হয়ে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্তিক এগিয়ে যায় এবং বিনয়ী ভঙ্গিতে সাফওয়ানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল,

“তুমি অন্তুর ফ্রেন্ড? ভেতরে এসো।”

​সাফওয়ান নিরেট ভঙ্গিতে হাত মেলায়। তারপর একটু গলা খাঁকারি দিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে ফেলে,

“আমি সাফওয়ান। তবে ওনার কেবল ‘ফ্রেন্ড’ নই, আঙ্কেল। যদিও উনি আমাকে বন্ধুর চেয়ে বেশি কিছু ভাবেন না, তবুও আমি ওনাকে ভালোবাসি।”

​তার কথা শুনে উপস্থিত সকলের মুখের স্বাভাবিক ঔৎসুক্য মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। সাফওয়ানের বাবা একদিন তাদের বাড়িতে এসেছিলেন সঙ্গে বডিগার্ডদের মাফিয়া সুলভ আচরণ কারও পছন্দ হয়নি।

​সাফওয়ান নিজ থেকেই ভেতরে এগিয়ে আসে। তার হাতে ফুলের নয়, বরং বই দিয়ে তৈরি খুব যত্ন সহকারে বানানো একটি বুকে । তার কবজিতে সেই কাপল ঘড়িটা এখনো আছে। অন্তিহা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলে,,

“সাফওয়ান, আপনি বসুন এখানে।”

​সাফওয়ান বসল না, বরং আরও খানিকটা এগিয়ে আসে অন্তিহার কাছে। হাতের বুকেটা প্রেয়সীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ব্যকুল ও নিচু গলায় বলে উঠে,

“আই রিয়ালি মিস ইউ, অ্যান্ড আই অ্যাম সরি টু। আমার জন্য আপনাকে এত কিছু সহ্য করতে হলো... আমি আসলে সত্যি বুঝতে পারিনি।”

​কথা শেষ করার ফুরসত নেই তার। এক নিঃশ্বাসে আবোলতাবোল বলে যাচ্ছে। অন্তিহা তাকে বারবার শান্ত হতে বলছে, কারণ পরিবারের এতগুলো মানুষের সামনে এসব বড্ড অদ্ভুত শোনাচ্ছে। তবে এতদিন পর প্রেয়সীকে সামনে পেয়ে উত্তেজিত সাফওয়ান যেন নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। হঠাৎ সে বলে উঠে,

“আমি কি আপনাকে একটু জড়িয়ে ধরতে পারি? বড্ড কষ্ট হচ্ছে আমার, কথাগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।”

​এমন অপ্রস্তুত পরিস্থিতিতে পরিবারের সামনে অন্তিহা কী বলবে বুঝতে পারছে না। তার ওপর একটু আগেই আয়াশের দাদির সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনা ঘটেছে। এই মুহূর্তে বৃদ্ধার সামনে ভীষণ লজ্জা ও অস্বস্তি হচ্ছে তার। সাফওয়ান অপেক্ষা করছে, কখন অন্তিহা উপহারটা হাতে নেবে। এবং একটু জরিয়ে ধরার অনুমতি দেবে অন্তিহা আড়চোখে মায়ের দিকে তাকায় কী করবে তা বোঝার জন্য। কুহু ইশারা করতেই সে হাত বাড়ায় কিন্তু সেটি হাতে নেওয়ার আগেই—

​“আহহহহ! অন্তি, চোখটা ভীষণ ব্যথা করছে আমার!”

​যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে আয়াশ। অন্তিহা উপহার নেওয়া ছেড়ে দ্রুত আয়াশের দিকে ঘুরে । সোফায় তার পাশে বসে ব্যাকুল গলায় বলল,

“হয়তো জোড়াজুড়ি করে দেখার চেষ্টা করছেন, চোখে একদম প্রেশার দেবেন না!”

​আয়াশ মুখ ভার করে নিচু, হিসহিসানি গলায় বলল,

“এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে অন্ধত্বই ভালো ছিল। অন্তত তোমার ওই ‘বলপেন’কে তো দেখতে হচ্ছে না!”

​“শাট আপ! ও আমার বয়ফ্রেন্ড নয়!”

​ওদিকে দাঁতে নিচের ঠোঁট কামড়ে তাদের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাফওয়ান। রাগে তার শরীর রিরি করছে। অন্তিহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাঁড়ায়, এবার নার্ভাস হলে চলবে না, মনকে শক্ত করে সে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে সাফওয়ানকে বলল,

“আসলে বাড়িতে এখন খুব সমস্যা চলছে। আমরা না হয় অন্য কোনো সময় কথা বলি?”

​সাফওয়ানের মনটা ভেঙে গেলো প্রেয়সীর কথায়। উৎফুল্ল মুখটা মুহূর্তে মলিন হয়ে আসে তার। হৃদয়ে কষ্টের প্রচণ্ড ঢেউ উঠলেও সে দ্বিমত করল না। সোফার ওপর বুকেটা রেখে আলতো করে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“কালকে?”

​“হুম, কালকে।”

​সাফওয়ান এবার পরিবারের সবার দিকে তাকায়, কৃত্রিম এক হাসি ফুটিয়ে কুহুর কাছে গিয়ে সালাম করে। একে একে সবাইকে সালাম জানিয়ে সে তাশার সামনে যায়, তাশার দৃষ্টি হঠাৎ নিচে আটকায়। সাফওয়ানের সাদা জুতোয় হালকা রক্তের দাগ লেগে আছে।

​কৌতূহল ও সন্দেহ নিয়ে তাশা সরাসরি জিজ্ঞেস করে বসে,

“তোমার জুতোয় রক্ত!”

​সাফওয়ান নিজের পায়ের দিকে তাকায়। অত্যন্ত শান্ত ও নরম গলায় বলে,

“আসলে আসার সময় একটা ছোট অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল। বাড়ি যাওয়া হয়নি বলে জুতোটা চেঞ্জ করা হয়নি।”

​অন্তিহা উদ্বিগ্ন হয়ে শুধায়

“আপনার কোথাও লাগেনি তো? ঠিক আছেন আপনি?”

​মুহূর্তেই যেন থমকে গেল সাফওয়ানের হৃদস্পন্দন! সে চোখ বন্ধ করে, অবুঝের মতো ঠোঁট টিপে ঢোক গিলে হাসে। অন্তিহার দিকে ফিরে বলল,

“ঠিক ছিলাম না। কিন্তু আপনি আমার কথা ভেবেছেন জেনে এখন ঠিক হয়ে গেলাম। আচ্ছা, আমি আসি... নিজের খেয়াল রাখবেন। আর হ্যাঁ, বিয়ে নিয়ে স্বপ্নেও ভাববেন না!”

​ছেলেটা প্রস্থান করতেই অন্তিহা নিজেও নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। যাওয়ার আগে কেবল আয়াশের উদ্দেশ্যে বলে গেল,

“আপনি প্লিজ কিছুদিন ম্যানেজ করে চলুন, অসুবিধা হলে এ বাড়িতে থাকুন। কিন্তু বিয়ে নিয়ে চাপ নেওয়া এখন সম্ভব নয়। সবেমাত্র ভাইয়া আর আশার এত বড় একটা ইনসিডেন্ট হলো, এখন আমরা এতটা অমানবিক হতে পারি না।”

​দমবন্ধ এক অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেতে অন্তিহা দ্রুত ওপরে গিয়ে নিজের রুমে ঢুকে দরজাটা ভিড়িয়ে দেয়। নিচে আয়াশ আছে, যে লোকটা কিছুই দেখতে পারছে না, যার এই মুহূর্তে অন্তিহাকে বড্ড প্রয়োজন। আর সাফওয়ান? যে সব ভুলে কেবল তার একটি ডাকে দূর দেশ থেকে ছুটে এসেছে। ভাবতেই বুকটা অস্থির হয়ে উঠছে। এ কেমন দোটানায় পড়েছে তার জীবন!

______

​রাত এখন গভীর। অন্তিহাকে নিয়ে নিজেদের বাড়ি ফিরেছে কুহু ও অন্তিক। আসার পর থেকে কারও মুখেই কোনো সাড়াশব্দ নেই। অন্তিহা চুপচাপ ম্যাট্রেসের ওপর শুয়ে আছে।

​রুমের দরজা সামান্য ভিড়ানো। অন্তিক ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছে, আর কুহু পাশে দাঁড়িয়ে শুনছে।

“সবটাই বুঝতে পারছি তিতু... তবে আমার মেয়েটাকেও তো চিনিস তুই। অন্তু বদলে গেছে, নিজের ভালো-মন্দ এখন বুঝতে শিখেছে। ও এতে সম্মত নয়।”

​ওপাশ থেকে তিতাশ ভারী গলায় বলল,

“আয়াশ অন্তিহাকে বিয়ে করতে চায়। আর এই কঠিন সময়ে ওর একজন কাছের মানুষকে খুব প্রয়োজন। ও নিজের দাদিকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। আর মা? মা বারবার একটাই কথা বলছেন অন্তির জন্যই নাকি সব হয়েছে!”

​অন্তিক গম্ভীর গলায় জবাব দিল,

“পরিস্থিতি যেভাবে গড়িয়েছে, তাতে অন্তুকে দোষ দিয়ে তো লাভ নেই।”

​তিতাশের কণ্ঠ সামান্য নরম হলো,

“কিন্তু আমার ছেলেটা? ওসিডির জন্য ও তো কারও কাছে যায় না, এমনকি আমাদের কাছেও আসে না! এখন ওর চোখের এই অবস্থা... ওর ফিউচারের কী হবে? ও সুস্থ হয়ে যাবে অন্তিক, অন্তুও ভালো থাকবে।”

​অন্তিক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। না, তিতাশের ওপর তার কোনো ব্যক্তিগত রাগ নেই, সব বাবা-মা-ই নিজের সন্তানকে নিয়ে ভাবে। কলটা কেটে ভাবনায় ডুবে গেল অন্তিক।

গাল ভারী করে বসে থাকা কুহু সাফ জানিয়ে দিল, সে আয়াশ আর অন্তিহার বিয়ের পক্ষে একদমই নেই। অন্তিক কুহুর কাছে গিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

“দেখ কুহু, ছেলেটা কিন্তু সত্যি ভালো...।”

​কথা শেষ করতে পারল না সে। শীতল গলায় গর্জে উঠে কুহু,

“তরফদারি করবে না অন্তিক, একদম না! ও আশার এক্স , এটা কতখানি অস্বস্তিকর একটা সম্পর্ক হয়ে উঠবে ধারণা আছে?”

​অন্তিক এবার কিছুটা বিরক্ত হলো। কুহু বরাবরের মতোই নিজের যুক্তিতে অটল। সে বসা থেকে উঠে একটু রূঢ় কণ্ঠে বলল,

“এত ভাবিস, অথচ এটা ভাবিস না কেন যে তোর কথাতেই আশার সঙ্গে ছেলেটার আবার বিয়ে হচ্ছিল? সেই কারণেই অহীন আর আশা এমন চরম সিদ্ধান্ত নিল, আর এসব সামাল দিতে গিয়েই আজ ছেলেটার এই করুণ অবস্থা!”

​কথাটা শুনে চরম বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে পড়ে কুহু। অন্তিকের দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হেসে বলল,

“কী বলতে চাও তুমি? এসব হয়েছে বলে তোমরা আমার মেয়েকে ওর গলায় ঝুলিয়ে দেবে? আশার সঙ্গে আয়াশের সম্পর্ক ছিল, আমরা জানতাম তারা একে অপরকে ভালোবাসে। কিন্তু আমার মেয়ে? ওর সঙ্গে জড়ানো মানে সারাজীবন নিজেকে মানিয়ে চলা! তোমার কোনো ধারণা আছে এসবের? ওর সঙ্গে আমি আমার মেয়েকে কখনোই ভাবতে পারব না, তাই দয়া করে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া বন্ধ করো। কেবল দায়িত্ব দিয়ে সংসার চলে না!”

​স্ত্রীর কথায় অন্তিকের চোয়াল শক্ত হয়। সে ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলল,

“তোর সব বিষয়ে কেবল চালাকি! আয়াশ নয়তো কে? সামান্য ওসিডি আর চোখের সমস্যা, কিছুদিন পরেই তো ঠিক হয়ে যাবে। ও কতটা ভালো ছেলে আমার চেয়ে ভালো তুই আর অন্তিহা জনিস! তাহলে নাটক করছিস কেন? নাকি ওই মাস্তানি করা লোকটার ছেলে সাফওয়ানকে পছন্দ?”

​“অতিরিক্ত কিছুই ভালো নয়, অন্তিক! পুরুষের অভাব নেই এই দুনিয়াতে। আমার মেয়ের জন্য আয়াশ বা সাফওয়ানকেই কেন বেছে নিতে হবে?”

​“কারণ সাফওয়ান তোর মেয়েকে চায়, আর আমরা আয়াশকে চাই!”

​রাগে কুহুর গায়ের পশম খাড়া হয়। একটা মুহূর্তের জন্য সে অন্তিককে সেই পুরোনো রূপে দেখতে পাচ্ছে যখন সে নিজের সমস্ত সিদ্ধান্ত জোর করে চাপিয়ে দিত। সেই দূরত্বগুলো কুহু ভুলে যেতে চায়, কিন্তু এখন নিজের সন্তানের জীবন নিয়েও কি একই খেলা চলবে?

​“তোমার এই স্বভাবের জন্যই তো আমার সঙ্গে তোমার দূরত্ব তৈরি হয়েছিল! ওসব দেখতে দেখতে অহিনের মাথাটাও নষ্ট হয়েছে, তালাকের মতো বিষয়কেও গুরুত্ব দেয়নি। অন্তত মেয়েটাকে মুক্তি দাও! অমিলের সংসারে আমার মতো আমার মেয়ে সারাজীবন কাটাতে পারবে না...।”

​স্তব্ধ হয়ে গেল অন্তিক। সে নিরেট চোখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইল। দুই পা এগিয়ে যেতেই কুহু কিছুটা পিছিয়ে গেল। অন্তিক তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে কিছু বলতে যাচ্ছে, কিন্তু কুহুর নজর চট করে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অন্তিহার দিকে আটকে গেল। অস্পষ্ট স্বরে কুহু বলে উঠে

“অন্তু?”

​হকচকিয়ে পিছু হটে অন্তিক। দুজন রাগের মাথায় এতটাই মশগুল ছিল যে দরজায় কখন অহীন আর অন্তিহা এসে দাঁড়িয়েছে টেরই পায়নি।

​অন্তিহার হাত দুটো কাঁপছে, চোখ দুটো জলে ছলছল করছে। সে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,

“আমাকে নিয়ে তর্ক করছ তোমরা? নিজেদের পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে ঝগড়া করছ, অথচ একটিবারের জন্যও আমাকে জিজ্ঞেস করলে না। আমি কী চাই? একজন বলছ আয়াশ ভালো ছেলে, অন্যজন বলছ পুরুষের অভাব নেই! আবার ভাবছ সাফওয়ান ঠিক হবে কিনা! আমাকে কি কোনো সওদা করার বস্তু পেয়েছ?”

​অন্তিক তার দিকে এগিয়ে এসে শান্ত করার চেষ্টা করে,

“ভুল ভাবছ আমরা তোমাকেই জিজ্ঞেস করতাম, কিন্তু নিজেদের মধ্যে...।”

​“নিজেদের মধ্যে?” অন্তিহা থামিয়ে দিল তাকে। “আমাকে নিয়ে সারাজীবন তোমরা কী-ই বা ভেবেছ? এখন বিয়ের প্রসঙ্গ এসেছে বলেই ট্রেডিশনাল অভিভাবকদের মতো নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছ দুজন!”

​“তোমার ওপর কিছু চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে না, অন্তু।”

​অন্তিহা জায়গা থেকে নড়ল না। বুক ভরে গভীর একটা শ্বাস নিয়ে কান্না থামানোর বৃথা চেষ্টা করে ভাঙা ভাঙা গলায় বলতে লাগে,

“যখন থেকে অনুভূতিগুলো বুঝতে শিখেছি, ঠিক তখন থেকেই আমি আয়াশকে ভালোবেসে এসেছি! প্রকাশ করতে পারিনি কোনোদিন, তার আগেই সে আশাকে নিজের অনুভূতির কথা বলে দিয়েছিল। তারপর এতগুলো বছর তাদের নিখুঁত প্রেমের নীরবে সাক্ষী থেকেছি আমি। তোমার ভাগ্নি নিজের অনুভূতি বোঝেনি, তাও আয়াশের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। ওসব দেখেও আয়াশের কথা ভেবে সব সময় ওদের দুজনকে এক করে রাখার চেষ্টা আমি করেছি! তখনো আয়াশ আমাকে দেখেনি। আশা জানতই না আয়াশ কিসে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, আমি পেছন থেকে সব সামলে নিতাম... তাও আয়াশ বোঝেনি আমি তাকে চাই! আর এখন যখন আশা নেই, সে অহিনের প্রতি নিজের ভালোবাসা বুঝে তার মন মতো চলতে শিখেছে, তখন আয়াশ একা আর অসহায় হয়ে পড়েছে বলে আমাকে প্রয়োজন? আমি কি কোনো সামগ্রী যে কারও প্রয়োজনে ব্যবহৃত হব?”

​একটু থামল অন্তিহা। চোখ মুছে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে আবারও বলল,

“মানছি এখন ওর আমাকে প্রয়োজন, কারণ সে চোখে দেখতে পাচ্ছে না, বিশ্বাসী কাউকে পাশে চাই। সে আমাকে দেখতে পাচ্ছে না তাই হয়তো বিয়ে করে ফেলবে! কিন্তু যখন দেখতে পাবে? তখন আমার এই মুখটা পাল্টে আশা হয়ে যাবে না, আমি অন্তিহাই থাকব! আর আয়াশের চোখে তখন আমি হয়ে যাব অহীন ভাইয়ার মতো বেহায়াপ্রেমী! আয়াশ হাজারো ধিক্কার দিলেও তখন হয়তো আমি লোকটাকে ছাড়তে পারব না... কিন্তু আমি কোনো বেহায়া প্রেমিকা বা স্ত্রী হয়ে বেঁচে থাকতে চাই না! আমাকে নিয়ে এভাবে ভাবা বন্ধ করো আব্বু... বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে আমাকে এভাবে নিলামে তুলে দিও না!”

​অন্তিক তাকে কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু অন্তিহা তাকে সে সুযোগ দিল না। সোজা চলে গেল পাশের ঘরে। ​অহীন চুপচাপ তাকিয়ে আছে মা-বাবার দিকে। দুজনই একদম স্তব্ধ হয়ে আছেন। থমথমে নীরবতা ভেঙে অহীন নিচু গলায় বলল,

“অন্তু আয়াশকেই ভালোবাসে, কিন্তু ওর মনের গভীরের ভয়টা অন্য জায়গায়। ও ভাবছে, জোর করে আয়াশকে রাজি করিয়ে বিয়েটা হলে ওদের সম্পর্কটাও হয়তো আমাদের মতো ভেঙে যাবে। স্বাভাবিক, পরিস্থিতির বিচারে যে কেউ এটাই ভাববে।”

​বলতে বলতে ধীরপায়ে চলেও যাচ্ছে অহীন, কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে থেমে গেল। গলা ঝেড়ে মাথা নিচু করে বলল,

“আব্বু যখন আম্মুকে ছেড়ে গিয়েছিল, তখন আমি ছিলাম না দেখিনি কিছু জানিও না তেমন। কিন্তু আশাকে ছেড়ে দেওয়াটা পুরোপুরি আমার নিজের সিদ্ধান্ত ছিল। রাগের মাথায় অত বড় একটা ভুল করে আজ আমি নিজেই আফসোস করছি। তাই প্লিজ, তোমরা অন্তত একে অপরকে দোষ দিও না। আশার আর আমার দূরত্ব তো তৈরি হয়েই গেছে, এবার আমি অন্তত তোমাদের দূরত্বের কারণ হতে চাই না।”

বাসা থেকে ড্রেস পাল্টে দরজা দিয়ে বেড়িয়ে গেলো অন্তিহা। যাওয়ার আগে জোরে হাক তুলেছে,

“আমি নীল মামানির কাছে যাচ্ছি কিছুদিন ওখানেই থাকব।”

_______

​রাতের নির্জন পথ ধরে একা একা হেঁটে চলেছে অন্তিহা। চোখের জল ইতিমধ্যে শুকিয়ে এসেছে, কিন্তু মনের ভেতরের ক্ষোভ আর ক্লান্তি এতটুকু কমেনি। এসব নাটকীয়তা আর ভালো লাগছে না তার। দেশে ফিরে আসাটা যেন কোনো ফেইরিটেল গল্পের অভিশপ্ত এক রাজকুমারীর কাহিনীর চেয়েও ভয়াবহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনে হচ্ছে, কেউ যেন তাকে চরম অভিশাপ দিয়ে পাঠিয়েছে দেশে পা রাখলেই জীবনটা এমন ওলটপালট হয়ে যাবে!

​বুকের ভেতরে চিনচিন করে একটা তীব্র ব্যথা অনুভব করছে অন্তিহা। জীবনের এই পর্যায়ে এসে ভালোবাসার মানুষটাকে পাওয়ার মতো সব সুযোগ সামনে থাকা সত্ত্বেও, নিজের হাতে সেই স্বপ্নকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়াও কম সাহসের কাজ নয়! আনমনা হয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে নিজের ভাগ্যকেই মনে মনে ধিক্কার দিচ্ছে আজ।

​ঠিক তখনই কানে আসে গাড়ির তীব্র হর্নের শব্দ! হকচকিয়ে পেছন ফিরতেই অন্তিহার বুক চিরে বেরোয় দীর্ঘ হতাশা । সাফওয়ানের গাড়ি নিঃশব্দে তাকে অনুসরণ করছে। এই মুহূর্তটা যেন তার জীবনের সবচাইতে বিষাদময় এক মুহূর্ত।

​গাড়ি থেকে নেমে আসে সাফওয়ান। তার ঢুলুঢুলু চোখ বলে দিচ্ছে সে ঘুমাচ্ছিল, হয়তো এতক্ষণ গাড়িতেই পড়ে ছিল। এই অতিরিক্ত নজরদারি অন্তিহার সহ্যসীমা পার করে দিচ্ছে। সাফওয়ান কোনো আগাম বার্তা না দিয়েই হুট করে এগিয়ে এসে অন্তিহাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে,

“ আই মিস ইউ সো মাচ, মিস! থ্যাঙ্ক ইউ আমার কাছে আসার জন্য...।”

​নিজের সঙ্গে কী ঘটে গেল, তা বুঝে উঠতে অন্তিহার এক ন্যানোসেকেন্ড সময় লাগল। পর মুহূর্তেই চরম ঘৃণা আর আক্রোশে সে সাফওয়ানকে সজোরে একটা ধাক্কা দেয় এবং ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দেয় তার গালে!

​আঘাতটা হয়তো একটু বেশিই তীব্র আর ঘৃণামাখা ছিল, তাই তো সাফওয়ানের মতো শক্ত-পোক্ত সুঠাম দেহের এক পুরুষও এক পাশে হেলে পড়েছে! তার ফর্সা গালে আঙুলের লাল দাগ ভেসে উঠে মুহূর্তের মধ্যেই। সে ছলছল চোখে অন্তিহার দিকে তাকায়।

​রাগ আর চরম ঘৃণায় হাঁসফাঁস করতে করতে গর্জে উঠল অন্তিহা,

“হাউ ডেয়ার ইউ টু টাচ মি? কীভাবে এত বড় সাহস হয় আপনার?”

​সাফওয়ানের বুকের ভেতর যেন তীব্র যন্ত্রণার ঢেউ খেলে যায়। এতদূর থেকে সব ছেড়েছুড়ে ছুটে এসে প্রেয়সীর কাছ থেকে পাওয়া এই চরম প্রত্যাখ্যান সহ্য করা বড্ড কঠিন! তবুও সে চোখ দুটো স্থির রেখে শান্ত, ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করে,

“কেন মারলেন আমায়? কেন, আমার সাহস নেই? আমার সাহস সম্পর্কে আপনার কতটুকু ধারণা আছে? একমাত্র আপনার সামনে এসে নিজেকে গুটিয়ে রাখি, শান্ত হয়ে থাকি আমি! ডেয়ার? আমার সাহস সম্পর্কে বিন্দুমাত্র আইডিয়া নেই আপনার! সারাক্ষণ অবুঝের মতো আপনার পেছনে পেছনে ঘুরে বেড়াই, তাও কি আমার সামান্যতম অধিকারও নেই?”

​দাঁতে দাঁত চেপে, কড়া গলায় জবাব দেয় অন্তিহা,

“না, নেই! কখনোই ছিল না, আর ভবিষ্যতেও কোনোদিন হবে না! আপনার মতো একজন হুডলাম এর সঙ্গে আমার মতো মেয়ের কোনো মিল হতে পারে না! আপনি একটা গ্যাংস্টারের ছেলে যে আমার বাড়ি বয়ে এসে আমার পরিবারকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়! আমরা সাধারণ মানুষ, সমাজ আর সম্মান নিয়ে আমাদের বেঁচে থাকতে হয়!”

​সাফওয়ান ক্ষুব্ধ ও ব্যাকুল গলায় বলল,

“আমার পরিবারের জন্য আমার এতদিনের ভালোবাসাকে এভাবে ফিরিয়ে দিচ্ছেন আপনি?”

​অন্তিহার চোখ জোড়া আবারও জলে ভরে উঠে। সে তাচ্ছিল্য করে বিষাদময় হাসি দিয়ে বলে,,

“আপনাকে এখানে আসতে কি আমি কোনোদিন ডেকেছি? আমি তো আপনার এই আতঙ্কেই আর ফ্রান্সে ফিরে যেতে চাই না! জানেন, আমার ভাইয়া গলায় দড়ি দিয়েছিল? প্রাণটা প্রায় চলেই যাচ্ছিল তার! আর ঠিক সেই চরম অসহায় মুহূর্তটার সুযোগ নিয়েছিল আপনার বাবা! আমি আপনাকে বুঝিয়ে বলতে পারব না ওই মুহূর্তের অনুভূতি, ওই ভয়াবহ ভয়ের কথা... যদি সেদিন আমার ভাইয়ার কিছু হয়ে যেত, তবে আমি কী করতাম? একটা মানুষ কেবল আপনাকে দেশে আনার জন্য আমার বাড়ি বয়ে এসে আমার স্বজনদের জীবন নিয়ে খেলে যায়, হুমকি দেয়, আমাকে তুলে নিয়ে যায়। আপনার সঙ্গে নিজের দূর আমার পরিবারের ও কোন সেফটি নেই! এরপরও কি আপনার মনে হয় না আমরা দুজন সম্পূর্ণ বিপরীত দুই মেরুর মানুষ?”

সাফওয়ানের বোধহয় এবারই প্রথম অন্তিহার ওপর ভীষণ রাগ হলো, একেবারে অন্ধ, হিংস্র রাগ! সে কয়েক ধাপ এগিয়ে গিয়ে হেঁচকা টানে অন্তিহাকে নিজের গাড়ির সাথে চেপে ধরো। রাগে দাঁতে দাঁত চেপে, ফণা তোলা গোখরো সাপের মতো গর্জে উঠে বলল,

“বেশি ভালোবাসা পেয়ে গিয়েছেন, তাই না? নাকি আয়াশের সাথে বিয়ের কথায় মন ওলটপালট হয়ে গেছে? লিসেন অন্তিহা আই লাভ ইউ! আমার দুনিয়ার কিচ্ছু চাই না, শুধু আপনাকে চাই! যদি ভেবে থাকেন পরিবারের কথায় আয়াশকে বিয়ে করবেন, তবে ওসব চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। নয়তো আয়াশকে আমি সত্যি সত্যি খুন করে ফেলব!”

​অন্তিহা সজোরে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় নিজের স্থান গুছিয়ে নিয়ে গর্জে উঠে,

“এটা রাস্তা, বাংলাদেশ! ফ্রান্স নয়, সাফওয়ান! এখানে মেয়েদের সমাজ আর রুলস মেনে চলতে হয়। আর রইল আয়াশের বিষয়? সে ব্যাপারে আপনাকে কৈফিয়ত দেব না। যা মন চায় করুন আপনি! তবে একটা কথা মাথায় রাখবেন আপনাকে আমি কখনো কোনো সুযোগ দিইনি, দেবও না। আমার জীবনে প্রথম ও শেষ মানুষ একজনই, সে আয়াশ! সে আমার হোক বা না হোক, আমি কেবল তাকেই ভালোবেসেছি আর বাসব। আপনার মতো চরিত্রকে ঠাঁই দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। দয়া করে আমার জীবনটা একটু সহজ হতে দিন... চলে যান এখান থেকে, যেভাবে এসেছিলেন সেভাবেই!”

​সাফওয়ান তাচ্ছিল্যের এক বিষাদময় হাসি হেসে বলল,

“তাহলে ডাকলেন কেন আমাকে? আপনার স্বপ্নের জগত যেখানে কোনো সমাজ বা নিয়ম নেই, আমি তো ঠিক তেমনই, তাই না? যেমনটা আপনার উপন্যাসে থাকে একটি প্রেমিক যে পাগলামি করবে, সীমানা ভাঙবে! তবুও আয়াশ... আয়াশ কেন করেন সারাক্ষণ?”

​অন্তিহা স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায়। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে তার। একদম নিচু ধারালো কণ্ঠে জবাব দিল,

“কারণ মহাকাশ থেকে পৃথিবীটাকে অনেক সুন্দর আর সবুজে ঘেরা মনে হলেও, কাছে আসলে বোঝা যায় চারপাশটা কেবল ধু-ধু উর্বর ভূমি ছাড়া আর কিছুই নয়! উপন্যাসের ডার্ক ভিলেনগুলোকে হয়তো কেবল দূর থেকে পড়ে সুন্দর লাগে, কিন্তু বাস্তবে তারা কেবলই একটা জঘন্য অভিশাপ! যেটা এখন আপনাকে আমি মনে করি।”

“অন্ধ হয়ে গিয়েছেন আয়াশের জন্য। জাস্ট ফাকিং ব্লাইন্ড। নিজের ভালোবাসার মানুষকে পাওয়াটাও লাকের ওপর ডিপন করে। আপনি নিজে যেহেতু পাচ্ছেন না আমাকে পেতে দিন। ”

চেচিয়ে উঠে গাড়ির নাম্বার প্লেটে কয়েকটা পরপর লাথি দিয়ে বসে সে জোরজোরে ফলে নাম্বার প্লেটটাও একদিক দিয়ে ছুটে যায়। শব্দে জোর সরো হয়ে গুটিয়ে গেলো অন্তিহা কিঞ্চিৎ ভয় পেলো সে। কেননা সাফওয়ানের রাগে ঘারের রগ গুলো দেখা যাচ্ছে। বোঝাতে পারছে না আর না মিস গম্ভীরকে আঘাত করতে পারছে সেই রাগটাই গাড়িতে ঝাড়লো সে। চোখ যায় দূর পথে আশা অন্তিহা নিজের মায়ের দিকে। মেয়ের জন্য এত রাতে বেশ চিন্তা নিয়েই বেড়িয়ে এসেছে কুহু। কাছে এসে এমন বিধস্ত দুজনকে দেখে ভ্রু কুঁচকে নিলো সে। এগিয়ে অন্তিহাকে জরিয়ে ধরলো,

“কি হয়েছে?”

অন্তিহা উপর নিচ মাথা দোলায়,

“কিছু না। তুমি এত রাতে বের হলে কেনো?”

সাফওয়ানকে কুহু উপেক্ষা করলো। অন্তিহাকে নিয়ে আগায় সামনের দিকে। সাফওয়ান তাকিয়ে আছে। এতটা সময় অন্তিহা রাগের বসে এত গুলো কথা বলেছে মানলেই এই মূহুর্তে এভাবে চলে যাওয়াটা শরীরে জ্বলন তৈরি করছে। কিছু দূর যেতেই একটা রিক্সায় চড়ে কুহু অন্তিহা।

_____

​কিচেনে নিজের জন্য রান্না করছে আয়াশ। মুখে মাস্ক আর হাতে গ্লাভস পরা, চুলার বেশ কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে কাজ করছে সে। পরিপাটি, চকচকে কালো টাইলসের আধুনিক এই কিচেনটি দেখতে অসম্ভব সুন্দর। দেয়ালগুলো যেন একদম নতুন! কোনো ব্যাচেলর পুরুষের কিচেন যে এতটা নিখুঁত ও গোছানো হতে পারে, তা যেন স্বপ্নেও এক বিস্ময়!

​আগে দেশে এলে এই বাড়িতেই তার দাদি থাকতেন। মহিলাটি যেমনই হোন না কেন, পরিচ্ছন্নতা আর স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়ে বেশ সচেতন ছিলেন। হবে নাই বা কেনো? আয়াশের এই মারাত্মক ওসিডি (OCD) রোগের পেছনে তিনি নিজেই অনেকাংশে দায়ী! তবে আশা আর আয়াশের বিয়ের চরম ইনসিডেন্টের পর থেকে তাকে আর এ বাড়িতে আনেনি আয়াশ। তিনি এখন নিজের দ্বিতীয় ছেলের সাথেই থাকেন, যাদের সাথে আয়াশের তেমন কোনো সুসম্পর্ক নেই।

​রান্নার মাঝেই পাশে রাখা ফোনটা বেজে উঠে। আয়াশ হাতের গ্লাভস দুটো খুলে, বাটিতে রাখা স্লাইস করা ফ্রুট সালাদের প্লেটটা হাতে নিয়ে ড্রয়িংরুমের সিটিং টেবিলে এসে বসে। ফোনের স্ক্রিনে খুব প্রিয় একটি নাম জ্বলজ্বল করছে “থেরাপিস্ট অন্তিহা শিকদার”।

​কাটা চামচে সালাটের একটি টুকরো তুলে মুখে দিয়ে কলটা রিসিভ করে আয়াশ। খাবার গিলে বেশ অসহায়ত্ব ফুটিয়ে কণ্ঠস্বরে বলল,

“কে?”

​অন্তিহা অনেকক্ষণ রাহাতের বাড়িতে এসেছে । না চাইতেও আয়াশকে কল করাটা আজ তার কেবলই কি মানবতা, নাকি তীব্র মায়া? সে তা জানে না। তবে আপাতত এটাকে 'মানবতা' বলেই নিজের ব্যাকুল মনকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছে অন্তিহা। সে ওপাশ থেকে শুধাল,

“আমি অন্তিহা। আপনার চোখের অবস্থা এখন কেমন?”

​সালাটের প্লেটে কাটা চামচটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নরম আমের একটা টুকরো তুলে নিল আয়াশ। তারপর কৃত্রিম হতাশায় এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“দাদুকে বলেছিলাম আমার সঙ্গে এসে থাকতে, কিন্তু এলেন না। চোখে বড্ড ঘোলা দেখছি... কোনোমতে ওয়াশরুম ছাড়া আর কিছুই ঠিকমতো ইউজ করতে পারছি না! তা নিয়ে ভেবো না, মাসখানেক একটু আমিও নাহয় অন্ধত্বের সুখ উপভোগ করি!”

​কথাটা শুনে মনটা ভীষণ খারাপ হয় অন্তিহার। কোনো মেয়ে কি নিজের ভালোবাসার মানুষের এই অবস্থা সহ্য করতে পারে? আয়াশকে উপর থেকে যতটাই ঘৃণা দেখাক না কেন, অন্তিহার মন তো ভালো করেই জানে—ঠিক কতটা ভালোবাসে সে এই পুরুষটিকে! নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে সে আবার জিজ্ঞেস করে,

“খেয়েছেন কিছু?”

​আমের টুকরোটা মুখে পুরে নিয়ে একটু শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল আয়াশ, তবে কোনো জবাব দিল না। এতেই অন্তিহা বুঝে লোকটা কিছু খায়নি! খাবেই বা কীভাবে? সে তো না কারও সেবা নেয়, আর না এখন নিজে কিছু তৈরি করার মতো পরিস্থিতিতে আছে।

​আয়াশ নিজেই নীরবতা ভেঙে ধীরে ধীরে নিচু কণ্ঠে বলতে শুরু করল,

“তুমি একদম চিন্তা করো না। বাড়ির মানুষ তো এমনই হয়, বিয়ে নিয়ে চাপ দেবেই... আমাকেও দিচ্ছে। কি বলো?! তোমাকে ছাড়া এই জীবনে আমি কখনো অন্য কারও সংস্পর্শেই যাইনি। সেই বিষয়টা হয়তো তাদের নজর এড়ায়নি। তোমাকে আমি যতটা অবলীলায় ছুঁয়ে দিই, আশাকেও তো কোনোদিন ওভাবে ছুতে পারি না! তোমাকে ছোঁয়ার আগে আমার মন কখনোই ভাবে না যে তোমার হাতটা হাইজেনিক কি না! এসব আমি সেদিন থেকেই লক্ষ করেছি, যেদিন সাফওয়ানের সামনে তোমাকে প্রথম ছুঁয়েছিলাম...।”

​নিজের বানাওট কথাগুলোর সাথে আয়াশ কখন নিজের আবেগগুলোকে কেমন গুলিয়ে ফেলছিল জানেই না! কথা বলতে বলতে মনের অজান্তে কাটা চামচ নাড়াতে গিয়ে কাচের বোলে ‘টস’ করে একটা স্পষ্ট শব্দ হয়!

​ব্যস! সেই শব্দেই আয়াশের আবেগের ওপর যেন এক বালতি ঠান্ডা পানি ঢেলে দিল অন্তিহা। সে ওপাশ থেকে ব্যাকুল হয়ে বলে উঠে,

“কিসের শব্দ হলো? ঠিক আছেন তো আপনি, আয়াশ? আমি কি কাউকে পাঠাব? নাকি... আমি নিজেই আসব?”

​মুহূর্তেই থতমত খেয়ে গেল আয়াশ! ধড়ফড় করে উঠতে গিয়ে সালাটের পুরো কাচের বাটিটা আছড়ে পড়ল ঠিক তার পায়ের ওপর! ঠোঁট চেপে ধরে তীব্র যন্ত্রণা হজম করে সে। মনে মনে শুধু একটাই কথা আওড়ালো ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়েরে আয়াশ, নড়ে!’

​সে ভালো করেই জানে, সত্যিটা ফাঁস হলে এই মুহূর্তে অন্তিহাকে আসতে বলা যাবে না। এসব নাটক দেখলে মেয়েটা তাকে মাথায় বাড়ি দিয়ে সত্যি সত্যিই কানা বানিয়ে দেবে! তাই নিজের পায়ের তীব্র যন্ত্রণাটাকে তোয়াক্কা না করে, কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব কাতর ও স্বাভাবিক বানিয়ে সে বলল,

“কিছু না... ওসব ভেবে চিন্তা করো না। যার চোখ নেই, তার মতো অসহায় আর কেউ নেই এটা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি! তুমি কেন আমাকে বিয়ে করে নিজের লাইফটা নষ্ট করতে যাবে বলো?”

​পায়ের যন্ত্রণায় আয়াশের মুখের অবয়ব বিকৃত হয়ে যাচ্ছে, তবুও তার কণ্ঠস্বর যেন বড্ড কাতর ও অসহায় শোনাল। আয়াশ বোঝাতে চাইল সে ব্যথায় নয়, বরং নিজের অন্ধত্বের কষ্টে ভুগছে!

​কথা শেষ করেই হুট করে কলটা কেটে দিয়ে সোফায় ধপ করে বসে পড়ো সে। ফোনটা পাশে রেখে তাড়াহুড়ো করে টিস্যু দিয়ে নিজের পা আর মেঝের চারপাশটা দ্রুত পরিষ্কার করতে থাকে। সালাটের টুকরোগুলো সব যে তার পায়ের ওপরই পড়েছে!

​টিস্যু দিয়ে মেঝে মোছাতে মোছাতে মনের ভেতর উপলব্ধি হচ্ছে আয়াশের যা অজান্তেই ঠোট দিয়ে বেড়িয়ে আসলো

“বাপরে! এই মেয়েমানুষ সামলানো যে নিজের চরম ওসিডির রোগ সামলানোর চেয়েও শতগুণ কঠিন কাজ! ইয়া খালিদ হয় অন্তিহা দিয়ে দাও, নয়ত অন্তি দিয়ে দাও।”

চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন