#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ৫৬
গড়িয়েছে সকাল। ঘুম থেকে উঠেই ঝটপট রেডি হলো অহীন। আজকে বাড়িতে মা নেই, নেই কোনো বাধাসাধাও। সে এখন ওবাড়িতে যাবে। সারারাত তার ফোনটা বেজে গেছে। আশা হয়তো তাকে কল দিতে দিতে ঘুমায়ইনি। মেয়েটার সাথে সব রাগারাগির এবার সমাপ্তি টানতে হবে। আলমারি খুলে সে একটা মাফলার নিতে যায়, যাতে গলার দাগটা আড়াল করা যায়। তবে চোখ পড়ে আশার একটা পুরোনো ওড়নার দিকে, পুরোনো হলেও সেটাকেই গলায় পেঁচিয়ে নেয় সে। রুম থেকে বের হয়ে দেখে, তার বাবাও রেডি তার সাথেই যাবে। কাল রাতের পর লোকটা একটুও ঘুমাননি, চোখ-মুখের বেহাল অবস্থা। তা দেখে অহীন একটা কৃত্রিম হাসি দিয়ে বাবাকে হালকা উপহাস করে বলে
“বউ ছাড়া ঘুমাতে পারো না, তাহলে কেন এত ঝামেলা করো? মহিলারা তো সব সময় এককাঠি বাজিয়েই কথা বলবে, তাদের জিতিয়ে দিতে পারলেই তুমি সফল পুরুষ!”
“একটু তো লজ্জা করো! বউ বউ করছ কেন? ওটা তোমার মা।”
“তোমার তো বউ-ই!”
দুজনে একসাথেই বাসা থেকে বের হয়। বাবা-ছেলের গন্তব্য এখন শিকদার বাড়ি। আকাশ আজকে বাড়িতে থাকবে না, আর এটাই তো সুযোগ আশার সাথে কথা বলার! বাইকে করে দুজনে শিকদার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। পথে অন্তিক নেমে গেল ছোট শিকদার বাড়ির সামনে, কেননা সেখানে কুহু আছে, যে রাগ করে মেয়েকে নিয়ে চলে এসেছে।
অহীন শিকদার বাড়ি পৌঁছে যথারীতি দরজা খোলা পেয়েছে। ভেতরে আকাশ আর আশা খাবার খাচ্ছে, আর তাশা পরম আদরে আশার মুখে লোকমা তুলে দিচ্ছে। কিন্তু মেয়েটার খাবারে একদমই মন নেই। অহীন হালকা গলা খাঁকারি দিতেই সবার দৃষ্টি তার দিকে গেল। উৎসুক আশা খাবার রেখেই মুখে হাসি নিয়ে বসা থেকে উঠতে চায়। অহীনকে শেষ হাসপাতালে অসুস্থ দেখেছিল সে এখন তাকে সুস্থ দেখে মনটা অজানা এক শান্তিতে নেচে উঠল। তবে এগোনোর আগেই বাবার গম্ভীর নিষেধাজ্ঞা জারি হলো,
“চুপচাপ বসে থাকো।”
বাবার কড়া ধমকে মাথা নত করে বসে আবার আশা। অহীন এগিয়ে এলে তাশা মুচকি হেসে তার জন্য চেয়ার টেনে দেয়। এরপর আলহাদ আর আদরমাখা গলায় জিজ্ঞেস করে,
“শরীরটা ভালো হয়েছে তোমার? গলার দাগটা কি কমেছে? পাগলামি করার জন্য তোদের দুজনকে একদম গোল্ডেন মেডেল দেওয়া উচিত! যেন আমরা তোদের কোনো কথাই শুনি না! বলি, আমরা কি এতটাই টক্সিক বাবা-মা যে তোরা এমন কাজ করবি? আমাদের সময় হলে বুঝতিস, তোদের দাদি দিনে ১৪ বার কথা শোনাত!”
তাশা বাঁ হাত দিয়ে ওড়নাটা অহীন এর গলা থেকে একটু সরাতেই নীলচে ক্ষতটা খানিকটা দৃশ্যমান হলো। আশা উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করল কিছুটা। তবে সে দেখার আগেই তাশা আবার ঢেকে দেয়। অহীন আশার এই ব্যাকুলতা আড়চোখে দেখেও কোনো কথা বলল না। খানিকটা কষ্ট তো সে আশাকে দিতেই চায়! অহীন তাশার হাত ছাড়িয়ে বলল,
“ও মা, বারবার গলার দাগের কথা মনে করিয়ে দিয়ে কী বোঝাতে চাও?”
“কাপুরুষেরা আত্মহত্যা করে।”
সামনে বসে থাকা আকাশ সাবলীলভাবে খেতে খেতেই অবলীলায় অপমানটা করে উত্তর করে তাকে। কেবল কি অপমান? যেন এক নিমেষে ধূলিসাৎ করে দিল তার পুরুষত্বকে! কথাটা শুনেই খুক খুক করে কেশে উঠে আশা। তাশা সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে পানি এগিয়ে দেয়। অহীন নিচু গলায় জবাব দেয়,
“আমার পুরুষত্বের প্রমাণ তো পাশেই বসে আছে, তা-ও আবার একসাথে দুটো!”
পুনরায় খুক খুক করে কেশে উঠে আশা, তাশা আবার পানির গ্লাস এগিয়ে দেয়, কিন্তু পানি গলা দিয়ে নামার আগেই আকাশ টেবিলে ঠাস করে গ্লাসটা নামিয়ে রাখে। ধড়ফড়িয়ে উঠে মেয়েটা। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে তাশা কথা ঘোরাল,
“অহীন, নাস্তা করেছ?”
অহীন মাথা নেড়ে নিচু গলায় বলল,
“উহু, আম্মু আব্বুর সাথে ঝামেলা করে বাপের বাড়ি চলে গেছে, আর অন্তু রাগ করে বাড়ি ছেড়েছে। আব্বু একটু পর চলে আসবে তোমাদের বাড়িতে।”
তাশা চিন্তিত হয়ে অহীনের দিকে আশার জন্য তৈরি করা লোকমাটা এগিয়ে দেয়। অহীন হাসিমুখে সেটা খেয়ে নেয়। আশার দিকে তখনো সে একটিবারের জন্যও তাকায়নি। সবাই খাবার খাচ্ছে, আর তাশা অহীনের মুখের খাবার শেষ হওয়ার আগেই আরেক লোকমা তুলে দিচ্ছে। আশা না চাইতেও আড়চোখে দেখে মুচকি মুচকি হাসছে। অহীন কিছু গিলে খাওয়ার আগেই আবার খাবার হাজির! কথায় আছে না হাতে নয়, ভাতে মারা, সেটাই যেন এখানে অহীনের ওপর বাস্তবায়ন করছে তাশা।
আকাশ নিজের খাবারের পাতে নজর রেখে নিচু গলায় বলল,
“খাওয়াও, মিসকিন খাওয়ানো সুন্নাহ। তবে কী প্রয়োজনে এসেছে, সেটাও জিজ্ঞেস করে নাও।”
তাশা আকাশের কথায় তেমন গুরুত্ব দিল না। আশা হাসপাতাল থেকে এসেছে বলে তার জন্য নানা পদের খাবার রান্না করেই যাচ্ছে সে। আর আকাশ বাজার থেকে পারলে সব ফল একাই নিয়ে আসত! তাদের একটিমাত্র মেয়ে। সন্তান যতই ভুল করুক না কেন, মা-বাবার চোখে তারা তো সব সময় নির্দোষ আর আলহাদিই হয়।
তাশা হাত ধুয়ে অহীনের সামনে পায়েসের বাটি রাখতেই অহীন নির্বিকার ভঙ্গিতে সেটায় চামচ নাড়ে। ভাবলেশহীনভাবে জবাব দিল,
“ওকে নিতে এসেছি।”
বলেই পায়েস মুখে পুরে নেয় সে। আকাশ হাত ধুয়ে অহীনের দিকে তাকায়। অহীন খাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু চোখ তার আকাশের দিকেই আটকে। এত কিছুর পরও এই ছেলের কত বড় সাহস যে এভাবে এসে কথাটা বলছে! আকাশ যেন হিসাব মেলাতে ব্যর্থ । সে তাশার শাড়ির লম্বা আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বলে,,
“লজ্জা করে না তোমাদের? কোনো সম্পর্ক নেই, তবুও কোন মুখে তোমরা দুজন পাশাপাশি বসে খাচ্ছ? আবার নির্লজ্জের মতো বলছ তুমি ওকে নিতে এসেছ?”
আকাশের শান্ত গলার কথাগুলো এবার আশার গায়ে গিয়ে লেগেছে। নিজের জন্য নয়, অহীনের জন্য! বারবার তার জন্যই তো অহীনকে কথা শুনতে হচ্ছে। আশা মাথা নিচু করে বলল,
“সম্পর্ক তো আছেই, সে আমার সন্তানদের বাবা। তাছাড়া সে আমার কাজিন এবং গার্ডিয়ান।”
“গার্ডিয়ান? গার্ডিয়ান কেবল বাবা আর মা হয়। দ্বিতীয় কাউকে বানাতে হলে শক্ত একটা দলিল প্রয়োজন হয় আছে তোমাদের কাছে?”
আশা মাথা নিচু করে অহীনের দিকে ফেরায় অহীন আকাশের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলতে শুরু করে,
“তোমার মেয়ের দায়িত্ব নেয়ার জন্য আলাদা করে আমার কোন.…”
কথাটা শেষ করার আগেই নতমস্তক আশা কণ্ঠস্বর একদম নামিয়ে, ভেজা গলায় বলে ওঠে,
“অহীন, দীর্ঘ একটা বছর কেবল আমার জন্য তুমি সবার সামনে বারবার ছোট হয়েছ। তবুও কি আমাকে একটুও ঘৃণা হয় না তোমার? সত্যি, বড্ড বেহায়া তুমি! তোমার মতো নির্লজ্জ এই দুনিয়ায় আর দুটো নেই। এত অপমান আর চরিত্র নিয়ে নোংরা মন্তব্য শোনার পরও ঘৃণা হয় না বুঝি? আমাকে নিতে চাও?”
অহীন তাকে পুরোই উপেক্ষা করে। যে মেয়েটাকে সে নিজের সাথে ফিরিয়ে নিতে চায়, তাকে এভাবে উপেক্ষা করে যাওয়াটা পুরো পরিবেশটাকে যেন থমথমে করে তুলছে। নীরেট এক অভিমান ভর করেছে তার ওপর। সে কেবল আকাশের দিকে কথা বলার ভঙ্গিতে চেয়ে আছে, যেন পাশে কেউ নেই তার।
অহীন থিতু গলায় বলল,
“ছোট আব্বু, স্বার্থপরতা কোনো খারাপ কিছু না। ওটা আমাদের জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন, যা থাকা দরকার। ওকে এবার আমি অন্য কারও জন্য নয়, নিজের খুশির জন্য নিয়ে যাব। তাই এই মুহূর্তে আমি সত্যি দুনিয়ার সবচাইতে নগণ্য আর নির্লজ্জ বেহায়া…”
আশা এবার চাতক পাখির মতো ব্যাকুল হয়ে চেয়ারটা অহীনের আরও কাছে টেনে বসল। পাশে বাবা-মা আছে জেনেও মেয়েটার যেন এখন একমাত্র ভরসা এই অহীন! যে ছোটবেলা থেকে তাকে কখনো ইগনোর করেনি, আজ কতগুলো দিন সে কথা বলছে না তাকাচ্ছে না, একটুও না!
আশা ব্যাকুল গলায় বলে উঠল,
“কথা বলবে না? আই অ্যাম সরি, ইয়ার! তোমার এই ইগনোর করার ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই। তুমি কখনো কোনো ভুলের জন্য আমাকে এভাবে এড়িয়ে চলোনি। ফ্রান্স ডিভোর্সের পর দুটো সপ্তাহ সাথে ছিলাম, তখনও তো স্বাভাবিক ছিলে! এবার কেন এমন করছ? এত কাছে এসেও কেমন যেন এক মেকি দূরত্বের অনুভূতি হচ্ছে!”
অহীন দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আশার দিকে না চেয়েই শান্ত কণ্ঠে বলে,
“ইগনোর করলে নিতে আসতাম না।”
“কিন্তু তুমি তো কথাও বলছ না!”
আশার কণ্ঠে তীব্র ব্যাকুলতা ঝরে পড়ছে। তার আকুতিতে ঘরের পরিবেশ যেন আরও খানিকটা ভারী হয়ে ওঠে। আকাশ ড্যাবড্যাব করে অহীনের দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েকে এভাবে উপেক্ষা করে ছেলেটার এমন কাঠখোট্টা ভাব দেখে যেন তার ভেতরে রাগের পারদ চড়ছে। তাশা আশার হাত ধরে বসা থেকে উঠিয়ে নিতে চায়, কিন্তু আশা আলতো করে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়। তারপর যেন নিজের জায়গায় অনড় হয়ে বসে একদম নিরেট ভঙ্গিতে বলে ওঠে,
“আই লাভ ইউ। সত্যি বলছি, আমার অনুভূতি নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। আমি তোমার সঙ্গেই থাকতে চাই।”
ঘরের থমথমে পরিবেশে বিস্ময় আর মনের ভেতরের সুপ্ত উত্তেজনাগুলো যেন অহীনের বুকে আছড়ে পড়ে। নিজের কান দুটোকেই যেন বিশ্বাস হতে চাইছে না তার! কান দুটো কি হাত দিয়ে পরিষ্কার করে নেবে? কিন্তু তাতে আবার ছোট আব্বু আর ছোট আম্মু তাকে পাগল ভেবে বসবে না তো?
আকাশ মেয়ের দিকে তাকায় যার মুখে লজ্জার এতটুকু লেশ মাত্র নেই! তাশা আশার বাহুতে হালকা ফোড়ন কাটে, কারণ আকাশের রাগী দৃষ্টি ততক্ষণে আগুনের শলাকার মতো এসে পড়ছে মেয়ের ওপর। অহীনের কোনো উত্তর না পেয়ে আশা আবারও আকুল হয়ে বলে,
“আমি সত্যি ভালোবাসি তোমায়। যেভাবে রাখতে চাও, সেভাবেই থাকতে রাজি।”
অহীন শুকনো ঢোক গিলে। সে বুঝতে পারছে না এই স্বীকারোক্তিতে তার খুশি হওয়া উচিত, নাকি আরও গভীর আফসোসের সাগরে ভাসা উচিত! আশা কেবল অহীনের সঙ্গে কথা বলার জন্য যেন ছটফট করছে। তাশা স্বামীর চোখের দিকে তাকায় স্বামীর চোখের ভাষা সে খুব ভালো করেই বোঝে। এই মুহূর্তে আকাশ রাগের ভান করলেও, ছেলে-মেয়ের এই মান-অভিমানের পর্বটি বোধহয় মনে মনে উপভোগই করছে সে। তাশা কিচেনের দিকে পা বাড়ায় এবং সেখান থেকেই হাঁক ছাড়ে,
“আকাশ, একটু শুনুন? আচারের বয়ামটা নাগালে আসছে না।”
স্ত্রীর এমন জরুরি ডাক কি ফেলার সাধ্য আছে কোনো মানুষটার? জায়গা ছেড়ে উঠে চলে যায় আকাশ। অহীনও আকাশের পিছু নেওয়ার জন্য উঠতে গেলে, অমনি তার হাত চেপে ধরে থামায় আশা। কব্জিতে নরম হাতের স্পর্শ পেয়ে বরফের মতো জমে যায় অহীনের পুরো শরীর। হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই আশা আরও কাতর গলায় বলে ওঠে,
“আমি তোমাকে কবে কখন থেকে এত তীব্রভাবে চাইতে শুরু করেছি, জানি না। আমি চাই না তোমার মুখ থেকে ‘আশাকে ভালোবেসেছিলাম’ কথাটা শুনতে। আমি চাই আমার অহীন সারাজীবন কেবল বলুক সে তার পেঁচিকে ভালোবাসে। বাড়ির সবাই বলছিল তুমি নাকি জেসিকে বিয়ে করে নেবে! তখনো কেউ আমাকে তাইয়ের কথা জানায়নি, তুমিও না। মনে হচ্ছিল এইতো, কোনোভাবে একটা বছর কেটে যাবে, আর তারপর তুমি বলবে জেসির সঙ্গে মুভ অন করেছ। তখনো যদি আমাকে ভালোবাসতে, তবুও জেসিকে দেখানোর জন্য বলতে ভালোবাসো না! সেই লোকদেখানো অবহেলা আমি সহ্য করতে পারতাম না। তুমি তো শুধু ভালোবাসায় থেমে থাকোনি... নিজের উন্মাদের মতো পাগলামিতে আমাকে অভ্যস্ত করেছ! আই লাভ ইউ। তুমি যদি আমাকে তোমার বাড়ির যেকোনো এক কোণেও ফেলে রাখো, আমি থেকে যাব। কিন্তু এভাবে আর কষ্ট দিও না, প্লিজ!”
দাঁড়ানো থেকে আশা পাশে এসে বসে অহীন। বলতে বলতে মেয়েটার গলা জড়িয়ে আসছে, দু’চোখ বেয়ে অবিরল ধারায় ঝরছে অশ্রু। কি নিঃসীম মায়া এই মুখটায়! কে বলবে এই মেয়ে প্রেগন্যান্ট? একটু তো পেটটাও বোঝা যাচ্ছে না!
অহীন আলতো করে ওকে পিঞ্চ করে বলে,
“কষ্ট হয়, তাই না? যখন কাছে ছিলাম, তখন তো এভাবে বলিসনি! আমাকে পাওয়ার জন্য এভাবে কাঁদিসনি। তখন কাঁদতাম আমি, তোকে পাওয়ার জন্য। তোর চেয়ে শত-সহস্র গুণ বেশি কেঁদেছি। আজও মনে পড়লে কাঁদি... যে তোকে ছোঁয়ার, তোকে ভালোবাসার কোনো অধিকারই আমার নেই!”
আশা চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে অহীনের হাত দুটো মুঠোয় চেপে ধরে,
“তুমিই তো বলেছিলে, না ছুঁয়েও আমরা একসঙ্গে থাকতে পারব! আমাদের তো এখন দুটো বেবি হবে... তখন সব আরও সুন্দর হয়ে যাবে, তাই না?”
অহীন এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে,
“ভালোবাসা সহজে পেয়ে গেলে তো সবটাই সুন্দর , তাই না? কিন্তু একবার হারিয়ে দেখ দূরত্ব আসলে ঠিক কতটা ভয়ংকর ! যা প্রতিনিয়ত আমি অনুভব করি।”
আশা ঠোঁট উল্টে মাথা দোলায়,
“চার মাস কম ছিল?”
অহীন ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আশার চোখের দিকে তাকিয়ে কিছুটা দৃঢ় গলায় বলে,
“আমি কিন্তু আর আগের মতো তোর সঙ্গে অহেতুক আহ্লাদ বা অতিরিক্ত আদর দিয়ে চলব না। তবুও যাবি?”
আশার চটপট জবাব,
“হ্যাঁ, যাব।”
“বউয়ের মতো ট্রিট করব না। কেবল আমার দুটো সন্তানের মা হয়ে থাকতে হবে।”
“তাতেও আমি রাজি!”
অহীন আশার চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে, মেয়েটার চোখের এই আকুতি আর কাতরতা দেখতে যেন তার মন্দ লাগছে না। এটাই প্রথম কিনা? ভালোবাসার মানুষটার চোখে পাওয়ার চাতরতা কয়জনই বা দেখার ভাগ্য পায়? এবার নিজের চোয়াল কিছুটা কঠিন করে আশার দিকে তাকায় অহীন, শক্ত গলায় বলে,
“এবার আমি যদি তোকে রেখে অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে জড়াই, তবে সেটা পরকীয়া বা তোকে চিট করা হবে না। বরং তুই তখন আমাদের জীবনে একটা উটকো তৃতীয় ব্যক্তির মতো থাকবি। মানতে পারবি?”
কথাটা শুনে থমকে গেল আশা। এবার আর চট করে সম্মতি দিতে পারল না সে। জোড়া ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠে । থিতু মুখে অহীনের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিল। পারবে না এটা পারবে না মানতে। অন্যদিকে তাকিয়ে, নাক টেনে বুক ফুলিয়ে এক গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,
“তখন আমি তোমার জীবন থেকে চলে যাব।”
“বিষ খেয়ে?”
অহীন কথাটা বলতেই আশা চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকায়। কেমন খোঁচা মেরে কথা বলে লোকটা ছিহ! অহীন এগিয়ে এসে আলতো করে ওর চোখের পানি মুছে দিয়ে নিচু গলায় বলল,
“সব বদলে যাবে, আশু। সমাজ কটু কথা বলবে। কাছে থেকেও সব সময় কেবল দূরে দূরে থাকতে হবে। আমাদের নিজেদের মাঝে একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে নিতে হবে। কোনো কিছুই আর আগের মতো থাকবে না। তোর সঙ্গে কথা বললেই তো নিজেকে মাতাল মাতাল লাগে! তোকে এভাবে দূরে রেখে আমি কীভাবে থাকব, বল? আবার তোকে ছাড়াও তো বেঁচে থাকতে পারব না! নিজেদের মধ্যে ঝামেলা করার সুযোগটাই তো পাওয়া যাবে না... বাইরের লোকের কথা হজম করতেই তো সময় পার হয়ে যাবে, নিজেদেরটা কখন সামলাব?”
তার এই কথায় আশা ভাষা হারাচ্ছে। কী বলবে সে? অহীনের কথাগুলো তো বিন্দুমাত্র ভুল নয়! অহীন ফের বলে,
“আগের মতো পরিস্থিতি হলে তোকে জোর করে তুলে নিয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু এখন…?”
“এখন আর পারবে না! কারণ, আমি আশুকে তোমার সঙ্গে যেতে দেব না। তোমার সঙ্গে কোনো সম্পর্কই যখন নেই, তবে কেন আমার মেয়ে তোমার কাছে যাবে?”
কথার মাঝেই রান্নাঘর থেকে উত্তরটা ভেসে আসে। আকাশ নিজের পরনের সাদা শার্টটি টিস্যু দিয়ে মুছতে মুছতে বের হচ্ছে আচারের দাগ লেগেছে তাতে। শার্ট মুছলেও অহীনকে খোঁচা দেওয়ার সুযোগ সে কিছুতেই হাতছাড়া করতে রাজি নয়। আশা নিচু মাথায় ঠোঁট চেপে মিটিমিটি হাসে। অহীন জোরালো গলা খাঁকারি দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় বলল,
“আমি তো ওকে নেবই! জোর বাইরের লোকের সঙ্গে খাটে না, তুমি তো আমার চাচ্চু!”
আকাশ তাকে ধমকে উঠে ভারী গলায় বলল,
“আমার মেয়েকে তুমি ডিভোর্স দিয়েছ! তোমার সঙ্গে কেন আমি আমার সন্তানকে দেবো?”
অহীন আশার দিকে আড়চোখে একবার তাকায়। তারপর একটা মুচকি হাসি দিয়ে আকাশের দিকে ফিরে বেশ ভাব নিয়ে, বুক ফুলিয়ে বলল,
“তোমার সন্তানকে কে চায়? আমি আমার সন্তানগুলোকে চাই!”
আকাশ নাক ফুলিয়ে আশার দিকে তাকায়। অনতিদূরে নতমুখে দাঁড়িয়ে থাকা আশা বাবা আর অহীনের তর্ক শুনে ভেতরে ভেতরে ঠোঁট চেপে হাসছে। আকাশ বেশ গম্ভীর গলায়, অহংকার মিশিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
“হাহ্! সন্তান! জন্ম নিক আগে, তারপর তোমার বাড়িতে বস্তায় ভরে পাঠিয়ে দেব।”
বিস্ময়ে যেন আকাশ থেকে পড়ে অহীন! সে দ্রুত আশাকে বসা থেকে তুলে নিজের পেছনে আড়াল করে দাঁড়ায়। তারপর তীব্র আতঙ্কিত গলায় বলে উঠে,
“আমি তোমাকে বিশ্বাস করি না! দেখা গেল আমার একটা মেয়ে হলে তুমি তো জন্মের সময় পিছলে তার প্রেমে পড়ে যাবে! কোনো বুড়োর কাছে আমি আমার মেয়েকে রাখব না রিস্ক নিয়ে।”
আকাশ তার এমন অদ্ভুত কথায় থতমত খায়! বড় বড় চোখে অহীনের দিকে তাকিয়ে, আছে আত্মসম্মানে গিয়ে লাগলো অহীনের কথাটা প্রায় তাশাকে দেখিয়ে বলে উঠে
“তোমার মেয়ে হলে আবার কী এমন হবে? আমার বউ তার থেকে হাজার গুণ বেশি সুন্দরী! আমি তার প্রতি শতভাগ লয়াল।”
“তুমি যতই লয়াল হও না কেন, আমার মেয়ের রূপের আগুনে সব জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাবে! আজকালকার বুড়োদের একদম বিশ্বাস নেই। বাবারে বাবা! মেয়ে জন্ম নেওয়ার আগেই দেখো কীভাবে আমার সন্তানের দিকে নজর দিচ্ছে! তুমি এখনই ওর প্রেমে পড়ে যাওনি তো?”
তাশা আর আশা দুজনই এদের অহেতুক আর অদ্ভুত তর্কের দৃশ্য দেখে মুখ চেপে হাসছে। আকাশ তাশার বাহু শক্ত করে ধরে তাকে একটু সামনে ঠেলে দিল, তারপর অহংকার করে নিজের স্ত্রীর গাল টেনে বলল,
“আমার বউকে দেখেছ? তোমার মেয়ে হুরপরী হলেও একে টেক্কা দিতে পারবে না! বয়স হলেও আমার বউকে যদি আজ দ্বিতীয়বার কনে সাজাই, মনে হবে অষ্টাদশী এক সদ্য যুবতী! এসেছে টেক্কা দিতে... কোথায় চাঁদ আর কোথায়...?”
“ব্যস, হয়েছে! অনেক তর্ক করেছ, আর করতে হবে না।” দরজার কাছ থেকে একজন বলে উঠলেন, “আকাশ, তোর যদি মনে হয় আমার নাতনি এতটা অসুন্দর হবে, তবে তাকে আমিই নিয়ে যাই, সেটাই ভালো হবে। কারণ তোর তো বউ আছে, আর আমার বউ তো বছরে ১১ মাস রাগ করেই কাটায়! সেই ফাঁকা সময়টায় নাতনিকে সামলানোই আমার কাজ দেবে!”
আকাশ ঠাস করে হাতে তালি বাজিয়ে দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে থাকা অন্তিকের দিকে আঙুল তাক করে। অহীনকে কটাক্ষ করে, তাকে নিচু দেখানোর ভঙ্গিতে বলল,
“এবার দেখো, কোথায় তোমার মেয়ের রিস্ক বেশি।”
অহীন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
“আমার আব্বু? তিনি এই এগারো মাস কোনো ফিমেল টিকটিকির দিকেও তাকান না। তাই আমি জানি তিনি কতটা লয়াল। প্লিজ, কারও সন্তানকে নিয়ে টানাটানি করবেন না।”
তাশা সবাইকে থামিয়ে বলল,
“হয়েছে, হয়েছে। যার যার সন্তানকে নিয়ে সে সে ভালো থাকুক। আমার আশা যেখানে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, সেখানেই থাকুক। কারণ অহীন না থাকলেও আশা তো তার ফুম্মিরই মেয়ে, তাই না অন্তিক ভাইয়া?”
অন্তিক ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে মৃদু হেসে বলল,
“আশা কার বাড়িতে থাকবে, সেটা নিয়ে তর্ক পরে করব। আগে আমাকে নাস্তা দাও, অফিস আছে আমার। তোমাদের রোজ রোজ বিরক্ত করতে করতে আমি গর্বিত। কারণ ছেলে পক্ষের লোকজন একটু এমনই হয়। এখানে এসে আদেশ করলে নিজেকে একেবারে ছেলের বাপ-বাপ ফিল হয়।”
আকাশ হেসে বলে
“তুই তো ছেলেরই বাপ।”
কথাটা বলেই সে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যায়। ইশারায় অহীনকেও সঙ্গে নিয়ে । যথারীতি দুজনই নিজেদের সেই চিরচেনা ডেরায় যাবে যেখানে প্রায়ই বসে মনের সব কথা একে অপরের সঙ্গে ভাগাভাগি করে।
___________
কিছুক্ষণ আগে…
কতদিন পর চেনা বাড়িটায় আসা! চাচার বাড়ি উহু, বউয়ের ভাইয়ের বাড়ি, অর্থাৎ রাহাতের বাড়িতে এসেছে অন্তিক। কুহুর সঙ্গে শেষ কবে এমন দূরত্ব আর সমস্যা হয়েছিল, তা ঠিক মনে নেই। তবে এবারের একটা কথা তাকে ভীষণভাবে ভাবাচ্ছে।
বাসায় প্রবেশ করতেই নিলয়ী তাকে দেখে ছুটে আসে ঠিক যেমন নিজের ভাইকে দেখলে বোন এগিয়ে আসে, নিলয়ীর ব্যবহারটা ঠিক তেমনই। সে অন্তিকের হাত ধরে টেনে এনে সোফায় বসায়,
“কেমন আছেন? অহীনকে আনলেন না কেন, অন্তিক? আমাদের বাড়িতে বুঝি আর আসতেই ইচ্ছে করে না? আব্বু যখন বেঁচে ছিল, তখন তো কত ঘন ঘন আসত! এখন আপনি আর আকাশ ভাইয়া আসতেই চান না, কেন বলুন তো?”
অন্তিকের মুখটা হঠাৎ মলিন হয়ে যায়। নিলয়ী অনুমান করতে পারে, কুহুর সঙ্গেই কোনো ঝামেলা হয়েছে, এমনই তো হয় মানুষটা চুপচাপ হয়ে যায়। অন্তিক মৃদু স্বরে শুধায়,
“রাহাত বাসায় নেই?”
“আছে তো! কুহু আর অন্তিহা এসেছে বলে আজ ফ্যাক্টরিতে যায়নি। কুহুর সঙ্গেই রুমে আছে।”
অন্তিক সোফা ছেড়ে উঠে ঘরের দিকে এগোয়। ভেতরে গিয়ে দেখে রাহাতের সঙ্গে হালকা হাসি-ঠাট্টায় মেতে আছে কুহু। অন্তিহা এখানে নেই, হয়তো পাশের কোনো ঘরে আছে। অন্তিককে ঢুকতে দেখেই কুহু মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নেয়। অন্তিক রাহাতের পাশে বসে দু-একটা সংক্ষিপ্ত কথা বলেই থামে। রাহাত বুঝতে পারে অন্তিক হয়তো কুহুর সঙ্গে একান্তে কথা বলতে চায়। তাই নাস্তার কথা বলে ঘরের পরিবেশ হালকা করতে উঠে দাঁড়ায় সে।
রাহাত বের হতেই কুহুও তার পিছু পিছু উঠতে যায়। কিন্তু কব্জিতে এক শক্ত স্পর্শ পেতেই থমকে যেতে হয় তাকে। শুকনো ঢোক গিলে সে অন্তিকের দিকে তাকায়। অন্তিক তাকে আলতো টানে নিজের সামনে এনে বসায়। পুরো ঘরটা থমথমে নীরবতায় ছেয়ে গিয়েছে। নতমুখে বসে থাকা মানুষটির দিকে তাকিয়ে অন্তিক নিজেই প্রথম নীরবতা ভাঙে,
“আমাদের আর বয়স কম হলো না, কুহু! রাগ-অভিমানের খেলা খেলতে আমি আসিনি।”
স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে কুহু কেবল নিঃশব্দে মাথা নাড়ে। অন্তিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“গত রাতেও আমি একফোঁটা ঘুমাতে পারিনি। কিন্তু এবার তোর অভাবে নয়, ভেবে যে এতগুলো বছর ধরে তুই কেবল আমার সঙ্গে মানিয়েই চলেছিস!”
জিভ দিয়ে শুষ্ক ওষ্ঠ ভিজিয়ে কুহু আবারও একটা শুকনো ঢোক গিলে থতমত খেয়ে বলে,
“অন্তুকে তুমি...!”
কথাটা শেষ করার আগেই অন্তিক তাকে থামিয়ে দেয়। গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
“আমি অন্তুর কথা বলছি না, কুহু! আমার যতদূর মনে পড়ে, অন্তুর জন্মের পর থেকে আমি কেবল তোকে ঘিরেই বেঁচে আছি। অথচ আজ এতগুলো বছর পার করে তোর মুখ থেকে ‘অমিলের সংসার’-এর কথাটা শুনে আমার ভেতরটা স্থির থাকতে পারছে না। আই অ্যাম সরি! তোকে সত্যিই বোধহয় একটা সুন্দর জীবন দিতে আমি ব্যর্থ হয়েছি। তোকে নিজের করে নিয়ে বাঁচার চক্করে, তুই আদৌ তোর মতো করে বেঁচে আছিস কি না সেটাই খেয়াল করা হয়নি। তোর যতদিন ইচ্ছে, তুই এখানে থাক। বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে হলে একটা ফোন দিস, এসে নিয়ে যাব, কেমন? এই বয়সে এসে আর টানাপোড়েন সামলানোর জোর আমার গায়ে নেই।”
কুহু চুপ করে থেকে স্বামীর প্রতিটি কথা মন দিয়ে শুনল। এই সামান্য কটি কথা বলতেই কি লোকটা আজ এসেছে? কথা শেষ করে অন্তিক ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ততক্ষণে পাশের ঘর থেকে অন্তিহাও বেরিয়ে এসেছে। মেয়েটার ফোলা চোখ দুটো স্পষ্ট বলে দিচ্ছে সেও সারারাত ঘুমায়নি। অন্তিক তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়,
“মায়ের মতো বাড়ি ছেড়ে চলে আসাটা ভালোই শিখেছ, বেয়াদব মেয়ে!”
অন্তিহা ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে থাকে। অন্তিকের গলা এবার খানিকটা নরম হয়ে আসে,
“আয়াশ ছেলে হিসেবে কিন্তু খারাপ নয়! পরিস্থিতি কেমন ছিল, তা তো তুমি নিজের চোখেই দেখেছ। অহীন বলল, তুমি নাকি আয়াশকে চাও। ভালোবাসা পাওয়াটা কি এতই সহজ, অন্তিহা? আয়াশকে বারবার আমাদের পরিবারের তরফ থেকে ঠকানো হয়েছে... বারবার নিজেদের প্রয়োজনে ওকে ব্যবহার করা হয়েছে। আজ যখন ওর নিজের প্রয়োজন, তখন আমরা কীভাবে পিছিয়ে যাই, বলো? তিতু তো শুধু এখন নয়, শুরু থেকেই আমার সঙ্গে থেকেছে দূর থেকেই। আমরা না বললে ও হয়তো আর কখনো তোমার নাম মুখে আনবে না। কিন্তু তুমি তো বোঝো আয়াশের আসলেই কী প্রয়োজন?”
অন্তিহা নিচু গলায় বলে ওঠে,
“কেবলমাত্র তিতাশ চাচ্চু তোমার পাশে ছিল বলেই আমাকে আয়াশকে মেনে নিতে হবে? কাছে আমি একটা অপশন হিসেবে আছি! যদি আশার সঙ্গে ওর বিয়েটা হয়ে যেত, তবে কি আমাকে পাওয়ার কোনো চেষ্টা বা ইচ্ছে ওর থাকত?”
“তুমি নিজেই জানো না তুমি আসলে কী চাও! আদৌ আয়াশকে নিজের জীবনে চাও, নাকি চাও না? যদি চেয়েই থাকো, তবে এমন জটিলতা তৈরি করছ কেন? সাফওয়ানকে পছন্দ করো? যদি ওকে পছন্দ হয়, তবে বলো আমরা কোনো আপত্তি করব না। নাকি অন্য কোথাও কোনো ভাবনা আছে?”
“আমি এখন এসবের কিছুই চাই না! আমি শুধু আমার ক্যারিয়ার নিয়ে থাকতে চাই।”
অন্তিক ওপর-নিচ মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়,
“ঠিক আছে। তোমার সেমিস্টার তো সামনেই চলে এলো, ফিরতে হবে না? আমি সব ব্যবস্থা করে দেব। তোমাকে আর কোনো কিছুর জন্য চাপ দেব না। তবে সুযোগ হলে আয়াশকে একবার দেখে এসো।”
অন্তিক আর বেশি সময় না দাঁড়িয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। নিলয়ী নাস্তা খাওয়ার জন্য অনেক অনুরোধ করলেও তাকে আটকানো গেল না। লোকটার মন আজ ভীষণ ভারাক্রান্ত। যে বউটাকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবেসে এসেছে, তাকে দূরে সরিয়ে রেখে ভালো থাকার ভান করা কত যে কঠিন! সান্তান গুলোর জীবনটা গুছিয়ে উঠুক... হয়তো তখন সব ভুলবোঝাবুঝি আর এই দীর্ঘ জমে থাকা মেঘগুলোও একদিন কেটে যাবে।
_____
ছাদের রেলিং ঘেঁষে বসে আছে অহীন আর আকাশ। দু’জনের হাতেই পায়েসের বাটি। তাশাই তো দিয়ে গেছে। বিয়ের পর আকাশকে দেখে মনে হয় সে বেশ ভালোভাবেই সংসারী হয়ে উঠেছে। তাশার তাকে যত্ন করতে কমতি রাখে না। পানিটাও তো গোসলের বউটাই এগিয়ে দেয়। আকাশ হাজার বার না করলেও শোনে না স্বামীর একটা কথা। ভালোবাসার মানুষের জন্য ছোট্ট ছোট্ট কাজ গুলোকেই তাশা নিজের সুখ করে নিয়েছে। আকাশ নিজেও তাশাকে কম মানে বললে ভুল সময়মতো খাওয়া, বউয়ের খেয়াল রাখা, চোখের পাতালায় রেখেছে যেনো কষ্ট ছুঁয়ে যাওয়ার আগেই আবাস পায় আকাশ নিজে। আশার বিয়ের আগে পর্যন্ত সংসারিক ঝামেলা তার কাছে যেন দুঃস্বপ্নের মতোই ছিল। অহীন আলতো করে আকাশের বাহু জড়িয়ে নিচু গলায় বলল,
“ও ছোট আব্বু, দেবে না আশাকে?”
আকাশ গলা খাঁকারি দিয়ে অহীনের হাতটা নিজের বাহু থেকে সরিয়ে বলল,
“না দিয়ে উপায় আছে? তোমরা যদি আবার কিছু করে বসো? আমার মেয়েটার সঙ্গে এখন আরও দুটো প্রাণ জড়িয়ে আছে।”
অহীন মুচকি হেসে বলল,
“এসেছো তো মনা লাইনে।”
আকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে হেসে উঠল, অহীনের পায়ের সঙ্গে তার পায়ের ধাক্কা লাগছে। কখনো অহীন ইচ্ছে করে ধাক্কা দিচ্ছে, কখনো আকাশ। শেষে আকাশ নিজের পা দুটো সরিয়ে নিল। অহীন তাকে ভেংচি কাটে, আকাশ এবার গম্ভীর গলায় বলল,
“আর নয় মাস। তারপর আশাকে আবার ফিরিয়ে আনব আমি। এখন ওকে কোনো মানসিক চাপ দিতে চাই না। বাবা-মায়ের কাছে সন্তান যত ভুলই করুক না কেন, সে সবসময় অমূল্য থাকে। আমি চাই না পুরোনো বিষয় টেনে এনে এখন ওকে আরও টেনশনে ফেলতে। একটা সন্তান হারিয়েছে আশা। এই নয়টা মাস ওর খেয়াল রেখো।”
অহীন শান্ত গলায় বলল,
“চিন্তা করো না। আমি জানি ওকে কীভাবে ভালো রাখতে হয়।”
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“জানো, আমি আর তোমার বাবা কেন সবসময় তোমাদের সিদ্ধান্তগুলো মেনে নিই?”
অহীন মাথা নাড়ে। আকাশ নিজেই বলল,
“কারণ একসময় আমাদের বাবা-চাচাদের সম্পর্ক খুব টানাপোড়েনের ছিল। তাদের সেই ঝামেলার প্রভাব আমাদের জীবনেও পড়েছে। অনেক কিছু এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। এখন আমরা ভয় পাই, নিজেদের মধ্যেও যদি তেমন কিছু হয়ে যায়। তাই প্লিজ, তোমরা আর কোনো ঝামেলা কোরো না। আমি অন্তিকের সঙ্গে সামান্য কারণে সম্পর্ক নষ্ট করতে চাই না।”
একটু থেমে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলল,
“আমি জানি, আমার মেয়েরই বেশি ভুল ছিল। বয়সের তুলনায় ও এখনও অনেক অবুঝ। আর এখন ওর জীবনের ওপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সবসময় সবার হয়ে লড়াই করেছি আমি। কিন্তু এখন আর পারছি না। সিদ্ধান্ত নেওয়া যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে ততটা সহজ নয়।”
________
বিকেলের হালকা সোনাঝরা রোদ। পরনের হালকা রঙের সাধারণ একটা কুর্তিতেই অন্তিহাকে দারুণ মানিয়েছে। বাসা থেকে বের হয়ে সে এসেছে আয়াশের সঙ্গেই দেখা করতে। যাক, ভাগ্য ভালো যে আজকে পথে কিংবা পেছনে সাফওয়ানকে দেখতে হয়নি। বিশাল বড় বিল্ডিংটার সামনে দাঁড়িয়ে আশপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল সে। মনটা কোনোভাবেই চায় না সাফওয়ান এখানেও তার পেছনে ধাওয়া করুক লোকটা অনর্থক আয়াশের সঙ্গে ঝামেলা পাকাবে। হাজার হোক বড্ড চায় কিনা তাকে! হয়ত গত রাতের তীব্র কথা গুলো গায়ে মেখেছে মানুষটা। যাক এতে লোকটার জন্য ভালো হয়েছে।
লিফ্টে উঠে তিনতলায় নামে সে। পুরো একটা ইউনিট নিয়ে আয়াশের নিজস্ব ফ্ল্যাট। এই বিল্ডিংটা আয়াশরই, শুধু নিজের ফ্ল্যাটটা সে নিজের মনমতো ডিজাইন করিয়ে নিয়েছে। চারপাশটা ভীষণ নীরব, আর দেয়ালগুলো একদম আয়নার মতো পরিষ্কার! এসব পরিচ্ছন্নতার পেছনে লোকটা যে পানির মতো টাকা ঢালে, তা দেয়ালগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়। ফ্ল্যাটের কলিং বেল চেপে ধরে অন্তিহা নিজের ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে।
ভেতরে আয়াশ টেবিলে বসে চোখে চশমা দিয়ে ল্যাপটপে কাজ করছে। কানে কলিং বেলের শব্দ আসতেই ল্যাপটপ অন রেখেই চট করে উঠে যায় সে। দরজার লুকিং গ্লাসে কেন যেন চট করে চোখ রাখে। ওপাশেই পরিচিত মুখটা দেখতেই কেমন যেন হকচকিয়ে গেল সে! ঘুরতে গিয়ে নিজের পায়ের সঙ্গেই পা পেঁচিয়ে,,
ধপাস!
আয়াশ সোজা মুখ থুবড়ে নিচে পড়ে। বাইরে থেকে ভারী আওয়াজটা পেতেই চমকে উঠে অন্তিহা। এবার দরজায় হাত দিয়ে একটু জোরেশোরেই আঘাত করে বলে উঠে,
“আয়াশ, কী হলো? আস্তেধীরে আসুন, আমি অপেক্ষা করছি। এত তাড়াহুড়ো করছেন কেন?”
আয়াশ মুখ চেপে ধরে পায়ের গিরায় হাত দিয়ে ব্যথার চোট হজম করার চেষ্টা করে টু শব্দ না করে খোঁড়াতে খোঁড়াতে তাড়াহুড়ো করে নিজের রুমে যায়। দ্রুত লাইটগুলো নিভিয়ে ল্যাপটপ অফ করে। পাশেই পড়ে থাকা কফির কাপটা নিয়ে চলে যায় কিচেনে। চোখে হাত রেখে ভীষণ অস্বস্তি আর ইতস্তত ভাব নিয়ে সিঙ্কের মধ্যে ফেলে দিল পুরোটা কফি যা দেখে নিজেরই গা গুলিয়ে উঠছে এখন! কাপটা একপাশে সরিয়ে রেখে দরজার দিকে এগোতে গিয়েও কী মনে করে যেন আবার ফিরে এলো। রান্না করা খাবারের হাঁড়ির প্রতিটা ঢাকনা একটু এলোমেলো করে দিয়েছে। বোঝাতে হবে, সে আসলেই কতটা অসহায় আর অন্ধের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে!
এবার দরজার সামনে এসে ফোস করে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ে সে। দরজার লকে হাত রাখতেই হঠাৎ মনে পড়ে, চোখে তো তার চশমাটা রয়েই গেছে! হুলস্থুল কাণ্ড করে চশমাটা খুলে দরজার পাশে রাখা শু-র্যাকের ড্রয়ারে পুরে । নিজেকে আপাদমস্তক একবার দেখে নিয়ে এবার দরজাটা খুলে।
কিন্তু সে অন্তিহার দিকে তাকাল না। চোখের কড়্নিয়াগুলো যেন অস্থির, কোথাও স্থির হচ্ছে না, একদম অন্ধ মানুষের মতো দৃষ্টিহীন ভঙ্গি।
অন্তিহা তার চোখের দিকে তাকিয়ে কিছুটা সন্দেহভাজন গলায় জিজ্ঞেস করে,
“এখনো দেখতে পান না? আশ্চর্য!”
আয়াশের গলায় যেন বিন্দুমাত্র জোর নেই। ভীষণ নিচু আর অসহায়ের মতো গলায় বলল,
“হুম, আশ্চর্য! দেখতে না পেলে কী করব বলো? আল্লাহর ইচ্ছা!”
আয়াশের বাহানায় একপাশে গাল বাঁকাল অন্তিহা। আয়াশের পেছন পেছন বাসায় প্রবেশ করে সে। বাসাটা ঠিক যতটা ভেবেছিল, তেমনই নিখুঁত আর গোছানো। আয়াশ দেয়ালে হাত ঘেঁষে হাঁটছে।
অন্তিহা জুতো খুলতে গেলেই আয়াশ নিচু গলায় সতর্ক করে দিল,
“ডানদিকের র্যাকটার দ্বিতীয় সেলফে রাখো জুতো। দেখো পাশে একটা স্যানিটাইজার আছে, জুতো ধরার পর হাতে লাগিয়ে নিও।”
অন্তিহা কথা বাড়ায় না, নির্দেশমতো কাজ সেরে ভেতরের সোফায় গিয়ে বসে, একটু খোঁচা মেরেই বলল,
“ডাক্তার তো বলেছে হালকা ঝাপসা দেখেন আপনি, আর কিছুদিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে। এখনো এমনভাবে হাঁটছেন যেন পুরোপুরি অন্ধ! মার খেয়েও মানুষ কানা হয়, আয়াশ?”
“সন্দেহ করছো নাকি আমাকে?”
“হ্যাঁ করছি। কোনো অন্ধ ব্যক্তির ঘরের পরিবেশ এমন নিখুঁত হতে পারে না। সোফার কুশনটা পর্যন্ত পারফেক্ট, বাহ্! ডাইনিং টেবিলে ঠিক ছয়টা চামচ একই মাপে সাজিয়ে রাখা, চেয়ারগুলোও একদম সমান দূরত্বে যেন খুব যত্ন করে দেখে দেখে এসব সাজানো হয়েছে।”
অন্তিহার তীক্ষ্ণ যুক্তিতে আয়াশ থমকায়। চটজলদি নিজেকে বাঁচাতে সাফাই গায়,
“কারণ... কারণ আমি এসব ব্যবহার করিনি এখনো!”
অন্তিহা সোফায় নড়েচড়ে বসে, আয়াশও সাবধানে তার পাশে এসে বসে। ঘরের ভেতর থমথমে পরিবেশ। জনমানবহীন নীরবতায় যেন মৃদু বাতাসও গুঞ্জন তুলছে।
অন্তিহা দীর্ঘ সময় চুপ থেকে বলল,
“আপনার রিপোর্টগুলো কোথায়?”
আয়াশ বসা থেকে উঠতে গেলে অন্তিহা তাকে হাত বাড়িয়ে থামায়
“আমি আনছি, কোথায় আছে বলুন।”
“সামনে দেখো, টিভির পাশে।”
অন্তিহা সেদিকে তাকাল। দৃশ্যটা দেখে কিছুটা হতবাক না হয়ে পারল না। এতগুলো প্রেসক্রিপশনের ফাইল সাজানো, যেন দুনিয়ার সমস্ত রোগ নিয়ে একমাত্র আয়াশেরই জন্ম হয়েছে!
ফাইলগুলো ঘেঁটে কাঙ্ক্ষিত কাগজটা বের করতে বেশ খানিকটা সময় লাগে অন্তিহার। আয়াশের পাশে এসে বসে রিপোর্টগুলোতে চোখ বুলাল সে, মুখে একরকম 'জ্ঞানী জ্ঞানী' ভাব।
আয়াশ একনজরে অন্তিহার চোখের পলকের দিকে তাকিয়ে আছে। একটু পরপর বিস্ময় আর বিরক্তিতে ঢোক গিলছে তো আবার নাক-মুখ কুঁচকে নিজের অস্বস্তি লুকানোর চেষ্টা করছে।
হঠাৎ অন্তিহা মুখ তুলে চোখ ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, “চোখে দেখেন না কেন? আপনার তো চোখে কোনো সমস্যাই হয়নি আয়াশ!”
কথাটা শুনতেই চট করে চোখ ফিরিয়ে নিল আয়াশ। ভেতরে ভেতরে ভীষণ ভয় পাচ্ছে সে, কপালে জমে উঠেছে সূক্ষ্ম ঘাম। কম্পিত গলায় বিড়বিড় করে বলল,
“জানলে কি এমনভাবে থাকতাম আমি? দেখো না, তুমি ছাড়া কিছুই করতে পারি না বাড়িতে!”
নিজের ঘরটার করুণ দশা বোঝাতেই কথাটা বলল সে। অন্তিহা আবার চোখ বুলাল পুরো বাসায়। কিছু না করতে পেরে যদি বাসার এই পারফেক্ট অবস্থা হয়, তবে কিছু করতে পারলে কী হতো তা তার ভাবনার বাইরে!
অন্তিহা বসা থেকে উঠে ঘরের ভেতরের দিকে যায়। অন্ধকার রুমটার লাইট জ্বালাল না। কিচেনে গিয়ে দেখল পুরো রান্নাঘর চকচকে হলেও সিঙ্কের ভেতর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে কফি। এতে সন্দেহটা আরও গাঢ় হলো। পুরো বাসা পরিষ্কার হলেও এই একটা জায়গায় যেন তাড়াহুড়োর ছাপ। তাও মেয়েটা মুখে কিছু প্রকাশ করল না। এগিয়ে গিয়ে সুন্দর করে সিঙ্কটা ক্লিন করে হাত ধুয়ে নেয়। ভেতর থেকে আয়াশের হাঁক ভেসে আসল,
“অন্তি, ফ্রিজে ফ্রুটস আছে, কেটে আনো। আমিই করতাম, কিন্তু...”
কথাটা আর শেষ করল না সে। হতাশার একটা বড় করে দীর্ঘশ্বাস ড্রয়িংরুম থেকে স্পষ্ট ভেসে আসে অন্তিহার কানে। ফ্রিজ খুলে কিছু আপেল কেটে নিয়ে আয়াশের কাছে যাস। প্লেটটা পাশে রেখে নিজের কুর্তিটা ঠিকঠাক করতে করতে বলল,
“খেয়ে নিন। ভাবছি আমার কারণে যেহেতু আপনার এই অবস্থা, আমি নিজেই আপনাকে হাসপাতালে নিয়ে যাব। একদম সামনে দাঁড়িয়ে নতুন করে টেস্ট করিয়ে রিপোর্ট চেক করব। হাসপাতাল বা ডাক্তারের মধ্যে যদি কোনো টেকনিক্যাল প্রবলেম থাকে, আমি সোজা কেস করব ওদের নামে!”
সবে হাতড়ে একটা আপেলের স্লাইস নিয়ে মুখে দিতে যাচ্ছিল আয়াশ। অন্তিহার হুমকি শুনে সেটাই গলায় আটকে গেল! বিষম খেয়ে কাশতে গিয়ে হাত থেকে আপেলটা নিচে পড়ে যায়।
অন্তিহা আর সে একই সঙ্গে ঝুঁকে সেটা তুলতে চায়। আর তাতেই ঘটে বিপত্তি! অপ্রত্যাশিতভাবে দুজনের কপালে ঠোকা লাগে, কপালে হাত দিয়ে বসে পড়ল অন্তিহা। ব্যথায় কিঞ্চিৎ রাগ আর বিরক্তি নিয়ে বলে উঠল,
“কানার একটা, দেখে না চোখে, তাতেই মাথা ফুটিয়ে ছাড়বে।
অন্তিহা বসা থেকে উঠতে গিয়েই আয়াশের গায়ে ধাক্কা লাগে। ব্যালেন্স হারিয়ে সোজা গিয়ে পড়ে আয়াশের বুকের ওপর!
ডেবডেব করে চেয়ে রইল অন্তিহা এক মুহূর্তে কী হয়ে গেল তার সঙ্গে? আয়াশের হাতটা ধরেছিল বলেই কি সে পড়ে গেল? নাকি হাতে হেচকা টান পড়লো? বুঝতে না পেরে থতমত খেয়ে উঠে সে। কিন্তু কোনো এক অজানা চাপে লতানো কোমরটা আটকে যায় আবার, আবারও ধপাস করে পড়ে আয়াশের বুকের ওপর! এবার আয়াশ নিজেই হালকা ধাক্কা দেয় তাকে, নাক-মুখ কুঁচকে কেমন যেন অস্বস্তি প্রকাশ করছে ছেলেটা। পুরুসালী বক্ষের ধুকপুক শুনতে পাচ্ছে অন্তিহা। তবুও যেন মেয়েটা সরতে পারছে না, মনে হচ্ছে সরিয়ে দিয়েও আয়াশ কেমন এক মায়ায় পেঁচিয়ে রেখেছে তার কোমর।
অদ্ভুত এক অনুভূতি! জীবনের প্রথম কোনো পুরুষের এত কাছে আসা, তাও আবার সেই মানুষটা যাকে সে মনে মনে পছন্দ করে! অন্তিহার বুকের ভেতরটা তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে।
আয়াশ অবশ্য চোখ বন্ধ করেই আছে। অন্তিহাকে স্পর্শ করায় সমস্যা না থাকলেও এই পরিস্থিতিটা তার জন্য বড্ড 'নন-হাইজেনিক'। মেয়েটা সবেমাত্র বাইর থেকে এসেছে, পোশাকটা ধুলোবালি মাখা ভাবতেই গা গুলিয়ে উঠছে তার!
বিরক্তি সামলাতে না পেরে অন্তিহা ধমকে উঠে,
“হাত না সরালে আমি সরব কেমন করে, মদনা একটা?”
আয়াশ দ্রুত হাত সরিয়ে নেয়। মনে হলো নরম কিছু একটা সরে গেলো হাতের নিচ থেকে, তবুও চোখ মেলে তাকাল না। মুখ দেখে মনে হচ্ছে গা গুলিয়ে বমি আসবে তার! অন্তিহা একটু দূরে সরতেই, চট করে পকেট থেকে একটা নরম টিস্যু বের করে নিজের নাকে-মুখে চেপে ধরে আয়াশ। তারপর একদমে, অস্ফুট কিন্তু আকুল স্বরে বলে উঠে,
“Be mine, Onti. I need you.”
নিস্তব্ধ হয়ে গেল অন্তিহার পুরো শরীর। কানে ভুল শুনল না তো? আয়াশ তাকে প্রপোজ করল? অসম্ভব! আয়াশ হাঁসফাঁস করছে, অন্তিহা তার অস্থিরতা দেখে ধরতে গেলে। স্পর্শ করার আগেই চট করে সরে যায় মানুষটা। একটু দূরে গিয়ে বলল, “বাইর থেকে এসেছ, প্লিজ একটু দূরে থাকো!”
কথাটা শুনে অন্তিহার নিজের কানকেই আবার বিশ্বাস হলো হ্যাঁ, আগেরটা নিশ্চয়ই ভুল শুনেছে সে! তা না হলে প্রপোজ করার পরই কোনো পাগল বলে, 'দূরে সরে যাও'? অন্তিহা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আপনি দেখতে পাচ্ছেন?”
আয়াশ কোনো জবাব না দিয়ে তাড়াহুড়ো করে নিজের রুমে ঢুকে। অন্তিহা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে কেবল সেদিকে। কিছুক্ষণ পর আয়াশ চেঞ্জ করে একটা নতুন টিশার্ট পরে ফিরে আসে। নিজের দুহাত ঘষতে ঘষতে হঠাৎ করে এসে অন্তিহার গায়ে কিছু একটা স্প্রে করতে শুরু করে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল অন্তিহা,
“অ্যাই! এটা কী করছেন?”
উপর থেকে নিচে বারকয়েক ডিসইনফেক্ট্যান্ট স্প্রে করে অবশেষে নিজের ভেতরের চরম দ্বন্দ্বে ইতি টানে আয়াশ। একটা সুদীর্ঘ, শান্ত শ্বাস ফেলল সে।
অন্তিহা নাকের কাছ থেকে হাত নেড়ে অস্বস্তি তাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিছু বলার আগেই, হঠাৎ নিজেকে আবিষ্কার করে আয়াশের সুগঠিত বাহুবন্ধনে! এবার আর কোনো অস্পষ্টতা নেই। একদম স্পষ্ট, গভীর আর প্রগাঢ় স্বরে আয়াশ বলে উঠে,
“অন্তি, আই নিড ইউ। প্লিজ, আমার হয়ে যাও। আমি জানি এটা খুব অদ্ভুত... কারণ আমি তোমার কাজিনের এক্স-ফ্যায়ান্সে! কিন্তু আমি জানি না ঠিক কবে থেকে আমি এত জেলাস অনুভব করা শুরু করেছি! সাফওয়ানকে তোমার পাশে দেখলে আমার মাথা ঠিক থাকে না, বুকটা অস্থির হয়ে ওঠে। শুরু থেকেই ও আসার পর তুমি আমার প্রতি মনোযোগ কমিয়ে দিয়েছ!”
আয়াশ অন্তিহার চোখের দিকে তাকায়। দৃষ্টিতে আর কোনো অন্ধত্বের অভিনয় নেই, আছে কেবল তিব্র চাওয়া এক বুক অধিকার,,
“একজন প্রেমিকা হিসেবে তুমি ভাবতে পারো আমার অপশন তুমি। কিন্তু আমি তোমাকে'প্রেমিকা' বানাতে চাই না, অন্তি। আমার বউ হয়ে যাও... সেটা কোনো অপশনাল চয়েজ নয়। তুমিই প্রথম হবে আর তুমিই শেষ।”
আয়াশের শক্ত বাহুবন্ধন থেকে শরীরের সমস্ত ভর ছেড়ে দিয়ে সাবধানে, পিচ্ছিল মাছের মতো নিজেকে ছাড়িয়ে নিল অন্তিহা। কিন্তু আয়াশ তার হাত ছাড়ল না মৃদু আঁকড়ে ধরে রেখেছে। অন্তিহার মনে তুমুল দ্বন্দ্ব আজ কি এখানে এসে বড় কোনো ভুল করে ফেলল সে? মন ভেতরের অস্থিরতা ঢাকতে নিজের কণ্ঠ যতটা সম্ভব শক্ত করে অন্তিহা বলল,
“যে মানুষটাকে ছোঁয়ার আগে গায়ে ডিসইনফেক্ট্যান্ট স্প্রে করতে হয়, তাকে বিয়ে করার কথা ভাবছেন কোন সাহসে?”
আয়াশ অমায়িক ভঙ্গিতে, কোনো রকম অপরাধবোধ ছাড়াই জবাব দিল,
“ওটা তো তোমার ধুলোবালি মাখা ড্রেসের ওপর করেছি! কারন তুমি বাহির থেকে এসেছো। তোমার নিজের শরীর নিয়ে আমার কোনো প্রবলেম নেই, আই ট্রাস্ট ইউ। এই তো, একটু আগেই তোমার হাতে কাটা ফ্রুটস খেলাম না?”
অন্তিহা চরম হতবাক হয়ে নাক-মুখ কুঁচকে বলে,
“মানে আমাকে নিয়ে সমস্যা নেই, কিন্তু আমার ড্রেস নিয়ে...”
কথাটা নিজের মুখেই আটকে গিয়েছে অন্তিহার। কিন্তু আয়াশ তাকে থামার বা ভাবার বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়ে। একদম সিরিয়াস মুখে, অতি স্বাভাবিক গলায় বলে ফেলে,
“হুম, ট্রাই করে দেখতে পারো! আনড্রেসড হলে আমার বিন্দুমাত্র সমস্যা হবে না, বরং ওটাই আমার জন্য বেশি কমফোর্টেবল হবে!”
কথাটা কানে যাওয়া মাত্রই অন্তিহার পুরো গাল-কান কানায় কানায় লাল হয়ে উঠে। পুরুষ মানুষের সামনে এসব শুনছে দাড়িয়ে দাড়িয়ে ছিহ! লোকটা বলে কী! কী বলবে বুঝতে পারছে না সে নির্লজ্জ, নাকি অসভ্য বেয়াদব? তার বাকরুদ্ধ অবস্থা দেখে আয়াশ কোনো ভাবান্তর ছাড়া আরেকটু কাছে ঘেঁষে এসে উৎসাহিত গলায় বলতে গেল,
“ট্রাই করেই দেখো, খোলো, দেখাই...”
ঠাস...!
আয়াশের গালের ওপর আছড়ে পড়ে অন্তিহার ডান হাত। তারপর ভেসে আসে অন্তিহার ঝাঁজালো ধমক,
“বেয়াদব!”
আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না সে। টেবিলের ওপর থেকে নিজের ফোনটা তুলে নিয়ে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল ফ্ল্যাট ছেড়ে। যাওয়ার সময় দরজার পাশের টেবিলে রাখা ছোট কাঁচের শিশিটাও তার গায়ে লেগে নিচে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল তবুও পেছনে ফিরে তাকাল না মেয়েটা।
আয়াশ কেবল গালে হাত দিয়ে বিস্ময়ে ডেবডেব করে তাকিয়ে আছে বন্ধ দরজার দিকে। লাল হয়ে যাওয়া গালে হাত বোলাতে বোলাতে হতবুদ্ধির মতো নিজেকেই যেন বলল,
“সত্যি বললে আজকাল মেয়েরা এভাবে থাপ্পড় মারে? তারচেয়ে তো মিথ্যাতেই ভালো ছিলাম!”
চলবে...