ফন্ট সাইজ:
থিম:
বখাটে আদিত্য

১০ম পর্ব

লেখক: প্রিয়ন্তিকা প্রীয়ন্তি

#বখাটে_আদিত্য

#প্রিয়ন্তীকা_প্রিয়ন্তী

পর্ব:১০

তুর্য খান উঠে দাঁড়িয়ে তাদের কাছে চলে যায় এবং জিজ্ঞাসা করে

– কি রে তোদের এই অবস্থা হলো কেমনে তোদের লুঙ্গি কই?আর তোদের সবার মুখের অবস্থা বাংলাদেশ বর্ডার ভারতের মতো ফুলে ফুলে আছে কেন?? পুরো তো মানচিত্র করে ফেলেছিস তোরা নিজেদের।

তিথি, স্নেহা, ছোট্ট আবরার জোরে জোরে হাসতে থাকে।

বাড়ির প্রত্যোকটা লোক মিটি মিটি করে হেসে চলেছে হাসবে নাই কেন। তাদের তিনজন মুখের অবস্থা পুরো লাল, বড়ো বড়ো করে ফুলে রয়েছে । আর সবচেয়ে বড়ো কথা পরনে শুধু গেঞ্জি আর আন্ডারওয়ার ছাড়া আর কিছুই নেই।

কুদ্দুস কে দেখে সবাই বেশি হাসছে কেননা তার মাথায় বড়ো বড়ো ডিমের মতো করে ফুলে রয়েছে। কুদ্দুস, রেদোয়ান আর বুলবুল চাচা পারছে না লজ্জায় মাটি ফাঁক করে সেখানে চলে যেতে।

কুদ্দুস এর খুব কান্না পাচ্ছে খুব তার পাশা পাল্টা কেন তার দিকেই ঘুরে ঘুরে আসে।

ওই যে কথায় আছে না অন্যের জন্য গর্ত খুঁড়লে নিজেই সেই গর্তে পড়ে যাই কুদ্দুস এর এখন সেটা মনে হচ্ছে। কুদ্দুস ফ্লোরে বসে পড়ে ব্যাথায় আর না পেড়ে হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে

–ওই আমার সাথে এমন কেনো হয় মাগো

শালার ভেউর গুলো কামড়িয়ে শেষ করে দিলো মাগো .....

আমার সারা দেহে ব্যাথায় টন টন করে মাগো ......

ভোলতা গুলো কী আমার টাক মাথা শুধু পাইলো মাগো....

ওমা গো কি যন্ত্রনা আমার টাক মাথায় মাগো......

–

সবাই হা হয়ে তাকিয়ে আছে এই কে রে কো থেকে আসে এইসব।পেট ফেটে কেউ হাঁসি থামাতে পারছে না কুদ্দুস এর অবস্থা দেখে। তখন ইকবাল খান সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে বলে

–তোরা কী চুরি করতে গিয়েছিলি যে তোদের হাল, এই দশা করলি ?

তিনি রেদোয়ান এর সামনে দাঁড়িয়ে তাকে একপলক দেখে বলতে থাকে

– রেদোয়ান তুমি না উচ্চশিক্ষিত মানুষ এদের না হয় একটু বুদ্ধি শুদ্ধি কম তাই বলে তুমি ও। আমার ছেলেটা তো হয়েছে একটা বাদ্দাইমা , অকর্মণ্য। এখন কী তুমি ও ওর খাতায় নাম লেখাতে চাচ্ছো।

উফফ আব্বু তোমার কী যেখানে সেখানে আমার নাম না টানলে লুঙ্গির গীট টাইট থাকে না, মানে আমার নামে ন্যানো সেকেন্ড বদনাম করতে হবেই।

ইকবাল খান ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মতো চিল্লিয়ে বলে

– বিয়াদপ ছেলে বাপের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় শেখো নি দেখছি । তারপর পায়ের জুতা খুলে আদিত্যর দিকে ছুড়ে মেরে বলে

– হয়েছো তো একটা বাদ্দাইমা,বাউন্ডুলে, বখাটে। জীবনে তো আর কিছু করতে পারলা না। আমি মরে গেলেও দেখবো আমাকে তোমার অভিযোগ শুনার জন্য মানুষ কবর থেকে তুলে নিয়ে আসবে। দূর হও চোখের সামনে থেকে।

আদিত্য সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে বলে

– সব দোষ আমার, আমি বলেছিলাম আমাকে পৃথিবীতে আনতে, নিজেই নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারো নি আর দোষ দিচ্ছো আমার। যদি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারতেন তাইলে আজ আমি এখানে আসতাম না তাই না ইকবাল খানকে চোখ মেরে দিয়ে বলে।

ইকবাল খান তেড়ে উঠে জুতা নিয়ে গর্জে চিৎকার করে বলে

– ওরে বাদ্দাইমা রে.....

আদিত্য কে আর পাই কে সে ভৌ দৌড় দিয়ে নিজের রুমে চলে গেলো।

ইকবাল খান কিছুটা শান্ত হয়ে রেদোয়ান এর উদ্দেশ্য বলে

– ছোট ভাইয়ের মতো হয়ো না পারলে ওকে একটু বুঝ দাও জীবন এইভাবে চলে না। আমি মরে গেলেও শান্তি পাবো না যতক্ষণ পর্যন্ত আদিত্যকে আমি মানুষের মতো মানুষ করতে পারছি ।

রেদোয়ান মনে মনে মুচকি হেসে ভেবে বলে

– আমার ভাই আদিত্য মানুষের মতো মানুষ তৈরি হয়েছে মেঝো কাকু । তুমি ভাবতেও পারবে না ও কে ?? রেদোয়ান হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে আবার মনে মনে ভাবে – ইশশ্ তুমি যদি জানতা তাহলে এতো অভিযোগ থাকতো না।

ইকবাল খান ভ্র কুঁচকে জিজ্ঞাসা করে

– মনে মনে বিরবির করে কী ভাবো তুমি?

রেদোয়ান মুখে হালকা হেসে জবাব দেয়

– কিছু না মেঝো কাকু।

– হুম রুমে গিয়ে ওষুধ লাগিয়ে নে এবং ওষুধ খেয়ে নিস তাড়াতাড়ি ব্যাথা চলে যাবে।

এইবার তিনি কুদ্দুস আর বুলবুল চাচার দিকে তাকিয়ে বলে

– জনাব উঠুন কোন ধানক্ষেতে চুরি করতে গিয়েছিলি কে জানে। হাদারাম কোথাকার উঠ তাড়াতাড়ি ওষুধ খেয়ে এবং একটু মলম লাগিয়ে নে। কুদ্দুস এর টাক মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে

– ইসস দেখ কেমন ভাবে কামড়িয়েছে একদম ফুলের গেছে। যা তাড়াতাড়ি তোদের এইভাবে জোকার এর মতো লাগছে তাড়াতাড়ি যা।

কুদ্দুস ফুফাতে ফুফাতো চলে যাই তার রুমের দিকে।

ইকবাল খানের ভিতর থেকে একটা তপ্ত নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে তিনি পরিবারের বাকি সবার দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে

– কী তোমরা এখানে দাঁড়িয়ে কাটিয়ে দিবে নাকি হা করে , এখানে কী টকশো হচ্ছে। যাও ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজাও খিদে পেয়েছে খেতে দাও তাড়াতাড়ি।

সবাই স্বাভাবিক হয়ে যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো ।

–––

রাত তখন ১১ টার কাছাকাছি হঠাৎ করে আদিত্য খেয়াল করে তার রুমে বেলকনিতে কিছু নড়ছে বা এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছে। সে বিষয়টাকে এতো পাত্তা না দিয়ে ল্যাপটপ এ কাজ করে চলেছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করে কিছু শব্দ শুনা যায় আদিত্য হুঁশিয়ারি সাথে কান দিয়ে ভালো করে শুনতে থাকে এটা কিসের শব্দ হচ্ছে বা কোথা থেকে এই শব্দের উৎস। দেখতে দেখতে শব্দটা হঠাৎ থেমে যায় ।

আদিত্য নিজের ভ্রম মনে করে আবার কাজে মনোযোগী হয় কিন্তু তার ব্ল্যাঙ্কেট এর ভিতর থেকে আবার কিছু নড়াচড়া ও উদ্ভব শব্দ শুনা যায় কিছুটা- মিয়াও মিয়াও এমন। তাড়াতাড়ি ল্যাপটপ টা কোল থেকে নামিয়ে ব্ল্যাঙ্কেটটি সরিয়ে যা দেখে তার রাগ সপ্তম আকাশ সমান ছুঁই ছুঁই।

আদিত্য রুম থেকে কাশতে কাশতে বের হয়ে জোরে জোরে তার মাকে ডাকতে থাকে এবং নিচে চলে যায় । সুফিয়া খান ছেলের এমন ডাক শুনে তাড়াতাড়ি করে রুম থেকে বের হয়ে জিজ্ঞাসা করে

– কী হয়েছে বাবা এমন করছিস কেন ??

আদিত্য রাগে গজগজ করতে বলে

– আমার রুমে বিড়াল এলো কো থেকে তোমরা জানো না আমার বিড়ালের এলার্জি আছে তাহলে কোন সাহসে আমার রুমে বিড়াল ঢুকে।

ওকে বিড়াল বলবেন না ওর নাম লুসি। ওকে লুসি বলে ডাকবেন বুঝেছেন। তিথির লুসি রুম থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলো বেচারি তিথি এতক্ষণ ধরে লুসিকে খোঁজে চলেছে শেষমেশ আদিত্যর রুমেই ওকে পেলো।

আদিত্য দাঁতে দাঁত চেপে বলে

– তুই এই উজবোক প্রাণীটাকে কোথায় থেকে নিয়েছিস!

তিথি সঙ্গে সঙ্গে বলে দেয়

– লুসিকে আমি আর স্নেহা কলেজ থেকে ফেরার পথে পেয়েছি । ওর খুব জ্বর ছিলো তাই আমার সাথে নিয়ে এসেছি। আজ থেকে ও আমার সাথে থাকবে , ও আমার বাচ্চা লুসি ।

আদিত্য কপালে হাত দিয়ে ঘষতে ঘষতে নিজের রাগ কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছে

– আমাদের বাড়ি কী তোর চিড়িয়াখানা মনে হয় যে যখন যেখান থেকে প্রানী তুলে নিয়ে আসবি। কালকে এটাকে যেখানে থেকে পেয়েছিস সেখানে রেখে আসবি তিথি।

তিথি লুসিকে বুকে আগলে নিয়ে আদিত্যর কথা নাকোচ করে দিয়ে বলে

–কখনো না আমি আমার বাচ্চা লুসি কে রেখে আসতে পারবো না। ও আমার সাথে থাকবে।

সুফিয়া খান ছেলের দিকে চেয়ে বলে

– কি হচ্ছে টা কী আদিত্য থাকুক না কি সমস্যা এতে তুই দূরে দূরে থাকলেই হলো।

মুগ্ধ আজকে এসেছে মামার বাড়ি ও সদর দরজা দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে বলল

– কী হয়েছে এতো রাতে? তিথির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে

– কীরে এই কিউট বিড়ালটিকে কোথায় পেলি তুই??

তিথি মুগ্ধ কথা শুনে বলতে থাকে

– ওর নাম লুসি। দেখো না ভাইয়া আদিত্য ভাই বলছে লুসিকে রেখে আসতে।

মুগ্ধ আদিত্যর দিকে এসে বলে

– সমস্যাটা কোথায় তোর ! থাকুক না তুই দূরে দূরে থাকলে হলো।

আদিত্য রাগে হিণাহিত জ্ঞান হারিয়ে জোরে জোরে কুদ্দুসকে ঢাকতে থাকে।

কুদ্দুস দৌড়ে এসে জিজ্ঞাসা করে কেন ডাকছে তাকে।

আদিত্য তিথির কোলে থাকা লুসির দিকে আঙ্গুল তাক করে বলতে থাকে

– ওকে নিয়ে কোন এক জায়গায় ছেড়ে দিয়ে আয় তাড়াতাড়ি।

কুদ্দুস কি বলবে ভেবে পায় না ও আমতা আমতা করে কিছু বলতে যাবে আদিত্য তাকে থামিয়ে দেয় ।

তিথি বুকের কাছে শক্ত করে চেপে ধরে লুসিকে সে কিছুতেই দেবে না লুসি কে।

মুগ্ধ আদিত্যকে বুঝাতে থাকে

– আদিত্য তুই কিন্তু এইবার বেশি বেশি করছিস সমস্যাটা কি তোর লুসি কে নিয়ে। কেনো মেয়েটাকে কাঁদাতে চাচ্ছিস??

আদিত্য মুগ্ধের কথার জবাব না দিয়ে আবার কুদ্দুস কে বলল লুসি কে কোথাও নিয়ে গিয়ে ছেড়ে আসতে।

কুদ্দুস ভয়ে ভয়ে তিথির কাছে গিয়ে লুসি কে নিতে গেলে তিথি কুদ্দুস এর মাথায় টেবিলে চামচ দিয়ে কুদ্দুস এর টাক মাথায় বারি দেয়

– কুদ্দুস একদম আসবি না আমার লুসি কে আমার থেকে কেড়ে নিতে।

স্নেহা ভাইকে বোঝাতে থাকে – ভাইয়া এমন করছিস কেনো ?? থাক না লুসি এইভাবে রিয়েক্ট করার কিছু নেই এখানে ভাইয়া।

কুদ্দুস তার মাথায় হাত বুলিয়ে আদিত্যর উদ্দেশ্য বলতে থাকে

– তিথি আপু তো দিচ্ছে না কি করবো।

আদিত্য তিথির কাছে গিয়ে কোন রকম বার্তা ছাড়া ঠাস করে লাগিয়ে দেয় থাপ্পড় তিথির নরম তুলতুলে গালে।

– দিয়ে দে এই বিড়ালটিকে না হলে আরেক গালে আরেকটি পড়বে। দিয়ে দে তিথি নয়লে আমার থেকে খারাপ কেউ আর হবে না।

তিথি কান্না করতে করতে লুসি কে দিয়ে দেয় কুদ্দুস এর কোলে। কুদ্দুস লুসি কে নিয়ে যেতে গেলেই বাধা দেয় মুগ্ধ, সুফিয়া খান ও স্নেহা।

আদিত্য এইবার প্রচন্ড রেগে গিয়ে টেবিলে থাকা সমস্ত কাঁচের প্লেট ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলে

– তোমাদের এতো দরদ কিসের সামান্য একটা বিড়াল এর জন্য। কুদ্দুস কে যেতে দাও তোমরা।

আদিত্যর রাগান্বিত মুখ দেখে আর কারোর সাহস হয় নি আটকানোর। কুদ্দুস চলে যাই লুসি কে নিয়ে। তিথি জোরে জোরে কান্না করতে করতে আদিত্যর দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে

– আদিত্য ভাই আপনি খুব খুব বেশি খারাপ। একটা নিষ্পাপ পশু কে এতো রাতে ছেড়ে আসতে আপনার কী কলিজা লাগলো না। কেমন মানুষ আপনি।

আপনাকে আমি অনেক ঘৃণা করে এখন থেকে অনেক বেশি ঘৃণা করবো আপনাকে আদিত্য ভাই বলে কান্না করতে করতে উপরে চলে যায়। আদিত্য হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলে তিথির কথায়।

সুফিয়া খান,, স্নেহা একবার আদিত্যর দিকে তাকিয়ে উপরে রুমে চলে যাই।

মুগ্ধ আদিত্যর কাছে এসে বলতে থাকে

– তুই এটা ঠিক করিস নি আদিত্য একদম ঠিক করিস নি। তিথি অনেক কষ্ট পেয়েছে।

আদিত্য নিজের হাতের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে।

মুগ্ধ বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যাই তখন লুসি কে রেখে কুদ্দুস বাড়িতে ফিরছিলো মুগ্ধ তাকে জিজ্ঞাসা করে লুসি কে কোথায় নিয়ে গেছে সে । কুদ্দুস তাকে সেই জায়গার নাম বলে দেয় । মুগ্ধ জায়গাটিতে অনেক খুঁজাখুজি করে তবুও লুসি কে কোথাও পেলো না।

মুগ্ধ অবশেষে হাল ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে ফিরে আসে। তার ফারুক কান্না করছে এটা কিছুতেই মুগ্ধ মেনে নিতে পারছে না। তার রাগ হচ্ছে খুব রাগ হচ্ছে আদিত্যর উপর। সে দেওয়ালে জোরে জোরে ঘুসি মেরে নিজের রাগ কমাচ্ছে।

–

সুফিয়া খান আর স্নেহা তিথি রুমের বন্ধ দরজায় বারবার ধাক্কাতে থাকে কিন্তু তিথি দরজা খুলে না।

সুফিয়া খান আদুরে গলায় বলতে থাকে

– তিথি মা দরজা খোল আমি তোর মেজো কাকু কে বলে আরেকটা নিয়ে আসতে বলবো। আদিত্য ব্যাপারেও অভিযোগ জানাবো দরজাটা খোল মা। কিছু তো খাস নি চল খেতে।

ভিতর থেকে শুনা গেলো তিথির কান্নাভরা আওয়াজ – আমি খাবো না মেজো মা তোমরা চলে যাও আমাকে কিছুক্ষণ একা থাকতে দাও। স্নেহা তুই কিছুক্ষণ পর ঘুমাতে আসিস এখন আমাকে একা ছেড়ে দে।

তিথি বালিশে মুখ গুজে কান্না করতে করতে বলতে থাকে

– আপনি খুব খারাপ আদিত্য ভাই খুব খারাপ আমি আপনাকে ঘৃণা করি । আপনার সাথে আমি আর কথা বলবো না কখনো বলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে।

অনেকক্ষন কান্না করার পর সে উঠে গিয়ে দরজাটা খিল খুলে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়তে থাকে। গালটা ব্যাথায় টনটন করছে।

–––

সুফিয়া খান ছেলের রুমে এসে তাকে বোঝাতে থাকে

– তুই এটা কী করলি তুই জানোস না মেয়েটা কতো দয়াবান। ছোট প্রাণীদের প্রতি তার কী দয়া দেখিস না তুই। কেন এমন করলি বাবা। মেয়েটি সন্ধ্যা থেকে কিছু খায় নি খালিপেটে ও কী শুয়ে থাকবে বল। ওকে এইভাবে যখন তখন থাপ্পড় মারিস কেন দেখ তো ওর গালে পুরো তোর আঙ্গুলের ছাপ বসে গেছে।

সুফিয়া খান উঠে দাঁড়িয়ে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল

– যদি পারিস বিড়ালটিকে তিথির কাছে ফিরিয়ে দিস এমন অমানবিক কাজ করিস না।

আদিত্য কিছু বলে না থম মেরে বসে আছে সুফিয়া খান চলে যায় আদিত্যর রুম থেকে।

আদিত্য কিছুক্ষণ ভাবতে থাকে হঠাৎ করে সেই তার বন্ধুদের কল দিয়ে তার বাড়ির সামনে আসতে বলে।

—

রাত তখন ১২:৩০ টা আকাশ পুরো কালো মেঘে ঢেকে পড়েছে। আকাশে তারা গুলো মিটিমিটি জ্বলছে। চারিদিকে জোনাকিরা খেলে বেড়াচ্ছে। তাদের উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হয়েছে চারপাশ। আদিত্য, ইরফান, অর্জুন, রুদ্র ও রাতুল খোঁজ চলেছে লুসি কে।

স্নেহা থেকে একটা ছবি নিয়েছে আদিত্য। তো সেই ছবি দেখে ভালো করে সবাই খোঁজে চলছে লুসি কে। লুসির পড়নে ছিলো লাল ছোট্ট একটা গেঞ্জি। তো সহজেই তারা লুসি কে হয়তো খুঁজে নিতে পারবে। কুদ্দুস কথা মতো সেই জায়গাতেই এসেছিলো তারা কিন্তু ফলাফল শূন্য। লুসি কে খোঁজে পায় নি।

আদিত্য জোরে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে কাউকে কল দিতে থাকে

– চট্টগ্রাম এর যত ছাএদল, যুবলীগ,যত সব লীগ আছে আর তার মধ্যে জড়িত সব ছেলেদের তাড়াতাড়ি আমাদের কাছে পাঠিয়ে দাও কুইক। এক মিনিট ও যেন দেরি না হয়।

আরো কিছু ট্রেনিং প্রাপ্ত কুকুর ও নিয়ে আসবে তাড়াতাড়ি।

ইরফান আদিত্যকে জিজ্ঞাসা করে

– তুই ঠিক কী করতে চাচ্ছিস এদের এখানে আনছিস কেন?? এতোই যখন চিন্তা ছিলো তখন কেন এতো রিয়েক্ট করলি ।

আদিত্য বিরক্ত হয়ে ইরফান কে বলতে থাকে

– তুই জানিস না কেন আমি এটা করেছি। কিন্তু হয়তো আমার ভুল হয়েছে আমি ওকে বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছি।

আধাঘণ্টা মধ্য যতসব লীগের ছেলে ছিলো সবাই চলে আসলো। কেননা তারা প্রত্যোক এ বখাটে আদিত্যর ভক্ত।

তারা সবাই কাজে লেগে পড়লো চারদিকে থেকে সবাই লুসি কে খুঁজতে থাকে লাগলো কিন্তু কোথাও খুঁজে পেলো না। আদিত্য হাল ছাড়ে নি সে লুসি কে খোঁজে বের করবেই করবে কোথায় বা যাবে এই প্রানী।

আদিত্য আরো লোকজন নিয়ে এসে লুসি কে খোজতে লাগলো । কুকুর গুলো মাটি শুঁকে শুঁকে লুসির খোঁজ চালাচ্ছে।

সব জঙ্গলে তন্ন তন্ন খুঁজে চলেছে লুসি কে। কালো অন্ধকারে টর্চের আলোয় চারিদিকে আলোকিত হয়ে গেলো। শতশত মানুষ খুঁজে চলেছে লুসি কে। সব জায়গায় তন্ন করে খুঁজছে। প্রায় ২ ঘন্টা খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে অনেকটা দূর

আদিত্যর বাড়ি থেকে প্রায় অনেক দূরে একটা জঙ্গলের মধ্যে লুসি কে পেলো আদিত্যর লোকেরা। মিয়াও মিয়াও করতে করতে লুসি চারপাশে লোকদের দেখছে। এতো লোক দেখে হয়তো সে ভয়ে পেটে গুটিগুটি মেরে আছে। সবার মুখে এতক্ষণ এ হাসি ফুটলো টানা অনেকক্ষন

খোঁজাখুঁজির জন্য সবাই অনেক ক্লান্ত তাই সবাই যার যার বাসায় ফিরতে লাগে। আদিত্যর এলার্জি থাকায় এখন সে লুসি কে কোলে তুলে নেয় নি । লুসি কে অর্জুন কোলে নিয়েছে। আদিত্য যেতে যেতে শুধু বারবার লুসি কে পরখ করছে।

আদিত্য ও আদিত্যর বন্ধুরা খান বাড়িতে পৌঁছে যায়।

আদিত্য হাতে গ্লাভস পড়ে অর্জুন এর কাছ থেকে লুসি কে নিয়ে নেয় তখন রাত অনেক গভীর হয়তো ৩ টা বেজেছে। আদিত্যর বন্ধুরা যে যার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। লুসি আদিত্য কোলে কতক্ষন মিয়াউ মিয়াও করে আরাম করে ঘুমিয়ে পড়ে।

সদর গেট পেরিয়ে আদিত্য এক্সট্রা চাবি দিয়ে দরজা খুলে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো। সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে তিথির রুমে সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দরজাটা খোলা কেননা স্নেহা দরজাটি বন্ধ করেনি সে জানতো তার ভাই লুসি কে নিয়ে আসবে যেখান থেকে হোক নিয়ে আসবে।

আস্তে করে দরজা খুলে আদিত্য রুমে ঢুকে পড়ে। বিছানায় একপাশে গুটিগুটি মেরে শুয়ে আছে তিথি।

জানালা থেকে আসা চাঁদের আলোয় তিথি মুখটা অসম্ভব স্নিগ্ধ লাগছে। লুসি কে তিথির কাছে রেখে সেখানে ফ্লোরে বসে পড়লো আদিত্য।

জানালা থেকে আসা চাঁদের আলোর সেই চাঁদের দিকে তাকিয়ে আদিত্য বিরবির করে বলতে থাকে

– কতো সহজেই না তুই বলে দিলি আমায় ঘৃণা করিস তাই না। তোর বখাটে আদিত্য ভাইকে তুই ঘৃণা করিস। একবার ও বুঝলি না আমায় অবশ্য এখানে আমার দোষ তোকে কখনো আমি বুঝতে দেয় না।

কেন করেছি সেটা যদি আমি তোকে বলতে পারতাম আমার বিয়াদপ বেডি তাহলে তুই ঠিক বুঝতি কেন আমি এমন করেছি। কিন্তু আফসোস রে আমি তোকে কিছুই বলতে পারবো না কারণ আমি লোহার শিকলে আবদ্ধ।

জানিস আজকে আমি খুব কষ্ট পেয়েছি তোর কথায় জানি না কেন খুব খারাপ লাগছে। এই বখাটে আদিত্য কে হয়তো কেউ ভালোবাসে না হয়তো তুই ও না। এই বখাটে আদিত্যকে শুধু সবাই পারে ঘৃণা করতে শুরু ঘৃণা করতে।

রেড চেরি তুই এই ঘৃণা তোর মধ্যে রাখিস একটুও আমার প্রতি ঘৃণা কমাবি না। পৃথিবীর সবটুকু ঘৃণা এই আদিত্যর জন্য রাখবি। তোর ঘৃণা শুধুমাত্র এই আদিত্যর জন্য বরাদ্দ থাকবে।

আদিত্য ফ্লোর থেকে উঠে তিথির পাশে বসে পড়লো কিছুটা ঝুঁকে তার লাল গালে যেখানে তাকে থাপ্পড় মেরেছিলো সেখানে হালকা অধরের স্পর্শ দেয়। একটা, দুইটা, তিনটা,পরপর অনেক গুলো ঠোঁটের পরশ দিতে থাকে তিথির লাল হয়ে যাওয়া গালে ।

কান্না করতে করতে চোখ মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে মেয়েটা। আদিত্য ফির ঝুঁকে তিথির চোঁখের ভেজা পাতায় অধরের পরশ দেয় দুই চোখে।

– কী করে বোঝায় বল এই মনের ব্যাথা । যদি তোকে বুকটা ছিঁড়ে দেখাতে পারতাম তাহলে মনে শান্তি লাগতো। আমি তোকে মেরেছি সেই আমি তোকে আদর দিয়ে ব্যাথা সারিয়ে দেবো । তুই যে আমার হাজারো অপেক্ষার রজনী।

ভোর হতে চললো তাই আদিত্য বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ব্লাকেট দিয়ে তিথিকে ডেকে দেয় এবং তার বুকের মাঝে লুসি কে রেখে দেয়। পলকবিহীন তাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকে আদিত্য। মাথার পেছনে চুলকিয়ে একটু একটু মুচকি মুচকি হাসে।

আদিত্য চলে যেতেই পিছু ফিরে স্নেহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতে থাকে

– আমার দুষ্টু বুড়ি তোদের কিছু হলে যে আমি শেষ হয়ে যাবো। তারপর বোনের কপালে ছোট্ট চুমু দিয়ে তার গায়েও ব্ল্যাঙ্কেট দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে।

প্রায় ভোর হয়ে গেলো চারিদিকে আস্তে আস্তে আলো ফুটতে শুরু করেছে। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আদিত্য একের পর এক সিগারেট টেনে যাচ্ছে আর আকাশ ধোঁয়া গুলো উড়িয়ে দিচ্ছে। ধোঁয়ার সাথে সাথে উড়ে যাচ্ছে তার অজানা কথা,

অজানা গভীর ক্ষত ও অজানা কষ্ট।

আদিত্য জোরে শ্বাস নিয়ে চোখ বন্ধ করে সুর নিয়ে গাইতে লাগলো

———

চাই না মেয়ে তুমি অন্য কারো হও

পাবে না কেউ তোমাকে, তুমি কারো নও

তুমি তো আমার-ই, জানো না হো-ও-ওও

এ হৃদয় তোমার-ই

ও-হো-ওও

তোমাকে ছাড়া আমি, বুঝি না কোনো কিছু যে আর

পৃথিবী জেনে যাক, তুমি শুধু আমার

তোমাকে ছাড়া আমি, বুঝি না কোনো কিছু যে আর

পৃথিবী জেনে যাক, তুমি শুধু আমার

হৃদয়ের নীল আকাশে স্বপ্ন আমার ওড়ে

ভেঙ্গে যায় আমার-ই মন অভিমানী ঝড়ে

হৃদয়ের নীল আকাশে স্বপ্ন আমার ওড়ে

ভেঙ্গে যায় আমার-ই মন অভিমানী ঝড়ে

তুমি তো আমার-ই, জানো না হো-ও-ওও

এ হৃদয় তোমার-ই, ও-হো-ওও

তোমাকে ছাড়া আমি, , বুঝি না কোনো কিছু যে আর

পৃথিবী জেনে যাক, তুমি শুধু আমার

———

এই গানের মাঝেই হয়তো লুকিয়ে আছে আদিত্য না বলা অনেক কথা– যা হয়তো ও মুখে প্রকাশ করতে ব্যর্থ। তার এই গানের স্বাক্ষী হয়ে রয়ে যাই নতুন একটা ভোর,

আকাশ উড়ে বেড়ানো হাজারো পাখি। সূর্য মামা গানের মাঝে আর আলোর কিরন আরো চারদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে ধরনীতে।

চলবে ~

( আপনারা কী বলতে পারবেন কেন আদিত্য বিড়ালকে রাখতে চাই নি । আদিত্য ভালোবাসার প্রখরতা হয়তো এখনো কেউ বুঝে উঠতে পারে নি। প্লিজ আপনারা বেশি বেশি রেসপন্স করিয়েন 😁 )

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন