#ছায়াবৃত_রোদ্দুর
#আয়রা_ইবনাত
৯.
আজ নতুন বাসায় উঠেছে ইলহাম। বেশি দূর যেতে হয়নি একই গলির আরও দুটি বাসা পেরিয়ে এই বিল্ডিং। চারতলা ভবনের দুতলায় উঠেছে তারা। নতুন বাসায় উঠলে বাসা গুছানো ছেলেদের জন্য কষ্টসাধ্য, তাই সব সময় ফার্নিশড বাসা বুক করে তারা। আগের তুলনায় এই বাসার সবকিছু অনেক ভালো এবং পরিপাটি। ছয়টি রুম সাথে এটাচ বাথরুম ও একটি কিচেন সব মিলিয়ে একটি বড় বাসা নিয়েছে। বলা যায় একটি বড় ফ্যামিলি নিঃসন্দেহে এখানে থাকতে পারবে। নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে সন্ধ্যার পূর্ব মুহুর্তে নতুন বাসায় উঠেছে সবাই। যেহেতু সবকিছু সাজানো গোছানো রয়েছে তাই আর নতুন করে ঝামেলা পোহাতে হয়নি।ওই ছোট ব্যাচেলর বাসায় থাকতে বউয়ের কষ্ট হবে সেটা ভেবেই নতুন বাসা নিয়েছে তাছাড়া দুইদিন আগে বা পরে হোক নতুন বাসা তো নিতেই হতো। কিন্তু এখন চিন্তার বিষয় হচ্ছে বউ যে আলাদা ঘরে থাকবে তার সমাধান কি করে করবে?
সন্ধ্যার পর লিভিং রুমে বসে আছে আয়ুশ আর ইলহাম। ইরা আর মিরা নেই সেখানে, ইরা কিছুক্ষণ পূর্বেই বের হয়েছে। দুইদিনের ঝামেলায় পার্টি অফিসে যাওয়া হয়নি আর তাছাড়া না পেরেছে কাজে এক্টিভ থাকতে। ফাকা বাসায় বোনকে রেখে যেতে চায়নি ইরা, এই ছেলেদের উপর তার কোনো বিশ্বাস নেই। কিন্তু মিরা তো তার বোন জামাইয়ের ভিষণ ভক্ত, এসেছে পর থেকেই দুজনের মধ্যে খুব ভালো জমেছে। বোনকে অনেক বুঝিয়ে এটা ওটা বাহানা দিয়ে একা পাঠিয়েছে সে। আয়ুশ আর ইলহাম লিভিং রুমে বসে গল্প করছে, কেউ ফোন চাপছে তো আবার কেউ সামনে চলমান টেলিভিশনে চোখ রাখছে।ইলহাম ঘড়িতে সময় দেখে আয়ুশকে বলল
"কিছু বানিয়ে নিয়ে আয়, শুকনো মুখে বসে আছি কতক্ষন হলো!"
"আমি কেন? তুই যা"
"ভালো লাগছে না ভাই, অর্ডার করে নে"
"কি অর্ডার করবেন ভাইয়া?"
ট্রে ভর্তি নুডুলস আর পপকর্ন ভাজা নিয়ে হাজির হয়েছে মিরা। তাকে দেখে দুজনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো প্রানবন্ত হাসল ইলহাম
"তুমি কি করে জানলে যে এখন আমরা এটাই চাইছিলাম?"
"এটা সিক্রেট"
চোখ টিপ দিলো সে, শব্দ করে হেসে উঠলো দুজন। আয়ুশ হাসতে হাসতে বলল
"দেখি বেয়াইন তাড়াতাড়ি দাও খেয়ে দেখি কেমন রান্না করো তুমি"
হেসে এক প্লেট নুডুলস তার দিকে বাড়িয়ে দিলো সে। ইলহাম হেসে বলল
"তুমি শুধু শুধু কষ্ট করতে গেলে কেন মিরা? আমরা তো এখনই অর্ডার করতাম"
"আমি থাকতে আবার অর্ডার করে বাইরের খাবার খাবেন? সেটা কি করে হতে দেই ভাইয়া?"
"যদি কোনো দূর্ঘনা ঘটতো তবে তোমার বোন তো আমায় জেলে পুরে দিতো"
শব্দ করে হেসে উঠলো তিনজন, মুখটাকে এইটুকু করে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল মিরা
"এটা কিন্তু ভুল বলেন নি ভাইয়া, একদিনে যা বুঝলাম আপু আপনাকে সহ্যই করতে পারে না"
ফুস করে নিশ্বাস ফেলল ইলহাম, আফসোসের স্বরে বলল
"সে কি আর বলতে হয় বোন, তোমার বোনটাকে আমি কত ভালোবাসি অথচ সে দেখো আমাকে জনম জনমের শত্রু ভাবে"
"বিয়েটা তো এক্সিডেন্টলি হয়েছে তবে ভালোবাসা...?"
"হুম গুড কুয়েশ্চন, আমরা আগে থেকেই পরিচিত ছিলাম। প্রথম দেখাতেই তোমার বোনের তেজের প্রেমে পড়েছিলাম আমি, তারপর একটু একটু করে দুর্বলতা তবে আমার ভাগ্য ভালো যে কয়েকদিনের মধ্যেই তাকে পেয়ে গেলাম"
"কিন্তু আপু তো আপনাকে মেনে নেয় নি কি করবেন তবে?"
"মানিয়ে নিবো চিন্তা করো না"
হঠাৎ প্রশ্ন করলো আয়ুশ
"আচ্ছা মিরা তুমি কতো ফ্রি মাইন্ডেড তাহলে তোমার আপু এতো রুড কেন?"
হাসি হাসি মুখটা মুহুর্তেই নিভে গেলো, তার চেহারার পরিবর্তন লক্ষ করলো দুজন। ইলহাম ভরসা দিলো তাকে
"আমাদের নির্দ্বিধায় বলতে পারো মিরা, তবে যদি কোনো সমস্যা হয় তবে থাক"
"আপনি তো এখন আমাদের একজন ফ্যামিলি মেম্বার তাছাড়া আপুর জীবনসঙ্গী আপনি, তাই আপুর সম্পর্কে সবকিছু জানার অধিকার আপনার আছে"
দুজনে নিশ্চুপ রইলো, একটু থেমে বলতে শুরু করলো সে
"আমি আসলে আপুর আপন বোন নই সৎবোন"
বিস্ফোরিত চোখে তাকালো দুজন, একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে প্রশ্ন করলো ইলহাম
"তবে তোমাদের মধ্যে এতো মিল যে, ও তো তোমাকে খুব ভালোবাসে দেখলাম"
"হুম আপু একমাত্র আমাকেই ভালোবাসে"
"তাহলে তোমার বাবা?"
"বাবা মা কাউকেই আপু পছন্দ করেনা। এমন কি তাদের কখনো বাবা মা বলে ডাকতেও শুনিনি আমি"
অবাক হলো দুজন, মা নাহয় সৎমা কিন্তু নিজের বাবাকে কেন অপছন্দ করবে?
"কিন্তু কেন?"
"আপুর জীবনে অনেক কষ্ট ভাইয়া, আপুর খুব ছোট বেলায় বড়মা মারা যান তারপর থেকে আপু নিজেকে ঘুটিয়ে নেয় কারো সাথে মিশেনা। নিজেকে আটকে নেয় চারদেয়ালে, বছরের পর বছর মানুষটা একা থাকতে থাকতে নিজের মনকে পাথরে পরিণত করেছে। এখন কারো সাথেই সে সহজে মিশতে পারেনা ছোট বেলার সেই আঘাত এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি সে, তার যে কেউ ছিল না। যে তার একাকিত্বের সময় মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দিবে। তাকে ভালোবেসে কাছে টানবে। সেই থেকেই আপু কেমন পাংশুটে হয়ে গেছে সব সময় রুড হয়ে থাকে"
অবাকের রেশ যেন কাটছেই না দুজনের, আয়ুশ প্রশ্ন করলো তাকে
"কিন্তু তোমার বাবা কেন তার পাশে দাড়ান নি?"
"আপু তো বাবার সাথে রাগ করেই নিজেকে সবার থেকে ঘুটিয়ে নিয়ে ছিল"
"কিন কেন?"
"আমার মা আর বাবা সম্পর্ক করে বিয়ে করেছিলেন সেই ধাক্কা সইতে না পেরে বড়মা হাট অ্যাটাক করে মারা যান। তাই আপু তার মায়ের মৃত্যুর জন্য মা-বাবাকে দায়ী মনে করে"
এমন অপ্রিয় সত্য যেন প্রবল ধাক্কা দিলো তাদের অন্তরে, দুজনে নিশ্চুপ বসে রইলো কিছুক্ষন। এই মানুষটা এতো একা? অথচ তাকে দেখলে কখনো মনেই হয়না। কত স্ট্রং পার্সোনালিটি তার, শক্ত খোলসের আবরণে নিজের সব দুঃখ কষ্ট লুকিয়ে রেখেছে।
"আরেকটা কথা জানেন ভাইয়া? আপু প্রেম ভালোবাসায় বিশ্বাস করে না কারন বড় মা আর বাবা ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন"
আরও অবাক হলো দুজন, ভালোবেসে বিয়ে করে সেই মানুষটাকে কিভাবে ঠকাতে পারলেন তিনি!
"তোমার বোনের সব ভূল আমি ভেঙে দিবো মিরা, আজ থেকে আমি প্রতিজ্ঞা করলাম তার ছায়া হয়ে থাকবো আমি। তাকে সব সময় আগলে রাখবো কখনো দুঃখকে স্পর্শ করতে দিবো না"
সে জানে তার বোন নিজের জন্য একাই যথেষ্ট তবুও তাকে ভালোবাসার একটা মানুষ হয়েছে শুনে ভালো লাগছে। ইলহামের কথায় খুব খুশি হলো সে, ছেলেটাকে পারসোনালি তার অনেক ভালো লেগেছে।
এক চামচ নুডুলস মুখে নিয়ে প্রশংসা করলো আয়ুশ
"তুমি তো খুব ভালো রান্না করেছো বেয়াইন"
সহমত পোষণ করলো ইলহাম
"হ্যাঁ অনেক ভালো হয়েছে"
"থ্যাংকস ভাইয়া, তবে এর চেয়ে বেশি কিছু পারিনা শুধু এতোটুকুই"
হাসলো দুজন, আয়ুশ বলল
"তুমি ছোট মানুষ এতোটুকুই অনেক"
"আচ্ছা শুন, এখন তো আমরা চারজন, কাজের মধ্যে দুই-তিন বেলা রান্না করা তুই বা আমি দুজনের জন্যই কষ্টসাধ্য। একজন সার্ভেন্ট হলে ভালো হয়"
ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে প্রশ্ন করলো আয়ুশ
"কেন তোর বউ আছে কি করতে?"
"হাহ, সারাক্ষন ঝাড়ি দিয়েই কূল পায়না আবার আসছে তাকে নাকি রান্না করে খাওয়াবে"
খিলখিল করে হেসে উঠলো মিরা, হাসতে হাসতে বলল
"কোনো লাভ নাই ভাইয়া আপু রান্না পারেনা"
ঠোঁট গোল করে নিশ্বাস ফেলল ইলহাম
"যাক এখন অন্তত মনকে বুঝ দেওয়া যাবে যে রান্না পারে না"
হেসে উঠলো তিনজন,খেতে খেতে বিভিন্ন আলাপচারিতায় মগ্ন তৎক্ষনাৎ বেজে উঠলো কলিং বেল। সবাই জানে কে এসেছে, কেননা এখন একমাত্র ইরা বাহিরে আছে। মিরা উঠে যেতে চাইলে আয়ুশকে ইশারা করলো ইলহাম। মিরার দিকে ঝুকে নিচু কন্ঠে কিছু বলল,দুষ্টু হাসল মিরা। আয়ুশ উঠে গিয়ে দরজা খোলে দিল, ক্লান্ত ইরা মৃদু পায়ে প্রবেশ করলো ভেতরে, উচ্চ শব্দে কারো হাসা হাসির আওয়াজ ভেসে আসছে লিভিং রুম থেকে, কৌতুহলবশত সে এগিয়ে গেল সেদিকে, বেখেয়ালি পায়ের জুতা রেখে যায়নি যথাস্থানে। ইলহাম আর মিরা পাশাপাশি এক সোফায় বসে আছে, উপর থেকে আলগা করে সোফার হাতলে হাত রেখেছে ইলহাম, দূর থেকে দেখে মনে হবে যেন কাধ জড়িয়ে ধরেছে তার, কথার সাথে হাসতে হাসতে ইলহামের কাধের উপর হেলে পড়ছে মিরা। এমন অবস্থা দেখে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকালো ইরা, ভ্রুদ্বয় কুঞ্চিত করে তাদের তিনজনকে পরখ করছে আয়ুশ, কিছুক্ষন আগে ওতো এই দুইটা কত দুরত্ব মেইনটেইন করে বসেছিলো তাহলে হঠাৎ এমন চিপকে গেলো কেন?
আচমকা পিঠের উপর কিছু পড়ায় লাফিয়ে উঠলো ইলহাম, চোখ দুটো কপালে তুলে তাকিয়ে আছে আয়ুশ। পায়ের জুতা খোলে ছুড়ে মেরেছে ইরা। আর্তনাত করে উঠলো ইলহাম
"এটা কি করেছো বউ? জামাইকে জুতোপেটা করছো?"
তাদের দিকে তেড়ে এলো ইরা, মিরা কে এক ধরে হাতে টেনে দাড় করালো নিজের পাশে। ঝাঝালো কন্ঠে চেচিয়ে উঠলো
"শালা লম্পট আমার বোনের থেকে একদম দূরে থাকবি"
"সে কি কথা আমার শালির কাছে আমি যাবো না?"
"বা*লের শালি তোর, আরেকবার যদি আমার বোনের আশে পাশে দেখেছি ভালো হবে না কিন্তু"
"এমন করছো কেন আপু? আমি আর ভাইয়া তো গল্প করছিলাম"
"তুই চুপ থাক, কি পেয়েছিস এই লম্পটের মধ্যে? এসেছিস থেকে শুধু ভাইয়া ভাইয়া। আরেকবার যদি ওর সাথে দেখেছি তাহলে বাড়ি পাঠিয়ে দিবো একদম"
বাতাসের বেগে সেখান থেকে চলে গেলো সে। মুখ চেপে হেসে উঠলো মিরা। তার মতো আয়ুশ ও মুখ চেপে হাসছে। অসহায় চোখে তাকালো ইলহাম
"তোমার বোনের মধ্যে কোন ফিলিংস নেই মিরা, ওর থেকে বোধ হয় রোবটও অনেক ভালো আছে"
নিস্তব্ধ গভীর রাত, চারিপাশে নেই কোনো কোলাহল। আনুমানিক সাড়ে বারোটা কি একটা হবে। নিজের কক্ষে পায়চারী করছে ইরা, সে খুব দুশ্চিন্তায় আছে। দুইদিন হলো তার আর্টের কাজ স্থগিত, এ বাসায় এসেছে থেকে আর কোনো কাজ করা হয়নি অথচ তার কতোগুলো অর্ডার পেন্ডিং রয়েছে। একটি প্রাইভেট রুম তার খুবই প্রয়োজন, সে ভাবলো তাদের চার রুম ছাড়া এই ফ্লাটে আরও দুটি রুম খালি পড়ে আছে তার থেকে একটা তো নিয়ে নেওয়া যায় তবে তার আগে তো ইলহামের সাথে কথা বলতে হবে। সে ঘড়ির পানে দৃষ্টি দিলো বারোটা বেজে পঞ্চান্ন, এতো রাতে নিশ্চয়ই ইলহাম জেগে নেই। আর ভাবলো না সে, রুমের ব্যাপারে ইলহামের সাথে সকালে কথা বলা যাবে। রাত অনেক হয়েছে এখন ঘুমানো প্রয়োজন কাল আবার একটা সমাবেশ রয়েছে। লাইট অফ করে এক পাশ হয়ে শুয়ে পড়লো সে, চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করলো। প্রায় দুই থেকে তিন মিনিট পর দরজা খোলার আওয়াজ পেয়ে চোখ মেলে তাকালো সে। পেছন ফিরে থাকায় শুধু কিঞ্চিৎ পরিমান আলো চোখে লাগলো তার, সে বুঝতে পারলো রুমে কেউ প্রবেশ করছে। চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান ধরলো, মিনিটের মাথায় অনুভব করলো কেউ তার সামনে ঝুকে আছে। তার গরম নিশ্বাস চোখে মুখে আছড়ে পড়ছে। তার পরবর্তী পদক্ষেপের অপেক্ষায় এখনো চোখ বন্ধ করে আছে ইরা, মুগ্ধ চোখে তার বন্ধ চোখের পানে তাকিয়ে আছে ইলহাম। এতোক্ষন শুধু তার ঘুমানোর অপেক্ষায় ছিল, রাত যখন একটা ছুঁইছুঁই তখন নিশ্চয়ই আর জেগে থাকবে না। নিজের কাছে থাকা ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজা খোলে ভেতরে এসেছে এটা যদি ইরা জানতে পারে তাহলে নিশ্চয়ই তাকে উল্টো ঝুলিয়ে রেখে দিবে। কথাটা ভাবতেই হাসি পেলো তার,
আবছা আলোয় ইরার উজ্জ্বল তামাটে মুখশ্রী খুব মায়াবী লাগছে। মনে পড়লো মিরার বলা তখনের কথাগুলো, এই মেয়েটার এতো চাপা কষ্ট? কে বলবে সে এতো দুঃখি! তার নরম মনটাকে পাথর দিয়ে চেপে রেখেছে শক্ত খোলসে আবৃত করে রেখেছে নিজেকে। এই মেয়েটাকে সে তার সবটুকু দিয়ে ভালোবাসবে সবটুকু, তার মনের কোনে যত ভালোবাসা আছে সবটুকু এই মেয়েকে উজাড় করে দিবে।
#চলবে