আমার রাজ্যে তুমি
উপন্যাস এর পর্ব ২
জারা ভাবে আর রাইসা রেস্টুরেন্ট থেকে বাইরে এসে দাঁড়ায়। তাদের ভাইয়া রাফিদ তখন বিল পেমেন্ট করে তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়।
ঠিক তখনই রাইসার চোখ যায় রাস্তার পাশের ফুচকার স্টলের দিকে। সে স্টলের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলে,
—ভাইয়া, ফুচকা খাবো!
জারারও চোখ যায় ফুচকার স্টলের দিকে। রাইসার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেও বলে,
—হ্যাঁ ভাইয়া, ফুচকা খাবো।
রাফিদ দুই বোনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে,
—ফুচকা খাওয়ার জন্য তোদের পেটে জায়গা আছে?
রাইসা সঙ্গে সঙ্গে বলে,
—ফুচকা খাওয়ার জন্য পেটে জায়গা লাগে না। এটা খাওয়ার জন্য আলাদা করে পেটে জায়গা থাকে!
কথাটা বলেই দাঁত বের করে একটা মিষ্টি হাসি দেয়।
রাফিদ দুই বোনের হাত ধরে রাস্তা পার করিয়ে ফুচকার স্টলের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। তারপর ফুচকা বিক্রেতার উদ্দেশ্যে বলে,
—ওদের ফুচকা দিন।
ফুচকা বিক্রেতা জারা ও রাইসার উদ্দেশ্যে বলে,
—আপামনি, বোম্বাই মরিচ দেবো?
জারা আর রাইসা একে অপরের দিকে তাকিয়ে চুপ করে থেকে একসঙ্গে বলে ওঠে,
—হ্যাঁ হ্যাঁ, বোম্বাই মরিচ দিন!
মানুষ ঝাল পছন্দ করুক কিংবা না করুক, ফুচকার সঙ্গে ঝাল যেন সবাই একটু বেশিই পছন্দ করে।
ফুচকা বিক্রেতা দুজনকে দুই প্লেট ফুচকা দিয়ে দেয়। জারা ও রাইসা মনের আনন্দে ফুচকা খেতে থাকে।
রাফিদ দুই বোনের দিকে খেয়াল করতেই দেখে, ঝাল ফুচকা খেয়ে দুজনের চোখ লাল হয়ে গেছে। দুজনেই ঝালের কারণে চোখ-মুখ কুঁচকে শুষাচ্ছে।
বোনদের অবস্থা দেখে রাফিদের মায়া হয়। সে দুই বোনকে সেখানেই রেখে দ্রুত পাশের আইসক্রিমের দোকান থেকে দুটো আইসক্রিম নিয়ে আসে।
ততক্ষণে জারা আর রাইসার ফুচকা খাওয়া শেষ। রাফিদ আইসক্রিম নিয়ে ফিরে এলে দুজনেই আইসক্রিম খেতে খেতে ভাইয়ার সঙ্গে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
বাসায় ফিরে তিনজনই ফ্রেশ হয়ে এসে সোফায় বসে।
কিছুক্ষণ পর রাফিদ বাবাকে ফোন দেয়। কয়েকবার রিং হওয়ার পরই বাবা ফোন ধরেন।
—আসসালামু আলাইকুম, বাবা।
—ওয়ালাইকুমুস সালাম। কেমন আছিস, রাফিদ?
রাফিদ প্রথমে বাবার সঙ্গে কথা বলে পরিবারের সবার খোঁজখবর নেয়। এরপর রায়হান রহমান প্রশ্ন করেন,
—জারাকে কি কলেজে ভর্তি করিয়েছিস?
—হ্যাঁ বাবা, করিয়েছি।
—রাইসাকে রেখে যেও। ওর হয়তো আবার স্কুল কামাই হচ্ছে।
রাফিদ একটু ভেবে বলে,
—আচ্ছা বাবা। দুই-এক দিন পর রেখে আসব।
কথা শেষ করে রাফিদ ফোনটা রেখে দেয়।
এতদিন রাফিদ একাই থাকত। তাই কখনো হোটেলে, আবার কখনো ভার্সিটির ক্যান্টিনে খেয়ে নিত। কিন্তু এখন যেহেতু দুই বোন তার সঙ্গে থাকবে, তাই একজন কাজের লোক রাখা দরকার।
এই কথা ভেবেই রাফিদ আগেই একজনকে বলে রেখেছিল। সে আগামীকাল সকাল থেকেই কাজে আসবে।
তার কাজ হবে রান্না করা, থালা-বাসন মাজা এবং ঘর ঝাড়ু-মোছা করা। এতে রাফিদেরও সুবিধা হবে, আর বোনকে নিয়েও তাকে আর অতটা চিন্তা করতে হবে না।
এভাবেই কেটে যায় দিনটি।
এখন বাজে সকাল ৯টা। রাফিদের কথা অনুযায়ী আজকে জারা কলেজে যাবে। জারা রেডি হচ্ছে। এখনো ইউনিফর্ম বানানো হয়নি, তাই নিজের পছন্দ অনুযায়ী সুন্দর একটি ড্রেস পড়ে নেয়।
জারা খুব উৎসাহিত প্রথম দিন কলেজে যাওয়ার জন্য। সাথে জারার ছোট বোন রাইসাও। মনে হচ্ছে রাইসারও কলেজে যাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে।
দুই বোনের রেডি হতে হতে সাড়ে ৯টা বেজে যায়। দেরি হয়ে গেছে বলে রাফিদ দুই বোনকে ডাকতে থাকে,
—জারা, রাইসা, তাড়াতাড়ি এসো। ক্লাস শুরু হয়ে যাবে।
জারা রাতে রেডি করে রাখা নিজের ব্যাগটা ঘাড়ে নেয় এবং রাইসার হাত ধরে বেরিয়ে আসে।
কলেজে পৌঁছাতে পৌঁছাতে লেট হয়ে যায়। জারা ঘড়িতে দেখে ক্লাস আরও পাঁচ মিনিট আগেই শুরু হয়ে গেছে।
ভাই আর ছোট বোনকে বিদায় দিয়ে জারা একপ্রকার দৌড়াতে দৌড়াতে এসে নিজের ক্লাসের সামনে এসে পৌঁছায়।
জারা একটু ভয়ে ভয়ে বলে,
—May I come in, sir?
এক মিনিট হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও কোনো উত্তর না আসায় জারা আরেকটু জোরে বলে,
—May I come in, sir?
ক্লাসের মধ্যে থেকে গম্ভীর স্বর ভেসে আসে,
—No.
জারা বিরক্ত হয়ে ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকে।
এভাবেই কেটে যায় ১৫ মিনিট। জারার পা ধরে গেছে।
হঠাৎ আবারও গম্ভীরভাবে বলে,
—Yes, come in.
জারা রুমের ভেতরে এসে মাঝখানে ফাঁকা একটা বেঞ্চে বসে।
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে জারার পা ব্যথা হয়ে গেছে। বিরক্ত হয়ে মনে মনে বিড়বিড় করতে থাকে,
“স্যারটা দেখতে এত হ্যান্ডসাম, কিন্তু তার ব্যবহার এত খাটাশের মতো কেন? মাত্র পাঁচ মিনিট দেরি করেছি, তাই এতক্ষণ দাঁড়িয়ে রাখছে!”
তখন আবারও গভীর শব্দ ভেসে আসে জারার কানে,
—Stand up.
জারা ভাবে, স্যার হয়তো তার সামনের কাউকে বা পেছনের কাউকে বলছে। তাই সে দাঁড়ায় না।
আরও জোরে গভীর শব্দ ভেসে আসে,
—Are you deaf? Stand up! বেড়াতে বলছি না!
জারা চমকে ওঠে। এক মুহূর্ত দেরি না করে দাঁড়িয়ে পড়ে।
আবারও গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করে,
—What is your name?
জারা উত্তর দেয়,
—My name is Jara Rahman.
নামটা শুনেই আরহাম থমকে যায়। নামটার সাথে জড়িয়ে আছে তার ভয়ঙ্কর অতীত!
জারার মুখের দিকে ভালো করে তাকায়। জারার পরনে ছিল সুন্দর একটি কালো এমব্রয়ডারি করা গাউন, সঙ্গে কালো হিজাব। ফর্সা গায়ের রঙের সঙ্গে কালো পোশাকটি যেন দারুণ মানিয়ে গেছে। হালকা করে লিপস্টিক আর আইলাইনার দিয়েছে। এতেই যেন ৫ ফুট ৩ ইঞ্চির জারাকে অপরূপা লাগছে। কেউ দেখলে সহজেই চোখ ফেরাতে পারবে না।
তারপর বলে,
—আমি এতক্ষণ কী বোঝাচ্ছিলাম, বলো। রিপিট কর।
জারা এতক্ষণ বাইরে ছিল। বিরক্তিতে তেমন কিছুই শুনেনি। তাই জারা চুপ করে থাকে।
গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
—আমার ক্লাস করতে ভালো না লাগলে বাইরে গিয়ে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে। অমনোযোগী স্টুডেন্ট আমার একেবারেই পছন্দ না। ওকে?
তারপর ক্লাস থেকে বের হয়ে যায় শিক্ষক।
জারা বাইরে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করতে থাকে,
—খাটাশ স্যার একটা! পাঁচ মিনিট লেট করেছিলাম, তাই এত কিছু শোনালো। বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখল, সবার কাছে হাসির পাত্র বানালো!
জারা খেয়াল করে, বেশিরভাগ স্টুডেন্টই তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। তাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে।
তার পাশে বসে থাকা মেয়েটা বলে,
—আমার নাম রিমি। তোমার নাম তো জানলাম।
জারা প্রশ্ন করে,
—এই খাটাশ স্যারটার নাম কী গো?
রিমি বলে,
—খাটাশ? উনি আরহাম খান। কলেজের সব মেয়েদের ক্রাশ!
জারার কাছে আরহাম খান নামটা খুব পরিচিত মনে হয়। কিন্তু সেই ভাবনাকে প্রায়োরিটি না দিয়ে বলে,
—এরকম খাটাশ মানুষ আবার কারও ক্রাশ হতে পারে?