ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম আমার (সিজন ১)

৪৩তম পর্ব

লেখক: আয়ানা জাহান নুসরাত

#প্রেম_আমার♥

#পার্ট-৪৩♥

#Ayanaa_Jahan(Nusraat)♥

.

🌺

.

---- আয়ায়ায়ায়ায়ায়ায়া.........!

আম্মু, আব্বুউউউ, ভূত......! ভূতে হিশু করে দিয়েছে আমার ওপর.......!

.

গায়ে পানি পড়ায় একলাফ মেরে চেঁচিয়ে এসব বলতে বলতে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো অগ্নি ভাইয়া!

আর প্রতিবারের মতোই ধড়ফড়িয়ে ঘুম থেকে উঠতে যেয়ে উদ্ভট সব বাক্য উচ্চারণ করে বসলো ইজ্জতের ফালুদা বানিয়ে। আমার পেছনে নীবিড় ভাইয়া মাথায় হাত দিয়ে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন।

উনার পাশেই রুশো ভাইয়া টেনশনের চোটে এতোক্ষণ দাঁত গুলোকে আবারও নেইম কাটার বানিয়ে কুটকুট করে নখ কেটে যাচ্ছিলো। কিন্তু অগ্নি ভাইয়ার মুখে এমন অদ্ভুত বাক্য শুনে টেনশন ফেলে ফিক করে হেসে ফেললো রুশো ভাইয়া।

.

গত ১৫ মিনিটের মতো সময় ধরে দিদুনের আদেশ মতো অগ্নি ভাইয়াকে ডেকেছি আমি। কিন্তু কোনোকিছুতেই কোনো লাভ হয় নি বরং ডাকতে ডাকতে আমার গলা ব্যথা হয়ে গিয়েছে। আমরা মেয়েরা তো ভোরের দিকেই উঠে গিয়েছি। যেহেতু নিত্য আপু আর নীবিড় ভাইয়া সচরাচর ভোর বেলায়ই ঘুম থেকে উঠেন সেই হিসেবে আপু উঠে আমাকে আর রাত্রিকে ডেকে তুলে দিয়েছে। এদিকে নীবিড় ভাইয়া রুশো ভাইয়াকে ঘুম থেকে উঠাতে পারলেও আমার এই ঘুম কাতুরে ভাইকে শত চেষ্টা করেও উঠাতে পারেন নি।

দিদুন ৬ টার দিকে ভাইয়াদের ঘরে এসে অগ্নি ভাইয়াকে এখনো ঘুমোতে দেখে আমায় ডেকে পাঠিয়েছেন। অবশেষে আমিও যখন ভাইয়াকে উঠাতে ব্যর্থ হলাম ঠিক সেই মুহূর্তে দিদুন আমার হাতে এক মগ পানি ধরিয়ে দিয়ে বললেন ভাইয়ার মুখে ছুড়ে মারতে। প্রথমে না করতে চেয়েও দিদুনের কড়া গলার নির্দেশ শুনে অগত্যাই ভাইয়ার মুখে পানি মারতে হলো আমার।

.

অগ্নি ভাইয়া চোখ ভালো করে ডলে নিয়ে মগ হাতে আমায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দিলো এক ধমক,

---- ওই পেত্নী, শাঁকচুন্নি! পানি মারলি কেন গায়ে? আমার কতো সাধের ঘুমটা ভাঙ্গালি!৷ আহা কি স্বপ্নটাই না দেখছিলাম। আমি আর নি....

.

আর কিছু বলার আগেই আমি নিঃশব্দে চোখ-মুখের ইশারায় ভাইয়াকে আড়চোখে দিদুনকে দেখিয়ে চুপ করতে বলায় ভাইয়া তৎক্ষনাৎ দুহাতে ঠোঁট চেপে ধরলো।

দিদুন আমাদের থেকে খানিকটা দূরে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। অগ্নি ভাইয়াকে উঠে বসে এসব অদ্ভুতুড়ে কথা বলতে দেখে দিদুন নিজের কুঁচকে যাওয়া কপাল আরোও খানিকটা কুঁচকিয়ে বলে উঠলেন,

.

---- এসব কি অগ্নি? এতো বেলা পর্যন্ত ঘুমোও কেনো? বাকিরা তো ঠিকই উঠে গেছে। তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে নিচে এসো সবাই।

.

অগ্নি ভাইয়া আমতাআমতা করে এদিক ওদিক তাকিয়ে বলে উঠলো,

---- সরি দিদুন! আর হবে না এমন। তুমি যাও, আসছি আমরা!

.

দিদুন আর কিছু বললেন না। ধীর পায়ে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।

দিদুন চলে যেতে রুশো ভাইয়া আর নীবিড় ভাইয়া হাসতে হাসতে অগ্নি ভাইয়ার পাশে বসে পড়লেন।

.

---- সিরিয়াসলি অগ্নি! ভূত তোর ওপর হিশু করে দিয়েছে? বাহ কি টয়লেট ভূতের!

.

---- ব্রো, ভূতেদের আবার হিশু, পটি এসবও হয় নাকি? আমি তো জানতাম না।

.

ওদের কথা শুনে আমি ঠোঁট চেপে হাসতে লাগলাম। অগ্নি ভাইয়ার এরকম আচমকা ঘুম থেকে উঠার কারণে বলা উদ্ভট সব বাক্য গুলোর সাথে আমি পূর্ব পরিচিত হলেও নীবিড় ভাইয়া পরিচিত নন। তাই একটু বেশিই মজা নিচ্ছেন উনি!

.

---- ভাইয়া, এইবার কিন্তু আমি ইচ্ছে করে পানি মাড়ি নি। দিদুনের আদেশে বাধ্য হয়েই মেড়েছি! তাই তোর বকা গুলো ফেরত নে। পেত্না, শাঁকচুন্না!

.

অগ্নি ভাইয়া আমার কথায় চোখ ছোট ছোট করে বলে উঠলো,

---- পেত্নি অার শাঁকচুন্নির কোনো মেল ফর্ম নেই, ডাফার।

.

আমি ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে কপালের ওপর পড়ে থাকা চুলগুলো মুখ বাকিয়ে ফুঁ দিয়ে সরিয়ে বলে উঠলাম,

---- সো হোয়াট? না থাকলে নাই। আমি বানিয়ে নিলাম।

.

আমার কথায় রুশো ভাইয়া আর নীবিড় ভাইয়া আগের থেকে আরো উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। এদিকে অগ্নি ভাইয়া রেগে বোম্ব হয়ে "তবে রে...!" বলে তাড়া করতেই আমি হাসতে হাসতে এক ছুটে ঘর থেকে বেড়িয়ে পড়লাম।

হাহ! যা করে করুক ভাই! আমি আগে পালাই বাবা!

.

🍂

.

ভাজ্ঞিস আমরা বুদ্ধি খাটিয়ে পেস্ট আর ব্রাশ সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলাম। নয়তো আর সবার মতো নিমের ডাল দিয়ে দাঁত মাজতে হতো আমাদের।

.

বাড়ির নিয়ম সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে ২০ মিনিট হাটাচলা করা। সেই সুবাদেই বাড়ির পাশের রাস্তাটায় হাটছি আমি নিত্য আপু আর রাত্রি।

ভাইয়ারা সবাই উল্টো দিকে হেটে গিয়েছে। ওদিকটায় গ্রামের একটা ক্লাব আছে। আর তার পাশেই আছে একটা পুকুর। ওদিকে পরিবেশটা অনেক সুন্দর কিন্তু আমি যাচ্ছি না অন্য একটা কারণে আর সেই কারণটা হলো "ভুট্টু!" ভুট্টু কোনো মানুষের নাম নয় এটা হলো সৈকত কাকুদের পোষা কুকুরের নাম। ওটাকে দেখলেই আমার ছোট বেলার কুকুরের তাড়া খাওয়ার সিনটা মনে পড়ে যায় যার ফলে নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে দেই এক দৌড়। তবে বিপদে আমি কখনোই পড়িনি। বিপদে তো পড়ে আমার পেছনে থাকা মানুষজন। ঠিক যেমনটা পড়েছিলো সাদা বিলাই। কুকুরটা আমায় ধরতে না পেরে উনাকে তাড়া করেছিলো। এখনো সাদা বিলাইয়ের পেছনে ওই কুকুরটার দৌড়ানোর দৃশ্য মনে পড়লেই পেট ফেটে হাসি বের হয় আমার।

.

---- কিরে হাসছিস কেনো?

.

রাত্রির প্রশ্নে ভাবনা জগৎ থেকে বেড়িয়ে এলাম আমি। নিজেই নিজের মাথায় একটা চাটি মেরে বলে উঠলাম,

.

---- এমনি রে! একটা সিন মনে পড়ায়!

.

---- কালকের লুঙ্গি ড্যান্সের? (হাসতে হাসতে বললো রাত্রি)

.

---- আরে না না! ঐ যে তোর মনে নেই ভার্সিটির তৃতীয় দিনে নীবিড় ভাইয়াকে কুত্তার দৌড়ানি খাইয়েছিলাম?

.

আমার কথায় রাত্রি কিছুক্ষণ চুপ থেকে মনে করার চেষ্টা করে পর মুহুর্তে হু হা করে হাসতে শুরু করে দিলো!

.

---- সিরিয়াসলি অনন্যা, তুই একটা জিনিস! হায়রে নীবিড় ভাইয়াকে কিভাবে না কুকুরের তাড়াটা খাওয়ালি! বেচারা দুলাভাই!

.

উনাকে দুলাভাই বলায় আমি মুখ বাকিয়ে রাত্রির পেটে গুঁতে মেরে দিলাম। নিত্য আপু আমাদের কাছে এগিয়ে এসে বললো,

---- এই অনন্যা, তোমাদের দাদুবাড়িতে চা খায় তো সবাই?

.

আমি গালে হাত দিয়ে একটু ভেবে বললাম,

---- শুধু মামুন ভাইয়া, মাসুম ভাইয়া আর চাচিমনি খায়! কেনো?

.

নিত্য আপু ঠোঁট উল্টে বললো,

---- আর বলো না, সকাল সকাল উঠে গরম গরম চা না খেলে আমার কিছু হজম হতে চায় না৷

.

আপুর কথায় হাল্কা হেসে বললাম,

---- চলো তবে, কেউ চা বানিয়েছে কিনা দেখি। নাহলে বানিয়ে নিতে হবে।

.

🌹

.

---- আচ্ছা মামুন, এগুলো কি ফুল? (নীবিড়)

.

মামুন পাশের ঝোপে ফোটা ফুলগুলোর দিকে এক নজর চেয়েই বলতে শুরু করলো,

---- ও এগুলোকে ধুতুরা ফুল বলে। রাস্তার পাশে পরিত্যক্ত স্থানে জন্মায় এই অবহেলিত ধুতুরা ফুল। এই গাছ সাধারণত বিষাক্ত হিসেবে পরিচিত হলেও আয়ুর্বেদ ও ভেষজ চিকিৎসায় এই গাছের পাতা, ফুল, মূল ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ধুতুরার বীজ থেকে চেতনানাশক পদার্থ তৈরি করা হয়। তাছাড়া কুকুরের কামড়ের বিষ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ধুতুরা গাছের মুলের রস পান করানোর বিধান আছে।

.

---- আচ্ছা? তাহলে তো বলা যায় বিষও কোনো না কোনো ভাবে উপকারী!

.

মামুন হাসলো। আর একটু এগোতেই সামনে পড়লো "ভুট্টু!" রুশোও অনন্যার মতো কুকুরে ভীষণ ভয় পায় তাই মামুন স্থির থাকতে বলবে তার আগেই "ওহ নোউ কুত্তা!" বলেই ছিড়ে ছুটকে উল্টো দিকে ঘুরে দৌড় লাগালো রুশো!

রুশোকে দৌড়োতে দেখে নীবিড়ের আবারও ভার্সিটির ওই বডিবিল্ডার কুকুরের দৌড়ানির কথা মনে পড়তেই "আবে ভাগ পাগলা!" বলে নিজেও দৌড় লাগালো। ততক্ষণে ভুট্টুও ওদের পেছনে "ভাউউউ" "ভাউউউ!" করতে করতে দৌড়ানো শুরু করে দিয়েছে।

এবার অগ্নি আর মামুন একে ওপরের দিকে তাকিয়ে "চাচা আপন প্রাণ বাঁচা!" বলেই নিজেরাও ছুট লাগালো বাড়ির উদ্দেশ্যে!

.

🌺

.

বাড়িতে ফিরতেই চোখ গেলো বড় চাচির দিকে। বড় চাচি চাল বাছছেন! পাশে বসে আছে চাচিমনি! চাচিমনি পিরায় বসে রুটি বেলছেন। আর সেই বেলা রুটিগুলো নির্দিধায় মাটির উনুনের ওপর বসানো তাওয়াতে ভাজছে আম্মু! আম্মুর পাশের উনুনে আলুর ডাল রান্না করছে জুঁই ভাবী ওরফে মাসুম ভাইয়ার ওয়াইফ! ৩ বছর হলো বিয়ে করেছেন মাসুম ভাইয়া!

মাসুম ভাইয়া বড় চাচির ছেলে। উনারা ৩ ভাই বোন। মাসুম ভাইয়ার ছোট আরোও দু বোন ছিলো তবে ওদের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে শ্বশুর বাড়িতে থাকে।

আর চাচিমনির একমাত্র ছেলে হলো মামুন ভাইয়া। উনি মার্স্টার্স শেষ করেছেন তবে শহরে চাকুরির সন্ধানে যান নি। বাড়ির ব্যবসা তেই হাত লাগিয়েছেন। কারণ চাচ্চুদের বয়স হয়ে যাচ্ছে, শুধু মাসুম ভাইয়ার ওপর সব চাপ তো আর রাখা যায় না তাই মামুন ভাইয়াও মাসুম ভাইয়ার সাথে ব্যবসায় নেমে পড়েছেন। মৎস ব্যবসায় ইনকামও বেশ ভালোই হয়। তবুও দিদুনের কথামতো কেউই প্রয়োজন ছাড়া কোনো খরচ করে না। খুব সাধারণ ভাবেই চলাফেরা করে সবাই।

.

চায়ের কথা মনে পড়তেই আমি পা টিপেটিপে আম্মুর পাশে গিয়ে কানে ফিসফিস করে বললাম,

---- আম্মু চা হবে?

.

আম্মু আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আস্তে করে বললো,

---- তুই আবার চা খাওয়া শুরু করলি কবে? গলা ব্যথা করছে নাকি?

.

---- আরে না না আম্মু! আসলে নিত্য আপু প্রতিদিন সকালে চা খায় তুমি তো জানো! তাই বলছিলাম আর কি!

.

---- ওমা তাইতো? ভুলেই গিয়েছিলাম, আচ্ছা তুই যা। রুটি ভাজা হয়ে গেলে চা বসাচ্ছি!

.

আমি মাথা নাড়িয়ে খুশি মনে আপুর পাশে এসে দাঁড়াতেই পেছন থেকে দিদুনের গলা পেয়ে উল্টো দিকে ঘুরে তাকালাম। দিদুন নিজের চোখে লাগানো চশমাটা ঠেলে দিয়ে এগিয়ে আসতে আসতে বলে উঠলেন,

.

---- আজকে চা হবু নাত বউ বানাবে। আর আমিও চা খাবো! কথা সবার কানে গিয়েছে?

.

সবাই এক সুরে "জ্বি" বলে মাথা নাড়াতেই দিদুন উল্টো দিকে ফিরে নিজের চেয়ারে বসে খবরের পাতাটা মেলে পড়তে শুরু করলেন। এদিকে নিত্য আপু ভীষণ নার্ভাস ফিল করছে! চা বানাতে আপুর কোনো প্রবলেম নেই তবে প্রবলেম হচ্ছে আজকে দিদুনও চা খাবেন। যদি একটু উনিশ-বিশ হয় তবে কি হবে তার ধারণা না থাকলেও অজানা ভয় এসে হানা দিচ্ছে আপুর মনে।

আর আমি ভাবছি মাটির উনুনে আপুর গায়ে কোনো ভাবে যদি আগুন লেগে যায়! তাছাড়া এমনিতেই তাপের কারণে চুলোর আশেপাশেই যেতে পারিনা আমি। আপুর ফর্সা মুখ আজকে টমেটোই হয়ে যাবে নির্ঘাত।

.

এর মধ্যেই ভাইয়ারা এসে হাজির হলো। দেখেই বোঝা যাচ্ছে দৌড়াদৌড়ি করেছে তিনজন মিলেই ভীষণ! কি জানি ভুট্টুর তাড়া খেলো টেলো না তো? ওটা যে সেয়ানা কুকুর অপরিচিত কাউকে দেখলেই তো গলা ফাটিয়ে চেঁচাতে থাকে। ইভেন একটু টেরিবেরি করলে পেছন পেছন ছুটও লাগিয়ে দেয়। হাহ!

আর ইদানীং কেনো জানি ভাইয়াদের দেখলে আমার শুধু একটা কথাই মনে হয়। কথাটা কিছুটা এরকম, "তিন মাথা ছয় কান, যেখানেই যাবে সেখানেই অপমান!"

.

ভাইয়ারা ভেতরে ঢুকতেই আম্মু রুটি ভাজতে ভাজতে অগ্নি ভাইয়াকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,

---- অগ্নি...! দেখ দরজার পাশে একটা হাড়িতে দুধ রাখা আছে। হাড়িটা নেয়ে আয় তো বাবা!

.

"আচ্ছা আনছি" বলে ভাইয়া হাড়িটা নেওয়ার আগেই রুশো ভাইয়া অগ্নি ভাইয়া কে থামিয়ে দিয়ে ভাব নিয়ে বললো "হেই ব্রো চিল না! আমি নিয়ে যাচ্ছি!"

বলে রুশো ভাইয়া হাড়িটা নিয়ে দুধাপ দিতেই "ডাসসসস....!"

.

পুরো উঠান জুড়ে নীরাবতা! আমি হা করে মাথায় হাত দিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে আছি। অগ্নি ভাইয়া আর নীবিড় ভাইয়া এতোক্ষণে দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলেছে।

.

পুরো উঠান জুড়ে দুধের ছড়াছড়ি! রুশো ভাইয়ার গা থেকে টপ টপ করে দুধ পড়ে যাচ্ছে! এতো বড় হাড়িতে মিনিমাম ৩ কেজি দুধ তো ছিলোই। তার অর্ধেক ছিটকে রুশো ভাইয়ার গা ভিজিয়ে দিয়েছে, আর বাকি অর্ধেক উঠানে ছিটকে উঠানে গড়িয়ে পড়েছে। একবার আশেপাশে চোখ বুলিয়ে নিতেই সবাইকেই হা করে থাকতে আবিষ্কার করলাম আমি! শুধুমাত্র দিদুনের চেহারায় অবাকের বিন্দুমাত্র রেশ নেই। দিদুন নিজের চোয়াল শক্ত করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রুশো ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন। যার অর্থ আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ভয়াবহ কিছু হতে চলেছে!

.

রুশো ভাইয়া ফ্লোরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দুধের বন্যার দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে পর মুহূর্তে মুখ তুলে তাকিয়ে সবার রিয়াকশন আড়চোখে দেখে নিয়ে কাচুমাচু করে ঠোঁট উল্টালো।

.

দিদুন বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ধীর পায়ে খানিকটা এগিয়ে রাগান্বিত কন্ঠে বলে উঠলেন,

.

---- সালমা.....! ওকে পুরো উঠান মুছতে লাগিয়ে দাও। মুছা হয়ে গেলে লালু-ভলুর ঘরে পাঠিয়ে দুধ দুইয়ে আনতে বলো। সময় ১ ঘন্টা!

এর মধ্যে আমি ফিরে এসে যেনো সবকিছু আগের মতো পাই।

.

বলেই দিদুন গটগট করে হেটে ঘরে চলে গেলেন আর রেখে গেলেন ধকধক করতে থাকা আমাদের ছোট্ট ছোট্ট কলিজাগুলোন! রুশো ভাইয়া গাভীর দুধ দুইবে? এও সম্ভব?

এই কাহিনীর পর রুশো ভাইয়া এতোক্ষণে পারলে বোধহয় এক লাফে মাটি ফাঁক করে ভেতরে ঢুকে পড়তো!

.

দিদুন একটু পর পরই এসে দেখে যাচ্ছে যে আমরা কেউ রুশো ভাইয়াকে হেল্প করছি কিনা! তাই ভাইয়াকে কেউ একটু হেল্পও করতে পারছি না।

কোনোরকমে কাপড় দিয়ে উঠান মুছে উঠলো রুশো ভাইয়া!

কিন্তু এবার কি হবে?

নীবিড় ভাইয়া আর অগ্নি ভাইয়া দুজনেই কপাল চাপড়াচ্ছে। এদিকে রুশো ভাইয়া নখ কামড়ে ভাবছে দুধ দুইবে কিভাবে! নিত্য আপু আর আমি অসহায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চেয়ে আছি ভাইয়ার দিকে। বাড়িতে কেমন যেনো থমথমে পরিবেশ! শুধুমাত্র একটা মানুষই এখন মুখ টিপে হেসে যাচ্ছে। সে হলো আমার বেস্টু রাত্রি! এই মেয়েটা আমার ভোলাভালা ভাইটার ইজ্জতের ফালুদা হলে এতো খুশি হয় কেনো আল্লাহ মালুম!

.

হঠাৎ রুশো ভাইয়া নখ খাওয়া থামিয়ে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে কিছু একটা ভেবে বললো,

---- হেই গাইস! কেউ টেনশন করো না। আমি ঠিক টাস্ক কমপ্লিট করে আসছি! মনি একটা বালতি দাও আমাকে!

.

আম্মু অসহায় ফেইস নিয়ে রুশো ভাইয়ার হাতে বালতিটা ধরিয়ে দিয়ে বললো,

---- পারবি তো? সাবধানে করিস বাবা!

.

রুশো ভাইয়া দাঁত কেলিয়ে ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বললো, "ওহ কাম অন মনি, ওই কাউ একটা লাথি দিলে আমি উল্টে দুটো কিক মেরে দেবো!"

বলেই বুক ফুলিয়ে শ্বাস টেনে গোয়াল ঘরে চলে গেলো ভাইয়া!

.

🌸

.

---- হেই কাওস তোমাদের মধ্যে হু ইজ লালু এন্ড হু ইজ ভলু? মনি তো বললো লালুর দুধ দুইতে। দুজনেই তো প্রায় সেম সেম কালারের! চিনি কীভাবে বলোতো?

.

রুশোর প্রশ্নের কোনো আগামাথা না বুঝে লালু "হাম্বায়ায়ায়া...!" করে ডাক দিলো। রুশো লালুর ডাকে লাফিয়ে উঠে খানিকটা দূরে সরে গিয়ে বুলে ফুঁ দিয়ে শান্ত হয়ে আবারও একটু এগিয়ে এসে হাসার চেষ্টা করে বলে উঠলো,

.

---- ওহ! তার মানে তুমি লালু! গুড লুকিং লালু! বাই দ্য ওয়ে এখন এটারও এন্সার দাও তো, যে দুধ দুইবো কোথায় থেকে?

.

লালু আবারও আগের থেকে জোড়ে "হাম্বায়ায়ায়ায়া!" করে উঠলো। রুশো খানিক ভেবে হঠাৎ চুটকি বাজিয়ে "আইডিয়া!" বলে ফোন বের করে দুধ দুয়ার একটা ভিডিও অল্প একটু দেখে নিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বললো,

"এইবার কোনে যাব্বা লাল্লু জি? আম কামিং লালু বেবি!"

বলেই লালুর কাছে গিয়ে আস্তে করে বালতিটা নিচে রেখে দিলো রুশো। লালুকে চারদিকে খু্ঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে রুশো চিন্তিত হয়ে পড়লো এই ভেবে যে,

"এইরে, ইউটিউবে দেখা গরুর মতো এটার অঙ্গ-প্রতঙ্গ নেই কেনো? তবে কি এটা হাইব্রিড গরু?"

ভেবেই রুশো গুটিগুটি পায়ে লালুর পাশে গিয়ে বসতে নিলেই লালু লেজ দিয়ে রুশোর গালে ঠাসস করে বারি মেরে দিলো। লেজের বারি খেয়ে রুশো ধপাস করে নিচে থাকা গোবরের ওপর পড়ে গেলো!

.

---- ও মাই গড! এই চিপকু গামের মতো এগুলো কি?

.

বলে নিজের বাম হাত গোবরে ছুঁইয়ে মুখের সামনে ধরতেই "ওহ নো ইটস পটি! কাউ ডানগ! ইয়্য্যায়ায়াক্কক্কক......!" বলে নাক-মুক সিঁটকে উঠতে নিলেই আবারও গোবরে পা লেগে স্লিপ কেটে সোজা লালুর গায়ের সাথে লেগে যায় রুশো।

লালু রেগে গিয়ে পেছনের পা দিয়ে রুশোর পেছনে লাথি মেরে দিতেই "ইয়ায়ায়ায়ায়া......!" বলে চিৎকার দিয়েই ধপাস করে সামনে রাখা পাতার ঝুড়ির ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে যায় রুশো!

.

🍁

.

বাইরে থেকে রুশো ভাইয়ার চিৎকার শুনে ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়লাম আমি। অগ্নি ভাইয়া আর নীবিড় ভাইয়া মাথায় ধপ করে হাত দিয়ে অপরের দিকে এক নজর তাকিয়ে " এই খাইছে রে....!" বলেই ছুট লাগালো গোয়াল ঘরে। এদিকে আমরা আল্লাহ আল্লাহ করে যাচ্ছি! নির্ঘাত লালু রেগে গিয়ে লাথি মেরে দিয়েছে ভাইয়াকে। তবে লালুতো সচারাচর এরকম রেগে যায় না। খুব শান্ত স্বভাবের লালু! আবার লালুর ঠিক উল্টো হচ্ছে ভলু! ভীষণ রাগি! আশেপাশে গেলেই গুঁতো মারতে এগিয়া আসে ভলু!

.

কিছুক্ষণ পরই রুশো ভাইয়ার দুবাহু ধরে নিয়ে এলো অগ্নি ভাইয়া আর নীবিড় ভাইয়া! রুশো ভাইয়ার প্যান্ট গোবরে মাখামাখি। মুখচোখের অবস্থা করুন। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ধুলোয় লুটুপুটু খেয়ে গেছে।

রুশো ভাইয়াকে এমন অবস্থায় দেখে আম্মু আর চাচিমনি ছুটে গিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ভাইয়াদের জিজ্ঞেস করলো,

.

---- একি, রুশোর এই অবস্থা হলো করে?

.

আম্মুর প্রশ্নে অগ্নি ভাইয়া মুখটা পেঁচার মতো বানিয়ে উত্তর দিলো,

---- গাভী কে ছেড়ে ষাঁড়ের দুধ দুইতে গেলে এর থেকে কম আর কি হতে পারে?

.

.

.

.

চলবে................💕

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন