#প্রেম_আমার♥
#পার্ট-৪৪♥
#Ayanaa_Jahan(Nusraat)♥
.
🌺
.
গালে হাত বসে গভীর ভাবনার জগতে ডুব দিয়েছি আমি। পাশেই রাত্রি হাসির সাথে যুদ্ধে নেমে পড়েছে! সেই যে শুনেছে রুশো ভাইয়া ষাঁড়ের দুধ দুইতে গিয়েছে সেই থেকে এখন পর্যন্ত শুধু হেসেই যাচ্ছে!
সামনেই নিত্য আপু ফার্স্ট এইড বক্স থেকে মুভ নিয়ে রুশো ভাইয়ার পিঠে লাগিয়ে দিচ্ছে।
এদিকে অগ্নি ভাইয়া আর নীবিড় ভাইয়া রুশো ভাইয়াকে একেবারে গোসল করিয়ে তারপর ঘরে নিয়ে এসেছে। বর্তমানে তারা রুশো ভাইয়ার দুপাশে বসে একটু পর পর ফিক করে হেসে উঠছে আবার পর মুহূর্তে রুশো ভাইয়াকে সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছে।
.
---- আহহ....! ভাবী আস্তে.....!
.
---- সরি সরি! এদিকে লেগেছে বুঝতে পারিনি! হয়ে গেছে আমার। তুমি রেস্ট নাও এখন, ব্যথা সেরে যাবে।
.
বলেই আপু আমার পাশে এসে বসে পড়লো। এমন সময় মামুন ভাইয়া ঘরে নক করে বলে উঠলেন,
"আসবো?"
অগ্নি ভাইয়া মামুন ভাইয়াকে অনুনয়ের সুরে বললো
" আরে এসো এসো!"
মামুন ভাইয়া মুচকি হেসে ঘরে ঢুকেই একবার রুশো ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে বসলেন,
.
---- রুশোর কি খবর? ঠিক আছে এখন?
.
রুশো ভাইয়া শুয়ে থেকেই ডান হাত উপরে তুলে "লাইক থামস আপ" দেখিয়ে "অলরাইট ব্রো!" বলেই হাত নামিয়ে নিলো। মামুন ভাইয়া মৃদু হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
.
---- অনন্যা, দুপুরের খাবারের পর দিদুনের ঘরে এসো! দিদুন ডেকেছে। একটু পরই খাবার বারা হবে।
.
মামুন ভাইয়ার মুখে দিদুন আমায় ডেকেছে শুনেই বুকটা ধক করে উঠলো আমার। এই একটা মানুষ যখন কাউকে নিজের ঘরে ডাকে তখন শুধু সিরিয়াস না মারাত্মক সিরিয়াস কিছু বলার জন্যই ডাকে। যা দিদুনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের জন্য হার্ট এট্যাকের কারণ পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। তাই আমি কৌতুহল বসতো উত্তেজিত হয়ে মামুন ভাইয়ার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠলাম,
.
---- কেনো ডেকেছে আপনি কি জানেন ভাইয়া?
.
মামুন ভাইয়া ক্ষণিকের জন্য একটু চিন্তা করে বললেন,
---- তা ঠিক বলতে পারছি না। গেলেই বুঝতে পারবে। আমাকেও ডেকেছে অবশ্য! আমিও তার কারণ জানিনা।
.
---- আচ্ছা ঠিক আছে ভাইয়া!
.
বিনিময়ে মামুন ভাইয়া স্মিথ হেসে বেড়িয়ে গেলেন। নীবিড় ভাইয়া কিছুক্ষণ ভ্রু কুচঁকে মামুন ভাইয়ার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে চোখ সরিয়ে আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বসলেন। উনার এমন চাহনির কোনো অর্থ খুঁজে পেলাম না আমি৷ উনি কিচ্ছুক্ষণ ওভাবেই তাকিয়ে থেকে চোখ নামিয়ে রুশো ভাইয়ার সাথে আবারও হাসি-তামাশায় মত্ত হয়ে পড়লেন।
.
---- ছুটকি....! এটম বোম্বকে একটু থামতে বল না রে বোন! ও ফেটে গেলে আমরা একটাও আস্ত থাকবো না। গ্রেনেড টাইপ হামলার শিকার হয়ে টপকে যাবো সবাই!
.
রুশো ভাইয়ার কথায় নিমিষেই হাসি থামিয়ে রেগেমেগে লাল হয়ে উঠলো রাত্রি! দাঁতে দাঁত চেপে রুশো ভাইয়ার দিকে অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বড়বড় পায়ে হেটে চলে গেলো ঘরে।
আমি ফিক করে হেসে দিয়ে রুশো ভাইয়ার পাশে গিয়ে বসে পড়লাম। ভাইয়ার কপালের সাথে লেপ্টে থাকা সিল্কি ব্রাউন চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে নাকটা টেনে দিলাম।
রুশো ভাইয়ার সাথেসাথেই নিজের নাক চেপে ধরে আহত কন্ঠে বলে উঠলো,
.
---- তুইও শেষমেশ আমার অসহায় নাকেটার পেছনেই পড়লি ছুটকি?
.
আমি মুখ টিপে হেসে দিয়ে বললাম,
---- তোমার নাকটা অনেক কিউট তো তাই রাত্রি আদর করতে গিয়ে ভুলে ঢিশুম করে মেরে দেয়। আর আমি তো শুধু আদরই করলাম। হেহে!😁
.
আমার কথা ভাইয়ারা সাথে নিত্য আপুও ঘর কাঁপিয়ে হাসিতে ফেঁটে পড়লো। অগ্নি ভাইয়া আবারও দাঁত কেলিয়ে রুশোর ভাইয়ার মজা নেওয়ার জন্য বলে উঠলো,
.
---- সিরিয়াসলি রুশো! তুই শেষমেশ কিনা একটা ষাঁড়ের দুধ দুইতে গিয়েছিস! ইতিহাসে প্রথম! এটা নিয়েই স্টোরি লেখ ভাই! ট্রাস্ট মি, সেই মার্কেট পাবে।
.
রুশো ভাইয়া ঠোঁট উল্টিয়ে মুখে অসহায়ত্ব ফুটিয়ে বলে উঠলো,
---- আমার কি দোষ? আমি আস্ক করলাম দুটোকেই যে হু ইজ লালু এন্ড হু ইজ ভলু! তার মধ্যে একজন এন্সার দিলো! তাই তো আমি ওকেই লালু ভেবে নিয়েছিলাম!
.
---- মানে? গরু আবার এন্সার দেয় কিভাবে? (নীবিড়)
.
রুশো ভাইয়া মুখ গোমরা করে আবারও বললো,
---- আমি তো নিনজা হাতোরীর মতোই আস্ক করেছিলাম আর প্রতিউত্তরে ওই বুল টা হাম্বায়ায়া...! করে ডেকেছিলো। সো এতে আমার কি দোষ?
.
রুশো ভাইয়ার উত্তরে আমি হাসবো না কাঁদবো না বাড়ি ছেড়ে উগান্ডায় পালাবো ভেবে কূল-কিনারা পাচ্ছিনা।
অগ্নি ভাইয়া হাসতে হাসতে ক্লান্ত হয়ে নীবিড় ভাইয়ার ওপর থেকে উঠে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠলো,
.
---- ভাই থাম তুই! আর হাসাস না প্লিজ!
এসব জাস্ট তোর দ্বারাই পসিবল। হাহ? মানুষ হয়ে পশু-পাখি দের সাথে কথা উল্টাপাল্টা কথা জাস্ট তুই ই বলতে পারিস! উফফফ.....! আম জাস্ট স্পিচলেস!
.
নিত্য আপু আর আমি হাসতে হাসতে তিন ফাজিল কে রেখে বেড়িয়ে এলাম! আম্মু ডাকছে নিচে যাওয়ার জন্য, তাই রাত্রি কে নিয়ে নিচে নেমে গেলাম!
.
🌷
.
---- কিন্তু মা...! এটা কিভাবে হয় তুমিই বলো? তুমি এখনো সেই পুরোনো কথা ধরে বসে আছো? (আব্বু)
.
---- আমি কোনো কথা শুনতে চাইনা আহসান! তুই বলেছিলি অনন্যা ছোট তাই সময় নিবি। সেই হিসেবে আজ নিয়ে দু বছর পেরিয়ে গিয়েছে। ও এখন ১৯ বছর বয়সে পা দিয়েছে। সেই হিসেবে এখন ওর বিয়ের বয়সও হয়েছে। (দিদুন)
.
---- সবই ঠিক আছে আম্মা, কিন্তু মেয়ের ওতো একটা মতামত আছে। আমরা তো মেয়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনো কিছু করতে পারিনা। (আম্মু)
.
---- বেশ তো! অনন্যাকে ডেকে পাঠিয়েছি আমি। ও আসুক তবেই ওর কাছে মতামত নেওয়া হবে। তাছাড়া ওর মতামতে তেমন কিই বা যায় আসবে? পরিবার থেকে যেখানে বিয়ে দেওয়া হবে মেয়ে তো সেখানেই বিয়ে করতে রাজি হয়ে যাবে। এতে এতো ভাববার কিছুই নেই। আমি চাই এই মাসেই বিয়েটা সেরে ফেলতে। মামুনের বয়সও তো কম হলো না! বিয়ে তো করতে হবে!
.
---- অনন্যা তো শহরে মানুষ হয়েছে মা! ও কি করে এখানে খাপ খাইয়ে নেবে বলো?
.
---- সমস্যা নেই। ব্যবসা শহরে থেকেও করা যাবে। বরং তার থেকে ভালোই হবে। এখান থেকে মাসুম সামলাবে। শহর থেকে মামুন মাছগুলো জায়গা মতো পৌঁছে দেবে। দরকার হলে বাড়ি ভাড়া নিয়েই থাকবে বগুড়ায়! তাছাড়া মামুন উচ্চশিক্ষিত! এর পরেও কোনো আপত্তি থাকার কথা না।
.
---- কিন্তু.....!
.
---- আর কোনো কিন্তু না! আমি যেটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি সেটাই ধার্য্য করা হবে! এর ওপর কোনো কথা নয়! আমি তোর সাহস দেখে অবাক হচ্ছি আহসান, তুই আমার ছেলে হয়ে আমায় না জানিয়ে বাসায় পাত্রপক্ষকে ডেকেছিস! আর দেড়ি করতে রাজি নই আমি।
.
দিদুনের কথার ওপর আর আম্মু আব্বু কিছু বলার সাহস পেলো না। ঠিক সেই সময়ই আমি আর মামুন ভাইয়া গিয়ে হাজির হলাম দিদুনের ঘরের সামনে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুক ফুলিয়ে সাহস নিয়ে ধীর পায়ে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দিদুনকে উদ্দেশ্য করে বললাম,
.
---- দিদুন, আসবো?
.
---- এসো....।
.
দিদুনের অনুমতি পেয়ে ঠোঁট কামড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম আমি। আমার পেছন পেছন প্রবেশ করলো মামুন ভাইয়াও।
ভেতরে যেতেই দেখলাম আম্মু আব্বু দুজনেই উপস্থিত! আম্মু আব্বুকে দেখে একটু স্বস্তি ফিরে পেলাম। আস্তে করে আম্মুর পাশে বসতেই আম্মুর মুখটা মলিন হতে দেখে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো আমার। এক অজানা ভয় এসে হানা দিলো আমার মনে কোণে! তবে কি খুব খারাপ কিছু হতে চলেছে? তবে কি সেটা?
.
দিদুন আমাদের বসিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলা শুরু করলো,
---- মামুন, অনন্যা! তোমাদের দুজনের উদ্দেশ্যে কিছু কথা আছে আমার! আর আমি তোমাদের নিয়ে যে সিদ্ধান্তটি নিয়েছি তা অবধারিতই! তবুও যেহেতু ব্যাপারটা তোমাদের নিয়েই তাই তোমাদের ডেকেছি। এখন আমি যা যা বলছি তা মন দিয়ে শুনো! সে হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করো!
.
একটু থেমে দিদুন আবারও বলতে শুরু করলো,
---- তোমাদের দুজনেরই বয়স হয়েছে। বলা যায় তোমরা বিয়ে করার উপযুক্ত বয়সে পা দিয়েছো!
মামুন যদিও একটু হলেও অবগত এই ব্যাপারে তবে অনন্যা তুমি বিষয়টা জানো না। অনেক আগে থেকেই তোমার আর মামুনের বিয়ে ঠিক করে রেখেছি আমরা! শুধু অপেক্ষা ছিলো তোমাদের উপযুক্ত হওয়ার! আর এখন তোমরা সেই নির্দিষ্ট সময়ে পা রেখেছো!
যেহেতু অপরিচিত কাউকে বিয়ে করতে বলছি না আমি তোমাদের। আমার মনে হয় না তোমাদের দুজনের মধ্যে কারোও কোনো আপত্তি থাকতে পারে।
.
---- কিন্তু আমার আপত্তি আছে দিদুন!
.
পেছন থেকে কারোও গলা পেয়ে হকচকিয়ে উঠে পেছন ফিরে তাকালাম আমরা সবাই! নীবিড় ভাইয়াকে এই মুহূর্তে দেখে আমার খুশি হওয়ার কথা তবুও নিজেকে কেমন যেনো অনুভূতি শুণ্য বলে মনে হচ্ছে আমার। আমি শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখছি সবাই কে! কি হচ্ছে আমার সাথে? আর পরবর্তীতেই বা কি হবে? নীবিড় ভাইয়া কিভাবে হ্যান্ডেল করবে সবকিছু? আগের বার নাহয় নিত্য আপু ছেলেপক্ষকে বুদ্ধি করে তাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু এবার?
আমার মাথাটা কেমন যেনো ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। সব কিছু ঘোলাটে লাগছে আমার।
.
নীবিড় ভাইয়া ধীর পায়ে ঘরে প্রবেশ করে দিদুনের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। দিদুন নিজের ঘরে কাউকে এভাবে প্রবেশ করায় রেগে গিয়ে নিজেও দাঁড়িয়ে পড়লেন সাথে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো আম্মু আব্বু আর আর মামুন ভাইয়াও!
দিদুন কড়া গলায় নীবিড় ভাইয়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
.
---- তার মানে তুমি দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে সব কথা শুনেছো! তুমি এর মাঝে বলার কে?
.
নীবিড় ভাইয়া তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে আমায় টান দিয়ে দাঁড় করিয়ে একহাত দিয়ে কোমড় জড়িয়ে ধরলেন। আমায় নিজের সাথে লাগিয়ে রেখেই বলে উঠলেন,
---- বা রে! আমার বউয়ের আবারও বিয়ে নিয়ে কথা উঠছে সেখানে বুঝি আমার আপত্তি থাকবে না?
.
নীবিড় ভাইয়ার কথা আব্বু হতবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন,
---- নীবিড়, অনু তোর বউ মানে?
.
তখনই আম্মু আব্বুকে থামিয়ে দিয়ে মাথাটা নিচু করে বললো,
---- বাবুই ঠিকই বলছে, অনন্যা আর নীবিড় বিবাহিত! তারা একে অপরের স্বামী-স্ত্রী!
.
আব্বু যেনো আম্মুর কথায় আকাশ থেকে পড়লো, উত্তেজিত হয়ে আব্বু জিজ্ঞেস করলো,
---- কিভাবে???
.
নীবিড় ভাইয়া আমায় ছেড়ে দিয়ে আব্বুর এক হাত নিয়ে দুহাতের মুঠোয় নিয়ে উনি বলতে শুরু করলেন,
---- হ্যাঁ বাপী! মামনি ঠিকই বলছে। আর তোমার বাকি প্রশ্নের জবাব আমিই দিচ্ছি!
.
একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ছেড়ে উনি আবারও বলতে শুরু করলেন,
---- এটা সেদিনের পরেরদিনের ঘটনা, যেদিন আমরা নিত্য আর অগ্নির এনগেজমেন্টের ডেট ফাইনাল করে চলে গিয়েছিলাম! ওই দিন ভার্সিটিতে রাত্রি যায়নি, আর শেষ ক্লাসও হয় নি অনন্যাদের। তাই ও একাই বাড়ি ফেরার পরিকল্পনা করে ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে পড়ে। আর ওকে একা পেয়ে সেই সুযোগেই তুলে নিয়ে যায় ভার্সিটির দুজন ছেলে! আগে থেকে অনন্যার পেছনে ঘুরে বেড়াতো সিফাত! ওদের বিরক্ত করার জন্য আমি শাসিয়েও ছিলাম কিন্তু সে শুধরোয় নি বরং এমন একটা সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলো সে।
সেদিন ক্লাসের বাহিরে ফার্স্ট ইয়ারের স্টুডেন্ট দের টাইমের আগেই বেরোতে দেখে আমিও অনন্যার খোঁজে বেরিয়ে পরি। আর ঠিক তখনই এক জুনিয়রের কাছে জানতে পারি কেউ বা কারা অনন্যাকে গাড়িতে অজ্ঞান করে উঠিয়ে নিয়ে চলে গিয়েছে! আমি আর বিন্দুমাত্রও অপেক্ষা করিনি। জিপিএস থেকে লোকেশন ট্রাক করে গন্তব্যে পৌঁছেই অনন্যাকে অনেক খোঁজার পর একটা ঘরে আবদ্ধ অবস্থায় পাই। ছেলেগুলোকে মেরে রক্তাক্ত করে ফেলি আমি রাগের বশে। কিন্তু অনন্যাকে নিয়ে ফেরার পথে শেষরক্ষা আর হয় নি, গ্রামের কয়েকদল লোক আমাদের খারাপ উদ্দেশ্যের লোক ভেবে জোর জবরদস্তি বিয়ে দিয়ে দেয়!
তার পরেই অগ্নিরা এসে উপস্থিত হয় কিন্তু ততক্ষণে যা হবার তা হয়েই গিয়েছে।
.
বলেই আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকালেন নীবিড় ভাইয়া! আব্বু স্তব্ধ হয়ে ধপ করে বিছানায় বসে পড়লো! আম্মু আব্বুকে ধরে বলে উঠলো,
---- আমিও এসব জানতাম না আহসান। তবে এখানে আসার আগের দিনই নীবিড় আমায় সব খুলে বলেছে! প্রথমে আমি ব্যাপারটা নিতে না পারলেও পরে ভেবে দেখেছি! এর থেকে খারাপ ও তো কিছু হতে পারতো তাইনা? যদি নীবিড় সময় মতো সেখানে না পৌঁছাতে পারতো তবে আমাদের মেয়েটার কি হতো তা ভাবলেও আমার গায়ে কাটা দিয়ে ওঠে! আর বিয়েটা তো যার তার সাথেও হয়নি। আমাদের বাবুইয়ের সাথেই হয়েছে। তুমি প্লিজ ভেঙে পড়ো না!
.
আব্বু আম্মুর হাত ধরে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে পর মুহূর্তে মাথা তুলে তাকিয়ে ধীর কন্ঠে বলে উঠলো,
---- তুমি হয়তো ঠিকই বলছো অনামিকা! যেভাবেই হোক ওদের বিয়েটা হয়েছে! এটা আমাদের মেনে নিতে হবে।
.
---- কিচ্ছু মানতে হবে না কাউকে। সমস্যা যেহেতু হয়েছে তার সমাধানও রয়েছে! (দিদুন)
.
দিদুনের কথা চমকে উঠলাম সবাই! আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ছলছল চোখে দিদুনের দিকে তাকাতেই দিদুন বলতে শুরু করলো,
---- হয়তো বিয়েটা হয়েছে তবে ভূল বশত হয়েছে। যেমন বিয়ে হয়েছে তেমন বিয়ে ভাঙার পদ্ধতিও রয়েছে। আর তাছাড়া ওদের মধ্যে স্বামী স্ত্রীর কোনো সম্পর্ক নেই।
.
দিদুনের কথা শেষ হতেই নীবিড় ভাইয়া আমার বা হাত নিজের ডান হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে দিদুনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন,
---- তা হয়তো আছে দিদুন, তবে আমি তো অনন্যাকে ছাড়বো না। যে কোনো মূল্যে হোক ওকে আমি ছাড়ছি না।
.
দিদুন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নীবিড় ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে মুখে হাল্কা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বললেন,
---- বেশ তো! তবে আগে প্রমাণ করো তুমি অনন্যার যোগ্য! শুধু টাকা-পয়সা, গাড়ি-বাড়ি আর সুন্দর চেহারা থাকলেই সব হয় না। তুমি কি রাজি?
যদি আমার শর্তে হেরে যাও তবে অনন্যাকে তালাক দিতে হবে তোমায়।
.
নীবিড় ভাইয়া বুক ফুলিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে আমার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে উঠলেন,
---- আমি রাজি! যতটা কঠিন পরীক্ষাই দিতে হোক না আমায় আমি দেবো!
.
নীবিড় ভাইয়ার উত্তরে দিদুন রেগে গেলেন না বরং এক রহস্যময়ী হাসি হেসে "কাল থেলে তোমার পরীক্ষা শুরু হবে। ঘরে যেতে পারো। যেটুকু সময় পাচ্ছো বিশ্রাম করে নাও!" বলেই দিদুন নিজের চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজে ফেললেন।
আমি এতোক্ষণ শুধু রোবটের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিলাম। মুখ ফুটে কিছু বলবার শক্তিই যেনো হারিয়ে ফেলেছিলাম আমি। হয়তো বলতে চাচ্ছি অনেক কিছুই কিন্তু বলা হয়ে উঠছে না। কথাগুলো মুখ নিসৃত হবার পূর্বেই গলায় এসে জোট পাকিয়ে যাচ্ছে।
.
মামুন ভাইয়া দিদুনের কথা শেষ হতেই মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেলেন। আম্মু আব্বু আমাদের নিয়ে দিদুনের ঘরের দরজা চাপিয়ে দিয়ে চিন্তিত মুখ নিয়ে নীবিড় ভাইয়ার দিকে তাকালো।
দরজার বাহিরে বেরোতেই নিত্য আপু, রাত্রি,রুশো ভাইয়া আর অগ্নি ভাইয়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম আমি। তার মানে এতোক্ষণ ওরা ভেতরের সব কথাই শুনেছে!
.
আম্মু নীবিড় ভাইয়ার মাথায় একবার আর আমার মাথায় একবার হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে উঠলো,
---- জানি না আম্মা ঠিক কোন কঠিন পরীক্ষায় ফেলছে তোদের! সফল হোস বাবুই!
.
নীবিড় ভাইয়া মুচকি হেসে আম্মুকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
---- তোমরা পাশে থাকলে আর কিছু চাইনা মামনি! আমাদের জোড়া তো ওই উপর থেকে সেটিং করা আছে। দিদুনের এই ছোট খাটো পরীক্ষায় ফেইল করবো না আমি। ডোন্ট ওয়ারি!
.
🍁
.
রাত ২ টা বেজে ১৬ মিনিট....
আমার চোখে ঘুমের টিকিটিও নেই! সারারাত টেনশন আর কথা বলতে বলতেই নিত্য আপু আর রাত্রি একটু আগেই ঘুমিয়ে পরেছে। তবে শুধু ঘুমোতে পারিনি আমি! অদ্ভুত সব ভাবনা এসে জমে যাচ্ছে মনে কোঠায়। নিজেকে বড্ড অসহায় লাগছে আমার। এ কোন গোলকধাঁধায় বসবাস করছি আমি? যেথায় নেই আমার কোনো হস্তক্ষেপ নেই কোনটা স্বইচ্ছে!
আমি আর ভাবতে পারছিনা। প্রকৃতির হাওয়াটা গায়ে মাখানোর বড্ড প্রয়োজন এখন। যদি পারতাম কোনো কিছুর বিনিময়ে নিজের সব দুশ্চিন্তা, মন খারাপের কারণ ধুয়ে মুছে খিলখিল করে হাসতে তবে তাই করতাম।
.
ছিমছাম দোতলা পেড়িয়ে ছাদের সরু পথে একপা দুপা করে এগিয়ে যাচ্ছি! সচরাচর এতো রাতে একা একা কোনোকালেই আমার সাহস হয় না ছাদে আসার। তবে আজ যেনো কোনো ভয়ই কাজ করছে না মনের ভেতর।
.
ছাদে যেতে এক নীরব, স্থির ছায়াকে আবিষ্কার করলাম আমি। সেই ছায়া মানবটি উল্টো দিকে ঘুরে ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আকাশ পানে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে। নিশি রাতের হিমেল হাওয়ায় তার অবাধ্য চুল গুলো ঢেউ খেলিয়ে উড়ছে! চাঁদের আলোয় তার শরীরে এক অদ্ভুত রূপ এসে ভর করেছে।
সেই ছায়া মানবটিকে চিনতে আমার বেশি বেগ পেতে হলো না। নিজের সবথেকে আপন মানুষটাকে না চিনলে আপন কথাটা নিতান্তই বেমানান!
.
ধীর পায়ে আমার সেই ছায়ামানবের পেছনে গিয়ে ঘাড়ে হাত রাখতেই অস্ফুট সুরে মৃদু আওয়াজে বলে উঠলেন,
---- এখনোও ঘুমোও নি?
.
সাথেসাথেই চমকে উঠলাম আমি। না দেখেই চিনলন কিভাবে আমায়? তবে কি উনি আগে থেকেই বুঝতে পেরেছেন আমার অস্তিত্ব?
উনি আকাশের পানে চেয়েই মুচকি হেসে বলে উঠলেন,
---- তুমি এসেছো আর আমি বুঝবো না তা কি করে হয়?
.
আমি উনার প্রশ্নের কোনো জবাব দিলাম না। বরং আমার দৃষ্টি তো উনার সেই মায়াবী চোখে। যেথায় উনার ব্যথিত নোনাজলগুলো জমাট বেঁধে চিকচিক করে উঠছে।
তবে কি উনি কাঁদছেন? কিন্তু কেনো?
.
---- একি আপনি কাঁদছেন?
.
উনি কোনো উত্তর না দিয়ে আচমকাই পেছনে ফিরে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন আমায়। আমার ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিয়ে চাপা কন্ঠে বলে উঠলেন,
---- আমায় ছেড়ে যাবে না তো অনন্যা?
.
.
.
চলবে..................💕