#প্রেম_আমার♥
#পার্ট-৫০♥
#Ayanaa_Jahan(Nusraat)♥
.
🌺
.
দীর্ঘ ১ ঘন্টার জার্নি করার পর তবে আমরা পৌঁছোলাম নির্দিষ্ট গন্তব্য মহাস্থানগড়ে! ১০ টার দিকেই বেড়িয়েছি বাড়ি থেকে। গ্রাম থেকে শহরে আসতে লেগেছে ৩৫ মিনিট। আবার শহর থেকে উত্তরে ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক ধরে ১৩ কিলোমিটার পথ সিএনজি করে আসতে লেগে গেলো ২৫ মিনিট। যদিও এতো বেশি সময় লাগতো না তবে রাস্তায় জ্যাম থাকায় একটু বেশিই দেড়ি হয়ে গিয়েছে।
.
সিএনজিতে ড্রাইভার সহ সিট থাকে মোট ৬ টা! সামনে ড্রাইভারের সিট সহ তিনটে মানুষের বসার জায়গা থাকে আর পেছনে তিনটে মানুষের বসার মতো ক্যাপাসিটি থাকে। পুরো সিএনজি একেবারে রিজাভ করার জন্য ভাড়া পড়ে মিনিমাম ১৪০ টাকা!
.
সে হিসেবে সবই ঠিক ছিলো কিন্তু বিপত্তি বাধলো জনসংখ্যা নিয়ে। ড্রাইভার ছাড়াই আমরা জনসংখ্যায় মোট ৬ জন। এখন পুরো সিএনজি রিজাভ নিলেও ড্রাউভার কে তো আর ফেলে রেখে যাওয়া যাবে না তাই ভীষণ ভাবনার মধ্যে পড়তে হয়েছিলো আমাদের। তবে ভাবনাটা বেশিক্ষণ ভাবতে হয়নি। যখন কোনো উপায় নজরে পড়ছিলো না আমাদের তখন অগ্নি ভাইয়া চট করে রুশো ভাইয়াকে নিজের কোলে বসিয়ে ড্রাইভারের বাম পাশের সিটে উঠে পড়ে। রুশো ভাইয়া লজ্জায় কোলে বসবে না বলে লাফালাফি করলেও শেষমেশ আমাদের ঠোঁট উল্টে থাকা অসহায় মুখ দেখে চুপচাপ গুটিশুটি মেরে অগ্নি ভাইয়ার কোলে বসে এসেছে। এমনি সময় ভাইয়ার কোলে বসার সুযোগ মিস করতে চাইতো না রুশো ভাইয়া তবে আজ ইতস্তত বোধ করছে শুধুমাত্র রাত্রির জন্য। রাত্রির সামনে নিজেকে একটা বাচ্চা প্রমাণ করতে ভুলক্রমেও রুশো ভাইয়া চায়নি কোনো কালেই তবুও একপ্রকার বাধ্য হয়েই আজ নিজের মান-সম্মানের ফালুদা বানিয়ে অগত্যাই ভাইয়ার কোলে চেপে বসে আসতে হলো রুশো ভাইয়ার!
পুরো রাস্তা এই নিয়ে রাত্রি আর আমি একটু পর পরই ফিক করে হেসে উঠছিলাম আর এদিকে লজ্জায় কান্না করে দেবার মতো অবস্থা ছিলো রুশো ভাইয়ার।
.
অগ্নি ভাইয়া তো আরোও একটু মজা নেবার জন্য "আলে লে লে...! বাচ্চা এতো নড়াচড়া করে না। পড়ে যাবে তো! চু চু চু....!" বলে দিব্যি খিল্লি উড়িয়ে গিয়েছে রুশো ভাইয়ার। কি একটা অবস্থা! মাঝখান থেকে নিত্য আপু আর নীবিড় ভাইয়া ছিলেন চুপা রুস্তম! ভেতরে ভেতরে হাসির পাটাকা ফুটিয়ে বাইরে থেকে একদম ফিটফাট টাইপ হয়ে বসে এসেছে পুরো রাস্তা। তাদের মতে যদি আমাদের সাথে তারা নিজেরাও রুশো ভাইয়াকে নিয়ে মজা নেয় তবে রুশো ভাইয়া বোধহয় লজ্জায় আইসক্রিমের মতো গলেই পরে যাবে।
.
অবশেষে সিএনজি এসে স্পটের পাশের স্ট্যান্ডে থামতেই এক লাফ মেরে নেমে গেলো রুশো ভাইয়া। বুক ভরে একটা তীব্র শ্বাস টেনে শান্ত হলো তবে। আর রুশো ভাইয়া নামতেই অগ্নি ভাইয়া নিজের ঝিম ধরা পা ধরে " ইয়ায়ায়া...!ইইই উউউ....! করে আর্তনাদ শুরু করে দিলো৷ রুশো ভাইয়াকে নিজের কোলে বসিয়ে ২৫ মিনিটের রাস্তা একটানা একই ভাবে বসে থাকতে থাকতে পা অবশ হয়ে গিয়েছিলো অগ্নি ভাইয়ার! রুশো ভাইয়া নামতেই সেই অবশ ছেড়ে গিয়ে ঝিঝির রূপ নিয়েছে পা দুটোয় তার। নীবিড় ভাইয়া অগ্নি ভাইয়ার এমন করুন অবস্থায় ইচ্ছে করে দাঁত কেলিয়ে আস্তে করে টোকা মেরে দিচ্ছেন ভাইয়ার পায়ে। সাথেসাথেই গলা ছেড়ে দিয়ে তীব্র কম্পাংক বিশিষ্ট শব্দে চেঁচিয়ে যাচ্ছে অগ্নি ভাইয়া। বিস্ফরিত চোখে নীবিড় ভাইয়ার দিকে তাকালেও নড়াবার অবস্থায় নেই। অগ্নি ভাইয়ার বর্তমান মনোভাব "খালি পা তা ঠিক হোক, তোরে আজকে খাইছি!" কিছুটা এরকম টাইপ!
.
আমার মতে মহাস্থানগড় পাহাড়পুর টাইপই হবে। আর এসে দূর থেকে যতটুকু বোঝা যাচ্ছে তাতে দেখতে অনেকটা পাহাড়পুরের মতো হলেও ভিন্নতা রয়েছে বেশ! সবাই মিলে সিএনজির ভাড়া চুকিয়ে হাটা ধরলাম মহাস্থানের সেই নগরীতে।
মহাস্থানগড় দেশের অন্যতম প্রাচীন পুরাকীর্তি। প্রসিদ্ধ এই নগরী দেশের ইতিহাসে পুণ্ড্রবর্ধন বা পুণ্ড্রনগর নামে পরিচিত ছিলো। ইভেন এই মহাস্থানগড়ই নাকি একসময় বাংলার রাজধানী ছিলো।
.
আকাশে আজ কোনো মেঘ নেই৷ আছে শুধু সূয্যিমামার রাজত্ব। রোদের তীব্রতায় জ্বলজ্বল করছে প্রকৃতি। সাথে মাথা থেকে হয়তো বা কয়েকশ ফুট ওপরে ঘুরছে চিল। পরিবেশ সেজেছে আজ নিজের মনমাতানো রূপে তবে এই রূপ আমার শরীরে সাথে ঠিক কতটা খাপ খাওয়াবে তা আধঘন্টা না পেরোলে বোঝা যাবে না।
.
🍂
.
যাত্রা শুরুর প্রথমেই মহাস্থানগড়ের যেই নিদর্শনটা চোখে পড়লো তা হলো হযরত মাহিসাওয়ার (রহঃ) এর মাজার। এই মাজারের সম্পর্কে আমার বিশেষ কিছু ধারণা নেই। আমি রুশো ভাইয়ার হাত ঝাঁকিয়ে এই মাজার সম্মন্ধে জিজ্ঞেস করতেই রুশো ভাইয়া ঠোঁট উল্টালো। যা জানান দিলো রুশো ভাইয়ারও এই সম্পর্কে জ্ঞানের ভান্ডার শূণ্য। নীবিড় ভাইয়া রুশো ভাইয়ার রিয়াকশন দেখে মুচকি হেসে বলতে শুরু করলেন,
.
---- হযরত মাহিসাওয়ার এর পুরো নাম হলো শাহ সুলতান বলখী মাহিসাওয়ার (রহঃ)।
এই মহাপুরুষ ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে সূদুর বল্লখদেশ থেকে মহাস্থানগড়ে আগমন করেন। এখানে এসে হিন্দু রাজা পরশুরাম কে পরাজিত করেন এবং ইসলাম ধর্ম সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।
.
অগ্নি ভাইয়া নীবিড় ভাইয়ার কাঁধে হাত রেখে বললো,
---- আরে বাহ! তুই তো অনেক কিছু জানিস!
.
ওমনি নীবিড় ভাইয়া অগ্নি ভাইয়ার পেটে হাতের কুনুই দিয়ে গুঁতো মেরে বললেন,
---- তোর থেকে কমই জানি।
.
মাজারের ভেতরে মেয়েদের প্রবেশ নিষিদ্ধ সেহেতু ভাইয়ারা আর কেউ ভেতরে ঢুকলেন না। মাজার ছেড়ে এগিয়ে চললাম আমরা জিয়ৎ কুন্ডের দিকে। জিয়ৎ কুন্ড মূলত একটা কূপ। কূপটা আকারে বেশ বড়। একটু হেলে নিচে তাকাতেই তার গভীরতা দৃশ্যমান হলো সবার। গভীরতা বর্তমানে অনেক কমই। টুপ করে দেয়ালের ইটগুলোতে পা রেখে নামা যাবে। আবার টুপ করেই ওঠা যাবে।
জিয়ৎ কুণ্ডের পাশেই বড় একটা সাইনবোর্ড লাগানো যেখানে এর ইতিহাস সম্মন্ধে বর্ণনা করা আছে। কিন্তু এই রোদেলা দুপুরে ইচ্ছে হলো না কারো চোখ লাগিয়ে খুঁটিয়ে খঁুটিয়ে লেখাগুলো পড়বার। নীবিড় ভাইয়া আমাদের সবার অলসতা দেখে বলতে শুরু করলেন,
.
---- এটা রাজা পরশুরামের আমলেরই একটি কূপ। কথিত আছে এই কূপের পানি পান করে রাজার আহত সৈন্যরা সুস্থ হয়ে যেতো। এই কূপের পানি দ্বারা মরা মানুষ জীবিত করা হতো বলে এর নাম দেওয়া হয়েছে জিয়ৎ কুন্ড!
.
রাত্রি নীবিড় ভাইয়ার কথা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো,
---- মরা মানুষ আবার জিন্দা হতো? সত্যি?
.
নীবিড় ভাইয়া মুচকি হাসলেন, আবারও বললেন,
---- এরকম টা শুধু শুনা যায়।
.
🌸
.
হাটতে হাটতে ক্লান্ত হয়ে আমরা অবশেষে চলে এলাম গোকুল মেড়। গোকুল মেড় এর আরেক নাম নাকি বেহুলার বাসর ঘর। বলা যায় এটা বগুড়ার শহরে টুরিস্ট স্পট গুলোর মধ্যে সবথেকে বেশি পাবলিক চয়েজ টুরিস্ট স্পট।
বলতে গেলে মহাস্থানগড়ের মেইন স্পট এই গোকুল মেড় ই।
.
আমাদের টিকিট কাউন্টারের পাশেই দাঁড়াতে বলে ভাইয়ারা গেলো টিকিট কাউন্টারে টিকিট কিনতে। আমি ঘুরে ঘুরে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছি জায়গা গুলোতে। কতো সুন্দর সবুজে ঢাকা মাঠ-প্রান্তর। রাস্তার ওপর দিয়ে শা শা করে চলে যাচ্ছে একটা দুটো বাইক। রাস্তার ওপারে রয়েছে ধান ক্ষেত। বর্তমানে তাতে বৃষ্টির পানি জমাট বাঁধা। আমার কাছে এই গোকুল মেড় টাকে অনেকটা পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসাবশেষ এর মতোই লাগছে। দূর থেকে হয়তোবা ১৫ ফুট কি সামথিং এরকমই উঁচু বলে মনে হচ্ছে। এদিকে নিত্য আপু আর রাত্রি সেলফি তোলায় ব্যস্ত। নিত্য আপু যদিও ছবি তুলতে খুব একটা পছন্দ করে না কিন্তু রাত্রির জন্য একপ্রকার বাধ্য হয়েই তুলতে হচ্ছে আপুকেও।
.
হঠাৎ কাউন্টার থেকে চেঁচামেচির আওয়াজ আসতেই ভাইয়াদের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম আমরা। নীবিড় ভাইয়া কাউন্টারের লোকটাকে কিছু একটা বলছেন আর এদিকে রুশো ভাইয়া চেঁচিয়ে বলছে,
.
---- হেই আমি বাংলাদেশি! আম নট এনি ফরেইনার মিনি হাতি!
.
মাঝখানে অগ্নি ভাইয়া রুশো ভাইয়াকে চেপে ধরে রয়েছে। ব্যাপারখানা আমার এই ছোট্ট মাথায় ঢুকতে চাইছে না কোনো মতেই। তাই আমি অগ্নি ভাইয়ার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
.
---- কি হয়েছে রে ভাইয়া?
.
অগ্নি ভাইয়া আমায় কাউন্টারের সাইনবোর্ডের দিকে তাকাতে ইশারা করলো। আমিও বাধ্য মেয়ের মতো সাইনবোর্ডে তাকালাম। ব্লু রঙের সাইনবোর্ডে সাদা রঙের কালিতে বোল্ড করে লেখা আছে,
" প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর
গোকুল মেড় (বেহুলার বাসর ঘর)
বুকিং কাউন্টার/Booking counter
প্রবেশ মূল্য/Entrance Fee
দেশী টা : ২০৳
মাধ্যমিক স্তর শিক্ষার্থী : ৫.০০ ৳
FOREIGNER TK : 200.00 ৳
SAARC COUNTRY TK : 100.00৳ "
.
এতোক্ষণে বুঝলাম আসল কাহিনী! তার মানে টিকিট কাউন্টারের লোক রুশো ভাইয়াকে ফরেইনার ভাবছে। অবশ্য ভাইয়াকে ফরেইনার ভাবাও অস্বাভাবিক কিছুই না। রুশো ভাইয়াকে দেখে ফার্স্টলি যে কেউ হয় কোরিয়ান নয়তো থাই ভাববে। রুশো ভাইয়া দেখতেই এমন। না আছে দাড়ি আর না আছে গোপ। ফর্সা গায়ের রং সাথে চুল, ভ্রু, চোখের মনি সবই ব্রাউন কালারের। ঠোঁট বাচ্চাদের মতো গোলাপি। চুলগুলো কোরিয়ান দের মতোই কাট দেওয়া। পুরো কপালের সাথে লেপ্টে থাকে।
কিন্তু ভাষা শুনেও কি বুঝতে পারছে না এই লোকটা যে রুশো ভাইয়া বাংলাদেশিই!
.
---- এই ভাইয়া, লোকটা কি মাথামোটা নাকি যে রুশো ভাইয়ার মুখে স্পষ্ট বাংলা শুনার পরও ফরেইনার ভাবছে?
.
অগ্নি ভাইয়া চোখমুখ কুঁচকে বললো,
---- সব ফরেইনাররা বাংলা বলতে পারেনা এমনটাও তো না। ওরা প্রমান হিসেবে আইডেন্টিটি কার্ড চাচ্ছে। কিন্তু সেটা তো রুশো বাসায় ই ফেলে এসেছে।
অগ্নি ভাইয়ার কথায় কিছুক্ষণ চুপ থেকে চট করে ফোনটা বের করে গ্যালারি তে ঢুকলাম আমি। তার মধ্যে একটা ফটো ক্রিনে বের করে টিকিট কাউন্টারের লোকটাকে দেখে নিতে বললাম।
বর্তমানে সবাই আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। লোকটা ছবিটা দেখে নিয়ে জ্বিবে কামড় দিয়ে বললো,
.
---- সরি ম্যাম, সরি স্যার। আমি আসলে বুঝতে পারিনি। তাছাড়া উনাকে দেখে ফরেইনারই লাগে তাই আর কি।
.
আমি মুখ বাকিয়ে " ইটস ওকে " বলে নীবিড় ভাইয়াকে ইশারা করলাম ২০ টাকা দড়েই ৬ টা টিকিট কিনে নিতে। নীবিড় ভাইয়া আমার কথামতো বিল মিটিয়ে টিকিট নিলেন।
আমার কাছে এসে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
.
---- কিসের ছবি দেখালে যে ব্যাটা একেবারেই বুঝে নিলো?
.
আমি মুচকি হেসে ফোনটা উনার সামনে ধরতেই উনি বললেন,
---- রুশোর আইডেন্টিটি কার্ডের ছবি তোমার ফোনে কেনো?
.
আমি একটু ভাব নিয়েই বললাম,
---- সাবধানতা অবলম্বনের জন্য ভাইয়াদের আইডি কার্ডের ফটোগ্রাফস রেখে ছিলাম। যদি কখনো কাজে লাগে এই ভেবে। আর আজ কি সুন্দর করে কাজে লেগে গেলো দেখলেন।
.
উনি আমায় ব্যঙ্গ করে বললেন,
---- যাক, যতোটা অপদার্থ তোমায় ভেবেছিলাম ততোটাও অপদার্থ তুমি নও।
.
বলেই উল্টো দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন উনি।
"ফলো মি!" বলে গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে এগোতে লাগলেন। রুশো ভাইয়া আমার নাক টেনে দিয়ে বললো,
---- থ্যাংকস ছুটকি!
ওই পেট মোটা ভূরি ওয়ালা টাক্কু কাক্কু আমায় হেনস্ত করতে এসেছিলো। জাস্ট ইমাজিন কর কতো সাহস টাক্কুর! ব্লা! চল ভেতরে যাই আমরা।
.
🌹
.
বর্তমানে আমরা দাঁড়িয়ে আছি গোকুল মেড়ের নিচে। আমাদের সামনে রয়েছে ইয়া বড় ইটের পাহার। দূর থেকে ১৫ ফুট ভেবেছিলাম, বাস্তবে এটা প্রায় ৪৫ ফুট উঁচু। তার গা ঘেষে লাগানো আছে এত্তো লম্বা সিঁড়ি। সিঁড়িটাকে নিচ থেকে একবার ওপরে দেখে নিতেই গলা শুকিয়ে এলো আমার। এই সিঁড়ি পুরোটা শেষ করার আগেই আমার জান বের হয়ে যাবে কিনা এই নিয়ে মনে রয়েছে এক গভীর সংশয়!
.
রুশো ভাইয়া একবার নিচ থেকে ওপরে চোখ বুলিয়ে ভ্রু কুঁচকে মাথা চুলকোতে চুলকোতে প্রশ্ন করলো,
---- আরিস'শাবাস এই এত্তো বড় পাহার বেহুলার বাসর ঘর ছিল? আর আমাদের বাসর ঘর স্রেফ একটা ছোট্ট ঘর হয়? দ্যটস নট ফেয়ার!
.
নীবিড় ভাইয়া রুশো ভাইয়ার বোকামিতে হেসে দিয়ে সামনে তাকিয়েই আমাদের সকলকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন,
---- বেহুলার কাহিনি সেন যুগেরও অনেক পূর্বের ঘটনা।বেহুলার বাসরঘর একটি অকল্পনীয় মনুমেন্ট! বর্তমান গবেষকদের মধ্যে এই মনুমেন্ট ৮০৯ থেকে ৮৪৭ খ্রিস্টাব্দের দেবপাল নির্মিত একটি বৈদ্যমত। এটা একচুয়ালি কোনো বাসর ঘর নয়। স্তুপটিতে আছে বাসর ঘরের প্রবাদ স্মৃতি চিহ্ন।
চলো উপরে যাওয়া যাক।
.
বলেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলেন উনি। রুশো ভাইয়া কিছু না বুঝে ঠোঁট উল্টে যেতে লাগলো। একে একে চলতে লাগলাম সবাই।
.
১০-১২ ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই বুঝতে পারলাম আমার গতির বেগ ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে। গায়ে শক্তি পাচ্ছিনা ঠিকমতো। ঠিক এই জন্যেই জার্নি, ঘুরাঘুরির নাম শুনলেই গলা শুকিয়ে আসে আমার। মহাস্থানগড় বগুড়ার মধ্যেই বলে দু বার না ভেবেই রাজি হয়ে গিয়েছিলাম আমি। কিন্তু শরীর আবারো তার খেলা দেখানো শুরু করলো। একে এতোক্ষণ হাটাহাটি তার ওপর সূর্যের তীব্র রোদ! সব মিলিয়ে এককথায় মাথা চক্কর দিয়ে উঠছে আমার।
.
আমার পাশে আছে রাত্রি। তার সামনে রুশো ভাইয়া, নিত্য আপু আর অগ্নি ভাইয়া। নীবিড় ভাইয়া তাদের এক সিঁড়ি ওপরে ওপরে হাটছেন। আমার গতি কমে যাওয়ার রাত্রি আনমনেই আমার থেকে কয়েক ধাপ এগিয়ে গেলো। অবসাদ অনুভব করায় একটু জিড়িয়ে নিতে থেমে গেলাম আমি। রুশো ভাইয়া আমি পেছনে আছি ভেবেই বলতে লাগলো, "ছুটকি তোর কি পানি লাগবে?" পেছন থেকে প্রতিউত্তরে কোনো জবাব না আসায় ভাইয়া সহ রাত্রি আর নিত্য আপুও পেছন ফিরে তাকালো। আমি ওদের থেকে কমপক্ষে ৫ কি ৬ টা সিঁড়ি নিচে। সবাইকে থেমে যেতে দেখে পেছন ফিরে তাকালেন নীবিড় ভাইয়াও। আমায় দাঁড়িয়ে হাপাতে দেখে একছুটে আমার কাছে নেমে এলেন উনি। কপাল কুঁচকে বললেন,
.
---- কি? গেলো তো পেট্রোল শেষ হয়ে? জানতাম আমি। তোমার দ্বারা কিচ্ছু হবে না। রুশো....! তোমার সাইড ব্যাগে পানির পট আছে দাও তো।
.
রুশো ভাইয়া মাথা নাড়িয়ে চট করে বোতলটা এগিয়ে দিলো নীবিড় ভাইয়ার হাতে। উনি বোতলটা নিয়ে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
---- পানিটা খেয়ে নাও।
.
উনার কথা শেষ হবার আগেই আমি ক্যাপ খুলে ঢকঢক করে পানি খেতে শুরু করে দিলাম। পুরো বোতল শেষ করে উনার হাতে ধরিয়ে দিয়ে শান্ত হয়ে নিয়ে বললাম,
---- আমি ঠিক আছি। চলুন!
.
উনি কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে থেকে হুট করে কোলে তুলে নিলেন আমায়। বাকিদের "আগা তোরা!" বলেই এক পা এক পা করে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলেন আমায় কোলে নিয়েই।
.
---- আরে আরে কি করছেন? নামান আমায়। হাটতে পারবো আমি।
.
উনি সামনে তাকিয়ে হাটতে হাটতেই ধমকে উঠলেন,
---- জাস্ট শাট আপ। আর একটা কথা বললে উপর থেকে টুপ করে নিচে ফেলে দেবো তোমায়।
.
উনার ধমক খেয়ে ঠোঁট চেপে ধরে গুটিশুটি মেরে থাকলাম উনার কোলেই। কেই বা যেচে নিজের বাচ্চাকালের জীবনটা কোমড় ভেঙে থাকতে চায়? তেমনই আমিও চাইনা।
.
রুশো ভাইয়া নীবিড় ভাইয়াকে আমায় কোলে নিয়ে হাটতে দেখে অগ্নি ভাইয়াকে ফিসফিস করে বলে উঠলো,
---- ছুটকির কি লাক রে ভাই! হেই ব্রো এখন আমাকে কোলে নাও না প্লিজ। আমি আর একদম লাফালাফি করবো না৷ ট্রাস্ট মি!
.
সাথেসাথেই অগ্নি ভাইয়া চোখ বড়বড় করে চেঁচিয়ে উঠলো,
---- নেহিইইইইইইইইই.........!
.
.
.
.
চলবে............💕