#প্রেম_আমার♥
#পার্ট-৫১♥
#Ayanaa_Jahan(Nusraat)♥
.
🌺
.
নীবিড় ভাইয়া আমায় নিয়ে উপরে উঠে আস্তে করে নামিয়ে দিলেন। উনার থেকে ছাড়া পেয়ে আড় চোখে চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিতে লাগলাম আমি। কিন্তু আশ্চর্যজনক ব্যাপার আমাদের দিকে কেউ তাকিয়েই নেই। বরং সবাই তাকিয়ে আছে সিঁড়ির দিকে। খটকা লাগায় আমি নিজেও সিঁড়ির দিকে তাকালাম। আর তাকাতেই আমার চোখ খুলে হাতে চলে আসার মতো অবস্থা!
.
অগ্নি ভাইয়া ক্লান্ত হয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে এক পা এক পা করে ওপরে উঠছে। আর ভাইয়ার পিঠে উঠে গলা জড়িয়ে ধরে দাঁত কেলিয়ে আছে রুশো ভাইয়া। অগ্নি ভাইয়া কোনোরকমে উপরে উঠতেই লাফ মেরে নেমে গেলো রুশো ভাইয়া। রুশো ভাইয়া নামতেই অগ্নি ভাইয়া পিঠ সোজা করতে যেয়ে "আম্মমায়ায়া রে....!" করে চিৎকার করে উঠলো রুশো ভাইয়া জিহ্বায় কামড় দিয়ে ধরে বললো,
.
---- এইরে! আমার ওয়েট কি বেড়ে গেলো নাকি!
.
অগ্নি ভাইয়া সোজা হয়ে ইটের ওপর বসে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রুশো ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
---- ৬২ কেজি ওজনের বস্তা পিঠে চাপিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠেছিস কোনো দিন? ভাই ঘাট হয়েছে আমার। আর ভুলেও তোকে কোনো দিনো কোলে বসাবো না।
.
রুশো ভাইয়া চোখ মুখ কুঁচকে ঠোঁট উল্টালো। পেছন থেকে হাসতে হাসতে হেলেদুলে পৌঁছোলো নিত্য আপু আর রাত্রি! অগ্নি ভাইয়াকে বসে হাঁপাতে দেখে নিত্য আপু আবারও এক গাল হেসে বলে উঠলো,
.
---- যা বুঝলাম আমার বাবা অনন্যার মতো কপাল নেই যে বরের কোলে চড়ে ঘুরে বেড়াবো! পায়ে ব্যথা হলে হুইলচেয়ারেই ঘুরে বেড়াতে হবে আমায়।
.
অগ্নি ভাইয়া নিত্য আপু কথায় চট করে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলো,
---- আরে আরে কি যে বলো না! তুমি তো কাগজের মতো হাল্কা। তোমাকে তো কোলে নিয়ে পুরো দুনিয়া ঘুরে বেড়াতে পারবো। ও লম্বা, তাই ওজন বেশি বুঝোনা?
.
নিত্য আপু চোখ ছোট ছোট করে বললো,
---- ওহ তার মানে আমি মোটা হয়ে গেলে আর কোলে তুলতে পারবে না এইতো?
.
অগ্নি ভাইয়া নিত্য আপুর কথায় থতমত খেয়ে গেলো। আমতাআমতা করে ভাইয়া বললো,
---- আরে না না! কোথায় তুমি আর কোথায় রুশো। ও পাতলা হয়েও ভারী। আর তুমি মোটা হলেও আমার কাছে কাগজের মতো হাল্কাই থাকবা। বিলিভ মি!
.
অগ্নি ভাইয়ার কথায় এতোক্ষণের চাপিয়ে রাখা হাসির ফোয়ারা বের হয়ে গেলো সবার। রুশো ভাইয়া হাসতে হাসতে অগ্নি ভাইয়ার কাধে হাত রেখে বললো,
---- কি ব্রো! তুমিও দেখি আজকাল লজিকহীন লজিক ক্রিয়েট করো!
.
অগ্নি ভাইয়া ভ্রু কুঁচকে রুশো ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে দাঁত দাঁত চেপে বলে উঠলো,
---- রুশো ফুশো! বদের হাড্ডিইইইই....! তোর লাফ মেরে পিঠে উঠার জন্য দেখ বউ বিয়ের আগেই ডিভোর্স দিচ্ছে।
.
বলেই তেড়ে রুশো ভাইয়ার পেছনে ছুট লাগালো অগ্নি ভাইয়া। ততক্ষণে রুশো ভাইয়া হাওয়া!
ওদের দৌড়াদৌড়ি দেখে নীবিড় ভাইয়া হাসতে হাসতে বললেন,
---- আবে পড়ে যাবি শালা! ছোটাছুটি অফ কর।
.
নীবিড় ভাইয়ার বলার পরও কারো কোনো রিয়াকশন হলো না। দুজনেই ছোটাছুটি করতে করতে হাপিয়ে গিয়ে একসময় হেসে ধুপ করে বসে পড়লো ঘাসের ওপর।
নীবিড় ভাইয়া কপাল কুঁচকে বললো,
---- ভালো কথা কানে যায়না না? দিলি তো বাকি এনার্জিও ফুরিয়ে। চল জলদি, এদিকটা ঘুরে ফিরে দেখা হলে জাদুঘরে যাবো।
.
অগ্নি ভাইয়া আর রুশো ভাইয়া কিছুক্ষণ বসে জিড়িয়ে নিয়ে উঠে পড়লো। এবার রওনা হলাম আমরা মহাস্থানগড় জাদুঘরের উদ্দেশ্যে।
.
🌹
.
বর্তমানে আমরা মহাস্থানগড় জাদুঘরে অবস্থান করছি। হাস্যকর হলেও আবারও আমায় কোলে করে গোকুল মেড় থেকে নামিয়েছেন নীবিড় ভাইয়াই। কিন্তু এবার রুশো ভাইয়া অগ্নি ভাইয়ার পিঠে লাফ মেরে উঠার সুযোগ পায় নি। রুশো ভাইয়ার থেকে ১০ টা সিঁড়ি পেছনে থেকে নেমেছে অগ্নি ভাইয়া। যাতে ভুলক্রমেও রুশো ভাইয়া লাফিয়ে পিঠে উঠতে না পারে।
.
জাদুঘরের প্রবেশ মূল্য আমাদের বিডি পর্যটকদের জন্য পরেছে ২০ টাকা বাবাদ! এখানেও ফরেইনারদের জন্য চার্জ বেশি। সার্কভুক্ত দেশগুলোর জন্য ১০০ ৳ আর সার্কভুক্ত বাদে দেশগুলোর জন্য ২০০ ৳।
সুঙ্গ থেকে মুসলিম আমলের ইতিহাস-ঐতিহ্যের স্বাক্ষী আজকের মহাস্থানগড় জাদুঘর। এই জাদুঘরে নাকি ওই আমলের ২ হাজার ৬৮৭ টি প্রত্নতত্ত্ব সংরক্ষিত রয়েছে।
সেসবেরই কিছু নিদর্শন দেখতেই জাদুঘরে আসা। শরীরটা ভালো লাগছে না তাই বেশি ঘুরাঘুরি করা হবে না মনে হচ্ছে। জাদুঘরের উত্তরে রয়েছে গোবিন্দ ভিটা। তাছাড়া আরো আছে খোদার পাথর ভিটা, শিলা দেবীর ঘাট, মহাস্থান রেস্তোরাঁ, মানকালীর কুণ্ডু ইত্যাদি।
.
জাদুঘরে ঘুরতে ঘুরতেই চোখে পড়লো কিছু পোড়ামাটির ফলক। যেখানে মানুষের অঙ্গ-ভঙ্গির ছবি লিপিবদ্ধ করা আছে। আরেক ফলকে রয়েছে হাতির চিত্র, তার আরেকটিতে রয়েছে সিংহের গর্জনরীত একটি চিত্র। তার পাশেই খেয়াল করলাম একটা মাটির চুলা! মাটিত চুলা খুব সাধারণ হলেও অদ্ভুতভাবে এই চুলাটা অন্য সব চুলার থেকে ভিন্ন।
.
নীবিড় ভাইয়া এখানকার স্থানীয় মানুষদের কাছে জিনিসগুলো সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ করে চলেছেন। রুশো ভাইয়া, অগ্নি ভাইয়া আর নিত্য আপু রৌপ্যমুদ্রাগুলো বেশ উৎসুক দৃষ্টিতে দেখছে। আর রাত্রি আমার সঙ্গে রয়েছে। আমরা পাশের সেলের কলসি গুলো সুক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করে চলেছি। একটার থেকে আরেকটা বড়! এভাবে সিরিয়ালি সাজানো আছে অনেকগুলো কলসি।
.
অবাক করা বিষয় হলো জাদুঘরে অনেক বিদেশি পর্যটকেরাও এসেছে। অথচ যেখানে বাঙালিদেরই ঐতিহাসিক স্থানগুলোর প্রতি ইন্টারেস্ট কম। এই জন্যেই বোধহয় রুশো ভাইয়াকেও কাউন্টারের লোকটা ফরেইনারই ভেবে নিয়েছিলো। 😅
নীবিড় ভাইয়া হঠাৎ সামনে থেকে পেছনে এসে আমাদের কাছে দাঁড়িয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমায় দেখে নিয়ে বলে উঠলেন,
.
---- শরীর খারাপ লাগছে?
.
বিনিময়ে আমি শুধু জোড়পূর্বক হেসে দু দিকে মাথা নাড়িয়ে না বোধক জবাব দিলাম। উনি আমার দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অগ্নি ভাইয়াকে একটু জোড়েই ডেকে বললেন,
---- অগ্নি....! লেইট হয়ে গিয়েছে অনেক। আবার বগুড়া থেকে সান্তাহার স্টেশন যেতে লাগবে। চল রওনা দেই।
.
---- আসছি....! আগা তোরা! (অগ্নি)
.
নীবিড় ভাইয়া চোখের ইশারায় সম্মতি জানিয়ে আমার ডান হাত নিজের হাতের মুঠোয় আঁকড়ে ধরে এগোতে লাগলেন। আমিও চুপচাপ বাধ্য মেয়ের মতোই উনার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে লাগলাম। এরকম পাবলিক প্লেসে মান-সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেবার ইচ্ছে নেই আমার। যদি এখন উনার কথার প্রতিবাদ করতে যাই তবে নিঃসন্দেহে সবার সামনে চেঁচিয়ে মার্কেট ফাটিয়ে ফেলবেন উনি!
.
🍁
.
সিএনজি স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি সবাই। আবারও সেই একই বিপত্তি এসে হানা দিলো যাত্রা পথে। সিএনজির সিট ৫ টা কিন্তু আমরা মোটে ৬ জন। অগ্নি ভাইয়া তো বোধহয় মাটিতে নাক খড় দিয়ে ফেলেছে এই বলে যে রুশো ভাইয়াকে আর কোলে বসাবে না কোনো কালেই। এদিকে রুশো ভাইয়াও এবার নিজের মান-সম্মানের তোয়াক্কা না করে অগ্নি ভাইয়ার কোলেই বসবে বলে দাঁত কেলিয়ে যাচ্ছে।
.
---- নো নো নো! ন্যাড়া একবারই ব্যাল তলায় যায়। সেই জায়গায় আমি তো দু দুবার গিয়েছি।
.
---- হেই ব্রো! তাছাড়া তো আর উপায়ও নেই। নাও না কোলে প্লিজ প্লিজ প্লিজ....!
.
---- নীবিড়.......! বাঁচা আমাকে এটার হাত থেকে।
.
নীবিড় ভাইয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
---- তোরা সামনের সিএনজি রিজাভ নিয়ে ৪ জন উঠ! আমি আর অনন্যা পেছনের সিএনজি রিজাভ নিয়ে যাচ্ছি।
.
নীবিড় ভাইয়ার প্রোপোজাল সবার সেকেন্ডের মধ্যেই পছন্দ হলেও হলো না শুধু আমার। আমি ভাইয়া, আপু আর রাত্রিকে ছেড়ে আলাদা ভাবে আস্ত একটা বিষাক্ত নখ বিশিষ্ট সাদা বিলাইয়ের সাথে যেতে ইচ্ছুক নই মোটেই।
তাই মুখ ফুলিয়ে কেবল না শব্দটা উচ্চারণ করবো তার আগেই বাকিরা সামনের সিএনজি তে উঠে পড়লো। নীবিড় ভাইয়া গম্ভীর কন্ঠে আমায় বললেন,
.
---- তোমাকে না না না বলে গান গাইতে বলা হয় নি। চুপচাপ সিটে বসে পড়ো!
.
কি আর করার শেষমেশ অবাধ্যগত সন্তান হয়েও মুখ বুঝে বাধ্যগত সন্তানের মতো সিএনজির সিটে চেপে বসতে হলো আমায়। আমি বসতেই উনি আমার পাশে উঠে বসে "মামা চলেন...!" বলেই সিটে চোখ জোড়া বন্ধ করে গা এলিয়ে দিলেন।
আর আমি মুখ ফুলিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চোখ দিয়েই গিলে ফেলতে লাগলাম উনাকে। ভেতরে ভেতরে যত রাগ আছে তা গালাগাল দিয়েও কমানোর ক্ষমতা নেই আমার। কারণ আমি ভালো ভালো গালাগাল দিতেই জানি না!
.
উনি চোখ দুটো বুজে রেখেই বলে উঠলেন,
---- এভাবে দেখিও না। আমার রেস্ট নিতে প্রবলেম হচ্ছে।
.
সাথেসাথেই চোখ বড়বড় হয়ে এলো আমার। এটা মানুষ নাকি সত্যিকারেই বিলাই? চোখ বন্ধ রেখেই বুঝলেন কিভাবে আমি উনাকে দেখছি?
প্রচন্ড রকম বিরক্তি নিয়ে ডান দিকে মুখ ঘুরিয়ে রাস্তার পাশের শা শা করে ছুটে চলা লম্বা লম্বা গাছগুলো দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম আমি। যদিও বাস্তবে গাছ গুলো নিজের জায়গাতে স্থির তবে আমার কাছে আপেক্ষিক ভাবে তাদের ছুটন্ত বলে মনে হচ্ছে। চলমান সিএনজির ফলে সৃষ্ট দমকা হাওয়া এসে অবাধ্য চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে আমার। যার দরুন বিরক্ত বোধ করছি আমি আরোও বেশিই। হাতদুটো উঁচু করে হাত খোপা করতে নিলেই এক হাতে কোমড় জড়িয়ে টান মেরে নিজের একদম কাছে নিয়ে এলেন আমায় উনি। আমার মাথা নিজের কাঁধের সাথে ঠেকিয়ে বলে উঠলেন,
.
---- রেস্ট নাও! এন্ড বিরক্ত করো না।
.
---- আরে আরে কি করছেন? ছাড়ুন আমায়!
.
উনি নিজের ক্লান্তিমাখা চোখ দুটো আধখোলা অবস্থায় এনে আমার চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে বললেন,
---- অনেক টায়ার্ড আমি। ডিস্টার্ব করো না প্লিজ!
.
আর কিছু বললাম না। উনার ক্লান্তিমাখা মুখটা বড্ড বাঁধা দিলো আমায়। ইচ্ছে হলো না আর কোনো শব্দ উচ্চারণ করে উনার বিশ্রামের ব্যাঘাত ঘটাতে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার! বিশ্রাম উনি নিলে আমায় কেনো নিজের কাধে মাথা রাখাতে বাধ্য করলেন?
সত্যিই এই মানুষটার মনে যে ঠিক কি চলে তা বোঝা মুশকিল। এক কথায় বড্ড বেশিই মুশকিল!
.
🌸
.
প্রায় ৩ টের নাগাদ বাড়ি পৌঁছোলাম আমরা। ভাইয়ারা বাড়ি এসেই গামছা নিয়ে দৌড় মেরেছে দীঘিতে। এতোদিন অসহ্যকর মনে হলেও আজ যেনো এখান থেকে যাবার ঘন্টা বাজতেই সবার মায়া পড়ে যাচ্ছে গ্রামের পরিবেশে।
আমি রাত্রি আর নিত্য আপুও এই ফাঁকে গোসল সেড়ে নিলাম। চাচিমনি আর বড় চাচি মিলে পাটি বিছিয়ে খাবার এনে রেখেছে। অপেক্ষা শুধু ভাইয়াদের। ওরা এলেই থালায় ভাত বেড়ে দেবে চাচিমনি।
.
আমরা পাটিতে বসেই গল্প করছিলাম, এর মাঝেই দিদুন একটা টিফিন বক্স এনে নিত্য আপুর হাতে ধরিয়ে দিলেন। নিত্য আপু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই দিদুন বললেন,
---- আমসত্ত্ব নাকি ভারী পছন্দ হয়েছে তোমার। তাই বেঁধে দিলাম। বাসায় যেয়ে খেয়ো।
.
নিত্য আপুর খুশিতে চোখ চিকচিক করে উঠলো। সাথে খুশি হলাম আমরা সবাইও। দিদুন নিজের সাথে করে আনা পুরোনো একটা বাক্স নিত্য আপুকে ধরতে বলে চেয়ার টেনে বসে পড়লেন।
.
---- এতে কি আছে দিদুন?
.
দিদুন ইশারায় আপুকে বাক্সটা খুলে দেখতে বললেন। বাক্সটা দুহাত দিয়ে খুলতেই চমকে উঠলো আপু। দিদুন মুচকি হেসে বলতে শুরু করলেন,
.
---- আমার দাদুভাই দের বউদের জন্য একজোড়া করে বালা বানিয়ে রেখেছিলাম আমি। জুঁই কেও দিয়েছি। এখন তুমি তো অগ্নির বউ হতে যাচ্ছো তাই তোমার বালা জোড়া এখনই দিয়ে রাখলাম।
.
নিত্য আপু বালাগুলোয় হাত বুলিয়ে দেখতে লাগলো। আপুর চোখের কোণে জল জমাট বাঁধতে শুরু করে দিয়েছে। তবে এ কোনো দুঃখের অশ্রু নয় এতো পরম শুখের নমুনা মাত্র!
.
এর মধ্যেই ধুমধাম আওয়াজে পেছন ফিরে তাকালাম আমরা। অগ্নি ভাইয়া আর রুশো ভাইয়া দুজনেই ভেজা গায়ে একসাথে সদর দরজা দিয়ে ঢুকতে গিয়ে আটকে গিয়েছে।
---- হেই ব্রো....! আমি ছোট আমি আগে ঢুকবো! ছোটরা সব কিছুতে বেশি পায়।
.
---- আমি বয়সে বড়। সবার আগে আমি ঢুকবো! ইয়ায়ায়ায়া.....!
.
ওদের এভাবে ধস্তাধস্তি করতে দেখে চোখ বড়বড় হয়ে এলো সবার। ভাইয়াদের পেছনে ছিলো নীবিড় ভাইয়া। উনি ভাইয়াদের পাগলামি দেখে পেছন থেকে ধাক্কা মারতেই হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লো অগ্নি ভাইয়া আর রুশো ভাইয়া। পড়তে পড়তে আর একটুর জন্যেই বেঁচে গেলো দুজনে। ওদের কান্ড দেখে হাসিতে ফেটে পড়ার বদলে শুধুমাত্র মুখ টিপে হাসতে হলো আমাদের, দিদুনের উপস্থিতির জন্য।
.
কিন্তু আমাদের অবাক করে দিয়ে এক তাক লাগানো হাসির ঝংকার ভেসে আসলো পেছন থেকে। আমরা অবাক দৃষ্টিতে সেই হাসির উৎসের দিকে তাকাতেই আঁতকে উঠলাম। দিদুন ভাইয়াদের কাহিনী দেখে আজ মন খুলে হাসছেন। ১০ বছরেও যেখানে দিদুনকে গম্ভীরতার পাছে হাসতে দেখা যায় নি সেখানে আজ দিদুন প্রাণ খুলে হাসছেন। দিদুনকে হাসতে দেখে চাচিমনি, বড় চাচি আর আম্মুর চোখে নোনাজল এসে বাসা বাধতে লাগলো। দিদুন হাসি থামিয়ে হাতের ইশারায় ভাইয়াদের নিজের কাছে ডাকলেন।
.
ভাইয়ারা ভয়ে ভয়ে দিদুনের কাছে এসে স্ট্যাচুর মতো সটান হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। দিদুন রুশো ভাইয়ার পিঠে থাপ্পড় মেরে বললো,
---- এই আমচোড় টা দেখি বুড়ো বয়সেও বড় হবে না।
আর অগ্নি, দাদুভাই তুমিও ওর সাথে বাচ্চামো শুরু করে দিয়েছো! নাত জামাই, যে কিভাবে তোমাদের সামলায়! যাও তাড়াতাড়ি কাপড় বদলে একেবারে তৈরি হয়েই নামো সবাই।
.
অগ্নি ভাইয়া আর নীবিড় ভাইয়া দিদুনকে হেসে হেসে কথা বলতে দেখে অবাক হলেও সামলে নেয় নিজেদের। কিন্তু সামলাতে পারে না শুধুমাত্র রুশো ভাইয়া। দিদুনের মুখে এমন মিষ্টি মিষ্টি কথা করলার চেয়েও বোধহয় তেঁতো লাগলো রুশো ভাইয়ার কাছে। যার দরুন বেজায় বিষম খাওয়া শুরু করলো রুশো ভাইয়া। চাচিমনি রুশো ভাইয়াকে কাশতে দেখে পানি ভরিয়ে গ্লাস এগিয়ে দিলো ভাইয়ার দিকে। রুশো ভাইয়া এক নিমিষেই ঢকঢক করে পুরো গ্লাস শেষ করে শান্ত হলো তবে। রশো ভাইয়ার বর্তমান মনোভাব কিছুটা এরকম যে "করলার মধ্যে মধু ঢেলে দিলো কে!"
নীবিড় ভাইয়া আর অগ্নি ভাইয়া রুশো ভাইয়াকে ধরে আরোও কোনো অঘটন ঘটানোর পূর্বেই মুখ লুকিয়ে ঘরে নিয়ে গেলো!
আর এদিকে হাসির বোম্ব ফাটতে শুরু করলো আমাদের পেটের মধ্যে।
.
🍂
.
অতঃপর ঘনিয়ে এলো গ্রাম থেকে বিদায় নেবার চূড়ান্ত মুহুর্ত। সবাই মিলে খেয়ে নিয়ে রেডি হয়ে নিচে নেমে এলাম আমরা। আম্মু আব্বু লাগেজ নিয়ে উঠানে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের অপেক্ষায়। আমরা নেমে জুঁই ভাবী, মাসুম ভাইয়া, চাচি আর চাচ্চুদের সাথে কুশল বিনিময় করে নিলাম। দিদুন কে সালাম করে আশেপাশে চোখ বুলিয়ে নিয়ে কিছু একটা ভেবে জিজ্ঞেস করলাম,
.
---- মামুন ভাইয়া কোথায় দিদুন?
.
দিদুন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,
---- তোমরা গেলে বের করবো ওকে। চিন্তা করিও না।
.
বিনিময়ে ছোট্ট একটা শ্বাস ছেড়ে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালাম আমি। বাড়ি ছেড়ে কাঁচা রাস্তায় উঠে এক পলক চেয়ে দেখে নিলাম আমরা হীনা খাঁ খাঁ করা বাড়িটা। বাড়ির পাশেই গোয়ালঘরে লালু-ভলুকে ড্যাবড্যাব করে আমাদের দিকে চেয়ে থাকতে দেখলাম আমি। রুশো ভাইয়া ভলুকে এভাবে জ্বলজ্বল করে তাকিয়ে থাকতে দেখে তাকে ভেঙিয়ে বলে উঠলো,
.
---- হে হেই বুল! এখন কাকে কিক মারবে হ্যা? পচ্চা বুল! বাই দ্য ওয়ে, আই উইল মিস বোথ অফ ইউ। স্পেশালি ইউ মি. বুল! টাডা.....!
.
রুশো ভাইয়ার উচ্চারিত বাক্য বোধগম্য না হওয়ায়, বিনিময়ে লালু ভলু "হাম্বায়ায়ায়ায়ায়....!" করে ডেকে উঠলো। রুশো ভাইয়া ওদের ডাক শুনে ভরকে গিয়ে অগ্নি ভাইয়ার গলা জড়িয়ে চেপে ধরলো ভাইয়াকে। সাথেসাথেই হাসিতে ফেটে পড়লাম আমরা সবাই।
.
.
.
চলবে..................💕