#প্রেম_আমার♥
#পার্ট-৫২♥
#Ayanaa_Jahan(Nusraat)♥
.
🌺
.
বর্তমানে সান্তাহার প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে নিজেকে একটা ক্ষুদ্র পিঁপড়ের মতোই লাগছে আমার। আজ প্লাটফর্মেই এতো ভীড় যদি হয় তবে ট্রেনের ভেতরে ঠিক কিরকম ভীড় হবে তা কল্পনা করলেই গায়ে কাটা দিয়ে উঠছে আমার। যদিও টিকিট কেটে সিট নেয়া আছে আমাদের তবে সন্দেহ সিট অবদিই পৌঁছোতে পারবো কিনা এই নিয়ে।
তারওপর আজ ট্রেন লেইট! মাত্র খবর নিয়ে জানলাম ট্রেইন জয়পুরহাট ছেড়েছে। অর্থাৎ আগে আক্কেলপুর আসবে তারপর ছাড়বে, অবশেষে পৌঁছোবে সান্তাহার জাংশনে।
.
আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আশেপাশের লোকজনদের দেখতে দেখতে এসব ভাবছিলাম ঠিক তখনই পাশ থেকে রুশো ভাইয়ার আতংকিত কন্ঠস্বর কানে ভেসে আসতে লাগলো,
---- ও ভাই! মারো মুজে মারো! ও মাই গড এত্তো পপুলেশন! হুয়াই হুয়াই?
.
অগ্নি ভাইয়া রুশো ভাইয়ার কথার প্রতিউত্তরে প্লাটফর্মের এন্ড পর্যন্ত হেলে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলে উঠলো,
---- খাইছে রে! আজকে রুশো ভর্তা হয়ে যাবে নিশ্চিত। কিন্তু এখন কথা হচ্ছে নুন, তেল কোথায় পাবো যে ভর্তাটাকে একটু স্বাদযুক্ত বানাবো?
.
রুশো ভাইয়া চোখমুখ কুচকে ঠোঁট উল্টে বললো,
---- উফফ..ব্রো! এই নিয়ে অনেক পঁচাইছো। প্লিজ আর না! প্রেস্টিজ এইবার পাম্পচার না হয়ে প্লাস্টিক হয়ে যাবে নির্ঘাত।
.
রুশো ভাইয়ার কথায় অগ্নি ভাইয়া হো হো করে হাসতে শুরু করে দিলো। চোখ ছোট ছোট করে অগ্নি ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে আবারও মুখ ফুলিয়ে বসে পড়লো রুশো ভাইয়া।
.
এই ব্যস্ত স্টেশনে একজনই শুধুমাত্র সেল্ফি তোলায় ব্যস্ত আর সে হলো ওয়ান এন্ড ওনলি আমার বেস্টু রাত্রি। ওর মতে গাল ফুলিয়ে বসে থাকলে তো আর ভীড় কমবে না তাই সেল্ফি তুলেই টাইম পাস করা বেটার। এদিকে নিত্য আপু চোখে চশমা লাগিয়ে এই ব্যস্ততার মাঝে মেসেঞ্জারে ফ্রেন্ডদের পাঠানো মেডিকেল নোটস দেখছে। কিসব হাড্ডি হুড্ডির ছবি রয়েছে তাতে। বর্তমানে আপু সেগুলোই জুম করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। আল্লাহ মালুম এই দুই ভাই বোন এতো পড়াশুনো করে কিভাবে! তাও আবার একাডেমিক স্টাডিস! আমি তো একটু ফাঁক পেলেই কমিক্স, গল্পের বই অথবা গোপাল ভাড়ের বই নিয়ে পড়তে বসি। একাডেমিক বই গুলো তো আমার রোজ দিনকার ইন্সট্যান্ট স্লিপিং পিলস! কয়েক লাইন পড়তেই চোখে রাজ্যের ঘুম এসে হানা দেয় যেই আমার, সেই আমিই বা কিভাবে পড়াশুনোর সাথে বন্ধুত্ব করবো? এটা নিছক কল্পনার জগৎেই সীমাবদ্ধ মাত্র।
.
খানিক বাদেই হাতে ৪ টে কোকের বোতল নিয়ে স্টল থেকে ফিরলেন নীবিড় ভাইয়া। আমার পাশের সিটেই বসে পড়ে কয়েক সেকেন্ড জিড়িয়ে নিলেন উনি। অগ্নি ভাইয়া নীবিড় ভাইয়ার হাতে ৪ টে কোকের বোতল দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
.
---- এই রে, কোন অভাগা বা অভাগীরা যে কোকের ভাগ থেকে বাদ পড়বে আল্লাহ মালুম। এই তুই কোক আনলি ভালো কথা বাট মাত্র ৪ টে আনলি কেন, আমরা মেম্বার যেখানে ৮ জন?
.
নীবিড় ভাইয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অগ্নি ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন,
---- বলদের বলদ! আমার কি অক্টোপাসের মতো ৮ টা বাহু যে ৮ টা তে ৮ টা কোকের বোতল পেঁচিয়ে নিয়ে চলে আসবো? শেয়ার করে খাবো, একা কেই বা পুরো বোতল খাবে? আর তোর গরুর পাকস্থলী বিশিষ্ট বোনের জন্য তো পুরো ২ লিটারের পানির বোতল ব্যাগে আছেই।
.
কথাটা যে উনি আমায় ব্যঙ্গ করেই বললেন তা আমি বেশ বুঝতে পারছি। ইচ্ছেতো করছে উনার মাথাটা পুরো পিস পিস করে চিবিয়ে খেয়ে ফেলি! আমার গরুর পাকস্থলী? লাইক সিরিয়াসলি!
মেজাজ বেজায় বিগড়ে যাওয়ায় অবশেষে আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলাম না আমি। রেগেমেগে দাঁত কটমট করে বলে উঠলাম,
.
---- এই কি বললেন আপনি? আমার গরুর পাকস্থলী?
.
আমার কথাটা যেনো কোনো প্রভাবই ফেলতে পারলো না উনার ওপর। উনি আমার রাগান্বিত রিয়াকশন সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ড্রেনে ফেলে দিয়ে ভাবলেশহীন ভাবেই বলে উঠলেন,
.
---- তা নয় তো কি? কোনো মানুষের পেটে এতো পানি ধরে কিভাবে তার সাইন্স তো আমার জানা নেই। এন্ড যেহেতু গরুর ৪ টে পাকস্থলী সেই হিসেবে মেইবি তোমার গরুর মতোই ৪ টে পাকস্থলী রয়েছে এন্ড দ্যটস হোয়াই অনায়াসেই বালতি বালতি পানি ধারণ করার অসম্ভব ক্ষমতা রাখো তুমি!
.
নীবিড় ভাইয়ার কথা শুনে পাশ থেকে ফিক করে হেসে উঠলো রাত্রি যার ফলস্বরূপ মেজাজটা আমার আগের থেকেও হাই লেভেলে পৌঁছে গেলো। আমি বিনিময়ে রেগেমেগে কয়েকটা কড়া জবাব দেবো তার আগেই উনি উঠে গিয়ে আম্মু আব্বুদের কাছে চলে গেলেন। আমি রেগেমেগে রাগগুলো নিজের মধ্যেই পুষে রাখলাম। উদ্দেশ্য একসময় রাগের জোয়ালামুখি ফাটিয়ে শূন্যে উড়িয়ে পুরো ইউনিভার্স ভ্রমণে পাঠিয়ে দেবো উনাকে।
.
প্লাটফর্মের রাউন্ড সিটে আমার বাম পাশে বসে আছে রাত্রি তার বাম পাশে বসেছে রুশো ভাইয়া, আবার ভাইয়ার পাশে বসেছে অগ্নি ভাইয়া। দেন নিত্য আপু দেন নীবিড় ভাইয়া এন্ড দেন উনার একদম গায়ে ঘেষে একরকম বাধ্য হয়েই বসতে হয়েছে আমায়। আব্বু আম্মুকে একটা কোকের বোতল, অগ্নি ভাইয়া আর নিত্য আপুকে একটা কোকের বোতল, রুশো আর রাত্রিকে একটা কোকের বোতল ধরিয়ে দিয়ে বর্তমানে অবশিষ্ট বোতলের ক্যাপ খুলছেন নীবিড় ভাইয়া। বোতলের ক্যাপটা খুলে আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে উনি শান্ত গলায় বলে উঠলেন,
.
---- খাও!
.
বিনিময়ে আমি উনার থেকে বোতলটা নিলাম না। বরং মুখ ফুলিয়ে ঘুরিয়ে নিলাম আমি। আমার ব্যবহারে নিমিষেই কপাল কুঁচকে এলো উনার। উনি জোড় করে আমার হাতে কোকের বোতলটা ধরিয়ে দিয়ে ধমক দিয়ে উঠলেন,
.
---- নিজ ইচ্ছায় না খেলে কিন্তু জোড় করে খাইয়ে দিতে বাধ্য হবো আমি। এন্ড দেন তোমার এই সুন্দর ড্রেস নষ্ট হলে কিন্তু আমায় দোষ দিতে পারবে না।
.
উনার বিরুদ্ধে আর কিছু বলার সাহস পেলাম না আমি। চুপচাপ কোকের বোতল উঁচু করে কয়েক ঢোক খেয়ে নিলাম। ওমনি আবারও এক ধমক দিয়ে বসলেন উনি,
---- হা করে খেতে বলেছি তোমায়? গায়ে পড়ে যাবে না? চুমুক দিয়ে খাও স্টুপিড!
.
ব্যাস হয়ে গেলো! এটা কোনো কথা যে আমি চুমুক দিয়ে খাবো, উনি আবার সেই বোতলেই খাবেন? কি জানি হয়তো হা করেই খাবেন! যাক গে! আপাতত এতো ভেবে কাজ নেই। ৪৪০ ভোল্ট ওয়ালা এতোগুলো ধমক খেলে আবারও গুলা শুকিয়ে আসবে সাথে মান-সম্মানের ভয় তো আছেই। তাই চুপচাপ বোতলে চুমুক দিয়ে খেতে লাগলাম আমি। ওদিকে অগ্নি ভাইয়া আর নিত্য আপু হেসে এসে গল্প করতে করতে কোক খাচ্ছে। একবার ভাইয়া তো একবার আপু! মাঝে মাঝে একজন থেকে আরেকজনকে কোক পাস করতে করতে দুজনেই টান মেরে একসাথে ধরে ফেলছে বোতলটা। সাথেসাথেই ফিক করে হেসে ফেলছে দুজনেই। কত্তো সুইট একটা কাপল! দেখলেই যেনো চোখ দুটি একদম জুড়িয়ে যায়।
.
আর এদিকে রুশো ভাইয়া আর রাত্রির মধ্যে শেয়ার করে কোক খাওয়া নিয়ে তুমুলযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। রুশো ভাইয়া বলছে আগে রাত্রিকে খেয়ে তারপর নাহয় রুশো ভাইয়াকে দিতে কিন্তু না তাতেও হচ্ছে না রাত্রির। মোটকথায় ও চুমুক না দিয়ে খেতে পারে না, আবার রুশো ভাইয়ার এতে কোনো প্রবলেম না থাকলেও ওর নিজেরই নিজেকে নিয়ে প্রবলেম। শেষমেশ ওদের যুদ্ধে হতাশ হয়ে নীবিড় ভাইয়া গেলেন সামনের স্টলে। হাতে দুটো স্ট্র নিয়ে ফিরলেন উনি।
স্ট্র দুটো ওদের বোতলে ঢুকিয়ে দিয়ে বললেন,
.
----- এর পরেও যদি এনি টাইপ অফ ফাইটিং হয়, তো সিরিয়াসলি আমি এখানেই শহীদ হয়ে যাবো!
.
নীবিড় ভাইয়ার কথায় ঠোঁট উল্টালো রাত্রি। পাশ থেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো রুশো ভাইয়া। রাত্রি রুশো ভাইয়ার থেকে বোতল নিয়ে মনের সুখে গলা ভিজাতে লাগলো। আর রুশো ভাইয়া গালে হাত দিয়ে ড্যাবড্যাব করে রাত্রির খাওয়া দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।
.
🌸
.
বোতলের অর্ধের কোক খেয়ে বোতলটা পাশে রাখতেই নির্দ্বিধায় বোতলটা হাতে নিয়ে চুমুক দিয়ে কোক খেতে শুরু করলেন নীবিড় ভাইয়া। আমার মুখ লাগানো বোতলে উনাকে নির্দ্বিধায় মুখ লাগিয়ে খেতে দেখে চোখ বড়বড় হয়ে এলো আমার। আমি অবাক চোখে উনার খাওয়া দেখছি বুঝতে পেরে বোতলে চুমুক দেওয়া অবস্থাতেই ভ্রু নাচিয়ে "কি হয়েছে?" জিজ্ঞাস করলেন উনি।
বিনিময়ে নিজের মাথাটাকে ডানে বামে ঘুরিয়ে "কই কিচ্ছু না তো!" বলে চোখ নামিয়ে নিলাম আমি।
মুখ ঘুরিয়ে রাত্রিদের দিকে তাকাতেই বিশাল এক সিক্রেট ক্যাপচার হয়ে গেলো আমার চোখে।
.
রাত্রি স্ট্র দিয়ে অর্ধেক কোক খেয়ে বোতলটা পাশে রাখতেই রুশো ভাইয়া নিজের স্ট্র টা ফেলে দিয়ে রাত্রির ঠোঁট লাগানো স্ট্রটাই মুখে নিয়ে কোক খেতে লাগলো।
রুশো ভাইয়ার কান্ড দেখে আমি আনমনেই ভাবতে লাগলাম "রুশো ভাইয়ার মতোও কেউ বুঝি প্রেমে পড়তে পারে? তাও আড়ালে আড়ালে এতোটা গভীর ভাবে!"
.
🌹
.
দেখতে দেখতে ঢংঢংঢং করে ট্রেনের ঘন্টা বেজে উঠলো। দীর্ঘ ১ ঘন্টা অপেক্ষার পর ভিআইপি তিতুমীর মহাশয় এসে হাজির হলেন অবশেষে।
আমরা তৎক্ষণাৎ উঠে লাগেজগুলো হাত নিয়ে প্লাটফর্মের কিনারার দিকে এগিয়ে গেলাম। আমাদের "ঝ" বগির সিট হিসেবে ট্রেনের ঝ বগি সোজা আমাদের অবস্থানরত প্লাটফর্মের এই সাইডেই থামবে। তাই দৌড়াদৌড়ি করার দরকার পড়বে না ভেবেছিলাম সবাই। কিন্তু আমাদের চিন্তামুক্ত থাকতে না দিয়ে আজকে এই ওভার পপুলেশন, ধাক্কাধাক্কির চরম পর্যায়ে নিয়ে এসে ফেললো আমাদের। মানুষের গায়ে ধাক্কা লাগবে তাই নীবিড় ভাইয়া নিজের এক হাত দিয়ে আমায় নিজের সাথে চেপে ধরে আগলে রেখেছেন।
.
ট্রেন এসে থামতেই মানুষজন ধাক্কাধাক্কি করে ট্রেনে উঠতে শুরু করে দিয়েছে। কেউ কোনো বাধাই মানছে না। আব্বু লোকগুলোকে বলছে আগে যাত্রীদের নামতে দিতে বাট না এই অসভ্য লোকগুলো আব্বুর কথা কানেই নিচ্ছে না। এর মধ্যে একজন লোক আমায় ধাক্কা মেরে ট্রেনে উঠতে নিলেই নীবিড় ভাইয়া এবার রেগে গিয়ে ধমকে উঠলেন,
.
----- এই যে আপনারা কি শুরু করে দিয়েছেন হ্যা? এভাবে কেউ ট্রেনে ওঠে? ইডিয়েট! মেয়ে মানুষ আছে চোখে দেখতে পারেন না?
.
এর মধ্যেই এভাবে যাত্রীদের নামতে না দিয়ে আগেই পারাপারি করে ট্রেনে উঠতে দেখে টিটি এসে হুইসেল বাজিয়ে থামতে বললেন সবাইকে। লাঠি হাতে ধমকাতে লাগতেই সবাই চুপ করে থেমে গেলো। ট্রেনে থাকা যাত্রীরা ধীরে সুস্থে ট্রেন থেকে নেমে যেতেই আগে আমাদের মেয়েদের উঠাতে বললেন টিটি। আম্মু উঠতেই আব্বু আম্মুকে ব্যাগগুলো পাস করে দিলো। এরপর রাত্রি, নিত্য আপু আর আমাকে উঠিয়ে দিয়ে নিজেও উঠে পড়লো আব্বু। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত আমার বা পায়ের জুতোটা উঠার সময়ই নিচে পড়ে গেলো। এই জ্যামের মধ্যে জুতো তুলাও সম্ভব নয় তাই কাউকে কিছু বললাম না চুপ করেই রইলাম আমি।
একে একে ভাইয়ারাও উঠে পড়লো। সিট গেইটের কাছেই থাকায় বেশিদূর যেতে হলো না আমাদের। এক পায়ে জুতো পরেই মুখ গোমড়া করে উইন্ডো সিটে বসে পড়লাম আমি। অগ্নি ভাইয়া আর নীবিড় ভাইয়ার পেছনে হঠাৎ চোখ যেতেই রুশো ভাইয়াকে না দেখে আমি আতংকিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলাম,
.
---- এই রুশো ভাইয়া কোথায়? ওঠে নি?
.
আমার প্রশ্নে বাকিরাও আশেপাশে চোখ বুলিয়ে রুশো ভাইয়াকে খুঁজতে শুরু করলো। অগ্নি ভাইয়া চিন্তিত হয়ে বললো,
---- আমাদের সাথেই তো উঠলো ও। গেলো কোথায়?
.
অগ্নি ভাইয়ার কথা শেষ হতে না হতেই হুইসেল বেজে উঠলো ট্রেনের। সামান্য ঝাঁকুনির সৃষ্টি করে ধীর গতিতে চলমান হতে লাগলো আমাদের অবস্থানরত তিতুমীর এক্সপ্রেস। নীবিড় ভাইয়া আর অগ্নি ভাইয়া কপালে হাত দিয়ে "ওহ শিট!" বলে রুশো ভাইয়াকে খুজতে উল্টো দিকে ফিরেই ছুট লাগাতেই থেমে গেলো। রুশো ভাইয়া হাতে আমার পড়ে যাওয়া জুতোটা ধরে মুখে শুকনো হাসি ফুটিয়ে হাঁপিয়ে যাচ্ছে। টপটপ করে স্বেদজল বেরিয়ে যাচ্ছে ভাইয়ার শরীর থেকে।
.
অগ্নি ভাইয়া হন্তদন্ত হয়ে রুশো ভাইয়াকে ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
---- নেমে গিয়েছিলিস কেনো তুই? আরেকটু হলেই তো ট্রেনটা মিস করে যেতি! উফফফ কি যে করিস না।
.
রুশো ভাইয়া আমার কাছে এগিয়ে এসে জুতোটা নিচে রেখে মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললো,
---- ছুটকির জুতোটা পড়ে গিয়েছিলো ব্রো! ওটাই নিচে পড়ে থাকতে দেখতে পেয়ে আনতে নেমেছিলাম। তুমিই বলো এক পায়ে জুতো ছাড়া যাবে নাকি ছুটকি?
.
রুশো ভাইয়ার কথায় সবাই আমার পায়ের দিকে তাকালো আর আবিস্কার করলো যে আসলেই আমার এক পা উন্মুক্ত! আমি বাম পায়ে জুতোটা পড়ে নিয়ে রুশো ভাইয়াকে এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বললাম,
---- জুতো পড়ে গেলে গেলো! তাই বলে তুমি ওভাবে নেমে গেলে কেনো ভাইয়া? এই যদি ট্রেনটা ছুটে যেতো! জানো কতো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমি?
.
রুশো ভাইয়া আমার নাক টেনে দিয়ে ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বললো,
---- তোর সুপার ম্যান রুশো ভাইয়ের কিচ্ছু হতো না। ঠিকই উড়ে এসে উঠে পড়তাম। আপাতত উইংস না থাকায় পা দিয়েই দৌড়ে উঠতে হয়েছে এই যা।
.
খালাতো ভাই-বোন হবার সত্ত্বেও আমাদের মাঝে এতোটা ভালোবাসা দেখে উপস্থিত সবার চোখেই যেনো জলেরা এসে বাসা বাধতে লাগলো। অগ্নি ভাইয়া আর নীবিড় ভাইয়া এসে রুশো ভাইয়ার কাধে হাত রাখলো। অগ্নি ভাইয়া রুশো ভাইয়ার এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুলগুলো আরও একটু এলোমেলো করে দিয়ে বললো,
.
---- তুই আসলেই একটা জিনিস বটে রুশো!
.
বিনিময়ে রুশো ভাইয়া দাঁত কেলিয়ে দিলো। রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে টুপ করে বসে পড়লো রাত্রির পাশে। যা দেখে আমরা সবাই ফিক করে হেসে ফেললাম। মুখ ফুলিয়ে রাত্রি চোখ ছোট ছোট করে রুশো ভাইয়াকে বললো,
---- এই আপনি এতো জায়গা থাকতে আমার পাশেই এসে বসলেন কেনো?
.
রুশো ভাইয়া ঠোঁট উল্টে ফিসফিস করে জবাব দিলো,
---- তা কাপলদের মাঝে কাবাব মে হাড্ডি হবো নাকি?
.
বিনিময়ে রাত্রি আবারও মুখ ফুলিয়ে চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটিয়ে ফোনে মুখ গুঁজে দিলো। আমি মুখ টিপে হেসে দিয়ে পূণরায় আমার উইন্ডো সাইড সিটে বসে পড়লাম আর অগ্নি ভাইয়া গিয়ে নিত্য আপুর পাশে বসে পড়লো। আমি বসতেই ধপ করে আমার পাশে বসে সিটে গা এলিয়ে দিলেন নীবিড় ভাইয়া। চোখ দুটো বুজে নিয়ে ডুব দিলেন কোনো এক অজানা ভাবনার জগতে।
ইচ্ছে করছে উনার সাথে কথা বলতে, হাতটা ধএএ ঝাকিয়ে বিরক্ত করতে। কিন্তু আমি উনার সাথে কথা তো বলবো না। আমার পাকস্থলীকে গরুর পাকস্থলী বলে অপমান? এতো সহজে ভুলবো না তো আমি!
.
🍂
.
অবশেষে ৩ ঘন্টার লম্বা ট্রেন জার্নি করার পর আমরা পৌঁছোলাম আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য রাজশাহী রেইলওয়ে স্টেশনে। ঘড়িতে এখন সময় ১০ টা বেজে ৫ মিনিট।
এবারে ট্রেন থেমেছে সর্ব বামের প্লাটফর্মে। সহজভাবে স্টেশনের হিসেবে ১ নম্বর প্লাটফর্মে। বুক ভরে এক সতেজ শ্বাস টেনে দীর্ঘঃশ্বাস ফেললাম আমি। আমার মতে রাজশাহীর মতো এতো নিরিবিলি শহর সচারাচর হয় না। বিশেষ করে রাতের বেলা রাজশাহী শহরটা দেখতে একদম অন্যরকম লাগে। স্টেশন থেকে বেড়িয়ে আমাদের বাসা অব্দি রাস্তার মাঝের ঝাউগাছ গুলোতে মরিচ বাতি লাগানোর ফলে এক অদ্ভুৎ সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে পুড়ো সড়ক সহ তার চারিপাশ। স্টেশন থেকে বেড়িয়ে বাহিরে আসতেই ড্রাইভার আংকেল কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম আমরা। হয়তো আব্বু গাড়ি নিয়ে আসতে বলেছিলো উনাকে।
আম্মু আজকে রাতটা আমাদের বাসাতেই যেতে বললো নীবিড় ভাইয়া আর নিত্য আপুকে। নীবিড় ভাইয়া না করলেও আম্মুর সামনে উনার মতামত ঠিক খাটলো না। অগত্যাই তাদের আসতে হলো আমাদের বাসাতেই।
মাঝ রাস্তায় এসে রাত্রি চেয়েছিলো নিজ বাড়িতে নেমে যেতে কিন্তু অামি আটকে দেই ওকে। এতো রাতে আংকেল আন্টিকে না বিরক্ত করে একেবারে কাল সকালে যাওয়ার জন্য বলি রাত্রিকে। শেষমেশ আমার জেদের সামনে হার মেনে রাত্রিকেও আসতে হলো আমাদের বাসায়ই।
.
🌹
.
রাত ১১ টা বেজে ৩২ মিনিট।
বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিলাম আমরা। শরীরটা ভীষণ ক্লান্ত। একটা জিনিস ইতিমধ্যে আমার বোঝা হয়ে গেছে যে এবরোড গিয়ে ঘুরে বেড়ানো আর যারই হোক আমার কাম্য নয়। টেলিভিশনে দেশ-বিদেশের ছবি, ভিডিও এসব দেখেই পৃথিবীর বাকি সৌন্দর্য উপভোগ করতে হবে আমার।
.
আম্মু এতোক্ষণে ডিনার বানিয়ে ফেলেছে। তারই ডাক পড়ছে নিচ থেকে। আমি রাত্রি আর নিত্য আপুকে নিচে যেতে বলে ভাইয়াদের ডাকার জন্য পাশের ঘরের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালাম। এদের কানে আম্মুর ডাক যায় না কেনো কে জানে। কানে বোধহয় তুলে গুঁজে রয়েছে ৩ জনই।
.
ভাইয়াদের ঘরে গিয়ে অগ্নি ভাইয়া আর নীবিড় ভাইয়াকে টাওয়েল দিয়ে মাথা মুছতে আবিষ্কার করলাম আমি। এতো রাতে শাওয়ার না নিলেই কি হতো না? ঠান্ডা বাধিয়ে ফেললে তখন তো দিব্যি বিছানায় শুয়ে উল্টাউল্টি করা ছাড়া আর গতি থাকবে না।
.
---- এই ভাইয়া, শাওয়ার নিলি কেনো এখন?
.
অগ্নি ভাইয়া বিছানায় বসতে বসতে বললো,
---- ফার্স্টলি রুশো শাওয়ার নিয়েছে দেন ওকে দেখে আমাদেরও ইচ্ছে হলো সো নিয়ে নিলাম। তাছাড়া ঘেমে গিয়েছিলাম কেমন যেনো বিদঘুটে ফিলিংস আসছিলো।
.
পাশে রুশো ভাইয়ার দিকে তাকাতেই দেখলাম ভাইয়া ল্যাপটপে খুবই মনোযোগ সহকারে কিছু টাইপ করছে। আশেপাশের কোনো কিছুতেই মন নেই রুশো ভাইয়ার। এতো মনোযোগ সহকারে ঠিক কি টাইপ করছে তা তো দেখতে হচ্ছে! তাই পা টিপে টিপে ভাইয়ার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিনে উঁকি ঝুঁকি মারতে লাগলাম আমি। রুশো ভাইয়া ইংলিশে স্টোরি লিখছে। কিন্তু কখনো তো ভাইয়াকে এতোটা মনোযোগ সহকারে স্টোরি লিখতে দেখিনি আমি। তাই আরোও একটু ভালো করে লেখাগুলো পড়ার জন্য হেলে পড়লাম আমি। রুশো ভাইয়া স্ক্রিনে আমার ছায়া দেখতে পেয়ে হকচকিয়ে উঠে তৎক্ষণাৎ ল্যাপটপ সাইডে রেখে দিলো। আমতাআমতা করে ভাইয়া বললো,
.
---- কিরে ছুটকি? এভাবে উঁকি ঝুঁকি মারছিস যে? হোয়াট হ্যাপেন্ড?
.
আমি রহস্য উদঘাটনে ব্যার্থ হয়ে ঠোঁট উল্টালাম। পর মুহূর্তে ব্যাপারটা পরেও দেখা যাবে ভেবে নিয়ে ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে বললাম,
---- খেতে চলো আম্মু ডাকে।
.
রুশো ভাইয়া আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
---- তুই যা আমরা যাচ্ছি।
.
আমিও আর কথা বাড়ালাম না। মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে নেমে এলাম ডাইনিং রুমে।
.
🍁
.
আমার সামনে জলজ্যান্ত দুধের রাজ্যের রাক্ষসেরা হাউমাউখাউ করে যাচ্ছে। ভয়ে এদিকে আমার গলা শুকিয়ে যাওয়ার সাথে কান্নাও পাচ্ছে বেশ। আমি শুধু কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে উচ্চারণ করছি "না....না...না...!" ওমনি রাক্ষসগুলো তাদের ইয়া লম্বা দাঁত বের করে বলছে,
.
---- হাহাহাহা! আজ তোকে কে বাঁচাবে অনন্যা....?
.
🌷
.
---- উফফফ অনু! খেয়ে নে না প্লিজ! দেখ হরকিক্স, কমপ্লান, বুস্ট তিনটে ফ্লেবারই এনেছি তাও তোর দোহাই লাগে দুধটা খেয়ে নে।
.
---- ছুটকি তুই দুধ টা খেয়ে নে, আমি তোর জন্য এত্তোগুলো চকলেট নিয়ে আসবো! তাও প্লিজ খেয়ে নে বোনটি।
.
ওদের কোনো কথাই ইফেক্ট ফেলতে পারছে না আমাতে। অগ্নি ভাইয়া আর রুশো ভাইয়াকে বর্তমানে আমার কাছে দুধের রাজ্যের রাক্ষসই বলে মনে হচ্ছে।ওদের দু হাতে দু দুটো দুধের গ্লাস সাথে একজনের হাতে হরলিক্সের বোয়াম আর আরেকজনের হাতে কমপ্লানের বোয়াম। পেছনে দাঁড়ানো নিত্য আপুর হাতে আছে বুস্ট! বোঝাই যাচ্ছে ফুল প্রিপারেশনের সাথে মেরে ফেলতে এসেছে সবাই আমায়।
পাশের চেয়ারে বসে গালে হাত দিয়ে আমাকে দুধ খাওয়ানো অভিযান নিয়ে চলা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হাই তুলতে তুলতে দেখছে রাত্রি। আর দরজায় হেলান দিয়ে আরামে ফোনে মুখ গুঁজে রয়েছেন নীবিড় ভাইয়া।
.
আজকে ডিনারে পর ঘরে কিছুসময় রেস্ট নিচ্ছিলাম ঠি সেই সময়ই দরজা দিয়ে হুড়মুড় করে ঢুকে আক্রমণ চালিয়ে বসে ভাইয়ারা সাথে নিত্য আপুও। তাদের মেইন অস্ত্র রাইফেল বা গ্রেনেড হলেও হয়তো আমি মুখ বুজে ঠুস করে মরে যেতাম বোধহয় বাট তাদের মেইন হাতিয়ার হচ্ছে দুধ নামক আমার সবচেয়ে ভয়ংকর দুশমন। যাকে দেখলে আমি যুদ্ধ করার বদলে ময়দান ছেড়েই পালিয়ে যাই। সেই দুধকেই খাওয়াতে এসেছে ভাইয়ারা! পালানোর কোনো পথও নেই। দরজা বন্ধ করে রাখা হয়েছে আর তাতেই হেলান দিয়ে রয়েছেন নীবিড় ভাইয়া। আমি শুধু খাবো না বলে না না করতে করতে ঘরের এই দিক থেকে ওইদিক ছুটে চলেছি। আমার পেছন পেছন দুধের গ্লাস হাতে ছুটে চলেছে ভাইয়ারাও।
.
প্রায় ১৫ মিনিট যাবৎ দুধ খাবো না মিশন চলার পর নীবিড় ভাইয়া নিজের ফোনটা পকেটে ভরে নড়েচড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। হাত ঘড়িতে সময়টা দেখে নিয়ে সিল্কি চুলগুলোতে হাত চালাতে চালাতে বলে উঠলেন,
.
---- তোদের দ্বারা ওটাকে সাইজ করা হবে না বুঝেছি। দুধের গ্লাস রেখে বের হ সবাই। ওটাকে আমি ছাড়া কেউই টাইড দিতে পারবে না।
.
নীবিড় ভাইয়ার কথার ওপর আর কেউ কোনো কথা বললো না। বলবেই বা কিভাবে? টানা ১৫ মিনিট ধরেই তো চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে সবাই। বাট আফসোস কোনো পজিটিভ ফলাফল পায় নি তারা।
রুশো ভাইয়া একবার আমার অসহায় ফেইস দেখে তো একবার নীবিড় ভাইয়ার গম্ভীর ফেইস দেখে নিয়ে ঠোঁট উল্টে বলে উঠলো,
----- শেষ শেষ শেষ। আমার ছুটকি আজকে শেষ। ভাইয়ের কথা শুনলি না তো ছুটকি! এবার দেখ ব্রো তোর ওপর হাইব্রিড বোম্ব ফুটাবে!
.
.
.
চলবে..................💕