ধ্রুবতারা..
পর্ব ১৬..
লেখিকা.. আঁখি শেখ..
.............
"শান্তি হয়েছে তোর এবার পাগলামো একটু বন্ধ কর কেন খেয়েছিস এসব? আমি এখানে একটু সময় নেই আর পাগলামো শুরু করে দিলি? এখন কি করবো আমি? "
খুব রেগে গিয়ে তারাকে কথাগুলো বলল ধ্রুব। তারা চুপটি করে বাচ্চাদের মত গাল ফুলিয়ে একটা আঙ্গুল ঠোটের উপর চেপে ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
তারপর রক্তচক্ষু নিয়ে তাকালো অর্নবের দিকে।
" কেন খাইয়েছিস ওকে এইসব? তুই জানিস না ও একটা পিচ্চি।? এসব ও সহ্য করতে পারে? কি করে সামলাবো ওকে। এমনিতেই পাগলামো করে মাথা খেয়ে ফেলে আর এখন তো জাস্ট নিতে পারছি না আমি। কি করে করতে পারলি এটা? "
অর্ণব চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুধু কথা শুনছিল।
তারা হঠাৎ টালমাটাল খেয়ে পড়ে যেতে নিলে ধ্রুব আবার দুপা এগিয়ে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরল বুকের সাথে। খুব শক্ত করে ধরলো যাতে পালিয়ে না যায়। তারা নিজেকে ছুটানোর জন্য ধ্রুব শক্ত পোক্ত বুকে কিল ঘুসি মারতে লাগলো। ধ্রুব যেন পাথরের মত দাঁড়িয়ে আছে একটু নড়ছেও না। জিম করা বডিতে কি আর তারার ছোট ছোট কোমল হাতের কিলে ব্যাথা লাগে?
" তুই ভুল বুঝছিস অর্ণবকে। ও ইচ্ছে করে তারাকে খাওয়ায় নি। আসলে ওই খুব জেদ করে জোর করেই খেয়েছিল। আমরা সবাই আটকানোর চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু পারিনি। অর্ণবের কোন দোষ নেই। আসলে কিউটি পাই একটু বেশি জেদি। "
অর্ণবের হয়ে সাথী কথাগুলো বলল।
সাথীর কথার প্রতিউত্তরে ধ্রুব বলল,
" ওর কোন দোষ নেই বলছিস? জিজ্ঞেস করে দেখ আমি এখানে আসার আগে ওকে পই পই করে বারণ করেছিলাম যে এখানে যেন কোন প্রকার অ্যালকোহল বা হার্ডডিংস না নিয়ে আসে । কজ আই নো তারা কতটা জেদি। ও একবার যেটা বলে সেটা করেই ছাড়ে। তাই নিজে থেকে সাবধান হয়ে থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু না ওর তো একদিন ড্রিঙ্কস না করতে পারলে পেটের ভাতই হজম হয় না। এই নিয়ে না কি ও পুলিশের চাকরি করছে ? "
অর্ণব মুখে আঙুল দিয়ে চুপচাপ কথাগুলো শুনলো। দেখে মনে হচ্ছে ওর মত ইনোসেন্ট একটা ছেলে আর হয় না।
" আচ্ছা ভাই রাগারাগি করিস না এখন কি করবে সেটা বল? "
নিরবের কথায় ধ্রুব বলল,
" তোর গাড়ির চাবিটা আমায় দে আর আমার বাইকের চাবি তুই নে। ওকে এই অবস্থায় বাইক রাইড করে নিয়ে যাওয়া যাবে না। বাইকে বসে থাকার এবিলিটি ওর নেই । ওকে নিয়ে আমি কোন প্রকার রিস্ক নিতে পারবো না। "
ওকে গাড়ি নিয়ে যা আমি তোর বাইক নিয়ে যাচ্ছি।
তারপর যখন ধ্রুব তারাকে সাথে করে নিয়ে যেতে চাইলে তারা বেঁকে বসলো। বলল ও যাবে না। ধ্রুব নাকি ওকে আবার মারবে। ধ্রুব তারার এই জেদি ভাব দেখে এবার বেজায় রেগে যাচ্ছে,
" ওই ড্রামা কুইন এর বাচ্চা যদি সাথে না যাস তাহলে এখানে থাকলেও তোকে মারবো আমি। তাই কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ চল? "
কিন্তু না তারা তো কথা শুনবে না। ধ্রুব ওকে একবার থাপ্পড় মেরেছে ও আবার ধ্রুবর সাথে গিয়ে আর থাপ্পড় খেতে চায় না।
ধ্রুব এবার উপায় না পেয়ে তারা কে কোলে তুলে নিল। সিঁড়ি বেয়ে যখন নিচে নাম ছিল। তারা বারবার বলছে তাকে নামিয়ে দিতে। সে ওয়াশরুমে যাবে। ধ্রুব তারার কথা বিশ্বাস করলো। গ্রাউন্ড ফ্লোরে এসে নামিয়ে দিল। তারা আর কি যেই না ছাড়া পেয়েছে অমনি দৌড়ে চলে গেল যেখানে ওই মেয়েরা এবং ছেলেরা একসাথে নাচানাচি করছে। ধ্রুবত থ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেস টা কি হলো বুঝি বুঝতে একটু সময় লাগলো। ততক্ষণে তারা ওখানে চলে গেছে। এটা মেয়ে নাকি অন্য কিছু। ড্রিংকস করলে মানুষ এত বদলে যায়। একটু আগেই না ঐসব মেয়েদের দেখে নাক সিটক ছিল এখন ওদের সাথে গিয়ে নাচছে? না ভাবা যায়?
সাথী অর্ণব নিরব রুমিনা ওরা তো রীতিমতো হতবাক হতভম্ব। ওরা তো কোশ্চেন কালেও ভাবতে পারেনি কিউটি পাই এরকম একটা কাজ করতে পারে।
ধ্রুব এবার সব চিন্তাভাবনা সাইটে রেখে তারা দিকে এগিয়ে যেতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই কিছু বখাটে ছেলে এসে তারাকে ঘিরে ধরল।
ধ্রুব ওদের দেখে থেমে গেল, এখন আবার নতুন ঝামেলা সৃষ্টি হবে।
বখাটে ছেলেগুলো প্রায় সাত আট জন ছিল। ওরা তারাকে মাঝখানে রেখে চারদিকে গোল গোল করে ঘুরছিল। তারা টালমাটাল খেয়ে মাঝখানে দাঁড়িয়ে ডুলছে আর নিভু নিভু চোখে তাদের দেখছে।
তারপর হুট করেই ফিক করে হেসে ফেলল।
সবাইকে অবাক করে দিয়ে তারা, হাতের তর্জনে আঙুল দিয়ে নিজেও ঘুরছিল আর সবার সামনে একটা একটা করে কাউন্ট করছিল।
গোনা হয়ে গেলে বলল,
" মাত্র ৮ জন। মাত্র আটজন এসেছিস আমাকে তুলে নিতে? হাহা হুহুহু!"
বখাটে গুলো একজন একজনার দিকে মুখ চাওয়াচাই করছিল। এই মেয়েটা কি বলছে? এইতো মনে হয় অলরেডি ড্রাঙ্ক। ভালোই হয়েছে মেয়েকে তুলতে সমস্যা হবে না।
ওদের মধ্যে একজন বলল,
" বেবি আমরা আটজনে যথেষ্ট তোমার মত একটা পুতুলকে তুলতে। চলো আজকে তুমি আমাদের বেড পার্টনার হবে। খুব মজা করব আমরা সারারাত খেলবো। খেলবে তো তুমি আমাদের সাথে? "
ধ্রুব কথাগুলো শুনে মুট পাকিয়ে নিলো শক্ত করে। চয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর যখন ওদের শায়েস্তা করতে এগিয়ে যাবে
তখনি আবার তারার গলা শোনা গেল, ধ্রুব দাঁড়িয়ে পড়ল। তারা কি বলছে শোনার জন্য,
" জানিস আমার হিরো আছে! তোদের একটা একটা করে গুলি খাইয়ে উগান্ডা পাঠিয়ে দেবে। জানিস আমার হিরো কে? "
" না মামনি তোমার হিরো কে আমরা চিনি না তো। আজকের রাতটা আমাদের দাও কালকে থেকে তোমার হিরোকে দিও। কাম ওন বেবি লেট'স গো!"
" আমার অসহ্য পুরুষ আমার হিরো। আমার এসপি সাহেব। এই জেলার নতুন এসপি, " এসপি ধ্রুবনীর চৌধুরী "!"
বখাটে গুলো এবার আবার নিজেদের মধ্যে চাওয়া চাই করল। তারপর একজন হেসে বলল,
" আরে ভাই ও মজা করছে ড্রাংক আছে বুঝতে পারছিস না। চল তোল এটাকে। "
এই বলে বখাটে বলো তারার হাত ধরতে গেলে একটা শক্তপোক্ত হাত এসে এই হাতটা ধরে ফেলল।
বখাটে টা কে হাত ধরল দেখার জন্য সাইডে তাকাল, যেগুলো বিশাল সুঠামা দেহি এক পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে।
কালো রঙের সার্টের হাতা গুলো কোনুই অব্ধি গোছানো।শার্টের সামনের তিনটি বোতাম খোলা, লমহীন ফর্সা শক্তপোক্ত বুক দেখা যাচ্ছে।
তখনই বখাটেদের কর্ণকুহর হলো রুক্ষ দাঁতে দাঁত চেপে ধরা কন্ঠ,
" কি বলল শুনিস নি? ওর হিরো আছে। ওর হিরো একজন এসপি। দেখ তোদের সামনে দণ্ডায়মান স্বয়ং এসপি ধ্রুবনীর চৌধুরী। "
বখাটের দল ভয়ে কাচুমাচু হয়ে গেল। ওদের মধ্যে একজন বলল,
" স্যার ভুল হয়ে গেছে স্যার। আচ্ছা ক্ষমা করে দিন স্যার। প্লিজ স্যার। থানায় নিয়ে যাবেন না। "
" তোদের ছেড়ে দিলে ওর সাথে অন্যায় করা হবে। কি বলল শুনিস নি, একটা একটা করে গুলি খাইয়া উগান্ডা পাঠাতে বলল। এবার বল কে আগে গুলি খাবি "?
বখাটে গোলা এবার সব ঠক ঠক করে কাঁপতে লাগলো। ভয়ে বোধহয় সবার প্যান্টি ভিজে যাওয়ার অবস্থা। অর্ণব মনে মনে বলছে,
" শালা সিংহের লেজে পা দিছো আর থাবা খাবে না তা কি কখনো হয়?"
" সাব ইন্সপেক্টর অর্নব মির্জা!"
" ইয়েস স্যার!"
ধ্রুব'র ডাকে তৎক্ষনাৎ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পরল অর্নব। কাছে গিয়ে মাথা উচু করে সামনে একদম প্রফেশনাল ভাবে তাকায়,
" এদের উগান্ডা পাঠানোর ব্যাবস্থা করো!"
" ইয়েস স্যার! বলছি স্যার আমি টিকিট কর্নফার্ম করে দিচ্ছি স্যার!"
ধ্রুব এবার কিছু না বলে তারা কি আবার কাঁধে তুলে নিল। তারপর গটগট পায়ে বেরিয়ে গেল।
নিরবের গাড়িতে ফ্রন্ট সিটে তারাকে বসিয়ে দিল। তারপর সিট বেল্ট বেঁধে দিল। দরজা লক করে নিজে গিয়ে বসল ড্রাইভিং সিটে।
গাড়িটা ধীরে ধীরে নাইট ক্লাব ছেড়ে অন্ধকারে মিশে গেল।
এইদিকে সাথি নিরবের সাথে চলে গেল। নিরব ওকে ড্রপ করে তারপর বাড়ি ফিরবে। রুমিনার হাজবেন্ড এসেছিল রুমিনাকে নিতে । সবশেষে অর্নব ও নিজের বাইক নিয়ে চলে গেল বাড়ি।
ড্রাইভিং সিটে বসে ধ্রুব ড্রাইভ করছে। আসলে গাড়ির ড্রাইভ করছে নাকি যুদ্ধ করছে সেটা বলা মুশকিল। তার কারণ হচ্ছে' তারা '। সে কিছুতেই এখন বাড়ি ফিরবে না। তার জন্য ধ্রুবকেও ড্রাইভ করতে দিচ্ছে না। ধ্রুবকে বিরক্ত করছে বারবার। স্টেয়ারিং নিজের হাত দিয়ে ঘুরিয়ে দিচ্ছে তো আরেকবার ধ্রুবকে ঝাকাচ্ছে। ধ্রুবকে নাজেহাল করে তুলছে। ধ্রুব বারবার ধমকালেও শুনছে না।
তারা আরো পার্টি করবে। পার্টি পার্টিতে তো এখনো নাচলোই না তাহলে পার্টি শেষ হয় কি করে? তারা নাচবে তো উরাধুরা না নাচবে।
ধ্রুব আসলে কি করবে বুঝতে পারছে না।। এই মেয়ে ওকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দেবে। ড্রাইভিং সিটে বসার পরে যদি এত এত বিরক্ত করে তাহলে কি ড্রাইভ করা যায়? যত ভালো ড্রাইভারই হোক না কেন এক্সিডেন্ট ঘটবেই। কিন্তু এই মেয়েকে এখন বোঝাবে কি করে?
তারা এবার একটা প্রত্যাশিত কাজ করে বসলো।
এতক্ষণ তো নিজের সিটে বসে জ্বালিয়ে হচ্ছিল না তাই তারা এবার নিজের সিট বেল্ট খুলে ধ্রুব'র কোলে উঠে বসলো।
শুধু কোলে উঠে যে ক্ষান্ত হল তা তো নয়, এখন সে নিজেই ড্রাইভ করবে, এলোমেলোভাবে স্টেয়ারিং ঘোরাতে লাগলো। ধ্রুব'র এবার গাড়ি কন্ট্রোল করতে অনেকটাই বেগ পোহাতে হলো।
না এবার মনে হচ্ছে এক্সিডেন্ট করেই ছাড়বে।
ধ্রুব এবার রেগে গিয়ে বলল,
" ওরে ড্রামা কুইন এর বাচ্চা তোর ড্রামাটা এবার একটু স্টপ কর। নইলে দুজনেই এবার উগান্ডা চলে যাব। "
ধ্রুব খুব কষ্ট করে ব্রেক কসে গাড়িটা আপাতত থামালো। তারপর তারার দুই হাতের কব্জি শক্ত করে ধরে স্টিয়ারিং এর ওপর হাত দুটো ঠেসে ধরল।
চয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
" তোর ড্রামা বন্ধ কর। নাহলে উল্টাপাল্টা কিছু করে ফেললে আমাকে দোষ দিতে পারবি না। একেতে রাতের বেলা শুনশান জায়গায় আছি। তার উপর কেউ নেই আশেপাশে। পূর্ণ যুবক আমি আর তুই পূর্ণ যুবতী। তার ওপর আবার আমার কোলে উঠে বসেছিস। এবার যদি কিছু করে দেই তাহলে কিন্তু আমাকে দোষ দিবি না। ভালোই ভালোই বলছি চুপ করে বাড়ি চল। নাহলে হাঁটার অবস্থায় রাখবো না।"
তারা কি বুঝল কে জানে,
তারা কোন মতে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল তরপর ধ্রুবকে কে জড়িয়ে ধরে গলায় মুখ গুঁজে দিল। তারপরে অস্পষ্ট স্বড়ে আওরালো,
" আমি ঘুমাবো, এখানেই ঘুমাবো আপনি যা করার করুন, "
এই মেয়েটা কি পাগল। এইভাবে কোলে উঠে বসে তার ওপর আবার জড়িয়ে ধরে বলছে এভাবে নাকি ঘুমাবে। আশ্চর্য! একজনের রাতের ঘুম হারাম করে এখন নিজে শান্তিতে ঘুমাতে চাইছে।
যাইহোক আপাতত যখন একটু শান্ত হয়েছে তখন বাড়ি যাওয়াই যাই। থাকে এইভাবে যতটুকু সময় পারে। তারপর এই বাদরামোর শাস্তি তোলা রইল সুদে আসলে ফেরত দেবে।
তারপর ধ্রুব ড্রাইভ করা শুরু করল।
কিছুটা পথ ড্রাইভ করার পর যুব ফোনটা বেজে উঠলো।
ওই স্টেয়ারিং থামিয়ে পকেট থেকে বের করল।
দেখলো তার ভাই আদ্র কল দিয়েছে।
ফোন ধরার পর আদ্র বলল,
" কিরে এত রাত করছিস কেন কি করছিস।?
" তোমার বোনকে কোলে করে বসে আছি! "
"কি আমার বোনকে কোলে করে বসে আছিস মানে? "
"তার আগে তুমি বলো তোমার বোন যে মদ খায় এটা আমাকে আগে বলনি কেন? "
"মানে তারা মদ খায় মানে? তোর মাথা ঠিক আছে তো তুই ড্রাঙ্ক না তো? "
" তোমার বোন মদ গিলে সারাটা রাত আমাকে জ্বালিয়েছে না? জাস্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। এখন যা বলছি শোনো, আমি নিরবের গাড়ি নিয়ে আসছি। তুমি তরী কিংবা তরুকে বল একটু কষ্ট করে জেগে থাকতে। তোমার বোনকে পরিষ্কার করতে হবে।। অবস্থা খারাপ ওর। ২০ মিনিটের মধ্যে চলে আসছি রাখছি এখন! "
তারপর ধ্রুব কলটা কেটে পকেটে রেখে দিল।
গাড়ি স্টার্ট দেয়ার আগে তারার মুখের দিকে তাকালো, কে বলবে এই মেয়ে এতক্ষণ এত দুষ্টুমি করছিল, এই যে কি নিষ্পাপ বাচ্চার মত ঘুমাচ্ছে। দুনিয়ায় যেন কোন কিছুই তার জানা নেই।
(চলবে....)?