ফন্ট সাইজ:
থিম:
জটিল প্রেম

৩২তম পর্ব

লেখক: আসিফা খান

#পর্ব_৩২

#জটিল_প্রেম

----------------------☞

(গল্প কপি করা নিষেধ।)

.

রাফাজ দেশে ফিরে এসেছে,পেরিয়েছে চব্বিশ ঘন্টা।। আকাশটা আজ ভারি অচেনা লাগছে ওর কাছে। চারপাশে চেনা পরিবেশ, চেনা শহরের ঘ্রাণ কিন্তু হৃদয়ের ভেতরটা যেন পোড়া কাগজের মতো হালকা আর ছাইভরা ঠেকছে।। ফিরে এসেছে ঠিকই, কিন্তু রাফাজ এর অস্থির ভাব কাটতে চাইছে না,,, মনটা কেমন আনচান করছে।।

জারিন খবর পেয়েছে যে রাফাজ এসেছে,,,কিন্তু তার সাথে দেখা করার সুযোগ আর নেই। আর মাত্র এক দিন পরেই তাদের বিয়ে।।

এদিকে রাফাজ চিন্তায় শেষ,,,সে কি ভাবে জারিন এর সামনে দাঁড়াবে!! কারণ, ওর গলার বাঁদিকে এখনও জেনিলিয়ার নখের দাগ স্পষ্ট।। কি জবাব দেবে সে!! জারিন কে বিয়ের রাতেই সব জানাবে...একদম শুরু থেকে।। এটাই মনে মনে ঠিক করে রাফাজ।।

---------

"পূর্ণতা মানে জানো তোমরা!! পূর্ণতা,,,শুধুই একটা শব্দ না এটা দীর্ঘ এক অপেক্ষার অবসান। সৃষ্টিকর্তার উপহার।।

পুরো বাড়ি জাঁকজমকপূর্ণ। ঘড়িতে তখন রাত সাতটা। আমি বর বেসে রেডি হয়ে দাঁড়িয়েছি আয়নার সামনে।। সময়ের টিক টিক শব্দ বুকে ঢেউ খালাচ্ছে।। মনে মনে বারবার উচ্চারণ করলাম,,,জারিন।। আজকের পর সে আমার হবে একান্ত আমার।। আমরা একটু পরেই রওনা দিতাম জারিন দের বাড়ির উদ্দেশ্যে।। ঠিক তখন আমার ভাবনা চিন্তার মাঝেই আমার রুমের দরজা খুলে ভাবি খুবই চিন্তিত মুখে এগিয়ে এসে বলল,,,"

----------

"রাফাজ,,,রুমি কে পাওয়া যাচ্ছে না।।"

"মানে!?'

"ও একটু আগেই সেজেগুজে একাই দৌড় লাগালো জারিন দের দিকে,,,আসিফা, জায়ান দের কাছে।। আয়াজ এখনও রেডি হয়নি তাই রাগে একাই বেরিয়েছে।। এখন খোঁজ নিলাম,,,রুমি যাইনি ওখানে।।"

"ভাবি চিন্তা করো না,,,আশেপাশেই হবে কোথাও খেলছে।।"

"কোথাও নেই,,,সব জায়গায় খোঁজা হয়ে গেছে।।"

বলেই কেঁদে ফেললেন আসমা সুলতানা।। রাফাজ কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠল।। মনটা ভালো কিছুর সায় দিচ্ছে না।। সে খানিক ধাতস্ত স্বরে বলে,,,,

"ভাবি আমি দেখছি।।"

আসমা সুলতানা চলে যায়।। রাফাজ কাউকে কল করতে সাইলেন্স হয়ে থাকা ফোন হাতে তুলে অন করতেই চোখে পড়ে বেশ কিছু ম্যাসেজ।। রাফাজ ভ্রু কুঁচকে চট জলদি ম্যাসেজ গুলি ওপেন করতেই দেখে গুটি কয়েক লেখা,,,

"আপন মানুষদের চোখের সামনে মরতে দেখার অনুভব এর চেয়ে কষ্টের আর কিছুই হতে পারে না।। তোমার মনের খুব কাছের ভাইঝি কে দেখতে চাইলে চলে আসো,,,নিয়ে যেতে পারলে নিয়ে যাও,,,নাহলে......"

আর লেখা নেই।। রাফাজ প্রশস্থ দেহ কাপতে লাগলো। বুকের ভেতরের ধকধক শব্দটাই কানে বাজছে বারবার।। এক অজানা ভয়ে শিউরে উঠতে লাগল রাফাজ। আজকের দিনের খুশির মুহূর্ত গুলো যেন এক ঝড়ে সব উড়িয়ে নিয়ে গেল।

শেরওয়ানির বোতাম খোলা, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ওর। ঘেমে উঠেছে কপাল, অথচ শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছে।

রাফাজ কি মনে করে রুম থেকে বেরাতে বেরাতে জারিন এর নাম্বারে কল করলো।। কিন্তু ফোন বন্ধ।।

মনে পড়ে জারিন বলেছিল বিয়ের আগ পর্যন্ত সে কথা বলবে না। সেই কারণেই ফোন বন্ধ করে করে রেখেছে।। রাফাজ চোখ বুঁজে রুদ্ধশ্বাস ছাড়ে।।

কেনো জানি ওর মন চাইছে ছুটে জারিন এর কাছে যেতে,,,ওকে একটু হলেও জেনিলিয়ার ব্যাপার টা বলতে।।

পরক্ষনেই মাথায় এলো তার ছোট্ট রুমি।। রাফাজ এক ছুটে বেরিয়ে গেলো গাড়ি নিয়ে।। পিছন থেকে আত্মীয় স্বজন ওকে ডাকে কিন্তু সে দিকে রাফাজ এর ভ্রুক্ষেপ কোথায়!!

---------

একটা নির্জন ঠিকানা।। রাতের আঁধার, কালোয় চারিপাশ। নিস্তব্ধ মেঠো পথ পেরিয়ে রাফাজ এর গাড়ি থামে একটা পরিত্যাগ বাড়ির সামনে।। দেখে মনে হয় কত দিন এখানে কারোর পা পড়েনি।।

নিজেকে লৌহমানব করে রাফাজ এগিয়ে যেতে লাগলো।। একটা সময় ভাঙ্গা দরোজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করতে নিলেই দুই জন কালো মাস্ক পড়া লোক রাফাজ কে দুই দিক থেকে ধরে ফেলে।। রাফাজ কিছু বলতে নেবে তার আগেই তারা বলে ওঠে,,,

"চালাকি নয়..."

তাদের কন্ঠে হুশিয়ারি।।রাফাজ বোঝে এখানে তার কোনো রকম কিছুই চলবে না।। এখানে রাজত্ব অন্য কারোর।। রাফাজ কে একটা অন্ধকার রুমে ধাক্কা দিতেই রাফাজ পড়তে পড়তে নিজেকে সামলায়।। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চারি দিকে চোখ ঘোরায় কিন্তু অন্ধকার ছাড়া এর কিছুই পায় না সে।। রাফাজ এর নজর খুজে চলেছে ওর কলিজার টুকরা কে।।

কিন্তু কোথাও তার নিশানি নেই।।

হঠাৎ করেই একটা আলো ফুটে ওঠে।। বিশাল বড় রুমের ওপর প্রান্তের দেয়ালে লাগনো প্রজেক্টর।। রাফাজ চোখ বন্ধ করে নেয়,,, অন্ধকারের মাঝে হঠাৎ আলো তার চোখে বিধছে।। কিছু মুহূর্ত পর রাফাজ ভ্রু কুঁচকে তাকালো সেদিকে।। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে একটা দৃশ্য।।

কোনো হাসপাতালের কেবিন।। শুভ্র বিছানায় শুয়ে আছে একটা মেয়েলি শরীর।। হাতে সেলাইন, মুখে অক্সিজেন,চারিপাশে নতুনত্ব মেশিনের সমাহার।। দেখে বোঝা যাচ্ছে মেয়েটি ঘোরতর অসুস্থ।।রাফাজর চোখ ধীরে ধীরে বৃহৎ আকার ধারণ করে।। চেহারায় ফুটে উঠে বিস্ময়। ওর বুক ঢিপঢিপ করছে।। ভারী নিশ্বাস ফেলে ঠোঁট কাঁপিয়ে বললো,,,

"জেনি...."

হ্যাঁ! জেনিলিয়া।। সেই জেনিলিয়া যে ভালোবাসার দাবি নিয়ে রাফাজ এর সম্মুখে হাজির হতো বারবার। আর রাফাজ! সে এই ভালোবাসা প্রত্যাখ্যান করত।। আজ মেয়েটা এরকম কেনো!! নিস্তব্ধ ভাবে শুয়ে আছে কোন এক হসপিটাল কেবিনের শুভ্র বিছানায়।। এটা কি ভাবে হলো!!

রাফাজ এর মনে আছে সে জেনিলিয়াকে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে একপ্রকার লুকিয়ে বেরিয়েছিলো।। ফিরে এসেছিল নিজের দেশে।। তবে জেনিলিয়ার এই অবস্থা কি ভাবে হলো!। মেয়েটার মাথায় মোড়ানো সাদা ব্যান্ডেজ তাতে ফুটে ওঠা রক্তের আভা রাফাজকে নাড়িয়ে তুলছে।।

চলতে থাকা স্ক্রিন বুঝে এলো পরপর আবার ধপ করে জ্বলে উঠলো।। এবার জায়গায় টা অন্য,,,ঝিমিয়ে থাকা কোনো কক্ষ,,, সামনে চিয়ারে বসে আছে অলিভার স্মিথ।। লাল চোখ,এলোমেলো চেহারা।। বিদেশি শুভ্র মুখে প্রতিশোধের নেশা।। রাফাজ চেনে এই মানুষটাকে।।

জেনিলিয়ার ভাই এবং নিউইয়র্কের অন্যতম ক্ষমতাশালী মাফিয়া গ্যাং এর নেতা।।

রাফাজ এর চোখে অদম্য সাহস।। সে শক্ত হয়ে দাড়িয়ে।। অলিভার ওকে দেখে,,,এই মানুষটার সান্নিধ্য পেতে গিয়েই তার বোন আজ এই অবস্থায়।। অলিভার পারে না রাফাজকে স্ক্রিনের ভেতর থেকেই শুট করে দিতে।। কিন্তু নাহ,,, এই মানুষটাকে অলিভার মারবে না, বাঁচিয়ে রাখবে যেভাবে বেঁচে আছে তার বোন।।

নিস্তব্ধতা কাটিয়ে ভেসে এলো অলিভার এর রাশভারী কন্ঠ,,,,,

"চিন্তা নেই, তোমায় মারবো না রাফাজ।। মারার হলে অনেক আগেই মে*রে ফেলতাম তোমায়।।বাঁচিয়ে রাখবো,ঠিক যে ভাবে আমার বোন বেঁচে আছে সেই ভাবেই।। আমার চঞ্চল বোনকে তুমি যেমন নির্জীব করে দিয়েছো ঠিক সেই ভাবেই তুমি বেঁচে থাকবে, ধুঁকেধুঁকে।। ভালোবাসার মানুষকে নিজের চোখের সামনে দেখবে কিন্তু তাকে ছুঁতে পারবে না,,,তার চোখে নিজের জন্য বিতৃষ্ণা দেখবে কিন্তু তুমি কিছু করতে পারবে না।। তোমার জীবন এখন থেকে আমার কমান্ড এ চলবে রাফাজ।।

জানো! আমি সবসময় ভাবতাম আমার এত এত ক্ষমতা তার সঠিক ব্যবহার কখনো ঠিকভাবে করতে পারিনি কিন্তু এখন আমার ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার হবে,,, আমার অফুরন্ত দৌলত কাজে লাগবে।। আমার বোনের কথা বাদ,,, ও আর এই জগতে নেই।। তোমাকে ফিরিয়ে আনতে গিয়ে গাড়ি এক্সিডেন্টে ওর ব্রেন হ্যামারেজ হয়েছে ডক্টর ক্লিয়ারলি জানিয়ে দিয়েছে ওর শুধু নিশ্বাসে চলবে। কিন্তু বেঁচে থাকবে এইভাবেই বিছানায় শুয়ে।।

কারণ মৃত্যু ওর জন্য নয় রাফাজ,,,আমার বোন এত তাড়াতাড়ি মরবে না।।

তুমি আমার বোনের ভালোবাসা থেকে পলাতক ছিলে,,,ঠিক তেমনি তোমার ভালোবাসার শাস্তিই হবে তোমার অনন্ত শিকল।"

অলিভারের চোখ জ্বলছে পুঞ্জীভূত প্রতিহিংসায়। মুখে শান্ত ভঙ্গি, কিন্তু তার প্রতিটি শব্দে বিষ। রাফাজ দাঁড়িয়ে আছে নিঃশ্বাস বন্ধ করে। শরীরের প্রতিটা রক্তকণা যেন জমে এসেছে।

চোখে লেগে থাকা বিস্ময় আস্তে আস্তে গলে গিয়ে জায়গা নিচ্ছে এক ভয়ানক বাস্তবতায়।

তার গলার কাছে কিছু যেন আটকে গেছে। বুকের মাঝখানে ভারি পাথরের মতো চাপা কষ্ট।

সে জেনিলিয়ার ভালোবাসা ফিরিয়ে দিয়েছিল, তবে সে কখনও মৃত্যু কামনা করেনি।

সে অলিভারের চোখে তাকিয়ে বুঝে যায়,,,এই মানুষটা ধ্বংস করে দিতে এসেছে,,,কিন্তু কাকে?

রাফাজকে? নাকি তার মধ্যকার মানবিকতাকে?

নিজের করুনতা কে দূরে ঠেলে রাফাজ হঠাৎই জিজ্ঞেস করে ফেলে।

"রুমি?"

কণ্ঠে কাঁপন, কিন্তু চেহারায় দৃঢ়তা। অলিভার হালকা হেসে বলে,,,,

"গুড কোশ্চেন।। তোমার কলিজার টুকরা এখনো টুকরো হয়নি আছে ঠিকঠাক,,,ভাবছো আমি এত নিচে নামবো? তুমি যা করেছো, তার তুলনায় কিছুই না। তবুও আমি ভদ্র। রুমিকে এখনো কিছু করিনি, কিন্তু কতক্ষণ কিছু না করে থাকবো সেটা বলতে পারছি না।।"

রাফাজের হাত শক্ত হয়ে আসে, চোখে ধিক্কার,,,আর একরাশ ভয় যাহ চোখের অন্দরে লুকিয়ে রাখা।।

"রুমির কিছু হলে,,,i will ki*ll you."

অলিভার নীরব। মুখটা কিছুক্ষণ থেমে থেকে কঠিন হয়ে যায়। তারপর বলে…

"Ohhh come on Rafaz,,, আগে নিজেকে,নিজের পরিবার,নিজের প্রেয়সীকে বাঁচাও ।। তারপর আমায় মারার কথা ভাববে,,,"

হঠাৎ স্ক্রিনে আবার ছবি ফুটে ওঠে। এইবারে রুমির ছবি সাথে জায়ান আর আসিফা। রুমির সাথে সাথে জায়ান আর আসিফা কে দেখে রাফাজ হতবিরোল হয়ে রইলো।। তারা কোনো অন্ধকার রুমে,,তিন জনেই অজ্ঞান। পরনে তাদের সুন্দর বিয়ের জন্য কেনা ড্রেস। রাফাজ এর বুক কাপছে।। দিন,দুনিয়া যেনো সব গুলিয়ে মিলিয়ে একেকার।। অসহায় হয়ে তাকিয়ে রইল সেই দিকে।। তার জীবনটা এই ভাবে খাদে পড়ে যাচ্ছে!!

তার চোখের সামনেই সব কিন্তু সে কিছুই করতে পারছে না,,, বাঁচাতে পারছে না।।

রাফাজ এর নিস্তেজ,ব্যর্থ অভিব্যক্তি যেনো অলিভারকে প্রশান্তিতে ফেলছে।। বিরাম কণ্ঠ ভেসে এলো হঠাৎ রাফাজ এর কানে,,,

"ওদের কিছু করিনি এখনো। কিন্তু করবো কিনা, সেটা নির্ভর করছে তোমার সিদ্ধান্তের ওপর।

ওদের বাঁচাতে চাইলে…

ভালোবাসা হারাতে হবে।"

রাফাজ দাঁড়িয়ে থাকে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

তাও কোনো রকম বলে,,,"ওদের ছেড়ে দাও। ওরা নির্দোষ বাচ্চা। ওদেরকে আমাদের মাঝে টানবে না,,,তোমার হিসাব নিকাশ আমার সাথে অলিভার।। আমায় মেরে দাও,,,"

"নাহ নাহ,,,তোমায় মারবো না। আচ্ছা চল একটা ডিল করি,,,ওদের মধ্যে যে ছেলেটা আছে তাকে তুমি নিজের হাতে এক্ষণই শুট করবে,,,তারপর ঐ দুই মেয়েকে নিয়ে তুমি চলে যাবে,,,সো সিম্পল।।"

রাফাজ এর অন্তর কেঁপে উঠলো।। তার প্রশস্থ দেহ এক ঝটকায় চূর্ণ হয় যেনো। চোখের সামনে ভেসে উঠছে জায়ানের মুখ,,, যাকে ছোটো থেকেই আয়াজ এর সমান ভালোবেসে,স্নেহ করে এসেছে।আর পাশে রুমি, তার কলিজার টুকরো আর আসিফা! নিরীহ, সরল এক প্রাণ, এই ভয়ঙ্কর খেলায় যার কোনো দোষ নেই।

রাফাজ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে স্ক্রিনের দিকে। গলার স্বর ভারী, কাঁপা কাঁপা,,,তবুও স্পষ্ট।

"অসম্ভব,,,আমি অমানুষ না।"

অলিভার চুপ। কণ্ঠে একরাশ তাচ্ছিল্য মেশানো ঠাণ্ডা ব্যঙ্গ,

" যারা ভালোবাসা ফিরিয়ে দেয়, তারা মানুষ থাকে না। ওদের জীবন আজ তোমার হাতে।।"

রাফাজ ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকে সেই স্ক্রিনের সামনে রাখা ভার্চুয়াল প্রজেকশনের দিকে, হাতের মুঠো শক্ত হয়ে উঠেছে। তার হৃদপিণ্ড ধড়ফড় করছে। আর একদিকে অলিভার,সেই অমানবিক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে স্ক্রিনে বন্দী রাফাজের দিকে। যেন রাফাজের প্রতিটি টুকরো হয়ে যাওয়া অভিব্যক্তি তার জন্য বিজয়ের প্রতীক।

রাফাজ হঠাৎ থেমে যায়। চোখে জল নেই, কেবল নিঃশ্বাস আটকে আসে বারবার। সে কাঁপা কণ্ঠে বলে…

"আমি মরতে রাজি অলিভার… জায়ানকে কে না,,,ওদের প্রাণ ভিক্কা চাইছি।।"

অলিভার তাচ্ছিল্য হেসে বলে,,,"ভিক্ষা আমি দিইনা রাফাজ।।শুনেছি ছেলেটা তোমার প্রেয়সীর জান!! ইসস,,,তুমি যদি ওকে মে*রে দাও তাহলে তো___ আচ্ছা যাও আরো একটা অপশান দিচ্ছি,,,এটা লাস্ট কিন্তু।"

"কি?"

রাফাজ কণ্ঠে ছিল এমন নিরুত্তাপ দৃঢ়তা। যেনো তার কাছে আর কোনো পথ নেই,,,সে নিরুপায়।।

এবার অলিভারের মুখে কঠিন হাসি।

"তাহলে তো মজা আরও বাড়লো… দেখা যাক ভালোবাসা কতোটা বড়....ওদের তুমি অক্ষত নিয়ে যেতে পারো কিন্তু শর্ত একটাই,,,,"

"সমস্ত শর্ত মাথা পেতে নেবো,,,"

"বেশ,,,আজ না তোমার বিয়ে!! কিন্তু বিয়েটা যে আর হচ্ছে না।। যাকে ঘিরে তোমার ভালোবাসা সে আজ অপূর্ন থাকবে,,,আজ তোমাদের পরিণয় হতে গিয়েও হবে না রাফাজ।। যত দিন আমার বোনের নিশ্বাস চলবে ততদিন তোমাদের ভালোবাসা অপূর্ন থাকবে। যেরকম আমার বোনের ভালোবাসা অপূর্ন।।

তোমার প্রেয়সী তোমায় ঘৃণা করবে, লোক সমাজে ছোটো হবে,,,তোমরা ধুঁকে ধুঁকে মরবে রাফাজ।। ভালোবাসার মানুষ কে চোখের সামনে দেখবে কিন্তু ছুঁতে পারবে না,,,সব বলতে চেয়েও বলতে পারবে না।। তোমার জীবন কাটবে কষ্টে রাফাজ।।"

অলিভার এর সমস্ত বাক্যে আকাশ পরিমাণ প্রতিহিংসায় ভরপুর।। রাফাজ ধপ করে বসে পড়লো মেঝেতে।। রাফাজ এর অনুভব হচ্ছে সে মারা যাচ্ছে।।ভেতরটা যেন চুরমার হচ্ছে তার।বুকের ভিতর যে আগুন জ্বলছে, সেই আগুনে নিজেই পুড়ছে সে। রাফাজ ভেতরে ভেতরে ভেঙে যাচ্ছে ।। জেনিলিয়ার সেই শুভ্র নিথর শরীর ওকে অসহায়ত্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।

মেয়েটার ভালোবাসা আজ তার কাছে শাস্তি।

জারিন এর স্নিগ্ধ শোভন চেহারা,ওর জন্য অপেক্ষায় থাকা আঁখি জোড়া,,রুমির অবচেতন মুখ, জায়ানের আদুরে বাচ্চা চেহারা,, নিষ্পাপ আসিফা,,,সব মিলিয়ে তার অস্তিত্বটা আজ ধুলিসাৎ। নিজের বেঁচে থাকাটাই এখন অপরাধ মনে হচ্ছে তার কাছে।

অলিভারের প্রতিটা বাক্য তার মনের ভেতর বিষের মতো ঢুকছে। কিন্তু একটাই চিন্তা,,,ওদের বাঁচাতে হবে...ওরা নিষ্পাপ।। তার ঠোঁটের ফাঁকে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসে,,,

"মঞ্জুর,,,,"

ভালোবাসা না পেয়েও, ভালোবাসার জন্য নিজেকে ধ্বংস করার নামই তো রাফাজ।। অলিভার যেনো সন্তুষ্ট হলো না।। নিজের ক্ষমতা দেখাতে সে স্ক্রিনে প্লে করে জারিন দের বাড়ির আঙিনা। চারি দিকে আগুনের কুন্ডুলিতে ভরপুর।। বিয়েতে আসা মানুষ জন ছুটোছুটি করছে। সবার চিৎকার চেঁচামেচিতে রাফাজ শিউরে উঠলো। ওর চোখের মনিতে ভেসে ওঠে বিয়ের সাজে সজ্জিত জারিন,,,যে কিনা এই অবস্থা দেখে কেঁদে হয়রান,,,তাও ওর চোখে রাফজ এর আসার অপেক্ষা,,,সে অধির আগ্রহে অপেক্ষায় আছে তার ভালোবাসার মানুষের।। মুহূর্তের মধ্যেই খুশির আমেজ আগুনে জ্বলছে।। রাফাজ এর বাম চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।। নিষ্প্রাণ স্বরে বলে,,,

"আমি রাজি,,,তোমার সমস্ত শর্তে রাজি অলিভার। শুধু তাদের কিছু করো না যারা এই সব বিষয়ে অপরাগ,,,"

অলিভার ভারী কন্ঠে বলল,,,"তোমাকে রাজি হতেই হত রাফাজ।। কখনো ভুল করো না নিজের প্রিয়সির সাথে দেখা করার কিংবা কথা বলার।। না হলে আজ যেগুলো বাকি রয়ে গেছে পরবর্তীকালে আমি একটুও রেহাই করবো না।।

ভাবছো নিশ্চয়ই এত দূর থেকে তোমার উপর কিভাবে নজর রাখব!! রাফাজ আমার ক্ষমতা সম্পর্কের তুমি হয়তো অবগত না কিন্তু ব্যাপার না ধীরে ধীরে বুঝে যাবে আর এমনিতেও তোমার আশেপাশে এমন কেউ আছে যে আমাকে এই কাজে সাহায্য করবে।। সে এমন এক জন যাকে তোমরা চেনো,,,খুঁজে নিতে পারলে খুজে নাও।।"

স্ক্রিন বন্ধ হয়ে গেলো। রুমটা আবার অন্ধকারে ছেয়ে গেল।। একদম ঘুটঘোটে, নিস্তব্ধ অন্ধকার। যেমন নিস্তব্ধ এখন রাফাজ, যেমন অন্ধকার এখন তার হৃদয়।। আজ সে নিজের হাতে কবর দিলো তার ভালোবাসা।। মনে মনে উচ্চারিত করলো,,,' আমার জারিন, আমায় ক্ষমা করো।"

কিছুক্ষন পর একটা গার্ড এসে জানালো আসিফা,রুমি, জায়ান কে ওর গাড়িতে রাখা হলো। সাথে হুশিয়ারি দিলো,,আজকের এই ঘটনা যেনো শুধুই রাফাজ এর স্মৃতির পাতায় থাকে।। নির্জীব রাফাজ মাথা নাড়িয়ে উঠে দাঁড়ায়।। কাঁপতে থাকা পা জোড়া নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।।

জায়ান ও আসিফা কে খুবই সংগোপনে খান বাড়ির গেটের কাছে রেখে আসে।। ছেলে মেয়ে দুটো এখনো সেন্সলেস।। অপর পাশে রুমিকে নিয়ে এসে সোজা নিজের বাড়িতে প্রবেশ করে।। খান বাড়িতে আগুন লাগার খবর শুনে শেখ বাড়ির কেউই আর বাড়িতে নেই। পুরো বাড়িটাই প্রায় মানব শূন্য।। রাফাজ রুমিকে শুইয়ে বেরিয়ে আসে।।অতপর গাড়ি নিয়ে চলে যায় দূরে কোন নাম না জানা ঠিকানায়।।

তিন দিন রাফাজ এর খোঁজ মেলেনি।। চতুর্থ দিনের মাথায় রাফাজ ওর বড় ভাই আয়নাম সাহেবকে একটা বার্তা পাঠায়। তিনি যেনো জানিয়ে দেন যে,সে আর জারিন কে বিয়ে করবে না।। এই খবর যেনো দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।। জারিন এর কানে এই কথা এলেই মেয়েটা অজ্ঞান হয়।।

ঠিক দশ দিনের মাথায় রাফাজ ফিরে আসে। নিজের জীবন শুরু করে সাধারণ ভাবে।। মানুষের প্রশ্ন,ধিক্কার কোনো কিছুতেই রাফাজ উত্তর করে না। জারিন কে দেখলে এড়িয়ে যাওয়া এই সমস্ত কিছু রাফাজ কে সবার চোখে খারাপ করে তোলে। জারিন এর ঘৃণা জন্মায় রাফাজ এর প্রতি।। তত্পর তাদের জীবন চলে দুই অজানা পথে।।

--------------

(বর্তমান)

রাফাজ চোখ খোলে,,,যেনো সে এতক্ষণ পুরো কাহিনী তার ক্ষত হৃদয় দিয়ে নিঙড়ে বলছিল।রাফাজের আত্মত্যাগ।। হ্যাঁ আত্মত্যাগই তো। যে আত্মত্যাগে মানুষ শুধু নিজেকে হারায় না। হারায়, ভালোবাসা, হারায় সেই অধিকার যেখানে সে আপন মানুষদের নিজের অসহায়ত্বের কথা বলতে পারে না।।

পরিবেশটা নিঃশব্দ, ভারী, কান্নায় ভেজা এক বিষণ্ন আবহ।। চারিদিকে এক কালচে আলো। ভোর হতে দেরি আছে এখনো।। পাখিদের রিনরিনে শব্দ

যেনো তারা নিজেও শোক জানাচ্ছে।

হাওয়া থেমে গেছে, গাছের পাতাগুলো নিস্তব্ধ। আশেপাশে কুকুরের হালকা গম্ভীর ডাকে ভেসে আসে একটা অদ্ভুত আতঙ্ক।

ছাদে তখন ঘন নিস্তব্ধতা।। উপস্থিত খান বাড়ির, শেখ বাড়ির সমস্ত সদস্য। কেউ কারো মুখে তাকাতে পারছে না। কেউ হঠাৎ হঠাৎ ফুঁপিয়ে উঠছে।

সবাই বসে আছে এক ঘর অন্ধকার আলোয়।। ঝাপসা হয়ে থাকা মুখগুলো একেকটা বিষাদের প্রতিচ্ছবি।

মেঝেতে বসে থাকা রুমি বারবার কান্না চেপে ফেলছে।। তার পাশেই বসে থাকা আসিফার চোখে জলের ফোঁটা লুকানো যাচ্ছে না।

কেউ একবারও রাফাজের নাম জোরে বলছে না।।তাঁর নাম উচ্চারণ করতেও যেন বুক ফেটে যাচ্ছে।

রেলিং এ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আয়াজ মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকে।

এদিকে সবার থেকে আলাদা জায়ান।। অনুতপ্তবোধ ওকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। যেই মানুষটাকে গত ১৩ টা বছর ধরে ঘৃণা করে এসেছে সেই মানুষটাই কিনা তার জীবন রক্ষার জন্য সব কিছু বাজি রাখল!! এই অপরাধ,অনুতাপ সে কোথায় রাখবে!? তার কঠিন, প্রশস্ত ,নজর কাড়া দেহ ভেঙে এলো।। সবার নজরের আড়ালে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে পড়ল।। তার লাল হওয়া আঁখি জোড়া। নিস্তব্ধ রাখল ফ্লোরে।।

তাহ দেখলো রুমি,,, ওর চোয়াল শক্ত, ঠোঁটে তাচ্ছিল্যতা যাহ মোটেও নজর এড়ায়নি জায়ান এর।।

মাঝেমাঝে একটা একটা করে হাস্নুহেনা ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে, সেই গন্ধে যেন একটা শোকের চাদর নেমে আসছে।। জারিন চিয়ারে মাথা নিচু করে বসে কেঁদেই যাচ্ছে। সে হতভম্ব,স্তব্ধ।। এই মানুষটাকে সে আর কি বলবে!! এত বছর করা তার রাগ, অভিমান, ঘৃণা, বিতৃষ্ণা সবটাই যেন মরীচিকা ছিলো।। সে যেন পাথর হয়ে গেছে। ঠোঁটে শুধু ফিসফিসে এক লাইন,,,

"সে আমাকে ভালোবেসে নিজের আত্মত্যাগ স্বীকার করলো সে,,,আমি কী করে বাঁচবো এই অপরাধবোধ নিয়ে?"

এগিয়ে এলেন জুলফিকার সাহেব। তার বিশ্বাস নিয়েই রাফাজ এর কাঁধে হাত রেখে বললেন,,,"জীবন আমাদের কিছু শিক্ষা দেয় রাফাজ।। তোমার জীবনের এই ঘটনা দিয়ে তুমি কি শিখলে আমি জানিনা কিন্তু তোমার প্রতি আমার বিশ্বাস সবসময় ছিল,,,"

রাফাজ মৃদু হেসে তাকালো।। আয়নাম সাহেব রুদ্ধ শ্বাস টেনে বললো,,,"ভাইকে একটুও জানাতে পারলি না! এত কষ্ট মনের মধ্যে চেপে রেখে ১৩ টা বছর কাটালি ! আমি কি তোর কেউ না!!"

রাফাজ শুকনো ঢোক গিলে বললো,,,"তারা যদি একটুও জানতে পারতো যে,আমি তোমায় সব বলেছি তাহলে ওরা তোমার ক্ষতি করত ভাই। তাদের নজর সর্ব সময় আমাদের উপর ছিলো।।

আমি যখনই জারিন কিংবা তোমাদের কিছু জানাতে গিয়েছি ততবার আমি কারোর ক্ষতি ডেকে এনেছি।। আমাকে তোমরা সবাই মাফ করো,,,আমি নিরূপায় ছিলাম।।"

গলা ধরে আসলো রাফাজ এর। আয়নাম সাহেব ওকে জড়িয়ে নিলো।। আসিফা আর রুমি ছুটে এসে রাফাজ এর কোমর জড়িয়ে ধরলো,,, ওদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো রাফজ।। আজ যেনো সবার মনে বিধে থাকা রাগ, অভিমান, হতাশা, কৌতূহল মিটে গেলো।। আনোয়ারা বেগম চোখ মুছে সবার উদ্দেশ্যে বললো,,,

"তুমি কোনো ভুল করিনি রাফাজ বরং তুমি যা করেছো সেটা করার সাহস পৃথিবীর মাঝে খুব কম মানুষের থাকে।। কিন্তু ভাগ্য যাদের এক করে পৃথিবীর কোন শক্তি তাদের আলাদা করতে পারে না।। তখন তোমার করা আত্মত্যাগে জারিন তোমার হয়নি কিন্তু দেখো তেরোটা বছর পর তোমরা ঠিক এক হলে।। এটাই ভাগ্যের লিখন, এটাই বিধান।

এবার সব ঠিক আছে,,,আমরা সবাই এক।। আল্লাহর শুকরিয়া।। এখন সবাই যাও বিশ্রাম নাও।। তোমাদের বিশ্রাম এর প্রয়োজন।। জারিন,,, রাফাজ কে তোমার রুমে নিয়ে যাও।। রুমি আসু যাও একটু আরাম করো,,, আয়াজ তুমি জায়ান দাদুভাইয়ের রুমে যাও,,, ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নাও।। আর বাকি সবাই আসো আমার সাথে,,,"

আনোয়ারা বেগম এর কথায় সবাই ধীরে ধীরে নিচে নেমে যায়।।

-----

রাফাজ ধির পায়ে জারিন এর সাথে যায়।। মেয়েটা কেমন নীরব হয়ে আছে।। রুমে প্রবেশ করে তারা।। ইসস,,,আজ নাকি তারা এক সাথে থাকবে! এত বছর পর!! স্বপ্ন নয় এটা,,, কল্পনাও নয়। এটা বাস্তব,,, অপেক্ষায়মান এই রজনী।। যার জন্য দুই হৃদয়কে পার করতে হয়েছে ১৩ টা বছর।।

রাফাজ নিজে দরোজায় ছিটকানি লাগায়।। জারিন নীরব দাড়িয়ে কক্ষের মাঝে।। নিস্তব্ধতা কাটিয়ে রাফাজ বলে ওঠে,,,,

"জারিন... তু...তুমি আমায় বিশ্বাস...."

পরের কথা গুলি বলতে পারল না রাফাজ। জারিন ছুটে এসে ওকে জড়িয়ে ধরে।। হঠাৎ আক্রমণে রাফেজ দুই পা পিছিয়ে যায় অতঃপর নিজে জারিনের পিঠে হাত দিয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে ফেলে।।

রাফাজের বুকজুড়ে জারিনের নিশ্বাসের কাঁপুনি টের পাওয়া যায়। চুপচাপ কান্নায় বুক ভিজিয়ে দিচ্ছে সে। কত কথা, কত অভিমান জমে ছিল সব যেন এই নিঃশব্দ জড়িয়ে ধরার মাঝে গলে যাচ্ছে।

জারিন ক্রন্দনরত শব্দে আওড়াতে থাকলো,,,

"আমায় মাফ করে দিন রাফাজ,,,,আমি ভীষণ স্বার্থপর হয়ে গিয়েছিলাম। আমি শুধুই নিজের কষ্ট নিয়েই ভেবেছিলাম,,,একবার আপনার দিক বোঝার চেষ্টা করিনি। একবারও আপনার চোখের দিকে তাকায়নি।। আমি কেনো এমন হলাম রাফাজ? কেনো আপনার কষ্ট অনুভবে ব্যর্থ হলাম। কেনো আপনার ভালোবাসা ভুলে গিয়ে শুধুই দুঃখ মনে রাখলাম।। আমায় মাফ করে দিন রাফাজ।"

জারিন এর আহাজারি রাফাজ কে উদ্বিঘ্ন করে তোলে।। সে বোঝে জারিন এর দিকটা।। মেয়েটা নিজেকে দোষারোপ করছে।। রাফাজ ধীরে জারিনের মাথায় হাত বুলিয়ে ওকে শান্ত করে।। বলে,,,,

"তোমার দিক থেকে তুমি একদম সঠিক ছিল জারিন। তোমার রাগ,অভিমান সবটা জায়েজ ছিলো। হয়তো আমাদের ভাগ্যের লিখন এটাই ছিলো জারিন।। দেখো না! আজ এত বছর পর তোমাকে বুকে নেওয়ার শপথ পূরণ হয়েছে।। আমি এই শপথ একদিনও ভুলিনি জারিন,,,এক মুহূর্তও না।।"

জারিন চোখ তুলে তাকায়, তার চোখ দুটো লাল।। সেথায় এক রাশ ভালোবাসা।সে ফিসফিস করে বলল,

“আমাকে নিয়ে কেনো এতটা লড়েছো রাফাজ?"

রাফাজ থেমে যায়। তারপর নরম স্বরে বলল,,,

“তুমি বোঝা না জারিন!! তুমি ছিলে আমার আঁধার রাতের জ্বলতে থাকা তাঁরা।। তুমি না থাকলে আমি হারিয়ে যেতাম…”

জারিন এবার কেঁদে ফেলে। বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে আসে।রাফাজ ওকে আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে।

"জারিন আমরা নাকি বিবাহিত!!"

রাফাজ একটু হাসি ফুটিয়ে কথাটি বলে।। জারিন কেনো জানি শিউরে উঠলো। সে চোখ তুলে তাকালো রাফাজ এর দিকে।। লজ্জায় গাল লাল হলো ওর।। রাফাজ এই আদুরে কন্যার দিকে তাকিয়ে বলল,,,

"দুই রাকাত শুরিয়ার নামাজ পড়ি জারিন!?"

জারিন মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাতেই ওরা দুই জনে ওযু করে নামায আদায় করে।। অতঃপর রাফাজ জারিন এর মাথায় হাত রেখে একটা দোয়া পড়ে।। সমস্ত বাঁধা পেরিয়ে একটা লম্বা চুমু দেয় জারিন এর কপালে।। জারিন এর চোখ ভিজে উঠলো।। হায়রে প্রতীক্ষা!! রাফাজ নিজের পকেট একটা আংটির বক্সে বের করে। তাহ থেকে একটা সাদা রঙের ডায়মন্ড এর আংটি বের করে জারিন এর বাম হাতের অনামিকা আঙুলে পরিয়ে দিতে দিতে বলল,,,

"আমায় পাগল বলো সমস্যা নেই কিন্তু জানো এই আংটি আমি সেই বিয়ের রাত থেকে আর আজ পর্যন্ত পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াই।। সুযোগ খুঁজতাম বারবার,,,কিন্তু দেখো পেলাম সুযোগ তাও তেরো বছর পর।।"

জারিন অবাক চোখে রাফাজ এর দিকে তাকিয়ে রইল।। এত ভালোবাসাতে কে পারে!! জারিন অবাক চোখে চেয়ে বলল,,,,

"আমার কপাল এত ভালো কেনো রাফাজ!! আমার কোন নেকীর বিনিময়ে আমি আপনাকে পেয়েছি!! এত কে ভালোবাসে? একটা মেয়ের জন্য কে নিজের সব হারায়!! রাফাজ আপনি মহা প্রেমিক,,,আপনি পাগল প্রেমিক,,,"

"তোমার জন্য,,,সব তোমার জন্য।"

"আমি আপনাকে দেখে অবাক হচ্ছি রাফাজ,,,"

রাফাজ এইবার আর একটু এগিয়ে যায় জারিন এর দিকে।। মুখের কাছে মুখ এনে নাকে নাকে ঘষা দিয়ে হাস্কি কন্ঠে বলল,,,"অবাক হওয়ার এখনও অনেক কিছু বাকি আছে জান।। তোমার অনুমতি পেলে একটু ছুঁয়ে দেখি তোমায়?"

জারিন মাথা নিচু করে চুপ করে রইলো। ওর ঠোঁটের কোনায় একটুকরো লাজুক হাসি, আর বুকের মধ্যে তোলপাড় করা অনুভব।। রাফাজ ওর মুখের এক পাশের চুলটা সরিয়ে চোখের দিকে তাকায়।

"কিছু বলো না জারিন।। তুমি যা বলবে, যে ভাবেই বলবে আমি মাথা পেতে নেব।"

রাফাজ ফিসফিস করে বলে।জারিন ধীরে মাথা তোলে, চোখে জল টলমল করছে, কিন্তু ঠোঁটে সেই চেনা ভাঙা হাসি। লাজে রাঙা রিনরিনে কন্ঠে বলে,,,

"আপনার কাছ থেকে ভালোবাসা শিখে আপনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার মত সাহস নেই আমার রাফাজ।।

আমার প্রতি আপনার ভালোবাসা,,,আমি নিজের জীবন দিয়েও শোধ করতে পারব না।।"

রাফাজ এবার ধীরে জারিনের হাত দুটো ধরে বিছানার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।ওরা পাশাপাশি বসে। রাফাজ জারিনের মাথা নিজের কাঁধে রেখে বলে,

"জানো,,,কত প্রতীক্ষায় ছিলাম এই মুহুর্তের।।"

"আমিও..."

দুই জনের একে অপরের দিকে তাকালো।। তাদের উভয়ের আঁখিতেই কেমন জমে থাকা তৃষ্ণা।। ধীরে ধীরে এক হলো দুই জোড়া অধর।। জারিন আঁকড়ে ধরলো রাফাজ এর কাঁধ ঘাড়।। রাফাজ এর উন্মত্ত চুমু জারিন কে বেহাল করে তুলছে।। আজ কোনো বাধা নেই,,,নেই কোনো আক্ষেপ।। আজ প্রকৃতি স্বয়ং চাইছে তারা এক হোক।। জারিন চোখ বন্ধ করে রাফাজের বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে ফেলে।।

তার ঠোঁট কাঁপে।। রাফাজ ভারিক্কি নিঃশ্বাস ফেলে বলে,,,,

"আজ সম্পূর্ণ ভাবে আমার হবে জারিন!?

জারিন রাফাজ এর কপালে আলতো চুমু অঙ্কন করে লাজে আচ্ছন্ন কন্ঠে বলল,,,

"আমি শুধুই আপনার,,,রাফাজ।।"

রাফাজ ওকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নেয়।। অতপর আবার এক হলো দুই অধর।। বিছানায় পিঠ ঠেকলো জারিন এর।। ধীরে ধীরে প্রেম নামলো।

হাওয়ার শব্দ, পর্দার নরম দোল, আর দুই হৃদয়ের নিরব স্পন্দনে কক্ষটা ভরে ওঠে।।

ওরা জানে,,,এই রাত নতুন সূর্যের মতো, যেখানে কোনো অতীত নেই, শুধু বর্তমান আর অনন্ত ভালোবাসা আছে।

#জটিল_প্রেম সমস্ত পর্ব একত্রে।

@Highligts

ক্রমশ

--------------(সবাই নিজেদের মতামত জানাবেন। চাচু আর ফু মাকে নিয়ে এর থেকে বেশী কিছু আমার কাছে আশা করো না।। আমি লজ্জা পেয়েছি এদের এই সিন লিখতেই।। সবই অনেক কমেন্ট করো।।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন