ফন্ট সাইজ:
থিম:
জটিল প্রেম

৩৪তম পর্ব

লেখক: আসিফা খান

#পর্ব_৩৪

#জটিল_প্রেম

----------------------☞

(গল্প কপি করা নিষেধ।)

.

নতুন সকাল সাথে নব কিছুর আগমন।। আজ জারিন এর প্রথম দিন তার শশুর বাড়িতে।।

ভোরের আলোয় শুরু, জারিনের চোখ খুলতেই যেন একটু অন্যরকম অনুভব হলো। ঘুম ভাঙার পর এই ঘর, এই ছাদের নিচে, এই বিছানায়—রাফাজের পাশে... এটা বাস্তব কোনো স্বপ্ন নয়।। এই বাস্তব এর জন্য তাদের অপেক্ষার প্রহর তো কম ছিলো না।।

কচি কলাপাতা রং এর শাড়িতে জারিনকে সুন্দরীতমা লাগছে।। রাফাজ এর সুন্দরীতমা। খোলা লম্বা চুল আর ঠোঁটের কোণে স্নিগ্ধ হাসি রাফাজ এর চোখে পড়তেই ওর চিত্ত কুলে ছলাৎ করে ওঠে।। সকাল সকাল আঁখি মেলেই এহেন মনমাতানো দৃশ্য দেখতে কার না ভালো লাগে!!

এই দৃশ্যের অপেক্ষায় কেটেছে শত প্রহর।। রাফাজ বিছানায় শুয়ে থেকেই হাত বাড়ালো,,,আলতো ছুঁয়ে দিলো রমণীর গাল।। জারিন চায়ের কাপ বেড সাইড টেবিলে রেখে রাফাজ এর চুলে হাত দিয়ে ঘেঁটে বললো,,,,

"বেড টি খাওয়ার অভ্যাস এখনও আছে কি না জানি না,,,"

রাফাজ বিস্তার হেসে উঠে বসলো। সকাল সকাল স্ত্রীর ললাটে ঠোঁটের নরম ছোঁয়া দিয়ে বলল,,,,

"অভ্যাস করে নেবো আবার,,,করতেই হবে,,,এই চা ফিরিয়ে দেওয়া পাপ।"

জারিন চোখ নামিয়ে ফেলে। রাফাজের গলার সেই গম্ভীর কোমল সুরে এখনো তার মন কেঁপে ওঠে। ওর গালজোড়া যেন লাল টকটকে গোলাপ!

চুপচাপ বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ বলে উঠলো,

"রোজ সকালে এমন মিষ্টি কথা বললে... আমি ভুলেও আপনাকে বেড টি দেওয়া মিস করতে পারবো না তাহলে।"

"মিস করার জন্য তো তোমাকে কোথাও যেতে হবে, দূরত্ব লাগবে, আর একটা মুহূর্তের দূরত্বও আমি দেব না তোমায়। তাই কখনো চা'ও মিস হবে না।"

জারিন হেসে দিলো সাথে রাফাজও হেসে উঠে বললো,,,

" তুমি আমার অভ্যাস ছিলে, আছো আর থাকবে,,,,আমার ঘুম তোমার গন্ধে ভাঙুক, আমার দিন শুরু হোক তোমার হাসিতে,,,।"

জারিন এবার কিছু না বলে শুধু চায়ের কাপটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিলো।। জারিন চোখে মুখে বিরক্তির অভিনয় করে বললো,,,

"আপনি তো পুরো কবি হয়ে যাচ্ছেন আজকাল!"

রাফাজ আবারও একবার হেসে বলে উঠলো,

"জীবনসঙ্গী তুমি হলে, কবিতা এমনি বেরিয়ে আসবে।"

জারিন উঠে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে ক্লিপ লাগাতে লাগাতে বললো,,,"কবি সাহেব এবার উঠে ফ্রেশ হয়ে নিচে আসুন,,,"

রাফাজ বিরক্ত হয়ে বললো,,,"তুমি থাকো,,,একসাথে নিচে যাবো"

"নাহ জনাব,,,আপনার লজ্জা নেই কিন্তু আমার আছে।।"

"কে বলেছে লজ্জা পেতে!?"

"আপনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন আজ আমার শ্বশুর বাড়ির প্রথম দিন,,, এমনি আমি একটু নার্ভাস তার উপর আপনার এই সকল কথা!"

জারিন কথাটি বলে খানিক ভাবনায় পড়ে। এই বাড়ির সাথে তাদের সম্পর্ক অনেকদিনের থাকলেও আজকে যেন জারিন নিজেকে নতুন রূপে আবির্ভাব করছে এই পরিবারে,,, সে এখন এই পরিবারের বৌমা,রাফাজের স্ত্রী।। জারিন এর নার্ভাসনেস রাফাজ কিছুটা আন্দাজ করতে পেরে এগিয়ে এসে ওকে ঘুরিয়ে দাঁড় করায়,নিজের বৃহৎ হাতের মাঝে ওর মুখটা তুলে বলে,,,

"এত কেন ভাবছো জান! এই পরিবার তোমার সবাই তোমাকে প্রচুর ভালবাসে,তুমি সেটা জানো না!"

"জানি,,,বাট"

"নো বাট...রিল্যাক্স থাকো।"

জারিন মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলে। অতঃপর রাফাজ কে ঠেলে ওয়াশরুমে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল,,,"ফ্রেশ হয়ে নিচে আসুন আমি যাই,,,"

রাফাজ কি যেনো বললো ওয়াশরুম থেকে জারিন তাহ পাত্তা দিল না। রাফাজ এর জামা কাপড় ডিভানে রেখে ,বিছানা গুছিয়ে নিলো অতপর চপল পায়ে ছুটলো নিচে।।

রান্না ঘরে কাজে ব্যস্ত আসমা সুলতানা সাথে রুমি। মেয়েটা জারিন কে দেখা মাত্রই ভুবন ভুলানো একটা হাসি দিয়ে বলল,,,,"ওয়াও ছোটমা ইউ আর লুকিং ফ্যাব।।"

রুমির মুখ থেকে নতুন ডাক সাথে প্রশংসা পেয়ে জারিন খানিক লজ্জা পেয়ে মেয়েটার গাল টেনে বললো,,,,"তাই নাকি!! একদম আসুর মত কথা হয়েছে তোমার,,,"

"ইয়েস,,,কারণ উই আর বেস্ট ফ্রেন্ড ফরএভার। ওর কিছু জিনিস তো আমার মধ্যে আসবে।।"

"তোমরা দুইজনেই আমার কাছে সমান রুমি,,,তাহ কি করছো! আমি হেল্প করি,,,"

রুমি পরোটার প্লেট নিয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে যেতে যেতে বলল,,,"নো নো নো,,,হেল্প না তুমি শুধু আরাম করবে এখন,,,আর কাজ করার জন্য তো সারা জীবন পড়ে আছে,,,"

রুমির কথায় খানিক হেসে জারিন আসমা সুলতানার কাছে গিয়ে পাশে দাঁড়ালো। কিছুটা মিনমিন সুরে বললো,,,"ভাবি,,, কাল থেকে আমি তোমাকে হেল্প করবো,,,আজ উঠতে লেট হয়ে গেছে আর...."

আসমা সুলতানা ঘুরে তাকালো ওর দিকে।। চোখে মুখে একরাশ প্রসন্নতা। সে জারিন এর দুই হাত ধরে বলল,,,

"জারিন তুমি জানো আমি তোমায় সব সময় নিজের ছোটো বোনের মত দেখেছি।। তোমার সুন্দর ব্যবহার আমায় সব সময় মুগ্ধ করে। তোমাদের বিচ্ছেদ আমি কখনোই মেনে নিতে পারিনি,,,আর আজ যখন তোমরা এক, এত বছর পর যখন তোমরা একে অপরকে নিজের করে পেয়েছো, এতে যে আমি এত খুশি তাহ বলার বাহিরে।।

জারিন আমরা সবাই তোমার আপন তাই কোনো ফর্মালিটি নেই,,,আর রইলো কথা হেল্প করার,,,তাহলে বলব এর জন্য আমি অনেক অপেক্ষা করেছি।। দুই জা এক সাথে রান্না করবো,আড্ডা দেবো,ঘুরতে যাব এইগুলির জন্য আমি অনেক অপেক্ষায় ছিলাম,,,আর একা একা ভালো লাগে না জানো তো,,,এবার তুমি চলে এসেছো,,,হেল্প তো তোমায় আমাকে করতেই হবে নাহলে ভুলে যেওনা আমি বড় জা..."

বলেই হেসে দিলো আসমা সুলতানা। জারিন ঠোঁট উল্টে ওনাকে জড়িয়ে ধরে।। এই মানুষটার সাথে সব সময় বান্ধবীদের মত মিশে এসেছে।। জারিন বললো,,,,

"ভাবি না, তুমি তো আমার জন্য সবসময় একটা ভালো বান্ধবী আর বোনের মাঝামাঝি কিছু ছিলে... আমিও সবসময় তোমার সেই গল্প, রান্না আর আড্ডা দেওয়ার সঙ্গী হতে চাইতাম। কিন্তু মাঝে চলে গেলো অনেক গুলি বছর,,, আর আজ সেই স্বপ্নটা যেন সত্যি হলো।"

আসমা সুলতানা জারিনকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন, আর বললেন,,,

"তুমি এলে, মনে হচ্ছে ঘরের সব খালি জায়গা পূর্ণ হয়ে গেছে।"

তাদের কথা শেষ হতে না হতেই,, রুমি ডাইনিং টেবিল থেকে মাথা উঁচু করে বলল,,,

"উফফ! প্লিজ তোমরা দুইজন এমন ইমোশনাল ডায়লগ দিও না, না হলে আমি কান্নার সাথে পরোটা ডুবিয়ে খাবো।"

রুমির কথা শুনে দুই জনেই হেসে দিলো।। ধীরে ধীরে টেবিলে এসে হাজির হলো আয়াজ, রাফাজ, আয়নাম সাহেব,রাজিয়া বেগম। জারিন আর আসমা সুলতানা চা আর ভুনার প্লেট নিয়ে হাজির।।

সবাই এক সাথে খাওয়া শুরু করলো, সাথে গল্প।। রাজিয়া বেগম এর মনটা যেনো ভরে উঠলো। তার পরিবার আজ পূর্ণ। তিনি কিছুটা আবেগী হয়ে বললেন,,,

"এরকম একটা ভরা আর গুছানো খাওয়ার টেবিল দেখার জন্য মনটা সব সময় মুখিয়ে থাকতো কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে আজ আমার সেই দুয়া কবুল করেছেন।। আমার দোয়া সবার সাথে আছে আমার বাচ্চারা,,,সুখে থাকো সবাই,,,"

সবাই তাঁর কথায় অনেকটাই আবেগজ হয়ে ওঠে।। রাফাজ মায়ের হাতে হাত রেখে বলে,,,"মায়ের দোয়া কখনোই বিফলে যায় না আম্মা,,,"

রাজিয়া বেগম এবার কিছুটা হেসে পরিস্থিতি শান্ত করতে বলে,,,"হ্যাঁ...এখন শুধুই একটাই দোয়া আমার দাদুভাই এর পাশের চিয়ার ভরাট হোক,,,তাহলে আরো পূরণ হবে আমার পরিবার।"

তাঁর কথায় আয়াজ এর গলায় রুটি আটকা পড়ে যেনো। এদিকে রুমি, রাফাজ,জারিন আর আসমা সুলতানা মিটিমিটি হাসে। আয়াজ পানি খেলো,,,চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই চঞ্চন পাখির আদুরে চেহারা।। আয়াজ বলে,,,

"দাদি মা, আমার পাশের চেয়ার পূরণ হওয়ার জন্য একটা চিয়ার খালি করতে হবে,,,"

বলেই রুমির দিকে তাকালো। রুমি ছোটো ছোটো নজর করে বললো,,,"আমার দিকে তাকাচ্ছ কেনো?"

"না মানে বিয়ের বয়স কিন্তু তোরও হয়েছে বনু,,,"

রুমি নাক মুখ কুঁচকে দাদীর দিকে তাকিয়ে বলল,,,"দাদি মা থামতে বলো কিন্তু তোমার এই আদরের দাদুভাই কে।"

এই ভাবেই চলতে থাকলো হাসি,খুনসুটি। রাফাজ একটা সময় আয়াজ এর উদ্দেশে বললেন,,,"আয়াজ আজকের লাঞ্চ আমার দিক থেকে তোমাদের জন্য,,জাস্ট ইয়াং স্টার্স,,, জায়ান আর আসু কে বলে দিও কেমন,,,"

"জ্বী চাচু "

----------------

আকাশটা আজ খানিক গুমোট। গরম আছে কিন্তু ধরা দিচ্ছে না বেশি।। মেঘ আর রোদ মিশ্রিত একটা আলাদা আবহ। রাফাজ,জারিন আর রুমি তিনজন একই গাড়িতে। তারা রয়োনা হয়েছে রেস্টুরেন্টের দিকে।। হাসি গল্পের মাঝে রাস্তা কেটেছে তাড়াতাড়ি। একটা সময় রেস্টুরেন্টের পার্কিং এর মধ্যে গিয়ে থামে রাফাজ এর গাড়ি।। রাফাজ জারিন আর রুমির দিকে তাকিয়ে বলে,,,

"দুইজনে ভেতরে গিয়ে বসো।। সিট বুক করা,,, আমার নাম নিলে তারা দেখিয়ে দেবে,,,"

জারিন সিট বেল্ট খুলে গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলে,,,"আপনিও আসুন একসাথে যাই,,,"

"না এখানে পার্কিংয়ে কিছু সমস্যা হয়,,, আমি একবার সিকিউরিটি গার্ডের সাথে কথা বলে তারপর যাচ্ছি তোমরা যাও,,,"

রুমি জারিন এর হাত ধরে বলে,,,"আচ্ছা ছোটমা আমরা যাই চাচু আসুক,,,"

জারিন মাথা নাড়িয়ে এগিয়ে যায় তখনই কল আসে আসিফার রুমি কল রিসিভ করতেই ওই পাশ থেকে বিরক্তি পূর্ণ একটা কণ্ঠ ভেসে আসে,,

মেয়েটা দ্রুত বলে,,,

"কোথায় তোরা! ৫ মিনিট ধরে আমি রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে আছি তাড়াতাড়ি আয়,,,"

"তুই একা! তোর সাথে আর কেউ নেই?"

"আরে দাভাই গাড়ি পার্ক করতে গেল এখনো আসেনি আমি দাঁড়িয়েই আছি একা একা,,"

"আচ্ছা দুই মিনিট। আমরা চলে এসেছি,,, আসছি দাড়া,,,"

কল কাট হলো রুমি আর জারিন এগিয়ে গেলো।। এদিকে রাফাজ গাড়ি পার্ক করে সিকিউরিটির গার্ডের সাথে কথা বলে আসে।। এখানে গাড়ি পার্ক করলে ঘন্টায় টাকা কাটে,,, এক ঘন্টায় নাকি কুড়ি টাকা। যাক ভালই বিজনেস আইডিয়া।। রাফাজ নিজের মতো হাসে,,, অতঃপর এগিয়ে আসে গাড়ির দিকে।।

গাড়ির সামনে এসে দাঁড়াতেই তার চোখ পড়ে গাড়ির বনেট এর ওপর।। সেখানে একটা ছোট্ট কাঠের বাক্সের ওপর। সেটা নিখুঁতভাবে রাখা,,, যাতে পড়ে না যায়।।

রাফাজ একটু অবাক হয়ে বাক্সটা তোলে। কৌতূহল নিয়ে খুলে দেখেন ভেতরে একটা ময়লা হয়ে যাওয়া পুরনো কাগজের তৈরি অনেক গুলি ব্যাঙ, ঘোড়া।। রাফাজ সেগুলি ভালো করে দেখে।। মনে পড়ে এই সমস্ত কিছু রাফাজ বানাতে পারতো একটা সময়।। সে কাগজের তৈরি এই সকল কিছু বানিয়ে জায়ানকে দিত,,, কারণ জায়ানের এইসবের প্রতি ভীষণ আকর্ষণ।। ছেলেটা সব সময় রাফাজ কে রিকোয়েস্ট করত যাতে সে তাকে শিখিয়ে দেয় যে, এটা কিভাবে বানায়।।

রাফাজ বলতো,,,"আমি শেখাব না,,, আমি বানিয়ে তোমাকে দেবো তুমি ফোল্ড গুলো খুলে নিজে নিজে আবার ফোল্ড করবে,,,তাহলেই তুমি শিখে যাবে।"

রাফাজ এর কথা অনুযায়ী জায়ান শিখেও যায়।। একদিন মনে পড়ে,,, রাফাজ এর রুমের একটা দামি ফ্লাওয়ার বাস জায়ান এর বল লেগে ভেঙে যায়,,,ছেলেটা রাফাজকে সরি বলে এই কাগজের তৈরি ব্যাংক এবং ঘোড়া বানিয়ে দিয়ে।।

রাফাজ সহসা ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসে।। সে এদিক সেদিক তাকিয়ে জায়ু বলে এক বার ডাকতেই দেখা গেলো জায়ান দূরে এক গাড়ির পিছন থেকে বেরিয়ে আসছে।। রাফাজ এর ঠোঁটের কোণে হাসির দেখা মেলে।। এই প্রাপ্তবয়স্ক জায়ানকে তার কাছে সেই ছোট্ট ১২ বছর বয়সী আদুরে ছেলে লাগছে।।

একটা সময় জায়ান এসে রাফাজ এর সামনে দাঁড়ায়।তার চোখেমুখে একটা চাপা দ্বিধা,অনুতাপ কিন্তু ভেতরে কিছু বলার এক অদ্ভুত আকুলতা।। রাফাজ তার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ নীরব থাকেন, তারপর ধীরে ধীরে বলেন...

"অ্যাংরি ইয়াং ম্যান ভেতর থেকে যে এখনো বাচ্চা। তার মাফ চাওয়ার ভঙ্গি আজও সেই ছোট্ট জায়ানের মতোই রয়ে গেছে।"

মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকা জায়ান এবার ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকালো।। ওর চোখ কেমন লাল।। ভিতরের অপরাধবোধ যেনো চোখের রেটিনার ভেসে উঠেছে।।

জায়ান এর শিক্ষা ছোটবেলা থেকেই ভীষণ সুন্দর।। তার বাবা জুলফিকার সাহেব তাকে ছোট থেকে বুঝিয়ে এসেছেন,, ভুল করে মাফ চেয়ে নেওয়া মানুষকে সৃষ্টিকর্তা পছন্দ করেন এবং মাফ চাইলে কেউ ছোট হয়ে যায় না।।

জায়ান রগচটা কিংবা ঘাড় ত্যাড়া হলেও ওর মধ্যকার শিক্ষা কখনোই ওকে কারো সামনে ছোট করেনি।। সে সমস্ত ফিল্ডে নিজের পারিবারিক শিক্ষার সাথে উত্তীর্ণ হয়েছে আর ছেলে হিসাবে সে ছিল মেধাবী।।

জায়ান কে ওভাবে দাড়িয়ে থাকতে দেখে রাফাজ তাকে জড়িয়ে ধরে। চারপাশে হালকা বাতাস। কিন্তু জায়ানের বুকের ভেতর একঝড় বয়ে যাচ্ছে।

কিছুক্ষন পর সে আলতো করে রাফাজের থেকে সরে দাঁড়ায়। চোখ তার জ্বলছে, ঠোঁটের কোণে কেমন কাঁপুনি। ছেলেটা নিচু গলায় বলে ওঠে,,,

"চাচু...আমি ১৩ বছর ধরে আপনাকে ঘৃণা করেছি।

আমি ভেবে নিয়েছিলাম আমার সব থেকে কাছের মানুষটিকে আপনি ধোকা দিয়েছেন, ঠকিয়েছেন, তাকে একা ফেলে নিজের মত সুখের জীবন কাটাচ্ছেন কিন্তু আমি কখনো এসবের পিছনের কারণ জানতে চাইনি।। হয়তো কখনো জানার চেষ্টা করিনি কিংবা আপনি সেই সুযোগটাও আমাদের দেননি।। আপনার চুপ করে থাকায় আমি ধরে নিয়েছিলাম আপনি দোষী।"

সে থামে। ওর চোখের পাতা কাঁপে।জায়ান আবার ভাঙা কণ্ঠে আওড়ায়,,,

"কিন্তু আমি ভুল ছিলাম। আমার চোখ… আমার বিশ্বাস… সবই ভুল ছিল।। আপনার প্রতি আমার রাগ, বিতৃষ্ণা ,ঘৃণা সবটাই ছিল বেমানান।। উপরন্ত আপনি আমার জন্য তেরোটা বছর আগে যে স্যাক্রিফাইস করেছেন তার মূল্য হয়তো আমি আর কখনোই দিতে পারবো না।।

রাফাজ নীরবে তাকিয়ে থাকেন, চোখে অনুতাপ, অপরাধবোধ এর ছায়া।জায়ান মাথা নিচু করে বলে,,,

"আমি বুঝতেই চাইনি যে কারো জীবন থেকে চলে যাওয়া মানেই অন্য কেউ দোষী না-ও হতে পারে।।

আপনার কষ্ট, একাকীত্ব কখনো আমার চোখেই পড়েনি,, হয়তো আমি কখনো সেটা দেখতেই চাইনি।। অবশেষে আমার রাগ হেরে গেল চাচু,,, আমি জানিনা আমি কিভাবে আপনার কাছে,,,,"

রাফাজ ওকে থামিয়ে ওর দুই গালে হাত রাখলো। রাফাজ ধীরে ধীরে বলল

"এখানে তোমার কোন দোষ নেই জায়ু।। আমি তোমাকে ছোটবেলা থেকে চিনি।। আমি জানি তোমার ফুমায়ের প্রতি তোমার কত ভালোবাসা।। যখন এত কিছু হয় তখন তো তুমি অনেক ছোট।। সেই ছোট থেকে তুমি তোমার ফুমায়ের চোখে আমার জন্য পানি দেখেছো,,, আমার প্রতি তোমার রাগ হওয়া, অভিযোগ হওয়া স্বাভাবিক।। আমি কখনোই তোমাকে ভুল ভাবিনি।।

আর আমার করা স্যাক্রিফাইস সেটা শুধুই একটা বাহানা,,, তোমার জায়গায় যে কেউ হতে পারতো।। আর এমনিতেও এটাই আমার আর জারিন এর বিধান ছিল আর আমরা সেটা মেনে নিয়েছি।। তুমি আমার কাছে সব সময় আমার আরেক ভাতিজা হয়ে থাকবে,,, তুমি আমার ছেলের মত,,, আমি তোমাকে কি করে ভুল ভাবতে পারি!!

জায়ান চোখ তোলে।চোখের কোণে জমে থাকা অপরাধ বোধ এখন সেখানে একরাশ বিস্ময় আর প্রশান্তি। চাচুর মুখে নিজের প্রতি এমন কথা সে আশা করেনি। অনেক দিনের জমে থাকা পাথরটা যেনো একটু একটু করে গলে যাচ্ছে। জায়ান আবারও ধীরে ধীরে বলে,

“চাচু, আপনি জানেন না,, আমি কতবার চাইছিলাম আপনার কাছে এসে, আপনাকে জিজ্ঞেস করতে যে,আপনি কেন এমন করলেন? কিন্তু আমি পারিনি,,, আপনার এড়িয়ে যাওয়া আমার মধ্যে এক ধরনের রাগ সৃষ্টি করে। আজ এত বছর পর বুঝতে পেরেছি আমার সেই রাগ ছিল বেমানান,,,"

রাফাজ জায়ানের মাথায় হাত রাখেন। হাতের ছোঁয়ায় যেনো সমস্ত দূরত্ব মিলিয়ে যায়। রাফাজের কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু ভারী,,,

“মানুষের অনুভূতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দুর্বোধ্য হলো ভুল বোঝাবুঝি। এই ভুল বোঝাবুঝি মানুষকে আপন মানুষদের থেকেও আলাদা করে দেয়,,, আমি তোমাকে কখনোই দোষারোপ করিনি জায়ান কখনোই না,,,

জায়ান এবার নিজেই রাফাজকে জড়িয়ে ধরে। এতদিনের জমে থাকা কষ্টগুলো হঠাৎ করে দুর হয়ে যায়।। জায়ান কখনোই রাফাজকে দোষী মানতে চায়নি। কিন্তু পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করে।।

রাফাজ কণ্ঠ ভার করে বলেন,

“আমার জায়ান,,, অনেক বড় হয়ে গেছে।। আজকের তোমার করা এই স্বীকারোক্তি বুঝিয়ে দিয়েছে তুমি ছেলে হিসেবে কতটা উত্তম,,,"

এদিকে পেছনের গাড়ির দরজার কাঁচের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা জারিন তখন নীরবে সব দেখছে। তার চোখেও জলের রেখা। এত বছর পর তার ফেলে আসা সম্পর্কগুলো আবার যেনো একসাথে হচ্ছে।। সে এসেছিল রাফাজ এর এত দেরি হওয়ার কারণ দেখতে কিন্তু এখানে এসে যা দেখল তা যেন জারিনের চিত্ত প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিল

এই পরিবেশে হালকা বাতাসে কাগজের তৈরি ব্যাঙ আর ঘোড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে বেড়াচ্ছে সম্পর্কের পুরনো ছায়াগুলো…যেগুলো অবশেষে আলোয় এসে দাঁড়িয়েছে।

---

রাফাজ আর আর জায়ান রেস্টুরেন্টে ঢুকতে যাবে কি? ঠিক তখনই তাদের পিছন থেকে ডেকে ওঠে আয়াজ।। ছেলেটা হেলমেট খুলতে খুলতে এগিয়ে আসে। পরনে সাদা শার্ট আর জিন্স।। সে একেবারে কনস্ট্রাকশন সাইট থেকে আসছে।। ছেলেটা জায়ান রাফাজ কে পাশাপাশি দেখে চোখ ছোট ছোট করে বলে,,,

"বাহ্... যেই একটা ভাতিজাকে পেলে অমনি আমায় ভুলে গেলে!!"

রাফাজ হেসে আয়াজ কে নিজের আরেকপাশে এনে বলে,,," কিসের ভাতিজা!! তোদের থেকে বেশি ইয়াং লাগে, আমাকে বুঝেছিস!!"

"তুমি তো এভার গ্রিন! কি খাও বলতো লুকিয়ে! এখনও এত হ্যান্ডসাম কি করে?"

আয়াজ আর রাফাজ একটু কেশে নিয়ে বলে,,,"সেটা তোরা বুঝবি না,,,প্রেয়সীর জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে নিজেকে মেনটেন করেছি,,,"

জায়ান আর আয়াজ দুই জনেই মুখ টিপে হাসে। অতপর তিন জনে একসাথেই ভিতরে প্রবেশ করে।।

দুই দিকে দুই ভাতিজা এর মাঝে তাদের চাচু কিন্তু দুর থেকে তাদের বন্ধু মনে হচ্ছে।। রেস্টুরেন্টের প্রায় সবাই তাদের দিকে তাকিয়ে আছে বিশেষ করে রমণীরা।।

এদিকে দুর থেকেই টেবিলে বসে থাকা জারিন, রুমি আর আসিফা নিজেদের তিন হ্যান্ডসাম পুরুষদের দেখে ফেলে,, সাথে সাথেই তিন জিনেই হা করে তাকিয়ে থাকে সেদিকে।। তিন রমণীর পলক যেনো পড়ে না।। ইসস তাদের পুরুষ গুলো এত নজরকাড়া কেনো!!

জারিন আর রাফাজ এর চোখ চুখী হতেই ছেলেটা চোখের ইশারায় আশ্বাস দিলো। হয়তো জায়ান এর ব্যাপারটা জানাতে চাইলো।। এইদিকে জায়ান এর অপলক দৃষ্টি রুমির উপরেই,,,মেয়েটা চোখ সরিয়ে নিয়েছে।। জায়ান এর এখন একটাই লক্ষ্য এই মেয়ের মান,,অভিমান ভাঙানো।। এদিকে আয়াজ দুর থেকেই আসিফা কে ভ্রু নাচিয়ে একটা দুষ্টু হাসি ছুঁড়ে দিতেই আসিফা শুকনো ঢোক গিলে পানি খায়।।

তিন পুরুষ এসে পাশাপাশি চেয়ারে বসে।। রাফাজ জিজ্ঞাসা করল,,,"জান মানে,,, আব,,,জারিন কিছু অর্ডার দেওনি তোমরা?"

রাফাজ খানিক কেশে উঠলো। জারিন এর তীক্ষ্ম দৃষ্টি।। এদিকে চার ছেলে মেয়ে মুখ টিপে হাসে।। জারিন মেনু বুক রাফাজ এর দিকে এগিয়ে বললো,,,"আপনি অর্ডার করুন যেটা বেস্ট মনে হয়। আর আয়াজ তুমি কি একেবারে অফিস থেকে ফিরলে!?"

"জ্বী ছোটমা,,,"

"জায়ু,,,"

"হ্যাঁ ফুমা,,,"

"পানি খাও,,,ঘেমে গেছো তো"

"জ্বী"

জায়ান ইচ্ছে করেই রুমির হাতের মাঝে থাকা গ্লাস টেনে নিলো তাতে রুমির হাতের উপরে জায়ান এর রুক্ষ হাতের ছোঁয়া লাগলো। রুমি ওর দিকে ধারালো চোখে তাকাতেই জায়ান ঠোঁট টিপে হাসে।। এদিকে আসিফা চুপচাপ বসে। কেনো জানি খুব অসস্তি হচ্ছে। আয়াজ ওর দিকে কি ভাবে তাকিয়ে আছে।

রাফাজ কথা বলছে টুকটাক তার দুই ভাতিজার সাথে,,,মূলত তাদের কথা ব্যবসা বিষয়ক।।

এদিকে হুট করে আসিফার কল আসে,,,মেয়েটা এক্সকিউজ করে উঠে যায় বাহিরে দিকে।। কেউ সেদিকে বেশি নজর না দিলেও আয়াজ ঠিকই মেয়েটাকে লক্ষ করে।। হাতে গোনা দুই মিনিট পরেও মেয়েটাকে আসতে না দেখে আয়াজের অস্বস্তি বাড়ে। ছেলেটা অবচেতনেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। রাফাজ ওর দিকে তাকালে সে এক কথায় বলে ওঠে—

"ওয়াশরুম থেকে আসছি,,,"

আয়াজ চলে যেতেই সবাই আবার নিজেদের মত কথা শুরু করে।। আয়াজ বেরিয়ে দেখে আসিফা করিডোরের শেষ মাথা গিয়ে দাড়িয়ে কারোর সাথে হেসে কথা বলছে।। ছেলেটার খানিক রাগ হলো।। কই ওর সাথে তো এত হেসে কথা বলে না।।

"নাহ তুমি আগে কথা বলবে মায়ের সাথে,,,আমি বললে সমস্যা হবে,,,আর"

আসিফা আরো কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই কেউ ওর ফোন ছিনিয়ে নিলো বাজ পাখির মত।। মেয়েটা ভিমড়ি খায়। চমকে পিছনে তাকাতেই দেখে আয়াজ ওর দিকে তাকিয়ে আছে,,,কেমন ক্রুদ্ধ নজরে।। আসিফা ভ্রু কুঁচকে ওর হাত থেকে ফোন নিতে গেলে ছেলেটা হাত উচু করে।। আসিফা লাফাতে শুরু করে,,,কিন্তু এই তাল গাছের নাগালের বাইরে সে।। মেয়েটা এবার কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলে,,,

"কি হচ্ছে ফোন টা দিন,,,"

আয়াজ ফোনটা এক হাতে উপরে ধরে রেখেছে, আর অন্য হাতে পকেটে গুঁজে ঠান্ডা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। চোখে আগুন, ঠোঁটে বিদ্রুপ হাসি। গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করে ছেলেটা।

"কার সাথে কথা বলছিলে এত হেসে?"

আসিফা চোখ মুখ শক্ত করেই বলে,,,"আপনাকে বলব কেনো?"

"বলতে তো তোমাকে হবে।"

আসিফা কিছুটা ভেবে বলে,,,"বিশেষ কেউ।"

আয়াজ ভ্রু কুঞ্চিত করে। দাঁত খিঁচে বলে,,,"কে সে?"

"বয়ফ্রেন্ড।"

আসিফার স্পষ্ট কথায় আয়াজ কিছুটা চমকে তাকায়। অতঃপর ফোনটা উঁচু করে ধরেই লাস্ট কল লিস্ট চেক করে সেখানে লেখা..."annu"

নামটা দেখে মুহূর্তে ছেলেটার মুখ অন্ধকার হয়ে যায়। সে কি বড্ড দেরি করে ফেললো মেয়েটার মনে নিজের জায়গা করে নিতে? ঠোঁট শক্ত করে মুখ গম্ভীর করে ফেলে আয়াজ। ভেতরটা কেমন জ্বালা করে উঠলো তার।ঠাণ্ডা স্বরে উচ্চারণ করে সে,,,

"কে এটা?"

আসিফা মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে,কৌতুকের ছায়া টেনে বলে,,,

"হুম। খুব আপনজন, খুব স্পেশাল। এবার প্লিজ ফোন টা দিন,,, আপনি ফোন কেটে দিয়েছেন হুট করেই,,, নিশ্চয়ই ও চিন্তা করছে"

আয়াজের মুখ শক্ত হয়ে যায় আরও। দাঁত পিষে বলে,,,

"তোমার কাছের মানুষ!! পাগল পেয়েছো আমাকে! আসিফা ভালই ভালই বলো কে এই রা*স্কেল!"

আসিফা এবার আর মুখে হাসি ধরে রাখতে পারে না, কিন্তু সেটা প্রকাশও করে না। আয়াজের কথায় কিছুটা মিছে রাগ দেখিয়ে বলে,,,

"সব কিছু জানতে হবে নাকি আপনাকে? আর হ্যাঁ ওকে ভুল করেও এসব বাজে কথা বলবেন না বলে দিলাম।"

আয়াজ এবার এক পা এগিয়ে আসে। গলার স্বর আরও নিচু, আরও দাবিদার। সে কোনো দ্বিধা ছাড়াই আসিফার কোমরে হাত রেখে ওকে নিজের দিকে টেনে নিল,,, রাগে মুখের অবস্থা দেখার মত। এদিকে আয়াজের ছোঁয়ায় আসিফা যেন কূল কিনারা হারালো,,, বড় বড় চোখ করে নিজেকে ছাড়াতে ছেলেটার বুকে দুই হাত রাখল কিন্তু ধাক্কা দেওয়াটা আর হলো না তার আগেই আয়াজ শক্ত কণ্ঠে বলে উঠলো,,,,

"হ্যাঁ, জানতে হবে। কারণ তুমি আমার অনেক কিছু হয়ে উঠছো। সেদিন আমার কথায় কিছু বোঝোনি! নাকি বুঝতে চাও নি!! আর তোমার ‘স্পেশাল’ কারা, সেটা জানার অধিকার আমার আছে,,,তোমার ফোন আমার কাছেই রইলো,,,তোমার স্পেশাল মানুষের একটা হাত আর একটা পা ভাঙার পর ফোনটা তুমি পাবে,,,তারপর তোমার ব্যবস্থা হবে।।"

আসিফার বুক ধক করে ওঠে। আয়াজ এর নিরেট হুমকি মেয়েটার গলা শুকিয়ে দিলো।। আয়াজ ওকে ছেড়ে চলে যেতে নিলেই আসিফা পিছন থেকেই ওর শার্ট খামচে ধরে আকুতি স্বরে বলে,,,

"এই এই দাঁড়ান প্লিজ,,, আয়াজ ভাই আমার কথা,,,"

আসিফা কে আর বলতে না দিয়ে আয়াজ নিজেই পিছন ফিরে ওর দিকে তাকালো,,, অতঃপর চোখ ছোট ছোট করে বলল,,,"তোমার বাবাকে বলবে জায়ান এর অর্ধেক সম্পত্তি আমার নামে লিখে দিতে"

আসিফা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে বললো,,,"কেন?"

"ভাই ডেকেছো আমাকে! তাই তোমাদের সম্পত্তির ভাগিদার আমিও হব ,,,তাই না!!"

"আমি তো,,,"

"চুপ একদম,, আমি তোমার কোন জনমের ভাই হ্যাঁ!! আর একবার ভাই বললে না..."

"কি করবেন!?'

আয়াজ বাকা এসে ওর দিকে ঝুঁকে গিয়ে ধীরলয়ে বলল,,,"কিস করে ফেলব!"

আসিফার সারা শরীর ঝিনঝিন করে ওঠে। চোখ বড় বড় করে সামনে দাঁড়ানো ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল।। আয়াজ বাঁকা হেসে মেয়েটার দিকে আরো ঝুঁকে পড়ল।

"You are mine Darling... তোমার উপর সমস্ত অধিকার আছে আমার।। তোমার হাসি,তোমার মিষ্টি সুর, তোমার নরম ঠোঁট আর পুরো তুমিটাই জাস্ট আমার।।

আসিফা মাথা নিচু করে দাড়িয়ে রইলো। আয়াজের প্রতিটা কথা চিত্ত কুলে যেন দামামা বাজাচ্ছে।। এই মানুষটাকে যতটাই ইগনোর করতে চায় মানুষটা ততটাই তার কাছে চলে আসছে।। আয়াজ এর জন্য মনের ভেতর থাকা অভিমান,রাগ সবটাই যেন একদম গলে জল হয়ে যাচ্ছে।। আসিফা হাসফাঁস করে কোনো রকম বলে,,,

"কেনো আমি আপনার কে?! কেন আমার প্রতি আপনার অধিকার আছে?? আপনি বলেছিলেন আপনার থেকে যেন আমি দূরে থাকি,,, কোন রকমের পাগলামি না করি,,, তখন আমার অনুভূতি আপনার কাছে ফেলনা ছিল এখন কেন এসেছেন,,,!

আয়াজ শুকনো ঢোক গিলতে লাগলো।। মেয়েটাকে দেওয়া আঘাত অনেক বেশি ছিল সে জানে।। সে আসিফা কে নিজের দিকে টেনে আনলো। ওর দুই বাহু ধরে আকুল স্বরে বলল,,,,

"তখন পরিস্থিতি আলাদা ছিল আসু,,,তোমার প্রতি আমার অনুভূতি থাকলেও সেটা প্রকাশ করা বারণ ছিল। আসু প্লিজ আমাকে বোঝো,,,"

আসিফা জলে ভরপুর চোখ তুলে তাকালো, আয়াজের দিকে,,,"কে বারণ করেছিল আপনাকে?"

"কেউ না,,,, কিন্তু তখন আমাদের ফ্যামিলি প্রবলেম, চাচু ছোটমা সবকিছু মিলিয়ে আমি ফ্রাস্টেটেড ছিলাম। ভেবেছিলাম আমি যদি এগাই তাহলে যা কিছু আছে সেটাও ভেঙে যাবে।"

আসিফা কথা না বলেই আয়াজ এর হাত থেকে ফোনটা নিয়ে কঠিন কণ্ঠে বললো,,,"ও আমার খালাতো ভাই আনাস,,,হয়েছে!"

আসিফা চলে যেতে নিলে আয়াজ ওকে টেনে একটু কোণে নিয়ে যায়। সহসা দেয়ালের সাথে আটকে ধরে।। মেয়েটা খানিক ভরকে যায়। আয়াজ চোখে চোখ রেখে দৃঢ় কন্ঠে বলল,,,

“তোমাকে ভালোবাসি বলার জন্য হয়তো হাজারটা নাটক করতে হবে না, আসিফা... আমার আচরণই নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ,,, দ্যাট আই লাভ ইউ,,,

তখন পরিস্থিতি অনুকূলে রেখে আমি যা বলেছি সেই কথা মনে রেখে তুমি আমাকে দূরে ঠেলে দিতে পারো না,,, আমি সেটা হতে দেবো না।।"

আসিফার গা ছমছম করে উঠলো। সে নিজেও এই স্বীকারিত্ব চেয়েছিল।। আসিফা ভারিক্কি নিঃশ্বাস ফেলে। জানে, এই অনুভূতিটা স্বস্তির, আশ্রয়ের।।

আসিফা একটু থেমে খুব আস্তে জিজ্ঞেস করল,,,

“তাহলে... সেই দূরে থাকার কথা,,,"

আয়াজ এবার আসিফার হাতটা নিজের তালুতে নিয়ে মুঠো করে ধরল,,,

“বললাম ওগুলো সব ছিল নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা... কিন্তু, আমি ব্যর্থ হয়েছি। বারবার।

চোখে চোখ ,ভারি নিঃশ্বাসের সাথে কমল নিঃশ্বাস এর মেলামেশা, দুই হৃদয়ের অনুভূতির এক্কা দোক্কা খেলা। সব মিলিয়ে দুইজনেই বোঝে তারা আর তাদের মাঝে নেই। আসিফা এবার একটু চুপসে যাওয়া মুখে, চাপা গলায় বলল,

“তাহলে আমি আপনাকে নিজের ফাঁদে ফেলেছি?”

“না... আমি ইচ্ছা করেই পড়েছি।”

--------------

আসিফা চিয়ারে বসার পরপরই আয়াজ এসে হাজির হলো।। আয়াজ কে দেখেই রাফাজ রসিক কন্ঠে বলে,,,

"কি ভাতিজা ওয়াশরুমে কি লাইন একটু বেশি ছিল?"

আয়াজ মুচকি হেসে আসিফার দিকে তাকিয়ে বলল,,,"হ্যাঁ চাচু,,,আজকাল সব জায়গায় লাইন দিতে হয়।। "

খাওয়া দাওয়া শুরু হয়েছে।। রুমি চুপচাপ খাচ্ছে আসিফা মাঝে মাঝে ওর দিকে চেয়ে চেয়ে অনেক কথা বলছে।। জায়ান হাজার চেষ্টা করেও রুমির সাথে একটা বাক্য বিনিময়ও করতে পারল না।। মেয়েটা সেই সুযোগ দেয়নি।। টেবিলে নানান পদের খাবার। জায়ান জানে রুমির চিকেন কত ফেভারিট।। তাই টেবিলে থাকা চিকেন ডিস রুমির দিকে এগিয়ে দিতে রুমিও তাহ পাতে তুলে নিলো,, খাবারে কিসের রাগ! দুই চামচ খেতেই রুমি ঝালে নাজেহাল হয়ে কাশতে আরম্ভ করলো।। জায়ান চট জলদি পানি এগিয়ে দিলো। আসিফা একবার চিকেন ডিস এর দিকে তাকিয়ে বলল,,,

"রুমি তুই খেলি কেনো এটা!! আমরা সবাই জানি তুই ঝাল খেতে পারিস না,,,তাই তোকে এটা দিইনি"

আসিফার কথায় রুমি সুস টানতে টানতে জায়ান এর দিকে তাকালো।। এদিকে জায়ান হতবাক।। সে সত্যিই জানে না যে রুমি ঝাল খেতে পারে না।। জানার কথাও না।। আয়াজ আর আসিফা রুমির ব্যাপারে যে সব খুঁটিনাটি বিষয় জানবে তার অনেক কিছুই জায়ান এর না জানার কথা। কারন রুমির সাথে তার দিন কেটেছে ছোটো বেলায় তাও অল্প সময়ের জন্য। কিন্তু সেই সময় ছিল খাঁটি সোনার,,,মধুর স্মৃতি।। জায়ান চোখ বন্ধ করে মনে মনেই বললো,,,

"শিট... কেনো সব বিগড়ে যাচ্ছে,,,,যতই সব ঠিক করতে চাই ততই,,,"

রুমি আর কিছু বলে না। একটা সময় তাদের খাওয়া দাওয়া শেষ হলো।। ধীরে ধীরে সবাই উঠে হাত ধুতে গেলো রয়ে গেল রুমি আর জায়ান।। জায়ান নিচু গলায় বলল,,,

"আমি জানতাম না যে তুমি ঝাল খেতে পারো না,,,আমি ইচ্ছে করে ওটা দিইনি তোমায়,,,"

রুমি ওর দিকে তাকালো না। শুধুই বললো,,,,"জানবেন কি করে! আমার জন্য আপনার মনে সর্বদা বিতৃষ্ণা ছিলো,,,,সেখানে আমার ভালো মন্দ আপনার না জানার কথা।"

জায়ান আহত চোখে চেয়ে বলল,,,"আমায় ভুল ভাবছো,,,"

"ঠিক ভাবতে চাইনা,,,"

"আমার দিকে তাকিয়েও কথা বলা যায় না!"

"নাহ যায় না,,,"

"রুমি..."

জায়ান এর আকুল কন্ঠ।। রুমি পাত্তা দেয় না চুপ চাপ উঠে যায়।। ধীরে আবার টেবিল ভরাট হয়। রাফাজ এবার সবার জন্য ডিজার্ট অর্ডার দিয়েছে।।

সবার মাঝে আসিফা বলে ওঠে,,,,

"আচ্ছা চাচু,,,আমার একটা প্রশ্ন আছে।"

"বলো পাখি,,,"

"আচ্ছা তোমার কথা অনুযায়ী,,,ওই অলিভার বলেছিল যে,যতদিন পর্যন্ত তার বোন বাঁচবে তুমি ফুমাকে বিয়ে করতে পারবে না,,,তাহলে কি সেই মেয়েটা...."

রাফাজ রুদ্ধ শ্বাস ছেড়ে বললো,,,"হুমম,,,সে আর নেই।"

জারিন রাফাজ এর দিকে তাকালো।। সবার কৌতূহলী দৃষ্টি রাফাজ এর দিকে।। রাফাজ কিছুক্ষন চুপ থেকে বলে ওঠে,,,,

"প্রায় পাঁচ মাস আগে রাতের বেলায় আমার কাছে অলিভার এর কল আসে,,,,

.

"You have to come to New York, Rafaz. Even in her last moments, she wants you, only you."

বার্তা পেয়েই রাফাজ পরের দিনের ফ্লাইটেই নিউ ইয়র্ক যাওয়ার জন্য বেরিয়ে যায়।। আর তেরো বছর পর পা রাখে এই বিষাক্ত শহরে।। এই শহর রাফাজ কে নিজের স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যেতেতো সাহায্য করেছে কিন্তু তাঁর কাছ থেকে তার সবচেয়ে মূল্যবান কিছু কেড়ে নিয়েছে।।

রাফাজ কে অলিভার এর গাড়ি পিক করতে আসে।। গাড়ি থামে সোজা নামকরা এক বৃহৎ হাসপাতালের সামনে।। রাফাজ ধীরে ধীরে নেমে দাঁড়ায়। গার্ড দের নির্দেশ অনুযায়ী রাফাজ সোজা গিয়ে দাঁড়ালো একটা কেবিন এর সামনে। এই করিডোর শুধুই গার্ড দিয়ে ভরা।। রাফাজ ধীর পায়ে কেবিনের ভিতরে প্রবেশ করে।

জেনিলিয়াকে এখন দেখা যাচ্ছে এক গভীর ঘুমের ভেতরে,যেন সময়ের বাইরে কোনও এক অন্য জগতে সে হারিয়ে গেছে। তেরো বছর ধরে কোমায় থাকার পর তার চেহারাটা অনেকটাই পাল্টে গেছে।

তার মুখটা একেবারে শান্ত। সাদা বালিশে মাথা রাখা, নিঃসাড় দেহে নল জড়ানো, গালে হালকা হলদে ছায়া পড়েছে, ঠোঁট কিছুটা শুকনো।

। একটুও না নড়ে শুয়ে আছে, যেন সময় তার ওপর থেমে গেছে।

রাফাজ তাকিয়ে থাকে অপলক।। এই সেই মেয়ে যে রাফাজ কে পাওয়ার জন্য সব করতে প্রস্তুত ছিলো। রাফাজ এর গলা শুকিয়ে আসে। সে কখনোই চাইনি জেনিলিয়ার অবনতি।। এই মেয়ে জানেই না যে তার জন্য রাফাজ ও অপূর্ন রয়ে গেছে এখনও।।

"ওর কাছে বেশি সময় নেই,,,ডক্টর বলে দিয়েছে ও আর আমাদের মাঝে বেশিক্ষণ থাকবে না।"

পিছন ফিরে অলিভার এর দিকে তাকালো রাফাজ।

মানুষটা একদম ভেঙ্গে গেছে।। জেনিলিয়া তার শেষ সম্পদ।। রাফাজ কিছু বলতে পারলো না।। ধপ করে সোফায় বসে পড়লো। ধীরে ধীরে সময় গড়াতে লাগলো । সূর্য ঢলে পড়তে লাগলো পূব আকাশে সাথে যেনো নিয়ে যেতে লাগলো জেনিলিয়ার বাঁচার আশা।। হৃদস্পন্দন মাপার যন্ত্রে শব্দ হতে লাগলো।। অলিভার পাগল প্রায় হয়ে ওঠে,,,ডক্টর আসে,চেক করে,নিজেদের হাত ঘড়ি দেখে।।

রাফাজ প্রাণহীন হতে এগিয়ে গেলো জেনিলিয়ার দিকে।। ঠিক তখনই হলো কোনো মিরাকেল,,, জেনিলিয়া ধীরে ধীরে চোখ খুলে রাফাজ এর দিকে তাকালো তত্পর সবাই কে কিংকর্তব্য বিমূঢ় করে দিয়ে ঠোঁট নাড়ালো।। নাহ এটা হওয়ার কথা না,,, কারণ গত তেরোটা বছর জেনিলিয়া চোখ তো খুলেছে কিন্তু কথা বলতে পারেনি।।

সে ঠোঁট নাড়িয়ে কি যেনো একটা বললো।। রাফাজ দুরু দুরু বুকে নিজের কান ওর ঠোঁটের সামনে নিয়ে গেলে শুনতে পায়,,মেয়েটা একদম মিহি স্বরে বলছে,,,

"আমায় কেনো ভালো বাসলে'না রাফাজ?"

শুধু একটা বাক্য ছিল না। সেটা ছিল একটা বিস্ফোরণ। রাফাজের পা যেন হঠাৎ জমে গেলো। পুরো শরীরটা কেঁপে উঠল। চোখে পানি এসে গেলেও সে ঠিক ঠাহর করতে পারল না,,,এটা কষ্টের জন্য, না তীব্র অপরাধবোধে।

সে ভাবেনি...এভাবে, এই মুহূর্তে, তেরো বছর পর, যখন মৃত্যুর কিনারায় দাঁড়িয়ে একটা মেয়ে, তখন সে এমন একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেবে!!

রাফাজের বুকটা যেন হাহাকার করে উঠলো। সেই প্রশ্নের ভেতর ছিল তেরো বছরের তীব্র না-পাওয়ার যন্ত্রণা, ভালোবাসায় জয়ী না হওয়ার ব্যর্থতা।

তার ঠোঁট কাঁপতে থাকে। সে জেনিলিয়ার ঠান্ডা হাতটা নিজের কাঁপা হাতে ধরে ফেলে।

ধীরে ধীরে বলে উঠলো, ভাঙা কণ্ঠে,,,

"আম সরি... আমি তোমার ছিলাম না কখনোই,,,"

রাফাজ এর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে।

সে জানে, সময় বড্ড অল্প। হয়তো এইটাই শেষ কথা। আর জেনিলিয়া?

সে চোখের কোণ দিয়ে একফোঁটা অশ্রু ফেললো।মৃদু হাসল…এবং হঠাৎ… হৃৎস্পন্দনের যন্ত্রে আলোর ঢেউ থেমে গেল। থেমে গেল শব্দ।

অলিভার চিৎকার করে উঠলো।। জেনিলিয়া আর নেই,,,পৃথিবী থেকে একটা প্রাণ বিদায় নিলো ভালোবাসা হীনা হয়ে,,,প্রেম কে না পেয়ে।।

.

"জেনিলিয়া ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তাই ওর জানাযা হয়,,,সেই নামাজ আমি পড়াই।। দাফন শেষ করেই আমি ফিরে আসি,,,"

রাফাজ এর কথা শেষ।। পুরো টেবিল থমথমে।। জারিন কেঁদে ফেলে। সেই মেয়েটার জন্য মনের মধ্যে তৈরি হয় একরাশ বেদনা।।

#জটিল_প্রেম সমস্ত পার্ট একত্রে কমেন্টে।

ক্রমশ

--------------(সবাই নিজেদের মতামত জানাবেন। অনেক কমেন্ট করবেন।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন