ফন্ট সাইজ:
থিম:
Crown Of Shadows

২১তম পর্ব

লেখক: SADIYA AFRIN

#crown_of_shadows 

#sadiya_afrin
{কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ}
পর্ব ২১
বিকেলের তপ্ত সোনালী আলো তখন ধীরে ধীরে শান্ত ও নরম হয়ে আসছে।
ঢাকার ব্যস্ত ও সুদীর্ঘ রাজপথ পেরিয়ে নাইরা নিজের প্রিয় Kawasaki Ninja ZX-25R বাইকটি অত্যন্ত নিখুঁত দক্ষতায় চালিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে।
কালো হেলমেটের কাঁচের ওপার থেকেও তার মুখের সেই বাঁধভাঙা মিষ্টি হাসিটা খুব স্পষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছিল। কত দীর্ঘ বছর পর সে এমন একটি অমলিন ও নিঃস্বার্থ দেখা করতে যাচ্ছে, যা তাকে এক মুহূর্তে শৈশবের সেই চেনা ও নিষ্পাপ পুরোনো দিনগুলোর সোনালী স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
সেই ছোটবেলার প্রাইমারি স্কুল জীবন।
পারিবারিক আবহে পাশাপাশি বাসার মধুর দিনগুলো।
ছোট ছোট তুচ্ছ বিষয় নিয়ে অকারণ ঝগড়া আর খুনসুটি।
আর একদল দারুণ পাগলাটে শৈশব বন্ধুদের ভিড়।
প্রায় আধাঘণ্টা একটানা রাইড করার পর নাইরা ঢাকার একটি শান্ত, সুপরিসর ও অভিজাত রেসিডেন্সিয়াল এলাকার সীমানায় এসে নিজের স্পোর্টস বাইকের গতি কমাল।
তার ছোটবেলার আরেক বান্ধবী রাইসা তাকে আগেই মেসেজে সুনির্দিষ্ট ঠিকানাটা পাঠিয়ে দিয়েছিল।
নাইরা বাইকের গতি আরও কমিয়ে চারপাশে একপলক চোখ বোলালো এবং একটা তিনতলা দৃষ্টিনন্দন বাড়ির সুসজ্জিত মেইন গেটের সামনে এসে বাইক স্ট্যান্ড করল।
হেলমেটের কাঁচ ও স্ট্র্যাপ খুলতে খুলতে সে যখন মাথা তুলল, ঠিক তখনই বাড়ির ভেতরে থাকা মেহগনির গেট ঠেলে পরিচিত ও উচ্ছ্বসিত একটি পুরুষালী কণ্ঠ ভেসে এলো—
— “নাইরা না?”
নাইরা চট করে ঘুরে তাকাতেই তার ফর্সা মুখ মুহূর্তের মধ্যে আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
— “আলভী!”
একটা বেশ লম্বা, সুদর্শন ও সবসময় হাসিখুশি থাকা তরুণ দ্রুত পায়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে তার দিকে এগিয়ে এলো।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য দুজনেই গভীর বিস্ময় আর কৌতূহল নিয়ে একে অপরের চোখের দিকে চেয়ে রইল। সময়ের স্রোতে দুজনেই কতটা বদলে গেছে!
তারপর আলভী নিজের স্বভাবজাত ভঙ্গি দিয়ে হো হো করে হেসে উঠে বলল—
— “তুই সত্যিই কিন্তু অনেক বড় হয়ে গেছিস, নাইরা! সেই ছোটবেলার ফ্রক পরা নাইরা আর এই নাইরার মধ্যে তো আকাশ-পাতাল তফাত!”
নাইরা নিজের হেলমেটটা বাইকের হ্যান্ডেলে ঝুলিয়ে মিষ্টি হেসে জবাব দিল—
— “আপনিও কিন্তু খুব একটা কম বড় আর গম্ভীর হননি, আলভী ভাই!”
আলভী সঙ্গে সঙ্গে কাল্পনিক বিরক্তি ও নাটকীয় ভঙ্গি করে বলে উঠল—
— “অ্যাই! এই ‘আপনি’ আর ‘ভাই’ বলাটা কিন্তু এখনই একদম বন্ধ কর! ছোটবেলার পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে কেউ এমন ফর্মাল আর পর পর ভাব নিয়ে কথা বলে নাকি?”
নাইরা এবার মনের ভেতর থেকে মুক্ত ঝরনার মতো সত্যিকারের স্বস্তির হাসিতে হেসে ফেলল।
কতদিন পর মির্জা ভিলার সেই থমথমে রাজকীয় গম্ভীর পরিবেশের বাইরে এসে তার মুখে এমন নিঃসংকোচ স্বস্তির হাসি ফুটল!
ওরা বাড়ির সুন্দর বাগানের সীমানায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতে লাগল।
আলভী জানাল, তাদের সেই পুরোনো বাড়িটা বিক্রি করে কয়েক বছর আগে তারা পুরো পরিবার নিয়ে এই নতুন শান্ত এলাকায় শিফট করেছে। সে এখন তার বাবার দীর্ঘদিনের ফ্যামিলি ট্রেডিং বিজনেস ও রিয়েল এস্টেটের কাজে হাত লাগিয়েছে।
নাইরা জবাবে নিজের লন্ডনের ব্যাচেলর লাইফ, কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং মেডিকেল স্টাডি আর ইমার্জেন্সি হাসপাতালের প্র্যাকটিক্যাল কাজের কিছু মজার ও রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতা শেয়ার করল।
আলভী অবাক চোখে ভুরু কুঁচকে বলে উঠল—
— “তার মানে তুই এখন সত্যিই ফুল-টাইম সার্জন মোডে ঘুরে বেড়াস? গায়ে সাদা অ্যাপ্রন আর গলায় স্টেথোস্কোপ নিয়ে ঘুরে বেড়ানো সেই ভাব?”
— “সব সময় না। তবে কাজের সময় কোনো ছাড় নেই। আর ইমার্জেন্সি ওটি কল তো আর মানুষের মুড বা আরাম জিজ্ঞেস করে রাতে আসে না!”
কথাটা শুনে দুজনেই আবার পুরোনো দিনের মতো প্রাণখুলে হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ পর ওরা দুজন হেঁটে পাশের একটা ছায়াবৃত ও শান্ত ক্যাফেতে গিয়ে পাশাপাশি দুটি কাঠের চেয়ারে গিয়ে বসল।
বছরের পর বছর পর দেখা হওয়া দুই পুরোনো বন্ধুর কথা ও গল্পের ঝুড়ি যেন কোনোভাবেই শেষ হতে চাইছে না। কখনও ছোটবেলার স্কুলের কড়া টিচারদের কান্ডকারখানা নিয়ে হাসাহাসি, আবার কখনও পুরোনো দিনের সেই পাড়াময় দুষ্টুমির হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি।
নাইরা অনেক অনেক দিন পর নিজের মনের ওপর জমতে থাকা সব অদেখা পাথর সরিয়ে এতটা হালকা ও সতেজ অনুভব করছিল।
কিন্তু সে ঘুনাক্ষরেও খেয়াল করেনি—
ক্যাফের বড় কাঁচের জানালার ওপারে, রাস্তার ঠিক উল্টোপাশের আবছায়ায় একটা ঘন কালো গ্লাস-টিন্টেড দামি স্পোর্টস কার বেশ কিছুক্ষণ ধরে একদম নিস্তব্ধ হয়ে পার্ক করে দাঁড়িয়ে আছে।
গাড়ির ভেতরে থাকা কালো চশমা পরা লোকটা তার হাই-রেজোলিউশন ক্যামেরা দিয়ে দূর থেকেই নাইরা ও আলভীর পাশাপাশি বসে হাসাহাসি করার কয়েকটি স্পষ্ট ছবি তুলে নিয়ে দ্রুত একটি এনক্রিপ্টেড নম্বরে পাঠাল।
ফোনের ওপাশ থেকে ঠিক দশ সেকেন্ডের মাথায় বার্তা এলো—
“মেয়েটার পাশে বসা এই ছেলেটা কে?”
লোকটা আবার উইন্ডশিল্ডের ওপার দিয়ে মনোযোগ দিয়ে আলভীর মুখের দিকে তাকাল।
তারপর ফোনে ছোট করে টাইপ করে লিখল—
“গবেষণা করে যতটুকু বুঝলাম, পুরোনো কোনো পরিচিত বা শৈশবের বন্ধু মনে হচ্ছে।”
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পর ওপাশ থেকে আরেকটা বরফের মতো ঠান্ডা ও বিপদজনক নোটিফিকেশন মেসেজ ভেসে এলো—
“মেয়েটার প্রতিটা পদক্ষেপে নজর রাখো। ও নিজের ভেতরে মির্জা গ্রুপ আর অতীত নিয়ে যা ভাবছে, আসল রহস্যের খেলাটা তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি জটিল আর বিষাক্ত।”
লোকটা ফোনটি সাইলেন্ট করে পকেটে রেখে শান্ত ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আবার কাঁচের ওপারে নাইরার হাস্যোজ্জ্বল মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
এদিকে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামতেই মির্জা ভিলার প্রাসাদে এক থমথমে নীরবতা নেমে এসেছে।
নিজের তিনতলার পার্সোনাল স্টাডি রুমে বসে ইহান মির্জা ল্যাপটপে কয়েকটা আন্তর্জাতিক আইনি চুক্তিপত্র পর্যালোচনা করার চেষ্টা করছিল।
কিন্তু কাজের প্রতি তার স্বাভাবিক মনোযোগ বারবার বিঘ্নিত হয়ে অন্য কোথাও হারিয়ে যাচ্ছিল। মস্তিষ্কের প্রতিটা নিউরনে কেবল নাইরার সেই বিকেলে একা বাইক নিয়ে বের হয়ে যাওয়ার দৃশ্যটাই ঘুরপাক খাচ্ছিল।
ঠিক তখনই তার টেবিলের ওপর রাখা পার্সোনাল এনক্রিপ্টেড ফোনটির স্ক্রিন হালকা নীল আলোয় জ্বলে উঠল।
কোনো অজানা নম্বর বা অচেনা থ্রেট নয়। এটি তার নিজের ব্যক্তিগত বিশ্বস্ত সিক্রেট সার্ভিসের লোক।
মেসেজের প্রথম লাইনে লেখা ফুটে উঠল—
“নাইরা ম্যাডাম একদম সেফ আছেন।”
ইহানের প্রখর চোখ দ্রুত স্ক্রিনের অক্ষরের ওপর নড়ল। তার বুকের ভেতরের অজানা এক অশান্তি কিছুটা প্রশমিত হলো।
কিন্তু তার ঠিক নিচের দ্বিতীয় লাইনটা পড়ার সাথে সাথেই ইহানের দুই বরফশীতল ভুরু মারাত্মকভাবে কুঁচকে গেল—
“ম্যাডাম বর্তমানে একজন তরুণের সাথে কফি শপে বসে আছেন।”
কয়েক সেকেন্ডের মাথায় লোকটির কাছ থেকে শেষ আপডেট নোটিফিকেশনটি এলো—
“ছেলেটির নাম সম্ভবত আলভী। তারা বেশ কিছুক্ষণ ধরে একসাথে আছেন।”
ইহান ফোনটি হাতের মুঠোয় এত শক্ত করে চেপে ধরল যে তার হাতের রগগুলো নীল হয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠল।
তার ফর্সা চেহারায় দৃশ্যমান কোনো বড় রাগের এক্সপ্রেশন প্রকাশ পেল না। কিন্তু তার প্রখর নীলচে চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে বরফের চেয়েও বেশি শীতল, কঠিন ও ভীতিকর হয়ে উঠল।
সে কাজের টেবিল ছেড়ে উঠে বিশাল জানালার ফ্রেঞ্চ গ্লাসের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু কিন্তু ওজরহীন ধীর গলায় বিড়বিড় করে বলল—
— “তুই সত্যিই শেষ পর্যন্ত ওর সাথে দেখা করতেই গেলি, নাইরা…”
নিজের ভেতরের এই অস্বাভাবিক জিলন, তীব্র ক্ষোভ আর অজানা বিরক্তির আসল কারণ সে নিজে একজন চতুর আইনজীবী হয়েও স্পষ্ট বুঝতে পারছে না।
তবুও একটা বাস্তব সত্য এই মুহূর্তে তার প্রখর চেতনায় প্রদীপের মতো পরিষ্কার—
নাইরাকে নিয়ে সে মনে মনে যা ভাবছে বা যেভাবে আগলে রাখার চেষ্টা করছে, তা আর সাধারণ কোনো পারিবারিক দায়িত্ব বা বড় ভাইয়ের চিন্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই!
রাতের আঁধার এখন আরও কিছুটা গাঢ় ও থমথমে হয়ে এসেছে।
ক্যাফে থেকে আড্ডা শেষ করে বেরিয়ে নাইরা নিজের বাইকটি চালিয়ে আলভীর নতুন বাড়ির ড্রাইভওয়ের সামনে এসে থামাল।
বিদায় নেওয়ার মুহূর্তটিতে আলভী আন্তরিক হাসি দিয়ে বলল—
— “এবার কিন্তু আবার হুট করে বাতাসে হারিয়ে যাস না, নাইরা! এতগুলো বছর পর আজ তোকে আবার খুঁজে পেলাম।”
নাইরা হেলমেট পরার আগে মুচকি এক চিলতে সুন্দর হাসি উপহার দিয়ে বলল—
— “চেষ্টা করব না হারানোর। তুইও ভালো থাকিস!”
সে ব্ল্যাক হেলমেটটা মাথায় চাপিয়ে স্ট্র্যাপ টাইট করে বাইকের ওপর সওয়ার হলো।
ইঞ্জিন স্টার্ট দিতেই Kawasaki-র সেই পরিচিত শক্তিশালী গর্জনের শব্দে চারপাশের নিস্তব্ধ এলাকাটা কেঁপে উঠল।
আলভী গেটে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ল। নাইরাও হাত তুলে বন্ধুকে চূড়ান্ত বিদায় জানিয়ে বাইকের এক্সেলেটর ঘুরিয়ে পিচঢালা মূল রাস্তায় নেমে পড়ল।
কিন্তু নাইরা নিজের বাইক নিয়ে কিছুটা দূরত্ব অতিক্রম করতেই রাস্তার আবছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই ঘন কালো স্পোর্টস কারটি হালকা হেডলাইট জ্বেলে ধীরে ধীরে তার বাইকের পথ ধরে চলতে শুরু করল।
নাইরা তখনও পর্যন্ত তার পেছনের সেই মারাত্মক ও বিষাক্ত বিপদের ছায়া বিন্দুমাত্র টের পায়নি।
শহরের রাতের সোডিয়ামের আলো আর কোলাহল পেছনে ফেলে সে নিজের গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলেছে।
আর তার ঘুনাক্ষরেও অজানা থেকে গেল—
তার এই শৈশবের পুরোনো বন্ধুত্বের একটা সাধারণ দেখা ও নির্দোষ আনন্দ এখন কীভাবে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ছে মির্জা পরিবারের এক অদৃশ্য বিষাক্ত ছায়া আর প্রাণঘাতী শতরঞ্জের চালের সাথে! 
(চলবে…)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন