#crown_of_shadows
#sadiya_afrin
{কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ}
Part 22
রাত প্রায় সাড়ে আটটা।
শহরের কৃত্রিম আলো আর সান্ধ্যকালীন ব্যস্ত রাজপথ পেরিয়ে নাইরা ধীরে ধীরে মির্জা ভিলার সুবিশাল মূল ফটকের সামনে এসে নিজের Kawasaki Ninja স্পোর্টস বাইকটি থামাল।
গতকালের সেই অমানুষিক ওটি এবং ইমার্জেন্সি ডিউটির অসীম ক্লান্তির পর আজ শৈশবের পুরোনো বন্ধু আলভীর সঙ্গে বেশ খানিকটা সুবর্ণ সময় কাটিয়ে তার ভারী হয়ে থাকা মনটা অনেকটাই হালকা হয়ে গিয়েছিল। এতদিন পর যেন একটা উন্মুক্ত সতেজ বাতাসে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারল সে।
সে বাইকটা নিজের নির্ধারিত জায়গায় নিখুঁতভাবে স্ট্যান্ড করে মাথার হেলমেটটা খুলে হাতে নিল।
তারপর ধীরপায়ে মির্জা ভিলার বিশাল ভিক্টোরিয়ান স্টাইলের গেট পার হয়ে ভেতরের দিকে হাঁটা শুরু করল। আলোয় ঝলমল করা ভিলার পরিচিত, রাজকীয় ও উষ্ণ আবহ টা তাকে সবসময়ই এক অদ্ভুত মানসিক স্বস্তি এনে দেয়।
কিন্তু প্রধান দরজার মেহগনি ফ্রেম পার হয়ে ভেতরে পা রাখতেই নাইরার চটুল গতি হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল।
বিশালাকার ডাইনিং আর লিভিং রুমের মাঝামাঝি আভিজাত্যপূর্ণ আলোর নিচে দরজার দেওয়াল ঠেস দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছে ইহান।
কালো ফিটেড টি-শার্ট আর ডার্ক গ্রে ট্রাউজারে তাকে এই আবছায়া আলোয় অদ্ভুত রকমের গম্ভীর, সুদৃঢ় এবং বরফের মতো কঠিন দেখাচ্ছে।
নাইরা নিজের ভেতরের অস্বস্তিটুকু লুকিয়ে স্বাভাবিক থাকার ভান করে তাকে এড়িয়ে ভেতরে ঢুকতে চেয়েছিল। ঠিক তখনই নীরব ঘরটায় ইহানের অত্যন্ত শান্ত, সুগম্ভীর অথচ ধারালো কণ্ঠস্বর ভেসে এলো—
— “কই গেসিলি?”
নাইরা হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে ইহানের মুখোমুখি হলো। নিজের স্পষ্ট গলায় বলল—
— “একটু দরকারি কাজে বাইরে গিয়েছিলাম।”
ইহান বরফশীতল দুই ভ্রু সামান্য কুঁচকে এক পা সামনে এগিয়ে এসে ভারী গলায় বলল—
— “ওটা তো আমিও বুঝতে পারতেছি। কিন্তু ঠিক কোথায় গেসিলি?”
নাইরা হাতের ভারী হেলমেটটা পাশের সাইড টেবিলের ওপর রেখে ক্লান্ত গলায় বলল—
— “আপনি আমাকে হুট করে এত জেরা আর ইন্টেরোগেশন করছেন কেন বলুন তো?”
ইহান ধীরপায়ে তার আরও কিছুটা কাছে এগিয়ে এলো। তার প্রখর চোখের দৃষ্টিতে ফুটে উঠল এক অজানা কর্তৃত্ব—
— “কারণ তুই আজ সকালেই অত্যন্ত ফ্যাকাশে আর ক্লান্ত মুখে হাসপাতাল থেকে ফিরেছিস। শরীর সম্পূর্ণ রিকভার করার আগেই আবার বিকেলে একা বাইক নিয়ে বের হইলি।”
নাইরা এবার বেশ কিছুটা বিরক্ত ও খিটখিটে হয়ে সোজা তার দিকে তাকাল—
— “আমি সম্পূর্ণ ঠিক আছি, আর নিজের যত্ন আমি নিজেই নিতে পারি।”
— “তুই ঠিক আছিস কি না, সেটা আমি জিজ্ঞেস করি নাই। আমি জানতে চেয়েছি—কোথায় গেসিলি?”
কিছুক্ষণ তাদের মধ্যে এক তীব্র নীরবতা ঘনীভূত হয়ে রইল। নাইরা ইহানের জেদী চোখের দিকে তাকিয়ে শেষ পর্যন্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল—
— “রাইসার পাঠানো একটা নির্দিষ্ট ঠিকানায় গিয়েছিলাম।”
ইহানের চোখে মুহূর্তের জন্য এক অন্যরকম অদেখা কৌতূহল আর সন্দেহ চমকে উঠল—
— “রাইসার ঠিকানায়?”
— “হুম।”
— “আর কার সাথে দেখা করলি?”
নাইরা এবার খুব স্পষ্টভাবেই বুঝতে পারল যে, ইহান কেবল কোনো সাধারণ পারিবারিক কৌতূহল বা দায়িত্ব থেকে এই তীব্র প্রশ্নগুলো ছুড়ছে না। তার গভীর নীলচে চোখের নেপথ্যে কাজ করছে এক অদৃশ্য মানসিক অস্বস্তি।
নাইরা ঠোঁট সামান্য বাঁকিয়ে হালকা কটাক্ষের সুরে বলল—
— “আমার শৈশবের পুরোনো এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম।”
ইহানের চোখের দৃষ্টি মুহূর্তের মধ্যে স্থির ও পাথরের মতো কঠিন হয়ে উঠল। সে নিচু গম্ভীর গলায় প্রশ্ন ছুঁড়ল—
— “আলভী?”
নাইরা মারাত্মক অবাক হয়ে ইহানের দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল—
— “আপনি আলভীর কথা জানলেন কীভাবে?”
ইহান এক মুহূর্তের জন্য থেমে নিজেকে একটু সামলে নিল। তারপর নির্বিকার মুখে বলল—
— “সেদিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে তো তুই নিজেই জায়ানকে বলছিলি যে ওর সঙ্গে একবার সামনাসামনি দেখা করতে চাস।”
নাইরা ধীরে ধীরে ডানে-বামে মাথা নাড়ল।
— “হুম। তাই ওর সাথে দেখা করতেই গিয়েছিলাম।”
কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো ডাইনিং হলের বিশাল পরিসরে এক থমথমে নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
নাইরা খুব নিখুঁতভাবে খেয়াল করল, আলভীর নামটা শোনার পর ইহানের ফর্সা ও সুগঠিত মুখের ভাবটা যেন অদ্ভুতভাবে বদলে গেছে। তার চোয়ালের হাড়গুলো শক্ত হয়ে উঠেছে, আর চোখের দৃষ্টি আরও বেশি হিংস্র হয়ে উঠেছে।
নাইরা নিজের ক্লান্ত মেজাজ বজায় রেখে হালকা ও নিঃসংকোচ একচিলতে হাসি উপহার দিয়ে বলল—
— “আরে রিল্যাক্স! ওর সাথে তো আর যুদ্ধ করতে যাইনি, শুধু একসাথে বসে এক কাপ কফি খেলাম, কিছুটা পুরোনো দিনের গল্প করলাম আর চলে এলাম।”
ইহান অত্যন্ত শান্ত কিন্তু কঠোর গলায় জবাব দিল—
— “মনে হচ্ছে খুব ক্লোজ ফ্রেন্ড তোর?”
নাইরা স্বাভাবিক ও সহজভাবে উত্তর দিল—
— “হ্যাঁ, ছোটবেলার বন্ধু। পাশাপাশি বাসায় বড় হয়েছি। অনেক বছর পর হঠাৎ ঢাকা ব্যাক করে দেখা হলো, তাই একটু দেখা করলাম। এতে দোষের তো কিছু দেখছি না।”
ইহান আর মুখ ফুটে দ্বিতীয় কোনো কথা বলল না।
কিন্তু তার ফর্সা মুখে স্পষ্ট হয়ে উঠল এক পৈশাচিক অস্বস্তি আর শক্ত চোয়াল।
নাইরা এবার নিঃশ্বাস ছেড়ে ক্লান্ত গলায় বলল—
— “আর কোনো গোপন প্রশ্ন বা চার্জশিট তৈরি করা বাকি আছে আপনার?”
ইহান নিঃশব্দে কয়েক মুহূর্ত নাইরার সেই নিদারুণ সুন্দর অথচ ক্লান্ত মুখটার দিকে অপলক তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব ধীর ও সুগম্ভীর কণ্ঠে বলল—
— “রাত অনেক বেশি হয়ে গেছে। পরের বার থেকে এত দেরি করে একা ভিলতায় ফিরবি না।”
নাইরা চোখ দুটো বড় বড় করে কিছুটা অভিমানের সুরে বলে উঠল—
— “আপনি কি আবার আমাকে শাসন করা শুরু করলেন?”
ইহান এবার কোনো রাগ না দেখিয়ে খুব হালকা কিন্তু নির্দেশাত্মক গলায় বলল—
— “যা বললাম, সেটা মনে রাখিস।”
নাইরা একটা গভীর ও ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্পোর্টস বাইকের চাবিটা হাতে নিয়ে চারতলার মার্বেলের সিঁড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল।
দুটি ধাপ ওপরে ওঠার পর সে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল।
ইহানের দিকে পেছন না ফিরেই সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে সে খুব শান্ত ও বিষণ্ন কণ্ঠে বলল—
— “আপনি জানেন ইহান ভাই… আপনার এই মাত্রাতিরিক্ত ওভারপ্রোটেক্টিভ বিহেভিয়ার একদিন আমাকে সত্যিই পুরোপুরি পাগল করে দেবে।”
কথাটা এক নিঃশ্বাসে বলেই সে আর একমুহূর্ত না দাঁড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত ওপরে নিজের ঘরের দিকে উঠে গেল।
ইহান নিচতলার লবিতে একাকী স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার বরফশীতল দুটি চোখ স্থির হয়ে রটার মতো সিঁড়ির ফাঁকা পথটার দিকে আটকে ছিল। কিছুক্ষণ পর সে ধীরপায়ে হেঁটে গিয়ে পার্সোনাল সোফায় নিজেকে সঁপে দিল।
পকেট থেকে ফোনটা বের করতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল তার গোপন সিক্রেট লোকটার পাঠানো সেই আগের আপডেটেড নোটিফিকেশনগুলো—
“ম্যাডাম একদম সেফ আছেন।”
“ও একজন ছেলের সঙ্গে কফি শপে বসে আছেন।”
“ছেলেটির নাম সম্ভবত আলভী।”
ইহান মুহূর্তের মধ্যে সাইলেন্ট ফোনটি বন্ধ করে টেবিলের কাঠের ওপর রেখে দিল।
তার নিজের ভেতরের এই অনাকাঙ্ক্ষিত রিয়্যাকশনটাই তাকে মারাত্মকভাবে বিরক্ত ও অস্থির করে তুলছে। কেন আলভী নামের একটা সাধারণ শৈশবের বন্ধুর কথা শুনলেই তার বুকের ভেতর এভাবে আগুন জ্বলে উঠছে? কেন নাইরাকে অন্য কারো পাশে কল্পনা করতেই তার মস্তিষ্কের রগগুলো বিস্ফোরিত হতে চায়?
ঠিক তখনই নীরব ঘরটাকে কাঁপিয়ে টেবিলের ওপর রাখা তার ফোনটা আবার ভাইব্রেট করে উঠল।
একটা নতুন মেসেজ এসেছে।
তবে এটি তার কোনো গুপ্তচরের বার্তা নয়—একটি সম্পূর্ণ এনক্রিপ্টেড Unknown International Number!
ইহান চশমা ঠিক করে বরফের মতো দৃষ্টি নিয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
মেসেজের বডিতে পাঠানো হয়েছে মাত্র একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রাণঘাতী রক্ত হিম করা লাইন—
“তুই যাকে নিজের প্রাণ দিয়ে প্রোটেক্ট করতে চাচ্ছিস councilor Ihan, সে ইতিমধ্যেই আমাদের বুলেট আর নজরের সুনির্দিষ্ট টার্গেটে আছে।”
ইহানের চশমার ওপারের সুপ্রখর নীলচে চোখ দুটি মুহূর্তের মধ্যে পৈশাচিক হিমশীতল ও রক্ত তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠল।
সে এক নিমেষে চেয়ার ছেড়ে সটান হয়ে উঠে দাঁড়াল।
তার মুখের এতক্ষণের যাবতীয় পারিবারিক বিরক্তি ও বিভ্রান্তি এক সেকেন্ডের মধ্যে মিলিয়ে গিয়ে সেখানে জায়গা করে নিল এক মারাত্মক, ভয়ংকর ও হিংস্র গম্ভীরতা।
অন্যদিকে চারতলার নিজের সুসজ্জিত ও সুরক্ষিত ঘরের দরজা বন্ধ করে নাইরা তখন নিশ্চিন্ত মনে জামাকাপড় বদলে ফ্রেশ হতে ব্যস্ত।
সে ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারছে না—
আজ রাতে প্রথমবারের মতো কালান্তক বিপদটা কেবল মির্জা গ্রুপের বিজনেস সাম্রাজ্য বা গোপন ফাইলের আশপাশে সীমাবদ্ধ নেই, বরং মির্জা ভিলার আঁধারে লুকিয়ে থাকা শত্রু সরাসরি তার নিজের জীবনের ওপরেও এক বিষাক্ত ও বিপজ্জনক রক্তচক্ষুর ছায়া ফেলতে শুরু করেছে!
(চলবে…)