ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের আলোড়ন

৩২তম পর্ব

লেখক: এমডি সুহান জয়

গল্প: প্রেমের আলোড়ন

লেখক: সুহান জয়

পর্ব: ৩২

{দৃষ্টির আকর্ষণ:- এই পর্বটা ১৮+ এলার্ট দেওয়া হলো }

(Note – এটি একটি প্রণয় ও জীবনবোধের মিশ্রণ সম্বলিত গল্প। যেখানে তীব্র রোম্যান্সের পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।)

জাহির দ্রুত হাতে তুহিনাকে গাড়ির ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েই সপাটে কাঁচ তুলে দিল। ভেতরে তাকিয়ে দেখল, আফ্রিদি এখনো সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে আছে। তুহিনা যেই না আফ্রিদির দশা দেখল, ভয়ে আর উদ্বেগে সেও চোখ উল্টে ঠিক আফ্রিদির পায়ের কাছেই জ্ঞান হারিয়ে আছড়ে পড়ল।

জাহির বিরক্তিতে চোখ কুঁচকে নিজের মনেই বিড়বিড় করতে লাগল—

"অপূর্ব! এখন অজ্ঞান হওয়ার কম্পিটিশন চলছে? একবার বর অজ্ঞান হচ্ছে তো পরক্ষণেই বউ! জ্বালা তো আমার; নিজের প্রেমেরই ঠিক নেই, অথচ ভাইয়ের বউ চুরি করতে হচ্ছে। ছিঃ, এটা কোনো জীবন? ছিঃ!"

জাহির সুহানা রামিম তিন জনের বুক কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে, কপালে ঘামের বিন্দু। চারদিকে হন্যে হয়ে কাউকে খুঁজছে তারা। রামিম বিরক্তির সুরে বলল, "উফফ! বলদ দুটো গেল কই?"

হাইরোড থেকে নিচে নেমে আসতেই গলির মতো বড় একটা ফাঁকা জায়গা। সামনে কয়েকটা বাড়ি, যেগুলোর চারপাশ মাঝারি উচ্চতার পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। তার ওপাশেই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে সুউচ্চ সব ফ্ল্যাট। গলিটার মাঝের দুই মোড়ে দুটো বিশাল গাছ ডালপালা মেলে আছে।

পুরো এলাকাটি এখন উৎসবের সাজে সজ্জিত। চারদিকে রঙিন আলোর রোশনাই, মাথার ওপর দিয়ে সারি সারি আলোকমালা বাসের মতো ঝুলে আছে। রাস্তার ধারে সারিবদ্ধভাবে রাখা প্রচুর গাড়ি। তুহিনাদের বাড়িটা ঠিক রাস্তার শেষ মাথায়, আর জাহির তার গাড়ি নিয়ে এখন দাঁড়িয়ে আছে ঠিক তার উল্টো দিকের অন্ধকারে।

চারদিকের উৎসবের কোলাহল ছাপিয়ে হঠাৎ দূর থেকে দ্রুত ধাবমান পায়ের শব্দ কানে এল। জাহির সতর্ক হয়ে সেই দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। আবছা অন্ধকারে স্রেফ দুটো ছায়া মূর্তিকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসতে দেখা যাচ্ছে। দূরত্ব বেশি হওয়ায় মুখ স্পষ্ট নয়, কিন্তু তাদের গলার স্বর বাতাসের আগে জাহিরের কানে পৌঁছাল—

"বড়দা...!"

জাহিরের বুঝতে আর বাকি রইল না এরা কারা। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি পাল্টে গেল। রামিম তড়িৎ গতিতে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কালো ফর্চুনারটায় গিয়ে উঠে বসল। ইঞ্জিন গর্জন করে উঠলো। রামিম জানলার কাঁচ নামিয়ে জিপের চাবিটা সজোরে ছুড়ে দিল জাহিরের দিকে।

জাহির এক হাতে চাবিটা লুফে নিয়ে জিপের দিকে দৌড় লাগাল। অন্য হাতে সুহানার কব্জি শক্ত করে ধরে তাকে এক প্রকার টেনে নিয়েই জিপের কাছে পৌঁছাল। ঠিক সেই মুহূর্তে হাপাতে হাপাতে সেখানে এসে হাজির হলো সামির আর সাদাদ। তাদের চোখেমুখে আতঙ্ক আর উত্তেজনার ছাপ স্পষ্ট।

সামির বুক ভরে দম নিয়ে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু তার কথা আর মুখ থেকে বেরোনোর সুযোগ পেল না। তার আগেই পেছন থেকে ধেয়ে এল এক গগনবিদারী চিৎকার!

"ওই যে শু*য়ো*রের বা*চ্চা*রা! ধর... ধর ওদের!"

অন্ধকার চিরে ভেসে আসা কর্কশ চিৎকারটা আছড়ে পড়ল কান ফাটানো শব্দের মতো। সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখল, একদল কেনা লোক ধেয়ে আসছে তাদের দিকে। বাড়ির মারমুখী লোকজন, সশস্ত্র গার্ড আর একঝাঁক ক্ষ্যাপাটে ছেলে—সবার লক্ষ্য এখন ওই একটা গাড়ি।

জাহির দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল, "রামিম, ফাস্ট! মুভ ইট!"

সুহানা এক লহমায় জিপের সামনের সিটে উঠে বসল। জাহির চিতার মতো এক লাফে ড্রাইভ সিটে বসেই জিপের হেডলাইট অন করে দিল। তীব্র আলো গিয়ে পড়ল ধেয়ে আসা লোকগুলোর মুখে। সামির আর সাদাদ তখনো থমকে দাঁড়িয়ে আছে দেখে জাহির কড়া সুরে শাসিয়ে উঠল,- "ইডিয়েট! তাড়াতাড়ি বস নইলে কিন্তু ফেলে রেখে চলে যাব!"

বলামাত্রই দুজন মরণ কামড় দেওয়া কুকুরের মতো ছিটকে গিয়ে জিপের ব্যাকসিটে উঠে পড়ল। জাহির এক টানে গিয়ার চেঞ্জ করে স্টার্ট দিল গাড়ির। টায়ারের ঘর্ষণে রাস্তা থেকে ধোঁয়া আর আগুনের ফুলকি যেন ঠিকরে বেরোলো।

ঠিক সেই মুহূর্তে রিয়াজ তার নিজের গাড়িতে গিয়ে সপাটে উঠে বসল। পাশে তার ভাইকে বসিয়ে গাড়ির স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরল সে। যাওয়ার আগে তার হিমশীতল কণ্ঠের নির্দেশ বাতাসের আগে ছুটল রক্ষীদের দিকে:

"সব কটাকে জ্যান্ত চাই! একটাও যেন সীমানা পার হতে না পারে!"

শুরু হলো এক রুদ্ধশ্বাস ‘কার চেজ’। ইঞ্জিনের গর্জনে রাতের নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে গেল। জাহিরের জিপ আর রিয়াজের গাড়ি—দুটোই এখন আগুনের গোলার মতো রাস্তার বুক চিরে ছুটছে।

জাহিরের জিপের চাকা যখন পিচঢালা রাস্তায় ঘর্ষণ খেল, তখন মনে হলো রাস্তাটা বুঝি দু-ভাগ হয়ে যাবে। পেছনের সিটে সামির আর সাদাদ একে অপরের গায়ের ওপর আছড়ে পড়ছে। সুহানা শক্ত করে ড্যাশবোর্ড আঁকড়ে ধরে আছে, তার চোখের সামনে রাস্তার আলোগুলো স্রেফ উজ্জ্বল রেখা হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে।

পেছন থেকে রিয়াজের গাড়ির হেডলাইটের তীব্র আলো জাহিরের রিয়ার-ভিউ মিররে এসে বিঁধল। রিয়াজ একদম ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। জাহির দাঁতে দাঁত চেপে স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে চিৎকার করল, “ধরে বস সব! দ্যা গেম স্টার্টস নও!”

সামনের মোড়টা আসতেই জাহির ব্রেক কষে হ্যান্ডব্রেক টেনে ধরল। জিপটা একপাশে কাত হয়ে বিকট শব্দে ‘ড্রিফট’ করে গলি থেকে মেইন রোডে উঠে এল। ঠিক পেছনেই রিয়াজের গাড়িটা পাগলের মতো গোঁ গোঁ শব্দে ধেয়ে আসছে। রিয়াজ জানলার কাঁচ নামিয়ে তার লোকদের ইশারা করল।

হঠাৎ একটা বিকট শব্দ— ‘ঠাস!’ রিয়াজের এক লোক জিপের চাকা লক্ষ্য করে কিছু একটা ছুড়ে মারল। জিপটা একবার কেঁপে উঠল, কিন্তু জাহির দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে গিয়ার বাড়িয়ে দিয়ে এক্সিলারেটরে চাপ দিল শেষ সীমা পর্যন্ত।

রিয়াজ স্টিয়ারিংয়ে আঙুল ঠুকছে, সে শিকারকে জালে বন্দি করার অপেক্ষায় থাকা এক ক্ষুধার্ত নেকড়ে। পাশে বসা ভাইকে উদ্দেশ্য করে সে শান্ত কিন্তু ভয়ংকর গলায় বলল,

“ওরা ভাবছে পালিয়ে যাবে? আমার এলাকা থেকে বেরোনোর রাস্তা একটাই, আর সেই রাস্তার চাবিকাঠি এখন আমার হাতে”।

পেছনে তাকাতেই দেখা গেল আরও তিন-চারটে বাইক আর প্রায় বাইস টা কালো গাড়ি পঙ্গপালের মতো তাদের পিছু নিয়েছে। চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলার ছক কষছে রিয়াজের বাহিনী।

জাহিরের কপালে ঘামের রেখা, কিন্তু মুখে সেই চিরচেনা বাঁকা হাসি। স্টিয়ারিংটা এমনভাবে ঘোরাচ্ছে যেন সে ভিডিও গেম খেলছে। ওদিকে সুহানার মধ্যে কোনো ভয় নেই, তার চোখেমুখে এখন এক অদ্ভুত শীতলতা।

জাহির পাশে তাকালো সুহানার দিকে আহহা কি রোমান্টিক সিন। এই চরম উত্তেজনার মাঝেও তার মনে এক অদ্ভুত রোমান্টিক বেহায়া ইচ্ছা উঁকি দিয়ে গেল। চারপাশে অ্যাকশন চলছে, পেছনে ধাওয়া করছে ভয়ংকর ভিলেন, আর পাশে আছে তার টপ ক্লাসের সুহৃ, জাহিরের বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ কোনো এক অজানা নেশায় কেঁপে উঠল। পাশে বসা সুহানার দিকে তাকাতেই তার শিরায় শিরায় এক নিষিদ্ধ উন্মাদনা খেলে গেল। এই রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির মধ্যেই জাহির নিজেকে এক অন্য জগতে কল্পনা করে নিল।

সুহানা খুব নিবিড়ভাবে জাহিরের কোলের ওপর বসে তাকে জড়িয়ে ধরে আছে। সুহানা তার চোখের চশমাটা অবহেলায় খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিল। তারপর জাহিরের চোখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে এক চিলতে রহস্যময় হাসি হাসল।সুহানা দুহাত উপরে তুলে তার চুলের বাঁধনটা আলগা করে দিল। মুক্ত কেশগুচ্ছ যখন তার কাঁধ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল, জাহিরের গলার কাছে একটা শুকনো ঢোক যেন পাথর হয়ে আটকে রইল। তার বুকটা উত্তেজনায় ভারি হয়ে উঠছে। জাহির আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না; এক হাত দিয়ে সুহানার নরম কোমরটা পেঁচিয়ে ধরে এক হেঁচকায় তাকে নিজের শরীরের সাথে পিষে ফেলল।

সুহানা আরও এক ধাপ এগিয়ে এল, তার উষ্ণ নিশ্বাস জাহিরের ঠোঁটের খুব কাছে এসে মিশল। জাহির আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না; এক হাত দিয়ে সুহানার নরম কোমড়টা পেঁচিয়ে তাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল তাদের মাঝে একচুল ফাঁকও রইল না। সুহানার নরম কায়া জাহিরের শক্ত, পুরুষালি বুকের সাথে মিলে মিশে একাকার হলো, এক তীব্র বিদ্যুৎ খেলে গেল তাদের শরীরে। জাহির চোখ বন্ধ করে ফেলল—শুধু অনুভব করার জন্য।

মুখ থেকে এক অস্ফুট “ওহ্...” শব্দ বেরিয়ে এল। সুহানার হাত তখনও জাহিরের মুখ আগলে আছে, তার স্পর্শে জাহিরের মনে এক অন্যরকম শিহরণ জাগছে। এই মুহূর্তে সুহানার শারীরিক ভঙ্গি তাকে আরও নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধরার এক ব্যাকুল আর অদম্য ইচ্ছে প্রকাশ করছে।

জাহির আর পারল না! তার ভেতরের বাঁধনগুলো যেন ছিঁড়ে গেল। সে সুহানাকে দু’হাতে পেঁচিয়ে ধরে তার উষ্ণ গলায় মুখ গুঁজল, যখন তার সমস্ত ইন্দ্রিয় শুধু সুহানাকেই অনুভব করতে চাইছে... ঠিক সেই মুহূর্তেই এক তীক্ষ্ণ গুলির শব্দে তার পৃথিবীটা কেঁপে উঠল। গুলিটা এসে লাগল গাড়ির ঠিক সামনের বোনেটের ওপর। তীব্র উত্তেজনা আর আসন্ন বিপদের এক মিলিত ঝলক পুরো পরিবেশটাকে এক লহমায় বদলে দিল।

জাহিরের মনের সেই রঙিন কল্পনার বুদবুদটা মুহূর্তেই চুরমার হয়ে গেল। একটা বিকট শব্দে সচকিত হয়ে সে পাশে তাকাতেই দেখল, একটি বাইক অত্যন্ত তীব্র গতিতে তাদের ঘেঁষে ধেয়ে আসছে। বাইক আরোহীর হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখে জাহিরের বুঝতে আর বাকি রইল না যে, এই 'হারামজাদা'ই একটু আগে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছিল।

সে আড়চোখে সুহানার দিকে তাকাল। সুহানা ভুরু কুঁচকে জাহিরের দিকে তাকিয়ে আছে; সে আসলে বোঝার চেষ্টা করছিল কিছুক্ষণ আগে জাহিরের আচরণের রহস্য। কারণ, কাল্পনিক ঘোরে থাকা জাহির তখন অদ্ভুতভাবে হাত-পা ছুড়ছিল। এমনকি পেছনের সিটে বসা সামির আর সাদাদও হাঁ করে জাহিরের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন তারা কোনো আজব চিড়িয়া দেখছে।

জাহির পরিস্থিতি সামলাতে একবার গলা পরিষ্কার করে নিল। ঝেড়ে ফেলল সব মাথা থেকে সেই চরের কথা মনে পড়লো গালে হাত বুলিয়ে পূর্ণ মনোযোগ ফিরিয়ে আনল ড্রাইভের ওপর এবং জিপের স্পিড বাড়িয়ে দিল বহুগুণ। সামনে রামিমের গাড়ির ঠিক পেছনেই আরও একটি বাইক তাড়া করছে। জাহিরের লক্ষ্য এখন স্থির—যেভাবেই হোক, ওই বাইকটাকে রাস্তা থেকে উড়িয়ে দিতে হবে।

সুহানা পকেট থেকে ধীরেসুস্থে কিছু একটা বের করল। জিপের দুলুনির তোয়াক্কা না করে সে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল—গাড়ির হেডলাইট দানবের চোখের মতো জ্বলছে। সুহানা পকেট থেকে এক জোড়া কালো হ্যান্ডগ্লাভস বের করে খুব শান্তিতে হাতে গলিয়ে নিল।

“ব্রো, আপনারা একদম সিটের নিচে সেঁধিয়ে যান!, মাথা এক ইঞ্চিও উঁচুনীচু না হয়!”

সামির আর সাদাদ এক মুহূর্ত দেরি না করে জিপের মেঝের সাথে মিশে গেল। জাহির স্টিয়ারিং সামলাতে সামলাতে আড়চোখে দেখল সুহানা শরীরটা হালকা করে পেছনের দিকে ঘোরাচ্ছে। জিপটা প্রচণ্ড গতিতে দুলছে, কিন্তু সুহানার হাত দুটো পাথরের মতো স্থির।

পরের মুহূর্তেই জাহিরের আত্মারাম খাঁচা হওয়ার জোগাড়! সুহানা সিটের ওপর উল্টো হয়ে ঘুরে বসে ‘শ্যুট পজিশন’ নিল। তার হাতে ধরা একটা অত্যাধুনিক পিস্তল, যার নল এখন সরাসরি পেছনের কনভয়ের দিকে তাক করা।

জাহির তখন স্টিয়ারিং সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, আর রিয়ার-ভিউ মিররে সুহানার এই রূপ দেখে তার হার্টবিট মিস হওয়ার জোগাড়!

সুহানা জাহিরের উদ্যেশে বলল,“ ক্যাপ্টেন, ড্রাইভ দি কার! ফোকাস অন দ্য রোড!”

সুহানা এক সেকেন্ডের জন্য শ্বাস বন্ধ করল। জিপটা প্রচণ্ড গতিতে লাফাচ্ছে, কিন্তু তার লক্ষ্য স্থির। ঠিক তখনই— ‘ঠা-ঠা-ঠাশ!’

অন্ধকার চিরে আগুনের ফুলকি বেরিয়ে গেল সুহানার হাতের অস্ত্র থেকে। প্রথম বুলেটটা গিয়ে সরাসরি আঘাত করল ঠিক পেছনে থাকা রিয়াজের বাহিনীর প্রথম বাইকটার সামনের চাকায়। বিকট শব্দে টায়ার বাস্ট করে বাইকটা উল্টে গিয়ে রাস্তার মাঝখানে এক বিভীষিকা তৈরি করল। পেছনের গাড়িগুলো ব্রেক কষতে গিয়ে একে অপরের গায়ে ধাক্কা খেতে লাগল।

সুহানা পিস্তলের নলটা নামিয়ে আনল ঠিক রিয়াজের সামনে থাকা ফর্চুনারটার বাম দিকের চাকা বরাবর। রিয়াজ তখন জানলা দিয়ে মাথা বের করে চিৎকার করছিল, কিন্তু সুহানার আঙুল ট্রিগার টিপতেই সেই চিৎকার আর্তনাদে রূপ নিল।

‘ঠা-ঠা-ঠাশ!’

একটানা তিনটে বুলেট গিয়ে বিঁধল গাড়ির সামনের টায়ারে। বিকট শব্দে টায়ার ফেটে গিয়ে গাড়িটা রাস্তার ওপর লাটিমের মতো বনবন করে ঘুরতে শুরু করল। ঠিক যেন তাসের ঘরের মতো পেছনের একের পর এক গাড়ি রিয়াজের গাড়ির ওপর আছড়ে পড়তে লাগল।

ব্রিজের মুখে ঢোকার আগেই হঠাৎ পেছন থেকে একটা বুলেট এসে বিঁধল জাহিরের বাঁ কাঁধে!

“আহ্...!” যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল জাহির। বুলেটের ধাক্কায় তার হাত থেকে স্টিয়ারিং ছুটে যাওয়ার জোগাড় তবে ছুটলো না। জিপটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ব্রিজের পিলারের কাছে এক বিকট শব্দে ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল।

ড্রয়িংরুমের থমথমে পরিবেশটা মুহূর্তেই চুরমার হয়ে গেল জাহিরের বাবার বজ্রকণ্ঠে। ছোট ভাইয়ের দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি গর্জে উঠলেন—

"তুই আমাকে এখন জানাচ্ছিস? সব কিছু ঘটে যাওয়ার পর এই খবর দিতে এসেছিস?"

ছোট চাচু ঘামছিলেন, কিন্তু এই প্রথম তিনি বড় ভাইয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে পাল্টা যুক্তি দিলেন—

“ভাইয়া, তখন কি তুমি কোনো সমাধান দিতে পারতে? মেয়েটা যখন বিয়ের পিঁড়িতে বসে পড়েছে, তখন আমাদের হাতে এক সেকেন্ড সময়ও ছিল না!"

"তাই বলে আমার কাছে এটা লুকাবি?"

"হ্যাঁ, কোনো উপায় ছিল না ভাইয়া, বাধ্য হয়েই লুকিয়েছি। তুমি আফ্রিদি কে দেখেছ? কী করুণ অবস্থা ওর! । ওর সাথে যে মেয়েটা ছিল, সে তুহিনারই আত্মীয়।"

'সুহানা'র নাম আসতেই জাহিরের বাবার মেজাজ সপ্তমে চড়ল। তিনি বিদ্রুপের হাসি হেসে বললেন—

"ওহ! তাহলে এই ছিল আসল মতলব? বাহ্! মেয়ে তো দেখছি অতি চালাক! কী নিখুঁত সততার সাথে নিজের চাল চেলেছে সে!"

পুরো বাড়িতে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল। ওপরের তলা থেকে ফিনা আর বাড়ির বাকি মেয়েরা সিঁড়ির রেলিং দিয়ে উঁকি মারছে; বড়দের এমন চিৎকার-চেঁচামেচিতে তারা ভয়ে কুঁকড়ে আছে। অন্যদিকে, এক কোণে দাঁড়িয়ে তাসিন আর তিতাস বার বার ফোন করে যাচ্ছে জাহির আর রামিমকে। কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো উত্তর আসছে না।

সাবেরা বেগম উনানের পাশে দাঁড়িয়ে শাড়ির আঁচল মুখে চেপে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। তার বুক ভেঙে আসছে ছেলের কথা ভেবে। মনে মনে বিড়বিড় করছেন, "আমার ছেলেটা এমন কেন? কেন ও বিপদ ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না? আর আফ্রিদিটাও তো একই পথের পথিক! ওকে ভরসা করাটাই আমার সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছে।" ছেলেরা এখন বড় হয়েছে, সব নিজেদের মর্জিমতো চালাচ্ছে। সাবেরা বেগমের দুশ্চিন্তার সীমা নেই। কোনো একদিন অভিমানে সব ছেড়ে 'নবীর দেশে' চলে যাবে, যেখান থেকে আর কোনোদিন ফিরবে না। বাড়িতে কেউ তাকে প্রাধান্য দেয় না, তার মনের হাহাকার বোঝার মতো কেউ নেই। উৎকণ্ঠায় তার মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে, এক অশুভ আশঙ্কায় মনটা বারেবারে কু ডেকে উঠছে।

ঠিক সেই মুহূর্তে আয়না বেগম ঠোঁট উল্টে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে উঠলেন—

"এখন কেঁদে আর কী হবে? যা সর্বনাশ করার তো করেই ফেলেছে! ওই মেয়ের তো খুব গুণগান করলে, এখন দেখলে তো? সেই তো সব নাটের গুরু! যার মা-বাবার ঠিক নেই, তাকে যখন-তখন বাড়িতে তুলে আনলে এমন তো হবেই!"

আয়না বেগমের এই বিষাক্ত কথা শুনে রুবাইদা প্রতিবাদ করতে চাইল। সে কিছু একটা বলতে মুখ খুলেছিল ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই সাবেরা বেগম তার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলেন। ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলেন—এখন মুখ খুলে তিক্ততা বাড়িয়ে লাভ নেই। আয়না বেগম নিজের তপ্ত বাক্যবাণ ছুড়ে দিয়ে গটগট করে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। গেছে তো গেছে সাথে তার ছেলেটাকেও নিয়ে গেছে।

সাবেরা বেগম পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন, তার চোখের জল তখনো থামেনি। রান্নাঘরের সেই বিষাক্ত কথার পিঠে প্রতিবাদটা এল সপাটে। একজনের কণ্ঠস্বরে ঝরে পড়ল তীব্র ঘৃণা আর আক্ষেপ—

"ঠিক এই কারণেই আমি এখানে আসতে চাই না! শুধু মায়ের জন্যে আসা। আপনারা শহরে থাকেন ঠিকই, কিন্তু মানসিকতাটা সেই অন্ধকারেই পড়ে আছে। যতসব ফালতু কথা! বাচ্চা একটা মেয়ে সম্পর্কে অর্ধেক তথ্য জেনে এমন কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করাটা কোন সভ্যতার মধ্যে পড়ে, মেজদি?"

এমন মন্তব্যে মালেহা স্তব্ধ হয়ে রইলেন। আসলে তিনি নিজেই এসব নিয়ে প্রতিনিয়ত বিরক্ত হন, কিন্তু কিছু করার নেই। যৌথ পরিবারে থাকলে চড়া সুরের চেয়ে সহ্যশক্তিটা একটু বেশিই লাগে। মালেহা আর বিতর্কে জড়ালেন না। তার মাথায় এখন একটাই চিন্তা—বাড়ির ছেলেগুলো যেন আল্লাহর রহমতে সহি-সালামতে বাড়ি ফেরে। সেখানে তার নিজের কলিজার টুকরো ছেলেও আছে। সবার অমঙ্গল ভাবনায় তার বুক কাঁপছে।

বাইরের ঘরে জাহাঙ্গীর সাহেব তখন অস্থির হয়ে পায়চারি করছেন। বারবার জাহিরকে কল দিচ্ছেন, কিন্তু ফোনটা কেবল বেজেই যাচ্ছে, কেউ ধরছে না। তার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। পুলিশকে যে খবর দেবেন, সেই উপায়ও নেই। কারণ আইনের চোখে আসামি তো তার নিজের ছেলেরাই! পুলিশকে গিয়ে কি বলবেন —আমার ছেলেরা এক বিয়েবাড়ি থেকে মেয়ে তুলে নিয়ে পালিয়েছে?

পুরো ঘরটা নিস্তব্ধ। সবাই গুরুগম্ভীর মুখে বসে একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছেন। সবার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—ভাবা যায়? ! উদ্বেগ, আর অনিশ্চয়তায় প্রতিটা সেকেন্ড ভারী হয়ে উঠেছে।

তুহিনাদের বাড়িতে এখন বিষাদের কালো মেঘ জমেছে। আতিফ সাহেব অপমানে আর আঘাতে ভেঙে পড়েছেন; রাদিফ কোনোমতে তাকে ধরে তুলে এনে ভেতরে বসাল। আতিফের মুখ থমথমে, যেন লজ্জায় আর ক্ষোভে পাথর হয়ে গেছেন তিনি। অন্যদিকে, আয়েশা বেগম তানিকে জাগানোর চেষ্টা করছেন। বারবার বিড়বিড় করছেন—আহারে! তার নিষ্পাপ মেয়েটা অকারণে এমন আঘাত পেল! মোহনা একপাশে মেঝের ওপর নিঃসাড় হয়ে পড়ে আছেন, তার শূন্য দৃষ্টি সিলিংয়ের দিকে স্থির। নিজের আদরের মেয়ের এই পরিণতিতে তিনি মেনে নিতে পারছেন না ।

হঠাৎ তানি একটু নড়েচড়ে উঠল। আয়েশা বেগম মেয়ের সামান্য নড়াচড়া লক্ষ্য করতেই দ্রুত কাছে সরে গেলেন। পরম মমতায় মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই তানি ধীরু চোখের পাতা খুলল। আলোর তীব্রতায় একবার চোখ বন্ধ করে নিলেও মাথায় কারো স্নেহের স্পর্শ পেয়ে সে আবার তাকাল।

সামনে মা-কে দেখতে পেয়ে তানি আঁতকে উঠে দ্রুত উঠে বসতে চাইল। কিন্তু শরীরের শক্তি যেন কুলাচ্ছে না, মাথাটা প্রচণ্ড ভারী হয়ে আছে তার। আয়েশা বেগম আলতো করে ধরে তাকে উঠে বসতে সাহায্য করলেন। পরক্ষণেই তানির মস্তিষ্কে ঝাপসা সব স্মৃতি ভিড় করে এল। সব মনে পড়তেই সে আর্তস্বরে মা-কে উদ্দেশ্য করে বলল—

তানি চোখ মেলেই অস্থির হয়ে চারদিকে তাকিয়ে আর্তস্বরে বলে উঠল, "আপু কই মা?"

মেয়ের প্রশ্ন শুনে আয়েশা বেগমের মুখটা তিক্ততায় ভরে উঠল। তিনি তীব্র অবজ্ঞায় মুখ বাঁকিয়ে জবাব দিলেন, "কোন ছেলের হাত ধরে যেন পালিয়ে গেছে! আমাদের সবার নাক কেটে এখন কোথায় আছে কে জানে!"

তানি মায়ের কথা শুনে সাথে সাথেই প্রতিবাদ করল। সে জোর দিয়ে বলল, "ছেলে নয় মা, মেয়ে!"

আয়েশা বেগম বিস্ময়ে চোখ কুঁচকে মেয়ের দিকে তাকালেন। তানি কী বলতে চাইছে তা যেন তার মাথায় ঢুকছে না। তানি আর কথা না বাড়িয়ে দুর্বল স্বরে জিজ্ঞেস করল, "আব্বু কই?"

"নিচে আছে।"

"চলো, আমার সাথে চলো।"

মায়ের সাহায্যে তানি টলমল পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। আতিফ সাহেব তখনো সেখানে পাথরের মতো নিঃসাড় হয়ে বসে আছেন। তানি গিয়ে বড় আব্বুর সামনে খুব সাবধানে বসল। আতিফ সাহেবের চোখেমুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, কোনো আবেগ নেই; তিনি যেন সমস্ত বোধশক্তি হারিয়ে সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন হয়ে পড়ে রইলেন।

তানি আতিফ সাহেবের খুব কাছে বসে কাঁপা গলায় বলতে শুরু করল, "বড় আব্বু, একটা মেয়ে এসেছিল আপুকে নিতে। তবে মেয়েটার পুরো মুখ ঢাকা ছিল বলে আমি দেখতে পাইনি। কিন্তু ওর চোখগুলো... চোখগুলো খুব অদ্ভুত ছিল! অত অন্ধকারও জ্বলজ্বল করছিল। আমি ওকে আটকাতে গিয়েছিলাম, কিন্তু পারিনি।"

তানির কথা শুনে রাদিফ ঝট করে ওর দিকে ফিরে তাকাল। তার কণ্ঠে বিস্ময় আর আতঙ্ক মাখানো, "চোখ অদ্ভুত মানে? ঠিক কেমন ছিল দেখতে?"

তানি ধীরস্থিরভাবে তার দেখা সেই রহস্যময় চোখের বিবরণ দিতে লাগল। বর্ণনা শুনতে শুনতে রাদিফের গলা শুকিয়ে এল, এক ঢোক শুকনো লালা গিলতেও যেন তার কষ্ট হচ্ছে। অথচ আতিফ সাহেব তখনও পাথরের মতো স্থির। তিনি শুধু তার দুই হাত মাথার পেছনে দিয়ে হেলান দিয়ে রইলেন; কোনো কথা বললেন না, কোনো ভাবাবেগও তার মুখে ফুটে উঠল না।

রাস্তার সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে নিজের দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া গাড়ি থেকে কোনোমতে নেমে এল রিয়াজ। কপাল ফেটে রক্ত ঝরছে তার। চারদিকে মানুষ আর গাড়ির যন্ত্রাংশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে—পুরো জায়গাটা একটা ধ্বংসস্তূপ হয়ে আছে। রিয়াজ যন্ত্রণায় একবার মুখ বিকৃত করল, তারপর পকেট থেকে ফোনটা বের করে একটি নাম্বারে ডায়াল করল।

ফোন কানে দিয়ে সে শুধু একটি শব্দ উচ্চারণ করল—

"হ্যালো!"

চলবে…….

(গল্পের সমস্ত চরিত্র,কাল সবই কাল্পনিক সকলে সেই ভাবেই নেবেন, লেখার মাঝে কোনো বানান ভুল থাকলে মাফ করবেন)

#প্রেমের_আলোড়ন

#suhan_joy

#midnight_tales_by_joy

Thank You🍀

(Don’t copy without permission)

Enjoy your reading 🎀

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন