ফন্ট সাইজ:
থিম:
অতৃপ্ত চাহনা

৫ম পর্ব

লেখক: তুরঙ্গনা

#অতৃপ্ত_চাহনা

#তুরঙ্গনা

পর্ব—||০৫||

তৃতীকা তার কাঁচ-ঘেরা রুমে, ডেস্কে বসে বসে নিজের কাজ করছে। সে মূলত পার্টটাইম জব করতেই এসেছে। কেননা সকালে ভার্সিটি আর দুপুরের পর থেকে অফিসে কাজ না করলে—ঢাকায় এসে পড়াশোনা করার স্বপ্ন পুরোটাই বৃথা যাবে। তবে আজ হয়তো পুরো দিনটাই তার অফিসেই কেটে যাবে। প্রথম দিনেই যে এতগুলো কাজ এসে কপালে জুটবে তা সে হয়তো কল্পনাতেও ভাবেনি।

তৃতীকা তার কাজে বেশ মনোযোগী।অফিসের সিও এ.আর.চৌধুরীর কেবিনের প্রায় পাশেই তাকে তার নির্দিষ্ট ডেস্ক দেওয়া হয়েছে। যা সিও তথা আধীর রায়ান চৌধুরীর কাঁচ-ঘেরা রুম থেকে একদমই দৃশ্যমান। যদিও আধীরের রুমের গ্লাসগুলো রিফ্লেকটিভ হওয়ায়, শুধু আধীরই বাহিরের সবকিছু দেখতে পারে। কিন্তু বাহিরের কারো পক্ষেই তার রুমের ভেতরের কার্যক্রম বা কোনো কিছুই দেখা সম্ভব না।

তৃতীকার পাশে তার সহকর্মী হিসেবে আরো একটি নতুন মেয়ে রয়েছে। মেয়েটির নাম জারা। যদিও সে তৃতীকার চেয়ে বয়সে কিছুটা বড়। কিন্তু মেয়েটির হাবভাব খানিক অদ্ভুত। প্রথম পরিচয়-আলাপে সে তার বিশেষ কোনো কিছুই আন্দাজ করতে পারেনি। মেয়েটি কখনো গম্ভীর খিটখিটে মেজাজের—আবার মনে হয় হয়তো স্বাভাবিকই।

দুজনে পাশাপাশি বসে, ভালোই নিজেদের কাজে মনোযোগী হয়েছে। তবে মাঝেমধ্যে কাজের ফাঁকে ফাঁকে সে এই জারা নামক মেয়েটিকে আড় চোখে দেখছে। যদিও টুকটাক কথা বলার ইচ্ছে তার রয়েছে, কিন্তু মেয়েটি অত্যধিক পরিমাণে গম্ভীর হওয়ায় সে আর এই সাহস পাচ্ছে না।

এরইমাঝে আচমকা জারার ফোনের একটা কল আসে। ফোনটা চেক করতেই তার কপাল কুঁচকে যায়। খানিকটা বিরক্তি নিয়েই সে কলটা রিসিভ করে। পরক্ষণেই ফোনের অপর প্রান্ত হতে ব্যক্তির বলা কিছু কথা চুপ করে শোনার পর, খানিকটা রুক্ষ স্বরে সে বলতে শুরু করে,

"আপনাদের সমস্যাটা কি? আমি কতবার বললাম আমার নতুন জব হয়েছে। এই মূহুর্তে আমি এই টিউশনিতে কন্টিনিউ করতে পারব না। আর আমিও চাইছিও না।"

---"........

---"ঠিক আছে, আমি তেমন কাউকে পেলে অবশ্যই ব্যবস্তা করব।"

এইটুকু বলেই জারা তার ফোনটা রেখে দেয়। খানিকটা বিরক্তির শ্বাস ফেলে, রুক্ষ স্বরে আওড়ায়,

"যত্তসব, এতবার করে বলছি আমি টিউশনি করাতে পারব না। আর এনারা মানছেই না। খালি বাচ্চার পরীক্ষা সামনে, বাচ্চার পরীক্ষা সামনে...আরেহ্,বাচ্চার পরীক্ষা সামনে তাতে আমি কি করব?আশ্চর্য লোকজন!"

জারার কথাবার্তা গুলো তৃতীকার কাছে বেশ অদ্ভুত লাগল। সে কিছুটা সংকোচের সহিতে জারার উদ্দেশ্যে বলল,

"কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?"

তৃতীকার কথায় জারা তার দিকে ফিরে তাকায়। খানিকটা বিরক্তি ও সন্দিহান স্বরেই বলে ওঠে,

"হুম, বলো।"

---"একটু আগে তুমি যে ফোনে কথা বলছিলে...মানে বলতে চাচ্ছিলাম। তুমি কি তোমার কোনো টিউশনি ছেড়ে দিয়েছো?"

তৃতীকার সংকোচমূলক কথার স্বরে জারা কিছুটা ভারী শ্বাস ফেলে বলে,

"হুম। কিন্তু এরা আমার পিছুই ছাড়ছে না। এমনিতেই একটা গাধা বাচ্চাকে পড়াতে হয়। ঠিকমতো পড়াশোনা করেনা। আবার সামনের মাসে তার পরীক্ষা, এখন আমি টিউশনি ছেড়ে দিয়েছি বলে তাদের কত কাহিনি। এইমূহূর্তে আমার টিউশনি ছেড়ে দেওয়া নাকি ঠিক হচ্ছে না। আচ্ছা তুমিই বলো, আমার টিউশনি আমি যখন ইচ্ছে তখন ছাড়ব তাতে ওনাদের কি? আর বাচ্চার কবে কিসের পরীক্ষা, পাশ করবে নাকি ফেইল করবে তা কি টিউশনি ছাড়ার পরও আমার দেখার বিষয়? মোটেও না। আবার বলছে আমাকেই নাকি নতুন টিউটর খুঁজে দিতে হবে। যত্তসব ফাউল লোকজন।"

প্রচন্ড বিরক্তির সহিত এই কথাগুলো বলে জারা ভারী শ্বাস ফেলে নিজের কাজে মনোযোগী হয়। এমনিতেই সে নামীদামী এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। যথারীতি এসব টুকটাক টিউশনি পড়াতে নিয়েছিল শখের বসে। এখন এতো বড় অফিসে জব হওয়ায়,টিউশনির মতো ব্যাপারগুলো তার কাছে বড়ই তুচ্ছ হয়ে গিয়েছে।

এদিকে তৃতীকাও মেয়েটির এমন কথাবার্তা শুনে কিছুটা অবাক হয়। অবশ্য তার বেশি কিছুও বলার সুযোগ নেই। এই শহরে কত বিচিত্র মন-মানসিকতা মানুষজন যে রয়েছে, তা তৃতীকা পুরোপুরি জানতে না পারলে এই কয়েদিনে কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পেরেছে। তবে সে এসব বিষয় রেখে, জারার একটি কথাকে বিশেষ প্রাধান্য দিয়ে সরাসরি তার উদ্দেশ্যে বলল,

"উমমম,তুমি যদি কিছু মনে না করো তাহলে আমি তোমার এই টিউশনির ব্যাপারে আরো কিছু জানতে আগ্রহী। আই মিন, যেহেতু তুমি বললে তাদের নতুন টিউটর লাগবে..."

তৃতীকার কথার স্বরেই জারা খানিকটা সন্দিহান ও আনন্দের উদ্বেগে বলে ওঠে,

"তুমি পড়াবে নাকি? যদি বলো তাহলে আমি তোমাকে তাদের নাম্বার আর ঠিকানাটাও দিয়ে দিতে পারি। তুমি পড়ালে হয়তো আমার মাথা থেকে আপদটা বিদেয় হবে।"

জারার কথা শোনে তৃতীকা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে আলতো হাসে৷ পরক্ষণেই জারার কাছ থেকে টিউশনির ঠিকানা ও ফোন নম্বারটা জেনে নিয়ে, কিছুটা খুশি মনেই ভারী শ্বাস ফেলে। শুক্রবার ব্যতীত প্রতিদিন অফিস শেষে সন্ধ্যা বিকেলের দিকে একটা ক্লাস থ্রি পড়ুয়া বাচ্চাকে পড়াতে হবে। এবং বিনিময়ে এই টিউশনির জন্য পাবে ছয় হাজার টাকা। হয়তো তার জন্য কিছুটা প্রেসার হয়ে যাবে৷ কিন্তু মাস শেষে অফিসের চৌদ্দ হাজার আর এই একটা টিউশনির জন্য ছয় হাজার...সবমিলিয়ে বিশ হাজার—এটা তার জন্য অনেক বড় কিছু।

তৃতীকার ধ্যানে মগ্ন হয়ে ভাবনা চিন্তার মাঝেই, একজোড়া চোখ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায়। অফিসের বস তথা আধীর রায়ান তার কাঁচ-ঘেরা বিশাল রুম হতে তির্যক চাহনিতে তার দিকে তাকিয়, তাকে পর্যবেক্ষণ করছে।

কিছু তো একটা অদ্ভুত বিষয় রয়েছে এই মেয়েটার মাঝে। কিন্তু সে ঠিক হিসেবটা মেলাতে পারছে না। না! কিছু একটা তাকে করতে হবে। আর সেটা খুব শীঘ্রই। এই ভেবেই আধীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তৃতীকার দিক থেকে নজর সরিয়ে নেয়।অথচ রিফ্লেকটিভ গ্লাস হওয়ায় তৃতীকা কিংবা অন্য কেউই আধীরের কোনো কার্যক্রমই দেখতে পায়না।

_______

আজ সারাটাদিন অফিসে খাটাখাটুনির পর, অবশেষে বিকেলের শেষ প্রান্তে তৃতীকা অফিস থেকে মুক্তি পায়। এবং আগামীর জন্য কোনোপ্রকার দেরি না করে সোজাসুজি জারার দেওয়া ঠিকানার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়৷ কেননা অফিস শেষ হতেই সে তার কাঙ্খিত টিউশনির জন্য নির্দিষ্ট নাম্বারে কল করে—তার বিষয়টা জানায়। এবং গার্ডিয়ানও অত্যন্ত বিনয়ী ও আনন্দের সহিত তাকে তাদের বাড়ির ঠিকানায় যেতে বলে।

তাই তৃতীকা কোনো দেরি না করেই, সেই ঠিকানায় গিয়ে পৌঁছায়। অফিস থেকে কাছে হলেও জায়গাটা তার বাড়ি হতে বেশ দূরে৷ এদিকে সারাদিন না খেয়েদেয়ে শরীরটা আবারও ঝিমঝিম করছে। আগে জানলে হয়তো বাড়ি থেকেই খাবারের ব্যবস্তা করে আনতো, কিন্তু আজ আর তা হয়নি। আবার ক্যান্টিন থেকে কিছু খাওয়ার মতোও সুযোগ হয়নি। ফলাফলস্বরূপ পেটে ক্ষুধা নিয়েই সে তার গন্তব্যে পৌঁছল।

বিশাল এক প্রাসাদ সমতুল্য বাড়ি। বাড়ির চারপাশে বিশাল ইট-পাথরের দেওয়াল। সম্মূখে সোনালী রাঙা বিশাল এক গেইট। তার সামনে কয়েকজন নীল রাঙের পোশাক পরিধানরত গার্ড দাঁড়িয়ে। আর এমন একটা বাড়িতেই নাকি তার টিউশনি করাতে হবে।

তৃতীকা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে গেল। এটাই কি তার কাঙ্খিত ঠিকানা? নাকি আসতে কোনো ভুল হয়েছে। সে গেইটের দিকে এগিয়ে যেতেই দেখে, গেইটের একপাশে কালো রঙের টেমপ্লেটে সোনালী কালিতে বড় করে লেখা ❝চৌধুরী ম্যানশন❞।

এদিকে কোনো এক অপরিচিতকে বাড়ির সমানে ঘুরঘুর করতে দেখে, গার্ডরা তাকে সন্দেহের বশত তার পরিচয় জিজ্ঞেস করলে, তৃতীকা সরলমনে নিজের পরিচয় দেয়। এবং গার্ডদের পারমিশন নিয়েই বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে।

বাড়ির সদর দরজায় আসতেই, এক বৃদ্ধ নারীকে দেখে তৃতীকা খানিকটা থমকায়। বৃদ্ধার বেশভূষায় স্পষ্ট আভিজাত্যের ছাপ।হাত-গলা ভর্তি সোনার গহনা।হাতে দুটো মোটা বালা, গলায় মোটা একটা চেইন। দেখেই মনে হচ্ছে তিনি এই বাড়ির এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। ওদিকে সাদা পোশাকে মোড়ানো মধ্য বয়স্ক বৃদ্ধা নারীটি, তাকে দেখে এগিয়ে এলো। এবং এসেই জিজ্ঞেসার স্বরে বলল,

"এই যে মেয়ে, কে তুমি? তোমাকে ভেতরে আসতে দিয়েছে—অথচ আমি তো তোমায় চিনতে পারছি না।"

নারীটির কথাগুলো যথেষ্ট নমনীয়। তবে কন্ঠে জানার তীব্র আগ্রহ। তৃতীকা কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও, নিজেকে যথাসাধ্য স্বাভাবিক রেখে বলে ওঠে,

"আসসালামু আলাইকুম। টিউশনির জন্য আমাকে এই ঠিকানায় আসতে বলা হয়েছিল। এইজন্যই..."

তৃতীকার কথা শেষ হতে না হতেই, বৃদ্ধা নারী বিস্তৃত হেসে বলে উঠল,

"ওয়ালাইকুম আসসালাম! ওয়ালাইকুম আসসালাম! মাস্টারি পড়াবে তাহলে ওখানে দাঁড়িয়ে কেনো। ভেতরে আসো দ্রুত।"

হঠাৎ তার চোখে মুখে এতো উচ্ছ্বাস দেখে তৃতীকা কিছুটা অবাক হলো।বিষয়টা কেমন যেন তার বোধগম্য নয়। এরইমধ্যে নারীটি কাউকে জোর স্বরে ডাকতে লাগল,

"ঈশানী! ওই ঈশা! এদিকে আয় তো। ঈয়াশ আব্বার জন্য নতুন মাস্টার ডেকেছিস? এই দেখ, নতুন মেডাম আসছে।"

বৃদ্ধা নারীটির কথা শুনে, একটি অল্প-মধ্য বয়স্ক নারী সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো৷ পরনে সাধারণের মাঝেও আভিজাত্যে ঘেরা বেগুনী রঙের শাড়ি। ফর্সা গোলগাল চেহেরা, চুলগুলো খোপা করা। সবমিলিয়ে নান্দনিক এক সাজসজ্জা।

সেই অল্প বয়সী নারীটি তৃতীকাকে দেখে হাস্যজ্জ্বল অভিব্যক্তিতে সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলে,

"তুমিই কি সে—ফোন করেছিল যে?"

তৃতীকা খানিকটা ইতস্তত স্বরেই বলে,

"জ্বী, আমিই তৃতীকা৷"

---"বাহ, বেশ মিষ্টি নাম।"

ঈশানীর কথা শুনে পাশ থেকে বৃদ্ধা নারীটি আওড়ায়,

"তৃতীকা! মাইয়ার নামটাও যেমন, মাইয়া দেখতেও তেমন। মাশাল্লাহ, মাশাল্লাহ।"

টিউশনির খোঁজে শুরুতে এমন একটা জায়গায় চলে আসা, অতঃপর স্টুডেন্টের গার্ডিয়ান থেকে এমন সব মন্তব্য—সবকিছুই যেন তৃতীকাকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছে। তৃতীকা আলতোভাবে ইতস্তত ভঙ্গিতে মুচকি হাসে।

ওদিকে সে কিছু বলার আগেই ঈশানী আবার তাকে টেনে নিয়ে গিয়ে সোফায় বসিয়ে দেয়। এবং কিছু সার্ভেন্টকে ডেকে নানান নাস্তা-পানির ব্যবস্তা করে। এই দুজন ব্যক্তির এমন কার্যক্রমে তৃতীকা সম্পূর্ণ হতভম্ব। তার এখন পর্যন্ত সেভাবে কিছু বলার সুযোগই যেন হলো না। শুধু চুপচাপ বসে বসে দুজনের কাজকর্ম দেখে যাচ্ছে।

---"তুমি কি ঢাকায় একাই থাকো? তোমার বাবা-মা কিংবা অন্যকেউ..."

বৃদ্ধা নারী অর্থাৎ হাফসা বেগমের কৌতুহল সম্পূর্ণ কথার স্বরে,তৃতীকা কিছুটা মলিনতার সহিতেই জবাব দেয়,

"আমার বাবা-মা বেঁচে নেই।"

তৃতীকার এইটুকু কথাতেই দুজনেই সম্পূর্ণ থমকে যায়।এতো সুন্দর নমনীয় এক মেয়েটি কিনা সম্পূর্ণ এতিম। ভাবতেই তাদের মাঝে এক অসহায়বোধ কাজ করছে। এবার ঈশানীও কিছুটা মলিন হেসে আওড়ায়,

"সরি,আমাদের হয়তো উচিত হয়নি তোমাকে এসব জিজ্ঞেস করা।কিন্তু বিশ্বাস করো, তুমি ভারী মিষ্টি একটা মেয়ে। তোমার সাথে বিধাতা যখন এমন করেছে—দেখবে আগামীতে তোমার জন্য তিনি অনেক ভালো কিছু রেখে দিয়েছেন। কখনো হাল ছেড়ো না। খোদার প্রতি ভরসা রেখে, সৎ মনে কাজ করে যাবে। দেখবে তুমিও একদিন সফল হবে। তোমার জন্য আমাদের অনেক অনেক দোয়া রইল।"

এরইমাঝে আবার হাফসা বেগম একে একে তার পরিচয় সম্পর্কে যত কিছু জানা যায়, সবই সহজসরল মনে জেনে নেয়। কখনো তার গ্রাম-পরিচয়, কিংবা কখনো তার বাবা-মা সম্পর্কে। আবার বাবা-মায়ের সম্পর্কে জানতে গিয়ে, হাফসা ও ঈশানী...দুজনেরই মনও খারাপ হয়৷তবে তৃতীকাও তেমন সংকোচ বোধ করেনা। দুজনকেই তার বেশ মিশুক মনে হয়েছে। যতটুকু বলা ঠিকঠাক মনে হয়েছে, সে ততটুকু তাদের সাথে শেয়ার করে।

তবে তৃতীকা খেয়াল করে দেখল, এতো বিশাল বাড়িটিতে এই দুজন ব্যক্তি ব্যতীত আর কেউই নেই। অর্থাৎ এই মূহুর্তে আর কাউকেই তার নজরে এলো না৷ যা রয়েছে তা হলো, কয়েকজন সার্ভেন্ট তথা কাজের লোক। তৃতীকা এই বিষয়ে আর বেশি ভাবার প্রয়োজনবোধও করে না।কেননা তার মতে এসব তার জানার বিষয়ও নয়৷

এদিকে হাসিমুখে নানান কথার আলাপ শেষে, ঈশানী তথা তৃতীকার নতুন স্টুডেন্ট ঈয়াশের মা—তার উদ্দেশ্যে বলতে লাগল,

"তোমাকে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। আমার ছেলেটা অনেক ছোট৷ তেমনি অনেক দুষ্টও। পড়াশোনাটা ঠিকমতো করতেই চায় না। সামনে মাসে ওর এক্সাম, অথচ পড়াশোনার অবস্থা অত্যন্ত বাজে। এর মাঝেই আবার ওর পুরোনো মিস হুট করে চলে গেলেন। আমি তোমাকে এই মূহুর্তে কোনো প্রেশার দিচ্ছি না। কিন্তু পরীক্ষা যেহেতু আগামী মাস হতে, তাই তুমি যদি ঈয়াশকে আগামীকাল থেকেই পড়ানো শুরু করতে..."

এইসব পড়াশোনার বিষয়েও ঈশানীর কথাবার্তায় এতো ইতস্ততবোধ দেখে—তৃতীকা কিছুটা অবাক হয়। একইসাথে অবাক হয়,তখন অফিসে থাকাকালীন অবস্থায় ফোনে যখন জারা কথা বলছিলো—সে ঘটনাকে মনে করে। তার যদি ভুল না হয়, তবে সেসব রুক্ষভাষায় কথাবার্তাগুলো হয়তো জারা ঈশানীর সাথেই বলছিল। অথচ এমন লোকজনের সাথে কেউ কিভাবে ওমন করে রুক্ষ ভাষায় কথা বলতে পারে, তা তৃতীকার বোধগম্য নয়।

ঈশানীর কথার প্রতিত্তোরে তৃতীকা বিস্তৃত মুচকি হেসে বলে,

"জ্বী অবশ্যই, আমি আগামীকাল থেকেই পড়ানো শুরু করব।"

---"তাহলে তো বেশ ভালো হয়৷"

---"আ...যার জন্য এখানে আসা...আমার সেই স্টুডেন্ট ঈয়াশ কোথায়?

তৃতীকার কথায় ঈশানী হেসে ফেলে। ওদিকে আবার বৃদ্ধা নারীটি তথা হাফসা বেগম বলে ওঠে,

"আচ্ছা,ঈয়াশ আব্বা কি এখনো ঘুমাচ্ছে?"

ঈশানী হ্যাঁ সূচক স্বরে বলে,

"হুম, ওকে আর তাহলে না ডাকি। অসময়ে উঠলেই আবার দুষ্টমি শুরু করবে। "

তৃতীকাও বিস্তৃত হেসে বলে,

"আচ্ছা ঠিক আছে। কালই না হয়, ওর সাথে পরিচয়-আলাপ করে নেব।"

টুকটাক আরো কিছু কথাবার্তা পর তাদের কথোপকথন শেষ হয়। এদিকে প্রায় সন্ধ্যা নেমে আসছে। তৃতীকাও খুব বেশি দেরি করতে চাইল না। এখানে জোরপূর্বক হালকা নাস্তা করলেও, বেচারীর অনেক বেশি ক্ষিদে পেয়েছে। চোখমুখ চুপসে গেলেও, তার হাস্যজ্জ্বল হাসিতে, সে তা বোঝার উপায় সে রাখছে না।

অবশেষে ছোট করে বিদায়-আদায়ের পর, তৃতীকা চৌধুরী বাড়ি ছাড়তে সদর দরজার দিকে অগ্রসর হয়। তবে এরইমাঝে আবার আচমকা পেছন থেকে ঈশানীর ফোনে বলা কথোপকথন শুনতে পেয়ে—তার পা'জোড়া কিঞ্চিৎ সময়ের জন্য থেমে যায়।

তৃতীকার বিদায়ের মূহুর্তেই হঠাৎ এক পরিচিত ব্যক্তির নম্বর হতে ঈশানীর ফোনে কল এলে, সে প্রচন্ড হাসিমুখে উচ্ছ্বাসের সহিত কথা বলতে শুরু করে। এবং একটা পার্যায়ে সে বলে ওঠে,

"আহ্ আধীর, কখন বাড়ি আসবে তা বলো। আমি ওতোকিছু জানি না৷ ঈয়াশ ঘুম থেকে উঠলেই তোমার জন্য পাগলামি শুরু করবে।..."

আচমকা এই 'আধীর' নামটাই তৃতীকার থমকে দাঁড়ানোর কারণ। সে কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়ালেও, পরক্ষণেই আবার পেছনে না ফিরেই বাড়ির সীমানা ত্যাগ করে। এবং যেতে যেতে মনে মনে তাচ্ছিল্যের সহিত বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়,

"এই মিস্টার খারুস দেখি সব জায়গায় রয়েছে। কি আশ্চর্য!"

তৃতীকা এই বলেই হেসে ফেলে। নিমিষেই দৃশ্যমান হয় তার চকচকে গ্যাজ দাঁত। এছাড়া সে ঈশানীর কথপোকথনে ভেবেই নিয়েছে—এই আধীর হয়তো ঈশানীর স্বামী অর্থাৎ ঈয়াশের বাবা। আর এসকল ভাবনার মাঝেই সে অত্যধিক ক্ষিদের দরূন মলিন হেসে, একটা রিকশা নিয়ে তার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। এখন গিয়েই চুলোয় রান্না বসিয়ে—খেদে-দেয়ে পড়তে বসতে হবে।কেননা এই বয়সে এইটুকু পরিশ্রম না করলে কি আর—তার ভবিষ্যৎ সাফল্যের আলোয় উজ্জ্বল হবে?

চলবে_____

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন