#অতৃপ্ত_চাহনা
#তুরঙ্গনা
পর্ব—||০৭||
তৃতীকার অফিস টাইমের সমাপ্তি ঘটেছে। এবার সোজা টিউশনির উদ্দেশ্যে বেরোতে হবে। হাতে সময় খুবই কম। এই আধীর রায়ানের চক্করে পড়ে, প্রয়োজনের চেয়ে আজ বেশি সময় খাটতে হয়েছে। আধীর তাকে একে একে সবগুলো ফাইল রেডি করিয়েই—অতঃপর যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে।
তৃতীকা দেরি না করে দ্রুত, নিচে নেমে এলো। কিন্তু আটতলা হয়ে, অফিসের নিচে নামতেই দেখে—এখানে বড়সড় এক বিপত্তি বেঁধে রয়েছে। এই অবেলায় জোরেসোরে বৃষ্টি নেমেছে। যা দেখা মাত্রই তৃতীকা সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে যায়। এটা কি কোনো বৃষ্টি আসার সময় হলো? আর সবচেয়ে বড় কথা, তার কাছে তো কোনো ছাত নেই। আগে জানলে, নিজের সাথে করে অন্তত ছাতাটা নিয়ে আসত।
তৃতীকা বিরক্তি ও অসহায়বোধ নিয়েই, অফিসের গেইটের দিকে এগিয়ে যায়। একটা পিলারের নিচে দাঁড়িয়ে চুপচাপ ভাবতে থাকে,এখন তার কি করা উচিত। রাস্তার পাশ দিয়ে সব বড়বড় চার চাকার গাড়িগুলো ছুটে চলেছে। এই বড় রাস্তা পেরোলে, সামনে একটা মোড় রয়েছে। আর সেখান থেকেই শুধু রিকশা পাওয়া সম্ভব।
কিন্তু এতো বৃষ্টির মাঝে,এই বড় রাস্তাটা সে কিভাবে পেরোবে? একে তো এসব বড় বড় রাস্তায়,বড় বড় গাড়িগুলোকে তুমুল গতিতে ছুটতে দেখলেই তার ভেতরে ভয় জমে। অন্যদিকে রাস্তা পারাপারেরও সে খুব বেশি দক্ষ নয়। যদি সে দৌড় দিয়ে রাস্তা পার হতে চায়—নিশ্চিত আজ একটা অঘটন ঘটে যাবে।
তৃতীকা শেষমেষ উপায় না পেয়েই, বৃষ্টি না কমে যাওয়া অব্দি নিচে অপেক্ষা করার সিন্ধান্ত নেয়। একইসাথে চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নেয়। এই সময় হাতে গোনা কয়েকজনই, অফিস শেষে বের হচ্ছে। এছাড়া বেশিরভাগই আগেই চলে গিয়েছে। তৃতীকা হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে,দীর্ঘ শ্বাস ফেলল। অপেক্ষা করতে লাগল,বৃষ্টি কমে আসার।অথচ মিনিট দশ-পনেরো পেরিয়ে গেলেও, বৃষ্টি কমার আর নাম নেই।
তৃতীকা এই পর্যায়ে এসে একইসাথে প্রচন্ড বিরক্তও হলো। শেষে উপায় না পেয়ে, তীব্র বৃষ্টির মাঝেই সে পা বাড়ায়। তবে এক পা যেতে না যেতেই,প্রচন্ড বৃষ্টির ছিটেফোঁটায় সে চোখ বুঁজে ফেলে। এমন বৃষ্টিতে এক পা এগোনোও যেন অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তৃতীকা পিলার হতে খানিকটা সমানে এগোনোর পরও,তার শরীরের কোনো অংশই যেন ভিজছে না।
তৃতীকা বিস্ময়ে চোখ মেলে তাকায়৷ সম্মূখে তীব্র বৃষ্টি ঝড়লেও,সে মোটেও ভিজছে না। তৃতীকা মাথা উঁচিয়ে আকাশ দেখতে নিলে,এক নীল রঙের ছাউনির আবরণ—তার আর আকাশের মাঝে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।
তৃতীকা শুরুতে বুঝতেই পারল না, মূল ব্যাপাটা আসলে কি? সে চোখ পিটপিট করে পুনোরায়, তার মাথার উপরটা দেখতেই বুঝতে পারল—এটা একটা ছাতা। কিন্তু আচমকা তার মাথার উপরে ছাতা এলো কোথায় থেকে?
সে অজান্তেই খানিকটা ঘাবড়ে দু'পা পেছনে সরে আসে। কিন্তু এ দফায় সে আবারও চমকায়। তার পিঠ কারো শক্ত-পোক্ত বুকের সাথে আঁটকে গিয়েছে। তৃতীকার গলা শুঁকিয়ে কাঠ হয় নিমিষেই। সে দ্রুত উল্টো ঘুরে পেছনে ফিরতেই দেখে, গম্ভীর মানব আধীর রায়ান চৌধুরী স্বয়ং তার সামনে নীল রাঙা ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন।
আচমকা আধীরকে এবং তার গম্ভীর মুখশ্রী দেখে, তৃতীকা পুনরায় ঘাবড়ে যায়। তার ইতস্তত ও বোয়ালখালীর মাঝেই সে ভেজা ফ্লোরে আচমকা পা পিছলে, উল্টো দিকে পড়ে যেতে ধরে। আর ঠিক তৎক্ষনাৎ আধীর তার বলিষ্ঠ হাতের দরূন, তৃতীকার ডানহাতটা শক্ত করে ধরে তাকে পড়ে যাওয়া হতে আঁটকায়।
এবার তৃতীকার পাশাপাশি আধীরও যেন কিছুটা অবাক। তার অবাক হওয়ায় মূল কারণ, তৃতীকার হাবভাব কিংবা চালচলন। সে কিছুটা বিরক্তি ও গম্ভীর স্বরে তৃতীকার উদ্দেশ্যে বলে,
"মিস তৃতীকা! আপনি কি এমনই?"
এই বলেই আধীর তার হাতটা হেঁচকা টানে—তাকে নিজের কাছে নিয়ে আসে। মূলত তৃতীকাকে সোজা করে দাঁড় করাতে গিয়েই তার এই পদক্ষেপ। নয়তো তৃতীকার প্রতি তার স্পষ্ট বিরক্তিবোধ—এখনোও তার কপালের ভাজগুলোতে দৃশ্যমান।
এদিকে তৃতীকা সম্পূর্ণ বোকাবনে গিয়েছে। যেন বুঝতেই পারল না এটা কি হতে কি হলো।শুধু অতিদ্রুত আধীরের সংস্পর্শ হতে সরে এসে,নিজেকে স্বাভাবিক রেখে দাঁড়াল।
এদিকে আধীর আর একমুহূর্তও দেরি না করে, তৃতীকার হাতে ছাতাটা ধরিয়ে দিয়ে বলল,
"নিন!"
আচমকা আধীরে এহেন কাজে তৃতীকা বিস্মিত নয়নে তার দিকে তাকায়। তার মুখশ্রীর এমন অবিস্মরণীয় পরিবর্তনে, আধীর ভারী শ্বাস ফেলে তাকে একনজক দেখে নেয়। এবং পরক্ষণেই গম্ভীর স্বরে বলতে লাগল,
"বর্তমানে আবহাওয়ার গতিবিধি তেমন ভালো না। কখন ঝড়-বৃষ্টি এসে যায়, তা বলা মুশকিল। সবসময় ছাতা নিয়েই বাড়ি হতে বের হবেন। আর পারলে... সাদা ড্রেস এভয়েড করুন। নয়তো অনাকাঙ্খিত যেকোনো পরিস্থিতিতে পড়ার সম্ভবনা খুব বেশি।"
তৃতীকা যেন আরেক দফায় বিস্মিত হলো।আধীর আদতে কি বোঝাতে চাইল?নিজের দিকে মাথা নুইয়ে একপলক দেখার পর সে কিঞ্চিৎ ঢোক গিলল। অথচ আধীর তার হাতে ছাতা ধরিয়ে দিয়ে, নির্বিকারে তার গাড়ির দিকে হেঁটে চলেছে। তৎক্ষনাৎ আবার পেছন হতে, তৃতীকা বিস্মিত স্বরে বলে,
"কিন্তু...!"
তার কথা শুরু হবার পূর্বেই,আধীর পেছনে ফিরে না তাকিয়েই বলে,
"মনে করে,পরেরবার ছাতাটা দিয়ে যাবেন।"
এবার যেন তৃতীকার আর কিছুই বলার রইল না। সে ফ্যাল ফ্যাল করে আধীরের যাওয়ার পানে চেয়ে রইল।
আধীর চলে যেতেই, তৃতীকা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে সামনে এগোতে নিলেই—আচমকা সে টের পায়, তার জুটোর দশা ঠিকঠাক নেই। তৃতীকা পা উলোটপালোট করে চেয়ে দেখে, তার আধা - ছিঁড়া জুতোর একপাশ একেবারে খুলে গিয়েছে। তখন পা পিছলে পড়াতেই এই দশা হয়েছে। আর এখন যদি আর একটু অসাবধানতার সাথে হাঁটতে থাকে,তবে কপালে আরো দুঃখ রয়েছে। কেননা তখন এই জুতো পুরোপুরিই ছিঁড়ে যাবে,একইসাথে নতুন এক বিপত্তি বাঁধবে।
তৃতীকা হতাশ হয়ে, একবার সামনে তাকিয়ে দেখে—আধীরের বড়সড় সাদা-কালো রঙের দামি-চকচকে গাড়িটা, দ্রুত গেইট পেড়িয়ে অফিসের সীমানা ছাড়ল। এদিকে তৃতীকা খানিকটা বিরক্ত,রাগ ও হতাশা নিয়ে, নিজের জুতোটার দিকে চেয়ে নিস্পৃহে আওড়ায়,
"ওহ খোদা,এই খারুস আমার জন্য আশীর্বাদ নাকি আতংক—তাই এখনো বুঝে উঠতে পারলাম না।"
______
প্রচন্ড বৃষ্টির মাঝেই তৃতীকা চৌধুরী ম্যানশনে এসে পৌঁছাল। হাতে ছাতা থাকলেও, এতো বৃষ্টির দরূন সে অনেকটাই ভিজে গিয়েছে৷ যথারীতি একটুও দেরি না করে, সে সোজা বাড়ির ভেতরে এসে প্রবেশ করল।
তাকে দেখামাত্রই ঈশানী যেন কিছুটা অবাক হলো। সে তো ভেবেছিল,এতো বৃষ্টিতে হয়তো তৃতীকা আজ আর আসতে পারবে না। ঈশানী অতিদ্রুত সার্ভেন্টদের ডেকে,তৃতীকার জন্য একটা সাদা তোয়ালে এনে দেয়। অতঃপর তার কাছে এগিয়ে এসে বলে,
"তুমি যে আজ আসবে আমি তো কল্পনাও করিনি। এতোটা প্রেশার নিয়ে, না এলেও হতো।"
তৃতীকা কিছুই না বলে,নিস্পৃহে মুচকি হাসে। এই বাড়ির লোকগুলো এতো বেশি আন্তরিক কিভাবে হতে পারে—তা তার মাথায় আসে না। শহরে আসার পর, মনের মতো দু'জন মানুষের সন্ধান হয়তো সে এখানেই পেলো।
তৃতীকা তোয়ালে দিয়ে হালকা করে,তার চুল ও গায়ের পানিগুলো মুছে নেয়। ভেজা গাঢ় নীল রঙের ছাতাটা খানিক যত্ন ও সতর্কতার সাথেই, সে বাড়ির বারান্দায় রেখে দেয়। অতঃপর আলগোছে ঈশানীর দেখানো অনুযায়ী, ঈয়াশের পড়ার ঘরে প্রবেশ করে।
-
ছোট বাচ্চার জন্য সাজানো-গোছানো এক ঘর। ঘরের একপাশে সুন্দর আকারের ছোট বিছানা। একপাশে পড়ার টেবিল। ঘরের দেওয়ালগুলোতে নানা রকমের স্টিকার লাগানো। এক কোণায় অনেকগুলো খেলনা গুছিয়ে বড় আকারের ঝুড়িতে রাখা।
চারপাশটা একপলক দেখার পর, তৃতীকা সমানে তাকিয়ে দেখে, পড়ার টেবিলের একপাশে একটা ছোট্ট গোলমেলে চেহেরার বাচ্চা বসে রয়েছে। চুলগুলো খানিকটা কোঁকড়ানো। ফর্সা মিষ্টি একটা চেহেরা। তবে চোখে-মুখের ভাবগাম্ভীর্যের মাঝে, একধরনের দুষ্টুমির অব্যয় স্পষ্ট।
তৃতীকার আর বুঝতে বাকি নেই,এটাই সেই ঈয়াশ। তৃতীকা মুচকি হেসে তার দিকে এগিয়ে যায়। ঈশায় খানিকটা সন্দিহান দৃষ্টিতে তার দিকেই চেয়ে ছিল। তৃতীকা তার দিকে মুচকি হেসে এগিয়ে যায়।আর ঠিক তৎক্ষনাৎ ঈয়াশ তার উদ্দেশ্যে বলে ওঠে,
"আপনি কি আমাকে প্রতিদিন পড়াবেন?"
ঈয়াশের কথায়, তৃতীকা কিঞ্চিৎ মুচকি হাসে। ঈয়াশের অভিব্যক্তিতে বোঝাই যাচ্ছে, সে তার নতুন টিউটরের প্রতি খুব একটা খুশি নয়। হয়তো হঠাৎ টিচার পরিবর্তনই,এর মূল কারণ।
---"হুম,তোমার পরীক্ষা শেষ না হওয়া অব্দি আমি চেষ্টা করব প্রতিদিন পড়ানোর। এরপর হতে, প্রতি শুক্রবার ছুটি থাকবে তোমার জন্য।"
তৃতীকা মুচকি হেসে কথাটা বললেও, ঈশায় এ কথা শোনা মাত্রই হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে আওড়ায়,
"ওহ!"
পরক্ষনেই আবার কি যেন মনে পড়তেই, সে তৃতীকার দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে বলে,
"আপনাকে আসসালামু..লাইকুম।"
অতিদ্রুত বলায়, সালামের উচ্চারণের মাঝে খানিকটা তারতম্য হয়ে যায়। তবে তৃতীকা নিমিষেই বিস্তৃত হেসে বলল,
"ওয়ালাইকুম আসসালাম।তুমি তো ভারী মিষ্টি!"
---"আমিও মোটেও মিষ্টি নই। আমার নাম ইয়াশ আর মিষ্টি আমার স্কুল ফ্রেন্ড। ও দেখতে অনেক সুন্দর। একদম রসগোল্লার মতো। তুমি রসগোল্লা খাও? আমার কিন্তু রসগোল্লা অনেক ভালো লাগে। কিন্তু বগুড়ার দই বেশি মজা।"
তৃতীকা যেন ঈয়াশের এহেন কথাবার্তা শুনে সম্পূর্ণ হতভম্ব। কি সুন্দর নির্বিকারে সে একের পর এক কথা বলে গেল। কোথাও থামল না, কোথাও দুদণ্ড ভাবার প্রয়োজন বোধ করল না। সবমিলিয়ে ছেলেটা বেশ মজাদার। অন্তত তৃতীকার কাছে তাই মনে হলো। তৃতীকা অজান্তেই বিস্তৃত হেসে ফেলল।নিমিষেই দৃশ্যমান হয় তার গ্যাজ দাঁত।
তৃতীকা হ্যান্ড শেক্ করতে, ঈয়াশের দিকে হাত বাড়িয়ে বলে,
"হাই,আমি তৃতীকা!"
---"ওয়াউ!! আপনার হাসিটা অনেক সুন্দর মিস।... বাই দ্য ওয়ে,আই'ম ঈয়াশ চৌধুরী।"
পুনোরায় ঈয়াশের এক হাত বাড়িয়ে কথা বলা। আর এবারও তৃতীকা না হেসে আর পারল না। সে আবারও হেসে মনে মনে আওড়ায়,
"এই বিচ্ছুকে সামলানো মুশকিল হবে।"
______
এখনো বৃষ্টি থামার কোনো নাম নেই। বৃষ্টির বেগ কমতে শুরু করলেও,বৃষ্টি পুরোপুরি থামেনি। এরইমাঝে চৌধুরী ম্যানশনের সোনালী গেইট পেরিয়ে, এক সাদা-কালো রঙের দামি ব্রান্ডের গাড়ি এসে প্রবেশ করল। এবং তা ঠিক সদর দরজার কাছে এসে থামল।
মূহুর্তেই গাড়ি হতে বেড়িয়ে এলো আধীর রায়ান। পরনে সেই অফিসের সুট-বুট পড়া। যেন অফিসের পর সে সোজা এখানেই এসেছে।
আধীর দেরি না করে দ্রুত বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। হাতে ছাতা না থাকায়, কিঞ্চিৎ সময়ের মাঝেই সে খানিকটা ভিজেও যায়।তবুও হাত দিয়ে, কাঁধের পানির ছিটেফোঁটা ঝেড়ে সামনের দিকে এগোতে থাকে।
কিন্তু দরজার পাশেই হঠাৎ বিশেষ কিছু নজরে পড়তেই,তার চোখেমুখের গম্ভীর্যের ছাপ অনেকটা দৃঢ় হয়। খেয়াল করে দেখে,হুবহু তার নীল রঙের ছাতার মতো একটি ভেজা ছাতা দরজাটার পাশে বারান্দায় রেখে দেওয়া।
আধীরে যতটুকু জানা রয়েছে,এমন ছাতা হাতেগোনা বিশেষ কয়েকজনেরই রয়েছে। কারণ এই ব্রান্ডের ছাতাগুলো নিজের মতো করে ব্রান্ড হতে ডিজাইন করে বানানো যায়।আর তার ছাতার মতো এটারও হাতলটা সোনালী রঙের।
আধীরের মনে খানিকটা খটকা লাগলেও,সে এসবে খুব বেশি পাত্তা না দিয়ে এগিয়ে যায়। দরজার কাছে আসতেই দেখে, হাফসা বেগম সম্মূখে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আর তাকে দেখামাত্রই সে প্রচন্ড উচ্ছ্বাসের সহিত, তার কাছে এগিয়ে এসে বলে,
"আধীর! তুমি সত্যি সত্যি আসছো? আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না।"
আধীর হাফসা বেগমকে দেখে, বিস্তৃত মুচকি হেসে বলল,
"আসসালামু আলাইকুম, ফুপি।ভালো আছেন?
---"ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমি কিনা আর ভালো থাকব না? তোমারে দেখে এখন আমি খুব ভালো হয়ে গিয়েছি। ওরে ঈশানী,দেখ! দেখ! কে আসছে।"
আধীর তার এতো প্রফুল্লতায় মুচকি হাসে। তবে কিছু একটা ভেবে নিয়ে,হাফসার উদ্দেশ্যে বলে,
"ফুপি! বাড়িতে কি কেউ এসেছে?"
আধীরের কথায়, হাফসা বেগম খানিকক্ষণ ভেবে নিয়ে, কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বের স্বরে আওড়ায়,
"কই, না তো!"
_____
আধীর,হাফসা বেগম ও ঈশানী সোফায় বসে একসাথে নানান গল্প-আলাপ করছে৷ তাদের জন্য আধীরের হঠাৎ আজ বাড়ি আসাটা ছিল অকল্পনীয়। এবং এতে দুজনেই বেশ খুশি। তারা অপেক্ষা করছে কখন ঈয়াশের পড়া শেষ হবে, আর সে আধীরকে দেখবে। আধীরের জন্য ঈয়াশ প্রচন্ড পাগল। তবে আধীরকে সচারাচর তার কাছে পায় না বিধায়, এই নিয়ে আধীরের প্রতি তার অভিমান কিংবা আপসোস দুটোই জমে রয়েছে। কিন্তু আধীরের সান্নিধ্য পেতেই, তা আবার পুনোরায় হাওয়া হয়ে উড়ে যায়।
আধীর বরাবরের মতো চুপচাপ দু'একটা কথা গম্ভীর স্বরে আওড়াচ্ছে। এছাড়া বাকি সব কথাবার্তা, হাফসা আর ঈশানীই বলছে। এছাড়া আধীরের ধ্যান-জ্ঞান এখন ভিন্ন চিন্তায় মগ্ন।
এরইমাঝে আবার ভেতরের ঘর হতে, ঈয়াশ ছুটে দৌড়ে এলো। আজকের মতো তার পড়া শেষ। ঈয়াশ ড্রইং রুমে এসেই দেখে, সোফায় পায়ের উপর পা তুলে আধীর নির্বিকারে বসে রয়েছে। আর তাকে দেখামাত্রই যেন, ঈয়াশের বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাসের জোয়ার নামে।
ঈয়াশ আধীরের কাছে এসেই, তার কোলে উপর চড়ে বসে। এবং আধীরের গলাটা পেঁচিয়ে,বুকে মুখ লুকিয়ে একপ্রকার কেঁদে ফেলে। ওর কান্নায় আধীর খানিকটা চমকায়। তবে খুব বেশি অবাক হয়না। ঈয়াশ তার জন্য বরাবরই খুব পাগল। ঈয়াশের পাশাপাশি, আধীরও তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে,
"বাবা,কি হয়েছে? কাঁদছো কেনো? এই তো আমি এসেছি।"
আচমকা আধীরের কথার স্বর, নরম হয়ে এসেছে। তথাকথিত গম্ভীর্যেঘেরা আধীরের চেয়ে, এই আধীরের মাঝে বেশ পার্থক্য রয়েছে।এদিকে আধীরে কন্ঠে ঈয়াশও খানিকটা নরম হয়। সে ফুঁপিয়ে বলে ওঠে,
"তুমি এখানে আসো না কেনো? তুমি জানো না,আমি তোমাকে কতটা মিস করি?"
আধীর খানিকটা সময় চুপ থাকে। সে আর কিছুই না বলে ভারী শ্বাস ফেলে। ওদিকে হাফসা আর ঈশানীও একমনে দুজনকে দেখছে। তাদের দৃষ্টিতেও হতাশার স্পষ্ট ছাপ।
এদিকে তৃতীকাও পড়ানো শেষে, ঈয়াশের পেছন পেছন ড্রইং রুম অব্দি আসতেই খানিকটা থমকে যায়। উল্টো দিকের সোফায় বসে থাকা এক ব্যক্তিকে আঁকড়ে ধরে, ঈয়াশ কেঁদে চলেছে। তৃতীকা ভাবলো,এটা হয়তো ঈয়াশের বাবা। কিন্তু ঈয়াশ কেনো এভাবে কাঁদছে তাই বুঝতে পারছে না।
এছাড়া লোকটি উল্টো ঘুরে বসে থাকায়, তৃতীকা তার চেহেরাটাও স্পষ্ট দেখতে পেল না। তবে এইটুকু বুঝল,এখানে আর বেশিক্ষণ থাকাটা ঠিক হবে না৷ তৃতীকা আলগোছে খানিক এগিয়ে যায়, সোফার একপাশে বসে থাকা হাফসা আর ঈশানীর দিকে৷
অনেকটা নমনীয় স্বরেই, তাদের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে,
"আচ্ছা, আমি তাহলে আজ আসছি৷ ভালো থাকবেন,আসসালামু আলাই..."
তৃতীকার কথা সম্পূর্ণ হয়না। বরং তার পূর্বেই হাফসা ও ঈশানীর পাশাপাশি—উল্টো ঘুরে বসে থাকা ব্যাক্তিও, পেছন ফিরে মুখ ঘুরিয়ে তৃতীকার দিকে তাকায়।ওমনি যেন তৃতীকা সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে যায়। আর ঈয়াশও তৃতীকাকে দেখামাত্রই,ঠিক তৎক্ষনাৎ আধীরের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে,
"হেই বাডি,দেখো ওটা আমার নতুন মিস৷... আ...কি যেন নাম...মিস তেঁতোকা! কিন্তু সে অনেক ভালো, একদম আমার স্কুল ফ্রেন্ড মিষ্টির মতো রসগোল্লা।"
চলবে________