নিভৃত নক্ষত্র ✨
#নিভৃত_নক্ষত্র
#পর্ব_২
রেফা
জন্মদিনের আনন্দ শেষ হয়েছে কয়েক দিন আগে। যে উঠোনটায় সেদিন মানুষের ভিড়, হাসির শব্দ আর ছোট ছোট বাচ্চাদের দৌড়ঝাঁপে মুখর হয়ে ছিল, সেই উঠোনটাই এখন আবার আগের মতো শান্ত।
সকালের রোদ ধীরে ধীরে দোতলা বাড়িটার বারান্দা পেরিয়ে মাটির উঠোনে এসে পড়েছে। রাতের শিশিরে ভেজা মাটিতে এখনও হালকা সোঁদা গন্ধ। উঠোনের এক পাশে কয়েকটা মুরগি খাবার কুড়োচ্ছে। রান্নাঘর থেকে ভাতের গন্ধ ভেসে আসছে। দূরে কোথাও একটা শালিক ডেকে উঠল।
মঞ্জোয়ারা মুন প্রতিদিনের মতো সকালেই অফিসে চলে গেছেন। যাওয়ার আগে মিথিলার কপালে একটা চুমু এঁকে দিয়ে বলেছিলেন,
— "ভালো মেয়ে হয়ে থাকিস। আমি বিকেলে এসে তোর জন্য কিছু নিয়ে আসব।"
মিথিলা তখনও আধো ঘুমে চোখ মুছছিল। শুধু মাথা নেড়ে আবার সুয়ে পড়েছিল।
আব্বুও ভোরে বেরিয়ে গেছেন। তাঁর কাজের জন্য প্রায়ই বাড়ির বাইরে থাকতে হয়।
দাদা চাকরির কারণে বেশির ভাগ সময় শহরেই থাকেন। বাড়িতে এখন শুধু দাদি, মেজো বাবা রাসেল আর ছোট্ট মিথিলা।
ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুয়ে মিথিলা উঠোনে এল। কিন্তু আজ উঠোনটা কেমন যেন অন্যরকম লাগছে।
দাদি ঘরের ভেতর থেকে পুরোনো একটা লোহার ট্রাঙ্ক টেনে বের করেছেন। মেজো বাবা রাসেল আলমারি থেকে কাপড় নামিয়ে ভাঁজ করছে। কখনো ট্রাঙ্কে রাখছে, কখনো আবার বের করে গুছিয়ে রাখছে।
এক কোণে কয়েকটা থালা-বাটি, গ্লাস, কম্বল আর বালিশ আলাদা করে রাখা।
সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে, কেউ যেন অনেক দূরে কোথাও চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মিথিলা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই দেখল।
তারপর ছোট ছোট পায়ে দাদির কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
— "দাদি..."
— "হুম?"
— "এত কাপড় বের করছ কেন?"
দাদি হাতের কাজ থামালেন না।
শুধু শান্ত গলায় বললেন,
— "গুছিয়ে রাখছি।"
— "কোথায় যাবে?"
এবার রাসেল মাথা তুলে মুচকি হেসে বলল,
— "শহরে যাব।"
মিথিলা অবাক হয়ে রাসেলের দিকে তাকিয়ে রইল।
— "সত্যি?"
— "হ্যাঁ। দাদার কাছে।"
ছোট্ট মুখটা একটু গম্ভীর হয়ে গেল।
— "কবে যাবে?"
— "আর কয়েক দিনের মধ্যেই।"
মিথিলা আর কোনো কথা বলল না।
ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে উঠোনে চলে এল।
মাটিতে পড়ে থাকা একটা শুকনো আমপাতা তুলে আঙুল দিয়ে ভাঙতে লাগল।
দাদি চলে যাবে...
এই কথাটাই যেন বারবার মাথার ভেতর ঘুরছে।
দাদি তাকে খুব একটা আদর করেন না। কোলে নিয়েও বসেন না। কিন্তু দুপুরে খেতে না চাইলে বকা দিয়ে হলেও খাইয়ে দেন। অসুখ হলে গরম পানি করে দেন। শীতের রাতে চুপচাপ গায়ে কম্বল টেনে দেন।
এসব কি আর শহরে চলে গেলে থাকবে?
মিথিলা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ঠিক তখনই রাসেল বাইরে এসে ডাক দিল,
— "মিথিলা!"
— "কী বাবা?"
— "এদিকে আয় তো।"
মিথিলা দৌড়ে গেল।
রাসেল একটা ছোট্ট ব্যাগ এগিয়ে দিয়ে বলল,
— "এটার চেইনটা আটকে দে তো।"
মিথিলা খুব মন দিয়ে চেইন লাগাতে লাগল।
হঠাৎ তার মনে একটা প্রশ্ন এলো।
— "বাবা..."
— "হুম?"
— "তুমি কত দিন পরে আসবা?"
রাসেল একটু থেমে গেল।
তারপর হেসে বলল,
— "খুব বেশি দিন না। মাঝেমধ্যে আসব।"
মিথিলা মাথা নাড়ল।
সে তখনও জানে না...
এই গোছগাছ শুধু দাদি আর রাসেলের জন্য নয়।
তার নিজের ছোট্ট জীবনটাও ধীরে ধীরে গুছিয়ে অন্য এক ঠিকানার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
বিকেলের দিকে মিথিলা বারবার রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকল।
কখন মা আসবে...
আজ তাকে অনেক কথা বলতে হবে।
বলতে হবে, দাদি চলে যাচ্ছে।
বলতে হবে, রাসেল বাবাও চলে যাচ্ছে।
তার একটুও ভালো লাগছে না...
বিকেলের রোদ তখন একটু নরম হয়ে এসেছে। উঠোনের একপাশে লম্বা ছায়া পড়েছে। দাদি রান্নাঘরে রাতের রান্নার আয়োজন করছেন। রাসেল বাবা আবারও ট্রাঙ্কের ভেতর জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখছে। মাঝে মাঝে কী যেন খুঁজে না পেয়ে দাদিকে জিজ্ঞেস করছে,
— "আম্মা, ওই নীল চাদরটা কোথায়?"
— "আলমারির ওপরের তাকে আছে, দেখে নে।"
মিথিলা চুপচাপ উঠোনে বসে সব দেখছিল। আজ খেলতে যাওয়ারও ইচ্ছে করছে না। মনে হচ্ছিল, বাড়ির সবাই যেন তাকে না জানিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ করছে।
হঠাৎ গেটের বাইরে রিকশার ঘণ্টার শব্দ শোনা গেল।
মিথিলা দৌড়ে উঠোন পেরিয়ে গেটের দিকে চলে গেল।
— "মা এসেছে!"
রিকশা থেকে নামতেই মঞ্জোয়ারা মুন ক্লান্ত মুখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। অফিসের ব্যাগটা কাঁধে, কপালে ঘামের ছোট ছোট ফোঁটা।
মিথিলা ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল।
— "মা!"
— "আরে, আমার মেয়েটা! আজ সারাদিন কী করেছিস?"
মিথিলা কোনো উত্তর না দিয়ে হাত ধরে টানতে লাগল।
— "চলো... চলো... তোমাকে একটা কথা বলব।"
মা হেসে বললেন,
— "এই তো এলাম। ভাড়া মিটিয়ে সে মেয়ে কে নিয়ে বাড়ির ভিতরে গেলেন
—
মায়ের হাত ধরে টেনে উঠোনে নিয়ে এল সে।
ছোট্ট মুখটা কেমন গম্ভীর।
— "মা... দাদি চলে যাবে।"
মা একটু থেমে গেলেন।
তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন,
— "হ্যাঁ, জানি তো।"
— "রাসেল বাবাও যাবে।"
— "হ্যাঁ, সেও যাবে।"
মিথিলা এবার মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
মা বুঝতে পারলেন, ছোট্ট মেয়েটার মন খারাপ।
তিনি ব্যাগ খুলে ভেতর থেকে একটা বড় চকোলেট বের করলেন।
— "দেখ তো, আজ তোর জন্য কী এনেছি!"
চকোলেটটা দেখেই মিথিলার চোখ দুটো একটু চকচক করে উঠল।
— "আমার?"
— "হুম, তোরই।"
সে চকোলেটটা হাতে নিয়ে মুচকি হেসে ফেলল। কিন্তু হাসিটা বেশিক্ষণ থাকল না।
চকোলেটের মোড়কটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে দেখতে আবার জিজ্ঞেস করল,
— "মা... দাদি গেলে বাড়িটা একদম ফাঁকা হয়ে যাবে না?"
মা মেয়ের পাশে বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
— "একটু তো লাগবেই।"
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
শুধু উঠোনে বাতাসের শব্দ।
দূরে কারও বাড়ি থেকে ভাত নাড়ার শব্দ ভেসে আসছে।
মা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে আস্তে করে বললেন,
— "শুধু দাদি না মা..."
মিথিলা মাথা তুলে তাকাল।
— "তুইও যাবি।"
মিথিলা যেন বুঝতেই পারল না।
— "আমি?"
— "হ্যাঁ। শহরে একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করব তোকে। দাদির সঙ্গে থাকবি। পড়াশোনা করবি।"
ছোট্ট মেয়েটা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
— "আমি... এখানেই পড়ি না?"
— "পড়িস। কিন্তু শহরে আরও ভালো পড়তে পারবি।"
— "আমি গেলে... তুমি?"
মায়ের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
তবু মুখে হাসি রেখেই বললেন,
— "আমি আর আব্বু তো চাকরি করি, মা। ছুটি পেলেই তোকে দেখতে যাব। তুইও ছুটিতে বাড়ি আসবি।"
মিথিলা এবার আর কিছু বলল না।
সে শুধু মায়ের কাঁধে মাথা রেখে বসে রইল।
তার ছোট্ট মাথায় এত বড় কথা ঢুকছে না।
সে শুধু বুঝছে...
আজ দাদি যাবে।
রাসেল বাবা যাবে।
আর এখন মা বলছে...
সেও যাবে।
হঠাৎ মনে হলো, তার খুব প্রিয় খেলনার বাক্সটা এখনও তো গুছানোই হয়নি।
সে দৌড়ে ঘরের ভেতর চলে গেল।
মা অবাক হয়ে পেছন পেছন তাকিয়ে রইলেন।
ঘরে ঢুকে মিথিলা নিজের ছোট্ট পুতুলটা তুলে নিল।
তারপর স্কুলব্যাগটা জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ বসে রইল।
ব্যাগটার ভেতরে এখনও আগের দিনের খাতা আছে।
একটা পেন্সিল।
রাবার।
আর বাংলা বইয়ের ভাঁজের মধ্যে রাখা একটা শুকনো শিউলি ফুল।
ফুলটা হাতে নিয়ে সে শুধু ফিসফিস করে বলল,
— "আমি কি তোমাকেও নিয়ে যেতে পারব?"
ঘরের বাইরে তখন সন্ধ্যার আজান শুরু হয়েছে।
আর মঞ্জোয়ারা মুন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ নিজের মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছেন।
মেয়েটা এখনও বুঝে উঠতে পারেনি সামনে কী অপেক্ষা করছে।
কিন্তু একজন মা ঠিকই বুঝে গেছেন...
আজ থেকেই তাঁর ছোট্ট মেয়েটা ধীরে ধীরে বড় হয়ে যাওয়ার পথে হাঁটা শুরু করেছে।রাতটা যেন সেদিন অন্যসব রাতের মতো ছিল না।
রাতের খাবার শেষ করে সবাই যে যার মতো বসে আছে। উঠোনের মাঝখানে পাটি পেতে দাদি বসে কি যেনো ভাবছেন । রাসেল বাবা আর আব্বু দু'জনে শহরে নিয়ে যাওয়ার কী কী বাকি আছে, সেগুলো নিয়ে গল্প করছেন। মাঝেমধ্যে দু-একজন প্রতিবেশীও এসে বসছে, আবার চলে যাচ্ছে।
কেউ বলছে,
— "মেয়েটাকে শহরে পড়ালে ভালোই হবে।"
আবার কেউ বলছে,
— "এত ছোট বয়সে মা-বাবাকে ছেড়ে থাকবে, কষ্ট হবে ।"
বড়দের কথাগুলো পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও, "শহর" আর "যাবে"—এই দুটি শব্দ বারবার কানে এসে লাগছিল মিথিলার।
সে চুপচাপ মায়ের গা ঘেঁষে বসে ছিল।
হঠাৎ খুব আস্তে করে জিজ্ঞেস করল,
— "মা..."
— "হুম?"
— "আমি যদি না যাই?"
প্রশ্নটা শুনে আশেপাশে বসে থাকা সবাই কয়েক সেকেন্ডের জন্য চুপ হয়ে গেল।
মা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে শুধু বললেন,
— "সব সময় তো নিজের ইচ্ছেমতো সব হয় না, মা। তুই ভালো করে পড়বি, বড় হবি। দেখিস, সময় খুব তাড়াতাড়ি চলে যাবে।"
মিথিলা ঠোঁট ফুলিয়ে বসে রইল।
তার কাছে "সময়" মানে কত দিন, সেটা সে জানে না।
সে শুধু জানে, আজ রাতে যদি মায়ের পাশে ঘুমায়, কয়েক দিন পর হয়তো আর ঘুমাতে পারবে না।
সেদিন রাতে বিছানায় শুয়েও তার ঘুম আসছিল না।
মা পাশে শুয়ে আছেন।
মিথিলা আলতো করে মায়ের হাতটা শক্ত করে ধরে রাখল।
মা অবাক হয়ে বললেন,
— "কী হলো?"
— "তুমি হাত ছাড়বে না তো?"
মায়ের বুকটা কেঁপে উঠল।
তিনি হেসে বললেন,
— "না, ছাড়ব না। ঘুমিয়ে পড়।"
কিন্তু মিথিলা ঘুমিয়ে পড়ার অনেকক্ষণ পরেও মঞ্জোয়ারা মুন জেগে ছিলেন।
মেয়ের কপালে পড়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিচ্ছিলেন, আর অন্ধকারে চুপচাপ তাকিয়ে ছিলেন তার মুখের দিকে।
মনে মনে শুধু একটাই কথা বলছিলেন—
"আল্লাহ, আমার মেয়েটাকে তুমি ভালো রেখো।"
পরদিন সকাল।
বাড়িটা আজ আরও বেশি ব্যস্ত।
আজ আর মা অফিসে যাননি।
খুব ভোর থেকেই তিনি দাদির সঙ্গে কাপড় গুছাচ্ছেন। ট্রাঙ্কের তালা ঠিক আছে কি না দেখছেন। মিথিলার জামাগুলো আলাদা করে ভাঁজ করে রাখছেন।
মিথিলা ঘুম থেকে উঠে সবকিছু চুপচাপ দেখল।
আজ আর কেউ তাকে কিছু বলছে না।
কেউ হাসছে না।
সবাই শুধু নিজের কাজে ব্যস্ত।
তার ছোট্ট মনটা কেমন অস্থির হয়ে উঠল।
সে ধীরে ধীরে নিজের ঘরে গেল।
পুতুলটার দিকে তাকাল।
তারপর জানালার বাইরে তাকাল।
উঠোন...
আমগাছ...
দোলনাটা...
সবকিছু যেন তাকে ডাকছে।
তার হঠাৎ খুব ইচ্ছে করল কোথাও চলে যেতে।
এমন কোথাও, যেখানে কেউ তাকে খুঁজে পাবে না।
চুপচাপ দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল সে।
কেউ খেয়ালই করল না।
মাটির সরু রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে সে চলে গেল তাদের স্কুলের দিকে।
স্কুল বন্ধ।
মাঠটাও ফাঁকা।
একটা গাছের নিচে গিয়ে বসে পড়ল।
হাঁটু জড়িয়ে বসে ছোট্ট গলায় নিজেকেই বলল,
— "আমি বাড়ি যাব না..."
কিছুক্ষণ পর আবার বলল,
— "আমি যদি না ফিরি... তাহলে কি আমাকে নিয়ে যেতে পারবে?"
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো সেখানে কেউ ছিল না।
শুধু গাছের পাতাগুলো বাতাসে দুলছিল।
আর দূরে কোথাও একটা কোকিল ডেকে উঠেছিল।
সময় গড়িয়ে যেতে লাগল।
এদিকে বাড়িতে কেউ তখনও বুঝতে পারেনি, মিথিলা কখন বেরিয়ে গেছে।
দাদি রান্নাঘর থেকে ডাক দিলেন,
— "মিথিলা... এই মিথিলা, ভাত খেয়ে নে।"
কোনো উত্তর নেই।
দাদি ভেবেছিলেন, হয়তো উঠোনেই খেলছে। কিন্তু উঠোনে নেই। বারান্দায় নেই। ঘরেও নেই।
তিনি একটু জোরে ডাকলেন,
— "রাসেল, মিথিলা কে দেখেছিস ?"
রাসেল বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে এদিক-ওদিক তাকাল।
— "না তো আম্মা। একটু আগেও তো বাড়িতেই ছিল।"
মা তখন মিথিলার কাপড় ভাঁজ করছিলেন। কথাটা শুনে হাতের কাজ থামিয়ে বাইরে এলেন।
— "কোথায় গেছে ও?"
রাসেল বাবা উঠোনের চারদিকে একবার ঘুরে দেখল। তারপর বাড়ির পাশের রাস্তায় গিয়ে ডাকতে লাগল,
— "মিথিলা... ও মিথিলা!"
কিন্তু কোনো সাড়া নেই।
মায়ের বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠল।
তিনি দ্রুত পাশের বাড়িতে গেলেন।
— "ভাবি, মিথিলাকে দেখেছেন?"
— "না তো। সকালে একবার দেখেছিলাম। তারপর আর না।"
একটু একটু করে খবরটা আশেপাশের বাড়িগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ল।
যে যার কাজ ফেলে খুঁজতে বেরিয়ে গেল।
কেউ খেলার মাঠে গেল।
কেউ স্কুলের দিকে।
কেউ পুকুরপাড়ে।
কেউ আবার গ্রামের রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল।
মা তখন আর নিজেকে সামলে রাখতে পারছিলেন না।
বারবার একটাই কথা বলছিলেন,
— "আমার মেয়েটা কোথায় গেল?"
দাদি যদিও বাইরে থেকে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছিলেন, তবু তাঁর চোখেমুখেও দুশ্চিন্তা স্পষ্ট।
তিনি শুধু বললেন,
— "কেঁদে লাভ নেই। আগে খুঁজে বের কর।"
সময় যেন আজ আর এগোতেই চাইছে না।
রোদ মাথার ওপর উঠে গেছে।
একটু পরেই মসজিদ থেকে দুপুরের আজানের ধ্বনি ভেসে এলো।
ঠিক তখনই গ্রামের এক চাচা স্কুলের পাশ দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন।
হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল, স্কুলের পেছনের বড় আমগাছটার নিচে একটা ছোট্ট মেয়ে গুটিসুটি মেরে বসে আছে।
কাছে যেতেই চিনতে পারলেন।
— "আরে... এ তো মিথিলা!"
লোকটা ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে বসলেন।
— "এই যে মা, এখানে একা বসে আছিস কেন?"
মিথিলা মাথা নিচু করে রইল।
কোনো কথা বলল না।
— "সবাই তোকে খুঁজছে। চল, বাড়ি যাই।"
মিথিলা আস্তে করে মাথা নাড়ল।
— "যাব না।"
— "কেন?"
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ছোট্ট গলায় বলল,
— "বাড়ি গেলে... আমাকে শহরে নিয়ে যাবে।"
লোকটার বুকটা কেমন ভারী হয়ে গেল।
নয় বছরের একটা বাচ্চা...
তার ভয়টাও কত ছোট্ট, কত সরল!
তিনি মৃদু হেসে বললেন,
— "চল মা। তোর মা খুব চিন্তা করছে।"
মিথিলা এবার মুখ তুলে তাকাল।
— "মা কাঁদছে?"
— "হ্যাঁ। তোকে না পেয়ে কারও মুখে হাসি নেই।"
এই কথাটা শুনেই মিথিলার মুখটা কেমন বদলে গেল।
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
ছোট্ট হাতটা এগিয়ে দিল।
লোকটা তার হাত ধরে হাঁটতে শুরু করলেন।
দূর থেকে বাড়িটা দেখা যাচ্ছিল।
উঠোনে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে।
কেউ রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে, কেউ আবার এদিক-ওদিক খুঁজছে।
মিথিলাকে দেখতে পেয়ে রাসেল বাবা দৌড়ে এগিয়ে এল।
তারপর মা...
মা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না।
তিনি দৌড়ে এসে মিথিলাকে শক্ত করে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন।
— "কোথায় গিয়েছিলি তুই? একটা কথাও বলে যাসনি কেন?"
মিথিলা ভয়ে ভয়ে বলল,
— "আমি... আমি যেতে চাই না..."
এই কথাটুকু শুনেই মায়ের চোখ ভিজে উঠল।
তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না।
শুধু মেয়ের কপালে বারবার চুমু খেতে লাগলেন।
উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই তখন নিশ্চুপ।
সেদিন সেই বাড়িতে কেউ কাউকে বোঝানোর চেষ্টা করেনি।
কারণ সবাই বুঝে গিয়েছিল—
সবচেয়ে কঠিন বিদায়টা কখনো বড়দের জন্য নয়...
সবচেয়ে কঠিন হয় সেই ছোট্ট শিশুটার জন্য, যে এখনও বুঝতেই শেখেনি কেন তাকে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষগুলোর কাছ থেকে দূরে যেতে হচ্ছে।
উঠোনে তখন আবার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসার চেষ্টা করছে। কিন্তু সবার মুখেই যেন এক ধরনের চাপা নীরবতা।
মা মিথিলার হাতটা শক্ত করে ধরে বারান্দায় বসালেন। কলস থেকে এক গ্লাস পানি এনে তার হাতে দিলেন।
— "নাও, একটু পানি খাও।"
মিথিলা চুপচাপ পানি খেল।
রাসেল বাবা পাশে এসে বসে মুচকি হেসে বলল,
— "এইভাবে কাউকে না বলে চলে যায় নাকি?"
মিথিলা মাথা নিচু করে রইল।
খুব আস্তে বলল,
— "আমি ভেবেছিলাম... আমাকে আর খুঁজবে না।"
রাসেল বাবা হেসে তার মাথায় আলতো একটা টোকা দিল।
— "পাগলি একটা! তোকে না খুঁজে আমরা থাকব কীভাবে?"
প্রথমবারের মতো মিথিলার ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি ফুটে উঠল।
ঠিক তখনই আব্বুও বাড়িতে এসে পৌঁছালেন। বাড়ির সামনে এত লোক দেখে তিনি কিছুটা অবাক হয়ে গেলেন।
— "কী হয়েছে?"
পাশের একজন প্রতিবেশী সব খুলে বলতেই আব্বুর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
তিনি ধীরে ধীরে মিথিলার সামনে এসে দাঁড়ালেন।
মিথিলা ভয়ে ভয়ে মাথা নিচু করে ফেলল।
ভাবল, এবার হয়তো আব্বু খুব বকবেন।
কিন্তু না...
রাকিবুল ইসলাম শুধু হাঁটু গেড়ে মেয়ের চোখের সমান হয়ে বসলেন।
তারপর শান্ত গলায় বললেন,
— "আব্বুকে একবার বলেও যেতে পারতি, মা। সারাটা দুপুর শুধু তোকে খুঁজেছি।"
এই কথাটা শুনেই মিথিলার চোখ আবার ভিজে উঠল।
সে আস্তে করে আব্বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
— "আমি শহরে যেতে চাই না, আব্বু..."
আব্বু কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা বললেন না।
শুধু মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
তারপর বললেন,
— "সব জায়গাই একদিন নিজের হয়ে যায়। প্রথম প্রথম একটু কষ্ট হবে, তারপর দেখবি নতুন স্কুল, নতুন বন্ধু—সব ভালো লাগতে শুরু করবে। আর এই বাড়িটা তো কোথাও পালিয়ে যাচ্ছে না। ছুটি পেলেই আবার চলে আসবি।"
মিথিলা কোনো উত্তর দিল না।
সে শুধু উঠোনটার দিকে তাকিয়ে রইল।
বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে।
আমগাছের নিচে পড়ে আছে তার ছোট্ট বলটা।
বারান্দার কোণে পড়ে আছে লাফদড়ি।
দেয়ালের পাশে রাখা আছে ছোট্ট সাইকেলটা।
হঠাৎ তার মনে হলো, এগুলোকে কিছু না বলেই সে চলে যাবে?
সেদিন সন্ধ্যায় আর কেউ গোছগাছের কথা বলল না।
মা ইচ্ছে করেই মিথিলাকে নিয়ে উঠোনে একটু হাঁটলেন।
রাতের খাবারে তার পছন্দের ডিম ভেজে দিলেন।
রাসেল বাবা খেতে খেতে মজা করে গল্প করছিল, যেন বাড়ির ভারী পরিবেশটা একটু হালকা হয়।
দাদিও আগের মতোই শুধু বললেন,
— "ভাতটা শেষ কর। না খেলে শরীর খারাপ করবে।"
কথাগুলো খুব সাধারণ ছিল।
কিন্তু সেই সাধারণ কথার মাঝেও একটা অদ্ভুত মায়া লুকিয়ে ছিল।
রাত গভীর হলে সবাই ঘুমিয়ে পড়ল।
শুধু মিথিলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
একটা-দুটো তারা জ্বলছে।
সে মনে মনে খুব ছোট্ট একটা কথা বলল—
"আমি চলে গেলেও... আমার বাড়িটা যেন আমাকে ভুলে না যায়।"
তারপর ধীরে ধীরে বিছানায় গিয়ে মায়ের পাশে শুয়ে পড়ল।
মায়ের শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে মুঠোয় ধরে চোখ বন্ধ করল।
সামনের সকালটা যে তার ছোট্ট জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের সকাল হতে চলেছে, সেটা সে এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি।