ফন্ট সাইজ:
থিম:
অবাধ্য মন পাখি

৭ম পর্ব

লেখক: খাদিজা পারভিন

#অবাধ্য_মন_পাখি

#পর্ব_৭

#লেখনিতে_খাদিজা_পারভিন

"ইন্সপেক্টর আব্রাহাম ক্রুস একটা মেয়ের হাতে মার খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।" পুরো এলাকায় ছড়িয়ে গেছে নিশা এলাকায় আসা নতুন ইন্সপেক্টরকে মেরে হাসপাতালে পাঠিয়েছে।

হাসপাতালের বেডে শুয়ে এমন একটা খবর শুনে আব্রাহাম হাত থেকে সেলাইনের সুচটা একটান দিয়ে খুলে ফেলে দিলো।রাগে তার মগজের ভিতর আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়ে গেছে।শরির কাঁপছে।

" ঐ বেয়াদব মেয়েকে আমি ছাড়বো না।একটা মেয়ে মানুষের গায়ে হাত দেওয়া আমি পছন্দ করি না তাই ওকে ছেড়ে দিয়েছিলাম কিন্তু ও আমার রেপুটেশন খারাপ করে দিয়েছে ।

কে আছো বাইরে এদিকে এসো।"

বাইরে থেকে একজন পুলিশ দৌড়ে এলো।

"বলুন স্যার"

"ঐ বেয়াদব মেয়ের নাম থেকে শুরু করে অল ডিটেইলস আমার চাই একদিনের মধ্যেই, ক্লিয়ার?"

"ওকে স্যার।"

"আই উইল কিল ইউ," বলেই আব্রাহাম বেডের উপর জোরে একটা ঘুসি দিলো।

নিশা এতিমখানার বাচ্চাদের সাথে খিচুড়ি রান্না করছে। এতিমখানার ভেতর থেকে বয়স্ক একজন লোকে বেরিয়ে আসলেন মুখে লম্বা সাদা দাড়ি।

নিশার পেছনে গিয়ে ডাক দিলেন, " নিশু মা"

নিশা পেছনে তাকালো, তাকে দেখে গাল ভরে একটা হাসি দিলো, রান্নার হাড়ির হাতাটা একজের হাতে ধরিয়ে নিজের ঘামা হাত লুঙ্গি দিয়ে মুছে তার কাছে এগিয়ে গেলো, " জানো করিম চাচা? তুমি যখন আমাকে নিশু মা বলে ডাকো তখন আমার বাবার কথা খুব মনে পড়ে।"

করিম চাচা হেসে দিলো," আমি তো তোর বাবার মতোই মা।আগে যখন তোর বাবা ছিল তখন এই এতিম বাচ্চাগুলোর সব খরচ তোর বাবাই দিতো।তোর বাবার অকাল মৃত্যুর পর অনেক বছর এখানকার বাচ্চাদের মুখে তিনবেলা ঠিক মতো ভাত ও দিতে পারিনি।

তারপর তুই যখন আসলি আবার সব আগের মতো হয়ে গেলো। বাচ্চাগুলো পেট ভরে খেতে পায় এখন।"

"বাবার গোছানো এত টাকা আমি একা খেয়ে পারবো নাকি বুইড়া ভাম? তাই তোমাদের সবাইকে নিয়ে খাই।"

একগাল হাসে নিশা।

"তুই সবসময় এমন উদ্ভট পোষাক কেন পড়িস মা?তুই তো মেয়ে মানুষ।তোকে কি এইসবে মানায় মা?তোর বাবা বেঁচে থাকলে এগুলো দেখলে খুব কষ্ট পেতেন।"

নিশা কথাটা খুব মনযোগ দিয়ে শুনলো,"সত্যিই কি বাবা কষ্ট পেতো?"

নিশা একবার চারপাশটা দেখে। আগে সে এখানে তার বাবার হাত ধরে আসতো । তার বাবা বলতেন," নিশু মা আমার পরে তুমি এদের দায়িত্ব নিবে‌। ওদের কেউ নেই ওরা যেন এক বেলাও খালি পেটে না থাকে।"

"আচ্ছা চাচা থাকো,সবাইকে দেখো।"

চন্দন আর বাঁধন বাচ্চাদের সাথে খেলা করছিলো নিশা তাদেরকে বলে যায় যাতে সবার খাওয়ার আগ পর্যন্ত এখানে থাকে।

নিশার বুকের ভিতরটা খুব ব্যাথা করছে মাঝে মাঝেই এমন এমন করে।

নিশা হাঁটতে হাঁটতে নদীর পাড়ে গিয়ে বসে। নদীর পাড়ের ঠান্ডা বাতাসে শক্ত করে বাঁধা খোপাটা খুলে দেয়।প্রতিটা চুলে বাতাসের স্পর্শে তার মস্তিষ্কে শীতলতা বয়ে যায়।

" বাবা তুমি কি আমাকে দেখতে পাও?দেখা যায় আমাকে?"

আকাশের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ে নিশা। আকাশটা মেঘলা ছিলো ঠিক তার জীবনের মতো।

নিশা নদীর পাড়ের স্যাঁতসেঁতে মাটিতে নিথর হয়ে শুয়ে আছে। তার চোখের কোণে জন্ম নেওয়া নোনাজলের ফোঁটাগুলো একে একে গড়িয়ে পড়ে সবুজ ঘাসের বুকে হারিয়ে যাচ্ছে।

"তুমি থাকলে আমার জীবন ও কি বাকি পাঁচটা মেয়ের মতো হতো? হারাতে হতো নাকি আমার শৈশব?

যখন বাইরে পরিবেশ দেখার কথা মায়ের হাত ধরে স্কুলে যাবার কথা ছিল, মা লাঠি নিয়ে তাড়া করলে বাবার কোলে যাওয়ার কথা ছিল তখন আমি অন্ধকার জেলে দিন গুনেছি বাবা। তুমি দেখোনি তা?"

"তখন অন্ধকার জেলের রাতগুলো আমাকে ভয় দেখাতো। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কত রাত "মা" বলে কেঁদেছি, কিন্তু মা আসেনি। কতবার "বাবা" বলে ডেকেছি, কিন্তু সেই ডাক শুধু দেয়ালে গিয়ে ঠেকেছে।

আমি যখন অসুস্থ হয়ে জ্বরে পুড়েছি, তখন মাথায় হাত রাখার মতো কেউ ছিল না।

যখন দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙেছে, তখন বুকের কাছে টেনে নেওয়ার মতো কোনো আপন মানুষ ছিল না।

সবাই আমার অপরাধ দেখেছে, কিন্তু আমার চোখের জল দেখেনি।

সবাই আমার রাগ দেখে কিন্তু আমার ভাঙ্গা শৈশবটা কেউ দেখেনি।"

"পুরো পৃথিবীর আমার কাছে প্রশ্ন কেন আমি ছেলেদের মতো থাকি?" চোখে পানি নিয়ে একগাল হাসে নিশা,

"আমার জীবনে আর কিছু নেই, কিন্তু যাদের জন্য আমার জীবন এলোমেলো হয়ে গেছে আমিও তাদের জীবন শেষ করতে দিবো।কাউকে বাঁচতে দিবো না। তারপর আমি জানি কি হবে। এই ইউজলেস আইন আমার ফাঁসি দিয়ে দিবে।শালা এই আইনটা কোন ল্যাওড়া তৈরি করেছিল কে যানে।

পারে না কারো বালডা ছিঁড়তে শুধু গায়ে নাম লেখা পোশাক পড়ে ঘুরে বেড়ায়।"

আরো জোরে জোরে হাসে নিশা। বৃষ্টি শুরু হয়েছে সে দিকে তার কোনো খেয়াল নাই। শুরুতে বৃষ্টির ফোঁটা তার মুখের উপর পড়তে দুই একবার চোখ মুখ খিছকে বন্ধ করেছিলো কিন্তু এখন তার দেহ বৃষ্টির পানির সাথে মানিয়ে নিয়েছে।

"স্যার,মেয়েটার নাম নিশা। এখানকার স্থানীয়,সবাই চিনে ওকে এবং পুরো এলাকা নিশার ভয়ে তটস্থ থাকে।

লোকজন পেটানো ওর প্রতিদিনের স্বভাব।

১২ বছর বয়সে তিনজন খুন করে পাঁচবছর জেলে ছিলো।"

আব্রাহাম কথা গুলো মন দিয়ে শুনছিল। "আচ্ছা রতন খুন গুলো কিভাবে হয়েছিল আর কেন বা করেছিলো?"

"যাদেরকে নিশা মেরেছিল তারা নিশার বাবা আর চাচার খুনি ছিল। তাদের ভিতরে দুইজন পালিয়ে গিয়েছিল।সেই দুইজনের ভিতর একজন নিশার মায়ের ধর্ষক ছিলো।"

"ইন্টারেস্টিং, তারপর?" হাতের ফাইলটা টেবিলের উপর রেখে পুরো দৃষ্টি রতনের দিকে দিলো আব্রাহাম।

"কিন্তু একটা বিষয় নিশা বা তার পরিবারের কেউ কখনো বাকি দুইজনের বিরুদ্ধে কেনো কেস ফাইল করেনি।"

"এই ঘটনাটা কত আগের?"

"এটা এখন থেকে আট বছর আগের ঘটনা।"

"হুম এই জন্য এই ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না।আট বছর আগে আমি লেখাপড়ার জন্য বিদেশে চলে গেছিলাম।নিশার নামে কেস ফাইল করো আর তাকে অ্যারেস্ট করে আনো পুলিশের গায়ে হাত তোলার অপরাধে।"

"লাভ নেই স্যার। নিশার সাথে উপর মহলের অনেকের সাথে যোগাযোগ আছে তাই তাকে থানায় এনে পাচ মিনিট ও রাখা যায় না। আর এখানকার বেশিরভাগ মানুষ নিশার পক্ষে, নিশা অন্যায় করলেও।"

আব্রাহামের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে।

"অন্য পথে এগোতে হবে আমাদের।"

জাহানারা বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরে ফুল গাছের উপর বৃষ্টি পড়ছে সে দিকে তাকিয়ে আছে। বৃষ্টির বেগ এতই বেশি ছিল চারিদিকের সব কিছু অস্পষ্ট হয়ে গেছে।

এই অস্পষ্ট পরিবেশের মধ্যে হটাৎ কিছু একটা চোখে পড়লো তার।

একটু খুঁটিয়ে দেখলেন নিশা আস্তে আস্তে হেটে বাড়ির দিকে আসছে। বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে গেছে।

নিশা গেট খুলে ভেতরে আসছে ,আসার আগে ফুল গাছ গুলোর দিকে একবার তাকিয়ে তাতে তার ভেজা হাত আলতো করে ছুয়ে দিলো।

জাহানারা দেখছে তার একমাত্র সন্তানকে। অন্য কোনো মা হলে এখন চেঁচিয়ে উঠতো, বলতো "বৃষ্টিতে ভিজিস না,ঠান্ডা লাগবে তখন তো আমারই দেখা লাগবে। উঠে আয় নয়তো আমি এলে কিন্তু মার একটাও মাটিতে পড়বে না।"

কিন্তু জাহানারা তো কিছুই বলছে না। তার মানে কি সে মা হিসাবে ব্যার্থ?জাহানারার চোখ ভিজে উঠছে।

নিশা ফুল গুলোর দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে বাড়ির দিকে তাকায়। দেখতে পায় তার মা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে তাকেই দেখছে।

নিশার মুখে হাসি ফুলে, সেখান থেকে হাত নাড়িয়ে তার মাকে জোরে "হায় ডার্লিং" বলে।

তারপর হাতটা নামিয়ে নিজের পেটে রেখে বোঝায় তার খিদে পেয়েছে।

জাহানারা নিশার এমন কান্ডে হেসে ফেলেন।

চলবে ___

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন