ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে জানান দিচ্ছে, এখন ঠিক রাত ১২টা বাজে। চৌধুরী বাড়ির একটা বিশেষ নিয়ম আছে। এখানে সবাই রাত ১০টার মধ্যে খাওয়া শেষ করে যার যার রুমে চলে যায়। তাই আপাতত বাড়ির সব লাইট বন্ধ, শুধু সিঁড়ির কাছে একটা লাইট জ্বলছে।
রাইসা অপেক্ষা করছে মাহভীরের জন্য। মাহভীর কি আদৌ তার গুরুত্ব দেবে? হয়তোবা না। তাও রাইসা অপেক্ষা করছে, কারণ এটা তার দায়িত্ব।
কিছুক্ষণ পর...
মাহভীর নিজের রুমে ঢুকেই কপাল কুঁচকে ফেলল। রাইসা বিছানায় পা তুলে বসে আছে। হাতে চানাচুরের একটা বাটি, সেটাই আপাতত খাচ্ছে।
মাহভীরকে দেখেই দৌড়ে দরজার কাছে গেল। চঞ্চল স্বরে জিজ্ঞেস করল,
— আপনার আসতে এত দেরি হলো কেন?
মাহভীর তুয়াক্কা করল না। রাইসাকে পাশ কাটিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল।
রাইসা তো বেজায় চটে গেল। তাকে কি মাহভীর অপমান করল?
মাহভীর লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে বের হলো। বের হতেই মেজাজটা খারাপ হলো, কারণ একাই রাইসা ওয়াশরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মাহভীরকে দেখা মাত্রই দাঁত বের করে জাক্কাস এক হাসি হাসল।
— কী সমস্যা তোর? পেছনে পেছনে বেহায়ার মতো ঘুরছিস কেন? মতলব?
— মতলব? ততলব কিছুই না। আমি যে জিজ্ঞেস করলাম আসতে এত দেরি কেন? কোনো উত্তর করলেন না কেন?
মাহভীর এবার রেগে ধমকানোর সুরে বলল,
— সাহস বেশি হয়েছে? থাপ্পড় দিয়ে গাল লাল করে ফেলব। কে, তুই? যে তোকে আমার কৈফিয়ত দেওয়া লাগবে?
রাইসার মন একটু খারাপ হলেও হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে বলল,
— বউ হই আপনার।
মাহভীর আরও বেশি রেগে গেল। কোনো মতে কন্ট্রোল করে বলল,
— বালের বউ! আর একবার ওই ওয়ার্ডটা উচ্চারণ করেছিস তো খুব খারাপ হবে, বলে রাখলাম।
রাইসা আগের মতোই হাসতে হাসতে বলল,
— ঠিক আছে। আমি পাশের বাসার টাকলা মফেজের বউ। এবার বলেন কোথায় ছিলেন, আসতে দেরি হলো কেন?
এবার আর মাহভীর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। রাইসাকে এক ধাক্কা দিল। ধাক্কার চাপটা এত বেশি ছিল যে রাইসা ছিটকে দূরে পড়ে গেল। সাথে সাথে খাটের কোনায় মাথা লেগে জায়গাটা কেটে গেল।
মাহভীর চিৎকার দিয়ে বলল,
— আর একবার বউগিরি করে অধিকার খাটাতে আসলে এর চেয়েও খারাপ হবে।
বলেই সে বারান্দায় চলে গেল।
বারান্দার রেলিংয়ে দুহাত রেখে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল মাহভীর। রাতের নিস্তব্ধ শহরটা তার সামনে ছড়িয়ে আছে।
পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরিয়ে নিল। একবার গভীর টান দিয়ে ধোঁয়াগুলো ধীরে ধীরে শূন্যে ছেড়ে দিল।
রাগটা তখনও কমেনি।
বরং নিজের মনকেই যেন বোঝাচ্ছিল—
রাইসার প্রতি তার কোনো মায়া নেই, কোনো দুর্বলতা নেই।
অথচ ঘরের ভেতর পড়ে থাকা মেয়েটার কপাল থেকে ঝরে পড়া রক্তের দৃশ্যটা বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।
মাহভীর বিরক্ত হয়ে আবার একটা টান দিল।
নিজেকেই খুব নিচু স্বরে বলল,
— নিজেকে সামলাতে শিখ, মাহভীর। ওর জন্য তোর কিছু যায় আসে না।
সিগারেটের ছাইটা ঝেড়ে দিয়ে সে আবার অন্ধকার রাতের দিকে তাকিয়ে রইল।
আর রাইসা?
সে উঠে দাঁড়াল। চোখের পানি মুছল। অবাক হয়ে ভাবল, মানুষ এতটা নির্দয় কীভাবে হয়!
সে আর কিছু বলল না।
চুপচাপ সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।
প্রায় এক ঘণ্টা পর মাহভীর রুমে আসল। এতক্ষণ ধরে কন্ট্রোল করা রাগটা নিমেষেই জ্বলে উঠল।
ততক্ষণে রাইসা ঘুমে কাদা।
মাহভীর গিয়ে ঘুমন্ত রাইসাকে সজোরে টান দিয়ে দাঁড়া করাল। ঘুমন্ত মেয়েটা কিছুই বুঝল না। এমনিতেই মাথাব্যথায় নাজেহাল অবস্থা।
মাহভীর রাইসাকে আবার ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল। বাঘের মতো চিৎকার দিয়ে শুধাল,
— তোর জায়গা এই মাটিতে। কোন সাহসে সোফায় শুতে গেলি? You fucking bloody bitch!
রাইসার কিছুটা সময় লাগল ব্যাপারটা বুঝতে। সে কিছু না বলে বিনা বাক্যে মাটিতেই শুয়ে পড়ল।
নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিল।
এক সুন্দর সকাল।
সকালের মিষ্টি রোদ এসে পড়ল রাইসার গায়ে। সে আস্তে ধীরে উঠে বসল। দেখল, মাহভীর এখনও ঘুমে।
সে ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে গেল। প্রথমেই যেটা চোখে এল, সেটা হলো কালকের সেই ফেটে যাওয়া কপাল। এরপরেই যা নজর কাড়ে, তা হলো চেহারার নিস্তব্ধতা। রাইসার সুন্দর কোমল মুখটা কেমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে, যেন কোনো প্রাণ নেই।
তাও রাইসা আয়নায় নিজেকে দেখে একচিলতে হাসল।
ফ্রেশ হয়ে নেমে গেল রান্নাঘরে।
ঢুকতেই সাথী বেগম বললেন,
— কিরে মা, এত তাড়াতাড়ি উঠে পড়লি যে? কিছু লাগবে?
রাইসা একটু জোরে হেসে উঠে বলল,
— না মা, কিছুই লাগবে না। তোমার কোনো সাহায্য লাগবে কিনা বলো।
সাথী বেগম বললেন,
— উঠেছিস যেহেতু, তোর শ্বশুরের জন্য একটু চা বানাতে পারবি?
রাইসা বলল,
— ও মা! এ আর এমন কী কাজ? কেন পারব না? অবশ্যই পারব। দেখি, সরো তো।
এই বলেই কাজে লেগে পড়ল।
সাথে শাশুড়ির সাথে গল্প তো আছেই।
রাইসা চা নিয়ে মিনহাজ চৌধুরীর কাছে গেল। বলল,
— আব্বু, এই নিন আপনার চা।
মিনহাজ চৌধুরী খবরের কাগজের কাজ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বললেন,
— আজকে আমার বউমা চা করেছে বুঝি? দেখাই তো।
রাইসা হালকা হেসে চা এগিয়ে দিল।
মিনহাজ চৌধুরী তো চা খেয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
কিছুক্ষণ পর নিজে থেকেই জিজ্ঞেস করলেন,
— মাহভীরের সাথে সব ঠিক আছে?
রাইসা এই পর্যায়ে নিশ্চুপ রইল।
মিনহাজ চৌধুরী নিজ থেকেই বললেন,
— আমি জানি তোমাদের বিয়েটা কেমনভাবে হয়েছে। ওর মানিয়ে নিতে সমস্যা হবে, সাথে তোমারও। তাই বলছি, মা, আগে সময় নাও। আগেই না বুঝে কোনো সিদ্ধান্ত নিও না।
রাইসা শুধু মাথা নিচু করে রইল।
তারপর মিনহাজ চৌধুরীর দৃষ্টি গিয়ে থামল রাইসার কপালে।
— মা, কপালে কী হয়েছে?
রাইসা সঙ্গে সঙ্গে চুলটা একটু সামনে এনে হালকা হেসে বলল,
— কিছু না আব্বু, একটু লেগে গেছে।
মিনহাজ চৌধুরী আর কিছু বললেন না। শুধু কিছুক্ষণ গভীরভাবে রাইসার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
অন্যদিকে, ওপরের ঘরে মাহভীরের ঘুম ভেঙে গেছে।
চোখ খুলতেই তার দৃষ্টি গেল মেঝের দিকে।
যেখানে কয়েক ঘণ্টা আগেও রাইসা শুয়ে ছিল।
মাহভীরের চোখ এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে রইল।
তারপর নিজের অজান্তেই তার দৃষ্টি চলে গেল রাইসার ফেলে যাওয়া ছোট্ট বালিশটার দিকে।
কিছু একটা যেন বুকের ভেতর অস্বস্তি তৈরি করল।
কিন্তু পরক্ষণেই মুখ শক্ত করে নিজেকেই বলল,
— দুর্বল হওয়ার কোনো কারণ নেই।
সে উঠে দাঁড়াল।
তবু বেরিয়ে যাওয়ার আগে একবার দরজার দিকে তাকাল।
যেন অজান্তেই অপেক্ষা করছিল—
রাইসা আবার এসে আগের মতো হাসতে হাসতে তাকে বিরক্ত করবে।
কিন্তু আজ ঘরটা অস্বাভাবিক নীরব।
মাহভীর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।
চলবে...