ফন্ট সাইজ:
থিম:
অন্ধকার শেষে আলোর দেখা

১৩তম পর্ব

লেখক: Rahiya sheikh Raisa

বিয়ের পর কেটে গেছে বেশ কিছুদিন।

চৌধুরী বাড়ির পরিবেশটা ধীরে ধীরে রাইসার কাছে পরিচিত হয়ে উঠছে। নতুন একটা পরিবার, নতুন কিছু মানুষ, নতুন একটা জীবন—সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে সে।

তবে একটা মানুষকে ছাড়া।

মাহভীর।

মাহভীরের সঙ্গে তার সম্পর্কটা এখনও ঠিক আগের মতোই। একই ছাদের নিচে থেকেও দুজনের মধ্যে যেন অদৃশ্য একটা দেয়াল।

কিন্তু বাড়ির বাকি মানুষগুলোর সঙ্গে রাইসার সম্পর্কটা একেবারেই অন্যরকম।

বিশেষ করে মাহার সঙ্গে।

মাহা, মাহভীরের ছোট বোন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কারণে প্রথম থেকেই রাইসার সঙ্গে তার বেশ ভালো একটা বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল। প্রথম দু-একদিন দুজনের মধ্যে শুধু সাধারণ কথাবার্তাই হতো।

কিন্তু কয়েকদিন যেতে না যেতেই সেই সম্পর্কটা বন্ধুত্বে গড়ায়।

এখন এমন অবস্থা হয়েছে—মাহা যেখানে, রাইসাও যেন সেখানেই।

একসঙ্গে খাওয়া, একসঙ্গে গল্প করা, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া, মাঝরাতে হঠাৎ কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করা—কিছুই বাদ যায় না।

মাহা মাঝে মাঝে মজা করে বলে,

— জানিস, তুই আমার বোন না হয়ে যদি আগে আমার বন্ধু হতি, তবুও আমি তোকে এতটাই পছন্দ করতাম।

রাইসা হেসে উত্তর দেয়,

— আর আমি তোকে বোন না ভেবে কী ভাবব? তুই তো আমার অপরাধের পার্টনার!

মাহা হেসে বলে,

— অপরাধের পার্টনার কেন?

— কারণ তুই না থাকলে আমি এই বাড়িতে এত কথা বলার সাহসই পেতাম না।

মাহা তখন হেসে রাইসাকে জড়িয়ে ধরে।

এই ছোট্ট বন্ধুত্বটাই রাইসার নতুন জীবনে একরকম স্বস্তির জায়গা হয়ে উঠেছিল।

---

সকালের নাশতার টেবিলে সবাই বসেছে।

সাথী বেগম একদিকে সবার নাশতা দিচ্ছেন। মিনহাজ চৌধুরী খবরের কাগজ পড়ছেন। মাহা আর রাইসা পাশাপাশি বসে নিজেদের মধ্যে গল্প করছে।

রাইসা এক হাতে পরোটা ছিঁড়ছে, আর অন্য হাতে মাহাকে কিছু একটা বোঝাচ্ছে।

— তারপর জানিস কী হলো? আমি ওকে বললাম, তুই যদি আবার আমার কলম নিস, তাহলে আমি কিন্তু তোর খাতা নিয়ে পালাব!

মাহা হেসে বলল,

— তারপর?

— তারপর কী! সে আমার দিকে এমনভাবে তাকালো, যেন আমি তার জীবন নষ্ট করে দিয়েছি।

মাহা হাসতে হাসতে বলল,

— তুই সত্যিই একটা ঝামেলা।

— আমি ঝামেলা না, আমি বিনোদন।

দুজনেই হেসে উঠল।

টেবিলের অন্যপাশে বসে থাকা মাহভীর এতক্ষণ একদম চুপচাপ ছিল।

সে নিজের মতো করে নাশতা করছিল।

রাইসা হঠাৎ তার দিকে তাকিয়ে বলল,

— মাহভীর সাহেব?

কোনো উত্তর নেই।

রাইসা আবার বলল,

— একটা প্রশ্ন করি?

মাহভীর চুপ।

— আপনি কি সবসময় এমন গম্ভীর হয়ে থাকেন?

মাহা মুখ চেপে হাসল।

মাহভীর এবারও কোনো উত্তর দিল না।

রাইসা একটু সামনে ঝুঁকে বলল,

— মানে জন্মের সময়ও কি এমন মুখ করে ছিলেন?

মাহা এবার আর হাসি আটকাতে পারল না।

মিনহাজ চৌধুরীও খবরের কাগজের আড়াল থেকে হেসে ফেললেন।

মাহভীর ধীরে ধীরে চোখ তুলে রাইসার দিকে তাকাল।

কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে আবার চোখ নামিয়ে নিল।

রাইসা নিজের মতো করে বলল,

— আচ্ছা, উত্তর না দিলেও চলবে। আমি ধরে নিচ্ছি—হ্যাঁ।

মাহভীরের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

সাথী বেগম পরিস্থিতি হালকা করার জন্য বললেন,

— রাইসা, তুই একটু চুপ করে খা মা।

রাইসা হেসে বলল,

— মা, আমি তো চুপ করেই খাচ্ছি। শুধু মুখটাও তো খাবারের সঙ্গে কাজ করছে!

মাহা আবার হেসে উঠল।

কিন্তু মাহভীর এবার আর চুপ থাকল না।

সে ঠান্ডা গলায় বলল,

— তোর কি এক মিনিটও চুপ থাকার অভ্যাস নেই?

রাইসা কিছুটা থেমে গেল।

তারপরও হাসিমুখে বলল,

— না। আমার ছোটবেলা থেকেই বেশি কথা বলার অভ্যাস।

মাহভীর বিরক্ত হয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।

— এই অভ্যাসটা আমার সামনে দেখানোর দরকার নেই।

রাইসার মুখের হাসিটা একটু ম্লান হলো।

তবুও সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলল,

— আচ্ছা, আপনার সামনে কম বলব।

মাহভীর কটমট করে তাকিয়ে বলল,

— শুধু কম না। প্রয়োজন ছাড়া আমার সামনে আসবিই না।  তোকে দেখলেই থাপ্পরাতে ইচ্ছে করে, বেয়াদব।

টেবিলটা মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

মাহা রাইসার দিকে তাকাল।

রাইসা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে আবার হালকা হাসল।

— ঠিক আছে।

মাহভীর আর কিছু না বলে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর অফিসের জন্য তৈরি হয়ে নিচে নামল।

রাইসা তখন মাহার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

মাহভীর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রাইসা স্বাভাবিকভাবেই বলল,

— আজকে ফিরতে দেরি করবেন?

মাহভীর থামল।

তারপর বিরক্ত গলায় বলল,

— আমার আসা-যাওয়ার হিসাব রাখার দরকার নেই।

— আমি তো শুধু জিজ্ঞেস করলাম।

— এত প্রশ্ন করার অভ্যাসটা বাদ দে।

রাইসা আর কিছু বলল না।

মাহভীর বেরিয়ে গেল।

মাহা কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে থেকে রাইসার কাছে এসে বলল,

— মন খারাপ করিস না।

রাইসা সঙ্গে সঙ্গে হেসে বলল,

— আরে না! ওনার তো জন্মগতভাবেই মেজাজ খারাপ।

মাহা হেসে ফেলল।

— তুইও না!

— কী করব বল? কাঁদলে উনি তো আর হাসবেন না।

দুজনেই আবার হেসে উঠল।

---

অন্যদিকে — হিমি গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ

দশতলার কেবিনে ঢুকেই মাহভীর নিজের কোটটা চেয়ারের ওপর ছুড়ে দিল।

তার মেজাজ তখনও খারাপ।

কিছুক্ষণ পর সাকিন কেবিনে ঢুকল।

মাহভীরের মুখ দেখেই সে বুঝে গেল কিছু একটা হয়েছে।

— কী হয়েছে?

— কিছু না।

— তোর মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে অনেক কিছু হয়েছে।

মাহভীর ফাইল খুলে বলল,

— বাড়ির কথা অফিসে আনবি না।

সাকিন চেয়ারে বসে মৃদু হেসে বলল,

— রাইসা আবার কিছু করেছে?

মাহভীর এবার ফাইল থেকে চোখ তুলে তাকাল।

— ওর নাম আমার সামনে আনিস না।

— কেন?

— কারণ ভালো লাগে না।

সাকিন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

— মেয়েটা তোকে একটু বেশি কথা বলে, তাই না?

— বেশি না। অসম্ভব বেশি।

— আর তুই?

— আমি ignore করি।

সাকিন হেসে বলল,

— সেটা তো বুঝতেই পারছি।

মাহভীর বিরক্ত হয়ে বলল,

— সাকিন, এসব নিয়ে মাথা ঘামাস না।

— আমি মাথা ঘামাচ্ছি না। শুধু একটা কথা বলছি—রাইসা কিন্তু তোকে নিয়ে বেশ স্বাভাবিক।

— ওর স্বভাবই এমন।

— আর তোর?

মাহভীর কিছু বলল না।

সাকিন এবার গম্ভীর হয়ে বলল,

— তুই যতই ওকে অপছন্দ করিস, একটা কথা মনে রাখিস। ও কিন্তু এই বিয়েটা নিজের ইচ্ছায় করেনি।

মাহভীরের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

— আমিও করিনি।

— জানি।

— তাহলে আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করিস না।

সাকিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

— আমি তোকে বোঝাচ্ছি না। শুধু বলছি, সব রাগ একসঙ্গে একটা মানুষের ওপর ঢেলে দিস না।

মাহভীর ঠান্ডা গলায় বলল,

— আমার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কাউকে দিইনি।

সাকিন উঠে দাঁড়াল।

— ঠিক আছে। কিন্তু বন্ধু হিসেবে একটা কথা বললাম।

মাহভীর আর কোনো উত্তর দিল না।

সাকিন বেরিয়ে গেল।

---

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে

রাইসা আর মাহা,আর মেহা পাশাপাশি হাঁটছে।

রাইসার হাতে বই, মুখে সেই চিরচেনা হাসি।

মাহা বলল,

— সকালে যা হয়েছে, সেটা নিয়ে সত্যিই খারাপ লাগছে না?

রাইসা মাথা নেড়ে বলল,

— না।

— সত্যি?

— একদম।

— তাহলে এত হাসছিস কেন?

রাইসা একটু থেমে বলল,

— কারণ আমি যদি হাসা বন্ধ করে দিই, তাহলে তো ও জিতে যাবে।

মাহা কিছু বলতে পারল না।

রাইসা আবার হেসে বলল,

— চল, আজ ক্লাসের পর তোদের ক্যান্টিনে নিয়ে যাব। অনেকদিন ভালো করে আড্ডা দেওয়া হয়নি।

মাহা মাথা নাড়ল।

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ঢুকে গেল।

আর অন্যদিকে, দশতলার কাঁচঘেরা কেবিনে বসে মাহভীর আবার কাজে ডুবে গেল।

তার জীবনে রাইসা এখনো শুধু একটা অনিচ্ছাকৃত সম্পর্কের নাম।

আর রাইসার কাছে মাহভীর—

একজন অসম্ভব রাগী মানুষ, যাকে জ্বালানোটা তার কাছে অদ্ভুত এক আনন্দের বিষয়।

তাদের দুজনের কেউই জানে না—

এই সম্পর্কটা একদিন তাদের দুজনের জীবনকেই এমনভাবে বদলে দেবে, যেটা তারা কেউ কল্পনাও করেনি।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন