সাকিন কেবিন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরও মাহভীর বেশ কিছুক্ষণ একইভাবে বসে রইল।
তার সামনে ফাইল খোলা। ল্যাপটপে একের পর এক রিপোর্ট জমে আছে। অথচ কিছুতেই মন বসছে না।
সাকিনের কথাগুলো মাথায় ঘুরছে।
“রাগের মাথায় এমন কিছু করিস না, যেটার জন্য পরে আফসোস করতে হয়।”
মাহভীর বিরক্ত হয়ে ফাইলটা বন্ধ করে দিল।
— সবাই এত জ্ঞান দিতে আসে কেন?
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে মাহার নাম।
মাহভীর বিরক্ত মুখে কলটা ধরল।
— কী হয়েছে?
ওপাশ থেকে মাহা বলল,
— ভাইয়া, তুমি কি তোমার একটা ফাইল খুঁজছ?
— হ্যাঁ। কেন?
— ওটা ভুল করে রাইসার ব্যাগে চলে গেছে।
মাহভীরের মুখ সঙ্গে সঙ্গে শক্ত হয়ে গেল।
— আবার ওর কাছে?
— ভুল করে গেছে বললাম তো।
— ওকে বল, এখনই পাঠিয়ে দিতে।
— তুমি নিজে নিয়ে যেতে পারবে না?
মাহভীর ঠান্ডা গলায় বলল,
— আমার অফিসে বসে থাকার সময় নেই, মাহা। আর তুই ওর হয়ে কথা বলা বন্ধ কর।
মাহা একটু চুপ করে থেকে বলল,
— তুমি সবকিছুতেই এত রাগ করো কেন?
— কারণ আমার ধৈর্য সীমিত।
— কিন্তু রাইসা তো—
— মাহা!
এক ধমকে মাহা চুপ হয়ে গেল।
— আমার সঙ্গে ওর ব্যাপারে তর্ক করবি না। যা বলেছি, তাই কর।
মাহা ধীরে বলল,
— ঠিক আছে, তুমি রাগ করো না।
মাহভীর কিছু না বলে কল কেটে দিল।
---
বিশ্ববিদ্যালয়ে
ক্লাস শেষ করে রাইসা, মেহা, মাহা, প্রিয়া আর স্মৃতি করিডোর দিয়ে বের হচ্ছিল।
রাইসার হাতে একটা ফাইল।
মাহা বলল,
— এটা তুই নিয়ে যাবি?
— হ্যাঁ।
— ভাইয়াকে দিয়ে দিলেই তো হয়।
রাইসা হেসে বলল,
— উনি তো আমাকে দেখলেই রেগে যান। আমি গেলে আবার একটা বক্তৃতা শুনতে হবে।
প্রিয়া মুচকি হেসে বলল,
— তুইও তো কম যাস না।
— আমি কী করি?
মেহা বলল,
— তুই ওনাকে জ্বালাস।
রাইসা গম্ভীর মুখ করে বলল,
— আমি? কখনো না।
মাহা হেসে বলল,
— তোর এই মুখটাই সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী।
রাইসা হেসে উঠল।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
মাহভীর।
রাইসা কল ধরল।
— হ্যালো?
— আমার ফাইলটা এখনো তোর কাছে?
— জি।
— তাহলে পাঠাসনি কেন?
— ভাবছিলাম আপনি নিজেই নিয়ে যাবেন।
মাহভীরের গলা সঙ্গে সঙ্গে কঠিন হয়ে গেল।
— আমার কি এত সময় আছে তোর পেছনে ঘোরার?
রাইসার মুখটা একটু থেমে গেল।
— আমি তো শুধু—
— শুধু কী? সবকিছু নিয়ে মজা করার অভ্যাসটা বাদ দে।
রাইসা এবার চুপ করে গেল।
মাহভীর বলল,
— আজকের মধ্যে ফাইলটা বাড়িতে রেখে দিস। আর আমার জিনিসপত্র নিয়ে কোনো ধরনের মজা করার চেষ্টা করবি না।
কল কেটে গেল।
মাহা রাইসার মুখের দিকে তাকাল।
— আবার কী বলল?
রাইসা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে হেসে বলল,
— কিছু না। তোমার ভাইয়ের মেজাজটা আজকে বোধহয় পৃথিবীর সব মানুষের ওপর খারাপ।
মাহা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— তুমি এত সহজে সবকিছু হাসি দিয়ে উড়িয়ে দিস কীভাবে?
রাইসা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
— কাঁদলে তো উনি আরও খুশি হবে। তাই হাসিই ভালো।
মাহা আর কিছু বলল না।
---
সন্ধ্যার দিকে রাইসা বাড়ি ফিরল।
ফাইলটা নিজের হাতে নিয়ে মাহভীরের ঘরের টেবিলের ওপর রেখে দিল।
তারপর মাহার সঙ্গে নিচে বসে গল্প করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর দরজা খোলার শব্দ হলো।
মাহভীর ফিরেছে।
সে সোজা ঘরে উঠে গেল।
কিছুক্ষণ পর আবার নিচে নেমে এল। হাতে সেই ফাইল।
রাইসাকে দেখেই বলল,
— এটা রাখার আগে অন্তত আমাকে একটা মেসেজ করতে পারতিস।
রাইসা অবাক হয়ে বলল,
— আপনি তো বলেছিলেন বাড়িতে রেখে দিতে।
— আমি বলেছিলাম তুই রেখে দিবি। এভাবে নিজের ইচ্ছামতো আমার ঘরে ঢুকে জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করতে বলিনি।
রাইসা এবার একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
— আপনার কথামতোই তো রেখেছি।
— তর্ক করিস না।
— আমি তর্ক করছি না।
— তুই সবসময়ই তর্ক করিস।
রাইসা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর হালকা গলায় বলল,
— আচ্ছা, আর করব না।
মাহভীর যেন তাতেও শান্ত হলো না।
— আর একটা কথা। আমার সামনে অযথা দাঁত বের করে হাসবি না। সবকিছু নিয়ে মজা করার জায়গা এটা না।
রাইসার হাসিটা এবার সত্যিই মিলিয়ে গেল।
মাহা দূর থেকে সবটা দেখছিল।
সে এগিয়ে এসে বলল,
— ভাইয়া, তুমি একটু বেশি—
মাহভীর সঙ্গে সঙ্গে মাহার দিকে তাকাল।
— মাহা, তুই মাঝখানে আসবি না।
মাহা থেমে গেল।
— কিন্তু তুমি—
— আমি কীভাবে কথা বলব সেটা আমি জানি।
রাইসা এবার মাহার হাত ধরে বলল,
— থাক। তুই কিছু বলিস না।
তারপর মাহভীরের দিকে তাকিয়ে বলল,
— আমি বুঝেছি।
মাহভীর কিছু না বলে ঘুরে ওপরে উঠে গেল।
সিঁড়ির মাঝখানে গিয়ে একবারও পেছনে তাকাল না।
---
মাহা ধীরে ধীরে রাইসার পাশে এসে দাঁড়াল।
— তুই কষ্ট পেয়েছিস?
রাইসা মাথা নাড়ল।
— না।
— মিথ্যা বলিস না।
রাইসা একটু হাসল।
— কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু অভ্যাস হয়ে যাবে।
মাহা তার হাতটা চেপে ধরল।
— আমার ভাই এমন না।
রাইসা মৃদু হেসে বলল,
— এখন তো এমনই।
মাহা কিছু বলল না।
রাইসা আবার বলল,
— তবে একটা ব্যাপার জানিস?
— কী?
— তোর ভাই যত রাগই দেখাক, আমি কিন্তু ওনাকে জ্বালানো বন্ধ করব না।
মাহা অবাক হয়ে তাকাল।
— কেন?
রাইসা হেসে বলল,
— কারণ উনি রাগলে খুব মজার লাগে।
মাহা হেসে ফেলল।
— তুই একদিন সত্যিই ওনাকে পাগল করে দিবি।
রাইসা হাসতে হাসতে বলল,
— দেখি কে আগে হারে!
---
একই সময়ে — মাহভীরের ঘর
মাহভীর জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
নিচ থেকে ভেসে আসা রাইসার হাসির শব্দ তার কানে আসছিল।
সে বিরক্ত হয়ে পর্দা টেনে দিল।
তারপর নিজের মনেই বলল,
— মেয়েটা কি একটুও চুপ থাকতে পারে না?
তারপর আবার নিচ থেকে ভেসে আসা হাসির শব্দ শুনে বিরক্ত মুখে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
তার কাছে এখনো রাইসা মানে—
একটা অনিচ্ছাকৃত সম্পর্ক, একগুচ্ছ বিরক্তি, আর তার নিজের জীবনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটা অধ্যায়।
আর সে জানে না—
এই মানুষটাকেই একদিন তার নিজের সবচেয়ে বড় অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে হবে।
চলবে...