#দেওয়ান_সাহেব( পর্বঃ ৩.১)
#ট্রাজেডি_জাস্টিস
#লেখনিতেঃরুপান্জলি
,,, মা!! মেলা বুক লাগছে, খাইতে দেও।
,,, ৬ বছরের ছোট ছেলেটার কাতর কণ্ঠে করা খাওয়ার জন্য আহাজারি শুনে মায়ের বুকখানি কেমন কেঁপে উঠল। সকালে কালি চরণ ধরা পড়ার পর, দুপুরের দিকে দুইজন লোক এসে খাবার আর একশো বিশটা টাকা দিয়ে গিয়েছিল। সেই খাবারগুলো দুপুরেই পাঁচ ছেলে-মেয়েতে মিলে খেয়ে নিয়েছে। সন্ধ্যা নাগাদ একশো বিশ টাকা নিয়ে মুদি দোকানির কাছে চাল আনতে যেতেই মুদি দোকানি টাকাগুলো রেখে দিয়ে কড়া ভাষায় বলেছিলেন,"" আগের বাকি টাকা সব ফেরত দিবা, তারপরে সদাই দিমু। এর আগে একটা কণাও পাইবা না। "" দোকানিকে অনেক অনুরোধ করেছিলেন রমনি, কিন্তু দোকানির মন গলেনি। উল্টো আরও দু-পাঁচ কথা শুনিয়ে দিয়েছিলেন। শেষে হাতে-পায়ে ধরেও যখন কাজ হলো না, তখন ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছিলেন খালি হাতে। ছেলে-মেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে মানুষের বাড়ি ঘুরে ঘুরে এক পাতিল ভাতের মার জোগাড় করেছিলেন। সেটা মনে পড়তেই উঠে দাঁড়িয়ে তড়িঘড়ি করে সেখান থেকে বাটিতে করে একটু খানি ভাতের মার এনে ছেলের সামনে রাখলেন। খাবারের আশায় বাকি চার ছেলে-মেয়েও তাকিয়ে ছিল রমনির পানে। হারিকেনের টিমটিমে আলোয় ছেলে-মেয়েদের আশা-ভরা মুখখানি ভাতের মার দেখে চুপসে যেতে দেখে রমনি বুকের ভেতর চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে দেওয়ালে টাঙানো মা লক্ষ্মীর ছবির দিকে নজর তাক করল। মনে মনে আওড়াল, "" সুদিন দেও মা!! সুদিন দেও, আমার যে আর সইহ্য হইতাছে না। "" পরক্ষণেই নজর সরিয়ে ছেলেকে খাওয়ার জন্য তাড়া দিল।
ছেলেটা তীব্র অনীহা নিয়েই বাটিতে চুমুক বসাল। এক চুমুক খেয়েই কেমন আবদারের কণ্ঠে আওড়াল,
— একটু নুন দেও না মা, মজা লাগে না।
,,, ছেলের কথায় চোখ ভিজে উঠল রমনির। নুন কোথায় পাবেন তিনি? ঘরে চাল, ডাল, নুন, মসলা— কিছুই নেই। এই মুহূর্তে ছেলে-মেয়েগুলোকে যে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলবেন, সেই টাকাটাও নেই তাঁর কাছে। ভেবেই ফুঁপিয়ে উঠলেন রমনি। মাকে কাঁদতে দেখে ছুটে এলো কল্যাণী। মাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো সম্পর্ক না তাদের। গরিবদের ওরকম মা-মেয়েতে মাখোমাখো সম্পর্ক থাকে না। অগত্যা এমনি দূরে থেকে মাকে সান্ত্বনা দিয়ে যত্নসহকারে ভাই-বোনগুলোকে ভাতের মার খাওয়াল। শুধু ভাতের মার খেতে মজা না লাগলেও মাকে কাঁদতে দেখে ছোট্ট প্রাণগুলো চুপচাপ গলাধঃকরণ করে নিল তা। ছোট ছেলেটা খেতে খেতে নিজেকে বুঝ দিয়ে বড় আপাকে বলল,
— আব্বায় এইলে আমরা আবারও ডাইল-ভাত খামু, হাছা না আপা?
,,, ভাইয়ের কথায় চোখ ভিজে উঠলেও মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানাল কল্যাণী। চার হাতের চৌকিতে ছেঁড়া কাঁথাটা বিছিয়ে ভাই-বোনগুলোকে শুইয়ে দিয়ে মায়ের মতো করে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করল। এই কারণেই হয়তো বড় বোনকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়। মেয়েটার কাণ্ড চেয়ে চেয়ে দেখলেন কালির বউ। মেয়েটার বয়স হয়েছে। তেরো বছর চলে। টাকার অভাবে বিয়ে দিতে পারেন না, অথচ বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাওয়ার যোগাড়। লোকে এখনই নানান কথা বলে, বাড়িতে এসে বাজে প্রস্তাব দেয়। সমাজের সেই গুণী সম্মানিত লোকগুলো তাঁকে একলা পেলেই মেয়েটাকে কেনার জন্য মোটা টাকা দিতে চান। মা হয়ে এসব কীভাবে সহ্য করবেন তিনি? তাদের জীবনের এই দুর্দশা আদৌ কি কোনোদিন কাটবে? কালির বউয়ের চোখ থেকে আপনাআপনি কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। মুছলেন না রমনি। চুপচাপ মাটিতে বসে হাঁটু ভাঁজ করে হাঁটুতে মুখ গুঁজে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগলেন। অনেকটা সময় পেরোল এভাবেই। আকস্মিক ঘরের এক কোণের জানালা দিয়ে মাটিতে কিছু একটা আছড়ে পড়ল। মুহূর্তেই শব্দ শুনে ধড়ফড়িয়ে উঠল কালির বউ, সঙ্গে কল্যাণীও উঠে বসল। হয়তো বিড়াল-টিড়াল এসেছে, তাই আবারও হারিকেনের আলোটা জ্বালিয়ে দিল কালির বউ। কল্যাণী, "" হুস! হুস! "" শব্দ করে জানালার দিকে এগিয়ে যেতেই নজর আটকাল মেঝেতে পড়ে থাকা লাল কাপড়ের পুঁটলিটার দিকে। সে কেমন ভ্রু কুঁচকে মায়ের দিকে তাকাল। হয়তো জানতে চাচ্ছে, এটা কী হতে পারে? আর এখানে এটা ফেললই বা কে? কল্যাণীর মনোভাব বুঝতে পেরে কালির বউ ইশারায় কাপড়খানা খুলে দেখতে বলল। মায়ের আদেশ অমান্য করল না কল্যাণী। চুপচাপ মেঝেতে বসে লাল কাপড়ের গিট খুলে উন্মুক্ত করতেই হকচকিয়ে গেল মেয়েটা। চোখজোড়া বিস্ময়ে কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার যোগাড়। ওদিকে দূরে বসে থাকা কালির বউয়েরও একই হাল। কেমন বাকহারা হয়ে পড়েছেন তিনি। নড়তে-চড়তে পারছেন না। মায়ের হাল দেখে কল্যাণী পুঁটলিখানা হাতের আজলায় নিয়ে উঠে গিয়ে মায়ের সামনে বসল। পুঁটলিটা আবারও মেঝেতে রাখতেই সেখানে দৃষ্টি পাত করল কালির বউ। একটা একশো টাকার মোটা বান্ডিল আর ছোট ছোট দুটো ঝুমকো, সঙ্গে ছোট একটা গলার হারও দেখা যাচ্ছে। সেই সঙ্গে ছোট্ট একখানা চিরকুট। মা-মেয়েতে চরম অবাকতায় এখনো একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। ক্লাস ফোর পর্যন্ত অধ্যয়ন করা কল্যাণী সেই চিরকুটখানি হাতের আজলায় নিয়ে ভাঁজ খুলে ভাঙা ভাঙা শব্দে উচ্চারণ করার চেষ্টা করল
"""আমরা আপনার আরও কয়েকজন সন্তান। কল্যাণী আমাদের বোন সমতুল্য। এই টাকাগুলো আজ থেকে আপনাদের। কল্যাণীকে ভালো ছেলে দেখে ধুমধাম করে বিয়ে দিবেন।"""
—— রবার সিং
,,, রবার সিং!! কোন দেশি ভাষা এটা? এর অর্থ কী? বুঝল না মা-মেয়েতে। তবে কাগজে লেখা বাক্যগুলো শুনে কালির বউয়ের চোখজোড়া কেমন চিকচিক করে উঠল। কান্না পেল কল্যাণীরও। সে এই প্রথমবার কান্নায় ভেঙে পড়ে মায়ের বুকে মুখ গুঁজে দিল। একটা বড় ভাই নেই, বাপের কামাই নেই বলে এই জীবনে কম লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়নি। চাচা থেকে শুরু করে দাদার বয়সী লোকেরাও টাকার বিনিময়ে কুপ্রস্তাব দিতে ছাড়েনি। আজ বুঝি তার উপশম ঘটল? কে দিল এই টাকাগুলো? ওরা কি সত্যিই কল্যাণীর ভাই, নাকি বোন? ওপাশের ব্যাক্তিগুলো কি ছেলে নাকি মেয়ে?
*********
সময়টা ফজরের পরপর। সদ্যই নদীর বুক চিরে উদয়িত হয়েছে সূর্য, তবে তা ঢাকা পড়েছে কুয়াশার অমূল্য চাদরে। পথে-ঘাটে জন্ম নেওয়া ছোট ছোট দুব্বা ঘাসগুলোতে ফোঁটা ফোঁটা কুয়াশার বিস্তরণ। সেই কুয়াশাচ্ছন্ন দুব্বা মাড়িয়ে নদীর ঘাটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আরহান। উদ্দেশ্য একটুখানি শীতল হাওয়া গায়ে মাখা, পাথরের ওপর আছড়ে পড়া ঢেউয়ের মৃদু গর্জন শোনা। বহুদিন শহরের ব্যস্ত জীবনযাপন দেখতে দেখতে হাঁপিয়ে উঠেছে সে। এবার একটু নিজেকে প্রকৃতিতে বিলীন করার পালা। আজকে অবশ্য সে একা নেই, সঙ্গে মেহরাবও রয়েছে। মেহরাবের সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই বেশ সখ্যতা ছিল আরহানের। একসঙ্গে ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়েছিল। তারপরপরই বড় মামু তাকে একেবারের জন্য ডেকে নিলেন ঢাকায়। ক্লাস ফাইভ থেকে শুরু করে মাস্টার্স পাস করার আগ পর্যন্ত ঢাকাতেই ছিল। আগে থেকেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আর পারিবারিকভাবে ভালো সম্পর্ক থাকায় গতকাল বিচারের পর মেহরাবের সাথেই পুরোটা দিন কাটিয়েছে সে। মেহরাবের সঙ্গে ঘুরঘুর করতে গিয়ে আরও কিছু বন্ধু-বান্ধব হয়েছে তার। বয়স ২৬-এর কোটায় হলেও আরহানের ছেলেমানুষি হাবভাবে মানুষ খুব দ্রুতই আকৃষ্ট হয় তার প্রতি। যার ফলস্বরূপ এক দিনেই মেহরাব ছেলেটা আরহান-অন্তপ্রাণ হয়ে উঠেছে। আরহানের পরনে সেই চিরাচরিত পাঞ্জাবি আর পায়জামা। গায়ে অবশ্য বাদামি রঙের একটা শাল রয়েছে। পাশে পাশে হাঁটতে থাকা মেহরাবের পরনে লুঙ্গি আর ফতুয়া। দুজনেরই মাথায় টুপি। কুয়াশায় মুড়ানো পথ পেরিয়ে দুজন নদীর ঘাটের সামনে পৌঁছাল। আরহান মাথার টুপিখানা খুলে পকেটে পুরে ঘাট থেকে উঠে আসা পথের দিকে তাকাতেই চোখ দুটো কেমন ছোট ছোট হয়ে এলো। কাঁখে কলসি নিয়ে হেঁটে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে গতকালের সেই মেয়েটি। পরনে বেগুনি রঙের পুরোনো একটা সুতির শাড়ি, মাথায় ঘোমটা টানা। ভিজে চুপচুপে অবস্থায় দাঁতে দাঁত চেপে ঘাটের সিঁড়ি ভেঙে একমনে সামনের দিকে পা বাড়াচ্ছে। দাঁতে দাঁত চাপলেও শীতের তোপে শরীরের কাঁপুনি কমার নাম নিচ্ছে না। আশ্চর্য হলো আরহান। এত সকালে মেয়েটা গোসল করল কেন? আজব তো! গোসল করার কি আর সময় ছিল না?আরহানের তাকিয়ে থাকার মাঝেই চোখাচোখি হলো দুজনের। মেহরাব ভাইয়ের সঙ্গে অচেনা লোকটাকে দেখে থতমত খেয়ে গেল রুপান্মিতা। মাথার ঘোমটাটা টেনে-টুনে ঠিক করে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। কাছাকাছি এসে পৌঁছাতেই কী ভেবে যেন ডাকল আরহান — এই মেয়ে, শুনো।
,,, শুনেও শুনল না রুপান্মিতা। গতকাল ময়নুল ভাই ওই কথাটা বলার পর কেন যেন লোকটার সামনে যেতে বড়ই অস্বস্তি কাজ করছে কিশোরীর। সেই সঙ্গে লোকটাকে সে চেনে না। নাম কী, বাড়ি কোথায়— কিছুই জানে না। এমন একটা লোকের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলাটা বড্ড বেমানান দেখায়। অগত্যা কোনোদিকে না তাকিয়ে নিজের মতো এগিয়ে যেতে লাগল সে। মেয়েটাকে এড়িয়ে যেতে দেখে রাগ হলো আরহানের। আবারও ডাকল — এই যে মেয়ে!! ডাকলাম না? এড়িয়ে যাচ্ছ কেন?
,,, সহসা রুপান্মিতার পদযুগল থেমে গেল। কাঁপা কাঁপা নজরে তাকাল রাস্তার এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা দুই মানবের দিকে। আরহানের বার কয়েক ডাক শুনে রুপান্মিতার দিকে দৃষ্টি তাক করল মেহরাব। অতি পরিচিত একটা মুখ দেখে আরহানের উদ্দেশে প্রশ্ন করল — রুপান্মিতাকে ডাকছো কেন, আরহান? কিছু হয়েছে?
,,, রুপান্মিতা!! এই মেয়েটার নাম তবে রুপান্মিতা?
আরহান বেশ কয়েকবার নামটা মনে মনে আওড়াল। পরপরই অনুধাবন করল, নামটা বেশ সুন্দর। মেহরাব এখনো উত্তরের আশায় আরহানের দিকে তাকিয়ে, তবে আরহানের তাতে মন নেই। সে মেহরাবের কথার উত্তর না দিয়ে রুপার উদ্দেশে এবার ধমক ছুড়ল — এই মেয়ে!! এদিকে আসো।
,,, অচেনা লোকটার ধমক শুনে কেঁপে উঠল কিশোরীর তনু-মন। তবুও ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। এগোনোর সাহস পাচ্ছে না, আবার এড়িয়েও যেতে পারছে না। রুপান্মিতার এই অবাধ্য আচরণে চটে গেল মানব। অকারণেই রাগে নাকের পাটাতন ফুলে উঠল। আরহানের এহেন মতিগতি দেখে ভ্রু কুঁচকাল মেহরাব। বুঝল, কিছু একটা হয়েছে, নয়তো আরহান এমন করত না। অগত্যা রুপান্মিতাকে কাছে আসার জন্য ইশারা করল মেহরাব। এই পর্যায়ে আর থেমে থাকতে পারল না মেয়েটা। শীতে কাঁপতে কাঁপতে আরহান আর মেহরাবের সামনে এসে দাঁড়াল। কাছাকাছি আসতেই কিছুটা থমকাল আরহান। মেয়েটার শ্যামবর্ণের মুখশ্রীতে ফোঁটা ফোঁটা পানির আস্তরণ, চোখ দুটো লাল। শীতের তোপে ফ্যাকাশে ওষ্ঠজোড়া থরথর করে কাঁপছে। পরনের ভেজা শাড়িখানা লেপ্টে রয়েছে দেহভাগে। সেদিকে আর নজর দিল না আরহান। চোখ সরিয়ে রুপান্মিতার চোখের দিকে দৃষ্টি স্থির করল। এখনো মানবের চোখে-মুখে রাগ স্পষ্ট। সেটা বুঝতে পেরে রুপান্মিতা কাঁপা কণ্ঠে শুধাল — জ্বি!! বলুন।
,,, মেহরাব নিজেও আরহানের দিকে তাকাল। হয়তো জানতে চাচ্ছে, আরহান রুপাকে ঠিক কী বলতে চায়। মেহরাবের প্রশ্নের উত্তর কাটাতেই আরহান রুপান্মিতার চোখে নজর স্থির রেখেই কটকট গলায় প্রতিউত্তর করল — তোমার কাছে গতকাল আমি একটা শাল গচ্ছিত রেখেছিলাম। কোথায় সেটা? গতকাল তো ফেরত না দিয়েই চলে গেলে। আজও দেবে না?
,,, আরহানের এহেন বাক্যে রুপান্মিতা সম্বিত ফিরে পেল যেন। মনে মনে জিভ কাটল। ইসস!! পুরো একটা দিন, রাত পেরিয়ে সকাল হয়ে গেল, তবুও কিনা সে শালটা ফিরিয়ে দিল না? কী ভাববে এই অচেনা লোকটা? তাকে চোর ভাববে কি? মুহূর্তেই নাজুক হয়ে উঠল মেয়েটা। ইতস্তত করতে করতে উত্তর করল—
— আ... আসলে... মনে ছিল না। কাল নিয়ে আসব।
,,, বলেই মাথা নিচু করে নিল মেয়েটা। চোখ-মুখজুড়ে তীব্র অনুতপ্ততা। এখনো শীতের তোপে থরথর করে কাঁপছে সর্বাঙ্গ। আরহানের ঠোঁটে আকস্মিক শয়তানি হাসি ফুটে উঠল। রুপান্মিতার দিকে হালকা ঝুঁকে প্রশ্ন করল — কাল? তোমার জন্য অপেক্ষা করতে বলছো? একটা ছেলে একটা মেয়ের জন্য কখন অপেক্ষা করে, জানো তো? জেনে-বুঝেই অপেক্ষা করতে বলছ তো?
,,, রুপান্মিতা কথার অর্থ না বুঝেই আনমনে মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানিয়েও আবার আরহানের বলা কথাটার অর্থ বুঝে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে "না" করল। মুহূর্তেই এক ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল আরহান। এই পর্যায়ে রুপান্মিতা আবারও মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ জানাল। আবারও দুদিকে মাথা নাড়াতে নিয়েই থতমত খেয়ে গেল মেয়েটা। কী থেকে কী বলবে ভেবে পেল না। তাই তাড়াহুড়ো করে কলসিটা দুহাতে চেপে ধরে দৌড়ে সেখান থেকে পালাল। মুহূর্তেই শব্দ করে হেসে উঠল আরহান। মেয়েটা তো দারুণ ভীতু। ভড়কে দেওয়া খুব সোজা। রুপান্মিতার থতমত মুখটা মনে করে ফের হাসল আরহান। ছেলেটার মতিগতি বুঝল না মেহরাব। কেমন সন্দেহী কণ্ঠে আওড়াল — ব্যাপার কী বলো তো, আরহান? বিষয়টা খুলে বলো।
,,, আরহান আকস্মিক মেহরাবের কাঁধ জড়িয়ে ধরল। সামনের দিকে এগোতে এগোতে আওড়াল
— চলো, যেতে যেতে বলছি।
******
স্কুল থেকে ফিরে দ্রুত শাড়ি পাল্টে ছাদে গেল কাব্যশ্রী। যাওয়ার আগে দেওয়ান সাহেবের তিনটে লুঙ্গি আর দুটো পাঞ্জাবি কেচে রোদে দিয়ে গিয়েছিল। সেসবই তুলতে এসেছে এখন। ছাদে এসে তিনটে লুঙ্গির জায়গায় দুটো লুঙ্গি দেখে বুঝল, দেওয়ান সাহেব হয়তো কুলসুমকে দিয়ে একটা নিচে নামিয়ে নিয়েছেন। সে দুটো লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি দড়ি থেকে নামিয়ে হাতের ভাঁজে রাখতেই সাবানের ঘ্রাণে নাকটা ধাঁধিয়ে এলো।দেওয়ান বাড়ির বড় পুত্রের বেশ ডিমান্ড রয়েছে। সে পাউডার কিংবা কাপড় কাচার সাবান দিয়ে কাপড় কাচলে সেই কাপড় ছুঁয়েও দেখবে না। তার লুঙ্গি, পাঞ্জাবি, পায়জামা, এমনকি স্যান্ডো গেঞ্জিটাও সুগন্ধি সাবান দিয়ে কাচতে হবে। তারপর সেটা সমান করে ভাঁজ করে ঘরে রাখলেই ওই কাপড় গায়ে জড়াবেন তিনি। অগত্যা সেসব নিয়ে নিচে নামল কাব্য। আপাতত বসার ঘরটায় কেউ নেই। তবে বড় আম্মা, আম্মাকে নিয়ে রান্নাঘরে নানান পদ রান্না করছেন। দেওয়ান সাহেব সন্ধ্যায় বের হলে কাঁচামাল চালান দিয়ে ফিরবেন কাল সকাল ৮টা-৯টা নাগাদ। সঙ্গে ময়নুল ভাইসহ আরও দু-চারজন কর্মচারীও থাকবে। সবার জন্যই রাতের খাবারটা একসঙ্গে দিয়ে দেওয়া হবে।
কাব্যশ্রী বসার ঘরের এক কোণায় পাটি বিছিয়ে সরঞ্জাম বক্স থেকে একটা স্টিলের পাটাতন নামাল। সঙ্গে একটা পুরোনো কাপড় নিল। এই পাটাতনে হাতল লাগানো রয়েছে। বহু বছর ধরেই পোশাক সমান করার কাজে ব্যবহৃত হয়। তবে এটা কে আবিষ্কার করেছে, তা জানা নেই কাব্যর। কাব্যশ্রী পাটির ওপর আরবিদের কাপড়গুলো রেখে রান্নাঘরে গেল। কয়লার ধানিতে সাত-আটটা নতুন কয়লা যুক্ত করে আম্মার উদ্দেশ্যে বলল — একটু আগুন দেও, আম্মা।
,,, কাব্যর ডাকে রান্না ছেড়ে মুখ তুলে তাকালেন রাহিমা বেগম। উনুনের আঁচ কমিয়ে নিরামিষের পাতিলে খুন্তি নাড়াতে নাড়াতে শুধালেন — বাবু ফিরেছে?
,,, কাব্যশ্রী দুদিকে মাথা নাড়িয়ে উত্তর করল— ্কুল থেকে ফেরার পথে ময়নুল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে। উনি জানালেন, আজ একটু দেরিতে রওনা দেবেন। সবজি এখনো নৌকায় তোলা হয়নি।
,,, মাথা ঝাঁকালেন রাহিমা বেগম। আবারও মন দিলেন রান্নায়। মাটির চুলার তাপে রান্না করতে গিয়ে এই শীতের মাঝেও ঘেমে-নেয়ে একাকার রমনি। ততক্ষণে কুপিতে আগুন জ্বালিয়ে কাব্যশ্রীর দিকে আগুনখানা এগিয়ে দিলেন আয়েশা বেগম। কাব্যশ্রী কয়লার ধানিটা কলসির মতো করে কোমরে রেখে অন্য হাতে কুপিটা সামলে নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
মেয়ের প্রস্থানের দিকে তাকিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেললেন আয়েশা বেগম। মেয়েটা যে মরীচিকার পেছনে প্রতিটি সময় ব্যয় করছে, সেই মরীচিকা কি আদৌ ধরা দেবে তাকে? কী জানি! আয়েশা বেগম তো কোনো আশার আলোই দেখতে পান না।
,,, কাব্যশ্রী বসার ঘরে বিছিয়ে রাখা পাটির কাছে ফিরে এসে পাটির একপাশে হাঁটু ভাঁজ করে বসে পড়ল। কয়লার ধানিতে থাকা পুরোনো কয়লা আর নতুন কয়লা নেড়ে-চেড়ে মিলিয়ে কুপি থেকে সামান্য কেরোসিন তেল ঢেলে দিল। পরপর তাতে আগুন ছোঁয়াতেই মাটির কয়লার ধানিতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। কাব্যশ্রী শাড়ির আঁচল টেনে হালকা করে বাতাস দিতে দিতে কাঠি দিয়ে নাড়িয়ে-চাড়িয়ে আগুনের আঁচ কমাল। আঁচ কমে আসতেই এক হাতে স্টিলের পাটাতনটা আগুনের ওপর ধরে রাখল, অপর হাতে দেওয়ান সাহেবের পাঞ্জাবিটা পাটিতে বিছিয়ে সমান করে নিল। স্টিলের পাটাতন আগুনের তাপে গরম হয়ে আসতেই পুরোনো কাপড় দিয়ে পাটাতনে লেগে থাকা হালকা কালির আস্তরণটা মুছে নিল। পরপর তা চেপে ধরল আরবিদের পাঞ্জাবিতে। আলতো করে চাপ প্রয়োগ করে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পাঞ্জাবিখানা সমান করতে চাইল। গরম তাপ পেতেই হালকা-পাতলা কুচকানো জায়গাটা নতুন কাপড়ের মতো সমান হয়ে উঠল। এভাবেই বারংবার পাটাতন গরম করে করে দুটো পাঞ্জাবি, দুটো লুঙ্গি সমান করে ভাঁজ করে নিল কাব্যশ্রী। ততক্ষণে আরহানের জামা-কাপড় নিয়ে নেমে এলো কুলসুম। মেয়েটা বিধবা। বিয়ে দিয়েই বাপ মরেছিল। স্বামী মরার পর শ্বশুরবাড়িতেও জায়গা হয়নি। একদিন ঝড়-বাদলার রাতে ঠাঁই নিয়েছিল দেওয়ান বাড়িতে। সেই থেকে মেয়েটা এখানেই থাকে। থাকা, খাওয়া, কাপড়সহ মাস গড়ালে দুশো টাকা বেতনও দেওয়া হয়। কুলসুমকে আসতে দেখে প্রশস্ত হেসে দেওয়ান সাহেবের জামা-কাপড়গুলো বুকের সঙ্গে আলতো করে জড়িয়ে নিল কাব্যশ্রী। কুলসুম ঠোঁট টিপে হেসে বলল — এক্কেরে দেওয়ান বাড়ির বড় বউ!! কবে যে ভাইজান তোমারে কবুল কইরা ঘরে তুলবো, সেই প্রহর গুনতাছি খালি।
,,, না চাইতেও লাজুক হাসল কাব্যশ্রী। আরবিদের কাপড়গুলো বুকে চেপেই ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে গেল উপরের দিকে। পায়ের গতি স্থির হলো আরবিদের ঘরের সামনে এসে। ধীরে ধীরে সেগুন কাঠের দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকল। গম্ভীর মানবের সঙ্গে রাগ করে ঘরে ঢোকা হয় না আজ দেড়দিন। ঘরটা কী অগোছালো করে রেখেছে, দেখো! পালঙ্কে ছড়ানো মখমলের কাপড় থেকে শুরু করে আলনায় রাখা কাপড় পর্যন্ত এলোমেলো হয়ে রয়েছে। আলমারির দরজাটাও খোলা। লোকটার বাহিরের ওই পরিপাটি রূপ দেখে কেউ কি আদৌ বুঝবে, মোহাম্মদ দেওয়ান সাহেবের ঘরের ভেতরটা যে আস্ত এক আস্তাবল? কার আশায় এসব অগোছালো করে রেখেছে মানব? কাউকেই তো অনুমতি ব্যতীত ঘরে প্রবেশ করতে দেন না। আবার তাকেও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, যেন সে উনার চোখের বালি। কাব্যশ্রী হাতের ভাঁজে থাকা কাপড়গুলো একপাশে যত্ন করে রেখে শাড়ির আঁচলখানা কোমরে গুঁজে নিল। তক্ষুনি লাফাতে লাফাতে ঘরে ঢুকল শুশি। মাকে তথাকথিত বাবার ঘরে ঢুকতে দেখেই এখানে এসেছে সে। যদিও আরবিদ দেওয়ান মা ও বাচ্চা দুটোকেই বিন্দুমাত্র সহ্য করতে পারে না, তবুও আরবিদ দেওয়ানের ঘরে সবচেয়ে বেশি আনাগোনা চলে এই দুই প্রাণীর। শুশিকে ঘরে ঢুকতে দেখে চোখ পাকাল কাব্যশ্রী। মায়ের চোখ পাকানির তোয়াক্কা করল না খরগোশটা। সে এক লাফে পালঙ্কে উঠে বসল। কাব্যশ্রী ওকে ঠেলে-ঠুলে সরাতে চেয়েও পারল না। অগত্যা শুশির জ্বালাতন সহ্য করতে করতেই পুরো আস্তাবলটাকে ঝেড়ে-মুছে পরিবর্তন করল। আলনা ও আলমারিতে যা যা ময়লা কাপড়চোপড় পেল, সব একে একে মেঝেতে ফেলতে থাকল। তৎক্ষণাৎ ঘরের ভেতর প্রবেশ করলেন জনাব দেওয়ান সাহেব। কাব্যশ্রীকে ঘরের ভেতর দেখে কেমন বিরক্তিতে চোখ-মুখ কুঁচকে নিলেন। এদিক-ওদিক তাকিয়ে পরিপাটি ঘরটা দেখে আরও বিরক্ত হলেন। আরবিদ ঘরে ঢুকতেই পুরো দমে লাফিয়ে উঠল শুশি। লাফিয়ে আবারও বিছানার মাঝখানটায় উঠে বসল। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বিছানা পেয়ে মুহূর্তেই গা হেলিয়ে দিল শুশিটা। আনন্দে ছোট লেজটা নাড়াতে নাড়াতে চোখ বুজে নিল। এরূপ দৃশ্য চুপচাপ দেখে গেল আরবিদ। আপাতত কিছু বলল না। তাকে কিছুক্ষণের মাঝেই তৈরি হয়ে বেরোতে হবে। সে আবারও এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাঙ্ক্ষিত জিনিসগুলো খুঁজল, তবে পেল না। না পেয়ে হাঁক পেড়ে ডাকল — কুলসুম আপা!!
,,, মুহূর্তেই প্রতিউত্তর করল কিশোরী — আলমারিতে তুলে রেখেছি। ওখান থেকে নেওয়া হোক।
,,, কাব্যশ্রীর কথা বলার ধরন শুনে মনে হলো, সে আরবিদের ঘরনি। কতদিনের সংসার তাদের! খুব রাগ হলো আরবিদের। দুটো ধমক দেওয়ার বাসনা জাগল মনপুটে। তবে সে বরাবরই ধৈর্যশীল ব্যক্তি। এগিয়ে গিয়ে আলমারি থেকে সদ্য ধোয়া লুঙ্গি-পাঞ্জাবি বের করতে করতে কাব্যশ্রীর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করল — তোমার কিছু লাগবে?
,,, ময়লা কাপড়গুলো একত্র করছিল কাব্যশ্রী। আকস্মিক কর্ণকুহরে প্রবেশ করা বাক্যে অবাক চোখে তাকাল মেয়েটা। কাপড় ছেড়ে নিজের দিকে আঙুল তাক করে বলল — আমার? আমাকে শুধালেন?
,,, অতীব রূপের অধিকারী ছোট্ট কাব্যর দিকে ফিরে তাকিয়েও দেখল না আরবিদ। চোখ-মুখ শক্ত, কপালে বিরক্তির ভাঁজ। মুখে ফোটা বিরক্তির থেকেও অধিক বিরক্তি কণ্ঠে ঢেলে তিক্ত ভাষায় প্রতিউত্তর করল মানব— সবাইকেই শুধানো হয়েছে। মেঘ, বন্য, আম্মা, ছোট আম্মা সবাইকেই। তুমি বাদ যাবে কেন? তুমি কি আমার বোন না? আর একদম আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলবে না, কাব্যশ্রী। আমি বিরক্তি অনুভব করি।
,,, কাব্যশ্রীর অবাক হওয়া মুখখানি কেমন নিমিষেই চুপসে গেল। কাজ করতে করতে সে তো ভেবেই নিয়েছিলো সে বোধহয় আরবিদ দেওয়ানের বউ। মুহূর্তেই টানা টানা কাজল চোখজোড়া ছলছল করে উঠল। এভাবে মুখের ওপর সত্যি বলার খুব প্রয়োজন? কাব্যর মনে হলো, আরবিদ এই কথাটা না বলে যদি ওর বুকের বাম পাশে শক্ত একখানা তলোয়ার ঢুকিয়ে দিত, তাতেও বুঝি কম যন্ত্রণা হতো। সে ভঙ্গুর হাতে ময়লা কাপড়গুলো বুকে চেপে ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে মলিন কণ্ঠে আওড়াল — আমার কিছু লাগবে না।
,,, শুনল আরবিদ। মেনে নিল। কোনো প্রতিবাদ কিংবা সাধাসাধির চেষ্টা চালাল না। সবাইকে জিজ্ঞেস করেছে, তাই ওকেও জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। কিছু লাগবে না যখন, না লাগুক। আরবিদ পোশাক নামিয়ে বিছানার ওপর শুয়ে থাকা শুশিকে বাইরে ছুড়ে ফেলে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিল। মুহূর্তেই খরগোশটি ব্যথাতুর শব্দে ঘুঙিয়ে উঠল। কাব্য খুব একটা দূরে যায়নি। শুশিকে ছিটকে ফেলতে দেখে ছুটে এলো খরগোশটার পানে। আচমকা আছড়ে পড়ায় পায়ে ব্যথা পেয়েছে বোধহয়। কাব্যর বুকটা মুচড়ে উঠল। চোখ ছাপিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। সে আর তার বাচ্চাটা কেন এত অবহেলিত ওই মানবের কাছে?
এমন নয়, কাব্যশ্রী দেখতে অসুন্দর। কাব্যশ্রী মেয়েটা ভীষণ সুন্দর। এক কথায় যাকে রাজহংসী বলা চলে। শুভ্র গায়ের রং, টানা চোখ, সূচের ডগার ন্যায় চিকন খাড়া নাক, শিশিরবিন্দুর ন্যায় ভেজা ঠোঁট, রেশমের ন্যায় ঝরঝরে দীঘল কালো চুল, তলোয়ারের ন্যায় বাঁকানো কোমর, শরীরের গড়ন ছিমছাম। এরূপ রূপ যেকোনো শক্ত পুরুষকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম। অথচ আরবিদ দেওয়ান তাতে চোখ রাখারও প্রয়োজন করে না। শুধু কাব্যশ্রীই নয়, বরং কোনো মেয়ের দিকেই তাকিয়ে দেখে না ছেলেটা। বয়স ৩০ পেরোনোর যোগাড়। বাড়ি থেকে বিয়ের তাড়া দেওয়া হয় প্রতিদিন। তবে মানবের এক কথা ""সে বিয়ে নিয়ে ভাবতে চায় না। কখনোই বিয়ে করবে না, মা "" এ নিয়ে ভীষণ চিন্তিত রয়েছেন রাহিমা বেগম ও মাহমুদুল দেওয়ান। ছেলে-মেয়ে দুটো কেন বারবার একই কথা আওড়িয়ে যায়? কেন তারা বিয়ে করতে চায় না?
,,,, চলবে।
কাব্যশ্রী একটি স্নিগ্ধ চরিত্র। অনেকেই হয়তো ভাবতে পারো, কাব্য কেন আরবিদের জন্য পাগল? এত অপমান করার পরেও কেন দাম দেখায় না? মুখ ফিরিয়ে নেয় না? এর অবশ্য কারণ রয়েছে। এই গল্পটা নরমাল নয়, এর অনেক ব্যাপার রয়েছে। আমার লেখা প্রতিটি গল্পেরই আলাদা আলাদা মিনিং রয়েছে। এই গল্পে কাব্যর এই চরিত্রটা বড়ই প্রয়োজনীয়। আমার তৈরি অর্পনা যেমন আপনাদের মন ছুঁয়েছে, দিন শেষে কাব্যশ্রীও মন কেড়ে নেবে। যাই হোক, কাব্য চরিত্রটা কার কার ভালো লেগেছে? সবাই গল্পবিষয়ক কমেন্ট করে যাও।
#দেওয়ান_সাহেব( পর্বঃ ৩.২)
#ট্রাজেডি_জাস্টিস
#লোখনিতে_রুপান্জলি
,,, পশ্চিম পাড়ার মসজিদের ঠিক পিছনের ঘরটাই হাসান ফকিরের। দু'চালার দুটো ঘর আর একটা ছোট রান্নাঘর। এর মধ্যে দুটো ঘরের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ দুই রকমের। বড়ো ঘরটা ১২ হাতের, তাতে রুম সংখ্যা দুটো। মেঝেটা সুন্দর করে মাটি দিয়ে লেপন করা। বহু বছর আগে ঘরটা বানানোর দরুন টিনগুলো ঝং ধরে গেছে বহু আগেই। দুটো রুমের মধ্যে ডান পাশের রুমটা একটু বড়ো, আর অপর পাশের রুমটা ছোট।
প্রথম দিকে বড়ো ঘরটায় রুপান্মিতা আর তার মা একসাথে থাকলেও বর্তমানে রুপা বড়ো হওয়ার পর তাকে খাওয়ার ঘরটা রুম হিসেবে দেওয়া হয়েছে। ঐ রুমে এখনো খাওয়া-দাওয়া করা হয়। মূলত রুমটা রুপার হলেও এখানে ব্যক্তিগত শব্দটার কোনো স্থান নেই। রুপার ঘর থেকে সরাসরি রান্নাঘর আর সৌচাগারে যাওয়ার সুবিধা থাকায় এদিক দিয়েই রাত-বিরেতে বাহিরে চলাচল করে রুপা আর রুপার মা।
বড়ো ঘরের সামনে ঠিক ২৩ হাত দূরে একটা ৭ হাতের ঘর রয়েছে। ঐ ঘরটা একান্তই হাসান ফকিরের। তিনি পেশায় একজন ফকির, অর্থাৎ ঝাড়ফুঁক করে জ্বীন ছাড়ানো, সন্তান না হলে তার ঔষধ দেওয়া, ছেলে-মেয়ে অবাধ্য হলে তার ঔষধ দেওয়া, জ্বীন চালান থেকে শুরু করে জ্বীন খাটানো—সবটাই উনার আয়ত্তে। এক কথায় যাকে কবিরাজ বলা যায়। এই ক্ষেত্রে কাজে সফল হলে ভালো ইনামিও পাওয়া যায়। যার দরুন রুপান্মিতারা তেমন একটা খাওয়ার অভাব করেনি। হয়তো সচ্ছল নয়, তবে টুকটাক এটা-ওটা দিয়ে মোটামুটি আকারে জীবনটা চলে যাচ্ছে।
রুপান্মিতার মা মানুষটা বরই বিচক্ষণ মানুষ, সাথে পরিশ্রমীও। বাড়ির সামনের জায়গাটা উনার হাতের তৈরি নানান সবজিতে ভরপুর। পেয়াজ, আলু, ডাল, মসলা কিনলে বাকিটা বাড়ির সবজি দিয়েই পার হয়ে যায়। এদিক থেকে রুপান্মিতার জীবন নিয়ে খুব একটা আফসোস নেই, শুধু বাবার ভালোবাসা আর বাবা-মায়ের সুন্দর একটা সম্পর্ক দেখা ব্যতীত।
রুপা তার ১৫ বছরের জীবদ্দশায় কোনোদিন তার বাবা-মাকে একসাথে বসে দুটো কথা বলতে দেখেনি। এমনকি রুপার সাথেও দুটো কথা বলতে দেখেনি তার বাবাকে। কোনোদিন মেয়ে বলে স্বীকৃতিও দেননি। রুপা বাবা বলতে একটা বিষয়ই অনুধাবন করতে পারে—অবহেলা, অবজ্ঞা আর অত্যাচার। যদিও বাবা কোনোদিন তার গায়ে হাত তোলেনি, তবে মাকে হরহামেশাই আঘাত করে। কথা বলতে গেলেই বেদম পিটায়, অথচ মা কোনোদিন প্রতিবাদ করেনি। আঘাত সহ্য করার পরেও মুখ তুলে দ্বিতীয়বার কোনো বাক্য ব্যয় করেনি।
রুপার মা ফাতিমা বেগম, একজন শিক্ষিত নারী। ক্লাস নাইন পর্যন্ত অধ্যয়ন করেছেন তিনি। রুপা মায়ের কাছে মাঝে-সাঝেই শুনতে পায়, রুপার নানাজান নাকি রুপার মাকে চোখে হারাতেন, আদরে-আদরে রাখতেন। এক কথায় রাজকন্যা যাকে বলে। অথচ আজ, রুপার বাবাকে বিয়ে করে কী হাল হলো সেই রাজকন্যার?
এই তো বিকাল নাগাদ সামান্য পিছন থেকে ডাকায় মাকে ইচ্ছামতো মারলো। বারবার শাসালো যেনো আব্বার থেকে দূরে থাকে। আম্মা চুপচাপ মার খেয়েছে। সেই মারের তোপে শরীরের অনেক জায়গায় দাগ বসে গিয়েছে। রাত নামতেই শরীর কাঁপিয়ে জ্বর এলো। বর্তমানে সেই জ্বরেই কাতরাচ্ছে রুপার নানাজানের সেই রাজকন্যাটি।
রুপার কেমন কান্না পেলো, তবে কাঁদলো না। তার ইদানীং কাঁদতে ভালো লাগে না, ক্লান্ত লাগে। রুপা মায়ের কপালে রাখা জলপট্টিটা তুলে বাটিতে থাকা পানিতে ভিজিয়ে চিপে আবারও মায়ের কপালে রেখে দিলো। খুব ইচ্ছা করছে একটা প্রশ্ন করতে, কিন্তু সংকোচ হচ্ছে। রুপা যে রুপার মাকে ভীষণ সম্মান করে, খানিক ভয়ও পায়। যদি প্রশ্নটা শুনে আম্মা রেগে যায়? এই সংকোচের কারণেই এতগুলো দিন প্রশ্নটা মনে জাগলেও মুখ ফুটে করা হয়নি। আজ রুপা সাহস করে বলেই ফেললো—
— বুঝ হওয়ার পর আব্বাকে কোনোদিন তোমার সাথে ভালো ব্যবহার করতে দেখিনি, আম্মা। তুমি এসব কেনো মেনে নাও? চলে যাও না কেনো? মামুরা কি তোমায় নিবে না?
,,, রুপা ভেবেছিলো ধমক খাবে, অথচ মেয়ের কথায় ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলেন ফাতিমা বেগম। জ্বরের তোপে রুগ্ণ শরীরখানা কেমন মৃদু গতিতে কাঁপছে। সেই কাঁপা-কাঁপা হাতটা উঁচিয়ে মেয়ের গালে আঙুল ছুঁইয়ে বললেন — কোথায় যাই বলতো? তর নানি মারা যাওয়ার আগে আব্বার কাছে খুব শখ করে আবদার করেছিলো, সইয়ের ছেলের কাছে বিয়ে দিবে আমায়। আব্বার মত না থাকলেও আম্মার কথা রাখতে আব্বা অমত করতে পারেনি। আমি আমার বিয়ের আগের দিন দুপুর পর্যন্ত জানতামই না আমার যে বিয়ে। দুপুরের পর আমার এক চাচি এসে কেমন হুড়মুড় করেই হলুদ শাড়িটা পরিয়ে দিলো। জিজ্ঞেস করতেই জানালো, কাল আমার বিয়ে। আব্বাজানের উপর খুব অভিমান হয়েছিলো, জানিস? আমি দেখতে কালো বলে বিয়েতে আমার অনুমতি না নিক, একবার জানাবেও না? আব্বা সেই অভিমানের ধার ধারলেন না, বিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হলেন। বিয়ের দিন এই বাড়িতে আসার পর তর আব্বার ঘরে আমায় যখন বসানো হলো, তখন তর দাদি আমার এই হাতটা ধরে (ডান হাত দেখিয়ে) বলেছিলেন—
""" মাগো!! আমার পোলাডায় একটা মাইয়ার লগে পিরিত করতো, হেই মাইয়া অহন আর নাই। পোলাডা হারাদিন পাগলের লাহান ঘুইরা বেড়ায়। উক্তমতোন খায় না, কান্দে। তুমি আমার পোলাডারে দেইখা রাইখো। একটু ভালা কইরা কথা কইয়ো, লগে লগে থাইক্কো, আমনেই তোমার লাগি মায়ায় হইবো।""'
আমি মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানিয়ে তর দাদিকে কথা দিয়েছিলাম। এরপর আমাদের বিয়ের তিন দিনের মাথায় আকস্মিক তর দাদি মারা গেলো। সেই যে কথা দিয়েছিলাম, ঐ কথা আর ফিরিয়ে নেওয়ার সাধ্য হয়নি আমার।
,,, বলতে বলতে হাঁপিয়ে উঠলেন রমনি। রুপা চেয়ে রইলো মায়ের মুখখানিতে। রুপার মা রা শ্যামলা, তবে কালো নয়। মুখটা খুব সুন্দর, চেহারা কাটিংও বেশ পরিপক্ব। আম্মা যদি ফর্সা রং পেতো, তাহলে কোনো পরির চেয়ে কম লাগতো না তাকে। রুপা তো মায়েরই রং পেয়েছে, তবে চেহারাটা পুরো মায়ের মতো নয়, আব্বার সাথেও মিল রয়েছে অনেকটা। আম্মার বলা এতোগুলা কথার মাঝে রুপার মস্তিষ্কে শুধু একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে "" তর আব্বা অন্য একটা মেয়েকে ভালোবাসতো।"" সেটা মাথায় রেখেই কেমন দৃঢ় কণ্ঠে শুধালো — তার মানে আব্বা তোমাকে সত্যিই ভালোবাসে না? কোনোদিন বাসেওনি?
,,, ফাতিমা বেগম চোখের ইশারায় না বুঝালেন, মানে ভালোবাসে না, আর কখনো বাসেওনি। রুপান্মিতার চোখ-মুখ কেমন শীতল হয়ে এলো। বুকের একাংশে কিছুটা যন্ত্রণা হলো বোধহয়। সে কেমন ভাঙা কণ্ঠে শুধালো — তাহলে কাকে ভালোবাসতো আব্বা?
,,, ফাতিমা বেগম কেমন চোখ সরিয়ে নিলেন। মুখখানিতে তীব্র অস্থিরতা বিরাজমান, যেনো কোনো গোপন কথা লুকানোর প্রয়াস চালাচ্ছে। তিনি কেমন অপ্রস্তুত কণ্ঠেই আওড়ালেন — জানি না।
,,, রুপার বিশ্বাস হলো না। সে এতোটাও বোকা নয়। মায়ের হাবভাবেই বুঝলো মা কিছু লুকাচ্ছে। সে কেমন সন্দেহী কণ্ঠে শুধালো — জানো না? কেমন যেনো বিশ্বাস হচ্ছে না, আম্মা। তুমি তো এতোটাও বোকা নও।
,,, মেয়ের কথা যেনো শুনেও শুনলো না রমনি। চোখ বুজে ঘুমিয়ে যাওয়ার ভান করলো। রুপান্মিতা বরই অসন্তুষ্ট হলো তাতে, তবে কথা বাড়ালো না। বুঝতে পারলো বিষয়টা বরই ব্যক্তিগত, হয়তো তাকে বলা যাবে না, তাই আম্মা বলতে চাচ্ছে না। অন্যথায় আম্মা কোনোদিন রুপার থেকে কিছু লুকায়নি। অগত্যা ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকা মায়ের পাশে বসে রইলো রুপা। মধ্যরাত পর্যন্ত জলপট্টি দিলো। এই পর্যায়ে জ্বর কমে শরীরটা ঘেমে উঠতেই উঠে দাঁড়ালো রুপান্মিতা। রাতে খাওয়া হয়নি, খেতে ইচ্ছাও করছে না। আজকে রাতটা সে পাশেই শুয়েই কাটিয়ে দিবে, রুমে যাবে না। ভেবেই মাথার ঘন লম্বা চুলগুলোর খোঁপা খুলে এমনি বেণিটা পাকিয়ে নিলো। বেণি পাকাতে গিয়ে আকস্মিক কিছু একটা মনে হতেই তড়িঘড়ি করে এগিয়ে গেলো নিজের জন্য বরাদ্দকৃত ঘরটায়। সেদিন লোকটার শাল বহু কষ্টে লুকিয়ে-চুরিয়ে এনে বিছানার মোটা কাঁথার তলায় রেখেছিলো সে, যেনো আম্মার নজরে না পড়ে। এই পর্যায়ে দ্রুততার সহিত বিছানার তলা থেকে শালটা বের করে কাছে টানতেই আতরের ঘ্রাণে রুপান্মিতার নাসারন্ধ্র কেমন বুঁদ হয়ে এলো। আনমনেই মুখ ডুবালো তাতে। বড়ো করে দম নিতেই বুকের ভিতরটা কেমন যেনো করে উঠলো। অদ্ভুত এক অজানা অনুভূতি।
রুপান্মিতা তড়িঘড়ি করে দূরে সরালো চাদরটা। আকস্মিক কাণ্ডে শালটার ভাঁজ খুলে বিছানার উপর ছড়িয়ে পড়লো। মুহূর্তেই মাথা কাজ করা বন্ধ হয়ে গেলো রুপান্মিতার। সে তাড়াহুড়ো করে শালটা হাতে নিয়ে পরখ করতেই দেখলো, শালের ঠিক মধ্যেভাগে অনেকটা জায়গা ছেঁড়া। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, বিছানার তলায় রাখার দরুন বিচ্ছু ইঁদুরগুলো পরম আয়েশ করেই চাদরটা ছিন্নভিন্ন করেছে। তীব্র কুণ্ঠায় কাতর হলো কিশোরী। অপমানিত হওয়ার আশঙ্কায় কান দুটো গরম হয়ে এলো। ঐ লোকটা এখন আর তার অচেনা নয়। দেওয়ান বাড়ির ছোট ছেলে সে। সবাই ছোট দেওয়ান সাহেব বলে ডাকেন। নাম আরহান, বনশ্রীর বড়ো ভাই। এই লোকটার কথা বন্যর মুখে বহুবার শুনেছে সে। এমন একটা লোকের আমানতের খেয়ানত সে কিভাবে করতে পারলো? এখন কী জবাব দিবে? কাল তো চাদরটা ফেরত চাইবেন তিনি। এই ছেঁড়া চাদর কিভাবে ফিরিয়ে দিবে কিশোরী? অপমানিত হতে হবে কি? লোকটা কি অনেক বাজে ব্যবহার করবেন?
************
,,, কাব্যশ্রীর নিজস্ব একখানা ঘর থাকা সত্ত্বেও সে রাতের বেলা একা ঘুমাতে পারে না, ভয় পায়। তাই সারাটা দিন কোনোরকম নিজের ঘরে কাটালেও রাত হলেই বড়ো আপার দোরগোড়ায় এসে হাজির হয়। সাথে অবশ্য বই নিয়ে আসে। মেঘশ্রী যতটা সময় নিয়ে জেগে জেগে বই পড়ে কিংবা স্টুডেন্টদের খাতা দেখে, ঠিক ততটা সময় আপার পাশে বসে পড়ালেখায় মশগুল থাকে কাব্যশ্রী। আজকেও তার ব্যতিক্রম হলো না। আপা যতক্ষণ জেগে জেগে বই পড়লো, কাব্যও ততক্ষণ বই নিয়ে বসে রইলো। তবে তার মনোযোগ বইয়ে নেই। দুদিন ধরেই মনটা বেশ ভার। নাহ! দুদিন ধরে নয়। এই মন খারাপের সময়কাল বহুদিন গড়িয়েছে, অথচ কাব্যশ্রীর মন ভালো হয়নি। যার উপর অভিমান করে বসে থাকে, তার এসবে মন নেই, ফিরেও তাকায় না। একতরফা ভালোবাসা বুঝি এমনি বেদনাদায়ক? কাব্যশ্রীকে আনমনা দেখে ওর হাতের বইটা কেড়ে নিলো মেঘশ্রী। মুহূর্তেই ধড়ফড়িয়ে উঠলো মেয়েটা। কিছু জিজ্ঞেস করতে নিবে, তার আগেই শোনা গেলো মেঘশ্রীর শান্ত স্বর — রাত অনেক হয়েছে, শুয়ে পড়।
,,, বড়ো আপার কথা ফেলে দেওয়ার সাহস পেলো না মেয়েটা। পাশে পায়ের ব্যথায় কাতর হয়ে শুয়ে থাকা শুশিটাকে টেনে কোলে তুলে নিলো। বাচ্চাটার জ্বর হয়েছে। বিকালবেলা আরবিদের ওরকম আছড়ে ফেলার দরুন পায়ে বেশ চোট পেয়েছে বেচারি। এরপর থেকেই এরকম নিশ্চুপ মেরে শুয়ে আছে। কাব্যশ্রী শলার ঝাড়ু টেনে বিছানার ময়লা ঝেড়ে দুদিকে দুটো বালিশ সাজিয়ে দিলো। বিছানা তৈরি দেখে প্রতিদিনকার মতো বিছানার ঠিক মাঝখানটায় গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়লো শুশি। পরপর মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো, যেনো চোখের ইশারায় মাকে পাশে শোয়ার জন্য তাড়া দিচ্ছে। কাব্যশ্রী বিষয়টা বুঝতে পেরে শুশিকে বুকে জড়িয়ে শুয়ে পড়লো।
ততক্ষণে মেঘশ্রীরও সব কিছু গুছানো শেষ। বইগুলো বইয়ের আলমিরাতে তুলে রেখে কক্ষের আলো নিভিয়ে কাব্যর পাশাপাশি এসে শুয়ে পড়লো। কিছুটা সময় কাটলো এভাবেই। কক্ষজুড়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকায় কেউ কারো অবস্থান টের পাচ্ছে না। তবুও ও কী মনে করে যেনো নীরবতা কাটিয়ে মেঘশ্রী কিছুটা দৃঢ় অথচ মলিন কণ্ঠে আওড়ালো — কাউকে এতটা ভালোবাসতে নেই, কাব্য। যতটা ভালোবাসলে মানুষ নিজের অস্তিত্ব ভুলে যায়।
,,, বড়ো আপার এহেন কথায় চমকালো কাব্যশ্রী। এতক্ষণ সে আগের ন্যায় বড়ই আনমনা ছিলো। আপার দিকে তাকিয়ে বুঝতে চাইলো, আপা কেনো তাকে এই কথাটা বলেছে। অন্ধকার হওয়া সত্ত্বেও কাব্যের মনোভাব বোধহয় বুঝতে পারলো মেঘশ্রী। ওপাশ থেকে প্রশ্ন আসার আগেই নিজ থেকে উত্তর করলো — বছর খানিক আগেই ভাইজান তকে বিয়ে করবে না বলে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, কাব্য। সাফ সাফ কণ্ঠে জানিয়েছে ভাইজান তকে বোন ব্যতীত অন্য কোনো নজরে দেখে না। তাহলে তুই কেনো তার বিরহিনী হয়ে নিজেকে প্রতিনিয়ত বিরহে বিরহে কাতর করছিস? মনের দিক পাল্টা। আব্বাজান, চাচাজান যেখানে বলবেন, সেখানেই বিয়ে করে নিস।
,,, আপার এই দৃঢ় কণ্ঠে ভীতু কাব্যটার কিযে হলো, সে কোনোকিছু না ভেবেই কেমন আনমনে বলে বসলো—
— তবে তুমি কেনো করোনি, আপা? মনের দিক পাল্টাতে অপারগ কেনো তুমি? এখনো কেনো সেইজনের পথ চেয়ে বসে আছো, যেইজন কথা রাখতেই জানে না?
,,, কাব্যশ্রীর এহেন প্রশ্নে অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো মেঘশ্রী। মন-মস্তিষ্ক কেমন গুটিয়ে গেলো নিমিষেই। নড়ার শক্তি পাচ্ছে না যেনো, আর না উত্তর করার ভাষা খুঁজে পেলো। অগত্যা চোখ বুজে নিলো রমনি। অজান্তেই চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দু'ফোঁটা তপ্ত নোনা জল। ভঙ্গুর মনটা কেমন বিক্ষোভ করে আওড়ালো "" কষ্ট পাচ্ছিস যে? কাব্য তো ভুল কিছু বলেনি। যার পথ চেয়ে বসে আছিস, সে কি আদৌ আসবে? সংসার হবে তর? "" মেঘশ্রী উত্তর করতে পারলো না। পরিবার, সমাজ, মন, মস্তিষ্ক সবাই শুধু তাকে প্রশ্নই করে যায়, অথচ মেঘশ্রীর কাছে কোনো উত্তর নেই। সে উত্তর দিতে পারে না, তাই চুপ হয়ে যায়। চুপ থেকে নিজের ব্যথাগুলোকে প্রশ্রয় দেয়, অভিমান গাঢ় করার প্রয়াস চালায়। বাড়েও তা, বেড়ে আকাশচুম্বী হয়, কিন্তু সেই অভিমান ভাঙতে সে আসে না। কথা তো ছিলো শিগগিরই ফিরবে, সেই শিগগিরই কি এখনো আসেনি? কবে আসবে তা? সত্যি সত্যিই মেঘশ্রীর একটা সংসার হবে তো? এই পর্যায়েও উত্তর খুঁজে পেলো না মেয়েটা। কাব্য জানে তার কথায় আপা কষ্ট পেয়েছে, কিন্তু তাতে কী করণীয়? চাইলেই কি মনের দিক পাল্টানো যায়? অন্য কাউকে ভালোবাসা যায়? নাকি তাকে ভুলে অন্য কাউকে বিয়ে করা যায়? আপা যেমন পারেনি, কাব্যও তো পারবে না। নিজের ভালোবাসার পরিমাপ বুঝাতেই আপাকে মুখের উপর সত্যি কথাটা বলে দিলো, অথচ এখন অন্তর পুড়ছে। এভাবে বলাটা বোধহয় উচিত হয়নি। অকারণেই কাব্যশ্রীর চোখজোড়া কেমন ঝাপসা হয়ে এলো। চোখে ভেসে উঠলো বছর কয়েক আগের এক পশলা স্মৃতি।
,,,,সময়টা ৭১-এর শুরুর দিকে। মার্চের ১ তারিখে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছেন। যার ফলস্বরূপ ২ মার্চ থেকে দেশজুড়ে শুরু হলো অসহযোগ আন্দোলন। পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে পরিচালিত হতে থাকে এই আন্দোলন। শহরজুড়ে তখন বিক্ষোভ, মিছিলের ছড়াছড়ি। রেডিও অন করলেই শোনা যায় যুবক থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী লোকেদের একের পর এক অধিকার লড়াইয়ের চিৎকার। শহরের দিকে এসবের রেশ থাকলেও নবীনগরের মতো একটা নিশ্চুপ, পরিশ্রান্ত এলাকায় তার বিন্দুমাত্র রেশ ছিলো না। এমনকি নবীনগর থেকে আলাদা করে এই আন্দোলনে যুক্তও হয়নি কেউ। অথচ মার্চের ৫ তারিখে সন্ধ্যার রাতে আহত অবস্থায় বাড়ি ফিরলো মোহাম্মদ আরবিদ দেওয়ান। বাহুতে তিনটে গুলি লেগেছে, যার ফলস্বরূপ বাহুর উপরের অংশ সাদা ব্যান্ডেজে মোড়ানো। পায়ে আঘাত পেয়েছে বোধহয়, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। অবস্থা দেখেই বোঝা যাচ্ছে সদ্য হাসপাতাল থেকে ফিরেছে। দুজন অচেনা লোকের সাথে আরবিদকে আহত অবস্থায় বাড়ি ফিরতে দেখে মা-চাচি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। বিনু ফুপু চেঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় তুললেন। কখনো বিলাপে টান দিচ্ছেন, আবার কখনো আরবিদকে বকাঝকা করছেন। ভাইজানের এহেন অবস্থা দেখে কেঁদে উঠলো কাব্যশ্রী। তখনো আরবিদ দেওয়ান তার কাছে শুধুই ভাইজান। বন্যটা কাব্যকে শান্তনা দিতে দিতে ভাইজানের দিকে তাকিয়ে রইলো। মেঘশ্রী ছুটে গিয়ে ভাইজানকে টেনে সোফায় বসিয়ে বাহুর ক্ষত পরীক্ষা করতে করতে ফুঁপিয়ে উঠলো। তক্ষুনি মাহমুদুল দেওয়ান ও মাহবুবুর দেওয়ান এশার নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরলেন। আরবিদ গুলি খেয়েছে শুনেই নামাজ থেকে ছুটে এসেছেন তারা। গ্রামের অনেকেই এসেছে তাদের পিছু পিছু। দেওয়ান বাড়িতে এক প্রকার মানুষের হাট বসেছিলো সেদিন। গত দুইদিন আগে সন্ধ্যাবেলায় কাঁচামাল নিয়ে শহরে গিয়েছিলো আরবিদ। পরদিন সকাল আটটার আগেই ফেরার কথা ছিলো, অথচ ছেলেটা ফিরেনি। মাহমুদুল দেওয়ান ভেবেছিলেন, ছেলেটা বোধহয় আন্দোলনের চক্করে পড়ে ফিরতে পারছে না। তাই চিন্তিত হলেও তেমন একটা ঘাবড়াননি। অথচ আরবিদের সাথে আসা দুজন অপরিচিত ছেলেদের থেকে জানতে পারলো, আরবিদ নাকি গত দুইদিন যাবৎ চৌহাট্টায় ছাত্র-জনতার সমাবেশ ও বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করেছে। একটা গুলি কাল খেয়েছিলো, আজ খেয়েছে দুটো।
মুহূর্তেই বাড়িতে হুলুস্থুল বেঁধে গেলো। চেঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় তুললেন মাহমুদুল দেওয়ান। ক্ষতি হলে রাজনৈতিক নেতাদের হচ্ছে, অধিকার গেলে নেতাদের যাচ্ছে। এর মধ্যে তারা সাধারণ মানুষ কেনো জড়াবে? তারা কেনো এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করবে? আজ যেমন পাকিস্তানিদের হাতে খাজনা তুলে দিতে হচ্ছে, ভবিষ্যতে যেই রাজ করুক না কেনো, তার হাতেও খাজনা তুলে দিতেই হবে। পার্থক্য একটাই, বর্তমানে এটাকে খাজনা বলে, ভবিষ্যতে ট্যাক্স বলবে। এর বাইরে কোনো উন্নতি ঘটবে না এই দেশে। আরবিদ কি তা মানার মানুষ? সে দেশের জন্য প্রাণ দিতেও প্রস্তুত। তার একজনের প্রাণের বিনিময়ে যদি দেশবাসী বেঁচে যায়, তাহলে সে হাসতে হাসতে প্রাণ দিবে। এই পর্যায়ে বাবা-ছেলের মাঝে তীব্র তর্কাতর্কি চললো। আরবিদ দেওয়ানকে একপ্রকার একঘরে করে দেওয়া হলো। মাহমুদুল দেওয়ান সাফ সাফ জানিয়ে দিলেন, এই ছেলে যদি মরেও যায়, তবুও যেনো ওর কাছে কেউ না যায়। এমনকি আরবিদের মা-ও না। ঐ মহিলা যদি যায়, তবে তাকে সরাসরি তিন তালাক দিয়ে বাড়িছাড়া করবেন তিনি। আরবিদ দেওয়ান তো আরবিদ দেওয়ানই। বাবার থেকেও শতগুণ জেদি সে। তৎক্ষণাৎ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলো, তবে বেরুতে পারলো না। রাহিমা বেগম কেঁদে কুটে ছেলেকে আটকে দিলেন। সেই রাতে আরবিদের ভীষণ জ্বর হলো। অথচ মাহমুদুল দেওয়ানের নিষেধাজ্ঞা পেরিয়ে কেউ আরবিদের নিকট যাওয়ার সাহস পেলো না। ছেলের চিন্তায় বারংবার বিলাপ পারছিলেন রাহিমা বেগম। আয়েশা বেগমও বাদ গেলেন না। বিনু ফুপিটা কেমন যেনো— এই মায়া দেখায়, আবার এই ঝগড়া পাতাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। যার ফলস্বরূপ দুই মা চেয়েও ননদের নজর ভেদ করে ছেলের কাছে পৌঁছাতে পারলেন না। গেলেই যদি বিনদিনী ভাইদের কানে কথাটা পৌঁছে দেন? তবে মেঘশ্রী কি তা মানে? ততদিনে পরিবারের কাছে এমনিই সে খারাপ, অভদ্র, কলঙ্কিত। এখন না হয় বাবার কথা অমান্য করে বড়ো ভাইয়ের কাছে গিয়ে আবারও খারাপ হলো সে, সমস্যা নেই। অগত্যা চুপচাপ সহ্য না করে ভাইয়ের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো মেয়েটা। মেঘশ্রীর পিছু পিছু বোকা কাব্যটাও গিয়েছিলো বড়ো ভাইজানের কক্ষে। তিনটে গুলি খাওয়ার ফলে তীব্র জ্বর হানা দিয়েছে আরবিদের শরীরে। মনটা যতই শক্ত হোক না কেনো, শরীর কি তা মানে? মেঘশ্রী ঘরে এসে ভাইজানকে সোজা হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এসে ভাইজানের কপাল ছুঁলো। তৎক্ষণাৎ উত্তাপে কেমন কাতর হয়ে এলো রমনি। ভাইয়ের কষ্টে চোখে পানি জমা হলো। সে তড়িঘড়ি করে কাব্যশ্রীকে আরবিদের পাশে বসিয়ে ছুটে গেলো নিচে। উদ্দেশ্য গামলা ভরে পানি এনে ভাইজানের মাথায় জলপট্টি দেওয়া। বড়ো আপা চলে যেতেই কৌতূহলী কাব্যশ্রী ধীরে ধীরে আরবিদের কপাল ছুঁলো। পরপর গাল ছুঁতেই নাজুক কাব্যশ্রীর ঠান্ডা হাতখানা শক্ত করে চেপে ধরলো আরবিদ। শরীরে হিমোগ্লোবিন কম থাকার কারণে বরাবরই কাব্যশ্রীর হাত ঘেমে ঠান্ডা হয়ে থাকে। আরবিদ সেই ঠান্ডা হাতের স্পর্শে আরাম বোধ করলো বোধহয়। সে হাতখানা নিয়ে একে একে গালে, চোখে, মুখে ঠেকিয়ে অস্ফুট স্বরে আওড়ালো
— ভালো লাগছে। দূরে যেওনা।
,,, আরবিদের শরীরের উত্তপ্ততা, পুরুষালি হাতের স্পর্শ, শক্ত হাতে পিষ্ট হতে থাকা ছোট হাতটায় লাগা আরবিদের পুরো ঠোঁটের অনিচ্ছাকৃত বিচরণে কেঁপে কেঁপে উঠলো কাব্যশ্রী। কেমন যেনো অদ্ভুত অনুভূতি বয়ে গেলো তার দেহ-মন জুড়ে। কাব্যশ্রী তখন সদ্যই বড়ো হয়েছে। বাচ্চা বাচ্চা অনুভূতি ছাপিয়ে মনকোটায় ভালো লাগার অনুভূতি অনুভব করার সময় এটা। এমতাবস্থায় আরবিদের এরূপ নৈকট্যতা কাব্যের মনে ঝড় তুলে দিলো। আশেপাশে সমবয়সী বান্ধবী, প্রতিবেশী, এমনকি নিজের থেকেও বছর দুয়ের ছোট মেয়েদের বিয়ে হওয়ার পর তাদের হওয়া জীবনসঙ্গীদের কথা কল্পনা করে সে নিজেও অনুভব করলো, তাদের ঘরে থাকা এই মারাত্মক সুদর্শন যুবকটি জীবনসঙ্গী হিসেবে মন্দ না। সেই রাতটাই ছিলো কাব্যশ্রীর জন্য সর্বনাশা রাত। ঐ একটা রাত আরবিদের শিয়রে বসে জলপট্টি দিতে দিতে কাব্যশ্রীর মনটা পাল্টে গেলো। এরপর থেকে তার বড়ো ভাইজান হয়ে উঠলো কাব্যের দেওয়ান সাহেব। সেইদিনের পর থেকে কেমন করে যেনো সব পাল্টে পাল্টে গেলো। কাব্যশ্রীর অনুভূতির পরিমাণ বাড়তে থাকলো। আরবিদের কী পছন্দ, কী করতে ভালোবাসে, কী পরতে ভালোবাসে, সবটা অনুশীলন করা যেনো তার বরাবরের নিয়ম হয়ে উঠলো। আরবিদের কক্ষে খাবার এনে দিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে, আরবিদ যখন বাড়ি থাকে না তখন তার ঘর গুছানো, ময়লা কাপড় কেচে, ঝেড়ে, গরম পাটাতন দিয়ে সমান করে আলমিরাতে ভাঁজ করে রাখা একান্তই তার দায়িত্ব হয়ে উঠলো। টানা ছয় মাসে একেবারে আরবিদের বউ বনে গেলো মেয়েটা। তাদের যেনো শুধু কবুল করে একসাথে একই ঘরে থাকাটাই বাকি ছিলো। কাব্যশ্রীর এই ঘরণী ঘরণী ভাব দেওয়ান বাড়ির সদস্যদের নজর এড়ালো না। আরবিদ ব্যতীত সবাই বোধহয় বুঝলো কাব্যের মনের লুকায়িত সেই অনুভূতির কথা। এরপর সময় পেরুলো অনেকটা। কাব্যশ্রীর এখনো মনে পড়ে সেই দিনটার কথা, যেদিন সে কাব্যশ্রী দেওয়ান থেকে হয়ে উঠেছিলো দেওয়ান সাহেবের বিরহিনী।
,,, দেওয়ান বাড়িতে এত সদস্য, সদস্যদের ঘর থাকা সত্ত্বেও আরবিদ কোনোদিন কারোর ঘরে পা রাখেনি, রাখার প্রয়োজনও মনে করেনি। সে বরাবরই নিজেকে নিজের মাঝে আবদ্ধ রাখতে পছন্দ করে। অথচ আজ প্রথম বারের ন্যায় কাব্যর ঘরে পা দিলো মানব। সপাটে ধাক্কা দিয়ে খুললো চাপানো সেগুন কাঠের দরজাটা।
কাব্যশ্রী তখন বিছানার একপ্রান্তে বসে কাঁথা সেলাই করছিলো। আকস্মিক শব্দ হতেই কেমন হকচকিয়ে উঠলো মেয়েটা। নিজের ঘরে দেওয়ান সাহেবের আগমন টের পেয়ে কিছু বলতে নিতেই তৎক্ষণাৎ পুরুষালি হাতের দাবাং চড় খেয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো কিশোরী। পরমুহূর্তে আরও একটা চড় উঁচিয়েও কী মনে করে থেমে গেলো মানব। মেয়েটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর হাতের কনুই চেপে ধরলো আরবিদ। কখনো মার না খাওয়া নাজুক শরীরটা কেমন ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলো। মুহূর্তেই চোখ ভরে উঠলো নোনা জলে। গাল বেয়ে অনবরত গড়ালো তা। মানবের চোখ এড়ালো না বিষয়টি। সে এক ঝটকায় হাত ঝাড়া মেরে ফেলে দিয়ে শক্ত ধাক্কা বসালো ১৪ বছর বয়সী কিশোরীর কাঁধে। নিজের থেকেও বয়সে দ্বিগুণ অমন শক্তপোক্ত পুরুষের ধাক্কায় দেয়ালে ছিটকে পড়লো কিশোরী। পিঠে আঘাত পেয়ে নুয়ে পড়তে নিতেই ঝড়ের বেগে সন্নিকটে এসে থামলো মানব।
এতোটাই নিকটে, যতটা নিকটে এলে দুজন দুজনার নিশ্বাস পর্যন্ত মাপতে পারে। কাব্যশ্রী তখন আরেকটু খাটো ছিলো, আরবিদের বুকেরও কিছুটা নিচে। লোকটা রেগে-মেগে ওর কাছে এসে কেমন ঝুঁকে গেলো। একটা হাত দেওয়ালে আটকে অন্য হাতে চেপে ধরলো কাব্যশ্রীর নরম চোয়ালখানা। সেখানে এখনো একটু আগে খাওয়া দাবাং চড়ের দাগ স্পষ্ট। এতক্ষণ আকস্মিক ঘটা কাণ্ডগুলো টের পাওয়ার ফুরসত না পেলেও, যখন চোখে-মুখে লোকটার গরম নিশ্বাস আছড়ে পড়লো, মুহূর্তেই চোখ পিটপিট করে তাকালো কিশোরী। অনুভব করলো আরবিদের লম্বা খাড়া নাকটা তার নাকের খুব কাছে। চুরুটে পোড়া ঠোঁটটা তার কোমল অধর ছুঁইছুঁই। খুব একটা দূরত্ব নেই তাদের মাঝে। কাব্যশ্রী তখন ভালোলাগা, ভালোবাসা বুঝলেও বিপরীত ব্যক্তির প্রতি আকর্ষণ সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলো না। আজ আবারও সেই রাতের ন্যায় অদ্ভুত অনুভূতি হতেই বুকের ভিতরকার কাঁপন বাড়লো। শরীরটা অদ্ভুত শিহরণে কেঁপে উঠলো। সেই শিহরণের তোপ সামলাতে না পেরে স্থির হয়ে পড়লো কিশোরী। তক্ষুনি কানের কাছে আছড়ে পড়লো লোকটার তপ্ততা-মিশেলে কয়েকটি তীরের ফলার ন্যায় বাক্য—
"" বাঘ যতই ক্ষুধার্ত হোক না কেনো, তাকে কখনো কুকুর-বিড়াল ছুঁতে দেখেছো? তুমি আমার কাছে সেই কুকুর-বিড়ালের সমান, নিকৃষ্ট জাত। আমার থেকে দূরে থাকবে। ""
,,, বলে একমুহূর্তও স্থির রইলো না মানব। যেমনি করে বাতাসের গতিতে এসেছিলো, অমনি করেই হনহন করে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। অথচ আরবিদের কথায় হতবাক মেয়েটা গাল ও শরীরের ব্যথা অগ্রাহ্য করে স্থির চিত্তে দরজার পানে তাকিয়ে রইলো। দেওয়ান সাহেবের এসব বলার কারণ কী? কেনো বলে গেলো? সে যে দেওয়ান সাহেবকে ভালোবাসে, এই কথা তো সে কাউকে কোনোদিন বলেনি। তাহলে দেওয়ান সাহেব জানলেন কী করে? কাব্যশ্রী এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেলো পরের দিন সকালবেলা। বাবা-চাচা নাকি উনার কাছে কাব্যশ্রীকে বিয়ে করার প্রস্তাব রেখেছিলেন। এমনকি কাব্যশ্রী যে আরবিদকে মনে মনে পছন্দ করে, তাও প্রকাশ করেছিলেন। ঐ কথাটা জানার পরেই রেগে-মেগে ওর ঘরে এসেছিলো আরবিদ। সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, কাব্যশ্রী তার কাছে কুকুর-বিড়ালের সমান। এই কাব্যকে তার রুচিতে ধরবে না। এরপর থেকে কাব্যশ্রীও যায়নি আরবিদের রুচির কারণ হতে। শুধু অভ্যাসবশত কাজগুলো করে দেওয়া হয়। করে না দিলেও অনেক কথা শুনতে হয় তাকে। আরবিদ দেওয়ানের একেক সময় একেক মর্জি হয়। একদিকে কাব্যকে দেখতে পারেন না, অন্যদিকে কাব্যর হাতে কাচা পোশাক না হলে চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তোলেন, ধোয়া পোশাক-আশাক ছুড়ে ফেলেন মেঝেতে। কুলসুমকে ঘরের জিনিসপত্রে হাত দিতে দেন না। কাব্য গুছিয়ে দিলে ঐ ঘরটা গোছানো হয়, নয়তো তা আস্তাবলের রূপ নিয়ে পড়ে থাকে দিনের পর দিন।
( নিচের লেখাগুলো পড়তে হবে মাস্ট)
,,,, চলবে
তোমরা বরাবর গল্প পড়ার ক্ষেত্রে গল্পের পরিস্থিতি না বুঝে লেখিকার ভুল ধরার চেষ্টা করো, মুলত এটা করা উচিৎ না। তোমাদের উচিৎ একটা লেখার মাধ্যমে তোমাদেরকে লেখিকা কি বুঝাতে চাচ্ছে সেটা অনুধাবন করা। চুপ চাপ মনোযোগ দিয়ে পড়তে থাকা, মনের মাঝে কোনো প্রশ্ন থাকলে সেটা আস্ক করা, যেই দিকটা ভালো লাগলো সেটা প্রকাশ করা। যদি বলো খারাপ লাগাটা প্রকাশ করবো না? অবশ্যই করবে, কখন জানো? যখন আমি একটা চরিত্রকে একরকম জাহির করবো আর বানাবো অন্যরকম। যখন আমি তোমাদের বা*জে কিছু শিখাবো, মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট অ*শ্লিলতার দিকে ধাবিত করবো তখন তোমরা আমার ভুল ধরবে। ইতিমধ্যে কাব্য চরিত্রটা নিয়ে একজনার সাথে আমার প্রায় তর্কাতর্কি হয়েছে। কাব্যের কেনো সেল্ফ রেসপেক্ট নেই? কেনো সে আরবিদের সাথে দাম দেখায় না? আমার কথা হচ্ছে,, আমি সেচ্ছায় কাব্যকে এমন বানিয়েছি, ওকে বার বার ভীতু, ভঙুর বলেছি একবারও বলিনি ও সাহসি, প্রতিবাদি। তাহলে কাব্যর কাছে কি কোনো মতে প্রতিবাদ, তর্কাতর্কি বিষয়টা আশা করা যায়? যারা আমার অর্পনাকে পড়েছো তারা হয়তো জানো, অর্পনা ব্যাক্তি জীবনে নিস্ব হওয়া সত্তেও কারোর কাছে মাথা নতো করেনি। দ্বীপকে পেতে কৌশল করেছে তবুও দ্বীপের নিকট মাথা নতো করেনি। আমি ওকে বানিয়েছি ই এরকম। ৩৭ পৃষ্ঠার পুরো গল্পটাতে যেমন অর্পনার মাইন্ড গেইমার চরিত্রটা প্রয়োজন ছিলো অমনি এই গল্পে কাব্যের ভিতু চরিত্রটা প্রয়োজন আছে। কাব্য একতরফা ভালোবাসায় আসক্ত। একতরফা ভালোবাসা এমনি হয়। এই মুহুর্তে কাব্য মুখ ফিরিয়ে নিলেও আরবিদের কিছু আসবে যাবে না। আর আমি মাত্র চরিত্র গুলো তৈরি করছি, এখনো তৈরি করা শেষ হয়নি। এমন নয় আরবিদ আগে কাউকে ভালোবাসতো, তার জীবনে আগে কোনো নারী আসেনি। মূলত ঘটনা আরও গভীরে। তাই দয়া করে আমার লেখালেখিতে আমায় ফোকাস করতে দেন।
মোট কথা কাব্য এমনি থাকবে, একেবারে আত্মসম্মান ছাড়া, আরবিদ বার বার আঘাত করবে তাকে। এটুকু মানতে শিখুন। দয়া করে ভবিষ্যতে এই একই কথা কেউ বলবেন না, আমি আগেই ক্লিয়ার করে দিচ্ছি। এরপর যদি মনে হয় এই গল্পটা আপনার রুচিসম্মত না তাহলে দুঃখিত, আমি আন্তরিক ভাবে সরি। আমার লেখার থিম আমি চেন্জ করবো না। আমি কখনোই একটা প্রেম কাহিনি লিখে বিয়ে বাসর জিনিসটাতে থেমে থাকতে চাইনা। উল্টো পাল্টা লিখে লেখালেখিতে অস্থিরতা ছড়াতে চাইনা। আমি চাই নতুন কিছু লিখতে, যা কেউ লেখেনি, কেউ না। একজন ও এসে বলতে পারবে না ও আমার গল্পকে কপি করেছে। আমি সিরিয়াস ইস্যু নিয়ে লিখতে চাই, গল্পকে জীবন্ত করতে চাই, নতুন কিছু শিখাতে এবং জানাতে চাই সুতরাং আমাকে আমার মতো লিখতে দাও আর প্রান ভরে দোয়া করো যেনো আমি সত্যি সত্যি ই তোমাদের নতুন কিছু উপহার দিতে পারি। আমার কথায় কেউ কিছু মনে করলে দুঃখিত, আর এই বিষয়ে কিছু না বলে প্লিজ গল্প বিষায়ক বড়ো করো কমেন্ট করে যেও। তোমরা গল্প বিষায়ক কমেন্ট করলে আমি লেখার আগ্রহ পাই।