ফন্ট সাইজ:
থিম:
দেওয়ান সাহেব

৪র্থ পর্ব

লেখক: রুপান্জলি

#দেওয়ান_সাহেব ( পর্বঃ ৪)

#ট্রাজেডি_জাস্টিস

#লেখনিতেঃরুপান্জলি

,,,,,বেলা আনুমানিক সাতটা ছুঁইছুঁই। কুয়াশার তোপে সূর্যের অবস্থান বোঝার ফুরসত নেই, চারদিক এখনো ঘোলাটে। ঘাট থেকে ক্ষণে ক্ষণে নৌকার ইঞ্জিনের শব্দ ধেয়ে আসছে। গ্রামের মেয়ে-বউরা কাঁখে কলসি, হাতে পরনের পোশাক, বালতি ভর্তি ময়লা কাপড়চোপড় নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ঘাটের দিকে। ফজরের আজান দিয়েছে ৫টা ২২ মিনিটে। নামাজ শেষ করে আরহান মেহরাবকে নিয়ে নদীর ঘাটে এসেছিল ছয়টা নাগাদ। ঘণ্টাখানেক পেরিয়ে যাওয়ার পরও রুপান্মিতার দেখা মিলল না। আরহান বারবার ঘাটের দিকে তাকাচ্ছে, পরপরই তাকাচ্ছে ঘাটে আসার রাস্তা বরাবর। এত মানুষ আসে, তবুও রুপান্মিতা আসে না।

বিরক্ত হলো আরহান। যত সময় বাড়ছে, ততই মানুষের আনাগোনা বাড়ছে। বিশেষ করে মেয়েদের আনাগোনা মাত্রাতিরিক্ত বাড়ছে। এমন অবস্থায় তাদের এখানে দাঁড়িয়ে থাকাটাও দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফকিরের মেয়ে কি জানে, দুজন প্রাপ্তবয়স্ক যুবককে মেয়েদের গোসলের ঘাটের সামনে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে লোকে তাদের ঠিক কতটা মন্দ বলবে? নির্দিষ্ট একজনের জন্য আরহানের বদনাম কামাতে আপত্তি নেই, তবে ব্যাপারটা যদি অধিকের খাতিরে হয়, তাহলে নিশ্চয়ই আপত্তি আছে তার। আরহানকে এমন উসখুস করতে দেখে কিছুটা কৌতূহলী হলো মেহরাব। ঠোঁট টিপে হেসে শুধালো—

— তোমার কি শালটা খুব প্রয়োজন, আরহান? নাকি অন্য কোনো ব্যাপার আছে?

,,, মেহরাবের এহেন বাক্যে ভ্রু গুটালো আরহান। তর্জনী আঙুল তুলে ভ্রু চুলকে প্রসঙ্গ পাল্টে আওড়ালো— ফকিরের মেয়ে কথা দিয়ে কথা রাখল না? বুঝলে, মেহরাব! তোমাদের এলাকার মানুষ খুব একটা ভালো না।

,,, এই পর্যায়ে মেহরাবও কিছুটা ভ্রু কুচকাল। চোখ দুটো কেমন ছোট ছোট করে আরহানের দিকে তাকিয়ে আওড়ালো — তুমি কিন্তু আমাদের এলাকারই, আরহান। বাহিরের কেউ না।

,,, আরহানের ঠোঁটজোড়া কেমন বেঁকে এলো। আরও একবার ঘাট ও রাস্তা দুদিকে নজর বুলিয়ে মেহরাবের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে শুধালো — তোমায় কে বলেছে আমি ভালো, মেহরাব?

,,, এই পর্যায়ে ফিক করে হেসে ফেলল মেহরাব। মাথায় থাকা টুপিখানা খুলে লুঙ্গির ভাঁজে রেখে, দুহাত একসঙ্গে করে ঘষল। পরপরই হাতজোড়া পরখ করে এমন একখানা ভাব নিল, যেন সে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা আওড়াবে। ওর হাবভাব দেখে আরহানও ওর হাতের দিকেই তাকিয়ে রইল। আরহানের দৃষ্টির উপসম ঘটাতে মেহরাব কেমন মুহূর্তেই সেই সতর্ক ভঙ্গি পরিবর্তন করে মজার ছলে আওড়ালো — তোমার অবস্থা দেখে আমার একটা গান মনে আসছে, বুঝলে? অনুমতি দিলে গাইতাম।

,,,, আরহান শেষবারের মতো ঘাট ও রাস্তা দুটো পরখ করে হতাশ ভঙ্গিতে মসৃণ চুলগুলো এক হাতে পেছনে ঠেলে উত্তর করল — ইচ্ছা অপূর্ণ রাখা বোকামি, মেহরাব।

প্রশ্রয় পেয়ে আগেভাগেই হেসে উঠল মেহরাব। অনেকটা সময় হেসে কোনোমতে হাসি থামানোর প্রয়াস চালিয়ে থেমে থেমে গাইল —

,,,ফকিরের মেয়ে রুপা আমায় কথা দিয়েছে,

আসি আসি বলে রুপা...................

,,, আর বলতে পারল না ছেলেটা। আবারও সশব্দে হেসে ফেলল। হাসল আরহানও। সে এবার মেহরাবকে ইশারা করে ফিরে আসার পথে পা বাড়িয়ে আবারও মসৃণ চুলে হাত বুলিয়ে অসম্পূর্ণ গানটা গাইল—

— ফকিরের মেয়ে রুপা আমায় কথা দিয়েছে,

আসি আসি বলে রুপা ফাঁকি দিয়েছে...

***************

,,, সময়টা ১৮৫৮ সাল। নবীনগরে তখন নাওয়াফ দেওয়ানের জমিদারি বিরাজমান। নাওয়াফ দেওয়ান হচ্ছেন আরবিদ দেওয়ানের বড়ো আব্বু, অর্থাৎ আরবিদের দাদাজানের পিতা। নাওয়াফ দেওয়ানের সন্তানসংখ্যা ছিল ১১টি। তার মধ্যে পুত্রসংখ্যা চার ও কন্যাসংখ্যা সাতটি। ঐ সময়টাতে শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা বলতে বাংলা পড়া-লেখা, গণিতের প্রাথমিক হিসাব ও চিঠিপত্র লেখা শেখানো হতো। বঙ্গাঞ্চলে তখনো ইংরেজি শব্দটার বিস্তার ঘটেনি। তবে ইংরেজদের সঙ্গে ওঠাবসা করতে করতে একপর্যায়ে নাওয়াফ দেওয়ান ঠিক করলেন, তিনি তাঁর সন্তানদের ইংরেজি শিক্ষায়ও শিক্ষিত করবেন। অগত্যা লোক লাগিয়ে একজন ইংরেজি শিক্ষকের খোঁজ চালাতে থাকলেন। টানা ১৮ সপ্তাহ খোঁজ চালানোর পর বঙ্গাঞ্চলের পশ্চিমে অবস্থিত হিন্দুস্তানের অন্যান্য প্রদেশ, ভারতে এক বিজ্ঞ শিক্ষকের সন্ধান পাওয়া গেল। লোকটা হিন্দু নয়, খাঁটি মুসলিম ধর্মীয়। অগত্যা তাঁকে স্ত্রী-সন্তানসমেত ডেকে নিলেন নাওয়াফ দেওয়ান। জায়গা দিলেন নিজের তৈরি দেওয়ানবাড়িতে। তবে সেই মাস্টার বেশিদিন জমিদারবাড়িতে রইলেন না। বরং ভারতের সব জায়গাজমি বিক্রি করে আজীবনের জন্য বহমান হলেন বঙ্গাঞ্চলে। দেওয়ানবাড়ি থেকে ছয়-সাত মিনিটের দূরত্বে পুরো দুই শতাংশ জমিজুড়ে বাড়ি তৈরি করে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করতে শুরু করলেন। সেই থেকেই এই বাড়িটির নাম হয় মাস্টারবাড়ি।

,,, নবীনগড়ের উত্তরপাড়ার ঠিক সড়কের মাথায় মাস্টারবাড়ির অবস্থান। চারদিক ফকফকা সিলভার-রঙা টিনের আলতা। সড়কের সঙ্গে মিলিয়ে আলতার ঠিক মাঝখানটায় বড়ো করে টিনের গেট লাগানো। সেই গেইটের একপাশে মাঝারি সাইজের একটা লিফলেট টাঙানো ""অনুমতি ব্যতীত ভিতরে প্রবেশ করা নিষেধ।"" ঐ লিফলেটের ঠিক নিচেই একটা কাঠের চেয়ার পাতা। ঐ চেয়ারে বসে সর্বদা বাচ্চাওয়ালা মুরগির মতো ঝিমায় দারোয়ানটা। এই নিয়ে অবশ্য তাকে কম কথা শুনতে হয় না। কয়েকশ বার কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেওয়ারও হুমকি এসেছে। কিন্তু কী করার? বেচারার কেমন অকারণেই ঘুম পায়। এমন নয় যে দারোয়ানকে রাতেও ডিউটি করতে হয়। মূলত বাড়িটির দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বিশাল হওয়ার দরুন পুরো বাড়িটাতেই নানান ধরনের ফলের গাছগাছালি রয়েছে। একপ্রকার ফলের রাজ্য বলা যায় বাড়িটিকে। বাড়িতে এত এত ফলের গাছ থাকা সত্ত্বেও সেগুলো বিক্রি করার প্রয়াস চালায় না মাস্টারবাড়ির বর্তমান উত্তরাধিকারী রেজওয়ান মাস্টার। এমনকি কাউকে দেওয়ারও প্রয়োজন মনে করে না। রেজওয়ান মানুষটা বড়ো খিটখিটে। চেহারাটাও তেমন গুরগম্ভীর, আচরণটা আরও বিদঘুটে। কারোর সাথেই তেমন একটা ভালো ব্যবহার করে না। মোট কথা, সে ভালো করে কথা বলতেই জানে না। সারাক্ষণ কথার নামে তিক্ত বাণী বের হয় মুখ দিয়ে। একেবারে দাদুর ওপর দিয়েই গিয়েছে ছেলেটা। দাদু যেমন সারাদিন খিটখিট করত, বইয়ে মুখ গুঁজে রাখত, বাইরের কাউকে বাড়িতে ঢুকতে দিত না, দারোয়ান, মালি ও রান্নার লোকেদের সঙ্গে রাগারাগি করত, তেমন করেই ছেলেটাও সারাদিন খিটখিট করে, বইয়ে মুখ গুঁজে রাখে। এই খিটখিটে স্বভাবটাকে পূর্ণরূপ দিতেই বোধহয় জন্মের সময় কপালে একখানা ভাঁজ নিয়েই জন্মেছিল রেজওয়ান। যা বর্তমানে রেগে গেলে কিংবা বিরক্ত হলেই সেই ভাঁজসহ আরও দুইখানা ভাঁজ মিলিয়ে তিনটি ভাঁজ পড়ে চওড়া কপালটায়। এতে যেন আরও ভয়ানক রাগী দেখায় ছেলেটাকে। রেজওয়ানের এই খিটখিটে মেজাজের কারণেই আজ অবধি যতগুলো মেয়ের বাড়িতে বিয়ের সম্বন্ধ গিয়েছে, সবটাই বাতিল হয়েছে। রেজওয়ান অবশ্য বিয়ে করতে চায়নি। তার এসবে মনোযোগ নেই। তবে তার দাদুটা ছিল নাছোড়বান্দা। বাড়িতে একজন দারোয়ান আর বাগানের মালি ব্যতীত অন্য কারোর প্রবেশ নিষিদ্ধ। রান্নার লোক এলেও চুপচাপ কাজ করে বেরিয়ে যায়। ছেলে আর ছেলের বউ মারা গিয়েছে আজ বহু বছর। বাড়িতে একটা নিজের মানুষের অভাববোধ, সেই সঙ্গে একাকী, একমনা নাতিটার সংসার দেখার আশায় নানান ঘরে বিয়ের প্রস্তাব রেখেছিলেন। তবে মেয়ের বাবারা মেয়ে দিতে রাজি নয়। কিছু কিছু জায়গায় মেয়ের বাবা রাজি হলেও মেয়ের মাকে রাজি করানো সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এরপর আর কী? নাতির জন্য কোনো মেয়ের সন্ধান না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে এসেছেন সামাদ মাস্টার। এই তো বছর দেড়েক আগে। দিনটা শুক্রবার ছিল। তপ্ত দুপুরবেলা দেওয়ানবাড়ির মেঝো মেয়ের সঙ্গে একনাগাড়ে ঝগড়া বাঁধিয়ে বিছানায় গা হেলিয়ে দিয়েছিল বুড়োটা। রেজওয়ান মাত্রই কল চেপে গোসল সেরে ঘরে ঢুকেছে। সামাদ মাস্টার নাতিকে আগাগোড়া পরখ করে কেমন গালভরা হাসলেন। রেজওয়ান তা দেখে কপালে সেই চিরচেনা তিনটি ভাঁজ ফেলে শুধিয়েছিল— বুড়া বয়সে রং লাগছে? হাসছো কেন এভাবে?

নাতির কথায় সামাদ মাস্টার ফের একগাল হেসে শুদ্ধ-অশুদ্ধ ভাষা মিলিয়ে বললেন — দেওয়ানবাড়ির মেঝো মাইয়াটা বেশ মিষ্টি। কাল একবার দেওয়ানবাড়ি যাবো ভাবতাছি।

,,, দাদার কথায় আরও বিরক্ত হলো রেজওয়ান। ঐ চোর মেয়েটার মাঝে কী এমন মিষ্টতা পেলেন দাদু? যার খাতিরে একেবারে দেওয়ানবাড়ি যেতে হবে? বুঝে পেল না ছেলেটা। অগত্যা বিরক্তিসূচক শব্দ করে নিজের ঘরে চলে গেল রেজওয়ান। নাতির কাণ্ডে ফের হেসে চোখ বুজলেন সামাদ মাস্টার। সেই যে চোখ বুজলেন মানুষটা, আর চোখ মেলে তাকালেন না। দাদাজান মারা যাওয়ার পর রেজওয়ান আরও একা হয়ে পড়ে। বিদ্যালয়ে যাওয়া ব্যতীত বাকিটা সময় আরও ঘরকুনো হয়ে বসে থাকে। আগে গেইটে লেখা ছিলো """ অনুমতি ছাড়া ভিতরে প্রবেশ নিষেধ।"" এখন সেটা কেটে বড়ো বড়ো করে লেখা "" প্রবেশ করা সম্পূর্ন নিষেধ"" তবে এই নিষেধাজ্ঞা কি দেওয়ানবাড়ির মেঝো মেয়ে মানে? বেয়াদব না সে? উড়নচণ্ডী, উগ্র, লক্ষ্মীছাড়া সবকটা শব্দই তার সঙ্গে মানানসই।রেজওয়ানের এই নীরব জীবনে প্রতিটা দিন একবেলা না একবেলা ঝামেলা পাকাতে এই মেয়ের আবির্ভাব ঘটবেই। কখনো তাকে তেঁতুলগাছে, আবার কখনো আমগাছে, জামগাছে, কদবেলগাছে— কোনো না কোনো গাছে ঠিকই পেত্নীর মতো পা ঝুলিয়ে বসে থাকতে দেখা যাবে। এত বকাঝকা, খারাপ ব্যবহারের পরও মেয়েটার বেয়াদবি কমে না।

,, ফজরের নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরে বিছানায় গা হেলিয়ে দিয়েছিল রেজওয়ান। কথা ছিল বাজারে যাওয়ার, অথচ শরীর ক্লান্ত থাকায় আর যাওয়া হলো না। বিছানায় গা হেলিয়ে দিতেই ঘুম এসে হানা দিল চোখজুড়ে। সেই ঘুমের রেশ কাটল মাত্রই।কানের কাছে মেয়েলোকের বেসুরো গলায় গাওয়া গানের সুর বাজতেই ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল রেজওয়ান। মুহূর্তেই কপালের মধ্যভাগে সেই চিরচেনা তিনটি ভাঁজ পড়ল। ঘরের পেছনের দিক থেকে এখনো বেসুরো গলায় গান ভেসে আসছে। এই বেসুরো গলার মালিককে সে বেশ ভালো করেই চেনে। মেয়েটার সাহস আছে বলতে হবে, নয়তো তার বাড়িতে চুরি করতে এসে এমন বড়ো বড়ো গলায় গান গাইতে পারত না, তাও এই বেসুরো গলায়।কপালে সেই চিরচারিত তিনটে ভাঁজ ফেলে রেখেই পরনের এলোমেলো লুঙ্গিখানা ঠিকঠাক করে উঠে দাঁড়াল রেজওয়ান। গায়ে লুঙ্গি ব্যতীত আর কোনো পোশাক নেই। উপরিভাগ উন্মুক্ত। তবে তাতে ভাবাবেগ হলো না ২৯ বছর বয়সী যুবকের। গায়ে শুধু মাত্র একটি সেন্ডো গেঞ্জি জড়িয়ে রয়েসয়ে বিছানার তলা থেকে পাঁচ হাত লম্বা লাঠিটা বের করে নিল। এই লাঠিটা নিমগাছের ডাল দিয়ে তৈরি। গতকাল খুব যত্নের সহিত লোক দিয়ে ভাঙিয়ে এনে ছাল ছাড়িয়ে ঘষেমেজে চোর পেটানোর জন্য তৈরি করেছে। লাঠিটা হাতে নিয়ে মাটিতে দুটো ঠক ঠক করে বাড়ি মারল। নাহ! তেমন কোনো শব্দ হয় না। তবে এর একটা বাড়ি কারোর শরীরে পড়লে সেই ব্যক্তি স্থির হয়ে দাঁড়িয়েও থাকতে পারবে না। অগত্যা লাঠি হাতে ধীরে ধীরে দরজার কপাট খুলে বাহিরের দিকে হাঁটা দিলো মানব। নিঃশব্দে বাড়ির পেছনে এসে তেঁতুলগাছের নিচে এসে থামল। প্রতিদিনকার ন্যায় আজকেও দেখল, গাছের মগডালে বসে বসে পা দোলাচ্ছে দেওয়ানবাড়ির মেঝো মেয়ে।

,,,, কাঁচা তেঁতুলে শক্ত কামড় বসিয়ে টকজাতীয় শব্দ করে পুরো গাছটা পরখ করে নিল বনশ্রী। সে প্রায় গাছের মগডালে বসে আছে। তবে তার হাতের নাগালে কোনো পাকা তেঁতুল নেই। যা আছে, তা অনেকটা ওপরে। তেঁতুলগুলো নিতে হলে তাকে ওপরে উঠেই নিতে হবে। কিন্তু ঐ ডালগুলো ভীষণ চিকন। তার ভার নিতে সক্ষম হবে না, আর না বনশ্রী সাহস দেখিয়ে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে পারবে।

অগত্যা চোখ-মুখ অন্ধকার করে আবারও গান ধরল কিশোরী—

,,,সে যে কেন এলো না, কিছু ভালো লাগে না,

এবার আসুক, তারে আমি মজা দেখা... আআআআআ...

,,, গান গাইতে গাইতে নিচের দিকে চোখ যেতেই আকস্মিক গাছের নিচে লাঠি হাতে রেজওয়ানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভয়ার্ত চিৎকার করে উঠল বনশ্রী। মুহূর্তেই চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে এলো।

এই ফালতু শিক্ষকটা এখানে কী করছে? দারোয়ান কাকা না বলল, বাড়িতে নেই? বাজারে গিয়েছে? তবে কি ফিরে এলো? কখন এলো? সে যেখানে বসে আছে, এখান থেকে বাড়ির গেটটা সম্পূর্ণভাবে পরখ করা যায়। ফিরলে তো এই রাস্তা দিয়েই ফেরার কথা। তাহলে সে দেখল না কেন? বনশ্রী অসম্ভব অসুন্দর দেখতে লোকটাকে ভালো মতো পরখ করে নিল। কুৎসিত লোকটার চোখ-মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে সদ্য ঘুম থেকে উঠে এসেছে। তবে কি দারোয়ান কাকা মিথ্যা বলল? আজকে একবার এই ভয়ানক লোকটার থেকে ছাড়া পেয়ে নিক, তারপর দারোয়ান কাকার সঙ্গে একটা বিশাল বোঝাপড়া করবে বনশ্রী। বনশ্রীকে এমন আহাম্মকের ন্যায় চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে থাকতে দেখে দাঁতে দাঁত চেপে মানব। গাছের গোড়ায় শক্ত বাড়ি বসিয়ে হিসহিসিয়ে আওড়ালো—

— গাছ থেকে নাম।

,,, বনশ্রী মনে মনে ভয়ার্ত ঢোক গিললেও ওপর-ওপর বেশ সাহসী সাজল — নামব না।

,,, এরূপ কথায় কী যে রাগ হলো রেজওয়ানের! ইচ্ছে করল গাছে উঠে মেয়েটাকে সপাটে চড় বসিয়ে দিতে। কী পেয়েছে তাকে? প্রতিদিন এসে এভাবে জ্বালায়। মেয়েটা কি জানে না, তার বাড়িতে প্রবেশ নিষিদ্ধ?

রেজওয়ান কেমন তিক্ত কণ্ঠে আওড়ালো — এটা তোর বাপের গাছ? চোরের বাচ্চা। নিচে নাম।

,,, রেজওয়ানের বলা কথাগুলো কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই তিরবিরিয়ে উঠল কিশোরী। ভয়-সংকোচ ভুলে হাতের তর্জনী আঙুল তুলে শাসানোর মতো করে বলল — একদম বাপ তুলে কথা বলবেন না। চোর হলে আমি চোর। আমার আব্বাজান কি আপনার বাড়িতে চুরি করতে এসেছে, যে আপনি আমায় চোরের বাচ্চা বলে গালি দিবেন?

,,, গম্ভীর, তিতকুটে রেজওয়ানের ভ্রুযুগল বেঁকে এলো। শুধালো — তুই স্বীকার করছিস, তুই একটা চোর?

,,, অন্য কেউ হলে লজ্জায় মিইয়ে যেত বোধহয়, কিন্তু বনশ্রীর মাঝে এমন কিছু দেখা গেল না। সে একপ্রকার গর্বের সহিত আওড়াল — অস্বীকার করার কী আছে? আজব।

,, মুহূর্তেই মুখ বিকিয়ে বিবৃতি করলো মানব — তর কোনোদিন লজ্জা-সরম হবে না, না?

,,, বনশ্রী মাথা ঝাঁকিয়ে বললো — হয়েছে।

— কী হয়েছে?

— ওদের দুজনার সাথে কথা হয়েছে। বলেছে, কোনোদিন আসবে না।

,,, এই পর্যায়ে কুচকানো ভ্রুযুগল আরও কুচকালো রেজওয়ান। কেমন ফ্যাসফ্যাসে গলায় শুধালো — কাদের সাথে? কী কথা হয়েছে?

,, বনশ্রী এবার গাছের ডালটায় আয়েশ করে বসল, যেন বড্ড কাজের কথা বলবে সে। হাতের তেঁতুলে অল্প করে কামড় দিয়ে মৃদু শব্দ করলো। রেজওয়ানের কী যে রাগ হলো! তবে কিছু বললো না। দাঁতে দাঁত চেপে বিষয়টা জানার আগ্রহে তাকিয়ে রইলো। বন্য রয়েসয়ে প্রতিত্তোর করলো — লজ্জা-সরমের সাথে। আমি ওদের অনেক অনুরোধ করেছি, আসার জন্য। জানিয়েছে, জীবনেও আসবে না।

,,, মুহূর্তেই অগ্নিমূর্তি ধারণ করলো রেজওয়ান। দাঁতে দাঁত পিষে হিসহিস করে উঠলো মানব। আবারও বাড়ি বসালো গাছের গোড়ায়। এরূপ কাণ্ডে বন্যর ভেতরটা কেমন লাফিয়ে উঠলো। রেজওয়ান ফের ধমক দিয়ে বললো — এই গাছ থেকে নাম।

,,, বনশ্রী দ্রুত দুদিকে মাথা ঝাঁকিয়ে বললো — নামবো না।

,,, রেজওয়ান আর কথা বাড়ালো না। গলা উঁচিয়ে বাগানের মালির নাম ধরে ডেকে উঠলো — কাশেম! এই কাশেম! এক বয়াম চিনি নিয়ে আয়, দ্রুত।

,,, কিছুক্ষণের মাঝেই চিনির বয়াম নিয়ে হাজির হলো কাশেম আলী। ৫৩ বছর বয়সী লোকটার হাতে বাটির বদলে বয়াম দেখে চোখ রাঙালো রেজওয়ান। কাশেম আলী কেমন কাচুমাচু মুখ করে চিনির বয়ামটার দিকে ইশারা করে বললো — চিনি! চিনি দিয়া কী হইবো, সাব?

,,, অসন্তুষ্ট হলেও কিছু বললো না রেজওয়ান। এদেরকে সে পরে দেখে নেবে। দারোয়ান-মালি দুটোকেই পাল্টাতে হবে। একজনও নিয়ম-কানুনের ধার ধারে না, যেন এটা তাদের নিজের বাড়ি। আপাতত তিতকুটে মুখটাকে স্বাভাবিক রেখে গাছের গোড়ার দিকে ইশারা করে আওড়ালো — চিনিটা গাছের গোড়ায় ঢেলে দে। এমনভাবে ঢালবি, যেন মুহূর্তেই কালো পিঁপড়া দিয়ে গাছ ভরে যায়।

,,,, সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঝাঁকালো কাশেম। মুনিব যা বলবে, তাই সই। অপরদিকে রেজওয়ানের কথা শুনে কেমন চোখ বড়ো বড়ো হয়ে এলো বনশ্রীর। কালো পিঁপড়া মানে? উনি গাছের নিচে চিনি ঢেলে কালো পিঁপড়েদের ডেকে আনবেন ওকে শায়েস্তা করার জন্য? হায় আল্লাহ! একটা মানুষ ঠিক কতটা দয়া-মায়াহীন, নির্দয় হলে বন্যর মতো একটা নিষ্পাপ মেয়ের সাথে এতটা পাষাণ হতে পারে? জানা নেই বনশ্রীর। তবে মেয়েটা রাগে ফেটে পড়লো। এক হাতে গাছের ডাল ধরে অন্য হাতে আঙুল তুলে শাসিয়ে আওড়ালো — একদম এসব করার সাহস করবেন না। কালো পিঁপড়ার কামড়ে অনেক ব্যথা পাওয়া যায়।

— তাহলে নিচে নাম।

,,, বনশ্রী দুদিকে মাথা নাড়িয়ে রেজওয়ানের হাতে থাকা লাঠির দিকে ইশারা করে বললো — আপনি মারবেন।

— মারবো না, নাম।

— সত্যি তো?

,,, এই পর্যায়ে ফের ক্ষেপে গেলো রেজওয়ান — চোরের বাচ্চা, নাম!

,,,, বনশ্রী এবার চুপচাপ গাছ থেকে নেমে আসার প্রয়াস চালালো। কাশেম এখনো চিনি হাতে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। বনশ্রী নামতে নামতে কাশেমের দিকে তাকিয়ে কেমন মুখ বাঁকালো। মুহূর্তেই থতমত খেয়ে গেলো কাশেম। বড়ো সাহেব বেঁচে থাকতে তাকে আর মোকসেদকে পইপই করে বলে গিয়েছেন, দেওয়ানবাড়ির মেঝো মেয়ে যখন ইচ্ছা তখন মাস্টারবাড়িতে ঢুকবে। তারা যেন তাকে মানা না করে।বড়ো সাহেব মারা যাওয়ার দেড় বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও তারা সেই কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে, এখনো করে যাচ্ছে। বনশ্রী যখনই মাস্টারবাড়ির গেটের সামনে এসে দাঁড়ায়, তখনই তার জন্য বিনা বাক্যে গেট খুলে দেয় মোকসেদ। দুজন বেশ সম্মান করে মেয়েটাকে। তবে যার খাতিরে সম্মান করে, সেই দেখো কেমন অগ্নিদৃষ্টিতে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে। বনশ্রী ভীতু ভীতু পলক ঝাপ্টে বিড়ালছানার ন্যায় ধীরে ধীরে নিচে নামলো। তৎক্ষণাৎ ডান বাহুতে সজোরে লাঠির আঘাত পড়লো। ব্যথায় ককিয়ে উঠলো মেয়েটা। লাফিয়ে দুপা পিছিয়ে যেতেই আবারও অপর বাহুতে লাঠির আঘাত পড়লো।এই পর্যায়ে কান্না আটকাতে পারলো না কিশোরী। যতগুলো তেঁতুল হাতে ছিল, ব্যথার তোপে তা ছিটকে পড়লো নিচে। চোখজোড়াতে পানি জমা হলো মুহূর্তেই।

বন্য আর কাব্য জমজ বোন হলেও তাদের চেহারায় কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। বন্য কাব্যর থেকে একটু বেশি সুন্দর, তবে নাকটা বোচা। সেই বোচা নাকটা লাল রং ধারণ করেছে। জোরালো আঘাতগুলোতে হাত দুটো অবশ হয়ে আসায় হাত উঠিয়ে বাহুতে হাত ঘষে ব্যথা নিবারণের চেষ্টাও চালাতে পারলো না কিশোরী।

বনশ্রীর মুখটা দেখে বড্ড মায়া হলো কাশেমের। মাস্টারবাড়িতে বন্যর বিচরণ আজ থেকে নয়। মেয়েটার নাম যেমন বনশ্রী, মানে বনের সৌন্দর্য; অমনি নামের সাথে মিলিয়ে সুন্দর মেয়েটার আচরণেও বন্য বন্য একটা ভাব রয়েছে। ছোট থেকেই, একেবারে সাত বছর বয়স থেকেই মাস্টারবাড়ির এই গাছে, ওই গাছে বিচরণ চালিয়ে গিয়েছে মেয়েটা। এতগুলো বছরে মেয়েটার সাথে টুকটাক ধমক, রাগারাগি করলেও এভাবে আঘাত করা হয়নি কোনোদিন। বড়ো সাহেব বেঁচে থাকতে প্রতিদিন মেয়েটার সাথে ঝগড়া করতেন, আবার প্রশ্রয়ও দিতেন। প্রশ্রয় না দিলে তো আর একটা মানুষ এরকম অবাধ বিচরণ চালাতে পারতো না, তাই না? গত দেড় বছরে বড়ো সাহেব মারা যাওয়ার পর ঝগড়াটা হস্তান্তর হয়েছে। বড়ো সাহেবের পরিবর্তে রেজওয়ান তীব্র খারাপ ব্যবহার করে মেয়েটার সাথে। তবে বনশ্রী তাতে পাত্তা দেয় না। বিচরণ চালাতে চালাতে অভ্যাস হয়ে গিয়েছে যে! মানুষ তো অভ্যাসের দাস। এতকাল এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র ধ্যান না দেওয়া কিশোরীর চোখ-মুখে আজ তীব্র অভিমান। কাশেম নরম কণ্ঠে কিছু বলতে নেবে, তৎক্ষণাৎ শাড়ির আঁচলে বাঁচিয়ে রাখা তেঁতুলগুলো মাটিতে ছুড়ে ফেললো বনশ্রী। চোখে পানি নিয়ে রেজওয়ানের চোখে চোখ রেখে ফ্যাসফ্যাসে গলায় আওড়ালো—

— খাইষ্টার ঘরের খাইষ্টা, পাইনশা তরমুজ। এই কারণেই তর বিয়ে হয় না, জীবনে হবেও না। অভিশাপ দিলাম। আর কোনোদিন আসবো না তর বাড়িতে। তর মরার তেঁতুলে আমার উষ্ঠা।

,,, বলতে বলতে ঠাস করে লাথি বসালো তেঁতুলগাছটায়। ফের ফুঁসে উঠলো মানব। চোখজোড়াতে অগ্নির দাবানল। পাত্তা দিলো না বনশ্রী। হনহন করে চলে যেতে গিয়েও কিছুটা পেছনের দিকে ফিরে এসে রেজওয়ানের থাকার ঘরটায় সজোরে লাথি বসালো। মেয়েটার এই কাণ্ডের জন্য রেজওয়ান কিংবা কাশেম কেউই প্রস্তুত ছিল না। বিষয়টা বুঝে আসতেই লাঠি হাতে তেড়ে এলো রেজওয়ান। বনশ্রীকে আর পায় কে? রেজওয়ানকে বকতে বকতে এক ছুটে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে।

***************

মাগরিবের নামাজ থেকে ফিরে হিসেবের খাতা নিয়ে বসেছে আরবিদ। শহর থেকে ফিরতে ফিরতে বিকাল গড়িয়ে যাওয়ায় আজ আর দোকানে যাওয়া হয়নি। কর্মচারীরাই সামলে নিচ্ছে বাকিটা। কিছুক্ষণের মাঝেই হয়তো দোকানও বন্ধ হয়ে যাবে। কাজ করার মাঝে হঠাৎ দরজার কাছ থেকে খটখট শব্দ ধেয়ে আসতেই মনোযোগ চ্যুত হলো আরবিদের। খানিক বিরক্ত হয়েই ফিরে তাকালো দরজার পানে। তৎক্ষণাৎ উঁকি দেওয়া খরগোশটা কেমন নিজেকে গুটিয়ে নিল। বাবার ঘরে যাবে না সে। মা তাকে পইপই করে মানা করে দিয়েছে, যেন বাবার ঘরে এক কদমও না ফেলে। কিন্তু অভ্যাস যে পাল্টানোর নয়। সে তো দিনের বেশিভাগ সময় মায়ের সাথেই এই ঘরেই থাকে। অগত্যা উঁকি দিয়েই পালাতে চাইলো। তবে পায়ের ব্যথায় মিইয়ে পড়লো বেচারি। মায়ের ঘর থেকে বাবার ঘরের দূরত্ব বিশাল। ভাঙা পা নিয়ে আসতে বেশ বেগ পোহাতে হয়েছে তাকে। তাই আর কদম বাড়াতে পারলো না। অসহায় হয়ে বসে পড়লো মেঝেতে। পুরো ব্যাপারটা সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে দেখলো আরবিদ। কী মনে করে যেন উঠে দাঁড়ালো। এগিয়ে গিয়ে দরজার বাইরে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বসে থাকা খরগোশটাকে হাতে তুলে নিতেই অবুঝ শুশিটা কী বুঝলো কে জানে! সে ছুটে যেতে চাইলো আরবিদের হাত থেকে। অথচ অন্য সময় কোলে ওঠার জন্য মুখিয়ে থাকে, আদর পাওয়ার জন্য বারবার পেছন পেছন ঘুরে। খরগোশটার হাবভাব দেখে মনে হলো, সে আরবিদের সাথে ভীষণ রাগ করেছে। কোনোমতেই আরবিদের কাছে থাকার ইচ্ছা নেই তার।

মুহূর্তেই ভাঁজ পড়লো মানবের কপালে। বিড়বিড় করে আওড়ালো — মায়ের মতোই অবাধ্য।

,,, আবারও ছুটতে চাইলো শুশি। আরবিদ পাত্তা দিলো না। কয়েক কদম এগিয়ে বিছানার মাঝখানটায় নামিয়ে দিলো। এই মুহূর্তে কিছুটা স্থির হলো শুশি। আবারও কী মনে করে হাত-পা গুটিয়ে বসলো আরাম করে।

ওকে বসতে দেখে আরবিদ এগিয়ে গিয়ে আলমারির ফটক খুলে কাগজে মোড়ানো দুটো প্যাকেট বের করে আবারও বিছানার কাছটায় ফিরে এলো। পরপরই বিছানায় বসে শুশিকে কোলে তুলে নিলো। প্যাকেটের ভেতর থেকে মলম আর ব্যান্ডেজের কাপড় বের করে মলমের ক্যাপটা খুলে একটু-খানি মলম নিয়ে আলতো করে ম্যাসাজ করে দিলো শুশির আঘাত পাওয়া পাটাতে। বাবার আদরে কেমন মিইয়ে গেলো খরগোশটা। গুটিশুটি মেরে পেটের কাছে মুখ গুঁজলো। অসহ্য রকমের বিরক্ত লাগা খরগোশটার কাণ্ডে আজ আর কিছু বললো না আরবিদ। অনেকটা সময় নিয়ে ম্যাসাজ করার পর পাটা ব্যান্ডেজে মুড়িয়ে দিয়ে কোল থেকে নামাতে চাইলো। তবে শুশি নামতে নারাজ। সে বোধহয় আর খানিকটা সময় বাবার আদর খেতে চায়।

আরবিদ শান্ত দৃষ্টিতে দেখলো তা। শুশি নামক খরগোশটা বেশ সুন্দর আর আদুরে। প্রতিনিয়ত খাওয়া-দাওয়ার ওপর থাকার দরুন আকৃতিও বেশ নাদুসনুদুস। সাদা ফকফকা লোমবিশিষ্ট শরীরটায় এক টুকরো ময়লা নেই। গলার কাছটায় ঝলঝল করছে স্বর্ণের লকেটবিশিষ্ট চেইন। চেইনটা দুটো প্যাঁচ দিয়ে পরিয়ে রাখা হয়েছে। সহসাই অনুমান করা যায়, এটা শুশির মায়ের চেইন। আরবিদ কাগজে মোড়ানো অপর প্যাকেটটা খুলে ভেতর থেকে কুশিকাঁটায় তৈরি করা একটা পায়েল বের করলো। পায়েলটা সবুজ সুতো দিয়ে বুনন করা। সুতোর চেইনটার ফাঁকে ফাঁকে সুতো দিয়ে তৈরি করা ছোট ছোট গোলাপের কুঁড়ি। এটা পায়েল নাকি কী, জানা নেই আরবিদের। তবে দোকানদার বলেছে এটা পায়েল। সেদিক থেকে সেও ধরে নিল, এটার নাম পায়েল।কেনার সময় কারোর নাম নিয়ে কেনা হয়নি। দোকানে দেখে পছন্দ হয়েছিল, তাই নিয়ে এসেছে। এখন কী মনে করে যেন শুশির গলায় থাকা চেইনটা খুলে কুশিকাঁটার পায়েলটা গলায় পরিয়ে দিলো।

#দেওয়ান_সাহেব ( পর্বঃ ৪.২)

#ট্রাজেডি_জাস্টিস

#লেখনিতে_রুপান্জলি

বহু প্রচলিত একটি বাক্য রয়েছে, জমজ ভাই-বোনদের মধ্যে কোনো একজনের জ্বর হলে নাকি অন্যজনেরও জ্বর হয়। তবে এতকাল এরকম কোনো কিছু না ঘটলেও আজ অদ্ভুত রকমভাবে ব্যাপারটা ঘটে গেল। সকাল থেকেই বনশ্রীর বেশ জ্বর। সকালবেলা মেয়েটা হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি ফিরে সেই যে বিছানায় গা হেলিয়ে দিয়েছিল, আর ওঠার নাম করেনি। সকালে খাওয়ার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে বিধায় কলি গিয়েছিল ডাকতে। ডাকতে গিয়ে অনুভব করল, মেয়েটার গা কাঁপিয়ে জ্বর এসেছে। বন্যটার এরকম হুটহাট জ্বর হয় না, শুধু খুব জোরে মারলেই জ্বরে ভোগে মেয়েটা। ঠিক এই কারণেই মেয়েকে মেরে ধরে শাসন করতে পারেন না আয়েশা বেগম। কাব্যকে প্রয়োজনের খাতিরে চর-থাপ্পড় দিতে পারলেও বন্যর বেলায় দু-চারটে ধমকেই সীমাবদ্ধ। যার ফলস্বরূপ মেয়েটা এরকম ছন্নছাড়া, উড়নচণ্ডীতে পরিণত হয়েছে। তবে কি আজ মেয়েটাকে কেউ সজোরে আঘাত করেছে? কে মারবে? স্কুলও তো বন্ধ ছিল, তাহলে মার খেল কোথায়? সত্যিই কি কেউ মেরেছে? নাকি এমনি জ্বর এসেছে? ভেবে পেলেন না আয়েশা বেগম। এদিকে সারাদিন বাড়ির দুই কর্তা দোকানে ছিলেন, আরবিদ ছিল শহরে, আফনান মাদ্রাসায়। বাড়িতে পুরুষ বলতে বাকি থাকে আরহান। তবে এই ছেলের নাগাল পাওয়া আর সুতো ছেড়া ঘুড়ি ধরতে পারা একই ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে ইদানীং। গ্রামে আসার পর থেকে সারাক্ষণ কোথা থেকে কোথায় যে ঘুরে বেড়ায়, সেই সম্পর্কে ধারণা নেই কারও। বিষয়টা নিয়ে যদিও মাহমুদুল দেওয়ান ও মাহবুবুর দেওয়ান ছেলের প্রতি তীব্র অসন্তুষ্ট। তবে আরবিদ সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, আরহানকে যেন এখন কেউ কিছু না বলে। আগে গ্রামে নিজেকে স্থির করুক, জীবনটা উপভোগ করুক। লাগাম টানার সময় এলে আরবিদ নিজেই ভাইয়ের লাগাম টেনে ধরবে। অগত্যা তাকে আপাতত কেউই জীবন নিয়ে তাড়া দিচ্ছে না।

এদিকে বাড়ির বউরা যে স্বামীর অনুমতি ব্যতীত মেয়েকে নিয়ে ডাক্তারখানায় যাবেন, তারও ফুরসত নেই। দুই কর্তা পইপই করে মানা করে দিয়েছেন, বাড়ির মেয়ে-বউরা যেন তাঁদের ছাড়া বাজারে পা না রাখেন। মেঘশ্রীর ক্ষেত্রেও এই নিয়মখানা বরাদ্দ, যার ফলস্বরূপ বনশ্রীকে আর ডাক্তারখানায় নিয়ে যাওয়া হয়নি। মাঝে একবার কর্মচারীদের দিয়ে বাজারে খবর পাঠিয়েছিলেন রাহিমা বেগম। কর্মচারীরা ওষুধ হাতে ফিরে এসেছিল। সেই ওষুধ খাওয়ানোর পর দুপুর নাগাদ জ্বরটা কমলেও আবার সন্ধ্যা নাগাদ গা কাঁপিয়ে জ্বর উঠেছে। সেই সঙ্গে বমি, মাথা ঘোরা, চোখ-মুখ লাল হয়ে যাওয়া, আরও নানান রকম সমস্যা দেখা দিয়েছে। এই একবেলার জ্বরেই কেমন মুচড়ে গিয়েছে মেয়েটা। অপরদিকে বন্যাটার দেখাদেখি সন্ধ্যা নাগাদ কাব্যটার শরীরেও জ্বরের আবির্ভাব ঘটেছে। তবে মেয়েটা ওষুধ খেতে নারাজ। এমনকি দুদিন ধরে ঠিকঠাক খাবারও খাচ্ছে না। সে নিয়ে আয়েশা বেগম কম রাগারাগি করেননি, কিন্তু কাব্য কি তা কানে তোলার মানুষ? মেয়েটা বকা-ঝকা, মার সবকিছু সহ্য করে নীরবে কাঁদবে, তাও নিজের জেদের বাইরে এক পা বাড়াবে না। দেওয়ান বাড়ির রক্ত বলে কথা, এদের তো শিরায় শিরায় জেদ। মেয়ে হোক কিংবা ছেলে, এই দেওয়ান বংশের ছেলে-পুলের জেদের কাছে পরের বাড়ির মেয়েরা নিতান্তই তুচ্ছ।

,,,সময়টা রাত আটটা নাগাদ। আকাশে চাঁদ নেই। থাকলেও তা কুয়াশার চাদরে ঢাকা। মাঝেমধ্যে কুয়াশার ফাঁক গলে একটুখানি দেখা দিলেও খানিক পরে আবারও ডুবে যাচ্ছে কুয়াশার চাদরে। উত্তর দিক থেকে মৃদুমন্দ শীতল হাওয়া বইছে। সেই হাওয়ার শোঁ-শোঁ শব্দ এসে বিরহের ধ্বনি সৃষ্টি করছে কাব্যশ্রীর কানে। শরীরে তীব্র জ্বর নিয়েই বারান্দায় ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে কাব্যশ্রী। চোখ দুটো পানিতে টইটম্বুর। খানিক পরপর তা গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে। জ্বর ও শীতের মিশেলে শরীর কাঁপছে অবিরত, তবে তাতে ভাবাবেগ নেই কিশোরীর। শীত নিবারণের জন্য গায়ে একখানা শাল পর্যন্ত জড়ায়নি। মনে জমা অভিমান ও বুকের বাঁ পাশে তৈরি হওয়া জখমগুলোর কাছে বোধহয় এই শরীর কাঁপানো জ্বর আর শীতের থরথরে কাপুনিটুকু কিছুই না।

,,,,বিকাল নাগাদ শহর থেকে সবার জন্য একগাদা জিনিসপত্র নিয়ে হাজির হয়েছেন আরবিদ দেওয়ান। কাব্যর সামনেই যার যারটা তাকে তাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন, তবে সেখানে কাব্যর জন্য কিছু ছিল না। বিষয়টাতে অবশ্য কোনো ভুল নেই। তিনি তো সবার মতো করেই তাকেও জিজ্ঞেস করেছিলেন, তার কিছু লাগবে কিনা। সে তো না করে দিয়েছে। না করে দেওয়ার পরও কেন আনবেন তিনি? না আনাটাই বরং স্বাভাবিক। তবুও মন যে মানে না! মন পোড়ে, অভিমান জমে, কাঁদতে মন চায়। তাই তো ঘটা করে কাঁদতে বসেছে সে। কাঁদতে হলে যে শব্দ করে কাঁদতে হবে, এমন তো কোনো কথা নেই। নীরব কান্নায় বড্ড অভ্যস্ত কিশোরী। কান্নারত কাব্যশ্রীর ভাবনার মাঝে এক পা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পায়ের কাছে এসে দাঁড়াল শুশি। মায়ের মনোযোগ না পেয়ে নিজের উপস্থিতি জানাতে ছোট ছোট দাঁত দিয়ে কামড় বসাল মায়ের পরনে থাকা শাড়ির অংশে। মুহূর্তেই চমকে নিচের দিকে দৃষ্টিপাত করল কাব্যশ্রী। আধো অন্ধকারে সাদা ফকফকা খরগোশটাকে নজরে আটকাতেই নাক টেনে দুহাতে চোখ মুছে অল্প ঝুঁকে ওকে কোলে তুলে নিল। পাঁচ আঙুলের সাহায্যে গলার কাছটায় আদর করতে নিলে শুশির গলায় নতুন কোনো কিছুর আভাস পেতেই ভ্রু কুঁচকে নিল কিশোরী। আধো অন্ধকারে বুঝতে পারল না জিনিসটা কী। তাই হাত বাড়িয়ে খোলা বারান্দার রেলিংয়ে রাখা হারিকেনের আলোটা অল্পবিস্তর বাড়িয়ে দিল। সহসা জ্বলজ্বল করে উঠল শুশির গলায় থাকা কুশিকাঁটার মালাটা। প্রথম দিকে মালাটা দেখে মুগ্ধ হলেও পরমুহূর্তেই আঁতকে উঠল কিশোরী। শুশির গলাটা ভালো মতো পরখ করতে করতে অবুঝ প্রাণীর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ল — হায় আল্লাহ! চেইন কই, শুশি? এটা তোকে কে দিয়েছে? আমার চেইন কার কাছে রেখে এসেছিস তুই? আম্মা জানতে পারলে আমার কপালে মাইর আছে। ওফফ! বলবি তো কিছু, নাকি?

অবুঝ শুশি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। সে কী বলবে? সে কি কথা বলতে পারে নাকি? এদিকে চিন্তিত কাব্য বিচলিত হয়ে শুশির সম্পূর্ণ শরীর পরখ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, যদি চেইনটা কোথাও আটকে থাকে। পরখ করতে গিয়ে শুশির পায়ে বাঁধা ব্যান্ডেজে নজর আটকাতেই বুঝতে বাকি রইল না, চেইনটা বর্তমানে কার কাছে আছে। থাকুক তবে। আম্মাকে বলবে যেন উনার থেকে নিয়ে নেয়। সে আপাতত ওই মুখো হবে না। আগে যেমন আড়ালে-আবডালে থেকে কাজবাজ করে দিত, তখন তো উনি টেরও পেতেন না। এখন না হয় অমনিই করে লুকিয়ে-চুরিয়ে সব কাজ করে দেবে। দিনশেষে উনার মনমাফিক কাপড় আর ঘর হলেই তো হলো। এমনিতেও তার উপস্থিতি উনার বিরক্তির কারণ। এভাবে প্রতিনিয়ত উনাকে বিরক্ত করা সত্যিই কি প্রয়োজন? ভাবতে গিয়ে কিশোরীর চোখজোড়া আবারও ভিজে উঠল। শুশির ব্যান্ডেজ করা পায়ে আলতো করে হাত বুলাতে বুলাতে কেমন আফসোসের স্বরে আওড়াল — তোর ভাগ্যের তারিফ করতে হয়, শুশি। পায়ে সামান্য আঘাত পেয়েছিস বিধায় তার হাতের মলম জুটেছে তোর কপালে। এদিকে আমায় দেখ। অন্তরে প্রতিনিয়ত জখম সৃষ্টি হওয়ার পরও তার নজর নেই। অথচ এই জখমের মালিক সে নিজেই।

অবুঝ শুশিটা মায়ের কষ্ট বুঝল কিনা জানা নেই। তবে সে কেমন ছটফট করে মায়ের বুকে মিশে গেল। কাব্যশ্রীও হাত বুলিয়ে দিল ফর্সা লোমকূপে। এমন সময় হন্তদন্ত পায়ে ছুটে এলো আফনান। একেবারে কাব্যর ঘর পেরিয়ে বারান্দায় এসে থামল। জোরে জোরে দুটো দম নিয়ে তাড়াহুড়োর কণ্ঠে আওড়াল— কাব্য আপা! বড়ো ভাইজান তোমাকে নিচে ডাকছে, ডাক্তারখানায় যাওয়ার জন্য।

আফনানের কণ্ঠ শুনে ফিরে তাকাল কাব্য। কানে বাজল আফনানের বলা কথাটা, বড়ো ভাইজান বলেছে। কেন বলেছে? আর বললেই বা তাকে শুনতে হবে কেন? শুনবে না সে। অগত্যা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে শুশির গায়ে হাত বুলানোতে মত্ত হলো।

আফনান আবারও ডাকল নাম ধরে। এই পর্যায়ে নরম কণ্ঠে উত্তর করল কিশোরী — আমার জ্বর নেই। ভালো আছি আমি। বন্য আপাকে নিয়ে যেতে বল। আমি যাব না।

আফনান কি তা মানার মানুষ? সে জানে কাব্য আপার খুব জ্বর। শরীরের কাঁপুনি দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কেমন থরথর করে কাঁপছে, দেখো। তবে নিজে জোর দিয়ে কিছু বলতে পারল না। শুধু আলতো করে টেনে ধরল আপার হাতখানা। সতর্ক কণ্ঠে বলল — ভাইজান রাগ করবেন, আপা। দয়া করে চলো।

রাগ করবে? কেন রাগ করবে? তার শরীর, তার জ্বর, তার যেতে ইচ্ছা করছে না, তাই সে যাবে না। এতে দেওয়ান বাড়ির বড়ো পুত্র কেন রাগ করতে যাবেন? কাব্যর ইচ্ছা করল উচ্চস্বরে চিৎকার করে কথাগুলো বলতে। কিন্তু বলতে পারল না। বলার সঙ্গে সঙ্গে দু-চারটে ঝড় বয়ে যাবে তার ওপর দিয়ে। মা, বিনু ফুপু ছেড়ে কথা বলবেন না। তাঁদের মতে মেয়েরা তো পুরুষের দাসী। তাদের আবার উচ্চস্বরে কথা বলার কী? খাইয়ে-পরিয়ে নিজের পরিচয়ে যে বড়ো করছেন, এই অনেক। মাথায় রাগ চাপলেও প্রকাশ করতে পারল না মেয়েটা। শুধু শক্তি খাটিয়ে আফনানের থেকে হাত ছাড়িয়ে শক্ত কণ্ঠে আওড়াল — তোমাকে যেতে বলেছি, আফনান। যাও।

আফনান বুঝল, কাব্য আপার মন ভালো নেই কিংবা কোনো কারণে খুব রেগে আছে। নয়তো কাব্য আপা কখনোই তাকে এভাবে 'তুমি' সম্বোধন করে কথা বলে না। এই মুহূর্তে চাইলেও আপাকে নিয়ে যেতে পারবে না সে। নিতে হলে বড়ো ভাইজান কিংবা বড়ো মামিকে এসে নিয়ে যেতে হবে। অগত্যা চুপচাপ বেরিয়ে গেল ছেলেটা। কাব্যশ্রী এবার বারান্দার ফাঁক গলিয়ে বাড়ির গেটের দিকে তাকাল। এই তো বাড়ির আঙিনায় গরুর গাড়ি এসে থেমেছে। নিশ্চয়ই ডাক্তারখানায় যাওয়ার জন্য? কাব্যশ্রী যাবে না। জ্বর হয়েছে, বেশ হয়েছে। আরও হোক। এই জ্বরেই তার মরণ হোক। তারপর ওই ব্যক্তিটাও বুঝুক, কাব্য ছাড়া তার দুনিয়া ঠিক কতখানি কঠিন। এত সহজে তো নিশ্বাস নিতে পারবেন না। হারিয়ে গেলে ফেলে রাখা খেলনার জন্যও মানুষ আফসোস করে। সে তো একখানা জলজ্যান্ত কাব্য।

************

বসার ঘরে বেতের সোফায় মায়ের কাঁধে মাথা হেলিয়ে বসে আছে বন্য। মেয়েটার জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে প্রায়। তাদের থেকে গজ কয়েক দূরে বসে রাতের জন্য রুটি বেলছেন রাহিমা বেগম। বিনু ফুপু তাঁর পাশে বসেই রুটির গোল গোল গোলা বানিয়ে গামলায় রাখছেন আর বন্যকে বকে যাচ্ছেন। মেয়েটা বড়ই ছন্নছাড়া। এভাবে হাপুস-হুপুস করে চললে তো জ্বর বাঁধাবেই, এ আর অবাক হওয়ার কী হলো? সারাদিন দেওয়ান বাড়িতে এই-ই চলে। বাড়িতে কিছু হতে না হতেই বিনু ফুপুর আহাজারি শুরু। মায়ের এই খিটখিটে স্বভাবে বড়ই অতিষ্ঠ নিবেদিতা, তবে মুখ তুলে কিছু বলার সাহস নেই। কখন না জানি আবার তার পিঠে বেলনের বাড়ি পড়ে যায়। মেঘশ্রীও এতক্ষণ বোনের পাশেই বসে ছিল, এখন পা বাড়াল ওপরের দিকে। কখন না জানি বিনু ফুপু আবার বন্যর কথা ছেড়ে তাকে নিয়ে পড়েন। ভাগ্যিস সন্ধ্যা থেকে ভাইজান বাড়িতে উপস্থিত রয়েছেন, নয়তো ফুপু এতক্ষণে ঠিকই তার কথা তুলতেন। হাজারটা কথা শুনাতেন। হয়তো বিয়ে করে না বলে নানান ধরনের কটাযুক্ত বাক্যও ছেড়ে দিতেন তার ওপর। এখন যেহেতু ভাইজান চলে যাবে, সেও না হয় ওপরে চলে যাক। আবার বন্য, কাব্য ডাক্তারখানা থেকে ফিরলে নিচে আসা যাবে। ভেবেই ধীর কদমে সিঁড়ি পার করতে থাকল। মেঘশ্রীর ওপরে ওঠার মাঝেই সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে নিচে নামল আফনান। ছেলেটাকে হুড়মুড়িয়ে নামতে দেখে সবার দৃষ্টি স্থির হলো তার দিকে। সবাই আফনানের দিকে তাকিয়ে থাকলেও আফনান কারও দিকে তাকানোর প্রয়োজন মনে করল না। সে ছুটে গিয়ে একদম বড়ো ভাইজানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। পরপর হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—

— ভাইজান! কাব্য আপার ভীষণ জ্বর, একদম পুড়ে যাওয়ার মতো। দেখুন, আমার হাত এখনো গরম হয়ে আছে। কিন্তু আপা বলছে, তার নাকি জ্বর নেই। ডাক্তারখানায় যাবে না। বন্য আপাকে নিয়ে যেন আপনি চলে যান।

চোখ-মুখ শক্ত রেখে পেছনে দুহাত বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা আরবিদের মাঝে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। সে শুধু চোখ উঠিয়ে এক পলক ওপরের তলায় তাকাল। তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তাকিয়ে থেকেই চাচির উদ্দেশে গম্ভীর কণ্ঠে আওড়াল — আমি বাইরে অপেক্ষা করছি। দুই মেয়েকে নিয়ে তবেই আসুন, ছোট আম্মা।

বলেই শক্ত কদমে বাইরে দিকে হাঁটা দিল। মুহূর্তেই রাগে ফেটে পড়লেন আয়েশা বেগম। মেয়েটা এবার তাঁর হাতে মার খাবে। এতটা অবাধ্য, অসভ্য মেয়ে-ছেলে তিনি এখনো পর্যন্ত দেখেননি। শুধু কি দেওয়ান বংশের মান রাখতেই মেয়েটাকে এত জেদি হতে হলো? এর এই জেদ কে সহ্য করবে? কে দাম দেবে তাকে? মেয়েটা কি জানে না, সে একটা মেয়ে? মেয়েদের এভাবে তিন বেলা তোষামোদ করা হয় না। মেয়েদের হতে হয় জলের মতো। তাদের যেই পাত্রেই রাখা হোক না কেন, সেই পাত্রকেই আপন মনে করে জীবন পার করতে হয়। মেয়েদের অত আকৃতি ধরতে নেই, জেদ করতে নেই, সাহস দেখাতেও হয় না।

-----------

,,,আফনান চলে যেতেই আবারও হারিকেনের আলো শূন্যের কোটায় নামিয়ে দিয়েছিল কাব্য। খুব একটা আলো নেই, তাকে দেখতে পারারও সুযোগ নেই। তবুও অনুভব করল, গরুর গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সুষ্ঠব মানব-এর নজর তার বারান্দার দিকেই স্থির। কেমন শক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে, যেন এই দৃষ্টি দিয়েই ঝলসে দেবে তার অধঃপ্রান্ত। কাব্যশ্রীও নজর সরাল না। সে দেখতে চায়, লোকটা তাকে আর কত পদ্ধতিতে জ্বালাতে পারে, পোড়াতে পারে, তারপর নিঃশেষ করতে পারে।

কাব্যর তাকিয়ে থাকার মাঝেই পিঠে ধুম করে কিল পড়ল। মুহূর্তেই নড়ে উঠল মেয়েটা। ব্যথা সহ্য করতে না পেরে ঝুঁকে গিয়ে বারান্দার রেলিং খামচে ধরল। তৎক্ষণাৎ ভয়ে মায়ের কোল থেকে লাফিয়ে নিচে নেমে পালাল শুশি। কাব্যশ্রী একটুখানি ব্যথাতুর শব্দও করল না। তখনো তার দৃষ্টি মানব-এর পানেই স্থির। যেন দৃষ্টি দ্বারাই বোঝাতে চাচ্ছে— আমার জীবনের যত যন্ত্রণা, যত দুঃখ, সবকিছুর কারণ আপনি। আপনি আমায় প্রতিনিয়ত জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিচ্ছেন, অথচ ভালোবাসা কোনো পাপ ছিল না।

,,,,মনভরা অভিমান, অভিযোগ নিয়ে তাকিয়ে থাকা কাব্য অনুভব করল, লোকটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কী নিদারুণ প্রত্যাখ্যান! এতখানি প্রত্যাখ্যান সত্যিই কি সে প্রাপ্য? মানুষ এত পাষাণ হয় বুঝি? কাকে বিয়ে করবেন তিনি? কাকে ভালোবাসবেন? সে কাব্যর চেয়েও বেশি ভালোবাসতে পারবে উনাকে? সত্যিই পারবে? না তো। তার মতো করে কেউ ভালোবাসতে পারবে না দেওয়ান সাহেবকে। তারপরেও উনার এত উপেক্ষা? কী চান উনি? কাব্যর ভাবনার মাঝেই হাতের কবজিতে টান পড়ল। কানে এসে বাড়ি খেল মায়ের কর্কশ ধ্বনি—

— নাটক পেয়েছিস? থাপ্পড়ে দাঁতের পাটি সমান করে দেব। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে, ডাক্তারখানায় যাবেন না তিনি! ছেলেটা নিজের কাজবাজ রেখে লোক লাগিয়ে গাড়ি আনিয়েছে, মহারানি এখন যাবেন না! তাকে পালঙ্কে করে নিয়ে যেতে হবে।

***********

তালপাতার মাদুরির ওপর বসে সাদা পাতায় কালির খসখসে শব্দ তুলে একেকটা অঙ্ক সমাধান করে যাচ্ছে রুপান্মিতা। মা খানিক দূরে বসে কাঁথা সেলাই করছেন। রুপা অঙ্ক করতে গিয়ে মাঝেসাঝে আটকে গেলেই মাকে শুধাচ্ছে। পাঠশালায় পড়াকালীন ছোট্ট ফাতিমা বেশ মেধাবী ছিলেন। বাচ্চা বয়স থেকে কিশোরী বয়স পর্যন্ত তিনি বরাবর ক্লাসে ফার্স্ট হয়ে এসেছেন। তাই মেয়েকে অঙ্ক কিংবা অন্যান্য বিষয়ে পড়াতে খুব একটা সমস্যায় পড়তে হয় না তাকে। কাঁথা সেলাই করার ফাঁকে মেয়েটাকে এক ঝলক দেখে নিলেন ফাতিমা বেগম। রুপান্মিতা মেয়েটা শ্যামলা হলেও চেহারার ভাঁজ বেশ মায়াবী। হুট করে চোখে লাগার মতো না, তবে একবার চোখে লেগে গেলে এই রূপ ভোলার মতোও নয়। একেবারে অন্তরে দাগ কেটে রেখে দেওয়ার মতো রূপ। এখনো পর্যন্ত যে মেয়েটাকে গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখেছে, সেই তীব্র মনোযোগে নিজেকে হারিয়েছে। রুপার যখন নয় বছর বয়স, তখন থেকেই বাড়িতে একটার পর একটা বিয়ের প্রস্তাব আসা শুরু হয়েছিল। তবে ফাতিমা বেগম সেসবের কর্ণপাত করেননি কোনোদিন। নিজের জীবন থেকে চরম শিক্ষা পেয়েছেন তিনি। তাই মেয়েকে এত তাড়াতাড়ি, মেয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দেবেন না। মেয়ে বড়ো হোক, লেখাপড়া শেষ করুক, কম করে উচ্চমাধ্যমিকটা অন্তত দিক, তারপর না হয় বিয়ের দিকে এগোনো যাবে। ভেবেই আবারও নিজের কাজে মনোযোগ দিলেন ফাতিমা বেগম। মনোযোগের সহিত অঙ্ক কষতে থাকা রুপান্মিতা অনুভব করল, তার বাইরে যাওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, শীতের রাত হওয়ায় প্রচুর ঘুম পাচ্ছে, সেই সঙ্গে একটু শৌচাগারেও যাওয়া প্রয়োজন। অগত্যা খাতার ওপর কলমটা রেখে তালপাতার মাদুরি থেকে উঠে দাঁড়াল রুপান্মিতা। মায়ের উদ্দেশে বলল — আম্মা! আমি একটু বাইরে যাই, চোখে-মুখে পানি দেব।

ফাতিমা বেগম চোখ তুলে না তাকিয়েই মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানিয়ে বললেন — সঙ্গে করে হারিকেন নিয়ে যা।

প্রতিউত্তর করল না রুপা। তবে মায়ের কথামতো নিজের ঘরে গিয়ে হারিকেনে আগুন জ্বালিয়ে সেটা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। দরজা খুলে বাইরে পা রাখতেই উত্তর হতে আসা শীতল হাওয়ায় কেঁপে উঠল রুপার শরীরখানা। তার পরনে পুরোনো একখানা শাড়ি, তার ওপর পুরোনো জোড়া তালি দেওয়া শাল। শীতের প্রকোপ বাড়ন্ত হওয়ায় সেই শাল ভেদ করেই কিশোরীর শরীরটা হিম করে তুলছে অনবরত। রুপা পরনের শালটা ভালো মতো টেনে-টুনে একবার আড়চোখে আব্বার ঘরটার দিকে তাকাল। আলো বন্ধ। নিশ্চয়ই বাড়ি নেই। হয়তো ছাইপাঁশ জোগাড় দিতে গিয়েছেন। রুপা মন দিল না তাতে। এগুলো দেখলে এখন আর তার কষ্ট লাগে না। গোয়ালঘর থেকে কালাইয়ের ডাক ভেসে আসছে। হয়তো তারও শীত লাগছে। কালাই মূলত একটা ছাগল। এমনিতে রুপাদের কয়েকটা ছাগল রয়েছে, তবে তাদের মধ্যে এই ছাগলটা রুপার ভীষণ প্রিয়। দেখতে একদম কুচকুচে কালো হওয়ায় রুপা এর নাম দিয়েছে কালাই। ছাগলটা খুব একটা কষ্ট সহ্য করতে পারে না। সামান্য পরিমাণ কিছু হলেই ডাকাডাকি শুরু করে দেয়। তাই কালাইকে নিয়েও খুব একটা ভাবল না মেয়েটা। প্রথমেই এগিয়ে গেল শৌচাগারের ভেতরে। হারিকেনটা ভেতরে রেখে বদনা হাতে ফিরে এলো। কল চেপে বদনা ভরে আবারও ফিরে গেল শৌচাগারে। সময় নিয়ে শৌচকর্ম শেষ করে হারিকেন হাতে দরজা খুলে বের হতেই আকস্মিক টান পড়ল হাতে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পিঠ ঠেকল শৌচাগারের সঙ্গে থাকা বহু বছরের পুরোনো মোটা নিমগাছটায়। রুপান্মিতা ভয়ে চিৎকার করতে নিতেই তৎক্ষণাৎ ওর মুখ চেপে ধরল কেউ। মুহূর্তেই গোঙিয়ে উঠল কিশোরী। অনুভব করল, তার খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে কেউ। মানুষটা বেশ লম্বা, তাও পুরুষ মানুষ। অজানা আশঙ্কায় আঁতকে উঠল রুপান্মিতা। তড়িঘড়ি করে হারিকেন উঁচিয়ে ধরতেই কানে এলো পুরুষালি গম্ভীর স্বর — কী ব্যাপার? ফকিরের মেয়ে রূপকুমারী! আমার শাল তো ফিরিয়ে দিলে না। ওই শাল মেরে দেওয়ার ধান্দা করছ নাতো? ধান্দা কিন্তু আমিও জানি। ধান্দা করে যদি তোমায় আঁটকে দিয়ে এখন গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখি... পালাতে পারবে?

রুপান্মিতা শুনল না সেসব। সে তাজ্জব বনে তাকিয়ে রইল তার দিকে ঝুঁকে থাকা মানুষটার দিকে। এই লোক এখানে কী করছে? এত রাতে তাদের বাড়িতে কী কাজ উনার? উনি কি এত রাতে শাল নিতে এসেছেন? মায়ের কাছে শালের খোঁজ করত কী? সর্বনাশা কাণ্ড! মা জানলে তাকে আস্ত রাখবে নাকি? মেরে-মুরে অর্ধেক করে দেবে না? বাড়ি থেকে বেরও করে দিতে পারে, ভরসা নেই। এরকম হাজারটা ভয়, ভীতি, আশঙ্কা, প্রশ্ন নিয়ে ডাগর ডাগর চোখে আরহানের দিকে তাকিয়ে রইল রুপা। আরহানের দৃষ্টিও রুপার চোখেই স্থির। হারিকেনের লাল আলোয় শ্যামলা মুখখানি চকচক করছে। ঘন পাপড়িবিশিষ্ট চোখজোড়াতে গাঢ় কাজল। ওই কাজলে ঘুমের ওষুধ কিংবা নেশাদ্রব্য মেশানো রয়েছে বোধহয়। আরহানের চোখ জ্বলে উঠল। নিজেকে মাতাল মনে হলো, তাও চোখ সরাল না মানব। ওইভাবেই তাকিয়ে রইল একদৃষ্টিতে। নিমগাছে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক কিশোরী, তার হাতে হারিকেন। কিশোরীর অনেকটা কাছে এসে তার দিকেই ঝুঁকে আছে ছাব্বিশ বছর বয়সী যুবক। দুজনার দৃষ্টি দুজনাতে স্থির। দৃশ্যটি বড়ই মধুর, অথচ তা তেতো ঠেকল রুপার কাছে। সে চিন্তায় চিন্তায় মরে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে মা আরহানকে দেখতে পেলে কী ভাববে? মা না দেখুক, অন্য কেউ দেখলে? বদনাম হবে না তার? রুপান্মিতা ফের গুঙিয়ে উঠল। কিছু বলার জন্য এক হাতে নিজের মুখের ওপর থেকে আরহানের হাতটা সরাতে চাইল, তবে সরাতে পারল না। আরহান ঠায় শক্ত করে ধরে রেখেছে তার মুখ। এমতাবস্থায় হাসান ফকিরের ঘরের পেছন থেকে টিনের ওপর আছড়ে পড়লে যেমন শব্দ হয়, তেমন শব্দ হলো। আকস্মিক শব্দে সেদিকে তাকাতে চাইল রুপা, অথচ আরহান তা হতে দিল না। মুহূর্তেই ঘুরিয়ে নিল ওকে। অকারণেই টেনে মাথাটা বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিল। এতোটাই শক্ত করে ধরেছে যে রুপান্মিতা চাইলেও সরতে পারবে না একচুল। এই পর্যায়ে কেমন থমকে গেল রুপা। শরীর, মন কেমন অসাড় হয়ে এলো। এতক্ষণকার ভয় আর শীতের মিশেলে হওয়া কাঁপাকাঁপিও থেমে গেল এক মুহূর্তে। তবে সে না কাঁপলেও সামনের মানুষটা কাঁপছে। পরনে শীত নিবারণের কিছু নেই যে, তাই হয়তো এভাবে কাঁপছেন। পুরুষালি শরীরের ঘ্রাণ আর আতরের ঘ্রাণে রুপার নাকটা ধাঁধিয়ে এলো। রুপা অনুভব করল, আরহানের হৃদগতি অস্বাভাবিক। ধুপধাপ শব্দ হচ্ছে। সেই ধুপধাপ শব্দ শুনে যেন আরও স্থির হয়ে পড়ল কিশোরী।অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও এই প্রথম কোনো পুরুষ ছুঁয়েছে তাকে। তবে এই ছোঁয়ায় কোনো অসৎ উদ্দেশ্য টের পেল না রুপা। শুধু টের পেল নিজের হতভম্বতা।

ওর এই স্থিরতার মাঝেই ঘর থেকে ডেকে উঠলেন ফাতিমা বেগম — কী হয়েছে? রুপ! এতক্ষণ সময় লাগছে কেন? কোনো সমস্যা? আম্মা আসব?

এই সময়টাতে মায়ের আগমনী বার্তায় আরও ভয় পেল কিশোরী। তাড়াহুড়ো করে আরহানের থেকে দূরে সরতে চাইতেই দূরে সরে গেল আরহান। সঙ্গে টেনে নিল রুপার গায়ে পেঁচিয়ে রাখা পুরোনো, জোড়া তালি দেওয়া শালটা। ওকে কিছু বলার ফুরসত না দিয়েই সেটা গলায় পেঁচাতে পেঁচাতে ফিসফিসানো স্বরে আওড়াল — যেদিন আমার শাল ফেরত পাব, সেদিনই এটা ফেরত দেওয়া হবে তোমায়, ফকিরের মেয়ে রূপকুমারী।

বলেই হন্তদন্ত পায়ে বেরিয়ে গেল ছেলেটা। রেখে গেল বোকার ন্যায় হারিকেন হাতে দাঁড়িয়ে থাকা রুপা নামক কিশোরীকে। মেয়েটা এখনো ঘোরের মাঝেই ডুবে আছে। কিছুক্ষণের মাঝে এসব কী থেকে কী হয়ে গেল তার সঙ্গে? সে না শৌচাগারে গিয়েছিল? তাহলে এই লোক এলো কোথা থেকে? আর কীসব করে গেল?

ঝরের বেগে এলো, কিছু বুঝে ওঠার আগেই জড়িয়ে ধরল, এমনকি যাওয়ার আগে তার শালটাও নিয়ে গেল। এই পর্যায়ে ধ্যান ভাঙল কিশোরীর। আঁতকে উঠে মুখ চেপে ধরল। এই যা! এখন কী হবে? লোকটা তো শাল নিয়ে চলে গেল। এখন মা যদি জানতে চায়, শাল কোথায়, তাহলে কী জবাব দেবে সে? এটা কেমন বিপদ হলো? কেন যে সেদিন লোকটার শাল নিজের সঙ্গে করে নিয়ে এলো সে! এখন একটা বড়সড় ঝামেলা না হওয়ার আগে বোধহয় বিষয়টা মিটমাট হবে না। আর যদি ঝামেলা হয়ও, তাহলে কীভাবে সামাল দেবে সে?

**********

ডাক্তারখানা থেকে বের হতে হতে রাত বাজল দশটা ৫৩ মিনিট। শুক্রবার হওয়ার দরুন এখনো নবীনগর হাটে ভালোই জনমানুষের ভিড় রয়েছে। সেই ভিড় ঠেলে আগে আগে হাঁটছে ময়নুল। তার পেছনে বন্যকে দুহাতে আগলে ধরে এগিয়ে যাচ্ছেন আয়েশা বেগম। মেয়েটার শরীর বেশ দুর্বল, একা একা হাঁটতে পারছে না। ডাক্তার পইপই করে বলে দিয়েছেন, মেয়েটা যেন আগামী সপ্তাহখানেক দৌড়ঝাঁপ না করে। আয়েশা বেগম নিজেও এবার ভালো রকমভাবে মন স্থির করেছেন। মেয়েটা সুস্থ হোক খালি। সুস্থ হলেই চেপে ধরবেন তিনি। এসব বন-বাদাড়ে ছুটোছুটি এবার বন্ধ করা প্রয়োজন। নয়তো একদিন দেখা যাবে, বন-বাদাড়ে ঘুরতে ঘুরতে বড়সড় কোনো অঘটন ঘটিয়ে বসে আছে। মা ও বড়ো আপার পেছন পেছন পিপীলিকার ন্যায় হাঁটছে কাব্য, আর তার পেছন পেছন পিঠপিছে দুহাত বেঁধে এগিয়ে আসছে মোহাম্মদ আরবিদ দেওয়ান। মানব-এর চলন ভারী, দৃষ্টি শক্ত। পরনে প্রতিদিনকার ন্যায় কাব্যর প্রস্তুত করে দেওয়া পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি। লম্বা-চওড়া গড়নের মানবটা খুব সুন্দর করে লুঙ্গি পরে, একদম টাখনুর ইঞ্চিখানেক ওপরে। লুঙ্গির ভাঁজ বরাবর বড়ই সুনিপুণ, আর চারপাশ একদম সমান হয়। পায়ে এক জোড়া চামড়ার স্যান্ডেল, হাতে রুপার ব্রেসলেট, পাঞ্জাবির ওপরে সুন্দর একখানা শাল। প্রতিদিনকার ন্যায় আজকেও এই গোছানো সাজগোজে অসম্ভব রকমের সুন্দর লাগছে লোকটাকে। তবে আজ আর আহাম্মকের ন্যায় তাকিয়ে থাকল না কাব্য। নিজেকে সংযত করল। অভিমান করতে করতে এবার যে তার অভিমানি মনটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তার এবার একটু ছুটির প্রয়োজন।

এসব নানাবিধ ভাবনায় বিভোর কাব্য অনুভব করল, তার চোখজোড়া কেমন আবছা ঠেকছে। চারদিক কেমন অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। সে চোখ কুঁচকে আরও এক কদম এগুতেই মাথাটা কেমন চক্কর দিয়ে উঠল। তৎক্ষণাৎ নিজের ভারসাম্য ধরে রাখতে না পেরে পড়ে যেতে নিল কিশোরী। তার আগেই আবিষ্কার করল, কেউ তাকে আটকে দিয়েছে। বাহুতে আকস্মিক টান পড়ায় কাব্যশ্রী ছিটকে গিয়ে আছড়ে পড়ল সেই মানব-এর বুকে। সহসা আবারও ভারসাম্য হারাল কিশোরী। বাম হাতটা পৌঁছাল মানব-এর কোমরের পেছন দিকে। সেদিকটা আঁকড়ে ধরতেই তৎক্ষণাৎ ঘ্যাচ করে শব্দ হলো। মুহূর্তেই ব্যথায় চিৎকার করে উঠল কাব্যশ্রী। হাতের ব্যথায় লাফিয়ে উঠল খানিক, তবে সুবিধা করতে পারল না। ততক্ষণে কাব্যকে আরও শক্ত করে আগলে নিল আরবিদ। নিমিষেই কঠিন ধাঁচের মানুষটা কেমন অশান্ত হয়ে উঠল। অধৈর্যের ন্যায় কাব্যশ্রীকে পরখ করতে করতে আওড়াল—

— কাব্য! এই! কাব্য! কী হয়েছে তোমার? হাত... হাতে কী হয়েছে? দেখি। (বলতে বলতে হাতখানা আগলে নিল।) ওফ! এতটা কেটেছে কীভাবে? ময়নুল! ময়নুল! পানি নিয়ে আয়, দ্রুত।(এই পর্যায়ে দাঁতে দাঁত চেপে মানব।) বাচ্চা তুমি? দেখে চলতে পারো না? হাত কাটে কীভাবে? ময়নুল! কু&ত্তার বাচ্চা! দ্রুত কর!

ময়নুল ততক্ষণে ছুটে গিয়েছে বাজারের দিকে। কাব্য আর আরবিদের চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে দাঁড়িয়ে পড়েছেন আয়েশা বেগম। মেয়ের হাতের দিকে নজর যেতেই আঁতকে উঠলেন মুহূর্তেই। তবে বড়ো মেয়েকে ছেড়ে সেদিকে এগোতে পারলেন না। ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে নিজেও আর্তনাদ করে উঠলেন। কাব্যর হাত থেকে অনবরত গলগল করে রক্ত ঝরছে। অনেকটা কেটেছে বোধহয়, হয়তো গভীরও গিয়েছে অনেকটা। নয়তো এতটা রক্তক্ষরণ হতো না। আরবিদ তড়িঘড়ি করে কাব্যর হাতটা পরনের পাঞ্জাবি দিয়ে চেপে ধরল। চোখেমুখে তীব্র অস্থিরতা, যেন আঘাতটা কাব্যর নয়, তার লেগেছে। সে আবারও ময়নুলকে তাড়া দিল—

— শু*য়োরের বাচ্চা! এত সময় লাগে কেন? ওফ, দ্রুত আয়, ময়নুল!

বলতে বলতে লম্বা লম্বা শ্বাস টানতে লাগল মানব। আরবিদের কাণ্ডে কাব্যশ্রী যেন বোকা বনে গেল। সঙ্গে আয়েশা বেগম আর বনশ্রীও কিছুটা থমকাল। আরবিদের আচরণ অচেনা। আরবিদ কখনোই কাউকে বকে না, গালিগালাজ পছন্দ করে না। তার ঠোঁট ফুঁড়ে তো উঁচুৎ কথাই বের হয় না। সেদিক থেকে কুত্তার বাচ্চা, শুয়োরের বাচ্চার মতো গালিগালাজ সম্পূর্ণ অসম্ভব ব্যাপার-স্যাপার। বড়ই অচেনা ঠেকল মানবকে। সেই সঙ্গে কাব্যের প্রতি এই উৎকণ্ঠা, এই বিষয়টাতে আরও অবাক হয়েছে সবাই। কাব্যশ্রী ব্যথা ভুলে কেমন অবাক চিত্তে তাকিয়ে রইল মানব-এর পানে। এমন করছে কেন এই লোক? সে উনার বোন বলে? বোনের জন্য এতটা উৎকণ্ঠা? মানা যায়? যাকে বোন ব্যতীত অন্য নজরে দেখা যায় না, তার হাত কেটে যাওয়ায় বুঝি এতটা ব্যাকুল হওয়া যায়? ভেবে পেল না কিশোরী। ময়নুল ততক্ষণে বোতলভর্তি পানি নিয়ে ছুটে এসেছে। ছেলেটা যেন হাওয়ার বেগে গিয়েছে, আবার সেই হাওয়ার বেগেই ফিরে এসেছে। ময়নুল ছুটতে ছুটতেই বোতলের ছিপি খুলে আরবিদের দিকে এগিয়ে দিল। আরবিদ ধীরে-সুস্থে পাঞ্জাবি থেকে কাব্যের হাত ছাড়িয়ে বোতলের পানিটা আলতো করে ক্ষতস্থানে ঢালতে থাকল। কাটা হাতে পানির ঝাপটা পড়তেই ফের ব্যথাতুর শব্দ করে উঠল কিশোরী। তীব্র জ্বালুনিতে হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে চাইলে ধমকে উঠল আরবিদ—

— কী সমস্যা? হাত ছাড়িয়ে নিচ্ছো কেন? মজা করছি আমি? অকারণে তোমায় বকা-ঝকা করা হয় না, কাব্য। তুমি বড্ড নাছোড়বান্দা। হাত কেটেছে কীভাবে? কোথায় লেগে কেটেছে? বলো। মারাত্মক হলে ইনজেকশন নিতে হবে।

প্রশ্ন করতে করতে কাব্যের দিকে সোজা দৃষ্টিপাত করল আরবিদ। কাব্য কিছুটা হকচকিয়ে গেল। লোকটার চোখে চোখ পড়তেই এই পর্যায়ে হাতের জ্বালুনিটাও কেমন ফিকে মনে হলো। সে কিছুটা আমতা-আমতা করে আওড়াল — আপনার পেছনে... কোমরে ধারালো কিছু একটা ছিল। কী ওটা? কেন রেখেছেন ওখানে?

কাব্যশ্রীর এহেন বাক্যে স্থির হয়ে পড়ল মানব। চট করেই কাব্যের হাত ধরে রাখা হাতটা ছাড়িয়ে হাত নিয়ে গেল কোমরের পেছনে। মুহূর্তেই চোখ কুঁচকে লম্বা শ্বাস টানল মানব। বস্তুটা ধীরগতিতে ভালো মতো লুকিয়ে নিল আগের জায়গায়। কাব্যশ্রী এখনো উত্তরের আশায় আরবিদের দিকে তাকিয়ে, তবে আরবিদের ভাবান্তর নেই। যেন কাব্যের বলা শেষের প্রশ্নটুকু শুনতেই পায়নি। শুনবে না কেন? শুনেছে, তবে উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করছে না। কারণ কাব্যের সেই অধিকার নেই। ভেবেই দীর্ঘশ্বাস গোপন করল কিশোরী।

এরমধ্যে আরবিদের বেখেয়ালিপনায় কাব্যের হাত থেকে আবারও রক্ত ঝরা শুরু হলো। এই পর্যায়ে ফের সতর্ক হলো মানব। বোতলের সম্পূর্ণ পানিটা ঢেলে পাঞ্জাবির পকেট হাতড়ে রুমাল বের করে যত্নের সহিত কাব্যর হাতটা বেঁধে দিতে দিতে আয়েশা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল — ছোট আম্মা! আপনি একটু বন্যকে নিয়ে বসুন। আমি কাব্যকে নিয়ে শিগগিরই ফিরছি। ময়নুল!

আরবিদের মুখ থেকে নামটা বের হতে দেরি, ময়নুলের সাড়া দিতে দেরি হলো না — কন ভাইজান! হুনতাছি।

— ছোট আম্মা আর বন্যর খেয়াল রাখিস। কাব্য! আগে হাঁটো, আমি পেছনে আছি।

,,বলেই পানির বোতলটা ময়নুলের হাতে ধরিয়ে দিল। কাব্য যেন তা শুনেও শুনল না। এগিয়ে গেল গাড়ির দিকে। এই পর্যায়ে ফের ধমকে উঠল মানব — কাব্য! তোমায় কি বলা হয়েছে? শুনতে পাওনি?

কাব্য মাথা নত করে নরম কণ্ঠে উত্তর করল — লাগবে না, সেরে যাবে। চলুন, বাড়ি যাই।

আবারও পা বাড়াতে নিলে ওর হাতটা টেনে ধরল আরবিদ। এতক্ষণ যাবৎ যতখানি এগিয়েছিল মেয়েটা, তা এক টানেই কেমন গুটিয়ে দিল মানব। কাব্য আবারও এসে দাঁড়াল আরবিদের বরাবর। চোখাচোখি হলো দুজনার। মানব চোখে চোখ রেখেই অত্যন্ত ফ্যাসফ্যাসে গলায় আওড়াল — কয়েক ধাপ বেশি বোঝার লক্ষণটা আমার সামনে না দেখিয়ে অন্য কাউকে দেখিও।

কাব্যশ্রীর কী যেন হলো। এতদিন জমিয়ে রাখা অভিমানগুলো কেমন গলার কাছটায় দলা পাকিয়ে এলো। মস্তিষ্কটা জ্বলে উঠল। কণ্ঠে কঠোরতা ঢেলে কাঠকাঠ গলায় আওড়াল— অন্য কাউকেই দেখাব। অন্য কেউই দেখবে আমায়।

মুহূর্তেই কনুইয়ে শক্ত হাতের চাপ পড়ল। ব্যথায় ককিয়ে উঠল কিশোরী। চোখজোড়া চিকচিক করে উঠল পানিতে। তবে সেই কান্নায় দৃষ্টিপাত করল না আরবিদ। দাঁতে দাঁত চেপে শুধাল — অন্য কেউ মানে? কী বোঝাতে চাইলে? কী দেখাবে তুমি? কাকে দেখাবে?

মুখে রাশ রাখার প্রয়োজন মনে করল না কিশোরী। একটু আগে আরবিদকে ব্যাকুল হতে দেখে কেমন তরতর করে সাহসখানা আকাশ ছুঁল। আরবিদকে কষ্ট দেওয়ার তাগিদে সোজাসাপ্টা উত্তর করল—

— সবই দেখাব। আমার রূপ, গুণ, সব। বিয়ে করব অন্য কাউকে, অন্য কারোর বউ হব আর অন্য কারোরই মালিকানায় থাকব।

কপাল গুটাল মানব। চোখেমুখে বিরক্তির রেশ। কাব্য ভেবেছিল আরবিদ রাগ করবে, বিচলিত হবে, উন্মাদ হবে। অথচ তার কিছুই হলো না। সে কাব্যশ্রীর দিকে অনিহা নিয়ে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে ঝটকা মেরে কনুইটা ছেড়ে দিয়ে বিরবির করে আওড়াল — বিরক্তিকর।

আরবিদের অনিহাভরা দৃষ্টি আর ''বিরক্তিকর"" উচ্চারণে কাব্যর অন্তরটা মুচড়ে উঠল। কণ্ঠটাও ভেঙে এলো কেমন — আমি তো বিরক্তই করি। তাহলে এত সুস্থ করার তাড়া কেন? মরে যেতে দেওয়া হোক। তবেই তো...

কথা ফুরাবার আগেই গালে দাবাং করে চড় পড়ল। চড়টা এতোটাই জোরে ছিল যে চড়ের তোপে অনেকটাই হেলে পড়েছে কাব্য। মনে পড়ে গেল সন্ধ্যারাতে এই লোকের জন্য মায়ের হাতে খাওয়া মারের কথা। সবাই শুধু তাকে মারে, আঘাত করতে ভালোবাসে। ব্যথা ভুলে তীব্র অভিমানে ঠোঁট ভেঙে কেঁদে উঠল কিশোরী। আরবিদ রাগে কেমন ফোঁসফোঁস করছে। ওদিকে যে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, আর সে যে কাব্যর মা, সে বিষয়ে যেন আরবিদের কোনো ভাবান্তর নেই। সে কোনোদিনই কাউকে পরোয়া করেনি, করার প্রয়োজনও মনে করেনি। কাব্যর বাহু ধরে টেনে সোজা করে দাঁড় করাল ওকে। রাগের তোপে গলা টিপে ধরার জন্য হাত বাড়াতেই ভীতু কাব্য শব্দ করে কেঁদে উঠল। সহসা হাত সরিয়ে নিল আরবিদ। পরপরই হাত রাখল নিজের কাঁধে। খুব শক্ত করে ঘাড় ডলল কয়েকবার। তার পরেও শান্তি পেল না মানব। রাগ কমছে না। অগত্যা আবারও চেপে ধরল কিশোরীর কনুই। টান বসাতেই আরবিদের অনেকটা নিকটে চলে এলো কাব্য। সেসবে ধ্যান নেই আরবিদের। বুঝতেও চাইল না, কাব্য তার বুকের অনেকটা কাছে। অনুভব করতে চাইল না কিশোরীর সান্নিধ্য। সে কণ্ঠে সর্বোচ্চ অনিহা আর তিক্ততা ঢেলে আওড়াল—

— আমার সাথে অভিমানের ঢং করছ? নিষেধ করেছি না? আমার সাথে একদম বউ-বউ ভাব দেখাবে না। কয়েকশত বার বলেছি, তুমি আমার বোন। বোন মানে শুধুই বোন। মাথায় ঢুকিয়ে নাও।

ঝাপসা চোখে তাকিয়ে রইল কাব্যশ্রী। উত্তর করতে পারল না। একটা মানুষ এতটা পাষাণ, এতটা নির্দয় কী করে হতে পারে? ভেবে পেল না কিশোরী। এই পর্যায়ে নিজের নির্দয়তার প্রমাণ দিতে কাব্যশ্রীর কাটা হাতটা চেপে ধরল আরবিদ। টানতে টানতে নিয়ে যেতে লাগল বাজারের ভেতরে। বাধা দিল না কাব্য। যা করার করে নিক। যন্ত্রণাই তো দেবে। সমস্যা নেই, এটা তার নিত্যদিনের সঙ্গী।

#দেওয়ান_সাহেব ( পর্ব: ৪.৩)

#ট্রাজেডি_জাস্টিস

#লেখনিতে_রুপান্জলি

এক রাশ মন খারাপ বুকে চেপে শ্রেণিকক্ষে বসে আছে রুপান্মিতা। ক্ষণে ক্ষণে বুকের ভিতরটা কেমন মুচড়ে মুচড়ে উঠছে। বারংবার কালাইয়ের কথা মনে পড়ছে। আর মনে পড়তেই চোখ জোড়া ঝাপসা হয়ে আসার পায়তারা করছে। এই মুহূর্তে শ্রেণিকক্ষে না থাকলে বোধহয় কেঁদেই ফেলতো মেয়েটা। কাল রাতে কে যেনো তার কালাইটাকে চুরি করে নিয়ে গিয়েছে। গতকাল রাতে সে যখন বাহিরে বেরিয়েছিলো, তখনো তো কালাইয়ের ডাক শোনা যাচ্ছিলো। তখন যদি সে একটাবারও ওদিকটায় যেতো, তাহলে হয়তো কালাইটা এখনো তাদের মাঝে রয়ে যেতো। কালাইয়ের সঙ্গে কাটানো ছোট ছোট মুহূর্তগুলো চোখে ভাসতেই রুপার চোখ জোড়া এবার সত্যি সত্যিই ঝাপসা হয়ে এলো। কে করলো কাজটা? কার নজর পড়েছিলো তার কালাইয়ের উপর? রুপান্মিতার মন বারংবার একজনের নাম বলছে, কিন্তু সেটা কি আদেও সম্ভব? না না!! কিছুতেই সম্ভব না। উনার মতো মানুষ এটা করতেই পারে না। উনাদের কি টাকার কোনো অভাব পড়েছে? চাইলে এরকম দশটা ছাগল নির্দ্বিধায় কিনে নিতে পারবে।

রুপান্মিতার গভীর ভাবনার মাঝেই ওর দিকে কলম ছুড়ে মারলো কেউ। আকস্মিক উরুর উপরে কলম আছড়ে পড়তেই কেমন ধরফরিয়ে উঠলো মেয়েটা। সামনে তাকাতেই দেখলো রেজওয়ান স্যার তার দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মুহূর্তেই মনে মনে জিহ্বা কাটলো মেয়েটা। সে তো ভুলেই গিয়েছিলো আজকের প্রথম ক্লাস অংক, মানে রেজওয়ান স্যারের। এই স্যারের ক্লাসে অমনোযোগী থাকার মতো ভুল কি করে করতে পারলো সে? রুপান্মিতাকে এমন আহাম্মক বনে তাকিয়ে থাকতে দেখে ধমকে উঠলো রেজওয়ান --- “আহাম্মকের মতো তাকিয়ে আছিস কেনো? উঠে দাঁড়া।”

রুপান্মিতা সময় নিলো না। ভদ্র মেয়ের মতো তাড়াতাড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে উত্তর করলো— “জ্বী স্যার।”

,,,,“বাড়ির কাজ করেছিস?”

রুপান্মিতা মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানিয়ে বললো— “করেছি।”

অন্যদিন বাড়ির কাজ পরখ করলেও আজ আর দেখতে চাইলো না রেজওয়ান। রুপান্মিতা এমনিতেই ভালো মেয়ে, পড়াশোনায়ও ভালো। শুধু ঐ দস্যি, ছন্নছাড়া মেয়েটার সাথে ওঠাবসা করা ব্যতীত আর কোনো খারাপ গুণ নেই তার মাঝে। অগত্যা বাড়ির কাজ দেখার ব্যাপারটা ছাড় দিলো রেজওয়ান। কোনো দ্বিধা সংকোচ না রেখে সোজাসাপ্টা ফ্যাসফ্যাসে গলায় শুধালো— “তর সাথেরটা কই?”

রুপান্মিতা কেমন এদিক-ওদিক তাকিয়ে পাশে বসে থাকা দুজনের দিকে তাকালো। পরক্ষণেই কিছু একটা মনে হতেই কেমন দ্বিধান্বিত কণ্ঠে শুধালো— “বন্যর কথা বলছেন, স্যার?”

রেজওয়ানের চোখ-মুখ কেমন তিতখুটে ঠেকলো। কপালে সেই চিরচেনা তিনটে ভাঁজ ফেলে ভ্রু গুটিয়ে শুধালো— “তর সাথে আর কে থাকে?”

এই একটা প্রশ্নই যথেষ্ট ছিলো রুপান্মিতার প্রশ্নের উত্তরস্বরূপ। বিষয়টা বুঝতে পেরে রুপান্মিতা ফের নরম স্বরে আওড়ালো----- “বন্যর খুব জ্বর স্যার!! ডাক্তার বলেছে এক সপ্তাহ বিশ্রাম নিতে। আরবিদ ভাইজান নাকি লোক পাঠিয়ে ছুটি নিয়েছেন, মনে হয় এই সপ্তাহে আর আসবে না।”

রেজওয়ানের গোটানো কপালটা এবার শিথিল হলো। রুপান্মিতাকে ইশারায় বসতে বলে অনেকটা সময় চুপ রইলো মানব, পরপর সবাইকে বীজগণিতের দুটো অংক করতে দিয়ে বাহিরে বেড়িয়ে গেলো। খুব দূরে কোথাও যায়নি, ক্লাসের বাহিরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিকে শিক্ষক বের হতেই ক্লাসে ফিসফিস শুরু হলো। ক্লাস এইটে মেয়ে সংখ্যা ৯ জন আর ছেলে সংখ্যা ১৩ জন। মোট ২১ জন মানুষের ফিসফিসানোতে মোটামুটি সোরগোল বয়ে গেলো ক্লাসটায়। সবার ফিসফিসানো সোরগোলের মধ্য রুপান্মিতা এক মনে অংক করে যাচ্ছে, অথচ তার পাশে বসা মেয়েরা যে যার মতো কথা বলতে ব্যস্ত। রুপান্মিতা বহুবার তাদেরকে থামানোর প্রয়াস চালিয়েছে, তবে লাভে লাভ কিছু হয়নি। সবাই যে যার মতো কথা বলায় মত্ত, ফলস্বরূপ এই বেলায় স্যারের হাতে বেদম মার খেলো সবাই। রেজওয়ান স্যার রেগে মেগে তেড়ে এসে সবাইকে ইচ্ছামতো বেত দিয়ে পিটালেন। বাদ গেলো না রুপান্মিতা সহ বাকি মেয়েরাও।

***********

বেলা আনুমানিক বারোটা ছুঁই ছুঁই। গত কয়েকদিন যাবৎ শীতে ঝপঝপ করছে প্রকৃতি। বেলা বাড়ার সাথে সাথে সূর্য উঁকি দেওয়ার কথা থাকলেও সারাদিনব্যাপী সূর্যের দেখা মেলা দুষ্কর। দিনভর কুয়াশায় ম্লান হয়ে থাকে ধরণী। এরূপ শীতের মাঝেও ঘেমে চুপচুপা হয়ে বালুর মাঠে ফুটবল খেলায় মত্ত দুই দল যুবক। একপাশের দলে রয়েছে পশ্চিম পাড়ার ছেলেরা, অপরপাশে উত্তর পাড়ার ছেলেরা। উত্তর পাড়া আর পশ্চিম পাড়া মুখোমুখি হওয়ার দরুন বরাবরই এদের মাঝে একটা বিবাদ লেগে থাকে। সেই বিবাদের জের ধরেই সকাল থেকে একনাগাড়ে একটার পর একটা ম্যাচ খেলে যাচ্ছে তারা। ইতিমধ্যে দুইটা ম্যাচ শেষ হয়েছে আর একটা বর্তমানে রানিং চলছে। আগের দুইটার মধ্যে একটা ড্রো হয়েছে আর অন্যটায় পশ্চিম পাড়া জিতেছে। এই বিষয়টাই মানতে পারছে না আরহান, মেহরাব সহ বাকি ছেলেরা। আরহান নবীন গড়ে এসেছে আজ মাত্র তিনদিন, অথচ ছেলেটা বন্ধু জুটিয়েছে আটজন। বর্তমানে তাদেরকে সাথে নিয়েই পশ্চিম পাড়ার ছেলেদেরকে মোক্ষম জবাব দিতে প্রস্তুত। দেওয়ান বাড়ির ছেলে হয়ে সে হেরে যাবে? তাদের পাড়া হেরে যাবে? তাও পশ্চিম পাড়ার ছেলেদের কাছে। অসম্ভব!! অগত্যা জোরদার খেলা চলছে বালুর মাঠ জুড়ে।

খেলার সময় ৩০ মিনিট পার করতেই গোল দিলো মেহরাব। সে নিয়ে অনেকটা সময় মাতামাতি চললো। আবারও খেলা শুরু হলো, তবে খেলার সময় ৪০ মিনিট পেরোতেই নিয়মমাফিক ১০ মিনিটের বিরতি দেওয়া হলো। ১০ মিনিট পার হলেই আবারও খেলা শুরু হবে। অগত্যা যে যার মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য একেক জায়গায় বসে পড়লো। আরহান আর মেহরাব গিয়ে বসলো বালুর মাঠের এক কোণায় বড়ো বট গাছটার মূলে। তাদেরকে বসতে দেখে হুরমুরিয়ে বাকি সাতজনও ঘিরে বসলো তাদের। এই শীতেও ঘেমে নেয়ে একাকার সকলে। আরহানের পরনে ধুতি পাজামা আর ফতোয়া। ছেলেটা গরমের তোপে ফতুয়ার হাতা টেনে টুনে কনুইয়ের আরও অনেকটা উপরে ভাঁজ করে রাখলো। আরহান যখন ফতুয়ার হাতা ভাঁজ করতে ব্যস্ত, তখনই কর্ণকুহরে বারি খেলো মেহরাবের আতঙ্কিত স্বর—

“আরহান!! সামনে তাকাও, আরবিদ ভাইয়ের হাতে ব্যাত।”

মেহরাবের বলা এহেন বাক্যে আরহানের বুকটা কেমন ধ্বক করে উঠলো, তড়িৎ গতিতে তাকালো সামনের দিকে। তৎক্ষণাৎ নজর আটকালো দেওয়ান বংশের প্রতাপশালী উত্তরাধিকারের উপর। রাগে ফোসফোস করতে করতে তার দিকেই এগিয়ে আসছে আরবিদ। ডান হাতে সাদা কাপড়ের ব্যান্ডেজ। সেই ব্যান্ডেজ করা হাতে শক্ত, মোটা, লম্বা একটা কড়ই গাছের ব্যাত। এই ব্যাতটা আরবিদের নিজস্ব, বহু বছর যাবৎ ভাই-বোনদের শাসন করার কাজে ব্যবহার করে আসছে।

,,,,,,,মানবের পরনে পাঞ্জাবি, তার নিচে চ্যাকের লুঙ্গি, লুঙ্গির রং বাদামি। হাতে ব্যাত ধরে রেখেই পরনের লুঙ্গিটা দুহাতে উপরে তুলে কোমরে বাঁধতে বাঁধতে শক্ত কদমে আরহানের দিকে এগিয়ে আসছে। লুঙ্গি উঁচানোর ফলে ফর্সা পায়ের লোমকূপ বড্ডো আকর্ষণীয়ভাবে ছলকে উঠে প্রতীয়মান হচ্ছে চোখে। পায়ের পাতায় থাকা কালো চামড়ার স্যান্ডেল জোড়া মানবের শক্ত কদমকে আরও ঐতিহ্যবাহী করে তুলছে। এই মুহূর্তে এখানে যদি কাব্যশ্রী দেওয়ান উপস্থিত থাকতো, তাহলে বোধয় তার দেওয়ান সাহেবের এহেন রূপ দর্শনে নিমিষেই মূর্ছা যেতো মেয়েটা। তবে আরহান তো আর কাব্য নয়, তাই না? সে মূর্ছা যাবে কোন দুঃখে? গেলে আতঙ্কে যেতে পারে।

ভেবেই আরও আতঙ্কিত হলো আরহান। ভাইজানকে এভাবে কোমরে লুঙ্গি গিট দিতে দেখে আরহানের প্রাণ পাখি উড়ে যাওয়ার জোগাড়। ছেলেটা স্থির থাকতে পারলো না। সহসা কোনো বাক্য ব্যয় না করে আরবিদের উল্টো পথে ছুট লাগালো। আরবিদ যেনো এর জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলো। আরহান দৌড় দেওয়ার সাথে সাথে আরবিদও পায়ের কদম বাড়ালো। আরবিদের এই অগ্নিমূর্তি রূপ দেখে সেখানকার সবাই ভয়ে তটস্থ হয়ে পড়েছে শুরুতেই। একপ্রকার ভদ্র বনে গিয়েছে সবাই। এলাকার বড়ো ভাই বলে কথা, তাও আবার মান্যগণ্য মানুষ, সেই সাথে অসম্ভব রাগী। ভয় পাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না। সবাই কেমন সংকিত দৃষ্টিতে দুই ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো।

এদিকে প্রাণপণ ছুটতে থাকা আরহান ছুটতে ছুটতে একবার পিছনের দিকে তাকালো। তৎক্ষণাৎ আরবিদকে তার পিছন পিছন ছুটতে দেখে ভরকে গেলো ছেলেটা। মুহূর্তেই পায়ের গতি বাড়ালো আরও খানিকটা। আরবিদ দাঁতে দাঁত চেপে ডাকলো—

“কু*ত্তার বাচ্চা, দাঁড়া তুই। তর কলিজা বের করবো আজ। মেপে দেখবো কতোটা সাহস হলে আমার শিক্ষার অবমাননা করা যায়। থাম। ভালো চাইলে ঠ্যাং বরাবর না দিতেই থেমে যা।”

আরহান কি তা শুনে? পাগল নাকি সে? ভাইজান এখন তাকে কাছে পেলে একদম হাত-পায়ের রগ টেনে ছিঁড়ে ফেলবে। এতো বড়ো ঝুঁকি নেওয়ার মতো ভুল সে কোনোদিনই করবে না। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠার পর যখন জানতে পারলো ইতিমধ্যে কাল রাতের ঘটনা বড়ো ভাইজানের কানে পৌঁছে গিয়েছে। তক্ষুনি তাড়াহুড়ো করে নাস্তা না করেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছে সে। এখনো পর্যন্ত বাড়ি ফেরেনি। এমনকি সকালে নাস্তাটা পর্যন্ত করেনি। অথচ দেখো, ভাইজান ঠিক তার পিছু নিয়েছে। বেচারা ছুটতে ছুটতে কেমন ভয়ার্ত কণ্ঠে আওড়ালো—

“ভাইজান!! ভাইজান মাফ করে দেও। কাল, কাল আমার আবেগ কাজ করেছিলো, বিবেক কাজ করেনি তাই, তাই ভুল করে চুরি করে ফেলেছি। আমি আর জীবনে, আল্লাহ!! চুরি করবো নাতো।”

বলতে বলতে হাঁপিয়ে উঠলো ছেলেটা। ভাইজান শান্ত হয়েছে কিনা বুঝার জন্য পিছনে তাকাতেই দেখলো আরবিদ তার অনেকটা কাছে পৌঁছে গিয়েছে। আরবিদের চোখে-মুখে এখনো চরম রাগ বিরাজমান। মুহূর্তেই মুখটা কাচুমাচু করে প্রাণপণ ছুটতে লাগলো বেচারা। খেঁকিয়ে উঠলো আরবিদ—

“আমার কি টাকার অভাব পড়েছে? নাকি ক্ষমতার? চুরি করবি কেনো? তাও সামান্য একটা ছাগল, নারী হলে নাহয় মেনে নিতাম। টাকা দিয়ে কিনতে পারা যায়, এমন জিনিস তুই চুরি করে কেনো খাবি? চুপচাপ দাঁড়িয়ে উত্তর দে, নয়তো ধরতে পারলে তুই শেষ।”

ভাইজানের কথায় চরম আশ্চর্য হলো আরহান। ছুটতে ছুটতে আরও একবার পিছনে তাকিয়ে উৎসাহিত কণ্ঠে শুধালো—“নারী নিয়ে এলে মেনে নিবে?”

,,,,, “বাহবা দিবো।”

,,,, “ওপ্স, সত্যি? আচ্ছা, তাহলে এর পরবর্তী টার্গেট মেয়ে। এই খুশিতে মাফ করে দাও।”

,,,,, “আগে দাঁড়া, তারপর মাফ করছি।”

,,,,“পাগল মনে হয় আমাকে? তুমি আমায় মেরেই ফেলবা, আমি জানি।”

বলতে বলতে পায়ের গতি আরও বাড়ালো আরহান। দুভাই বালুর মাঠ পেরিয়ে গন্তব্যহীন ছুটছে। পথচারী অনেকেই দাঁড়িয়ে থেকে প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, আবার অনেকেই দুভাইয়ের খুনসুটি দেখে মিটি মিটি করে হাসছে। এগুলো নতুন নয়, ছোট থেকেই হয়ে আসছে। মাঝে হয়তো কয়েকটা বছর দুভাই পরিস্থিতির কারণে দূরে ছিলো, কিন্তু আরহানের ঢাকা যাওয়ার ১৫ বছরের সফরে এমন কোনো মাস যায়নি, যেই মাসে আরহানের কাছে একবারের জন্যও যায়নি আরবিদ। বরাবর ঢাকায় গিয়ে আরহানের জীবনযাত্রা সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছে সে। কখন কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে, যার সাথে মিশছে সেই ছেলেটা কেমন? কোনো ভুলভ্রান্তি হচ্ছে কিনা? আরহান বেপথে যাচ্ছে কিনা? আরও নানাবিধ খোঁজাখবর সর্বদা আরবিদের নখদর্পণে থাকতো। ভুলক্রমেও যদি আরহান দ্বারা কোনো রকম ভুল কিছু হয়ে যেতো, তাহলে ঢাকার মাটিতেও ভাইয়ের শাসনের শিকার হতো যুবক।

আরহান ছেলেটা আল্লাহর পর সবচেয়ে বেশি ভয় পায় তার ভাইজানকে। মা-বাবার পর ভালোও বাসে ভাইজানকে। ভাইজান ব্যতীত এই পৃথিবীতে এমন একটি ব্যক্তিও নেই, যার কাছে মাথা নত করতে বাধ্য আরহান। সে মাথা নত করবে কি? আরবিদ কখনো এমন দিন আসতেই দিবে না। আরবিদ তার ভাইকে সর্বদা বীরের মতো বাঁচতে শিখিয়েছে, সাথে সবাইকে সম্মান করাও শিখিয়েছে। যদিও আরবিদ কখনোই কাউকে আলাদা করে তোষামোদ করার প্রয়োজন মনে করেনি, ভদ্র সাজতে চায়নি, কারোর মনের মতোও হতে চায়নি। তবুও নিজ উদ্যমে ভাইকে সর্বোত্তম মানব ও ভদ্রলোকে পরিণত করার চেষ্টা চালিয়েছে। তার দ্বারা যা যা সম্ভব হয়নি, তার সবটা ফুটিয়ে তুলেছে ভাইয়ের চরিত্রে।

এতো কঠোর শাসন ও শিক্ষার পরেও নবীনগরে এসে বন্ধুবান্ধবের চক্করে পড়ে কাল রাতে হাসান ফকিরের বাড়ি থেকে তরতাজা খাসি চুরি করে একরাতেই জবাই দিয়ে বনভোজন করে হজমও করে নিয়েছে ছেলেটা। এসব করে বাড়ি ফিরেছে ভোর চারটায়। রাত করে বাড়ি ফেরার ব্যাপারটা আরবিদ শুরু থেকে জানলেও ছাগল চুরির বিষয়টা জানতে পেরেছে শাহিলের কাছ থেকে। শাহিল আরবিদের দোকানের কর্মচারী, কাল রাতে সেও আরহানের সাথে ছিলো। বিষয়টা জানতে পেরেই আরবিদের মাথায় রাগ টগবগ করছিলো। তার এতো খাটাখাটনি, রোজগার কার জন্য? এতো টাকা থাকার পরেও তার ভাই কেনো চুরি করে খাবে? এখন যদি ধরা পড়ে যায়? হাসান ফকির যদি শালিস বসায়? তখন বড়ো ভাই হয়ে সন্তানতুল্য ছোট ভাইয়ের বিচার কি করে করবে সে? বিষয়টা কি বুঝতে পারছে আরহান?

নবীনগড়ে চুরির শাস্তি স্বরূপ মাথা ন্যাড়া করে, মুখে চুন-কালি মাখিয়ে, গলায় জুতার মালা দিয়ে পুরো গ্রাম তিন পাক ঘুরানো হয়। আরহানের জন্য এমন একটা রায় দিতে পারবে আরবিদ? সম্ভব? তার থেকে ভালো এই ছেলেকে আজ পিটিয়ে ছাল তুলে নিবে, তবে যদি ভালো-মন্দ বুঝার বুদ্ধি হয় মাথায়।

ভাইজানের ভয়ে ছুটতে ছুটতে আরহানের দম আটকে আসার জোগাড়। সহ্য করতে না পেরে সে আবারও পিছন ফিরে তাকিয়ে লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে বললো—

“একটা মিনিট ভাইজান। আমি, আমি একটু বিশ্রাম নিতে চাই, দম আটকে আসছে আমার। তুমি ওখানেই দাঁড়াও আর আমি এখানে দাঁড়াই। আবার, আবার এক মিনিট পর দৌড় শুরু করবো দুজন। ঠিক আছে? দাঁড়াও না, দাঁড়াও, আমি কিন্তু দম নিতে পারছি না ভাইজান।”

এই পর্যায়ে দাঁড়িয়ে পড়লো আরবিদ। ভাইজানকে দাঁড়াতে দেখে আরহান একটু স্বস্তি পেলো। ধপ করে বসে পড়লো মাটির রাস্তায়। টানা তিন ঘণ্টা খালি পেটে ফুটবল খেলার পর এতোটা ছুটাছুটি করে বেচারা কেমন মিইয়ে পড়েছে। লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে নিজেকে ঠিক করার প্রয়াস চালাচ্ছে বেচারা। বড্ডো পানি পিপাসাও পেয়েছে।

অপরদিকে তার থেকে গুনে গুনে দশ-বারো হাত দূরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে আরবিদ। সেও হাঁপাচ্ছে কিছুটা, তবে দৃষ্টি কঠিন। আরহান বুঝলো সে মার না খাওয়া আগ পর্যন্ত ভাইজানের রাগ কমবে না। অগত্যা বাঁচার জন্য কোনো পথ খোলা না পেয়ে আবারও দৌড় দিতে নিবে, তখনই পিছন থেকে নীল শাড়ি পরিহিত এক মানবিকে এগিয়ে আসতে দেখে আশার আলো দেখতে পেলো আরহান। তাড়াতাড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে মানবির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ভাইয়ের ভয়ে কেমন অপকটেই স্বীকার করে নিলো নিজের দোষ—

“এইযে রুপকুমারি, শুনো। কালকে তোমাদের বাড়ি থেকে আমরা বন্ধুরা মিলে তোমাদের ছাগল চুরি করেছি, চুরি করে সেটা জবাই করে খেয়েও নিয়েছি। এবার তুমি আমাদের ক্ষমা করে দাও, নয়তো ভাইজান আমাকে মেরেই ফেলবে।”

একদিকে কালাই চুরি হয়ে যাওয়া, অপরদিকে বন্য স্কুলে না যাওয়া, সেই সাথে রেজওয়ান স্যারের হাতে ঠাস ঠাস চারটা ব্যাতের বাড়ি খাওয়ার পর আর ক্লাস করতে ইচ্ছা করেনি রুপান্মিতার। অগত্যা সাথে করে নিয়ে যাওয়া বই-খাতাগুলো বুকে চেপে বেরিয়ে এসেছে স্কুল থেকে। স্যারদের থেকে ছুটিও নেয়নি, মন খারাপ থাকায় কাউকে জানিয়েও আসেনি। স্কুল থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত পুরো রাস্তাটাও আনমনা হয়ে হেঁটে এসেছে মেয়েটা। সেই আনমনা অবস্থাতে আরহানের এই আকস্মিক আগমনে এমনিতেই হকচকিয়ে গিয়েছিলো সে, এখন এমন কথা কর্ণকুহরে হতেই কেমন হতভম্ব হয়ে পড়লো। একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো সামনে দাঁড়িয়ে সমানে হাঁপাতে থাকা মানবের দিকে।

এর মানে সে যা আশঙ্কা করেছিলো, তাই সঠিক? গতকাল রাতে আরহানই তার দলবল নিয়ে তার কালাইকে চুরি করেছিলো? এর মানে কাল রাতে আরহান তার কাছে শালের খোঁজে নয়, বরং তাদের বাড়িতে চুরি করতে গিয়েছিলো? চুরি করার সময় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে রুপা হারিকেন হাতে বেরিয়ে আসায় লোকটা দলবল ছেড়ে তাকে কথায় ব্যস্ত রেখেছে, যেনো কালাইকে নিয়ে যেতে সুবিধা হয়? আর ঐ জড়িয়ে ধরাটা? রুপান্মিতার এখনো স্পষ্ট মনে আছে, আব্বার ঘরের পিছন থেকে টিনের উপর কোনো কিছু আছড়ে পড়ার শব্দ হতেই আরহান ওকে ঘুরিয়ে নিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলো। তারমানে, ঐ সময়ই কালাইকে নিয়ে উনার দলবল আব্বার ঘরের পিছন দিয়ে পালিয়েছে?

এই পর্যায়ে নিশ্চিত হলো রুপান্মিতা। কেমন ঘৃণা ভরা দৃষ্টিতে তাকালো আরহানের দিকে। চোখ জোড়া মুহূর্তেই ছলছল করে উঠলো। গলার কাছে কান্নারা দলা পাকিয়ে আসতেই আরহানের চোখে চোখ রেখে ভাঙা কণ্ঠে শুধালো— “আপনি আমার কালাইকে জবাই করে খেয়ে ফেলেছেন, ছোট দেওয়ান সাহেব?”

আরহানের ভিতরটা কেমন কেঁপে উঠলো। ছোট দেওয়ান সাহেব!! এই নামে তো কতো লোকেই ডাকে, তখন তো এমন হয় না? তাহলে এই মেয়ের মুখ থেকে শোনার পর এমন বুক মুচড়ে উঠার কারণ কি? আর এই ভাঙা কণ্ঠটা? চোখে জমা পানিটা? আরহান কেমন দ্বিধায় পড়ে গেলো। রুপান্মিতার দিকে আরেকটু এগিয়ে ভ্রু গুটিয়ে দ্বিধান্বিত কণ্ঠে শুধালো—

“কালাই? কালাই কে আবার? আমরা তো ছাগল জবাই—”

আরহানের কথা ফুরাবার আগেই ফের ভাঙা কণ্ঠে উত্তর করলো রুপা— “ওটাই আমার কালাই। খুব শখের, খেয়ে নিতে পারলেন?”

এই পর্যায়ে রুপার চোখে জমা পানিটুকু গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়লো। ধপ করেই মন খারাপ হয়ে গেলো আরহানের। তখনই মনে পড়লো পিছনে তার ভাইজান দাঁড়িয়ে আছে আর অনুরোধ করে নেওয়া এক মিনিট সময়ও ফুরিয়ে গিয়েছে। সে তড়িৎ গতিতে ভাইজানের দিকে তাকালো। আরবিদ রাস্তায় ব্যাত ঠেকিয়ে চোখ ছোট ছোট করে এদিকেই তাকিয়ে আছে। আরহান আরও একটু মিনতির স্বরে বললো—

“ভাইজান!! আর একটা মিনিট হা? একটু কথা বলে নেই। একটুই, সামান্য।”

আরহানের চোখে কাতরতা, আরবিদ চোখের ইশারায় জানালো। মুহূর্তেই ঘুরে তাকালো আরহান। রুপান্মিতা নিশ্বব্দে কাঁদছে। আরহান কেমন আগ বাড়িয়েই রুপান্মিতার গাল থেকে এক ফোঁটা পানি নিয়ে সেটা দেখতে দেখতে দ্বিধাভরা কণ্ঠে শুধালো—

“কি যেনো বললে? নামটা? কালাই? এই চোখের পানি কি ঐ ছাগলটার জন্য? একটা ছাগলের জন্য এভাবে কাঁদছো?”

রুপান্মিতা উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না। চুপচাপ গাল মুছে আরহানকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। আহাম্মক বনে গেলো যুবক। বড়ো ভাইজানের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টালো, অথচ আরবিদ এখনো চোখ ছোট ছোট করে ভাইকে পরখ করছে। দুজনার চোখাচোখি হতেই আরবিদ গমন পথে হাঁটতে থাকা মেয়েটার দিকে ইশারা করে কিছু একটা শুধালো, কাঁধ উঁচালো আরহান, মানে সে এখনো শিওর না। আরবিদ কপাল কুঁচকে অসন্তুষ্টি জানালো। আরহান দ্বিধাভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে মাথা চুলকালো। এভাবেই দূর থেকে অনেকটা সময় নিয়ে দুভাই ইশারায় কিসব যেনো বললো। বলা শেষ হতেই আরবিদ ইশারায় বুঝালো সময় শেষ, আরহানের দৌড়ানোর সময় শুরু। আরহান ঠোঁট উল্টে ফের দৌড় শুরু করলো, তবে এবার আরবিদের বিপরীতে নয়, বরং এক দৌড়ে আরবিদকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। ভাইজানের দুহাত নিজের দুহাতের ভাঁজে শক্ত করে আটকে রেখে আওড়ালো— “এবার মারো, কতো মারবা, মারো, মারো না, মারো।”

*********

সময়টা রাত ৯টা নাগাদ।

ইতিমধ্যে বাজারে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরেছেন দেওয়ান বাড়ির কর্তারা, আরহানটাও আজ বাড়িতে। বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত পুরোটা সময় আরবিদের দোকানে থেকেছে। চুরি করার শাস্তি স্বরূপ আরহানকে দুদিন একা হাতে দোকান সামলানোর দায়িত্ব দিয়েছে আরবিদ। শাস্তি পাওয়ার বেলায় বিষয়টা কঠিন ঠেকলেও দোকানে যাওয়ার পর আরহান খেয়াল করলো, তাকে কোনো কাজই করতে হচ্ছে না, যা করার কর্মচারীরাই করে দিচ্ছে। সে শুধু বসে বসে দেখলো দোকান কেমন হয়? কোন সবজির দাম কতো, কিভাবে বিক্রি করা হয়, এসবই। আরহান যখন দোকানে বসেছিলো, তখন আরবিদ দোকানে ছিলো না, ময়নুলকে নিয়ে কোথাও একটা গিয়েছিলো, ফিরেছে এশার নামাজ পরে।

বর্তমানে সব পুরুষেরাই বাহিরের ক্লান্তময় শরীরটা বিছানায় হেলিয়ে নিজেদের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছেন। বাড়ির দুই বউ গরম গরম খাবার এনে রাখছেন টেবিলে। কাব্য আর নিবেদিতা সমান তালে মা-মামিদের সাহায্য করছে। গতোরাতে আর সকালের দিকে কাব্যর শরীরে মোটামুটি জ্বর থাকলেও বিকাল নাগাদ শরীরটা ঘেমে উঠে জ্বর ছেড়েছে, তবে বন্যটার এখনো জ্বর, এই জ্বর সারতে না হলেও আরও দিন দুই সময় লাগবে। মেয়েটার শরীরই এরকম, হুটহাট অসুস্থ হয় না, হলে পরে সুস্থ হতে চায় না।

কলি গিয়েছে কলপাড়। দেওয়ান বাড়ির পুরুষগণ আবার সদ্য ধোয়া-মোছা থালা ছাড়া ভাত খেতে পারেন না। বিনু ফুপু ব্যাতের সোফায় বসে ভাইদের জন্য অপেক্ষা করছে। রাহিমা বেগম একটা থালায় মাঝারি আকারের ভাত আর ঝাল ঝাল তিন রকমের ভর্তা, আরেকটা বাটিতে গাড়ো ডাল দিয়ে নিবেদিতার উদ্দেশ্যে বললেন—

“নিবিদ!! যাও তো বন্য আপাকে এগুলো খাইয়ে দিয়ে এসো। খাওয়া শেষ হলে মনে করে ঔষধও দিও। আর ফিরার সময় বড়ো আপাকে আর ছোট ভাইজানকে খেতে ডেকো।”

নিবেদিতা হাতের কাজ ফেলে প্লেট নিয়ে ধীরো গতিতে চলে গেলো উপরের দিকে। এরমধ্যে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিলো আফনান। নিবেদিতার পাশাপাশি এসে পৌঁছাতেই মেয়েটার লম্বা চুলের বেনুনি ধরে সজোরে টান মারলো ছেলেটা। বদমাশটার কাণ্ডে দাঁতে দাঁত চাপলো নিবেদিতা। নেহাতই হাতে খাবার রয়েছে, নয়তো ছেলেটাকে আজ সে আস্ত গিলে খেতো। আপাকে কটমট করতে দেখে মুখ ভেংচালো আফনান। পরপরই মায়ের দিকে নজর যেতেই ভদ্র বাচ্চার ন্যায় চলে গেলো নিচে। নিবেদিতাও নাক-মুখ দিয়ে অগ্নিশ্বাস নিক্ষেপ করে চলে গেলো উপরের দিকে। এটাকে সে পরে দেখে নিবে।

আফনান ধীরো গতিতে বড়ো মামির সামনে গিয়ে ভদ্রতার সহিত আওড়ালো— “বড়ো মামি!! বড়ো ভাইজান বলেছে এখনি খাবার পাঠাতে। বেশি করে ভাত দিতে বললো, ভর্তাও দিও।”

বলেই হুরমুরিয়ে চেয়ার টেনে খাবার টেবিলে বসে পড়লো। রাহিমা বেগম ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। বড়ো ছেলেটা যে বড়ই খুঁতখুঁতে স্বভাবের, সবকিছু পরিপাটি হতে হয়। তিনি ধোয়া বাটিতে তরকারি বাড়ার তোরজোর করতে করতে কাব্যর উদ্দেশ্যে বললেন—

“আরবিদের প্লেটটা কলপাড় থেকে নিয়ে আয় তো কাব্য, সাথে হাতও ভালো মতো ধুয়ে আসিস।”

কাব্য মাথা ঝাঁকিয়ে চলে গেলো, তবে বড়ো আম্মা কেনো তাকে হাত ধুয়ে আসতে বললো, সেটা বুঝতে পারলো না। ধীরো পায়ে কলপাড় ঢুকতেই দেখলো, আরবিদের থালাটা সদ্যই ধুয়ে মোছার প্রয়াস চালাচ্ছে কুসুম। কাব্য সেটা নিয়ে নিজ উদ্যমে মুছে খাবার টেবিলের কাছে এসে বড়ো আম্মার দিকে এগিয়ে দিলো। রাহিমা বেগম সেই থালা ভর্তি করে ভাত বাড়লেন, ভাতের উপর তিন রকমের ভর্তা দিয়ে অন্য থালাতে ছয়টি বাটি রেখে ছয় রকমের তরকারি দিলেন। পরপরই সেটা কাব্যর হাতে ধরিয়ে দিতেই বাধা দিলো কাব্য— “আমি যাবো না বড়ো আম্মা, তুমি যাও।”

রাহিমা বেগম নাকচ করে বললেন—ৃ“আমি কিভাবে যাবো? তর আব্বাজানরা এখনই নিচে নামবেন, খাওয়াতে হবে না?”

কাব্যশ্রীর চোখে-মুখে ঘন আঁধার নামলো। এখন ঘরে গেলেই বলবে, চলে যাও, তোমার এই ঘরে আসাটা আমার পছন্দ না। বারবার এসব শুনতে কার ভালো লাগে? বাবা-মায়ের মুখের উপর দুটো কথা বলার সাহস না পাওয়া মেয়েটা আবারও বাধ সেধে আওড়ালো—“আমি যেতে পারবো না বড়ো আম্মা, কুসুম আপা নয়তো আফনানকে দিয়ে পাঠাও।”

বড্ড অসন্তুষ্ট হলেন রাহিমা বেগম। কিছু বলার আগেই ধমকে উঠলেন আয়েশা বেগম— “বড়ো আম্মার মুখে মুখে তর্ক করছিস কেনো? তর আব্বাকে বলবো?”

তৎক্ষুণি উপরের ঘর থেকে ডাক ভেসে এলো—“আম্মা!!”

এরপর আর কি? না চাইতেও খাবার হাতে উপরের দিকে ছুটে গেলো কাব্য। সে ভালোই বুঝতে পারে বড়ো আম্মা চায় কাব্য যেনো সবসময় আরবিদের কাছে কাছে থাকে, এতে করে যদি উনার ছেলেটা কাব্যর মায়ায় পড়ে। কিন্তু বড়ো আম্মা তো আর জানে না, কাব্য যে নিকৃষ্ট জাত, কুকুর, বিড়াল আর তাদের ছেলে হচ্ছে সিংহ। তাই কাব্যর সাথে এই বাড়ির বড়ো ছেলের যায় না, রুচিতে লাগে ভীষণ।

খাবার হাতে আরবিদের ঘরে ঢুকতেই আরবিদকে খাওয়ার জায়গায় বসে থাকতে দেখে কিছুটা স্বস্তি পেলো কাব্য। মনে মনে ঠিক করলো, খাবার সাজিয়ে রেখেই ঘর ত্যাগ করবে। কোনো রকম বাক্য ব্যয় করবে না, মুখ তুলে তাকাবেও না, বিরক্ত করা দূর।

আরবিদ যেহেতু বেশিরভাগ সময় ঘরে খাবার খায়, সেহেতু তার জন্য ঘরেই ছোটখাটো টেবিল-চেয়ারের ব্যবস্থা রয়েছে। সেই চেয়ারেই বসে আছে আরবিদ। নিশ্চয়ই খুব জোর খিদে পেয়েছে? নয়তো অন্য সময় হলে খাবার নিয়ে দুই-তিন মিনিট অপেক্ষা করতে হয়। তারপর উনি মনমাফিক সময় এসে চেয়ারে বসলে ভাত বেড়ে দিয়ে, হাত ধুইয়ে দিয়ে, তারপর অনুমতি নিয়ে কক্ষ ত্যাগ করতে হয়।

কাব্যশ্রী ভাবনা রেখে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে শান্ত মনে টেবিলের উপর ভাতের থালাটা রাখলো। পরপর তরকারির বাটিগুলো থালা থেকে নামিয়ে একটার পর একটা টেবিলে সাজিয়ে দিয়ে কয়েক কদম এগিয়ে বিছানার পাশের টেবিল থেকে পানির জগ আর গ্লাস এনে টেবিলে রাখলো। গ্লাস ভর্তি করে পানি নিয়ে খালি থালাটার দিকে ইশারা করে ছোট করে বললো— “হাত ধোন।”

বলেই সেই থালাতে তাকিয়ে রইলো। এসে থেকে একবারের জন্যও মুখ তুলে আরবিদের দিকে তাকায়নি কাব্য। তবে মিনিট খানিক পেরুনোর পরেও আরবিদকে হাত ধোয়ার উদ্দেশ্যে হাত এগুতে না দেখে ভ্রু কুঁচকে চোখ তুলে তাকালো মানবী। চোখে-মুখে প্রশ্নের ছাপ স্পষ্ট। এপর্যায়ে মুখ খুললো আরবিদ—

“খাইয়ে দাও।”

কাব্যশ্রীর কুঁচকানো ভ্রু যুগল কেমন শিথিল হয়ে এলো। দ্বিধান্বিত কণ্ঠে শুধালো— “হঠাৎ?”

অতো ভনিতা করলো না মানব, চোখ-মুখ গোমড়া করে আওড়ালো— “এতো আপত্তি থাকলে আম্মাকে ডেকে দাও।”

ততক্ষণে আরবিদের কাটা হাতের দিকে নজর পড়েছে কাব্যশ্রীর। বুকের ভিতর সূক্ষ্ম যন্ত্রণা হলো বোধয়। না চাইতেও ঠোঁট ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো— “কিভাবে কেটেছে?”

নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে উত্তর করলো মানব— “কুমড়োর আগা কাটতে গিয়ে।”

মনে মনে ঠোঁট উল্টালো কাব্য। কুমড়োর আগা কাটতে গিয়ে ডান হাত কাটে কিভাবে? ডান হাতে তো কাস্তে থাকে। কাটার হলে বাম হাত কাটবে। প্রশ্নটা মনে আসলেও ঠোঁট ফুঁড়ে বের করতে পারলো না। এই মুহূর্তে সামনের মানবকে প্রশ্ন করা মানে বিনামূল্যে দুটো ধমক আর তিক্ত কথা শোনা। দুজনার মাঝে ঝামেলা হলে দেখা যাবে ভাত-তরকারি সব মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। এই আরবিদ দেওয়ান মানুষটা একটা ধাঁধা, কখন কি করে তার কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।

অতঃপর আর কথা বাড়ালো না কাব্য। চুপচাপ সামনের চেয়ারটা টেনে আরবিদের পাশাপাশি বসে পড়লো। এরকমটা নতুন নয়, মাঝেসাঝেই ফসলাদি কাটতে গিয়ে আরবিদের হাত কেটে যায়। তখন বড়ো আম্মাকে খাইয়ে দিতে হয়। বড়ো আম্মা ব্যস্ত থাকলে কাব্যকে করতে হয়। এই দুজন ব্যতীত অন্য কারোর হাতের খাবার মুখে তোলেন না আরবিদ দেওয়ান।

মোহাম্মদ দেওয়ান সাহেবের রুচি ভিন্ন। সে অধিক পরিমাণের ভাত খায়, কাব্য তিন বেলায় যা খায়, তিনি এক বেলায় তার থেকেও বেশি ভাত খান। তরকারি লাগে সাত-আট পদের। অল্প অল্প ভাত মাখিয়ে মাখিয়ে খাওয়াতে হয়। অনেক ভাত একসাথে মাখলে ঐ ভাত তিনি খাবেন না। খাওয়ানোর সময় প্লেট সম্পূর্ণ পরিষ্কার থাকতে হবে, প্লেটের আশেপাশে খাবারের ছিটেফোঁটা লাগা যাবে না, যে খাওয়াবে তার হাতের নিচের আঙুলের ভাঁজ ব্যতীত উপরের ভাঁজে খাবার যাওয়া যাবে না। লোকমা রাখতে হবে মাঝারি, এক লোকমা শেষ হওয়ার সাথে সাথে মুখের সামনে লোকমা তুলে রাখতে হবে। লবণ দিতে হবে বেশি। লবণ ঠিকমতো দিয়ে ভালো মতো মেখে খেয়ে দেখতে হবে লবণ ঠিক আছে কিনা? ঠিক না থাকলে সেই ভাত মুখে তুলে সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দিবেন তিনি। সাত-আট লোকমা খাওয়ানোর পরপরই পানি এগিয়ে দিতে হবে।

আরও কতো কতো নিয়ম রয়েছে, সেসব অভ্যাসে জ্ঞাত কাব্যশ্রী। ব্যাখ্যা করতে হয় না, এমনিই এমনিই হয়ে যায়। এতো এতো নিয়ম মেনে যে কেউ চাইলেও উনাকে খাওয়াতে পারবে না। মাঝে মধ্যে তো রাহিমা বেগম নিজেই ছেলেকে খাওয়াতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তাই ছেলেটা হাত কেটে বাড়ি ফিরলে খাওয়ার সময় এলেই তিনি অকারণে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। যেনো এক মুহূর্তেই শত শত কাজের দায়িত্ব পড়ে যায় উনার মাথায়। যার ফলস্বরূপ ছেলেকে খাওয়ানোর ভার চাপিয়ে দেন ছোট্ট নাজুক কাব্যটার উপর।

আচ্ছা!! ভার চাপিয়ে দেওয়ার আগে বড়ো আম্মা একবারও কি ভাবেন? এই দানবকে খাওয়াতে ঠিক কতোটা পরিমাণ কসরত করতে হয় কাব্যকে? জানেন না বোধয়। সত্যি অর্থে এই লোককে খাওয়াতে খাওয়াতে কাব্যর জান বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়, হাত ব্যথা করে, ঘাড় ব্যথা করে, পিঠের শিরদাঁড়া পর্যন্ত ব্যথায় টনটন করে। মাঝে মাঝে তো ক্লান্তিতে ঘুমও চলে আসে। তবুও মুখ বুজে সবটা মেনে নেয় সে, একটা টু শব্দটুকু করে না।

এতোকিছুর পরেও তার দিকে মন নেই লোকটার। আচ্ছা!! কাব্য ব্যতীত অন্য কেউ কি মেনে নিবে এসব? পারবে মেনে নিতে? লোকটার এই খামখেয়ালি মেনে নেওয়া এতোই সহজ? আজ হয়তো লোকটা তাকে ফেলনা ভাবছে, কিন্তু যখন সে থাকবে না, কপালে একটা কুচুটে বউ জুটবে, তখন ঠিকই কাব্যর অভাব বুঝতে পারবে এই লোক। তখন শত খুঁজলেও পাবে না তাকে। না খেয়ে মরে গেলেও বিবাহিত লোকের দিকে ফিরে তাকাবে না কাব্য।

এসব নানান আজগুবি ভাবনা ভাবতে ভাবতে আরবিদকে খাওয়াচ্ছিলো কাব্য। হুট করেই ভাবনার ঘোর কাটাতে কানের কাছে একখানা বেশ বড়ো ধমক পড়লো—

“খাবার কই ধরে রেখেছো?”

ধমক শুনে কাব্যশ্রী তড়িৎ গতিতে নিজের হাতের দিকে তাকালো। ভাতের লোকমা ধরে রেখেছে আরবিদের কানের কাছে। তৎক্ষণাৎ অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো মেয়েটা। দ্রুত গতিতে নিজেকে ঠিক করে আরবিদের মুখের সামনে খাবার ধরে বললো—

“দুঃখিত!! খাওয়া ছেড়ে উঠবেন না, দয়া করে। আর ভুল হবে না।”

অন্যদিন হলে এতোক্ষণে খাবার ছেড়ে উঠে পড়তো আরবিদ। আজ পেটে খিদা থাকায় উঠলো না, চুপচাপ লোকমাটা মুখে তুলে নিলো। কাব্যশ্রী ধরেই নিয়েছিলো আরবিদ বোধয় আরও একটা ধমক দিয়ে খাওয়া ছেড়ে উঠে দাঁড়াবে। তবে ভাবনা ভুল হতে দেখে কিছুটা স্বস্তি পেলো কিশোরী। এই পর্যায়ে মনোযোগ দিয়ে একটার পর একটা লোকমা এগিয়ে দিতে থাকলো আরবিদের মুখের সামনে। অনেকটা সময় নিয়ে খাওয়ানোর পর খাবার যখন শেষের পথে, তখন শোনা গেলো দানবীয় লোকটার শান্ত স্বর—

“রাতে খেয়েছো?”

চোখ তুলে তাকালো কাব্যশ্রী, চোখ দেখেই বোধহয় বুঝতে পারলো আরবিদ। তাই উত্তর না শুনেই নিজ উদ্যমে বললো—

“বাকিটা খেয়ে নাও, আমি আর খাবো না। খাওয়া শেষ হলে পা টা টিপে দিয়ে যেও।”

বলেই গ্লাস ভর্তি পানিটা খেয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। পরপর বইয়ের আলমিরার কাছে গিয়ে ফটক খুলে দুটো বই নিয়ে বিছানায় আধশোয়া হয়ে শুয়ে পড়লো, চোখে আটলো কালো ফ্রেমের চশমা। পরপরই মনোযোগ দিলো বইয়ের ভিতরে।

কাব্যশ্রী তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো সবটা। মুখের ভিতরটা কেমন তিতখুটে ঠেকছে। এতোটা সময় নিয়ে এই দানবকে খাওয়ানোর পর এখন নাকি আবার পা টিপে দিতে হবে। কাব্যশ্রী চোখ-মুখ কুঁচকে অবশিষ্ট মাখানো ভাত নিজের জন্য লোকমা বানাতে বানাতে নিচু স্বরে আওড়ালো—

“আমার বাম হাত কাটা, আপনাকে খাওয়াতে খাওয়াতে ডান হাতেও ব্যথা করছে। কিভাবে—”

কথা ফুরাবার আগেই চশমার আড়াল থেকে ভ্রু কুঁচকালো আরবিদ। শক্ত কণ্ঠে উত্তর করলো—

“পা দিয়ে পারা দিয়ে যাও।”

এরপর আর কি বলবে কাব্য? কিছু বলার নেই। এই কাজটাও তো নতুন নয়। তার যখন ছয় বছর, তখন তো এই দানবের ২১ বছর। ঢাকা থেকে ফিরলেই তাকে বোকা পেয়ে ধমকে-ধামকে পা পারিয়ে দেওয়ার আদেশ জারি করতো। কখনো কারোর কথা অমান্য না করা কাব্যটা দুটো ধমক শুনেই এই বদমাশ লোকের সব কাজ করে দিতো। বিনিময়ে কিছুই পেতো না, কোনোদিন দুটো টাকাও দেয়নি তার হাতে, উপহার দেওয়া তো দূর। তবুও খুব একটা আফসোস নেই কাব্যর। সে এই লোকটাকে ভালোবাসে, অসম্ভব এবং নিঃস্বার্থ। বিনিময়ে একটু সান্নিধ্য ব্যতীত কিছুই লাগবে না তার। ভেবেই তপ্ত শ্বাস ফেললো কিশোরী।

জগৎ-সংসার কি জানে? কাব্য তার একটা জীবন শুধু তার দেওয়ান সাহেবের খাতিরেই বিনষ্ট করে দিতে প্রস্তুত?

,,,, চলবে...

আমার মতো সারাক্ষণ কথায় কথায় ইংলিশ ঝাড়া মেয়েটা ৯০ দশকের কাহিনি লিখছে... হাহ!! বিশ্বাসই হয় না। মানুষ বাংলা থেকে ইংরেজি ট্রান্সলেট করে আর আমি ইংলিশ থেকে বাংলায় ট্রান্সলেট করে করে লেখি। আসলে, জীবনটাই ব্যদনা।

যাই হোক, লেখার ফাঁকে ভুলে-টুলে ইংরেজি পেয়ে গেলে কিছু মনে নিবেন না, কারণ আমি লেখালেখিতে প্রায় নতুন। প্রথম ৯০ দশক নিয়েই লিখছি। হয়তো ২০, ২৫ পর্ব গেলে ঠিক হয়ে যাবে।

আর হে, সবাই প্লিজ গল্প বিষয়ক কমেন্ট করে যাবেন। ইনশাআল্লাহ!! আমরা খুব শীঘ্রই গল্পের মূল কাহিনিতে ঢুকবো, তবে ধীরে ধীরে। আমি লেখালেখি নিয়ে তাড়াহুড়ো পছন্দ করি না। ধীরে ধীরে এগুলে আপনারাও পরিস্থিতি ফিল করতে পারবেন আর আমিও ফিল করাতে পারবো।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন