#দেওয়ান_সাহেব ( পর্বঃ ৫)
#লেখনিতে_রুপান্জলি
#ট্রাজেডি_জাস্টিস
,,, মাঝে কেটেছে দুটো দিন। বিকাল নাগাদ নিবেদিতাকে নিয়ে একটু বের হলো কাব্যশ্রী। মিতালিটার খবর-পাত্তা নেই আজ বারো দিন,, এতদিন পেরিয়ে যাওয়ার পরেও মেয়েটা স্কুলে যাচ্ছে না। এমনকি কাব্যদের বাড়িতেও যায়নি একবার। এমনটা তো সচরাচর হয় না। মিতালি নামক মেয়েটা কাব্যশ্রী আর নিবেদিতার বন্ধু,, একসাথে একই ক্লাসে পড়ে তিনজন। উত্তরপাড়া আর পশ্চিমপাড়া কাছাকাছি হওয়ার দরুন প্রায়ই মিতালি দেওয়ান বাড়িতে আসে। বন্য আপাসহ কাব্য, নিবেদিতার সাথে সময় কাটিয়ে যায়। মিতালির তো মা নেই, মারা গিয়েছে ১৩ বছর আগে। মিতালি তখন দুই বছরের শিশু। এটুকু বাচ্চাকে সামলাতে না পারার অজুহাত দেখিয়ে মা মারা যাওয়ার তিন দিনের মাথায় বাপ বিয়ে করে সৎ মাকে ঘরে তুলেন। অথচ ঐ মহিলা আগে থেকেই সাত মাসের গর্ভবতী ছিল। বাবা ভ্যান চালিয়ে মোটামুটি পরিমাণের টাকা উপার্জন করা সত্ত্বেও সৎ মায়ের ঘরে খেয়ে না খেয়ে বড়ো হয়েছে মেয়েটা, বুঝ হওয়ার পর থেকে বাড়ির সকল কাজকর্ম সেরে তারপর স্কুল গিয়েছে। এখনো তাই হয়ে আসছে,, সকালে ঘুম থেকে উঠার পর রান্না করা থেকে শুরু করে রাতে সৎ ভাই-বোনদের খাইয়ে ঘুম পাড়ানো পর্যন্ত সবটা একা হাতে সামলায় চোদ্দ বছরের কিশোরী। এতোকিছু সহ্য করার পরেও মেয়েটা কখনোই পড়ালেখায় খামতি দেয়নি, বরাবর পড়ালেখা নিয়ে সতর্ক থেকেছে। মিতালির স্বপ্ন, সে পড়ালেখা করে নিজেকে একটা ভালো জায়গায় নিয়ে দাঁড় করাবে, চাকরি করবে, নিজের একটা ঘর হবে, মনমতো একটা বর হবে, একে একে মিলিয়ে কত শত স্বপ্ন যে মেয়েটা দেখে তার ইয়ত্তা নেই। এমন স্বপ্নসম্ভার সম্পন্ন মেয়ের দ্বারা এমনি এমনি স্কুল কামাই করা কতটা যৌক্তিক দায়ক? ভেবে পায় না কাব্য। মেয়েটার কি শরীর খারাপ? নাকি কোনো বিপদ-আপদ হলো? ওর সৎ মা-টা তো ভালো না, কথায় কথায় মারে। কতবার যে মেয়েটার শরীরে মারের দাগ দেখেছে তার ইয়ত্তা নেই। মারের দাগগুলোও অনেক গাড়ো থাকে, গলায়, হাতে, মুখে সবখানেই কেটে-ছিঁড়ে যায়। একবার তো মার খেয়ে তিন দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিল মেয়েটা, এখনো কি তেমন কিছুই হলো? মিতালি ঠিক আছে তো? মনে এত এত প্রশ্ন জাগার পরেও মনকে কোনো রকম উত্তর দিতে পারছিল না কাব্য, চিন্তায় চিন্তায় ভিতরটা অস্থির হয়ে আসছিল। তাই সেই অস্থিরতা কাটাতে ছুটে চলেছে মিতালিদের বাড়ির উদ্দেশ্যে।
হিসেব মাফিক মিতালিদের বাড়িটা পশ্চিমপাড়ায় হলেও তারা সমাজের আওতায় থাকে না। তারা পশ্চিমপাড়া ও উত্তরপাড়ার পাশ দিয়ে বয়ে চলা জমিজমার মাঝখানে বাড়ি বানিয়ে বসবাস করে। ওদিকটায় তেমন একটা বাড়িঘর নেই, রুপা আপার থেকে শুনেছিল ঐ জায়গাটাতে নাকি মিতালির পরিবার একাই বসবাস করে। এই বিষয়টাতেই টুকটাক ভয় হচ্ছে কাব্যর। তারা এর আগে কখনো মিতালিদের বাড়িতে যায়নি। আরবিদ দেওয়ান কাব্যকে কোথাও যেতেও দেয় না, কেমন শাসনে শাসনে রাখে। বন্য আপা যেমন সারাক্ষণ এই ডালে ঐ ডালে ঘুরে বেড়ায়, তেমন চাইলেই কাব্যশ্রী ঘুরে বেড়াতে পারে না। ওকে স্কুল যাওয়া ব্যতীত অন্য কোথাও যেতে দেখলে কিংবা কারোর মাধ্যমে খবর পেলেই চলল। সেদিন আর শান্তি থাকবে না ঘরে,, কাব্যর উপর দিয়ে বড়ো-সড়ো একটা ঝড় বয়ে যাবে নিমিষেই। সেই সাথে কোনো পুরুষ মানুষের ধারও ঘেঁষা যাবে না। ভুলক্রমেও যদি কাব্য কোনো পুরুষের সাথে কথা বলে কিংবা সামনে যায়, তখন আরবিদ দেওয়ান বর্তমানের চেয়েও অধিক পাষণ্ডে পরিণত হয়।
এখনো স্পষ্ট মনে পড়ে, কাব্যর যখন বারো বছর বয়স, এলাকার এক বড়ো ভাই চার আনা দামের একটা আইসক্রিম কিনে দিয়েছিল। সেটা খাওয়ায় সেদিন সারাদিন খাওয়া জোটেনি কাব্যর কপালে। স্কুল থেকে ফেরার পর থেকে পরদিন সকাল হওয়ার আগ পর্যন্ত ঘরবন্দী করে রেখেছিল কাব্যকে। কাব্যর ভাগ্য খারাপ, সেদিন মা-চাচিরাও বাড়ি ছিল না, দুপুরের পর নৌকা করে শাহালাল শাহাপরান মাজারে জিয়ারত করতে গিয়েছিল, ফিরেছে পরদিন সকালে। মেঘ আপা, কুসুম আপা ভয়ে কিছু বলতে পারেনি, বন্য আপা তো তখন কাব্যর বয়সীই।
সেদিন সকালে স্কুলে খেয়ে যায়নি কাব্য, দুপুরেও টিফিন করা হয়নি, ফেরার পথে শুধু আপাদের সাথে মিলে-মিশে একটা আইসক্রিম খেয়েছিল। তারই জের ধরে পাষাণ হয়েছিল মানব। লোকটার পাষাণতার তোপে সারাদিন খেতে না পেয়ে শেষ রাতের দিকে ক্ষুধায় গলা ফাটিয়ে কেঁদেছিল মেয়েটা। আরবিদের মায়া হয়নি। কেমন কাট-কাট গলায় বলেছিল "" তর বাপের দেওয়া আইসক্রিম খেয়ে পেট ভরেনি? এখন আবার খাবার কিসের? আজকে না খেয়ে মরে গেলেও খাবার দেওয়া হবে না তকে ""
বিনিময়ে কাব্য শুধু মাফ চেয়েছে, কথা দিয়েছে আর কারোর থেকে কখনো কিছুটি নিবে না, খাওয়া তো দূর। তখন পাষাণ মানবটা বিকল্প স্বরূপ আরও একটা শর্ত দিয়েছিল """বমি করতে পারলে খাবার দেওয়া হবে,, আগে বমি করে তর বাপের দেওয়া আইসক্রিম ফেল, তারপর খাবার দিবো তকে। ""
এরূপ কথা শুনে কাব্য কাঁদতে কাঁদতে গলায় হাত দিয়ে বমি করার অনেক চেষ্টা করেছিল, কিন্তু বমি হয়নি। সেই দিনটার কথা ভাবলে এখনো আত্মা ছলকে ওঠে মেয়েটার। একটা মানুষ এতটা পাষাণ কিভাবে হতে পারে? একটা বাচ্চা মেয়েকে না খাইয়ে রেখে কি শান্তি পেলেন? ঐ ঘটনার পর কাব্য বহুদিন আতঙ্কে আরবিদের কাছ ঘেঁষেনি, সামনেও পড়েনি, সারাক্ষণ পালিয়ে পালিয়ে থেকেছে। বিনিময়ে কি মারটাই না খেয়েছিল ঘটনার নয় দিনের মাথায়। তাকে ঘরে ডেকে নিয়ে গুনে গুনে চারটা থাপ্পড় মেরেছিল। এই জীবদ্দশায় মানুষটা কাব্যকে ধমকে-ধামকে মেরেই গেলো, কোনোদিন ভালো করে কথা বলেনি। নিজেও কিছু দেয়নি আর কারোর থেকে কিছু নিতেও দেয়নি। কাব্য কতবার অভিমান করে দূরে সরে ছিল, বিনিময়ে কপালে মার আর অশান্তি ছাড়া কিছুই জুটেনি।
,, নিবেদিতা চাচ্ছিল প্রথমে রুপা আপাদের বাড়িতে যেতে, তারপর ওদের বাড়ি থেকে রুপা আপাকে নিয়ে তারপর মিতালিদের বাড়ি যেতে। কিন্তু ওদিক দিয়ে যেতে হলে মসজিদের সামনে দিয়ে যেতে হবে। বর্তমান সময়টা আসরের পরপর, এই সময়টাতে মসজিদে অনেক মানুষ থাকবে, পাড়ার মুরুব্বিদের সামনে পড়লে আব্বাজান, চাচাজান কিংবা দেওয়ান সাহেবের কানে পৌঁছালে বাড়িতে আবার তুলকালাম কাণ্ড ঘটবে। তাই ঝুঁকি নিলো না কাব্য, চুপচাপ মাথায় ভালো মতো ঘোমটা টেনে, গায়ে শাল জড়িয়ে মৃদু পায়ে এগিয়ে চললো বাড়ির পিছনের জমির আইল ধরে। দেওয়ান বাড়ি থেকে চক দিয়ে গেলে মিতালিদের বাড়ি অনেক দূরে, পুরো পনেরো-ষোলো মিনিটের রাস্তা। বিকাল হওয়ার দরুন শুরুর দিকে দু-চারজন মানুষ পেলেও একটু এগুতেই চকটা কেমন শূন্য ঠেকলো। চারদিকটা যেন থম মেরে রয়েছে, তবে গ্রামের মেয়ে হওয়ার দরুন এই নিস্তব্ধতায় বড্ডো অভ্যস্ত ছিল দুবোন। চারদিকে নতুন নতুন সরষে ফুল ফুটেছে, ফুলে ফুলে মৌমাছির গুনগুন আনাগোনা, উত্তর হতে আসা মৃদু বাতাস আর এক ঝাঁক শীত, একরকম ভ্রমণ হয়ে যাচ্ছে দুবোনের।
চক পুরোপুরি নিস্তব্ধ হয়ে উঠতেই দুই বোন মিলে-মিশে অনেকগুলো সুন্দর দেখে সরষে ফুল ছিঁড়ে নিলো, পরপর গুঁজে দিলো একে অপরের কানে। আইল দিয়ে হাঁটার সময় ছোটবেলার ন্যায় ছোটাছুটিও করলো কতক্ষণ। ইসস!! এই মুহূর্তে বন্য আপাটা থাকলে বেশ হতো, মিলে-মিশে মানুষের ক্ষেত থেকে ক্ষীরা, ভাঙ্গি চুরি করে এনে খাওয়া যেতো। কাব্য যতই আদর্শ বুলি আওড়াক না কেন? দিন শেষে চুরির খাবার খেতে ভালোই লাগে। বন্য না থাকলেও চুরি করে খাওয়ার আফসোসটা অপূর্ণ রাখেনি নিবেদিতা। ঠিকই নাচতে নাচতে গিয়ে সামনের ক্ষেত থেকে চারটে ছোট ছোট ক্ষিরা পেড়ে এনেছে। চুরি করতে সফল হয়ে মেয়েটার মুখে কী যে হাসি, ঐ হাসি দেখে কাব্যও হেসেছে কিছুক্ষণ। পরপরই দুবোন গলাগলি করে ক্ষীরা খেতে খেতে এগিয়ে গিয়েছে সামনের দিকে।
এদিকটায় কখনো না আসার দরুন তারা জানতো না চলতি পথে যে গোরস্থান পড়ে। গোরস্থানটা ভীষণ বড়ো আর ভয়ানকও, চারদিকে গাছপালা বড়ো বড়ো হয়ে কেমন জঙ্গলের মতো রূপ ধারণ করেছে। গোরস্থানের পাশ দিয়ে যাওয়ার বেলায় ভয়ে কুঁকড়ে উঠলো দুই বোন। জিন-ভূতের ভয়ে নয়, বরং পুরুষ মানুষের ভয়ে। ঝোপের আড়ালে সাত-আটজন ছেলেপুলে মিলে তাস খেলছে, তাস নাকি জুয়া সেটাও সঠিক বলা যাচ্ছে না। কাব্য আর নিবেদিতা ভয়ে একে অপরের হাত শক্ত করে ধরলো। কোন কুক্ষণে যে তারা এই পথে আসতে গেলো,, এই মুহূর্তে এই ছেলেপুলেরা যদি তাদের কিছু করতেও আসে, তবুও দুবোনের কিছু করার ক্ষমতা থাকবে না। ঠান্ডা মাথায় ধ*র্ষণ করে গোরস্থানে ফেলে রাখলেও কেউ দেখতে আসবে না এটা কোনো ওয়ারিশ লাশ নাকি বেওয়ারিশ। বাড়ির কেউও এদিকটায় খুঁজতে আসবে না তাদের, কারণ বাড়ির কাউকেই জানিয়ে আসা হয়নি। জানিয়ে আসলে হয়তো এই বিপদের সম্মুখীন হতে হতো না। দেওয়ান সাহেবকে কিছুক্ষণ অনুরোধ করলেই দুজন লোক সমেত যেতে দিতো কিংবা লোক দিয়ে মিতালির খবর এনে দিতো। নিজের সিদ্ধান্তের উপর বড্ডো মনঃক্ষুণ্ণ হলো মেয়েটা।
বড়ো বোন হিসেবে আগলে নিতে চাইলো ১৪ বছরের নিবেদিতাকে। গোরস্থান পার করার বেলায় দুবোনের আতঙ্কিত দৃষ্টি স্থির ছিল জুয়া খেলতে থাকা ছেলেদের দিকে আর ঠোঁটে ছিল আল্লাহর নাম। দুই বোন কোনোরকম আল্লাহ আল্লাহ করতে করতে গোরস্থান পার করে মিতালিদের বাড়ির সামনে গিয়ে থামলো। সেই সাথে অনুভব করলো, এর উল্টো পথ দিয়ে গেলে দুমিনিট হাঁটলেই মাটির রাস্তা। যাওয়ার বেলায় আর কোনো ভুল করবে না কাব্য, প্রয়োজনে দেওয়ান সাহেবের থেকে একরাশ অশান্তি সহ্য করে নিবে, তাও এই বিপদজনক পথে আর না।
মিতালিদের ঘরটা মাটির তৈরি, দুপাশ থেকে দুটো ঘর একসাথে জোড়া লাগানো, মাঝখানটা উঠোন, একপাশে মাটির চুলা, তবে চুলার উপর কোনো ছাউনিও নেই। বাড়িটি অচেনা হলেও এখানে থাকা মানুষগুলো অচেনা নয়। মিতালির সৎ মা, ভাই-বোনদের বহুবার দেখেছে কাব্য। আর ওর আব্বা তো বড়ো আব্বার কর্মচারী, সকাল-বিকাল ক্ষেত থেকে মাল আনা-নেওয়া করে। সবার সাথেই টুকটাক সাক্ষাৎ রয়েছে দুবোনের। সেই ভরসা থেকেই বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলো দুজন।
টিনের গেইট ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই দেখলো মিতালির মা শলার ঝাড়ু দিয়ে উঠোন ঝাড়ু দিচ্ছে। মুহূর্তেই হাসি ফুটলো দুবোনের মুখে, ভালোই হলো বাহিরে পেয়ে গিয়েছে, নয়তো ডাকাডাকি করতে হতো। নিবেদিতা ঠোঁটে হাসি ফুটিয়েই কিছু বলতে নিবে, তখনই তাদেরকে অবাকের চরম সীমানায় পৌঁছে দিতে একপাশের ঘর থেকে লুঙ্গি ঠিক করতে করতে বেরিয়ে এলো জেলে পাড়ার মুমিন কাকা। লোকটা বের হতেই এক গাল হেসে তার দিকে এগিয়ে গেলেন মিতালির সৎ মা। মুমিন নামক লোকটাও কেমন এক গাল হেসে লুঙ্গির ভাঁজ থেকে টাকা নিয়ে মিতালির সৎ মায়ের হাতে ধরিয়ে দিলো।
মুহূর্তেই কাব্যর ভ্রু যুগল গুটিয়ে এলো, এই লোকটাকে কাব্য চেনে, দেওয়ান বাড়িতে রোজ রোজ মাছ দিতে যায়। এই লোকটা এখানে কী করছে? আর কিসের টাকা দিলো মিতালির মাকে? নিবেদিতার মনেও একই প্রশ্ন। সন্দেহের তোপে দুবোন কেমন চোখ ছোট ছোট করে একে অপরের দিকে তাকালো। তক্ষুনি কানে বাজলো মুমিন নামক লোকটার আশ্চর্যন্মিত কণ্ঠস্বর-- এরা এখানে কী করছে?
,,, সঙ্গে সঙ্গে ওদের দিকে নজর তাক করলো মিতালির মা, মহিলা কেমন অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো যেন। তবে মুমিন লোকটার দৃষ্টি নিবেদিতার দিকে স্থির। মেয়েটা একটু মোটা-সোটা কিনা? কাব্য অনুভব করলো লোকটার দৃষ্টি বাজে, নিবেদিতাও বুঝতে পেরেছে ব্যাপারটা। সাথে সাথে নিজেকে চাদর দ্বারা আরও খানিকটা গুটিয়ে নিলো কিশোরী। মুহূর্তেই মুমিনের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালো কাব্য, দাঁতে দাঁত পিষে কটমট করে চোখের ইশারায় বুঝালো "" দৃষ্টি সংযত কর,, তুই আমাদের বাড়িতে খেটে খাওয়া কর্মচারী,, জান নিয়ে নিলে প্রশ্ন তোলার মতো কারোর স্পর্ধায় কূলবে না "" কাব্যর দৃষ্টির মানে বুঝতে পেরে চোখ সরিয়ে নিলো মুমিন। পরপরই চুপচাপ হাঁটা দিলো বাহিরের দিকে। মুমিন চলে যেতেই শান্ত হলো কাব্য,, নিবেদিতাও নিজের মাঝে হওয়া হাঁসফাঁসটুকু দমিয়ে নিলো। এ আর নতুন কী? চলতি পথে বাচ্চা, বুড়ো, মধ্যবয়স্ক, কত লোকের বাজে দৃষ্টি সহ্য করতে হয়। মেয়ে হয়ে জন্মেছে না? মেয়েরা তো অবলা আর ছেলেরা হচ্ছে সব শক্তির অধিকারী। তারা চাইলেই যেকোনো বয়সে নারীকে ভেঙেচুরে ধ্বংস করে দিতে পারে। ভেবেই তাচ্ছিল্য হাসলো কিশোরী,, তন্মধ্যে শোনা গেলো কাব্যর আগ্রহভরা স্বর,, সে মিতালির মায়ের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়লো ---- মিতালি কই চাচি? ওকে একটু ডেকে দিন।
,,,, মহিলাটি এতক্ষণ ওদের দুবোনের দিকেই ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে ছিলো,, হয়তো আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলো তারা এমন একটা প্রশ্ন করবে। মহিলা কেমন অপকটেই অসন্তোষভরা কণ্ঠে উত্তর করলো -- মিতালি? ওরে দিয়া কী কাম? ওর কাছে কী জন্য আইছো?
,,, কাব্যশ্রী বুঝলো মহিলা তাদের পছন্দ করছে না, অন্যদিন হলে তো কত আম্মা আম্মা করে,, তোষামোদ করে বাড়িতে আসতে বলে। আজ হঠাৎ এমন আচরণ করছে কেনো? সত্যি সত্যি বাড়ি বয়ে এসেছে বলে? নাকি অন্য কোনো ব্যাপার আছে? মিতালির কথা ভেবে আপাতত খারাপ ব্যবহারটা গায়ে মাখলো না দুবোন। নিবেদিতা উত্তর করলো -- তেমন কোনো কাজ নেই চাচি,, শুধু একটু দেখা করতে চাচ্ছিলাম। দশ-বারো দিন যাবত স্কুলে যায় না, ওকে কি আর স্কুলে পাঠাবেন না? পড়ালেখা,,
,,, নিবেদিতার বাক্য ফুরাবার আগেই খেঁকিয়ে উঠলো মিতালির সৎ মা -- পড়ালেখা আবার কী? যথেষ্ট বয়স হইছে, এইবার বিয়া দেওনের কাম। বিয়া দিয়া দিমু।
,,, কিন্তু চাচি,, মিতালি তো পড়ালেখা করতে চায়৷
,,, কাব্যর কথাটা যেনো কানেই তুললো না রমণী, আবারও কোমর বাঁকিয়ে উঠোন ঝাড়ু দিতে দিতে আওড়ালো -- হেইর চাওন না চওনে কী আয়ে যায়? খায় আমার জামাইরডা, আমি যা কমু তাই হইবো। আর তোমরা এইখানে কী করো? তোগো বাপ-চাচায় জানে তোমরা যে এইখানে আইছো? বাড়িত যাও,, আমার মেলা কাম পইরা আছে।
,,, বাবা-চাচার কথা তোলায় কিছুটা ভয় পেলো নিবেদিতা, তবে কাব্যর চোখে কৌতূহল। সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে পুরো বাড়িটা পর্যবেক্ষণ করছে। মিতালিরা সৎসহ তিন বোন, এক ভাই। মিতালির পিঠাপিঠি বোনটা নানির বাড়িতে থাকে, এর ছোটটার বয়স সাত, তার পরেরটার বয়স তিন। তিন বছরের ছেলেটা উঠোনের এক পাশে মাটি নিয়ে খেলছে,, বোনটা কোথায়? বোনের খোঁজ করতে বাড়ির ভিতরের দিকে উঁকি-ঝুঁকি দিতেই দেখলো, মুমিন কাকা যেই ঘর থেকে বের হয়েছে, তার অন্য পাশের ঘরের ঝানালা দিয়ে ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে এক জোড়া নিষ্পাপ চোখ। এই চোখের ভাষা বুঝতে পারলো না কাব্য, কেমন ভাষাভাসা দৃষ্টি, যেনো কত শত কথা লুকিয়ে আছে এই চোখে। কাব্যকে এরকম উঁকি-ঝুঁকি দিতে দেখে ফের ধমকে উঠলো রমণী -- এমনে উঁকি-ঝুঁকি দিতাছো কেন মাইয়া? চুরি করবার আইছো?
,,, এই পর্যায়ে ক্ষেপে গেলো নিবেদিতা, কত বড়ো সাহস তাদের চোর বলে। মেয়েটা রাগের তোপে ফোঁসফোঁস করতে করতে কিছু বলতে নিতেই হাত চেপে ধরলো কাব্য, চোখের ইশারায় শান্ত হতে বলতেই নিভে গেলো নিবেদিতা। কাব্যশ্রী আবারও ঠান্ডা মাথায় উত্তর করলো --- চাচি!! আপনে ভালো করেই জানেন আমরা কোন বাড়ির মেয়ে, তাই চুরি প্রসঙ্গটা না টানি? আমরা একটু মিতালির সাথে দেখা করতে চাই, মিতালিকে ডেকে দেন, কথা বলেই চলে যাবো।
,,, মহিলাটি কেমন ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকালো -- মিতালি নাই, হেইর খালার বাইত গেছে। আসলে কমুনে তুঙগো বাইত যাইতে। এইবার যাও, বাড়ি খালি করো।
,,, কিন্তু,,
,,, নিবেদিতা কথাটুকু শেষ করতে পারেনি, তার আগেই হাতের ঝাড়ুটা তাদের দিকে ছুড়ে মারলেন রমণী, তৎক্ষণাৎ পিছিয়ে গেলো দুবোন। মহিলা কেমন ফোঁসফোঁস করতে করতে আওড়ালো --- এই মাইয়ারা, আমার বাড়ি থাইক্কা যা, আর কোনোদিন জানি তগোরে এই বাড়ির আশেপাশেও না দেখি।
,,, মহিলাটির খারাপ ব্যবহার আর নিতে পারলো না নিবেদিতা, ইচ্ছা করলো ঝাড়ুটা তুলে মহিলাকে মন ইচ্ছামতো দু-পাঁচটা দিয়ে যেতে, কিন্তু সেটা পূর্ণ করতে পারলো না। অচেনা, শুনশান জায়গায় মাতব্বরি করার ফলে যদি কোনো বিপদ-আপদ হয়, সেই ভয়ে। অগত্যা কাব্যর হাতখানা টেনে ধরলো, টানতে টানতে আওড়ালো -- চলে আয় কাব্য, মহিলা একটা বদমাশ।
,,, কাব্যও বাধা দিলো না, আবার যেতেও চাইলো না, তার কেনো যেনো মনে হচ্ছে মিতালি বাড়িতেই আছে, কিন্তু ওর মা বলতে চাচ্ছে না। সে স্পষ্ট লক্ষ করেছে, মহিলা তাদের দেখে প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিলো, এমনকি এত করাগ দেখানোর বেলায়ও মহিলাটির চোখে-মুখে স্পষ্ট ভীতি দেখেছে কাব্য।
*******
,,, সকাল ৬টা বেজে ২২ মিনিট,,
,,, শিশিরে ভেজা স্নিগ্ধ ভোর, শীতল বাতাস, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা লম্বা খেজুর গাছ হতে ধেয়ে আসা খেজুরের রসের মিষ্টি ঘ্রাণ—সবে মিলিয়ে মন-মস্তিষ্ক তরতাজা করে দেওয়ার মতো একটি পরিবেশ। এমন পরিবেশে গায়ে চওড়া লেপ জড়িয়ে শুয়ে থাকার কথা থাকলেও কর্মব্যস্ত মানুষদের দ্বারা তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাদেরকে ছুটতে হয় নিজের কর্মের উদ্দেশ্য। উদাহরণস্বরূপ,, এক গাদা শাক-সবজি কেটে কর্মচারীদের দিয়ে বাজারে পাঠিয়ে চক থেকে উঠে এলেন মাহমুদুল দেওয়ান, মাহবুবুর দেওয়ান গিয়েছেন বাজারে। অন্য দিনগুলোতে শাক-সবজি কেটে বাজারে পাঠানোর কাজটা আরবিদ করলেও আজ ছেলেকে বাড়ি থেকে বের হতে দেননি রাহিমা বেগম। ছেলের হাত কেটে যাওয়ায় কেঁদে-কুটে একশা করে ছেলেকে বাড়িতেই রেখে দিয়েছেন। এমন নয় যে আরবিদের আগে কখনো হাত কাটেনি, ফসলাদি কাটতে গিয়ে বহুবার হাত কেটেছে, তবে এইবার কিছুটা ব্যতিক্রম। ছেলেটার হাতের ক্ষত বিশাল, ডান হাতের তালুর চামড়া ফেটে সাদা মাংসল জায়গাটা পর্যন্ত ফেটে গিয়েছে। তিন দিন আগে হাত কেটেছে, অথচ এক টুকরো ওষুধ লাগায়নি হাতে, যার ফলস্বরূপ ঘা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। রাহিমা বেগম বহুবার হাতে ওষুধ লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ছেলের রাগের কাছে টিকতে পারেননি। যদিও মাহমুদুল দেওয়ান হাতের ক্ষতটা স্বচক্ষে দেখেননি, তবে অর্ধাঙ্গিনীর থেকে শুনেছেন। বিষয়টা জানতে পেরে বরই ব্যথিত হয়েছেন মানব। অতীতে করা ভুলের জন্য বাবা-ছেলের মাঝে যতই দূরত্ব থাকুক না কেনো? ছেলেকে খুব ভালোবাসেন মাহমুদুল দেওয়ান। একটা মাত্র ছেলে বলে কথা। হয়তো ছেলেটা সেসব বুঝতে চায় না, মানতেও চায় না, তবুও তো বাবারা বাবা-ই হয়। এসব নানাবিধ ভাবনায় মশগুল মাহমুদুল দেওয়ান আনমনে মাটির পথ ধরে বাড়ির পথে হাঁটছিলেন। আকস্মিক পিছন থেকে কারোর পদাচরণের শব্দ ধেয়ে আসতেই ধ্যানচ্যুত হলেন তিনি। কৌতূহলবশত পিছন ফিরে তাকাতেই মাস্টার বাড়ির বর্তমান উত্তরাধিকারীকে এগিয়ে আসতে দেখে ঠোঁট প্রসারিত করে হাসলেন। এই ছেলেটার জন্য ভীষণ মায়া হয় উনার,, সাত বছর বয়সে ভাষা আন্দোলনের সময় বাবাকে হারিয়েছে,, মাকে হারিয়েছে নয় বছর বয়সে। এরপর থেকে দাদুর কাছে বড়ো হয়েছে, দাদুটাও মারা গেলেন বছর দেড়েক আগে। বর্তমানে আপন বলতে তেমন কেউ-ই নেই। অতীতে দেওয়ান বাড়িতে মাস্টার বাড়ির লোকেদের বেশ আনাগোনা থাকলেও ইদানীং সেসবের বালাই নেই। যখন রেজওয়ানের মা বেঁচে ছিলেন, তখন দিনের বেশিরভাগ সময় আরবিদ আর আরহানের সাথেই সময় কাটিয়েছে ছেলেটা। তখন রেজওয়ান এতটা খিটখিটে, একঘেয়ে ছিলো না, বরং প্রাণোচ্ছল ছিলো। এরপর যেদিন রেজওয়ানের মা মারা গেলো, নাহ!! ঐ ভয়ানক দিনটার কথা ভাবতে চাইলেন না ভদ্রলোক। ভাবতে গেলেই যে আত্মাটা ধরফর করে ওঠে। রেজওয়ানের বাবা-মায়ের অকালমৃত্যুর কথা স্মরণে আসায় ভার হওয়া মনটাকে সামলে নিলেন মাহমুদুল দেওয়ান। নজর স্থির করলেন সামনের যুবকের পানে। উল্টো পথ হতে পিঠ পিছে দুহাত বেঁধে এগিয়ে আসছে রেজওয়ান, কপালের মধ্যভাগে জন্ম থেকে পাওয়া সেই চিরচারিত একখানা ভাঁজ স্পষ্ট,, পরনে চেকের সাদা লুঙ্গি আর বেগুনি রঙা শার্ট, পথভ্রমণে বেড়িয়েছিলো বোধহয়। ছেলেটা প্রতিদিনই সকাল সকাল নামাজ পড়ে গ্রামের রাস্তাটা চক্কর কাটে,, এতে নাকি শরীর-স্বাস্থ্য ভালো থাকে। এদিকটা ঠিকই আছে, শিক্ষক মানুষ, সারাদিন শুয়ে-বসে কাটায়, এক বেলা না হাঁটলেই নয়। কিছু সময়ের মাঝেই সামনাসামনি হলো দুজন, চোখাচোখি হতেই মাহমুদুল দেওয়ানের ঠোঁট জোড়া আরও খানিকটা প্রসারিত হলো। তবে হাসলো না রেজওয়ান। মূলত সে খুব একটা হাসতে জানে না, হাসেই না একপ্রকার। তবুও কী মনে করে যেনো কিছু সময় পর আকস্মিক ঠোঁট জোড়া অল্প বাঁকালো। সবসময় মুখ দিয়ে বের হওয়া তিক্ত কথার বানটা সামলে কণ্ঠ স্বাভাবিক করে আওড়ালো-- আপনাকেই খুঁজছিলাম চাচা, গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা ছিলো। ভালোই হলো দেখা হয়ে গিয়েছে,, হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি?
,,, মাহমুদুল দেওয়ান চোখের ইশারায় সায় জানালেন, পরপরই সামনের দিকে হাঁটা দিলেন দুজন। রেজওয়ান একমনে এগিয়ে যাচ্ছে, চলন-বলন বড়ই নিখুঁত, একদম মুগ্ধ হওয়ার মতো। হয়তো চেহারাটা তেমন সুন্দর নয়, মায়া-মোহাব্বতের কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না, তবুও চারিত্রিক দিক থেকে মাস্টার বাড়ির ছেলের তুলনা দ্বিতীয়টি হয় না। ভদ্রলোক আড়চোখে রেজওয়ানকে পরখ করতে করতে আগ বাড়িয়েই বললেন--- আমার ভাতিজির নামে বিচার দেওয়া ব্যতীত যা খুশি বল। মেয়েটাকে শাসন করার যো নেই, তিন দিন ধরে জ্বরে ভুগছে, এক বেলা সেরে উঠলে অপর বেলায় আবারও ঝেঁকে ধরে।
,,,, রেজওয়ান মনে মনে তপ্ত নিশ্বাস ফেললো, এর আগে বহুবার নালিশ করেছে ঐ মেয়ের নামে। শুধু মাহমুদুল দেওয়ানই নয়, বরং মাহবুবুর দেওয়ান, আরবিদ দেওয়ানের কাছেও জানিয়েছে বিষয়টা। সেই সাথে ঐ মেয়ের সাথে করা প্রতিনিয়ত খারাপ ব্যবহারগুলো তো রয়েছেই। এতোকিছুর পরেও মেয়েটাকে থামানো যাচ্ছে না। এদিকে মেয়েটা বড়ো হওয়ার সাথে সাথে লোকের কটু কথা বলার ধরন বাড়ছে। সামনাসামনি কিছু না বললেও আগ-পিছে মন্দ কথা রটাচ্ছে। বিষয়গুলো কানে আসে রোজওয়ানের, তাই আপাতত এই মেয়েকে নিয়ে অতিষ্ঠ রেজওয়ান। সেই অতিষ্ঠ ভাব কণ্ঠে ঢেলেই উত্তর করলো -- মূলত, এটাই বলতে চাচ্ছিলাম আমি। আপনার ভাতিজির উপদ্রব দিনকে দিন বেড়েই চলেছে, ভাতিজিকে সামলান।
,,, মাহমুদুল দেওয়ান যেনো প্রস্তুতই ছিলেন কথাটা শোনার জন্য, তাই আগে ভাগে উত্তরও তৈরি করে রেখেছেন। তিনি কেমন তপ্ত নিশ্বাস ফেলে আওড়ালেন-- মেয়েটার আচার-আচরণে আমরা সকলেই অসন্তুষ্ট,, এমন নয় যে আমার বাড়িতে ফলের গাছ নেই। দু-চারটে ফলের বাগান থাকা সত্ত্বেও বাড়ির চারিধারে সব ধরনের গাছ লাগিয়েছি। কিন্তু মেয়েটা তর বাড়ির ভিটা ছাড়তে চায় না। কতই নিষেধ করেছি, কথা না শুনলে কতবার বলা যায়?
,,, উপরের ঠোঁট দিয়ে নিচের ঠোঁট জোড়া চেপে ধরলো রেজওয়ান, মনে মনে কিছুটা সমাধান হাতড়ালো,, কী করলে এই মেয়ের উপদ্রব থেকে বাঁচা যায়? অনেক ভেবেও আশানুরূপ কোনো উত্তর পেলো না মানব। অগত্যা গাড়ো নিশ্বাস ত্যাগ করে সর্বশেষ উপায়টা আওড়ালো -- শুনেন চাচা!! একটা ভালো কথা বলি।
,,, এই পর্যায়ে বরই মনোযোগী হলেন মাহমুদুল দেওয়ান,, নজর স্থির করলেন লাল ফর্সা মুখমণ্ডলে। এহেন চাহনিতে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো বোধয় ছেলেটা। তার মতো পুরুষের মুখে এমন একখানা বাণী মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়, তবুও বলাটা উচিত। রেজওয়ান দুবার গলা খাকারি দিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করলো, মুখটাকে শাসন-বারণ করে বুঝালো কথাটা সুন্দর করে বলতে হবে, অন্তত এই কথাটা তিক্ত স্বরে বলা যাবে না। মুখটাকে শাসন-বারণ করার পর সহজ কণ্ঠে আওড়ালো -- আপনাদের বাড়ির চোরটাকে আমার বাড়িতে দিয়ে দেন,, অন্য কোথাও দিয়েও রাখতে পারবেন না। ঠিকই আমার বাড়ির ফলের ঘ্রাণ ধরে ধরে দিন-দুপুর শ্বশুরঘর ছেড়ে পালিয়ে আসবে, তখন বদনাম হবে আমার।
,,, বলেই চোখ ঘুরালো রেজওয়ান, এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিজেকে ঠিক রাখতে চাইলো, সেই সাথে প্রত্যাখ্যান হওয়ার জন্যও নিজেকে প্রস্তুত করলো। দেওয়ান বাড়ির মেঝো মেয়ে মারাত্মক সুন্দরী, এক কথায় বোনেদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর সে। এমন একটা মেয়ের জন্য নিশ্চয়ই তার মতো চেহারা খারাপ, শ্যামলা গায়ের রং আর খিটখিটে একজন পুরুষকে বেছে নিবেন না তার বাবা-চাচা। রেজওয়ানের অপ্রস্তুততার মাঝেই শোনা গেলো মাহবুবুর দেওয়ানের গম্ভীর কণ্ঠস্বর--- তুই কি কোনোভাবে আমার বাড়ির মেঝো মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছিস?
,,, রেজওয়ান ফিরে তাকালো, মুহূর্তেই চোখাচোখি হলো দুজনার। এই পর্যায়ে নিজের খিটখিটে ভাবটা আটকে রাখতে পারলো না মানব। ভালো করে কথা বলার গুষ্টিকে তুষ্টি করে দিয়ে কেমন ফ্যাফ্যাসে গলায় আওড়ালো -- আমি অত ঘুরায়-পেঁচায় কথা বলতে পারি না চাচা। যা বলার সোজা-সাপ্টা বলছি,, দাদায় বেঁচে থাকতে আপনার ভাতিজিকে মিষ্টি বলে সম্বোধন করেছিলো। আপনাদের বাড়িও যেতে চেয়েছিলো, তবে আর যাওয়া হয়নি। এখন যখন উপায়-অন্তর দেখছি না, তখন দাদার কথাই থাক, দিয়ে দেন ভাতিজিরে। চুরি-চামারি করে আর কয়দিন,, আসার হলে অধিকার নিয়েই আসুক। কিছু খাওয়ার হলে অধিকার নিয়েই খাক।
,,, মাহমুদুল দেওয়ান আজ বুঝলেন, ছেলেটাকে মানুষ এমনি এমনি রশ-কষহীন খিটখিটে পুরুষ বলে না। এভাবে কেউ বিয়ের কথা বলে? তাও আবার তার চাঁদের মতো সুন্দর ভাতিজিকে? কোথায় ভেবেছিলেন বাপ-মা মরা ছেলে যেহেতু, সেহেতু অত কিছু না ভেবে ভাতিজীকে দিয়েই দিবেন, কিন্তু ছেলের ব্যবহার দেখো। সারাক্ষণ এরকম খিটখিট করলে বন্যকে দুদিনও আটকে রাখতে পারবে না, মেয়ে সব ছেড়ে-ছুড়ে দেশান্তর হবে, তাও ওর সংসার করবে না। অগত্যা চোখ-মুখ অন্ধকার করে নিলেন মানব, প্রয়োজনের তুলনায় বাড়িয়ে দিলেন পায়ের গতি। মাহমুদুল দেওয়ান রেজওয়ানকে ছাপিয়ে অনেকটা দূরে চলে যাওয়ার পর সম্বিত ফিরে পেলো রেজওয়ান। বড়ো বড়ো কদম ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়া মাহমুদুল দেওয়ানের দিকে তাকিয়ে কেমন অবাক কণ্ঠে শুধালো -- কিয়োও চাচা!! ভাতিজি দিবেন না? ভালোয় ভালোয় বলছি, সসম্মানে দিয়া দেন, নয়তো আরও একবার আমার বাড়িতে এলে হাত-পা ভেঙে বিয়ে করে রেখে দিবো।
,,, বড্ডো অনীহা নিয়ে ফিরে তাকালেন মাহমুদুল দেওয়ান, গলা উঁচিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন-- তর মতো খিটখিটে পুরুষের কাছে মেয়ে বিয়ে দিলে আমাদের মেয়ে কোনোদিন শাশুড়ি-ননদের অভাব বুঝবে না। খিটখিটা বাদর একটা।
,,,, বলেই সামনে ফিরে ফের হাঁটা দিলেন, পায়ের গতি আগের চেয়েও তীব্র। ভ্রু কুঁচকালো রেজওয়ান, সহসা কপালে ভাঁজ পড়লো তিনখানা। কথাটা দ্বারা কী বুঝাতে চাইলো? সে উনার ভাতিজিকে একাই শাশুড়ি আর ননদের মতো অত্যাচার করবে? বাজে ব্যবহার করবে? রেজওয়ানের ইচ্ছা করলো খাঁটি বাংলা ভাষায় দুটো গালি ঝাড়তে, কিন্তু ঝাড়া যাবে না। অন্তত দেওয়ান বাড়ির মেজো মেয়েকে কবুল করার আগ পর্যন্ত নিজের এই চিড়তার মতো গুণটাকে মাটি চাপা দিতে হবে। অগত্যা সে এই পর্যায়ে ফের গলা উঁচিয়ে আওড়ালো--
,,, সন্ধ্যায় আপনার ভাতিজিকে দেখতে যাবো, সাজগোজ করিয়ে রাখবেন। কথাবার্তা নাহয় এক বসাতেই সেরে ফেললাম।
,,, উত্তর করলেন না মাহমুদুল দেওয়ান,, ফিরেও তাকালেন না, কেমন হনহন করে এগিয়ে গেলেন সামনের দিকে। রেজওয়ানও এবার পায়পর গতি কমিয়ে দিলো। এই তো আরেকটু হাঁটলেই সরকের মোড়ে তার বাড়ির গেইট। অযথা জেঠা শ্বশুরের পিছু নিয়ে লাভ নেই।
***********
,,, বেলা ৭টা বেজে ৫৭ মিনিট। উঠোনের মাঝখানে চেয়ার পেতে বসে আছে আরবিদ, তার সামনে ছোট একখানা টেবিল পাতা। সেই টেবিলের উপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে হিসাবের খাতা, চোখে চশমা এঁটে সেই খাতায় গটগট করে কলমের আঁচড় ফেলে হিসাব মিলাচ্ছেন মানব। তার যে দুদিন আগে হাত কেটেছে, সেই হাতে ওষুধ না লাগানোর ফলস্বরূপ যে ঘা বেড়েছে, তাতে কোনো ধ্যানজ্ঞান নেই। সে নিজের মতো নিজের কাজে ব্যস্ত।
,, জমিদারি প্রথা আইনত চুকে যাওয়ার পরপরই নিজেদের জমি নিয়ে কাঁচামালের ব্যবসা শুরু করেন মাহমুদুল দেওয়ান ও মাহবুবুর দেওয়ান। দু ভাই মিলে মোটামুটি আকারে ব্যবসাটা চালিয়ে নিলেও আরবিদ পারিবারিক ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার পর অনেক কিছুই পাল্টে গিয়েছে। এই কয়েক বছরেই বাবা-চাচার থেকেও অধিক সুফল কামিয়েছে মানব,, সিলেট শহরের কাজিরবাজার থেকে শুরু করে আম্বরখানা বড়বাজার, বন্দরবাজার, সোবহানীঘাটের আড়ত পর্যন্ত প্রতিটি আড়তে আরবিদের বিচরণ। প্রতিটি আড়তে সপ্তাহে দুদিন কাঁচামাল সাপ্লাই দেয় আরবিদ। প্রথমটা বৃহস্পতিবার আর দ্বিতীয়টা সোমবার। হিসাব মাফিক আজকেই শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার দিন, তাই বাড়িতে যেহেতু বসে আছে, সেহেতু আগে ভাগেই হিসাবের কাজটা মিলিয়ে নেওয়া যাক। দুপুরের পর থেকে আবার মাল প্রস্তুত করতে হবে, সেই মাল ভ্যানে তুলে সন্ধ্যা নাগাদ শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হবে। আজ তো দোকানেও যাওয়া হয়নি,, ছোট আম্মা সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে ভাপা পিঠা বানিয়েছেন, সেই সাথে আরবিদের কাটা হাত—সব মিলিয়ে আজ ভালোই অজুহাত পেতে বসেছেন আম্মা। আরবিদ তার জীবদ্দশায় শুধু তিনটে মানুষকে পরোয়া করে এসেছে, তার মধ্যে আম্মা দ্বিতীয়জন। তাই আম্মার কান্নাকাটি, আহাজারি দেখে নিজের মনমতো বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়াটা হয়ে ওঠেনি।
আরবিদ যখন গভীর মনোযোগে কাজ করতে ব্যস্ত, আকস্মিক গালের এক পাশে পানির ফোঁটা এসে ছিটকে পড়লো,, মুহূর্তেই দাঁতে দাঁত চাপলো মানব। ভ্রু কুঁচকে তড়িৎ গতিতে পাশ ফিরে তাকাতেই হাত দশেক দূরে দেওয়ান বাড়ির ছোট মেয়েকে দেখতে পেলো। সদ্য গোসল সেরে উঠোনে এসে নিজের গতদিনের পরিহিত শাড়ি আর আরবিদের দুটো লুঙ্গি দড়িতে মেলে দিয়ে চুলে পেঁচানো গামছাটা খুলে তা মাত্রই গামছা দিয়ে চুলে দুটো বাড়ি বসিয়েছে। মেয়েটার পরনে স্কুলের জন্য বরাদ্দকৃত নীল শাড়ি। লম্বা চুলগুলো ভেজা, যা কোমরের নিচ পর্যন্ত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। গামছা দিয়ে চুলে যতটা বাড়ি বসিয়েছে, প্রতিটি বাড়ি হতে ছিটকে আসা পানি আছড়ে পড়েছে আরবিদের মুখবিবরে। দাঁতে দাঁত চেপে পুরো বিষয়টা লক্ষ্য করলো আরবিদ, কেমন পাগলের মতো চুলে বাড়ি দিচ্ছে দেখো, মাথা খুলে ফেলবে নাকি? মুহূর্তেই ধমকে উঠলো মানব -- তোমার জন্য শান্তিতে কাজও করতে পারবো না কাব্য? কী শুরু করেছো?
,,, আকস্মিক পরিচিত পুরুষের কণ্ঠ শুনে পাশ ফিরে চাইলো কাব্য, তার থেকেও গুনে গুনে দশ-বারো হাত দূরে বসে আছে লোকটা, এতটা দূরে পানি ছিটকে যাবে কাব্য তো ভাবতেই পারেনি। আরবিদ এখনো দাঁতে দাঁত চেপে কাব্যর দিকে তাকিয়ে,, মুহূর্তেই আঁখি নামালো কিশোরী, নিজের চুলগুলো সামলে নিয়ে নরম স্বরে বললো --- বুঝতে পারিনি, দুঃখিত।
,,,, এতে করে আরবিদের রাগ কমলো কিনা জানা নেই, তবে আর কিছুই বলেনি মানব, গালও মুছলো না, বরং সেভাবেই গালে ফোঁটা ফোঁটা পানি নিয়ে আবারও কাজে মন দিলো। কাব্যশ্রীও খুব একটা মন দিলো না ব্যাপারটাতে, আপাতত সে চিন্তিত, মিতালিটার সাথে যতক্ষণ না সামনাসামনি দেখা হচ্ছে, ততক্ষণ শান্তি পাবে না সে।
এর মধ্যে এক গাদা ভেজা জামা-কাপড় নিয়ে হাজির হলেন বাড়ির দুই কর্ত্রী, নিবেদিতা আর বন্যও এলো তাদের পিছু পিছু। তাদের হাতেও নিজেদের ভেজা জামা-কাপড়। গোটা তিন দিন যাবত রোদ না উঠায় ভালোই জামা-কাপড় জমা হয়েছে। এখন হুট করেই রোদ উঁকি দেওয়ায় সবাই নিজেদের ভেজা কাপড়চোপড় নিয়ে হাজির হলো। গোটা তিন দিনের জ্বর ছাড়িয়ে বন্যকে নিচে নামতে দেখে বাড়ির সকলেই বেশ খুশি হয়েছে। এতগুলো দিন মেয়েটার নির্জীবতায় বাড়িটিও কেমন নির্জীব হয়ে ছিলো, আজ নিচে নামতেই বাড়ির মানুষজনসহ প্রকৃতিও কেমন আনন্দে মেতে উঠেছে।
বন্য দড়িতে কাপড় মেলে হুরমুরিয়ে বরই গাছে উঠতে নিতেই ধমকে উঠলেন বিনু ফুপু। রমণী মাদুর আর লাল মরিচ হাতে সদ্যই উঠোনে পা রেখেছেন। এই পর্যায়ে বিনু ফুপুর দেখাদেখি সবাই একে একে কথা শুনালো মেয়েটাকে, তবে সেসব কানে পাতলো না বন্য। ছুটে গিয়ে বিনু ফুপুর থেকে মাদুর নিয়ে সবুজ ঘাসের উপর বিছিয়ে তার উপর পড়ে থাকা লাল মরিচগুলো ঢেলে দিলো।
সেই সময় বাড়ির গেইটে মাহমুদুল দেওয়ানের দেখা মিললো। ভদ্রলোক, গায়ের শালটা হাতের ভাঁজে রেখে দাম্ভিকতার সহিত এগিয়ে আসছেন। সবাইকে উঠোনে দেখে খুব একটা আশ্চর্য হননি। শীতকাল, এটা প্রায়শই ঘটে, রোদের দেখা মিলতেই বাড়ির সবাই গায়ে রোদ মাখতে উঠোনে চলে আসে। স্বামীকে বাড়িতে ঢুকতে দেখে এগিয়ে যেতে চাইলেন রাহিমা বেগম। তবে ইশারায় মানা করে নিজেই এগিয়ে এলেন মাহমুদুল দেওয়ান। স্ত্রীর হাতে ভাঁজ করা শালটা এগিয়ে দিয়ে আড়চোখে চাইলেন খানিক দূরে কাজ করতে থাকা ছেলের হাতের দিকে। এখান থেকেও কাটা হাতের ঘা কিছুটা দৃশ্যমান হচ্ছে, সেই হাতেই কেমন ফটাফট লিখে যাচ্ছে দেখো। বড়ো আব্বার দৃষ্টি অনুসারে কাব্যও তাকিয়েছে সেদিকে,, এখনো পর্যন্ত লোকটা হাতে ওষুধ লাগায়নি, বড়ো আম্মা বারবার গিয়ে ফিরে এসেছে, তবে সে একবারও যায়নি। তার কি একবার যাওয়া উচিত? সে বললে কি মানব ওষুধ লাগাবে? কাব্যর ভাবনার মাঝেই মাহমুদুল দেওয়ান ছেলের থেকে নজর সরিয়ে স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বললেন -- সন্ধ্যায় বন্যকে দেখতে আসবে। আয়োজন করে রেখো।
,,, মাহমুদুল দেওয়ানের এহেন কথায় বাড়ির সকলে কেমন হকচকিয়ে গেলো! বাড়ির বড়ো মেয়েকে রেখে নাকি মেঝো মেয়ের বিয়ে দিবেন, এটা আবার কীভাবে সম্ভব? তবে রাহিমা বেগমের মাঝে তেমন ভাবান্তর দেখা দিলো না। তিনি কেমন কৌতূহলী কণ্ঠে শুধালো -- কোথা থেকে আসবে? কতজন আসবে? যদি বলতেন, তাহলে সুবিধা হতো। এলাকা ভিত্তিক বাধ বিচার মেনে রান্না-বান্না করতাম।
,,, উত্তর করলেন মানব -- ছেলে আমাদের হাতের কাছেরই। রেজওয়ানকে তো চিনোই, মাস্টার বাড়ির ছেলে। সে নিজেই নিজের জন্য বন্যকে দেখতে আসবে, সাথে বরোজোর বাগানের মালি, রান্নার লোক আর দারোয়ান আসবে, এর বাইরে তো ওর আপন বলতে কেউ নেই।
,,,, মাহমুদুল দেওয়ানের মুখ থেকে কথাটা বের হতে দেরি, ধপ করে কোনো কিছু পড়ার শব্দ হতে দেরি হলো না। মরিচভর্তি মাদুরের উপর ঠাস করে পড়ে গিয়েছে বনশ্রী, কেমন বড়ো বড়ো চোখ করে বড়ো আব্বার দিকে তাকিয়ে লম্বা লম্বা শ্বাস টানছে। মুহূর্তেই চোখ উল্টে জ্ঞান হারালো রমণী। আকস্মিক কাণ্ডে কেমন হকচকিয়ে গেলো সবাই,, দিক-বেদিক শূন্য হয়ে ছুটে গেলো মেয়েটার পানে। অথচ নির্বিকারচিত্তে তাকিয়ে আছেন মাহমুদুল দেওয়ান। বন্য যদি দুধ হয়, তাহলে রেজওয়ান হচ্ছে কাঁটা-ওয়ালা আনারস। দুটো একসাথে হলেই বিপদ।
#দেওয়ান_সাহেব ( পর্বঃ ৫.২)
#ট্রাজেডি_জাস্টিস
#লেখনিতে_রুপান্জলি
সারাদিনের হা-হুতাশা, কান্নাকাটি দমিয়ে এই পর্যায়ে একটু ধীরস্থির হলো বন্য, আর কতো কাদবে? মা-চাচিরা তো তাকে পাত্তাই দিচ্ছে না। বিনু ফুপু তো পারছে না দুহাত তুলে নাচতে, খালি বিধবা বলে এখনো নাচন-কুদন বন্ধ রেখেছে। স্বামীটা বেঁচে থাকলে নির্ঘাত এতোক্ষণে স্বামী নিয়ে ধিন তানা নানা, ধিন তানা নানা শুরু করে দিতো। ঐ খাইষ্টাকে সে কিছুতেই বিয়ে করবে না। ঐ লোককে তার সাথে যায়? চেহারা-ছুরতের কথা নাহয় বাদই দিলো, মুখটা কি? সারাক্ষণ খালি নিমপাতা ঝরে। বন্য যদি শখ করেও কোনোদিন ডাকে, এই শুনেন না। ঐ লোক নির্ঘাৎ বলবে, ‘কো ছেরি, কি কবি।’ ভেবেই ফোস ফোস করে উঠলো মেয়েটা, চোখ ছাপিয়ে ফের জল গড়ালো। রাগ সামলাতে না পেরে আকস্মিক উচ্চস্বরে বকে উঠলো অজানায়—‘খাইষ্টার ঘরের খাইষ্টা!! সুন্দর মেয়ে দেখে লোভ সামলাতে পারে না, বুইরা খচ্চর।’
,,, মুহূর্তেই দুরকমের হাসির জোয়ারে কেঁপে উঠলো বন্যর ঘরটা। নিবেদিতা আর কাব্য হাসতে হাসতে এসে বন্যর দুপাশে শুয়ে পড়লো। দুদিক থেকেই জড়িয়ে ধরলো ছোটখাটো ছিমছাম শরীরটা। মুহূর্তেই মুখ তুলে বিরক্তিকর দৃষ্টিতে দুবোনের দিকে তাকালো বন্য, শুধালো—‘তরা কি আমার বোন নাকি শত্রু? তদের মামু-চাচারা আমায় ধরে বেঁধে ঐ খাইষ্টার কাছে বিয়ে দিচ্ছে আর তরা দাঁত কেলিয়ে হাসচ্ছিস? যা, উষ্ঠা না দিতে বের হো আমার ঘর থেকে।’
,,, দুবোন কি তা মানার মানুষ? নির্লজ্জ না তারা? এমনিও বন্য আপা বকলে রাগ হয় না। আমাদের আশেপাশে এমন এমন কিছু মানুষ থাকে, যারা বকলে শুধু হাসিই পায়, মনে ব্যথা হয় না। বড়ো বোনের রাগকে দু-আনার দাম না দিয়ে কাব্য ফের ফিক করে হেসে দিয়ে বললো—‘একদমই বের হবো না, ইসস!! এই প্রথম বাড়িতে বিয়ে হবে, আমি তো অনেক খুশি। ও বন্য আপা, রাজি হয়ে যাও না, মাস্টার মানুষটা কিন্তু খিটখিট্টা হলেও ভালো আছে।’
,,, বলতে বলতে বন্যকে ঝাঁকাতে লাগলো, নিবেদিতাও সামিল হলো এহেন কাজে। দুবোন মিলে মিশে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে যখন বন্যকে অতিষ্ঠ করে ফেললো, তখনই হতাশ ভরা কণ্ঠে আওড়ালো মেয়েটা—‘তরা ভাবতে পারছিস? ঐ খাইষ্টার সাথে আমার বিয়ে হবে, আমি ঐ খাইষ্টার বাড়ি যাবো, একসাথে থাকবো, খাবো, ঘুমাবো। খচ্চরের বাচ্চায় আমার কাছে আসবে, ছুঁবে, আমি ঐ খাইষ্টার বাচ্চার মা হবো। নাআআআআ, আল্লাহ গো!!’
,,, বলেই আবারও বালিশে মুখ গুঁজলো, এই বিয়ে সে জীবনেও করবে না, মরনেও করবে না। তবে ঐ মাস্টারকে সে দেখে নিবে, কতো বড়ো সাহস তার মতো নিষ্পাপ ফুলকে নিজের কাঁটা দ্বারা পিষ্ট করতে চায়। বন্যর হা-হুতাশার মাঝেই ছুটে এলো আফনান, ছেলেটার খুশি দেখে কে। মাদ্রাসা থেকে বাড়িতে এসে যখন শুনলো বন্য আপার বিয়ে, তখনই দুই পাক নেচে এখন লাফাতে লাফাতে এই ঘরে এসেছে। এসে একদম এক লাফে ঝাঁপিয়ে পড়লো বন্যর পিঠের উপরে। মুহূর্তেই ‘ওমা’ বলে চিৎকার করে উঠলো মেয়েটা। আফনানের সেসবের ধ্যান নেই, সে কেমন দুলতে দুলতে গানের তালে তালে আওড়ালো—‘আপা তোমার বিয়ে, বন্য আপার বিয়ে। ওহো, কি মজা। বন্য আপার বিয়ে।’
,,, আফনান ছেলেটা ছোট হলেও বেশ নাদুস-নুদুস, একেবারে গলুমলু বলা চলে। অগত্যা ছেলেটার এই ঝাঁপিয়ে পড়া আর শরীরের সব ভার ছেড়ে দিয়ে দুলতে থাকায় ছিমছাম গড়নের বন্যটার আত্মা বেড়িয়ে যাওয়ার যোগার হলো। সে কেমন হাঁপাতে হাঁপাতে আটকে আসা গলায় আওড়ালো—‘আইদ্দা মুন্সির ঘরের আইদ্দা মুন্সি, নাম আমার উপর থেকে। ভোটকার ঘরের ভোটকা, বয়স আট অথচ ওজন আঠাশ। ভত্তা বানিয়ে দিলো।’
,,, নিবেদিতাটা একটু পাকা আছে, মোট কথা দেওয়ান বাড়ির সব বাচ্চারাই এতোদিনে চৌবাচ্চা হয়ে গিয়েছে। মেয়েটা কেমন মিটি মিটি হেসে বন্যর পেটে কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে আওড়ালো—‘রেজওয়ান স্যার যদি নাও হয়, আনুমানিক সত্তর থেকে আশি কেজি তো হবেই। না, মানে বলছিলাম যে...’
,,, ধাম করে কিল পরলো নিবেদিতার পিঠে, মার খেয়ে মন খারাপ করার বদলে পিঠ কুচকে শব্দ করে হেসে ফেললো মেয়েটা, তবে কাব্যের গাল দুটো আকস্মিক লাল হয়ে এলো। সে অতো মজা করে কথা বলতে পারে না, কাউকে কথা বলে পচানিও দিতে পারে না। শুধু প্রয়োজনীয় কথা বলা, চুপচাপ শোনা আর মেনে নেওয়াটাই পারে শুধু। বন্যর খুব রাগ হলো, ঐ লোককে নিয়ে কিসব বলছে এই মেয়ে। ও তো ঐ লোককেই বিয়েই করবে না, আবার এসব ওজন-টজন আবার কি? রাগের তোপে আফনানকে ঝাড়া মেরে ফেলে দিলো পিঠের উপর থেকে। আফনান এবার গড়িয়ে পড়লো বিছানার উপর। তবুও ছেলেটার নাচন-কুদন কমে না, মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে গান গাইছে। কিসব উদ্ভট গান, গানগুলো বন্যর শরীরে কেমন জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছে। সে এবার চট করে শোয়া থেকে উঠে বসলো, আফনানের দিকে তাকাতেই দেখলো ছেলেটার পরনে মাদ্রাসার পোশাক। জুব্বা পরে মাথায় টুপি নিয়েই একের পর এক গা জ্বালানো গান গেয়ে যাচ্ছে। সে খপ করে ছেলেটার মাথা থেকে টুপি কেড়ে নিয়ে ঝাঁকড়া চুলগুলো টেনে ধরে নিবেদিতা আর কাব্যর উদ্দেশ্য বললো—
,,, ‘এটাকে আমি সাধে আইদ্দা মুন্সি বলি, দেখ অবস্থা। পরনে পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি নিয়েই কখন থেকে নেচে কুদে বেড়াচ্ছে। তকে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছে কে? ন্যাংড়া শয়তানের ভাতিজা।’
,,, চুলের ব্যথায় ককিয়ে উঠলো আফনান। নিবেদিতা, কাব্য খিলখিল করে হাসছে। আফনান আপার থেকে চুল ছাড়ানোর প্রয়াস চালিয়ে ক্ষ্যাপাটে স্বরে বললো— ‘আপার ঘরের আপা!! চুল ছাড়ো, নয়তো অভিশাপ দিবো, যেনো খিটখিট্টা মাস্টার বিয়ের পর দিনের তিন বেলা ঝাড়ু দিয়ে তোমার পিঠে গাদাম গাদাম দেয়।’
,,, ধপ করেই মন খারাপ হয়ে গেলো মেয়েটার, খাইষ্টা টা কি তাকে সত্যি সত্যিই মারবে? মারবেই তো। সেদিন না মারলো? মেরে একেবারে জ্বর আনিয়ে দিলো। বুইরা খচ্চর।
*********
,,, শহরে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে আরবিদ, সপ্তাহে দুটো রাত তার ঠিকমতো ঘুম হয় না। সন্ধ্যায় নবীনগড় থেকে রওনা দিলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত দশটা বেজে যায়। এরপর মাল সাপ্লাই দিতে দিতে রাত চারটা, পাঁচটা। সাপ্লাই শেষে রওনা দিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে পরদিন সকাল আটটা, নয়টা। মাঝেমধ্যে দুপুরও গড়ায়, আবার কখনো পরদিন সকালে ফিরে আরবিদ। এরূপ কাণ্ডে কেউ কখনো প্রশ্ন তোলেনি, প্রশ্ন তোলার প্রয়োজনও মনে করেনি। কারণ, প্রতিবার আরবিদের বাইরে অতিরিক্ত রাত্রি যাপনে আয়ের সংখ্যাই বাড়িয়েছে, কোনো রকম ক্ষতি করেনি।
,, গোটা একটা রাত যেহেতু নৌকায় অতিবাহিত করতে হবে, সেহেতু আলাদা করে গরম কাপড় নিলো আরবিদ, সাথে একটা অতিরিক্ত শালও নিলো। শেষ রাতের দিকে বেশ শীত পড়ে, এ সময়টাতে গায়ে দুটো শাল না রাখলেই নয়। অতিরিক্ত শাল আর গরম কাপড়টা ভাঁজ করতে করতে আড়চোখে দরজামুখী দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে তাকালো। গত আধা ঘণ্টা যাবত ঘরের ভিতর, অথচ দরজার কাছে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে কাব্য, হাতে কাটা-ছেঁড়ার মলম। কম করে হলেও সাত-আটবার কাটা হাতে ঔষধ লাগিয়ে নেওয়ার আবদার করেছে মেয়েটা, তবে ওপাশ থেকে কোনো উত্তর আসেনি। আরবিদ ফিরেও তাকায়নি মেয়েটার দিকে, কাব্যর অনুরোধের বিপরীতে কোনো প্রতিত্তোরও করেনি, চুপচাপ ব্যস্ত ছিল নিজের কাজে। কাব্যও ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল। আরবিদ আর কাব্যর সম্পর্কটা কেমন যেন? মেয়েটা অপেক্ষা করতে বাধ্য, সহ্য করতেই হয়, কারণ তাকে কখনো মুক্তি দেওয়া হয়নি। আবার চাইলেই হুটহাট কাছে যেতে পারে না, অধিকার দেখাতে পারে না, কারণ তাকে সেই অধিকারটুকুও কোনোদিন দেওয়া হয়নি। অগত্যা, ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল দরজামুখী। এই গোটা সময়টার মধ্যে বহুবার আড়চোখে মেয়েটার দিকে তাকিয়েছে আরবিদ, পরপরই নজর সরিয়ে নিয়েছে, তবে এই পর্যায়ে এসে নজর সরালো না। কাব্যের দিকে ঠায় নজর স্থির রেখে ধমকে শুধালো—
,,, কি সমস্যা? এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেনো? নিজের ঘর নেই?
,,, এতোটা সময় মাথা নিচু করে পায়ের আঙুল দিয়ে মেঝে খুটছিলো কাব্য। আকস্মিক পুরুষালি গম্ভীর ধমকে ছোটখাটো দেহটা খানিক কেঁপে উঠলো, তবে দমে গেলো না। এই ধমক, বাজে ব্যবহারে ইদানীং সে অভ্যস্ত। অগত্যা চোখ তুলে তাকিয়ে হাতের ভাঁজে থাকা মলমটার দিকে ইশারা করে ফের চোখ নামালো। কাব্যর ইশারা বুঝতে বেগ পোহাতে হলো না মানবের, বিষয়টা বুঝে আসতেই মুখটা পাংশুটে করে কেমন তিক্ত স্বরে আওড়ালো—‘আম্মাকেই যেহেতু অনুমতি দেইনি, তোমাকে দিবো বলে মনে হয়? নিজেকে কি আম্মার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে শুরু করেছো?’
,,, জীবনে কম তিক্ত কথা শুনতে হয়নি কাব্যকে, তবে আজকের এই কথাটাতে কিশোরীর ছোট্ট হৃদয় বড্ডো আঘাত পেলো। কিন্তু কিছু করার নেই, কি-ই বা করার আছে তার? সে একটা গোলকধাঁধায় আটকে আছে। চাইলেও দূরে সরে যেতে পারবে না। আর দূরে সরে গেলেই বা কি? এই মানুষটার কিছু আসবে যাবে? কখনোই না। কাব্য মুখ ফিরিয়ে নিলে হয়তো এই মানুষটা তার খোঁজও নেবে না। এরপর? এরপর সব পাল্টে যাবে। কাব্য নিজের মতো চলতে শুরু করবে, কাব্যর ঘর হবে, বর হবে, সুন্দর একটা সংসার হবে, কিন্তু দেওয়ান সাহেবটা কাব্যর হবে না, দেওয়ান সাহেবের সাথে সংসার পাতা হবে না, কাব্যর নিষ্পাপ ভালোবাসাগুলোও পূর্ণতা পাবে না। ভাবতে ভাবতে ক্ষণকালেই পানিতে ভরপুর হলো কোটরজোড়া, ভেজা, লালবর্ণ ঠোঁটজোড়া কেমন তিরতির করে কাঁপছে। চোখের পানি লুকানোর সে কী প্রয়াস মেয়েটার। যে দুঃখ দেয়, তাকে যে দুঃখ দেখাতে হয় না, নিজেকে খুব দুর্বল মনে হয়। অগত্যা চোখের পানিটা সামলে নিলো, তবে ঠোঁটের কাঁপনটা কমলো না। সেই কাঁপা কাঁপা ঠোঁটজোড়াই কেমন নাড়িয়ে মৃদু কণ্ঠে আওড়ালো—
,,, দুঃখিত!! আমি জানি, আমি গুরুত্বপূর্ণ কেউ না, অন্তত কুকুর-বিড়াল কোনোদিন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না।
,,, বলেই তপ্ত নিশ্বাস ফেলে ঘুরে দাঁড়ালো কাব্য, এক হাতে মলমখানা চেপে ধরে বাহিরের উদ্দেশ্যে দু-কদম হাঁটা দিতেই পিছন থেকে ধেয়ে এলো গম্ভীর কণ্ঠস্বর—দাঁড়াও।
,,, দাঁড়িয়ে পড়লো কাব্য, তবে পিছু ফিরে চাইলো না। আরবিদও তাকালো না সেদিকে, নিজের কাজে মনোযোগ বহাল রেখে আওড়ালো—যা দেওয়ার দ্রুত দিয়ে ঘর থেকে বের হও, আমার অতো সময় নেই।
,,, কাব্য চট করেই ফিরে তাকালো, কিছুটা বিস্মিতই হলো বোধহয়। কানকে দু-দফায় নেড়ে চেড়ে দেখতে ইচ্ছা হলো, সত্যিই কি উনি এই কথাটা বলেছেন? তার কানের শুনতে ভুল হয়নি তো? তবে সেটা করার সাহস পেলো না। ফের যদি ধমক দেয়? তবে একটা ব্যাপারে বড্ডো দ্বিধান্বিত হলো কাব্য, উনি বলেছিলেন মাকেও অনুমতি দেয়নি, অথচ তিক্ত কথা শুনিয়ে হলেও তাকে অনুমতি দিয়েছে। তবে কি সে গুরুত্বপূর্ণ? মায়ের থেকেও বেশি? ভাবতে গিয়ে কুণ্ঠিত হলো মেয়েটা। এই জীবনে বহুবার একা একা অনেক কিছু ভেবে নিয়েছে সে, তবে ওপাশ থেকে আজো পর্যন্ত কিছুটি সঠিক করা হয়নি, বরাবর তার ভাবনাগুলো ভুল প্রমাণিত হয়েছে, তাই আর এসব ভাবলো না। ভাবনা রেখে ঘুরে দাঁড়িয়ে, দু-কদম এগিয়ে মলমটা বিছানার উপরে রেখে দিয়ে আওড়ালো— একটু অপেক্ষা করুন, আমি গরম পানি নিয়ে আসছি।
,,, আরবিদ প্রতিত্তোর করলো না, এটা তার স্বভাব, মুখ তুলে বকবক করা তার সাথে যায় না। যেখানে কথা না বলে বিষয়টা সামলানো যায়, সেখানে কথাই বলে না। কাব্যশ্রী ছুটে গেলো নিচে। তখনো রান্নার ঘরে তুমুল হাড়ে রান্না চলছে, উনি শহরে যাবেন যে? তাই। কাব্য রয়েসয়ে বড়ো আম্মাকে সরিয়ে গরম পানিটা করে নিয়ে আবারও ছুটে গেলো আরবিদের ঘরে। আরবিদ ততোক্ষণে সব গোছগাছ করে মাত্রই পোশাক পরিবর্তন করতে নিয়েছিলো, তখনই ঘরে ঢুকলো কাব্য। এতে ভাবাবেগ হলো না মানবের, সে নিজের মতো উপর থেকে লুঙ্গি জড়িয়ে নিচের লুঙ্গিটা পরিবর্তন করে গায়ে নতুন পাঞ্জাবি জড়ালো। সামনাসামনি এই পোশাক পরিবর্তন করার ব্যাপারটা কাব্যর চোখেও আহামরি ঠেকলো না, ছোট থেকেই বাপ-চাচাদের এভাবে লুঙ্গি পরিবর্তন করতে দেখেছে সে, দেওয়ান সাহেবকে তো অহরহবার দেখেছে। কোনোদিনই অস্বাভাবিক ঠেকেনি আর না অপ্রস্তুত হওয়ার মতো ভাবে পোশাক পরিবর্তন করেছেন তিনি। কাব্যশ্রী তরহরি করে গরম পাতিলাটা পালঙ্কের উপর রাখলো। আরবিদও পোশাক পরিবর্তন করে সেই পাতিলার সামনে বসে কাটা হাতটা এগিয়ে দিলো। প্রায় দুই থেকে তিন ইঞ্চির একটা কাটা দাগ, গভীরতা অনেক, হয়তো সেলাই লাগতো, কিন্তু সেলাইয়ের কথাটা তোলা যাবে না। পরে হয়তো যতটুকু করতে দিচ্ছে, ততটুকুও করতে দিবে না, ধমক দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিবে। অগত্যা চুপ রইলো কাব্য। প্রথমে গরম পানি দিয়ে আলতো করে ক্ষতটা পরিষ্কার করে দিয়ে মলম লাগিয়ে সাদা কাপড় দিয়ে ব্যান্ডেজ করতে থাকলো। তক্ষুনি কানে বাজলো সামনের মানুষটার গম্ভীর স্বর—
,, সেবার কিছু চাওনি, এইবার কিছু লাগবে?
,,, এহেন বাক্যে চট করে চোখ তুলে তাকালো কাব্য, আরবিদ অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা তাতে ধ্যান দিলো না, কেমন শঙ্কিত কণ্ঠে শুধালো—কাল সকাল সকাল ফিরবেন না?
,,, না।
,,, বিকালে ফিরবেন?
,, না।
,,, পরদিন সকালে?
,,, না।
,,, বিকালে?
,,, হতে পারে।
,,, বৃহস্পতিবার আবার যাবেন?
,, যাবো।
,,, শুক্রবার থাকবেন না?
,, না।
,,, বন্য আপার বিয়ে হয়তো ঠিক হয়ে যাবে, শুক্রবার দিন পড়বে হয়তো, থাকবেন না?
,,, আমি এসব আনুষ্ঠানিকতা পছন্দ করি না।
,,, কাব্যর মনটা ধপ করেই খারাপ হয়ে গেলো। আজ সোমবার, কাল ফিরবেন না, ফিরবে বুধবার বিকালে, আবার চলে যাবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়, ফিরবে শনিবার। এতোগুলো দিন কিভাবে না দেখে থাকবে সে? ওদিকে বড়ো আব্বা ছাপ ছাপ জানিয়ে দিয়েছে, বন্য আপাকে তিনি রেজওয়ান মাস্টারের হাতেই তুলে দিবেন। আর সেটা এই শুক্রবারেই। হয়তো সন্ধ্যায় রেজওয়ান মাস্টার প্রস্তাব নিয়ে এলে তারিখও ঠিক হয়ে যাবে। এই দানবীয় লোকটাকে ছাড়া পুরো আস্ত একটা বিয়ে একা একা কী করে কাটাবে সে? সব মাটি ঠেকবে না? সাজগোজও তো করতে ইচ্ছা করবে না। এসব ভাবতে ভাবতে চট করেই কাব্যর মাথায় একটা প্রশ্ন খেলে গেলো। কণ্ঠে মিছেমিছি কৌতূহল ঢেলে শুধালো—আমার বিয়েতেও থাকবেন না?
,,, এই পর্যায়ে চোখ ঘুরিয়ে কাব্যর দিকে তাকালো আরবিদ, কেমন দ্বিধাহীন পাষাণ কণ্ঠে উত্তর করলো—কারোর বিয়েতেই থাকবো না। হয়েছে তোমার? যাও এবার, ঘর থেকে বের হও।
,,, কাব্য ভেবেছিলো মানুষটা একটু হলেও দুঃখ পাবে, চোখ-মুখ মলিন হবে, অথচ কিছুই হলো না, উল্টো খারাপ ব্যবহার করলেন। বড্ডো অভিমান হলো মেয়েটার। তরিহরি করে আরবিদের হাতের ব্যান্ডেজ বাঁধা শেষ করে অভিযোগের স্বরে আওড়ালো—এভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন না? একদিন দেখবেন, আমি থাকবো না, পুরো দেওয়ান বাড়ি খুঁজেও আমাকে পাবেন না। দিব্যি অন্য কাউকে বিয়ে করে সংসার করবো, আপনাকে ভুলে যাবো, আপনি নামক মানুষটাকে স্মরণেও আসবে না আমার।
,,, বলেই আরবিদের চোখে চোখ রাখলো কাব্য। এই পর্যায়ে মানবের দৃষ্টিজোড়া কেমন নিষ্প্রভ ঠেকলো, ভ্রূজোড়া ক্ষণকালের জন্য শিথিল দেখালো বোধহয়, তবে সেটা দীর্ঘস্থায়ী হলো না। লোকটা নজর ঘুরালো অন্যদিকে। কণ্ঠে ফের কাঠিন্য ভাব ফুটিয়ে আওড়ালো—খুব ভালো!! যাও তবে, এখন থেকেই আর এসো না।
,,, থতমত খেয়ে গেলো মেয়েটা, কেমন অপ্রস্তুত কণ্ঠে বললো —না, মানে এখনো তো আমার বিয়ে হয়নি, তাই...
,,, শোনার ধৈর্য বোধহয় হলো না মানবের, উঠে দাঁড়িয়ে খপ করে চেপে ধরলো মেয়েটার হাত। হকচকিয়ে গেলো কাব্য, আরবিদ হাতখানা চেপে ধরে টানতে টানতে ধাক্কা দিয়ে ছুড়ে ফেললো ঘরের বাহিরে, চিৎকার করে বললো —বেয়াদবের বাচ্চা!! আর কখনো আসবি না আমার ঘরে। আমার আশেপাশেও যেনো না দেখি তকে।
,,, বলেই খট করে ভিতর থেকে দরজা আটকে দিলো। অপরদিকে বড়োসড়ো ধাক্কায় মেঝেতে আছড়ে পড়েছে কাব্য, হাতে, পায়ে, কোমরে বেশ আঘাতও পেয়েছে। তবে ভাবাবেগ নেই মেয়েটার। কী হলো? এই বাজে ব্যবহারটা কেনো করলো? সে এই ঘরে এসেছে বলে? নাকি বিয়ে করবে বলেছে বলে? দেওয়ান সাহেব এতোটা প্যাঁচালো কেনো? এই প্যাঁচ কিভাবে কাটাবে সে?
*******
সময়টা ১৯৫২ সাল।
,,, ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর যখন পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়, তখন এটি দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়। একটি পূর্ব পাকিস্তান ও অন্যটি পশ্চিম পাকিস্তান। পাকিস্তান দুটি ভাগে বিভক্ত হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের মোট জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। যা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী খুব সহজেই মেনে নিতে পারেনি, বাংলা ভাষা, বাঙাল অঞ্চল একপ্রকার চক্ষুশূল হয়ে ধরা দিয়েছিলো তাদের চোখে। অতঃপর তারা মিলে মিশে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ নেয়। যার বাস্তবায়ন ঘটে ১৯৫২ সালে।
( বাচ্চারা!! পড়ালেখা করবা না কি? গল্পের মাধ্যমে পড়ালেখা করাবো 😌)
,,, ১৯৫২ সালে ২৭ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ঘোষণা করেন যে, """ উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। "" তবে বাঙাল অঞ্চল ও বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী তা মানতে নারাজ। অতঃপর ৩১ জানুয়ারি ঢাকার বার লাইব্রেরি হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, ছাত্র ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, এবার বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে চলমান আন্দোলনকে আরও সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ করা হবে। এতোদিন যারা আলাদা আলাদা জায়গায় আন্দোলন করেছিলো, এবার তারা একত্র হয়ে আন্দোলন করবে এবং বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার আগ পর্যন্ত ক্ষান্ত হবে না। সেই সভায় সবার সাথে সাথে উপস্থিত ছিলেন সামাদ মাস্টারের ছোট পুত্র অক্ষর। অক্ষর তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের স্টুডেন্ট। ছেলেটা বরই তেজি, সাথে সাহসীও। কৈশর শেষে যৌবনে পা দেওয়া ছেলেটার রক্ত তখন টগবগে। অন্যায় মানতে নারাজ, অন্যায়ের কাছে মাথা নত করার চেয়ে নিজের হাতে নিজের শিরশ্ছেদ করাকে অধিক গ্রহণযোগ্য মনে করতো ছেলেটা। তার ঐ টগবগে জেদকে আর কেউ প্রশ্রয় দেক বা না দেক, অক্ষরের বড়ো ভাই সাক্ষর ঠিকই প্রশ্রয় দিয়েছিলো। অগত্যা সে সভা থেকে হলে ফিরে সর্বপ্রথম বড়ো ভাইকে সুনিপুণ হস্তে চিঠি লিখলো। সভায় হওয়া প্রতিটি আলোচনা, সিদ্ধান্ত অক্ষরে অক্ষরে জানালো, সেই সাথে এই কথাটাও স্পষ্ট করে লিখলো, প্রাণের বিনিময়ে হলেও বাংলা ভাষাকে তারা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিয়েই ছাড়বে। সাক্ষর তখন নবীগর পাঠশালার সরকারি শিক্ষক, মা মারা গিয়েছে বছর তিনেক আগে। বাবা সামাদ মাস্টার, ভাই অক্ষর, স্ত্রী নাজরাত আর একমাত্র ছেলে রেজওয়ানকে নিয়ে তার সুখী পরিবার। বংশপরম্পরায় মাস্টার বাড়ির পুত্ররা মাস্টারি করলেও অক্ষরের ইচ্ছা ছিলো সে রাজনীতি করবে। যার ফলস্বরূপ সে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যায়ন করতে শুরু করে। বিষয়টাতে তীব্র হারে নিন্দা জানিয়েছিলেন সামাদ মাস্টার, তবে সাক্ষরের জন্য ছোট ছেলেকে দমাতে পারেননি। এতোদিন যাবত ভাইকে প্রশ্রয় দিলেও ফেব্রুয়ারির ৫ তারিখ যখন হাতে ভাইয়ের লেখা চিঠি পৌঁছালো, রক্তের টানে উন্মাদ হয়ে উঠলো মানুষটা। যততত্র চিঠি লিখে ভাইকে এসবে জড়াতে নিষেধাজ্ঞা জানিয়ে বাড়ি ফিরতে বললো। কিন্তু কার অক্ষর কে? অক্ষর তখন মাতৃভূমি বুঝে, মাতৃভাষা বুঝে, মাতৃভূমি, মাতৃভাষার আগে কেউ না। বাবা, ভাই, পরিচয়, আত্মীয়, পরিজন কিচ্ছু না। সাক্ষরের লেখা চিঠির উত্তর এলো ফেব্রুয়ারির ১৮ তারিখে। অক্ষর ফিরবে না, সে সত্যি সত্যি মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত। এরূপ চিঠি হাতে পাওয়ার পর দিক-বেদিক শূন্য হয়ে পড়লেন সাক্ষর মাস্টার। কি করবেন, কিভাবে ভাইকে ফিরিয়ে আনবেন, কোনো দিশা খুঁজে না পেয়ে ছুটে গেলো দেওয়ান বাড়িতে। বঙ্গাঞ্চলে দেওয়ান বাড়ির মানুষগুলো ছাড়া উনাদের আপন বলতে আর কে আছে? রেজওয়ানের তখন সাত বছর, আরবিদের আট, আরহানের চার।
,,, সময়টা বিকালের মধ্যপ্রান্তে। আরবিদ ছোট থেকেই বেশ গম্ভীর ছিলো, জন্ম থেকেই ব্যাপারটা হয়েছে বোধহয়। তবে রেজওয়ান ছিলো প্রাণোচ্ছল, বিকাল হলেই ছুটে আসতো দেওয়ান বাড়িতে। আরহানের সাথে এই খেলায়, ওই খেলায় মেতে থাকতো। সেদিনও তার ব্যতিক্রম হলো না। গম্ভীর মুখে দেওয়ান বাড়ির বাগানে রাখা বেতের চেয়ারে বসেছিলো আটবিদ, আর তার সামনে উঠোনের খালি অংশে ফুটবল খেলায় মত্ত ছিলো রেজওয়ান আর আরহান। ঠিক ঐ সময়টাতেই চিঠি হাতে দেওয়ান বাড়িতে প্রবেশ করলেন সাক্ষর মাস্টার, ছেলেকে খেলতে দেখে নাম ধরে ডাকলেন। এমন সময় আব্বাকে দেওয়ান বাড়িতে দেখে কী যে খুশি হলো ছেলেটা, ছুটে গেলো বাবার কাছে। সেদিন রেজওয়ানকে কোলে নিয়ে মাহমুদুল দেওয়ানের কাছে এসেছিলেন ভদ্রলোক। বসার ঘরের বেতের সোফায় বসে ছেলেটাকে কোলে বসিয়ে কেমন আকুল কণ্ঠে বলেছিলেন—
---- ভাইজান!! আমার ছেলেটাকে দেখবেন। নাজরাতকেও রেখে যাচ্ছি। আমি যতোদিন না ফিরি, ততোদিন ওদের দায়িত্বটা আপনার হাতে দিয়ে গেলাম।
,,,, এরপর মানুষটা ফিরলো ঠিকই, তবে জীবিত অবস্থায় নয়। ২২ এ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা নাগাদ, দুটো লাশ এসে থামলো মাস্টার বাড়ির দোরগোড়ায়। একটা লাশ বোমা বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে, আর অন্যটি অক্ষর, তার গায়ে পরপর পাঁচটি গুলি লেগেছে। সহসাই ধরতে পারা যায়, ছিন্নভিন্ন হওয়া লাশটা অক্ষরের বড়ো ভাই অর্থাৎ সাক্ষর মাস্টারের। ছোট্ট রেজওয়ানটা সেই ছিন্নভিন্ন লাশের পাশে বসে কেমন ‘আব্বা, আব্বা’ বলে গলা ফাটিয়ে কেঁদেছিলো সেদিন। অক্ষর তো ছিলো রেজওয়ানের গুরু, চাচা বলতে অজ্ঞান ছিলো ছেলেটা। বাবার পাশে চাচার লাশ দেখে কী যে পাগলামি করেছিলো, বারংবার আছড়ে পড়ছিলো বাবা-চাচার মাঝখানে। কতো কতো আকুল আবেদন করেছিলো, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ডেকেছিলো, যেনো তারা ফিরে আসে। কিন্তু তা কি সম্ভব? মরা মানুষ কি ফিরে আসে? এরপর গুনে গুনে ২২টা বছর কেটে গেলো। এইতো সাক্ষরের দেওয়া দায়িত্বটা মাহমুদুল দেওয়ানের সামনে বসে আছে...
,,, ২২ বছর আগে সাক্ষর যেই সোফাটায় বসেছিলো, আজ ২২ বছর পর তার ছেলে রেজওয়ান ঠিক একই সোফায় দাঁড়ায়মান হয়ে বসে আছে। বাবা-ছেলের চেহারায় কোনো মিল নেই, অথচ দেহের গড়ন দেখো, বসার ধরন দেখো, একেবারে বাপের সাথে ছাপিয়ে এসেছে ছেলেটা। মাহমুদুল দেওয়ানের মনে হলো, এই বুঝি সাক্ষরটা উনার সামনে বসে আছে। তিনি দুচোখ ভরে দেখলেন সাক্ষরের ছেলেটাকে।
,,, রেজওয়ান দেওয়ান বাড়িতে এসেছে মিনিট দশেক হবে, সাথে দারোয়ান মোকশেদ, বাগানের মালি কাশেম এসেছে, রান্নার লোকটা অসুস্থ, আসতে পারেনি। আসার পর থেকেই দেখে যাচ্ছে মাহমুদুল দেওয়ান কেমন একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে আছে। রেজওয়ানের জায়গায় অন্য কেউ থাকলে বোধহয় লজ্জায় মাথা নত করে রাখতো, তবে সে তো রেজওয়ান, বন্যর ভাষায় যাকে খাইষ্টা, কাঠখোট্টা, চিড়তার রস বলা যায়। এই পর্যায়ে মাহমুদুল দেওয়ানের দিকে নজর স্থির রেখে কপাল গোটালো রেজওয়ান, কপালে সেই চিরচেনা তিনটি ভাঁজ ফেলে শুধালো—আমি তো আপনার বউ না, চাচা, এইভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো?
,,, ছেলেটার কথায় থতমত খেয়ে গেলেন ভদ্রলোক, কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রাহিমা বেগমও কেমন আঁচলে মুখ গুঁজে নিলেন, লজ্জা পেয়েছে মানবি। আয়েশা বেগমও লজ্জা পেয়েছেন কিছুটা। রেজওয়ানের পাশে বসা মোকসেদ আর কাসেম ফিক করে হেসে ফেললো। হাসলো বাবার পাশে বসে থাকা আরহানও। বিষয়টা বুঝে আসতেই মাহবুবুর দেওয়ানের দৃষ্টি কঠিন হলো। ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে রেজওয়ানের দিকে একবার তাকিয়ে পরপর বড়ো ভাইজানের দিকে তাকিয়ে বিরক্তিকর কণ্ঠে বললো—ভাইজান!! আরও একবার ভেবে দেখেন, এই ছেলেকে আমার পছন্দ না।
,,, ভাইয়ের এহেন কথায় মাহমুদুল দেওয়ান কিছু বলতে নিলে তার ফুরসত দিলো না রেজওয়ান, অকপটেই মাহবুবুর দেওয়ানের চোখে চোখ রেখে আওড়ালো— আপনাকেও আমার পছন্দ না, সাথে আপনার মেয়েকেও।
,,, ক্ষেপে গেলেন মাহবুবুর দেওয়ান—তাহলে বিয়ে করতে এসেছিস কেনো, হারামজাদা? বের হো।
,,, রেজওয়ান কি কম? সে কণ্ঠস্বর অধিক ক্ষ্যাপাটে করে তুললো, যেনো এখানে সে বিয়ে করতে নয়, বরং যুদ্ধ করতে এসেছে— আপনার হালালজাদা যে দিনের পর দিন নিজের গায়ে আমার নামের কলঙ্ক লেপন করছে, খোঁজ রাখেন? বড়ো মেয়েকে তো বানিয়েছেন নিজের মতো, দস্যি। বানরের মতো এগাছ থেকে ওই গাছে, ঐ গাছ থেকে ঐ গাছে লাফায়।
,,, মুখের উপর এতো বড়ো কথা? হজম হলো না মাহবুবুর দেওয়ানের। মানছে, ছোটবেলায় এই গাছে ঐ গাছে চড়ার বাজে অভ্যাসটা উনারও ছিলো, তাই বলে সেদিনের ছেলেটা দাদার থেকে এসব জেনে উনাকে খোঁটা দিবে? মানা যায় এসব। রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারালেন মানব, দাঁতে দাঁত চেপে বললেন— তাতে তোর কি? তোর কেনো জ্বলে? বদনাম হলে আমার মেয়ের হবে। তুই বের হো, আমার মেয়েকে আমি অন্য জায়গায় বিয়ে দিবো।
,,, ভাবাবেগ হলো না রেজওয়ানের, যেনো কথাটা সে কানেই তুলেনি। এতোক্ষণ যাই হোক, ভদ্রভাবে কথা বলছিলো, এখন তার ধার ধারলো না। স্বভাবসুলভ মুখটা পাংশুটে করে আওড়ালো— দিতে পারলে দেন, কিন্তু খবরদার, যদি বিয়ের পর আমার বাড়ির আশেপাশেও দেখেছি, তখন কিন্তু বিবাহিত-অবিবাহিত মানবো না। একদম...
,,, এই পর্যায়ে এসে থেমে গেলো রেজওয়ান। চোখে-মুখে কুটিলতা, মাহবুবুর দেওয়ান কেমন চোখ ছোট ছোট করে নিলেন, কথার পৃষ্ঠে শুধালেন—একদম কি? কি বলতে চাইছিলি? কথা শেষ কর।
,,, ধার ধারলো না রেজওয়ান, কেমন ভাবাবেগহীন কণ্ঠে উত্তর করলো— সেটা হলেই বুঝতে পারবেন।
,,,, দুজনার তর্কাতর্কিতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়লেন মাহমুদুল দেওয়ান। জামাই-শ্বশুর যদি এভাবে কথা-কাটাকাটি করে, তাহলে বিয়েটা এগুবে কি করে? ওদিকে খাবারের আয়োজন করতে থাকা রাহিমা বেগম, আয়েশা বেগম শঙ্কিত দৃষ্টিতে এদিক পানেই তাকিয়ে আছেন, বড়োসড়ো ঝামেলা না বেধে যায়। এই ঝামেলার রেশ কমানোর দায়িত্ব নিলেন বিনু ফুপু। কুসুমকে চা আনার জন্য তাড়া দিয়ে পরনের সাদা শাড়ির আঁচলখানা ভালো মতো মাথায় চেপে বড়ো ভাইয়ের পাশে বসে পড়লেন। বড়ো আপাকে বসতে দেখে দমে গেলেন মাহবুবুর দেওয়ান। রেজওয়ান দমলো কিনা জানা নেই, তার চোখে-মুখে এখনো তিক্ততা, কপালে তিনটে ভাঁজ বিরাজমান। কুসুম ততক্ষণে চা নিয়ে হাজির হলো, একে একে সবার দিকে চা এগিয়ে দিতেই যে যার মতো গ্রহণ করলো তা। বিনু ফুপু এবার ভাইয়ের পাশ থেকে উঠে রেজওয়ানের পাশে এসে বসলো। ছেলেটাকে আগাগোড়া পরখ করলেন, লম্বা, চওড়া দেহের গঠন, গায়ের রং লাল ফর্সা, নাকটা খাড়া, চোখ দুটো ছোট ছোট, ঠোঁটটা কালচে, চোয়ালে চাপ দাড়ি, কপালে বিরক্তির তিনটে ভাঁজ। বর্ণনা সুন্দর হলেও ছেলেটা বেশ একটা সুন্দর না, বন্যর পাশে একদমই মানায় না। এক কথায় যাকে বলে বানরের গলায় মুক্তার মালা। কিন্তু ঐ যে সরকারি চাকরি, মাস শেষে গোনা টাকা, বাপ-দাদার সম্পত্তি, বছর ঘুরতেই ফসল কাটার জমি থেকে আসা টাকা—সব মিলিয়ে ছেলে একেবারে সোনায় সোহাগা। সুন্দর ধুয়ে কি পানি খাবে? আর এমনিতেও পুরুষ মানুষের সুন্দর-অসুন্দরে কিছু আসে যায় না। ঐ যে একটা কথা আছে না? ""সোনার চামচ আবার বাঁকা।""" পুরুষ হচ্ছে সোনা, সেটা বাঁকা-ত্যাড়া যাই হোক, দিন শেষে দাম একই।
,, একজনার পর একজনকে এরকম আহাম্মকের মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে বেজায় বিরক্ত হলো রেজওয়ান। দাদায় বেঁচে থাকতে ঠিকই বলেছিলো, বিয়ে-সাদি বিরাট ঝামেলার ব্যাপার। করবো বললেই করা হয়ে যায় না, অনেক বেগ পোহাতে হয়। তবে সেসব বেগ পোহানো রেজওয়ানের সাথে যায় না। সে মাহমুদুল দেওয়ানের দিকে তাকিয়ে কেমন অধৈর্যের ন্যায় শুধালো— আমি কি আপনাদের দেখতে এসেছি? যার জন্য এসেছি তাকে আনুন, আমার যথেষ্ট কাজ আছে, গল্প করার সময় নেই।
,,, রেজওয়ানের সোজা-সাপ্টা কথায় বিরক্ত হলেন মাহমুদুল দেওয়ান, ছেলেটা খিটখিটের পাশাপাশি বরই অধৈর্য আর নির্লজ্জ। নয়তো এভাবে কেউ সোজা-সাপ্টা এসব বলে? নেহাতই সাক্ষরটাকে কথা দিয়েছিলেন, নয়তো এই হারামজাদা বজ্জাত ছেলেকে দেখে নিতেন তিনি। বড়ো ভাইয়ের পাশাপাশি বিনু ফুপুও কিছুটা বিরক্ত হলেন, তবে সরকারি চাকরির কাছে এই বিরক্তি কিছুই না। তিনি হাঁক পেরে রাহিমা বেগমের উদ্দেশ্যে বললেন— মটকার মতো খাড়ায় রইছো কেন? মাইয়ারে আনো, জামাই দেহুক।
,,, বন্যকে সাজিয়ে নিচের ঘরেই রাখা হয়েছিলো। রাহিমা বেগম কুসুমকে ইশারা দিতেই মেয়েটা ছুটে গেলো সেদিকে। রেজওয়ান এবার সেদিক পানে তাকালো, তবে এখনো কপালের সেই চিরাচরিত তিনটে ভাঁজ স্পষ্ট, এক কথায় বিরক্তিকর চাহনিতে তাকিয়ে আছে। বিষয়টাতে কী যে বিরক্ত হলেন মাহমুদুল দেওয়ান, বিষয়টা ব্যাখ্যা করার নয়। তিনি কেমন রাগত স্বরে শাসালেন— কপাল ঠিক কর, আমার ভাতিজি আসার সাথে সাথে ওর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাবি, না তাকাতে পারলে তুই ফেইল, তোর কাছে মেয়ে দিবো না।
,,, রেজওয়ান পাত্তা দিলো না, আগের ন্যায় তাকিয়ে রইলো সামনে। কাব্য আর নিবেদিতা একপ্রকার জোর করেই বন্যর হাত ধরে ওকে টানতে টানতে সবার সামনে নিয়ে এলো। বন্যর পরনে গোলাপি রঙা একটা শাড়ি, হাতে, কানে, গলায় সোনার ভারি গহনা, মাথায় বড়ো করে ঘোমটা টানা। ওদেরকে এগিয়ে আসতে দেখে উঠে দাঁড়ালো আরহান, বোনকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে নিজের পাশে বসিয়ে দিলো। বন্য আপাকে ভাইজানের কাছে ছেড়ে দিয়ে কাব্য মা-চাচিদের কাছে চলে গেলো। মেয়েটা বরই লাজুক, হুটহাট সবজায়গায় নিজেকে মানাতে পারে না, সেই সাথে মন-মেজাজও ভালো না। লোকটা যাওয়ার বেলায় কেমন ঝামেলা করে গেলো। সে যে কেনো তখন ওসব বলতে গেলো? ভালোয় ভালোয়ই তো কথা হচ্ছিলো দুজনার মাঝে।
,,, অপরদিকে নিবেদিতা কাব্যর থেকে বেশ ব্যতিক্রম। সে ছোট ভাইজানের পিছু পিছু গিয়ে বন্যর পিছনে দাঁড়ালো। বিনু ফুপু ইশারা করতেই বন্যর মাথার ঘোমটাটাও খানিক উপরে তুলে দিলো। এই পর্যায়ে চোখে-মুখে অনীহা নিয়েই চোখ তুলে মেয়েটাকে দেখতে চাইলো রেজওয়ান, তবে চোখ সরাতে পারলো না। খানিক চেয়ে থেকে কি যেনো বিড়বিড়ালো, মুহূর্তেই মুখ ভেংচালো মেয়েটা, ঠোঁট নাড়িয়ে বিড়বিড়ালো—খাইষ্টার ঘরের খাইষ্টা।
,,, কথাটা দূর থেকে শোনা না গেলেও দিব্যি বুঝে নিলো রেজওয়ান, দাঁতে দাঁত চাপলো। মাত্র কটাদিন, এরপর যে কি হবে সেটা তারপরেই বুঝা যাবে। রেজওয়ানকে এভাবে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে দেখে পাশে বসা কাসেম কেমন আপ্লুত স্বরে আওড়ালো—বন্য আপ্পারে কিন্তু হেব্বি লাগতাছে, হাসা না সাব?
,,, রেজওয়ান কিছু বললো না, তাকিয়ে রইলো। মোকশেদ বললো— শ্যার!! বন্য আম্মারে সালামি দিবেন না? দেকতে আইলেন যে?
,,, এই পর্যায়ে চট করেই মোকশেদের দিকে ফিরে তাকালো রেজওয়ান, দ্বিধান্বিত কণ্ঠে শুধালো— দেওয়া লাগে নাকি?
,,, মোকশেদ মাথা নাড়ালো, মানে দিতে হয়। পরপর আগ্রহী কণ্ঠে বললো— আগে জিজ্ঞাসা বাদ কইরা লন। দেখতে আইলে মাইয়া মাইনসের বুদ্ধি পরিক্ষা করন লাগে। দেখন লাগে সংসার করবার যোগ্য নাকি।
,,, রেজওয়ান কিছু বলার পূর্বেই কাসেম উৎসাহিত কণ্ঠে বললো— বন্য আপা কন দেহি, আজগা আকাশে কয়ডা তারা উটছে।
,,, বনশ্রী দাঁতে দাঁত চেপে দাঁত বের করে হাসলো, পরপর রেজওয়ানের মাথার দিকে ইশারা করে বললো— আপনাদের মাস্টারের মাথায় যেই কয়টা চুল, ওই কয়টা, গুনে দেখুন, আমি পারবো না।
,,, বন্যর উত্তর শুনে খুক খুক করে কেশে উঠলো কাশেম। কোন ভুলে যে এই মেয়েকে প্রশ্ন করতে গেলো সে? মেয়েটা যে কি পরিমাণ জাজিল, তা কি তার অজানা? এই মেয়েকে তো ছোট থেকেই চিনে সে। অপরদিকে বন্যর উত্তরে বরই অসন্তুষ্ট হলেন বিনু ফুপু— হাড়ে বজ্জাত ছেড়ি!! পাত্রপক্ষের লগে কেউ এমনে কথা কয়? সুন্দর কইরা উত্তর দে।
,,, ফের মুখ ভেংচালো বনশ্রী, রেজওয়ান দেখলো তা। তবে আমলে নিলো না, পাগলে কতো কিছুই করে, সেসবের ধ্যান দিতে নেই। সে বিনু ফুপুর কথায় বাধ সেধে বললো— লাগবে না, আপনাগো মেয়ে আমার পছন্দ হয়েছে, এবার কথা আগান, এতো সময় নেই আমার।
,,, মাথা ঝাঁকালেন বিনু ফুপু। ভাই-ভাতিজাদের দিকে এক ঝলক চোখ বুলিয়ে আগে ভাগেই কথা পারলেন—দেওন-নেওনের ব্যাপারটা আগে আলোচনা কইরা নিলে ভালো হইতো না, বাবা? কও দেহি, তুমি আঙ্গো থাইকা কি চাও? আর মাইয়ারে কি দিবা?
,,, রেজওয়ান আরও এক ঝলক দেখে নিলো সামনে বসা মেয়েটাকে। কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে মুখ পানে চেয়ে থেকে কপালে অসন্তোষ ভাব ফুটিয়ে আওড়ালো—যেই জিনিস ধরায় দিতাছেন, এই মাশাল্লাহ!! আর কিছু লাগবে না। নেওয়া-নেওয়ি বাদ, আমার আম্মার সাড়ে তিন ভরি সোনা আছে, ওইটা ওর। কাবিন বাবদ এক লাখ দিবো, চাইলেই বেশি দিতে পারতাম, কিন্তু মেয়ে মানুষের হাতে বেশি টাকা থাকা ভালো না, পরে আমার সাথে ভাব নিবে।
,,, সব কথার ভিড়ে ধরায় দিতাছেন কথাটা বরই কানে বাজলো মাহবুবুর দেওয়ানের, সহসা ক্ষ্যাপাটে কণ্ঠে আওড়ালো— হারামজাদা!! তোর হাতে আমি আমার মেয়েকে ধরায় দেইনাই, বরং তুই নিজেই নিতে আইছিস। এখন বড়ো বড়ো কথা কথা? বেহায়া ছেলে-পুলে।
,,, এসব গালিগালাজ গায়ে মাখলো না মানব, কেমন সম্বিত ফেরার ন্যায় ভাব করে বন্যর চোখে তাকিয়ে মুখটাতে পাংশুটে করে বললো— ওহ! তারমানে আপনারা আমার পায়ে কুড়াল মারেন নাই? আমি নিজেই কুড়ালের উপর পা মারছি?
,,, রেজওয়ানের কথা আর বলার ধরন দেখে উপস্থিত সকলে না চাইতেও ফিক করে হেসে দিলো। এমনকি কাঠখোট্টা বিনু ফুপু, দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রাহিমা বেগম, আয়েশা বেগম, সাথে মন খারাপ করে থাকা কাব্যটাও হাসতে বাধ্য হলো। অথচ হাসলো না অর্ধবউ বেশে বসে থাকা বন্যটা। সে দাঁতে দাঁত চেপে কুৎসিত তিতখুটে লোকটার দিকে তাকিয়ে আছে। এতোটা অপমান? এতোটা? এই খাইষ্টাকে দেখে নিবে বন্য, কত্ত বড়ো মহা ফাজিল, তাকে নাকি কুড়াল বলে? উনি কুড়ালে পা মারছেন নাকি বন্যকে জোর-জবরদস্তি করে কুড়ালে পা মারানো হচ্ছে? সেটা তো জাতি জানেই, জানে না নাকি? বদমাশ লোক, খাইষ্টার ঘরের খাইষ্টা, পাইনশা তরমুজ, তাকে এতো সুন্দর করে সাজানো হলো, দুটো টাকাও দিচ্ছে না। কিপ্টার ঘরের কিপ্টা, এই বিয়ে করবে না সে। বিয়ের আগেই তালাক, তালাক, তালাক, খাইষ্টার বাচ্চাকে দশ তালাক।
,,,, চলবে
,,, ওদের আরেকটু ঝগড়াঝাটি দিতে পারলে বেশ হতো কিন্তু সময় পাইনি লেখার পরে তোমাদের গল্প দিতে দেরি হয়ে যেতো। যাই হোক, সুন্দর করে গল্প বিষায়ক কমেন্ট করবা, ঠিক আছে?