#দেওয়ান_সাহেব( পর্বঃ ৬)
#ট্রাজেডি_জাস্টিস
#লেখনিতে_রুপান্জলি
টানা তিনদিন পর বাড়ি থেকে বের হলো রুপান্মিতা। এই তিনদিনে ঘর থেকে উঠোন আর উঠোন থেকে ঘর, এর বাহিরে কোথাও পা বাড়ায়নি। আক্ষরিক অর্থে সে এই তিনটে দিন নিজেকে একপ্রকার ঘরবন্দি করে রেখেছে। এখনো বেরোনোর ইচ্ছা ছিলো না, তবে পরিস্থিতির কারণে তাকে বের হতেই হলো। রুপান্মিতাদের মোট ছয়টি ছাগল ছিলো, এর মধ্যে দুটো গাভি ছাগল, দুটো বাচ্চা খাসি, একটা পাঠি আর অন্যটি ছিলো কালাই, মানে একটা বড়ো খাসি। কালাইটা তো আর নেই, তাকে জবাই করে খেয়ে নেওয়া হয়েছে। ভেবেই রুপান্মিতার চোখ জোড়া ঝাপসা হয়ে এলো। হয়তো কালাইয়ের চুরি যাওয়াটা তাকে শূন্যতা অনুভব করাতো, কিন্তু কালাইকে জবাই করে খেয়ে নেওয়া আর সেই বিষয়টা তার কর্ণকুহরে পৌঁছানোর ব্যাপারটা তাকে ভিতর থেকে ব্যথিত করেছে। মানুষ যখন কোনো পশুপাখিকে লালন-পালন করে, তখন অজান্তেই সেই পশুপাখির প্রতি একটা মায়া তৈরি হয়ে যায়। মনে মনে তাকে সন্তান ভাবতে শুরু করে। এমতাবস্থায় বিষয়টা শুধু মায়ায় আটকে থাকে না, দুর্বলতায় পরিণত হয়ে যায়। কালাই নামক ছাগলটাও এতোদিনে রুপান্মিতার মায়া পেরিয়ে দুর্বলতায় পরিণত হয়েছিলো। কালাইয়ের যখন জন্ম হলো, তখন তার আরও দুটো ভাই-বোন হয়েছিলো। তাদের মধ্যে একটা মারা গিয়েছে আর অন্যটি বেঁচে রয়েছে। একই সাথে দুটো ছাগলের জন্ম হলেও কালাইটা ছোট থেকেই রুপান্মিতার প্রিয় ছিলো, যা ধীরে ধীরে সময়ের সাথে সাথে সন্তানের রূপ নিয়েছে। কালাইয়ের কথা ভাবতে গিয়ে এই পর্যায়ে সত্যি সত্যিই চোখ ভিজে উঠলো রুপান্মিতার। সেই সাথে গাঢ় অভিমান জন্মালো এক অর্ধচেনা পুরুষের উপর। অন্তত পক্ষে ঐ মানুষটা এমন কিছু করতে পারে, সেটা বোধহয় ভাবতে পারেনি মেয়েটা। আরহানের কথা মাথায় আসতেই রুপান্মিতার চোখের পানি শুকিয়ে এলো। ঐ পাষাণ মানবের উপর অভিমান খাটে না। তার সাথে শুধু অভিযোগ যায়, ঘৃণাটা পুরোপুরি মানানসই।
সময়টা পরন্ত বিকাল, সূর্য অবস্থান করছে দিগন্তের অন্তিম আবহে। সূর্যের লাল আভার সঙ্গে কুয়াশার মিশ্রণ, সেই সাথে সদ্য ফোটা বড়ো-ছোট আকারের সরিষা ফুলের ঘ্রাণে প্রকৃতি যেনো মেতে উঠেছে আনন্দের জোয়ারে, চনমনে হয়ে উঠছে নাসারন্ধ্র। বর্তমানে সময়টা পৌষ মাসের মাঝামাঝি হওয়ার দরুন, প্রতিটি জমিতে সদ্যই ফসলের আনাগোনা শুরু হয়েছে। এই সময়টাতে চকে কৃষকের উপস্থিতি খুব কম থাকে। যারপরনায় এই মুহূর্তে আশেপাশে কাউকেই দেখতে পাচ্ছে না রুপান্মিতা। শুধু অনেকটা দূরে, দক্ষিণ পাড়ার ওইদিকটাতে কয়েকজন ছেলে-মেয়ে খিলক্ষেতে ছুটোছুটি করে গোল্লাছুট খেলছে বোধয়। পশ্চিম পাড়ার এদিকে আপাতত কেউ নেই। রুপান্মিতা এদিক-ওদিক ঘুরে ঘুরে কালাইয়ের সাথে জন্ম নেওয়া পাঠিটাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। রুপান্মিতাদের ছাগল, হাঁস, মুরগী সবগুলোই বেশ বাধ্য। সকালবেলা ছেড়ে দিলে একা একা নদীতে যায়, চকে যায়, আবার সন্ধ্যা হলেই ফিরে আসে। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। হাঁস-মুরগী, ছাগল সবকটিই ফিরে এসেছে, শুধু কালাইয়ের সাথে জন্ম নেওয়া পাঠিটাই এখনো ফিরে আসেনি। ঠিক এই কারণেই এই সন্ধ্যার আগ-আগ মুহূর্তে বাড়ি থেকে বের হতে হলো রুপাকে। রুপান্মিতা চকের আইল ধরে এদিক-ওদিক খুঁজে চলেছে, ক্ষণে ক্ষণে শব্দ করে ডাকছে। অনেকটা হাঁটতেই সামনে থেকে কয়েকটা রশিবিহীন ছাগল দেখতে পেলো, হয়তো বাড়ি ফিরছে। রুপান্মিতা গাঢ় মনোযোগ দিয়ে তাদের মাঝে পাঠিটাকে খুঁজে বেড়ালো, তবে পেলো না। এই পর্যায়ে এগিয়ে গেলো সামনের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে একদম চকের মাঝখানে চলে গেলো, এদিকটার জমি বেশ উর্বর, বোরো ধান চাষ করা হয়েছে মাত্র, একটু দূরেই পাম্প মেশিন। রুপান্মিতাদের ছাগলগুলো বেশিরভাগ সময় ওদিকটাতেই থাকে, মেশিনঘরের ওদিকটায় যা ঘাস জন্মায় সেসবই খায়। অগত্যা সেদিক পানে হাঁটা দিলো। দু-তিন মিনিটের মাথায় কাছাকাছি পৌঁছাতেই পরিচিত ছাগলের ডাক শুনে তরিহরি করে হেঁটে গেলো সেদিকে। পাঠিটাকে কেউ দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছে, অথচ ছাড়ার বেলা দ্বারা এমনিই ছেড়ে দিয়েছিলো। বিষয়টা বুঝে আসতেই এগুতে এগুতে দাঁত দাঁত চেপে ধরলো কিশোরী। আনমনেই বকে উঠলো—
—কোন বলদের ঘরের বলদে এরম একটা কাজ করছে? মনটায় চায়...
বলতে বলতে থেমে গেলো রুপান্মিতা। মেশিনঘরের পিছনে দাঁড়ালো, তাদের ছাগলের রশি ধরে রেখেছে আরহান। তার সাথে দাঁড়িয়ে আছে মেহরাবসহ আরও দুজন ছেলে। মানবের পরনে টিভিতে দেখা আলাদিনের মতো ধুতি-পাজামা আর শার্টের কাপড়ের ফতুয়া। ফতুয়ার হাতাটা কনুইয়ের উপরিভাগে ভাঁজ করা, চুলগুলো এলোমেলো, দেখেই বুঝা যাচ্ছে খানিক আগে বেশ হুড়োহুড়ি চালিয়েছে নিজেদের মাঝে। রুপান্মিতা বুঝে পেলো না দেওয়ান বাড়ির এই আধ দামড়া ছেলেটির কিসের এতো হুড়োহুড়ি? বয়সটা কি কম হয়েছে? এই বয়সে ছাগল চুরি, মানুষের বাড়ির ডাব চুরি, পেঁপে চুরি, বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ানো, সকাল-সন্ধ্যা ফুটবল খেলা, এসব কি? খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই? আরবিদ ভাইজান এটাকে শাসন করে না? মনে মনে আরহানের প্রতি কী যে বিরক্ত হলো। সেই বিরক্তিকর চাহনিটাই নিক্ষেপ করলো আরহানের দিকে। অথচ সামনের মানুষটা নির্বিকার, ছাগল বেঁধে রাখা দড়িটা হাতে পেঁচিয়ে সেই হাত বুকে পেঁচিয়ে মেহরাব আর বাকি ছেলেদের সাথে কথা বলতে বলতে মিটিমিটি হাসছে। পাত্তা না পেয়ে কথা বাড়ালো না সে। ঝুঁকে গিয়ে ছাগলের গলায় লাগানো রশিটার গিট খোলার প্রয়াস চালালো। চার-পাঁচটা গিট দিয়ে রেখেছে বদমাশটা। মনে মনে এক দফা বকতে বকতে বহু কসরত করে একটা গিট খুলেছে মাত্রই, তৎক্ষণাৎ খপ করে হাত টেনে ধরলো কেউ। পরপরই একটা হেঁচকা টান বসালো। সেই টানে ছিমছাম গড়নের রুপাটা নিজের ভারসাম্য রাখতে পারলো না। আছড়ে পড়লো মেশিনঘরের টিনের দেওয়ালটায়। আকস্মাৎ আছড়ে পড়ার দরুন ঠাস করে সজোরে শব্দ হলো। পিছনে বোধয় ফেটে যাওয়া কিংবা ঝঙ্কার ধরা টিন ভেঙে উঁচু হয়েছিলো। আকস্মিক আছড়ে পড়ার দরুন ঘ্যাচ শব্দ তুলে পিঠের অনেকখানি জায়গা কেটে গিয়েছে বোধহয়। দুর্ভাগ্যবশত ছাগলের গলার রশি খোলার সময় কাঁধ থেকে শালটা নিচে নেমে গিয়েছিলো, ফলস্বরূপ কাঁধের উপরের অংশটা কেটে গিয়ে জ্বলে উঠলো। তবে সেই জ্বালনের আভাস ফুটে উঠেনি মেয়েটার চোখে-মুখে। উল্টো তার চোখ জোড়া জ্বলে উঠেছে তীব্র রাগ ও ক্ষোভে। তক্ষুনি রুপার দিকে ঝুঁকে এলো আরহান। হাতের রশিটা মেহরাবের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো—
—এটা নিয়ে হাটা দেও, আমি আসছি।
ওপাশ থেকে উত্তর এলো না, তবে ঠিকই রশি টেনে ছাগলটি নিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান নিলো। মেহরাবের পিছু পিছু বাকিরাও চলে গেলো সামনে। রুপান্মিতা এখনো জ্বলন্ত দৃষ্টিতে আরহানের দিকে তাকিয়ে, অথচ সামনের পুরুষের ভাবাবেগ নেই। রুপান্মিতা বেশ বুঝতে পারছে, দেওয়ান বাড়ির ছোট ছেলেটা তাকে এতো সহজে শান্তি দিবে না। কিসের প্রতিশোধ নিচ্ছে কে জানে? সেদিন শাল নিয়ে ফেরত দেয়নি বলে এতো কাহিনি? তাহলে তার শালটা যে নিয়ে গেলো? সেই শালের জন্য কম বিপদ তো তাকে পোহাতে হয়নি, তাই না? আম্মার কাছে বহুবার ইনিয়ে-বিনিয়ে মিথ্যা মিথ্যা বাহানা দিতে হয়েছে, সেসবের কী হবে?
,,রুপান্মিতার ভাবনার মাঝে ফের টিনের দেওয়াল শব্দ হলো, দেওয়ালটা কেঁপে উঠলো খানিক। রুপান্মিতা অনুভব করলো, আরহান তার দুপাশে দুহাত রেখে একেবারে তার মুখের উপর ঝুঁকে এসেছে। মুহূর্তেই শীতল স্রোত বয়ে গেলো রুপান্মিতার ভিতরজুড়ে, মনে পড়ে গেলো সেদিনের ঐ জড়িয়ে ধরার দৃশ্যটি। যদিও ঐ জড়িয়ে ধরাটা আরহানের তরফ থেকে তাকে দুর্বল ও অন্যমনস্ক করার একটা চাল ছিলো। তবে রুপান্মিতার তরফ থেকে সেটা ছিলো কোনো পুরুষের সহিত প্রথম আলিঙ্গন, প্রথম স্পর্শ, যেই স্পর্শ রুপান্মিতার অন্তরাত্মা পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিলো। এই শিরশিরি অনুভূতির জোয়ার খানিক বাড়িয়ে দিতে একেবারে কানের কাছে ঝুঁকে এলো মানবটি। এই পর্যায়ে আরও কিছুটা হিম হয়ে এলো রুপান্মিতার শরীর। সরে যেতে চাইলো কিছুটা, তবে সফল হলো না। তার আগেই কানে বাজলো সামনের লোকটার বলা ফিসফিসে স্বর—
—কী ব্যাপার? তিন দিন ধরে স্কুল যাও না কেনো? অনেকদিন যাবত নদীর ঘাটেও যাও না। কী সমস্যা? কী হয়েছে?
এতোক্ষণ শিহরনে বুঁদ থাকলেও এরূপ প্রশ্নে সব যেনো হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো, ফিরে এলো আগে তৈরি হওয়া একরাস রাগ ও জেদ। সেই রাগের বশবর্তী হয়ে কাট কাট গলায় উত্তর করলো কিশোরী —যা খুশি, আপনাকে কেনো বলবো?
যা খুশি, আপনাকে কেনো বলবো? এতোটা রূঢ় স্বর? এরকমভাবে কেউ কোনোদিন কথা বলেনি আরহানের সাথে, অথচ সেদিনের মেয়ে হয়ে কিনা তার সাথে এতোটা বাজে ব্যবহার? সহ্য হলো না মানবের। দাঁতে দাঁত চেপে শুধালো —ত্যাজ দেখাও? ত্যাজ দেখাও আমার সাথে? গলা নামিয়ে কথা বলবে, নয়তো গলার রগ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো।
রুপান্মিতার ভয় পাওয়া উচিত, উচ্চবংশীয় ছেলে বলে কথা। চাইলে যখন-তখন, যেভাবে ইচ্ছা তাদের ক্ষতি করে দিতে পারে। বিপরীতে বিচার চাওয়ারও ক্ষমতা থাকবে না তাদের। কিন্তু তাতে কী আসে যায়? নিজের বিপদ-আপদের ভয় সে কোনোদিনই পায়নি, পেতে শিখেওনি। তাই কণ্ঠে আগের ন্যায় ত্যাজ ধরে রেখে আওড়ালো —কী যন্ত্রণা! আমি কেনো আপনাকে ত্যাজ দেখাতে যাবো? আর আপনি দেখছেনই বা কেনো? সরুন, আমার কাজ আছে।
সরলো না মানব, আগের ন্যায় হিসহিসিয়ে শুধালো
—কী কাজ? আমার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ কী কাজ থাকতে পারে তোমার?
রুপান্মিতার মুখটা কেমন তিতকুটে ঠেকলো। অগত্যা আরহানের চোখে চোখ রেখে বিবৃতি করে উত্তর করলো —গুরুত্বপূর্ণ? আপনি আমার কী এমন গুরুত্বপূর্ণ? জানতে পারি?
সোজাসাপ্টা কথায় বড্ডো অপমানিত বোধ করলো মানব, অপমানে চোখ-মুখ লাল হয়ে এলো যেনো। সেই সাথে রাগের পারদ তরতর করে বেড়ে দ্বিগুণ হলো
—আমার সাথে বাজে ব্যাবহার করছো তুমি।
—তাহলে সরে দাঁড়ান।
মানলো না মানব। জেদ দেখিয়ে আরও খানিক এগিয়ে এসে শুধালো —সরবো না, কী করবে?
মুখ ফিরিয়ে নিলো রুপান্মিতা, চোখে-মুখে অনীহা ফুটিয়ে আওড়ালো —কিছুই করবো না। কারণ কিছু করতে গেলেই আমার বদনাম হবে, মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়েছি না?
আরহান দেখলো সেই অনীহা। কেনো যেনো সহ্য হলো না এই ব্যবহারটা। সে আরও খানিকটা এগিয়ে এলো, পরপর নিজেও চোখে-মুখে অনীহা ফুটিয়ে বললো—
—তোমার ব্যবহার অত্যন্ত কর্কশ। ভালো ব্যবহার করতে শেখোনি।
—একদমই না, আমার ব্যবহার অত্যন্ত নম্র। তবে সেটা ততোক্ষণ পর্যন্ত, যতোক্ষণ আপনি এই অসভ্যতাটুকু করবেন না। কথাগুলো দূরে থেকেও ভদ্রভাবে বলা যেতো, আপনি অনুভব করতে পারছেন? আপনার অবস্থানটা ঠিক কোথায়?
বলেই নিজেদের অবস্থানের দিকে ইশারা করলো। আরহানও তাকালো নিজেদের দিকে। রুপান্মিতা মিশে রয়েছে টিনের দেওয়ালটায় আর আরহান মিশে রয়েছে রুপান্মিতার সাথে, দুজনার মাঝে হয়তো ইঞ্চি খানিক দূরত্ব, এর বাহিরে নয়। বিষয়টা বুঝে আসতেই আরহান অনুভব করলো, তার হৃদয়টা অনিয়ন্ত্রিত হারে কাঁপছে। সে তড়িৎ গতিতে সরে গেলো, নিজেও রুপান্মিতার পাশাপাশি মেশিনঘরের টিনের দেওয়ালটায় পিঠ ঠেকিয়ে কেমন লম্বা লম্বা নিশ্বাস ত্যাগ করলো। যেনো স্বস্তির রাস্তা খুঁজে বেড়াচ্ছে মানব।এই সুযোগে সরে পড়তে চাইলো রুপান্মিতা, তবে সামনে হাত রেখে বাধা প্রয়োগ করলো আরহান। ঘাড়টা কিঞ্চিৎ কাত করে রুপান্মিতার দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে শুধালো—
—সামান্য একটা ছাগলের জন্য এতোটা মনমরা হওয়া, স্কুল কামাই করা, বাইরে বের না হওয়া কতোটা গ্রহণযোগ্য?
আরহানের বলা বাক্যে রুপান্মিতাও ঘাড় কাত করে আরহানের দিকে তাকালো। দূর থেকে এই দৃশ্যটুকু বড্ডো সুন্দর দেখালো যেনো। দুজন মানুষ টিনের দেওয়ালে হেলান দিয়ে ঘাড় কাত করে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে, কতোই না মনোরম দৃশ্যখানা। তবে রুপান্মিতার কাছে তা মধুর ঠেকলো না। সে চোখ-মুখ শক্ত রেখে বিদ্রূপের কণ্ঠে শুধালো —কখনো আপন কোনো কিছু হারাননি, তাই না?
আরহান দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বুঝালো, মানে হারায়নি। হারাবে কী করে? সে তো সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছে, জমিদার বাড়ির বংশধর, বাবা-চাচার বিশাল ব্যবসা, বড়ো ভাইয়ের আদরের দুলাল, মা-চাচিদের চাঁদের টুকরা, বাবা-চাচাদের ভদ্র বাচ্চা, সব মিলিয়ে আরহানের জীবনটা সুখ দ্বারা কানায় কানায় ভর্তি। আরহানের তরফ থেকে আসা উত্তরে ফের বিদ্রূপ হাসলো মেয়েটা। পরক্ষণেই মানবের চোখে চোখ রেখে কেমন শান্ত কণ্ঠে আওড়ালো—
—দেখবেন, একদিন আপনিও খুব প্রিয় কিছু হারিয়ে হারানোর ব্যাদনায় ভেঙে চুরমার হয়ে যাবেন। বারংবার সেটা ফিরে পেতে চাইবেন, কিন্তু পাবেন না। আজীবনের জন্য হারিয়ে যাবে আপনার জীবন থেকে।
বলেই সামনে থেকে আরহানের হাতটা সন্তর্পণে সরিয়ে দিয়ে হনহন করে সামনের দিকে চলে গেলো । যাওয়ার আগে নিজেদের ছাগলটাকেও নিয়ে গেলো না। ছাগলটা রুপান্মিতাকে চলে যেতে দেখে বার কয়েক ডেকে উঠলো, পাত্তা দিলো না রুপা। আরহান কেমন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো রুপার দিকে, অনেকটা সময় নিয়ে রুপার কথাটা বুঝার প্রয়াস চালালো। বিষয়টা বুঝে আসতেই কেমন ফ্যাসফ্যাস করে হাসলো আরহান। ঠোঁট উল্টে আওড়ালো—
—আমি হারাবো না, আমি হারাতে শিখিনি। জয় করার লক্ষণ আমাদের বংশের ধারা নয় ফকিরের মেয়ে, আমরা ছিনিয়ে নিতে অভ্যস্ত।
*********
দিনটা বুধবার। শুক্রবার দিন বনশ্রী আর রেজওয়ানের বিয়ে। রেজওয়ানের তরফ থেকে যৌতুক সমেত কিছু চাওয়া হয়নি, উল্টো কাবিনের এক লাখ বাবদ দুই বিঘার একটা ফলের বাগান দেনমোহর হিসেবে ধার্য করেছে রেজওয়ান। যার প্রতি শতাংশ মূল্য ২ হাজার টাকা। এতে অবশ্য বনশ্রী ৩২ হাজার টাকা বেশি পাচ্ছে, তবে তাতে আপত্তি নেই রেজওয়ানের। ছেলেটা উপর থেকে খিটখিটে হলেও মনের দিক থেকে বড়ই স্বচ্ছ। ঠিক এই কারণেই মাহমুদুল দেওয়ান মেয়েকে দেওয়ার ভরসা পাচ্ছেন। তারা তো আর মেয়েটাকে জোর করে গছিয়ে দিচ্ছে না, উল্টো খিটখিটে রেজওয়ানটা নিজের স্বভাবের বাহিরে গিয়ে তাদের ঘরের মেয়েটাকে তোষামোদ করে নিয়ে যাচ্ছে। এতো তোষামোদ করে নিয়ে যাওয়ার পর নিশ্চয়ই অবহেলায় রাখবে না? মেয়েটা হয়তো সুখীই হবে।
বহু বছর বাদে দেওয়ান বাড়ির নতুন বংশধরদের মধ্যে প্রথম কারোর বিয়ের অনুষ্ঠান। বিদায়, দুদিন আগে থেকেই বেশ তোরজোর চলছে। রংবেরঙের মসারি কাপড় দিয়ে সাজানো হচ্ছে বাড়ির চারদিক। রাতের দিকে গোটা বাড়ির কোনায় কোনায় হাজার খানিক হারিকেনও জ্বালানো হবে। এগুলো অবশ্য বাড়িঘর সাজগোজ করানো লোকেরাই সাথে করে নিয়ে এসেছে। এখনো প্যান্ডেল বাঁধা হয়নি, তবে কাজ চলছে, হয়তো সন্ধ্যার আগে বাঁধা হয়ে যাবে। সোমবার দিন রাতে বিয়ে ঠিক হওয়ার পরপরই নিবেদিতা ও কাব্যকে নিয়ে নিমন্ত্রণের একটা তালিকা বানিয়েছেন মাহমুদুল দেওয়ান। বর্তমানে সেই অনুযায়ী কাজ ভাগাভাগি করে পাড়ায় পাড়ায় নিমন্ত্রণ পাঠানো হচ্ছে। রেজওয়ান মাস্টারের দিক থেকে তেমন কেউ না থাকলেও দেওয়ান বাড়ির মেয়ের বিয়েতে নবীনগরের সকলেই নিমন্ত্রিত। আর এই নিমন্ত্রণের ভার নিয়েছে আরহান ও তার বন্ধুগণ। মাহমুদুল দেওয়ানের করা নির্দেশ, প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে গিয়ে অত্যন্ত ভদ্রতার সহিত সবাইকে দাওয়াত করতে হবে। দেওয়ান বাড়ির মেয়ের বিয়েতে যেনো গ্রামের একজন মানুষ অভুক্ত না থাকে।
ভাইয়ের মেয়েকে নিয়ে মাহমুদুল দেওয়ানের এই উৎসাহ একদমই পছন্দ হচ্ছে না বিনু ফুপুর। বাড়ির বড়ো মেয়েটা এখনো অবিবাহিত। তার বিয়ে না দিয়ে ছোটটাকে এতো হৈচৈ করে বিয়ে দিলে লোকে নানান কথা বলবে না? এমনিতেই তো লোকজন পারছে না মেয়েটাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে খেয়ে ফেলছে, তার মধ্যে ছোট বোনের বিয়েতে এতো তোরজোর কতোটা গ্রহণযোগ্য? এর বিপরীতে মাহমুদুল দেওয়ান পুরোপুরি নির্বিকার। তিনি মেঘশ্রীকে নিয়ে আপাতত কিছু বলতে চান না। বিষয়টা আপাতত নয়, মোট কথা তিনি এই মেয়েকে নিয়ে কিছুই বলতে চান না। যে বাবা-মায়ের কথা শোনে না, বাবা-চাচাদের সম্মান বুঝে না, একটা ঠক জোচ্চরের জন্য অপেক্ষা করতে করতে নিজেকে সমাজের কীটে পরিণত করে, তার সাথে কোনো রকম বাক্যব্যয় করার ইচ্ছা নেই উনার। যে স্বেচ্ছায় মরতে চায়, নিজেকে পচিয়ে-গলিয়ে খাক করতে চায়, অন্তত পক্ষে তার জন্য ক্ষত সারানোর মলম কিনে অর্থব্যয় করা বেমানান।মেঘশ্রীও বিষয়টা নিয়ে তেমন একটা কথা বলেনি। কী-ই বা বলবে? সবার ভাগ্য তো আর তার মতো না। ছোট বোনের বিয়ে হচ্ছে, তাতে সে খুশি। বনশ্রীটা সুখী হোক, স্বামী-সংসার নিয়ে ভালো থাকুক। সংসার করতেও ভাগ্য লাগে, সেই ভাগ্যটা যার হয়, সে বড়ই ভাগ্যবতী।
,,,,নবীনগরের অর্ধেকটা জায়গা জুড়ে শুধু দক্ষিণ পাড়া নির্মিত আর বাকি অর্ধেকটা জায়গায় রয়েছে পশ্চিম পাড়া, উত্তর পাড়া, পূর্ব পাড়া, জেলে পাড়া, কুমার পাড়া, কামার পাড়া, নৌ পাড়া, হিন্দু পাড়া, বেদে পাড়া, সেই সাথে সব পাড়া পেরিয়ে বর্ডারের কাছে মৎস্য পাড়াও রয়েছে। সেখানে ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ মাছ ক্রয় করে সেগুলো শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করে। গতকাল সারাদিন ব্যাপী জেলে পাড়া, কুমার পাড়া, কামার পাড়া, নৌ পাড়া, হিন্দু পাড়া, বেদে পাড়া, মৎস্য পাড়ায় দাওয়াত করেছে আরহান ও তার বন্ধুরা। আজ গিয়েছে দক্ষিণ পাড়ায়। দক্ষিণ পাড়া জায়গাটা বিশাল হওয়ার দরুন তারা ভাগে ভাগে আলাদা হয়ে নিজেদের মতো দাওয়াত করেছে। এর মধ্যে কয়েকজন পশ্চিম পাড়ায়ও গিয়েছিলো।
সকাল থেকে জোহরের আজানের আগ পর্যন্ত নিমন্ত্রণ করেও খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি তারা, মাঝপথে জোহরের আজান পড়ে গিয়েছে। অগত্যা থেমে গেলো সকলে। মাঝপথে যে আজান পড়ে যাবে, বিষয়টা আগেই ঠাওর করতে পেরেছিলো, যার দরুন সকাল সকালই গোসল করে নিয়েছিলো সকলে। এই বেলায় নামাজ পড়ে তারপর দেওয়ান বাড়ির দোরগোড়ায় পা রাখলো সবাই।
অন্যান্য অতিথিরা বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে নিমন্ত্রিত হলেও আরহানের বন্ধু-বান্ধব, আরবিদ ও মাহমুদুল দেওয়ান, মাহবুবুর দেওয়ানের কর্মচারীরা আজ দুপুর থেকেই নিমন্ত্রিত ছিলো। অগত্যা দুপুরের খাবার খাওয়ার উদ্দেশ্যে দলবল নিয়ে ভিতরে ঢুকলো আরহান। সবাই আগে ভাগে ভিতরে গেলেও কী একটা কাজে যেনো পিছিয়ে গিয়েছিলো মেহরাব। বহুদিন যাবত দেওয়ান বাড়িতে পা না রাখার দরুন কিছুটা ইতস্তত কাজ করছে বেচারার। ছেলেটা কেমন আনমনেই এগিয়ে যাচ্ছে বাড়ির ভিতর।গেইট দিয়ে প্রবেশ করতে নিতেই আকস্মিক সামনে এসে দাঁড়ালো কেউ। হকচকিয়ে গেলো মেহরাব। সামনে না তাকিয়েই বুঝলো, সামনের মানুষটাও সমান তালে হকচকিয়ে গিয়েছে। হয়তো খেয়াল করেনি তাকে। নিজেকে সামলে সামনে দৃষ্টি পাত করলো মানব। তৎক্ষণাৎ নজর আটকালো দেওয়ান বাড়ির বড়ো মেয়ের পানে। ঝাম রঙা তাঁতের শাড়ি পরিহিত রমণীর চাহনি নিষ্প্রভ, কেমন শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে তার মুখটার দিকে। দৃষ্টি নামিয়ে নিলো মেহরাব। দুজন সামনাসামনি হওয়ার দরুন কিছুটা সরে গিয়ে যাওয়ার জায়গা করে দিলো। বিষয়টা বুঝতে পেরে মেঘশ্রীও সামলে নিলো নিজের নিষ্প্রভ চাহনিটা। মনে মনে দীর্ঘশ্বাস গোপন করে হাঁটা দিলো সামনের দিকে।
মানুষ যখন ভাগ্যের উপর অসন্তুষ্ট হয়েও আল্লাহর উপর অভিযোগ করার সাহস করতে পারে না, তখনই দীর্ঘশ্বাস গোপন করে। কারণ মানুষের নাক-মুখ হতে নির্গত প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস নিজের অবস্থানের উপর অসন্তুষ্টতার প্রমাণ রাখে। জোরপূর্বক দীর্ঘশ্বাস গোপন করলেও চোখের পানিটা আটকে রাখতে পারলো না মানবী। চোখ জোড়া কেমন ঝাপসা হয়ে উঠলো, কান্নারা দলা পাকিয়ে গলাটা ভার করে তুললো, কিন্তু কাঁদতে ইচ্ছা করলো না রমণীর। আর কতো কাঁদা যায়? আর কতোটা কাঁদলে পাওয়া যাবে তাকে? কাঁদলে কি সত্যি যা চাই, তা পাওয়া যায়? কই, মেঘ তো পেলো না। টানা ৯ বছর যাবত কেঁদেও তো তাকে পেলো না। আর কতো বছর কাঁদলে পাবে তাকে? একজীবন কাঁদলে পাবে কি? মরার পর আখিরাতে পাবে? পেলে তাই সই, আখিরাত পেরিয়ে পরজন্মে যদি তাকে পাওয়া যায়, তাহলে সেই পর্যন্ত চোখের পানি ঝরাতেও কোনো আপত্তি নেই তার।
মেহরাব তখনো ঠায় দাঁড়িয়ে, কেমন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ঘন পথ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানবীর দিকে। মেঘশ্রীর অস্তিত্ব মিলিয়ে যেতেই মেহরাবও গোপন করলো এক টুকরো গাঢ় নিশ্বাস। পরপরই পা বাড়ালো বাড়ির ভিতরে ঢোকার উদ্দেশ্যে।
সকালে আরহানরা বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত অধীর আগ্রহে বসে ছিলো কাব্যশ্রী, উদ্দেশ্য ভাইজানেরা ফিরে এলে মিতালির খোঁজ জানতে যাওয়া। সেদিন মিতালির বাড়ি থেকে আসার পর এক টুকরো শান্তি পায়নি মেয়েটা। নানাবিধ প্রশ্ন, আশঙ্কারা মিলে-মিশে তার মন-মস্তিষ্ককে বিষিয়ে তুলেছে প্রায়। এই দুদিনের ভিতর বেশ কয়েকবার বাড়ি থেকে বের হতে চেয়েছিলো কাব্য, কিন্তু সুবিধা করতে পারেনি। যখনই বের হতে চেয়েছে, তখনই কেউ না কেউ সামনে পড়ে গিয়েছে। জানতে চেয়েছে সে কোথায় যাচ্ছে, তখন বাগানের কথা বলে ব্যাপারটা কাটিয়ে নিয়েছে কাব্য। এই দুদিনে স্কুলেও যাওয়া হয়নি। বনশ্রী আপার বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকে স্কুলে যাওয়া একপ্রকার নিষিদ্ধ হয়ে উঠেছে তার জন্য। সারাক্ষণ এই কাজে, ঐ কাজে ডাকাডাকি করেই চলেছে। সব মিলিয়ে ভাইজানের থেকে খোঁজ নেওয়া ব্যতীত আর কোনো রাস্তা দেখছে না মেয়েটা।
বর্তমানে নিচ থেকে পুরুষালি হইচই আর ভাইজানের কণ্ঠস্বর শুনে ঘর থেকে ছুটে বের হলো কাব্য। বারান্দার রেলিঙের কাছে এসে রেলিং ধরে নিচে উঁকি দিতেই দেখলো ভাইজান দাঁড়িয়ে আছে, তার সাথে দাঁড়িয়ে আছে মেহরাব ভাই ও শাহিল ভাই। বাকিরা সোফায় বসে আছে। এতোকিছুতে মন দিলো না কিশোরী, দেওয়ার মতো ধৈর্য নেই তার। অগত্যা দিক-বেদিক শূন্য হয়ে ছুটে এলো নিচের দিকে। সিঁড়ি বেয়ে নামার কালে পায়ের নুপুর জোড়া কেমন রিনিঝিনি শব্দ তুলে আকর্ষণ কেড়ে নিলো সবার। সকলেই এক পলক তাকালো সিঁড়ির দিকে, পরপরই নজর সরিয়ে অন্যদিকে তাকালো। ওদিকে তাকানো বারণ, তাকানোর সাহস তৈরি করাটাও বারণ। তবে মেহরাব দৃষ্টি নত করলো না। সে তাকিয়ে রইলো নির্মেষ। এতেও দৃষ্টি দেওয়ার সময় পেলো না কিশোরী। এক ছুটে আরহানের সামনে এসে দাঁড়ালো।
ওর ছোটাছুটি দেখে আরহানের বন্ধু-বান্ধবদের জন্য খাবার বাড়তে থাকা আয়েশা বেগম ধমকে উঠলেন, তাতেও কান পাতলো না কাব্য। সে আজ অর্বাচীন, অশান্ত, ছন্নছাড়া। কারোর কথায় থেমে যাওয়ার মনোভাব কাজ করছে না। শান্ত-শিষ্ট কাব্যশ্রীর চোখে-মুখে এই উৎকণ্ঠা দেখে খানিক বিচলিত হলো আরহান। বোনের হাত ধরে টেনে এক পাশে জড়িয়ে ধরলো। অন্যদিন হলে ভাইজানের আদরে আদরিনী হয়ে উঠতো মেয়েটা, এতো ছেলেদের মাঝে লজ্জায় গুটিয়ে যেতো, কিন্তু আজ তার কিছুই হলো না। সে ভাইজানের দিকে তাকিয়ে কেমন তাড়াহুড়ো কণ্ঠে শুধালো —ভাইজান!! রুপা আপাকে দাওয়াত করেছেন?
রুপা? মানে রুপান্মিতা? রুপান্মিতার নামটা কানে বাজি খেতেই গতদিনের কথা মনে পড়ে গেলো আরহানের। সেই সাথে শেষে বলা মেয়েটার সেই অদ্ভুত কথাটাও। তবে সেই ভাবনা বেশিক্ষণ স্থায়ী করলো না। বোনকে উত্তরের আশায় চেয়ে থাকতে দেখে নরম কণ্ঠে উত্তর করলো—
—না, পশ্চিম পাড়ার মসজিদের পিছনের দিকে এখনো যাওয়া হয়নি। বিকালের দিকে যাবো। কেনো? এতো তাড়া কিসের?
উত্তর করলো না কাব্য, উল্টো প্রসঙ্গ পাল্টে শুধালো —মিতালিকে দাওয়াত করেছেন? ওদের বাড়ি গিয়েছিলেন?
আরহান অনুভব করলো, কাব্য বেশ বিচলিত। ঠোঁট ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা প্রতিটি বাক্য দ্রুততার সহিত আওড়াচ্ছে। এই শীতের মাঝেও থুতনিতে ঘাম জমা হয়েছে কিছুটা। বোনের অবস্থা দেখে চিন্তিত হলো আরহান। কাব্যর থুতনিতে জমা ঘামটুকু বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে মুছে দিতে দিতে প্রতিত্তোর করলো —অতুল গিয়েছিলো, কিন্তু তুমি এতোটা অস্থির হচ্ছো কেনো? কী হয়েছে কাব্য? কোনো সমস্যা? ভাইজানকে বলো।
ভাইজানের কথায় কিছুটা স্থির হলো কাব্য। মনে মনে নিজেকে কিছুটা শান্ত করে মুচকি হেসে উত্তর করলো—তেমন কিছু না ভাইজান। অতুল ভাই কোথায়? এখানে তো নেই।
আরহান কিছু বলার পূর্বেই উত্তর করলো মেহরাব —বাহিরে আছে বোধহয়। একটু অপেক্ষা করো, চলে আসবে।
পাশ থেকে মেহরাবের কণ্ঠ শুনে চোখ তুলে তাকালো কাব্য, তবে কোনো উত্তর করলো না। সেকেন্ড কয়েক চেয়ে থেকে ভাইজানের অনুমতি না নিয়েই তীব্র উৎকণ্ঠা নিয়ে ছুটে গেলো বাহিরের দিকে। পায়ে চটি নেই, মাথায় ঘোমটা নেই, ছুটার তালে কখন যে খোপা করা কোঁকড়া চুলগুলো কোমর ছাড়িয়েছে, তাতেও ভাবাবেগ হলো না কাব্যশ্রীর। সে আপাতত মিতালির খোঁজ জানতে চায়।
কাব্যর কোনোদিকে ভাবাবেগ না থাকলেও মেহরাবের ভাবনাটা বোধহয় চপলহীন, এলোকেশী, নুপুরের রিনিঝিন শব্দ তুলে ছুটে চলা কিশোরীর মাঝেই থেমে গিয়েছে। ছেলেটা এখনো কেমন হতবুদ্ধের ন্যায় তাকিয়ে আছে সেদিকে। এটা কাব্য, আরহানের বোন। একই পাড়ায় থাকার দরুন মাঝে-সাঝেই দেখা হয়ে যায়। কতোবার চলতি পথে পিছু নিয়েছে, তারও ইয়ত্তা নেই। তবে পথে-ঘাটে চলাফেরা করা কাব্য আর এখনকার কাব্যর মাঝে ভীষণ তফাৎ। রাস্তাঘাটে চলতে থাকা কাব্যটা নাজুক, সবসময় কেমন নিজেকে গুটিয়ে রাখে, তবে আজকের কাব্যটা কিছুটা ব্যতিক্রম। মেহরাবের মনে হলো, আজকের কাব্যটা চঞ্চল হরিণী, যে নিজের চঞ্চলতা দিয়ে তার হৃদয়টা আরও একবার হরণ করে নিয়েছে।
ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে আসা কাব্য বাড়ির বাহিরে পা রাখতেই কেমন থমকে গেলো। চারদিকে ছেলে ও পুরুষের আনাগোনা টের পেয়ে কেমন মিইয়ে গেলো মেয়েটা। সহসা শাড়ির আঁচল টেনে মাথায় লম্বা করে ঘোমটা টানলো। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলো প্যান্ডেলের দিকে। অতুল প্যান্ডেলের ওখানে বসে প্যান্ডেলের লোকেদের সাথে কী নিয়ে যেনো কথা বলছে। ওদিকে বেশি লোক থাকায় কাছাকাছি একটা জায়গায় থেমে গেলো কাব্য। ছোট একটা বাচ্চা মেয়েকে ডেকে বললো, যেনো অতুল ভাইকে ডেকে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চা মেয়েটি ছুটে গিয়েছে সেদিকে। এর মিনিট খানিকের মাথায় কাব্যর সামনে এসে দাঁড়ালো অতুল। কিছু বলতে নিবে, তার আগেই কাব্যশ্রী কণ্ঠে তীব্র উৎকণ্ঠা জমিয়ে অধৈর্যের ন্যায় শুধালো —অতুল ভাই!! আপনি নাকি মিতালিদের বাড়িতে গিয়েছিলেন? দাওয়াত করেছেন? মিতালির সাথে দেখা হয়েছে আপনার? ও ঠিক আছে না? আমার কথা জিজ্ঞেস করেছে?
একসাথে এতোগুলো কথা বলতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠলো মেয়েটা। সমান তালে অতুল নামক ছেলেটাও হাঁপিয়ে উঠেছে যেনো। সে কেমন তাড়াহুড়ো করে কাব্যকে শান্ত করার প্রয়াস চালিয়ে আওড়ালো —থামেন, থামেন আপা। একটু ধীরে ধীরে কন, আমি কোনোখানে চইলা যাইতাছি না। হো, মিতালিগো বাড়িত গেছিলাম, কিন্তু হেগো বাড়ি তালা মারা। মনে হয় কোনো খানে গেছে।
কাব্যশ্রীর উৎকণ্ঠা মিশ্রিত স্বরটা কেমন ধপ করেই মিলিয়ে গেলো। মুখটা মলিন করে শান্ত স্বরে আওড়ালো —তালা মারা? আশেপাশে কাউকে জিজ্ঞেস করেননি? মানে কোথায় গিয়েছে? কবে আসবে?
অতুল মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানালো, মানে বলেছে। পরপরই চোখে-মুখে অপারগতা ফুটিয়ে বললো —হেগো আশেপাশে তো কেউই থাহে না আপা, কারে জিগামু?
— হুম, তাও ঠিক।
রুপান্মিতার চোখে-মুখে মলিনতা আর কণ্ঠে অসহায়তা দেখে খানিক বিচলিত হলো অতুল। শুধালো —আপা!! কিছু হইছে? আপনারে এতো চিন্তিত লাগতাছে কেনো?
—আমার জন্য একটা কাজ করে দিতে পারবেন ভাইয়া? দয়া করে?
—এমনে কইতাছেন কেনো আপা? আমার কাজ ওইতো আমনেগো ফায় ফরমাস পালন করা। কন, কী করতে হইবে?
কাব্য কেমন কাতর কণ্ঠে আবদার করলো—
—সন্ধ্যার দিকে আবার একটু যাবেন? না, মানে আপার বিয়ে তো। যদি সন্ধ্যায় আবার ফিরে আসে। যাবেন?
অতুল মাথা নাড়ালো, মানে যাবে। কিছুটা ভরসা পেলো কাব্য। মনে মনে দোয়া করলো, যেনো মিতালিটা ঠিক থাকে। অন্তত পক্ষে সুস্থ, স্বাভাবিক আর প্রাণোচ্ছল থাকে।
***********
সময়টা ৫টা পঞ্চাশের ঘরে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে সবার ব্যস্ততা বেড়ে চারগুণ হয়েছে। সেই ব্যস্ততায় শামিল হয়েছে আরহান। খাওয়া-দাওয়া শেষে নিমন্ত্রণ করতে যাওয়ার কথা থাকলেও আকস্মাৎ ঢাকা থেকে মামুদের আগমন ঘটায় বাকিদের নিমন্ত্রণ করতে পাঠিয়ে দিয়ে মেহরাবকে নিয়ে নদীর ঘাটে গিয়েছিলো। ফিরেছে মাত্রই। জীবনের ১৫টি বছর যাদের সাথে কাটিয়েছে, তাদেরকে কাছে পেয়ে আপ্যায়নে ব্যস্ত সে, যার ফলস্বরূপ একা হয়ে পড়েছে মেহরাব। সারাদিন ঘুরে ফিরে শরীরটা অসার হয়ে আসায় অন্য কোথাও যাওয়ার প্রয়াস চালায়নি। চুপচাপ বসে রইলো বসার ঘরের বেতের সোফায়। এখানটায় আপাতত রাহিমা বেগম, কুসুম ও পাড়ার দুজন মহিলা ব্যতীত তেমন কেউ নেই। চারজন মিলে আরহানের মামুদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করছেন। আয়েশা বেগম আরহানের সাথে উপরে ঘরে, ভাই-ভাবিদের সাথে আলাপচারিতায় মত্ত। মেহরাব কিছুক্ষণ বাদে বাদে উপরে তাকাচ্ছে, উদ্দেশ্য আরহানের দর্শন পাওয়া। একা একা বড়ই একঘেয়ে অনুভূতি হচ্ছে তার।
এমন সময় উপরের ঘর থেকে হেলতে-দুলতে নিচে নেমে এলো শুশি। মাত্রই ঘুম থেকে উঠেছে বোধহয়। চোখ জোড়া কেমন নিভু-নিভু দেখাচ্ছে, গোলাপি রঙা কান দুটো একদম টকটকে গোলাপি রং ধারণ করেছে। হেলতে-দুলতে বসার ঘরের মাঝখানে এসে মেহরাবের সামনে থামলো শুশি। এদিক-ওদিক তাকিয়ে কার যেনো সন্ধান চালাচ্ছে, হয়তো মাকে খুঁজছে। বিষয়টা লক্ষ করলো মেহরাব। শুশিকে দেখে আনমনেই ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। এটা তো কাব্যশ্রীর খরগোশ। সে কী ভেবে যেনো চট করেই উঠে দাঁড়ালো। ঠোঁটে অমলিন হাসি স্থির রেখে কয়েক পা এগিয়ে চট করেই কোলে তুলে নিলো খরগোশটাকে। পরপরই কয়েক পা পিছিয়ে আগের ন্যায় বেতের সোফায় বসে পড়লো। এমনিতে সচরাচর অপরিচিত কারোর কোলে না গেলেও মেহরাবের কোলে আরাম পেয়ে গা হেলিয়ে দিলো শুশিটা। মেহরাব যেনো এতে পুলকিত হলো। ধীরে ধীরে সাদা পশমে হাত বুলিয়ে দিতেই চোখ জোড়া বন্ধ করে নিলো শুশি।
ঠিক সেই মুহূর্তেই বাড়িতে প্রবেশ করলো আরবিদের দুয়েকজন কর্মচারী। তাদের হাতে বড়ো বড়ো আকারের কয়েকটি ব্যাগ। আর তাদের পিছন পিছন ময়নুলকে নিয়ে বাড়িতে ঢুকলো আরবিদ। কর্মচারীগুলো দ্রুত গতিতে এগিয়ে গেলো রাহিমা বেগমের নিকট। এখানে বনশ্রীসহ বাকিদের জন্য উপহার রয়েছে। আরবিদ যখনই শহরে গিয়ে একের অধিক রাত কাটায়, তখনই সবার জন্য এটা-ওটা নিয়ে আসে। আজ কিছুটা ব্যতিক্রম। বনশ্রীর বিয়ে, বিদায় বনশ্রীর জন্য গোটা করে সাত-আটটি শাড়ি এনেছে, যেনো শ্বশুরঘরে গিয়ে পরতে পারে। সেই সাথে বাড়ির সব মহিলাদের জন্যও একাধিক শাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে দেওয়ান বাড়ির ছোট মেয়েটার জন্য আদৌ কিছু রয়েছে কিনা জানা নেই। হয়তো নেই। কখনোই তো থাকে না, আর থাকলেও হয়তো সবার মতো সীমিত। আলাদা করে তার জন্য কখনোই কিছু আনেনি আরবিদ দেওয়ান।
বড়ো ছেলেকে বাড়ি ফিরতে দেখে তড়িৎ গরম পানি বসালেন রাহিমা বেগম। ছেলেটা ফিরে কারোর সাথে কথা বলে না, সোজা ঘরে চলে যায়, এরপর পোশাক নিয়ে ফিরে এসে কলঘরে গিয়ে প্রথমে গোসল সেরে তারপর মায়ের সাথে দেখা করে। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। ময়নুলের হাত থেকে বড়ো শপিং ব্যাগটা নিয়ে হাঁটা দিলো উপরের দিকে। তবে চলতি পথে বেতের সোফায় নজর যেতেই কেমন থমকে গেলো মানব। ভ্রু যুগল কুঁচকে এলো মুহূর্তেই। মেহরাবের কোলে শুশির আরাম করে ঘুমিয়ে থাকাটা মোটেও পছন্দ হলো না আরবিদের। সে কেমন চোখ ছোট ছোট করে শুশির দিকে তাকালো, পরপরই আগাগোড়া পরখ করে নিলো মেহরাবকে। মেহরাবের তাতে ধ্যান নেই। সে মনোযোগ দিয়ে শুশির পশমে আলতো করে হাত বুলাচ্ছে। আরবিদ ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে তাকিয়ে রইলো। কিছু বললো না। তবে মিনিট খানিক পেরুনোর পরেও যখন মেহরাবের ভাবাবেগ হলো না, তখনই অধৈর্য হয়ে পড়লো মানব। দাঁতে দাঁত চেপে ধমকে উঠলো—
—এই ছেলে!! ওকে কোলে নেওয়ার সাহস দিলো কে তোমায়? নামাও।
আকস্মিক ধমকে হকচকিয়ে গেলো ছেলেটা। এরূপ ধমকে শুশিটাও লাফিয়ে উঠেছে। বিষয়টা বুঝতে পেরে ধমকের উৎস খুঁজে সামনে তাকাতেই আরবিদকে দণ্ডায়মান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো। এই মানুষটাকে হিসাবের বাহিরে গিয়ে ভয় পায় মেহরাব, সেই সাথে বড়ো ভাইয়ের মতো সম্মানও করে। এমন সম্মানিত মানুষকে নিজের দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে অসহায় বনে গেলো ছেলেটা। কৈফিয়ত দেওয়ার জন্য কিছু বলতে নিবে, তার ফুরসত দিলো না আরবিদ। দুপা এগিয়ে খপ করে কেড়ে নিলো ছোটখাটো শুশিটাকে। পরপর কোনো রকম বাক্যব্যয় না করেই খরগোশটাকে কাঁধের উপর বসিয়ে দিলো। বাবার আদরে আদরিনী হয়ে উঠলো শুশি। পাঞ্জাবির কলারখানা খামচে ধরে কাঁধে মুখ গুঁজে আবারও চোখ বুজে নিলো। বিষয়টা বুঝতে পেরে এক বিন্দু সময় অপচয় করলো না মানব। উপরের দিকে পা বাড়িয়ে যেতে যেতে মেহরাবের উদ্দেশ্যে বললো—
—আর কখনো ছুঁবে না ওকে, ধারে-কাছেও যেনো না দেখি।
মেহরাব উত্তর করতে পারলো না, শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো মানবের প্রস্থান। এটা একটা খরগোশ, আর এই সামান্য খরগোশটাকে ছোঁয়ায় তাকে পরপর দুটো ধমক দিলেন আরবিদ ভাইজান। এমনটা তো কখনোই হয় না। আরবিদ ভাইজান বড়ই শান্ত গোছের মানুষ, অকারণে কথা খরচ করে না, রাগ করা তো দূর। তাহলে এইটুকু কারণে রেগে গেলো কেনো? আর সম্ভবত আরবিদ ভাইজান খরগোশ পছন্দ করে না, ইতিপূর্বে এমনটাই তো শুনেছিলো সে? তাহলে আজ ব্যতিক্রম হলো কেনো? ভেবে পেলো না ছেলেটা।
,,,,, চলবে
,,,, আজ লেখা বোধহয় কিছুটা এলোমেলো হয়েছে। রিচেক করিনি, রিচেক না করেই বানান ঠিক করেছি শুধু । কেমন হয়েছে বলে যাও, বড়ো করে কমেন্ট করবে। 🤗🤗