#দেওয়ান_সাহেব ( পর্বঃ ৭)
#ট্রাজেডি_জাস্টিস
#লেখনিতে_রুপান্জলি
সময়টা সকাল সাতটা বেজে দশ মিনিট। দিন পেরুলে বনশ্রীর বিয়ে, যার দরুন দেওয়ান বাড়ির পুরুষগণ আপাতত বাড়িতেই রয়েছে। টানা দুদিন বাজারমুখী হবে না কেউ। সেই নিয়মের আওতায় আরবিদ দেওয়ানকেও রাখা হয়েছিল, কিন্তু সে মানতে নারাজ। এসব আনুষ্ঠানিকতার জন্য সে কোনো মতেই নিজের কাজে বিরতি দিতে রাজি নয়। তখনই শেষ ভরসাস্বরূপ রাহিমা বেগম কেঁদে কুটে রাজি করিয়েছেন ছেলেকে। এই একজন মানুষের কাছে বোধহয় আরবিদ দেওয়ান সত্যিই কিছুটা দুর্বল। মায়ের চোখে পানি দেখলে মানুষটা মাত্রাতিরিক্ত কঠোর হতে পারে না। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলো, সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত সে বাড়িতেই থাকবে, তবে সন্ধ্যার পর শহরে যাওয়াটা আবশ্যক। সে সত্যিই এসব আনুষ্ঠানিকতায় থাকবে না, ভালো লাগে না তার, বিরক্ত অনুভব করে। ছেলের কথা আপাতত মেনে নিলেন রাহিমা বেগম। পরে নাহয় আবারও দুপুরের পর একটু কেঁদে কুটে শহরে যাওয়াটাও আটকে দেবেন।
,,, সময়টা সাতটার ঘরে হলেও আজ দিনটা প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই মলিন, কুয়াশায় আচ্ছাদিত হয়ে কুয়াশাময় হয়ে উঠেছে ধরণী। ভোর রাত থেকেই ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির রূপ ধরে শিশির ঝরছে। বর্তমানেও একইভাবে শিশির ঝরা স্নিগ্ধ সকাল বিরাজমান। এমন পরিবেশে খবরের কাগজ হাতে বারান্দার লাগোয়া জানালাটার পাশে আরাম কেদারায় বসে আছে আরবিদ। এক হাতে খবরের কাগজ থাকলেও অন্য হাতে রয়েছে চুরুট। তাতে একটার পর একটা টান বসিয়ে বড্ড মনোযোগের সহিত দেশের হালচাল সম্পর্কে ধারণা নিচ্ছে। প্রথম দিকেই রয়েছে চলচ্চিত্রের নিউজ, যা সম্পর্কে জানার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই মানবের। ইদানীং অনির্বাণ নামক একটা ছায়াছবি দেশজুড়ে ভালোই আলোড়ন ছড়িয়েছে, টিকিটও বিক্রি হয়েছে হাজারের অধিক। নবীনগড়ে সিনেমা হল না থাকায় অনেকেই বন্দরে গিয়ে ছায়াছবিটি দেখে আসছে। ফিরে এসে আবার সেই ছায়াছবিতে প্রকাশ পাওয়া গানও গুনগুনিয়ে গাইছে, মাঝেমধ্যে ছায়াছবির ভিতরকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে করতে ঝগড়াও বাধিয়ে দিচ্ছে। এমনকি দেওয়ান বাড়ির মেয়েদের মাঝেও অনির্বাণ ছায়াছবি নিয়ে তীব্র আগ্রহ লক্ষ করেছে আরবিদ। তবে বিষয়টা মোটেও পছন্দ নয় আরবিদের। এমন নয় যে ছায়াছবি দেখতে যাওয়া খারাপ কিংবা ছায়াছবিটি অশুচনীয়। মূলত ছায়াছবিটি খারাপ নয়, বরং ছায়াছবি দেখতে যাওয়ার জায়গাটা নিরাপত্তাহীন। মেয়ে মানুষের সেখানে না যাওয়াটাই সূচনীয়। ভাবনা রেখে একের পর এক পাতা পাল্টালো মানব, তবে মনপুত কোনো লেখা কিংবা সংবাদ সামনে আসছে না। নজর বুলাতে বুলাতে ১২তম পৃষ্ঠার ৪৩ নম্বর প্যারায় গিয়ে থামলো আরবিদ। একজন নতুন সাংবাদিক, নাম শ্রুতি গাঙ্গুলি। মেয়ে মানুষ, পরনে সাংবাদিকতার পোশাক-আশাক। তারই ছবি বড়ো বড়ো করে ছাপানো রয়েছে খবরের কাগজে। সেই ছবিটির একপাশে বড়ো বড়ো করে শিরোনাম লেখা—
,,, তারা বলেছিলো স্বাধীনতা এসেছে, এবার অত্যাচার থামবে, দেশ পাল্টাবে, মানুষ হাসবে, হেসে-খেলে বাঁচতে শিখবে, তাহলে সেই স্বাধীনতা আজ কোথায়? বাংলাদেশের ৭০% এর অধিক মানুষ অনাহারে দিন কাটাচ্ছে, অভাব-অনটনে খেয়ে না খেয়ে কাটিয়ে দিচ্ছে দিনের পর দিন। এরপর এখানেই কি যন্ত্রণার উপশম ঘটে? গত দেড় বছরে ১৯০টি ওয়ারিশ ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। একই পরিসংখ্যানে ২,০৩৫টি গুপ্তহত্যা, ৩৩৭টি অপহরণ এবং ৪,৯০৭টি ডাকাতির ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে আইনি মাধ্যমে। এছাড়াও আরও কত কত বেওয়ারিশ ঘটনা রয়েছে, তা তো আন্দাজেরই বাহিরে। এত এত ঘটনার নিষ্পত্তি কোথায়? কোথায় সেই স্বাধীনতা? যার জন্য হাজার হাজার মানুষ প্রাণপাত করেছিল? এর কোনো উত্তর কি আদৌ সরকারের কাছে রয়েছে? নাকি এতসব ঘটনার আড়ালে প্রকৃত কালপ্রিট স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নিজেই?
,,, এরপর থেকে শুরু হলো শ্রুতি গাঙ্গুলির পরিচয়, প্রশ্নমাধ্যম, প্রশ্নের ব্যাখ্যা, আরও নানান আলোচনা-পর্যালোচনা। সেই পর্যন্ত পড়ার ধৈর্য পেলো না মানব। এতটুকু পড়েই দীর্ঘশ্বাস ফেলে পরবর্তী ধাপে এগুলো। এই মেয়েটির ভবিষ্যৎ হয়তো আরবিদের জানা। মেয়েটির জন্য বেশ আক্ষেপ জমলো মনপুটে। মেয়েটি বেশিদিন টিকবে বলে মনে হচ্ছে না। হয়তো দিনকয়েকের মাঝেই চাকরি ছাড়তে হবে। নয়তো সাত-আটদিনের মাথায় তারই মৃত্যু ঘটনা প্রকাশিত হলে প্রথম আলো নিউজ পেপারে। তখন হয়তো তারই মতো করে অনেকে এরকমভাবে পাতা উল্টে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সত্যি থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাইবে।
,,,, এই নিয়ে চতুর্থবারের ন্যায় আরবিদের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো কুসুম, হাতে চায়ের কাপ। এর আগে পরপর তিন কাপ চা নিয়ে হাজির হয়েছিল সে, অথচ আরবিদ তাকে ঘরে ঢোকার অনুমতি দেয়নি। অগত্যা চা ঠান্ডা হয়ে গেলে আবারও ফিরে যেতে হয়েছে তাকে, নতুন উদ্যমে চা বানিয়ে আবারও দাঁড়াতে হয়েছে এই দরজার সামনে। এমন নয় যে আরবিদ তাকে একেবারেই ঘরে ঢুকতে দেয় না, মাঝেমধ্যে তাকে অনুমতি দেওয়া হয়, তবে সেটা সীমিত পরিসরে। যখন রাহিমা বেগম খুব ব্যস্ত থাকে, ছেলের জন্য চা, নাস্তা নিয়ে উপরে আসার সুযোগ পান না, তখন কুসুমের হাতের চা-নাস্তা গ্রহণ করে মানব। তবে আজ কী হলো? আজ কেনো তাকে অনুমতি দিচ্ছে না? ভেবে পেলো না মেয়েটা। ওদিকে বড়োকর্তি সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে ঝাকে ঝাকে একের পর এক পদ রান্নায় ব্যস্ত। বাড়িতে কর্মচারী থাকা সত্ত্বেও রান্নাবান্নার কাজগুলো তাদেরকেই করতে হয়। বিনু ফুপু রান্নাঘরে বাইরের মানুষের প্রবেশ পছন্দ করেন না। কিসব উদ্ভট কুসংস্কার মেনে চলেন। রাহিমা বেগম আর আয়েশা বেগমও সেসব চুপচাপ মেনে নেন, নয়তো পরে যদি বিধবা ননাশটা বাড়ি ছেড়ে চলে যান? তখন স্বামীকে কী উত্তর দেবেন তারা?
,,, গতকাল বিকালের দিকে আরহানের মামুরা আসার সাথে সাথে আরও কয়েকজন অতিথি এসে হাজির হয়েছে দেওয়ান বাড়িতে। সেই সাথে রাতের দিকে আরবিদের নানির বাড়ির লোকেরাও হাজির হয়েছে সমান তালে। সবাই বর্তমানে দেওয়ান বাড়ির উত্তর পাশের অতিথিশালায় অবস্থান করছে। অগত্যা তাদের সকলকে মনপুত আপ্যায়ন থেকে শুরু করে বুধবার থেকে যারা নিমন্ত্রিত ছিল, তাদের সকলের জন্য রান্নাবান্না করা—সব মিলিয়ে আপাতত বাড়ির মেয়ে-বউ কারোর হাতই ফাঁকা নেই। ফলস্বরূপ, আরবিদের জন্য চা নিয়ে উপরে আসার মতো সময় নেই রাহিমা বেগমের কাছে। অগত্যা তাকেই চা হাতে বারংবার এখানে দাঁড়াতে হয়েছে। ভেবেই ক্লান্তিতে মিইয়ে গেলো কুসুম নামক রমণীটি। দুটো ক্লান্ত নিশ্বাস ফেলে অল্প করে গলা খাঁকারি দিয়ে নরম স্বরে শুধালো—
— আসবো ভাইজান?
,,, প্রতিবারের ন্যায় আবারও কুসুমের কণ্ঠস্বর শুনে খবরের কাগজ থেকে মুখ তুলে চাইলো আরবিদ, চোখে-মুখে অসন্তুষ্টতার ভাব স্পষ্ট। যেনো কুসুমের আগমনে খুব একটা খুশি হয়নি। তবে তা মুখে প্রকাশ করলো না। আবারও মুখ গুঁজে দিলো খবরের কাগজে। ওদিকে কুসুমের হাতে থাকা চায়ের কাপ আরও একবার ঠান্ডা হয়ে এসেছে। একপর্যায়ে কুসুমের ইচ্ছা করলো মাটিতে হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে। এটা আবার কেমন লোক বাবা? মাকে ছাড়া অন্য কাউকে ঘরে ঢুকতে দিলে কি হয়? এত মা-পাগল ছেলে তো সে তার ৩৪ বছরের জীবদ্দশায় কোনোদিন দেখেনি। এই মানুষটাকে সামলাবে কে? কাব্যটাকেও তো তেমন একটা পাত্তা দেয় না। বড়ো দেওয়ানের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড়ই চিন্তিত হলো রমণী, আরও একবার হতাশা নিয়ে পা বাড়ালো নিচের দিকে।
,,, গুনে গুনে ১৫০ জন লোকের জন্য সকালের নাস্তার আয়োজন করা হবে। এর মধ্যে পুরুষ মানুষই ১০৮ জন। ফলস্বরূপ পুরো এক বোল আটা গুলে নিবেদিতাসহ দুজন মহিলাকে নিয়ে রুটি বানাতে বসেছেন আয়েশা বেগম। রাহিমা বেগম আবারও নতুন উদ্যমে আরও একটা গামলা ভর্তি আটায় এক পাতিলা গরম পানি ঢেলে আটায় হাত চালিয়েছেন। খানিক দূরে বিনু ফুপুর সাথে বসে ভাজির জন্য সবজি কাটছে কাব্য আর বনশ্রী। মেয়েটা এখনো বিয়েতে রাজি না, কেঁদে-কুটে চোখ ফুলিয়ে রেখেছে, ঠিকমতো খাবার খেতেও নারাজ, সারাক্ষণ মুখ গোমড়া করে ঘরের ভিতর বসে থাকে আর রেজওয়ানকে বকাঝকা করে। এই তিন দিনে ব্যাচারাকে যেই পরিমাণ বকাঝকা করেছে, প্রতিটি বকাঝকায় যদি তার জিহ্বায় কামড় লাগতো, এতক্ষণে বোধহয় ব্যাচারার জিহ্বাটাই খসে পড়তো। অথচ খামতি নেই মেয়েটার। এখনো সবজি কাটতে কাটতে বিরবির করে রেজওয়ানকে নানান পদের বকাঝকা ও মুখঝামটা দিয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে বিনু ফুপু কম কথা শুনায়নি তাকে। তাতে বন্যর কি আসে যায়? সে যেমন বকতে পারে, তেমন বকা শুনতেও পারে, গণ্ডারের চামড়া কিনা? বকলেও গায়ে লাগতে লাগতে বছরখানিক পেরিয়ে যাবে।
সবার এই ব্যস্ততার মাঝে এক বুক হতাশা আর ক্লান্তি নিয়ে পঞ্চমবারের ন্যায় রানাঘরে এসে দাঁড়ালো কুসুম। রাহিমা বেগম কী কারণে যেন পাশ ফিরে তাকিয়েছিলেন। কুসুমকে আবারও চা হাতে ফিরে আসতে দেখে ভ্রু কুঁচকে নিলেন রমণী, শুধালেন— কী হয়েছে? এবারেও ঘরে ঢুকতে দেয়নি?
,,, কুসুম মাথা নাড়িয়ে না বুঝালো, মনে মনে হতাশার নিশ্বাস ত্যাগ করলেন রমণী। এই ছেলেটাকে নিয়ে তিনি আর পারেন না। নিজের আশেপাশে এত পরিমাণ নিয়ম-কানুন তৈরি করে রেখেছে যে এর বাইরে চলাচল করার ক্ষমতা যেমন তাদের নেই, তেমনি সেই নিয়ম অনুসারে চলতেও গিয়ে মাঝেমধ্যে হাঁপিয়ে উঠতে হয়। রাহিমা বেগম একবার নিজের হাতের দিকে তাকালেন, হাত ভর্তি আটা। এগুলো মেখে দ্রুত রুটি বানাতে হবে, নয়তো কিছুক্ষণের মাঝেই চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়ে যাবে। একদিকে বাপ, একদিকে মেয়ে, অন্যদিকে ছেলে, মাঝখান থেকে তিনি এক অবলা নারী। ছেলেটা কি বুঝতে পারছে না, কিছুক্ষণ বাদে যখন তার বাপ এসে দেখবে রান্নাবান্না শেষ হয়নি, তখন উনার উপর দিয়ে কী পরিমাণ ঝড় বয়ে যাবে? ছেলেটা আজ এত অবুঝ হচ্ছে কেনো? ৩০ বছর বয়সি যুবকের এই খামখেয়ালি কতোটুকু মানানসই? ভেবে পেলেন না তিনি। অগত্যা নতুন করে চা বসিয়ে হাঁক ছেড়ে ডাক পাঠালেন কাব্যকে। বড়ো আম্মার ডাক শুনে তরকারি কাটা রেখেই হুড়মুড় করে ছুটে এলো মেয়েটা। কী হয়েছে জানতে চাইলে তিনি ব্যস্ততা দেখিয়ে বললেন— আরবিদের ঘরে যা একটু, চাটা দিয়ে আয়, সাথে দুটো কথাও শুনিয়ে আসবি। ওদের বাবা, মেয়ে ও ছেলের খামখেয়ালিতে আমি অতিষ্ঠ হয়ে যাচ্ছি। নেহাতই আব্বা বেঁচে নেই, নয়তো এই পাপের সংসার আমি দুদিনও করতাম না।
,,, আরবিদের ঘরে যাওয়ার কথা উঠতেই কাব্যর মুখটা কেমন মলিন হয়ে গেলো। আগামীকাল শহর থেকে ফেরার পর এখনো পর্যন্ত উনার সাথে দেখা হয়নি। যদিও লুকিয়ে-চুরিয়ে দেখেছিল দুবার, তবে সামনে যাওয়া হয়নি। সেদিনের ঝামেলার পর আবারও কি তার ঐ ঘরে যাওয়া উচিত হবে? কাব্যর মনটা সায় জানালো না। সে মুখ তুলে মানা করতে নেবে, তৎক্ষণাৎ রাহিমা বেগম মুখ কালো করে বলে উঠলেন— যেতে পারবি না? আচ্ছা, রাখ, যেতে হবে না। যন্ত্রণা যেহেতু আমার, আমি নিজেই যাবো।
,,, এই পর্যায়ে কাব্য বেশ বুঝতে পারলো বড়ো আম্মা রেগে আছেন, চোখ দুটো কেমন ফোলা ফোলা দেখাচ্ছে। কেঁদেছেন কি? আবারও কি বড়ো আপাকে নিয়ে বড়ো আব্বার সাথে ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে? পুরোপুরি সঠিক না হলেও কাব্য ভালোই বুঝতে পারলো বড়ো আব্বা বড়ো আম্মার সাথে ঝামেলা করেছে। কারণটা হয়তো বড়ো আপাই হবে। কাব্যশ্রী আর কথা বাড়ালো না, বড়ো আম্মাকে ঘাঁটালে বিষয়টা আরও গাঢ় হবে। বাড়িজুড়ে নানান অতিথি, হুট করেই বড়ো-সড়ো ঝামেলা হয়ে গেলে দেওয়ান বাড়ির সম্মান যাবে, সেই সাথে মেঘ আপাও কষ্ট পাবে। মেঘ আপারই বা কী করণীয়? চাইলেই কি মনে একজনকে রেখে জীবনে অন্য কাউকে জড়ানো যায়? তা কি আদৌ সম্ভব? কলিজা পুড়বে না? বুক মুচড়াবে না? দম আটকে আসবে তো, বেঁচে থেকেও নিজেকে মৃত মনে হবে। এই মরণের যে বড় যন্ত্রণা। প্রেম হচ্ছে এক প্রকার দহন, মরণ নিশ্চিত বিষ। সাপের বিষে তো মানুষ একেবারে মরে, প্রেমের বিষে মানুষ ধুঁকে ধুঁকে দিনের পর দিন মরে।
********
,,, চায়ের কাপ হাতে আরবিদের ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো কাব্য। অনুমতি চাইবে ভেবেও চাইলো না। কুসুম আপাকে যেহেতু অনুমতি দেয়নি, তাকেও দেবে না। ওপাশ থেকে যা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তা বারবার চেয়ে কথা খরচ করা বোকামি। তারচেয়ে ভালো দুটো ধমক শুনে নেবে। ওসব হজম করা ইদানীং কাব্যর জন্য পানি হজম করার মতো ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অগত্যা দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলো কিশোরী। দৃষ্টি তাক করলো বারান্দার লাগোয়া জানালার পাশে বসে থাকা মানবের উপর। দরজার কপাট খোলার শব্দ হওয়া সত্ত্বেও পেপার থেকে মুখ তুললো না আরবিদ, মনোযোগ দিয়ে কী যেনো পড়ছে। এখনো চুরুট ধরিয়ে রেখেছে। চুরুটের ঘ্রাণে কাব্যর নাক-মুখ কুঁচকে এলো, তবে কিছু বললো না। এসব নতুন কিছু নয়। ছোট থেকেই বাবা-চাচাদের হাতে, ঠোঁটে এসবের আনাগোনা দেখেছে। আগে দাদিমা বলতেন, পুরুষ মানুষ নাকি এসব খায়ই, এসব না খেলে পুরুষ মানুষের মাঝে নাকি পৌরুষ পৌরুষ ব্যাপার থাকে না। এখন বিনু ফুপুকে বলতে দেখা যায়। তাই কাব্যর কাছে এসব আহামরি কোনো ব্যাপার মনে হয় না।
সে এগিয়ে গিয়ে মুখের সামনে চায়ের কাপটা এগিয়ে দিলো। একটা ছিমছাম গড়নের হাত ও তার হাতের ভাঁজে থাকা চায়ের কাপে নজর পড়তেই ভ্রু কুঁচকে নিলো আরবিদ, ঘাড় বাঁকিয়ে কাব্যশ্রীর দিকে তাকালো। কিশোরীর পরনে হলুদ রঙা শাড়ি, চুলগুলো উষ্কখুষ্ক, বাদনহারা। ঘুম থেকে ওঠার পর চিরুনি করা হয়নি, কাজ করার সময় খোপা করেই কাজ করছিলো। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে কোন ফাঁকে খোপা খুলে চুলগুলো কোমরে ছড়িয়েছে, তা খেয়াল করতে পারেনি। বর্তমানে ঝুঁকে আসার ফলে সেই উষ্কখুষ্ক চুলের কিছুটা অংশ আরবিদের কাঁধের উপরে আছড়ে পড়েছে। আরবিদ কাব্যর থেকে নজর সরিয়ে সেদিক পানে তাকালো একবার। মুহূর্তেই সেগুলো টেনে নিলো কাব্যশ্রী। কুণ্ঠিত হয়ে সবগুলো চুল এক হাতে ঘুরিয়ে এনে একপাশের কাঁধ বরাবর সামনে এনে রাখলো, যার ফলস্বরূপ সহসাই গলার একপাশ উন্মুক্ত হয়ে উঠেছে। কাব্য অনুভব করলো, আরবিদ সেদিকেও একবার চোখ তুলে তাকিয়েছে। কাব্যর নজর পড়তেই আবারও সন্তর্পণে ফিরিয়ে নিয়েছে তা। বিষয়টা বুঝে আসতেই কাব্যর ভিতরটা কেমন অস্বস্তিতে ছেয়ে গেলো। তাড়াহুড়ো করে চায়ের কাপটা আরাম কেদারার হাতলে রেখে চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো।
কয়েক পা এগিয়ে যেতেই কানে বাজলো—
,,, শুনো!!
,,, গম্ভীর পুরুষালি ডাকে পা জোড়া কেমন থেমে গেলো মেয়েটার। ঘাড় ঘুরিয়ে ফিরে তাকালো, মুহূর্তেই চোখাচোখি হলো দুজনার। কাব্য দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। সে কেনো যেনো কারোর চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না, সংকোচ বোধ হয়। এমনকি মা-চাচিদের সাথেও তার আচরণ এমন। চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকাটাকে তার কাছে অভদ্রতা মনে হয়, কিন্তু সে তো অভদ্র নয়, যথেষ্ট ভদ্র। ভাবনার মাঝে আবারও সামনের মানুষটার গম্ভীর স্বর শোনা গেলো—
,,, তোমার আর শাড়ি নেই?
,,, অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্নে না চাইতেও চোখ তুলে তাকালো কাব্য। সামনের মানুষটার সাথে চোখাচোখি হতেই আবারও দৃষ্টি নামিয়ে দিয়ে নরম স্বরে উত্তর করলো—
,,, আছে!
,,, কয়টা?
,,, নতুন নাকি পুরোনো?
,,, সব মিলিয়ে।
,,, এহেন প্রশ্নে চিন্তায় পড়ে গেলো মেয়েটা। এই মুহূর্তে সে কী করে বলবে? তার কয়টা শাড়ি আছে? সে কি গুনে রেখেছে নাকি? তবুও তাকে বলতে হবে। বলতে না পারলে নির্ঘাত সামনের মানুষটা ভয়ানক রেগে যাবে, আর সেই রাগের রেশ এসে তার উপর বর্তাবে। পরিবারের উপরে বর্তালেও খুব একটা অবাক হবে না সে। অগত্যা মনে মনে ভাবতে বসলো। নিজের ঘর, আম্মার ঘর মিলিয়ে খুঁজে খুঁজে যতগুলো শাড়ির কথা মনে পড়লো, সব একসাথে যুক্ত করে উত্তর করলো—
,,, বিয়ের অনুষ্ঠানে পরার জন্য ৯টা। ছোটখাটো অনুষ্ঠানে পড়ার জন্য ১৪টা।
,,, ওপাশ থেকে মানবটি ফের প্রশ্ন করলো—
,,, বাড়িতে প্রতিদিন পড়ার জন্য?
,,, কাব্যশ্রী কেমন করে যেনো নিজের পরনের শাড়িটার দিকে তাকালো। পরক্ষণেই মনে প্রশ্ন জাগলো, লোকটা হঠাৎ তার শাড়ি নিয়ে পড়লো কেনো? আর এতটা স্বাভাবিক আচরণই বা করছে কেনো? সেদিন না বললো উনার আশপাশে না আসতে? সেই মোতাবেক তো তাকে দেখার সাথে সাথে দু-চারটে ধমক দেওয়ার কথা। আগে তো তাই করতেন। তাহলে আজ দিচ্ছেন না যে? পরিবেশ আজ এত নীরব কেনো? এটা কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস নয়তো? তার জন্য কোনো বড়োসড়ো ধমক অপেক্ষা করছে কি? অপেক্ষার প্রহর বোধহয় ফুরালো। ঠাস করে ধমক বসালো আরবিদ—
,,, এই মেয়ে!! বাংলা বুঝো না?
--- হঠাৎ ধমকে আঁতকে উঠলো কাব্য, তড়িৎ গতিতে উত্তর করলো—
,,, ত, তিনটা।
,,, এই বেলায় দীর্ঘশ্বাস ফেললো মানব। চোখে-মুখে অসন্তুষ্টতার রেশ ফুটিয়ে কাব্যকে একবার পরখ করে নিয়ে চায়ের কাপ হাতে তুলে তাতে চুমুক বসালো। পরপর পালঙ্কের এক কোণে রাখা বড়ো ব্যাগটার দিকে চোখ দ্বারা ইশারা করে বললো—
--- ওটা নিয়ে যাও।
,,, ইশারা অনুযায়ী সেদিক পানে চোখ রাখলো কাব্যশ্রী। বিছানার এক কোণে বড়ো একটা ব্যাগ রাখা। তবে ব্যাগটা কিসের, সে তা জানে না। উপর থেকে বোঝারও উপায় নেই, এর ভিতর কী আছে? সে কেমন দ্বিধাভরা দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইলো। কাব্যশ্রীকে এভাবে থম মেরে তাকিয়ে থাকতে দেখে বিরক্ত হলো মানব। ফের ধমকে উঠলো—
-- কী সমস্যা? নাও।
,,, ধমক শুনে আবারও আরবিদের দিকে তাকালো কাব্য। লোকটা রাগান্বিত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে। মনে মনে ঠোঁট উল্টালো ব্যাচারি। ব্যাগটার দিকে ইশারা করে কেমন দ্বিধাভরা কণ্ঠে শুধালো—
-- এটা আমার?
,,, ওপাশ থেকে উত্তর এলো—
-- না, মেঘের।
,,, কাব্যশ্রীর দ্বিধাভরা দৃষ্টিটুকু কেমন হুট করেই নিভে গেলো। মুখটা মলিন হয়ে এলো পুরোদস্তুর। কতটা বোকা সে? কী না কী ভেবে নিয়েছিলো। সেসব ভাবতে গিয়েও মনে মনে লজ্জিত হলো। যে কোনোদিন তার জন্য এক টুকরো সুতোও আনেনি, সে কিনা এত বড়ো ব্যাগ বোঝাই করে তাকে কিছু দেবে? আদৌ সম্ভব? মনে মনে দুঃখ পেলেও উপরে উপরে তা প্রকাশ করলো না। মাথাটা আলতো করে ঝাঁকিয়ে বললো—
-- আচ্ছা!
,,, তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন ছুড়লো মানব—
-- কী আচ্ছা?
,,, নিশ্চুপ মেয়েটার স্থির জবাব—
-- মেঘ আপাকে দিয়ে দিবো।
,,, তবে সেই স্থির জবাবে বোধহয় সন্তুষ্ট হলো না দেওয়ান বাড়ির বড়ো ছেলেটা। বিরক্তিতে চ জাতীয় শব্দ করে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে আবারও চায়ের কাপে চুমুক বসালো। পেরিয়ে গেলো মিনিট খানিক। আরবিদ তখনো চা খাওয়ায় মত্ত। একবার চায়ে চুমুক দিচ্ছে, আবার চুরুটে টান বসাচ্ছে, আর কাব্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মেঝেতে পায়ের নখ খুটতে খুটতে পরখ করছে তা।
আকস্মিক চুরুটে লম্বা টান বসিয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে কাব্যর দিকে তাকালো আরবিদ। তিরের ডগার ন্যায় ভ্রু জোড়া তীক্ষ্ণ, চাহনি ধারালো, মুখাবয়ব কঠিন। কাব্য নজর সরিয়ে নিলো। এই চাহনিতে কী ছিলো কে জানে? মেয়েটার ভিতর-বাহির কেমন থরথর করে কাঁপছে। আরবিদের ভাবাবেগ নেই। সে নির্মিশেষ তাকিয়ে থেকে নাক-মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে শান্ত স্বরে আওড়ালো—
--- ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে একই শাড়ি বারবার পরবে না, বিরক্ত লাগে।
,,, বলেই আবারও মুখ ফিরিয়ে নিলো। আরবিদের এহেন কথায় কিছু একটা আঁচ করতে পারলো কাব্য। চট করেই তাকালো নিজের পরনের শাড়ির দিকে। আরবিদ যেদিন শহরে গিয়েছিলো, সেদিনও সে এই শাড়িটাই পরেছিলো, আজও এই শাড়িটাই পরে আছে। মূলত সে বেশি শাড়ি পরতে পারে না, অপচয় মনে হয়। তাই এবারে পরার জন্য শুধু তিনটা শাড়িই রেখেছিলো। সেগুলোই একদিন, দুইদিন পরপর ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে গায়ে জড়ায়। বিষয়টা কি লক্ষ করেছেন তিনি? এইজন্যই কি এই কথাটা বললেন? বিষয়টা বুঝতে পেরে লজ্জায় মিইয়ে গেলো মেয়েটা। এইখানে আর এক বিন্দুও দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পেলো না। উপরের ঠোঁট দিয়ে নিচের ঠোঁটটা চেপে ধরে বাহিরের দিকে পা বাড়াতেই আবারও কানে বাজলো—
--- নিয়ে যাও ওসব। মেঘদেরটা আম্মার কাছে দিয়ে এসেছি, তোমায় আলাদা করে দিতে হবে না।
*******
,,, আরবিদের ঘর থেকে ধীর কদমে বের হলেও বাহিরে এসে এক ছুটে নিজের ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো কাব্যশ্রী। পরক্ষণেই হুড়মুড়িয়ে ভিতরে ঢুকে ঠাস করে দরজাটা আটকে তাতে পিঠ ঠেকিয়ে লম্বা লম্বা দম নিলো। ভিতরটা উৎসাহ আর আনন্দে দিক হারাচ্ছে। দেওয়ান সাহেব যতই সোজাসাপ্টা উত্তর না দিক, সে তো আর বোকা না, তাই না। দিব্যি বুঝতে পেরেছে এগুলো তার।
,,, পনেরোয় চলমান কিশোরীর বুকের ভিতরটা কেমন ধরাস ধরাস করছে। তীব্র উৎফুল্লতায় ঘাম হচ্ছে, মাথা ঘুরছে, শরীর কাঁপছে, ভিতর ভিতর কী যে প্রেমযাতনা হচ্ছে, তা বোধহয় বলে বোঝানো সম্ভব না। পনেরো বছরের জীবদ্দশায় এই প্রথম দেওয়ান সাহেব তাকে কিছু দিলো। কিন্তু কী দিলো? কী আছে এর ভিতর? শাড়ি? কাব্যশ্রী একবার বাঁকা দৃষ্টিতে বুকের মাঝে আঁকড়ে ধরে রাখা বিশাল মাপের ব্যাগটার পানে তাকালো। ব্যাগটা ভীষণ ভারি, সে এক হাতে ধরে রাখতে পারছে না, তাই তো দুহাতে আগলে নিয়েছে। কয়টা শাড়ি আছে এখানে? এত ভারি কেনো? কৌতূহলী কাব্য আরও কৌতূহলী হয়ে পড়লো। ব্যাগটার ভিতর ঠিক কী রয়েছে, এত ভারি কেনো? তা জানার তীব্র আগ্রহ কাজ করলো মনপুটে। অগত্যা এক ছুটে ব্যাগটা বিছানায় রেখে পরক্ষণেই আবার দরজার কাছে ফিরে গিয়ে দরজার সিটকিনি টেনে দিলো।
,,, ঘরের ভিতর কাব্যশ্রীর আগমন টের পেয়ে বারান্দা থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে ঘরে ঢুকলো শুশি, মুখের ভিতর লম্বা একখানা ঘাস। মাত্রই গোড়া থেকে ছিঁড়ে মুখে নিয়েছে। বিছানার উপর এত বড়ো ব্যাগ দেখে খরগোশটাও বোধহয় বেশ কৌতূহলী হলো। সে এক লাফে বিছানায় উঠে পড়লো, পরক্ষণেই আরেক লাফে উঠে পড়লো ব্যাগটার উপর। সেখানে আরাম করে বসে মায়ের দিকে তাকিয়ে ঘাস চিবুচ্ছে শুশি। চোখে-মুখে কৌতূহলের পাশাপাশি একরাশ অভিযোগ। মা কেনো তাকে ঘুম থেকে উঠে গাজর কেটে দিয়ে গেলো না? মা কি জানে? তার এখন এসব ঘাসপাতা খেতে ভালো লাগে না? অথচ কাব্যশ্রী এই অভিযোগটুকু আমলে নেওয়ার প্রয়োজনই মনে করলো না। এখন তার এসব বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে ভাবার সময় আছে নাকি? তার তো উৎফুল্লতায় হৃদয়টাই দিক-বেদিক ছুটাছুটি করছে। কাব্যশ্রী বার কয়েক দম নিয়ে নিজেকে সামলে এগিয়ে গেলো ব্যাগটার দিকে। ব্যাগটা কাপড়ের, গোটা করে চেইন লাগানো। দেখে ঠাওর করা যাচ্ছে কতটা যত্ন সহকারে আনা হয়েছে ভিতরে থাকা জিনিসগুলো। কাব্য আলতো করে শুশিকে বিছানায় নামিয়ে দিলো, পরক্ষণেই টেনে ধরলো ব্যাগটা। এই পর্যায়ে হাত জোড়া কেমন থরথর করে কাঁপতে লাগলো। বুকের ভিতর স্কুলে বাজা ঘণ্টার ন্যায় ঠাস ঠুস শব্দ হচ্ছে। বিষয়টা ঠাস ঠুস নয়, বরং কেমন যেনো অদ্ভুত রকমের শব্দ হচ্ছে। এই শব্দগুলো কাব্যকে যেমন পীড়া দিচ্ছে, তেমন উৎফুল্লতার পরিমাণ বাড়িয়ে দশগুণ করে তুলছে।
কাঁপা কাঁপা হাতে চেইনটা খুলে ব্যাগের মাথাটা দুদিকে সরাতেই অবাকের চরম শীর্ষে পৌঁছে গেলো মেয়েটা। ব্যাগ ভর্তি শাড়ি। কাব্যটা কেমন অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে একটা একটা করে শাড়ি নামিয়ে বিছানার উপর রাখলো। মোট চোদ্দখানা শাড়ি। এর মধ্যে বাড়িতে পরার জন্য দশটা। কাব্য যেমন চিকন পাড়ের এক কালার শাড়ি পরে, ওইরকমেরই দশটি কালারের আলাদা আলাদা কাজ করা শাড়ি। বাকি চারটা বেশ দামি মনে হচ্ছে। দুটো শাড়ি জামদানির উপর পাথরে কাজ করা। এগুলোর রং কালচে সবুজ আর বাদামি। বাকি দুটো কী কাপড়ের, বুঝতে পারছে না কাব্য। তবে শাড়িতে সুন্দর করে হাতের কাজ করা রয়েছে, তাতে ছোট ছোট পাথর বসানো। এমন শাড়ি সে কোনোদিন দেখেনি। তবে শাড়িগুলো সুন্দর। শাড়ির রংগুলো কেমন আলাদা। হালকা আকাশি রঙের চেয়েও হালকা যেই রংটা হয়, ওইরকম। অন্যটি কাঁচা হলুদ রঙা। এই শাড়িটা সবচেয়ে বেশি মনে ধরেছে কিশোরীর। কেমন আলতো হাতে কোলে তুলে নিলো শাড়িখানা। মেলে ধরতেই নজর আটকালো শাড়ির ভিতরে ভাঁজ করে রাখা ব্লাউজের পানে। তৈরি করা ব্লাউজ, কিন্তু... কী ভেবে যেনো একে একে সবগুলো শাড়ির ভাঁজ সরালো কাব্য। সবগুলো শাড়ির ভিতরেই শাড়ির সাথে মিলিয়ে মিলিয়ে ব্লাউজ বানিয়ে রাখা। কাব্যশ্রী কৌতূহলবশত একটা ব্লাউজ খুলে মেলে ধরলো। মুহূর্তেই তীব্র লজ্জা-সংকোচে হিম হয়ে এলো ছোট্ট শরীরটা। শিরশির শিহরণ বয়ে গেলো পুরো কায়া জুড়ে। ব্লাউজটা একেবারে তার মাপ অনুসারে বানানো। অথচ তার ব্লাউজের মাপ আরবিদ দেওয়ানের জানার কথা না। এমনকি বাড়ির মহিলা সম্প্রদায়ের কেউ জানে কিনা সন্দেহ। কারণ কাব্য বরাবর নিজের ব্লাউজ নিজে হাতে কাজ করে বানিয়ে নেয়। এমনকি মাঝেসাজে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিছু হলে মা-চাচি, বোনেদেরটাও বানিয়ে দেয়। সেদিক থেকে দেখতে গেলে সে সবার বিষয়ে জানলেও তার বিষয়ে তো কারোর জানার কথা না। তবে? তবে দেওয়ান সাহেব কী করে জানলেন সে কী মাপের ব্লাউজ পরে বা কী মাপের ব্লাউজ প্রয়োজন?
এই পর্যায়ে কাব্যর গাল দু'খানা কেমন লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলো। কী ভেবে যেনো দুহাতে মুখখানা ঢেকে চট করে আছড়ে পড়লো বিছানায়। বিছানার চাদরে মুখ লুকিয়ে চোখ দুটো খিচে বন্ধ করে রাখলো। তার মস্তিষ্কটা পাজি, জ্বালাচ্ছে ভীষণ। তাই এই মস্তিষ্কটা আজ একেবারে অচল করে দেবে কিশোরী। কিছুতেই কিছু ভাববে না। আজকের পর দেওয়ান সাহেবের সামনেও যাবে না। কিছুতেই কিছু করবে না সে। একেবারে বিলীন হয়ে যাবে এই পৃথিবীর বুক থেকে।
,,, এদিকে মায়ের এমন হালচালের কিছুই বোধহয় বুঝতে পারলো না শুশিটা। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে মায়ের মুখের কাছে গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়লো। কাব্যশ্রী তা অনুভব করতে পেরে নিজের কাছে টেনে নিলো খরগোশটাকে। দু'হাতে আগলে নিয়ে আবারও মুখ গুঁজে দিলো বিছানায়। কাঁপা কাঁপা স্বরে আওড়ালো—
,,, আমার ভীষণ হাঁসফাঁস লাগছে রে শুশি। তোর আব্বা মানুষটা এমন কেনো? কিছু না করেও কেমন আমাকে জ্বালিয়ে মারে।
*********
,, বোনের বিয়েতে বড়ো আকারের একটা ছুটি কাটানোর কথা থাকলেও গায়ে হলুদের দিন সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে মেঘশ্রী। বেরিয়ে যাচ্ছো বললে ভুল হবে, বরং পালিয়ে যাচ্ছে। আজ থেকে সামনের দুটো দিন একেবারের জন্য কোথাও হারিয়ে যেতে পারলে বড্ডো শান্তি পেতো মেয়েটা। তবে তা তো সম্ভব না। এখন যদি সে বিয়েতে না থাকে, তাহলে বন্যটা বড্ডো দুঃখ পাবে। ভাববে, ওর বিয়েতে মেঘ মনে হয় খুশি নয়। সেই সাথে হাজার জনের হাজার কথা। বাড়িতে থাকলেও বিয়ে না করার অপরাধে হাজার খানেক বাজে কথা শুনতে হবে। আর যদি কোনোভাবে তাদের কথা শোনার ভয়ে বিয়ের দুটো দিন বাড়ির বাহিরে থাকে, তখন হয়তো বাকি যতটা কাদা রয়েছে, সেটা ছুড়ে দিতেও দ্বিধা বোধ করবে না। হয়তো তখন নষ্ট, দুশ্চরিত্রার তকমা দেওয়া হবে তাকে। মানুষের গলায় কাঁটা বিধলে যেমন ফেলাও যায় না, আবার গিলেও নেওয়া যায় না। বন্যর বিয়েটা মেঘের কাছে তেমন।
তবে মেঘের ধৈর্যশক্তি ভীষণ প্রখর। আল্লাহ তায়ালা তাকে এতোটাই ধৈর্য দান করেছে যে, মায়ের মুখে অতিরিক্ত খাওয়ার খোঁটা শুনেও সেই খোঁটাটা সহাস্যে হজম করে নিতে পারে সে। যেখানে নিজের মা-ই বলে, """ ;তকে হিসাবের বাহিরে গিয়ে অতিরিক্ত খাওয়াচ্ছি, """ সেখানে বাহিরের মানুষের কথাগুলো তো তেমন কিছুই না। মেঘ জানে, মা তাকে মন থেকে এসব বলেনি, রাগের মাথায় বলেছে। কিন্তু বলেছে তো? মায়েরই বা কী দোষ? মা, বাবা, সমাজ, পাড়া-প্রতিবেশী কারোর কোনো অপরাধ নেই। সব অপরাধ তার নিয়তির, সেই সাথে ঐ লোকটার। যে কথা দিয়ে কথা রাখেনি, ভালোবাসি বলেও ভালোবাসতে শেখেনি, স্বার্থপর। ঐ লোকটাকে কোনোদিন ক্ষমা করবে না মেঘ। তার কাছে এসে ক্ষমা চাইলেও না, এমনকি পায়ে ধরে অঝোরে কাঁদলেও না। গোটা নয়টা বছর ধরে যেহেতু সব যন্ত্রণা একা ভোগ করতে পেরেছে, বাকি জীবনও ভোগ করবে, তারপরেও ঐ মানুষটার ক্ষমা নেই। ঐ লোকটাকে সে ঘৃণা করে, প্রচণ্ড এবং মাত্রাতিরিক্ত ঘৃণা করে। ঘৃণা করে ভাবতে গিয়েও মেঘের মনটা কেমন হাঁসফাঁস করে উঠলো। কান্নারা দলা পাকিয়ে এলো গলার কাছটায়। তবে কাঁদা যাবে না, কারণ করিডর পেরিয়ে নিচে নামলেই পরিবার, পাড়া-প্রতিবেশীর মুখোমুখি হতে হবে। তার চোখে পানি দেখলে নিশ্চয়ই সেটাকে ঘেঁটে-ঘুটে তিল থেকে তাল বানাবে? ভেবেই লম্বা লম্বা দম নিয়ে নিজেকে ঠিক করলো।
মেঘশ্রী যখন চোখ বুজে বড়ো বড়ো দম নিয়ে সামনে তাকালো, তখন আরও একবার মুখোমুখি হলো মেহরাবের। ছেলেটা বোধহয় আরহানের ঘরে যাচ্ছিলো। তাড়ায় ছিলো বিধায় এই পর্যায়েও মেঘশ্রীকে লক্ষ করা হয়নি। ফলস্বরূপ একপ্রকার অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই মুখোমুখি হয়ে গেলো দুজন। ধাক্কা লাগতে লাগতে গিয়েও লাগেনি, সন্তর্পণে নিজেকে সামলে নিলো মেহরাব। তবে এই পর্যায়ে সরে গিয়ে মেঘকে যাওয়ার রাস্তা করে দিলো না, বরং চোখ রাখলো মেঘের চোখের দিকে। চোখ দুটো ফোলা, কার্নিশে এখনো পানি জমে আছে, সূক্ষ্ম, টিকালো নাকটা লাল। এর বাহিরে অন্যত্র নজর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না মানব। সামনে দাঁড়ানো মেয়েটা তার বড়ো, সম্মান করা প্রয়োজন।
মেহরাবকে এভাবে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে কিছুটা বিরক্ত হলো মেঘ। সরে যেতে চাইলো, অথচ পারলো না। তার আগেই সামনে থেকে ধেয়ে এলো গম্ভীর, কৌতূহলী স্বর—
-- কেমন আছেন?
,,, মেঘশ্রীর ঠোঁট জোড়া আনমনেই বেঁকে গেলো। আলতো করে হেসে উত্তর দিলো—
-- যেমন রাখা হয়েছে।
,,, মানুষ হাসলে নাকি তাকে খুব সুন্দর লাগে। তাহলে সামনে দাঁড়ানো রমণীটিকে এতোটা কাতর মনে হলো কেনো? এতোটা ব্যথাতুর কেনো তার হাসি? হাসলেও বুঝি দুঃখ ঝরে? মেহরাব অকারণেই পরখ করলো সামনে দাঁড়ানো রমণীটিকে। পরনে তাতের কলাপাতা রঙা শাড়ি, বড়ো হাতার ব্লাউজ, লম্বা ঘন চুলগুলো সোজা সিঁথি করে ঢিলে খোঁপা বাঁধা, কাঁধে একখানা কাপড়ের তৈরি ব্যাগ। চোখে-মুখে দুঃখ, ব্যথা। আর কোনো সাজসজ্জা নেই। সেই সাথে খেয়াল করলো, সামনাসামনি হওয়ার পর থেকে রমণী একটিবারের জন্যও তার মুখপানে নজর স্থির করেনি। অন্যদিকে তাকিয়ে রয়েছে। মেহরাব নিজেও খানিক হাসলো, শুধালো—
-- আমাকে এখানে আশা করেননি, তাই না? অস্বস্তিতে ফেলে দিলাম?
,,, উপেক্ষা করতে পারলো না মেঘ, উত্তর করলো—
-- কিছুটা।
,,, আর কতো নিজেকে এভাবে কষ্ট দিবেন? এবার নিজেকে সাজিয়ে নিন।
,, সুযোগ নেই।
,,, মেহরাবের খুব রাগ হলো। রাগটা সামলাতে পারলো না। কণ্ঠে রাগ রেখে কেমন চাপা কণ্ঠে আওড়ালো—
--- আপনি বড়ই নাছোড়বান্দা।
,,, ফের হাসলো রমণী। চাহনি শান্ত, মেহরাবের রাগে যেনো তার কিছু এলো গেলো না। কেমন উদাস কণ্ঠে আওড়ালো—
--- ভুল!! আমি বরং পাথর। চাইলেই যার স্থান পরিবর্তন করা যায়, ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু পরবর্তীতে মনমতো রূপ দেওয়া যায় না।
,,, মেঘশ্রীর কথাটা মেহরাব কতোটুকু ধরতে পারলো জানা নেই। হয়তো ধরতে পেরেছে, তবে তা আমলে নিলো না। অবুঝের মতো শুধালো—
-- তবে স্থান পরিবর্তন করা যেতে পারে, বলছেন?
,,, এতক্ষণ ঠোঁটে মৃদু হাসি থাকলেও এই পর্যায়ে ফিক করে হেসে ফেললো মেঘ। রমণীর সৌন্দর্য প্রখর। ২৭ বছর বয়সেও তাকে অপার্থিব সৌন্দর্যের অধিকারী বলে আখ্যা দেওয়া যায়। ছিমছাম গড়ন, আরবিদের মতোই অতিরিক্ত ফর্সা, চেহারার অনেকটা মিল। খুব একটা হাসে না, গম্ভীর থাকে। তবে যখন ফিক করে ঠোঁট প্রসারিত করে হাসে, তখন রমণীর চোখ জোড়া ছোট ছোট হয়ে যায়, যাকে এক কথায় চোখে হাসা বলে। তখন রমণীকে রূপকথার দুঃখী রাজকন্যাদের থেকে কম কিছু মনে হয় না। মেঘশ্রী ঠোঁটে সেই অপার্থিব সৌন্দর্যের রহস্য ফুটিয়ে রেখেই উত্তর করলো—
-- যেতেই পারে। কিন্তু আগুন, পানি, পাহাড়-পর্বত যেখানেই রাখা হোক না কেনো? পাথর তো পাথরই থাকবে, পরিবর্তন হওয়ার সুযোগ আছে কি?
,,, বলেই ডান ভ্রু উঁচালো মানবী। দাঁতে দাঁত খিচলো মেহরাব, চোখে-মুখে উপচে পড়া রাগ। মেঘের হাসিটা তার একদম পছন্দ হলো না, আর না এই নির্লিপ্ত ভাব। সে কেমন দাঁতে দাঁত চেপে আওড়ালো—
-- আপনি সত্যিই একটা নাছোড়বান্দা।
,,, এলো গেলো না মেঘশ্রীর। মেহরাবকে পাশ কাটিয়ে হাঁটা দিলো সামনে। তবে মেহরাব দাঁড়িয়ে রইলো। যতটা সময় মেঘশ্রীকে দেখা গেলো, সে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। মেয়েটা করিডর পেরিয়ে সিঁড়িতে পা রাখতেই মুখ ঘুরিয়ে নিলো মেহরাব। সেও পা বাড়ালো তার গন্তব্যস্থলে
,,,,, চলবে।
,,,, অনেক আগেই দিতাম কিন্তু কারেন্ট ছিলো না, এমবির মেয়াদ ও শেষ । তাই দিতে পারিনি। যাই হোক কেমন হয়েছে বড়ো করে কমেন্ট করবা।