ফন্ট সাইজ:
থিম:
দেওয়ান সাহেব

৮ম পর্ব

লেখক: রুপান্জলি

#দেওয়ান_সাহেব ( পর্বঃ ৮)

#লেখনিতে_রুপান্জলি

#ট্রাজেডি_জাস্টিস

,,,, বিকালের আগ আগ মুহূর্তে দেওয়ান বাড়ির সামনে আগমন ঘটল রুপান্মিতার। এই প্রথম দেওয়ান বাড়ির আঙিনায় পা রেখেছে সে। আলাদা পাড়া হওয়ার দরুন মা কোনোদিনই তাকে এদিকটায় আসতে দেয়নি। আজও আসতে দিতে রাজি ছিল না, কিন্তু বন্যর পাঠানো পরপর চারটি চিঠি হাতে পৌঁছাতেই আর মানা করতে পারল না ফাতেমা বেগম। বনশ্রী মেয়েটা বেশ ফাজিল। প্রথম দিকে বেশ আকুতি-মিনতি করে তিনটি চিঠি লিখলেও শেষের চিঠিটা বড়ই হুমকিদায়ক ছিল। রুপা যদি তার বিয়েতে আগের দিন থেকে উপস্থিত না থাকে, তাহলে সে এই বিয়েও করবে না আর রুপান্মিতার সাথে বন্ধুত্বও রাখবে না। সবকিছু ছেড়ে-ছুড়ে, ঐ খাইষ্টা রেজওয়ান মাস্টারের সুন্দরী বউ পাওয়ার স্বপ্নে পানি ঢেলে দূরদূরান্তে পালিয়ে যাবে। তখন রুপা আর খাইষ্টা মাস্টার দুজনেই বনশ্রীর জন্য হা-পিত্তেস করতে করতে মরবে। যদিও শুরুর দিকে সেই হা-পিত্তেস সে দেখতে পাবে না, কিন্তু বছর খানিক পেরুনোর পর ঠিকই একটা সুন্দর বর আর একগাদা বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে ফিরে আসবে। তখন নাহয় এক ফাঁকে গিয়ে উঁকি-ঝুঁকি দিয়ে দেখে আসবে দুজনকে। এরূপ চিঠি পড়ে না চাইতেও হাসতে বাধ্য হয়েছিলেন ফাতেমা বেগম। অগত্যা দেওয়ান বাড়িতে মেয়ের রাত্রি যাপনের সায় জানালেন, তবে রুপা যখন বেরিয়ে এসেছিল, তখন লক্ষ করেছিল তার দেওয়ান বাড়ি আসা নিয়ে আম্মা একটু বেশিই চিন্তিত। কেমন বারবার সতর্ক করছিলেন যেন একা বাড়ির বাইরে না বেরোয়, কারোর সাথে অতিরিক্ত কথা না বলে, বন্য, কাব্য আর নিবেদিতা ছাড়া যেন কারোর সাথে না মিশে। রুপা জানে না আম্মা কেনো তাকে এত নিষেধাজ্ঞা ঝেড়েছে, তবে সে তার মায়ের ভদ্র বাচ্চা। মায়ের কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে সে। বন্য, কাব্য, নিবেদিতা ব্যতীত কারোর কাছ ঘেঁষবে না, কারোর সাথে কথাও বলবে না, বিশেষ করে দেওয়ান বাড়ির ছোট ছেলের সাথে। ঐ লোক যদি কোনোভাবে তার সাথে কথা বলতে কিংবা তাকে জ্বালাতেও আসে, তবুও একটা অতিরিক্ত কথা বলবে না রুপা। নিজের মতো করে মানবকে এড়িয়ে চলবে।

,,, রুপান্মিতা গুটিশুটি পা ফেলে দেওয়ান বাড়ির গেইটের কাছে পৌঁছাতেই গেইট খুলে দিল দারোয়ান। তৎক্ষণাৎ হাজির হলো বনশ্রী। ঘরের ভিতর থেকে জানালার মাধ্যমে রুপাকে আসতে দেখে একপ্রকার ছুটে এসেছে সে। পরনে পুরোনো একটা শাড়ি, সাজগোজ কিছু নেই। সবাই মিলে জোর-জবরদস্তি করেও সাজাতে পারেনি। সে তো বিয়েতেই রাজি না, আবার ঐ খাইষ্টার জন্য সাজবে কী? বনশ্রীর এই অগোছালো রূপ দেখে ভ্রু কুঁচকালো রুপান্মিতা। সামনাসামনি পৌঁছাতেই শুধালো—

,,,, কী হয়েছে বন্য? তর এই অবস্থা কেনো? সাজিসনি?

,,,, এরূপ প্রশ্নে মুখ বাঁকালো বনশ্রী— সাজবো কী? সাজসাজির প্রশ্ন আসে কত থেকে? এমনিই আমি মারাত্মক সুন্দরী।

,, বলতে বলতে রুপান্মিতার কাঁধ পেঁচিয়ে ধরলো। মুহূর্তেই আঁতকে উঠলো মেয়েটা, ব্যথায় চোখ-মুখ খিঁচে বনশ্রীর অপর হাতখানা খামচে ধরলো। ঠোঁট ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো ব্যথাতুর শব্দ। সামান্য কাঁধ ধরায় রুপান্মিতার এই আত্মচিৎকারের মানে বুঝলো না বন্য, বুকের ভিতরটা কেমন ধক করে উঠলো। প্রাণপ্রিয় বান্ধবী বলে কথা। সে বিচলিত হয়ে কাঁধে আরেকটু চাপ প্রয়োগ করে কী হয়েছে জানতে চাইতেই এই পর্যায়ে কাঁধখানা কুঁচকে নিলো রুপান্মিতা। ব্যথাতুর কণ্ঠে আওড়ালো—

,,,, বন্য, ছাড়! কাঁধে ব্যথা পাচ্ছি।

,,,, এরূপ উত্তর শুনে আরও বিচলিত হয়ে পড়লো বনশ্রী। রুপান্মিতার কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে শালটা টেনে ধরে অশান্ত স্বরে আওড়ালো—

,,, দেখি, কী হয়েছে? শালটা সরা।

,,, বলতে বলতে গায়ের শালটা কাঁধ থেকে সরিয়ে দিলো। মুহূর্তেই উন্মুক্ত হলো কাঁধের কাছের গাঢ় ক্ষতটা। লম্বালম্বিভাবে অনেকটা জায়গা দখল করে কেটে গিয়েছে। কেমন ভয়ংকর লাগছে দেখতে, চারপাশ ফুলে রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে। বনশ্রীর কী যে মায়া লাগলো, আলতো করে ছুঁয়ে দিলো ক্ষতটা। রুপান্মিতা ব্যথায় চোখ কুঁচকে কিছু বলতে নিবে, তৎক্ষণাৎ নজর আটকালো ছাদের উপর দাঁড়িয়ে থাকা মানবের উপর। ছাদের কার্নিশে হাত রেখে তাতে ভর দিয়ে রুপান্মিতার কাঁধের ক্ষতটার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে আরহান। তড়িৎ গতিতে চোখ সরিয়ে নিলো রুপা, জোরপূর্বক শাল দিয়ে ঢেকে ফেললো কাঁধটা। রুপান্মিতার কাণ্ডে বড্ড অসন্তুষ্ট হলো বন্য, ধমকের স্বরে শুধালো—

-- ঢেকে দিলি কেনো? দেখতে দে, দেখি কীভাবে কেটেছে? কী হয়েছে তর? বল আমায়।

,,, বলতে বলতে আবার শালে হাত দিতে নিতেই হাত ধরে ফেললো রুপান্মিতা। বন্যকে টানতে টানতে ব্যস্ততা দেখিয়ে বললো—

-- তর ঘরে গিয়ে দেখিস, আপাতত উপরে চল, এখানে কত লোক। আমি এখানে কাঁধ খুলে দাঁড়িয়ে থাকবো? চল তো বোন, চল।

**********

বিকাল ৪টা বেজে ৫০ মিনিট। ঘণ্টা খানিক আগে স্কুল থেকে ফিরেছে মেঘশ্রী। ফিরেই বনশ্রীকে সাজাতে বসেছে। মাস্টার বাড়ি থেকে কাঁচা হলুদ রঙা শাড়ি, গাঁদা, গোলাপ ফুলের মালা পাঠানো হয়েছে। সেসব দিয়েই সাজানো হচ্ছে বন্যকে। পাশে চুপচাপ মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কাব্যশ্রী, পরনে আরবিদের দেওয়া কাঁচা হলুদ রঙা শাড়ি, চুলগুলো অবাধে ছেড়ে রাখা, চোখে গাঢ় কাজল, ঠোঁটে লাল রঞ্জক, নিবেদিতা জোরপূর্বক কানে একখানা গোলাপও গুঁজে দিয়েছে। এই সাজে মেয়েটাকে দেখতে কী যে স্নিগ্ধ লাগছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার নয়। তবে সেই সুন্দর মুখখানায় ঘন আঁধার। যার জন্য এত সুন্দর করে সাজলো, নিজেকে পরিপাটি করলো, তার কোনো পাত্তা নেই। দুপুরের পরপর খেয়ে-দেয়ে বেরিয়েছে মানুষটা। বর্তমানে হয়তো নৌকায় মাল তোলায় ব্যস্ত, ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা হবে, ফিরেও এক রত্তি স্থির থাকবেন না। গোছগাছ করে দুদিনের জন্য শহরে চলে যাবেন। কাব্যশ্রীর নিজেকে বড্ড হতভাগী মনে হয়, কেনো সে এই কাঠখোট্টা কাজপাগল মানুষটাকে মন দিয়ে বসলো? সেদিন কেনো যে বড়ো আপার সাথে লোকটার ঘরে গিয়েছিল, সেটাই বড়ো অন্যায় হয়েছে তার। এর চেয়ে ভালো ছিল সে যদি রাস্তার কোনো পাগলকে ভালোবাসতো, তাহলে নির্ঘাৎ ঐ পাগলটাও তাকে পাওয়ার জন্য একটুখানি হলেও পাগলামি করতো, এভাবে হেলাফেলা অন্তত করতে পারতো না। ভেবেই চোখ জোড়া ঝাপসা হয়ে এলো মেয়েটার, ইচ্ছা করলো এই সাজগোজ খুলে পাগলের বেশে পাগলিনী হয়ে বনে বনে ঘুরে বেড়াতে। কাব্যশ্রীর এই আকাশ-কুসুম ভাবনার মাঝেই শোনা গেল মেঘশ্রীর ব্যস্ত কণ্ঠস্বর।

,,, কাব্য!! একটু নিচে যা তো, আরহানকে বলবি উপরে আসতে। যে কাজেই ব্যস্ত থাকুক না কেনো, দ্রুত আসতে বলবি।

,,, আকস্মিক বড়ো আপার কণ্ঠ শুনে ধ্যানচ্যুত হলো কাব্যশ্রী। তবে কোনো রূপ উত্তর করলো না, মাথা নাড়িয়ে চুপচাপ বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। বেরিয়ে যেতেই দীর্ঘশ্বাস ফেললো বনশ্রী, মলিন কণ্ঠে আওড়ালো---

কাব্যটার জন্য ভীষণ মায়া হয় আপা, ভাইজান কি কাব্যকে কোনোদিন বুঝবে না? ভাইজান এত পাষাণ কেনো? পুরো ধরণী খুঁজেও কি তিনি আমার বোনের মতো স্নিগ্ধ, কোমল, ধৈর্যশীল মেয়ে পাবেন?

,,, বনশ্রীর প্রশ্নে মেঘশ্রী নিজেও দীর্ঘশ্বাস ফেলতে বাধ্য হলো, তবে উত্তর করতে ইচ্ছা হলো না। কী বা বলবে? উত্তরটা কি বন্যর অজানা? এই একটা প্রশ্নের উত্তর সকলেরই জানা। আরবিদ দেওয়ান কখনো বিয়ে করবে না, শুধু কাব্য কেনো? কাউকেই করবে না। এখন কেনো করবে না, তা জানা নেই মেঘের, হয়তো কেউই জানে না। বড়ো আপাকে উত্তর করতে না দেখে বনশ্রীও আর কথা বাড়ালো না, চুপচাপ বসে রইলো। মেঘশ্রী বন্যর মাথার চুলগুলো খোপা করে তাতে গাঁদা ফুলের মালা বেঁধে মাথায় ঘোমটা টেনে দিতেই অনুভব করলো বনশ্রীর চোখ জোড়া ঝাপসা, কোটরে জলবিন্দুরা থৈ থৈ করছে। কাজল চোখে সেই থৈ থৈ করা পানিটুকু কী যে সুন্দর লাগছে, তা কি জানে কাঁদনরত বন্যটা। মেঘশ্রী ঠোঁট বাঁকিয়ে সূক্ষ্ম হাসলো, মুখে আলতো করে হাত বুলিয়ে শুধালো---

,,, কী হয়েছে আমার বনবিড়ালের? কাঁদছিস কেনো? মাস্টারকে অপছন্দ? কাঁদিস না, আমরা, মানব জাতি বরাবর নিষিদ্ধ, অপছন্দের জিনিসের প্রতি দ্রুত আকৃষ্ট হয়ে পড়ি, দেখবি,

,,, কথা ফুরাবার আগেই মেঘশ্রীকে আকস্মিক ঝাপটে ধরলো বন্য, কাঁধে মুখ লুকিয়ে বাচ্চাদের ন্যায় ফুঁপাতে ফুঁপাতে বললো---

-- আমার ভীষণ বুক পুড়ছে আপা। তোমার আগে আমার সংসার হোক, এরকম প্রত্যাশা আমি ভুলেও রাখিনি। তবে নিয়তি কেনো রাখলো? নিয়তি এত নিষ্ঠুর কেনো আপা?

,,,, নিয়তি? নিয়তি যে নিষ্ঠুর, তা কি আজ জানতে পারলো বন্যটা? বড্ড দেরি হয়ে গেলো বোধয়। মেঘশ্রী তো ছোট থেকেই জেনে এসেছে, নিয়তি নিষ্ঠুর, ভালোবাসা পাষাণ, শব্দটা অর্থহীন। তবে সেসব মুখ তুলে বললো না মেঘশ্রী, উল্টো বন্যর পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে শান্ত করার প্রয়াস চালিয়ে আওড়ালো---

-- আহারে বাচ্চা!! এর জন্য কষ্ট পেতে হবে? আপার সংসার হয়নি বলেই তো এখনো তোদের সাথে আছি, রোজ দেখতে পাচ্ছিস। বিয়ে করে চলে গেলে কি দেখতে পেতিস? এরপর যখন সময় সময় করে বাপের বাড়ি আসবি, তখনো রোজ দেখতে পাবি। বিষয়টা কি খুব মন্দ?

,,, উত্তর করতে পারলো না বনশ্রী, শুধু কেঁদেই গেলো। আপাটা যতই হেসে হেসে এসব বলুক না কেনো, সে তো খুব ভালো করেই জানে আপার মনকুঠুরিতে ঠিক কতখানি দুঃখ লুকিয়ে রয়েছে। বন্যর মাঝে মাঝে মন চায় ঐ মানুষটাকে খুব কথা শোনাতে, ইচ্ছা করে খুন করে ফেলতে। কেনো সে তার আপাকে এতটা যন্ত্রণা দিচ্ছে? কেনো কথা দিয়ে কথা রাখলো না?

**********

,,,, সেগুন কাঠের দরজাটা ভালো মতো টেনে নিবেদিতার ঘর থেকে বের হলো রুপান্মিতা। পরনে লাল পাড়ের হলুদ রঙা তাঁতের শাড়ি, সবাই মিলে ঠিক করেছে আজ কেউ চুলে খোঁপা বাঁধবে না। একসাথে চুল ছেড়ে রাখবে, এতে করে সবার সাজ একই রকম দেখাবে। বিষয়টা খুব একটা মন্দ নয় বিধায় সকলেই চুল ছেড়ে রেখেছে। রুপান্মিতাও সেই নিয়মের বাইরে নয়। নিবেদিতা খুব সুন্দর করে তার চুলগুলো ছেড়ে কানের পিঠে একটা গোলাপ গুঁজে দিয়েছে। মেয়েটা সাজগোজে বেশ পটু। যেমন সাজতে পারে, অমনি সাজাতেও পারে। কাব্যটার দেওয়ান সাহেব সন্ধ্যা নাগাদ শহরে চলে যাবে বিধায় কাব্যকেই আগে ভাগে সাজিয়ে দিয়েছে। এরপর সাজাতে বসেছে রুপান্মিতাকে। রুপা অবশ্য সাজতে চায়নি। তার এসব সাজগোজ করতে ভালো লাগে না, তবে নিবেদিতা মানতে নারাজ। একপ্রকার জোর-জবরদস্তি করেই সাজিয়ে দিয়েছে তাকে। রুপান্মিতাকে সাজানো শেষ হতেই এবার নিজে সাজতে বসলো মেয়েটা। শাড়ি পরতে গিয়ে লক্ষ করলো তার কাছে শাড়ি আটকানোর পিন ফুরিয়ে গিয়েছে। অগত্যা রুপার কাছে আবদার জানালো, সে যেন বনশ্রী কিংবা কাব্যশ্রীর ঘর থেকে দুটো পিন এনে দেয়। সেই আবদার রাখতেই গুটিশুটি পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে রুপান্মিতা। দোতলার উত্তর হতে সাত নম্বর ঘরটা নিবেদিতার। তারপরেরটা আফনানের, এরপর আরহান, তারপর বনশ্রী, মেঘশ্রী, কাব্যশ্রী, মাহমুদুল দেওয়ান, মাহবুবুর দেওয়ান। এরপর অনেকগুলো ঘর খালি, সবশেষে আরবিদের ঘর। বিনু ফুপু থাকেন নিচের ঘরে। স্বামী কবরে শায়িত হওয়ার পর থেকে তিনি কোনোদিন বিছানায় ঘুমাননি। স্বামীটা মাটিতে শুয়ে আছে বিধায় তিনিও একটা জীবন মাটিতে শুয়ে পার করে দিতে চান। বিষয়টা জানতে পেরে বেশ আপ্লুত হয়েছিল রুপান্মিতা। ভালোবাসার ক্ষেত্রে দেওয়ান বাড়ির মেয়েরা এত স্নিগ্ধ কেনো? বুঝে পায় না সে। এই যে মেঘ আপা, একজনকে ভালোবেসে কত লাঞ্ছনা সহ্য করছেন, অপরদিকে কাব্যটা, বড়ো চাচার গম্ভীর ছেলেকে ভালোবেসে পাগলপ্রায় অবস্থা, বন্যটা এখনো কাউকে ভালোবাসেনি, তবে বিয়ের পর নিশ্চিত গভীর ভালোবাসায় মত্ত হবে। আর দেওয়ান বাড়ির ছেলেগুলো, এরা আস্ত একটা বদ। একজন তো নিষ্পাপ, শান্ত-শিষ্ট কাব্যটাকে দিনের পর দিন দহনে পোড়াচ্ছে আর অন্যজন, প্রতিনিয়ত তাকে দিকভ্রষ্ট করে দেওয়ার পাঁয়তারা করছে। লোকটা কেনো করছে এমন? সেদিন নিজের স্বার্থে ওকে জড়িয়ে ধরেছিল। কেনো ধরেছিল? আবার গতকাল কতটা কাছে এসেছিল। এসব কেনো করছেন উনি? করে কী পাচ্ছেন? রুপান্মিতাকে দিকভ্রষ্ট করে উনার কী লাভ?

এসব আকাশ-কুসুম ভাবনায় মত্ত রুপান্মিতা যখন হাঁটতে হাঁটতে আফনানের ঘর পার করে আরহানের কক্ষের দরজার কাছে পৌঁছালো, তক্ষুনি আচমকা তার হাত টেনে ধরলো কেউ। আর কিছু বুঝে ওঠার আগেই পিঠের ব্যথায় জান বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড় হলো। পিঠ ও কোমরের ব্যথায় চোখ-মুখ খিঁচে বন্ধ করে নিতেই রুপান্মিতা অনুভব করলো কেউ একজন তার দিকে ঝুঁকে রয়েছে। বিষয়টা বুঝে আসতেই তড়াক করে চোখ মেলে তাকালো রুপা। পরক্ষণেই ভরকে গেলো কেমন। সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরহান, চোখ-মুখ শান্ত, কিছুটা মুগ্ধতা বিরাজ করছে আঁখি পল্লবে, কেমন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সেই দৃষ্টি নত হলো খানিকটা। রুপান্মিতা অনুভব করলো আরহান তার পায়ের দিকে তাকিয়ে আছে, সেই দৃষ্টি ধীরে ধীরে উপরে উঠছে। আরও একটা ব্যাপার খুব ভালো করেই লক্ষ করলো মেয়েটা, আরহান নামক যুবকটি আরবিদের থেকে হাজার খানিক ব্যতিক্রম। অভদ্র আর অসভ্য, নয়তো একটা মেয়ের সর্বকায়ায় এভাবে কেউ নজর বুলায়? রুপান্মিতার ভিতরটা কেমন হাঁসফাঁস করে উঠলো। এক হাতে পরনের শাড়িটা খামচে ধরে ভিতরের হাঁসফাঁস দূরে ঠেলে শক্ত কণ্ঠে শুধালো—

,,, কী সমস্যা? এসব কী ধরনের অসভ্যতামি?

,,, রুপান্মিতার বাক্য ফুরাবার সাথে সাথে ওর দুপাশের দেয়ালে দুহাত রেখে আরও খানিকটা ঝুঁকে এলো আরহান। এতটাই ঝুঁকে এলো, যতটা ঝুঁকলে রুপান্মিতার গাল ছুঁতে পারবে আরহানের ওষ্ঠ যুগল। বিষয়টা বুঝতে পেরে আগেভাগেই চোখ খিঁচে মাথা সরিয়ে নিলো রুপান্মিতা। আরহান ছেলেটা বোধহয় সত্যিই অসভ্যদের কাতারে পড়ে। কেমন ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে হাসলো আরহান। ফিসফিস করে বললো—

-- এটাকে অসভ্যতামি বলে? শুরুতে এতটা কাছে এসেছিলাম? অযথা অসভ্যের তকমা দিলে কেনো? তকমা যখন দিয়েছো, তা মিথ্যা হতে দেই কী করে? সত্যি করে দিলাম। আরও একটু করতে হবে? দিবো প্রমাণ?

,,, আরহান তখনো সরে যায়নি, রুপান্মিতা মাথা তুলতে পারছে না, ঘাড় বাঁকা করে রেখেছে। এমনকি আরহানকে বেঁধ করে যে সরে যাবে, সেই রাস্তাটুকু রাখেনি মানব। এই পর্যায়ে নিজেকে ছাড়াতে আরহানের বুকে ধাক্কা মারলো রুপা, তবে লাভের লাভ কিছুই হলো না। বরং আরও কাছে চলে এলো লোকটা। রুপান্মিতার কেমন কান্না পেলো, তবে কাঁদলো না। দাঁতে দাঁত চেপে আওড়ালো—

,,, আরবিদ ভাইজান কি জানেন, তার ভাই ঢাকা গিয়ে অভদ্র, বখাটে হয়ে ফিরেছে?

,,, আরহান হাসলো, ফের ফিসফিস করে বললো -- জানে, অনুমতি দিয়েছে মেয়ে তুলে আনার।

,,, এরূপ উত্তরে তাজ্জব বনে গেলো রুপান্মিতা। আরবিদ ভাইজান!! উনার মতো ভদ্র, সভ্য মানুষ এরূপ কথা বলবে, তা কি সত্যিই সম্ভব? নিশ্চয়ই বানিয়ে বানিয়ে বলছেন এই লোক। আরবিদ ভাইজানকে কি সে চেনে না? রুপান্মিতার ভাবনার মাঝেই কিছুটা দূরে সরে গেলো আরহান। বড়ো একখানা দম নিলো রুপান্মিতা। ঘাড় সোজা করে দাঁড়াতেই অনুভব করলো আরহানের শক্তপোক্ত হাত দুটো তার গলার কাছে এগিয়ে আসছে। সেকেন্ড খানিক সময়ও নিলো না, ওর চুলের ভাঁজে হাত চালিয়ে দিলো আরহান। সরে যাওয়া কিংবা কিছু বলে আটকে দেওয়ার সময় পেলো না রুপান্মিতা, তার আগেই লোকটা আকস্মিক ঘুরিয়ে নিলো তাকে। মুহূর্তেই দেওয়ালমুখী হয়ে গেলো রুপান্মিতা, পিঠ ঠেকলো আরহানের বুকে, সেকেন্ডেই সরে গেলো আরহান। লম্বা লম্বা দম নিলো দুটো, পরপর এক হাতে আলতো করে রুপান্মিতার পিছনে পড়ে থাকা চুলগুলো পিঠ থেকে সরিয়ে পাঞ্জাবির পকেট থেকে কাটা-ছেড়ার মলমটা বের করে নিলো। আরহানের আচরণে তেতে উঠলো রুপান্মিতা। ঝটকা মেরে সরে যেতে চেয়ে বললো — অসভ্যতার একটা সীমানা থাকে, আপনি সীমা ছাড়াচ্ছেন।

,,, আবারও দুপাশ থেকে আটকে দিলো আরহান, ফলস্বরুপ আবারও আরহানের বুকে রুপান্মিতার পিঠ ঠেকলো। বিষয়টা অনুভুত হতেই দেওয়ালের সাথে সিটিয়ে গেলো রুপা, আরহান নরম স্বরে আওড়ালো -- হুস!! অসভ্যতা করছি না, চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো, নয়তো সত্যিই অসভ্যতাটা হয়ে যাবে।

,,,, পনেরো বছরের বয়সী রুপা প্রতিবাদের ভাষা বুঝে না, খুঁজে পাচ্ছে না। অজানা অনুভূতিতে বুক ধরফর করছে। থেমে নেই আরহান, অতি যত্নের সহিত কেটে যাওয়া জায়গাটায় মলম লেপন করতে ব্যস্ত সে। ঘাড়ের মধ্যভাগে আরহানের স্পর্শ লাগতেই রুপান্মিতার শরীরটা কেমন ঝঙ্কার দিয়ে উঠলো, সেই ঝঙ্কারে কেঁপে উঠলো পা থেকে মাথা পর্যন্ত। চোখের সামনে ভেসে উঠলো সেদিন রাতের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত জড়িয়ে ধরার দৃশ্য। সেই আতরের ঘ্রাণ, হৃদয় ধুকপুক করার শব্দ, বুকের ভিতরকার হাঁসফাঁস, সবকিছু স্পষ্ট হলো মানসপটে। এতে যেন আরও দুর্বল হয়ে পড়লো রুপান্মিতা। আরহান কি লক্ষ্য করলো তা? জানা নেই। এই পর্যায়ে রুপান্মিতার সত্যি সত্যিই কান্না পেলো, চোখ জোড়া ছলছল করে উঠলো মুহূর্তেই। দেওয়ান বাড়ির ছোট ছেলেটা কেনো তার সাথে এমন করছে? কেনো খেলছে তার কিশোরী মন নিয়ে? লোকটা কি জানে তার বয়স সম্পর্কে? এই বয়সে মনটা যে বাস্তব-অবাস্তব মানে না, মরীচিকার পিছনে ছুটতে পছন্দ করে। রুপান্মিতা নাহয় ছোট, আরহান তো ছোট নয়, জেনে-বুঝে এতটা কাছাকাছি আসার মানে কী? এখন যদি রুপান্মিতা নিজেকে হারিয়ে বসে? কিশোরী মনের আবেগ সামলাতে না পেরে যদি মনে অনুভূতি তৈরি হয়ে যায়? তখন তাকে সামাল দেবে কে? ঐ অনুভূতির দায়িত্ব কি দেওয়ান বাড়ির ছোট ছেলে নেবে? একদমই নেবে না। এখন হয়তো আরহান রাগ কিংবা অন্য কোনো কারণবশত তার সাথে এমন ব্যবহার করছে, কিন্তু তার মতো মেয়েকে তো আর আরহান দেওয়ান পছন্দ করবে না। একে তো তার বংশপরিচয় নিচু, তার উপর সে দেখতে কালো, সব মিলিয়ে কোনোভাবেই কি কোনো কিছু সম্ভব? এককালে দেখা যাবে আরহান দেওয়ান এসব আচরণ করে দিব্যি পিছিয়ে পড়েছে কিংবা এসব মনেই রাখেনি, কিন্তু রুপান্মিতার দ্বারা কি এসব স্বাভাবিকভাবে নেওয়া সম্ভব? এই তো বুকের মাঝে তোলপাড় হচ্ছে, হাড় হিম হয়ে আসছে, এসব কীভাবে নিবারণ করবে সে। নিজের ভয়ংকর বাজে ভবিষ্যতের চিন্তা করে রুপান্মিতার চোখ ছাপিয়ে জল গড়ালো, ক্ষীণ শব্দে ফুঁপিয়ে উঠলো মুহূর্তেই। রুপান্মিতাকে কাঁদতে দেখে ভরকে গেলো আরহান। ক্ষতস্থানে আলতো করে ফু দিতে দিতে শুধালো—

-- জ্বালা করছে? একটু অপেক্ষা করো, সেরে যাবে।

,,, বলতে বলতে নরম হয়ে এলো আরহান। সুযোগ পেয়ে ফের ঝটকা মেরে দূরে সরে গেলো রুপান্মিতা। চোখভর্তি পানি নিয়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে আওড়ালো -- আপনাকে আল্লাহ কোনোদিন মাফ করবে না, দেইখেন।

,,, বলেই চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে গেলো। এদিকে আল্লাহ কেনো তাকে মাফ করবে না, সেই কারণটাই ধরতে পারলো না আরহান। ঠোঁট উল্টে রুপার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে কাধ উচালো,,পরক্ষণেই কেমন শব্দ করে হেসে উঠলো মানব।

*****

,,, আপার তাড়া থাকায় একপ্রকার হন্তদন্ত পায়ে নিচে নেমে এসেছিল কাব্যশ্রী। বসার ঘরটায় তখন তুমুল ভিড়। একপাশে মসলা বাটা বাটি, অপর পাশে হলুদ বাটছে একজন। খানিক দূরে চার-পাঁচজন মহিলা মিলে সমস্বরে গীত গাইছেন। সেই সাথে গায়ের ছোট-বড়ো মেয়েরা শাড়ি পরে মিলিত হয়েছে এখানটায়। এর মধ্যে অনেকের সাথেই বেশ সখ্যতা রয়েছে কাব্যর। অগত্যা কাব্যকে নিচে নামতে দেখে সবাই কেমন উৎসাহে ফেটে পড়লো। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে দেখতে দারুণ প্রশংসা করলো। কাব্যশ্রীর মন খারাপ থাকলেও সেটা এই পর্যায়ে আর ধরে রাখতে পারলো না। সেও মিলিত হলো সবার আনন্দে। এমতাবস্থায় সে ভুলেই বসেছিল আপা যে তাকে একটা কাজে পাঠিয়েছে। স্মরণে আসতেই নিজের গালে আলতো করে চাপড় মারলো মেয়েটা। পরক্ষণেই সবার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে ছুটে গেলো বাহিরের দিকে। মাথায় লম্বা করে ঘোমটা টেনে বাহিরে এসে দাঁড়ালো। পুরো উঠোন খুঁজেও আরহানের দেখা পেলো না। দুজন বাচ্চাকে প্যান্ডেলের ভিতর খুঁজে আসতে বললে তারা খুঁজে এসে জানালো, আরহান সেখানেও নেই। হতাশ হলো মেয়েটা। এমনিই দেরি হয়ে গিয়েছে, এখন যদি ভাইজানকে না পাওয়া যায়, আপা রাগ করবে না? তীব্র হতাশার মাঝে আলোরণ ছড়াতে মেহরাবের দেখা পেলো কাব্য। ওই তো বাড়ির গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে শাহিল ভাইয়ের সাথে কথা বলছে। নির্ঘাত ভাইজান ওখানেই থাকবে? না থাকলেও কোথায় আছে, সে বিষয়ে তো জানা যাবে, নাকি? ভেবেই দ্রুত কদমে হেঁটে গেলো সেদিকটায়। মিনিট খানিকের মাঝেই মেহরাবের পিছনে এসে দাঁড়ালো কিশোরী, নরম স্বরে শুধালো—

,,, মেহরাব ভাই!! ভাইজান কোথায়?

,,, চিকন মেইলি স্বরে তড়িৎ ঘুরে তাকালো মেহরাব, তাকিয়েই কেমন বোকা বনে গেলো ছেলেটা। অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষের মুখ থেকে ক্ষীণ হয়ে পড়া অনাকাঙ্ক্ষিত স্বর কর্ণকুহরে পৌঁছানোর মাত্রই দিকবিদিকশূন্য হয়ে পড়লো মানবের মস্তিষ্ক। নিগূঢ় চিত্তে চেয়ে রইলো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পঞ্চদশী নিরব চিত্রের মেয়েটার পানে। পরনে থাকা হলুদ শাড়ি, চোখের কাজল, ঠোঁটের রঞ্জক, পায়ের আলতা, সুশ্রী গড়ন এত কাছ থেকে দেখে বাক্‌হারিয়ে পড়লো যেনো। কী বলবে? কী করবে, বুঝে পাচ্ছে না। ওদিকে কাব্যটা প্রশ্নের উত্তরের আশায় সরল দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে। বিষয়টা বুঝে আসতে চেয়েও যেনো আসতে চাচ্ছে না। সে কেমন অবুঝের ন্যায় শুধালো—

-- তোমার ভাইজান?

,,, কাব্যশ্রী চোখের ইশারায় সায় জানিয়ে বললো—

-- জ্বী, আমার ভাইজান, মানে আরহান ভাইজান কোথায়?

,,, এই পর্যায়ে এসেও একই অবস্থা হলো আরহানের। কেমন থম মেরে গেলো মানুষটা। পরপর মেইলি স্বরে আওড়ানো ছোট ছোট বাক্য তার হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করছে। মেহরাবকে চুপ থাকতে দেখে বিরক্ত হলো শাহিল। মেহরাবের চোখের চাহনি সে বুঝতে পারছে, এমনটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সামনে দাঁড়ানো মেয়েটা রাজহংসী, তার রূপের ছটা যেকোনো পুরুষের মন-প্রাণ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ঝাঁঝরা করে দিতে সক্ষম। তবে এই মেয়ের পানে তাকানো নিষেধ, নিষিদ্ধ বস্তু সে। যার নজর দেওয়ার কথা, সে নিজেই ঝলসে যাওয়ার ভয়ে নজর দেয় না, সেখানে মেহরাব, শাহিল তো অতীব তুচ্ছ মানুষ। তাদের দ্বারা এতটা সাহস করা সত্যিই কি গ্রহণযোগ্য? হতে পারে মেহরাব মেম্বারের ছেলে, তবে পরিণতি যা হওয়ার তা হবেই। সে যেই হোক না কেনো। এই মেয়ের রূপের ছটায় একবার মরতে গেলে দ্বিতীয় বার আর জান হাতে দাঁড়িয়ে থাকা হবে না, কবরে শায়িত করা হবে নিমিষেই। ভাবনা রেখে অন্যদিকে দৃষ্টি ঘুরালো শাহিল, নিজ থেকেই প্রতিত্তোর করলো—

,,, ছোট দেওয়ান এইখানে নাই, কাব্য আপা। উপরে নিজের ঘরে আছে মনে হয়, একটু খুঁইজা দেখেন।

,,, উত্তর পেয়ে মাথা ঝাঁকালো কাব্যশ্রী, মুখটা কেমন মলিন হয়ে গেলো। অকারণেই এত পথ ছুটে এসেছে সে। আগে ভাগে ঘরে গিয়ে পরখ করলেই ভালো হতো। ভেবেই বাড়ির দিকে পা বাড়ালো মেয়েটা, তৎক্ষণাৎ বাধ সাধলো মেহরাব। আকুল কণ্ঠে শুধালো—

-- কাব্য!! আমাকে এক গ্লাস পানি দিতে পারবে? অনুরোধ করছি। আসলে বসার ঘরে সবার হুড়োহুড়ির মাঝে ঢুকতেও পারছি না, কারোর কাছে চাইতেও পারছি না। এদিকে তৃষ্ণায় গলাটা শুকিয়ে কাঠ।

,,, মেহরাবের আকুল স্বর শুনে খানিক ব্যথিত হলো কাব্য, পানি পিপাসায় একজন মানুষ এতটা কাতর হতে পারে, বুঝি? সে আলতো করে মাথা ঝাঁকিয়ে বললো—

-- এভাবে বলছেন কেনো ভাইয়া? পানি তো। একটু এগিয়ে আসুন, আমি নিয়ে আসছি।

,,, বলেই হাঁটা দিলো সামনে। মেহরাবের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। এটা মোটেও পানির তৃষ্ণা নয়, বরং আরও একবার কাব্যশ্রীকে দেখার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কাতরতা দেখিয়েছে মেহরাব। তবে এটা তো আর কিশোরীকে বলা যাবে না, তাই ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে পানি খাওয়ার অজুহাত মেলে ধরলো। কাব্যশ্রীকে এগিয়ে যেতে দেখে মেহরাবও হাঁটা দিলো তার পিছু পিছু, দৃষ্টি ঘোমটাওয়ালির শাড়ির আঁচল বেঁধে গড়িয়ে পড়া হাঁটু ছুঁই ছুঁই লম্বা চুলে স্থির। মেহরাব ঠোঁটে মুগ্ধতার হাসি ফুটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে কদমের পর কদম।

,,, গুনে গুনে মিনিট খানিক পেরোতেই পানি নিয়ে বাহিরে বের হলো কাব্যশ্রী। মেহরাব তখনো দরজার পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। চাহনিতে কেমন চাতকতা। মেহরাবকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঠোঁটে সৌজন্যতার হাসি ফুটিয়ে পানিটা এগিয়ে দিলো কাব্য, মেহরাবও সমান তালে হেসে আলতো করে গ্রহণ করলো তা। তৎক্ষণাৎ দেওয়ান বাড়ির গেইট পেরিয়ে বাড়িতে ঢুকলো আরবিদ দেওয়ান। সাথে কেউ নেই, ময়নুল ভাইও না। হয়তো শহরে যাবেন বলে তৈরি হতে এসেছেন। মেহরাব পানির গ্লাসটি গ্রহণ করতেই কাব্যশ্রীর নজর আটকালো তার দেওয়ান সাহেবের উপর। মুহূর্তেই চোখাচোখি হলো দুজনার। আরবিদও তার দিকেই তাকিয়ে আছে, দৃষ্টি কঠিন, চোয়ালখানি শক্ত। চোখ জোড়াতে যেনো দাবানল ছুটছে। তবে সেসব বুঝতে পারলো না সরল কাব্য, সে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আরবিদের পানে। এই শীতের মাঝেও ঘেমে উঠেছে মানব, হয়তো মাল উঠাতে গিয়ে এমন অবস্থা হয়েছে। পরনের পাঞ্জাবিটা ঘামে ভেজা, লুঙ্গির নিচটাও পানিতে নামার ফলে ভিজে রয়েছে। বাম হাতে শাল ভাঁজ করে রাখা, চুলগুলোও খানিক ভেজা। কাব্যর ইচ্ছা করলো শাড়ির আঁচলটা দিয়ে চুলগুলো মুছে দিতে, কিন্তু অধিকার নেই বলে দিতে পারলো না। মেহরাব তখনো পানি খেতে খেতে কাব্যর দিকেই তাকিয়ে। আরবিদও ততক্ষণে হনহন করে হেঁটে এসে কাব্যশ্রীর সামনে পৌঁছালো। এই পর্যায়ে এসে কাব্যশ্রী অনুভব করলো আরবিদ তার দিকে ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কাব্য যেহেতু সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, আরবিদ ওই দরজা দিয়েই ভিতরে ঢুকেছে। কাব্যকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার বেলায় আরবিদের চাহনি বোধহয় আরও তীক্ষ্ণ হলো। কেমন মেপে নেওয়ার চোখে মেহরাবের শরীরটা মেপে নিয়ে কাব্যর সম্পূর্ণ কায়ায় নজর বুলালো। পরপরই শক্ত কদম ফেলে চলে গেলো ভিতরে। আরবিদের এই হঠাৎ রাগের কারণ বুঝতে পারলো না কাব্য, কী হয়েছে লোকটার? এত রেগে গেলো কেনো? কাজের ওখানে কিছু হয়েছে কি? কোনো ঝামেলা হলো নাতো। এরকম হাজারটা চিন্তায় জর্জরিত হয়ে উঠলো ছোট্ট কিশোরী।

*******

,,,, দেওয়ান বাড়ির বসার ঘরটাকে দেখতে একপ্রকার হলুদিয়া পাখির আসর মনে হচ্ছে। ছোট ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে পাড়ার কিশোরী, যুবতী, বাড়ির বউ, বৃদ্ধারা পর্যন্ত হলুদের সাজে সাজিয়েছে নিজেদের। কারোর পরনে তাঁতের শাড়ি, কারোর পরনে সুতির শাড়ি, আবার কেউ কেউ গায়ে জড়িয়েছে দামি মসলিন শাড়ি। তার প্রথম নিদর্শন হচ্ছে আরহানের মামুর মেয়ে সোনালী। মেয়েটার বয়স ১৯, চলন-বলনে শহুরে ভাব থাকলেও আচার-আচরণ বেশ স্নিগ্ধ। চেহারার ভাঁজ ভালো হওয়ার পাশাপাশি শহর থেকে গ্রামে আসার দরুন ফুপুর শ্বশুরবাড়িতে ভালোই তোষামোদ পাচ্ছে মেয়েটা। গ্রাম বাংলার একটা বেশ প্রচলিত নিয়ম রয়েছে, বিয়ের আগের দিন বাড়ির মেয়ে-বউরা গোটা করে সাজগোজ করে কুলো সাজিয়ে যার বাড়িতে মেহেদি গাছ রয়েছে, তার বাড়িতে পান-সুপারি দিয়ে মেহেদি তুলে আনে। আর এই মেহেদি তোলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় যেই উপাদান, অর্থাৎ কুলো, সেটা এক মায়ের এক মেয়ের হাতে দেওয়া হয়। সোনালী যেহেতু বাবা-মায়ের একটি মাত্র সন্তান, তাই কুলো নেওয়ার ভারটা সোনালীর হাতেই দেওয়া হলো। এতে বেশ খুশি মেয়েটা, কেমন গ্যাজবিশিষ্ট সূক্ষ্ম দাঁতগুলো বের করে অমায়িক হেসে সবার আনন্দের সাথে তাল মিলাচ্ছে। যদিও এটা রুপান্মিতার নেওয়ার কথা ছিল, বনশ্রী পই পই করে বলে দিয়েছে যেন তার একমাত্র বান্ধবী তার বিয়েতে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়, কিন্তু সোনালীর শহুরে হাবভাবের কাছে সেই প্রাধান্য পাওয়ার কথাটুকু টিকলো না। এতে রুপান্মিতা একদমই মন খারাপ করেনি, এমনিতেও তার এসব পছন্দ না। সেই সাথে আরহানের আচরণগুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই বিরক্ত সে। ঐ যে খানিক দূরে মেহরাব ভাইয়ের কাঁধে কনুই ঠেকিয়ে গালে হাত দিয়ে কেমন তার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি করে হাসছে। বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকালো মেয়েটা। নিবেদিতার হাত টেনে ওকে নিজের জায়গায় দাঁড় করিয়ে নিজে নিবেদিতার আড়ালে দাঁড়ালো। মুহূর্তেই জায়গা পরিবর্তন করলো আরহান, মেহরাবকে টেনে নিয়ে এমন জায়গায় দাঁড়ালো, যেখান থেকে রুপান্মিতাকে সম্পূর্ণ দেখা যায়। এরূপ কাণ্ডে হতভম্ব হয়ে পড়লো রুপা, এটা আবার কেমন আচরণ? কী শুরু করেছে কি আরহান দেওয়ান?

,,, সবাইকে একত্র হতে দেখে তাড়া দিলেন বিনু ফুপু, সবাই মেহেদি তুলে ফিরে এলে আবার সেই মেহেদি বেটে হলুদসহ রেজওয়ানের বাড়িতে পাঠাতে হবে। ছেলেটার ওখানে তো মহিলা বলতে কেউ নেই, কাউকে দাওয়াতও করেনি নিশ্চয়ই? খিটখিটে রেজওয়ানের কাছে এর থেকে বেশি আর কী আশা করা যায়? অগত্যা এখান থেকেই মহিলারা গিয়ে হলুদ ছুঁইয়ে আসবো তাকে। সে জনাব খিটখিটে হোক কিংবা ভালো মানুষ, বিয়ের নিয়ম তো একই, তাই না? ফুপুর তাড়া পেয়ে সবাই যখন রওনা দিবে বলে ঠিক করলো, তৎক্ষণাৎ উপর থেকে ভেসে এলো—

,,, কাব্যশ্রী, কাব্যশ্রী!! কাব্য!! কাব্য!! ঘরে আসো।

,,, কাঙ্ক্ষিত পুরুষের কণ্ঠে এরূপ অনাকাঙ্ক্ষিত ডাক সকল কোলাহলের মাঝেও শুনতে পেলো কাব্য, বুকের ভিতরটা ধক করে উঠলো। এরকম গলা চড়িয়ে তার নাম ধরে কোনোদিন ডাকেনি আরবিদ। বরাবর তার উচ্চ স্বরে শুধু আম্মা ডাকটাই ধ্বনিত হতো। অথচ আজ? কী এমন হলো লোকটার? এভাবে গলা চড়িয়ে ডাকলো কেনো? কাব্যশ্রীর কেনো যেনো বিশ্বাস হলো না লোকটা তার নাম ধরে ডেকেছে, তাই এদিক-ওদিক তাকিয়ে বুঝতে চাইলো কেউ লোকটার ডাক শুনেছে কিনা। তবে আশাহত হলো রমণী, কেউ যেনো কিছু শুনতে পায়নি। সবাই সবার মতো করে ব্যস্ত। এই পর্যায়ে কাব্যশ্রী ভেবে নিলো এটা তার মনের ভুল, অথচ ভাবার সাথে সাথে আবারও উপর থেকে ডাক এলো—

-- কাব্যশ্রী, কাব্য, ঘরে আসতে বললাম না? কাব্য!!

,,, এই পর্যায়ে আর মেয়েটাকে ধরে রাখে কার সাধ্যি? সে দিকবিদিকশূন্য হয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে হাঁটা দিলো। মেয়েটার পায়ে সে কী জোর, পারে না যেনো উড়ে চলে যায়। কাব্যকে উপরের দিকে ছুটতে দেখে পিছন থেকে তাড়া দিলো নিবেদিতা—

,,, এই মেয়ে!! কই যাস? সবাই তো এখনই চলে যাবে।

,,, ছুটতে ছুটতে ফিরে তাকালো কাব্য, তর্জনী আঙুল তুলে নিবেদিতার দিকে তাক করে বললো—

-- একটা মিনিট, একটা মিনিট অপেক্ষা কর। আমি আসছি।

,,, বলতে বলতে ছুটে গেলো মেয়েটা, প্রতিত্তোর শোনার সময় পেলো না, পিছু ফিরে চাইলোও না। তার কানে শুধু একটা কথাই বাজছে, কাব্যশ্রী!! ঘরে আসো। এমনভাবে লোকটা কোনোদিন ডাকেনি তাকে, এভাবে তো স্বামীরা তাদের বউদের ডাকে। কাব্যর মনে হলো সে বুঝি সত্যিই ঐ গম্ভীর লোকটার বউ। মেয়েটা ছুটতে ছুটতে একেবারে আরবিদের ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো, ভিতর থেকে দরজা চাপানো। আলতো করে দরজাটা খুলে ভিতরে ঢুকতেই সামনের দৃশ্য দেখে থমকে গেলো কাব্য। আরবিদ দেওয়ান, আলমারি থেকে একে একে কাপড় নামিয়ে মেঝেতে রাখছে। নামিয়ে রাখছে বললে ভুল হবে, একপ্রকার ছুড়ে ছুড়ে ফেলছে। এর মধ্যে কয়েকটা হয়তো ময়লা আর বাকি সবগুলোই ধোয়া। ধোয়া কাপড়গুলো এভাবে মেঝেতে ফেলতে দেখে আঁতকে উঠলো মেয়েটা। এগিয়ে এসে সামনাসামনি দাঁড়িয়ে বিচলিত কণ্ঠে শুধালো—

--- দেওয়ান সাহেব, এগুলো নামাচ্ছেন কেনো? কী হয়েছে? আমাকে বলুন।

,,, উত্তর করার প্রয়োজন মনে করলো না আরবিদ, আলমারি ছেড়ে এবার আলনার কাছে গেলো। সেখানে ভাঁজ ভাঁজ করে সাজিয়ে রাখা শালগুলো থেকে একটা একটা শাল নামিয়ে নামিয়ে ছুড়ে ফেলছে কাপড়ের স্তূপে। আরবিদের আচরণের মানে বুঝতে পারলো না মেয়েটা, কেমন বোকা বোকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মানবের পানে। বেশ কয়েকটা শাল ফেলে দেওয়ার পর আরবিদ কেমন ফ্যাসফ্যাসে গলায় আওড়ালো---

--- এগুলো এখনই কেচে দাও।

,,, আরবিদের কথায় তাজ্জব বনে গেলো কাব্য, অবাক কণ্ঠে শুধালো—

-- এই সন্ধ্যা সময় কাপড় কাচবো? আর এগুলো তো ময়লা নয়, কয়েকদিন আগে ধুয়ে রেখেছি।

,,, তড়িৎ চোখ বাঁকিয়ে তাকালো মানব, চোখে-মুখে রাগের দাবানল, জেদ যেনো থৈথৈ করছে সেখানে। মানব কেমন দাঁতে দাঁত খিঁচে শুধালো—

-- পারবে না? ঠিক আছে, তবে ঘর থেকে বের হও। যাও!!

,,, শেষের কথাটা কেমন ধমকের স্বরেই বললো মানব, মুহূর্তেই কাব্যশ্রীর অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো, ভয়ের তোপে দৃষ্টি নামিয়ে আমতা আমতা করে কৈফিয়ত দেওয়ার মতো করে বললো---

-- বলছিলাম যে, সবাই মেহেদি তুলতে চলে যাবে। আমিও ওদের সাথে যেতে চাই। আপনি বরং চলে যান, আমি এগুলো ধুয়ে সমান করে রেখে দিবো, ফিরে এসে সব ঠিকঠাক পাবেন।

,,, ভ্রু বাঁকালো আরবিদ, সন্দেহী কণ্ঠে শুধালো---

-- তাড়িয়ে দেওয়ার খুব তাড়া দেখছি। আমি চলে গেলে বেঁচে যাও, তাই না?

,,, বরং মরে যাই। মনে মনে কথাটা আওড়ালেও সামনাসামনি বলার সাহস পেলো না মানবি। মাথা নিচু রেখেই উত্তর করলো---

-- আমি কখন সে কথা বললাম? আপনি-ই তো শহরে যাবেন বলে ঠিক করেছেন।

,,, মুখে মুখে তর্ক করাও শিখে গিয়েছো?

,,, কাব্যশ্রীর এবার কান্না পেলো। এভাবে ধমকাবে বলেই বুঝি ডেকে এনেছে? আর এই কাপড়গুলোও তো ধোয়া, কত কষ্ট করে ধুয়েছিল সে। তার কষ্ট হয়নি বুঝি? এই বড়ো বড়ো শাল ধুতে গিয়ে তার হাত লাল হয়ে যায়। যদিও এসব করতে তাকে বাধ্য করেনি কেউ, সে নিজের ইচ্ছায়ই করে, তবুও আজ করতে ইচ্ছা করছে না। খুব ইচ্ছা করছে সবার সাথে যেতে, প্রতিদিন তো আর বাড়িতে বিয়ে হবে না, তাই না? ভাবতেই গাল বেয়ে পানি গড়ালো, তা নজর এড়ালো না আরবিদের। চোখ সরিয়ে নিয়ে অন্যদিকে নজর স্থির রেখে বললো---

-- আচ্ছা যাও,, যেখানে যাওয়ার, আর কখনো আমার কাপড়ে হাত দিবে না।

,,, কাব্যশ্রীর কী যে দুঃখ হলো। একদিকে আনন্দ, অপরদিকে ভালোবাসার মানুষ। কী করবে এখন? নিজের আনন্দকে প্রাধান্য দিবে কি? নাহ্, তা কী করে হয়? নিজের আনন্দকে প্রাধান্য দিলে এ কেমন প্রেমিকা হলো সে? প্রেমিকা না হোক, বিরহিণী তো? বিরহ মানতে না পারলে আরবিদ দেওয়ানের বিরহিণী হবে কী করে সে? অগত্যা দুহাতে গাল মুছে নিলো। পরনের শাড়িখানা কোমরে পেঁচিয়ে বাঁধনহারা চুলগুলো শক্ত খোঁপা করে নিলো। এর মধ্যে কোন ফাঁকে গোলাপটা মেঝেতে গড়িয়েছে, টের পেলো না মানবি, তবে সেই গোলাপের পানে একবার আড়চোখে তাকিয়েছে আরবিদ। পরক্ষণেই তাকালো মলিন মুখে সবগুলো কাপড় একসাথে জড়ো করে আগলে নেওয়া কাব্যর দিকে।

,,,, চলবে,,

,,, এরপরেও যারা বলবে আরবিদ দেওয়ান ভালো, মুগ্ধ হওয়ার ব্যাপার আছে তাদের জামাইরা তাদেরকে এরম দিন রাত কারনে অকারনে খাটাবে। 😒😒😒😒

যাই হোক,, কেমন হয়েছে বলে যাও। ☺️☺️

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন