ফন্ট সাইজ:
থিম:
দেওয়ান সাহেব

৯ম পর্ব

লেখক: রুপান্জলি

#দেওয়ান_সাহেব ( পর্বঃ ৯)

#লেখনিতে_রুপান্জলি

#ট্রাজেডি_জাস্টিস

গায়ে ছিপছিপা হলুদ নিয়ে উঠোনের মাঝখান থেকে কোনো রকমে পালিয়ে এসেছে বনশ্রী। হলুদ মাখাতে থাকা মহিলাগুলো শুধু গাল-গলায়ই থেমে থাকেনি, বরং পুরো শরীর ভর্তি করে হলুদ মাখিয়ে দিয়েছে। বাচ্চাগুলোও থেমে থাকেনি। একবার এ এসে বলছে, বন্য আপাকে হলুদ মাখাবো, আবার কখনো ও এসে বলছে, বন্য ফুপুকে হলুদ মাখাবো। বন্যর তখন কী যে রাগ হলো, ইচ্ছা করছিল সবকটাকে ধরে ধরে হলুদের বাটিতে চুবিয়ে মারতে। কিন্তু কিছুই করা হলো না। সব দোষ মায়ের, মা কেমন চোখ পাকিয়ে পাকিয়ে শাসাচ্ছিলো। এভাবে শাসিয়ে শাসিয়েই বন্যর জীবনটা তুলোধুনো করে যাচ্ছে তার মা। বন্যর জীবনের এই অবনতির জন্য শুধু যে তার মা দায়ী, তা কিন্তু নয়। সবচেয়ে বড়ো অপরাধী ঐ খাইষ্টার ঘরের খাইষ্টার। সে যদি তাকে বিয়ে করতে না চাইতো, তাহলে কি তাকে এখন এতোসব ঝামেলা পোহাতে হতো? ভেবেই ফোস ফোস করে উঠলো মেয়েটা। বাহিরে মহিলাদের সাথে ওঠা রাগটা এবার রেজওয়ানের উপর বর্তালো। একবার বিয়েটা হোক, আগে যাক খাইষ্টার বাড়িতে, তিন বেলা না খায়িয়ে রাখবে, কাছে ঘেঁষতে দেওয়া তো দূর, বিছানায় জায়গাই দিবে না। উল্টো দূর দূর করে তাড়িয়ে দিবে ঘর থেকে। ভেবেই পৈশাচিক হাসলো বনশ্রী। তৎক্ষণাৎ নজর আটকালো খাবার টেবিলের উপর ঢেকে রাখা হলুদের বাটিটার দিকে। চোখ দুটো কেমন ছোট ছোট হয়ে এলো, তার গায়ে তো হলুদ মাখানো শেষ, তাহলে এই হলুদটা কার? খাইষ্টা লোকের নয়তো? হতেই পারে। বিনু ফুপু তো বার বার বলছিলেন, মাস্টার বাড়িতে হলুদ নিয়ে যাওয়ার কথা। তার মানে এটা নিশ্চয়ই খাইষ্টা মাস্টারের। ভেবেই এদিক-ওদিক নজর ঘুরালো বনশ্রী। নাহ!! আশেপাশে কেউ নেই। সবাই বর্তমানে উঠোনের মাঝখানে অবস্থান করছে, এর মধ্যে অনেকেই পেন্ডেলে রয়েছে। মেয়েরা গিয়েছে মেহেদী তুলতে। এটাই মোক্ষম সুযোগ। ভেবেই আরও একবার পৈশাচিক হাসলো বন্য। চুপি চুপি এগিয়ে গেলো সেদিকে। নিয়ম অনুসারে হলুদগুলো তো লোকটার গাল, গলায়, হাতে, পায়ে মাখানোর কথা, তাই না? হুম!! তার বেলায় যেমনটা হয়েছে, লোকটার বেলায় তো তাই হবে। তাহলে হলুদে কিছু একটা মিশিয়ে দিলে কেমন হয়? বিষয়টা খারাপ না। তবে কী মিসাবে? চুলকানোর ঔষধ? নানা, এটা করা যাবে না, তাহলে লোকটা বুঝে ফেলবে। তাহলে কী করা যায়? যাই করুক না কেন, এমনভাবে করতে হবে যেনো লোকটা বুঝতেও না পারে আর বনশ্রী মনে মনে শান্তিও পায়। যাকে এক কথায় বলে, সাপও মরবে আর লাঠিও ভাঙবে না।

অগত্যা ভাবতে বসলো সে। অনেক ভাবা-ভাবির পর যা পেলো, তাতে বন্যর মুখাবয়বে কেমন শয়তানি হাসি ফুটে উঠলো। সময় নষ্ট করলো না মেয়েটা। তড়িঘড়ি করে হলুদের বাটিটা হাতে তুলে নিলো। পরপর আঙুল দিয়ে বাটা হলুদটুকু দুদিকে ছড়িয়ে এক দলা থুতু ছুড়ে মেরে যেই না মিশাতে নিবে, অমনি গা গুলিয়ে উঠলো কিশোরীর। নাক সিটকে আওড়ালো— ওয়াক!! এসব ছুঁবো আমি? ছি ছি।

বলেই হাত সরিয়ে নিয়ে পাশ থেকে কাঠি মতো কিছু একটা নিয়ে নেড়েচেড়ে ভালো মতো মিশিয়ে নিলো। পরপর আবারও সন্তর্পণে রেখে দিলো তা। কাজ শেষ হতেই একটা লম্বা দম নিলো বনশ্রী। আহ!! এবার খুব শান্তি লাগছে। আনন্দের তোপে সেখানে দাঁড়িয়েই দুই পাক নেচে নিলো বনশ্রী। লোকটাকে জব্দ করার এতো মজা, ইসস!! মনটা একদম খুশি খুশি হয়ে যায়।

**********

মাস্টার বাড়িতে মোট তিন খানা ঘর। একটা বড়ো ঘর, মানে এক তলার মাঝারি আকারের ঘর, এটাতে রেজওয়ান থাকে। আর দুটোর মধ্যে একটা হচ্ছে রান্নার ঘর আর অন্যটি চিলেকোঠার ঘর। চিলেকোটায় আবার দুটো কক্ষ, এর মধ্যে একটাতে রান্নার লাকড়ি, ফেলে দেওয়া পুরোনো জিনিসপত্র, আরও নানান কিছু রাখা হয়। আর অন্য ঘরটাতে কাশেম মিয়া বসবার করেন। রেজওয়ান বর্তমানে সেই চিলেকোঠার ঘরে পুরোনো ময়লা-আবর্জনা যেখানে থাকে, ঠিক সেখানেই অবস্থান করছে, চোখে-মুখে বিরক্তি। খানিক আগে চারজন মহিলা হলুদ বাটা, মেহেদী বাটা নিয়ে মাস্টার বাড়িতে হাজির হয়েছিলো। খিটখিটে রেজওয়ান তখন তিক্ত কথা শুনিয়ে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে তাদের। তার একদমই এসব হলুদ মাখামাখি পছন্দ না। তার তো বিয়েই পছন্দ না। সেই সাথে ঐ দস্যি মেয়েটাকেও পছন্দ না। নেহাতই,, নেহাতই? নেহাতই বলতে কোনো অজুহাত খুঁজে পেলো না রেজওয়ান। মূলত সে নিজেও জানে না, ঐ দস্যি মেয়েটাকে সে কেনো বিয়ে করতে রাজি হলো? জানতেও চায় না। এসব জানাজানি কি তার সাথে যায়? একদমই না। ওদিকে মহিলাদের তাড়িয়ে দেওয়ার মিনিট ৪০ পর একজন দেওয়ান বাড়ির কর্মচারী এসে হাজির হলো রেজওয়ানের দোরগোড়ায়। হাতে ভাঁজ করা একখানা চিঠি, জানালো এটা নাকি দেওয়ান বাড়ির মেঝো মেয়ে তার নামে পাঠিয়েছে। তবে সেই চিঠিটাও গ্রহণ করেনি রেজওয়ান। আবার সেটা ফিরিয়েও দেয়নি, কাশেমকে ধমকে-ধামকে আদেশ ছুড়েছে যেনো এখনই চিঠিটা কর্মচারীর হাত থেকে নিয়ে চিলেকোঠার ঘরের ময়লার স্তূপের উপর ছুড়ে ফেলে আসে। কাশেম হচ্ছে মুনিবের বাধ্যগত কর্মচারী। সে কোনোদিনই রেজওয়ানের কথার বাহিরে এক পা এগোয়নি। অগত্যা রেজওয়ানের কথা মাফিক সেই চিঠির অবস্থান হলো চিলেকোঠার ঘরের ময়লার স্তূপে। অথচ দেখো, এই রাত বিরেতে খিটখিটে লোকটার কাণ্ড দেখো। কাশেম ঘরে নেই, সেই সুযোগে ময়লার স্তূপ থেকে কেমন কুড়িয়ে নিলো চিঠিটা। সেই চিঠির জায়গা হলো লুঙ্গির প্যাচে। এরূপ দৃশ্য যদি কারোর নজরে পড়ে, তখন কি খিটখিটে রেজওয়ানের মান-সম্মান থাকবে? ওহুম, একদমই থাকবে না। তাই তো খিটখিটে পুরুষটা নিজের কার্য সিদ্ধি করে চোখে-মুখে গম্ভীরতা ধরে রেখে কেমন গুটি গুটি পায়ে বেরিয়ে গেলো চিলেকোঠার ঘর থেকে। বেরিয়েই একটা লম্বা দম নিলো মানব। পরপর হনহন করে ঢুকে গেলো নিজের ঘরটায়। দুই-তিনটে কক্ষ পার হয়ে লাইব্রেরী ঘরটায় পৌঁছালো। এই ঘরের চারদিকে শুধু বই আর বই, তবে কোনো সাহিত্যিক, কাব্যিক, প্রেমময় বই নয়, সব একাডেমিক, ঐতিহাসিক, দার্শনিকদের রিসার্চকৃত তথ্য অনুযায়ী তৈরি হওয়া বই। এগুলোর মাঝেই দিন-রাত ডুবে থাকে মানব।

রেজওয়ান হনহন করে হেঁটে এসে জানালার পাশে রাখা আরামকেদারায় বসে গা হেলিয়ে দিলো। পরপর লুঙ্গির প্যাচ থেকে টেনে বের করলো দেওয়ান বাড়ির মেঝো মেয়ের দেওয়া চিঠিখানা। মেলে ধরতেই চোখ-মুখ কুঁচকে নিলো মানব, কপালের সেই চিরচারিত তিনটে ভাঁজ সহজেই স্পষ্ট ও গাড়ো হলো। এতোটা বাজে হাতের লেখা কারোর হয়? ছিহ!! কেমন আঁকা-বাঁকা কানা বগির মাথার মতো একেকটা অক্ষর। রেজওয়ান এই মুহূর্তে একটা বিষয় দারুণভাবে লক্ষ করলো। দেওয়ান বাড়ির মেঝো মেয়ের রূপ ব্যতীত প্রশংসা করার মতো কিছুই নেই। ভাগ্যিস সে বিয়ে করে নিচ্ছে, নয়তো এই হাতের লেখা দেখে কে বিয়ে করতো বেয়াদবটাকে? রেজওয়ান চোখে-মুখে বিরক্তি ধরে রেখেই চিঠিখানা পড়তে শুরু করলো। চিঠিতে কোনো সম্বোধন নেই, প্রিয় অপ্রিয়র জায়গা নেই, শুরুতেই লেখা—

মাস্টারের ঘরের মাস্টার, খাইষ্টার ঘরের খাইষ্টা, বেয়াদব লোক। রস-কষহীন খিটখিটে পুরুষ। আপনার এতো কিসের দেমাগ শুনি? আমার রূপ দেখেছেন? একদম ঝলসে দেওয়ার মতো সুন্দর আমি। পাড়ার প্রতিটি ছেলে আমার একটুখানি ইশারা পাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে। আর আপনি কিনা আমার থুত্ (শব্দটা কাটা) নামে পাঠানো হলদি প্রত্যাখ্যান করেছেন? কতো বড়ো স্পর্ধা? আপনাকে তো জেলে দেওয়া উচিত। না, না খুন করা উচিত।

আপনার আচার-আচরণ আমার একদম ভালো ঠেকছে না। প্রথমে আমার মতো সুন্দরী মেয়ে পেয়ে লোভ সামলাতে পারেননি আর এখন কিনা ভাব নিচ্ছেন? আমি আপনার কাছে কিছুতেই বিয়ে বসবো না, আপনি এখনই বিয়ে ভাঙুন, নয়তো আমি আজ রাতেই পালিয়ে যাবো। তারপর একটা সুন্দর নাঙ্গা পোঙ্গা ছেলে দেখে বিয়ে করে নিবো। এরপর এক গাদা বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে ফিরে এসে আপনার নাকের ডগা দিয়ে ঘুরে বেড়াবো। তখন নিশ্চয়ই আপনি কাঁদবেন? কাঁদুন আমার কি? আমি তো হাসবো। জামাইর বুকে মাথা রেখে তাকে জড়িয়ে ধরে হা হা করে হাসবো। কত্তো মজা হবে তাইনা? হুম!! আপনাকে দুঃখ পেতে দেখলে আমার ভীষণ মজা হবে। খাইষ্টা মাস্টারের নাতি।

এরপর আর কিছু লেখা নেই, চিঠি শেষ হতেই দাঁতে দাঁত চাপলো রেজওয়ান। বেয়াদবটা এইটুকু লেখা লিখেছে, এর মধ্যে ২৪টা বানান ভুল। এইজন্যই পরীক্ষায় পরীক্ষায় দু, চারটে ফেল আসে। আর এই ফেল্টুস মেয়েটাকেই কিনা তার মতো একজন প্রাক্তন ভালো ছাত্র, বর্তমান বিজ্ঞ শিক্ষক এবং সারাদিন বইয়ে মুখ গুঁজে রাখা রেজওয়ান মাস্টার বিয়ে করছে। কী মজার ব্যাপার!! অন্যদের কাছে কতোটা মজার সেটা জানা নেই, তবে রেজওয়ানের কাছে একটুখানিও মজা লাগলো না। সেই সাথে আফসোসও করলো না। আফসোস করলে কী হবে? কেউ তো আর তার পায়ে কুড়াল মারতে আসেনি, সে নিজেই গিয়েছে কুড়ালের উপর পা মারতে। ভেবেই তপ্ত শ্বাস ফেললো মানব। পরক্ষণেই ভ্রু যুগল কুঁচকে এলো। মেয়েটা কী বললো? পালিয়ে গিয়ে কাকে বিয়ে করবে? সুন্দর নাঙ্গা পুঙ্গা ছেলেকে? কিন্তু এই নাঙ্গা পুঙ্গাটা আবার কী? এর আগে তো সে এরকম শব্দ শুনেনি। জীবনে এতো এতো বই পড়লো, কই কখনো তো এরকম শব্দ সে পায়নি? এটা কি কোনো আঞ্চলিক শব্দ? হতে পারে, হয়তো রেজওয়ান এর আগে শুনেনি, তাই জানে না। কিছু একটা ভেবে এবার হাঁক পেরে ডাকলো রেজওয়ান— আকবর!! আকবর!! একটু শুনে যা।

আকবর হচ্ছে রান্নার লোক, কাজে যুক্ত হয়েছে মাস খানিক হবে। রেজওয়ান মানুষটা খিটখিটে হওয়ায় রান্নার লোক বেশিদিন স্থায়ী হয় না। মাস পেরুলেই বেতন নিয়ে একপ্রকার পালিয়ে বাঁচে সকলে। যার দরুন মাসে মাসেই রান্নার লোক পাল্টাতে হয় তাকে। মুনিবের ডাক শুনে একপ্রকার হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো আকবর। বেচারা মাত্রই রাতের রান্না শেষ করে খাবার ঘরে এনেছিলো, যার দরুন শরীরটা ঘেমে রয়েছে। আকবর ছুটে এসে রেজওয়ানের সামনে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে সুধালো— মাস্টার সাব, কন কি কইবেন।

রেজওয়ান কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো, তবে তা বেশিক্ষণ টিকলো না তা, মুখটা গম্ভীর করে সুধালো— আকবর, নাঙ্গা পোঙ্গা মানে কিরে? জানিস?

আকবরের মুখে এরূপ শব্দ শুনে খুক খুক করে কেশে উঠলো আকবর। আমতা আমতা করে বললো— আপনে জানেন না সাব?

আকবরের কাণ্ডে ভ্রু গুটালো রেজওয়ান, চোখের ইশারায় না করে তিক্ত কণ্ঠে সুধালো— জানলে তকে জিজ্ঞেস করতাম? হাদারামের বাচ্চা?

মুনিবের ধমকে কিছুটা ভয় পেলো আকবর। অনেকটা সময় নিয়ে আমতা আমতা করে বিষয়টা খুলে বললো। বিষয়টা বুঝে আসতেই রেজওয়ানের রাগ বাড়লো। মেয়েটা তো ভারি বেয়াদব, সাথে অসভ্যও। তাকে কিনা এরকম একটা শব্দ লিখে চিঠি পাঠিয়েছে? আসলেই বেয়াদবটার কোনো লজ্জা-শরম নেই।

*******

রাত তখন ২টা বেজে ১৭ মিনিট। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করেও ঘুমের দেখা পাচ্ছে না রুপা। সে নিজের বাড়ি, নিজের বিছানা ব্যতীত অন্য কোথাও থাকতে পারে না, অস্বস্তি হয়, ঘুম হয় না। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। শুরুতে টুকটাক ঘুম পেলেও রাত একটু বাড়তেই চোখের ঘুমগুলো কেমন কর্পূরের ন্যায় উবে গেলো। অথচ পাশে শুয়ে থাকা বন্যটা বেশ আয়েশেই ঘুমাচ্ছে। বন্যটার ঘুমে হাত-পা ছোড়ার অভ্যাস রয়েছে, ফলস্বরূপ ইতিমধ্যে তিন-চারটা লাথি খাওয়া হয়ে গিয়েছে রুপার। এই কারণে আরও ঘুম হচ্ছে না তার। একটু চোখ লেগে আসতেই বন্যর লাথি, কিল, ঘুষি খেয়ে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। ঘুম না ধরায় এই পর্যায়ে উঠে দাঁড়ালো রুপান্মিতা। রুমে খানিক হাঁটাহাঁটি করলো, শরীরটাও কেমন ম্যাজম্যাজ করছে। অনেক ভেবে ঠিক করলো নিচে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে আসবে। হাত-মুখ ধুয়ে এলে হয়তো একটু প্রশান্তি মিললেও মিলতে পারে। আর সেই প্রশান্তিতে ঘুম হলেও হতে পারে। ভেবেই বাহিরের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো কিশোরী।

রুপান্মিতা ধীরলয়ে ঘর থেকে বের হয়ে করিডোর ধরে নিচের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিলো। হাঁটতে হাঁটতে সিঁড়ির কাছে এসে পৌঁছাতেই আকস্মিক কারোর কান্নার শব্দ শুনে পা যুগল থমকে গেলো তার। একটা মেয়ে কেমন গুনগুন করে কাঁদছে, আর এই কান্নার শব্দটি ধেয়ে আসছে দেওয়ান বাড়ির দক্ষিণ প্রান্ত হতে। অর্থাৎ আরবিদ দেওয়ানের ঘর যেদিকে, তার শেষ প্রান্ত হতে। অথচ ওদিকটায় কেউ থাকে না। থাকার কথাও না। রাতে নিবেদিতা যখন তাকে দেওয়ান বাড়ি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলো, তখন তো বলেছিলো ওদিকটায় কেউ যায় না। ওদিকটায় কেউ থাকে না, এমনকি ওদিকে পা বাড়ানো বড়ো ভাইজান পছন্দ করে না। তাহলে ওদিকটায় এভাবে কাঁদছে কে? রুপান্মিতার কেমন সন্দেহ হলো। সে সেদিকে দু-কদম এগিয়ে গভীর মনোযোগে কান পাতলো। মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে গুনগুন করে কিসব যেনো বলছে। রুপার কেমন ভয় হলো। সে জীবনে বহুবার শুনেছে জমিদার বাড়িতে ভূত-প্রেতের বসবাস থাকে। বন্যদের বাড়িতেও এমন কোনো ব্যাপার রয়েছে কি? ভেবেই ভীতু হলো মেয়েটা। পরক্ষণেই মনের মাঝে অদ্ভুত রকমের একটা কৌতূহল জাগলো। কে কাঁদছে সেটা একবার পরখ করে দেখার ইচ্ছা জাগলো মন পুটে। অগত্যা ধীরে ধীরে পা বাড়ালো সেদিকে।

আরবিদ দেওয়ানের ঘর পর্যন্ত হারিকেনের আলো থাকলেও এর পর থেকে পুরো করিডোর, এমনকি বাড়িটাও অন্ধকারে মোড়ানো। শত খুঁজলেও এক টুকরো আলোর সন্ধান পাওয়া যাবে না। রুপান্মিতা যত কদম বাড়াচ্ছে, ততোই অন্ধকার বাড়ছে, সেই সাথে ভয়াতুর হয়ে উঠছে বাড়িটি। রুপান্মিতা অনুভব করলো, সে যতো এগুচ্ছে, কান্নার শব্দ ততো দূরে সরে যাচ্ছে। এই পর্যায়ে রুপার ভয় বাড়লো। আকস্মিক অনুভব করলো, তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে কেউ। তড়িৎ গতিতে পিছু ফিরে চাইলো রুপা, তবে কাউকেই দেখতে পেলো না। মনের ভুল ভেবে আবারও ঘুরে দাঁড়িয়ে সামনের দিকে হাঁটা দিলো। দু-কদম এগুতে পারেনি মেয়েটা, তৎক্ষণাৎ রুপার হাত টেনে ধরলো কেউ। এই পর্যায়ে নিজেকে সামলাতে পারলো না মেয়েটা। ভয়ার্ত কণ্ঠে চিৎকার করে আওড়ালো— মাগো!!

তৎক্ষণাৎ অনুভব করলো, তার হাত ধরে টানছে কেউ। রুপান্মিতা আটকাতে পারলো না, কেমন সংকিত পায়ে হেঁটে গেলো সামনের মানুষটার পিছু পিছু। লম্বা-চওড়া গড়নে অবয়বটি ওকে টানতে টানতে আলোকিত জায়গায় এনে দাঁড় করাতেই স্তম্ভিত হয়ে পড়লো রুপা। কিছু বলতে নিবে তার আগেই ধমকে উঠলো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানব— এই মেয়ে, কে তুমি? এখানে কি করছো?

বন্যর বড়ো বাবা অর্থাৎ মাহমুদুল দেওয়ান ভ্রু কুঁচকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এমন দৃষ্টিতে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে আমতা আমতা করে উত্তর করলো কিশোরী। — আমি রুপান্মিতা, বনশ্রীর বান্ধবী। ওই ঘর থেকে কেমন কান্নার শব্দ আসছে, তাই।

রুপান্মিতার প্রথম কথায় ভ্রু শিথিল হলেও শেষের কথায় ভ্রু যুগল তীব্রভাবে গুটিয়ে নিলেন মাহমুদুল দেওয়ান। কেমন সন্দেহী কণ্ঠে সুধালো— কোথায় কান্নার শব্দ? কে কাঁদছে?

মাহমুদুল দেওয়ানের প্রশ্ন শুনে তড়িৎ পিছু ফিরে চাইলো রুপান্মিতা। কই নাতো, কোনো কান্নার শব্দ আসছে না। তাহলে? এতোক্ষণ যে সে শুনেছিলো, সেটা কি? তবে কি সে ভুল শুনেছে? একদমই না। এসব ভুলভাল শোনার রোগ তো তার নেই। আর না, এতোটা সময় ভুলভাল শোনা সম্ভব। রুপান্মিতার ভাবনার মাঝেই মাহমুদুল দেওয়ান শান্ত স্বরে আওড়ালেন— রাত অনেক হয়েছে, ঘরে যাও।

কথাটা শান্ত স্বরে বললেও মানবের চোখে-মুখে ছিলো শক্ত ও দৃঢ়তার ছাপ স্পষ্ট। রুপান্মিতা ভয় না পেলেও সম্মান দেখানোর খাতিরে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। এগিয়ে গেলো বন্যর ঘরের দিকে।

********

সময়টা ভোরের শুরুতে। দিনটা গতদিনের তুলনায় আরও খানিকটা ঘোমট, ভোর হওয়া সত্ত্বেও আলো ফোটেনি, কুয়াশার আবরণে অন্ধকারচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে ধরণি। বারান্দা হতে সদ্য ফোটা নয়নতারা, সুইট অ্যালিসাম ও ফ্রিজিয়া ফুলের ঘ্রাণে ঘরের চারিপাশ ম-ম করছে। এই ফুলের চারা গুলো সচরাচর পাওয়া যায় না। এই তো এক-দেড় বছর আগের কথা, হুট করেই দেওয়ান বাড়িতে একজন সাহেব মতো লোকের আগমন ঘটলো, জানালো আরবিদ দেওয়ানের সাথে দেখা করতে এসেছে। এসে দেওয়ান বাড়িতে দুদিন থেকেও ছিলো, তবে লোকটা অতিথিশালা আর আরবিদ দেওয়ানের ঘর ব্যতীত অন্য কোথাও পা রাখেনি। কথা-বার্তা যা বলার, সময় কাটানোর আরবিদ দেওয়ানের সাথেই কাটিয়েছে। এরপর যেদিন লোকটা চলে গেলো, তার পরদিন আরবিদের বারান্দায় এই অজানা ফুলের চারাগুলো দেখেছিলো কাব্য। ইনিয়ে-বিনিয়ে বহুবার প্রশ্ন করার পর জানতে পেরেছিলো এগুলোর নাম নাকি সুইট অ্যালিসাম ও ফ্রিজিয়া। ফুলগুলো বেশ পছন্দ কাব্যশ্রীর, ঘ্রাণগুলো আরও বেশি পছন্দ। যার দরুন ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ দিয়ে এসে কাব্যশ্রীর শান্ত ঘুমটাকে আরও শান্তিময় করে তুলেছে।

গতকাল রাতে কাব্যশ্রী জামা-কাপড় নিয়ে কলপাড়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ বাদেই নাকি শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন দেওয়ান বাড়ির বড়ো ছেলে। বিষয়টা নিয়ে কাব্যশ্রীর কী যে দুঃখ হলো। যাওয়ার পথে তার সাথে একটুখানি দেখা করেও যায়নি। চোখাচোখিও হয়নি দুজনার। অন্যদিন হলে আরবিদ কথা বলুক আর না বলুক, কাব্যশ্রী ঠিকই লোকটা বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগ পর্যন্ত দূর থেকে তাকিয়ে থাকতো। লোকটা তখন যাওয়ার পথে একবার হলেও রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকে শাসাতো। অথচ এই কাপড় ধোয়ার চক্করে আজ সেই শাসনটুকুও পাওয়া হলো না। এক নজর চোখাচোখিও হলো না, কিছুই হলো না। এই কিছু না হওয়ার ব্যাপারটাই বড্ড পীড়া দিয়েছে কাব্যকে। ফলস্বরূপ চোখের পানি নাকের পানি এক করে কাঁদতে কাঁদতে সবগুলো কাপড় কেচেছে। এদিকে কাপড় কাচতে কাচতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামলো, তাও কাব্যর কাপড় কাচা ফুরালো না। এর মধ্যে যে যতোবার কলপাড়ে এসেছে, ততোবার কাব্যকে পাগলের তকমা দিয়েছে। এতে কাব্যশ্রীর এক টুকরো দুঃখ নেই, পাগল না হয়ে পাগলের মতো ভালোবাসবে কী করে? কাব্য তো পাগলই, দেওয়ান সাহেবের পাগল। ভবিষ্যতে সে আরও পাগল হবে, পাগল হতে হতে একেবারে পাগলের মাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।

আরবিদ বোধহয় কাব্যশ্রীকে শাস্তি দিবে বলেই এতো গুলা ধোয়া কাপড় আবার ধুতে বলেছে। নয়তো অকারণে কেউ এতো কাপড় ধুতে দেয়? ধোয়ার বেলায় কাব্যশ্রী গুনে দেখেছে ১৩টা পাঞ্জাবী, ৮টা লুঙ্গি, ১১টা শাল ধুতে দিয়েছে। আরবিদ দেওয়ান মানুষটা শৌখিন, বড্ডো সুনিপুণ, তার একেকটা শাল কাশ্মীর থেকে যত্ন করে বানিয়ে আনা হয়। ফলস্বরূপ একেকটা শালের ওজন বেশ ভারি। লুঙ্গি আর পাঞ্জাবীগুলো কোনো রকমে কেচে দিলেও শালগুলো কাঁচার বেলায় বেশ কসরত করতে হয়েছে কাব্যকে। হাত দুটো লাল হয়ে গিয়েছে, কনুই থেকে শিরদাঁড়া পর্যন্ত প্রতিটি হাড় ব্যথায় হিম হয়ে এসেছিলো। ফলস্বরূপ ক্লান্ত কাব্যশ্রী বারান্দায় কাপড়গুলো মেলে দিয়ে আরবিদের বিছানায় একটুখানি বসেছিলো। সেই বসা থেকে কখন শুয়ে পড়লো আর শোয়া থেকে ঘুমিয়ে পড়লো বুঝতেই পারলো না বেচারি। আপাতত মেয়েটা পরম আবেশে আরবিদের বিছানায় হাত-পা গুটিয়ে শুয়ে আছে। একটা হাত মাথার নিচে, অন্য হাতটি বিছানায় ছড়িয়ে রাখা। ডান পাটা বাঁকা করে বাম পায়ের নিচে গোটানো, বাম পাটা সোজা করে রাখা। এরকম এক পা গুটিয়ে অপর পা সোজা করে রাখার ফলে পরনের শাড়িটা খানিক উপরে উঠে রয়েছে, ফলস্বরূপ অতিব ফর্সা গড়নের পা জোড়া খানিক উন্মুক্ত। লম্বা চুলগুলো এলোমেলো, আংশিক চুল বালিশের উপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে আর বাকিটা জায়গা দখল করেছে চোখে-মুখের উপরিভাগে। গায়ে দেওয়ার ল্যাপটা পড়ে আছে মেঝেতে, ঘুমের মাঝে হাত-পা ছোড়ার অভ্যাস থাকায় কোন ফাঁকে যে উপরে থাকা ল্যাপটা লাথি মেরে ছুড়ে ফেলেছে, নিজেও জানে না।

মুখের উপর কেউ ঝুঁকে আছে, এমন অনুভূতি হতেই ঘোঁঙিয়ে উঠলো কাব্যশ্রী। আড়মোড়া ভেঙে চোখ মেলে তাকাতেই অনাকাঙ্ক্ষিত একটা মুখ দেখে বোকা বনে গেলো মেয়েটা। আরবিদ দেওয়ান চোখ ছোট ছোট করে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। হয়তো বুঝতে চাইছে, সে তার ঘরে, তার বিছানায় কী করছে। অথচ কাব্যশ্রীর তাতে মন নেই, সে এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে মানবের পানে। ইদানীং কিছু কিছু ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে হলেও কাব্যশ্রীর মনপুত হচ্ছে, এই যে ঘুম থেকে উঠেই লোকটার মুখ দেখতে পাওয়া। এটা তো কাব্যর বহুদিনের সাধ, সে চোখ মেলে তাকিয়েই দেওয়ান সাহেবের সুন্দর কাননে নজর স্থির করবে। অথচ এই ঘটনাটি আয়োজনকৃত নয়, বরং অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ঘটে গিয়েছে। কাব্যশ্রীর মাথায় একখানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেলো। লোকটার তো কাল বিকালে ফেরার কথা ছিলো, তাহলে এই সকাল-সকাল এখানে কী করছেন উনি? কাব্যশ্রীর মনে জমা প্রশ্নটুকু কাব্যর মুখ থেকে বেরুনোর সুযোগ পেলো না, তা বের হলো গম্ভীর লোকটার কণ্ঠ ভেদ করে—

— আমার ঘরে কী করছো তুমি?

আরবিদের এহেন প্রশ্নে সম্বিত ফিরে পেলো বোধহয় মেয়েটা। কেমন হকচকিয়ে গিয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে অনুভব করতে চাইলো, সে মূলত কার ঘরে আছে। যখন বুঝলো সে দেওয়ান সাহেবের ঘরে ঘুমিয়েছে, তখনই তরাক করে উঠে বসলো মেয়েটা। উঠে বসতেই অনুভব করলো তার পায়ের কাছের শাড়ি এলোমেলো হয়ে উপরে উঠে পড়েছে, মুহূর্তেই সেটা টেনে ঠিক করে আরবিদের দিকে তাকালো কাব্যশ্রী। নাহ, লোকটা সেদিকে তাকায়নি, লোকটা তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু সে যখন ঘুমে ছিলো, তখন? তখন তাকিয়েছে কি? না না, একদমই তাকায়নি, লোকটা তো ওরকম লোকই না। ভেবেই খানিক স্বস্তি পেলো কিশোরী, লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে দেওয়ান সাহেবের দিকে তাকালো। লোকটা এখনো ভ্রু কুঁচকে উত্তরের আশায় তাকিয়ে রয়েছে। কাব্যশ্রী কেমন অপ্রস্তুত কণ্ঠে আওড়ালো—

— ঐ আরকি, মানে কাপড় বারান্দায় দিয়ে ক্লান্ত লাগছিলো, কখন ঘুমিয়ে গিয়েছি বুঝতে পারিনি।

বিষয়টা নিয়ে ঘাঁটালো না মানব, চট করেই গায়ের শালটা মেঝেতে ছুড়ে ফেলে পাঞ্জাবীটা খুলতে খুলতে তাড়া দিয়ে বললো—

— সরো।

আরবিদের ধমক কিংবা প্রতিক্রিয়া না পেয়ে হতভম্ব হয়ে পড়লো কাব্য, বোকা কণ্ঠে সুধালো—

— হুম?

বিরক্ত হলো আরবিদ, চোখ-মুখ কুঁচকে ফ্যাসফ্যাসে গলায় সুধালো—

— নামো, ঘুমাবো আমি। নাকি ঘুমাবে আমার সাথে?

আরবিদের ঠোঁট ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা বাক্যটা যেনো কাব্যর বুকে তীরের মতো বিধলো, তীব্র শিহরণে কেঁপে উঠলো অন্তর। চোখ-মুখ খিঁচে দ্রুত গতিতে বিছানা ছাড়তে ছাড়তে আওড়ালো—

— ছি!! আমি কখন বললাম সেটা?

আরবিদ উত্তর করলো না। কাব্যশ্রী বিছানা থেকে নেমে দূরে দাঁড়াতেই আরবিদ একপ্রকার আছড়ে পড়লো কাব্যশ্রী যেখানটায় শুয়েছিলো, সেই জায়গাটায়। এক হাতে খামচে ধরেছে মাথায় থাকা বালিশটা, পরপর সেই বালিশে মুখ গুঁজে দিলো। বিষয়টা নীরব চোখে দেখে গেলো কাব্য, ভিতরটা কেমন হাঁসফাঁস করছে। সে যেই জায়গাটাতে শুয়েছিলো, দেওয়ান সাহেব সেই জায়গাটাতেই কেনো শুলো? অন্যপাশটাতো খালিই ছিলো। সেখানে কেনো গেলো না? কাব্যশ্রীর হাঁসফাঁস বাড়লো, আর এক মুহূর্তও দাঁড়াতে পারলো না সেখানে।

***************

খানিক আগে সকলের খাওয়া-দাওয়ার পাঠ চুকেছে। এতোটা সময় বরই ব্যস্ত ছিলো কাব্য, মাকে, চাচিকে এটা-ওটা এগিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে কার কখন কী লাগছে সেটাও লক্ষ করতে হয়েছে। এর মধ্যে মেহেদী দেওয়ার সময় হয়ে উঠেনি। ওদিকে সবাই যে যার মতো করে হাতের তালুতে মেহেদী দিয়ে হাত রাঙিয়ে রেখেছে। তার বুঝি দিতে ইচ্ছা করে না? কাব্যশ্রী অনুভব করলো, বন্য আপার বিয়েটাতে সবাই আনন্দ করতে পারলেও তার ভাগ্যে আনন্দ বলতে কিছুই জুটেনি। কাল রাত পর্যন্ত কাপড় ধুলো, সকাল পর্যন্ত ঘুমালো আর এখন সকাল থেকে কাজ করতে করতে আনন্দ করার সময়ই পাওয়া হলো না। অগত্যা কাজ-বাজ সেরে নিজ ঘরে মনমরা হয়ে বসে ছিলো মেয়েটা। কাব্যশ্রীর এই মন ভার করার বিষয়টা লক্ষ করেছে মেঘশ্রী, তাই আবারও নতুন করে লোক পাঠিয়ে মেহেদী পেড়ে এনে মহিলা দিয়ে বাটিয়ে খুব সুন্দর করে লেপ্টে দিয়েছে কাব্যর হাতের তালুতে। বলেছে, শুকানোর আগ পর্যন্ত যেনো রেখে দেয়। বড়ো আপার কাণ্ডে বরই খুশি হয়েছে কাব্য, সেই সাথে গতদিনে এক টুকরো আনন্দ করতে না পারার আক্ষেপটাও যেনো এক লহমায় মিলিয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে নিচ থেকে খবর এলো, এই মুহূর্তে নাকি বাড়ির মেয়ে-বউরা মিলে নদীর ঘাট থেকে কলস দিয়ে পানি আনতে যাবে। বিষয়টা নিয়ে আগে থেকেই বেশ আশাবাদী ছিলো কাব্যশ্রী, কারণ সে চাইলেও কালে-ভাদ্রে একবারের জন্য নদীর ঘাটে যেতে পারে না। তার জন্য বিষয়টা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কাব্যশ্রীর এখনো স্পষ্ট মনে আছে। তার যখন ৮ বছর বয়স, তখন পাড়ার বান্ধবীদের সাথে একবার নদীতে গোসল করতে গিয়েছিলো। কতই না মজা হয়েছিলো সেদিন, সেই মজার তোপে কাটায় কাটায় চার ঘণ্টা গোসল করে দুপুরের পরপর বাড়ি ফিরেছিলো। বাড়িতে ফিরতেই দেখতে পেলো বাড়ির সকলে রেগে-মেগে একশা। কাব্যশ্রীর কী যে ভয় হলো, মেয়েটা মা-চাচিদের ভয়ে দরজার পাশে এক কোণে চুপটি মেরে দাঁড়িয়ে থেকে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছিলো। এর মধ্যে আরবিদ দেওয়ান কত থেকে যেনো রেগে-মেগে হনহন করে বাড়িতে ঢুকলো। বাড়িতে ঢুকতেই কাব্যশ্রীকে দরজার পাশে চুপটি করে দাঁড়িয়ে কাঁদতে দেখে তেড়ে মেরে এসে দুহাতে বাহু চেপে ধরে উপর তুলে আছাড় দিতে নিয়েছিলো। ভাগ্যিস সেদিন সে দেওয়ান সাহেবের গলা জড়িয়ে লটকে ছিলো, নয়তো এই ছোটখাটো কাব্যশ্রীটা তখনই দাবাং আছাড় খেয়ে নিচে পড়ে টুপ করে মরে যেতো। সেদিন আরও একটা অভাবনীয় কাজ করেছিলো কাব্যশ্রী, আরবিদ দেওয়ানের উন্মুক্ত গলায় মুখ গুঁজে মা মা বলে হাওমাও করে কেঁদেছিলো, ফলস্বরূপ নাকের পানি চোখের পানি সব মিশে গিয়েছিলো মানবের গলা ও পাঞ্জাবীতে। সে নিয়ে অবশ্য কাঠখোট্টা লোকটা তেমন কিছু বলেনি।

অতীতের এক ঝলক মনে আসতেই লজ্জায় লাল হয়ে গেলো কাব্যশ্রী। ইসস!! কিসব করেছিলো সে। এখন ভাবতে গেলেই কেমন দম আটকে আসার যোগাড় হয়ে উঠছে।

ভাবতে ভাবতে আকস্মিক নদীতে যাওয়ার কথা মনে আসতেই সেসব লজ্জা-শরমের ভাবনা দূরে সরিয়ে নিজেকে ঠিক করে নিলো কাব্য। কোনো রকম নিজের লাল হওয়া গালদ্বয়কে সামলে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে নিচে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই তৎক্ষণাৎ নিজের ঘর থেকে বের হলো আরবিদ। সহসাই চোখাচোখি হলো দুজনার। মানবের চোখ-মুখ ভারি, মাত্রই ঘুম থেকে উঠেছে বোধয়। হাতে লুঙ্গি, কাঁধে গামছা, হয়তো গোসল করতে যাবেন। কাব্যশ্রী হাঁটতে হাঁটতে এক ধ্যানে তাকিয়ে রইলো। তবে আরবিদের তাকিয়ে থাকাটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। লোকটা খানিক তাকিয়ে থেকেই চোখ সরিয়ে নিয়ে হনহন করে এগিয়ে আসতে নিলো, কাব্যশ্রীর কদম ধীর, সে আপাতত লোকটার সামনে পড়তে চায় না। সামনে পড়লে যদি জানতে চায় কোথায় যাচ্ছে আর জানতে পেরে যদি মানা করে দেয়, তাহলে শেষ আনন্দটুকুও তার করা হবে না। অথচ মানবের অবস্থা দেখো, উঠোনে হুল্লোড়ের শব্দ শুনে ভ্রু কুঁচকে একবার কাব্যর দিকে তাকালো, পরপরই সিঁড়িগোড়ায় এসে দাঁড়িয়ে পড়লো। দৃষ্টি কাব্যর দিকেই স্থির, নিশ্চয়ই তার জন্য অপেক্ষা করছে? ভেবেই মনে মনে ঠোঁট উল্টালো মেয়েটা। যা ভয় করেছিলো তাই সই, আজকে আর তার আনন্দ করা হবে না। আরবিদকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কাব্যশ্রী এবার পায়ের কদম বাড়ালো। একপ্রকার হন্তদন্ত পায়ে এসে আরবিদের সামনে দাঁড়ালো। মুহূর্তেই গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করলো মানব—

— কোথায় যাচ্ছো?

বাধ্য পুতুলের ন্যায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে নিলো কাব্য, নরম কণ্ঠে আবদারের স্বরে আওড়ালো—

— সবাই নদীতে পানি আনতে যাবে, আমিও যেতে চাই।

তৎক্ষণাৎ আবারও প্রশ্ন ছুড়ে দিলো মানব—

— অনুমতি দিয়েছে কে? যাওয়ার?

— সবাইই তো যাচ্ছে, নিবেদিতাও তো যাচ্ছে।

— তুমি কি নিবেদিতা?

কাব্যশ্রী দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না করলো। আরবিদ এবার শান্ত অথচ শক্ত কণ্ঠে আওড়ালো—

— তাহলে ঘরে যাও।

এই পর্যায়ে চোখ তুলে তাকালো কাব্যশ্রী। মনে খানিক জেদ চেপে আরবিদের মুখের উপর বলে বসলো—

— এমন করছেন কেনো? আমি কি একটু আপার বিয়েতে আনন্দ করতে পারি না?

বাক্য ফুরাবার আগেই একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে গেলো কাব্যর সাথে। ঘটনাটা অনেক সময় নিয়ে ঘটেনি, এই তো সেকেন্ড খানিকের মতো হবে, অথচ এই সেকেন্ডের ঘটনায় কেমন তব্দা খেয়ে গেলো মেয়েটা। তড়িৎ চোখ বাঁকিয়ে তাকালো সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকা পাষাণ মানবের পানে। মুখ জোড়া কেমন শক্ত করে রেখেছে দেখো, কতোটা স্বাভাবিকভাবে হেঁটে যাচ্ছে, অথচ স্বাভাবিক নেই কাব্যশ্রী, বাক্যহারা হয়েছে সে, নিশ্বাস হয়েছে ভারি, কাঁধের কাছটায় এখনো যেনো একটা শীতল হাতের স্পর্শ টের পাচ্ছে কিশোরী। আরবিদ দেওয়ানের একটা মারাত্মক রোগ রয়েছে, সে অগোছালো কোনো কিছু সহ্য করতে পারে না। অগোছালো কোনো কিছু দেখলেই সেটা ঠিক করানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠে, যদি অন্য কাউকে দিয়ে ঠিক করানো সম্ভব না হয়, তখন সে নিজেই ঠিক করে নেয়। হয়তো কোনোভাবে কাব্যশ্রীর কাঁধ থেকে কিছুটা শাড়ি সরে গিয়েছিলো। সেটাই হয়তো আরবিদের নজরে পড়েছিলো। গম্ভীর লোকটা কেমন আগ-পিছ না ভেবেই শাড়ির অংশটুকু টেনে উপরে তুলে দিলো। ফলস্বরূপ লোকটার শীতল আঙুলগুলো ছুঁয়ে গিয়েছে তার কাঁধের অংশ। মুহূর্তেই পাথর বনে গিয়েছিলো মেয়েটা। অথচ মানবকে দেখো, কত্তো নির্বিকার, যেনো কিছুই হয়নি। লোকটা কি বুঝতে পারছে না? তিনি ঠিক কী করেছেন? এটা করা কি ঠিক হলো? কাব্যশ্রী অনুভব করলো তার লজ্জার পরিমাণ বাড়ছে, শরীরটা কেমন অসার হয়ে আসছে। নাহ!! ভালো লাগছে না, মাথা ঘুরছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, সাথে হাত-পাও কাঁপছে মনে হয়। এই অবস্থা নিয়ে আর এক পা-ও বাড়াতে পারবে না কাব্যশ্রী, অগত্যা ধপ করে বসে পড়লো সেখানেই। ওদিকে লোকটা হনহন করে হেঁটে সদর দরজা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে, সদর দরজা আর সিঁড়ি মুখোমুখি হওয়ায় কাব্যশ্রী সরাসরি দেখতে পাচ্ছে তা। আরবিদ যখন সদর দরজা বেয়ে করে বাহিরে পা রাখতে নিবে, তখনই বাড়িতে ঢুকলো আরহান সাথে মেহরাব। মেহরাবের দিকে নজর পড়তেই আরবিদ কেমন তড়িৎ গতিতে পিছু ফিরে চাইলো, কাব্যশ্রী তখনো মানবের গমনপথে তাকিয়ে। চলতি পথে অমন থেমে গিয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাতে দেখে সচেতন হলো কাব্য। আরবিদ দেওয়ান তার দিকে শক্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চোখের ইশারায় ঘরে যেতে বলেছে। কাব্যশ্রীর কী হলো কে জানে? মেয়েটা কেমন হুরমুরিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে এক ছুটে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলো। একবারও জানতে চাইলো না আরবিদ কেনো তাকে চলে যেতে বলছে? এমনকি দ্বিমতটুকুও করলো না।

চলবে,,,,,

কেমন হয়েছে বলে যাও। একটু বড়ো করে গল্প বিষায়ক কমেন্ট করো। ঠিক আছে?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন