#জল_তরঙ্গে——#পর্বঃ৭
লেখিকা—#ইরফা_মাহনাজ
__________________
(গল্প ভালো লাগলে রেসপন্স করবেন।)
❌কপি করবেন না ❌
"প্রবাহ নীড়" নানা রঙের লাল, নীল আলোকে সজ্জায় সজ্জিত করা হয়। মানুষের সমাগমে মুখরিত চারপাশ। মেহেন্দি অনুষ্ঠানের পরে এনগেজমেন্ট ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত।
মূলত তরঙ্গ জাহাজে থাকাকালীনই এনগেজমেন্ট সারা হয়। এর বড়রা গিয়ে তন্দ্রাকে আংটি পড়িয়ে আসে। তবে তরঙ্গ বাড়ি আসতেই তন্দ্রা ইচ্ছা প্রকাশ করে সে তরঙ্গের হাত দিয়েই আংটি পড়বে।
তরঙ্গ বাড়ি আসে মেহেদী অনুষ্ঠানের আগে। এ কারণে মেহেদী অনুষ্ঠানের পর আজকের এই এনগেজমেন্ট সেরেমনি। গুঞ্জন-তরঙ্গের বিয়ের পরের দিন গুঞ্জনের হাতে তরঙ্গের পরিয়ে দেওয়া আংটি দেখে তন্দ্রা।
সেই থেকে ওর ভিতর তরঙ্গের হাত থেকে আংটি পড়ার জিদ চাপে। তবে নিয়তি যে আসলে কি? আর সৃষ্টিকর্তা কার কপালে কি লিখে রেখেছেন সেটা কেবল তিনিই জানেন।
হঠাৎ প্রবাহ নীড়ের মূল ফটকটা ভারি হয়ে গেলো। থেমে গেলো আশেপাশের গুঞ্জন। তির্যক এক আলো সেথায় জায়গা করে নিলো। মুহূর্তেই পরিবেশ বদলে থমথমে হয়ে গেলো।
কয়েক জোড়া চোখ বিদ্ধ হলো ব্র্যান্ড নিউ ওয়াই এস এলের এক জোড়া হিলের দিকে। ফর্সা পায়ে চকচক করছে। ঠক ঠক আওয়াজে জুতোর মালকিন পা সামনে হাটছে।
শকুনির মতো নজর তাক করে আছে তন্দ্রা গুঞ্জনের দিকে। মেয়েটা তার আজীবন শত্রই থেকে যাবে। সে যাকগে। কিছুএকটা ভেবেই বাঁকা হাসলো। গুঞ্জনকে অপমান করার ফন্দি এঁটে সামনে এগোয়। মুখোমুখি দাড়ায় তার তন্দ্রা।
--- গুঞ্জন? তরঙ্গের এক্স ওয়াইফ। ঠিক বললাম না?
--- তুমি তো তন্দ্রা? যার আমার ইউজড জিনিস পছন্দ। ঠিক বলেছি না?
ইউজড কথাটা গুঞ্জন তরঙ্গের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলে। যার দৃষ্টি তন্দ্রা আর গুঞ্জনের দিকেই। নিশ্চপ্রভ চাহুনি তাক করে আছে।
এতক্ষন পার্টির পরিবেশ স্বাভাবিক থাকলেও গুঞ্জন আর তন্দ্রাকে মুখোমুখি দাঁড়াতে দেখেই উপস্থিত সবার কৌতূহলের শেষ নেই। যেনো কোনো সিনেমার শুট।
আর হবেই না কেনো। এক্স আর প্রেসেন্ট একসাথে উপরন্তু বাঙালি জাতি একটু বেশিই কৌতূহল প্রজাতির। একেকজন মুখিয়ে আছে নাটক দেখার অপেক্ষায়।
এতক্ষন তরঙ্গ আর তন্দ্রা সবার আকর্ষণ হলেও এনগেজমেন্ট অনুষ্ঠানে গুঞ্জনের এন্ট্রি পুরো ব্যাপারটাই ঘুরিয়ে দিয়েছে।
এখন মূল কেন্দ্রবিন্দুতে দাড়িয়ে আছে তন্দ্রা এবং গুঞ্জন। সেই সাথে তন্দ্রার কথা শুনে আরো আগ্রহ বাড়ে যা পড়ে উপচে পড়া এক অমূল্য জিনিস দেখার চিন্তাতে পরিণত হয় যখন গুঞ্জন নিজের কথা দিয়ে পাল্টা আঘাত করে তন্দ্রাকে।
এদিকে গুঞ্জনের কথায় গা জ্বলে উঠলো তন্দ্রার। ও আগুন চোখে তাকিয়ে একটু জোরেই বলে উঠলো,
--- ইয়্যু ব্লা...
--- আরে আস্তে আস্তে। আমি শুনতে পাই। এতো হাইপার হওয়ার কি আছে। এমন কোনো কথা কি আমি বলেছি যাতে তোমার গায়ে এভাবে ফোস্কা পড়ছে?
তন্দ্রার উঁচিয়ে ধরা তর্জনী আঙ্গুলটা নিজের হাত দিয়ে নামিয়ে দিতে দিতে বলল গুঞ্জন। মুখে তার রহস্যময়ী হাসি।
--- উপস! দেখেছো কংগ্রাটসই তো করা হলো না।
এই বলেই তন্দ্রার হাত জোর করে টেনে হাত মিলিয়ে হ্যান্ডশেক করলো গুঞ্জন। তারপর নাটকীয় ভঙ্গিমায় হেসে শুধায়,
--- কংগ্রাচুলেশন ফর ইয়্যুর নিউ জার্নি। যেটা আমার দয়াতেই পাওয়া।
গুঞ্জনের টিটকারী মূলক কথাগুলো সব দাঁতে দাঁত চেপে হজম করে গেলো তন্দ্রা। তন্দ্রার এমন ফোঁসফাঁস দেখে গুঞ্জন হেসে দিলো। বলল,
--- হা হা হা! এভাবে সাপের ফোঁসফাঁস করছো কেনো? আর ইয়্যু স্নেক? নাকি নাগিন নাটকের নাগিন?
কথার সাথে আবার ডান হাত উঠিয়ে সাপের মতো ফণা তুলে অভিনয় করেও দেখালো গুঞ্জন।
তন্দ্রার সহ্যর বাঁধ ভেঙ্গে যায়। ও ফ্লোরের উপর দুই পা দিয়ে জোরে জোরে আঘাত করে। ধুপধাপ পা ফেলে এগিয়ে যায় তরঙ্গের সামনে। গিয়ে বলে,
--- তরঙ্গ তুমি চুপচাপ বসে আছো? এদিকে এই মেয়েটা সেই আসছে থেকে আমাকে যা নয় তাই বলছে। তুমি কিছু বলবে না?
--- না বলবে না।
পিছনে ফিরে গুঞ্জনকে দেখেই রাগী কণ্ঠে তন্দ্রা বলে,
--- হেই ইয়্যু ফলো করছো কেনো? আমাদের পার্সোনাল কথার মাঝখানে নাক গলাচ্ছ কেনো?
--- পার্সোনাল কথা পার্সোনাল স্পেসে গিয়েই বলবে। আর যেখানে ব্যাপারটায় আমি জড়িত সেখানে আমি নাক কান সব গলাবো। আশা করি বুঝেছো।
--- আহহহ! ইয়্যুউউউউ! স্টুপিড লেডি। তরঙ্গ! কিছু বলছো না কেনো?
তন্দ্রার কথায় গুঞ্জন মুখ দিয়ে চুক চুক আওয়াজ বের করে বলে,
--- আফসোস! বিয়ে করছো অথচ উডবির সম্পর্কে কিছুই জানো না। ভেরি ব্যাড!
--- মানে? কি বলছো কি তুমি?
--- সিম্পল। তোমার হবু বর নীরব দর্শকের ভূমিকাই করতে জানে। প্রতিবাদ করার এবিলিটি তার নেই।
শেষ কথাটা বলার সময় গুঞ্জনের কণ্ঠ কেমন শক্ত শোনায়। ওর কথা শুনে তন্দ্রা এবার তরঙ্গকে উদ্দেশ্য করে বলে,
--- তুমি এখনো চুপ থাকবে তরঙ্গ? তোমার সামনে আমাকে কতগুলো কথা শুনাচ্ছে তুমি কিছু বলবে না?
--- উইমেনদের লড়াইয়ে আমি কি করবো? নিজেদের লড়াই নিজেদের মধ্যেই কি করবে করো। আ'ম নট ইন্টারেস্টেড।
এ কথা বলেই পরিহিত ব্লেজার হাত দিয়ে ঝাড়া মেরে সেখান থেকে প্রস্থান করে তরঙ্গ। যাওয়ার আগে তরঙ্গ গুঞ্জনের চোখে চোখ মিলে।
তরঙ্গ চলে যেতেই গুঞ্জন একধাপ এগিয়ে তন্দ্রার মুখোমুখি হয়। ওর চোখের দিকে শিকারী দৃষ্টি দিয়ে বলে,
--- কিপ দ্যাট রিলেশনশিপ। বোর ফিল করলে আমাকে ডেকো আমি পুরো মশলা পাতি মাখিয়ে ব্যাপারটা আরো স্পাইসি করে দিবো। পপকর্ন নিয়ে আমি অলওয়েজ রেডি।
কথা শেষে গুঞ্জন সেখান থেকে অন্য সাইডে যেতে যেতে গেয়ে উঠে,
"জল তরঙ্গে
ঝিলিমিলি, ঝিলিমিলি
ঢেউ তুলে সে যায়!"
****************
সমাজ সর্বদা কেনো নরমের ভক্ষক হয়? আলতার জীবন মা হারানোর পরই বদলে গেছে। বাবা থাকা না থাকা একই। সৎ মায়ের একটু ভালবাসা মাখা কথা শুনতে ওর বুকটা আকুপাঁকু করে।
একটু আদর, স্নেহ পেতে চাতকের ন্যায় অপেক্ষায় থাকে। তাই তো যখন আলতার সৎ মা ইলমা একটু ভালো করে কথা বলে অমনি আলতা গলে গলে পড়ে।
ছুটে আসে মায়ের এক ডাকে। কিন্তু এখানে যে তার জীবন টাই পাল্টে দেওয়া হবে সেটা কস্মিন কালেও ভাবেনি আলতা।
ট্রেন জার্নির পরে ক্লান্ত শরীরে বিশ্রাম নিচ্ছিলো ঠিক তখনি ইলমা হুড়মুড়িয়ে রুমে ঢুকে। হাতে আলতার মতো লাল টকটকে একটা শাড়ি।
শাড়িটা আলতাকে ধরিয়ে দিয়ে বলেছে আজকেই নাকি তার বিয়ে। অস্বীকার করলেই মারধর করে। বোকা রমণী এক বারের জন্যও ভাবলো না ফট করে চলে এলো। আর এখন ফেঁসে গেছে।
লোকটা যদি সিঙ্গেল থাকতো তবে আলতার কোনো সমস্যাই ছিলো না। আলতার সেকেন্ড ম্যারেজ এ এলার্জি। দ্বিতীয় বিয়েতে ওর ভীতি।
একদম গা গুলিয়ে আসার মতো অবস্থা।ও হরহর করে বমি করে। আলতার গায়ে কাঁটা দেয় যখনি শোনে সে কারো লাইফের দ্বিতীয় অপশন।
লোকটার জীবনে আগেও একজন ছিলো। সে তাকে ছুঁইয়েছে কথাটা ভাবলেই বুকের মাঝে ছেৎ করে উঠে। যেহেতু তার জীবনে কেউ আগে ছিলো না, তার জীবনে যে আসবে সে হবে তার প্রথম তাই অবশ্যই বিপরীত পক্ষের জনের লাইফেও সেই প্রথম হবে এটাই চায় আলতা।
মনে মনে আল্লাহকে ডাকে। হাঁটু ভাঁজ করে তার মধ্যে মুখ গুঁজে বসে রয়। চুলের খোঁপা আধখোলা। এলোমেলো। ঠোঁট ফ্যাকাসে, চোখের জল শুকিয়ে গালে দাগ পরে গেছে।
*******************
একটা সংসার সুখী হতে লাগে স্বামী-স্ত্রীর মিল মহব্বত,বিশ্বাস, ভালবাসা এবং সংসারের বাকি সবার সহযোগিতা। যখনই স্বামী স্ত্রীর মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তি ঢোকে তখনই সে সংসার আর টিকে না।
গুঞ্জন তরঙ্গের সংসার জীবনের শুরু থেকেই চলছিল কূটনৈতিক সাংসারিক জঘন্য খেলা। আর এ কারণেই ভেঙ্গে যায় একটা পবিত্র সম্পর্ক।
তবে তরঙ্গ কিন্তু প্রকৃতই গুঞ্জনকে ভালোবেসেছিলো। এখনও হয়তো সেই অনুভূতি মনের কোনো চাপাবনে লুকিয়ে আছে। তরঙ্গ সর্বদাই একজন জেলাস ও পজেজিভ পার্সোন। নিজের স্ত্রী গুঞ্জনের বেলায় সেটার তীব্রতা ব্যাপক।
অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে এই যে স্টেজে বসে আছে তরঙ্গ। পাশেই কতটা মোহনীয় ভাবে সজ্জিত তার ভবিষ্যত স্ত্রী। কিন্তু তরঙ্গ চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে।
যেখানে তার প্রাক্তন স্ত্রী তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে নানা অঙ্গভঙ্গি করছে। এতে তার রাগ নেই। রাগ লাগছে আশেপাশের কতগুলো শকুনরুপী পুরুষ গুঞ্জনের রুপ চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে।
রূপের সুধা পান করছে। রাগে হাতের ভেইন্স স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কারুকার্য করা চেয়ারের হাতল খামচে ধরছে। নখ দেবে যাচ্ছে তাই অবস্থা। দাঁতে দাঁত পিষে নিজ মনে আওড়ায়,
--- বেয়াদব মহিলা দেখো কিভাবে সেজে এসেছে! এক্সের বিয়ে খেতে সেজে গুঁজে পটের বিবি হয়ে ঘুরছে। যতই হোক এক সময় হাসব্যান্ড ছিলাম এসব নজর ওর উপর সহ্য করা জাস্ট ইম্পসিবল।
তরঙ্গের লুচির মতো ফুলতে থাকা চেহারাটা ভারি মজা দিচ্ছে গুঞ্জনকে। সে ওয়েটারকে ডেকে আরেকটা জুস নেয়। জুসের কাঁচের গ্লাসটা হাতে ধরে বসে যায় একটা চেয়ারে।
পায়ের উপর পা তুলে বসে তরঙ্গের চোখের দিকে তাকায়। তার সেই উপহাস করছে যেনো। গ্লাসের নিচের প্রশস্ত অংশ ধরে কায়দা করে গ্লাসটা এদিকে ওদিকে করে। আর সিপ সিপ নেয়।
তরঙ্গ ও চোখের পলক না ফেলে তাকিয়ে রয় নিজের প্রাক্তন স্ত্রীর পানে। কিছু একটা চিন্তা করে বাঁকা হাসে। তারপর ফোন বের করে কাউকে ম্যাসেজ দেয়।
কিছুক্ষন বাদেই হলরুম অন্ধকার করে আলো চলে যায়। আলো যেতেই চারদিকের হইচই
ও বেড়ে যায়। ফিসফিসানি বেড়ে দ্বিগুন হয়।
নিজের ঘাড়ের উপর কারো উত্তপ্ত শ্বাস অনুভব করতেই চমকে ওঠে গুঞ্জন। পরিচিত ম্যান পারফিউম এতো কাছ থেকে তীক্ষ্ণ ভাবে নাকে লাগতেই বুঝে যায় পুরুষটি কে। কিছু বলবে তার আগেই তরঙ্গ ওর মুখ চেপে ধরে ওকে কোলে তুলে নিয়ে হাঁটা দেয় নিজের রুমে।
মুখ চেপে থাকায় শুধু "উম উম" শব্দ ছাড়া আর কিছুই পারছে না গুঞ্জন। কোনো অ্যাকশন নেওয়ার সুযোগটাও দেয়নি তরঙ্গ নামক অসভ্য পুরুষটি। গুঞ্জনকে নিয়ে সোজা নিজের রুমে ঢুকে রুম লক করে বসে।
___________
চলবে~