#জল_তরঙ্গে——#পর্বঃ৯
#ইরফা_মাহনাজ
[বিয়ে স্পেশাল 💃]
______________________
গুঞ্জন কে নিজের বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত করে দেয় তরঙ্গ। তবে যেতে দেয় না। গুঞ্জন বের হতে নিলেই হুশিয়ারি দিয়েছে,
--- এক পাও বের হলে এখানে দুটো ডেড বডি থাকবে।
তরঙ্গের নাটক জাস্ট সহ্য হচ্ছে না গুঞ্জনের। এসবে থোড়াই পরও আছে তরঙ্গের! সে নিজের প্যান্টের পকেট থেকে একটা রিং বের করে। রিংটা গুঞ্জনের চোখের সামনে ধরতে বিদ্যুৎ শক লাগে গুঞ্জনের তনু কায়ায়।
এটা তরঙ্গ গুঞ্জন এর প্রথম ভালোবাসার চিহ্ন। তরঙ্গের গুঞ্জনকে দেওয়া ওয়েডিং গিফ্ট।
--- এটা তো... তোমার কাছে কি করে এলো?
প্রশ্নটা করার সময় গুঞ্জনের কণ্ঠস্বরটা হালকা কম্পিত হয়। শতই হোক আংটিটা গুঞ্জনের জন্য স্পেশাল। তরঙ্গ ঠোঁট এলিয়ে হাসে। তাচ্ছিল্যভরা গলায় শুধায়,
--- আমার কাছে থাকার কথা ছিল না বুঝি?
গুঞ্জনকে হ্যাচকা টানে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এনে দাঁড় করায়। অতঃপর গুঞ্জনের গলা থেকে লকেট টা খুলে নেয়। সেটি হাতে নিয়ে লকেটের মধ্য দিয়ে আংটিটা প্রবেশ করিয়ে ফের আংটি সমেত লকেটটা গুঞ্জনের গলায় পরিয়ে দেয় তরঙ্গ।
আয়নার মধ্য দিয়ে তরঙ্গের ওই দুজোড়া গভীর চোখের দৃষ্টির সাথে মিলন ঘটে গুঞ্জনের দৃষ্টির। দুজনের চোখে চোখে বিনিময় হয় বহু না বলা অভিযোগ। নীরবতা ভেঙে তরঙ্গই বলে,
--- অস্থায়ী ভাবে আংটিটা এখানেই থাকুক। সময় হলে আংটি নিজস্ব স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে নেবে।
তরঙ্গের কথার গভীরতা উপলব্ধি করতে পেরে গুঞ্জন থমকে যায়। আজ অনেক গুলো বছর পর গুঞ্জনের ভাঙা হৃদয়টায় কিছু অনুভূত হয়। গুঞ্জন কি কোনো ভুল করলো?
ওর বাম চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পরে এক ফোঁটা চোখের জল। তরঙ্গ খুব যত্নের সহিত গুঞ্জনের সেই চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে শুধায়,
--- আজীবন শুধু ব্ল্যান্ডারই করে গেলে! আর সেটার দায়ভার সবসময় আমাকেই নিতে হয়।
গুঞ্জন ফিরে তাকালো তরঙ্গের দিকে। বলল খুব কঠিন স্বরে,
--- আমাদের পথচলা পাঁচ বছর আগেই শেষ নতুন জীবনের শুভকামনা।
তাকিয়ে রয় দুজন দুজনের দিকে। কথা বলে ঠিক করা গেলেও দুজনেই কোথাও না কোথাও আটকে আছে। পাঁচ বছর আগে কি এমন ঘটে যার জন্য গুঞ্জন এতো বড় সিদ্ধান্ত নেয়?
এতো বছরের ধামাচাপা কাহিনীর জট এখন এসে খোলার রাস্তা বন্ধ। সেই রাস্তাটা গুঞ্জন-তরঙ্গের ডিভোর্স বন্ধ করে দেয়। তরঙ্গ গুঞ্জনের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবে,
--- বেইমানিটা না করলেই পারতে গুঞ্জন!
আর গুঞ্জন তরঙ্গের দিকে তাকিয়ে ভাবে,
--- এখন সুপুরুষ হওয়ার চেষ্টা করলে লাভ আছে! সময় কালে তো কাপুরুষত্বের পরিচয়ই দিলে। কি এমন হতো সেদিন বিশ্বাস করলে।
****************
লাইট এসেছে অনেক্ষন কিন্তু তরঙ্গের দেখা নেই। লাইট আসতেই তন্দ্রা তরঙ্গকে নিজের পাশে পায়না। ঠিক তখনি দোতলার সিঁড়ি বেয়ে তরঙ্গকে আসতে দেখা যায়।
সেই সাথে দেখা যায় গুঞ্জনকে। গুঞ্জন তরঙ্গকে একসাথে দেখে মাথায় বাজ পড়ে স্রোত, তটিনী ও তন্দ্রার মাথায়। এরা দুজন এক হওয়া মানে তাদের বিপদ।
রমরমা পরিবেশটা মুহূর্তেই নিস্তব্ধতায় পরিণত হয়। কেউ কেউ বিস্ময় প্রকাশ করে। তো কেউ কেউ হাসে।
--- হবু বউ রেখে প্রাক্তনের সাথে বুঝি লীলা খেলতে গিয়েছে?
--- বড়োলোকদের ঢঙের শেষ নেই।
--- মেয়েটা কি নির্লজ্জ্ব!
--- ছেলেটা তো মোটেই ভালো না। চরিত্রে সমস্যা আছে।
এমন নানারকমের কথায় মুখরিত আশপাশ। স্রোত এগিয়ে এলেন হায়!হায়! করতে করতে। এসেই চড়াও হলেন গুঞ্জনের উপর।
--- আমি তোকে বলেছিলাম তটিনী এই কালনাগিনীকে ইনভাইট করিস না। দেখ এখন। আমার ছেলের শান্তি এর সহ্য হয় না।
--- মা আমার কথা শোনো....
তরঙ্গকে থামিয়ে নিজেই বিলাপ পাড়তে শুরু করেন।
--- তুই চুপ থাক। আর এই মেয়ে বের হ তুই এক্ষুনি আমার বাড়ি থেকে।
বলেই যেই না গুঞ্জনকে মারতে উদ্যোত হয় অমনি গুঞ্জন খপ করে স্রোতের হাতটা ধরে ফেলে। ঝাড়া মেরে হাত ফেলে দিয়ে শাসায়,
--- খবরদার এই ভুল করবেন না। আগে আপনাদের বাড়ির বউ নামের ঝি ছিলাম তখন আমাকে যখন খুশি মেরেছেন আমি কিছু বলিনি। বাট নাও আমার সাথে আপনাদের কোনো সম্পর্ক নেই। হাত ওঠালে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিবো।
স্রোতের মুখে যেনো ঝামা ঘষে দিলো গুঞ্জন। অপমানে অগ্নিশর্মা হয়ে ছেলেকে বললেন,
--- দেখ দেখ এই মেয়ের সাহস দেখ এখনও তুই চুপ করে থাকবি?
রহস্যময় হাসলো তরঙ্গ। মাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
--- একদমই না মা।
গুঞ্জন ও এবারে তৈরি হলো তরঙ্গের কাপুরুষের মতো পরিচয় দিয়ে বলা কথা শুনতে। স্রোতের মুখে ফুটে উঠলো বিজয়ী হাসি তবে তা বেশিক্ষন থাকলো না।
--- আমি ধরলে কিন্তু প্রত্যেকের হিসেব নিবো। নতুন পুরোনো সব হিসেব চুকাবো।
তরঙ্গের হিমশিতল গলার হুমকিতে থমকাতে হয় স্রোতকে। মনে মনে আঁতকে উঠেন তিনি কি একটু বেশিই করে ফেললেন! ছেলে তার হাতের নাগালের বাহিরে চলে গেলে কিছুই থাকবে না।
এসবের মাঝেও তন্দ্রার দৃষ্টি গুঞ্জনের গলায় থাকা লকেটে। যেথায় শোভা পাচ্ছে সেই আংটিটি। তন্দ্রার বহুল প্রতীক্ষার সেই আংটিটি গুঞ্জনের গলায় পরিহিত চেইনের সাথে আটকানো।
****************
তরণ দুই হাত মুষ্ঠী করে দাড়িয়ে আছে। রাগে ওর শরীরের পেশি ফুলে ফেঁপে উঠছে। নাভির নিচে পড়া প্যান্ট শুধু। উপরে উন্মুক্ত। পেটের কাছের ঘামে, পরিশ্রম করে গড়া সিক্স প্যাক গুলো জ্বল জ্বল করছে।
তখন আলতার গায়ে কোনো কিছু না থাকায় নিজের শার্ট খুলে মেয়েটাকে পড়িয়ে দেয়। কেনো জানি ইলমা যখন আলতাকে নষ্ট মেয়ে বলে ওই অবস্থায় টেনে হিচড়ে নিতে ছিলো তখন তরণের মোটেও ভালো লাগেনি।
এতো মানুষের সামনে মেয়েটা খোলা বইয়ের মতো প্রদর্শন হবে ভেবেই রাগ বইছিলো শিরায় শিরায়। তাই তো গা থেকে শার্ট খুলে ছুড়ে মেরে হুংকার দিয়ে বলে।
--- কোনো কথা শুনতে ইচ্ছুক নই। বডির আকর্ষণীয় সে** পার্ট গুলো খুবই আবেদনময়ী ভাবে দেখা যাচ্ছে। আমি সংযত থাকলেও বাকিরা সেটা করবে না।
আলতার তখন লজ্জায় গাল দুটো গরম হয়ে গেলো। তড়িঘড়ি করে পড়ে নিলো তরণের শার্ট। যেই শার্ট থেকে ভেসে আসে কড়া ম্যানলি পারফিউম ও তরণের বডির নিজস্ব ঘ্রাণ।
কোনো কিছুতেই ভুল ধারণা ভাঙাতে পারে না তরণ। ছেলের বাড়ি বিয়ে ভেঙ্গে দেওয়ায় উপস্থিত লোক মিলে জোর করে আলতার সাথে তরণের বিয়ে পড়িয়ে দেয়।
আলতার "কবুল" বলাতে ওর গলাটা বুঝি কেঁপে উঠলো। তরণ অবশ্য এতো ঢং করেনি। শক্ত চোয়ালে সে তিন বার কবুল উচ্চারণ করে আলতা নামক রমণীকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী রুপে গ্রহণ করে।
ইলমা অবশ্য খুশি বিয়ে যার সাথেই হোক। আপদ তো বিদায় হলো। তবে আলতাকে অপমান করার এতো বড় সুযোগ ছাড়তে ইচ্ছে করলো না।
তরণকে ওর বন্ধুরা শান্তনা দিচ্ছে। যা হয়েছে মেনে নিতে বললেও সে নির্বাক। দাঁতে দাঁত পিষে কটমট শব্দ হচ্ছে। আঙ্গুলের মটকা ফুটিয়ে ঘাড় এদিকে ওদিকে নাড়াতেই কটমট করে উঠে।
এরই মাঝে হুট করে কোথা থেকে উড়াল দিয়ে এসে আলতার সৎ মা ওর চুলের মুঠি ধরে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে আরম্ভ করে।
--- দুশ্চিরিত্র মেয়ে! বিয়ের আগে লাং এর সাথে শুইয়ে পেট বাঁধানোর ধান্ধা।
তরণের হাতের পেশি গুলো ফুলে উঠলো, ঘাড়ের আর হাতের রগ গুলো স্পষ্ট হয়ে উঠলো। গটগট করে এগিয়ে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাজ পাখির মতো থাবা বসালো আলতার সৎ মায়ের উপর।
মহিলার চুলের মুঠি চেপে ধরে আলতার থেকে আলাদা করে। একবার আলতার কান্নারত, অসহায় ব্যথায় জর্জরিত মুখটার দিকে তাকিয়ে শক্ত চোখে তাকিয়ে গর্জে উঠলো।
এমন টকবগে যুবকের হাতের থাবা চুলে পড়তেই কুঁকড়ে ওঠে ইলমা। পুরুষালি অসুর শক্তির সামনে টিকতে না পেরে আর্তনাদ করে ওঠে।
তরণের সেই ভয়ানক লাল হওয়া চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে কেউ এগোনোর সাহস পায়না। তরণ অপেক্ষা না করে নিজের ইস্পাত কঠিন হাত দিয়ে পরপর কয়েকটা থাপ্পড় মারে ইলমাকে।
ব্যথায় চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ছটফট করতে শুরু করে। হয়তো বুঝতে পারে আলতার কষ্ট। এতেও শান্ত হয়না।
আলতা নিজের সৎ মা কে এভাবে ছটফট করতে দেখে কি করবে না পেয়ে শেষে পিছন থেকে তরণকে জাপটে ধরে।
তরণের উম্মক্ত ঘর্মাক্ত পিঠের সাথে লেপ্টে বুকের কাছে নিজের ছোট ছোট তুলতুলে হাত দুটো চেপে ধরে। তরণের হার্টবিট অস্বাভাবিক ভাবে বিট করে।
চিবিয়ে চিবিয়ে তরণ বলে ওঠে,
--- বিয়ে মানা বা না মানা আমার ব্যাপার। তবে কেউ যদি আমার বউয়ের দিকে চোখ তুলে তাকায় আমি সেই চোখ তুলে ফেলবো। কেউ যদি হাত ওঠায় আমি সেই হাত ভেঙ্গে ফেলবো। কেউ যদি গলা উঁচিয়ে কথা বলে আমি সেই গলার রগ ছিঁড়ে ফেলবো।
মুহূর্ত ব্যায় না করে আলতার তুলোর ন্যায় শরীরটা নিজের কাঁধে উঠিয়ে নিলো তরণ। সামনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ এক জায়গায় এসে থামে।
পা উঠিয়ে সজোরে লাথি বসায় আলতার সাথে বিয়ে ঠিক হওয়া সেই লোকটার স্পর্শকাতর স্থানে।
সঙ্গে সঙ্গে লোকটা নিজের সেই স্থান চেপে আর্তনাদ করে মাটিতে বসে পড়ে। লোকটার কান্নার মাঝেই তরণ ভারি কণ্ঠে আওড়ায়,
--- আজ থেকে এই মেয়ে তরণের বান্দি। আগে তোর মতো কাওয়ার্ডের সাথে কি ছিলো ওসব চিরতরে মাথা থেকে রিমোভ করে দে। বাজে নজরে তাকিয়ে দেখিস তোর চোখ তুলে আমি মাছেদের খাওয়াবো।
আসলে লোকটা আলতার দিকে খুবই বাজে দৃষ্টিতে তাকায়। সেটা আবার তরণের শিকারী চোখ দেখে ফেলে।
--- টুটুল রাঙামাটি ট্যুর এখানেই ক্লোজড। আমি ব্যাক করবো।
অতপর সকলের উদ্দেশ্য একটাই কথা বলে,
--- আ'ম নট হিরো। আ'ম ভিলেন। ড্যাম ফা** ভিলেন!
___________
চলবে~