ফন্ট সাইজ:
থিম:
কাজল্লাতার মেঘ

৭ম পর্ব

লেখক: Rahmatunnesa

কাজললতার মেঘ ☁️

লেখিকা: রহমাতুন্নেছা
পর্ব ৭
সকালের মিষ্টি সুন্দর আবহাওয়া নিয়ে ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই চারপাশটা এক স্নিগ্ধ রূপ ধারণ করল। শীতের শেষ আমেজ জড়ানো নরম রোদের ছোঁয়া তখন গাছের পাতায় পাতায় ঝুলে থাকা শিশিরবিন্দুগুলোকে মুক্তার মতো জ্বলজ্বলে করে তুলছে। হালকা হিমেল বাতাসে প্রকৃতির ঘুম ভাঙার সেই ক্ষণটায় এক অদ্ভুত প্রশান্তি বিরাজ করছিল।
প্রতিদিনের মতো এই সুন্দর সকালে অজু সেরে মা ফাতেমা বেগম আর জান্নাতুল দাঁড়িয়ে গেলেন জায়নামাজে। ফজর ওয়াক্তের নামাজ শেষে দুজনে পবিত্র কোরআন শরিফ হাতে নিয়ে পাশাপাশি বসে গেলেন। চারপাশের পিনপতন নীরবতার মাঝে মা-মেয়ের কণ্ঠে কোরআনের তিলাওয়াত ঘরের কোণে কোণে যেন রহমতের নূর ছড়িয়ে দিল। কিছু সময় পর তিলাওয়াত শেষ করে মা ফাতেমা বেগম আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে মেয়েকে দ্বীনি কিছু কথা বোঝাতে শুরু করলেন। তিনি খুব স্নেহের সাথে বললেন,
 "দেখিস মা, দুনিয়ার জীবনে কষ্ট-অভাব যতই থাকুক না কেন, আল্লাহর ওপর ভরসা হারাতে নেই। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন—'নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে' (সুরা ইনশিরাহ, আয়াত ৬)। যে হাত সবসময় আল্লাহর কাছে মোনাজাতে ওঠে, সে হাত কখনো শূন্য হয় না।
" মায়ের এই পবিত্র ও মায়াবী কথামালার মাঝে ঘরের ভেতর এক অপরূপ আধ্যাত্মিক সুবাস ছড়িয়ে পড়ল।
 ঘরের অন্য প্রান্তে শুরু হলো ভাই-বোনের এক সুন্দর মিষ্টি মুহূর্ত। বড় ভাই আরিফ তখন কাজের উদ্দেশ্যে বাইরে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু তার কলারটা ঠিকমতো ভাজ করা ছিল না দেখে জান্নাতুল ছুটে এসে নিজহাতে ভাইয়ার কলারটা ঠিক করে দিয়ে মিষ্টি হেসে বলল,
 "যাওয়ার সময় একটু সাবধানে থেকো ভাইয়া, রাস্তাঘাটে বেশি দেরি কোরো না যেন!" আরিফ আদুরে গলায় বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে একটা চকোলেট তার হাতে গুঁজে দিয়ে মুচকি হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। 
ভাই-বোনের এই খুনসুটি ভরা মুহূর্তটা পুরো পরিবারে একটা মায়ার পরশ বুলিয়ে দিল।
কিছুক্ষণ পর স্কুল ড্রেস পরে বান্ধবীদের সাথে ইস্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা হলো জান্নাতুল। ঠিক তখনই পথিমধ্যে ঘটল সেই কাঙ্ক্ষিত ঘটনা!
সামনাসামনি এসে পড়ল ইমন। আর সেদিন ইমনের গায়ে জড়ানো ছিল এমন এক মোহনীয় ও মাতাল করা সুগন্ধি পারফিউমের ঘ্রাণ, যা বাতাসের সাথে মিশে জান্নাতের নাক ছূঁয়ে সোজা তার হৃদয়ে গিয়ে আঘাত হানল! সেই সুবাসে যেন জান্নাতের মাথাটা একটু ঝিমঝিম করে উঠল, গা-হাত-পায়ে এক অজানা কাঁপুনি শুরু হলো।
ইমন কিন্তু আগের মতো আর কোনো নাটক বা ফাজলামো করল না। সে জান্নাতুলের পাশ দিয়ে এমন ভাব নিয়ে হেঁটে চলে গেল, যেন সে পৃথিবীতে জান্নাতকে চেনেই না! তবে পাশ দিয়ে যাওয়ার ওই ক্ষণিক সময়ে চোখের পলকে সে জান্নাতের হাতে একটা ভাঁজ করা চিঠি গুঁজে দিয়ে এক নিমিষে পার হয়ে গেল।
জান্নাতুলের বুকের ভেতর তখন ড্রামের মতো ঢিপঢিপ শব্দ হচ্ছে! তার মনে হলো তার পায়ের তলার মাটি যেন সরে যাচ্ছে। বান্ধবীরা তখন নিজেদের মধ্যে অন্যমনস্ক হয়ে গল্প করছিল বলে খেয়ালই করতে পারেনি যে ইমনের হাত থেকে জান্নাতের হাতে একটা চিঠি এসে জমা হয়েছে। আজ ইমন দ্বিতীয়বার আর ফিরে এল না, সে একবারে সোজা তার বন্ধুদের কাছে চলে গেল। বন্ধুদের কাছে গিয়ে সে তখন দারুণ নার্ভাস—ভয়ে তার বুক কেঁপে উঠছিল যে কাজললতা চিঠিটা পড়ে কী না জানি প্রতিক্রিয়া দেখাবে!
 বন্ধুরা তো তাকে ঘিরে ধরে মহা উল্লাসে নানা রকম মশকরা শুরু করে দিল, "কিরে কবি সাহেব! প্যান্ট কি একেবারে ভিজে গেছে নাকি ভয়ে? নাকি কাজললতার রাগ দেখে জানটা খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড় হয়েছিল?"
ওদিকে বান্ধবীদের অগোচরে জান্নাতুল তার বইয়ের পাতার মাঝে পরম যত্নে চিঠিটা লুকিয়ে ফেলল এবং বুক কাঁপতে কাঁপতে ইস্কুলে গিয়ে পৌঁছাল।
স্কুলের পালা চুকিয়ে সারাদিন মনের ভেতর অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে কেটে গেল জান্নাতুলের। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে, দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে সে যখন একটু বিশ্রামের জন্য বিছানায় গেল, তখন যেন চোখের পাতা এক পলকের জন্যও এক করতে পারল না। চোখের সামনে কেবল ভাসছিল ইমনের সেই মুখখানা আর তার গায়ে মাখা সেই মাতাল করা সুবাস!
এভাবে কেটে গেল সারাটি দিন। গভীর রাত তখন ১২টা বেজে গেছে। চারপাশটা একদম নিঝুম। জান্নাতুল নিজের ঘরের কাঠের জানলাটা আস্তে করে খুলে দিল। বাইরে তখন শরৎ বা বসন্তের সেই মায়াবী চাঁদনি রাতের জোছনা উপচে পড়ছে। রাতের সেই রূপালি আলো জান্নাতের মুখের ওপর এসে পড়ল। খোলা জানলার বাতাসে তার কোমরছোঁয়া লম্বা, ঘন কালো চুলগুলো এলোমেলো হয়ে তার মুখের চারপাশে নাচানাচি করছিল।
সাদা ধবধবে ফর্সা ত্বক, যার মাঝে টানা টানা মায়াবী হরিণ চোখ দুটিতে ডিপ কাজল টানা; আর গোলাপি আভা ছড়ানো নরম ঠোঁট—চাঁদের আলোয় জান্নাতুলকে দেখতে এতটাই অপ্সরী ও রাজকন্যার মতো লাগছিল যে, পৃথিবীর যেকোনো সাধারণ ছেলেই তার ওই রূপ দেখে পলকে থমকে দাঁড়িয়ে যেতে পারত! জান্নাতুলের পরনে ছিল একটি অতি সাধারণ, কম দামি সুতির থ্রি-পিস। আসলে তাদের সংসারটা এতটাই অভাবের যে, বছরের দুইটা ঈদে মাত্র দুটো নতুন পোশাক জোটে। সারাবছর ওই দুটো জামা দিয়েই কোনোমতে দিন পার করতে হয়। মানুষ হয়তো বিলাসিতায় জীবন কাটায়, কিন্তু তাদের রক্তে বা কপালে বিলাসিতার কোনো জায়গা ছিল না। জান্নাতুল হলো এক খাঁটি গরিব ঘরের অবহেলিত রাজকন্যা—যাকে মহান আল্লাহ তাআলা রূপ-যৌবনের এমন এক নিখুঁত অবয়ব দিয়ে সাজিয়েছেন, যার জন্য তার জীবনে সুখের চেয়ে কষ্টের কাঁটায় হয়তো বেশি বিঁধে আছে, তা কেবল সর্বশক্তিমান আল্লাহই ভালো জানেন।
জান্নাতুল সেই খোলা জানালার পাশে একটা পুরোনো কাঠের চেয়ার টেনে বসল। বুক কাঁপানো উত্তেজনার মাঝে সে অবশেষে ইমনের সেই পরম কাঙ্ক্ষিত চিঠিটা বের করে আস্তে আস্তে খুলল।
ইমনের সেই চিঠিটি ছিল ঠিক এ রকম—
"আমার মায়াবতী কাজললতা,
জানি না এই চিঠিটা তোমার হাতে পৌঁছানোর পর তোমার মনের অবস্থা কেমন হবে, তবে আমার হাত দুটো কাঁপছে। তোমাকে প্রথম যেদিন আমি ওই ইস্কুলের গেটের সামনে দেখেছিলাম, বিশ্বাস করো—সেদিন আমার জীবনের ঘড়িটা যেন অন্য কোনো সময়ে গিয়ে থেমে গিয়েছিল। তোমার ওই টানাটানা হরিণ চোখের মায়ায় আমি এমন এক অদ্ভুত ঘোরে পড়ে গিয়েছিলাম যে, সেদিন শুধু তোমার ওই দুই চোখ ছাড়া পৃথিবীর আর কিচ্ছু আমার চোখে পড়েনি। মনে হয়েছিল, এমন রূপ তো মানুষের হতে পারে না!
আজ তোমাকে একটা সত্যি কথা বলি, কাজললতা। তোমাকে আমি আজ এক মাস ধরে বা এক বছর ধরে নয়—পুরো ৩ বছর ধরে ভালোবেসে আসছি! তুমি হয়তো জানো না, বহু দূর থেকে নিঃশব্দে তোমার চলাফেরা দেখা, তোমার ওই রাগী চাহনি ভালো লাগা—এসবই আমার ৩ বছরের না বলা এক দীর্ঘ উপাসনা। এই দীর্ঘ সময় ধরে নীরবে তোমাকে ভালোবেসে গেছি, সাহস করে সামনে এসে দাঁড়াতে পারিনি। তোমাকে আমি 'কাজললতা' নামে ডাকি, কারণ তোমার ওই চোখের কাজল আর তোমার পুরো অস্তিত্বটা আমার কাছে যেকোনো লতার চেয়েও বেশি পবিত্র ও কোমল মনে হয়। আমার এই কবি-প্রাণের প্রতিটি কবিতায় কেবল তোমারই নাম লেখা থাকে। তুমি আমার জীবনের সেই ধ্রুবতারা, যার আলো ছাড়া আমার একটা মুহূর্তও চলা অসম্ভব। তুমি কি একটুও ভালোবাসো এই অবুঝ কবিটাকে? তোমার উত্তরের অপেক্ষায় পলকহীন তাকিয়ে রইলাম।
ইতি—
তোমার সেই পাগল কবি সাহেব।"
চিঠিটার শেষ লাইনটা পড়ার পর জান্নাতুলের দুই চোখ বেয়ে গাল গড়িয়ে নেমে এল আনন্দের উষ্ণ জল। বুক চিরে বেরিয়ে এল এক দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস। ৩ বছর ধরে একটা মানুষ তাকে এতটা গোপনে ভালোবেসে গেছে—ভাবতেই তার সারা শরীর অবর্ণনীয় এক শিহরণে কেঁপে উঠল।
চাঁদের সেই মায়াবী আলোয় চিঠিটা বুকে জড়িয়ে ধরে জান্নাতুল মৃদুস্বরে ফিসফিস করে বলে উঠল—
৩ বছর ধরে? সত্যি বলছেন কবি সাহেব, আমাকে ভালোবাসেন আপনি, 
কিন্তু আমাকে কখনো বলেননি আপনি আস্ত একটা পাগল!"
আর রাতের সেই জোছনার আলোয় মিলিয়ে গেল এক অমর প্রেমের শুরুর অধ্যায়।
রাতের সেই মায়াবী জোছনায় ইমনের চিঠিটা বুকে চেপে ধরে কতক্ষণ যে কেটে গেছে, তার কোনো ঠিক ঠিকানা ছিলো না। জান্নাতুলের চোখের পলক যেন আর পড়তে চাইছিল না। চিঠির প্রতিটা লাইনে জমে থাকা ৩ বছরের নিঃশব্দ ভালোবাসার ওজন সে টের পাচ্ছিল প্রতিটা হৃদস্পন্দনে। যে ছেলেটাকে সে মাত্র এক মাস ধরে ঝগড়াকারী 'অকবি' আর অহংকারী ভাবতো, সেই মানুষটাই সুদূর অতীত থেকে তাকে গোপনে ভালোবেসে গেছে—এই ভাবনাটা তার অবুঝ মনে অদ্ভুত এক শিহরণ জাগিয়ে তুলল। বিছানায় শুয়েও সারারাত চোখের পাতা এক করতে পারল না সে। ইমনের চিঠির প্রতিটা অক্ষরের সাথে যেন তার নিজের ভেতরের না বলা অনুভূতিগুলো মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল পাখির ডাকে। ফাল্গুনের সেই মিষ্টি রোদের ছোঁয়া যখন ঘরের জানলা গলে বিছানায় এসে পড়ল, তখন জান্নাতুলের মুখে এক ফালি অচেনা তৃপ্তির হাসি। প্রতিদিনের মতো সেদিনও মায়ের সাথে অজু সেরে ফজর পড়ে কোরআন শরিফ হাতে বসল সে। তিলাওয়াত শেষ করে মায়ের সাথে কিছু চমৎকার দ্বীনি কথায় মনটা আরও হালকা হয়ে গেল। ফাতেমা বেগম মেয়েকে পরম স্নেহে বুঝিয়ে বললেন, "দেখিস মা, খাঁটি ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যায় না। যদি তা পবিত্র নিয়তে গড়া হয়, তবে আল্লাহ তাআলা তা কোনো না কোনোভাবে কবুল করেনই।" মায়ের এই কথাগুলো যেন জান্নাতুলের মনের জমে থাকা সব সংশয় ধুয়ে মুছে সাফ করে দিলো।
স্কুলে যাওয়ার সময় গেটের সামনে আসতেই সেই চিরচেনা সুবাসটা যেন বাতাস ভেদ করে তার নাকে এসে লাগল। ইস্কুলের গেটের কাছাকাছি পৌঁছাতেই দেখা গেল, প্রতিদিনের সেই পরিচিত মুখটা গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে। তবে আজকের ইমন আগের মতো ভাব বা তাচ্ছিল্য নিয়ে দাঁড়িয়ে নেই; তার চোখেমুখে স্পষ্ট এক উৎকণ্ঠা আর অজানা ভয়ের ছাপ! 
বান্ধবীরা তখন নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি আর ফাজলামো করতে ব্যস্ত। রিয়া পেছন থেকে ফিসফিস করে বলে উঠল, "কিরে জানু! কাল তো তোর কবি সাহেব তোর হাতে একটা প্রেমপত্র ধরিয়ে দিল, আজ কি তুই তাকে কোনো ভালোবাসার বার্তা দিবি নাকি রে?"
প্রিয়া খিলখিল করে হেসে উঠল, "আরে দে না একটা কড়া জবাব! দেখি আমাদের কবি সাহেব কেমন সামলায়!"
জান্নাতুল লজ্জায় রাঙা হয়ে বান্ধবীদের ধমক দিয়ে সামনে এগোতে লাগল। ঠিক তখনই ইমন তাদের ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল। সকালের সেই নরম রোদে ইমনের কপালে এসে পড়া কোঁকড়ানো চুলগুলো বাতাসে উড়ছিল। তার সেই শ্যামলা মুখে আজ কোনো চতুর বাঁকা হাসি নেই, বরং বুক কাঁপানো এক আকুলতা।
ইমন জান্নাতুলের সামনে এসে দুই সেকেন্ডের জন্য থমকে দাঁড়াল। তারপর খুব সাবধানে, অতি যত্নে নিজের পকেট থেকে একটা ছোট্ট ভাঁজ করা চিরকুট বের করে জান্নাতুলের হাতের মুঠোর ভেতর গুঁজে দিল। আর ঠিক আগের মতো এক সেকেন্ডও দেরি না করে সেখান থেকে এক দৌড়ে তার বন্ধুদের আড্ডার জায়গায় চলে গেলো।
জান্নাতুল হতবাক হয়ে গেল কি হলো বিষয়টা বুঝতে পারলাম না, কিভাবে তুফানের মত এসে আবার ঝড়ের বেগে চলে যাওয়ার কাহিনী কি, আমি তো ভেবেছিলাম আমি যে তাকে ভালোবাসে এটা জানাবো, কিন্তু ইমন তার হাতে নতুন করে একটি চিঠি ধরাই দিয়ে আবার কই চলে গেল,
বান্ধবীরা তো এবার রীতিমতো চোখ কপালে তুলে ফেলল! মিম চেঁচিয়ে উঠল, "ওমা! দেখছিস কাণ্ড! চোখের পলকে চিঠি দিয়ে আবার হাওয়া হয়ে গেল! আমাদের সামনেই এত বড় কাণ্ড ঘটে গেল, আর আমরা টেরই পেলাম না!"
জান্নাতুল লজ্জায় ও অস্থির হয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে দ্রুত চিঠিটা বোরকার পকেটে লুকিয়ে ফেলল। ইস্কুলের চত্বরে পৌঁছে ক্লাস চলাকালীন তার মন টিকল না। টিফিনের ফাঁকে বান্ধবীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সে স্কুলের পেছনের সেই প্রাচীন 'পুরাতন বটতলার চাতাল'-এর কিছুটা দূরে একটা নির্জন জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল। বুক ধড়ফড় করা অবস্থাতেই সে ইমনের দেওয়া ছোট্ট চিরকুটটা খুলল।
চিঠির ওপর বড় বড় অক্ষরে লেখা—
"আমার জীবনের একমাত্র কাজললতা,
তুমি বিশ্বাস করো বা না করো, গত ৩ বছর ধরে প্রতিদিন ইস্কুলের এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় কেবল তোমার এক পলক দেখার জন্য আমি প্রহর গুনতাম। কখনো সাহস হয়নি সামনে এসে দাঁড়ানোর, কারণ আমার না ছিল কোনো বড় পরিচয়, না ছিল অহংকার করার মতো সামর্থ্য। শুধু বুকভরা ভালোবাসা আর কিছু কবিতা নিয়ে বেঁচে ছিলাম। তুমি যখন প্রথম আমার ওপর রেগে গিয়ে গালি দিলে, বিশ্বাস করো—সেদিন আমার মনে হয়েছিল পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর গান শুনছি! আমার এই অবুঝ হৃদয়ের ৩ বছরের উপাসনা আজ সার্থক হলো। তুমি কি সত্যিই তোমার এই পাগল কবিকে একটু জায়গা দেবে তোমার ওই ছোট্ট হৃদয়ে? তোমার উত্তরের অপেক্ষায় আমার এই প্রাণটা খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড় হয়েছে, কাজললতা!"**
চিঠিটা পড়ার পর জান্নাতুলের চোখ দুটো আনন্দাশ্রুতে ভিজে এল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। পকেট থেকে একটা ছোট পেন্সিল বের করে ইমনের চিঠির ঠিক নিচে খুব সুন্দর করে লিখে দিল—
"কবি সাহেব, আপনার ৩ বছরের অপেক্ষা আর ভালোবাসার জয় হলো। আজ থেকে আপনার এই কাজললতা শুধু আপনারই রইল!"
চিঠিটা ভাঁজ করে সে দূর থেকেই ইমনের বন্ধুদের আড্ডার দিকে তাকিয়ে একটা মিষ্টি হাসি দিল। মফস্বল শহরের এই ধূলিমলিন রাস্তায় তখন যেন ফাল্গুনের বসন্ত বাতাস আরও তীব্রভাবে মেতে উঠল দুই কিশোর-কিশোরীর মায়াবী প্রেমে।
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন